আজকে আমাদের আলোচনার বিষয়ঃ মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের উপন্যাস সমাজ বিনোদন। যা মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের পাঁচটি উপন্যাসে জীবন ও সমাজ এর মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের উপন্যাস সমাজ এর অন্তর্গত।
মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের উপন্যাস সমাজ বিনোদন
মানুষের বেঁচে থাকার অন্যতম উপকরণ মনের খোরাক। হাসি-আনন্দ আর বিনোদন না থাকলে মানুষ মৃত্যুবত পরে থাকে। যেমন হয়েছিল শীতলের বেলায়। শীতল জেল থেকে ছাড়া পেয়ে বনগাঁয়ে একটি কুকুর আর কলকাতায় নিজের অন্ধ মেয়েকে সঙ্গী করে বেঁচে ছিল। তার কোনো বোধশক্তি ছিল না। এই শীতল একদিন বিনোদনের জন্য বন্ধুদের নিয়ে থিয়েটার দেখতো, মদ খেত, এমনকি টাকার বিনিময়ে নারীভোগও করতো।
আবার দেখা যায় শীতলের কমল প্রেসে চাকরির সময় মন্দা আর রাখাল বেড়াতে এসেছিল, তখন দুই পরিবার মিলে তারা থিয়েটার দেখতে যায়। গান বিনোদনের অন্যতম বিষয়।
‘জননী’তে সরযূর পরিবার গানবাজনা নিয়ে মেতে থাকে। তার বড় মেয়ে বিভা স্কুলে গান শেখায়। উচ্চবিত্তদের চেঞ্জে যাওয়াটাও একধরনের বিনোদন। দেখা যায় শঙ্কর-বিষ্ণুপ্রিয়ারা মাঝে মাঝেই চেঞ্জে যাচ্ছে। ‘জীবনের ‘জটিলতায়’ নগেন-লাবণ্যরাও চেঞ্জে যায়। পার্টি-ক্লাবও তাদের নিত্যদিনের ঘটনা, লাবণ্যকে আমরা টেনিস খেলতে দেখি।
আবার অধরও গান জানে, শাস্তার কাছেও সে গান শোনে। তারা একসঙ্গে দাবা খেলে, অধর শান্তাকে নিয়ে বায়োস্কোপে, থিয়েটারে যায়। শহরতলী’তে দেখি নন্দ পালাগান গায়। যশোদারা সবাই মিলে সিনেমা দেখতে যায়। আবার যশোদার বাড়ি সুব্রতা-অজিত ভাড়াটে হয়ে আসার পর যশোদার বাড়িও সংগীতে মুখর হয়ে ওঠে
“সুব্রতা মোটামুটি গান জানে, একটি হারমোনিয়াম আর একটি সেতার তার সঙ্গেই আসিয়াছিল। তারপর কয়েক জোড়া তাস আসিয়াছে, নগেন ডাক্তারের বাড়ির ক্যারাম বোর্ডটি আসিয়াছে।” (৩খ, প্র.-২৩৬)
এরপর যশোদা উদ্যোগ নিয়ে বাড়িতে বিনে পয়সায় গান শেখার স্কুলের মতো করে । লেখক প্রায় সব উপন্যাসেই বাড়িতে একটি সাংস্কৃতিক আবহ দেখিয়েছেন তাতে ধরে নেওয়া যায়, মধ্যবিত্ত-উচ্চবিত্তের মধ্যে সংস্কৃতি চর্চার একটা রীতি চালু ছিল ।
‘অহিংসা’ গ্রামনির্ভর উপন্যাস। গ্রামের লোকের বিনোদনের জন্য সিনেমা হল বা পার্ক কিংবা বাড়িতে গানবাজনার ব্যবস্থা নেই। ‘অহিংসা’য় এই চিত্র স্পষ্ট। সেখানে কয়েকগ্রাম মিলে ছোট একটি খড়ের নাটমন্দির আছে। এখানে নানা উপলক্ষে, মাঝে মাঝে বিনা উপলক্ষেও যাত্রাগান, কীর্তনগান হয়।
তাছাড়া কোনো একটি বাড়িতে সকলে বসে গল্প করা বা পুঁথি পড়াও গ্রাম্য বিনোদনের মধ্যে পরে। সে রকম শ্রীধরের বাড়ি সন্ধ্যায় একটি জমায়েত হয়। নানাস্তরের মানুষ এই সান্ধ্য আসরে যোগ দেয়। তাদের মধ্যে কামার-কুমার, চাষি মজুরই বেশি। এ আসরে শ্রীধর রামায়ণ মহাভারত পাঠ করে শোনায়। মাঝে মাঝে সে পাঠ করা থামিয়ে সহজ ভাষায় সকলকে বুঝিয়ে দেয়।
‘চতুষ্কোণ’ আধুনিক নর-নারী নির্ভর উপন্যাস। তাই তাদের বিনোদনও সেরূপ। দেখা যায়। সরসী সভা-সমিতি নিয়ে ব্যস্ত থাকে। রাজকুমার মাদ্রাজে গিয়ে নারীদের সম্পর্কে কী অভিজ্ঞতা সঞ্চয় করে তার ওপর একটি বক্তৃতা দেওয়ার জন্য সরসী একটি ঘরোয়া সভা ডাকে। সেখানে আশপাশের অনেকগুলো মেয়ে-বউ উপস্থিত থাকে। রাজকুমারের বক্তৃতার পর গানবাজনাও হয়।
এ উপন্যাসে ছুটির দিনে বন্ধুবান্ধব মিলে আড্ডা দেওয়ার কথাও আছে। রিণি বিভিন্ন পার্টিতে গান গায়, ক্লাবে গিয়ে টেনিস খেলে, রিণির বাবা স্যার কে এল ক্লাবে বিনিয়ার্ড খেলতে যায়। রাজকুমারও ক্লাবের সদস্য, তবে সে ক্লাবে যায় না। একদিন গিয়ে ব্রিজ খেলতে বসে বিরক্তিতে তার চোখে জল আসে। এছাড়া সিনেমায় যাওয়ার রীতিও এদের মধ্যে প্রচলিত আছে।

