১৯৭২-২০০০ পর্বের ছোটগল্পসমূহে গ্রাম-বাংলার আর্থ-সামাজিক ও সাংস্কৃতিক চিত্র পর্ব ১

আজকে আমাদের আলোচনার ১৯৭২-২০০০ পর্বের ছোটগল্পসমূহে গ্রাম-বাংলার আর্থ-সামাজিক ও সাংস্কৃতিক চিত্র পর্ব ১। যা বাংলাদেশের ছোটগল্পে গ্রামজীবনের এর অন্তর্গত।

 

১৯৭২-২০০০ পর্বের ছোটগল্পসমূহে গ্রাম-বাংলার আর্থ-সামাজিক ও সাংস্কৃতিক চিত্র পর্ব ১

 

১৯৭২-২০০০ পর্বের ছোটগল্পসমূহে গ্রাম-বাংলার আর্থ-সামাজিক ও সাংস্কৃতিক চিত্র পর্ব ১

ষাটের দশকে বাংলাদেশের সাহিত্যের অন্তর্ভাগতে একটি ব্যাপক পরিবর্তন আসে। এ সময়ে লেখকেরা অত্যন্ত সংবেদনশীল এবং তাদের সামাজিক দায়বদ্ধতা সম্পর্কে অধিক সচেতন হয়ে ওঠে। পরবর্তীকালে এ মানসিকতাটি আরও পরিপুষ্ট হয়ে ওঠে এবং সত্তর, আশি ও নব্বই দশকের গল্পগুলিতে সামাজিক সমস্যাই প্রধান স্থানটি দখল করে।

পরিবর্তিত সামাজিক অবস্থা, অস্থিতিশীল রাজনৈতিক পরিস্থিতি, শিল্পায়নের ফলে মুষ্টিমেয় লোকের হাতে অর্থসঞ্চয় এবং সামগ্রিকভাবে অর্থনীতির নিম্নগতি ইত্যাদি বিষয় মানুষের ব্যক্তিগত ও মানসিক জীবনে অস্থিরতা ও চাপ সৃষ্টি করে। তাই মনস্তাত্ত্বিক জটিলতা এ সময়ের সাহিত্যে অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ প্রতিপাদ্য হিসেবে স্থান পায়।

আগেই উল্লিখিত হয়েছে, ক্রমান্বয়ে নগরমুখী মানুষের নগরজীবনকেন্দ্রিক সামাজিক ও মানসিক জটিলতাই এ সময়ে সাহিত্যে সিংহভাগ স্থান দখল করেছে। তবে গ্রামজীবন সংক্রান্ত গল্পের উপস্থিতি কম নয়। গ্রামভিত্তিক এ সকল গল্পগুলোতে নিছক গল্পের পরিবের্ত সামাজিক, অর্থনৈতিক ও পেশাগত জীবনের সমস্যাই গল্পকারের হাতে শিল্পিত রূপ পেয়েছে।

স্বাধীনতাউত্তরকালে আবু জাফর শামসুদ্দীনের দু’টি গল্পগ্রন্থ প্রকাশিত হয়েছে- ‘রাজেন ঠাকুরের তীর্থযাত্রা’ (১৯৭৮), ও ‘ল্যাংড়ী’ (১৯৮৮)। এসব গ্রন্থের গল্পে শহরজীবনের পাশাপাশি নানান পটভূমিতে গ্রাম-বাংলা অঙ্কিত হয়েছে।
“রাজেনঠাকুরের তীর্থযাত্রা’ গ্রন্থভুক্ত ‘মাটি’ গল্পটি মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক।

স্বাধীনতাযুদ্ধের সময় পাকিস্তানী হানাদারদের আক্রমণে ছিন্নভিন্ন হয়ে যাওয়া গ্রামের বর্ণনা পাওয়া যায় গল্পটিতে। হানাদারদের নারকীয় হত্যা তাণ্ডবে গ্রামের মানুষ পলায়নরত। দিগ্বিদিক জনশূন্য হয়ে তারা ছুটে পালাতে থাকে। কোথায় গন্তব্য তা তারা জানে না। শুধু প্রাণভয়ে দৌড়াতে থাকে। পিছন থেকে পাকসৈন্যদের ছোঁড়াগুলি লাগে হয়তো কারও গায়ে। সে পড়ে যায়। কিন্তু প্রাণভয়ে কেউ ফিরে তাকাতে পারে না তার দিকে। তারা আশ্রয়ের সন্ধানে ছুটছে।

বাড়ি- ঘর, গ্রাম, ফসলের ক্ষেত সব পুড়ে যাচ্ছে হানাদারদের গোলার আঘাতে। রামকুমার তার স্ত্রী ও পুত্র রমেশকে নিয়ে ছুটছে নিরাপদ আশ্রয়ের সন্ধানে। তার ঘরবাড়ি, পাকা ধানের ফসল সবই পুড়ে যাচ্ছে। যে ধান তাকে স্বচ্ছলতায় বছর কাটানোর ইঙ্গিত দিয়েছিল, সে সোনার ধান পুড়ে ছাই হয়ে যাচ্ছে। শিশু রমেশের প্রশ্ন- মাটিও কি পুড়ে যাবে? রামকুমার সন্তানকে আশ্বস্ত করে, মাটি কখনও পোড়ে না আর পোড়ামাটিতে ফসল আরও ভাল হয় ।

‘প্রতিশোধ’ গল্পটি আবু জাফর শামসুদ্দীন রচিত মুক্তিযুদ্ধের সময় গ্রামবাংলার আরেকটি চিত্র। একজন পাকিস্ত ানী সেনা গ্রামবাসীর উপর পৈশাচিত নির্যাতন চালিয়েছে। মুক্তিযোদ্ধাদের হাতে সে নিহত হলে তার মৃতদেহের উপর গ্রামবাসীরা প্রতিশোধ নেয়। এদের মধ্যে প্রতিমা নামের এক নারী এই পাকসেনার রক্তপান করতে চায় ।

কেন না, হানাদার বাহিনীর এই সৈনিকটি প্রতিমার কন্যার উপর নির্যাতন চালিয়েছে, মেয়েটি এখন মৃতপ্রায়। অন্যসকলে মৃতদেহটির উপর ইট ছুঁড়ে, লাথি দিয়ে, আঘাত করে বা গালি দিয়ে তাদের আক্রোশ প্রকাশ করছে। সন্তানশোকে উন্মাদিনী প্রতিমা তখন সেই নিষ্ঠুর সেনার রক্তপান করে প্রতিশোধ নিতে চায়।

“মা” গল্পটি গ্রামের এক সহায়হীন নিঃসঙ্গ বৃদ্ধার গল্প। নিঃসঙ্গ বৃদ্ধা জোবেদা খাতুন চায় তার একমাত্র কন্যা ও জামাতাকে সন্তানসহ নিজের কাছে নিয়ে এসে বসবাস করতে। জোবেদা খাতুনের ফলের বাগান আছে, অল্প কিছু ধানী জমি আছে। মেয়ে-জামাই নাতি-নাতনিদের জন্য এগুলো সে পরম মমতায় আগলে রাখে। অনেক দিন মেয়ের সাথে তার দেখা হয় না। তাই একদিন আশি বছরের বৃদ্ধা নিজেই মেয়ের শ্বশুরবাড়ির উদ্দেশ্যে রওনা দেয়। মেয়ের জন্য নিজের হাতে তিলের নাড়ু তৈরি করে সাথে নেয়। কিন্তু পথে ট্রেনে কাটা পড়ে বৃদ্ধার মৃত্যু হয়। মেয়ের সাথে তার আর দেখা হয় না।

‘ফসল’ দিনমজুর মালেকের জীবনের বঞ্চনা, হতাশা ও স্বপ্নভঙ্গের গল্প। মালেক তার সামান্য জমিটি প্রস্তুত করে রেখেছে বৈশাখের বৃষ্টিতে জমি নরম হবে, সে বীজ ছড়াবে। সে আরও জমি কিনবে। কিন্তু বৈশাখ মাস পার হল, আষাঢ়-শ্রাবণও পার হল, বৃষ্টি হল না। প্রচণ্ড খরায় জমিতে ফসল ফলানোর স্বপ্ন পুড়ে ছাই হয়ে যায়। সে জীবিকার তাগিদে কৃষিকাজ ছেড়ে শহরে পাড়ি জমাবার কথা ভাবে আসমান জমিন কেওর পরান কান্দে না রে গরীবের লাইগা।

জানস মিল আবার গাঙের চর কাইটা তুলছে- অনেক মাড়ি কাটব এইবার। কয় লাখ ফুট জানি। হেগর হিসাব-পত্র বুঝি না, নয় টেহা হাজার, পাঁচ ছয়জনে এক হাজার কাটবার পারমু। তোর আমার পেট চইল্যা যাইব। না চললে গাও ছাইড়া শহরে যাম; কি কস?” বিংশ শতাব্দীর শেষেও বাংলাদেশের গ্রামগুলি এখনও কৃষির বৈজ্ঞানিক ও প্রযুক্তিগত সুবিধা পায়নি। গল্পটিতে প্রকৃতি নির্ভর কৃষিব্যবস্থা গ্রামবাংলার দরিদ্র চাষীদের জীবনে যে দুর্দশা বয়ে আনে তারই একটি চিত্র।

‘বাঁধ’ গল্পটিও গ্রামীন কৃষিজীবদের সংগ্রামের একটি চিত্র। “অনন্তেরা আদিম কৌম সাঁওতাল, আড়ঙ্গে বসবাসের ফলে গৃহস্থ হয়ে গেছে।” স্ত্রী তারা ও চয় বছরের পুত্র সন্তান নিয়ে অনন্তের সংসার। অনস্তের ক্ষেতে পাকা ফসল। কিন্তু হঠাৎ ফসলী জমির পাশের বাঁধটি ভেঙে যায়। পানি হুড়মুড়িয়ে ঢুকতে থাকে। কয়েকদিনের প্রায় অবিরত মুখলধারার স্ফীতি পদ্মার দুর্বল বাঁধ রোধ করতে পারে না।

 

১৯৭২-২০০০ পর্বের ছোটগল্পসমূহে গ্রাম-বাংলার আর্থ-সামাজিক ও সাংস্কৃতিক চিত্র পর্ব ১

 

প্রথমে চিড় এবং পরে পয়ঃপ্রণালী তৈরি করে বন্যার পানি হু হু করে আধাপাকা আউশ ক্ষেতে প্রবেশ করতে থাকে।” অনন্ত ও তারা জীবনপণ করে ঝাঁপিয়ে পড়ে বাঁধটি রক্ষা করার জন্য, না হলে তলিয়ে যাবে তাদের জমির ফসল। অনন্ত মাটি কুপিয়ে নালা তৈরি করে পানির বেগের দিক পরিবর্তনের চেষ্টা করে। কিন্তু প্রবল পানির বেগের সাথে পেরে ওঠে না। জীবনধারণের এই অবলম্বনকে বাঁচাতে হঠাৎ তারা স্রোতের মুখে শুয়ে পড়ে পানির বেগ ঠেকাতে। কিন্তু এভাবে পানির তোড় ঠেকিয়ে রাখা অসম্ভব।

তারার এই উন্মত্ত আচরণে হতবিহ্বল অনন্ত সাহায্যের জন্য চিৎকার করে। তার স্ত্রীকে বাঁচানোর জন্য অনুরোধ করে। শেষ পর্যন্ত সমবায় সমিতির মানুষদের সাহায্যে তারাকে উদ্ধার করা হয় এবং বাঁধটিও রক্ষা পায়। তারা সমবায় সমিতির সদস্য হবার সিদ্ধান্ত নেয় একটি নিশ্চিত ভবিষ্যৎ পাবার আশায়। সমবায় সমিতির সদস্য হলে ফসল ফলানোর অনিশ্চয়তা কমে যাবে। একটি আশ্বাস তাদের হৃদয়কে স্নিগ্ধ করে তোলে।

দারিদ্র্যের ছোবলের এক নিদারুণ চিত্র ‘জ্যোৎস্না” গল্পটি। পিতৃহীন পল্লীবালিকার জীবনযাপনে দীনতার পরাকাষ্ঠা গল্পটিতে দেখা যায়। জ্যোৎস্না নামে এই গ্রামীণ বালিকা বয়ঃসন্ধিকালের লজ্জা নিবারণ করে এক টুকরো বগ গামছা দিয়ে। বাজারের সওদাপাতি বলতে কোরোসিন তেল, সরিষার তেল, শুকনো মরিচ ও লবণ যৎসামান্য পরিমাণে সে কিনতে পারে। বাবা মৃত্যুর আগে ভিটে মাটি রেখে যায়নি।

দরিদ্র ভগ্নিপতির ভিটের এককোণে থাকার ব্যবস্থা- “মায় মাইনষের বাড়ী থেনে পুলা এক পুলা কইরা ছন মাইগ্যা আইন্যা একটা এক চালা বাইন্ধ্যা লইছে, হেইডার মধ্যে থাহি।” মেয়েটি বেশ প্রত্যয়ের সাথে উত্তর দেয়। “বেড়া দিছস্ কি দিয়া?” সরটুকু জানার ইচ্ছায় আবার প্রশ্ন করি। “মাইনষের বাড়ী খেনে হোলা মাইগ্যা আইন্যা।” আবার সেই সংক্ষিপ্ত এবং রূঢ় বাস্তর উত্তর।” বস্তুতঃ চির দারিদ্র্যের মধ্যে যার জন্ম ও বেড়ে ওঠা, তার মানসিক বিকাশও অনেক ক্ষেত্রে বিঘ্নিত হয়।

তাই দ্বাদশবর্ষীয় বালিকাটি জানে না ভিক্ষার অসম্মানজনক দিকটি। জীবনকে তারা এভাবেই মেনে নেয় । অন্তহীন ক্ষুধা ও অভাবের মধ্যে বেঁচে থেকে নিজস্ব ইচ্ছা, আত্মসম্মান বা উত্তরণ আকাঙ্ক্ষা অঙ্কুরিত হবার জন্য মানসিক পরিপুষ্টি এ সকল মানুষ পায় না কখনই। ” কোনরূপ ভাবপ্রণতা, বিগত দিন ও মানুষের জন্য মায়া-মমতা, নতুন ঘটনার প্রতি বিতৃষ্ণা, এসবের লেশমাত্রও নেই বালিকার কন্ঠস্বরে। মনে হলো, তার কাছে জীবনটা দেনা-পাওনার ব্যবসা- জন্ম-মৃত্যু, গ্রহণ বর্জন এগুলো সবই সেই দেনা-পাওনার যোগ-বিয়োগ মাত্র। ”

‘ল্যাংড়ী’ গ্রন্থভুক্ত ‘কলিমদ্দি দফাদার গল্পটি মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক। মুক্তিযুদ্ধে গ্রাম এলাকার আনসার, চৌকিদার প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ কৌশলে অত্যন্ত গোপনে পাকিস্তানী হানাদার বাহিনীর বিরুদ্ধে মুক্তিযোদ্ধাদের নানাভাবে সাহায্য করেছিল, তেমনই একটি কাহিনী কলিমন্দি দফাদার’। গল্পটিতে গ্রামের গরীব বিধবা হরিমতি ও তার যুবতী কন্যা সুমতি হানাদার বাহিনীর চরম বর্বরতার শিকার হয়।

গ্রামের কেউ তাদেরকে রক্ষা করতে পারে না, কেননা তারা নিজেরাই প্রাণভয়ে পলাতক। তাদের প্রতি এ বর্বরতার শোধ নেয় মুক্তিবাহিনী আর এ ব্যাপারে তাদেরকে সাহায্য করে আনসার কলিমদ্দি দফাদার। কলিমদ্দি দফাদার চরিত্রটিকে লেখক দরদ দিয়ে অঙ্কন করেছেন কলিমদ্দি এলাকার দফাদার। বিশ বাইশ বছর বয়সে ইউনিয়ন রোডের দফালারিতে – ঢুকেচিল । তখন হতে সে কলিমদ্দি দফাদার নামে পরিচিত। এখন বয়স প্রায় ষাট, চুল দাড়িতে পাক ধরেছে।

চৌকিদারের সর্দার দফাদার। গ্রামাঞ্চলের একটি মর্যাদাবান পদ। মর্যাদা যে পায়ও। কিন্তু পদমর্যাদার ভার তার বাড় বাড়ায়নি।” কলিমদ্দি পাকিস্তানী হানাদরদের আস্থাভাজন। কারণ সে বয়স্ক ব্যক্তি, নামাজ পড়ে এবং সরকারি চাকরী করে। গ্রামের মানুষেরা তাকে পাকিস্তানী সৈন্যদের দোসর বলেই জানে। কিন্তু আসলে সে খুব গোপনে মুক্তিবাহিনীদেরকে তথ্য সরবরাহের দায়িত্ব পালন করে দেশমাতার প্রতি তার অপরিসীম ভালবাসা ও দায়িত্ববোধের প্রকাশ ঘটায়। মহান মুক্তিযুদ্ধে এদেশের সর্বস্তরের মানুষের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণ এবং যার যার সামর্থ্য অনুযায়ী সহায়তা ও দায়িত্বপালনের একটি চিত্র ‘কলিমদ্দি দফাদার’ গল্পটি।

‘ল্যাংড়ী’ গ্রন্থের নাম-গল্পটি গ্রামবাংলার এক সাধারণ নারী সালেহার বিপর্যস্ত জীবনকাহিনী। প্রতিকূল সমাজ ব্যবস্থা আর মানুষের নিষ্ঠুরতার শিকার হয়ে আমৃত্যু দুঃখ-শোকে জর্জরিত এক গ্রাম্যবধূর করুণ কাহিনী ।

বিবাহিত জীবনে সালেহা সুখ স্বচ্ছলতা এবং স্বামীর ভালবাসা থেকে বঞ্চিত। তার স্বামী চরিত্রহীন এবং অত্যাচারী, সন্তান দানেও অক্ষম। সংসার জীবনে অসহনীয় কষ্ট সহ্য করতে না পেরে সালেহা ফিরে যেতে চায় ভাইয়ের সংসারে। এদিকে নিজ গ্রামে ফেরার সময় পথে গ্রাম সম্বন্ধীয় দেবর কাদিরসহ চার-পাঁচজন একত্রে সালেহার সম্ভ্রমহানি ঘটায়। তাদের অত্যাচারে সালেহার একটি পা খোঁড়া হয়ে যায়, তাকে লাঠিতে ভর দিয়ে হাঁটতে হয়।

তাই সবাই তাকে ‘ল্যাংড়ী’ বলে ডাকতে শুরু করে। ভাইয়ের বাড়িতে ফিরে এসেও সালেহা সুখ খুঁজে পায় না। গ্রামের অনেক যুবক সুন্দরী সালেহার সান্নিধ্য কামনা করত, কিন্তু বিয়ে করে সংসার পাততে নারাজ। ভাইয়ের সংসারে চরম অনটন- সালেহা, তার ভাই, ভাইয়ের বউ, ভাইয়ের ছেলে-মেয়েরা খেয়ে না খেয়ে দিন কাটায়। কিন্তু স্বজন-পরিবেষ্টিত দিনযাপনও তারপক্ষে বেশিদিন সম্ভব হল না।

নিয়তির নির্মম পরিহাসে একে একে ভাই, ভাইয়ের বউ, তাদের ছেলেমেয়েরা মারা গেল। শুধুমাত্র ভাইয়ের এক ছেলে কালু বেঁচে রইলো। তাকে আঁকড়ে ধরেই সালেহা জীবন কাটাতে চাইল। সে ভিক্ষা করে জীবিকা উপার্জন করে। এভাবেই কষ্ট করে সে কালুকে ম্যাট্রিক পাশ করায়। অনেক আশায় বুক বেঁধে শহরের কলেজের কলেজেও ভর্তি করায়। কিন্তু দেশে মুক্তিযুদ্ধ শুরু হল, অন্ধের যষ্ঠি কাল যুদ্ধে গিয়ে আর ফিরল না। সালেহা বেঁচে রইল একা।

মৃত্যুর পরও সালেহা নির্বিঘ্নে কবরের মাটি পাওয়ার নিশ্চয়তাটা পেল না; কেননা তার বসতভিটা তখন অন্যের দখলে। ‘ল্যাংড়ীর মরন-বাচন বিষয়ে গ্রামবাসীগণ কখনও চিন্তা করেনি। সে আছে এটাই দেখছে সকলে। ল্যাংড়ী তার বাঁশের লাঠি ভর দিয়ে দিনে দিনে একবার গাঁয়ের এ প্রান্ত ও প্রান্ত করে সেরেফ এই তার পরিচয়। তার তুলনা নেই। গাঢ় নীল রংয়ের বাবুরহাটী শাড়ির আঁচলটাই তার ভিক্ষাপাত্র। গায়ের মাঝামাঝি স্থানে উলুছনের ছাউনি দেয়ার তার ছোট ঘর ।……

একদিন সে বিনা নোটিশে মরে গেল ……… মরার সময় সে কোন সমস্যা সৃষ্টি করেনি। সাহায্য-সহায়তা চায়নি কারো- এক কাতরা পানিও চায়নি কারো কাছে……… ভূমিষ্ঠ হওয়ার পর সে আর দশজনের মতো ওয়া ওয়া করে উপস্থিত অন্যদের মনোযোগ আকর্ষন করেছিল হয়ত, কিন্তু মরার সময় টু শব্দটি করেনি, খালি ঘরে এক নিঃশব্দে মরেছে। কিন্তু মরার পরে সে রীতিমত ঝামেলার সৃষ্টি করে।”

 

১৯৭২-২০০০ পর্বের ছোটগল্পসমূহে গ্রাম-বাংলার আর্থ-সামাজিক ও সাংস্কৃতিক চিত্র পর্ব ১

 

সালেহার মৃত্যু ও কবর দেয়াকে কেন্দ্র করে যে গ্রাম্য কোন্দল পাকিয়ে ওঠে তা শেষে মামলা পর্যন্ত গড়ায়। এ বিষয়টিকে কেন্দ্র করে আবু জাফর শামসুদ্দীন গ্রাম্য কোন্দল ও ঠরষষধমব চূড়ষরঃরপং-এর একটি বাস্তব বর্ণনা দিয়েছেন।

অন্যদিকে, একজন শহীদ মুক্তিযোদ্ধার মরণোত্তর সংগ্রাম এবং তার আত্মীয়ের পরিণতিকেও লেখক কটাক্ষ করেছেন- “ল্যাংড়ীর ভিটে বাড়ীর উপর দিয়ে নবনির্মিত ইউনিয়ন বোর্ডের সড়ক। ……………. এ স্থানটির উপরে পৌঁছে সহসা মনে হল, সড়কটাই বুঝিবা ল্যাংড়ীর এবং তার ভ্রাতুষ্পুত্রের স্মৃতিসৌধ।”

গল্পটিতে গ্রামীণ সমাজের নানান অবক্ষয়-অনাচার শোষণ এবং নারীজীবনের নীরব কান্না একটি নিটোল গল্পের ভাঁজে ভাঁজে চিহ্নিত হয়েছে। বলা যায়, “ল্যাংড়ী গল্প গ্রন্থের শ্রেষ্ঠ গল্প হচ্ছে ‘ল্যাংড়ী’। গল্পের ভাষা ও পরিবেশ বর্ণনায় আবু জাফর শামসুদ্দীন কৃতিত্বের পরিচয় দিয়েছেন। ছোট ছোট ঘটনা আন্তরিকতার সাথে উপস্থাপন করেছেন তিনি। ১

স্বাধীনতাউত্তরকালে প্রকাশিত শওকত ওসমানের ছোটগল্পের গ্রন্থসমূহ হল: জন্ম যদি তব বঙ্গে’ (১৯৭৫), ‘তিন মির্জা’ (১৯৮৬), ‘মনিব ও তাহার কুকুর’ (১৯৮৬), ‘পুরাতন খঞ্জর’ (১৯৮৭), ‘ঈশ্বরের প্রতিদ্বন্দ্বী’ (১৯৯০), ‘রাজপুরুষ’ (১৯৯২)। স্বাধীনতাপূর্ববর্তীকালে তাঁর গ্রামীণ পটভূমিতে রচিত গল্পের সংখ্যা অনেক কিন্তু স্বাধীনতাউত্তরকালে রচিত গল্পে গ্রামীণ পটভূমিকে খুব কমই ব্যবহার করেছেন।

শওকত ওসমানের জন্ম যদি তব বঙ্গে’ গ্রন্থের অধিকাংশ গল্পগুলিই মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক। দেশের স্বাধীনতাযুদ্ধে জনগণের কৃতিত্ব ও বীরত্ব এবং হানাদার ও রাজাকারদের নির্যাতনের কাহিনী ফুটিয়ে তুলতে কয়েকটি গল্পে গ্রামকেই পটভূমি করেছেন। বারুদের গন্ধ লোবানের ধোঁয়া’ এমনই গ্রামের পটভূমিতে রচিত এক মুক্তিযোদ্ধার বীরত্বের অত্যুজ্জ্বল কাহিনী। গল্পে পাকিস্তানী ক্যাপ্টেন বশীর যখন তার বাহিনী নিয়ে গ্রামে আক্রমণ করেছিল, তখন সেখানে অবস্থান করছিলেন মুক্তিযোদ্ধা গেরিলাবাহিনীর কমান্ডো রণেশ দাদা।

তার বুদ্ধিতেই তাকে খাটে শুইয়ে সাদা কাপড় দিয়ে ঢেকে দেওয়া হল। পাশে জ্বেলে দেয়া হল তিন-চারটি লোবান। খাটে উপবিষ্ট হয়ে কয়েকজন উচ্চস্বরে দোয়া পড়তে লাগল এবং ষাটের কিনারায় মাথা রেখে দুই তরুণী কাঁদতে লাগল। লোবানের ধোঁয়ায় সৃষ্টি হল বিষাদঘন মৃত্যুর পরিবেশ। এমন পরিবেশে দলবলসহ উপস্থিত হয়ে অপ্রস্তুত বোধ করল ক্যাপ্টেন বশীর।

পরিবেশের প্রভাবে তার মনে জিঘাংসার পরিবর্তে যেন বৈরাগ্যের উদয় হল। সে প্রস্থান করল। তার প্রস্থানের সাথে সাথে রণেশ খাট থেকে নেমে পড়লেন এবং তরুণী দু’জনকে নিরপদ স্থানে পৌঁছে দিয়ে স্টেনগান হাতে পুনরায় প্রস্তুত হলেন যুদ্ধের জন্য।

‘রক্তচিহ্ন’ গল্পে একজন দেশপ্রেমিক, বীর মুক্তিযোদ্ধাকে তুলে ধরা হয়েছে যে মৃত্যু অবশ্যম্ভাবী জোনেও শত্রুর বিরুদ্ধে শেষ অস্ত্রটি প্রয়োগ করতে কসুর করেননি। মুক্তিযোদ্ধা নাজেম গ্রামবাসীর বহু প্রাণের কাছে নিজের প্রাণকে তুচ্ছ করে জখম অবস্থায় যুদ্ধ করতে থাকে এবং শেষ নিঃশ্বাস পর্যন্ত যুদ্ধ করে যায়।

‘তিন মির্জা’ গ্রন্থের ‘দ্বিতীয় অভিসার’ গল্পটিও মুক্তিযুদ্ধের চেতনাপ্রসূত এবং এর পটভূমি গ্রাম। মুক্তিযুদ্ধের কয়েক মাস পরের ঘটনায় গল্পটি আবর্তিত হয়েছে। গ্রামের মেয়ে মাজু মুক্তিযুদ্ধকালীন সময়ে হানাদারবাহিনীর সৈন্যদের দ্বারা অত্যাচারিত হয়। গল্পে দেখা যায়, মাজু তার গর্ভজাত সন্তানকে ধলেশ্বরী নদীতে বিসর্জন দেয়। কেননা, এটি পাকসৈন্যের ঔরসজাত।

গল্পকার মাতৃস্নেহে করুণতম আর্তিকে চমৎকারভাবে ফুটিয়ে তুলেছেন, নদীতে নিক্ষেপ করার পূর্বেও শিশুটির কেঁদে ওঠা এবং মাজুর ব্যাকুল হয়ে শিশুটিকে দুগ্ধপান করানোর মধ্যদিয়ে। মাগুর চরিত্রের মধ্যে মাতৃত্বের এই চরম ত্যাগের কাহিনী সৃজনের মধ্যদিয়ে গল্পকার স্বাধীনতাযুদ্ধে হাজার হাজার বীরাঙ্গনার চরম আত্মত্যাগের প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদন করেছেন।

‘মনিব ও তাহার কুকুর’ গ্রন্থের ‘গ্রহচ্যুত’ গল্পে মওকত ওসমান গ্রাম ও শহরের মাঝে যে এক বিশাল দূরত্ব তাকে একটি ক্যানভাসে চিত্রিত করেছেন। সামাজিক অবক্ষয় গল্পের মূল বিষয় হলেও ঘটনা উপস্থাপন ও বর্ণনায় শহর ও গ্রামের মধ্যকার ন্যান বৈসাদৃশ্য উপস্থাপিত হয়েছে। মানুষ ক্রমাগত নগরমুখী হচ্ছে।

গ্রামে জন্ম নিয়ে এবং বাল্য-কৈশোর গ্রামেই অতিবাহিত করে যে সকল যুবক উচ্চশিক্ষা গ্রহণের জন্য শহরে আসেন, অনেকেই শহরে প্রতিষ্ঠা লাভের পর আর ফিরে তাকান না ফেলে আসা জন্মভূমিটির দিকে। শহরের নানান সুযোগ-সুবিধাপ্রাপ্ত মানুষ, সকল বিষয়েই সুবন্দোবস্তে অভ্যন্ত উচ্চবিত্ত নাগরিকদের এই অবহেলায় আমাদের দেশের গ্রামগুলো যান্ত্রিকযুগেও পশ্চাৎপদই থেকে যাচ্ছে।

‘উন্নতি’ ‘সুব্যবস্থা’ ‘সুবিধা’ প্রভৃতি শব্দগুলো যেন বাংলাদেশের গ্রামগুলি থেকে যোজন যোজন দূরে অবস্থান করে। গ্রহচ্যুত’ গল্পে এ বিষয়টি চমৎকারভাবে উৎকীর্ণ হয়েছে। এ গল্পে মিরাজ সরকার শহরের সুপ্রতিষ্ঠিত বিত্তবান ব্যক্তি। বার্ধক্যে এসে হঠাৎ তিনি সুদূর কৈশোরে ফেলে আসা জন্মভূমি সাগরপুর গ্রামের জন্য টান অনুভব করলেন এবং স্ত্রী-সন্তানদেরকে নিয়ে একবার সেখানে ঘুরে আসার সিদ্ধান্ত নিলেন।

গল্পে রূপসী গ্রামবাংলার অপার সৌন্দর্যে লেখক উপস্থাপন করেছেন তিন জোড়া তরুণ চোখে- “বর্ষা শেষ হয়ে গেছে, শরতের প্রারম্ভ। মাঠের বিস্তার, আকাশের বেবহা নীল এবং বাতাসের আমেজ, নদীপথের আকবাক এবং তীরবর্তী জীবনধারার ছবি নাজনী, রাজনী, রামজাকে বেশ মোহমুগ্ধ রেখেছিল। তিনজনের মধ্যে প্রগলভতা বেড়ে যায়। নাজনী হঠাৎ হঠাৎ ভাটিয়ালী ঘান গাইতে লাগল।……… কিন্তু দু’পাশে এমন ছবি শহরকে সাজিয়ে দেবে?

কখনও পাড়ার ভেতর, কখনও ছোটখাট চষা মাঠ, পুকুর, দীঘি, জংলা ঝোপঝাড়। হাটের দিন ছিল তাই ঝাঁকা মাথায় পসারীর দল অথবা হাট-ফেরৎ গ্রামের মানুষ ছবি-ছবি-ছবি। ছবির কি শেষ আছে? এই এক অনন্ত রীল নিজেকে উন্মোচিত করে চলেছে। রমিজ অবাক হয়ে যায়। নিস্তরঙ্গতাও তরঙ্গ হতে পারে সরকার নন্দন জানে না। পরিবর্তনের ঢেউয়ে সে বেশ মৌতাত পায়।”

গ্রাম-প্রকৃতির অপার সৌন্দর্য সরকার পরিবারকে উদ্দীপিত করল, কিন্তু প্রাথমিক মুগ্ধতা কেটে যাবার পর প্রতিপদেই তারা অনুভব করল নানান অভাব শহুরে জীবনে আলাদা কাবার ঘরের ডাইনিং চেয়ার টেবিলের পরিবের্ত মাদুরে বসে খাওয়া, বৈদ্যুতিক আলোর অভাব, এটাচড বাথরুমের অভাব, মিরাজ সরকার ও তার স্ত্রীর গ্রামে জন্ম ও বেড়ে ওঠা; কিন্তু দীর্ঘদিনের নাগরিক অভ্যাসে সে জন্মভূমিই তাদের কাছে স্থবির, ক্লান্তিকর মনে হয়েছে।

এমনকি ফ্রিজের ঠাণ্ডা পানি না পাওয়ার মত তুচ্ছ সমস্যাও প্রকট হয়ে উঠেছে। শহরের আধুনিক সুযোগ সুবিধাভোগীদের কাছে গ্রাম দু’দিনের জন্য বেড়াতে যাওয়াই যথেষ্ট, কিন্তু তারপরই গ্রামের সৌন্দর্য স্থবির হয়ে যায়। তাই গল্পের রমিজ চরিত্রের মুখে শোনা যায়— টু ডেজ ইজ এনাফ ফর ফাদার্স মাদারল্যান্ড।” আধুনিক নগরমুখী শিক্ষিত সমাজের গ্রাম-বাংলার প্রতি অবহেলার বেদনাদায়ক ও লজ্জাজনক ছবিটি এখানে পাওয়া যায়। এরা যেন শিকড়বিস্তৃত।

 

১৯৭২-২০০০ পর্বের ছোটগল্পসমূহে গ্রাম-বাংলার আর্থ-সামাজিক ও সাংস্কৃতিক চিত্র পর্ব ১

 

গল্পে মিরাজ সরকারের সাথে দেখা করার জন্য সাগরপুর ও দূর-দূরান্তের গ্রামের মানুষের আগমনের যে চিত্র লেখক বর্ণনা করেছেন তা বাস্তবানুগ ও পল্লীসমাজের সৌহার্দের চিহ্ন বহন করে। গল্পকার শহর থেকে গ্রামে যাওয়ার পথের যে বর্ণনা দিয়েছেন “কোচে, ট্রেনে দুই-দুই, তারপর নৌকায় ঘণ্টা তিনেক … রিকশায়…। এর মধ্যদিয়ে গ্রাম ও শহরের অন্তর্গত দূরত্বটি প্রতিকায়িত হয়েছে। তারপর রিকশায়…। এর মধ্যদিয়ে গ্রাম ও শহরের অন্তর্গত দূরত্বটি প্রতিকায়িত হয়েছে।

‘পুরাতন খঞ্জর’ গ্রন্থের ‘কবন্ধকাহিনী’তে পাড়াগাঁয়ের উপকথার রূপকের আড়ালে গ্রামের কুসংস্কার, শোষণ- উৎপীড়ন ও উৎপীড়কের বিরুদ্ধে সমবেত হওয়ার আহ্বান পাওয়া যায়। গ্রামের কুসংস্কারের রূপটি লেখক কৌতুকপূর্ণ ভাষায় বর্ণনা করেছেন – “প্রাচীন পুরানে কবন্ধের সংখ্যা খুব অল্প। কিন্তু গ্রাম এলাকায় প্রায় এক – দুই গাঁ ছাড়া ছাড়া এই কাহিনী চালু। অমুক মাঠে কন্দকাটা আছে। সুতরাং হিসাবে হাজার হাজার হয়ে যেতে পারে। বহুৎ মাঠ, না, গ্রামে আছে কবন্ধের চারণভূমি।”

কলকাটা ভুতের আড়ালে বলা হয়েছে গ্রামের শোষকশ্রেণীর দুর্জনদের কথা। গল্পটি কন্দকাটা বধের কাহিনী। একটি গ্রামে অধিকাংশ মানুষ কন্দকাটা ভুতের উৎপীড়নে মারা গেছে। জীবিত কেবল একজন নারী ও একজন পুরুষ। তারা আবিষ্কার করল যে “কন্দকাটা মাইয়াপোলার গন্ধ ভালবাসে।” এবং সে মানুষের থেকে উঁচু হলেও এত উঁচু না যা মানুষের ধরা-ছোঁয়ার বাইরে।

শেষে গ্রামের মানুষের ‘মেয়ে মানুষের গন্ধের’ ফাঁদ পেতে কবন্দকে বধ করণ এবং গ্রামকে নিরাপদ করল। গল্পটিতে গ্রামের লম্পট জোতদারদের অত্যাচার এবং সেই অত্যাচারের বিরুদ্ধে নারী-পুরুষের সম্মিলিত শক্তি দ্বারা প্রতিরোধের আকাঙ্ক্ষাকে রূপায়িত করেছেন গল্পকার। গল্পে দরিদ্র অনুন্নত গ্রামের চিত্র পাওয়া যায় “শহরে থাইক্যা আপনেরা কিছু টের পান না। থাকতেন আমাগো লাহান গাঁও গেরামে, বুঝতেন কন্দকাটার জুলুম। শহরে বাতি জ্বলে রাস্তা রাস্তায়। কিন্তু আমাদের তো অন্ধকার বাস। মাড়ী-তেল (কেরোসিন) আর কয়জনে খুশীমত জ্বালাইতে পারে? আকুড়া ত্যাল।”

“শিবগঞ্জের মেলা’ গল্পটি ‘ঈশ্বরের প্রতিদ্বন্দ্বী’ গল্পগ্রন্থের অন্তর্ভূক্ত। সদু ফকিরের মাজারকে কেন্দ্র করে চৈত্রমাসের শেষদিন শিবগঞ্জে মেলা জমে ওঠে। এ মেলায় আসে বিভিন্ন পসারী নানারকম পসরা নিয়ে। বাঁশের বাঁশি, তালপাতার মাদুর, মাটির পুতুল থেকে মানুষের দেহপসরা পর্যন্ত বিক্রি হয়।

ভাঁড় নৃত্য, পুতুল নাচ, বাউল গান, যাত্রা, সার্কাস, জুয়ার আসর নিয়ে মেলার জমজমাট অবস্থা। পুরো গল্পটি গ্রাম্য মেলার প্রাচীন ও নতুন উপাচার ও আয়োজনের নিটোল বিবরণ। এর অন্তরালেই কাহিনী গড়ে উঠেছে। মেলায় জুয়ার আকর্ষণে সর্বস্বান্ত হয়ে গ্রাম্য কিশোর আত্মহননে প্রবৃত্ত হয়। দেহপসারিণীকে গার্হস্থ্যজীবনের রঙ্গীন স্বপ্ন দেখিয়ে তাকে সর্বস্বান্ত করে প্রতারক।

বস্তুতঃ গ্রাম্য মেলায় নিছক আনন্দ আয়োজনের অন্তরালে কত রকম নীতিহীন ও গর্হিত কর্মকাণ্ড সংঘটিত হয় এবং তা কর্তৃপক্ষের স্বার্থসংক্রান্ত বলেই তাদের সমর্থনপুষ্ট থাকে। এ ধরনের বাস্তবচিত্রের পাশাপাশি গ্রাম্য মাজারগুলোর স্বরূপ উদঘাটিত করেছেন- “আসলে সদু ফকীর জাবেদ পাটোয়ারীর আবিষ্কার। ফকীরের পাকা কবর আর মাজার না হলেত তার পাকা ইমারত হতে পারে না। স্বপ্ন দেখা তার জন্য ছিল বাধ্যতামূলক। ফকিরের নামও স্বপ্নেই পাওয়া নিশ্চয়।

ভুবন পাগলের সমস্যা’ গল্পে ভুবন পাগল এক সময় ছিল উচ্চবর্ণের হিন্দু গৃহস্থ, তার পদবী ছিল সেনগুপ্ত। নদীর ভাঙনে সে সর্বস্বান্ত হয়। সম্পত্তির শরীক ও প্রতিবেশীদের লোলুপ নির্দয়তা’ তাকে আবার গড়ে উঠতে দেয় না। উপরন্তু চিকিৎসার অভাবে স্ত্রী-পুত্রের মৃত্যুতে সে উন্মাদ হয়ে যায়।

গল্পটি ভুবন পাগলকে কেন্দ্র করেই আবর্তিত। ভুবন একদিন নিজ গ্রাম ছেড়ে হাজির হয় এক শহরতলীতে। সেখানে এক ব্যক্তি তাকে জমিতে আস্তানা বানিয়ে দেয়। সেখানে সে বেশ রোজগার করে। হঠাৎ একদিন তার মাথায় খেয়াল চাপে যে সে তার জমানো টাকা মানুষকে দান করবে। এই ভাবনা, থেকে সে গ্রামের গরীব চাষীদের বাড়ি যায় এবং তার টাকা নিতে বলে, কিন্তু চাষীরা টাকা নিতে রাজী হয় না।

এতে ভুবন পাগল ক্ষিপ্ত হয়ে রাতের অন্ধকারে চাষীদের ঘর-বাড়িতে আগুন ধরিয়ে দে, সেভাবে এবার নিঃস্ব চাষীরা তার কাছে হাত পাতবে। ভুবন পাগলের সংলাপ তুই ব্যাডারা না নিলে আমার পূণ্য কামাই করব কেমনে?” এই সংলাপের মধ্যদিয়ে গল্পকার যুগ যুগ ধরে শ্রেণী শোষণকে প্রতীকের মাধ্যমে উপস্থাপন করেছেন। গ্রামের দরিদ্র কৃষক পল্লীর অনাড়ম্বর জীবনযাত্রার একটি স্নিগ্ধ চিত্র গল্পটিতে পাওয়া যায়- “গরীব পল্লী।

অধিকাংশ ছোট ভিটের উপর লাগালাগি ছনের ঘর। এদের অধিকাংশ বৈঠকখানা বাঁশের মাচাং। তারই উপর বসে তামাক খাওয়া আর গল্পসল্প করে সময় কাটানো। গল্পটিতে একদিকে যেমন মানুষের নির্দয়-নিষ্ঠুরতায় অপরকে সর্বস্বান্ত করার চিত্র আছে, তেমনি অন্যদিকে হতদরিদ্র খেটে খাওয়া কৃষকদের আত্মসম্মানবোধের উজ্জ্বল চিত্র আছে।

‘শা’ নযর’ (১৯৮৬), ‘অতীত রাতের কাহিনী’ (১৯৮৬), অমরকাহিনী’ (১৯৮৭) শাহেদ আলীর স্বাধীনতাউত্তরকালে প্রকাশিত গল্পগ্রন্থসমূহ। শাহেদ আলী ‘মাটির মানুষের বেদনা ও বঞ্চনার কথা আন্ত রিকতার সঙ্গে তাঁর ছোটগল্পে তুলে ধরেছেন। খুব বেশি সংখ্যক গল্প রচনা না করেও তাঁর সংবেদনশীল জীবননিষ্ঠ লেখনীর গুণে বাংলা সাহিত্যের ছোটগল্পের জগতে স্থায়ী আসন করে নিয়েছেন তিনি। ২ তবে স্বাধীনপরবর্তী সময়ে তাঁর গল্প রচনার পরিমাণ খুবই অল্প।

শাহেদ আলীর ‘শনিষর’ গল্পটি গার্হস্থজীবনের একটি স্নিগ্ধ চিত্র। গ্রামের এক অন্ধ গায়েকের পিতৃত্বের প্রথম আস্বাদনের অপূর্ব অনুভূতি গল্পের বিষয়বস্তু। দর্শনেন্দ্রীয় বঞ্চিত মিরাজের হৃদয়ের অনুভূতি, সৌন্দর্য উপলব্ধির ইচ্ছ, স্বপ্ন-আকাঙ্ক্ষা ইত্যাদির এক মনস্তাত্ত্বিক ধারা বিবরণীর মধ্য দিয়ে গল্পটি এগিয়েছে।

জন্মান্ধ মিরাদের ভাব-কল্পনার পাশাপাশি জীবনের বাস্তববিক দিকগুলোও গল্পে স্থান পেয়েছে। জন্মান্ধ দরিদ্র মিরাদ তার স্ত্রীর ভরণ-পোষণের ব্যয়ভার বহনেই অক্ষম, সন্তানের আগমনে সংসারে নতুন খরচ বৃদ্ধি। তবুও পিতৃত্বের অনুভূতি তাকে আপ্লুত করে। পুত্রের জন্ম সংবাদে সুরেলা কন্ঠে আজান দিয়ে পরম মঙ্গলময়ের কাছে কৃতজ্ঞতা জ্ঞাপন করেছে গ্রামীণ গায়ক মিরাদ।

গ্রামীণ পটভূমিকায় লেখা ‘ছবি’ গল্পটি। গল্পে খালেদা চরিত্রটির মধ্য দিয়ে পল্লীবধূর স্নিগ্ধ ধৈর্য্যশীল ও আবেগময় রূপটি পাওয়া যায়। খালেদার স্বামী যুদ্ধে গিয়েছিল, কিন্তু এখনও ফিরে আসেনি। খালেদা গ্রহকর্মে লিপ্ত থাকে, সংসারের অন্যান্যদের সাথে মিলেমিশে দিনযাপন করে এবং অপেক্ষায় থাকে প্রিয়তম স্বামীর। হঠাৎ সংবাদপত্রে ছাপা একটি ছবি বদলে দেয় তার জীবনের প্রাত্যহিক গতি। ছবিটিতে একজন সৈনিক একটি কাটা মুণ্ডু হাতে ঝুলিয়ে নিয়ে আছে বিজয় উল্লাসে। কাটা মুণ্ডুটি দেখে খালেদা চিনতে পারে, এটি তার স্বামীর। গল্পটি অত্যন্ত করুণ।

 

১৯৭২-২০০০ পর্বের ছোটগল্পসমূহে গ্রাম-বাংলার আর্থ-সামাজিক ও সাংস্কৃতিক চিত্র পর্ব ১

 

গ্রামীণ জীবনের দারিদ্যের এক নিদারুণ চিত্র ‘নিরুত্তর’ গল্পটি। দারিদ্র্যসীমার সর্বনিম্নস্তরে বসবাসরত সুডানের আত্মমগ্ন চিন্তা ও মনস্তাত্ত্বিক চেতনা প্রবাহই গল্পের কাহিনীকে এগিয়ে নিয়ে গেছে। এরই মধ্যদিয়ে ফুটে উঠেছে সমাজের অনিয়ম ও অভাবের ক্ষতচিহ্ন। দারিদ্র্যের কষাঘাত যেন সুভানকে স্তব্ধ, বাকহীন করে দিয়েছে, যেমন দিয়েছিল তার বাবাকে। সুভানকে তার স্ত্রী, ছেলে, ছেলের বউ, মেয়ে, মেয়ের জামাই সকলকে নিয়ে থাকতে হয় একটি মাত্র ঘরে।

যার ছাউনিটি- “ফসল তোলার পর অন্যের জমি থেকে ডেঙ্গা কেটে এনে ছানি দেয় প্রতি বছর। কয়েক মাস যেতে না যেতেই ছানি পঁচে যায়। তখন রোদ আর বৃষ্টি দুই-ই হুমড়ি খেয়ে পড়ে। পড়বেই তো। ………. বৃষ্টির দিনে সবাইকে নিয়ে ভেজে তাতে অসুখ-বিসুখ হয় না। ব্যাঙের কখনও সর্দি হয় না।”

এর মধ্যেই পরিবার বর্ধিষ্ণু হয়, নতুন শিশুর আগমন ঘটে। আবার কখনও চলেও যায় কেউ; যেমন সুভানের গর্ভবতী মেয়েটি মারা যায় হঠাৎ একদিন- “পেটে বাচ্চা নিয়েই মরণ। তার কি হয়েছিল দুনিয়ার কোন ডাক্তার খবর রাখেনি।” সুভানদের জীবনে কোন সুখ-স্বপ্ন নেই, কোন সুখ-স্মৃতিও নেই।

অতীতে এক সময় তাদের অভিজাত্য ও স্বচ্ছলতা দুই-ই ছিল, এখন আর ওসব ভাবে না তারা, ভবিষ্যৎ চিন্ত াতেও বোনে না কোন স্বপ্নের জাল। প্রায় উপোসী জীবনে সকলই যেন রীতিমত অর্থহীন ভাবনা। গল্পটিতে শাহেদ আলী এক ঐন্দ্রজালিক ভাবালুতায় বর্ণনা করে গিয়েছেন এক রূঢ়-কঠোর বাস্তবতা, দারিদ্রোর সর্ব নিম্নস্তরে বসবাসরত মানুষের জীবনকাহিনী।

‘নিরুত্তর’ গল্পের শুরুতে মানুষের অসচেতনতা ও দেশনেতাদের অবহেলা সমৃদ্ধশালী গ্রামপ্রকৃতিকে যে দরিদ্র করে তুলছে তার চিত্র পাওয়া যায় “কিন্তু আজকাল বন-বাদাড় সব সাফ হয়ে গেছে, বিলঝিল সব ফিশারী হয়ে গেছে। পাখি বলতে গেলে নাই এখন দেশে। আর বড়শি নিয়ে তো নামতেই পারে না কোথাও। যেখানেই পানি, তাই নাকি জলমহাল। ফিশারীওয়ালা লোকেরা তেড়ে আসে।”

“বিশাল পৃথিবী’ গল্পটির পটভূমিকা গ্রামীণ এবং সময়টা বেশ কিছু পিছনের। জমিদার আমলের অত্যাচারের কাহিনীই গল্পটির উপজীব্য। জমিদারের শোষণ ও নিপীড়নে একজন সামান্য কৃষক কিভাবে ধীরে ধীরে ভূমিহীন কৃষকে পরিণত হয় সে চিত্র গল্পটিতে তুলে ধরা হয়েছে। হায়দারের জীবনকে কেন্দ্র করে গল্পের গতি আবর্তিত হয়েছে। হায়দার, তার সুন্দরী যুবতী স্ত্রী রাজন এবং মাকে নিয়ে সুখী গার্হস্থ্য জীবনের একটি চিত্র পাওয়া যায়। মাতৃহীন শিশুটিকে বুকে নিয়ে জমিদারের ফয়সালা শুনে হতবিহ্বল হায়দারের বর্ণনাটি হৃদয়স্পর্শী।

গ্রামীণ জোতদার ও সুদখোর মহাজনদের শোষণের কাহিনী ‘সোনাখালী’। সোনাউল্লাহ স্ত্রী-কন্যাদের একটি সচ্ছল জীবন দেবার প্রত্যাশায় বারংবার আশায় বুক বেঁধে উদ্যমী হয়, কিন্তু প্রকৃতিনির্ভর দেশে প্রাকৃতিক শক্তির কাছে পরাজিত হয় কিন্তু প্রাকৃতিক দুর্যোগের থেকেও মারাত্মক দুর্যোগ মহানজনের সুদ কিস্তি . কিস্তি ……কিস্তি ……… জীবনের এক মুহূর্তেও কি সে ভুলতে পারবে না কিস্তির কথা? বংশী তলা নেই কাঠা দিয়ে টাকা মাপে, তার কাঠা ভরে না, ভরবে না কোনদিন। সোনার জমিজমা, গরু, বাছুর, প্রায় সবকিছুই গিলেছে বংশী।

তবু তার ক্ষুধার তৃপ্তি নেই। আট বছর ধরে শুধু কিস্তি দিয়ে চলেছে।” রাগের মাথায় সে বংশী মহাজনের মাথায় আঘাত করে, এ আঘাতে মহাজন মারা যায় এবং সোনার চৌদ্দ বছরের জেল হয়। তার সাজানো সংসার তছনছ হয়ে যায়, বড় মেয়েটি মারা যায়। ছোট মেয়েটি নিরুদ্দেশ হয়, স্ত্রী পথে পথে ভিক্ষা করে দিন কাটায়। সোনাউল্লাহ তার নৌকা উদ্ধারের জন্য যে নালা কেটেছিল বন্যার চলে পাড় ভেঙে তা বিশাল খাল হয়ে দাঁড়ায়। গ্রামের মানুষ খালটির নামকরণ করে সোনাখালি ।

‘রাত অন্ধকার’ গ্রামের বিত্তশালীদের নিপীড়নের অপর এক কাহিনী। গ্রামের দরিদ্র জনগণের প্রাপ্য রেশন আত্মসাৎ এবং পারমিটের জিনিস চুরি করে নেয় গ্রামের প্রভাবশালী বিত্তবান ব্যক্তিরা। প্রাপ্য আদায় করে নিতে এগিয়ে যায় না কেউ, এসব তাদের গা সওয়া হয়ে যায়। তবুও কখনও কখনও প্রতিবাদ করে ওঠে কেউ । কিন্তু তাহলে প্রবল শক্তিমান অপরাধীদের সামনে বিচারের কাঠগড়ায় দাঁড়াতে হবে নিরপরাধীকে, যেমন: দাঁড়াতে হয়েছে গল্পের বালেপকে যে প্রকৃত প্রাপ্যটাই শুধু বুঝে নিতে চেয়েছিল।

‘শহীদে কারবালা’ গল্পটিতে রফিকের সততা ও পিতৃস্নেহের এক অপূর্ব চিত্র এঁকেছেন গল্পকার। গ্রামের সহজ- সরল, সৎ, ধার্মিক ব্যক্তি রফিক ক্ষয়রোগে শয্যাগত। চিকিৎসা করার সামর্থ্য তার নেই। স্ত্রী ও ছোট ছোট ছ’টি ছেলেমেয়েকে নিয়ে অর্ধাহারে-অনাহারে দিন কাটায়; এমনকি লজ্জা নিবারনের কাপড়ের টান পড়ে তাদের।

গল্পকার রফিকের ছোট ছোট ছেলেমেয়েদের যে চিত্র এঁকেছেন তা আবহমানকালের দরিদ্রপল্লীর চিত্র: ‘জন্ম থেকেই দেখতে দেখতে অভ্যস্ত হয়ে ওঠে ওরা, উপাস কাপাস করে, ছেঁড়া তালি দেয়া কাপড় পরে থাকে, – তা-ও যখন জোটে না তখন ন্যাঙটা আধো ন্যাঙটা কাটিয়ে দেয়। গায়ের এবং পাড়ার আরো অনেকেই, আরো বহুজনেই এভাবে জীবন কাটিয়ে দেয়। নতুন কিছু না।

জ্যান্ত মানুষের খিদা তো থাকবেই- ছেঁড়া কাপড় চোপড়, তেলা পড়ে থাকে, উদলাও থাকে কেউ কেউ। নালিশ কাকে বলে তাও ওরা জানে না।” রফিকের জ্ঞাতিভাই মওলা, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ে; গ্রামে বেড়াতে এসে রফিকের অবস্থা দেখে হতবাক হয়ে যায়।

এক সময়ের সচ্ছল বড় বাড়ির হাজি মুকররমের পুত্র রফিক আজ ভূমিহীন। শুধু তাই নয়, মওলা লক্ষ্য করে যে, দশ বছর আগেও রফিক বা গ্রামের অন্যান্য অনেক মানুষেরই এমন অবস্থা ছিল না, আগে গ্রামের প্রায় সব মানুষেরই কম-বেশি জমিজমা ছিল; কিন্তু এখন তা কুক্ষীগত হয়ে গেছে কেবল তিন-চারজনের হাতে, বাকি সবাই সামান্য ঋণের সুদ টানতে টানতে লগ্নিকারীর হাতে জমিজমা সবকিছু হারিয়েছে এখন হয়তো বা সবার ঘরে ছাউনিটাও ঠিকমত নেই। এছাড়া “আজকাল আবার উপজেলা হয়েছে। সেখানে অফিস আর অফিসারদের জন্য দালান-কোঠা হচ্ছে। রাস্তাঘাটের কাজ হচ্ছে- ফসলের ক্ষেত নষ্ট করে। এখানেও গাঁয়ের কেউ কেউ মাটি কাটে। বদলে কিছু গম পায়।”

মওলার বাবা সফদর চট্টগ্রাম শহরের বাসিন্দা এবং সচ্ছল ব্যক্তি। তিনি রফিকের চিকিৎসার জন্য কিছু টাকা দেন, কিন্তু কয়েক মাস পর গ্রামে এসে দেখলেন রফিকের অবস্থার আরো অবনতি হয়েছে। চিকিৎসার জন্য দেয়া টাকা দিয়ে সে ছেলেমেয়েদের অন্নসংস্থান করেছে। গল্পের শেষ হয়েছে সততার মূর্তমান পুরুষ এবং অপত্যস্নেহে উদ্বেল এক নিরুপায় পিতা রফিকের উক্তিতে- “দোহাই চাচা আমারে আর চিকিৎসার দায় টেকা পাড়াইবেন না।

আপনেরে আমি মিছা কইতে পারুম না।” বস্তুতঃ সন্তানদের অভুক্ত রেখে তার পক্ষে নিজের চিকিৎসা করানো সম্ভব নয়। তার চাচা সফদর প্রয়োজনে আরও টাকা পাঠানোর প্রতিশ্রুতি দিয়ে গিয়েছিলেন, কিন্তু মিথ্যা বলে টাকা নিতে তার বিবেক সায় দেয়নি। চরম দারিদ্র্য, দুঃখ-কষ্ট, রোগ-ভোগের মধ্যেও মানুষের সৎ গুণাবলী টিকে থাকতে পারে, গল্পটিতে শাহেদ সেই সোনালী ছবি এঁকেছেন।

 

১৯৭২-২০০০ পর্বের ছোটগল্পসমূহে গ্রাম-বাংলার আর্থ-সামাজিক ও সাংস্কৃতিক চিত্র পর্ব ১

 

“নতুন জমিনদার’ কঠোর পরিশ্রম ও দৃঢ় মনোবল নিয়ে দারিদ্র্য ও শোষণের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ানোর একটি অপূর্ব গল্প। বন্দার পরিবারে আছে তার মা, বোন ও বউ। তাদের বাস দরিদ্রসীমার নিচে। বন্দার বউ মেন্দির গর্ভে সন্তান আসে-এরই সাথে আসে আরেকটি অভাবনীয় খবর-সরকার ভূমিহীন কৃষকদের মধ্যে খাস জমি বণ্টন করবে।

পুরো পরিবার স্বপ্নে বিভোর হয়ে ওঠে। কিন্তু যখন জমি পেল, তখন দেখা গেল উর্বর জমিগুলি টাকার বিনিময়ে আমিন কানুনগোকে হাত করে তাদের সহায়তায় চেয়ারম্যান বেনামীতে দখল করে নিল। বন্দা পেল কেবল একটুকরো অনুর্বর জমি। কিন্তু তাতে সে দমে গেল না। মাত্র একটি কোদাল আর নিজ শরীরকে সম্বল করে লেগে গেল জমি প্রস্তুত করতে। কিন্তু জমিতে হাল চষা, মই দেয়া না হলে জমি প্রস্তুত হবে কিভাবে- অথচ লাঙল ও গরু কেনার সামর্থ্য তার নেই।

কর্জ করতে চাইলে চড়া সুদে মহাজনের কাছ থেকে টাকা নিতে হবে তার অর্থ আজীবন বা বংশ পরম্পরায় ঋণের মধ্যে আত্মাহুতি। কিন্তু তবু শেষ পর্যন্ত বন্দা মনুষ্যশক্তির জয়-জয়কার করতে চাইল-স্ত্রী ও বোন এগিয়ে এল সাহায্যে হাল চষা গরুর পরিবর্তে নিজেদের গলাতেই জোয়াল বেঁধে নিল।

অপরিমিত ধনের পাহাড় গড়তে গ্রামের জোতদার-মহাজনেরা যখন অমানুষে রূপান্তরিত হয় পশুর পরিবর্তে নিজের কাঁধে লাঙলের জোয়াল উঠিয়ে নিয়ে এভাবেই শোষকের পশুত্বকে পরাজিত করে মনুষ্যশক্তির জয় ঘোষিত হয়।

“পোড়া-মাটির গন্ধে” আমরা দেখি দুর্দশা ও দুঃসহ দারিদ্র্য মানুষের সহজ আচরণ ও সহজাত প্রবৃত্তিকে কিভাবে বিনষ্ট করে। হাওড় অঞ্চলের মানুষের জীবনযাত্রা প্রণালীও গল্পে চিত্রিত হয়েছে।

নাজমুল আলমের ‘সালিস’ (১৯৮১) গল্পটিতে গ্রামসমাজের সম্পদশালী ব্যক্তিদের অনাচার-অবিচার ও অবক্ষয়ের একটি চিত্র পাওয়া যায়। গল্পে গ্রাম্য সালিসের একটি বাস্তব বর্ণনা পাওয়া যায়। হতদরিদ্র কাদু মিয়া গ্রামের হারু পরামানিকের বিরুদ্ধে সালিস ডাকে। হারু পরামানিক অর্থ ও অস্ত্রে বলীয়ান, সে কাদু মিয়ার যুবতী সুন্দরী স্ত্রী বাতাসীকে দারিদ্র্যের সুযোগ নিয়ে লোভ দেখিয়ে নিজের বাড়িতে নিয়ে যায়- যদিও তার স্ত্রী বর্তমান এবং বিবাহযোগ্য কন্যা আছে।

কাদু মিয়ার অভিযোগ তার সাথে তার স্ত্রী তালাক হয়নি, তাই হারুর সাথে বাতাসীর বসবাস বৈধ না। সালিসের বিচারক ছানা মণ্ডল বলে, কাদু মিয়া তার স্ত্রীর ভরণ-পোষণে অক্ষম, উপরন্তু রাতে নেশা করে বাড়ি ফিরে তাকে মারধর করে। কাজেই এমন অসহায় একটি মেয়েকে আশ্রয় দিয়ে হারু পরামানিক অন্যায় কিছু করেনি। বাতাসী কাদু মিয়ার কাছে যদি ফিরে যেতে ইচ্ছুক না হয়, তবে কাদু মিয়া তাকে তালাক দিয়ে দিক। তাহলে হারু পরামানিকের সাথে বাতাসীর বিয়ে শরীয়ত মোতাবেক বৈধ হবে।

বিচারের নামে এই প্রহসনে গ্রামের কয়েকজন যুবক প্রতিবাদ জানায়। এদিকে স্ত্রী বাতাসীকে কাদু মিয়ার কাছে ফেরত পাঠিয়ে দেয়। এতে হারু পরামানিক ক্ষিপ্ত হয়ে স্ত্রীকে মারধর করে এবং বাইরের দহলিজ ঘরে শুতে যায়। রাতে হারু পরামানিককে পাপের শাস্তি দেয়ার জন্য গ্রামের প্রতিবাদী যুবকেরা তার ঘরে আগুন ধরিয়ে দেয়। গল্পটিতে গ্রামের সর্বস্তরের নারীদের অসহায়ত্ত্বের চিত্র পাওয়া যায় ।

‘আদিম’ (১৯৭৪) গল্পটি রজবালীর সাজানো সুখী গার্হস্থ্যজীবন বন্যার পানির তোড়ে ছিন্ন-ভিন্ন হয়ে যাবার কাহিনী। ছেলে সোনা, মেয়ে ননী এবং স্ত্রী তাহেরা বিবিকে রজবালীর সংসার। ক্ষেতে ফলানো তরিতরকারি গঞ্জের হাটে বিক্রি করে তাদের সচ্ছল দিনাতিপাত হয়। তাহেরা বিবি পরম যত্নে ও মমতায় গৃহস্থালী কর্ম করে। কিন্তু এক বর্ষায় ভয়াবহ বন্যা হয়। তাদের ঘর পানিতে ডুবে যায়।

রজবালী মাঁচা বেঁধে সপরিবারে সেখানে আশ্রয় নেয়। বন্যার পানি মাঁচা ছুই ছুই। এদিকে খাবারের মজুদও ফুরিয়ে আসে। দিন তিনেক অনাহারে থাকার পর তারা খবর পেল, রিলিফ আসবে। হেলিকপ্টার থেকে রুটি ফেলা হবে স্কুলের মাঠে। নয় বছরের সোনাকে সাথে করে ছোট ডিঙা নিয়ে রজবালী রিলিফ আনতে যায়। কয়েক হাজার লোকের জন্য কয়েক শ’ রুটি ছুঁড়ে দিয়ে হেলিকপ্টার উড়ে চলে যায়। ক্ষুধার্ত মানুষের প্রবল ভীড়ে শিশু সোনা মুখ থুবড়ে পড়ে। রজবালী কোন রকমে তিনটি রুটি সংগ্রহ করে রওনা দেয় তাহেরা বিবি ও ননীর কাছে। পথে হঠাৎ বন্যার পানিতে ঘূর্ণি ওঠে, স্রোতের তোড়ে ডিঙি থেকে পানিতে পড়ে যায় সোনা এবং পানির ঘূর্ণনে তাকে উদ্ধার করতে পারে না রজবালী। চিরকালের জন্য হারিয়ে যায় সোনা ।

‘ইজারদার’ (১৯৮০) গল্পে জমিরদ্দী গ্রামের একজন ছোটখাট ইজারদার। সে সৎ ও দায়িত্বশীল। ঘরে তার অসুস্থ স্ত্রী এবং স্বামী পরিত্যক্তা যুবতী কন্যা বাছিরন। গ্রামের অপর ইজারদার আলেক মৃধা- “আলেক মৃধা এ তল্লাটের ডাকসাইটে ইজারদার। কালভার্ট তৈরি করা, নদীর পাড়ে বাঁধ দেওয়া, খেয়াঘাটের লোক পারাপার করা, নদীর কোলে ইলিশ মাছ ধরা, সবকিছুরই ইজারা বন্দোবস্ত পেয়ে যায় সে।” আলেক মৃধা অর্থলোভী। হাটের ইজারা নিয়ে জমিরদ্দীর সাথে নানান রকম শত্রুতা করে। তার বিরুদ্ধে নালিশ করে সিও সাহেবকে।

কিন্তু সৎ জমিরদ্দীর বিরুদ্ধে মিথ্যা নালিশ প্রমাণ করতে পারে না। তখন সে ভিন্ন পথ নেয়। আলেক মৃধার যুবক ছেলে পনু বাছিরনকে নানানভাবে প্রলুব্ধ করে। স্বামীসঙ্গ বঞ্চিতা সহজেই এ ফাঁদে পা দেয়। জমিরুদ্দী যখন ঘটনাটি জানতে পারে তখন সে রাগে-ক্ষোভে ফেটে পড়ে। রাগের মাথায় সে মেয়েকে মারতে উদ্যত হয় এবং তখনই জানতে পারে বাহিরন গর্ভবতী। বিপদ-আপদ, দুঃখ-কষ্টেও জমিরুদ্দী কোনদিন অন্যায়ের কাছে মাথা নিচু করেনি। কিন্তু সন্তানের এই পরিণতিতে, “হাতের হেসোটা সজোরে উঠানে ছুঁড়ে ফেলে দিয়ে মাথা নিচু করে বৃষ্টির মধ্যে রাস্তায় নেমে গেল সে।” গল্পটি ভিলেজ পলিটিক্সের একটি বাস্তব চিত্র।

বিশ্বাস ও বিশ্বাসভঙ্গের একটি করুণ কাহিনী খাগড়াই’ (১৯৮৩)। নবীন ঘোষের বাড়িতে অনাথ মেয়ে পাতুরী। নবীন ঘোষের জমজমাট দইয়ের ব্যবসা- দূর-দূরান্তের এলাকাতেও তার হাতে বানানো সুস্বাদু দইয়ের খুবই সুনাম। এখান থেকেই পাতুরী শিখে নেয় দই বানানোর বিশেষ কলা-কানুন। একসময় পাতুরী কৈশোর ছাড়িয়ে যৌবনে পৌছায়, বহিরের সাথে তার বিয়ে হয়।

নবীন ঘোষের বাড়ি ছেড়ে সে আসে বছিরের সংসারে। বছির লোকটি অলস ও অকর্মণ্য। কিন্তু পাতুরী তার সংসারের চেহারা ফিরিয়ে দেয়। ঘোষ-বাড়িতে শেখা দই বানানোর বিদ্যা কাজে লাগিয়ে সংসারে সচ্ছলতা আনে, জমিজমা করে। দেখতে দেখতে দশ বছর কেটে যায়। বহির ও পাতুরী নিঃসন্তান। অতিরিক্ত পরিশ্রমে সুন্দরী পাতুরীর চেহারা ও স্বাস্থ্য ভেঙে পড়ে। বছির ধীরে ধীরে বাড়ির যুবতী কাজের মেয়েটির প্রতি আকৃষ্ট হয় এবং তার সাথে শারীরিক সম্পর্ক তৈরি করে। পাতুরীর চোখে তা ধরা পড়ে। স্বামীর এই বিশ্বাসঘাতকতায় তীব্র মানসিক আঘাত পেয়ে পাতুরী বিষ পান করে আত্মহত্যা করে।

আলাউদ্দিন আল আজাদের ‘আমার রক্ত স্বপ্ন আমার’ (১৯৭৫), ‘জীবন জামিন’ (১৯৮৮) স্বাধীনতার পরে প্রকাশিত উল্লেখযোগ্য গল্পগ্রন্থ। স্বাধীনতা যুদ্ধোত্তর গ্রামবাংলার অবক্ষয়ের একটি চিত্র পাওয়া যায় আলাউদ্দিন আল আজাদের ‘পল্লীগ্রাম’ গল্পে। গল্পটির রচনা কাল ১৯৮১। যুগ যুগ ধরে শোষণের যাতাকালে পিষ্ট মানুষের মুক্তি যেন কখনই আসে না। তাই মুক্তিযোদ্ধাকে প্রাণ দিতে হয় স্বাধীন দেশেও।

গল্পে মুক্তিযোদ্ধা আজহার বোনের স্বামীকে চাকরি করিয়ে দিতে পারেনি পেট্রোবাংলায়- তাই বোনকে স্বামী পরিত্যক্তা হতে হয়। মাধ্যমিক পাশ আজহার নিজেও জুটিয়ে নিতে পারেননি ভদ্রগোছের কোন চাকরি। একই গ্রামের সুসন্তান ( 1 ) রাজধানীতে সুপ্রতিষ্ঠিত মাহবুব আলীকে সে নিজের জীবন বিপন্ন করে হানাদারদের কবল থেকে উদ্ধার করেছিল। কিন্তু সেই মাহবুব আলীও তাকে নিজ প্রতিষ্ঠা ও প্রতিপত্তির সহায়তায় কোন সাহায্য করতে পারলেন না।

অথচ মাহবুব আলীর ছোট ভাই আফতাব আলী রাজাকার ছিল; সে এখন স্বাধীন দেশে জ্যেষ্ঠ ভ্রাতার প্রতিপত্তিতে হয়ে ওঠে বিপুল অর্থশালী এবং প্রতিপত্তিশালী : প্রায় প্রতি সপ্তাহেই তো সে আসে আপনার কাছে লাইসেন্স পারমিটের তদবির করতে। নানা প্রকল্পের সার-বীজ-নলকূপ-গম আদায় করে নিতে । এখন সারা তল্লাটের দুর্ধর্ষ নেতা, এসব বিষয়ে যদিও ঝামেলা প্রচুর, তাকে না দেখলে চলে না।

আপনার নরম হৃদয়, জনগণের দুর্দশার কথা ভেবে তাকে সাহায্য করেন। বিভিন্ন অফিসে বন্ধু-বান্ধবদের কাছে টেলিফোন করেও কত আদায় করেছেন আপনি।” এখানে তীর্যক ভাষা স্বাধীনতা যুদ্ধপরবর্তী কিছু অসৎ ও সুযোগসন্ধ্যানী মানুষ গ্রামের নিরক্ষর মানুষকে বঞ্চিত করে পারমিটের জিনিস আত্মসাৎ করে সম্পদের কালো পাহাড় গড়েছে তার স্বরূপ উন্মোচন করেছে। আফতাব আলী মুক্তিযুদ্ধের সময় ছিল আল-বদর-রাজাকারদের দোসর। কিন্তু স্বাধীন দেশের মাটিতে সেই নেতা হয়ে ওঠে আর বীর মুক্তিযোদ্ধা আজহার- “তবে মুক্তিযোদ্ধা আজহার হকের করুণ পরিণতির কথা নিয়ে কেউ যদি যেত আপনার কাছে………… ।

মিলিটারি আপনাকে গুলি করে মারত। সে আপনাকে বাচিয়েছিল নিজের জীবন বিপন্ন করে, তার দুঃসাহস দিয়ে, বীরত্ব দিয়ে; স্বাধীনতার পরে কয়েকবার দেখাও করেছিল আপনার সঙ্গে, আপনার অফিসে; কিন্তু আশ্বাস দিয়েও কিছু করতে পারেননি আপনি………………।”

আফতাবের রিরংসার শিকার হয় কলকাতা থেকে গ্রামে আত্মীয়-স্বজনকে দেখতে আসা গৌরী। রাজাকার আফতাব আলী হত্যা করে মুক্তিযোদ্ধা আজহারকে। কিন্তু স্বাধীন দেশের মাটিতেও তার কোন বিচার হয় না। গল্পের শেষে গরীবের সমস্ত রক্ত চুষে নিয়ে শহরের পথে পাড়ি জমানোর সিদ্ধান্ত নেয় আফতাব আলী। সেখানে অভিজাত এলাকায় বাড়ি প্রস্তুত করে রেখেছে সে আগেই; কেননা, গ্রাম তো বসবাসের উপযুক্ত স্থান নয়!

লেখক গল্পটিতে আরেকটি বাস্তবতার সাথে পাঠককে পরিচয় করিয়ে দিয়েছেন। গ্রামের কাদামাটি, আলো- বাতাস, ফলে-ফসলে বেড়ে উঠে যারা যৌবনে রাজধানীতে চলে আসে, নিজের মেধায় সুশিক্ষিত ও সুপ্রতিষ্ঠিত হয় রাজধানীর বুকে, এর চোখ ধাঁধানো জৌলুসে অভ্যস্ত হয়, তাদের অনেকের কাছেই শৈশব-কৈশোরের গ্রাম যেন ঝাপসা স্মৃতি হয়ে যায়।

অথচ এ সকল শিক্ষিত মানুষ যদি তাদের বিবেককে জাগ্রত রাখতেন তাহলে তাদের উজ্জ্বল জীবনের কিছু দ্যুতি ছড়াতেন শ্যামল বাংলায়, তাতে হয়তো বা নিভৃত পল্লীতে কিছুটা হলেও আলো জ্বলে উঠত। বস্তুতঃ গ্রাম ছেড়ে আসা এ সকল প্রতিষ্ঠিত মানুষ, যাদের শিকড় গ্রামে প্রোথিত, তাদের এই কৃতজ্ঞহীন অবহেলা বাংলার গ্রামকে একই সমান্তরালে প্রবাহিত রাখছে যুগের পর যুগ উন্নয়ন বা শোষণহীন শব্দগুলি সেখানেই নিতান্তই রূপকথা।

 

১৯৭২-২০০০ কালসীমায় বাংলাদেশের আর্থ-সামাজিক-রাজনৈতিক পরিস্থিতি ও গ্রামবাংলা

 

‘ঈশ্বরের পলায়ন’ গল্পটির রচনাকাল ১৯৮৪। গল্পটি সামাজিক অবক্ষয়ের একটি চিত্র। ঈশ্বর সূত্রধর বংশপরম্পরায় ছুতার। পিতামহ-প্রপিতামহের কর্মে পসার ও গৌরব ছিল, কিন্তু দিন বদল হয়েছে। ঈশ্বর কাজের অভাবে কষ্টে-সৃষ্টে দিনপাত করে। কারণ “আজকাল কৃষক সমাজ পুরনো লাঙল দিয়েই কাজ চালিয়ে যাচ্ছে এবং কাঠের দুর্মূল্য, পয়সাওয়ালা বেপারিরাও নৌকা তৈরী করাচ্ছে না।”

হঠাৎ একদিন নরসিংদী নিবাসী ঈশ্বর নারায়ণগঞ্জে একটি বড় কাজের ডাক পায় তাতে মজুরী বড় অঙ্কের। কাজ সেরে তিন মাস পর সে বাড়ি ফিরে আসে। চোখে নতুন স্বপ্ন। মজুরীর টাকায় ভাঙা ঘরটি মেরামত করবে, স্ত্রী-কন্যাও মায়ের জন্য নতুন কাপড় কিনে এনেছে। মাঝে মাঝে দুশ্চিন্তা উঁকি দেয় এ ক’মাস তাদের কত কষ্টে কেটেছে। কিন্তু বাড়ি ফিরে ঈশ্বর হতবাক তার ভাঙা ঘরের স্থানে নতুন চকচকে টিনে ছাওয়া পাকা ঘর; স্ত্রী রেবতীর পরণে দামী শাড়ি, চামড়ায় সতেজ চিক্কনতা।

বাড়ির সামনে সদলবলে চেয়ার পেতে বসে থাকা আমিরাত ফেরত আনসার আলীর দরাজ বাণী- ‘ঘরটা আমি তুইল্যা দিছি। ভবিষ্যতে ট্যাহা অইলে ফেরত দিয়া দিস। ঈশ্বরের মা শুধু তাকে বলে-‘পোড়া কপাইল্যা’। ঈশ্বরের অনুপস্থিতিতে তাদের ভাঙাঘরটি যখন ঝড়ে একেবারেই ভেঙে পড়ে তখন ধনী আনসারের কাছে ঈশ্বরের মা ও স্ত্রী রেবর্তী সাহায্য প্রার্থণা করে। আনসার সাহায্য করে, তবে তার বিনিময়ে যুবতী রেবতী আনসারের রিপুকে তৃপ্ত করে। চির দুর্দশা থেকে মুক্তি পেতে রেবতী এই পঙ্কিল জীবনকে স্বীকার করে নেয়।

ঈশ্বর সূত্রধরও অস্ত্রের মুখে মেনে নিতে বাধ্য হয়, তার জ্ঞাতসারেই তার স্ত্রী অন্যপুরুষের বাহুলগ্না। প্রাণভয়ে সে নিজ জীবন থেকেই পালিয়ে বেড়ায়, নিজ গৃহেই পরবাসী জীবন কাটায়। আনসারদের মত লম্পট অর্থশালীদের রিপুর পীড়নে কখনও কখন এভাবেই বলি হয় দরিদ্র অসহায় ঈশ্বরদের নিজস্ব জীবন ও আনন্দ ।

মধ্যপ্রাচ্যের আরবদেশগুলোতে শ্রম বিক্রি করে ধনী হয়ে ওঠা আমাদের দেশের গ্রামাঞ্চলের অশিক্ষিত দরিদ্র জনগোষ্ঠীর কাছে এক দারুণ প্রলোভন। নিজের সামান্য জমিটুকুও বিক্রি করে বা বন্ধক দিয়ে বিদেশে পাড়ি দেবার প্রয়োজনীয় অর্থ সংগ্রহ করে। কিন্তু অনেক সময়ই তারা প্রতারকের খপ্পরে পড়ে।

বস্তুতঃ কিছু দুষ্টচক্র এই সকল সরলমতি মানুষকে ফাঁদে ফেলে বিদেশে পাঠানোর ব্যবস্থা করে দিবে বলে মিথ্যা আশ্বাস দিয়ে টাকা হাতিয়ে নেয়। ফলে একদিকে ফসলি জমি এমনকি বসতভিটেটুকুও হাতছাড়া হয়, অন্যদিকে সোনার হরিণও ধরা দেয় না। তারা সর্বস্বান্ত হয়। ‘পৌষস্বপ্ন” গল্পে এ বিষয়টি উপজীব্য হয়েছে। গল্পটি ১৯৮৫ সালে রচিত হয়েছে।

অভাবের এক নিদারুণ নগ্ন চিত্র ‘কুপি’ গল্পটি। অসহনীয় ক্ষুধার যন্ত্রণায় উদভ্রান্ত মানুষ হঠাৎ চলে যায় পাপের পথে। পরক্ষণেই হয়তো বা তা বিবেককে দংশন করে। গল্পটির রচনাকাল ১৯৮৬।

উত্তরাঞ্চলের ভূমিহীন কৃষকদের প্রতি জোতদার-মহাজনদের অমানবিক আচরণের কাহিনী ‘প্রাচীন বংশের নিঃস্ব সন্তান’ গল্পটি। গল্পটি সম্পর্কে গল্পকারের ভাষ্য: “ঋণ শোধ করতে না পারলে উত্তরাঞ্চলের ভূমিহীন কৃষকেরা কিছুদিনের জন্য নিজেদের বিক্রি করে দেয়; ক্রীতদাসকাল এখনও অতিবাহিত হয়নি।”

বাংলাদেশের গ্রামাঞ্চলে দরিদ্র মানুষের অভাব ও সঙ্কটের সুযোগে চড়া সুদে টাকা ধার দেয় মহাজনেরা। টাকা শোধ দিতে না পারলে জমিজমা, ভিটেবাড়ি থেকে শুরু করে গরু-বাছুর এমনকি ঘরের তৈজসপত্রও তারা নিয়ে যায়। বস্তুতঃ তাদের সুদের অঙ্কটি চড়া থাকে এবং নিরক্ষর মানুষেরা হিসাব বোঝে না। তাই একবার কেউ ঋণ নিলে সমস্ত জীবনের জন্যই সে ঋণের দায় বহন করে।

আলোচ্য গল্পের চরিত্র ইদ্রিস খা এরকমই ঋণের দায়ে আটকে পড়া হতভাগ্য মানুষের প্রতিনিধি। দু’শ বছর আগে ইদ্রিস বায়ের পূর্বপুরুষ ফৌজদার ছিলেন। প্রৌঢ় ইদ্রিস বা নিজে মাইনর স্কুলের মাস্টার ছিলেন। এখন চণ্ডী মহাজনের ঋণের সুদ টানতে টানতে জমি-জমা হারিয়ে সর্বস্বান্ত। তবু ঋণশোধ হয় না। শেষে মহাজন ইদ্রিস খাঁকে তার কাছে বিক্রিত হতে বলে। মাত্র এক হাজার টাকার বিনিময়ে সে চণ্ডীমহাজনের কাছে নিজেকে বিক্রি করে।

চণ্ডমহাজন ইদ্রিস থাকে তার গাড়ীর গাড়োয়ান নিযুক্ত করেন। তেভাগা আন্দোলনের ভোলা মাস্টারের পরামর্শে ইদ্রিস বা মহাজনকে ফাঁদে ফেলল। বিক্রি হওয়ার কারণে সে চণ্ডী মহাজনের সম্পত্তি হয়েছে মানুষ থেকে বস্তুতে রূপান্তরিত হয়েছে এবং এই দ্রব্য ভোলা মাস্টার চুরি করে নিয়ে যায়। মহাজনের পক্ষে থানা-পুলিশ করা সম্ভব নয়। কেননা, একজন বয়স্ক মানুষ তার সম্পত্তি এবং তা চুরি গেছে তা এজাহার করা সম্ভব নয়। এভাবে ইদ্রিস বা মুক্তি পেল। কিন্তু সে জানে এটা সাময়িক। আবার চণ্ডী মহাজন কোন না কোনভাবে জুলুম শুরু করবে প্রাচীন বংশের এই নিঃস্ব সম্ভ ানের উপর।

‘যারা বেঁচে আছে’ গল্পটির পটভূমি ব্রহ্মপুত্রের পাড় ঘেঁষা একটি গ্রাম। গ্রামের স্বার্থান্বেষী বিত্তবান মহল এবং তাদের সমর্থনপুষ্ট এক শ্রেণীর বকধার্মিক মৌলানারা ধর্মের বিধি-নিষেধ ও প্রথা-কানুন নিজেদের সুবিধানুযায়ী ব্যাখ্যা ও ব্যবহার করে অজ্ঞ গ্রামবাসীকে পদদলিত রাখে তার বাস্তব চিত্র এই গল্পটি। সাকিল আলীর সুন্দরী স্ত্রী আম্বিয়া মারা গেলে তাকে সে গোরস্থানে দাফন করতে পারে না এবং ইমাম সাহেবও তার জানাজা পড়ে না। কেননা, হাজী সাহেব বা ইমাম সাহেবকে অর্থ দিয়ে খুশি করার সামর্থ্য তার নেই।

গ্রামের তিন-চারজনের একমাত্র আশ্রয় মাঠের ভিতর এক ঝুপড়ি যা কিনা ‘দু’ পেয়ে মানুষকে কেমন জানোয়ার দশায় রাখার ব্যবস্থা।” শীত নিবৃত্তির জন্য তারা একটা দিয়াশলাইয়ের কাঠির সন্ধান করে। কিন্তু মহাজনের কাছে চাইতে যাবার সাহস সঞ্চয় করতে পারে না। প্রচণ্ড ক্ষোভে সবদার আলী বলে, “কাওটা দেখো। ধান কেটে আনা, মাড়াই ঝাড়াই করা, মহাজনের গোলায় তুলে দিয়ে আসা, সবকিছুর মজুরী ষোলভাগের একভাগ। কিন্তু ঐ একভাগ দিতেই মহাজনের হাত উপুড় হয় না ।

…………. ইদিকে কপাল দেখো লোকটার। কাসেমানির বউকে নিয়ে শুয়ে থাকে রাতভর; এখন আবার রহিমুদ্দিনের বিধবা মেয়েটাকেও বিছানায় শোয়াবার তাল খুঁজছে।” তীব্র শীতের দাপটের সাথে শুরু হয় বৃষ্টি। সবদার ও মনোহরের মনুষ্যশক্তির সহাক্ষমতার সীমা অতিক্রম করে। প্রতিকূল আবহাওয়ার কারণে লম্পট মহাজন সালাম চৌধুরীকে ডাকতে বাধ্য হয়। কিন্তু মনুষ্যত্ববোধ রহিত চৌধুরী কৃষক দু’জনকে নির্দয়ভাবে মারধর করে ধান অরক্ষিত ফেলে রেখে আসার জন্য।

মহাজনের এই অমানবিক আচরণের প্রতিশোধ নেয় সবদার আলী। বাইরের দু’জন দরিদ্র কৃষক নামমাত্র মজুরীর বিনিময়ে শীত-বৃষ্টিতে ধুঁকে মহাজনের ধান পাহাড়া দিচ্ছে এবং ঘরের ভিতর মহাজন আদিম বাসনা চরিতার্থ করছে পরস্ত্রীর আসঙ্গ লাভ করে। শীত নিবারণের জন্য জ্বালানো আগুন দিয়ে সে মহাজন সমেত মহাজনের ঘরটিতে আগুন ধরিয়ে দেয়।

যে মহাজন ‘ক্ষেতের ধান বলো, ঘরের বউ বলো, আদরের মেয়ে বলো, সবকিছু গিলে খাবার জন্য মহাজন মুখ মেলে বসে আছে সর্বভূক শিখা তাকে গ্রাস করে নেয় এবং পূরণ হয় নির্যাতিত হতভাগ্য কৃষকের লেলিহান সাধ।
‘নয়নতারা কোথায় রে’ গল্পটি মহাজনরে রিরংসার চিত্র। নিষ্ঠুর মহাজনদের অনেকেরই যৌনকামনার বলি হয় অসহায় দরিদ্র কৃষককন্যা বা কৃষকবধূ।

মনোহর বর্মনের সুন্দরী কন্যা নয়নতারাকে ধরে নিয়ে যায় মহাজনের লোকেরা। যে মনোহর বর্মন গ্রামে অন্যায়ের প্রতিবাদে সর্বদা চোচ্চার কন্ঠ, তার কন্যার প্রতি এ অত্যাচারের সময় একজন লোকও ভয়ে এগিয়ে আসতে সাহজ করেনি। মনোহরের বুকফাটা হাহাকারে গ্রামবাসীর বিবেক জাগ্রত হয়ে ওঠে। তারা সমবেত হয়ে এই জঘন্য অত্যাচারের প্রতিবাদ করে।

‘ভবনদী’ গল্পটি মহাজনের শোষণের এক অভিনব প্রতিশোধের ভাষ্য। গল্পটিতে ছোট মহাজন হজ্ব করে ফিরে এসে সারাক্ষণ তসবী টেপে এবং সকলকে বলে জীবন ক্ষণস্থায়ী। তাই দুনিয়াদারী তাকে আর আকৃষ্ট করে না। তারই ভণ্ডামি গ্রামের সরল কৃষকেরা বুঝতে পারে না। ছোট মহাজনের দার্শনিক বাণী তাদের মনে কাজ করতে থাকে। কিন্তু ভাবালুতা ছাপিয়ে ওঠে ক্ষুধার ক্ষুরধার বাস্তবতা।

কৃষক নসরুদ্দিন ছোট মহাজনের কথায় দার্শনিক ভাবালুতায় একাকার হতে আসে নদীর তীরে। নদীর পাড়ে বসে দেখে বড় মহাজন স্ত্রী-সন্তানদের নিয়ে শহর থেকে ফিরছে সাচ্ছলতা- স্বাচ্ছন্দ্যে, হাসি-আনন্দে পরিপূর্ণ তার পরিবার। পাশাপাশি নসরুদ্দিনের নিজের সংসারের চিত্র চোখে ভেসে ওঠে রোগগ্রস্ত সন্তান, অনাহারে কঙ্কালসার স্ত্রী, অভাব-অনটন। এর মধ্যেই একটি দুর্ঘটনা ঘটে। বড় মহাজনের নৌকার দাঁড়টি ভেঙে দ্বিখণ্ডিত হয়।

নৌকাটি জোয়ার থেকে ডাটার দিকে ভেসে চলে যেতে থাকে। নসরুদ্দিনসহ আরো অনেকে সপরিবার মহাজনকে রক্ষা করার জন্য নৌকাটির কাছি নদীতীরে গুঁড়ি বাঁধতে থাকে। দড়িটি হঠাৎ নসরুদ্দিনের হাত ফসকে যায়, কিন্তু না, নসরুদ্দিনের ইচ্ছে হয় না, কাছিটি তুলে আনতে। গভীর বিষাদ একাকার হয়ে যায় তার বুকের ভেতরে।” বহুদিনের বুকে সঞ্চিত ক্ষোভ এক অচিৎকৃত প্রতিবাদে তলিয়ে দেয় বড় মহাজন ও তার পরিবারকে পানির অতলে।

‘শুন হে লখিন্দর’ গ্রন্থের ‘অচেনা’ গল্পটি একজন দরিদ্র কৃষকের চুরির মত নীচ প্রবৃত্তি গ্রহণের বাস্তব পরিস্থিতির চিত্র। কিসমত মিয়া মহাজনের জমিতে চাষ করে ফসল ফলায়, কিন্তু বিনিময়ে মহাজন যা দেয়। তাতে তার মা-হারা দুটি সন্তানকে পেট ভরে খেতে দিতে পারে না। তাই কিসমত এক সময় ভাবে মহাজনের বাড়িতে চুরি করবে। জমিতে চাষ করলাম আমি, ফসল ফলালাম আমি, সেই ফসল যদি আমি নিই তাহলে আমি চোর হব কেন?………. আর যে জমিতে ফসল ফলেছে, সেটাও কি মহাজনের ছিল পাঁচ সাত বছর আগে?”

মহাজনের গোলায় সে ধান চুরি করতে ঢোকে। ধানের বস্তায় ছিদ্র করে, ঝর্ণাধারার মত পড়তে থাকে ধান। কিসমতের বিবেকের টানাপোড়েন শুরু হয়। হঠাৎ শব্দে ঘুম ভেঙে যায় মহাজনের বাড়ির কাজের মেয়ে জয়গুনের, জয়গুন অনুমান করে বাড়িতে চোর ঢুকেছে। সে শুকুর মুহম্মদকে ডাকতে থাকে। এদিকে দিশেহারা হয়ে কিসমত পালাবার পথ খোঁজে এবং পালাতে গিয়ে পড়ে জয়গুন ও শুকুর মুহম্মদের সামনে। কিন্তু কেউ-ই কিসমত মিয়ার পথরোধ করে না। তাদের সামনে দিয়ে ধানের ভারী বস্তা নিয়ে পালিয়ে যায় সে।

 

১৯৭২-২০০০ কালসীমায় বাংলাদেশের আর্থ-সামাজিক-রাজনৈতিক পরিস্থিতি ও গ্রামবাংলা

 

মহাজন জেগে উঠে। বাইরে বেরিয়ে এসে শুকুর মুহম্মদ ও জয়গুনকে জিজ্ঞেস করে, চোর কে সেটা তার দেখতে পেয়েছে কিনা? চিনতে পেরেছে কিনা? কিসমত মিয়া তাদের দু’জনের চিরচেনা। জয়গুন ও শুকুর মুহম্মদ পরস্পর দৃষ্টি বিনিময় করে এবং উত্তর দেয়-চোর তাদের অচেনা। দরিদ্র অসহায় কিসমতের প্রতি জয়গুন ও – শুকুর মুহম্মদের সহমর্মিতা গল্পটিকে অসাধারনত্ব দিয়েছে।

‘অন্ধকার রাত’ গল্পটি গ্রামের জোতদার-মহাজনদের অবক্ষয়িত মানসিকতার চিত্র। তাদের অসুস্থ যৌন লালসার শিকার হয়ে অনেক সুখের সংসার ভেঙে যায়, অনেক অসহায় নারী যাপন করে অবর্ণনীয় দুঃখের কালরাত্রি।

‘শুন হে লবিন্দর’ মনসামঙ্গলের মিথের ছায়া অবলম্বনে এক প্রতিবাদমুখর জনভাষ্য। গল্পে লখিন্দর মহাজন আতঙ্কিত হয়ে পড়ে রাগী সান্ডাল যুবক গুপীনাথের প্রতিবাদের সামনে। গল্পটিতে গুপীনাথ সর্বকালের শোষিত মানুষের প্রতিনিধি যে তার ন্যায্য প্রাপ্যটা কড়া-গণ্ডায় বুঝে নিতে চায়- হিসাবটা যে বহুত দিনের লখিন্দর।

কতোদিন আর ঘুরে ঘুরে যামো হামরা। সান্ডালী পাহাড় হামার দাদা, পরদাদার বাস ছিল। কতোকালের পুরানা হিসাব, কম করে দেখ তুই কতো আকাল গেল, ব্যারাম গেল। বানবরিষ গেল কিন্তু হামারা খোরাকি পাই নাই। সদাগরের বেটা সেই হিসাবটা ইবার দিবি।”

‘পানকৌড়ির রক্ত (১৯৭৫), ‘সৌরভের কাছে পরাজিত (১৯৮৩), গন্ধবণিক (১৯৮৮) আল মাহমুদের গল্পগুচ্ছ।

আল-মাহমুদের “উত্তর পাহাড়ের ঝরনা’, ‘পশুর নদীর গাঙচিল’ ও ‘নফস’ গল্পে তিনটি মূলতঃ প্রেমের গল্প। তিনটি গল্পই গ্রাম-পটভূমিতে রচিত হলেও অন্তর্নিহিত বক্তব্য এবং পরিবেশ-পরিস্থিতি উপস্থাপনায় পৃথক ও স্বতন্ত্র। তবে গল্প তিনটির একটি সাধারণ সাদৃশ্য হল প্রতিটি গল্পেই নারীর অমিত শক্তি অথচ কল্যাণময়ী রূপটিকে চিত্রিত করা হয়েছে। উত্তর পাহাড়ের ঝরনা’ গল্পে এক উপজাতি নারীর প্রেম ও দৃঢ়তাকে গল্পের প্রতিপাদ্য করা হয়েছে।

উপজাতি নর-নারীকে নিয়ে এ ধরনের গল্প বাংলাদেশের সাহিত্যে বিরল; এদিক থেকেও গল্পটির বিশিষ্টতা রয়েছে। গল্পের নায়িকা মাইম্যা এক মারমা কন্যা। “মাইম্যার জীবনের একটা বাসনা ছিল সে ডন বসকো স্কুলের শিক্ষয়িত্রী হবে।” আদিবাসী অরণ্যচারীর জীবন ছেড়ে মাইম্যার পরিবার আধুনিক সামাজিক জীবনে প্রবেশ করেছিল। মাইম্যার বাবা বান্দরবানে কৃষি অফিসের পিয়নের চাকরি করত।

মাইম্যার মা ঘরে মাকু বসিয়ে তাঁত বুনত। দু’জনের আয়ে মাইম্যার পড়ালেখার খরচ চলে যেত। একদিন সে গ্র্যাজুয়েশন করতে সক্ষম হল। এরপর সে ডন বসকো স্কুলেও নিয়োগপ্রাপ্ত হল। তার স্বপ্নপূরণ হল। এ প্রসঙ্গ বর্ণনাকালে লেখক বাংলাদেশের উপজাতিদের কিছু সমস্যা তুলে ধরেছেন-“বান্দরবানে মারমা মেয়েরা সহজে এ ধরনের কাজ জোটাতে পারে না।

পাহাড়ী মেয়ে হোক আর ছেলেই হোক, লেখাপড়া শিখলেই তাদের নানা ঝামেলা পোহাতে হয়। নিজেদের পাহাড়ী সমাজে তারা আর নিজেদের খাপ খাওয়াতে পারে না। ম্যাট্রিক পাস করে কেউ কি আর দাওসে হাতে থুং নিয়ে পাহাড়ের টিলায় টিলায় ঘুরে বেড়াতে পারে? বাঙালি সহপাঠীরা মনে করে এই মগটা স্কুল ছেড়েই শান্তিবাহিনীতে যোগ দিতে পাহাড়ে পালিয়ে যাবে। তারা সবসময় সন্দেহের চোখে দেখে।

সরকার অবশ্য এখন উপজাতিদের মানসিক অবস্থা খানিকটা উপলব্ধি করতে পেরেছেন। মারমারা যে এখানে অসহনীয় দারিদ্র্যের হাত থেকে মুক্তির জন্যই মাঝেমধ্যে অতিষ্ঠ হয়ে ওঠে তা বুঝতে পেরে সরকার চাকরি-বাকরির ব্যাপারে মারমা ছেলে-মেয়েদের সুযোগসুবিধা দিতে চান। কিন্তু সরকার চাইলেই তো হবে না। মারমা ছেলেমেয়েরা যে লেখাপড়া শিখতে চায় না।

বান্দরবান প্রাইমারি স্কুলের খাঁচার চেয়ে মারমা-শিশুরা চিম্বুক পাহাড়ের গভীর অরণ্যে বিচিত্র ফুলের নাম, কোন পাহাড়ের কোন কন্দ আলু, ফলমূল কখন জন্মায় তা জানতেই বেশী ব্যাকুল।” মাইম্যার বিয়ে হওয়ার কথা ছিল তাদের পারিবারিক বন্ধু মং প্রু-এর পুরা মং সু-এর সাথে। মং প্রু ছিল রাঙামাটি কৃষি অফিসের ড্রাইভার। এক সড়ক দুর্ঘটনায় সে মারা যায় এবং তার পুত্র মং সু-এর দায়িত্ব নেয় মাইম্যার পরিবার।

মং সু-এর মা এক অরণ্যচারী জুম চাষী মগের সাথে নতুন সংসার পাতে। ম্যাট্রিক পাশ করে মং সু তার মায়ের সাথে দেখা করতে গিয়ে আর ফেরে না। মাইম্যা ও তার পরিবার তার বহু খোঁজখবর করে জানতে পারে যে মং সু ভিক্ষুজীবন গ্রহণ করেছে এবং চিম্বুক পাহাড়ের টিলায় নিজের তৈরি একটি ‘ক্যাংয়ে বাস করে। মাইম্যা মং সুকে ভুলতে পারেনি। সে এখনও মং সুকে ভালবাসে।

তাই স্কুলে শিক্ষয়িত্রীর জীবন শুরু করার আগে সে একবার মং সু-এর মুখোমুখি হতে চায়। মং প্রু-এর অন্তিম নির্দেশ ছিল তার পুত্র একজন শিক্ষিত জুমচাষী হবে। মং সু মাইম্যাকে ভালবাসত এবং বিয়ের প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল। সমস্ত প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ করে সে এখন জীবন থেকে পলাতক।

জীবনবাদী ও দৃঢ় প্রতিজ্ঞ মাইম্যা তাই মুখোমুখি হয় তার। মাইম্যার অতুলনীয় সৌন্দর্য ও সংহত ঋজু ব্যক্তিদের আকর্ষণে পরাজিত হয় মং সু । সন্ন্যাস ধর্ম ত্যাগ করে মাইম্যাকে আলিঙ্গনে আহ্বান করে। গল্পটিতে মাইম্যা চরিত্র অঙ্কনে লেখকের গভীর দরদ ও যত্ন উপলব্ধি করা যায়। প্রায় আদিম পরিবেশেই এখনও বসবাসরত যে জনগোষ্ঠী, তাদের মধ্যথেকেই এমন একটি মুক্ত ও আত্মপ্রত্যয়ী নারী চরিত্র লেখকের সৃষ্টি-নৈপূণ্যে সামঞ্জস্যপূর্ণ মনে হয়েছে। গল্পটিতে কাহিনীর ফাঁকে ফাঁকে মারমা জনগোষ্ঠীর অভ্যন্তরীণ সংস্কৃতি ও তাদের সমাজের নানান সমস্যা ফুটে উঠেছে।

এক কিশোরীর দুর্বার জীবনসংগ্রাম ও সাহসিকতার গল্প ‘পর নদীর গাঙচিল’। সময় ও শোষণের করাল আঘাতে সুন্দরবন অঞ্চলের মানুষের বনকেন্দ্রিক জীবিকা পরিবর্তন ও বিচিত্রতর জীবিকার সন্ধান গল্পে পাওয়া যায়। মংলা বন্দরের অদূরে কাইমারী গাঁ ও পশুর নদী গল্পের পটভূমি। “কাইনমারী গাঁ থেকে বাঘের ডাক আজকাল আর শোনা যায় না। বিশ-পঁচিশ বছর আগে বাতাস উল্টো থাকলে বসতির মানুষ বাঘের ডাক শুনতে পেত।

আজকাল বাঘ কমে গেছে বলেই হয়তো সুন্দবনের পশু-পাখিদের আওয়াজ পশুর নদীর এপার এসে পৌছায় না। আগে কাইনমারীর সব মানুষই তাকিয়ে থাকত বাদাবনের দিকে। বাঘ, ভালুক, সাপ-খোপ ছিল কাইনমারীর মানুষের নিত্যসঙ্গী। বনই ছিল জীবন। জীবিকার উপায় ছিল সুন্দরবনের মাছ, মাংস, মধু, ফল- পাকুড় ও কাষ্ঠ, অফুরন্ত লাকড়ি আর শুকনো গোলপাতা।

আজকাল বনের সে গৌরব নেই। সরকার যেদিন বন পাহারার পোস্ট বসিয়েছে সেদিন থেকেই সুন্দরবন লোপাট শুরু ।………. . বন উজাড় হয়ে যাচ্ছে। অসময়ে ডাককারীরা তরুণ গাছপালাকে বৈধ কুড়ালের ঘায়ে মাটিতে নামিয়ে দিচ্ছে। দোষ শুধু বেআইনি প্রবেশকারীদের। যারা বংশানুক্রমে বনের ওপর নির্ভর করে বেঁচে আছে। বন আবাদ করে বসত গড়ে তুলেছে। একটু গন্ধ পেলেই এদের ঘর-গোষ্ঠী ধরে আনে করমজল চেকপোস্টে। তারপর চালান কর সদরে। জেল, জুলুম মারপিট।” তাই গাঁয়ের মানুষেরা পরিস্থিতির চাপে জীবিকার নতুন পন্থাও খুঁজে নিয়েছে।

পশুর নদীর উপর অপেক্ষমান বিদেশী জাহাজগুলোতে তারা টালাই-নৌকাতে বোঝাই করে জাহাজের নাবিক ও কর্মচারীদের জন্য রসদ যোগান দেয়। এর বিনিময়ে জাহাজীদের কাছ থেকে অর্থ বা দামী জিনিস পায়। কাইমারী গ্রামের আমজাদ আলীর কন্যা কর্পূরী চৌদ্দ বছরের কিশোরী। সে টালাই-নৌকাতে করে ছাগল নিয়ে যায়। তার সঙ্গী একই গ্রামের কিশোর রতন। দু’জন মিলে খরস্রোতা পশুর নদীতে নৌকা বেয়ে চলে। কিন্তু একদিন একটি অন্যরকম ঘটনা ঘটল।

একটি লাল নিশানওয়ালা জাহাজের এক জাহাজী নৌকা থেকে ছাগলে দড়ি বেঁধে জাহাজে উঠিয়ে নিল। কিন্তু পরিবর্তে কাপুরীর প্রাপ্য তাকে দিল না। “কর্পূরী বুঝল না কেন ছাগলগুলো রেখে শূন্য দড়িটাকে পানিতে নামিয়ে দিয়েছে এরা? এ সব ব্যাপারে জাহাজের মানুষগুলো খুব ঈমানদার হয়। কেউ ফাঁকি দেয় না কপূরীদের মতো ছোট লেনদেনকারীদের, দিলে নদীতে এই ব্যবসা চলত না।

নৌ-পুলিশদের মার খেয়ে, ফাটকে আটক থেকে মান-ইজ্জত খুইয়ে গাঙচিলের মতো উড়ত না নদীতে। পশুর নদী মানে এই কর্পূরীদের দুঃখ ও দুঃসাহসের কাহিনী।” জাহাজের নাবিকেরা কখনই ঠকায়নি এই টালাই নৌকার মালিকদের। কিন্তু লাল নিশানওয়ালা জাহাজের এই লোকটির প্রতরণা কর্পূরীকে একরোখা করে তুলল। সে জাহাজের ভিতরে প্রবেশ করে প্রাপ্য আদায় করে নেয়ার সিদ্ধান্ত নিল।

দড়ি বেয়ে সে উঠতে লাগল জাহাজে। কিশোরীর কোমল পেলবতা ছাপিয়ে ফুটে উঠল এক আত্মপ্রত্যয়ী নারী- যে তার নিজের ন্যায্য অধিকারটি বুঝে নিতে চায়। খরস্রোত পশুর নদীর উপরে বাতাসের ধাক্কায় কপূরীর শাড়ি উড়তে লাগল। সে শাড়িটি খুলে নদীর উপর ছুঁড়ে ফেলে দিল। অবশেষে সে জাহাজের ভিতরের ঢুকল এবং কিছু দামী জিনিস নিয়ে নৌকাতে নেমে এল।

 

১৯৭২-২০০০ পর্বের ছোটগল্পসমূহে গ্রাম-বাংলার আর্থ-সামাজিক ও সাংস্কৃতিক চিত্র পর্ব ১

 

এরপর ধরা পড়ে যাওয়ার আগেই রতন এবং কপূরী পালিয়ে যেতে চাইল বাদাবনের নিরাপদ আশ্রয়ে। সেখানে বাঘের ভয়ে কেউ ঢোকে না। তাই নৌ-পুলিশের ভয়ে প্রায়ই তারা সেখানে আশ্রয় নেয়। বিপদসঙ্কুল উত্তেজনার মধ্যে কপূরী স্বতঃস্ফূর্ত জোরালো কন্ঠে রতনের কাছে প্রকাশ করে তার আবেগ- “তোকে আমি রোজ নিয়ে আসব রতন। তোকে আমার ভালো লাগে।”

পশুর নদীর গাঙচিল’ গল্পে আল মাহমুদ নারীর শক্তিময়ী রূপটিকে এক ব্যতিক্রমী শিল্পশৈলীতে ভাষ্য করে তুলেছেন। গল্পটি সেই কিশোরীর যে পরিবারের জীবিকা নির্বাহের জন্য অপরিণত বয়সেই বেছে নেয় এক বিপজ্জনক ও দুঃসাহসী পেশা, নিজ পরিশ্রমের প্রাপ্য আদায়ে যে দৃঢ় এবং নিজ আবেগের সত্য প্রকাশে অকুণ্ঠিত ।

‘নফস’ গল্পটিতে লেখক একটি অলৌকিক ও আধিভৌতিক পরিবেশ সৃষ্টি করেছেন। নর-নারীর প্রণয়ের অন্ত রালে বিশ্বাস ও ভরসাই সম্পর্ককে টিকিয়ে রাখে। কামনার সর্পিল বাঁধন পেরিয়ে স্নেহ ও মমত্ববোধ একটি পরিবার গঠন করে। ‘নফস’ গল্পে আলী মিয়া ও জোবেদা নিঃসন্তান দম্পত্তি। ফকির-মস্তানের উপর তাদের অগাধ বিশ্বাস। একদিন তাদের কোল জুড়ে সন্তান আসে।

তাদের দৃঢ় বিশ্বাস এযাবৎ শাহ মাস্তানের কৃপায় তাদের এই সন্তান লাভ। সময়ান্তরে তাদের সন্তান গুলবদন যুবতী হয়। সে রূপসী এবং ধর্মপ্রাণ। বয়সোচিত চপলতার পরিবর্তে তার মধ্যে ধীর-স্থির ও ভাব-গম্ভীরতা লক্ষ্য করা যায়। অত্যন্ত যত্ন ও মনোযোগ দিয়ে সে এবাদত করে। তার পিতা আলী মিয়া সন্তান লাভের কৃতজ্ঞতাবশতঃ বাড়ির ভিটা সংলগ্ন জমিতে এযাবৎ শাহ মাস্তানের মাজার স্থাপন করেন।

প্রতি বছর তার মৃত্যুদিবসে সেখানে ওরস হয়। দূর-দূরান্ত অঞ্চলের ফকির- বাউলের সমাবেশ হয় সেখানে। একদিন এক তরুণ ফকির আসল এযাবৎ শাহের মাজারে। অতি অল্পবয়সে সংসার বিচ্যুত সন্ন্যাসজীবন গ্রহণকারী এই সুদর্শন তরুণ ফকিরটির প্রতি জোবেদা অপত্যস্নেহ অনুভব করল এবং একবেলার অতিথি হবার নিমন্ত্রণ জানালো। তরুণ ফকির আদম আলী জোবেদার ষোড়শী কন্য গুলবানুর রূপ দেখে মুগ্ধ হল এবং তার প্রণয়াকাঙ্ক্ষী হয়ে উঠল।

গুলবদনেরও এই সুদর্শন তরুণ দরবেশকে ভাল লাগল। কিন্তু নিছক কামতাড়িত প্রেম নয়, গুলবদনের বিশ্বাস একটি আস্থাপূর্ণ সম্পর্কের উপর- “নিজের নফসের শিকলে বান্ধা এই মানুষডারে আমার পইলা নজরেই ভালা লাগছিল। কিন্তু মানুষটা আমারে চায় আমার বদন আর আমার রূপ দেইখা।

ইনসানের মাইয়াদের রূপের কেরামতি থাকে মাত্র দশ বছর। কিন্তুক মাইনষের হায়াৎ লম্বা। এই লম্বা হায়াৎ পাড়ি দিবার আয়োজন না থাকলে এই মানুষটা আমারে পথে ফালাইয়া চইলা যাইতে পারে। এই কথা বুঝাইবার জন্য আমি তার নফসের দড়িতেই তারে বন্দন লাগাইছি।

দেখুক তার ভিতরে সে নিজে বিরাজ করে না, করে একটা নফসের কালসর্প দোতারা আর এই দড়াদড়ি কালাইয়া যদি মানুষটা আবার আইসে, আমি থাকুম ওর জন্য।” গল্পের শেষে দেখা যায়, আদম আলী সংসারধর্ম পালনের জন্য সে গুলবদনের পানিপ্রার্থী হয়ে পুনরায় গুলবদনের কাছে ফিরে এসেছে।

‘নফস’ গল্পে ফকির-বাউল-দরবেশের অন্তর্বর্তী চিত্রের একটি বিস্তৃত বর্ণনা পাওয়া যায়। তারা সংসার-বিরাগী । সমাজে থেকেও তারা সমাজজীবনকে তার নিয়ম-কানুনকে উপেক্ষা করে। তাদের যেমন নেই কোন নির্দিষ্ট বাড়ি-ঘর, তেমন নেই কোন নির্দিষ্ট জীবনসঙ্গী বা সঙ্গিনী। স্থান বদলের মতই তাদের হয় সঙ্গী বদল। ধর্মীয় প্রথাবদ্ধতার বাইরে তারা নিজস্ব পদ্ধতিতে ঈশ্বরের আরাধনা করে।

গান আর গাঁজার নেশা যেন তাদের জীবনের সাথে ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে থাকে। মাজার বা কবর যে মানুষকে কিছু দেয় না তা এইসব বেশরা ফকির-দরবেশ বাউলদের চেয়ে আর কেউ বেশি জানে না। তবুও তারা মাজারে মাজারে ঘুরে বেড়ায় কিছু একটা পাওয়ার আশায়।”

‘মীর বাড়ির কুরসিনামা’ গল্পে গ্রামীণ বনেদী ও সচ্ছল গৃহস্থ পরিবারের জীবনচিত্র। গ্রামের অনেক ধনী চাষী পরিবারেরই আছে গৌরবময় ইতিহাস ও ঐতিহ্য। গল্পে ময়মনসিংহ জেলার দক্ষিণ প্রান্তের একটি গ্রামের এক মীর পরিবারের অতীত ও বর্তমান জীবন চিত্র অঙ্কিত হয়েছে।

এই মীর পরিবার প্রকৃতপক্ষে ভাটি অঞ্চলের প্রাচীন লস্করদের বংশধর। তাদের পূর্ব ঐতিহ্য লোপ পেয়েছে, কিন্তু জনগণের মনে তাদের প্রতি শ্রদ্ধা এবং ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠানে তাদের প্রতিপত্তি এখনও অক্ষুণ্ণ আছে। মীর বংশ এখন বহু শরীরে বিভক্ত। গল্পে খন্ড খন্ড চিত্রের মধ্যদিয়ে মীর পরিবারের সদস্যদের বর্ণনা পাওয়া যায় এবং এর মধ্যদিয়ে সময় পরিবর্তন ও জীবনের বৈচিত্র্যের সন্ধান পাওয়া যায়।

শরাফত মীর, নূরবানু, আশরাফ মীর, মুর্শিদা, আলিমা, শরিফা প্রভৃতি চরিত্রের মধ্যদিয়ে গ্রামের গৃহস্থালী ও আচারপ্রথা ধরা পড়েছে। শরিফা চরিত্রের মধ্যদিয়ে লেখক পুরনো বনেদি আবরণ ছাড়িয়ে আধুনিক জীবনের সূর্য রশ্মি প্রবেশের আভাস দিয়েছেন- “যে শরিফাকে আট বছরের নিয়ে আলিমা এসেছিল, এখন সে পূর্ণ যুবতী। ম্যাট্রিক পাস করে সবেমাত্র কলেজে ভর্তি হয়েছে।

তার শাড়িটারি পরনের ধরনধারণ এ বাড়ির অন্য যুবতী মেয়েদের থেকে একটু আলাদা । ………. সে যখন প্রথম কলেজে ভর্তি হতে যায় তখন বৌ-ঝিদের মধ্যে একটু গুঞ্জন উঠেছিল। কিন্তু শরাফত মীর সবাইকে থামিয়ে দিয়ে বলেছিল, ‘অত কথা কইও নাতো তোমরা।

আর সব বাড়ির পড়-য়ারা যে বাইরে স্কুল-কলেজে যায় আমার ভাগ্নীও তেমনভাবেই পড়তে যাইব ।…….. সেই থেকে শরিফা এ বাড়িতে একঝলক মুক্ত বাতাসের মতো। এর মধ্যেই শরিফার পোশাক-আশাক, চলাফেরার ঢেউ লেগেছে মীরবাড়িতে। বাড়ির অল্পবয়স্ক বৌ-ঝিরা গোপনে শরিফার কাছে ব্লাউজের কাপড় এনে দেয় তার মতো ছাঁটের ব্লাউজ বানিয়ে দেয়ার জন্য। মুখে অবশ্য বলে, আমাদের শরিফাটা লেখাপড়া শিখ্যা শরমের মাথা খাইছে ।”

রিপুতাড়িত গ্রামীণ জোতদার ও এক ভূমিহীন চাষীর স্বপ্ন-বিচূর্ণতার কাহিনী ‘নীল নাকফুল’। ওসমান এক ভূমিহীন চাষী। ভিনগাঁয়ে মুনীষের কাজ করতে গিয়ে বানেছার সাথে তার পরিচয় হয়। বানেছা অত্যন্ত রূপসী। তারা পরস্পরের প্রতি আকৃষ্ট হয়। নিজ গাঁয়ে ফেরার সময় ওসমান বানেছার কাছে প্রতিশ্রুত হয়ে আসে পরবর্তী ফসল কাটার মৌসুমে সে একটা নাকফুল নিয়ে আসবে এবং বানেছাকে তার ঘরনী করে নিয়ে যাবে।

পরের বছর একটি নীল পাথরের নাকফুল নিয়ে সে ফসল কাটতে আসে। কিন্তু বানেছার সন্ধান পায় না। ঘটনাক্রমে সে জোতদার হাশেমের অন্দরমহলে প্রবেশের অনুমতি পায়। হাশেম তার দ্বিতীয় স্ত্রীর সাথে ওসমানের পরিচয় করিয়ে দেয় এবং বলে “তুমি চিনলা না আমার বানেছা বিবিরে? গত বছর তো দেখছি মলন দিবার সময় ধান লইয়া কত হাসিঠাট্টা করছ। অহন আবার শরম কি, অহন তো তোমার চাচী লাগে, সেলাম কর।”

কিংকর্তব্যবিমূঢ় ওসমান নাকফুলটি হাশেমের হাতেই সমর্পন করে। গল্পটিতে গ্রামীন আচার-নিষ্ঠাসমূহ এবং ডাটি অঞ্চলের ভূমিহীন চাষীদের জীবনযাত্রার একটি স্পষ্ট চিত্র পাওয়া যায়। আধুনিক যুগেও বহুবিবাহের অভিশাপ থেকে গ্রামবাংলা মুক্ত হতে পারেনি। অতি সামান্য অজুহাতেই যে বিত্তবানেরা একাধিক বিয়ে করে তার একটি পরিচয় পাওয়া যায় উদ্ধৃত সংলাপে- “কি করুম কও? এত বড় জোত। মাইলের পর মাইল আমার জমি। হাল-বলদে একাকার সংসার।

 

১৯৭২-২০০০ পর্বের ছোটগল্পসমূহে গ্রাম-বাংলার আর্থ-সামাজিক ও সাংস্কৃতিক চিত্র পর্ব ১

 

ধান উঠলে মাঠের মতো বড় উঠানে পাহাড় জইম্যা যায়। দেখবার মানুষ থাকলেও রাখবার ঠামাইবার আপন মানুষ নাই। তোমার চাচীর অনেক বয়স অইছে। এখন আর ধান পান দেইখা সামাল দিতে পারে না। পোলাপান তো বউ-ঝি লাইয়া ঢাকায় থাকে, গেরামে আইবার চায় না।

সারা বছরের খোরাকি নাও ভইরা ঢাকা পাঠাইতে হয়। ” আমি কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে জিজ্ঞেস করলাম, “কই সম্বন্ধ করলেন চাচা?’ ‘এইডা আর জিগাইও না বেটা, এইডা আরও শরমের কথা, কোনো খান্দানওয়ালা বাড়িতে না। আমার গাঁওয়েরই মাইয়া, আমার বাড়িতে ধানপানের কাজ করত। রূপ দেইখা বাবা ভালো লাগল, মনে ধরণ, কইরা ফালাইছি।….”

আল মাহমুদের গল্পে বিষয়ে ও চরিত্র ঘটনার পটভূমিতে বৈচিত্র্যের সন্ধান পাওয়া যায়। তার কবিসূলভ বৈশিষ্ট্য গদ্যেও স্পষ্ট অনুভূত হয়। “আল মাহমুদের গল্পের বৈশিষ্ট্যের মধ্যে ‘গীতিময় গদ্যালেখ্য’ উল্লেখযোগ্য বৈশিষ্ট্য। তাঁর গল্পে বার বার ফিরে এসেছে নারী, প্রকৃতি ও গার্হস্থ্যজীবন।”

হাসান আজিজুল হক রচিত আলোচিত কালপর্বে প্রকাশিত গল্পসমূহ: ‘জীবন ঘষে আগুন’ (১৯৭৩), ‘নামহীন গোত্রহীন’ (১৯৭৫), ‘নির্বাচিত গল্প’ (১৯৭৫), ‘পাতালে হাসপাতালে’ (১৯৮১), ‘আমরা অপেক্ষা করছি’ (১৯৮৮), ‘রাঢ় বঙ্গের গল্প’ (১৯৯২), ‘হাসান আজিজুল হকের শ্রেষ্ঠ গল্প (১৯৯৫), ‘রোদে যাব’ (১৯৯৫), ‘মা-মেয়ের সংসার’ (১৯৯৭) “বাংলাদেশের স্বাধীনতা যা একাত্তরে অর্জিত হয়েছিল তার বৈজয়িক উল্লাসে সাম্যবাদের উচও ঢক্কা-নিনাদ শ্রাবিত হলেও সেখানেও ছিলো শোষণের দুর্নীতি আয়োজন। সুতরাং দেশীয় রাজনীতিতে পরিবর্তন যতই ঘটুক তার মৌল চরিত্র অপরিবর্তিতই রয়ে গেছে। হাসান তাঁর গল্পে শোষণের এই মূলশিকড় ধরে টান দিয়েছেন। ৪

হাসান আজিজুল হকের “জীবন ঘষে আগুন’ গ্রন্থে ‘শোষিত সেতু’ গল্পটিতে গল্পকার প্রেরণা ও উদ্দীপনাকে জীবনীশক্তির মূল উৎসকে চিহ্নিত করেছেন; একই সাথে জনগণের সম্মিলিত শক্তির জয়গান গেয়েছেন। গল্পটি রূপক-আশ্রয়ে প্রকাশিত। গল্পে তিনটি সংঘর্ষ একটি শীর্ষবিন্দুতে মিলিত হয়েছে। অবলাকান্ত নামের ভিন্নগ্রামের একটি ষাঁড় হঠাৎ মানিক নামের ষাঁড়টির গ্রামে এসে উপস্থিত হয়।

অবলাকান্তকে দেখেই মনে হয় বদমেজাজী আর কুচুটে স্বভাবের।” অন্যদিকে মানিক এ গাঁয়ের সাদা ঘাড়টা নাকি ভারি লক্ষ্মী। ষাঁড় হলেও। ষাঁড় দুটির মধ্যে বেঁধে যায় তুমুল লড়াই। ষাঁড়ের লড়াই গ্রামে প্রবল উত্তেজনা সৃষ্টি করে। অপরদিকে, গ্রামে শহর থেকে এক ব্যবসায়ী আসে যে নানান কৌশলে কৃষদের ধান কিনে নিতে চায়। কিন্তু কৃষকেরা তাদের বছরের খোরাক বিক্রি করতে রাজী নয়। গ্রামের চাষীরা ঐক্যবদ্ধ হয় প্রতিপক্ষের সঙ্গে অনিবার্য সংঘর্ষের মুখোমুখি দাঁড়াবার জন্য। তৃতীয় সংঘর্ষ হাঁপানীর রোগী নিশানাথের জীবনীশক্তির সাথে মৃত্যুর। নিশানাথ মৃত্যুশয্যায়।

কষ্ট কিছু উপশমের জন্য তার বউ তাকে তেল মালিশ করে দিচ্ছে। বাইরে তখন ষাঁড়ের লড়াইকে কেন্দ্র করে গ্রামের মানুষদের মধ্যে উত্তেজনা বিরাজ করছে। গ্রামবাসীর বিষয়টি নিয়ে আলোচনা করছে। ষাঁড়ের লড়াই নিয়ে গ্রামবাসীর আলোচনা নিশানাথ ও তার স্ত্রীর কানেও পৌঁছে যায়- “নিশানাথের বউ মালিশ করা ভুলে হাঁ করে এইসব কথা শুনছিল ( ষাঁড়ের লড়াইয়েক কথা- আ.জা.)। আর আশ্চর্যের ব্যাপার কিভাবে একটা পুরো গ্রাম জেগে যেতে পারে।

খুবই ধীরে ধীর-প্রায় অলক্ষ্যে এমনকি পরস্পরের সঙ্গে কথাবার্তার আদান-প্রদানটা পর্যন্ত সীমিত করে দিয়ে সমস্বার্থের মানুষ কাঁধে কাঁধ দিয়ে কাজ চালিয়ে যেতে পারে। অথচ কাজটা যে অত্যন্ত জটিল তা প্রত্যেককেই স্বীকার করতে হবে। বিপজ্জনক যে সেটা তো প্রশ্নের বাইরে।…………. মোটকথা যে সময়ে গাঁয়ের মানুষে খেয়েদেয়ে কুপি নিভিয়ে দিয়ে নিঃসাড়ে ঘুমিয়ে যায়- নির্বিবাদে মড়ার মতো পড়ে থাকে- এমনকি মহাবিপদেও যাদের জাগিয়ে তোলা কঠিন- ঠিক সেই সময়েই সমস্ত গ্রামটি উত্তেজনার অগ্নিকুণ্ডে রূপান্তরিত হয়ে গেছে।”

এখানে লেখক দীর্ঘকাল ধরে শোষিত-নিপীড়িত প্রতিবাদহীন মানুষকে নিজের অধিকার সচেতনতার ইঙ্গিত দিয়েছেন। নিশানাথের প্রাণশক্তি ও কৃষক সমাজের মিলিতশক্তির অনুপ্রেরণা যুগিয়েছে যে লড়াই সেখানে জয় হয়েছে দেশী ষাঁড় মানিকেরই। বস্তুতঃ গাঁয়ের শক্তির লড়াইয়ের প্রতীকায়িত হয়েছে অপশক্তি ও শুভশক্তির লড়াই। গল্পে ষাঁড়ের লড়াইকে কেন্দ্র করে গ্রামবাসীর উচ্ছ্বাস ও উত্তেজনার বর্ণনাটি বাস্তবানুগ ও শিল্পসফল।

হাসান আজিজুল হকের ‘পাতালে হাসপাতালে’ গল্পটি মুলতঃ দেশের মফঃস্বল শহরগুলির সরকারি হাসপাতালের দুরবস্থা- ডাক্তার নেই, ওষুধ নেই, চিকিৎসা ও অস্ত্রোপচারের প্রয়োজনীয় সামগ্রীর অভাব, প্রশাসনিক অব্যবস্থা ইত্যাদি অনিয়ম তুলে ধরেছেন; এই সূত্রেই এসেছে গ্রামের নিরক্ষর দরিদ্র মানুষের চিকিৎসার সুযোগের অব্যবস্থা ও অভাব। সাধারণত খুব সঙ্কটাপন্ন অবস্থা না হলে তারা চিকিসা নেয় না।

নিজেদের টোটকা চিকিৎসাতেই কাজ চালিয়ে নিতে হয়। কখনও যদি কোন নিরুপায় সঙ্কটাপন্ন রোগী নিকটস্থ মফঃস্বলের সরকারী হাসপাতালে যায়, সেখানে যেন তারা কেবল বিনা চিকিৎসায় ধুঁকে মরতেই যায়। গড়ে গরীব চাষী জমিরুদ্দির পায়ে বাবলার কাঁটা ফোটে। কাঁটা বের করতে সে প্রথমে গ্রামের নাপিতের শরণাপন্ন হয়। নাপিত কাঁটা বের করে দেবার পর থেকে তার পা ফুলে ওঠে এবং অসহনীয় ব্যথা হয়।

আসলে তার পায়ে গ্যাংগ্রিন হয়েছে। গ্রামের সুহৃদয়জন তাকে হাসপাতালে নিয়ে আসে, কিন্তু সুচিকিৎসা দেবার ক্ষমতা মফঃস্বলের সেই সরকারী হাসপাতালে নেই। গল্পটিতে গ্রামের অশিক্ষিত মানুষের অজ্ঞতা তাদেরকে কিভাবে মৃত্যুর দিকে ঠেলে দেয় তার পরিচয় পাওয়া যায় জমিরুদ্দির নাপিতের কাছ থেকে পায়ের কাঁটা বের করতে যাওয়ার ঘটনার মধ্যদিয়ে।

‘সমুখে শান্তি পারাবার’ গল্পে গ্রামের শোষণ, অবক্ষয় ও দারিদ্রের ভয়াবহ চিত্র। একটানা বর্ষণে গ্রামের দিন মজুরেরা হয়ে পড়ে কর্মহীন। গল্পটির প্রকাশশৈীল ভিন্ন ধাঁচের। গল্পে কোন চরিত্রের নামোল্লেখ নেই। পিতা ও পুত্রের সংলাপেই গল্পটি আবর্তিত, মাঝে মাঝে গল্পকারের বর্ণনা। বর্ণনা নৈর্ব্যক্তিক। একটানা বর্ষণের ফলে পরিবারের একমাত্র আয়ক্ষম ব্যক্তি পুত্র কাজে যেতে পারে না, তাই পরিবারের সকলকে নিয়ে তিনদিন অনাহারে কাটাতে হয়।

দূরের হাট থেকে অপেক্ষাকৃত কম দামে ধান কিনে বাড়িতে চাল তৈরি করে পাশের হাটে বেঁচে যে সংসার চালাত। সরকারী খালকাটা কর্মসূচিতে হয়ত অল্পকিছু গম পাওরা যেত, তাও বৃষ্টির জন্য বন্ধ । সম্বল বলতে ভিটেটুকু ছাড়া আর মাত্র এক বিঘে জমি । অসহনীয় ক্ষুধার তাড়নায় তা-ই মাত্র এক হাজার টাকায় বিক্রি করল তারা; কিন্তু রাতের অন্ধকারে জমির ক্রেতা মহাজন অস্ত্রের মুখে টাকা লুটে নিতে আসে। এর সাথে লুটে নিল পরিবারের নারীদের সম্ভ্রমটুকু। গ্রামের জোতদার-মাতব্বরদের অমানুষিক শোষণের এক অভিনব ভাষ্য গল্পটি।

সরকার থেকে খাস জমি বণ্টন করা হয়। কিন্তু সে জমি কখনই প্রকৃত ভূমিহীন কৃষকদের হাতে পৌঁছে না। জমি আত্মসাৎ করে নেয় জোতদার। মাটি-পাষাণ বৃত্তান্ত’ গল্পে ভূমিহীন চাষী একামতউল্লাহর নামে এক একর সরকারী খাস জমি বণ্টন হয়। কিন্তু একামতউল্লাহ তার খবর জানে না। জোতদারের জমিতে একামতউল্লাহ বংশপরম্পরায় পেটে-ভাতে খাটে। এই জোতদারই একামতউল্লাহর অজ্ঞাতে জমিটি আত্মসাৎ করে নেয়।

 

১৯৭২-২০০০ পর্বের ছোটগল্পসমূহে গ্রাম-বাংলার আর্থ-সামাজিক ও সাংস্কৃতিক চিত্র পর্ব ১

 

নিরক্ষর চাষী জানে না, সে নিজের জমিতেই খেটে ফসল ফলায় এবং তা তুলে দেয় জোতদারের হাতে। এদিকে তার স্ত্রী-পুত্র প্রায় সারাবছরই অভুক্ত থাকে। তারা বাস করে মাটির ঝুরঝুরে ভাঙা বাড়িতে। ঘটনাক্রমে একামতউল্লাহ প্রকৃত বিষয়টি জানতে পারে এবং জোতদারের কাছ থেকে নিজের মালিকানাটুকু বুঝে নিতে চায়। কিন্তু জোতদার তা অস্বীকার করে। তবে গল্পটি যুগ-যুগ ধরে শোষণ-অবিচার মেনে নেয়ার গল্প নয়। এক সময় চাষীরা রুখে দাঁড়াল।

তাদের প্রাপ্য হরণ করে জোতদার সম্পদের যে পাহাড় গড়ে তুলেছিল তার পতন ঘটল- একামত, তকিবুল, নছর, ফিরু এই রকম নিরীহ নির্বিকার গাঁয়ের মানুষদের, যারা কোন কথা বলেনি, এতটুকু জুলুম করেনি, শুধু নিঃশব্দে দাঁড়িয়ে থেকেছে শেষ রাতের চাঁদের আলোয়। তখন রক্ত হিম করা পৈশাচিক একটি চিৎকার করে উপুর হয়ে পঞ্চাশ একর জমি ঢেকে যে পড়েছিল তাকে জোতদার বলে নিঃসন্দেহে চেনা গেলেও পরে দেখা যায় তা আসলেই বিশাল ন্যাড়া পাথর ছাড়া আর কিছুই নয়।”

বাস্তবিক, অর্থপিশাচ জোতদারেরা মানবিক গুণ হারিয়ে নিরেট পাথর হয়ে যায়। ঘুমন্ত শোষিত জনগণ একদিন জেগে উঠবে এবং ঐক্যবদ্ধ হয়ে পতন ঘটাবে শোষকের এই আকাঙ্ক্ষার স্বপ্নবৃত্ত তৈরি হয়েছে হাসান আজিজুল হকের ‘পাথর-মাটি বৃত্তান্তে। গল্পটিতে লেখক রূপক প্রতীকের সফল ব্যবহার ঘটিয়েছেন। গল্পটি রংপুর অঞ্চলের গ্রামীণ পটভূমিতে রচিত এবং চরিত্রগুলির সংলাপে লেখক আঞ্চলিক ভাষার সফল ব্যবহার করেছেন।

ধর্মের দোহাই দিয়ে যেখানে অবিচার-অত্যাচার হয়। সেখানে ধর্মের বাণী নীরবে-নিভৃতে কাঁদে। হাসান আন্নিছুল হকের “বিলি ব্যবস্থা’ গল্পে গ্রামের ফতোয়াবাজী এবং এর অন্তরালে অর্থ-প্রতিপত্তিশালীদের স্বার্থের একটি উন্মোচিত চিত্র। গ্রামের বিত্তবান প্রভাবশালী মহলের ছত্রছায়ায় লালিত হয় কিছু বকধার্মিক মৌলানা । তারা তাদের সামান্ত প্রভুদের ফরমায়েশ মতই ফতোয়া জারী করে।

ভূমিহীন কৃষক নেক বখশের ষোড়শী বোন নেকী মূক ও বধির। এক জোতদারপুত্র নেকীর সাথে শারীরিক সম্পর্ক গড়ে তোলে এবং গর্ভবতী হয়ে পড়ে। এ ব্যাপারে জোতদারের কাছে তার পুত্রের অপকর্মের সুবিচার প্রার্থনা করে লাঞ্ছিত হয় নেক বখশ। বরং জোতদারের নির্দেশে গ্রামের মৌলানা শরীয়ত অনুযায়ী মুক ও বধির নেকীর ব্যভিচারের শাস্তি নির্ধারণ করে “হুজুর কি করে? কহে কি গর্তে কোমর ইস্তক গাড়িয়া পাথর তুলিবে, পাথর ছুঁড়িবে, পাথর তুলিবে, পাথর ছুঁড়িবে, যতো রক্ত ঝরিবে, ততো গুনাহ উড়ি যাইবে।

ইমাম সাহেব কহিছে এই হইল জেনার শাস্তি।” মুক, বধির গর্ভবর্তী জেনাকারিনীকে যথা সময় নিয়ে আসা হল শাস্তির ময়দানে কিন্তু এই অপরাধের অপরপক্ষ সম্বন্ধে বিচারকেরা নীরব। কেননা নেকীর এ অবস্থার জন্য যে দায়ী সে সমাজের উপরতলার মানুষ; তাই সে ইমামের ফতেয়ার বহির্ভূত।

“ভূষণের একদিন’ গল্পটি মুক্তিযুদ্ধের পটভূমিতে গ্রামীণ পরিবেশে রচিত। অজপাড়া গাঁয়ের দরিদ্র চাষী ভূষণের দৃষ্টিকোণ থেকে মুক্তিযুদ্ধ ও পাকবাহিনীর নৃশংসতার বর্ণনা পাওয়া যায়। গল্পে ভূষণের পুত্র হরিদাস হানাদার বাহিনীর হাতে নিহত হয়। গল্পটির সংলাপে বুলনা অঞ্চলের আঞ্চলিক ভাষা ব্যবহৃত হয়েছে।

‘ফেরা’ গল্পটিও গ্রামীণ পটভূমিতে রচিত মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক গল্প। মুক্তিযোদ্ধা আলেকের পায়ে যুদ্ধ করার সময় গুলির আঘাত লাগে। যুদ্ধ শেষে তাকে বেশ কিছুদিন হাসপাতালে থাকতে হয়। এজন্য নিজের বাড়িতে ফিরতে সামান্য দেরী হয়। আলেকের বাড়ি গ্রামে। নিজ গ্রামে ফেরার পথে আলেক লক্ষ্য করল যুদ্ধবিধ্বস্ত গ্রামটিকে চেনা যায় না। বাড়িতে ফিরে দেখল যুদ্ধ শেষের পর ক্ষুধা ও অভাবের চরম মুহূর্তে তার স্ত্রী তার সংসার ছেড়ে চলে গেছে। মুক্তিযুদ্ধের স্বপ্ন ও স্বপ্নভঙ্গের চিত্রটি পাওয়া যায় আলেকের মায়ের সংলাপে: তোরে সরকার থে ডাকপে না?

আলেক হাঁ হয়ে যায়, সরকার আমারে ডাকপে: ক্যালো?

তোরে ডাকপে না তো কারে ডাকপে? গুলিটা যদি তোর মাথায় লাগত আলেক?

তোরে একা না ডাকুক, তোরা যারা লড়াইয়ে ছিলি তাদের ডাকবো না? আমি আমার এই ভিটের চেহারা ফেরাবো আলেক কয়ে গেলাম আর জমি নিবি এট্টু। এটা গাইগরু আর দুটো বলদ কিনবি আর …………

গ্রামের এই অশিক্ষিত; বাইরের পৃথিবীর সাথে সম্পূর্ণ অপরিচিত বৃদ্ধার কাছে স্বাধীনতার মানে একটু জমি একটা গাই গরু আর দুটো বলদ। অনেকেরই এমন সামান্য অতি সাধারণ প্রাপ্তির আকাঙ্ক্ষা ছিল।

প্রকৃতপক্ষে, দারিদ্রাহীন, সচ্ছল ও নিরাপদ জীবনই সবাই স্বাধীন দেশে পেতে চেয়েচিল। কিন্তু তা কেবলই স্বপ্ন থেকে গেছে। স্বাধীন দেখে বাস্তবে রূপ পায়নি। ‘ফেরা’ গল্পটি তারই করুণ শিল্পপ্রকাশ ।

Leave a Comment