Site icon Literature Gurukul [ সাহিত্য গুরুকুল ] GOLN

সংস্কৃতি : সংস্কৃতির প্রাসঙ্গিক পরিচিতি

সংস্কৃতি : সংস্কৃতির প্রাসঙ্গিক পরিচিতি

আজকে আমাদের আলোচনার বিষয়ঃ সংস্কৃতি : সংস্কৃতির প্রাসঙ্গিক পরিচিতি। যা সংস্কৃতি ও বাঙালি সংস্কৃতি এর অন্তর্গত।

 

 

সংস্কৃতি : সংস্কৃতির প্রাসঙ্গিক পরিচিতি

পৃথিবীর সৃষ্টিলগ্ন থেকে প্রাণের তাগিদে জীবনমাত্রই বিকাশমান। মানবজাতির বুদ্ধিবৃত্তির বিকাশ, চিন্তা-কর্মে আচরণে জীবনের দৃশ্যমান ও অনুভবযোগ্য অভিব্যক্তি এবং সভ্যতার ক্রমবর্ধমান উৎকর্ষের মধ্যে নিহিত থাকে নানা রূপবদলের ইতিহাস। সেখানে মানবসৃষ্ট ভাব-জগৎ, তার জীবনাচরণ পদ্ধতি এবং পরিপার্শ্ব নিয়ে তার নিজস্বতা।

বলা হয়ে থাকে, স্মরণাতীত কাল থেকে সেই নিজস্ব জনজীবনকে কেন্দ্র করে মানবসভ্যতার সমান্তরালে গড়ে উঠেছে মানুষের সংস্কৃতি এবং তা বিকশিত হয়েছে নানা বৈচিত্র্যে। প্রত্যেক সভ্য জাতির নিজস্ব সাংস্কৃতিক ইতিহাস রয়েছে, রয়েছে বিশেষত্ব।

মানুষের সভ্যতা ও সংস্কৃতির সূচনা ঠিক কবে থেকে, এ নিয়ে গবেষণা চলছে যুগ যুগ ধরে। পর্যবেক্ষণলব্ধ সেসব তথ্য ও উপাত্ত থেকে প্রাপ্ত প্রাচীন নিদর্শন ও ঐতিহ্য থেকে উত্তরাধীকারীদের ভাষ্য ও লিখিত দলিল থেকে সংস্কৃতি ও এর রূপান্তর সম্বন্ধে সম্যক ধারণা পাওয়া গেছে। তবে, আজ পর্যন্ত এ সিদ্ধান্তে উপনীত হওয়া যায়নি যে, সংস্কৃতির জন্ম কখন ও কীভাবে, কিংবা সংস্কৃতি কি এবং কি নয়!

শাহ আবদুল হান্নান (২০০৪ ১০৯) মনে করেন, সংস্কৃতি নিয়ে নানা বিতর্ক বৃদ্ধি পায় মার্কসিজমের উত্থানের পর। সে সময় Art for life sake নামে নতুন একটি দর্শন এলে, কমিউনিস্টরা বিতর্ক তোলেন, Art for art sake না Art for life sake এই নিয়ে। এটা করতে গিয়ে তারা বাড়াবাড়িও করেন উল্লেখ করে আবদুল হান্নান লিখেছেন, আর্ট সেখানে সংস্কৃতি অর্থে ব্যবহার করা হয়।

সংস্কৃতির ভেতর যে একটা সৌন্দর্য আবশ্যক, সেটা তারা উপেক্ষা করেন বা বিশেষায়িত করতে ব্যর্থ হন। অপর দিকে ‘আর্ট ফর আর্ট সেক’-এর পক্ষে যারা, তারা এ ইস্যুকে রাজনীতিকরণ করে বলেন, আর্ট আর্টের জন্য। অর্থাৎ এর মধ্যে সৌন্দর্য থাকতে হবে, সৌন্দর্য চেতনা থাকতে হবে। জীবনের বিভিন্ন দিককে যা কিছুই সৌন্দর্যমণ্ডিত করে, তাই সাহিত্যকলায় ‘সংস্কৃতি’ হিসেবে স্বীকৃত। হান্নান আরও যোগ করেন :

সংস্কৃতির প্রশ্নে যদি আমরা সুবিচার করতে চাই তাহলে সেখানে আর্ট বা সংস্কৃতিতে দুটো দিকই থাকতে হবে। জীবনের জন্য তা প্রয়োজনীয় হতে হবে। জীবনের জন্যেই হবে। জীবন কে বাদ দিয়ে নয়। জীবনকেই সার্ভ করতে হবে। এটাই সত্য কথা। অন্যদিকে এটাও সত্য যে যা কিছু সুন্দর নয় তা আর্ট বা সংস্কৃতি হবে না, তা জীবনে জন্য হলেও। কাজেই দুটো উপাদানই প্রয়োজন। দুটোই সত্য। এই বিতর্কেও পরিসমাপ্তির প্রয়োজন রয়েছে। (হান্নান, ২০০৪ঃ১০৯ )

 

 

বিশেষজ্ঞদের মতে মানুষের চিন্তা, কর্ম, সৃষ্টি আর সজ্ঞান প্রয়াসে মিশে থাকা জটিল এক সামগ্রিকতার নাম সংস্কৃতি। সংকল্প আর সংঘশক্তির সাধনায় যার উন্নততর প্রকাশ বলে মনে করেন বিজ্ঞজনেরা। সংস্কৃতি মূলত বিমূর্ত এক ধারণাবোধ।

মানবজীবনের উৎকর্ষ সাধন, সামাজিক পরিবেশের উন্নতি বিধানের নিয়ন্ত্রক বা ইতিহাসের গতি-প্রকৃতির নির্ধারক এই সংস্কৃতি। ‘সংস্কৃতি’র সংজ্ঞা নিরূপণে নানা যুক্তি, মতপার্থক্য এবং দৃষ্টিভঙ্গি যেমন আছে, তেমনি এর স্বরূপ বিশ্লেষণে প্রাচ্য ও প্রতীচ্যের চিন্তকেরা নানা মত ও পথের সন্ধান দিয়ে সংস্কৃতির ধারণাকে বিকশিত করেছেন। তাঁদের মতে, এর তাৎপর্য উপলব্ধির জন্য মানুষের অন্তর্জীবনের সাধনা প্রয়োজন।

সংস্কৃতি : প্রাসঙ্গিক পরিচিতি

বাংলা ভাষায় ‘সংস্কৃতি’ সম্পর্কে সুদূরপ্রসারী চিন্তার উদ্ভব, বলা যেতে পারে, বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় (১৮৩৮-১৮৯৪) থেকেই। ইংরেজি Culture শব্দের অনুসরণে বঙ্কিমচন্দ্র প্রথম ‘অনুশীলন’ শব্দটি ব্যবহার করেন, , এমন তথ্য দেন আবুল কাসেম ফজলুল হক :

একশ বছর আগে বঙ্কিমচন্দ্র ধর্মের সঙ্গে ইংরেজি কালচার-এর ধারণার সংশ্লেষণ ঘটিয়ে একটি নতুন তত্ত্ব উদ্ভাবন করেছিলেন এবং তার নাম দিয়েছিলেন অনুশীলন। তৎকালে তিনি লক্ষ করেছিলেন ভারতবর্ষের মানুষ ধর্মসাধ মধ্য দিয়ে জীবনে ভালো হওয়ার ও ভালো করার জন্য যে চেষ্টা করে, ইউরোপের মানুষ কালচার-এর সাধনা দ্বারা মোটামুটি তাই করে।

কোনো কোনো দিক দিয়ে দুয়ের মধ্যে পার্থক্যও তিনি লক্ষ্য করেছিলেন। ধর্মের ধারণার সঙ্গে কালচার-এর ধারণার সংশ্লেষণ ঘটাবার প্রয়োজন অনুভব করে বঙ্কিমচন্দ্র অনুশীলনতত্ত্ব নামে যে তত্ত্ব প্রচার করেছিলেন তা অত্যন্ত প্রভাবশালী ও গভীর হয়েছিলো।

এ তত্ত্ব আজও মনুষ্যত্ব সচেতন মনুষ্যত্ব প্রস মানুষদের চিত্তকে নাড়া দেয়, অনুভূতিকে সতেজ করে, চেতনাকে জাগ্রত ও সতর্ক করে, জীবনে নতুন কর্মের স্পৃহা জাগায়। অনুশীলনতত্ত্বকে সংস্কৃতিতত্ত্বও বলা যায়। (আবুল কাসেম, ২০১৫ ১৬-১৭)

উনিশ শতকের শেষে এবং বিশ শতকের শুরুর দিকে কালচার অর্থে অনুশীলন শব্দটিই চালু ছিল। পরে যোগেশচন্দ্র রায় বিদ্যানিধি ‘কৃষ্টি’ শব্দটির প্রবর্তন করেন; এমন তথ্য পাওয়া যায় উল্লিখিত লেখকের বাঙালির সংস্কৃতি চিন্তা (২০১৬) সংকলন গ্রন্থের ভূমিকা অংশে। সেখানে আবুল কাসেম সংস্কৃতি শব্দের প্রচলন প্রসঙ্গে উল্লেখ করেন, ১৯২০ এর দশকে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ও সুনীতিকুমার চট্টোপাধ্যায়ের সহায়তায় ‘কৃষ্টি’ শব্দকে পাশে রেখে ‘সংস্কৃতি’ শব্দটি প্রবর্তিত হয়।

সমঅর্থে কর্ষণ, চর্চা, শিক্ষা, বৈদগ্ধ বা চারিত্র শব্দের প্রয়োগ হয়েছিল। এমনকি পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার পর তমদ্দুন মজলিশও সংস্কৃতি অর্থে “তমদ্দুন’ শব্দটি চালু করতে চাইলে, মর্মগত ধারণার বলিষ্ঠতায় টিকে যায় ‘সংস্কৃতি’ শব্দটি।

সংস্কৃতি চেতনার বা মানসিকতার ব্যাপার, যার একটি বস্তু ভিত্তি আছে এবং বস্তুর প্রভাবেই তা অস্তিমান, জাগ্রত ও ক্রিয়াশীল; এমন মত দিয়ে আবুল কাসেম বলেন ( ২০১৬ ৬১-৬২), মানুষের সকল চিন্তার, আচরণের ও কর্মের মধ্য দিয়েই সংস্কৃতির প্রকাশ। তিনি এর পরিশীলিত ব্যাখ্যা দেন এভাবে :

সংস্কৃতি বলতে বোঝায় সংস্কার করার, পরিমার্জন করার, অনুশীলন ও পরিশীলন করার চেষ্টার ও চর্চার মাধ্যমে সুন্দর ও ভালো হওয়ার ও করার, মহৎ হওয়ার ও করার প্রয়োজনীয় গুরুত্বপূর্ণ ও কল্যাণকর হয়ে ওঠার ও করে তোলার মানসিকতার চেষ্টার রূপ-স্বরূপকে। (আবুল কাসেম, ২০১৬ ৬১-৬২ )

জীবনধারণের ও উপভোগের প্রয়াপ্রসূত মানবক্রিয়া মাত্রই সংস্কৃতি; যেখানে জীবিকা-সম্পৃক্ত জীবনাচরণ মুখ্য- এমন মত আহমদ শরীফের ( ২০০৬ : ২২)। ভাব-চিন্তা-কর্মে ও আচরণে জীবনের সার্বক্ষণিক অভিব্যক্তি বা মনুষ্যজীবনের অর্জিত স্বভাবের সার্বিক অভিব্যক্তিকেই সংস্কৃতি বলেছেন তিনি। তবে সূক্ষ্ম, পরিণত ও সুন্দর- শোভন অভিব্যক্তিকে বিশেষভাবে সংস্কৃতি বলে বিশেষায়িত করে আহমদ শরীফ যোগ করেন, মানব সংস্কৃতির অবয়বে আদিম সংস্কৃতি, লোক-সংস্কৃতি ও অনুকরণীয় সংস্কৃতির ছাপ লক্ষ্যণীয়। তিনি বলেন :

ভাব-চিন্তা-কৃতির যে অংশ হিতকর ও গৌরবের তা-ই যেমন ঐতিহ্য বলে খ্যাত, তেমনি জীবনচর্যার যে অংশ সুন্দর-শোভন ও কল্যাণকর তা-ই সংস্কৃতি, বাদবাকি কৃতি বা আচারমাত্র। এ তৌলে যারা মাপেন তাঁদের কাছে জীবনচর্যার কিংবা জীবনযাত্রার সবটাই সংস্কৃতি নয়। তাদের সংজ্ঞায় নগরবিহীন সভ্যতাও নেই। আমাদের ধারণায় সংস্কৃতির উৎকর্ষে সভ্যতার উদ্ভব। সংস্কৃতির বস্তুগত ও মানসসম্ভূত অবদানপুষ্ট জীবনপদ্ধতির সার্বিক ও সামগ্রিক উত্তরাধিকারই সভ্যতা। (আহমদ শরীফ, 2002)

সংস্কৃতি শব্দকে ‘প্রাচীন সংস্কৃত শব্দ’ বলে ধারণা করেন অনেকে। এর সাথে সহমত প্রকাশ করে অন্নদাশঙ্কর রায় লিখেছেন :

বৈদিক যুগে সংস্কৃতি বলতে বোঝাত যজ্ঞ প্রভৃতির প্রস্তুতি। নৃত্য গীত কাব্য ইত্যাদি নয়। ‘ব্রাহ্মণ’ রচনার যুগে সংস্কৃতি বলতে বোঝাত গঠন। ক্লাসিক্যাল সংস্কৃত সাহিত্যে সংস্কৃতির অর্থ দেবতার কাছে উৎসর্গ। পরবর্তীকালে শব্দটি অপ্রচলিত হয়ে যায়। হঠাৎ এই বিংশ শতাব্দীতেই ইংরেজি কালচার শব্দের পারিভাষিক শব্দরূপে এর নবজন্ম ঘটে। (2016 21 )

 

 

তিনি আরও বলেন, যা কিছু মানবিক বা প্রাকৃতিক – তার সবটাই সংস্কৃতির অন্তর্গত। এমনকি ধর্মও এর বাইরে নয়।

উপরোক্ত কথার মিল পাওয়া যায় মোতাহের হোসেন চৌধুরীর কাছে। তিনি তাঁর সংস্কৃতি-কথা গ্রন্থে ধর্মকে সাধারণ লোকের কালচার, আর কালচারকে শিক্ষিত, মার্জিত লোকের ধর্ম বলে মত দেন। সেই সাথে এ কথার ব্যাখ্যা প্রসঙ্গে বলেন :

কালচার মানে উন্নততর জীবন সম্বন্ধে চেতনা-সৌন্দর্য, আনন্দ ও প্রেম সম্বন্ধে অবহিতি। … কালচার একটা ব্যক্তিগত ধর্ম। ব্যক্তির ভেতরের ‘আমি’কে সুন্দর করে তোলাই তার কাজ। … সত্যকে ভালবাসা, সৌন্দর্যকে ভালবাসা, ভালবাসাকে ভালবাসা বিনা লাভের আশায় ভালবাসা, নিজের ক্ষতি স্বীকার করে – ভালবাসা – এরি নাম সংস্কৃতি। ….. সংস্কৃতি মানেই আত্মনিয়ন্ত্রণ নিজের আইনে নিজেকে বাঁধা। – (মোতাহের, ২০১৬ ১-৪)

মোতাহের হোসেন সংস্কৃতিকে অহমিকা মুক্তির উপায় বলে বিশেষায়িত করে, একে মূল্যবোধের নির্ধারক মনে করেন। অনেকে মনে করেন ‘সংস্কার মুক্তি-ই সংস্কৃতি। মোতাহের এই বিভ্রান্তি সংশোধন প্রসঙ্গে বলেন, সংস্কার মুক্তি সংস্কৃতির একটি শর্ত, তবে অনিবার্য শর্ত হল মূল্যবোধ। আরও বিশদভাবে তিনি সংস্কৃতির সংজ্ঞা দিয়েছেন এভাবে:

সংস্কৃতি মানে সুন্দর ভাবে, বিচিত্র ভাবে, মহৎ ভাবে বাঁচা, প্রকৃতি-সংসার ও মানব-সংসারের মধ্যে অসংখ্য অনুভূতির শিকড় চালিয়ে দিয়ে বিচিত্র রস টেনে নিয়ে বাঁচা। … বিচিত্র দেশ ও বিচিত্র জাতির অন্তরঙ্গ সঙ্গী হয়ে বাঁচা। ইতিহাসের মারফতে মানব-সভ্যতার ক্রমবিকাশে বাঁচা, জীবন-কাহিনীর মারফতে দুঃখীজনের দুঃখ নিবারণের অঙ্গীকারে বাঁচা। বাঁচা, বাঁচা, বাঁচা। প্রচুরভাবে গভীর ভাবে বাঁচা। বিশ্বের বুকে বুক মিলিয়ে বাঁচা । ( মোতাহের, ২০১৬ : ১৪)

বাস্তব জীবনে মানুষের সমুদয় বাহ্যিক ও মানসিক কীর্তি ও কর্ম, তার জীবনযাত্রার আর্থিক ও সামাজিক রূপ, আধ্যাত্মিক চিন্তা-ভাবনা, শিল্পসৃষ্টি সবকিছুই সংস্কৃতির স্বরূপ। –

ব্রিটিশ পণ্ডিত হার্বার্ট স্পেন্সার সংস্কৃতিকে মানব সভ্যতার গুরুত্বপূর্ণ এক উপাদান হিসেবে বিবেচনা করেছেন। তিনি বিশ্বের যাবতীয় উপাদানকে অজৈব, জৈব ও অতিজৈব এই তিন ভাগে শ্রেণিকরণ করেন। যার উল্লেখ পাওয়া যায় বুলবন ওসমানের সংস্কৃতি ও সংস্কৃতিতত্ত্ব গ্রন্থে (২০০১ : ১৪)।

বিশ্বের সব প্রাণহীন বস্তু যা মানুষের তৈরি নয় অর্থাৎ ভূ-গোলকের পিও রয়েছে অজৈব বা পদার্থ-এর আওতায়। প্রাণীজগৎ ও মানুষ নিয়ে জৈব জগৎ। তৃতীয় ভাগে পড়ছে সংস্কৃতি বা মানুষের নিজের সৃষ্ট সব কিছু, যাকে স্পেন্সার অতিজৈব পরিবেশ বলে বিশেষায়িত করেছেন। তাই বলা যায়, মানুষের সৃষ্টিশীলতার দৃশ্যমান বা অনুভব করা অংশটুকু তার সংস্কৃতি। এই সৃষ্টিশক্তির জন্যই মানুষ পরিবেশকে নিয়ন্ত্রণ করতে সক্ষম, এ জন্যই মানুষ প্রাণিজগতে বিশেষ!

স্পেন্সারের এই শ্রেণিকরণের সাথে সাথে সংস্কৃতি বিষয়ে পাশ্চাত্য পণ্ডিতদের কিছু ধারণার সাথেও বুলবন ওসমান পরচিয় করিয়ে দেন (২০০১ ১৪-১৫)

রাশিয়ান চিন্তাবিদ ট. ভি. ডি. রবার্টির মতে সংস্কৃতি হলো অনুমানগত ও ফলিত সব চিন্তাধারা ও জ্ঞানের সমষ্টি।

গ্রাহাম ওয়ালেসের মতে সংস্কৃতি হল, চিন্তাধারা, মূল্যবোধ ও বস্তুর সমষ্টি, এক কথায় সামাজিক ঐতিহ্য।

বি. মালিনওস্কির মতে সংস্কৃতি হল, মানুষের ক্রমবর্ধমান সৃষ্টির সমষ্টি ।”

জন দুই গিলিন এবং জন ফিলিপ গিলিন সংস্কৃতিকে সম্পূর্ণ রূপে মানসিক ব্যাপার বলে গণ্য করেছেন। সাংস্কৃতিক বস্তু হলো মানুষের সংস্কৃতির ফল।

সামনার অবশ্য সংস্কৃতিকে ব্যাপক ভাবে বর্ণনা করেছেন। তাঁর মতে লোক জীবনধারা, শুভ-অশুভ বোধ ও প্রতিষ্ঠান সমূহের সমষ্টি হল সংস্কৃতি।

রবার্ট রেডফিল্ড বলেছেন সংস্কৃতি হল সমগ্রভাবে সমঝোতাসমূহের অংশ।

ব্র্যাডক্লিফ ব্রাউনের মতে সংস্কৃতি মূলতই একটি নিয়ম-কানুনের ধারা।

ট্যালকট পার্সন্স এবং তাঁর সহযোগীদের মতে, যাঁরা থিওরি অব এ্যাকশানের প্রবক্তা, সাংস্কৃতিক বস্তুসমূহ হলো সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য-ধারণার প্রতীকগত উপাদান বা বিশ্বাসসমূহ, প্রকাশধর্মী প্রতীকসমূহ বা মূল্যবোধের ধারা।

স্যার ই. বি. টাইলরের মতে, ‘জ্ঞান-বিজ্ঞান, আচার-বিশ্বাস, শিল্পকলা, নীতিবোধ, আইন-কানুন এবং অনুশীলন ও অভ্যাস এবং অন্যান্য সব সম্ভাবনা যা মানুষ সমাজের সদস্য হিসেবে আহরণ করে তা-ই সংস্কৃতি।’

মার্কসের মতে, সংস্কৃতি হল সুপারস্ট্রাকচার বা অতি কাঠামো। উৎপাদন পদ্ধতি ও উৎপাদন সম্পর্ক নির্ধারণ করে সমাজের মূল চরিত্র। তার ওপর তৈরি হয় সংস্কৃতি বা শিল্প-সাহিত্য, রাষ্ট্র, আইন, ধর্ম ইত্যাদি। মার্কস এই অতি কাঠামোকেই সংস্কৃতি বলে অভিহিত করেছেন।

অপর দিকে, Culture is the man made part of environment’ সংস্কৃতির এমন সংজ্ঞা দেন আমেরিকান নৃবিজ্ঞানী Alfred A. Konpf ( 1966 4 ) ।

মানুষের ক্রমবর্ধমান সৃষ্টি এবং তার মূল্যবোধের অনুশীলন যখন জীবনে শুভ-অশুভের পার্থক্য করতে শেখায়, তখন তা হয়ে ওঠে সংস্কৃতি। আর সমাজে গ্রহণযোগ্যতা লাভ করা মানুষেরা হয়ে ওঠে সংস্কৃতিবান মানুষ।

গোপাল হালদার তাঁর বাঙালীর সংস্কৃতির রূপ (১৯৭৫ : ১০) গ্রন্থে উল্লেখ করেছেন, যে ‘কৃতি’ বা সৃষ্টির সহায়ে মানুষ ‘মানুষ’ হয়েছে, প্রকৃতির সঙ্গে সংগ্রামে জয়ী হয়েছে তাই সংস্কৃতি। সংস্কৃতির অর্থ তার কাছে সৃষ্টি : –

সমস্ত জ্ঞান-বিজ্ঞান (sciences) ও সমস্ত সৃষ্টিসম্পদ (arts); অর্থাৎ যা আমরা জেনেছি (প্রকৃতির নিয়ম- নীতি প্রভৃতি), যা আমরা করেছি (যন্ত্র শিল্প, সামাজিক রীতি-নীতি, আচার-অনুষ্ঠান; মানসিক প্রয়াস, চিন্তা-ভাবনা, নৃত্য, গীত, চিত্র, কারা প্রভৃতি)।

আর্ট বা শিল্প এই সংস্কৃতিরই একটি এলেকা [এলাকা) আর শিল্প বলতে বোঝায় বাস্তব সৃষ্টি আর মানস-সৃষ্টি দুই-ই, কারণ দুই-ই সৃষ্টি; করুকলা (crafts) ও চারুকলা (arts) দুই-ই তাই সংস্কৃতির পরিচয় দেয়। সংস্কৃতির গোড়ার কথা হল সৃষ্টি, নূতন প্রকাশ, নূতন প্রয়াস। আর সংস্কৃতির মূল লক্ষ্য হল – প্রকৃতির সঙ্গে সংগ্রামে মানুষকে জয়ী করা, অগ্রসর করে দেয়া, শক্তিশালী করে তোলা। আর মানস সৃষ্টিরও সার্থকতা তাই বাস্তব সৃষ্টিতে, বাস্তব সৃষ্টিরও প্রয়োজন তাই মানস-সৃষ্টির সহায়তা করা (গোপাল, ১৯৭৫ ১০)

সংস্কৃতির শ্রেণিকরণ প্রসঙ্গে আনিসুজ্জামান (২০১৬ : ৫০) সংস্কৃতিকে মুখ্যত ‘বস্তুগত সংস্কৃতি আর মানস- সংস্কৃতি’ বলে বিশেষায়িত করেছেন। দৈনন্দিন জীবনযাপন প্রণালিকে তিনি বস্তুগত সংস্কৃতির অন্তর্গত করেন। সেই সাথে সাহিত্য-দর্শনে শিল্পে-সঙ্গীতে মানসিক প্রবৃত্তির যে বহিঃপ্রকাশ, তাকে বলেছেন মানস-সংস্কৃতি। বস্তুগত আর মানস-সংস্কৃতি এক হয়ে কোনো দেশের বা জাতির সাংস্কৃতিক পরিচয় তুলে ধরে বলে মত দেন তিনি।

 

 

“সাংস্কৃতিক বহুত্ব’ শিরোনামের অপর এক প্রবন্ধে আনিসুজ্জামান (২০০০ ২১) বলেন, সংস্কৃতি বলতে বোঝায়, কোনো বিশেষ জনগোষ্ঠীর স্বীকৃতি ও সুবিন্যস্ত আচরণরীতি, বস্তুগত অর্জন, বুদ্ধিবৃত্তিগত কাজ ও আধ্যাত্মিক ধারণাকে। এ প্রসঙ্গে তিনি রেমন্ড উইলিয়ামসের সাংস্কৃতিক ভাবনা তুলে ধরেন :

সংস্কৃতি না বলে সংস্কৃতি না চিত কেননা শুধু যে বিভিন্ন জাতি ও কালপর্বের নির্দিষ্ট পরিবর্তনশীল সংস্কৃতি রয়েছে, তা নয়, একটা জাতির বিভিন্ন সামাজিক ও অর্থনৈতিক গোষ্ঠীরও নির্দিষ্ট ও পরিবর্তনশীল সংস্কৃতি আছে। এর থেকে সাংস্কৃতিক বহুত্বের একটা সুস্পষ্ট ইঙ্গিত পাওয়া যায়। সাংস্কৃতিক বহুত্বের ধারণায় একথা স্বীকৃত যে, পৃথিবীতে বহু সংস্কৃতি রয়েছে এবং প্রত্যেক সংস্কৃতিরই নিজের মতো বিকাশ লাভের অধিকার আছে।…. দেখা যায়, মানুষ যে- সংস্কৃতির মধ্যে বেড়ে ওঠে, সাধারণত তাকেই সে বিশেষ ভাবে পছন্দ করে। ( আনিসুজ্জামান, ২০০০ ২১

সংস্কৃতির পরিচয় প্রদান প্রসঙ্গে মন্তব্য করেছেন আবুল হোসেনও। মুসলিম কালচার’ প্রবন্ধে তিনি বলেন, মানুষের চিন্তা কোনো একটা বিশিষ্ট দেশে, একটা বিশিষ্ট কালে, একটা বিশিষ্ট আবহাওয়ার মধ্যে ওই সময়ের মানুষকে যে সমস্ত কাজ করতে প্রণোদিত করে, সেই সমস্ত কাজের সমষ্টিকে বলা যায় ‘কালচার’। (আবুল হোসেন, ২০১৬ : ৮৪)

‘Culture is some kind of the information that human beingsare not born with but they need inorder to interact with each other in social life. It must be learned during the long process of education, socialization, maturing and growing Old The nature of culture, What impact Globalization has no Cultural Diversity থেকে এমন উদ্ধৃতি তুলে ধরে ওমর বিশ্বাস ( ২০০ = ৩১৪-৩১৫) লিখেছেন সংস্কৃতি মনকে পরিচ্ছন্ন করে। মনের উৎকর্ষতার জন্য পদ্ধতিগত প্রচেষ্টা চালায়।

এটা মানুষকে স্বচ্ছ রূপায়ণের ভিত্তিতে দাঁড় করিয়ে উন্নত মানসিকতার প্রেরণা দেয়। এর অনুরণনে যে পদ্ধতি উদ্ভাবন হয়, রূপ নেয় নতুনত্বের তা এমন এক কাঠামোগত বলয় তৈরি করে যেখানে দৃষ্টিভঙ্গি, চিন্তাভাবনা সব সময় সুন্দরভাবে ক্রিয়াশীল। কালের প্রতিক্রিয়ায়, যা বিরূপে আসা আপনা থেকেই নিজস্ব প্রতিরোধ ব্যূহ তৈরি করে নেয় তার উৎকর্ষতার আঁকরে। এখানে পরিবর্তনশীল নৈতিকতা আর মূল্যবোধের আলোক প্রাপ্তির স্থান আছে। কিন্তু দৃঢ়, নমনীয় বা স্থায়ী অনৈতিক ও রুচিহীনতার কোনো স্থান নেই।

উপর্যুক্ত আলোচনার পরিপ্রেক্ষিতে বলা যায়, সংস্কৃতি হলো মানব আচরণের সভ্য আবরণ এবং নৈতিক মূল্যবোধের পরিমাপক, যার গভীরে আছে প্রজ্ঞা এবং অনুশীলন। ব্যক্তিগত বা যৌথ প্রয়াসে জীবনযাত্রার মানোন্নয়ন করার যে প্রবণতা, সেই প্রক্রিয়ায় মুখ্য ভূমিকা রাখে ব্যক্তি, গোষ্ঠী, জাতি। ব্যক্তি-মানসের বা সমষ্টির ভাবনা, ক্রিয়া আর সৃষ্টিশীলতা সংস্কৃতিকে ধারণ করে। রুচিশীল ব্যক্তিত্ব উন্নত সংস্কৃতির বহিঃপ্রকাশ। মানুষের মনের ভেতর সুপ্তভাবে বিরাজ করা মনুষ্যত্ব। এই মানবিকতাই সংস্কৃতির উৎকর্ষ।

অতীতের অভিজ্ঞতাপুষ্ট জাতি ইতিহাসের গতি নির্ধারণে তার সাংস্কৃতিক অভিব্যক্তির প্রকাশ ঘটায় নিরন্তর সাধনার মাধ্যমে। সমাজজীবনের মানোন্নয়নে সুচিন্তা এবং সে চিন্তার বিকাশে সচেষ্ট হওয়াই সংস্কৃতির মূল কথা।

সংস্কৃতির বিশিষ্টতা

সংস্কৃতি মানুষের পুরোপুরি অর্জিত আচরণ’। প্রাণী হিসেবে একমাত্র মানুষই সংস্কৃতিবান। সংস্কৃতি হল সমাজের নিদর্শন, এককথায় জীবনধারা। এই জীবনধারাই উৎপাদন ব্যবস্থাকে প্রতিনিধিত্ব করে। তাই সামাজিক সমৃদ্ধি, অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির সর্বক্ষেত্রে প্রভাবক হিসেবে কাজ করে সংস্কৃতি।

সংস্কৃতিকে ধরা-ছোঁয়ার বাইরে অনুভবযোগ্য একটা বিমূর্ত বিষয় বলে মনে করেন আহমদ শরীফ। তিনি বলেন:

সত্য, সুন্দর এবং মঙ্গলের প্রতি মানুষের যে প্রবণতা মানুষ সচেতনভাবে চেষ্টার দ্বারা যে সৌন্দর্য চেতনা, কল্যাণবুদ্ধি ও শোভন জগতদৃষ্টি অর্জন করতে চায় তাকেই হয়ত তার সংস্কৃতি বলে অভিহিত করা যায়। সংস্কৃতি হল মানুষের অর্জিত আচরণ, পরিশ্রত জীবনচেতনা। (আহমদ শরীফ, ২০১৬ঃ৩৭ )

আহমদ শরীফের মতে, প্রজ্ঞা ও বোধিসম্পন্ন ব্যক্তি-মানসেই এর উদ্ভব ও বিকাশ, যা ব্যক্তি থেকে ক্রমে সমাজ ছাপিয়ে বিশ্বে ব্যাপ্ত হয়। চিন্তায়, কর্মে ও আচরণে জীবনের সুন্দর ও মার্জিত প্রকাশকেই সংস্কৃতি হিসেবে ব্যাখ্যা করেন তিনি।

সাধারণ মানুষ সংস্কৃতির প্রকৃত অর্থ বিষয়ে সঠিক ধারণা রাখে না বলে আশংকা আবদুল মতিনের। তিনি তাঁর ‘সংস্কৃতির সন্ধানে’ প্রবন্ধে সংস্কৃতির মধ্যে দিনাতিপাত করা মানুষ প্রসঙ্গে সেই সংশয়ের কথা তুলে ধরেন

…..তারা কাপড় পরে গান গায়, পালা-পরবে রকমারী অনুষ্ঠানের আয়োজন করে, কিন্তু এগুলো যে সংস্কৃতির বাহন সেটা তারা জানে না। তারা ধর্ম মানে, ধর্মীয় ক্রিয়াকর্মে যোগ দেয়, কিন্তু ধর্ম যে সাধারণ মানুষের সংস্কৃতি সেটা তারা ভেবে দেখে না। অপর দিকে, তত্ত্বানুসন্ধায়ী বিদ্বজ্জন মহলে সংস্কৃতি একটা ‘মূল্য’ (value), মানবজীবনের সর্বশ্রেষ্ঠ মূল্য – এবং বিশেষজ্ঞরা কথাটা ঘুরিয়ে বলেন যে শিক্ষিত, অর্থাৎ অসাধারণ মানুষের ক্ষেত্রে সংস্কৃতিই ধর্ম। (আবদুল মতিন, ২০১৬ : ৯৬)

তবে, ব্যাপক অর্থে সংস্কৃতি শুধু ধর্মই নয়, – মাতৃভাষা, গবেষণা, নীতি নৈতিকতা, ঐতিহ্য, দর্শন সবই পড়ে সংস্কৃতির আওতায়। সমাজবোধ মানসনির্ভর বিষয় হলেও, সংস্কৃতি মানুষের অর্জিত আচরণের ফল।

শ্রেণিহীন ও শ্রেণিযুক্ত সমাজের সংস্কৃতি সম্পূর্ণভাবে পৃথক চরিত্রের উল্লেখ করে বুলবন ওসমান তাঁর সংস্কৃতি ও সংস্কৃতিতত্ত্ব গ্রন্থে সংস্কৃতিকে সাম্যমূলক এবং দ্বন্দ্বমূলক সংস্কৃতি এই দুই ভাগে বিভাজন করে লিখেছেন :

সংস্কৃতি হলো বস্তু ও নির্বন্ধক কলা কৌশলসমূহের সমষ্টি এবং যা নৈতিক পক্ষপাতশূন্য হতে হবে। …কিন্তু সংস্কৃতির মধ্যে ভালমন্দ বোধও একটি মূল্যবোধ হিসাবে বিবেচিত, তাই নৈতিকতাবোধের জায়গা করে দিতে হবে সংস্কৃতির সংজ্ঞায় (বুলবন, ২০০১: ১৩)

মূলত সামাজিক পরিবেশ থেকেই সংস্কৃতির উদ্ভব। সংস্কৃতির বৈশিষ্ট্য এতটাই প্রখর, যে একটি সমাজ অবলুপ্ত হলেও সংস্কৃতির চিহ্ন ধারণ করে স্মরণীয় হয়ে থাকে যুগ যুগ ধরে। উদাহরণ হিসেবে বুলবন ওসমান (২০০১ = ১৭) পুরাতাত্ত্বিক স্থাপত্যের ইতিহাস থেকে তৎকালীন সামাজিক ধারণা লাভের প্রসঙ্গ উল্লেখ করেন।

সমাজের সংস্কৃতি সম্পূর্ণভাবে পৃথক চরিত্রের উল্লেখ করে বুলবুল একে সাম্যমূলক এবং দ্বন্দ্বমূলক সংস্কৃতি বলে বিভাজন করেছেন : ‘এক জায়গায় কোন শ্রেণীঙ্কর নেই, কিন্তু অন্যত্র শ্রেণীর সঙ্গে সঙ্গে সংস্কৃতিরও শ্রেণীবিন্যাস এসে পড়ে। ( ওসমান, ২০০১: 22 )

সমাজ-সংস্কৃতিবিদেরা মনে করেন, সংস্কৃতি সমাজের সম্পদ এবং সে সমাজের দর্পণ স্বরূপ। আমরা যা, সেই আমি-ই সংস্কৃতি। অর্থাৎ আমাদের আচার-ধর্ম, আচরণ-ভাবনা, দর্শন, জড় ও অজড় কলা-কৌশলের সমষ্টি নিয়ে এই সাংস্কৃতিক জগৎ।

বিজ্ঞানসম্মত দৃষ্টিতে সংস্কৃতির কোনো নির্ধারক নেই। তবে, মানবসভ্যতা মূল্যবোধজাত একটি ধারণা, তার একটা নির্ধারক আছে। মূল্যবোধ আরোপ করে কোনো সংস্কৃতিকে মাপা যায় না, তবে সেই মূল্যবোধ ঊর্ধ্বগামী বা অধঃপতিত, সেই মানদণ্ডে বিশেষায়িত করা যায়।

অপসংস্কৃতি

আমাদের শিল্প-সাহিত্য-সংস্কৃতির ক্ষেত্রে অপসংস্কৃতির যে জোয়ার, তা অনেকাংশেই প্রভাবিত করছে জাতীয় জীবনকে। বিকৃতি, নৈরাজ্যবাদ, অনুচিত ও অসুন্দর কার্যকলাপ অপসংস্কৃতির সমগোত্রীয়। এই হিসেবে অপসংস্কৃতি আর বিজাতীয়তা সমার্থক বলে মনে করেন নারায়ণ চৌধুরী (১৯৮৫ : ৫৭)। তাঁর মতে, *অপসংস্কৃতি বলতে রুচির বিকার, যৌনতা, অন্ধকার প্রবৃত্তির পোষকতা, সমাজ বিরোধী চিন্তার দাস্যতা ইত্যাদি নানা প্রকারের মালিন্যকে বোঝায় (নারায়ণ, ১৯৮৫ ৪৫)। জীবনের সমস্ত স্তরে বিজাতীয়তার কুপ্রভাব এক অর্থে অপসংস্কৃতির আবর্জনা বলেও মন্তব্য করেন তিনি।

প্রতিটি জাতির উন্নতি ও অবনতির মূলে কাজ করে তার সংস্কৃতি ও অপসংস্কৃতি। ব্যক্তিগত কিংবা যৌথ জীবনে সংস্কৃতি চেতনা যখন লোভ, হিংসা, ভোগসর্বস্বতা, ক্ষমতালিপ্সা, সম্পত্তিলিপ্সা, কুশিক্ষা, অসততা, দুর্নীতি ইত্যাদি দ্বারা বিকার প্রাপ্ত হয় তখন দেখা দেয় অপসংস্কৃতি; এমন মত আবুল কাসেম ফজলুল হকের (২০১৮)।

জাতি ও রাষ্ট্রের উন্নয়নে সংস্কৃতির ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ প্রবন্ধে তিনি লিখেছেন, প্রতিটি জাতির মধ্যেই সংস্কৃতি বিকশিত হয় অপসংস্কৃতির সঙ্গে সংগ্রামের মধ্য দিয়ে। শঠ, প্রতারক ও লোভীর প্রবণতা ও প্রচেষ্টা হলো অপসংস্কৃতি। বিপ্লবে ও ন্যায় যুদ্ধে সংস্কৃতি থাকে। কিন্তু প্রতিবিপ্লবে ও অন্যায় যুদ্ধে সংস্কৃতি থাকে না, থাকে অপসংস্কৃতি উল্লেখ করে আবুল কাসেম লিখেছেন :

প্রতিটি জাতির প্রতিটি কালের সংস্কৃতিচিন্তা ও সাংস্কৃতিক আন্দোলনের ক্ষেত্রেই প্রগতিশীল, রক্ষণশীল ও প্রতিক্রিয়াশীল ধারা লক্ষ করা যায়। প্রতিক্রিয়াশীলরা প্রগতির বিরুদ্ধে সক্রিয় থাকে। প্রতিক্রিয়াশীলদের সংস্কৃতি অপসংস্কৃতি। প্রতিক্রিয়াশীলদের অপক্রিয়াশীল বলাই সমীচীন। ব্যক্তিজীবনে ও সমাজে সংস্কৃতির সঙ্গে অবিচ্ছেদ্য রূপে বিরাজ করে অপসংস্কৃতি এবং দুয়ের মধ্যে চলে বিরোধ।

 

 

জাতীয় জীবনে কখনো সংস্কৃতি, কখনো অপসংস্কৃতি প্রাধান্য বিস্তার করে। জাতীয় জীবনে জাতীয় সংস্কৃতিই মূল। এতে থাকে নানা প্রবণতা এবং বৈচিত্র্যের মধ্যে ঐক্য। অপসংস্কৃতি মানুষকে পরিণত করে অপশক্তিতে। মানুষ মানবিক গুণাবলি অর্জন করে ঐশ্বরিক আচরণে রুদ্ধ এবং মানবিক গুণাবলি অর্জনে অমনোযোগী হয়ে পাশবিক আচরণ নিয়ে পত্র পর্যায়ে নেমে যায়। পাশবিক প্রবৃত্তি আর মানবিক প্রবৃত্তি অবিচ্ছেদ্য শুধু মানবিক প্রবৃত্তিকে রক্ষা করে পাশবিক প্রবৃত্তিকে নির্মূল করা সম্ভব নয়। (আবুল কাসেম, ২০১৮)

তবে ব্যক্তিগত, পারিবারিক, সামাজিক, রাষ্ট্রীয় ও বৈশ্বিক জীবনে পাশবিক প্রবৃত্তিকে সংযত রাখার চেষ্টাই সংস্কৃতি চর্চা, সাংস্কৃতিক আন্দোলন বলে মনে করেন আবুল কাসেম। জাতীয় জীবনে সংস্কৃতি চেতনা দুর্বল হলে, বিকৃত হলে জাতির উন্নতি ব্যহত হবার পাশাপাশি ব্যক্তিরও অবক্ষয় ঘটে। যার বিরূপ প্রভাব পড়ে জনগোষ্ঠীগত জীবনে- এমন মত তাঁর।

অহংকারবশত বা আধুনিকতার নামে স্বতন্ত্রবোধ, বিশ্বাস ও কৃষ্টিকে বিলিয়ে দেয়া অপসংস্কৃতির নামান্তর বলে মনে করেন ওমর বিশ্বাস ( ২০০৪ : ৩০৮)।

আধুনিকতা বা বিনোদনের নামে স্বেচ্ছাচারিতা এক ধরনের অপসংস্কৃতি। বিশ্বাস ও বিনোদনকে অবশ্যই অশ্লীলতামুক্ত হতে হবে। দুর্নীতিগ্রস্ত চিন্তায় সংস্কৃতিও বিরুপ প্রভাবিত হয়। কারণ, বিশ্বাস আচরণ দ্বারাই নিয়ন্ত্রিত: উল্লেখ করে শাহ আবদুল হান্নান অপসংস্কৃতির বাস্তবতা বিষয়ে কিছু বিধি নিষেধ তুলে ধরেন :

কৃষ্ণভাব সৃষ্টি করে, ক্রাইম ছড়ায় এমন কিছু করা যাবে না। খারাপ যা খুব কম ঘটে তাকে নাটকে এনে জাতিকে জানাতেই হবে তা আসলে জরুরি নয়। সাহিত্যের নামে যেটা করা হয় – একটি পরিবারের দুর্ঘনাকে গোটা জাতিকে জানানো হয়। তা যদি সুন্দর কিছু হতো তাও কথা ছিল। আসলে বিনোদনের মধ্যে একটা সীমা থাকতেই হবে। আইনের মাধ্যমে এবং কাস্টমসের মাধ্যমে। এ ব্যাপারে স্বাধীনতার নামে আমরা কদাচারকে অনুমোদন করতে পারি না। আমরা এমন স্বাধীনতা চাই না যে স্বাধীনতা মানুষকে অমানুষ করে দেয়। (হান্নান, ২০০৪ ১১৪ )

সংস্কৃতির বাইরে মানুষ হতে পারে না। এর মূল দিক জীবনাচার, পুরো জীবন বলে উল্লেখ করেন তিনি।

অপসংস্কৃতির বাঙালির মস্তিষ্কের অবদান। এর নির্দিষ্ট সংজ্ঞা নেই উল্লেখ করে অন্নদাশঙ্কর রায় (২০১৬ : ২৯-৩০) যোগ করেন, অশ্লীলতার বিরুদ্ধে আইন আছে, কিন্তু অপসংস্কৃতির বিরুদ্ধে এ যাবত কোনো আইন প্রণয়ন হয়নি বিধায়, তা একগুঁয়ে, নাছোড়বান্দা হয়ে সমাজে চেপে বসেছে। লেখকের মতে অপসংস্কৃতি :

ময়রার লোকোনের মতো স্বাবলম্বী। সকারের সাহায্যের জন্য সে হাত পাতে না। তার খুঁটির জোর জনতার আগ্রহ। আর এটাও পরীক্ষিত সত্য যে, জনতার আগ্রহ এদিনে বা এক মাসে বা এক বছরেও ফুরোয় না। কোটি কোটি মানুষ যদি একই নাটকে আগ্রহী হয় তো একটানা দশ বিশ বছর ওই নাটকই বাজার মাত করতে পারে। (অন্নদাশঙ্কর, ২০১৬ ৩৫-৩৬ )

শোষণমুখী সমাজে শোষণ অক্ষুণ্ণ রাখার এক প্রধান হাতিয়ার হলো অপসংস্কৃতি, এমন ভাবনা নারায়ণ চৌধুরীর (১৯৮৫ – ১৬)। কাজেই পাকেচক্রে অপসংস্কৃতি টিকিয়ে রাখায় ধনিক-বণিক শ্রেণির লোকেদের প্রভূত স্বার্থ বিদ্যমান মনে করে তিনি বলেন, ‘বর্তমানের সমাজে সুস্থ সংস্কৃতির প্রসার সম্ভব নয় এই কারণে যে, বর্তমান সমাজ যে বুর্জোয়া মূল্যবোধের সংস্কারের উপর দাঁড়িয়ে আছে, সেই মূল্যবোধের মূল কথাই হলো অসম চিন্তাধারা, বিকৃত দৃষ্টিভঙ্গি।’ (নারায়ণ, ১৯৮৫ : ৮৫)

প্রবীর ঘোষ বলছেন, ‘যে সংস্কৃতি একটি সংস্কৃতি গোষ্ঠীকে সামগ্রিকভাবে এবং গোষ্ঠীর প্রত্যেক সদস্যের জীবন ও চেতনার, মননের পুষ্টিতে বিঘ্ন সৃষ্টি করে, সুস্থ বিকাশের প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করে, অসুস্থ বিকাশের দিকে এগিয়ে নিয়ে যায়, তাই-ই অপসংস্কৃতি।’ (২০১৬ : 226 )

এই আলোচনার পরিপ্রেক্ষিতে বলা যায়, কুসংস্কার, হুজুগ, উত্তেজনা, অন্ধবিশ্বাস, অদৃষ্টবাদ বা ক্ষতিকর অভ্যাসের অনুগামীতা এগুলো অপসংস্কৃতির নিয়ামক। তাই অপসংস্কৃতির বিরুদ্ধে আন্দোলন কেবল সাহিত্য-সংস্কৃতির বা সমাজ পরিবর্তনের আন্দোলনই শুধু নয়, এই আন্দোলন জাতি গঠনের আন্দোলন। সুস্থ সংস্কৃতির বিকাশে যাঁরা অপসংস্কৃতির বিপক্ষে অবস্থান নেন, তাঁরা মূলত দেশের রাজনীতি-অর্থনীতি- সমাজনীতির মঙ্গলের সঙ্গে জাতিগত বৃহত্তর তাৎপর্যের কথা মাথায় রাখেন।

সংস্কৃতির বিবর্তন

সংস্কৃতির রূপরেখা আর অপসংস্কৃতির বিরূপ প্রভাব আলোচনার পর, স্বভাবতই প্রশ্ন জাগে সংস্কৃতির পরিবর্তন সংঘটিত হয় কিনা। এই প্রশ্নের সুনির্দিষ্ট উত্তর পাওয়া যায় গোপাল হালদারের লেখায়। তিনি লিখেছেন :

সংস্কৃতি শুধু মনের একটা বিলাস নয়, শুধুমাত্র মনের সৃষ্টি সম্পদও নয়। উহা বাস্তব প্রয়োজনে জন্মে এবং মানুষের জীবনসংগ্রামে শক্তি জোগায়, জীবনযাত্রার বাস্তব উদ্দেশ্য সিদ্ধ করে। সেই জীবনযাত্রারই ঘাত-প্রতিঘাতে সংস্কৃতির রূপ ও রঙ পরিবর্তিত হয়। আবার সংস্কৃতির সহায়েও জীবনযাত্রা যেমন অগ্রসর হয় সংস্কৃতিও তেমনি জীবনযাত্রার সঙ্গে তাল রাখিয়া তাহার সঙ্গে নূতন হইয়া উঠে। জীবনের সঙ্গে সংস্কৃতির এই সম্বন্ধ যখন দেখিতে পাই তখনই বুঝি সংস্কৃতি নিশ্চল নয় তাহার রূপান্তর ঘটে। ( গোপাল ১৯৭৬ ৩৪)

নানাবিধ অনিবার্য কার্যকারণে মানুষের জীবনযাপন পালটাতে থাকলে তাদের মনোজগৎ পালটে যেতে থাকে এবং মনোজগৎ পরিবর্তনের সঙ্গে তাদের সংস্কৃতি পরিবর্তিত হতে থাকে উল্লেখ করে হায়াৎ মামুদ সংস্কৃতির বিবর্তন প্রসঙ্গে লিখেছেন :

যদি কেউ ভেবে থাকেন সংস্কৃতির রূপ অপরিবর্তনীয় তিনি যেমন কট্টরপন্থি ছুঁৎমার্গের পরিচয় দেবেন, তেমনি সংস্কৃতির নিত্য পরিবর্তনশীলতাকে চূড়ান্ত বলে যিনি মানবেন, তাঁর চিন্তায় উন্মার্গতা ও আতিশয্য প্রাবল্য পাবেই। সত্য, মনে হয়, দাঁড়িয়ে আছে এ দুয়ের মাঝখানে। সংস্কৃতিরূপের পরিবর্তন না-মেনে উপায় নেই, কারণ জনগোষ্ঠীর ইচ্ছা- নিরপেক্ষভাবে তাতে পরিবর্তন ধীর ও সূক্ষ্ম লয়ে ঘটতেই থাকে, যে- সব কারণে ঘটে তার মধ্যে মুখ্য হলো জীবনযাত্রার চলিষ্ণুতাজনিত পার্থক্য।

যুগ থেকে যুগে কিংবা প্রজা থেকে প্রজন্মান্তরে জীবনযাপনে তফাত আসে। অর্থনৈতিক কারণে অর্থাৎ অর্থনীতিসঞ্জাত কর্মপ্রণোদনার ব্যাপ্তিতে বা সংকোচনে। গ্রামের ভিতরে শহরের অনুপ্রবেশ, এমনকি একে যদি শহুরে আগ্রাসন ও বলি, ঘটেতো গেছেই। ইচ্ছে করে পরিকল্পনামাফিক কেউ ঘটায়নি, অবশ্যম্ভাবী বলেই তা ঘটেছে। (হায়াৎ মামুদ, ২০১৯ : ৩৮১)

সংস্কৃতি বিবর্তনের বিশদ ব্যাখ্যা প্রসঙ্গে হায়াৎ মামুদ আরও উল্লেখ করেন, গ্রামাঞ্চলে আগের তুলনায় বর্তমানে বৃত্তিবিন্যাসের পরিবর্তন ব্যাপকভাবে চোখে পড়ে। এর পেছনে আছে অর্থনৈতিক নিয়ন্ত্রণ শক্তি। কাঠের আগুনে মাটিপর হাঁড়িতে জ্বাল দেয়া দুধ অমৃতস্বাদী হলেও, অ্যালুমিনিয়ামের হাঁড়ি বাসনের অনুপ্রবেশ রোধ করা সম্ভবপর নয়।

এর পশ্চাদবর্তী কারণ হিসেবে জিহ্বার স্বাদ পরিবর্তন নয়, আর্থিক সংগতির হিসেবনিকেশে অধিকতর সাশ্রয়গুণকেই প্রভাবক হিসেবে দেখেছেন তিনি। এমনকি পুরুষের পোশাকে সুতিবস্ত্রের জায়গায় সিন্থেটিক কাপড় প্রচলনের কারণ বায়সংকোচন। হায়াৎ মামুদের মতে, প্রাত্যহিক জীবনের এমনি হাজারো খুঁটিনাটিতে ধরা পড়বে জনজীবনে সাংস্কৃতিক বিবর্তন।

সংস্কৃতির রূপান্তর চিরন্তন, স্বাভাবিক এক প্রক্রিয়া। এই প্রসঙ্গের সাথে সুর মিলিয়েছেন বুলবন ওসমানও (২০০১ : ৩২-৩৩)। প্রথম দিকের সমাজতাত্ত্বিকরা মনে করতেন আদিবাসীদের সংস্কৃতির কোনো পরিবর্তন হয় না। পরে দেখা গেল পরিবর্তনটা দ্রুত নয় বলেই মনে হয়েছে কোনো পরিবর্তন হচ্ছে না। আসলে সব সংস্কৃতিই সচল।

বুলবনের মতে, মার্ক্সীয় দৃষ্টিতে সংস্কৃতিকে ধরা হয় অতি কাঠামো হিসেবে এবং সে ক্ষেত্রে সাংস্কৃতিক পরিবর্তন অর্থাৎ অতিকাঠামোর বদল – জীবনধারা, রীতি-প্রথা, মূল্যবোধ, শিল্প-সাহিত্য, দর্শন, ইতিহাস ইত্যাদির যে বদল, এই বদলের মাপ করতে গেলে সময়ের প্রয়োজন।

দৈনন্দিন বদলটা হঠাৎ করে ধরা না গেলেও, সময়ের সাথে এক সময় এই পার্থক্য দৃশ্যমান হয়। মানুষের সমাজ বা ইতিহাসের যে সব যুগবিভাগ তা সবই সময়কে কেন্দ্র করে। সংস্কৃতির পরিবর্তনের ব্যাখ্যা প্রসঙ্গে বুলবন আরও বলেন –

ভিন্ন ভিন্ন বর্ণের সংস্কৃতি ভিন্ন ধারার এবং সেটা জন্যগতভাবেই নির্ধারিত। … ভিন্ন বর্ণের মধ্যে বিয়ের পর পরবর্তী প্রজন্মের দেহে বিপুল পার্থক্য ঘটায়। তাছাড়া বর্ণগত স্থানান্তর দেহের ওপর প্রভাব ঘটায়। যুদ্ধ, দাসত্ব ইত্যাদি সামাজিক ব্যাপারগুলো বর্ণের এবং সাংস্কৃতিক পরিবর্তনে বিপুল প্রভাব বিস্তার করছে। যার ফলে একদল আর এক বর্ণগত নলকে নিকৃষ্ট বলার সুযোগ পায় বা এক বর্ণ ওপরে থাকার সুবিধা করে নেয়। … মেধার পার্থক্যের মূল কারণ সংস্কৃতিগত পরিবেশের পার্থক্যের ফল। (বুলবন, ২০০১ : ৩২- ৩৩)

সংস্কৃতির বিবর্তন প্রসঙ্গে নারায়ণ চৌধুরী (১৯৮৫ ৫১-৫২) আলোচনা করেছেন, তাঁর সংস্কৃতি, শিল্প ও সাহিত্য গ্রন্থে। তিনি বলেন :

দীর্ঘ দুশো বছরেরও বেশী সময় বিজাতীয় শাসনের পায়ের তলায় থাকার ফলে আমাদের সংস্কৃতি তার জাতীয় প্রতিভা অনুযায়ী বিকশিত হয়ে উঠতে পারেনি, শুরু থেকেই তার উপর অনুকরণাত্মক সংস্কৃতির অস্বাভাবিক ছাপ এসে পড়েছিল বিলক্ষণ মাত্রায়। প্রথমে ইংরেজের কালচারের দৃষ্টান্তে এই অনুকরণ ঘটেছিল, তারপর তার সম্পর্ক সূত্র ধরে ফরাসী জার্মান স্পেনীয় স্ক্যান্ডিনেভীয় এবং সর্বশেষ মার্কিন প্রভাব আমাদের শিল্প-সংস্কৃতি-সাহিত্যের উপর জাকিয়ে বসেছিল বিসদৃশভাবে।

 

 

তিনি মনে করেন, এই স্বাধীন দেশেও অনুকরণের এই প্রক্রিয়া আজও থামেনি বরং উত্তরোত্তর বেড়েই চলেছে। নারায়ণ চৌধুরী (১৯৮৫ ৫২) এ কথা স্বীকার করেছেন যে, আমাদের শিল্পে সাহিত্যে সাহসিক কিছু করার প্রেরণা আমরা পাশ্চাত্য সূত্রে পেলেও, তাতে উপকারের পাশাপাশি অপকার হয়েছে।

আশংকাজনকভাবে। আমাদের সংস্কৃতিতে প্রভাব ফেলেছে বিজাতীয় অনুকরণ। এই অবস্থা সংস্কৃতিকে ধ্বংসের মুখে নিয়ে এসেছে, যা থেকে পরিত্রাণের উপায় খুব সহজ নয়।

সময়ের সাথে সবকিছু বিবর্তিত হয়। ফলে সংস্কৃতির রূপান্তরকেও স্বাভাবিক এক প্রক্রিয়া বলে মনে করেন আবু জাফর শামসুদ্দীন ( ১৯৮৮ ৫৯)। শিক্ষার প্রসার, নতুন জ্ঞান, নতুন চেতনা, নতুন আর্থ-সামাজিক অবস্থা, নতুন উৎপাদন পদ্ধতি, নতুন নতুন বৈজ্ঞানিক আবিষ্কার, নতুন প্রশাসনিক কাঠামো প্রভৃতি মিলে এই রূপান্তর ঘটায় উল্লেখ করে তিনি ‘লোকায়ত সমাজ ও বাঙালি সংস্কৃতি’ নিবন্ধে লিখেছেন :

আমাদের বাল্যকালে পল্লী সমাজে পালিত বহু আচার অনুষ্ঠান এখন বিলুপ্ত প্রায়। পল্লী সমাজেও রেডিও, টেলিভিশন প্রবেশ করেছে নগর-সংস্কৃতির অনুপ্রবেশ ঘটছে লোকসংস্কৃতির মধ্যে। বহু কুসংস্কার হতে পল্লীর মানুষ মুক্ত হয়েছে। আবার নতুন কুসংস্কারও যে কিছু কিছু না ঢুকছে এমন নয়। দ্বন্দ্ব ও বিবর্তনের মধ্যেই মানব সমাজ এগিয়ে চলছে। … সমাজ তার দ্বৈত সত্তা – এক দিকে সে অতীত স্মৃতির ধারক ও বাহক – বিগত অতীত লোকসংস্কৃতির অন্তরে কথা বলে, তার মর্মে মর্মে অতীত গুঞ্জরিত, অপরদিকে সে নতুনের বার্তাবহ, সে নতুনকে ধীরে বরণ করে নেয়- নতুনের পথযাত্রায় সে এক বিরামহীন অনুষঙ্গী। (আবু জাফর ১৯৮৮ ৫৯-৬০)

এই বিবর্তনশীলতা মানুষের স্বভাবজাত, যেমন স্বভাবজাত বৃত্তি হিসেবে প্রভাব ফেলে স্মৃতিশক্তি। স্মৃতি নানাভাবে উত্তরাধিকারীদের মধ্যে সংক্রমিত হয়, যা পুরানো এবং আধুনিক সংস্কৃতিকে ঢেলে সাজায়। আবু জাফর লিখেছেন :

মানব জাতি ছবির বসে নেই এগিয়ে চলছে। কিন্তু নিতা অঙ্গমতার মধ্যেও মানুষ সুদূর অতীতের বহু স্মৃতি মস্তিষ্কে বহন করছে। কৃষিযুগে এমনকি যন্ত্রযুগে প্রবেশ করেও মানুষ লোট্র নিক্ষেপ করে নিছক আমোদের জন্যে শিকারে যায়। অর্থাৎ সে প্রাগৈতিহাসিক যুগের জীবনযাত্রা প্রণালীর স্মৃতি কতকটা যেন স্বভাবজাত বৃত্তিরূপে বহন করে চলছে। এ-যুগের লিখিত ইতিহাসে এই স্ববিরোধের বিবরণ পাওয়া যাবে না; কেননা এগুলো উল্লেখযোগ্য বিষয় নয়। কিন্তু এগুলোও সংস্কৃতির অঙ্গীভূত বিষয়। (আবু জাফর, ১৯৮৮ – 20 )

আবু জাফর মনে করেন, সংস্কৃতির রূপান্তর ঘটে কারণ, যুগের সাথে অবস্থার পরিবর্তন ঘটে। যোগাযোগ ব্যবস্থার অচিন্তনীয় উন্নতির ফলে অপেক্ষাকৃত দ্রুতভাবে সংস্কৃতিরও রূপান্তর ঘটছে। স্থানিক বৈশিষ্ট্য ও দূরত্ব দ্রুত হ্রাস পাচ্ছে। বিশ্ব-সংস্কৃতি নির্মানের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে মানবজাতি।

এ কথার পরিপ্রেক্ষিতে বলা যায়- মানব জাতির জন্ম বা বংশ পরিচয়ে তার নিয়ন্ত্রণ না থাকলেও, সংস্কৃতি তৈরিতে মানুষের ভূমিকা অনেকটাই এবং সাংস্কৃতিক বৈশিষ্ট্য মানুষের বেশ নিয়ন্ত্রণাধীন। সাংস্কৃতিক উত্তরাধিকার বিষয়টি স্পর্শকাতর এবং গুরুত্বপূর্ণ।

যদিও একথা সত্যি, রাষ্ট্র পরিচালনার কলাকৌশল, ঐক্যের ধারণা বা সাহিত্য-সংস্কৃতিতে অভূতপূর্ব সৃষ্টির প্রেরণা পাশ্চাত্য প্রভাবিত, তারপরও বাঙালি মূল্যবোধকে হতাশাব্যঞ্জক করে তোলে এমন কিছু মনোবৃত্তি গেঁথে আছে জাতির আষ্টেপৃষ্ঠে, যা দূর করা অসাধ্য হয়ে উঠেছে।

এর কারণ হিসেবে শাহ আবদুল হান্নানের মত, সংস্কৃতির একটি নিয়ামক হল ধর্ম বা বিশ্বাস। এই বিশ্বাস এক অর্থে সংস্কৃতিকে নিয়ন্ত্রণ করে। সে নিয়ামকের আলাদা বৈশিষ্ট্যের জন্য সংস্কৃতির পার্থক্য যেমন পরিলক্ষিত হয়, তেমনি কিছু সাংস্কৃতিক বৈশিষ্ট্য হারিয়ে যায়, আবার কিছু বৈশিষ্ট্য বিশ্বে টিকে থাকে। টিকে থাকা বৈশিষ্ট্যগুলো সাংস্কৃতিক ঐক্য জোরদার করলেও, সচেতন নাগরিকের ভালো-মন্দের পার্থক্য বুঝতে পারা জরুরি বলে মনে করেন হান্নান :

এখানে আগ্রাসন ও ইন্টারাকশনকে যদি এক না করে পার্থক্য করতে পারি তাহলে ভালো হবে। ইন্টারাকশনকে আমরা পারস্পরিক ক্রিয়া প্রতিক্রিয়া বা লেনদেন বলি, আর আগ্রাসন হচ্ছে পরিকল্পিতভাবে চাপিয়ে দেয়া। আমাদেরকে অবশ্যই পরিকল্পিত চাপিয়ে দেয়ার প্রচেষ্টাকে প্রতিহত করতে হবে। পাশ্চাত্যের কালচার দুর্ভাগ্যজনকভাবে হলেও বস্ত্রবাদের ওপর ভিত্তিশীল। বস্তুবাদ হলো ভোগবাদ এবং স্বার্থপরতা। তার কারণেই কালচার খুব নোংরা হয়ে গেছে। (হান্নান, ২০০৪ ১১৩ ১১৪ )

পশ্চিমাদের ভালো বিষয়গুলোকেই গ্রহণ করার পরামর্শ দিয়ে; অপসংস্কৃতি প্রতিরোধে তিনি লিখেছেন, পশ্চিমা বস্তুবাদ নাস্তিকতা না হলেও নাস্তিকতার কাছাকাছি, যা মানবতার জন্য কল্যাণকর নয়। এর জন্য তাঁর মতে সার্বিক প্রতিরোধ ব্যবস্থা গড়ে তোলা জরুরি।

সমাজে বিরাজমান নানা হতাশায় আশার আলো দেখেন হাসান আজিজুল হক (২০১৬ : ৫১৫)। তিনি মনে করেন, সংস্কৃতির রূপান্তর বা ক্ষেত্রবিশেষ অবলুপ্তি অনেক সময় শুভ বার্তা বয়ে আনে

যা এসেছে তা বদলানোর এবং চলে যাওয়ার জন্যই এসেছে। যা কিছু জীবন্ত তার মৃত্যু ঘটবে, তবু মৃত্যু ঘটলেই জীবনের পরাজয় ঘটে তা নয়। জীবনের মহিমা আপন জীবনীশক্তির বলেই প্রকাশ পায়। যখন আর তার প্রকাশ দেখা যায় না, তখন জীবনীশক্তির শেষ তৈলবন্দুটি পুড়ে গেছে বলে ধরে নিতে হবে। যা পছন্দ হয়, তাকে চিরকালের জন্য দৃঢ় মুষ্টিতে আঁকড়ে ধরে রাখলে একদিন মুষ্টি খুলে দেখা যায় সেটিতে শূন্যতা ধরে আছি। যেন উইপোকায় খাওয়া কাঠ। (আজিজুল হক, ২০১৬ : ৫১৫)

বলা হয়ে থাকে, মূল্যবোধ মানুষের প্রতিটি কর্মকে নিয়ন্ত্রণ করে। তাই অনেক ক্ষেত্রে মূল্যবোধের পরিবর্তন মানেই তা সামাজিক অবক্ষয় নয়। এই পরিবর্তন কখনো নতুন মূল্যবোধ সৃষ্টিরও কারণ হয়। সংস্কৃতির বিবর্তন হয় শিক্ষার মাধ্যমে। শিক্ষার মাধ্যমে অর্জিত মূল্যবোধ এবং বিশেষ জ্ঞান ব্যক্তির আচরণকে নিয়ন্ত্রণ করে। যার সূদূর প্রসারী প্রভাব দেখা যায় মানুষের কর্মে, চিন্তায়, শিল্পকলায়, লোকজীবন ধারায়।

তাই বিভিন্ন সমাজে মূল্যবোধের ভিন্নতা দেখা যায় এবং সংস্কৃতিতেও দেখা যায় পরিবর্তন। তবে সংস্কৃতির স্বরূপ কী অবলম্বনই বা কী, তা বোঝা গেলেই ধারণা পাওয়া সংস্কৃতি পরিবর্তনের গতি প্রকৃতির ধারা সম্পর্কে।

সংস্কৃতি বিপর্যয়ের প্রভাব

সমাজই ধারণ করে সংস্কৃতি। আর এই সমাজেই তৈরি হয় মূল্যবোধ। তাই সমাজের গুণগত প্রাচুর্য বা অবক্ষয়ের সঙ্গে সঙ্গে মূল্যবোধের ধারণারও বদল ঘটে। এমনকি সংস্কৃতির পরিবর্তনের ফলেও পরিবর্তন ঘটে মূল্যবোধের।
সমাজে সাংস্কৃতিক বিপর্যয়ের প্রভাব প্রসঙ্গে বদরুদ্দীন (১৯৭৪ : ১১১ ) বলেন, মানুষের দেশপ্রেম, আত্মসম্মানবোধ এবং গৌরবচেতনা সব কিছুই তার সাংস্কৃতিক জীবনের সাথে জড়িত।

তাই কোনো দেশের সাংস্কৃতিক বিপর্যয় ব্যক্তি-মানসের সামগ্রিক জীবনকে আচ্ছন্ন করতে বাধ্য। সাংস্কৃতিক জীবনকে পঙ্গু এবং বিধ্বস্ত করতে সমর্থ হলে পরোক্ষভাবে সে সমাজের সামগ্রিক জীবনকে পঙ্গু ও বিধ্বস্ত করার কাজ অনেকখানি সফল ও দ্রুততর হয়। এখনকার রবীন্দ্রবিরোধীতা এবং বাংলা ভাষা সরলীকরণের প্রচেষ্টা পূর্ব পাকিস্তানবাসীর সামগ্রিক জীবনকে এইভাবে বিধ্বস্ত করারই এক সূক্ষ্ম এবং দূরদর্শী পরিকল্পনা।

অনুকরণজাত, আন্তরিকতা বর্জিত, আচারসর্বস্ব আনুষ্ঠানিকতা স্বার্থকতাবিহীন অপসংস্কৃতিরই নামান্তর। এই – প্রজন্ম অজ্ঞানতাবশত সেদিকেই আকৃষ্ট। বলা যায় সৃষ্টিশীলতার পরিপন্থী ও পরিবর্তন বিমুখ জাতির জীবনে সৃষ্টির সম্ভাবনা আশংকাজনকভাবে কমে আসে। তবে সময়ের সাথে সাথে কোনো জাতির জীবনেই এটা স্থায়ী প্রভাব ফেলে না। ইতিহাস সেই আশার আলো দেখায়।

নারায়ণ চৌধুরী (১৯৮৫ : ৮৪) মনে করেন, সমাজে সুস্থ সংস্কৃতির আদর্শ প্রতিষ্ঠা করতে হলে যেটা সবচেয়ে আগে প্রয়োজন তা হল পাঠকের মন থেকে আমাদের শিল্প-সাহিত্যের জগতের সঙ্গে অঙ্গাঙ্গিভাবে জড়িত মধ্যবিত্ত মূল্যবোধের ধারণাগুলিকে বিদায় দেওয়া এবং তার জায়গায় আগামী দিনের সমাজের মূল্যবোধের আবাহন। তাঁর মতে, বিগত ও বর্তমানের চিন্তাধারাকে আমল না দিয়ে ভবিষ্যতের সমাজে যে চিন্তাধারা জন্ম নেবে তার পথ প্রস্তুত করার জন্য সজ্ঞানে চেষ্টা করে যাওয়াই হবে সুস্থ সংস্কৃতির ভিত তৈরির অপরিহার্য প্রাথমিক পদক্ষেপ।

কারণ, সাম্রাজ্যবাদ, আগ্রাসন, বিশ্বায়ন, যাই হোক না কেন; সেখানে আমাদের জাতিগত ভূমিকা, দেশের কৃষ্টি কালচার এবং তার নিয়ন্ত্রণের বিবেচনাবোধও আমাদের থাকা উচিত মনে করেন ওমর বিশ্বাস (২০০৪ : ৩১৭)।

ইতিহাসের দিকে ফিরে তাকালে দেখা যায় ব্রাহ্মণ্যবাদী সেন শাসকদের পতনের পেছনেও তাদের সাংস্কৃতিক অবক্ষয় একটি প্রধান বিবেচ্য বিষয়। সেন রাজত্বের শেষ দিককার পরিস্থিতির ওপর আলোকপাত করে ডক্টর নীহাররঞ্জন রায়ের উদ্ধৃতি দিয়ে মোহাম্মদ আবদুল মান্নান ( ২০০৪ ১৫৬) আমাদের জানাচ্ছেন, রাজা, মন্ত্রী, ব্রাহ্মণ, সেনাপতি, বণিক, রাজপুরুষ সবার জ্যোতিষ শাস্ত্রে পরম বিশ্বাসী হয়ে ওঠার পরিস্থিতি শাসকদের জনগণ থেকে বিচ্ছিন্ন করে ফেলে।

রাজার অনুচররা আতঙ্কগ্রস্ত, উপদেষ্টা ও মন্ত্রীমন্ডলী পরাজয় ভাবাপন্ন। জ্যোতিষরাই রাষ্ট্র বুদ্ধির নিয়ামক। এমন অপশাসনে বিক্ষিপ্ত হয়ে ওঠা জনগণ রাজার বিরুদ্ধে গড়ে তোলে প্রবল প্রতিরোধ। যুগে যুগে সংস্কৃতির নানা আগ্রাসন সংকটকেই ঘনীভূত করে।

শ্রীচৈতন্যের সাংস্কৃতিক অভ্যুত্থান প্রয়াস ব্যর্থ হওয়ার ফলে বাংলার মুসলীম শাসনের আয়ু বৃদ্ধি পায়। এরপর আকবরের শাসনামলে বাংলায় মুগল শাসনের সূচনা হওয়ার দরুন তার বিভ্রান্ত চিন্তাও বাংলার সংস্কৃতিকে বিরূপভাবে প্রভাবিত করে এমন উল্লেখপূর্বক মোহাম্মদ আবদুল মান্নান আরও লিখেছেন, সংখ্যাগরিষ্ঠ হিন্দু – প্রজার মনোরঞ্জনের জন্য আকবর দীন-ই-ইলাহী নামে যে সমন্বয়বাদী ধর্মমত প্রচার করেন তাতে ইসলাম ছাড়া বাকি সব ধর্মেরই কিছু কিছু অনুষ্ঠান ঠাঁই পেয়েছিল। উদাহরণ তুলে ধরে তিনি লিখেছেন :

বাদশাহর হেরেমে অগ্নিপুজা ও মূর্তি পূজা প্রচলন, সালাম দেয়ার রীতি রহিতকরণ, বাদশাহকে সেজদা করার রীতি প্রচলন, আযান ও গরু জবাই নিষিদ্ধকরণ, শুকরকে পবিত্র প্রাণীরূপে বরণ, দেওয়ালী, রাখী পূনম, সূর্যোপাসনা, কপালে তিলক এবং কোমরে ও কাঁধে পৈতা ধারণ, মৃতদেহ কবরস্থ করার রীতি পরিবর্তন প্রভৃতি রীতি দীন-ই-ইলাহীর বৈশিষ্ট্য ছিল। আওরঙ্গজেব আলমগীরের মৃত্যুর পর তার দুর্বল উত্তরাধিকারীরা সাংস্কৃতিকভাবে ছিল পুরোপুরি বিপর্যন্ত।

শৌর্য বীর্য হারিয়ে তারা ভীরুতা ও কাপুরুষতার মাঝে আত্মসমর্পন করেছিল। … শাসক সমাজ, আমীর ওমরাহ ও রাজানুকুল্য লাভকারী মুসলিম ধনিক শ্রেণীর চরম বিলাসিতা, সংস্কৃতির নামে বাঈজী চর্চা প্রভৃতি উপসর্গ প্রধান হয়ে দেখা দিয়েছিল এবং সমাজের উঁচু শ্রেণীকে নৈতিকভাবে পঙ্গু করে দিয়েছিল। আঠারো শতকে মুসলিম সমাজের দিল্লী থেকে নিয়ে মুর্শিদাবাদ, ঢাকা, সোনারগাঁও, চট্টগ্রাম সর্বত্র একই অবস্থা বিরাজ করছিল।

সাধারণ মুসলিম সমাজের নৈতিক, সাংস্কৃতিক ও সামাজিক অবক্ষয় চরমে উঠেছিল। বিশ্বাস, আচরণ ও নৈতিকবৃত্তি তথা সাংস্কৃতিক ক্ষেত্রের সকল দিকে সার্বিক বিপর্যয় নেমে এসেছিল। মুসলিম শাসকদের দুর্বলতা ও অসচেতনতার সূযোগে বাংলার ইউরোপীয় খৃস্টানদের মিশনারি তৎপরতা বৃদ্ধি করে। (আবদুল মান্নান, ২০০৪ : ১৫৮)

বহুকালে সংস্কৃতির এই আগ্রাসন বর্তমানকেও প্রভাবিত করে আমাদের পরিবার প্রথাকে ভাঙতেই যেন বন্ধ পরিকর। কেননা, আমাদের পরিবার বন্ধনের মতো অত্যন্ত শক্তিশালী বন্ধন ও সামাজিক ঐতিহ্যকে ভাঙতে পারলে অন্যান্য অনেক উপাদান আপনা আপনি ভেঙে যাবে। ওমর বিশ্বাস ( ২০০৪ : ৩১৭) মনে করেন, সাংস্কৃতিক স্বাতন্ত্র্যে আঘাত অবশ্যম্ভাবী। দেশে অপশক্তি, বিদেশি চক্রান্ত, পাশ্চাত্য প্রভাব প্রতিপত্তির মধ্য দিয়েই নিজস্বতাকে ঢাল হিসেবে ব্যবহার করে নিজেকে সংরক্ষিত করতে হবে। এই বিপর্যয় থেকে মুক্তির পথ হিসেবে শক্তিশালী সাংস্কৃতিক বৈশিষ্ট্য এবং সামষ্টিক ঐক্যই রক্ষাকবচ হতে পারে। এ ক্ষেত্রে আত্মিক উন্নয়ন, আধ্যাত্মিক সচেতনতা এবং জাগরণ জরুরি।

 

 

উপর্যুক্ত মত ও আলোচনার পরিপ্রেক্ষিতে বলা যায়, সংস্কৃতি জাতিগত জীবনবোধ, সমাজ গঠনের মূল উপাদানগুলোর অন্যতম। প্রতিটি জাতি তার নিজস্ব সংস্কৃতি নিয়েই উৎকর্ষ লাভ করে। সংস্কৃতি হলো একটি সম্প্রদায়ের অর্জিত আচরণ, এক কথায় সামাজিক সম্পদ। জাতির কীর্তির মাধ্যমেই সংস্কৃতির প্রকাশ। মানুষের আচার, জীবিকা, শিল্প, সামাজিক সম্পর্ক, ধর্মীয় রীতি বা শিক্ষা সম্পর্কীত বিষয়গুলো এ ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ।

অর্থাৎ প্রতিদিনের জীবন যাপনের সাথে যুক্ত হয় তার ললিত কলা এবং শিষ্টাচার। সময়ের সাথে এই বৈশিষ্ট্যগুলো কখনো তীব্র রূপ ধারণ করে, ভৌগলিক, আঞ্চলিক বা দেশজ বিভিন্ন উপাদান যোগ হয়ে বৃদ্ধি পায় এর পরিধি, কখনো বৈশ্বিক আগ্রাসনে তা হয়ে যায় ম্রিয়মান।

নিজের সাথে সাথে পারিপার্শ্বিক অবস্থাকে উন্নত করার যে প্রবণতা মানুষের মধ্যে দেখা যায়, এর মধ্যেই মিশে আছে সংস্কৃতি। সংস্কৃতিই প্রভাবিত করে রুচি, দৃষ্টিভঙ্গি, চিন্তাশক্তি, সমাজবোধ, পরিপার্শ্ব, গ্রহণ- বর্জন, প্রয়াস ও প্রচেষ্টা। এই চেতনা যখন তার স্বাভাবিক বিকশে বাধা পায়, তখনই তৈরি হয় সংস্কৃতির বিকার – অপসংস্কৃতি।

সাংস্কৃতিক আগ্রাসন সুষ্ঠু মানসিক বিকাশের যেমন অন্তরায়, তেমনি তা অস্পষ্ট করে তোলে জাতির আত্মপরিচয়। দেশ, জাতি, ধর্ম নির্বিশেষে রুচির পার্থক্য থাকলেও, মানুষের জীবন উপভোগের যাবতীয় পদ্ধতি এবং আয়োজনে সংস্কৃতির বিরূপ প্রভাব নড়বড়ে করে দেয় ইতিহাস, ঐতিহ্য এবং নৈতিক মূল্যবোধের ভিত। মানুষের চিন্তা, কর্ম ও সৃষ্টিই বহন করে তার সাংস্কৃতিক পরিচয়।

সংস্কৃতিতে পরস্পরবিরোধী উপাদান প্রায়শ দৃশ্যমান হলেও শত সহস্র বৎসর ধরে চলছে তার পুনঃর্গঠন। জীবনযাপন আর আর্থ-সামাজিক পদ্ধতি পরিবর্তন-পরিবর্ধনের সঙ্গে সংস্কৃতিও ধীরে ধীরে খাপ খাইয়ে নেয় তার রূপান্তর প্রক্রিয়ার সাথে। সে প্রক্রিয়ায় গ্রহণীয় এবং বর্জনীয় স্বাধীনতাই নির্ধারণ করে জাতিগত ঐতিহ্য এবং ধারাবাহিকতা।

Exit mobile version