সারেং বৌ উপন্যাস । বাংলাদেশের উপন্যাসের শৈলীবিচার

আজকে আমাদের আলোচনার বিষয়: সারেং বৌ উপন্যাস । এটি বাংলাদেশের উপন্যাসের শৈলীবিচার এর আঞ্চলিক উপন্যাসের শিল্পশৈলী এর অন্তর্গত।

 

সারেং বৌ উপন্যাস

 

সারেং বৌ উপন্যাস

প্রাকৃতিক পরিবেশ ধৃত অঞ্চল বিশেষের বাস্তবতা ও রোমান্টিক দৃষ্টির সহজ সমন্বয়ে শহীদুল্লা কায়সার (১৯২৬- ১৯৭১) রচনা করেন তাঁর ‘সারেং বৌ’ (১৯৬২) উপন্যাস। বাস্তবতা বা “রিয়েলেটি’ বিষয়টি আধুনিক সাহিত্যে বেশ গুরুত্ব পেয়ে থাকে, বিশেষত কার্ল মার্কস (১৮১৮-৮৩) ও ফিডরিশ এঞ্জেলস (১৮২০-৯৫) এর দ্বান্দ্বিক বস্তুবাদ প্রবর্তনের পর থেকে।

মার্কসীয় চিন্তাধারা অনুযায়ী মানুষের ভাগ্য বা নিয়তি নিয়ন্ত্রিত হয়, তার অর্থনৈতিক পরিস্থিতি দ্বারা। সমাজের অর্থনৈতিক কর্মকান্ড তথা বস্তুর উৎপাদন ব্যবস্থা, বণ্টন ও বিপণন পদ্ধতির উপর ভিত্তি করে গড়ে উঠে বাস্তব অবস্থা। সমাজ ও ধর্ম প্রাচীন। কখনো কখনো সামাজিক নিয়ম ও ধর্মীয় বিধিও মানুষের ভাগ্যকে নিয়ন্ত্রতা করে। মানুষ নিত্য যে সামাজিক সমস্যাগুলির সম্মুখীন হয়, তার মূলে রয়েছে অর্থনৈতিক সমস্যা।

এই সমস্যায় যুগে যুগে ভুলুণ্ঠিত হয়েছে মানবিকতা। কিন্তু বুর্জোয়া ব্যবস্থায় এর সমাধান নেই। ফলে একটি দ্বান্দ্বিক অবস্থা বিরাজ করছে আমাদের মত উন্নয়নশীল দেশগুলোতে। সারেং বৌ’ উপন্যাসে বিধৃত সমাজ ও পটভূমির বিবেচনায় উপরোক্ত কথাগুলো খুব প্রাসঙ্গিক। জীবন সংগঠন ও অস্তিত্ব অভীসার প্রশ্নে বিভাগোত্তর দ্বিতীয় দশকে বাংলাদেশের অঞ্চলভিত্তিক আর্থ-সামাজিক-সাংস্কৃতিক জীবনবলয়েও রূপান্তরের সূত্রপাত ঘটে।

গঠনোম্মুখ সমারের জন্মরায়ণ ও যন্ত্রায়ণের প্রভাব বৃহত্তর গ্রামীণ জীবনে যে বিক্রিয়ার সৃষ্টি করে, আঞ্চলিক জীবনেও তার প্রতিক্রিয়ায় জাগে আলোড়ন। এ-পর্যায়ে আঞ্চলিক জীবনোপাকরণ অবলম্বন করে যাঁরা উপন্যাস রচনা করেছেন, বাস্তবতার প্রতি দায়বদ্ধতার প্রশ্নে তারের কেউই সর্বাংশে সাফল্য লাভ করতে পারেনি। বরং জীবনানুভবের রোম্যান্টিকতা আঞ্চলিক জীবনের বস্তুসত্যকেও কখনো কখনো গ্রাম করতে উদ্যত হয়েছে। কিন্তু শিল্পীচৈতন্যের শোকড় বিশেষ ভূখন্ডের মৃত্তিকাগভীরে প্রোথিত থাকায়, রোম্যান্টিতাও অর্জন করেছে নতুন মাত্রা।

এ প্রসঙ্গে শহীদুল্লা কায়সারের (১৯২৬- ১৯৭১) সারেং বৌ (১৯৬২) উপন্যাসের নাম সর্বার্থে বিবেচ্য। এ উপন্যাসে বাংলাদেশের দক্ষিণ-পূর্ব সমুদ্র উপকূলবর্তী বিস্তীর্ণ অঞ্চলের মানুষের জীবন ও জীবীকার সংগ্রাম এবং বেঁচে থাকার নিরন্তর প্রচেষ্টার শব্দরূপ ‘সারেং বৌ’ উপন্যাস। বিধৃত সমাজ, অঞ্চল বিশেষের ভূ-খন্ডগত পরিচয়, প্রাকৃতিক পরিবেশ, ভাষা সংস্কার, প্রবাদ-প্রবচন ইত্যাদির ব্যবহার সারেং বৌ’ উপন্যাসকে আঞ্চলিক উপন্যাসের শিল্পমাত্রায় উন্নীত করেছে।

আঞ্চলিক উপন্যাসে প্রথম বৈশিষ্ট্য ‘কোনো নির্দিষ্ট ভৌগোলিক অঞ্চলের নিবিড় এবং অখন্ড পরিচয় দান” অর্থাৎ চরিত্রগুলো এমনভাবে বিধৃত যে সেই অঞ্চলের ক্ষেত্রভূমির শস্যরূপে আত্মপ্রকাশ করে এবং কোনোক্রমে সেই ক্ষেত্রভূমি থেকে তাকে বিছিন্ন করা যায় না। দ্বিতীয়ত ভাষা-সংলাপে, স্থানীয় প্রবাদ-প্রবচন এমনকি উচ্চারণভঙ্গিতে সাধ্যমত আঞ্চলিক বৈশিষ্ট্য ফুটিয়ে তোলা।”

অর্থাৎ ভাষা ও উচ্চারণভঙ্গিতে অঞ্চলবিশেষের জীবনবেদ এমভাবে সঞ্চারিত থাকে যে, সেই অঞ্চলের ভাষার মধ্য দিয়ে পরিবেশধৃত মানুষের অন্তর অবলোকন করা সম্ভব। স্থানীয় প্রবাদ-প্রবচনে সেই অঞ্চল বিশেষের সামাজিক রীতিনীতি, সংস্কার, ধর্মবোধ, আচার-অনুষ্ঠানের সমূহ পরিচয় স্পষ্ট হয়। উল্লিখিত বৈশিষ্টের আলোকে বিচার করলে ‘সারেং বৌ’ আঞ্চলিক উপন্যাসের অনন্য শিল্পপ্রতিমা।

 

সারেং বৌ উপন্যাস

 

২.

অঞ্চল বিশেষের সামাজিক জীবনাপ্যাটার্ন অনুসারে সারেং বৌ’ উপন্যাসের পটবিন্যাস্ত। গ্রামীণ পরিবেশধৃত চরিত্রসমূহ বাস্তব ও জীবন্ত। ভাষা-সংলাপ ও প্রবাদ প্রবচনে স্থানীয় জীবনধারার অকৃত্রিম ও বিশ্বাসযোগ্য পরিচয় পাওয়া যায়।

ঔপন্যাসিকের সর্বস্রদৃষ্টিকোণের পরিচর্যায় রচিত ‘সারেং বৌ’ উপন্যাস গঠননৈপুন্যে অনন্য। বাংলাদেশের সমুদ্রতীরবর্তী অঞ্চল বিশেষের প্রতি শহীদুল্লা কায়সার একজন তাত্ত্বিক ও সমাজবিজ্ঞানীর দৃষ্টি দিয়ে তাকিয়েছেন। নবিনতুনের উপর সমাজ আরোপিত দুঃখকে তিনি যেমন অকারণে বাড়িয়ে দেখেন নি, তেমনি সর্বোচ্চ প্রলোভনের কাছে তিনি বাস্তবকে বিসর্জন দেন নি।

‘সারেং বৌ’ উপন্যাসের কাহিনীগ্রন্থন নিটোল, পরিণামে জীবনমুখী। বিরুদ্ধ সমাজ ও বিধ্বংসী প্রকৃতির বিরুদ্ধে সংগ্রাম করে জয় যুক্ত হয়েছে কদম সরেং ও নিবতুন। কাহিনীর বাস্তবসম্মত উপস্থাপনা, অভনির উপকরণের দক্ষ ব্যবহারই ‘সারেং বৌ’ উপন্যাসকে বাংলাদেশের উপন্যাসের ধারায় ব্যতিক্রমী বিশিষ্টতা দান করেছে।

‘সারেং বৌ’ উপন্যাসটি তেরো অধ্যায় বিভক্ত। কাহিনীর শুরুতেই ঔপন্যাসিক একটি সুনির্দিষ্ট রূপরেখা নির্দেশ করেছেন :

চারিদিকে পানি। মাঝখানে ডাঙ্গা। তবু এক দ্বীপ বলেনা কেউ। বলে গ্রাম। কেননা এটা পানিরই দেশ। গ্রামটাকে বলে বামনহাড়ি। নদীটাকে বলে কয়াল। বামনহাড়ি যেমন গ্রাম হয়েও গ্রাম নয়, জলঘেরা ভূখন্ড, তেমন করালও মামুল নদী নয় । করাল সমুদ্র মোহনায় উম্মত্ত জলোচ্ছ্বাস।… শুধু বামনহাড়ি নগ্ন, সাগর আর মোহনার তীর ঘেঁষা আরও কত গ্রাম কদুরখিল, পিয়াল পাছা, মাদার টেক।

এসব গ্রামে যাদের বাস বিচিত্র মানুষ ওরা। বিচিত্র ওদরে জীবীকা। এদরে আছে জমি। সে জমিতে ধান হয়।…… তবু ওরা সমুদ্রের মানস। সমুদ্র ওদের জীবিকা, সমুদ্র ওদের জীবনের গান। সাগর ঊর্মি গুদের করেল পীত। সাগরের বুকে ডিঙ্গি ভাসিয়ে ওরা মাছ ধরে। সাগরের তরঙ্গের চড়ে ওরা চলে যায় দূরদেশে। ওরা নাবিক।

নদীবিধৌত ভৌগেলিক অঞ্চলের বামনছাড়ি গ্রামের মজল বারেংয়ের পুত্র কদম সারেংয়ের স্ত্রী নবিতুনকে কেন্দ্র করে কাহিনীর পল্লবিত বিস্তার। অস্তিত্বের সংগ্রামে, জীবিকার সন্ধানে কদম সারেং যায় সমুদ্রে জাহাজে ভেসে দূরদেশে। ঘরে তার উদ্ভিন্নযৌবনা স্ত্রী নবিতুন, একমাত্র মেয়ে আট বছরের আকিক্। নবিতুনের উঠোনে পাশেই একটা বড়ই গাছ। যে গাছে ফুল ধরে ফল হয়, বছরের পর বছর চলে যায়, কদম সারেং বাড়ি ফিরে না। লোকে বলে

“যে দেয় কয়াল পাখি

বৌ তার দুপুরের রাঁড়ি।

একমাত্র মেয়ে আকিকে নিয়ে নবিতুনের নিত্য বাঁচার লড়াই। প্রতিদিন তাকে অন্নসংস্থানের জন্য সংগ্রাম করতে হয়। ঝি-এর কাজ নেয় চৌধুরী বাড়িতে। গ্রামের বাড়ি বাড়ি ঘুরে ধান ভানার কাজ নেয়। কিন্তু যন্ত্রসভ্যতার উদ্যত থাবা নবিতুনের অস্তিত্ব সংগ্রামের সেই অবলম্বন টুকুও কেড়ে নেয়

“সেই যে কোরা নিয়ে গেল মুন্সী বাড়ি এখনো কেরেনা কেন আককি ? বুঝি আকক্বকিছু দেখাবার জন্যই উঠোন পেরিয়ে রাস্তাটার উপর একবার চোখ বুলিয়ে এল নবিতুন। তারপর কাঁড়া চালগুলো ঝড়ল, বাছল, নিজের মেহেদ্রুভের পাওনা একসের চাল পৃথক করে রাখল। বাকী চল কোরার তুলল।

খুদ আর তুষ আলাদা আলাদা হালসার পুরে নিল। যেন মস্তবড় অপরাধ করেছে তেমনি কুণ্ঠিত গায়ে কাছে এসে দাঁড়ায় আকৃতি। ওর হাতের শূন্য কোয়াটার দিকে তাকিয়ে যেন ছাৎ করে ওঠে নবিতুনের বুকটা। কিরে ধান আনলিনা । তথায় নবিতুন। না, তুইয়ার হাটে কল বসেছে। এখন থেকে সেই কলেই নাকি সবাই ধান ভানবে। মায়ের মুখের তাকিয়ে থেমে যায় আককি।

অস্তিত্বের সংগ্রামে নবিতুন আরো সংকটে পড়ে যায়। নবিতুনের এই দারিদ্র্য অবস্থায় সুযোগ নেয় সুন্দর শেখ। কদম সারেং নবিতুনের জন্য পাঠানো চিঠি, টাকা সব পোস্টমাস্টারের সহায়তায় গোপন করে রাখে সুন্দর শেখ। নজর নেয় নবিতুমের শরীরের প্রতি। কু-প্রস্তাব দিয়ে পাঠায় গুজাবুড়িকে, গুজাবুজি, লুন্দর শেখের প্রস্তাব নিয়ে এলে নিতুন “পিঁড়া ছুড়ে মারে। শুজাবুড়ি ব্যর্থ হলে লুন্দর শেখ নিজেই সরাসরি নবিতুনকে পাওয়ার চেষ্টা করে।

পশ্চিম হিস্যার শরবর্তির দাদু থাকে নবিতুনকে প্রথমে আক্কিকে পাঠালেও শেষে নিজেই যেতে হয়। লুন্দর শেখের দেয়া টাকাগুলোকে নৰিতুন আকির হাত থেকে নিয়ে ছুঁড়ে মারে। না, নবিতুন সুন্দর শেখের টাকার কাছে সতিত্ব বিসর্জন দিতে পারে না। লুন্দর শেখ ক্ষেপে গিয়ে বলে

তা এখন এর কদমেরই বা দরকার কি, টাকারই বা কি ঠেকা লাং-এর তো আর অভাব নেই, টাকারও কমতি নেই

চৌধুরী বাড়িতে কাজ করতে গিয়েও সে শঙ্কিত থাকে, ছোট চৌধুরীর কথা চাউনি নবিতুনের ভালো লাগে না। তর্ককাজটা ছেড়ে দিতে পারেনা । একাজটা ছেড়ে দিলে সে খাবে কি ? মেয়ে আকৃকিকে খাওয়াবে কি ? লুন্দর শেখের প্রস্তাবে রাজি হওয়ার চেয়ে মরে যাওয়াও তার কাছে শ্রেয়। নবিতুন চোখে অন্ধকার দেখে।

এদিকে সুন্দর শেখ দৃষ্টিও মানে আগুন দিয়ে নবিতুনকে গ্রাস করতে নতুনভাবে ফাঁদ পাতে। চৌধুরী বাড়ি থেকে কাজ শেষে সন্ধ্যায় বাড়ি ফেরার পথে পাট ক্ষেতের পাশে জানোয়ারের বেশি লুন্দর শেখ নবিতুনকে ঝাপটে ধরে, কিন্তু উদ্দেশ্য সফল করতে পারে না। নিজের বুদ্ধি ও শক্তি দিয়ে নবিতুন আত্মরক্ষা করে।

তিনবছর পর কদম সারেং বাড়ি ফিরে। আটমাস বাড়ি থেকে ঘরে নতুন চালা, বেড়া দেখার পর আবার সমুদ্রের উদ্দেশ্যে বেরিয়ে যেতে চাইলেও নবিতুন সন্তানসবো জেনে যায় না। কিন্তু গ্রামে নানা উপহাস, নবিতুনের চরিত্র নিয়ে নানা কথা, মামা লুন্দর শেখের ষড়যন্ত্রে কদমের মনে সন্দেহের সৃষ্টি হয়। সে কিছুতেই বুঝতে পারে না। জাহাজ থেকে মাসে মাসে টাকা পাঠানো পরও নবিতুন কেন চৌধুরী বাড়িতে ঝি এর কাজ করেছে, কেন ঘরের চালা ঠিক করেনি।

 

সারেং বৌ উপন্যাস

 

ক্রমশ তার মনে সন্দেহ প্রবল হয়। অসময়ে নবিতুন চৌধুরীদের বাড়িতে গেলে এনিয়ে তার সঙ্গে কদমের ঝগড়া হয় কদম নবিতুনকে ধাক্কা মেরে ফেলে দেয়। নবিতুন বদনার উপর পড়ে গিয়ে একটা মৃতসন্তান প্রসব করে। কলম বাড়িছেড়ে চলে যেতে চায় কিন্তু প্রকৃতি যেন এই দ্বন্দ্বে মীমাংসার এগিয়ে আসে। ঝড় এবং জন্মোচ্ছ্বাসে পুরো উপকূলের লোকালয় নিশ্চিহ্ন হয়ে যায়। বাড়িঘর গাছপালা, পশু-পাখি, সব ভেসে যায়, প্রবল ঝড় আর জন্মোচ্ছ্বাসে হাজার হাজার মানুষের মৃত্যু হয় :

তারপর এক সময় যেখানকার পানি সেখানেই ফিরে গেল। জেগে উঠল পৃথিবীর মাটি। পৃথিবীর মাটিতে ঘর নেই, আশ্রয় নেই। পৃথিবীর মাটিতে এখানে সেখানে মৃত মানুষ বিবস্ত্র বিকলাংগ । … ওরা দুজন। দূরে দূরে। একজন বুঝি আর একজনকে দেখছে না এখনো। ওরা একজন পুরুষ, একজন নারী।…. ওরা যেন পৃথিবীর সেই প্রথম মানবমানবী। বাবা আদম আর বিবি হওয়া।

ধর্মীয় মিথকল্পনাসূত্রের সঙ্গে শহীদুল্লা কায়সার ‘সারেং বৌ’ উপন্যাসের শিল্পসূত্রকে এভাবে সমান্তরাল করেছেন। প্রকৃতির দু’সন্তান,দুই নর-নারী, কলম এবং নিবতুন। নতুন পৃথিবীর নবজীবনের প্রেক্ষাপটে ঔপন্যাসিক তাদের স্থাপন করেছেন। প্রথাগত সামাজিক রীতিনীতি, বিশ্বাস-সংস্কারের বিপরীতে, তৃষ্ণার্ত, মৃতপ্রায় কদমের মুখে তুলে দেয় নবিতুন নিজের স্তন :

‘জেগে উঠেই নবিতুনকে আকস্মিক ধাক্কায় দূরে ঠেলে দিল কদম। কী এক বিভ্রান্ত উম্মাদ চোখে নবিতুনের মুখে মুহূর্তের জন্য কি যেন খুঁজল। দুর্বল কম্পিত পায়ে উঠে দাঁড়াল। চেঁচিয়ে উঠল পর করে দিলি? পর করে দিলি নবিতুন ? পর ? কেন ? বিমূঢ় জিজ্ঞাসা নবিতুনের। এ কী করেছিস ? একি করেছিস নবিতুন ? পর করে দিলি । এমন দুধমনি ? তুই কি জানিস না বৌ-র দুধ- কথাটা শেষ করতে পারলনা কদম।

উপন্যাসের সমাপ্তিতে ধ্বনিত হয় নবিতুন এবং কদমের জীবনাকঙ্ক্ষিার সংগ্রামী উচ্চারণে; তাদে অনন্ত আশাবাদ :
দেখল চরের নূরপান্তে সবুজ রেখা। আর দেখা কয়েক হাত দূরে বঙ্গোপসাগরের ঝিলিমিলি নীল। শান্ত সংযত আর সুন্দর। কদম বার, আর একটু জিরিয়ে নে রে নবিতুন। হাঁটতে হবে অনেক দূর। ১*

জীবনসংগ্রামের এই সুদৃঢ় উচ্চারণ, ‘সারেং বৌ’ উপন্যাসের শিল্পায়তনিক বিন্যাসকে উচ্চারিত করেছে। বিশেষ ভৌগোলিক আয়তনের বস্তুসমগ্রতা, সমুদ্র ও সমুদ্র উপকূলবর্তী জনপদের বাস্তবজীবন ও ভাবজীন, প্রকৃতিকর দাক্ষিণা ও ক্রোধে নির্মাণ ও ভাঙনশীল মানবপ্রবাহ প্রভৃতি বিষয়কে দক্ষতার সঙ্গে রূপদান করেছেন ঔপন্যাসিক।

কদম ও নবিতুনের সক্রিয়তা ও সংগ্রাম ঔপন্যাসিক লক্ষ্যবিন্দু হলেও পারিপার্শ্বিক জীবনবাস্তবতার অনিবার্যতাও স্বীকৃতি পেয়েছে। বিরূপ জীবনস্রোত ও বিধ্বংসী প্রকৃতির বিরুদ্ধে সংগ্রাম করে ট্রাজিক অভিজ্ঞতার মধ্যদিয়ে জয়যুক্ত হয়েছে কদম ও নবিতুন। বস্তুত জীবনার্থে রোমান্টিকতা থাকা সত্ত্বের ‘সারেং বৌ’ উপন্যাসের বিষয় পরিকল্পনা জীবনদৃষ্টি ও শিল্পশৈলী অনন্য।

‘সারেং বৌ’ উপন্যাসের চরিত্র-চিত্রণে ঔপন্যাসিক অঞ্চল বিশেষের পরিবেশধৃত বাস্তব অভিজ্ঞতার স্বাক্ষর রেখেছেন। ব্যক্তিগত জীবনে শহীদুল্লা কায়সার একজন খ্যাতনামা সাংবাদিক ছিলেন এবং তার জন্ম নোয়াখালী জেলায় (বর্তমান ফেনী জেলা)। উপন্যাসের পটভূমিও এই অঞ্চলের ফলত ‘সারেং বৌ’ উপন্যাসের কাহিনী যে তার বাস্তব অভিজ্ঞতার জগত থেকে নেয়া, তা বলার অপেক্ষা রাখেনা।

 

সারেং বৌ উপন্যাস

 

সারেং বৌ’ উপন্যাসের কাহিনী আবর্তীত হয়েছে নবিতুনের জীবনকে কেন্দ্র করে। নবিতুন বামহাড়ি গ্রামের প্রকৃতি লালিতা এক সাধারণ অথচ জীবনাকাঙ্ক্ষায় স্বপ্নময়ী, দৃঢ়চেতা, সংগ্রামী নারী। কদমের স্ত্রী আর আকৃকির জননী। স্বামী কদমে অনুপস্থিতিতে তার অস্তিত্বের সংগ্রাম, ক্ষুধা ও দারিদ্রের বিরুদ্ধে অবিচল যুদ্ধ, সর্বোপরি আপন সত্তি রক্ষায় তার শক্তি ও সাহস, তাকে অসাধারণ নারীর পরিচয়ে অভিসিক্ত করেছে। সতিত্ত্বের অবমাননা তার কাছে মৃত্যুর চেয়ে অধিক। লুন্দর শেখের টাকা তাই সে ঘৃণাভরে ছুঁড়ে মারে।

অসময়ে গুজাবুড়ি এলে আককিকে কিল মেরে ঘুম থেকে তোলে। পিঁড়ি ছুঁড়ে মারে বুড়ির উদ্দেশ্যে মনে মনে ভাবে আবার এলে “কচুপড়া বাটা’ দেখে তার মুখে। অথচ গুজাবুড়ি আর তার কাছে খাবার চায়, তখন সে নিজের জন্য রাখা পাস্তাটুকু তুলে দেয় বুড়ির মুখে। কারণ, ক্ষুধার জ্বালা সে বোঝে। বেঁচে থাকার প্রয়োজনে ধানভাব কাজ করেছে, শেষ পর্যন্ত চৌধুরী বাড়িতে গিয়ে ঝি-এর কাজ করে মেষের জীবন ও নিজের অস্তিত্ব রক্ষা করেছে।

শুধু তাই নয়, চৌধুরী বাড় থেকে কাজ করে ফেরার পথে সন্ধ্যার অন্ধকারে পাট ক্ষেত্রে সুন্দর শেখ তাকে ধর্ষণের চেষ্টা করলে সে নিজের শক্তি, সাহস ও বুদ্ধি দিয়ে সতিত্ব রক্ষা করতে সক্ষম হয়। দীর্ঘদিন স্বামী কদম খোঁজ খবর না নিলেও কদময়ের বিরুদ্ধে তার কোনো অভিযোগ নেই। পরে যখন চৌধুরী বাড়ির ছোট বৌয়ের কাছে জানতে পারে যে লুন্দর শেখের ষড়যন্ত্রের কারণে সে কদমের টাকা ও চিঠির সংবাদ থেকে বঞ্চিত হয় তখন তার সামান্য অভিমান ও দূর হয়ে যায়। ঝড়-জলোচ্ছ্বাসে মৃত্যুর মুখোমুখি দাঁড়িয়ে নবিতুনের কাছে ক্ষমা চায়।

জলোচ্ছ্বাসের পর মৃতপ্রায় স্বামীকে নিজের স্তনের দুধ দিয়ে বাঁচায়। ভাবতে অবাক লাগে যে, বামনছাড়ি গ্রামের এক অশিক্ষিত নারী নবিতুন দৃঢ়তা মনোবল, সংকটের মোকাবেলায় শ্রম ও সাহসের সমন্বয় কি করে ঘটলো ? অথচ আশ্চর্যের বিষয়, কোথাও তার চরিত্র বেমানান হয়ে ওঠেনি। লুন্দর শেখের মত গ্রামীণ সম্পদশালী লম্পট ষড়যন্ত্র করে তার উপর ক্ষুধা ও দারিদ্র্য চাপিয়ে দেয়। বর্হিশক্তি আরোপিত সংকট সে দৃঢ়তার সঙ্গের মোকাবেলা করে নিজের সতীত্ব ও অস্তিত্ব রক্ষা করে। বাংলাদেশের উপন্যাসে নবিতুনের মত এমন অসাধারণ নারী চরিত্র খুব একটা দেখা যায় না। ‘সারেং বৌ’ উপন্যাসের নামকরণের যথার্থতা নবিতুন চরিত্রের মধ্যে সার্থকতা লাভ করেছে।

উপন্যাসে দ্বিতীয় প্রধান চরিত্র কদম সারেং ভালোবেসে নবিতুনকে বিয়ে করে। কন্যা আকরিকে আট বছরের রেখে সে জাহাজে যায়। জীবীকার সন্ধানে অসীম সাহসী কদম সাগর পাড়ি দিতে ভয় করে না। স্ত্রী নবিতুন ও মেয়ের জন্য টাকা, চিঠি পাঠালেও তা সুন্দর শেখে ষড়যন্ত্রের কারণে তাদের হাতে পৌঁছায় না। তিন বছর পর বাড়ি ফেরার সময় খিদিরপুর বন্দরে সহকারী এক সারেংয়ের দেয়া অফিসের চালান পার করতে গিয়ে সে পুলিশের হাতে ধরা পড়ে।

কদম জানতো না সহকারী সারেংয়ের দেয়া বাক্সে অফিম। বিচারে কদমের জেল হয়। জেলে বসে কদম চিঠি লিখে নি. কারণ জেলের সিল অটা চিঠি দিলে নবিস্তৃন সমাজের চোখে ছোট হয়ে যাবে। জেল থেকে মুক্তি পেয়ে প্রেমিক কদম, পিতা কদম খালি হাতে বাড়ি না ফিরি আবার ‘রুতৃন্দা’ জাহাজে চলে যায়। টাকা রোজগার করে বাড়ি ফিরে। কিন্তু বাড়ি ফিরে সে গ্রামের নানাজনের কাছে স্ত্রী নবিতুনের চরিত্র সম্পর্কে নানা কথা শুনে দ্বিধাগ্রস্ত হয়। দূর সম্পর্কের মামা লুন্দর শেখও নবিতুনের প্রতি নজর রাখতে বলে।

নবিতুনের সভা গর্তকৃত সন্তান সম্পর্কে নানা বিশ্লি ইঙ্গিত করে। কদম ক্ষিপ্ত হয়ে নবিতুনকে প্রহার করে। ফলে নবিতুন মৃত সন্তান প্রসব করে। এ জায়গায় কদম চরিত্রের ত্রুটি লক্ষ করা যায়। সে কোনো কিছু যাচাই না করে লোকের কথা বিশ্বাস করেছে। বস্তুত, কদম চরিত্রটিতে নায়োকচিত মহিমা থাকলে ঔপন্যাসিক এই চরিত্রটির তেমন পরিচর্যা করেন নি। কদম চরিত্র ঔপন্যাসিকের হাতে উপেক্ষিত হয়েছে। শেষ পর্যন্ত কদমের ভুলভাঙ্গে এবং নবিতুনকে নিয়ে জীবন সংগ্রামে অবতীর্ণ হয়।

উপন্যাসে লুন্দর শেখ চরিত্রটি গ্রামীণ পরিবেশে প্রতিপত্তিশীল লম্পট জোতদারের যথার্থ প্রতিচ্ছবি। অবশ্য এই চরিত্রটিকে রূপ দিতে গিয়ে লেখক লুন্দর শেখের মধ্যে বহুমাত্রিকতার অভাব রেখেছেন। মানুষ তো কেবল মাত্র তার যৌন-উগ্রতা এবং পাশবিকতা দিয়ে সম্পুর্ন নয়।

যদির নবিতুনের চরিত্র বিকাশের জন্য কাহিনী অনুসারে সুন্দর শেখের চরিত্র বাস্তব ও বিশ্বাসযোগ্য কিন্তু তার মধ্যে মানবিকতা, অনুশোচনা, দ্বিধা ও সংশয় সৃষ্টি করে অসাধারণ চরিত্রের মাত্রা দেয়া যেতো। লুন্দর শেখ জানোয়ারই থেকে গেছে শেষ পর্যন্ত। সমাজে এধরণের খারাপ চরিত্র যথেষ্ট আছে, যারা পাশবিকতা চরিতার্থ করতে ব্যর্থ হয়ে নানা ষড়যন্ত্রের আশ্রয় নেয়। উপন্যাসে লুন্দর শেখ সে ধরণের চরিত্রেরই প্রতিনিধি। উপন্যাসে তৃতীয় চরিত্র গুজাবুড়ি, শ্রীকৃষ্ণকৃতীর্ণ” কাব্যের বড়াইয়ের মতই।

গুজাবুজি যৌবনে লুন্দর শেখের রক্ষিতা ছিলো। প্রৌঢ় বয়সে তার এই দৌত্যগিরি পেশা নিজের ক্ষুন্নিবৃত্তি নিবারণের জন্যই নয় কেবল, অনাস্বাদিত যৌবনের বিকৃতিও বটে। উল্লিখিত চরিত্রগুলোর সাহয্যে ঔপন্যাসিক একটি বিশেষ অঞ্চলের পরিবেশধৃত মানুষের জীবনপ্রকৃতিকে উম্মোচিত করেছেন। ফলে ‘সারেং বৌ’ কেবল নবিতুনের আর্থ-সামাজিক জীবন বাস্ততারও কাহিনী হয়ে উঠেছে।

 

সারেং বৌ উপন্যাস

 

৩.

ভাষা-সংলাপ, প্রবাদ-প্রবচনই আঞ্চলিক উপন্যাসের প্রাণসত্তা। অঞ্চল বিশেষের পরিবেশধৃত চরিত্রের আচার-উচ্চারণে স্থানীয়ভঙ্গির তাদের আর্থ-সামাজিক পরিচয়কে বাস্তব ভিত্তি দান করে। ‘সারেং বৌ’ উপন্যাসের ভাষা নির্মাণের শহীদুল্লা কায়সার এব্যাপারে সচেতন ছিলেন। রোমান্টিক জীবনানুভবের কারণে মৌলধর্মে আঞ্চলিক উপন্যাস হলেও ‘সারেং বৌ’ গীতিকবিতার সমীপবর্তী উপন্যাসের চরিত্র তাই আপন ভাব প্রাকশে সঙ্গীতময় পদের আশ্রয় নেয় :

“হিরামতি হিরামতি

আমি যামু সুধারাম কব্যামতি।

হিরামত্তি হিরামতি

তোমার লাইগা অন

পুঁতির মালা পইরবে কি

পুঁতির মালা কালা সুতায় লাল,

পুঁতির মালা ধলা সুতায় নীল।

পুঁতির মালা সোনার চিক

পুঁতির মালা গুলবদনি ঝিলিক।

হিরামতি হিরামতি

বড় পাতে নাও ভাসিয়ে

গহিন জলে ডুবান দিয়ে

আমি যামু সুধারমা কন্যামতি (সা. বৌ, পৃ. 20-21)

কদম সারেংয়ের মুখে উচ্চারিত এই লোকগীতির মধ্যে অঞ্চলিক জীবনের সঞ্চার লক্ষ্যণীয়। ‘সুধারাম’ নোয়াখালীর প্রাচীন নাম।’ সামাজিক ইতিহাস থেকে জানা যায়, সুধারাম একসময় গল্প ছিলো, সেই গঞ্জকে নিয়ে সেখানকার জীবনের প্রাণচঞ্চল্য ছিলো। এই লোকগীতিকায় কদম সারেং এর গঞ্জে যাওয়ার কথা আছে এবং সেখান থকে পুঁতিরমালা আনার কথা বলা হয়েছে। সেই অঞ্চলের উচ্চারণভঙ্গিরও গীতিকার শব্দে পাওয়া যায়-

 

সারেং বৌ উপন্যাস

 

‘লাইগা’ ‘কালো’ পইরবে’ ‘যামু’ ‘নাও’ ‘গহিন’ ‘ডুবান’ ইত্যাদি শব্দ। ‘লাইগা’ ‘পইরবে’ শব্দে অপিনিতি ঘটেছে। ‘কালা’ কালো অর্থে এবং ‘ধলা’ সাদা, ‘যামু’ নোয়াখালী অঞ্চলে যাবো অর্থে ব্যবহৃত হয়। চলতি ‘ব’ এর স্থানে ‘ম’, ‘CT’ স্থানে (-) হয়েছে। ‘নাও’ ‘নৌকা’ শব্দের আঞ্চলিক রূপ, অপিনিহিত অনুসারে ন-এর ‘T’ উচ্চারণকে ‘ও’-তে পরিণত করে ‘কা’ বর্ণটিকে লুপ্ত করে “নাও” হয়েছে। আঞ্চলিক উপন্যাসের অন্যতাম বৈশিষ্ট্য স্থানীয় প্রবাচ্-প্রবচনের ব্যবহার। ‘সারেং বৌ’ উপন্যাসে প্রবাদ-প্রবচনের যথেষ্ট প্রয়োগ লক্ষ্য করা যায়। যেমন

ক. ‘যে দেয় কয়াল পাড়

বৌ-তার দুপুরের রাঁড়ি।’ (সা.বৌ/ পৃ.৩১)

খ. কলাই খেতে নাইকো ফুল

গৌরীর মাথায় দীগেন

দীগল চুলে মারল বাড়ি

ফুল ফুইটাছে সারি সারি (সা. বৌ/ পৃ.৭%)

গ. আম ভাল জাম ভাল

তেঁতুল বড় টক

বাপের বাড় হাত গেল পিঠ গেল

মামা বাড়ির পিঠায় বড় ঢক (সা. বৌ /পৃ. ১২০)

ঘ. আইঠা কলার ছাউনি

ভেরণের স্বাম

পবন ঠাকুর বইসো বইলো।’ (সা. বৌ./পৃ.১৩৫)

‘ক’ উদাহরণ ‘কয়াল’ নদী সম্পর্কে স্থানীয় লোকগোষ্ঠীর সংস্কার ধ্বনিত হয়েছে। ‘খ’ উদাহরণে কলাইয়ের ফুলের সঙ্গে স্থানীয় ‘গৌরী নামের মেয়ে চুলের তুলনা করা হয়েছে এবং সেই চুলে আঘাত করলে সারি সারি ফুল ফোটার কথা বলা হয়েছে। উদাহরণ ‘গ’ এ মামার বাড়ির পিঠার সৌন্দর্যের (ঢক’ শব্দটি নোয়াখালী অঞ্চলে এই অর্থে ব্যবহৃত হয়) কথা বলা হয়েছে। ‘ঘ’ এ সেই অঞ্চলের লোকবিশ্বাস, সংস্কারের পরিচয় বিধৃত হয়েছে। এসব প্রবাদ- প্রবচনের মধ্যে স্থানীয় জীবনের বাস্তব রূপ এমনভাবে প্রতিফলিত যে সেখানকার জীবন বিশেষ আঞ্চলিক রঙেই রঞ্জিত।

Leave a Comment