মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের উপন্যাস সমাজ সংসারজীবন

আজকে আমাদের আলোচনার বিষয়ঃ মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের উপন্যাস সমাজ সংসারজীবন। যা মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের পাঁচটি উপন্যাসে জীবন ও সমাজ এর মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের উপন্যাস সমাজ এর অন্তর্গত।

 

মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের উপন্যাস সমাজ সংসারজীবন

 

মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের উপন্যাস সমাজ সংসারজীবন

মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় সংসার জীবনের সূক্ষ্মাতিসূক্ষ্ম বিষয় তুলে ধরেছেন। ‘জননী’ উপন্যাসের প্রথমেই দেখি বহুবিবাহ রীতি। শ্যামা শীতলের দ্বিতীয় পক্ষের স্ত্রী। আবার রাখালও দ্বিতীয়বার বিয়ে করে কোনো কারণ ছাড়াই। শাস্তার মৃত্যুর পর অধর দ্বিতীয় বিয়েতে উদ্যোগী হয়।

এ রকম আরো দেখা যায় পদ্মানদীর মাঝিতে কপিলার স্বামী দ্বিতীয় বিয়ে করে। এছাড়া ‘অমৃতস্য পুত্রাঃ’’ উপন্যাসে দ্বিতীয় বিয়ের কারণে বীরেশ্বরের প্রথম স্ত্রী তার একমাত্র সপ্ত নি শ্যামলালকে নিয়ে স্বামীকে ত্যাগ করে।

‘শহরতলী’ উপন্যাসে ধনঞ্জয় দুই বিয়ে করেছে। তার বউ মারা গিয়েছে, সে এখন যশোদার মতো কাউকে বিয়ে করতে চায়। দ্বিতীয় খণ্ডে যশোদার বাড়ির দুপুরের আড্ডায় আসা অমলার পরিচয় দিতে গিয়ে লেখক বলেছেন:

“ইনশিয়োরেন্স এজেন্ট জগদীশের দ্বিতীয় পক্ষের বউ অমলা!…….. …..” ( ৩খ, পৃ.– ২৩৯)

অর্থাৎ সমাজের দ্বিতীয় বিয়েটা স্বাভাবিক ঘটনার মতো করে এসেছে। ‘শুভাশুভ’ উপন্যাসে সমরেশের মামা তিন বিয়ে করে।

স্ত্রীর সম্পত্তির ওপর স্বামীর লোভ সমাজে একটি ব্যাধির মতো লেগে আছে। মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের উপন্যাসে এর চমৎকার প্রতিফলন হয়েছে। ‘জননী’ উপন্যাসে আমরা আরো পাই মেয়ের সম্পত্তির ওপর ছেলেদের লোভ। শীতল একজন ছিটগ্রস্ত মানুষ, তার পরও সে বিয়ে করার জন্য এমন মেরে খুঁজে বের করে যার সম্পত্তি পাবার সম্ভাবনা আছে। শ্যামার মামার সম্পত্তি সম্পর্কে লেখক বলেছেন:

“উত্তরাধিকারীবিহীন এই মামাটির কিছু সম্পত্তি না থাকিলে শীতল শ্যামাকে বিবাহ করিত কিনা সন্দেহ।” (১, পৃ.-)

আবার শ্যামার মামা সম্পত্তি বিক্রি করে দিয়ে নিরুদ্দেশ হলে, শীতল শ্যামাকে নানা রকম অত্যাচার করতে থাকে, শুধু কথার বোঁটা দিয়েই ক্ষান্ত হতো না, তাকে মারধরও করত। কিন্তু শীতল একটি নিয়ম-নীতিহীন বেপরোয়া মানুষ, তার কোনো কর্তব্যবোধ নেই, স্ত্রীর প্রতি কোনো ভালোবাসাও নেই।

সে স্ত্রীকে সম্পত্তি মনে করে যেমন খুশি ব্যবহার করতে থাকে। সমাজের কিছু লোককে এরকম পাওয়া যায়, যারা নিজের দায়িত্বের কথা ভুলে অন্যের দোষ খুঁজতে পছন্দ করে। শহরতলী’ উপন্যাসে দেখা যায় জ্যোতিময় যৌতুক নিয়ে বিয়ে করে

“আয়োজন ভালোই হইয়াছে, চাকুরে জামাইকে টাকা মেয়ের বাপ ভালো রকমেই দিয়াছেন।” ( ৩থ, পৃ.-১২৬)

 

মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের উপন্যাস সমাজ সংসারজীবন

 

‘চতুষ্কোণ’ উপন্যাসে মনোরমা তার দূর সম্পর্কের বোন কালীকে রাজুর সঙ্গে বিয়ে দিতে চায়। সে কালীকে বাড়িতে এনে বিভিন্ন ফন্দি আঁটে। কিন্তু রাজকুমার যখন কালীকে বাড়িতে পাঠিয়ে দিতে বলে তখন মনোরমা শেষ অস্ত্র হিসেবে বলে:
“ওর বাবার অবস্থা খারাপ নয়। মেয়েটাকে সন্তায় তোমার ঘাড়ে চাপানো যাবে বলে চেষ্টা করিনি ভাই।” ( ৪, পৃ. ৮৪)

স্বামী-স্ত্রীর বয়সের পার্থক্য সংসারে একটি অন্যতম প্রধান দিক। শ্যামা আর শীতলের বয়সের পার্থক্য দেওয়া না থাকলেও বোঝা যায় তাদের বয়সের পার্থক্য বেশি। কারণ শীতলের দ্বিতীয় পক্ষের স্ত্রী শ্যামা। তবে, মোহিনী-বকুল, বিধান সুবর্ণের বয়সের পার্থক্য তত নয়, কনক আর অজয়ের বয়সের পার্থক্যও কম। শান্তা আর অধরের বয়সের পার্থক্য বেশি।

অন্যদিকে জ্যোতিময় আর অপরাজিতার বয়সের পার্থক্য অনেক। অপরাজিতার বয়স জ্যোতির্মরের অর্ধেকেরও কম। বয়সের এই পার্থক্যের কারণে দাম্পত্যজীবনের বিভিন্ন টানাপোড়েন পরিলক্ষিত হয়।

সংসার জীবনে মানুষের বৈষয়িক ভাবনা একটি চিরন্তন দিক। শ্যামার মধ্যে এই ভাবনাটি অতি মাত্রায় প্রকট। সে কীভাবে সংসারের উন্নতি করবে তাই তার ধ্যান। দোতলায় ঘর তুলবে, তার সরঞ্জাম সে গুছিয়ে ফেলে। এ দিকে তার মামা এলে মামার গচ্ছিত টাকা আছে কি-না সে কথাও চিন্তা করে।

শীতলের খামখেয়ালির জন্য সমাজে ছোট হয়ে যায় পুরো পরিবার। শ্যামা তখন আরো বিপদে পরে। বিষয় ভাবনায় চিন্তিত শ্যামা প্রথমে একতলা ভাড়া দিয়ে নিজেরা দোতলায় থাকে। তারপর পুরো বাড়ি ভাড়া দিয়ে বনগাঁ চলে যায়। সেখানে গিয়ে সে মানসিক স্বস্তি পায় না।

মন্দা আর রাখাল তাকে বাড়ি বিক্রির কথা বললে বৈষয়িক ভাবনায় সে পীড়িত হয়। বাড়ি বিক্রি করতে চায় না। তারপর শেষ পর্যন্ত সে বাড়িটি রক্ষা করতে পারে না। অতঃপর বিধানের চাকরির পর তাকে বৈষয়িক ব্যপার নিয়ে আর তাকে ভাবতে দেখা যায় না। তখন সব ভাবনা গিয়ে পরে বিধানের ওপর।

উত্তরাধিকার সূত্রে বিধান শ্যামার থেকে ‘সংসারচিন্তা’টি-ই পায়। সে সংসারের বিভিন্ন বিষয় নিয়ে চিন্তিত হয়। শহরতলী তে সত্যপ্রিয়র বৈষয়িক ভাবনা প্রবল। সে জীবন দিয়ে একটি কাজই করেছে-টাকা উপার্জন। যশোদাকে সে বলে

“বছর বছর ব্যাঙ্কের টাকা যে আমার কী করে হু হু করে বেড়ে যাচ্ছে, নিজেই ভালো বুঝতে পারি না।” (৩খ, পৃ. ২০৭ )

‘অহিংসা’ উপন্যাসে বিপিন বৈষয়িক ভাবনায় সারাক্ষণ মশগুল থাকে। আশ্রমের পরিসর বৃদ্ধি করা, ঘর তোলা, আমবাগানসহ তপোবনের জায়গা আস্তে আস্তে সমস্তটা কিনে নেওয়া, আরো লোককে আশ্রমে থাকার ব্যবস্থা করে দেওয়া এ সকল ভাবনায় তার দিন কাটে। আবার যেদিন সদানন্দের কথায় লোকে বিভোর হয়ে যায়, সেদিন তার শীর্ণ স্নানমুখে আনন্দের ছাপ পড়ে

“আজ প্রণামি জুটিবে ভালো।” ( ৩খ, পৃ. ২৭৯)

আশ্রমের উন্নতির জন্য সে কখনো আপস করে, আবার কখনো আপসহীন হয়। আশ্রমটি মহীগড়ের রাজা সাহেবের দান। যত দিন পাকা দানপত্র না হয় বিপিন তত দিন রাজা সাহেব এবং রাজপুত্রকে সমীহ করে চলে। আশ্রমে এলে তাদের জন্য আলাদা ব্যবস্থা হয়। সদানন্দ সর্বসাধারণের সঙ্গে তাদের এক করে দিতে চাইলে বিপিন খেপে যায়। যাদের দয়ায় আশ্রম টিকে আছে তার মতে তাদের একটু সমীহ করে চলা উচিত।

এমন কি ভালো মানুষ মহেশকে রাজা সাহেব দেখতে পারে না বলে আশ্রমে তাকে অপাংক্তেয় করে রাখা হয়। তারপর আশ্রম, আমবাগান বিপিনের নামে এলে তখন রাজা সাহেবের প্রতি তার ভক্তি-শ্রদ্ধা কমে যায়।

মহেশকে তার দরকার বলে মহেশের সঙ্গে আস্তে আস্তে সম্পর্ক ভালো করে তোলে। উপন্যাসের শেষে দেখা যায় এতো কালের পরম বন্ধু সদানন্দকে বাদ দিয়ে মহেশকে দিয়ে আশ্রম চালানোর সিদ্ধান্ত নেয় বিপিন।

সমাজ জীবনের সাংসারিক মানুষ আর সন্ন্যাসজীবনের পার্থক্য জননী উপন্যাসে দেখা যায়। সংসার জীবনের বৈষয়িক চিন্তা, সুখ-দুঃখ, জীবনের নানা ঘটনা, দুর্ঘটনা কোনো কিছুই সন্ন্যাসজীবনে নেই। তারকনাথ শ্যামার সংসারের টানাপোড়েনে নিজের স্মৃতি মন্থন করে

“একটা গেরুয়া কাপড় পরো, গায়ে একটা গেরুয়া আলখাল্লা চাপাও, গলায় ঝুলাইয়া দাও কতগুলি রুদ্রাক্ষ ও স্ফটিকের মালা, তারপর যেখানে খুশি যাও, আতিথ্য মিলিবে, অর্থ মিলিবে, ভক্তি মিলিবে, কত নারী দেহ দিয়া সেবা করিয়া পুণ্য অর্জন করিবে।

ধার্মিকের অভাব কিসের? আজ ধনীর অতিথিশালায় শ্বেতপাথরের মেঝেতে খড়ম খটখট করিয়া হাঁটা, কাল সম্মুখে অফুরন্ত পথ, ভুট্টাক্ষেতের পাশ দিয়া, গ্রামের ভিতর দিয়া, বনের নিবিড় ছায়া ভেদ করিয়া, পাহাড় ডিঙাইয়া, মরুভূমির নিশ্চিহ্নতায়; সন্ধ্যায় গভীর ইঁদারার শীতল জল, সদ্যদোয়া ঈষদুষ্ণ দুধ, থিয়ে ভিজানো চাপাটি, আর ভীরু সলজ্জা গ্ৰাম্য কন্যাদের প্রণাম [… […]।” (১খ, পৃ- ৬০ )

 

মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের উপন্যাস সমাজ সংসারজীবন

 

সমাজ জীবন এরূপ সহজ নয়, তাই তারকানাথের তাল কেটে গেল, সে ভাগ্নির টাকা আত্মসাৎ করে পালালো। এমনই সমাজের রীতি। এই নির্লজ্জ চুরিতে শ্যামা বিপদে পরে, কিন্তু সে হতাশায় নিজেকে গুটিয়ে নেয় না, প্রচলিত নিয়মের বিরুদ্ধে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করতে অঙ্গীকার গ্রহণ করে। আঁদ্রে মোরোয়া বলেছেন:

“তীরে দাঁড়িয়ে ভাবনা-চিন্তা করলে সাঁতার কাটা কোনদিনই শেখা যায় না। একবার নেমে পড়লে সাঁতারু স্রোত এবং পানির শীতলতার সঙ্গে নিজেকে খাপ খাওয়াতে শিখে। ১৯

শ্যামাও তেমনি পরিস্থিতির ভেতরে ঝাঁপ দিয়ে টিকে থাকার সংগ্রামে লিপ্ত হয়। অভাবের সংসার মানুষের জীবনকে এবং মনকে সংকীর্ণ করে দেয়। বিধানকে শ্যামা সাধারণ স্কুলে ভর্তি করে, বাড়িতে সিদ্ধ করে জামা-কাপড় সাফ করে, কোলের খোকার জন্য মাত্র এক পোয়া দুধ। তার হিসাব চুলচেরা

“গুন দিত সেই অপরাহে, সারাদিন বুকে যে দুধটুকু জমিত বিকালে তাহাতেই খোকার পেট ভরিয়া যাইত। কত হিসাব ছিল শ্যামার ব্যাপক ও বিস্ময়কর!” (১খ, পৃ-৭৯)

একদিন যে রাখালের সঙ্গে শীতের রাতে হাত ভিজিয়ে তারা একজন অন্যজনের গায়ে ঠান্ডা দিয়ে খেলত, সেই রাখালও বিপদের দিনে পাওনা টাকা দিয়ে শ্যামাকে সাহায্য করে না। সমাজের মানুষগুলো এমনই, যার মাথার তেল আছে, তার মাথায় তেল ঢালে। শ্যামার ছিল শুধু হারাণ ডাক্তার। সে একতলায় বার টাকা ভাড়ায় ভাড়াটে এনে দিয়েছিল। সেখানেও সামাজিক ব্যবধান স্পষ্ট। একতলা আর দোতলার ভেতরে ব্যবধান অনেক। শ্যামার গাদাগাদির সংসার আর তাদের রিক্ত পরিচ্ছন্নতা।

‘জীবনের জটিলতায় লেখক দেখিয়েছেন সকালে প্রমীলাদের বাড়ি আলুভাতে ভাত হয় না। ছোট ভাই পাঁচু আর বোন অনিলার জন্য দু পয়সার মুড়ি বরাদ্দ আছে, অথবা রাত্রে যে আটার রুটি হয় তা থেকে বাঁচলে তারা খায়, বিমলের মাসিক বরাদ্দ টাকা থেকে সে নাশতা করে, প্রমথ সকালে খবরের কাগজ পড়তে গিয়ে কিছু হয়তো খেয়ে আসে। বরাদ্দ নেই শুধু প্রমীলা আর তার মায়ের। প্রমীলা ক্ষুধার যন্ত্রণা সহ্য করতে না পেরে তাই ভাতের চাল খেয়ে পানি খায় এই নিয়ে তার বাবা তাকে কথা শোনায়।

মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের গল্প-উপন্যাসে দারিদ্র্যের কথা বার বার এসেছে। সমালোচকেরা বলেছেন:

“তিনি সংকটের মধ্য দিয়ে সত্যের কাছে এসে পৌঁছেছেন, সমাজ ও সংস্কৃতির ট্র্যাজিক ধারণার উপাত্তে তিনি এসে পৌঁছেছেন, নির্যাতনের মৌলিক স্বরূপ ধরতে পেরেছেন : অর্থনৈতিক নির্যাতন। ২০

তিনি বিভিন্নভাবে, বিভিন্ন দৃষ্টিকোণ থেকে দারিদ্র্যকে তুলে ধরেছেন। ‘পদ্মানদীর মাঝি’, ‘নাগপাশ’, ‘চালচলন’, ‘আরোগ্য’, ‘হরফ’ ইত্যাদি উপন্যাসে দারিদ্র্য সমুলে উঠে এসেছে। ‘চালচলন’ উপন্যাসে দেখি:

“অমিয় আর বিনয় দুজনেই কলেজে পড়ে। অমিয় এবার গ্রাজুয়েট হবার পরীক্ষায় পাস করে আরও পড়তে চাইলে চারটি মেয়েরই স্কুল-কলেজের পড়া চলবে কি না সন্দেহ আছে সিদ্ধেশ্বরের মনে।” ( ৯খ, পৃ.-১২৯ )

মধ্যবিত্ত পরিবারে সন্তানের সংখ্যা অনেক হতো এবং সে জন্য অভাবের শেষ নেই। ‘জননী’ তে বেশি সন্তানের কারণে শ্যামাকে হাড়ভাঙ্গা পরিশ্রম করতে হয়েছে। অন্ন-বস্ত্র-স্থানের অভাবে তারা জর্জরিত।

“চারটি সন্তানের জননীর দারিদ্র্য, বঞ্চনা, হতাশা তাকে মাঝে মাঝে অন্যায়ের সঙ্গে আপস করতে শিখিয়েছে। সে জেনেছে মমতার চেয়ে স্বার্থপরতাই বাঁচার চাবিকাঠি। ২১

‘জীবনের জটিলতা’র প্রমথের সংসার সম্পর্কে লেখক বলেছেন,

“ছেলেমেয়ের সংখ্যা উপার্জনের অনুপাতে বেশিই বাড়িয়াছে। সুতরাং অনুরূপার খরচের টানাটানি কমে নাই।” (২খ, পৃ. ১০৩ )

আবার তাদের ঘুমানোর জায়গারও সংকুলান হয় না। প্রমীলা সম্পর্কে লেখক জানিয়েছেন:

“ভাইবোনের বিছানায় অত্যন্ত সংকীর্ণ একটু স্থানে গুটিসুটি হইয়া তাহাকে শুইতে হয়, তারই মধ্যে কী রকম কায়দা করিয়া সে বালিশে মুখ গুঁজিয়াছে” ( ২খ, পৃ. – ১৩২)

‘শহরতলী’ উপন্যাসের দ্বিতীয় খণ্ডে একটি ছেলের কথা ঘটনাক্রমে এসেছে। সত্যপ্রিয় তার জামাই যামিনীকে নিয়ে ডাক্তারের কাছে গেলে একটি ছেলের সঙ্গে সত্যপ্রিয়র কথা হয়। সে ডাক্তারের কাছে এসেছে, “রাতে তার ঘুম হয় না। সত্যপ্রিয় তাকে উপদেশ দেয় ঘরে দরোজা- জানালা বন্ধ করে জোড় আসনে বসে অভ্যাস করতে, তাতে ঘুম হবে। তখন ছেলেটি আর সত্যপ্রিয়র কথোপকথনে জানা যায় অতিরিক্ত ভাই বোনের সংসারে ছেলেটি বিপর্যন্ত

“ছেলেটি কাতরভাবে বলিল, আজ্ঞে, আমার ঘরে আমার চারটি ভাইবোন শোয়, আমার বাপ-মাও ও ঘরে থাকেন। ঘরে সব সময় লোক থাকে । অন্য ঘরে শোয়ার ব্যবস্থা করে নিও। আরেকটা ঘরে দাদা-বউদি শোয়। আর ঘর নেই আমাদের।” ( ৩খ, পৃ.-২৪৩) নিম্নমধ্যবিত্ত পরিবারের চিত্রই এরূপ ।

বিমলের মায়ের নাম অনুরূপা। ‘জননী’ উপন্যাসে আমরা দেখেছি শ্যামার ত্যাগে সংসার টিকে থেকেছে। ‘জীবনের জটিলতা’য় অনুরূপাকে আমরা সক্রিয় চরিত্ররূপে পাই না। উপন্যাসের শুরুতে সে সক্রিয় থাকে, এর পর দু-একটি জায়গায় তার সক্রিয় আবির্ভাব ঘটে।

 

মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের উপন্যাস সমাজ সংসারজীবন

 

এছাড়া সে অন্তরালেই রয়ে যায়। সন্তানদের ভালো-মন্দের অংশীদার সে হয় না। শ্যামার একেবারে বিপরীত চরিত্র অনুরূপা। তবে সংসারে মা যে প্রচণ্ড ব্যস্ত মানুষ তার পরিচয় লেখক উপন্যাসের প্রথমেই দিয়েছেন:

“ছেলেমেয়েদের জলখাবারের জন্য আজ সকালে আলুভাতে রাঁধিবার সময় অনুরূপার ছিল না।” (২, পৃ-১০১)

যশোদাকে আমরা মায়ের বৃহৎ রূপে পাই, সে যেন জগজ্জননী। আর পাওয়া যায় যোগমায়ার মাকে। সে শান্ত ও নিরীহ। সব সময় ‘ভ্যাবাচেকা লাগিয়া আছে।’ সত্যপ্রিয়র বেয়ারা জীবনযাপনে সে অভ্যস্ত হয় নি। সকলের থেকে দূরে একা একজন মানুষ। স্বামী-সন্তান কারো সঙ্গে মনের মিল হয় নি। সে সর্বদাই স্বামী-সন্তানের ব্যাবহারে সংকুচিত;

“সকলের অপরাধে নিজেকে যেখানে সে অপরাধী মনে করে, তাদের হাত ধরিয়া ক্ষমা চায়।” তখ, পৃ.-১৭৮)

বাঙালি রীতিতে বৈকালিক জলখাবার একটি অন্যতম দিক। ‘অহিংসা’ উপন্যাসে এর উল্লেখ আছে। বিভূতি জেল থেকে বাড়ি ফেরার পর তার মা নানা রকম খাবার তৈরি করে। সকলে একসঙ্গে খেতে বসে। এ সময় নানা রকম আলাপ-আলোচনা হয়।

সাধারণভাবে সমাজে রীতি চালু আছে ছেলে লেখাপড়া করে চাকরি নিলে তারপর বিয়ে করবে। বিধান চাকরি পেলে বকুল এসে বিধানের বিয়ের জন্য শ্যামাকে তাগাদা দিতে থাকে, বিধানকেও ব্যতিব্যস্ত করে তোলে। কিন্তু তখন বিধান রাজি হয় না। তার কিছু দিন পর বিধান নিজেই বকুলের স্বামী মোহিনীর কাছে বিয়ের প্রসঙ্গ উত্থাপন করে।

সমাজে বিয়ের ক্ষেত্রে সকলের জন্য একই নিয়ম। বিমলের ক্ষেত্রেও এই নিয়ম হবে এটাই স্বাভাবিক। শান্তা অসুস্থ হওয়ার পর বিমলের মানসিক অবস্থা বিপর্যন্ত হয়, তখন তার রাতে ঘুম হয় না। বারান্দায় হাঁটাহাঁটি করে। তার বাবা-মা ভাবে ছেলে বিয়ের কথা মুখে বলতে পারছে না, তাই এভাবে ইঙ্গিত দিচ্ছে। তাই তারা বউ আনার পরামর্শ করে। আদায়ের ইতিহাসে মিটুপ মদ খেয়ে বাড়ি ফিরলে তার বাবা-মা চিন্তিত হয়ে পরে। তার মা বলে:

“এত বড়ো সোমত্ত রোজগেরে ছেলে, কদ্দিন থেকে বলছি একটা বিয়ে-থা দিয়ে দাও-” (৬খ, পৃ.-৩৩)

শান্তার জানালা প্রেমের প্রয়োজনীয়তাও সমাজ বাস্তবতার অংশ। সমাজে বেশির ভাগ দম্পতি অসুখী জীবনযাপন করে। তাদের চাওয়া-পাওয়ার মধ্যে বিস্তর ব্যবধান। একজন আরেকজনের বন্ধু হতে পারে না। কিন্তু বন্ধুই সবচেয়ে আপন, বন্ধুই শেষ আশ্রয়, যাকে সবকিছু বলা যায়। শান্তা আর অধর বন্ধু হতে পারে নি, শুধু মানিয়ে চলে। কিন্তু শাস্তার বুভুক্ষু হৃদয় বন্ধু চায়, তাই আস্তে আস্তে বিমলের সঙ্গে সে সম্পর্কে জড়িয়ে পড়ে এবং একসময় প্রেমে গিয়ে পৌঁছে।

মানিক ভাই-বোনের সম্পর্কের বিচিত্রতা দেখিয়েছেন। বিধান আর বকুলের একটি সুসম্পর্ক আছে, তবে বকুল-শঙ্করের যে জটিল অধ্যায় তা বকুলের জীবনে কোনো প্রভাব ফেলে নি, তাই বিধানকে এ বিষয়ে কোনো উদ্যোগ নিতে হয় নি।

ছেলেবেলায়ও তাদের একে অন্যের কোনো কর্মের যোগসূত্র নেই। শুধু দেখা গেছে বিধান বকুলকে পড়াতে বসে অনেক মারধর করছে। কিন্তু বিমল আর প্রমীলা একে অন্যের সঙ্গে জড়িয়ে আছে। ছেলেবেলায় প্রমীলার কুড়িয়ে পাওয়া অচল সিকি কেড়ে নিয়ে বিমলের আত্মধিক্কার আসে, এবং বুদ্ধি করে মায়ের পয়সায় অচল সিকিটি চালান করে প্রমীলাকে পয়সা দেয়। সেই ছোট্ট ঘটনাকে কেন্দ্র করে ভাই-বোন একে অন্যের কাছাকাছি আসে।

এরপর সকল সময়ই দুজন দুজনের বিপদে এগিয়ে এসেছে, কোনো সমাধান না পেলেও দুঃখ ভাগাভাগি করে নিয়েছে। শাক্তার মৃত্যুর জন্য প্রমীলা বিমলকে অনেকখানি দায়ী করে, কিন্তু তার পরও বিমলের শোক দেখে প্রমীলা দাদার প্রতি সহায়ক হয়, সে বিমলকে সহজ স্বাভাবিক হতে অনুরোধ করে:

“লোকের বউ মরে জান তো দাদা? অনেক দিনের চেনা সন্তানের মা ভালোবাসার বউ?” (২৭, পৃ.-১৫১ )

বউয়ের শোকও লোকে ভোলে, বিমলের তো বউ মরে নি। বিমলকে শাস্তার মৃত্যু স্বাভাবিক মৃত্যু বলে মেনে নিয়ে নিজেকে স্বাভাবিক হতে বলে। অন্যদিকে নগেন প্রমীলাকে গহনা পাঠিয়ে চূড়ান্ত অপমান করলে বিমল প্রমীলার পাশে এসে দাঁড়ায়, তাকে কাজ থেকে, দায়িত্ব থেকে দূরে এসে বসে থাকতে বলে:

“আজ তোর কোনো কাজ নেই, কোনো দায়িত্ব নেই। কেউ তোকে ডাকবে না। এখানে বসে রাসকেলটার কথা ভাব আর ঘেন্না করতে শেখ।” (২খ, পৃ. ১৫৪ )

তারপর তাকে সাদাসিধে ছেলের সঙ্গে তার বিয়ে দিতে চায়। প্রমীলা রাজি হয় না। তখন বিমল লাবণ্যকে বিয়ে করে প্রতিশোধ নিতে চায়, প্রমীলা তাতেও রাজি হয় না। বোনের সম্মানের দিকে তাকিয়ে সে নগেনের সুপারিশে হওয়া চাকরি ছেড়ে দেয়। এরপর প্রমীলার আরো দুর্দিন আসে। অধর তার বাবার কাছে বিয়ের প্রস্তাব দেয়, তার বাবা রাজি হয়।

বিমল বাবাকে এ বিয়েতে অসম্মতি জানায় এবং শেষ পর্যন্ত শাস্তার স্মৃতিচিহ্ন পুড়িয়ে সমস্ত দায়িত্ব কাঁধে তুলে নেওয়ার প্রত্যয় ব্যক্ত করে। তাদের ভাইবোনের এই সম্পর্ককে লেখক এভাবে বুঝিয়েছেন:

“দাদার জন্য প্রমীলার কখনও কান্না পায়, বোনের জন্য বিমলের বুকের ভিতরটা কখনও পুড়িয়া যায়।” (২খ, পৃ. ১৫৫)

যশোদা ভাই নন্দকে কোলে-পিঠে করে মানুষ করেছে। তাদের ভাইবোনের সম্পর্ক যশোদার উপর নন্দর নির্ভরশীলতার সম্পর্ক। নন্দ চাকরি-বাকরি কিছু করে না। সে কীর্তন শেখে, বিভিন্ন আসরে কীর্তন গায়, বন্ধুদের সঙ্গে আড্ডা দেয়। যশোদা তাকে দিয়ে মাঝে মাঝে ভাত বেড়ে দেওয়ার কাজ করিয়ে নেয়। এরপর নন্দ যখন সুবর্ণের প্রেমে পড়ে তখন ভাইবোনের মধ্যে দূরত্ব বেড়ে যায়।

যশোদা নন্দকে সত্যপ্রিয়র দেওয়া চাকরি করতে নিষেধ করলেও নন্দ তা করে। যশোদা তাকে বলে দুই-তিন মাস পরে সত্যপ্রিয় তাকে তাড়িয়ে দেবে। নন্দ বলে সত্যপ্রিয় নিজে বলেছে তাড়িয়ে দেবে না। নন্দর সত্যপ্রিয়র কাছে গিয়ে চাকরি চাওয়াটা যশোদাকে হতভম্ব করে দেয়। রাগে-দুঃখে যশোদা কিছুক্ষণ গুম হয়ে থেকে নন্দকে জিজ্ঞাসা করে, তাকে না জানিয়ে নন্দ কেন সত্যপ্রিয়র কাছে চাকরি চাইতে গেলো । নন্দ বলে:

“চাকরি ছাড়া আমার চলবে না দিদি।” (৩খ, পৃ. ২০৬)

বোনের এত দিনের অর্জিত সম্মান আর মঞ্জুরদের বিশ্বাসকে সে কোনো মূল্য দেয় না। নন্দর চারিত্রিক বৈশিষ্ট্যের সঙ্গে তার এই আচরণ যশোদার কাছে অসামঞ্জস্যপূর্ণ মনে হয়।

 

মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের উপন্যাস সমাজ সংসারজীবন

 

“একটা রহস্যময় ব্যবধানের সৃষ্টি হইয়াছে দুজনের মধ্যে। যশোদা স্পষ্ট অনুভব করিতে পারে, জিজ্ঞাসা করিয়া কিছু জানা যাইবে না, এতকাল পরে নন্দর জীবনে এমন একটা গোপন কিছুর আমদানি হইয়াছে যা নিজস্ব ব্যক্তিগত সম্পদ, দিদিকে সে ভাগ দিতে পারিবে না। তাকে ডিঙাইয়া সত্যপ্রিয়র কাছে চাকরি ভিক্ষা করিতে যাওয়া শুধু চাকরির লোভে নয়- এতক্ষণে মন্দ তাহা হইলে কাঁদো কাঁদো হইয়া কথা বলিত, এমন তেজের সঙ্গে ঘোষণা করিতে পারিত না যে চাকরি ছাড়া তার চলিবে না, তাই সে চাকরি সংগ্রহ করিয়াছে, যশোদাকে জিজ্ঞাসা করাও দরকার মনে করে নাই।” (
তখ, পৃ. ২০৬)

নন্দর চাকরির ইস্যু নিয়ে সত্যপ্রিয় মজুরদের মধ্যে রটিয়ে দেয় যশোদা মালিকের সঙ্গে যোগ দিয়েছে। মঞ্জুররা যশোদাকে ত্যাগ করে। যশোদা নন্দকে চাকরি ছেড়ে দিতে বললেও নন্দ চাকরি ছাড়ে না:

“যশোদার বারণ না মানিয়া নন্দ চাকরি করিতে যায় আর যশোদা সকলকে জিজ্ঞাসা করে, নন্দকে যদি আমি খেদিয়ে দিই, তবে তো তোমরা আমায় বিশ্বাস করবে? ( তখ, পৃ. ২১০)

যশোদা আর নন্দর ভাইবোনের সম্পর্ক এমন তিক্ততায় গিয়ে দাঁড়ায়। তারপর নন্দ যশোদাকে আরো একা করে দিয়ে সুবর্ণসহ একসঙ্গে পালিয়ে যায়। নন্দর কীর্তন শুনতে যশোদার খুব ইচ্ছে হয়। কীর্তন করলে নন্দর শরীর খারাপ হতো বলে সে নন্দকে বারণ করতো। নন্দ চলে গেলে যশোদার মনে হয়, নন্দ থাকলে সে নিজেই নন্দকে কীর্তন গাইতে বলতো।

নন্দ আর সুবর্ণ যখন ঘর ছেড়ে পালালে যশোনা এ বিষয়ে কোনো উদ্যোগ নেয় না। কিন্তু জ্যোতির্ময় কিছু করেছে কি না সে বিষয়ে সে নিশ্চিত নয়। তার মনে নানা চিন্তা উদয় হয়। জ্যোতির্ময় একবার এসে জিজ্ঞাসাও করে নি, নন্দ আর সুবর্ণ কোথায় গেছে যশোদা তা জানে কি না। জ্যোতির্ময় সম্পর্কে যশোদা চিন্তা করে:

“হয়তো জ্যোতির্ময় পুলিশে খবর দিয়াছে, হয়তো চারিদিকে খোঁজ করাইতেছে, দুজনের সন্ধান পাইলেই নদকে জেলে পাঠাইয়া ছাড়িবে। সুবৰ্ণ সম্বন্ধে কী ব্যবস্থা করিবে সেই জানে। হয়তো দূরে কোনো আত্মীয়ের কাছে পাঠাইয়া দিবে, হয়তো কোনো বোর্ডিংয়ে রাখিয়া লেখাপড়া শিখাইবে, হয়তো মেয়ের এই কীর্তিকথা গোপন করিয়া চুপিচুপি কারো সঙ্গে বিবাহ দিবে-তারপর যা হবার হোক।” ( ৩খ, পৃ.-২২১)

উপন্যাসের শেষে দেখা যায় সিনেমায় অভিনয় করে নন্দ ধনী হয়েছে, তার ঘরে ‘গদি আঁটা চেরার’ কিন্তু সে বোনের কাছে আসে নি।

‘আদায়ের ইতিহাসে’ মনীশের বোন কুন্তলা পুরোপুরি দাদার ওপর নির্ভরশীল। এ নির্ভরতা ঋণাত্মক অর্থে নয়, ধনাত্মক। মনীশ তার বোনদের মন বোঝে, সে বোনদের অমঙ্গল হয় এমন কিছু করবে না। আর তার বোনেরা বড় হয়েছে তারই দেখানো আদর্শে। কুন্তলাকে ত্রিষ্টুপ বিয়ে করতে চাইলে সে বলে:

“আমি রাজিও নই, অরাজিও নই। কেন এসব জিজ্ঞেস করছেন আমাকে? যা বলবার দাদাকে বলুন।” (৬খ, পৃ.-৩৮)

‘চালচলন’ উপন্যাসে সুনীলের বোন লতার বাঁশির সুরে ঘুম আসে না জেনে সুনীল বাঁশি বাজানো বন্ধ করে। যদিও সে জানে বাঁশি শুনে নয়, লতার রাতে তাড়াতাড়ি ঘুমানোর অভ্যাস নেই তাই ঘুম আসছে না, তবু বোনকে মানসিকভাবে সাহায্য করার জন্য সে বাঁশি বাজানো বন্ধ করে। সুনীল এও জানে লতার ঘুমের সঙ্গে কত সুদূরের সম্পর্ক। ঘুম না হলে শরীর ভালো হবে না, শরীর ভালো না হলে পড়া বন্ধ হবে এবং পড়া বন্ধ হলে বাবা-দাদা মিলে যেমন তেমন ছেলের সঙ্গে বিয়ে দিয়ে দেবে। লতা ভালো ছেলেকে বিয়ে করতে আগ্রহী। সুনীল সম্পূর্ণ গোপনে বোনের এই আশা জানতে পারে এবং তাকে সাহায্য করে ।

বাঙালির আত্মীয়তার সম্পর্ক চিরন্তন। ‘চতুষ্কোণ’ উপন্যাসে রাজকুমারের বাড়ি মনোরমা ভাড়াটে হয়ে আসে ঠিকই কিন্তু এক মাসের মধ্যেই তাদের আত্মীয়তার সম্পর্ক বেরিয়ে পরে। মনোরমা রাজকুমারেরর দূর সম্পর্কের দিদি। এবং একসময় সম্পর্কহীন ভাইবোনের সম্পর্কটা ঘনিষ্ঠ হয়ে ওঠে।

বউ-শাশুড়ির খুনসুটি সমাজের একটি বিশেষ দিক। শ্যামার শাশুড়ি ছিল না বলে সে দুঃখ করেছে, কিন্তু মন্দা শাশুড়ির অত্যাচারে অতিষ্ঠ। এমনকি নিজের ছেলেদেরকে পর্যন্ত আদর করতে পারতো না শাশুড়ির কারণে, তাই নিজের ছেলেদের চুরি করে বাপের বাড়ি নিয়ে আসে। বকুলের বেলায়ও ঘটে এরকম ঘটনা।

পিসশাশুড়ির অত্যাচারে বকুল হয়ে পড়ে নিষ্প্রভ। এর পর শ্যামা শাশুড়ি হয়। সেও পুত্রবধূকে মেয়ের মতো বুকে তুলে নেয় না। বউয়ের রূপ-যৌবন দেখে ঈর্ষান্বিত হয়। বউকে নানা রকম কথা শোনায়, অপমান করে আর ছেলে পর হওয়ার সন্দেহ করে। তবে বউ সন্তানসম্ভবা হলে তাকে বুকে তুলে নেয়। ‘জীবনের জটিলতায় শান্তা অধরকে বলে তার বোন অর্থাৎ শান্তার ঠাকুর ঝিকে আনতে। তখন অধর বলেছে

“ঠাকুর জামাই তো আর পাঠাবে না, পাঠাবে ঠাকুর জামাইয়ের পিতা ঠাকুর। আমি চিঠি লিখেছিলাম, এখন পাঠাতে পারবে না জানিয়েছে। বুড়ো কী কম বজ্জাত।” (১৭, পৃ.-১৩০ )

শ্বশুরবাড়িতে শুধু মেয়েদেরই সমস্যা নয়, ঘরজামাইদেরও সমস্যা। ‘শহরতলী’ উপন্যাসে সত্যপ্রিয়র বড় মেয়ের জামাই তার বাড়িতে থাকে। সত্যপ্রিয় তাকে নিজের ইচ্ছেমতো পরিচালিত করে। ‘অহিংসা’ উপন্যাসেও শ্বশুরবাড়ি সম্পর্কে কটাক্ষ করা হয়েছে। মহেশ চৌধুরির দুই মেয়ে সম্পর্কে বলা হয়েছে:

দুটি মেয়ে গিয়াছে শ্বশুরবাড়ি নামক নকল সামাজিক ভোলে। ( তখ, পৃ.-২৯৯)

মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় শ্বশুরবাড়ির অন্যার অত্যাচার সম্পর্কে কটাক্ষ করেছেন।

 

মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের উপন্যাস সমাজ সংসারজীবন

 

সমাজে আশ্রিতরা মানবেতর জীবনযাপন করে। শ্যামা আশ্রিত অবস্থায় দেহের রক্ত পানি করে পরিশ্রম করেছে, কিন্তু কোনো কৃতজ্ঞতা পায় নি। উপরন্তু শুধু অবহেলাই পেয়েছে। টাকা নাই বলেই শ্যামা পরের বাড়ি আশ্রিত। তাই ভোর পাঁচটা থেকে রাত এগারোটা অবধি তার পক্ষে যত কাজ করা সম্ভব সব সে করে:

“আশ্রিতার সমস্ত অবসর মুহূর্তগুলো কেমন করিয়া কর্তব্যে ভড়িয়া ওঠে কেহ টেরও পায় না।” ( ১২, পৃ-100)

বনবিহারীর আশ্রিত জীবনও করুন। ক্যানভাসার বনবিহারীকে সারাদিন পর বাড়ি এসে ওষুধের সুটকেসটি রেখেই সংসারের বিভিন্নজনের বিভিন্ন কাজ করতে হয়, কখনো বাইরে থেকে রুটি আনতে হয়, কখনো কারো বাচ্চাকে হেঁটে হেঁটে ঘুম পাড়াতে হয় আবার কখনো বাড়ির কর্তার সঙ্গে দাবা খেলতে হয়।

শান্তা বিয়ের আগে তার মামার বাড়ি আশ্রিত ছিল, সেখানে মামী তাকে অনাদর অবহেলায় রেখেছিল। মামির টিয়া পাখির অসুখ হলে সে সওয়া পাঁচ আনার হরিলুট দিতে চায় কিন্তু শাস্ত রি অসুখে ওষুধও আনে না। যশোদার বাড়িতে কিছু আশ্রিত কুলি-মজুর আছে, তারা সকলে ভীতসন্ত্রস্ত নয়, তবে যশোদার কথামতো কাজ করে, তাকে মান্য করে। সত্যপ্রিয়র বাড়িতে কাছে-দূরের অনেক আত্মীয় আশ্রিত আছে। তারা কর্তা এবং তার ছেলেমেয়েদের সমীহ করে চলে। সত্যপ্রিয়র বাড়ির আশ্রিতরা সকলেই সর্বদা সন্ত্রস্ত। তাদের বাড়ির অনুষ্ঠানের দিন সত্যপ্রিয়র সেজো মেয়ে এবং তাদের বাড়িতে আশ্রিত সমবয়সী একটি মেয়ের কথোপকথনে আশ্রিতদের অবস্থা বোঝা যায়

“সেজো মেয়ে (মুখভার) :  সবাই চলে গেলেই তোমার দুল ফিরিয়ে দেব।

পিসতুতো বোন (ভীতা) : কেন ভাই?

সেজো মেয়ে :  দিদির কানবালা ধার করে পরতে পারবে বলেই তো যেচে যেচে নিজের বিচ্ছিরি দুল দুটো আমায় পরালে।

পিসতুতো বোন : তুই নিজেই তো চেয়ে নিলি ভাই?

সেজো মেয়ে : কখন চাইলাম?

পিসতুতো বোন : না ঠিক, এমন বোকা আমি ।

সেজো মেয়ে : বোকা তুমি নও। দুল দুটো পরলে নিজেকে খুব সুন্দর দেখায় জানো কিনা তাই আমি যেই দুল দুটো নিয়ে এলাম, ওমনি ফন্দি এঁটে দিদির কানবালা নিয়ে পরলে, যাতে আরও সুন্দর দেখায়। ফরসা রঙের অহংকারে ফেটে পড়ছ, বোকা হতে যাবে কোন দুঃখে?

পিসতুতো বোন : আমার রংটা তো ফ্যাকাশে সাদা ভাই, তোর মতো দুধেআলতা তো নয় ভাই? কানবালা খুলে ফেলব?”

(৩খ, পৃ. ১৭৭)

আবার, যোগমায়া এবং যামিনীকে আলাদা করার জন্য সত্যপ্রিয়র এক দূরসম্পর্কের বোনের হঠাৎ দেশে গিয়ে থাকার শখ হয়। সত্যপ্রিয়র জন্য তার আশ্রিতদের অনেকেরই ভাগ্যে এ অবস্থার সৃষ্টি হয়।

আশ্রিত জীবন কখনোই সুখের হয় না। আবার তারা স্বাধীনও নয়। ‘অহিংসায়’ আশ্রমে আশ্রিতদের অবস্থাও একই রকম। তারা নিজস্ব মতামতে চলতে পারে না, ন্যায়-অন্যায় বলতে পারে না, এমন কি নিজের খুশিমতো খেতেও পারে না। সদানন্দকে আশ্রম থেকে বিপিন বিতাড়িত করে কুৎসা রটালে আশ্রিতরা এর সত্য মিথ্যা যাচাই করার সাহসও পায় না:

“অহিংসা’ উপন্যাসের বিষয় আশ্রম এবং সন্ন্যাসী; বাংলা সাহিত্যে সন্ন্যাসীদের আশ্রম নিয়ে যে সব লেখা আছে তার বিপরীতে এই উপন্যাস, এখানে অভিজ্ঞতা হিসাবে বিধৃত হয়েছে জীবনযাপনে অহিংসতার তীব্রতা, অহিংসার শতমুখী সমস্যা, এখানে নেই গাঁজা, পারলৌকিকতা কিংবা আশ্রমিক জীবনের কদর্যতা। অহিংসা জীবনকে দেখবার, ভাববার, বুঝবার এক পদ্ধতি, যে-পদ্ধতির পরতে পরতে প্রবিষ্ট হিংসাই; অহিংসা এবং হিংসার সহ-অবস্থানের তীক্ষ্ণতা এবং তীব্রতার মধ্য দিয়ে মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় খানখান করে তুলেছেন চরিত্রগুলোকে। ২২

শশধর মহেশ চৌধুরির ভাগ্নে। সে মামার বাড়ি সঞ্জীক আশ্রিত। মামা-মামি যখন বৃষ্টিতে ভিজছে, সে তখন দাওয়ায় উঠে নিজেকে বাঁচাতে পারে না। বিপিন শশধরকে বাড়ি চলে যেতে বললে, সে আফসোস করে বলে:

মামি কাল বাড়ি ফিরেই কী করবে জানেন? কানটি ধরে বলবে, বেরো বাড়ি থেকে । কেবল আমাকে নয় মশায়, নিজের জন্য কি আমি ভাবি, বউটাকে সুদ্ধ । ( তখ, পৃ.- 308)

সংসার জীবনে বাড়ি ভাড়া দেওয়ার প্রবণতা একটি অবশ্যম্ভাবী দিক। কেউ বাড়িভাড়া দেয় শখে, কেউ নিতান্ত প্রয়োজনে। শ্যামা বাধ্য হয়ে বাড়ি ভাড়া দেয়। শীতল জেলে গেলে শ্যামার টাকা উপার্জনের কোনো পথ থাকে না, তাই একটি বড় সংসার নিয়ে অনেক অসুবিধা সহ্য করে সে বাড়িতে ভাড়াটে আনে।

যশোদা একা মানুষ, সঙ্গে রয়েছে ধনঞ্জয়। তার বাড়িতে সদস্য বাড়ানোর জন্য এবং যশোদার মানসিক ভারসাম্য রক্ষার জন্য রাজেন বুদ্ধি করে, যশোদাকে কিছু না বলে বাড়ি ভাড়ার জন্য অজিত আর সুব্রতাকে নিয়ে আসে। পরে যশোদার তাদেরকে পছন্দ হয়, সে বাড়ি ভাড়া দেয়। ‘চতুষ্কোণে’ রাজকুমার একা মানুষ। তাই সে তার বাড়ি ভাড়া দেয়। শুভাশুভ উপন্যাসে কারবারের অবস্থা খারাপ দেখে সমরেশ দোতলাটা ভাড়া দেয়।

ঘর-বাড়ি সাজিয়ে ফিটফাট হয়ে থাকা নতুন দম্পতিদের একটি সাধারণ জীবনযাপন প্রণালী। শ্যামা কনকলতাদের ঘর ভাড়া দেয়। তারা পরিবারের সদস্য তিনজন। কনক বড়লোকের মেয়ে, স্কুলেও পড়েছে, স্বাধীনভাবে ফিটফাট থাকতে পছন্দ করে। বড়ভাইয়ের সঙ্গে তাই পৃথক হয়ে এসেছে। নিজের সংসার পাততে তার বিপুল উৎসাহ।

জানালায় সে নতুন পর্দা দেয়, চিকন কাজ করা দামি খাটটি দক্ষিণের জানালা ঘেঁষে পাতে, আয়না বসানো টেবিল রাখে দরোজার উল্টা পাশে আর একটি কাঠের চেয়ার- এই তার আসবাব। ভাঁড়ারে তাকের ওপর মসলাপাতি রাখবার কয়েকটি নতুন চকচকে টিন, কাচের জার, স্টোভ, চায়ের বাসন আর দু- একটি টুকিটাকি জিনিস। সমস্ত ঘর একটি রিক্ত পরিচ্ছন্নতায় চকচক করে।

যশোদার ভাড়াটে সুব্রতা আর অজিত। তাদের ছয় মাস আগে বিয়ে হয়েছে। তারাও দাদার সঙ্গে পৃথক হয়ে এসেছে। অর্জিত প্রায় কুলি-মজুরের মতো একটা চাকরি নেওয়ায় এবং দাদার অপছন্দের মেয়েকে বিয়ে করায় দাদা রেগে তাদের সঙ্গে খারাপ ব্যবহার করে, তাই তারা পৃথক হয়েছে । যশোদার বড় ঘরখানা তিন টাকায় ভাড়া নেয় তারা।

সুব্রতা তার ঘর সাজায়। যশোদার দেওয়া চৌকির পায়ায় সে রঙিন কাপড়ের ঢাকনি দেয়, আলনায় বেশি বেশি কাপড় বের করে সাজিয়ে রাখে, দেওয়ালে ছবি আর ফটো টাঙায়, জানালায় পর্দা দেয়। একটি তোরঙ্গসহ আর দুটি স্যুটকেসে ঘরটি খালি খালি দেখায়। সুব্রতার ঘরটিতেও রিক্ত পরিচ্ছন্নতা বিরাজ করে ।

Leave a Comment