সংস্কৃতি ও বাঙালি সংস্কৃতি । বাংলার সংস্কৃতি বিকাশে ঋতুভিত্তিক উৎসব

সংস্কৃতি শব্দটির মূল অর্থ হলো চর্চা, পরিচর্যা বা পরিশীলন। এটি একটি সমাজের মানুষের বিশ্বাস, মূল্যবোধ, আচার-অনুষ্ঠান, রীতি-নীতি, চিন্তাধারা, জ্ঞান, শিল্প, সাহিত্য, ধর্ম, আচার-অনুষ্ঠান, নৃত্য, সংগীত, ভাষা এবং জীবনধারার সম্মিলিত প্রকাশ। সংস্কৃতি কেবলমাত্র একটি নির্দিষ্ট সময় বা স্থানের সীমায় আবদ্ধ নয়, বরং এটি মানব সভ্যতার ধারাবাহিক অভিযাত্রার প্রতিফলন।

বাঙালি সংস্কৃতি তার গভীর ঐতিহ্য, বহুমাত্রিকতা এবং বৈচিত্র্যের জন্য বিশেষভাবে পরিচিত। এই সংস্কৃতি হাজার বছরের ঐতিহ্য, সমৃদ্ধ ইতিহাস, নৃতাত্ত্বিক বৈচিত্র্য, এবং রাজনৈতিক, সামাজিক ও অর্থনৈতিক পরিবর্তনের মাধ্যমে গড়ে উঠেছে। বাঙালি সংস্কৃতির অন্যতম বৈশিষ্ট্য হলো এর মানবিকতা, সাম্যবাদ, প্রকৃতিপ্রেম, এবং ভাষার প্রতি গভীর অনুরাগ।

বাঙালি সংস্কৃতির প্রধান উপাদানগুলোর মধ্যে রয়েছে বাংলা ভাষা, রবীন্দ্রসংগীত, নজরুলগীতি, লোকগান, বাউল গান, নৃত্য, চিত্রকলা, সাহিত্য, নাটক, চলচ্চিত্র, খাদ্যাভ্যাস, পোশাক-পরিচ্ছদ, এবং আচার-অনুষ্ঠান। বাঙালির ধর্মীয় উৎসব যেমন পয়লা বৈশাখ, দুর্গাপূজা, ঈদ, চড়ক পূজা, এবং নানা লোকউৎসব এ সংস্কৃতির রঙিন মেলবন্ধনকে তুলে ধরে।

বাঙালি সংস্কৃতি কেবল প্রাচীন ঐতিহ্যের প্রতি অনুগত নয়, বরং আধুনিকতার ছোঁয়াও গ্রহণ করেছে। এটি একটি চিরন্তন অভিযাত্রা, যা যুগের পর যুগ ধরে বাঙালির জীবনকে সমৃদ্ধ করে চলেছে। তাই বাঙালি সংস্কৃতি শুধু একটি জাতির পরিচয়ই নয়, বরং এটি মানবতার প্রতি এক গভীর শ্রদ্ধার প্রকাশ। আজ আমরা

আজকে আমারা বাংলার সংস্কৃতি বিকাশে ঋতুভিত্তিক উৎসব এর প্রথম পর্ব পড়বো। এটি সংস্কৃতি ও বাঙালি সংস্কৃতি এর অন্তর্গত একটি বিষয়।

 

সংস্কৃতি ও বাঙালি সংস্কৃতি

 

সংস্কৃতি ও বাঙালি সংস্কৃতি

বাঙালি ও বাঙালি সংস্কৃতি, এর উৎপত্তি এবং এর হাজার বছরের ঐতিহ্য নিয়ে যুগে যুগে সমৃদ্ধ চিন্তার অভিব্যক্তি এবং গবেষণা থাকলেও সমাজতাত্ত্বিকদের মতে, কোনো জাতির সংস্কৃতির মতো দুরূহ বিষয়কে বোঝার জন্য জীবনব্যাপী সাধনার প্রয়োজন। কারণ হিসেবে বলা হয়, কোনো জাতির জীবনে সংস্কৃতির এক একটি উপাদান যেমন স্পষ্ট, তেমনি সব উপাদানের সমন্বয়ে তৈরি অবয়বটি বেশ জটিল।

বাঙালি সংস্কৃতি যেমন বাংলাভাষী সব ধর্মাবলম্বীর, তেমনি বহু জাতিতে বিভক্ত এই সমাজে তা বহু বর্ণিল। এরপরও বাঙালির সাংস্কৃতিক বৈশিষ্ট্যে কোথাও বেশ অভিন্নতা দৃশ্যমান। আর সেটাই বাঙালি সংস্কৃতির স্বকীয়তা। উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, বাঙালি হিসেবে তার শারীরিক গঠন, খাদ্যাভ্যাস, শিল্প-সাহিত্য, সমাজ কাঠামো বা জীবিকা নির্বাহের পন্থা।

কোনো জাতির চেতনা, সচেতনতা, চিন্তা আর উন্নয়ন প্রচেষ্টার পাশাপাশি তার নৃতাত্ত্বিক পরিচয়, ভৌগোলিক অবস্থান, প্রাকৃতিক সম্পদ, অর্থনৈতিক অবকাঠামো, ইতিহাস ও জাতীয় জীবনে ঘটনাপ্রবাহের গতি নির্ধারণ করে তার সংস্কৃতি। সেই আলোকে জাতি হিসেবে বাঙালির স্বকীয়তা যেমন আছে, তেমনি আছে অনন্য ঐতিহ্য, সম্ভাবনা।

পাশাপাশি তার স্বজাত্যবোধ, পরাধীনতা-মুক্তির সংগ্রামী ইতিহাস, অপরাজেয় মনোবল আর অর্জিত আত্মপরিচয় বিশেষায়িত করে বাঙালিকে। সবকিছু নিয়ে গঠিত তার সাংস্কৃতিক পরিমণ্ডল। বাংলা ভূখণ্ডে বসবাসকারী বাঙালির সংস্কৃতির বিষয়ে ধারণা পেতে, তার ইতিহাস, উত্তরাধিকার এবং অন্তর্জীবন ও বহির্জগতের গতিধারার বিষয়টি অনুসন্ধানের দাবি রাখেন সমাজতাত্ত্বিকরা।

একটি জাতির ভাষা-সাহিত্য, ধর্ম ও বিশ্বাস, রীতিনীতি, সামাজিক মূল্যবোধ ও নিয়মকানুন, উৎসব-পার্বণ, শিল্পকর্ম এবং প্রতিদিনের কাজে লাগে এমন হাতিয়ার ইত্যাদি সব কিছু নিয়েই সংস্কৃতি। সমাজের সদস্য হিসেবে মানুষ যে শিক্ষা, সামর্থ্য এবং অভ্যাস আয়ত্ত করে তাও সংস্কৃতির অঙ্গ। (মুরশিদ, ২০০৬:১৩ )

তাই, একটি জাতির সংস্কৃতিকে একদিকে যেমন তার আত্মগঠনের অন্যদিকে তার পরিবেশকে পুনর্গঠিত করার ব্যাপার বলে মনে করেন আবুল কাসেম ফজলুল হক। জাতি ও রাষ্ট্রের উন্নয়নে সংস্কৃতির ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ) শীর্ষক নিবন্ধে তিনি লিখেছেন :

সংস্কৃতি হল সেই শক্তি যা মানুষের চিন্তায় ও কাজে উন্নতিশীলতা, উৎকর্ষমानতা, সৌন্দর্যমানতা, উত্তরণশীলতা, প্রগতিশীলতা ও পূর্ণতা প্রয়াসের মধ্যে বিরাজ করে। সংস্কৃতি হল ব্যক্তিগত ও সম্মিলিত জীবনে সমান অজ্ঞান সংস্কার  প্রচেষ্টা। (আবুল কাসেম, ২০১8)সংস্কৃতির গভীরে প্রগতির তাড়নাও ক্রিয়াশীল থাকে। তাই সংস্কৃতিতে সর্বজনীন কল্যাণবোধ বিরাজমান। জাতির অন্তর্গত চিন্তা, কর্ম, উৎপাদন ও সৃষ্টিকে সেই জাতির সংস্কৃতির বাহন বলে মনে করেন আবুল কাসেম।

 

সংস্কৃতি ও বাঙালি সংস্কৃতি

 

তবে, বাঙালি সংস্কৃতির বিষয়ে আলোকপাত করতে বাঙালি জাতির চৌহদ্দি, পরিসীমা এবং ঐতিহাসিক পটভূমি জানা আবশ্যক বলে মনে করেন এ. বি. এম. শামসুদ্দীন আহমদ। বাঙালির সাংস্কৃতিক ইতিহাসের তথ্যপ্রমাণ সহজলভ্য না হলেও, জনগণের সামাজিক জীবন ও সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্যের ধারাবাহিকতায় তা খুঁজে পাওয়া কঠিন নয়, উল্লেখ করে শামসুদ্দীন লিখেছেন :

উপাদানের স্বল্পতার কারণে বাংলাদেশের জনগণের সামাজিক জীবন ও সাংস্কৃতিক বৈচিত্রের বিবরণ দেওয়া বেশ কঠিন। এ ছাড়া, যে-সব উপাদান পাওয়া যায়, বিশেষ করে প্রাচীন ও মধ্যযুগে সেগুলিতে রাজনৈতিক ঘটনারই বর্ণনা বেশি। তবুও প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শনাবলি ও সাহিত্যিক উপাদান এবং শিলালিপি, তাম্রলিপি, বিদেশী পর্যটকদের বিবরণ ও ফার্সি উপাদান থেকে সংগৃহীত তথ্যাদির আলোকে বাংলাদেশের জনগণের সামাজিক জীবন ও সাংস্কৃতিক বৈশিষ্ট্য সম্পর্কে এক পরিষ্কার ধারণা লাভ করা যায়। (শামসুদ্দীন, ২০০৭: ১৪৭ )

ইতিহাসের আলোকে প্রাপ্ত সেই তথ্যমতে বলা যায়, বর্তমানে লুপ্ত-প্রায় আন্দামান দ্বীপপুঞ্জের আদিম অধিবাসীগণ ব্যতীত এমন কোনো জাতি নেই যারা বিশুদ্ধ রক্ত বহন করে। সেই সূত্রে বাঙালিও মিশ্র জাতি- এমন উল্লেখপূর্বক অতুল সুর লিখেছেন :

বাঙালির আবাবিক নৃতাত্ত্বিক গঠনে যেসব জাতির রক্ত মিশ্রিত হয়েছে, তারা হচ্ছে অস্ট্রিক ভাষা-ভাষী বাঙলার আদিম অধিবাসী ও আগন্তুক দ্রাবিড় ভাষাভাষী ভূমধ্যসাগরীয় নরগোষ্ঠী ও আর্যভাষাভাষী আলপীয়, (বা দিনারিক) জাতিসমূহ। তবে অস্ট্রিক ভাষাভাষী বাঙলার আদিম অধিবাসী ও আলপীয় (বা দিনারিক) রক্তই প্রধান। … বাঙালী জীবনে অস্ট্রিক প্রভাব বিশেষভাবে লক্ষিত হয় বাঙালির লৌকিক জীবনে। বস্তুত ‘অস্ট্রিক’ জীবনচর্যার ওপরই গঠিত হয়েছে বাঙালির জীবন-চর্যার বনিয়াদ। সেই বনিয়াদের ওপরই স্বরীভূত হয়েছে দ্রাবিড় ও আলপীয় উপাদান। (অতুল, ২০০৮ ৮-৯)

বাঙালির জীবনযাত্রা শুরু হয়েছিল মানুষের আবির্ভাবের দিন থেকে, এমন কথার প্রমাণ পাওয়া যায় প্রাচীন তথ্য পরিক্রমায়। যুগের সাথে চাহিদা আর নতুন নতুন আবিষ্কার ছাপ রেখে গেছে বাঙালি স্বকীয়তার। অতুল সুর উল্লেখ করেন :

প্রত্নোপলীয় যুগের প্রথম দিকের মানুষের কঙ্কালাছি পাওয়া না গেলেও, মানুষ যে সেই প্রাচীন যুগ থেকেই বাঙলা দেশে বসবাস করে এসেছে, তার প্রমাণ আমরা পাই বাঙলা দেশের নানাস্থানে পাওয়া তার ব্যবহৃত আয়ুধসমূহ (tools) থেকে। এগুলো সবই পশ্চিম-ইউরোপে প্রাপ্ত প্রত্নোপলীয় যুগের হাতকুঠারের অনুরূপ। প্রত্নোপলীয় (palaeolithic) যুগের পরিসমাপ্তির পরই সূচনা হয় নবোপলীয় (neolithic) যুগের।

এ যুগেই কৃষি ও বয়নের উদ্ভব হয় এবং মানুষ পশুপালন করতে শুরু করে। তবে সবচেয়ে বৈপ্লবিক পরিবর্তন যা নবোপলীয় যুগে ঘটেছিল, তা হচ্ছে মানুষ তার যাযাবর জীবন পরিহার করে, স্থায়ীভাবে গ্রামে বাস কতে শুরু করেছিল। ধর্মেরও উদ্ভব ঘটেছিল।

… নবোপলীয় যুগের অনেক কিছুই আমরা আজ পর্যন্ত আমাদের দৈনন্দিন জীবনে ধরে রেখেছি, যথা ধামা, চুবড়ি, কুলা, ঝাঁপি, বাটনা বাটবার শিল-নোড়া ও শয্য পেষাইয়ের জন্য যাঁতা ইত্যাদি। এগুলো সবই আজকের বাঙালি নবোপলীয় যুগের ‘টেকনোলজি’ অনুযায়ী তৈরী করে। তা ছাড়া, নবোপলীয় যুগের শস্যই, আজকের মানুষের প্রধান খাদ্য। (অতুল (২০০৮)

ভূখণ্ড হিসেবে প্রাচীন বাংলার ঐতিহাসিক প্রমাণও পাওয়া যায়। ভূ-তাত্ত্বিক আলোড়ন ও আবর্তনের ফলে বাংলাদেশ গঠিত হয়ে গিয়েছিল প্লাওসিন যুগে। ভূতত্ত্ববিদগণের হিসাব অনুযায়ী সেটা ঘটেছিল প্রায় দশ থেকে পঁচিশ লক্ষ বৎসর পূর্বে আর মানুষের আবির্ভাব ঘটেছিল আরও পরে, আজ থেকে পাঁচ লক্ষ বৎসর আগে, এমন তথ্য দেন অতুল সুর (২০০৮: ৫)। তার আগেই ঘটেছিল জীবজগতে ক্রমবিকাশের এক কর্মকাণ্ড।

উন্নত মানবসমাজ সৃষ্টির আগে, প্রাগৈতিহাসিক যুগে, কিছু অসামঞ্জস্য ছাড়া যুদ্ধবদ্ধ জীবন প্রায় একভাবেই নিয়ন্ত্রিত হতো। সময়ের প্রয়োজনে বহুবিভক্ত সমাজব্যবস্থায় গড়ে ওঠে বিচিত্র সংস্কৃতি। সেই ধারায়, সংস্কৃতি তার উপাদানগত বৈচিত্র্য নিয়ে, শত-সহস্র বছরে গড়ে তোলে একটি জাতির মূল্যবোধ, মানসিকতা, ঐতিহ্যগত ধারণা। বাঙালি জাতি তার সংস্কৃতিক বৈশিষ্ট্য নিয়ে পরিবর্ধিত হলেও, প্রগৈতিহাসিক কিছু অকৃত্রিমতা বহন করে চলেছে যুগে যুগে। আবু জাফর শামসুদ্দীন উল্লেখ করেন :

অতীতে অলিখিত ইতিহাসের কোনো এক পর্যায়ে সমস্ত মানবজাতি অভিন্ন সাংস্কৃতিক স্তরে অবস্থান করত। সেই আদিম স্তরের কিছু কিছু স্মৃতি এ যুগের সভ্য মানুষও বহন করে চলেছে। … বিরল ব্যতিক্রমণের বাদ দিলে সংস্কৃতির ক্ষেত্রে বৃহত্তর মানবজাতির অগ্রগতি অব্যাহত আছে। (আবু জাফনা, ১৯৮৮ : ১০)

 

সংস্কৃতি ও বাঙালি সংস্কৃতি

 

বিচিত্র সাংস্কৃতিক বৈশিষ্ট্যের মধ্যে বাঙালি জাতির ভাষা, সাহিত্য, সঙ্গীত, খাদ্যাভ্যাস, অঙ্গসৌষ্ঠব, স্বভাব, গোষ্ঠীগত ঐক্য বাঙালি সংস্কৃতির লক্ষণীয় বৈশিষ্ট্য। এই অভিন্ন উপাদানের মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ তার ভাষা। গোলাম মুরশিদ বলেন :

সমাজের ভিন্নতা সত্ত্বেও বাংলা ভাষা সব বাঙালির ভাষা। এবং সে কারণে যখন থেকে বাংলা ভাষার উন্মেষ, তখন থেকে বাঙালি সংস্কৃতির সূচনা। অবশ্য তার মানে এ নয় যে, বাংলা ভাষার জন্মের আগে এ অঞ্চলের জনগোষ্ঠীর যে সাংস্কৃতিক বৈশিষ্ট্য প্রচলিত ছিলো, তাকে আমরা অস্বীকার করছি। বস্তুত অস্বীকার করে নয়, বরং সেই বাংলা-পূর্ব ভিত্তির ওপর গড়ে উঠেছে সত্যিকার বাঙালি সংস্কৃতি। (মুরশিদ, ২০০৬ : ১৫)

স্থানীয় বাংলাভাষী গোষ্ঠী বাংলা ভাষার ধারক। তাই যখন থেকে বাংলা ভাষা এবং বাঙ্গালা নামে একটি অঞ্চলের জন্ম হয়, তখন থেকে বাঙালি সংস্কৃতির সূচনা ধরে নেয়া যায় বলে মত গোলাম মুরশিদের। তিনি আরও বলেন, ত্রয়োদশ-চতুর্দশ শতাব্দীর আগে সত্যিকার বাংলা ভাষা বিকাশ লাভ করেনি। চতুর্দশ শতাব্দীর আগে অখণ্ড বঙ্গদেশও গড়ে ওঠেনি। আর এ অঞ্চলের লোকেরা আঠারো শতকের আগে বাঙালি বলেও পরিচিত হননি। (মুরশিদ, ২০০৬: ২৬)

মানুষ তার জীবন-জীবিকার প্রয়োজনে অনেক কিছুর সাথে সন্ধি রচনা করলেও, সব জনগোষ্ঠীর সংস্কৃতিই স্বতন্ত্র – উল্লেখ করে মাসুম কামাল (২০০৯ ১৬) লিখেছেন, সমাজে অন্তর্গত মানুষ একদিকে যেমন নতুনে বিশ্বাসী, অপরদিকে পুরাতনেরও পিয়াসী। প্রপিতামহের যুগের আসন-বসন ছিন্ন করতে ইচ্ছে জাগে না বলে পুরাতন এবং নতুন অঙ্গাঙ্গি হয়ে নিরবধি কাল ধরে বহমান রয়েছে। স্তরীভূত অসংখ্য বিশ্বাসও ভাবধারা সমাজে কেন্দ্রিভূত হয়ে আছে এবং এর মধ্য দিয়েই সমাজের সকল কর্মপ্রক্রিয়া একটি সুস্থির দর্শনে রূপ নিয়েছে উল্লেখ করে তিনি আরও বলেন ।

বহুবর্ণের এবং গোত্রের মিলন এবং মিশ্রণের মধ্য দিয়ে সাংস্কৃতিক যে পরিমণ্ডলের বিকাশ দেখা যায়, ত অভ্যন্তরে বহুবর্ণের এবং গোত্রের মানুষের মধ্যে ভাবের আদান প্রদান ছিল না ान সংস্কৃ বিশেষ কিছু লক্ষণের সন্ধান পাওয়া যায় একই ভৌগোলিক পরিবেশের মধ্যে অবস্থানরত বিভিন্ন জনগোষ্ঠীর মধ্যে (মাসুম ২০০ : ১৬)

বাঙালি সংস্কৃতি প্রাচীন। আদিকাল থেকে এ সময় পর্যন্ত এই সংস্কৃতিতে যোগ হয়েছে বিশ্বের নানা জাতি- গোষ্ঠীর প্রভাব। ফলে বাঙালি জাতির সংস্কৃতি বহুমাত্রিকতা লাভ করলেও, বাংলার প্রকৃতি ও ভৌগলিক অবস্থান সংস্কৃতিকে দিয়েছে স্বকীয়তা।

বাঙালি সংস্কৃতির উৎপত্তি

বাঙালি তার সংস্কৃতির উত্তরাধিকার যুগ যুগ ধরে বহন করে চলেছে স্বাতন্ত্র নিয়ে। কালে কালে বাংলা ভূ- ভাগে বিভিন্ন জাতিগোষ্ঠীর আগমন ও বিস্তারে বাঙালি সংস্কৃতি প্রভাবিত হয়েছে। এর পরেও জাতি হিসেবে বাঙালির সংস্কৃতি-চেতনা তাকে করেছে বিশিষ্ট।

অতুল সুরের (২০০৮ ৮২) লেখায় পাই, বৈদিক সংস্কৃতির বাহক নর্ডিক আর্থনা পূর্ব দিকে বিদেহ বা মিথিলা পর্যন্ত বিস্তৃত ছিল। ফলে সে পর্যন্ত ছিল আর্যাবর্ত বা বৈদিক সংস্কৃতির লীলাভূমি। এর বাইরের লোকেদের তারা হীন মনে করত। সেজন্য আর্যাবর্তের কোনো লোক যদি তীর্থ যাত্রা উপলক্ষে বাংলাদেশে আসত, তাহলে তাকে পুনোষ্টম নামে এক যজ্ঞ সম্পাদন করে শুদ্ধ হতে হতো। এই বিধান থেকে পরিষ্কার বুঝতে পারা যায়, বাংলাদেশের লোকেরা তখন সংস্কৃতিবিহীন জাতি ছিল না। তাদেরও স্বকীয় সংস্কৃতি ছিল, স্বকীয় ধর্ম ছিল এবং তাদের দেবদেবীকে কেন্দ্র করে তীর্থস্থানও ছিল। আর্যদের মধ্যে উদারপন্থী কেউ কেউ সে সকল তীর্থ দর্শন করতে আসত।

তবে, আর্যরা প্রথমে যখনই এসে থাকুন না কেন, বঙ্গদেশে আর্যসভ্যতার জোরালো প্রভাব পড়তে শুরু করে মৌর্যদের আমলে। তার কারণ হিসেবে গোলাম মুরশিদ (২০০৬ : ৫২) লিখেছেন, মৌর্য সাম্রাজ্যের রাজধানী ছিল বাংলার দোরগোড়া মগধে। ফলে, সে সময় (খৃষ্টপূর্ব তৃতীয় শতক) থেকে কৃষি এবং উৎপাদন ব্যবস্থায় আর্যসভ্যতার সঙ্গে স্থানীয় সভ্যতার আদান-প্রদান বৃদ্ধি পায়।

তার পরও, বাংলার জীবন যাপন প্রণালী যে অন্যান্য অঞ্চলের সংস্কৃতি থেকে স্বতন্ত্র্য, তার প্রমাণ পাওয়া য অতুল সুরের (২০০৮ : ৮২) লেখায়। বাঙালির আহারের একটা বিশেষ উপাদান-মাছ। অস্ট্রিক ও দ্রাবিড় ভাষাভাষি লোকেরাও মাছ যেত। কিন্তু বৈদিক আর্যরা মাছ যেত না। তারা খেত মাংস। এমনকি আর্যরা গরুর মাংসও আহার করত। কিন্তু অস্ট্রিক ও দ্রাবিড় ভাষাভাষী লোকেরা গরুকে দেখত প্রভার চোখে। এমন আরও পার্থক্য চোখে পড়ে পোশাক পরিধান বা রন্ধন পদ্ধতির বৈচিত্র্যেও।

অতুল ( ২০০৮ : ৮২) লিখেছেন, আসাম, বাংলা, ওড়িশা, গুজরাট ও দক্ষিণ ভারতের লোকেরা ঊর্ধ্বাঙ্গে চাদর ও পায়ে গোড়ালির দিকে খোলা জুতা পারে। তা ছাড়া, তারা রাঁধবার জন্য ব্যবহার করে তেল। এদিকে, উত্তরভারতের লোকেরা উপর-গায়ের জন্য সেলাই করা জামা, পায়ে গোড়ালি-ঢাকা জুতা এবং রাঁধবার জন্য তেলের পরিবর্তে ঘি ব্যবহার করে।

বাঙালির আহারে ৬৪ রকমের ব্যঞ্জন ব্যবহৃত হলেও, এত বেশি ব্যঞ্জন প্রস্তুত করতে জানত না উত্তরভারতের লোকেরা। আহার-বিহার ও বস্ত্রের বিভেদ ছাড়া অস্ট্রিক ও দ্রাবিড়গোষ্ঠীর লোকদের সঙ্গে আর্যাবর্তের লোকদের ধর্মীয় সংস্কারেরও পার্থক্য উল্লেখ করেন অতুল সুর :

অস্ট্রিক ও দ্রাবিড়গোষ্ঠীর ধর্মীয় সংস্কারের অন্তর্ভূক্ত ছিল মৃত্যু উত্তর জীবনে বিশ্বাস, পিতৃপুরুষগণের পূজা, কৃষি সম্পর্কিত অনেক উৎসব, যেমন পৌষপার্সণ, নবান্ন প্রভৃতি; মেয়েদের দ্বারা পালিত অনেক ব্রত এবং ধর্মীয় ও সামাজিক অনুষ্ঠানে চাট, দুর্বা, কলা, মরিদ্রা সুপার, সিঁদুর কলাগাছ প্রত্যহ শিলা বৃক্ষ ও লিঙ্গপূজা, পূজায় ঘাটের ব্যবহার ইত্যাদি।

 

সংস্কৃতি ও বাঙালি সংস্কৃতি

 

এগুলি কার্য অক্ষর জাতিসমূহের ধর্মীয় আচারের অন্তর্গত। চড়ক গাছ প্রভৃতি উৎসবও বাংলাদেশের বৈশিষ্ট্য। এরূপ অনুমান করার সপক্ষে যথেষ্ট যুক্তি আছে যে, বাঙালরি এই সকল বৈশিষ্ট্য প্রা-আর্য মুখ থেকে প্রচলিত আছে। যোগ- এর নাম ণী শিবপূজা, মাতৃদেবীর পূজ প্রভৃতি বাঙলাদেশে প্রাক-আর্থ কাল থেকেই চলে এসেছে। তন্ত্রধর্মের উদ্ভবও বাংলাদেশেই হছে, ২০০৮: ৮৩)

মহামহোপাধ্যায় হরপ্রসাদ শাস্ত্রীর উদ্ধৃতি দিয়ে বাঙালি সংস্কৃতির আরও অনেক বৈশিষ্ট্যের কথা তুলে ধরেন অতুল (২০০৮ ৮৩)। যেমন হস্তবিদ্যা, রেশমবয়ন, সাংখ্যদর্শন, প্রেক্ষাগৃহ (বা রঙ্গালয় ), নৌকা বা – জাহাজ নির্মাণ প্রভৃতি। সামাজিক ও ধর্মীয় অনুষ্ঠানে উলুধ্বনি দেওয়া, আলপনা অঙ্কন প্রভৃতিও বাঙালি সংস্কৃতির নিজস্ব অবদান।

এ তো গেল সংস্কৃতির দৃশ্যমান অংশবিশেষ। বাঙালি সংস্কৃতির ধর্ম বা আচারকেন্দ্রীক আনুষ্ঠানিকতার উদ্ভব বিষয়ে ফিরে দেখা যাক ইতিহাসের পাতায়। প্রাচীন বাঙলায় ব্রাহ্মণদের অনুপ্রবেশ ঘটেছিল মৌর্যযুগে। তবে ব্যাপকভাবে ব্রাহ্মণরা বাংলায় আসতে শুরু করে গুপ্তযুগে।

ব্রাহ্মণ্যধর্মের অনুপ্রবেশের পূর্বে বঙ্গ অঞ্চলে আদিম অধিবাসীদের ধর্ম এবং ধর্মীয় লোকাচার অনুসৃত হতো। যা পরবর্তী সভ্যতা ও সংস্কৃতিতে প্রভাব ফেলে। এর উদাহরণ তুলে ধরে অতুল সুর লিখেছেন

মৃত্যুর পরে আত্মার অস্তিত্বে বিশ্বাস, মৃত ব্যক্তিরা প্রতি শ্রদ্ধা, বিবিধ ঐন্দ্রজালিক দ প্রকৃতির সৃজনশক্তিকে মাতৃ, মারী পূজা, উটেম এর প্রতি ভক্তি শ্রদ্ধা এবং গ্রাম, নদী, বৃক্ষ, অরণ্য পর্বত ও ভূমির মধ্যে নিহিত শক্তির পূজা, মানুষের ব্যাধি ও দুঘটনাসমূহ দুষ্ট শক্তি বা ভূত-প্রেত দ্বারা সংঘটিত হয় বলে বিশ্বাস ও বিবিধ নিষেধাজ্ঞাজ্ঞাপক অনুশাসন ইত্যাদি নিয়েই বাঙলার আদিম অধিবাসীদের ধর্ম গঠিত ছিল।

কালের বিবর্তনে এই সকল বিশ্বাস ও আরাধনা-পদ্ধতি ক্রমশ বৈদিক আর্যগণ কর্তৃক গৃহীত হয়েছিল, এবং সেগুলি হিন্দুধর্মের অন্তর্ভূক্ত হয়ে জন্ম, মৃত্যু, বিবাহ, শ্রাদ্ধ ইত্যাদি আনুষ্ঠানিক ধর্মকর্মে পরিণত হয়েছিল। বস্তুতঃ ব্রাহ্মণ্যধর্মের অনেক কিছু পূজা-পার্বণের অনুষ্ঠান, যেমন দুর্গাপূজার সহিত সংশ্লিষ্ট নরপত্রিকার পূজা ও শবরোৎসব, নবান্ন, পৌষপার্বণ, হোলি, ঘেটুপূজা, চড়ক, গাজন প্রভৃতি এবং আনুষ্ঠানিক কর্মে চাউল, কলা, কলাগাছ, নারিকেল, সুপারি, পান, সিদুর, ঘট আলপনা, শঙ্খধ্বনি, উলুধ্বনি, গোময় এবং পঞ্চগব্যের ব্যবহার ইত্যাদি সবই আদিম অধিবাসীদের কাছ থেকে নেওয়া হয়েছিল।

তাদের কাছ থেকে আরও নেওয়া হয়েছিল আটকৌড়ে, শুভচনী পূজা, শিশুর জন্মের পর ষষ্ঠী পূজা, বিবাহে গাত্রহরিদ্রা, পানখিলি, গুটিখেলা, স্ত্রী-আচার, লাজ বা খই ছড়ানো, দধিমঙ্গল, লক্ষ্মীপূজার সময় লক্ষ্মীর ঝাঁপি স্থাপন, অলক্ষ্মীর পূজা ইত্যাদি আচার অনুষ্ঠান যা বর্তমান কালেও বাঙালী হিন্দু পালন করে থাকে। এসবই প্রাক্-আর্য সংস্কৃতির অবদান। এ ছাড়া, নানারূপ গ্রাম্য দেবদেবীর পূজা, ধ্বজা পূজা, বৃক্ষের পূজা, বৃষকাষ্ঠ, যাত্রাজাতীয় পর্বাদি যেমন স্নানযাত্রা, রথযাত্রা, ঝুলনযাত্রা, রাসযাত্রা, দোলযাত্রা প্রভৃতি এবং ধর্মঠাকুর, চণ্ডী, মনসা, শীতলা, জাঙ্গুলী, পর্ণশবরী প্রভৃতির পূজা ও আম্বুবাচী, অরন্ধন ইত্যাদি সমস্তই আমাদের প্রাক-আর্য জাতি সমূহের কাছ থেকে নেওয়া। (অতুল, ২০০৮ 88 8৫ )

উপর্যুক্ত উপাদানের ভিত্তিতেই গঠিত হয়েছিল বাঙলার লৌকিক সংস্কৃতি। অতুল সুর তাঁর বাঙলা ও বাঙালীর বিবর্তন (২০০৮ ৮৫, ৯০-৯৪, ১৬-১৮) গ্রন্থে আরও যুক্ত করেন, এই লৌকিক জীবনচর্যায় আছে বিয়ের মতো আনুষ্ঠানিকতা। জামাই ষষ্ঠী ও ভাইফোটার মতো লৌকিক উৎসব, সন্তান জন্মদান থেকে শুরু করে তার নামকরণ, অন্নপ্রাশন, বিদ্যারম্ভ, পৌষপার্বণ ও অরন্ধন (যে দিন মেয়েরা তাদের রন্ধনক্রিয়ার দক্ষতা প্রদর্শন করত)।

বাংলার গৌরবময় সংস্কৃতির নিদর্শনে আরও আছে – কার্পাস বা রেশম বস্ত্র বয়ন, মৃৎশিল্প তৈরি, পৌরাণিক কাহিনি সংবলিত পোড়া মাটির মন্দির সজ্জার মতো কারু ও দ্বারুশিল্প। আলপনা আঁকা বা নকশিকাঁথার মতো লৌকিক শিল্পে অনুরণিত হয়েছে বাঙালির প্রাণের স্পন্দন ও আনন্দময় জীবনচর্চার সংস্কৃতি। ছিল ঐন্দ্রজালিক প্রক্রিয়া বা সংস্কার মেনে চলার প্রবণতা, বশীকরণ, উচ্চাটন, মারন ইত্যাদিতে বিশ্বাস ।

লোকসংস্কৃতির এই ধারাগুলোকে বিশেষায়িত করে আমেরিকান ফোকলোরবিদ Archer Taylor মনে করেন, এই ঐতিহ্য মৌখিক উপাদানও হতে পারে, যা ঐতিহ্যানুযায়ী আচারকেন্দ্রিক পন্থায় পরিচালিত হয় । লোকসংস্কৃতির সংজ্ঞায় তিনি উল্লেখ করেন :

“Folklor” is the material that is handed on by tradition, either by word of month or by custom and practice. It may be folksongs, folktales, riddles, proverbs or other materials preserved in wards. (Taylor, 1948 216)

বাঙালির লৌকিক জীবনকে প্রাণস্পন্দনে ভরে তোলে তার নিজস্ব খেলাধুলা কাবাডি, কুস্তি, লাঠিখেলা, সাঁতার, নৌকাবাইচ, পাশা, কড়ি, গুটি খেলা, বাঘবন্দি, বউ-বাসন্তী, মোগল পাঠান, দশ-পঁচিশ লুকোচুরি, কানামাছি, এক্‌কা-দোককা ইত্যাদি। ছিল ঘুমপাড়ানি গান, বিয়ের গান। রাতের ঘুম হরণ করা পালা গান, পাঁচালি গান, কবিগান, তরজা গান, ঝুমুর, ধামালী গান বা যাত্রার মতো আরও মনোহর বিষয় বাঙালি সংস্কৃতির পরিচায়ক।

কালের বিবর্তনে এই লোক সংস্কৃতির অনেক কিছুই লুপ্ত, আর কিছু আধুনিকীকরণে বিবর্তিত হয়ে এখন সে পরিবেশ আর রেশ হারিয়ে গেলেও, এক সমৃদ্ধ সংস্কৃতির উত্তরাধিকারী বাঙালি – এ কথা নিসন্দেহ।

 

সংস্কৃতি ও বাঙালি সংস্কৃতি

 

বাঙালি সংস্কৃতির উদ্ভবকাল নিয়ে রয়েছে ধোঁয়াশা। জাতীয়তাবাদী চেতনায় উদ্বুদ্ধ কোনো কোনো লেখক বাঙালি সংস্কৃতিকে খুব পুরনো, এমনকি পাঁচ হাজার বছরের প্রাচীন বলে দাবি করলেও, গোলাম মুরশিদ মনে করেন; বাঙালি সংস্কৃতি আদৌ অতো পুরনো নয়। তাঁর মতে :

সত্যি বলতে কি, বাংলা ভাষার नয় এক হাজার বছরও হয়েছে কিনা, তাতেও সন্দেহ আছে। সন্দেহ আছে বলছি এ জন্যে যে, এক দিনে এমন কি এক শতাব্দীতে একটা ভাষা তার বৈশিষ্ট্য অর্জন করে – না। এ কথা মেনে নিলে নীহাররঞ্জন রায় যাকে বাঙ্গালীর ইতিহাস বলেছেন, তাকে বাঙালির ইতিহাস অথবা বাঙালি সংস্কৃতির ইতিহাস বলা সঙ্গত নয়। কারণ, তিনি যখনকার ইতিহাস লিখেছেন, তখনও এই অঞ্চলের ভাষা তার বৈশিষ্ট্য লাভ করে রীতিমত বাংলা হয়ে ওঠেনি।

এমন কি, এই এলাকাও তখন এক অখণ্ড বঙ্গভূমিতে পরিণত হয়নি। তখনও বঙ্গদেশ বিভক্ত ছিলো গৌড়, বরেন্দ্রী, রাঢ়, সমতট, সুক্ষ, বঙ্গ ইত্যাদি নানা ভাগে। বস্তুত, এই ছোট ছোট অঞ্চল মিলে একটি অখণ্ড বঙ্গভূমি পাল-বর্মন-সেন রাজাদের সময়ে গড়ে ওঠেনি। সুতরাং সেই যুগে যাঁরা বাস করতেন তাঁদেরও বাঙালি বলার কোনো যুক্তি নেই। (মুরশিদ, ২০০৬)

গোলাম মুরশিদকে সমর্থন করেই বলা যায়, বাংলা-পূর্ব অধিবাসীদের সাংস্কৃতিক বা নৃতাত্ত্বিক ঐতিহ্য বিলুপ্ত হয়ে যায়নি, বরং তাকে অবলম্বন করে নতুন উপাদানের সমন্বয়ে নির্মিত হয়েছে বাঙালি সংস্কৃতির ভিত । গোলাম মুরশিদ আরও যুক্তি দেখান, সেই প্রাচীন কালে যে- আদিবাসীরা এ অঞ্চলে বাস করতেন, তাঁদের রক্ত এখনও আমাদের ধমনীতে প্রবহমান। প্রথমে রাঢ়ে এবং তারপর বরেন্দ্রীতে আর্যরা এসে বসতী স্থাপন করেছিলেন খৃস্টের জন্মেরও আগে। কিন্তু তারও আগে এ অঞ্চলে কেবল অস্ট্রিক শ্রেণির লোকেরাই বাস করতেন না, ছিল দ্রাবিড়, ভোট-চীনারাও।

এই ভিন্ন ভিন্ন নৃতাত্ত্বিক জনগোষ্ঠীর লোকেদের রক্তের এবং ভাষার প্রভৃত মিশ্রণ হয়েছিল। তার সঙ্গে মিশেছে আর্য, সেমিটিক, কেন্দ্রীয় এশিয়ার রক্ত। ইউরোপীয় রক্তও যে একেবারে মেশেনি, তা নয় (মুরশিদ, ২০১৬ ১৬)। আজকের বাঙালির দেহে যেমন এই বিচিত্র নৃতাত্ত্বিক জনগোষ্ঠীর জীবন বহমান, তেমনি আজকের বাংলা ভাষাতে সকল জনগোষ্ঠীর ভাষার উপাদান বর্তমান। গোলাম মুরশিদ লিখেছেন :

আর্যরা এ অঞ্চলে এসে যখন স্থায়িভাবে বসতি স্থাপন করেন, তখন তাঁরা শাসক ছিলেন না। কিন্তু পরে তারাই শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে বঙ্গদেশ শাসন করেন। এবং তাদের মুখের ভাষাকেই এই অঞ্চলের লোকেরা ধীরে ধীরে নিজেদের ভাষা হিসেবে গ্রহণ করেন। …আর্যরা বঙ্গদেশে আসার প্রায় পনেরো শো বছর পরে বিবর্তনের মধ্য দিয়ে বাংলা ভাষার উদ্ভব হয় বলে অনুমান করা যায়।

অবশ্য তখনো বাংলার উত্তর এবং পূর্ব অঞ্চলের পাহাড়ী লোকেরা এ ভাষাকে গ্রহণ করেননি। … কিন্তু সমতল ভূমির লোকেরা বাংলাকে মেনে নিয়েছেন। এ থেকে সমতল ভূমির লোকেদের সমন্বয়ী মনোভাবের পরিচয় পাওয়া যায়। এমন কি, কেন্দ্রীয় এবং পশ্চিম এশিয়া থেকে মুসলমানরা যখন এসেছেন, তখনও তাঁরা নবাগতদের ভাষা দিয়ে যথেষ্ট প্রভাবিত হয়েছেন। (মুরশিদ, ২006-19 )

বস্তুগত সংস্কৃতি (জীবনযাপন প্রনালী) আর মানস সংস্কৃতি (সাহিত্য, দর্শন, শিল্প, সঙ্গীতে মানসিক প্রবৃত্তির প্রকাশ) মিলিয়ে কোনো দেশের বা জাতির সাংস্কৃতিক পরিচয় ফুটে ওঠে বলে মনে করেন আনিসুজ্জামান। তাঁর মতে, বাংলার আদি জনপ্রবাহে প্রাক আর্য নরগোষ্ঠী, পরবর্তীতে আর্য জনগোষ্ঠীর গভীর প্রভাব ছিলো।

পরে মুসলমানরা যখন এদেশ জয় করলেন, তখন তাঁরা যে সংস্কৃতি নিয়ে এলেন, তাতে তুর্কি-আরব-ইরান- মধ্য এশিয়ার সাংস্কৃতিক উপাদানের মিশেল ছিল। সেখান থেকে অনেক কিছু এল বাঙালি সংস্কৃতিতে। তারপর এদেশে যখন ইউরোপীয়রা এলেন, তখন তাঁরা এদেশের সংস্কৃতির সঙ্গে যোগ ঘটালেন আরও একটি সংস্কৃতির। এভাবে বাংলার সংস্কৃতিতে অনেক সংস্কৃতি-প্রবাহের দান এসে মিশেছে। আর নানা উৎসের দানে আমাদের সংস্কৃতি হয়েছে পুষ্ট। (আনিসুজ্জামান, ২০১৬ : ৫০)

বাংলা ভাষা গড়ে ওঠার আগেকার সংস্কৃতির অনেক বৈশিষ্ট্য এ অঞ্চলের লোকেরা বর্জন করতে পারেননি; সেই প্রভাব উল্লেখ করে গোলাম মুরশিদ যোগ করেন, বাংলা-পূর্ব কালের লোকেরা যে-মাছভাত খেতেন, বাঙালি তা এখনও ছাড়তে পারেনি। পুরনো জনগোষ্ঠীর মধ্যে আর্যরা নতুন কৃষি এবং খাদ্য নিয়ে। এসেছিলেন; মোগল-পাঠনি-তুর্কি-আরবরাও ভিন্ন ধরনের খাদ্যাভ্যাস নিয়ে এসেছিলেন।

এমনকি, পর্তুগিজ এবং ইংরেজরাও অনেক নতুন খাবার নিয়ে এসেছিলেন। তা সত্ত্বেও মাছ-ভাতের প্রতি বাঙালিদের আকর্ষণ এবং আনুগত্য আগের মতোই আছে। এমনকি, রান্নার ধরনেও রয়ে গেছে সেই ধারা। এমনকি, দ্বাদশ শতাব্দীর উদ্ভট শ্লোকে বাঙালির যে খাবার বর্ণনা, তার সঙ্গে এ যুগের বাঙালির খাবারে মিল যেমন আছে, তেমনি প্রাচীনকালে এ অঞ্চলে যেভাবে দোচালা বাড়ি তৈরি করা হতো শতাব্দীর পর শতাব্দী সেই রীতিই বজায় রয়েছে। (মুরশিদ, ২০০৬ : ১৭)

ইতিহাস থেকে জানা যায়, সুলতান গিয়াস উদ্দীন মাহমুদ শাহের সময়ে বাংলাদেশে ব্যবসা করার সনদ পান- ওলন্দাজ, ইংরেজ, দিনেমার, ফরাসি এবং পর্তুগিজ বণিকরা। পর্তুগিজদের অনেকে বঙ্গদেশে স্থায়ীভাবে বসবাস শুরু করার কারণে বাংলা ভাষায় তাদের প্রভাব পরিলক্ষিত হয়।

যদিও ইংরেজদের সাথে প্রতিযোগিতায় টিকে থাকতে পারেননি পর্তুগিজসহ অন্য বণিকরা। ভারতবর্ষে সাম্রাজ্য বিস্তারের লক্ষ্যে ইংরেজরাই খুঁটি গাড়েন বঙ্গদেশে। ইংরেজরা তাদের সাথে পণ্য এবং ইউরোপীয় ভাবধারার সাথে আরও নিয়ে আসে ইংরেজি ভাষা এবং সাহিত্য। যা দিয়ে সবচেয়ে বেশি প্রভাবিত হয় বাংলা ভাষা।

প্রাচীন সংস্কৃতির ভিত্তির ওপর গত এক হাজার বছরে বাঙালি সংস্কৃতির অবয়ব গড়ে উঠেছে। তার কাঠামো নতুন, কিন্তু তা দাঁড়িয়ে আছে বাংলা-পূর্ব ঐতিহ্যের ওপরে। যে-ভাষার ওপর ভিত্তি করে বাঙালি সংস্কৃতি গড়ে উঠেছে, সেই বাংলা ভাষা কখন জন্ম লাভ করে, তা বিবেচনা করে দেখার চেষ্টা করেছেন গোলাম মুরশিদ।

চর্যাপদের মধ্যে বাংলা ভাষার কিছু বৈশিষ্ট্য দেখা দিলেও, তখনও বাংলা ভাষার অনেক উপাদান ওড়িয়া- অহমিয়ার সঙ্গে অভিন্ন ছিল। গোলাম মুরশিদ যুক্তি দেখান, চর্যাপদেরও পরে বাংলা ভাষার উদ্ভব। চর্যার বয়স এক হাজার বছর হয়ে থাকলে, বাংলা ভাষার বয়স এখনো এক হাজার বছর হয়নি। সুতরাং বাংলা ভাষাকে বাঙালি সংস্কৃতির সবচেয়ে অভিন্ন উপাদান বলে গণ্য করলে, বাঙালি সংস্কৃতির ইতিহাসকে এক হাজার বছরের চেয়ে কম বয়সী বলে মনে করাই সঙ্গত বলে মনে করেন মুরশিদ।

 

সংস্কৃতি ও বাঙালি সংস্কৃতি

 

বাঙালি সংস্কৃতি নিয়ে বাংলা অঞ্চলের উৎপত্তি

‘বঙ্গের অধিবাসী’ এই অর্থে ‘বাঙ্গাল’ শব্দের প্রথম ব্যবহার লক্ষ করা যায় চোদ্দ-পনেরো শতকে এমন – তথ্যের অবতারণা করে গোলাম মুরশিদ বলেন :

কেবল শামসুদ্দীন ইলিয়াস শাহের পদবী শাহে বাঙ্গালিয়ান’ ছিলো না, নূর কুতুবে আলম নামে একজন বিখ্যাত দরবেশও “আলম বাঙ্গালি” বলে পরিচিত ছিলেন। এই দরবেশ অবশ্য দক্ষিণবঙ্গে বাস করতেন না। তাঁর কবরও পাণ্ডুয়ায় অবস্থিত। তা সত্ত্বেও তাঁকে বাঙালি কেন বলা হতো, জানা যায় না। (মুরশিদ, ২০০৬ঃ২২)

এ রকমের দু-একটি ব্যতিক্রম থাকলেও, সাধারণ লোক তখনও বাঙালি নামে পরিচিত হননি। মুরশিদ (২০০৬ : ২২) লিখেছেন, ষোলো শতকের শেষ দিকে মুকুন্দরাম চক্রবর্তী তাঁর চণ্ডীমঙ্গল কাব্যে ‘বাঙ্গাল’ শব্দটা ব্যবহার করেছেন এভাবে:

কান্দেরে বাঙ্গাল ভাই বাফোই বাকোই

কিন্তু মুরশিদ মনে করেন, কবি ‘বাঙ্গাল’ শব্দের প্রয়োগ করেছেন দক্ষিণ অথবা পূর্ববাংলার লোক অর্থে বৃহত্তর বঙ্গের অধিবাসী অর্থে নয়।

এ কথার সূত্র ধরে ‘বাঙ্গালি’ শব্দের আরও কিছু ব্যবহারের কথা উল্লেখ করেছেন মুরশিদ (২০০৬ : ২২ ) । ষোলো শতকে বৃন্দাবন দাসের চৈতন্যভাগবতে পূর্ববঙ্গের অধিবাসী হিশেবে ‘বাঙ্গাল’ শব্দের ব্যবহার দেখা যায়। এর প্রায় দু শতাব্দী পরে ভারতচন্দ্র রায়গুণাকর গোটা বাংলার অধিবাসী বোঝাতে প্রথম ‘বাঙ্গালি’ শব্দ প্রয়োগ করেছেন

বাঙ্গালিরা কত ভাল পশ্চিমার ঘরে

অন্যত্র কবি ভারতচন্দ্র অন্নদামঙ্গলের চরিত্র ভবানন্দ মজুমদারের পরিচয় দিতে গিয়ে বলেছেন ‘বাঙ্গালি

তপন রায়চৌধুরীর মতে, ভারতচন্দ্র রায়গুণাকরের আগে বঙ্গের অধিবাসী অর্থে বাঙ্গালি শব্দের ব্যবহার দেখা যায় না। কিন্তু আহমদ শরীফ দাবি করেছেন যে, ১৫৮৪ সালের দিকে লেখা সৈয়দ সুলতানের রচনায় ‘বাঙ্গালী’ শব্দের ব্যবহার লক্ষ করা যায়:

কর্মদোষে বঙ্গেত বাঙ্গালী উৎপন

না বুঝে বাঙ্গালী সবে আরবী বচন !!

এই উদ্ধৃতি প্রক্ষিপ্ত কি না, অথবা আহমদ শরীফ যে পুথি ব্যবহার করেছেন, তা কত সালে লিপীকৃত, এর উল্লেখ পাওয়া না গেলেও, বানান এবং ভাষা থেকে এ পুথিকে অত প্রাচীন বলে মনে করেন না গোলাম মুরশিদ।

আলোচনাসূত্রে বলা যায়, সমাজতাত্ত্বিকেরা সংস্কৃতিকে জটিল একটি ধারণা মনে করলেও, এ কথা স্বীকার করেন যে, মানুষের বিশ্বাস, দৃশ্যমান আচরণ এবং জ্ঞানের সমন্বয়ে গড়ে ওঠে তার সংস্কৃতি। এর সাথে যুক্ত হয় তার ভাষা-সাহিত্য, ধর্ম-বিশ্বাস, মূল্যবোধ, উৎসব ও পার্বণ, শিল্পকর্ম এবং দৈনন্দিন ব্যবহার্য দ্রব্য। সংস্কৃতি একমাত্রিক নয়। এর স্বরূপ চলমান, সময়ের সাথে বিবর্তিত।

জন্ম থেকে শুরু করে সমাজের সদস্য হিসেবে মানুষ যেসব শিক্ষা, সামর্থ্য এবং অভ্যাস আয়ত্ত করে, তাও সংস্কৃতির অঙ্গ। যুগের আবহে প্রাচীন কাল থেকে বর্তমানে যে উৎকর্ষ বা অবদমন- সবই তার সংস্কৃতির ফল। আর বাঙালি সংস্কৃতি অনুভবযোগ্য এক বিষয়; একে ব্যাখ্যা করা দুরূহ। একটা সময়ে বাঙালি গ্রামভিত্তিক সমাজ ছিল মন্থর। সময়ের সাথে জনসংখ্যা বৃদ্ধি, পরিবার প্রথার ধরণ, শিক্ষা, অর্থনৈতিক ও যোগাযোগ ব্যবস্থার বিকাশ, দেশবিভাগসহ নানা ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে প্রাকৃতিক পরিবর্তনের মতই ধীরলয়ে বিবর্তিত হয় বাঙালি সংস্কৃতি।

তারপরও বলা যায় – সমাজব্যবস্থা, পরিপার্শ্বের প্রভাব, ধর্ম, রীতি-প্রথা আর বিশ্বাস থেকে গড়ে ওঠা সংস্কার, মানবচিন্তার সচেতন যুক্তিবাদ – সবকিছু নিয়ে বাঙালি জাতির বাঙালি সংস্কৃতি। সংস্কার আর যুক্তির মিলিত বিন্দুতে যে সমাজবোধ, জাতিভেদে তা বৈচিত্রময়: আর বাঙালি সংস্কৃতি সেই বৈচিত্র্যেরই একটি অংশ। বহু বিভক্ত রাজনৈতিক ও ধর্মভিত্তিক সমাজে সংস্কৃতি খণ্ডিত বা ভিন্ন ভিন্ন রূপ পরিগ্রহ করলেও, সব মিলিয়ে বাঙালি সমাজ অভিন্ন, বাঙালি সংস্কৃতি সব বাঙালির।

Leave a Comment