আজকে আমাদের আলোচনার বিষয়ঃ সরদার জয়েনউদ্দীন। যা বাংলাদেশের উপন্যাসে নৈতিক বিবেচনার যুদ্ধোত্তর কালে প্রকাশিত যুদ্ধপূর্ব কালের উপন্যাসে নৈতিক বিবেচনা এর অন্তর্গত।

সরদার জয়েনউদ্দীন
সরদার জয়েনউদ্দীন ১৯২৩ সালে পাবনা জেলার কামারহাটি গ্রামে ১ মার্চ জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর কলেজ বা বিশ্ববিদ্যালয়ে উচ্চতর শিক্ষালাভ করা সম্ভব হয়নি। তিনি দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে সেনা বাহিনীত যোগ দিয়েছিলেন। দেশ বিভাগের আগে কলকাতায় বসবাস করছিলেন, বিভাগোত্তরকালীন ঢাকায় স্থায়ীভাবে বসবাস করেন।
১৯৫৫ সালে শিশু পাক্ষিক ‘সেতারা’ ও কিশোর পাক্ষিক ‘শাহীন’ নামে তাঁর সম্পাদনায় ঢাকা থেকে প্রকাশিত হয়। ঢাকার জাতীয় গ্রন্থ কেন্দ্রের পরিচালক পদে ১৯৬৫-৭৭ নিযুক্ত ছিলেন। এ সময়ে ‘বই’ পত্রিকা তিনি সম্পাদনা করেন।
১৯৭৭-৮০ সালে বাংলাদেশ স্কুল টেকস্ট বুক বোর্ডের পরিচালক পদে তিনি কর্তব্য পালন করেন। সাহিত্যে অবদানের জন্য ১৯৬৭ সালে তাকে বাংলা একাডেমী পুরষ্কৃত করে। তাঁর উপন্যাস –
‘পান্নামোতি’ (১৯৬৪), নীল রং রক্ত’ (১৯৬৫), ‘আদিগন্ত’ (১৯৬৫), অনেক সূর্যের আশা’ (১৯৬৬), ‘বেগম শেফালী মীর্জা’ (১৯৬৮), ‘বিধ্বস্ত রোদের ঢেউ’ (১৯৭৫) ‘শ্রীমতী ক ও খ এবং শ্রীমান তালের আলী’ (১৯৭৩) ইত্যাদি।
তাঁর আদর্শবাদিতায় উপন্যাসে এসেছে আর্থ-সামাজিক, সাংস্কৃতিক, রাজনৈতিক চেতনায় নিম্নবিত্ত সমাজের বাঙালি মুসলমানের আকাঙ্ক্ষা, ব্যর্থতা, স্বপ্নভঙ্গ প্রভৃতির বাস্তব সাক্ষ্য। এছাড়া তিনি যুদ্ধ, দুর্ভিক্ষ, দাঙ্গা, ভাষা-আন্দোলন অর্থনৈতিক বিপর্যয়ে মানুষের নৈতিক পরাভব অত্যন্ত সহানুভূতির সাথে অন করেছেন।
সরদার জয়েনউদ্দীন ‘শ্রীমতী ক ও খ এবং শ্রীমান তালেব আলী’ (১৯৭৩) উপন্যাসে যুদ্ধোত্তর সময় পরিসরে ক্ষয়িত, যন্ত্রণাদগ্ধ, বিদীর্ণ সমাজ পরিবেশের চিত্র উন্মোচিত করেছেন। এ উপন্যাসের নায়ক শ্রীমান তালেব আলী একজন বিকৃত, স্বপ্নভঙ্গ, আত্মভূক, বিশৃঙ্খল সমাজ ব্যবস্থার মধ্যবিত্ত হতাশাগ্রস্থ জীবনের যৌনাকাঙ্ক্ষীর প্রতীক।
স্বাধীনতার পরে দেশে রাজনীতি বলতে হিল অবক্ষয়িত নেতৃত্বের প্রভাব। জনসাধারণে দেখা দিয়েছে অমীমাংসিত দ্বান্দ্বিক মনোবৃত্তি। উপন্যাসের কথক রশীদ আহম্মদের ‘বিকৃতি ও রিরংসার সমান্তরালে সমকালীন সামাজিক রাষ্ট্রিক পরিস্থিতি, রাজনৈতিক অস্থিরতা, অর্থনৈতিক সংকট, যুবহতাশা মূল্যবোধের দ্বন্দ্ব অনাস্থা দেখা দিয়েছে।
দেশে এ সময়ে ব্যক্তি সমষ্টিতে দেখা যায় বিকার, হত্যা, চুরি, ডাকাতি, অভাব, দুর্ভিক্ষ, খুন অপহরণ, ধর্ষণ নিবেকবুদ্ধির দর্শনহীন পরিস্থিতি। বঙ্গবন্ধু এ দেশে মানুষের জন্য সোনার দেশের প্রতিষ্ঠা চেয়েছেন। তিনি সীমাহীন ঔদার্যময় ব্যক্তি। তিনি স্বাধীনতা বিরোধীদের ক্ষমা করেছেন।
দেশের প্রতিটি মানুষের কল্যাণ চেয়েছেন। কিন্তু দেশ বিভক্তিতে প্রশাসন যন্ত্রে থেকে যায়। স্বাধীনতা কামীর চেয়ে স্বাধীনতা বিরোধী শক্তি বেশি। আর্থ-সামাজিক, রাজনৈতিক অঙ্গনের অপ্রতিষ্ঠিত বিকাশে দেশের মানুষের স্বপ্ন বাস্তবে রূপান্তরিত হয় না। তাই দেখা যায় রশীদ আহম্মদ নৈতিক অনৈতিক দোলাচলে নিজেকে জড়িয়েছেন।
তবে তার নৈতিক মন মানসিকতায় দেখা যায় গোয়ালন্দ থেকে আসার সময় হেমগঞ্জ বাজারে যে ডাকাতি হয় দুপুর পৌনে বারোটায় তাতে মানুষের রক্তের দাগ সম্বন্ধে সারেং বলছেন ‘মানুষের রক্ত পায়ে মাড়াতে নেই, গোনাহ্ হয়। সে জন্যই ফ্লোরটা ধুয়ে দিতে চেয়েছিলাম।
তা যখন আপনারা শুনলেন না, তখন উঠুন। আমার কাজ আমি করেছি আল্লাহ যেন আমার গোনাহ মাফ করেন। আবার রশীদ আহম্মদের বাহাত্তুর সালের এবং স্বাধীনতার পরের অভিজ্ঞতার বর্ণনায় প্রকাশ পায় সকালে ব্যাঙ্কে, বিকালে লঞ্চে ডাকাতি, রাতে মটরকার হাইজ্যাক, সালারা বাহাতুর সালের বাংলাদেশটা পেয়েছিস কি? অর্থাৎ ৭২ সালের বাংলাদেশ ছিল অত্যন্ত অসংগঠিত, মূল্যবোধের অভাবে অর্থহীন।
রশীদ আহম্মদ একজন বয়স্ক লোক। কিন্তু শ্রীমতী ‘ক’ এর অপারেশনে তার বাধা আসলে আমাদের কাছে এই বয়স্ক সাহিত্যিক লোকটি আরেকবার নীতিবান হয়ে দেখা দেয়। আমার জীবনের মূল্য দিয়ে হলেও তাকে সাহায্য করবোই। ন্যার নীতি মূল্যবোধ যা কিনা এই কিছুদিন পূর্বেও বাংলার মানুষের অলঙ্কার ছিল, তা থেকে অন্তত আমার বয়সী লোকেরা ভয় কিংবা শঙ্কায় নিবৃত হতে পারে না। কিছুতেই না।

পরিশেষে উপন্যাসে দেখা যায় আবদুর রশীদ দ্বিতীয় বিয়ের মানসিকতা নিয়ে শ্রীমতী ‘ক’ এর কাছে এগিয়ে যায়। বিকারগ্রস্থ অসঙ্গতি, সামাজিকতায় বেড়ে উঠা সময় সংলগ্ন পরিবেশে আক্রান্ত তালেব আলিকে দেখে রশীদ আহম্মদ পিছিয়ে আসে। এবং স্বাভাবিক চৈতন্যই তাকে পরে সামনের দিকে এগিয়ে নিয়ে যায়। নায়ক তালেব আলী সময় স্বভাবের বিশেষ অসংলগ্ন মন মানসিকতায়ই আবার ‘খ’ কে বাদ দিয়ে শ্রীমতী ‘ক’ এর কাছে ফিরে এসেছে বিবাহিত জীবনের প্রত্যাশা নিয়ে।
ঔপন্যাসিক এই উপন্যাসে যন্ত্রণা আক্রান্ত প্রতিকূল সময়ের অমীমাংসীত করুণ নির্মম, ক্লেদাক্ত, ভগ্ন প্রতিচ্ছবির বাস্তবতার প্রতিফলন ঘটিয়েছেন। একজন নৈয়ায়িক ঔপন্যাসিক মনে করেন, কাহিনীর বিশ্লেষণে অন্তত যাই থাক, কিন্তু শেষাংশে তা যেন হয়ে উঠে মধুরমিলন। আদর্শপরায়ণ ঔপনাসিক তাই তালেব আলীর ক্রম উন্নতি মানদণ্ডের বিচার্যে এবং ফিরে আসাকে কেন্দ্র করে সমাজ ও পারিবারিক কল্যাণে শ্রেয়োনীতির পরিচয় নিহিত রেখেছেন।
সরদার জয়েনউদ্দীনের ‘বিধ্বস্ত রোদের ঢেউ’ (১৯৭৫) অভিন্ন ও অখণ্ড ইতিহাস কাল পরিসরের ‘অনেক সূর্যের আশা’ (১৯৬৬) এর দ্বিতীয় খণ্ড। ভাষা আন্দোলনের প্রাগরসর রূপায়ণে ‘বিধ্বস্ত রোদের ঢেউ’ প্রথম রচিত হয়। এ গ্রন্থের বিশাল আয়তনে ঔপন্যাসিক পাকিস্তান প্রতিষ্ঠা পরবর্তী বাঙালি মুসলমানের স্বপ্নভঙ্গ, দ্বিজাতিতত্ত্বের অসারত্ব, নবগঠিত পাকিস্তানি প্রশাসনের চক্রান্ত-শাসন-নিপীড়ন, প্রগতিশীল রাজনীতির পুনরুত্থান তে-ভাগা আন্দোলন, ভাষা সংগ্রাম প্রভৃতি প্রসংগের বিন্যাস দেখিয়েছেন।
১৯৪৬ সালের শেষ থেকে ১৯৫২-এর ২১ ফেব্রুয়ারি সময়সীমায় সমসাময়িক ঘটনা প্রবাহে আর্থসামাজিক রাজনৈতিক সমাজজীবনের পটভূমিতে ঔপন্যাসিক শোষণ, ধর্ম ও ইসলাম নামে বাঙালি জনমানসের গতিরোধ, সামন্তবাদ ও পুঁজিবাদের বিরুদ্ধে সমাজতান্ত্রিক সাম্যে দেশের কল্যাণ আনয়ন, কেন্দ্রীয় চরিত্র আত্মকথক লেখক রহমাতের মধ্যদিয়ে বাঙালি জাতিসত্তার বিশ্লেষণে নৈয়ায়িক নীতি নিষ্ঠ প্রতিবাদ উন্মোচন করেছেন।
আত্মবিশ্লেষক প্রাক্তন সামরিককর্মী রহমত, এই উপন্যাসে বর্ণনাভঙ্গির মাধ্যমে উদ্ভাসিত হয়েছেন। দেশ ভাগ ও পাকিস্তান সৃষ্টির কিছু পরেই বাঙালি মুসলমান সমাজে দেখা যায় স্বপ্নভঙ্গের বেদনা। কলকাতা হয়েছে হিন্দুস্থান।
স্বাধীনতার পরে চিত্রকর কলিম, হাতেম, সমাজকর্মী সুজিতদা, সাপ্লায়ার মনোয়ার ভাই, সাহিত্যিক রহমত, তারা বর্মণের বাসা ছেড়ে পাকিস্তানে যেতে দ্বিধান্বিত ও ভীত ঢাকার র্যাঙ্কিন স্ট্রিটের আস্তানায় উপনীত হয়ে উপলব্ধি করে স্বাধীনতার হস্তক্ষেপে অবরুদ্ধ, শাসনতান্ত্রিক বড়যন্ত্র, মুসলমান ভ্রাতৃত্বে অবহেলিত সমাজ ব্যবস্থায় সুপরিকল্পিত বিধিনিষেধ। যে আশা নিয়ে পাকিস্তান সৃষ্টি হয়েছিল, যে মুসলমান ভাই ভাই, এক ধর্ম, এক প্রাণ, দেশে আর কোন অভাব থাকবে না সবাই ভালোভাবে খেয়ে পরে বাঁচবে দেখা গেল সে আশায় গুড়েবালি।
বরং ভবিষ্যতে বাঙালিজাত, বাংলা ভাষা আর পূর্ব বাঙলার নাম। ইতিহাস ও মানচিত্র থেকে মুছে যাবে। এই অনিবার্য প্রাগরসর চিন্তা চেতনায় তখন বাঙালি শিক্ষিত তরুণ সমাজ, নিঃস্ব, মঞ্জুর, কৃষক জনসাধারণের মানবিক অধিকার প্রতিষ্ঠায় সংগ্রামী।
কঠিন পরিশ্রম করেও যারা নিজেদের ন্যায্য মূল্য পায়না, অধিকার থেকে বঞ্চিত হচ্ছে উৎপাদিত অর্থ ও সম্পদ থেকে বঞ্চিত হচ্ছে তাদের উদ্দেশ্যে মার্কসিষ্ট হামিদ বলে যায় আমাদের কাজ হবে শ্রমিক মজদুর কৃষক ও বিত্তহীন হা-ঘরে লোকদেরকে তাদের এই ন্যায্য অধিকারের কথা বুঝিয়ে দেওয়া, কে তাদের সম্পদ অপহরণ করছে তাদেরকে চিনিয়ে দেওয়া। কিন্তু আর্মি রহমত, দেশ পাকিস্তান হয়েছে বা মুসলমানের দেশ হয়েছে, সেজন্য পাকিস্তানি মুসলিম সরকারের রাজত্বে তার সমালোচনা বিবেচানয় বলে মনে করে।
কলিমের মত, যারা শোষণ দ্বারা মানুষকে গোলামীতে অভ্যস্ত ও বিত্তহীনে পরিণত করছে, তাদের বিরুদ্ধে সংগ্রাম হচ্ছে মানবিক অধিকার। শিক্ষিত সম্প্রদায় বিভিন্ন আলোচনায় তাদের চিন্তাধারায় রাজনীতির মত ধর্মকে নিয়েও আলোচনা করেন। বড় ভাই বলেন মুসলমানদের একটা প্রগাঢ় বিশ্বাস, সোস্যালিজমের কথা যারা বলে তারা কমিউনিষ্ট এবং কমিউনিষ্ট অর্থই হলো নিরশ্বরবাদী অর্থাৎ আল্লাহ অস্তিত্বে অবিশ্বাসী ।
…. ধর্ম আর রাজনীতি দুটো আলাদা বিষয়। রাজনীতি হলো মূলত অর্থনৈতিক এবং ধর্মের কিছুটা অংশ জাগতিক হলেও বহুলাংশ পারলৌকিক বড় ভাই র-শো থেকে পাঠ করে আরও বলেন, ‘প্রপার্টি ইজ থেস্ট অর্থাৎ সম্পদ-সম্পত্তি মাত্রই চুরি (১০)
এ উপন্যাসে সচেতন বিভিন্ন পেশার তরুণ মুসলমান সমাজ অন্ধকারাচ্ছন্ন বিবর থেকে বেরিয়ে এসে প্রগতিশীল পন্থায় বামপন্থী রাজনীতির বিকাশে নতুন জাতীয় চেতনায় শিল্প সাহিত্য, গণজাগরণের ভিত্তিতে রাজনৈতিক আন্দোলনের কর্মী হয়ে উঠে।
‘পাকিস্তান সাহিত্য শিল্প মজলিস’ ‘পাকিস্তান সাহিত্য সংসদে পরিণত হয়ে আন্দোলনের নেতৃত্বে এগিয়ে এল। পরে দেখা যায় যে রহমত পাকিস্তান সমর্থন করেছে এক সময় কিন্তু পাকিস্তানবাসী ও মোহাম্মদ আলী জিন্নাহর অন্তর্নিহিত ষড়যন্ত্রের অভিপ্রায় অনুধাবন করে মানবিক অধিকার আদায়ে গ্রামে গিয়ে বামপন্থী নিষ্ঠাবান কর্মী হয়ে উঠে। ব্যক্তিগত পাকিস্তানী মালিকানা উচ্ছেদ চায়।
শাস্তি, কল্যাণ, সুন্দর পরিবেশ শোষণ মুক্ত সমাজের জন্য রাজনৈতিক অংশীদার হয়ে পড়ে। সে গ্রামে গিয়ে ফুফুর পাহাড়তুল্য সম্পদের তিনভাগের দুই ভাগ দিয়ে দিতে অনুরোধ করে। জুনিয়র পাশ দেয়া শিক্ষিত কিন্তু দুর্নাম যুক্ত এক মেয়েকে বিয়ে করে। মানুষের মুক্তির জন্য সমাজতন্ত্রের সমাজ সৃষ্টির কাজ করে রহমত মানব ধর্মের সেবায় নিজেকে নিয়োজিত করে। এক সময় তার স্ত্রী সাজেদা ও অন্যান্য মহিলা সমাজ কর্মীদের দীক্ষায় একজন কর্মী ও সমাজতন্ত্রী হয়ে উঠে।
ইতিহাসের বাস্তবসভ্যের আলোকে জটিল সামাজিক পরিস্থিতিতে মানবিক অধিকার আদায়ের কার্যকারণ সমাজতান্ত্রিক নির্দেশনা এত বেশি ঝুঁকিপূর্ণ যে পুঁজিবাদ বা সরকারের বিরুদ্ধে তাদেরকে চলা ফেরা করতে হয়েছে ভীষণ রকন কঠিন বাস্তবতার সন্তর্পনে। ‘কেউ যেন না জানে এমন কি ঘরের গৃহিনী পর্যন্ত না পার্টির বিশ্বস্ত কর্মী হলে ও না ।
এই তরঙ্গায়িত রাজনৈতিক ঘটনাপ্রবাহ ঔপন্যাসিকের জীবন প্রবাহের অনুষঙ্গী হয়ে উঠেছে। তেভাগা আন্দোলনের ভাগচাষী নেতারা ‘জমি চাষ করে যে, জমির আসল মালিক সে’, মন্ত্রে উদ্বুদ্ধ হয়ে সারা দেশে আন্দোলনের ব্যাপক গণজোয়ার সৃষ্টি করে এবং সাম্রাজ্যবাদী পুলিশের নির্যাতনে নিশ্চিহ্ন হয়।

উপন্যাসের শেষে নগরজীবন সন্নিবেশিত গ্রামজীবনের সংঘাতময় অস্তিত্বের জাতীয়তাবাদী চেতনার সংগ্রাম প্রবল হয়ে উঠে। মিছিল, মিটিং, ভাষাআন্দোলনের বিন্যাসে ১৯৫২ এর একুশে ফেব্রুয়ারীর শোভাযাত্রা ও তাতে পুলিশের চরম নির্যাতন, গুলির রক্তাক্ত পরিসমাপ্তি ঘটে। প্রতিবাদী চরিত্রের একাংশ এবং ইতিহাসের বাঙালির চিরশ্রদ্ধার স্মরনীয় ব্যক্তিত্ব হয়ে উঠে রফিক, বরকত, সালাম জব্বার প্রমুখ।
সংঘাত, অস্তিত্বের সংকট, অবস্থার পরিণতি নিয়ে পরের দিন পেপারে মুদ্রিত হয়। এ ঘটনার প্রতিবাদে পরিষদ সদস্য আবুল কালাম নূর উদ্দিনের পদত্যাগের মধ্য দিয়ে বাঙালিকে পুনরায় আশা এবং সফলতার মন্ত্রে উজ্জীবিত হতে দেখা যায়। বাঙালি জাতির অস্তিত্ব সংকট ও জটিল দ্বন্দ্বময় সংগ্রামশীল বহুমুখী চেতনায় স্বাধীন বাংলাদেশের ই সম্ভাব্য ইঙ্গিত সুস্পষ্ট হয়ে উঠেছে।
‘বিধ্বস্ত রোদের ঢেউ’ উপন্যাসে সরদার জয়েন উদ্দিন মানবিক সত্য সুন্দর কল্যাণ, শান্তির দিককে বহুমুখী বাস্তব আবহে দেখিয়েছেন। বিভিন্ন পেশায় নিয়োজিত কল্যাণকামী ব্যক্তি চরিত্রের উন্মেষ লক্ষ্য করা যায় এ উপন্যাসে তেমনি একটি চরিত্র সেবিকা সুরুচি ব্যানার্জীর। তার মতে, মানব সেবার চেয়ে আর কোন মহৎ ধর্ম নেই, মানুষের মধ্যে মানবতার প্রতিষ্ঠাই দেবতার জন্ম দেয়।
সে জন্যেইতো আমি হসপাতালের সেবার কাজ বেছে নিয়েছি। এখানে কোন জাত নেই, জাতের গরিমাও নেই, সব মানুষ এক, সবাই রোগী । ঔপন্যাসিক যেন তার নিজের মনের অন্তসত্যকেই তুলে ধরেছেন। ভাষা আন্দোলনের আবহে বাঙালি জাতির ভাষা প্রতিষ্ঠার অন্বিষ্টই ছিল এ উপন্যাসের শেষে ফলপ্রসূ কার্যকারণ নির্দেশ। ঔপন্যাসিকের লেখনীতে সব সময় ঘটনা আহরণ ও ইতিহাস পরিচর্যাকে সন্নিবেশ করা হয়।
সরদার জয়েনউদ্দীন ঔপনিবেশিক শাসন শোষণের সময় সংলগ্ন যে মানুষের আশা অন্বেষার স্ফুরণ না ঘটতে পারা ও বাঙালি মানসে যে, বাকস্বাধীনতার মূল্যবোধের বিপর্যয় ঘটেছিল তারই প্রতিবাদে এ উপন্যাস সৃষ্টি করেছেন। ঔপন্যাসিক সচেতনতায় মনে হয়েছে, বাঙালি জাতির সত্যপ্রতিষ্ঠার হস্তক্ষেপে লেখনী চালনা দ্বারা প্রতিবাদ না করলে আত্মপ্রতারণার জন্ম দিবে। লেখক নৈতিক বিচার্যে আত্মপ্রতারক হননি, হয়েছেন আত্মপ্রচারক।