আজকে আমাদের আলোচনার বিষয়ঃ মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের উপন্যাস সমাজ সংস্কার। যা মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের পাঁচটি উপন্যাসে জীবন ও সমাজ এর মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের উপন্যাস সমাজ এর অন্তর্গত।
মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের উপন্যাস সমাজ সংস্কার
বাঙালির মানস গঠনে সংস্কার একটি স্থান দখল করে আছে। তাই সাহিত্যে এর প্রভাব অসঙ্গত নয়:
“সাহিত্যের কারবারই মানুষ নিয়ে। মানুষের চিন্তা-চেতনা, আচার-আচরণ, ক্রিয়াকলাপের বিবরণ ও বিশ্লেষণ নিয়েই রচিত হয় সাহিত্য। [… … মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় বিজ্ঞানের একনিষ্ঠ ছাত্র ছিলেন বলে তিনি ছিলেন বস্তুনিষ্ঠ। সাহিত্য সৃষ্টির নামে কল্পনা তথা মিথ্যার আশ্রয় নেয়া তাঁর পক্ষে সম্ভব ছিল না। ”২৩
‘জননী’ উপন্যাসে কিছু সংস্কার পাওয়া যায়। প্রথম সন্তান হওয়ার পর প্রতিবেশীরা যখন উচ্ছ্বসিত প্রশংসা করে শ্যামার মন তখন ভয়ে কেঁপে ওঠে। দেবতারা গোপনে শুনে যদি ছেলের কোনো অমঙ্গল করেন। তাই শ্যামা বলেছিল:
“কানা-খোঁড়া যে হয়নি মাসিমা তাই ঢের।” (১খ, পৃ-২০)
আবার নবজাতকের জন্য ধর্মীয় সংস্কারও কম নয়। নবজাতকের জন্য এগারটি প্রদীপ জ্বালা হয়। জাতকের অতন্দ্রপ্রহরী হয়ে এগার প্রদীপ দিনরাত্রি জ্বলে। প্রতি সন্ধ্যায় শিয়রের কাছে মেঝেতে লেখা হয় দুর্গানাম, সকালে কেউ পা দেবে বলে আঁচল দিয়ে মোছা হয়। শ্যামার এই ছেলেটি বাঁচে নি। এরপর বিধান হলে যখন শীতল বলে ‘এটার পয় আছে’ তখন শ্যামা ভাবে
“পয়মন্ত ছেলে? হয়তো তাই। সব অকল্যাণ ও নিরানন্দের অন্ত করিতে আসিয়াছে হয়তো।” (১খ, পৃ-২৩)
আবার শ্যামা মনে মনে ভয়ও পায়। আশা করলে যদি কোনো অমঙ্গল হয়। সমাজে সংস্কারের যেন অন্ত নেই। বিধানকে বাঁচানোর জন্য দেখা যায় শ্যামা কালীঘাট ও তারকেশ্বরে মানত করে, মাদুলি নেয়, মাদুলির একটিতে প্রসাদি ফুল, একটিতে সন্ন্যাসীপ্রদত্ত ভস্ম, অন্যটিতে স্বপ্নাদ্য শিকড় আছে। শ্যামা প্রতিদিন মাদুলি ধোয়া জল খাওয়ায়, এবং একটি একটি করে মাদুলী ছেলের কপালে ছোঁয়ায়। শ্যামার ছোট মেয়েটি জন্মান্ধ।
শ্যামা চিন্তা করে কার পাপে এই অন্ধ মেয়ে জন্ম নিল। আবার ভাবে বনগাঁয়ে একদিন সন্ধ্যায় সে কলাবাগানে ছায়ার মতো কিছু দেখেছিল কিংবা স্নানের আগে এলো চুলে তেল মাখার সময় পাগলা হানুর বুড়োদিদিমা তাকে দেখেছিল—এসব কারণে তার মেয়ে অন্ধ হতে পারে। উচ্চবিত্ত শ্রেণীতেও এ রকম কুসংস্কার রয়েছে। বিষ্ণুপ্রিয়ার মেয়ে ছাপ নিয়ে জন্মগ্রহণ করে, সবাই একে পাপের ছাপ বলে ।
বিষ্ণুপ্রিয়ার স্বামী মহিম তালুকদার ভীষণ পাপী, তাই তার সন্তান পাপের ছাপ নিয়ে জন্মেছে। “শহরতলীতেও এ রকম সামাজিক সংস্কার দেখা যায়। ধনঞ্জয় রাধাচরণ কবিরাজের কথা বিশ্বাস করে। কবিরাজ বলেছে ধনঞ্জয়ের বউ বাঁচবে না, ছেলে-মেয়ে হতে গেলেই মরে যাবে। ধনঞ্জয়ের দুই বউ ছেলে-মেয়ে হতে গিয়ে মারা গেছে। প্রথম বউ পাঁচ নম্বর ছেলের জন্ম দিতে গিয়ে, দ্বিতীয় বউ প্রথম সন্তানকে জন্ম দিতে গিয়ে মারা গেছে।
কবিরাজ তাই অনুমানের ওপর কিংবা নিজের খেয়ালে দুই বউয়ের মৃত্যু দেখে ধনঞ্জয়কে এই ভবিষ্যৎ বাণী করেছে। আর ধনঞ্জয় কোনো চিন্তা না করে তাই মেনে নিয়েছে। আবার সুধীর ওয়াগন ঠেলে দিয়ে ধনঞ্জয়কে পঙ্গু করে দিলে সে মনে করে তার কোনো পাপের ফলে তার ডান পা-টি কেটে বাদ দিতে হলো। উপন্যাসে অনেক সামাজিক সংস্কারও রয়েছে। যেমন, ময়রার দোকানের মালিক অমাবস্যায় নিশি পালন করে। যশোদা বাড়ি ছেড়ে যাওয়ার সময় সংস্কার বসতবাড়ির উনন ভাঙে।
‘অহিংসা’ উপন্যাসের কাহিনী ধর্মীয় সংস্কারকে কেন্দ্র করে। তবে উপন্যাসে সামাজিক সংস্কারও রয়েছে। রাধাই নদীতে জল আসার সঙ্গে গ্রামের মানুষরা চারবাদলার সম্পর্ক খুঁজে পায়।
তাদের সংস্কার চারবাদলা নামলেই শুকনো রাধাই নদীতে জল আসে, রীতিমতো স্রোত বইতে শুরু করে। চারবাদলা সে টিপটিপ করেই নামুক আর ঝমঝম করেই নামুক। আশ্রমটিই ধর্মীয় সংস্কারের প্রতীক। সদানন্দের চেহারাও সাধুর নির্দিষ্ট ছাঁচে ঢাকা। আসন করে বসলে ভুঁড়ি গিয়ে ঠেকে পায়ের কাছে, বৃষস্কন্ধ বিশাল দেহ, চওড়া বুক, পেশিবহুল সুডৌল বাহু। তার মাথায় জটা নেই বলে ভক্তরা আফসোস করে। সাধু-সন্ন্যাসীর মাথায় জটা থাকবে -এটাও ধর্মীয় সংস্কার।
সন্ন্যাস সম্পর্কেও বিভিন্ন সংস্কার প্রচলিত আছে। সন্ন্যাসীরা গেরস্তের বাড়ি তিনরাত্রির বেশি বাস করতে পারে না। এছাড়া
“সাধু-সন্ন্যাসীর নামে স্ত্রীলোকসংক্রান্ত কুৎসা বলিয়া কিছু হয় না। সাধু-সন্ন্যাসীরা তো সামাজিক জীব নয়, সাধারণ মানুষ নয়। তাদের কথাই আলাদা। স্ত্রীলোক ছাড়াও তাদের সাধনা চলে, স্ত্রীলোক নিয়াও সাধনা চলে যে সিদ্ধিলাভ করিয়াছে, সে মুক্ত পুরুষ, তার আবার ব্যভিচার কীসের?” ( ৩খ, পৃ. ৩৪৬)
‘চতুষ্কোণ’ উপন্যাসে রাজকুমারের দূরসম্পর্কের দিদি মনোরমা। সে রাজকুমারর শুভাকাঙ্ক্ষী। রাজকুমারের ঘনঘন মাথা ধরে এবং তীব্র যন্ত্রণা হয়। এই মাথাধরা সারানোর জন্য মনোরমা রাকুমারকে মাদুলি নিতে বলে। তার মতে, এতে মাথা ধরা না সারলেও উপকার হবে। সে নিজের পক্ষে যুক্তি দেখায়
“ভূতেও তো তোমার বিশ্বাস নেই, কিন্তু রাত দুপুরে একা একা শ্মশানঘাটে গিয়ে দেখো তো একবার, ভয় না করলেও দেখবে কেমন কেমন লাগবে। অবিশ্বাস করেও তুমি একটা মাদুলি নাও, আমার কথা শুনে নাও, মাথার যন্ত্রণা অন্তত একটু কম হবেই।” ( ৪খ, পৃ. ১৩)
বাঙালি সমাজের রন্ধ্রে রন্ধ্রে জড়িয়ে আছে সংস্কার। ধর্মীয় ও সামাজিক সংস্কারে জর্জরিত মানুষের জীবন। সামাজিক-অর্থনৈতিক জীবনের দারিদ্র্য, হতাশা, শ্রেণিবৈষম্য, নির্যাতন এ সকল জগদ্দল পাথরের মধ্যেও সংস্কার মানুষের বুকে আরো একটি জগদ্দল পাথরের মতো চেপে ধরেছে। মানিক এগুলোকে তীব্র ঘৃণার সঙ্গে স্মরণ করেছেন। তাঁর সম্পর্কে বলা যায়:
“সমাজ শরীরের নানা বিচ্যুতি এবং সমাজ-মানসের নানা অসঙ্গতি সম্পর্কে তাঁর প্রচণ্ড অশ্রদ্ধা ছিল। ২৪
সমাজের শরীর থেকে সমস্ত রোগ-শোক-জরা অপসরণের জন্য তিনি এই বিষয়গুলো এনে মানুষকে সচেতন করার প্রয়াসী হয়েছেন।

