Site icon Literature Gurukul [ সাহিত্য গুরুকুল ] GOLN

সর্বজনীন উৎসব

আজকে আমাদের আলোচনার বিষয়ঃ সর্বজনীন উৎসব। যা সর্বজনীন উৎসব এর অন্তর্গত।

 

 

 

সর্বজনীন উৎসব

আধুনিক সভ্যতার একটি সহযোগী অনুষঙ্গ সর্বজনীন উৎসব ভাবনা। যদিও এই সমাজে আত্মকেন্দ্রিকতা আর বিচ্ছিন্নতাবাদের সংস্কৃতি দিনে দিনে বাড়িয়ে দিচ্ছে মানুষে মানুষে মানসিক দূরত্ব। তারপরও, মনস্তাত্ত্বিক চাপ মোকাবেলার ফলপ্রসূ এক কৌশল, এক সঞ্জীবনী উদ্দীপক যেন হয়ে উঠেছে সর্বজনীন উৎসব।

সর্বজনীন উৎসব একটি জাতির সর্বজনীন উপাদান। বাংলাভাষী মানুষের সংস্কৃতি বিকাশের সূচনালগ্ন থেকে সম্মিলিত আনন্দ আয়োজনগুলো তার পরিসর দৃঢ় করে একটা বিশেষ অবস্থানে পৌঁছেছে; ফুটিয়ে তুলেছে সামাজিক শ্রেণিসম্পর্কের রূপরেখাও। এই উৎসবের শ্রেণিকরণ নিয়ে মতবাদ বা মতান্তর আছে। তবে, বিশেষ কিছু কারণে সেই আনন্দ আয়োজন হয়ে ওঠে শ্রেণির ঊর্ধ্বে সকলের।

মানুষ মানুষের সঙ্গে মিলে আনন্দের অংশীদার হবে, এটাই প্রাকৃতিক। এর বিরুদ্ধতা সমাজকে স্থবির করে দেবে। ফলে সামাজিক অগ্রগতি ও সাংস্কৃতিক উৎকর্ষের সম্ভাবনাও হয়ে উঠবে দুর্লক্ষ্য ।

এমন অচলায়তন সৃষ্টি হয়েছিলো পূর্ববর্তী বাঙালি মুসলিম সমাজেও বলে উল্লেখ করেন শামসুজ্জামান খান। তৎকালীন অবরুদ্ধ মুসলিম সমাজব্যবস্থায় ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর আনন্দ উদযাপনের সুযোগ এবং উদ্যোগের অভাব, সংস্কৃতি বিকাশের প্রতিবন্ধক ছিল উল্লেখ করে তিনি লিখেছেন :

পূর্ববাংলায় বাঙালি মুসলমানদের সামাজিক-সাংস্কৃতিক ইতিহাস ঘাটলে তাদের জীবনে উৎসব-আনন্দের তথ্য খুঁজে পাওয়া মুশকিল। তাদের সমাজ ও গৃহ তাই ছিল অনেকটা আনন্দহীন, নিষ্প্রভ। এর মানে এটা নয় যে, বাঙালি মুসলমান উৎসব-অনীহ বা আনন্দবিমুখ ছিল।

তাদের শাস্ত্রীয় ধর্মের স্পর্শকাতরতা এবং স্বল্পবিদ্যার মোল্লা-মৌলবির কাছ থেকেও তারা উৎসব-আনন্দের প্রতিকূলতাই পেয়েছে। ফলে, ধর্মীয় উৎসবকে সাংস্কৃতিক আধারে বিন্যন্ত করার সাহস করেনি। …. ধর্মীয় বিধিনিষেধ, সংস্কার উৎসবের নানা অঙ্গ সংগীত বা নৃত্যকলা মুসলমানগৃহে ঢুকতে পারেনি। আর যে-সমাজে গান নিষিদ্ধ, নাচ হারাম – সে- সমাজে উৎসব অভাবনীয়। তাই বাঙালি মুসলমান সমাজে উৎসব ছিল না। (শামসুজ্জামান, ২০১৩ ৮৯)

যেখানে উৎসব-ই নেই, সেখানে সমন্বিত উৎসব নিয়ে ভাবার অবকাশ সুদূরপরাহত। তারপরও বলা হয়, বারো মাসে তেরো পার্বনের এই বাংলাদেশে উৎসবপ্রিয় জাতি বাঙালি। স্বভাবসিদ্ধ আচরণেই সে উদ্বুদ্ধ হয় নানা উৎসবে।

সমন্বিত উৎসবের গুরুত্ব তুলে ধরেন মাসুদ রানা (২০১৬) উৎসব-জাতি-সম্প্রদায়-সম্প্রীতি নিবন্ধে। সেখানে লিখেছেন, অস্তিত্বের জন্য একটি জাতির আত্মপরিচিতি অপরিহার্য। জাতির আত্মপরিচিতির ক্ষেত্রে যে-সমস্ত উপাদান ঐতিহাসিক উৎপাদক হিসেবে কাজ করে, তার মধ্যে উৎসবও একটি।

 

 

উৎসব একটি জাতিকে একত্রে গ্রথিত করে তাদের একানুভূতিকে নবায়িত ও শক্তিশালী হতে সাহায্য করে। সে কারণেই উৎসবকে হতে হয় সর্বজনীন। কিন্তু খানিকটা সম্ভানা নিয়ে বিরাজ করা পয়লা বৈশাখের বাংলা নববর্ষ উৎসব ব্যতীত, এখনও পর্যন্ত এ জাতির প্রকৃত অর্থে কোনো সর্বজনীন উৎসব গড়ে ওঠেনি। কারণ হিসেবে তিনি মনে করেন, উৎসব পালনে বাঙালি তার মনের সঙ্কীর্ণতা দূর করতে পারেনি।

প্রধান দুই ধর্মীয় সম্প্রদায় হিন্দু বা মুসলমানদের মধ্যে সম্ভবত কেউ মনেই করেন না, তাদের ‘সর্বজনীন দুর্গোৎসবে কিংবা ঈদোত্সবে প্রতিবেশির সঙ্গে সুখ ও আনন্দ শরিক করার প্রয়োজন আছে। তাই দেখা যায়, যখন এক সম্প্রদায় উৎসবে মস্ত অন্য সম্প্রদায় তখন নিষ্ক্রিয় দর্শক। মূলত সম্প্রীতি চর্চার অভাবেই উৎসব তার সর্বজনীনতা হারায় বলে মত তাঁর।

একটি পরিকল্পিত সমাজে কল্যান, নৈতিকতা বা বিশ্বজনীন সম্প্রীতিতে বাধা না হয়ে বৈচিত্রময় সংস্কৃতি চর্চা আত্মবিকাশে সহায়ক ভূমিকা পালন করে বলে মনে করেন, বার্ট্রান্ড রাসেল। তিনি History of Western Philosophy গ্রন্থে বলেছেন

Diversity is essential to happiness, and in Utopia there is hardly any. This is a defect of all planned social systems, actual as well as imaginary. (Russel, 2009: 543)

আবহমান কাল থেকে বাংলায় নানা ধরণের পালা-পার্বণ-উৎসবের সৃষ্টি হয়েছে। তবে এগুলোর বেশিরভাগই লোকজ উৎসব বা পার্বণ। এগুলো কখনো আঞ্চলিক, কখনো ক্ষুদ্র গোষ্ঠীতে সীমাবদ্ধ, কখনোবা বিশেষ ধর্ম- সম্প্রদায়ের উৎসব। কিন্তু এসব উৎসব বৃহৎ, জাতীয় বা সর্বজনীন নয়, উল্লেখ করে শামসুজ্জামান খান লেখেন:

রক্ষণশীল মুসলমান সমাজে এ ধরণের উৎসব ছিল না বললেই চলে। তবে সমন্বিত সংস্কৃতির ঐতিহাসিক বিকাশজনিত কারণে সাধারণ মুসলমানদের মধ্যে উপযুক্ত কোনো কোনো উৎসব পালিত হলেও ঈদ, মহররম, নববর্ম ছাড়া অন্য কোনো উৎসব মূলধারার উৎসব হিসেবে তেমন একটা গণ্য হয়নি। আবার মূলধারার এইসব উৎসবও ব্যাপক বিপুল মানুষের সর্বজনীন উৎসব হয়ে উঠতে পারেনি আজ থেকে নাট- সত্তর বছর আগেও। তাই নিম্নবিত্তের মুসলমান পার্শ্ববর্তী হিন্দু সম্প্রদায়ের সর্বজনীন উৎসবে যোগ দিয়ে তাদের বিনোদন পিপাসা নিবৃত্ত করেছে। (শামসুজ্জামান, ২০১৩ ৯১ )

এভাবেই হয়তো এক পর্যায়ে, বাঙালি জাতীয়তাবাদের মৌল অনুপ্রেরণা হয়ে ওঠে সর্বজনীন উৎসবগুলো। জীবনবোধ উপলব্ধির যে মৌল দর্শন জাতির মনন জুড়ে বিরাজ করে, সে অর্থের সবটুকু ধারণ করে সর্বজনীন উৎসব, এমনটাই মনে করেন সেলিনা হোসেন। বাঙালির অসাম্প্রদায়িক উৎসব’ (২০১১) প্রবন্ধে তিনি লিখেছেন, সর্বজনীন উৎসবের বিস্তৃতি শহুরে ইটকাঠের গণ্ডি ছাপিয়ে গ্রামের মেঠো পথেও। যেখানে মানুষ জড়ো হয় আপন নিয়মে। অমোঘ এক শক্তির আশ্রয়ে এই বিশ্বাসে, যেন বিভ্রান্তির যাঁতাকলে পথ হারানোর সুযোগ রোধ করে এই উৎসব।

বলা যেতে পারে, যে উৎসবে ধর্মতান্ত্রিকতার ছায়াপাত নেই, যে উৎসব সাম্প্রদায়িক রীতি নীতির প্রভাবমুক্ত, নিরপেক্ষ বাঙালিত্ববোধে উদ্বুদ্ধ, তা-ই সর্বজনীন উৎসব। এই উৎসব একাকীত্ব ও সংকীর্ণতার উর্ধ্বে উঠে মানুষকে মানুষ হিসেবে বিবেচনা করতে শেখায়, জাতিগত বিকাশকে সমৃদ্ধ করে।

বাঙালি সমাজে নববর্ষ উৎসব ছাড়াও সর্বজনীন উৎসব হিসেবে স্থান করে নিয়েছে বিভিন্ন ঋতুভিত্তিক উৎসব, যেখানে ধর্মের দেয়াল তৈরি হতে পারেনি।

তবে, আতোয়ার রহমানের ( ১৯৮৫ ১৪) দেওয়া তথ্য থেকে বলা যায়, সর্বজনীন উৎসবের তালিকায় আরও আছে ঐতিহাসিক বা স্মরণ উৎসব (আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস একুশে ফেব্রুয়ারি, মে দিবস), বিজয় উৎসব ( স্বাধীনতা দিবস, বিজয় দিবস উদযাপন, খেলায় জয়সূচক উৎসব), রাজনৈতিক উৎসব (জাতীয় দিবস, শহিদ বুদ্ধিজীবী দিবস, যুব উৎসব), সাংস্কৃতিক উৎসব (শিল্পমেলা, নাট্যোৎসব, সঙ্গীত ও নৃত্য উৎসব, গ্রন্থমেলা, জাতীয় কবিতা উৎসব) ইত্যাদি। জাতীয় নির্বাচনকেও এক ধরনের সর্বজনীন উৎসব বলে অভিহিত করেন সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী (২০১৮)।

বাঙালি উৎসবের এত বৈচিত্র্য, এত শ্রেণিকরণ, তারপরও শুধু বর্ষবরণ ব্যতীত বাঙালির ধর্মনিরপেক্ষ মিলিত উৎসবের সংখ্যা খুব বেশি নয় বলে মনে করেন বিশ্বজিৎ ঘোষঃ

ক’টা উৎসব আছে আমাদের, যেখানে সবাই একনিষ্ঠভাবে অংশগ্রহণ করতে পারে, ধর্মীয় সামাজিক দেয়ালের উর্ধ্বে উঠে নিষ্ঠভাবে পালন করতে পারে প্রকৃত অংশগ্রহণকারী ভূমিকা সবার অংশগ্রহণে মিলিত বাঙালি যে-কটা অনুষ্ঠানে মুখর হয়ে ওঠে নববর্ষ উৎসব তার অন্যতম। শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে বাঙালি জনগোষ্ঠী ধর্মীয়-সামাজিক-রাজনৈতিক পরিচয়ের উর্ধো উঠে মিলিতভাবে পালন করে আসছে বাংলা নববর্ষ-উৎসব। উত্তরকালে একুশে ফেব্রুয়ারি, স্বাধীনতা দিবস বা বিজয় দিবসের মতো সর্বজনীন উৎসব পালনের দিন আমরা পেয়েছি বটে, তবে এক্ষেত্রে নববর্ষ-উৎসব যে ভিন্ন মাত্রা সঞ্চারী, তা লেখাই বাহুল্য। (বিশ্বজিৎ, ২০০৮ 289 )

বাঙালি জনগোষ্ঠীর উৎসবে এই ধর্মকেন্দ্রিকতা, সচেতনভাবে প্রথম লক্ষ্য করেন রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর – এমন ধারণা থেকে হায়াৎ মামুদ লিখেছেন :

তাঁর প্রজ্ঞা ও বোধ শক্তিতে প্রথম ধরা পড়ে বহুধর্মীয় জনগোষ্ঠীতে ধর্মনিরপেক্ষ উৎসব চালু না করতে পারলে বিভিন্ন সম্প্রদায় আত্মিকভাবে যুক্ত হতে পারবে না। ততদিনে ভারতবর্ষীয় রাজনীতিতে একটি উপাদান হিসেবে ধর্মকে বিবেচনা করা শুরু হয়েছে এবং ধর্মীয় ভেদনীতিতে রাজনৈতিক বিভাজন ও হিন্দু- মুসলিম বিরোধের বীজ রোপিত হয়েছে – এ সবও রবীন্দ্রনাথের দৃষ্টি নিশ্চয়ই খুলে নিয়েছিল।

কবি শান্তিনিকেতন ও শ্রীনিকেতনে যে-সব উৎসব প্রচলন করেছিলেন তার গভীরে ধর্মসম্প্রদায়গত ঐক্যবন্ধে দর্শন কাজ করেছিলো নিশ্চয়ই, নইলে বসন্তোৎসব, হলকর্ষণ উৎসব ইত্যাদি সেক্যুলার সম্মিলনী উদ্ভাবনের কোনো কারণ তাঁর ছিল না। বহুধর্মীয় সমাজে একমাত্র ধর্মভিত্তিক উৎসব কোনো ঐক্যসূত্র প্রতিষ্ঠিত করতে পারবে না, তিনি জানতেন। (হায়াৎ মামুন ২০০৮ ৩৮২)

 

 

সম্প্রদায়গত ধর্মতন্ত্র-সংশ্লিষ্ট কোনো দিনই যে সমস্ত মনুষের সঙ্গে একর হওয়ার কিংবা ‘সমস্ত মনুষ্যত্বের শক্তি অনুভব করার মতো মহৎ উৎসবের দিন বলে গণ্য হতে পারে না- এ কথা রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর উপলব্ধি করেছিলেন বলেই তিনি

বাঙালির উৎসব সন্ধান করেছেন ধর্মনিরপেক্ষ বাঙালিত্বের মর্মস্থলে, এমন মনে করেন যতীন সরকার। ‘বাঙালির নববর্ষ আজ আমাদের অসাম্প্রদায়িক উৎসব’ নিবন্ধে তিনি লিখেছেন : গাড়ালি সমাজের মানুষ বিভিন্ন ধর্ম গেছে সমস্ত প্রকার ধর্ম সাম্প্রদায়িকতার উর্ধ্বে। সম্প্রদায় নিরপেক্ষ প্রকৃতি চেতনা ও পরিপার্শ্ব ভাবনা থেকে উৎসারিত হয়েছে তাদের সকল উৎসব। (১৪ এপ্রিল ২০২১, সমকাল )

জাতীয়তাবাদী মানসিকতায় বাঙালিকে বলিষ্ঠ করতে সর্বজনীন উৎসবের ভূমিকা মুখ্য। ‘উৎসব’ প্রবন্ধে উৎসবের মাহাত্ম্য বিষয়ে সেই ভাবনাই ব্যক্ত করেন রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর –

সেদিন তাহার ব্যবহার প্রাতাহিক ব্যবহারের বিপরীত হইয়া উঠে। সেদিন একলার গৃহ সকলের গৃহ একলার খন সকলের জন্য বারিত হয়। সেদিন ধনী দরিদ্রকে সম্মান দান করে, সেদিন পণ্ডিত মুখকে আসনদান করে। কারণ আত্মপর খনিবিদ্র পণ্ডিতমূর্খ এই জগতে একই প্রেমের দ্বারা বিধৃত হইয়া আছে, ইহাই পরম সত্য এই সত্যের প্রকৃত উপলব্ধি পরমানন্দ। উৎসবদিনের অবারিত মিলন এই উপলজিই অবলা (রবীন্দ্রনাথ, ১৯৬৭ ৩৩৬)

ইতিহাসে চোখ ফেরালে দেখা যায়, হাজার বছরের পথ পাড়ি দিয়ে বাঙালি জাতি তাঁর মননে গভীরভাবে লালন করেছে অসাম্প্রদায়িক চেতনা। তাই ধর্মীয় উৎসব পালন করতে গিয়েও তাদের মধ্যে সম্প্রদায়বোধ কখনো বাধা হয়ে ওঠেনি। এই মনোভাবে একটি বিশেষ শ্রেণি ক্ষুব্ধ হলেও, তাদের কূটকৌশল কখনো প্রপ্রসূ হয়নি। এ কে এম শাহনাওয়াজ (২০১৮) মনে করেন, অসাম্প্রদায়িক এই ঐতিহ্যকে অস্বীকার করে যেসব গোষ্ঠী সাম্প্রদায়িক ভেদবুদ্ধি সৃষ্টির মাধ্যমে বিশেষ ফায়দা লোটার দুরভিসন্ধি করছে, তারা কিছু সময়ে হয়তো মানবতা ক্ষুণ্ন করতে পারে, নিরীহ মানুষকে দলিত করতে পারে কিন্তু সফল কখনই হবে না।

সংস্কৃতি তার নিজস্ব নিয়মে বিকশিত হলেও, সেই স্রোতধারা অনেক সময় নিরীক্ষণ, পর্যবেক্ষণ, কখনো-বা নিয়ন্ত্রণ করারও প্রয়োজন হয়ে পড়ে। কারণ সংস্কৃতিতে পঙ্কিলতা থাকলে বাঞ্জলির মানবিকতা আর সৃজনশীল উদ্ভাবনী শক্তিও লোপ পাবে বলে আশঙ্কা করা যায়।

বাঙালির বর্ষবরণ উৎসব হোক বা যে কোনো রাজনৈতিক-সামাজিক উৎসব, বলা যায় উৎসব মানেই মুক্তির অভিজ্ঞান। উৎসবের মাঝে ধর্মীয়, সামাজিক বা রাজনৈতিক সীমা আরোপ করতে গেলে তা মিলনের আনন্দকে স্নান করে দেয় অনেকটাই। আমাদের সমাজ ব্যবস্থাও অনেক ক্ষেত্রে সেই ধারার অনুগামী। এ প্রসঙ্গে আলী আনোয়ার তাঁর মত দেন এভাবে :

এই যে কিছু লোককে সীমার বাইরে ঠেলে দিচ্ছি, তাদের ডাকতে পারছি না তা আমাদের কুণ্ঠিত করে, লজ্জিত করে। আমাদের আনন্দও আর পূর্ণ হতে পারে না। অন্যকে অবমাননার গ্লানি আমাদের আবিষ্ট করে। উৎসবের আত্মাটি মারা যায়। আমাদের ধর্মীয় উৎসবে ঐ গণ্ডি-চিহ্নিতকারী রেখাগুলি পৌনঃপুনিক উচ্চারণে, ঘোষণায় অনুশাসনে বারবার প্রজন্ম থেকে প্রজন্মান্তরে আমাদের মনে করিয়ে দেওয়া হয়। এই নিষেধাজ্ঞা যে অন্য ধর্ম বা সম্প্রদায়ের প্রতিই প্রযুক্ত হয় তা নয়, তা স্ব-ধর্মের জন্য সম্প্রদায় বা তরিকার প্রতিও প্রযুক্ত হয়। (আলী আনোয়ার ২০০৮: ১২)

অনেক সাংস্কৃতিক ও ধর্মীয় উৎসব, যা আমরা হিন্দু উৎসব হিসেবে জানি। এর বেশির ভাগের উৎস আদিবাসী সংস্কৃতি বলে মনে করা হয়। কারণ, হিন্দু-বৌদ্ধ ধর্ম গ্রহণকারীরা নিজ ধর্ম পরিচয় পেয়েছে অনেক পরে। পরবর্তী সময়ে তাদের ধর্ম অনুষ্ঠানে স্বাভাবিকভাবে ঢুকে গেছে এসব সংস্কৃতি, এমন তথ্য দেন এ কে এম শাহনাওয়াজ (২০১৮) |

ধর্মীয় উৎসবে সাম্প্রদায়িকতা’ প্রবন্ধে তাঁর মতের সমর্থনে যুক্তি তুলে ধরেন এভাবে, এগারো শতক থেকে ধীরে ধীরে ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করতে থাকে এদেশের মানুষ। তেরো শতক থেকে তা ব্যাপকতা পায়।

সুতরাং স্বাভাবিকভাবেই পূর্বতন সাংস্কৃতিক আচরণ এবং সম্প্রদায় নিরপেক্ষ চেতনা তাদের মধ্যে বজায় থাকে। তাঁর তথ্য মতে আরও জানা যায়
উনিশ শতকে হাজী শরীয়তুল্লাহ অন্য সংস্কৃতির প্রভাবমুক্ত করে মৌলধারার মুসলমান বানাতে চেয়েছিলেন বাঙালি মুসলমানকে তার ফরায়েজি আন্দোলনের মাধ্যমে। কিন্তু তেমন একটা সাফল্য পাননি তিনি। কারণ এ মাটির অসাম্প্রদায়িক চেতনাকে অস্বীকার করার উপায় নেই।

তাই এসব লোকজ উৎসবকে বিশেষ ধর্ম ও সম্প্রদানের হৃপ মারা অন্যায় হবে। এসব সংস্কৃতি হিন্দু-বৌদ্ধ বা মুসলমানের সংস্কৃতি নয়- মিলেমিশে সব বাঙালি সংস্কৃতিতে রূপান্তরিত হয়েছে। (শাহনাওয়াজ ২০১৮)

পাশাপাশি, ঐতিহাসিক দৃষ্টিকোণ থেকে একীভূত সংস্কৃতি গড়ে ওঠার বিষয়টি ব্যাখ্যা করেছেন শামসুজ্জামান খান। তাঁর মতে, সামান্য কিছু বহিরাগত ছাড়া বাংলার মুসলমানেরা অধিকাংশই স্থানীয় জনগোষ্ঠী থেকে ধর্মান্তরিত মুসলমান। যারা ধর্ম বদলেছে, কিন্তু সংস্কৃতি বদলায়নি। ফলে তাদের আবহমান কাল ধরে আচরিত উৎসব পালা-পার্বণ তারা বর্জন করেনি। স্থানীয় এসব উৎসব তাদের জীবন ও সংস্কৃতির অপরিহার্য অঙ্গ হয়েই থেকেছে। উদাহরণ প্রসঙ্গে শামসুজ্জামান খান আরও বলেন:

আদি ভাক (Archetype) স্থিত থেকেই এসব উৎসব কিছুটা কালের ছোঁয়া এবং সামাজিক অগ্রগতি অভিঘাতের চিহ্ন বহন করেছে। জীবনাচারে মুসলিম অনুষদের কিছু ছাপ বহন করে কোনো কোনো অনুষ্ঠান মিশ্র বা সমন্বিত চারিত্রাও অর্জন করেছে। স্থানীয় উপাদানের সঙ্গে মুসলিম পুরাণ বা কিংবদন্তি যোগ করে বর্ণাঢ্য উৎসবেরও সৃষ্টি হয়েছে।

… অন্যদিকে আবহমান কালের যেসব স্থানীয় অনুষ্ঠান বাঙালি মুসলমানেরা কিছু গ্রহণ-বর্জন করে নিজেদের করে নিয়েছে তার মধ্যে আছে নবান্ন উৎসব, আমনি, পৌষ-পার্বণ, সয়লা ও গারসি উৎস। (শামসুজ্জামান, ২০১৩ ৯০-৯১)

জানা যায়, শেরে বাংলা এ কে ফজলুল হক রাজনীতিতে আসেন গ্রামবাংলার কৃষিসমাজ থেকে উঠে আসা নব্য শিক্ষিত ও উচ্চমধ্যবিত্ত মুসলমান সমাজের প্রতিনিধি হিসেবে। পূর্ব-প্রজনের নবাব-নাইট জমিদারদের মতো তিনি যেমন ইসলাম ধর্মকে রাজনৈতিক ফাদার কৌশল হিসেবে ব্যবহার করতে চাননি, তেমনি মোল্লা-মৌলবি-কাঠমোল্লাদের মতো ধর্মীয় অক্ষতায় আচ্ছন্নও ছিলেন না শামসুজ্জামান খান, ২০১৩ ৯১)।

এ প্রসঙ্গে যোগ করেন, নতুন প্রজন্ম নিয়ন্ত্রিত তৎকালীন বাঙালি মুসলমান সমাজের আর্থিক অবস্থা ও শিক্ষার কারণে যে উদার ও নবচেতনা সমৃদ্ধ মানসিক ও সাংস্কৃতিক ভাবাকাশ তৈরি হয়েছিল তার ধারাবাহিক ইতিহাস ছিল আনন্দ-উৎসবের উপযোগী এবং উৎসব মুখর। তিনি লেখেন :

উনবিংশ শতকের শেষদিক থেকে নতুন মুসলিম শিক্ষিত মধ্যবিত্ত সমাজ গড়ে উঠতে থাকে। ১৯৪৩-এ এ. কে. ফজলুল হকের নেতৃত্বে বাংলা সরকার গঠিত হলে তা আরও সম্প্রসারিত হয়ে একটি সংগঠিত শক্তিতে পরিণত হয়। এই নতুন শিক্ষিত মুসলমান মধ্যবিত্ত নাগরিক সমাজ, এমনকি গ্রামীণ অবস্থাপন্না কৃষক ও জোতদার পরিবারে ‘কলের গান’ (গ্রামোফোন), দৈনিক মাসিক পত্রিকা ও তার ঈদ সংখ্যা এবং ঈদ উপলক্ষে নতুন কাপড়চোপড় কেনার রেওয়াজ চালু হতে দেখা যায়। এভাবেই বাঙালি মুসলমানের সর্ববৃহৎ ধর্মীয় উৎসবের সূচনা। (শামসুজ্জামান, ২০১৩ ৯১)

তবে, উৎসবের গণ্ডী নির্ধারণে সংখ্যাগরিষ্ঠ ধর্মীয় প্রভাব অনেক ক্ষেত্রে আধিপত্য বিস্তার করে। ফলে, স্ব- সম্প্রদায়ের ভেতর থেকেও আরোপিত হতে পারে বিধিনিষেধ। যেমন, শিয়া অথবা ইসমাইলিয়া বা আহমদিয়ারাও সব উৎসবে স্বাগত নন এমন প্রসঙ্গের উল্লেখ করে আলী আনোয়ার (২০০৮ ১৬২) বলেন, উচ্ছল আনন্দ প্রকাশের বিরুদ্ধে বাঙালি সমাজ ব্যবস্থা অনেক সময় প্রতিকূলও। যেন আনন্দ প্রকাশ মাত্রেই ধর্ম থেকে খানিক বিচ্যুতি !

কিন্তু, আয়োজিত উৎসবে নির্দিষ্ট পদমর্যাদার ব্যক্তি ব্যতীত সর্বস্তরের জনগণের প্রবেশাধিকার সংরক্ষিত হলে, সে উৎসব সর্বজনীন তো নয়ই, উৎসব হয়ে ওঠারই গ্রহণযোগ্যতা হারায়, এমন মত মোহাম্মদ সিরাজুল ইসলামের (২০০৭ – ৯৪, ৮৭)। এতে সাম্যবাদে ব্যাঘাত ঘটে, সাংস্কৃতিক যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়, ব্যাহত হয় নিরপেক্ষতা। উৎসবে যা কাম্য নয় বলে উল্লেখ করেন তিনি।

 

 

বাংলাদেশে সত্যিকার অর্থে, একমাত্র ধর্মনিরপেক্ষ অনুষ্ঠান বাংলা নববর্ষ। তৃণমূল থেকে শাহরিক — সব পর্যায়েই বিপুল উৎসাহ উদ্দীপনার সঙ্গে তা পালিত হয় একমাত্র খাঁটি বাঙালি উৎসব হিসেবে, এমন মত মুনতাসীর মামুনের। এর বৈশিষ্ট্য হিসেবে তিনি (১৯৯৪ ৯৭) উল্লেখ করেন, মুসলিম অধ্যুষিত একটি ভূখণ্ডের উৎসব সত্ত্বেও তা বিষাদময় নয় রাষ্ট্র অন্যান্য ক্ষেত্রে সফল হলেও এক্ষেত্রে পারেনি ধর্মজ উপাদান যোগ করতে। শুধু তাই নয়, এখনও এ নববর্ষ স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনেও যোগ করে নতুন মাত্রা। মুনতাসীর উল্লেখ করেন

আপনাদের কি মনে পড়ে সামরিক শাসনামলের প্রতিটি নববর্ষের অনুষ্ঠানে কি বিপুল পরিমান মানুষ সমবেত হতে। নববর্ষে যারা শুধু ঘরে বসে ছুটি ভোগ করতে চান তারাও কি প্রেরণায় সে সময় যোগ দিতেন এ উৎসবের এ সময় বৈশিষ্ট্য মিলে বাংলা নববর্ষকে আখ্যায়িত করতে পারি, পৃথিবীর এক বিরল বৈশিষ্ট্যপূর্ণ উৎসব হিসেবে। (মুনতাসীর, ১৯৯৪ ৯৮)

বাঙালির বৃহত্তর সামাজিক পটভূমি এবং সাংস্কৃতিক তাৎপর্য বিশ্লেষণে এটা বলা যায়, সর্বসাধারণের জন্য আয়োজিত উৎসবগুলো কোনো ধর্ম-সম্প্রদায়কে বিশেষায়িত করে না। মানুষের প্রতি নিঃস্বার্থ ভালবাসা ঐক্য, সমৃদ্ধ জীবনের প্রার্থনার মতো অভিন্ন অন্তর্নিহিত বোধ যখন সমন্বিত উদ্দ্যেশ্যে এক হয়, তখনই উৎসব উত্তরিত হয় সর্বজনীনতায়।

হাজার বছরে মানুষের শিল্পকলা এবং তার ভৌগলিক-সামাজিক-অর্থনৈতিক ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়ায় গড়ে ওঠা উৎসব কেন্দ্রিক এই সামাজিক সংহতি অনেক প্রতিকূলতা পাড়ি দিয়ে আজও উদ্ভাসিত। কখনো কোনো ধর্মমত উৎসবপ্রিয় বাঙালির উদার চেতনাকে অবদমন করেছে, এমন উদাহরণ পাওয়া যায় না।

সর্বজনীন উৎসবের মাধ্যমে জীবনে যে সমাজতাত্ত্বিক তাৎপর্য বহন করে, সেটা সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণিত হয়েছে উৎসবগুলো প্রজন্ম নির্বিশেষে উদযাপনের মধ্য দিয়ে। তাই সর্বজনীন উৎসব বাঙালির সাংস্কৃতিক আবেগের অন্তর্ভুক্ত।

উৎসবের সামাজিক চিত্র

স্বাধীনতার পঞ্চাশ বছরেও কিছু মানুষ যেন সাম্প্রদায়িক চিন্তা-চেতনা থেকে মুক্ত হতে পারেনি। তারাই বারবার ধর্মের দোহাই দিয়ে নিপীড়ন করছে চিরকালের চেনা প্রতিবেশী সংখ্যালঘু সম্প্রদায়কে নিশ্চিহ্ন করেছে প্রগতিশীল লেখক-শিল্পী-সংস্কৃতি কর্মীকে। অপদস্থ করেছে বাংলার সহজিয়া মরমিয়া বাউল সম্প্রদায়কে। আলমগীর শাহরিয়ার ‘সাম্প্রদায়িক সন্ত্রাস, সহিংসতা ও বর্বরতার শেষ কোথায়? (২০২১ ) নিবন্ধে লিখেছেন :

এ যেন এক ছাই চাপা সাম্প্রদায়িক ঘৃণার আগুন। ঠুনকো অজুহাত পেলেই জ্বলে ওঠে। জ্বালিয়ে নিতে উদ্ধত হয় চিরচেনা সম্প্রীতির সমাজ। এমনই এক সাম্প্রদায়িক সহিংসতার আগুনে গত রোববার (১৭-১০- ২০৯১) রাতে পুড়িয়ে দেওয়া হলো রংপুরের পীরগঞ্জ উপজেলার রামনাথপুর ইউনিয়নের মাঝিপাড়া, বটতলা ও হাতীবান্ধা গ্রামের হিন্দু সম্প্রদায়ের মানুষের বাড়ি-ঘর। রাতের আধারে চলে লুটপাট ও নৈরাজ্য।

দুর্গা পূজায় কুমিল্লার এক মঞ্চলে দুর্বৃত্তের রাখা পবিত্র কুরআন অবমাননার জের ধরে ঘটে এ ঘটনা। কুমিল্লা ছাড়াও চাঁদপুর, নোয়াখালী, চট্টগ্রামসহ দেশের নানান জায়গায় মন্দিরে হামলার ঘটনা ঘটেছে। সাম্প্রদায়িকতায় বিশ্বাসী দল ও মানুষ এসব ঘটনার অফলাইন ও অনলাইনে প্রতিনিয়ত উসকানি ও ইন্ধন দিয়েছে। ধর্মের নামে দেশে এ রকম অর্গানাইজড ক্রাইম এই প্রথম নয়। আগেও ঘটেছে কক্সবাজারের রামুতে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার নাসিরনগরে, সুনামগঞ্জের শাল্লায়। (আলমগীর শাহরিয়ার, ২০২১ )

উৎসবে সহিংসতার আরও কিছু সামাজিক চালচিত্র তুলে ধরেন হাসান মামুন, তাঁর লেখা ‘যাহারা তোমার বিষাইছে বায়ু’ (২০১৫) নিবন্ধে

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এলাকার যেখানটায় একজন প্রবাসী লেখককে কুপিয়ে হত্যা করা হয়েছিল, তারই আশপাশে বাংলা নববর্ষের সন্ধ্যায় বেশ কজন নারীকে আক্রমণ করা হয়েছে দেখে অবাক হওয়া যাবে না।

একটি বাম ছাত্র সংগঠনের করুন কর্মী আক্রান্ত নারীদের রক্ষায় স্বতঃস্ফূর্তভাবে এগিয়ে যান। তাদের একজন আহত হয়েছেন হামলাকারীদের হাতে। আড়াই দশক আগে আমরা এখানকার হা থাকাকালে, যখন কোনো উৎসবই এত ব্যাপক রূপ নেয়নি, তখনও বিশেষত বাংলা একাডেমি এলাকায় বই মেলার প্রবেশপথে একদল ছেলে সংঘবদ্ধভাবে এসব ঘটাত। (হাসান মামুন ২০১৫ )

এসব ঘটনাদৃষ্টে বাঙালি আসলেই উৎসব-বান্ধব জাতি কি না, এই প্রশ্ন জাগে। নইলে দারুন উৎসবও কেন বিড়ম্বনার বিষয়। উৎসবের ভিড়ে মেয়েদের কোনঠাসা করে তাকে লাঞ্ছিত করতে কিছু বিচ্ছিন্ন ও বিকারগ্রস্ত লোক প্রস্তুত হয়েই থাকে, এমন আক্ষেপ করে হাসান (২০১৫) লিখেছেন, এসব ঘটনা জাতি হিসেবে বাঙালিকে, তার সংস্কৃতিকে কলঙ্কিত করে।

বাংলা নববর্ষ তো বটেই, রাজনৈতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ অন্যান্য উৎসবেও প্রতিবারই ঘটে নারীর ওপর আক্রমণ। অনেক ঘটনাই প্রকাশ পায় না। তিনি একে ‘যৌনসন্ত্রাস’ উল্লেখ করে লিখেছেন, দিনকে দিন আরও বেশিসংখ্যক যুবক দলবদ্ধ হয়ে এমনভাবে এসব ঘটায় যে, উপস্থিত দুএকজনের পক্ষে তাদের কবল থেকে কাউকে রক্ষা করা প্রায় অসম্ভব। এরই মধ্যে সবার মাঝে বেড়েছে ‘ঝামেলা’ এড়িয়ে চলার প্রবণতা। সাথে আইনের দৃষ্টান্তমূলক শাসন না থাকায় কিংবা তা ভেঙে পড়ার কারণেই অমন প্রবণতা বৃদ্ধি পাচ্ছে দিনকে দিন। সাহায্য করতে গিয়েও উলটা হয়রানির শিকার হচ্ছে মানুষ।

এ ধরনের ঘটনা ঘটতে থাকলে বাংলা নববর্ষ, একুশে ফেব্রুয়ারির মতো সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিকভাবে তাৎপর্যপূর্ণ উৎসবগুলোয় নারীর অংশগ্রহণ কমবে, কমবে শান্তিপ্রিয় মানুষের অংশগ্রহণ। নামধারী কিছু উৎসব হয়ে উঠবে নির্দিষ্ট কিছু মানুষের প্রধানত পুরুষদের কর্মকাণ্ড।

সর্বজনীন উৎসবের গুরুত্ব

পুঁজিবাদী অর্থনীতির বলয় এবং বৈশ্বিক অর্থনীতির প্রভাবে উৎসবে এসেছে পরিবর্তন এবং বৈচিত্র্য। তবু সর্বজনীনউৎসবগুলো তার উপযোগিতা হারাচ্ছে। সামাজিক সংহতি আর সর্বজনীনতা প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে বাধা আর কী কী হতে পারে, এই প্রশ্নের উত্তর খোঁজাই জরুরি বলে মনে করছেন প্রগতিশীল, সচেতন মহল।

বরাবরই অসাম্প্রদায়িক জীবনতৃষ্ণা বিশেষায়িত করে বাঙালি সংস্কৃতিকে। তাই বলা যায়, সর্বজনীন উৎসবে উন্মুখ একটি জাতি বাঙালি। ‘সর্বজনীন উৎসব’ শব্দ দুটি গভীর অর্থ বহন করে শফি আহমেদের কাছে। বৈষম্যমুক্ত মানবিক সম্পর্ক স্থাপনের এক গভীরতার জন্যই উৎসবকে সর্বজনের স্বতঃস্ফূর্ত উৎসব মেনে নিতে সুবিধাবাদী মহলের তোড়জোড়। কারণ হিসেবে শফি আহমেদ উল্লেখ করেন (২০০৮ : ৩২৩), বাঙালির বিবিধ জাতীয় উৎসবের মধ্যে দুটি বিশেষ উৎসবে স্বাতন্ত্র্য দেখা যায়। একুশে ফেব্রুয়ারি পহেলা বৈশাখ ।

সংস্কৃতজনদের মতে ধর্মনিরপেক্ষতার জন্য এই উৎসব দুটি স্বতন্ত্র্য। ধর্মের বিভেদ, অর্থনৈতিক শ্রেণিগত বিভেদ, সামাজিক বৈষম্য সবকিছুই ম্লান হয়ে ওঠে সম্মিলিত প্রাণের স্রোতে। যেটা ধর্মীয় রাষ্ট্রে ধর্মান্ধদের কাম্য নয়। এসব কারণেই উৎসব সর্বজনীন হয়ে ওঠার প্রেক্ষাপট ছিল বেশ বৈরী।

 

বিশ শতকের প্রথম দিকেও যে বাংলায় মুসলমানের বৃহৎ, বর্ণাঢ্য ও সর্বজনীন উৎসবের অস্তিত্ব খুঁজে পাওয়া যায় না, তার কারণ শুধু ইসলাম ধর্মের শাস্ত্রীয় অপরিবর্তনীয়তা নয়, তখন সমাজ ব্যবস্থাও প্রস্তুত ছিল না নানামুখি উৎসব আয়োজনে সুযোগ সুবিধার সমন্বয় ঘটাতে, এমন মত শামসুজ্জামান খানের

আসলে বড় উৎসব সংগঠনের জন্যে যেসব উপাদান ও প্রয়োজনীয় ভিত্তি দরকার, বাঙালি মুসলমান সমাজে তখন তার অভাব ছিল। আর্থিকভাবে স্বচ্ছল বড় আকারের একটি শিক্ষিত মধ্যবিত্ত সমাজ, সাধারণ মানুষের জীবনমান উন্নয়ন এবং ভোক্তাশ্রেণি হিসেবে তাদের কিছু সক্ষমতা অর্জন এবং উৎসর আয়োজনে সক্ষম প্রতিষ্ঠান গড়ে না ওঠায় উৎসবের ব্যাপকতা ও বহুমুখিতার সৃষ্টি । गान মুসলমানের প্রাণ ধর্মীয় উৎসব ঈদেও ভাই জৌলুস ও জেলা দেখা যায়নি কৃষিজীবী ও দরিদ্র সাধার মানুষের জীবনে। (শামসুজ্জামান, ২০১৩ : ৯১ )

তাই বলা যায়, সর্বজনীন উৎসব পালন একটি পরিপূর্ণ বোধের, একটি পরিপূর্ণ সামাজিক উৎকর্ষের মাপকাঠি। প্রাচীনতার নববিন্যাস এবং উদ্ভাবনী ব্যবহারে উৎসব ঐতিহ্যের নবায়ণ ঘটে, সংস্কৃতির নবনির্মাণ হয়। রবিউল হুসাইন যুক্তি দেখিয়েছেন (২০০৮ ৩১৬), অন্যথায় সমাজ একে অপ্রয়োজনীয় নিরূপণ করত

সর্বজনীন বোধের প্রয়োজনীয়তা এই উৎসবের কার্যকারিতা সমাজের মধ্যে অঙ্কুরিত হয় বলেই এটি উৎসব হিসেবে সমাজে উদ্ভূত হয়েছে এবং এর মূলে সেই সর্বজনীন মানবিকতাবোধের চূড়ান্ত তা যা থেকে উৎসারিত মানবের যাবতীয় কলা মধুময়তা (রবিউল ২০০৮ ৩১৬ )

সর্বজনীন উৎসব পালনে বাঙালি মনের সংকীর্ণতা দূর করতে নানা ভাবেই সচেষ্ট ছিলেন রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর। মানবশিশুর জন্মানুষ্ঠান থেকে শুরু করে বিবাহ বা শ্রাদ্ধ অনুষ্ঠানকেও সবার অংশগ্রহণে স্মরণীয় করতে তিনি উদ্যোগি হন এভাবে

জন্মোৎসব হইতে শ্রাদ্ধানুষ্ঠান পর্যন্ত কোনোটাকেই আমরা ব্যক্তিগত ঘটনার ক্ষুদ্রতার মধ্যে বন্ধ করিয়া রাখি নাই। এই সকল উৎসবে আমরা সংকীর্ণতা বিসর্জন দিই সেদিন আমাদের গৃহের দ্বার একেবারে উন্মুক্ত হইয়া যায়, কেবল আত্মীয় স্বজনের জন্য নহে, কেবল বন্ধুবান্ধবের জন্য নহে, রবাহৃত-অনাতের জ পুত্র যে ঘরে জন্মগ্রহণ করে, সে আমার ঘর নহে, সমস্ত মানুষের ঘরে। সমস্ত মানুষের গৌরবের অধিকারী, লইয়া সে জন্মগ্রহণ করে। তাহার জন্ম মঙ্গলের আনন্দে সমস্ত মানুষকে আহ্বান করিব না? সে যদি শুদ্ধমাত্র আমার ঘরে ভূমিষ্ঠ হইত, তবে তাহার মতো দীনহীন জগতে আর কে থাকিত। (রবীন্দ্রনাথ, ১৯৬৭-৩৯৮)

অসাম্প্রদায়িক উৎসব উদযাপনে যে সাংস্কৃতিক জাগরণ, তার ঐক্যকে শক্তিশালী করতে পারে প্রগতিশীল মানুষ। বাঙালি জাতিসত্ত্বা গঠনে তা বড় ভূমিকা রাখবে বলে মনে করেন রবীন্দ্রনাথ।

এই জীবন-তৃষ্ণা ও জীবন-দর্শনই বাঙালির জাতিগত ঐতিহ্যের মূলগত ভিত্তি, তার প্রাণপ্রবাহের মূলগত ধারা উল্লেখ করে সরকার আবদুল মান্নান (২০০৮ ৩৪৪) বলেন, যারা এর প্রতিপক্ষ তারা নিঃসঙ্গ ও আগন্তক। তারা আমাদের কেউ নয়।

অসহিষ্ণু সমাজে হিংসা ও দ্বন্দ্বের অন্ত প্রভাব থেকে মুক্ত হয়ে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতিতে বাঙালিকে ঐক্যবদ্ধ করে সর্বজনীন উৎসব। সৃষ্টির কল্যাণে আত্মনিয়োগ – এই চেতনাকে ধারণ করে, প্রীতিময় এক আনন্দযজ্ঞ হয়ে ওঠে এই উৎসবগুলো। ঈদ, পূজা, বড়োলি, যুদ্ধপূর্ণিমার মতো ধর্মীয় উৎসবগুলো সর্বজনীন হলেও, মানবকল্যাণ এর মূল বাণী। ধর্মীয় এই উৎসবের রয়েছে কল্যাণকামী সামাজিক প্রভাব, যা চিরন্তন।

তেমনি ঋতুভিত্তিক উৎসব, ঐতিহাসিক উৎসব, বিজয় উপসব, রাজনৈতিক বা সাংস্কৃতিক উৎসবের মতো সর্বজনীন উৎসবগুলো এদেশের ঐতিহ্যের সাথে যুক্ত। এই উৎসব উদযাপনের পেছনে সুচিন্ত সাংস্কৃতিক গোষ্ঠীর অসাম্প্রদায়িক ভাবনা যেমন ক্রিয়াশীল, পাশাপাশি সর্বজনীন উৎসব উদযাপনকে তারা একপ্রকার চিরমুক্তির সচেতন প্রকাশ বলে মনে করেন।

সর্বজনীন উৎসবের সামাজিক চালচিত্র

বলা হয়ে থাকে, সামাজিক-সাংস্কৃতিক নৈরাজ্য রোধে সচেতন মহল সক্রিয়। ফলে সাংস্কৃতিক শক্তির কাছে। সাম্প্রদায়িক অপশক্তি বরাবরই পরাজিত। আশা জাগানিয়া এমন ভাবনার পরও রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর অনুধাবন করেছিলেন উৎসবের সামাজিক অবস্থানগত প্রতিকূলতার দায় এক অর্থে মানুষেরই। তিনি লিখেছেন

হায়, এখন আমরা আমাদের উৎসবকে প্রতিদিন সংকীর্ণ করিয়া আনিতেছি। এতকালে যাহা বিন্যারসাগুত মাসলের ব্যাপার ছিল, এখন তাহা ঐশ্বর্যমদোদ্ধত আড়ম্বরে পরিণত হইয়াছে। এখন আমাদের সংকুচিত, আমাদের দ্বার রুদ্ধ।

এখন কেবল বন্ধুবান্ধব এবং ধনিমানী ছাড়া মঙ্গলকর্মের দিনে আমাদের ঘরে আর কাহারো স্থান হয় না। আজ আমরা মানनসাধারণকে দূর করিয়া নিজেকে বিচ্ছিন্ন-জুল করিয়া, ঈশ্বরের বাধাহীন পরিপ্রকাশ হইতে বঞ্চিত করিয়া বড়ো হইলাম বলিয়া কল্পনা করি। আজ আমাদের দীপালোক উজ্জ্বলতর খাদ্য প্রচুরতর আয়োজন বিচিত্রতর হইয়াছে কিন্তু মঙ্গলময় অন্তর্যামী দেখিতেছেন। আমাদের শুষ্কতা আমাদের দীনতা আমাদের নির্লজ্জ কৃপণতা। (রবীন্দ্রনাথ ১৯৬৭ ৩৯৮)

উৎসবে ক্ষমতাসীন প্রভাব কখনই কাম্য নয়। ধর্মের বিধি নিষেধ না থাকলেও, সমন্বিত কোন কোন উৎসবে সকল সংকীর্ণতা ছাপিয়ে সব ধর্মের মানুষের প্রাণবন্ত উপস্থিতি দেখা যায়, এ প্রশ্নই যেন মুখ্য হয়ে ওঠে। অথচ বিশ্বদরবারে নিজের সাংস্কৃতিক নিজস্বতা তুলে ধরতে অসাম্প্রদায়িক উৎসবের বিকল্প আর কিছু নেই। বাংলা নববর্ষের প্রধান বৈশিষ্ট্য তুলে ধরেন মুনতাসীর মামুন। তাঁর (১৯৯৪ ৯৪) মতে, এটি হিন্দু বা মুসলমান বা বৌদ্ধের একক কোন উৎসবের দিন নয়। এটির চরিত্র সর্বজনীন। আসলে, ধর্মভিত্তিক নয় কিন্তু সর্বজনীন এমন উৎসব পৃথিবীতে বিরল। তিনি লিখেছেন

বাঙালি ধার্মীক ছিল বটে, তবে খুব কম সময়েই ধর্মের কারণে তারা উন্মত্ততা দেখিয়েছে। তাদের ধর্মে এবং উৎসবে এত লোকায়ত উপাদানের অনুপ্রবেশ ঘটেছে যে, যার ফলে, বিভিন্ন সম্প্রদায়ের মধ্যে সহনশীলতা জেগেছে একে অপরের ধর্মকে শ্রদ্ধা করতে শিখেছে। (মুনতাসীর মামুন, ১৯৯৪ ভূমিকা )

তবে, এর বিপরীত চিত্রও অনেক সময় কলুষিত করে সমাজব্যবস্থাকে। এর উল্লেখ আছে যতীন সরকারের প্রবন্ধে
বিভিন্ন সম্প্রদায়ভুক্ত উচ্চবিত্ত ও মধ্যবিত্তদের পরস্পর-বিরোধী স্বার্থের টানাপোড়েনে যখন দেশের সাম্প্রদায়িক আবহ বিষাক্ত হয়ে উঠেছে, তখন বরং পরম পবিত্র ধর্মীয় উৎসব গুলোকেও সাম্প্রদায়িক বিদ্বেষের কলুমে ডুবিয়ে দেওয়া হয়েছে একান্ত অবলীলায় ও নির্বিবেক হৃদয়হীনতায়।

দোলযাত্রা ও কোরবানির ঈদকে কেন্দ্র করে এদেশে যে এ সময় নারকীয় বীভৎসতার প্রদর্শনী চলেছে, উৎসবের পরিণতি ঘটেছে ভ্রাতৃঘাতী পৈশাচিকতায়, সেই সব দুঃস্বপ্নের পুনরাবৃত্তি ঘটতে থাকুক, সুস্থ চিন্তার অনুসারী মানুষ কখনো তা চান না, ধর্মীয় উৎসবে ধর্মের মর্মের উদার প্রকাশই তাদের কামা।

তাই তারা এমন উৎসবেরও সন্ধান করে যে-উৎসব সাম্প্রদায়িকতার কলুষমুক্ত সম্প্রদায়-নির্বিশেষে সমগ্র জাতি ঐতিহ্যিক সম্পদ (যতীন সরকার, ২০০৮ 008)

অসাম্প্রদায়িক উৎসব পালনের বিরোধী অপশক্তি, স্বার্থবাদী মহল এই সমাজেই অবস্থান করে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করেন রবিউল হুসাইন :

মাঝে মধ্যে এই ধারণা সমাজে প্রচলিত যে, চারদিকে অবক্ষন ও ভাঙনের প্রতিকারও, খুন, বিশৃণলতা, জনসংখ্যার অস্বাভাবিক চাপ, অগণতান্ত্রিকতা, অবক্ষয়- সব মিলে একটি ভয়াবহ চালচিত্র এর বিরুদ্ধে জনমত প্রকাভাবে তৈরি হয় এইভাবে যে পরমতসহিষ্ণুতা অবশ্যই জড়িত হবে সমাজের রন্ধে রন্ধে যেহেতু সর্বজনীন উৎসবগুলো এই সমাজে এখনো প্রকভাবে বিরাজিত ও প্রভাতিরূপে অবস্থান করছে। রবিউল ২০০৮ ৩১৬-১৭)

ধর্মনিরপেক্ষতার প্রতায় প্রগতিশীলেরাও এখন আর ব্যক্ত করেন না। অসাম্প্রদায়িক ভাবনাও তাদের জোড়ালো নয়, এমন আক্ষেপ করে সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী এর কারণ তুলে ধরেন

বিদ্যমান ব্যবস্থায় মানুষের অভাব, নিরাপত্তাহীনতা ও বেকারত্ব বাড়ছে, মাদকাসক্তি মানুষকে পঙ্গু করে নিচ্ছে, ধর্ষণ ও নারী নির্যাতন ঘটছে তা সড়কে রীতিমতো নরহত্যা চলছে, তম, খুন, বিচারবহির্ভূত হত্যার ওপর কোনো নিয়ন্ত্রণ নেই, জবাবদিহি এখন লজ্জায় মুখ দেখায় না, বিপর্যন্ত প্রকৃতি ও পরিবেশের নীরব ক্রন্দন কেউ শুনছে না। সর্বোপরি, পুঁজিবাদী এই ব্যবস্থা উৎপাদনের শক্তিকে শিকল দিয়ে বেঁধে রেখেছে, যে জন্য দারিদ্র দূর হওয়ার পথ খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না। (প্রথম আলো, ডিসেম্বর ১৫, ২০১৮ )

 

 

আহমেদ ফয়েজ (২০১৩) একটি সার্বজনীন উৎসব পহেলা বৈশাখ’ নিবন্ধে বলছেন, বাংলা নববর্ষে কেবল সনাতন ধর্মাবলম্বী এবং ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী ব্যতীত অন্য ধর্মের মানুষের সম্পৃক্ততা তেমন চোখে পড়ে না। এর দুটি কারণ ধারণা করে তিনি লিখেছেন, প্রথমত খ্রিষ্টান সম্প্রদায়ের লোকেরা বৃহদাকারে বড়দিন এবং খ্রিষ্টীয় নববর্ষ উদযাপনে আগ্রহী।

অন্যদিকে, মুসলমান মৌলবাদীরা বর্ষবরণের আনুষ্ঠানিকতাকে সনাতন ধর্মীয় রীতি মনে করে, তা প্রতিহত করার চেষ্টায় লিপ্ত থাকেন, এমন কি হিজরি নববর্ষকে উদযাপন প্রাসঙ্গিক বলে মনে করেন। ফলে বর্ষবরণের স্বতঃস্ফূর্ততায় হামলার আশঙ্কা বা কঠোর নিরাপত্তা বেষ্টনি উৎসব আমেজকে অনেকাংশে ক্ষুণ্ণ করে। অন্যদিকে, ২৫ বৈশাখ বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বীদের সবচেয়ে বড় ধর্মীয় উৎসব বৌদ্ধ পূর্ণিমা নির্ধারিত হওয়ায়, বাংলা নববর্ষ তাদের তেমন আন্দোলিত করে না। এদিকে, ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীদের অনেকেই বুদ্ধের অনুসারী।

তারা চৈত্র সংক্রান্তি এবং পহেলা বৈশাখে প্রায় ৫ দিনব্যাপী ঐতিহ্যবাহী বৈসাবি উৎসবের আয়োজন করে। অবস্থা পর্যবেক্ষণে ফয়েজ এই সিদ্ধান্ত দেন যে, বর্ষবরণ মূলত সনাতন ধর্মসম্প্রদায় এবং ক্ষুদ্র জাতিসত্তার অংশগ্রহণকারীদের উৎসব। তবে নতুন ধান ওঠাকে কেন্দ্র করে বাঙালির নবান্ন উৎসবে অংশ নেয় জাতি-ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে সবাই। তাই নবান্ন উৎসবকেই তিনি বাঙালির সর্বজনীন উৎসব বলে মনে করতে আগ্রহী।

বাংলা বর্ষবরণ উৎসবেই ধর্ম-নিরপেক্ষ জাতীয়তাবাদ তথা সর্বজনীনতাকে আবিষ্কার করে বাঙালি মধ্যবিত্ত বুদ্ধিজীবী সমাজ। পহেলা বৈশাখ দিনটি অর্জন করে রাষ্ট্রীয় মর্যাদা। কিন্তু শেষ রক্ষা যেন হয়েও হলো না। শিক্ষিত মধ্যবিত্ত নাগরিক সম্প্রদায় সমাজের সর্বস্তরে কাঙ্ক্ষিতরূপে এ উৎসবের বিকাশ ঘটাতে পারল না।

এ রকম খণ্ডীভবন কোনো উৎসবেরই মর্যাদা বাড়ায় না, উল্লেখ করে যতীন সরকার ( ২০০৮: ৩০৪ ) লেখেন, যা হতে পারতো সমস্ত বাঙালির জাতীয় উৎসব, বস্তুত তা-ই জাতির এক সংখ্যালঘিষ্ঠ অংশের বাৎসরিক পার্বণ মাত্র হয়ে রইলো। এটা তার উৎসবত্ত্বের অবমাননাই করে। যা খণ্ডিত, যা সংকীর্ণ, যা সকলকে অভিন্ন মিলনক্ষেত্রে উদার আমন্ত্রণ জানায় না, তাকে উৎসব’ অভিধা দেওয়া শব্দটির অপপ্রয়োগ বলে মত দেন তিনি।

পাশাপাশি শফি আহমেদ যুক্ত করেন- স্বাধীনতা দিবস ও বিজয় দিবস যেন ঠিক ধর্মনিরপেক্ষ উৎসব হিসেবে গণ্য হয় না। কারণ, এই দুটি উৎসবের সাথে বাঙালির রাজনৈতিক ইতিহাস ও রাজনৈতিক দল জড়িত থাকে। তাই এই রাজনীতি-গন্ধী উৎসবকে সমগ্র বাঙালির বলে উল্লেখ করা যেন অরাজনৈতিক ব্যক্তিদেরও অন্তর্ভুক্ত করার সামিল, যা সুবিধাবাদীদের কোনোভাবেই কাম্য নয়। এই মন্তব্যের বিশদ ব্যাখ্যা করে লিখেছেন :

যে মুক্তিযুদ্ধে দেশের আপামর অংশগ্রহণ করেছে প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে, তার আরম্ভ এবং সমাপ্তি বিন্দুকে শুধু “জাতীয়’ আখ্যা দিচ্ছি, বলছি না ‘ধর্মনিরপেক্ষতার’ উৎসব। ‘জাতীয়’ শব্দটি এমনই সমতাসূচক যে, তার জন্য ‘ধর্মনিরপেক্ষতার ব্যাজ’ আর অপরিহার্য নয়, একথা স্বীকার করি। কিন্তু তা হলে একুশে ফেব্রুয়ারি ও প্যালা বৈশাখের ক্ষেত্রে আমরা আবার ওই অভিযা প্রয়োগে অতোটা মুখর হবো উঠি কেন।

… নববর্ষের সাথে একুশে ফেব্রুয়ারির অথবা স্বাধীনতা দিবস এবং বিজয় দিবসের চি একটা বিশেষ ভিন্নতা আছে এবং তার সঙ্গে আমাদের সমাজ, সংস্কৃতি ও ইতিহাসের তাৎপর্যপূর্ণ যোগ রয়েছে। নববর্ষ ভিন্ন অন্য তিনটি দিনই আমাদের সমকালীন ইতিহাসের সঙ্গে জড়িত। (শফি, ২০০৮: ৩২৩-৩২৪)

তাঁর মতে (২০০৮ – ১২৫) নববর্ষের সঙ্গে একুশে ফেব্রুয়ারি, ছাব্বিশে মার্চ বা খোলই ডিসেম্বরের আর এক বড় ভিন্নতা হলো, আমাদের জীবন ও ঐতিহ্য এর মধ্য দিয়েই বেড়ে উঠেছে নববর্ষ। এই দিনটি আমাদের অর্জন করতে হয়নি। পয়লা বৈশাখের সঙ্গে কোনো রক্তপাতের যোগ বা আন্দোলন পরিক্রমা নেই। বাংলা বর্ষবরণ আমাদের ঐক্যবদ্ধ ধর্মনিরপেক্ষ সাংস্কৃতিক অভিযাত্রার ফল। তিনি বলেন, এজন্যই হয়তো প্রাকরণিক অর্থে নববর্ষ ‘রাষ্ট্রীয়ভাবে’ পালিত হয় না। অথবা আমরা আলাদাভাবে বলি না নববর্ষের বা পয়লা বৈশাখের চেতনা।

পাশাপাশি এমন মতও উঠে আসে, নববর্ষ ছাড়া সামাজিক ভিত্তিতে বাঙালির সম্প্রদায়-নিরপেক্ষ কোনো জাতীয় উৎসব নেই, যে উৎসব আমাদের সাংস্কৃতিক অঙ্গনে জাতিসত্তাভিত্তিক একটি অসাম্প্রদায়িক সর্বজনীন উৎসবের স্থান পূরণ করতে পারে, যেখানে ধর্মবর্ণ নির্বিশেষে বাংলাদেশবাসী যে কোনো মানুষ যোগ দিতে পারে। যে উৎসব উদযাপনে কোনো বাধা নেই, জাতীয় জীবনে তা হয়ে উঠতে পারে সবার এমন ভাবনায় সহমত প্রকাশ করেন আহমদ রফিক :

একুশে ফেব্রুয়ারি তথ্য শহিদ দিবস প্রকৃতই শোকদিবস এবং সেই সঙ্গে প্রতিবাদ-প্রতিরোধ ও সংগ্রামের প্রেরণাদায়ী প্রতীকী দিবস, কোনো ক্রমেই উৎসব দিবস নয়, কোনো হিসেবেই নয়। ঈদ, দুর্গাপূজা, বুদ্ধপূর্ণিমা বা ক্রিসমাস দিবসগুলো নিতান্তই সম্প্রদায় বিশেষের ধর্মীয় সামাজিক উৎসব। একমাত্র পয়লা বৈশাদই সবদিক বিচারে জাতীয় উৎসবের শূণ্যতা পূরণ করতে পারে। (আহমদ রফিক, ২০০৮ ১৮৪)

তবে, বর্তমানে বাংলাদেশের মানুষ এমন একটা সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির সময়ে বসবাস করছে, যখন মানুষ নির্বিঘ্নে পূজা করতে পারছে। পারছে বলেই পূজা মণ্ডপের সংখ্যা বৃদ্ধি পাচ্ছে এবং এখানে হিন্দু, বৌদ্ধ, খ্রিষ্টান, মুসলমানসহ সকল ধর্মের মানুষ পূজা মণ্ডপে যাচ্ছে, এমন মত সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব অরূপ রতন চৌধুরীর (সাক্ষাৎকার ৩)। তিনি বলেন, সবাই একসাথে পূজা দেখতে আসছে, আরতির সময় হাজার হাজার মানুষ আরতি দেখছে। সেখানে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান সবাই উপভোগ করছে, এক সাথে প্রসাদ খাচ্ছে। এই যে একটা মহানন্দ, মহামিলন এই মহোৎসবে বাংলাদেশ পূর্ণতা পেয়েছে।

উপর্যুক্ত আলোচনার সূত্র এই বলে, বাঙালি জাতির জীবনে সাম্প্রদায়িক প্রভাবমুক্ত উৎসবকে সর্বজনীন উৎসব বলে অভিহিত করা হয়। যে উৎসবে সব রকম মানুষের প্রাণবন্ত উপস্থিতি কাম্য। তবে উৎসব সর্বজনীন হয়ে ওঠার আদিলগ্নটা খুব অনুকূল ছিল না। আর মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশে তা ছিল অনেকাংশেই প্রতিবন্ধকতা স্বরূপ। কারণ বাঙালির ধর্মানুশাসিত রীতি-প্রথা অনেক ক্ষেত্রেই নিরুৎসব, বিষণ্ন।

নানা বন্ধুর সময়পরিক্রমার পর শিক্ষিত মুসলমান শ্রেণির প্রতিনিধিত্বে, ধীরে ধীরে প্রসার লাভ করে জন্ম, মৃত্যু, বিয়ের মতো পারিবারিক আয়োজনগুলো । এরপর সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও সাংগঠনিক শক্তিতে বলীয়ান হয়ে বাঙালি উৎসব উদযাপনে উদ্যোগী হয়। সাথে যুক্ত হয় বর্ষবরণ, জাতীয় দিবস, মেলা বা কৃষিভিত্তিক উৎসবও।

দেখা যায়, এই উৎসব শুধু সামাজিক শক্তিকেই ঋদ্ধ করে না, মানব জীবনে আনন্দের অনুরাণ উৎস হয়ে ব্যক্তির অন্তলোক ও বৈষয়িক জীবনকেও আলোকিত করে। তাই বলা যায়, শ্রেণিবৈষম্যভেদে কোনো উৎসব সর্বজনীন হয়ে ওঠে তখনই, যখন সে দেশের মধ্যবিত্ত শ্রেণির অর্থনৈতিক সামর্থ্য থাকে, পাশাপাশি প্রধান্য পায় নির্মল বিনোদনগত চাহিদাও। যদিও একথা অস্বীকার করা যায় না যে, ধর্মীয় সংকীর্ণতা আর সামাজিক নিরাপত্তাবোধের অভাব উৎসব উদযাপনের আকাঙ্ক্ষা যেমন স্নান করে দেয়, তেমনি প্রাণহীণ উৎসব একটি জাতিকে করে তোলে নি প্রাণ।

সর্বজনীন উৎসব একটি জাতির রুচিশীল সংস্কৃতির নির্ণায়ক। উৎসবকে অর্থবহ করে তুলতে শুধু বৈচিত্র্যময়তাই যথেষ্ট নয়, জাতীয়তাবাদী চেতনা নিয়ে একে পৌঁছে দিতে হয় এর শেকড়ের কাছে, অর্থাৎ গ্রামাঞ্চলে খেটে-খাওয়া মানুষের উদযাপন সামর্থ্যের কাছে। সেই সাথে সুস্থ সংস্কৃতির বিকাশে জাতীয় সংস্কৃতির বিকাশ ঘটাতে সর্বস্তরের মানুষের উদ্যোগী হওয়াও আবশ্যক। তবেই আশা করা যেতে পারে, বাঙালি জাতিসত্তার অসাম্প্রদায়িক চেতনার ভিত্তি নির্মাণে সহায়ক হবে সর্বজনীন উৎসব।

Exit mobile version