আজকে আমাদের আলোচনার বিষয়ঃ মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের উপন্যাস সমাজ আধিপত্য। যা মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের পাঁচটি উপন্যাসে জীবন ও সমাজ এর মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের উপন্যাস সমাজ এর অন্তর্গত।

মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের উপন্যাস সমাজ আধিপত্য
সংসারে টাকাই একমাত্র সম্মানের মাপকাঠি। যার টাকা আছে সেই আধিপত্য বিস্তার করে। টাকার জোরেই উঁচু-নিচু ভেদাভেদ সৃষ্টি হয়। তাই বিষ্ণুপ্রিয়ারা শ্যামাদেরকে অবহেলা করে, মন্দা শ্যামার ওপর, এমনকি সতীন সুপ্রভার ওপর কর্তৃত্ব করে, বকুলের শ্বশুরবাড়িতে সবাই পিসশাশুড়িকে ভয় পায়, তার কথায় ওঠে বসে, বকুলের শাখা ভেঙে গেলে পিসশাশুড়ি তাকে বকাবকি করে, অলক্ষ্মী, বজ্জাত বলে। বকুল শ্যামাকে এসে বলেছে:
“ঘরদোর তার কিনা সব, নগদ টাকা আর সম্পত্তিও নাকি অনেক আছে শুনলাম, তাইতো সবাই তাকে মেনে চলে। বুড়ির ভয়ে কেউ জোরে কথাটি কয় না মা।” (১খ, পৃ-৯৫)
টাকার আধিপত্যের সবচেয়ে বড় উদাহরণ সত্যপ্রিয়। সত্যপ্রিয়র মেয়েকে যশোদা কটু কথা বললে খুব সরলভাবে সত্যপ্রিয় যশোদাকে বলে
“শুনলাম বেয়াদবির জন্য নাকি মেয়েকে ধমক দিয়াছ? […. […] আমার বাড়িতে আমার মেয়েকে অমন করে বলবার সাহস কারও হতে পারে, ভাবতেও পারিনি যশোদা।” (৩খ, পৃ-১৭৮)
যশোদা উত্তরে বলে ছেলেমানুষের দোষ ধরিয়ে দিয়েছি তাতে সাহসের কী আছে? কিন্তু সত্যিই সাহসের কিছু আছে। সত্যপ্রিয় নিজের মুখেই বলে:
আমার চাকরবাকরের দোষ দেখিয়ে দেবার সাহস পর্যন্ত অনেকের হয় না। যাদের কোনোদিন একটি পয়সা পাবার ভরসা নেই যারা চায়ও না একটি পয়সা, তারা পর্যন্ত ভয়ে মরে আমি পাছে চটে যাই।” ( তব, পৃ. 198 )

সত্যপ্রিয়র আধিপত্য সুদূরপ্রসারী। মিলের কর্মচারী, আশ্রিত আত্মীয়স্বজন, কুলি-মজুর, প্রতিবেশী, পত্রিকার সম্পাদক, মারাঠি, ইংরেজ, কিছু ভদ্রলোক টাকা আর বুদ্ধির জোরে সকলের ওপর সে আধিপত্য বিস্তার করে আছে। বাস্তব জগতে এরূপ চরিত্র কম নয়।
“শিল্পীর বৃহত্তম উপাদান হল জীবন। জীবনকে তিনি যে কেন্দ্র থেকে উপলব্ধি করেছেন তাকেই তিনি প্রকাশ করেন বইয়ে।
মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় জীবনকে দেখেছেন শোষিত মানুষের দৃষ্টিকোণ থেকে। বঞ্চিত নিগৃহীত মানুষদের প্রতি মমতা এবং পাশাপাশি যারা তাদের বঞ্চিত করেছে তাদের প্রতি ক্ষোভ-ঘৃণা তাঁর একমাত্র বোধ। তিনি সেই বোধেই চালিত হয়েছেন ।
‘অহিংসা’ উপন্যাসেও টাকা এবং পদমর্যাদা আধিপত্য বিস্তারের মাপকাঠি। আশ্রমের ভেতরে বিপিন আধিপত্য বিস্তার করে থাকে। আশ্রমটি বিপিনের সম্পত্তি। তাই ন্যায়-অন্যায় যাই হোক বিপিনের বিরুদ্ধে কেউ যেতে পারে না। বিপিন যখন রত্নাবলীর গা ঘেঁষে বসে তখন সে আঁতকে ওঠে, ভয় পায়, বিপিন যদি তাকে জড়িয়ে ধরে। সে চিন্তা করে:
বুঝিতেও পারে যে দোষ আগাগোড়া বিপিনের, তবু বিপিনের একটুকু আসিয়া যাইবে
“বিপিনের কিছু হইবে না, বিপদে পড়িবে সে। সে যদি গোলমাল করে, সকলে যদি না, মারা পড়িবে সেই।” (৩খ, পৃ.-৩১৮)
বিপিনের খেয়ালে অনেককেই আশ্রম ছেড়ে চলে যেতে হয়েছে। একবার সে সকলকে ডাকে সীতা নামের একটি শিষ্যের আশ্রমে মন টিকছে না, সে চলে যাবে, সকলের কাছে বিদায় নিতে চায়, কিন্তু সীতা বলেছিল অন্য কথা- তার স্বামীকে বিপিন বাইরে কোথায় কাজে পাঠিয়েছে, এ অবস্থায় সীতাকে বিপিন তাড়িয়ে দিচ্ছে, সীতা তার স্বামী না এলে কিছুতেই যাবে না, সেদিন সে গেলোও না। কিন্তু কদিন পর সীতা উধাও হয়ে গেলো। এ রহস্যের উদ্ঘাটন আশ্রমবাসী করে নি। সীতা সংক্রান্ত ঘটনার সময়ই কল্যাণী ও তার বাবাকে এক ঘণ্টার মধ্যে আশ্রম ছেড়ে যেতে বলে বিপিন
“কল্যাণীর বাবার মতো রূপবান পুরুষ রত্নাবলী কখনো দ্যাখে নাই। শাস্তির খোঁজে ভদ্রলোক সদানন্দের আশ্রমে আসিয়াছিল, কিন্তু একটু স্বাধীন প্রকৃতির মানুষ হওয়ায় বিপিনের সঙ্গে ক্রমাগত খিটিমিটি বাধিয়া অশান্তির সৃষ্টি হইতেছিল। মানুষটাকে সকলেই পছন্দ করিত, মেয়েকে সঙ্গে করিয়া আবার সংসারে ফিরিয়া যাইতেছে জানিয়া সকলের দুঃখও হইয়াছিল, আনন্দও হইয়াছিল, কিন্তু ঘটনার সীতা-সংক্রান্ত আকস্মিক পরিণতিতে সকলে থতোমতো খাইয়া গিয়াছিল।” ( ৩খ, পৃ.-৩১৭)

-এ সংক্রান্ত কোনো তদন্ত করতে কেউ সাহস পায় নি। আশ্রমের সাধু সদানন্দ হলেও বিপিনের কথার বাইরে সে কিছু করতে পারে না। বিপিনের কথার বাইরে এলে সে বলে:
“আগে যেমন সব বিষয়ে আমার কথা শুনে চলতিস তেমনিভাবে যদি না চলিস, তোকে দিয়ে আমার কাজ হবে না।” ( ৩খ, পৃ. ৩৩৮ )
আবার মহেশ চৌধুরী সদানন্দকে তিনবেলা ভক্তিভরে প্রণাম করতো, সদানন্দ তার বাড়িতে গিয়ে উঠলে সেও সদানন্দকে রীতিমতো উপদেশ দিতে শুরু করে, আস্তে আস্তে তার জোড় হাত কমে যায়, আজ্ঞে বলাও কমে যায়, মনে হয় মহেশ চৌধুরিই যেন গুরু ।
সমাজের খুটিনাটি সম্পর্কে মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের বিশিষ্ট্যতা সম্পর্কে বোরহানউদ্দিন খান জাহাঙ্গীর বলেছেন: “[… ….. তাঁর স্মৃতি চেতনা এবং মনে সক্রিয়ভাবে কাজ করেছে নির্যাতন এবং নির্যাতিতদের প্রতিবাদী এবং প্রতিরোধী ঐতিহ্য, তাঁর কাজে এ সকলের উদ্বোধন ঘটেছে।
সমাজে টাকাওয়ালা মানুষরা আপন খেয়ালে চলতে পারে। বিষ্ণুপ্রিয়া তেমনি চলেছে। আপন খেয়ালে সে শ্যামার ছেলে দেখতে এসেছে, উপহার পাঠিয়েছে। বিধানকে গাড়ি করে স্কুলে পাঠিয়েছে। আবার শীতল জেলে গেলে সম্পূর্ণ বিরূপ হয়েছে। নগেনও আপন খেয়ালেই প্রমীলার সঙ্গে প্রেমের খেলা খেলে এবং নিজের ইচ্ছেমত প্রমীলাকে ছুঁড়ে ফেলে দেয়। সমাজে টাকাওয়ালা ব্যক্তিরা মানুষকে কিনে রাখে। সহজে কেউ তাদের হাতের নাগাল পায় না, কিন্তু তাড়া ইচ্ছে করলে টাকা দিয়ে অনেক কিছু নিজেদের মতো করতে পারে:
“ঠিক অবহেলা নয়, স্পষ্টই বোঝা যায় সত্যপ্রিয়র আগমনের আশায় অথবা আশঙ্কায় জ্যোতির্ময় কারও দিকে ভালো করিয়া চাহিয়াও দেখিতে পারিতেছে না। ” ( তখ, পৃ.- ১২৭)
সত্যপ্রিয় বউভাত অনুষ্ঠানে আসার সঙ্গে সঙ্গে কয়েকটি চাপা কণ্ঠ বলে ওঠে:
“ওই যে উনি, ওই যে উনি-কর্তা এসে গেছেন।” ( ৩খ, পৃ. ১২৭)
সম্ভ্রান্ত ব্যক্তিদের ছলনারও অভাব নেই। জ্যোতির্ময়ের কাকা আর জ্যোতির্ময় তাকে অভ্যর্থনা করতে গেলে সে নিরহংকারী, সহজ-সরল মানুষের মতো এগিয়ে আসে, সকলকে ব্যস্ত হতে নিষেধ করে, হাসিমুখে এদিক ওদিক দেখে, দু-একজনের সঙ্গে কথা বলে। শুধু মানুষকেই সে আপন বশে রাখে না, পাড়ার ‘ক্লাবে’ চাঁদা দিয়ে নিজে সভাপতি হয়।

‘মডার্ন ক্লাব ও লাইব্রেরি’র প্রতিষ্ঠা দিবসে পাঁচশত টাকা চাঁদা দিয়ে প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হয় এবং খাপছাড়া স্বলিখিত এক প্রবন্ধ পাঠ করে। চাঁদার পরিমাণের কারণে নিজের ইচ্ছেমতো প্রবন্ধ পাঠ করতে দিতে বাধ্য হয় প্রতিষ্ঠানের জনগণ। এই প্রবন্ধে সে আগাগোড়া বলে মহান আদর্শের পেছনে না ছুটে ভবিষ্যতে যাতে কোনো রকমে খেয়ে পরে সুখে থাকা যায় প্রথম বয়সেই তার প্রাণপণে চেষ্টা করা উচিত।
সে নিজের নাম চারদিকে ছড়ানোর জন্য একটি প্রচার বিভাগও খোলে। সাময়িকপত্র সত্যপ্রিয়র প্রবন্ধ আর বক্তৃতার রিপোর্ট প্রকাশ করার মূল্যস্বরূপ বিজ্ঞাপনের ব্যবস্থা করা হয়। টাকার দম্ভে সে তার নিজের খাপছাড়া মতামত ছাপে। সম্পাদকরা না ছাপতে চাইলে জ্যোতির্ময় বলেঃ
“মুশকিল হয়েছে কী জানেন, লেখাটা না ছাপলে উনি হয়তো চটে যাবেন, বিজ্ঞাপনের কনট্রাক্টটা একটু হাসে জ্যোতির্ময় বোঝেন তো সব।” ( তথ, পৃ. ১৪৯ )
তারপরও কিছু কিছু ভলো কাগজ এ সব পাগলামি ছাপতে চায় না। তারা বলে “দেশের জন্য যাঁরা জীবন উৎসর্গ করেছেন, অর্ধেক জীবন জেলে কাটিয়েছেন, তাঁরা সবাই ভুল করে দেশকে টেনে নিয়ে যাচ্ছেন সর্বনাশের দিকে, আর টাকার গদিতে শুয়ে আপনার পাগলা জগাই আবিষ্কার করেছেন দেশোদ্ধারের একমাত্র উপায়।
দু- জায়গায় লিখেছেন, গভর্নমেন্টের সঙ্গে বিবাদ করা অন্যায়, আর এক জায়গায় লিখেছেন, প্রকৃতির নিয়মে যখন যে জাতি রাজপদে অধিষ্ঠান করে তাদের প্রাপ্য রাজসম্মান না দিলে দেশের কখনও উন্নতি হবে না! রাজার জাতিকে রাজসম্মান দিতে থাকলে প্রকৃতির নিয়মে আমরা একদিন নিজেরাই রাজার জাত হতে পারব, নয় তো কোনোদিন পারব না। এ সব কোন দেশি কথা মশাই?” ( ৩খ, পৃ. ১৪৯ )
টাকার জোরে সে ডাক্তারের মুখও বন্ধ করে দিয়ে একজন মানুষকে মৃত্যুর দিকে ঠেলে দেয়। সত্যপ্রিয়র মেয়ের বিয়েতে গিয়ে অপরাজিতা অসুস্থ হয়ে পড়লে সকলে ব্যস্ত হয়ে পরে। বিয়েতে নিমন্ত্রিত দুজন ডাক্তার তাকে পরীক্ষা করে। সত্যপ্রিয়র ছেলে মহীতোষ অ্যাম্বুলেন্সের কথা বললে সত্যপ্রিয় সে কথা কানেই নেয় না। ডাক্তাররা অপরাজিতাকে পরীক্ষা করে বাইরে এসে মুখ খোলার আগেই সত্যপ্রিয় বলে ওঠে:
“একটু সুস্থ হয়েছেন তো এখন? …. […] সুস্থ যখন হয়েছেন গাড়ি করে এবার ওঁকে বাড়ি পাঠিয়ে দি।” (৩খ, পৃ.-১৯৬)
অপরাজিতাকে বাঁচাতে হলে তাকে নড়াচড়া করানো ঠিক হবে না বলে কমবয়সী ডাক্তার ‘আমি বলছিলাম কী বলতেই সত্যপ্রিয় কৌশল অবলম্বন করে:
“পরম ধৈর্যের ভঙ্গিতে তার মুখের দিকে একদৃষ্টে চাহিয়া থাকিয়া শাস্তকণ্ঠে বলিল, বলুন? বলুন, আপনি কী বলছেন?” ( ৩খ, পৃ.-১৯৭)
ডাক্তারটির আর কিছু বলা হলো না। সত্যপ্রিয় ডাক্তারটিকেও অপরাজিতার সঙ্গে পাঠিয়ে দিল। সে অতিথির প্রতি-ও এরূপ নিষ্ঠুর
“শহরতলীতে এসে তিনি স্পষ্টতই উপলব্ধি করলেন যে মানুষের অর্থনৈতিক অবস্থান বিন্দু তার চরিত্রকে গভীরভাবে প্রভাবিত করে। মার্কসবাদ তাঁকে সেই শিক্ষা দিল যে, মানুষের যৌনবৃত্তির চেয়েও অর্থনৈতিক শক্তি অধিকতর মৌলিক শক্তি, এবং সমাজের বহিলোকের মতো মানুষের অন্তর্লোকেরও তা নিয়ামক শক্তি । ৩৬

টাকা দিয়ে সত্যপ্রিয় মেয়ের জন্য সুন্দর জামাইও কিনে আনে
“ যেন সোনার ওজনে সোনার পুতুলই সত্যপ্রিয় কিনিয়া আনিয়াছে মেয়ের জন্য। ” (৩খ, পৃ. ২৪১ )
সত্যপ্রিয়র টাকার দৌরাত্ম কত দূর তার হিসেব যশোদা বা শহরতলীর কেউ জানে না। যশোদা বাড়ি বিক্রি না করলে সত্যপ্রিয় শহরতলীর রাস্তার ব্যাপারে শহরতলীর উন্নয়নের জন্য যারা কাজ করে তাদের শরণাপন্ন হয়ে যশোদার বাড়ির ওপর দিয়ে রাস্তা যাবে বলে নোটিশ পাঠানোর ব্যবস্থা করে।
এবার আর বাড়ি বিক্রি না করে যশোদার কোনো উপায় থাকে না। এভাবেই দুর্বলের ওপর সবলের অত্যাচার সমাজ জীবনকে কলঙ্কিত করে। টাকার প্রভাবে ক্ষমতা এবং ক্ষমতার প্রভাবে আধিপত্য উচ্চশ্রেণিকে দাম্ভিক এবং স্বৈরাচারী করে তোলে। এর অগ্নিস্ফুলিঙ্গে মানুষ পুড়ে অঙ্গার হয়।