সংশপ্তক উপন্যাস – শহীদুল্লাহ কায়সার

শহীদুল্লাহ কায়সারের ‘সংশপ্তক’ উপন্যাস বাংলা সাহিত্যের এক অনন্য মাইলফলক, যা বাঙালি জীবনের সংগ্রাম, শোষণ, সামাজিক দ্বন্দ্ব এবং মুক্তির আকাঙ্ক্ষার এক জ্বলন্ত দলিল। উপন্যাসটির প্রেক্ষাপট মূলত পূর্ব বাংলার গ্রামীণ সমাজ, যেখানে রাজনৈতিক অস্থিরতা, কৃষক বিদ্রোহ, সামন্ততান্ত্রিক শোষণ এবং মুক্তির জন্য সাধারণ মানুষের তীব্র আকাঙ্ক্ষা একসাথে মিশে রয়েছে।

‘সংশপ্তক’ শব্দটির অর্থ হলো “সেই যোদ্ধা, যে কখনো পশ্চাদপসরণ করে না”। উপন্যাসটির প্রধান চরিত্রগুলোও ঠিক এমনই – তারা সমাজের চাপ, নির্যাতন, এবং অবিচারের মুখে কখনোই পিছু হটে না। কায়সার তাঁর লেখনীতে সাধারণ মানুষের সংগ্রাম, স্বপ্ন, বঞ্চনা এবং বেঁচে থাকার অবিরাম লড়াইকে অত্যন্ত বাস্তবধর্মী এবং মর্মস্পর্শীভাবে ফুটিয়ে তুলেছেন।

এই উপন্যাসে কায়সার গ্রামীণ জীবনের আনন্দ-বেদনা, আশা-নিরাশা, প্রেম-ঘৃণা, এবং আত্মত্যাগের এক বহুমাত্রিক চিত্র এঁকেছেন। তিনি দেখিয়েছেন কীভাবে সাধারণ মানুষ সংগ্রামের মধ্য দিয়ে আত্মমর্যাদা, অধিকার, এবং স্বাধীনতার জন্য লড়াই করে।

‘সংশপ্তক’ কেবল একটি উপন্যাস নয়, বরং এটি বাংলাদেশের মুক্তিসংগ্রামের এক অনবদ্য দলিল, যা আজও পাঠকদের অনুপ্রেরণা জোগায় এবং সংগ্রামের চেতনায় উদ্বুদ্ধ করে।

 

সংশপ্তক উপন্যাস

 

সংশপ্তক উপন্যাস

শহীদুল্লা কায়সারের (১৯২৬-১৯৭১) ‘সংশপ্তক’ মহাকাৰ্যশৈলীর শিল্পণিপুৰ উপন্যাস। এর গঠন কাঠাে (Structure) উনিশ শতকের ইউরোপীয় উপন্যাসের আঙ্গিক অনুসারী। ঔপন্যাসিকের আত্ম-অনুসন্ধান, তত্ত্ববাসনা ও দ্বন্দ্বময় সমাজপরিস্থিতি কাহিনীর (Plot) প্রাণাবেগকে ক্ষুণ্ণ করেনি।

‘সংশপ্তক’ এর বিশাল প্রেক্ষাপট ও বিপুল জীবন/ প্রবাহের মাঝেও এর কালগত সংহতি অক্ষুণ্ণ থেকেছে। শহীদুল্লা কায়সারের কোনোরকম উচ্চাশা ‘সংশপ্তক’ এর প্লটবিন্যাস ক্ষতিগ্রস্ত হয়নি। দ্বন্দ্ব। জটিল সামাজিক পরিস্থিতি সত্ত্বের স্বতঃস্ফূর্ত কার্যকারণসূত্রে এ উপন্যাসের ঘটনাপ্রবাহ বিকাশমান। প্রচলিত প্রথা অনুসারে আমরা সংশপ্তক উপন্যাসের গঠনশৈলী বিশ্লেষণ করতে পারি।

উপন্যাসটি দুই ভাগে বিভক্ত, প্রথম ভাগে উপন্যাসের মৌল দ্বন্দ্বের উৎপত্তি ও পরবর্তীতে ঘটনা প্রবাহের ক্রিয়াশীলতার সূচনা; দ্বিতীয় ভাগে ঔপন্যাসিক আরো বেশি নিরাসক্তভাবে, পরিবর্তিত সমাজ সময়ের প্রেক্ষাপটে চরিত্রের রসপরিণামী সংহতি দিয়েছেন। সংশপ্তক উপন্যাসে শহীদুল্লা কায়সারের সমাজ ভাবনা ও শিল্পবোধ ছিল।

নির্দ্বন্দ্ব, প্রাগ্রসর ও প্রগতিমুখী। কারণ ঔপন্যাসিকের জীবন সমাজ সমকালের রাজনৈতিক দ্বন্দ্বময় অভিজ্ঞতায় স্নাত (শহীদুল্লা কায়সার ব্যক্তিগত জীবনে বামপন্থি রাজনৈতিক চেতনার অনুসারী ছিলেন) এবং সেই চেতানার মর্মমূল থেকে উৎসারিত চরিত্র জাহেদ, রবীন্দ্রনাথের ‘গোরা’র মতই আত্মদ্বন্দ্ব ও সমাজদ্বন্দ্বের মধ্য দিয়ে বিকশিত ।

বস্তুত, জাহেদই ‘সংশপ্তক’ (যুদ্ধে জয় লাভ অথবা মৃত্যু, এরূপ শপথকারী সৈন্য।) নামের অর্থকে প্রতীকী ব্যঞ্জনা দান করেছে। সংশপ্তক উপন্যাসের প্রথম ভাগে মৌল দ্বন্দ্ব হচ্ছে অবক্ষরিত সামন্ত প্রভুর প্রাচীন ঐতিহ্য পুনরুদ্ধার চেষ্টা ও মধ্যবিত্তশ্রেণীর উত্থান প্রচেষ্টা। কাহিনীর এ অংশ গ্রামীণ। উপন্যাসের শুরু হয় শুক্রবার জুম্মার নামাজের শেষে হুরমতির বিচার সভা দিয়ে।

অন্যান্যদের মধ্যে প্রধান মিঞা বাড়ির ফেলু মিঞা, রমজান, খতিব সাহেব, কারি সাহেব, তালতলি হাইস্কুলে জুনিয়ার মাস্টার সেকান্দর, লেকু, সত্তুর বাপ, কসির ও অন্যান্য। বিচার শেষে ফেলু মিঞার নির্দেশে রমজান হুরমতির কপালে পঞ্চম জর্জের প্রতিকৃতিপূর্ণ একটি তামার পয়সা আগুনে তাতিয়ে ছেঁকা দেয়; অবৈধ সন্তান গর্ভে ধারণ করার যথার্থ শাস্তিই বটে। হুরমতির শাস্তি সম্পন্ন হলে এর জন্য দায়ী পুরুষের শাস্তি দাবী জানায় লেকু, তাকে সমর্থন করে সেকান্দর মাস্টার। কিন্তু ফেলু মিঞা সময়ে স্বপ্নতার কথা বলে পাশ কাটিয়ে যায়। হুরমতির এ পরিণতির জন্য দায়ী মূল আসামীর কোনো সাজা হয় না।

ঔপন্যাসিক ঘটনা ও চরিত্রের ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়া রূপায়ণে নাট্যশৈলী (dramatic manner)ও চিত্রশৈলীর (pictorial manner) শিল্প সম্মত সমন্বয় ঘটিয়েছেন। বাকুলিয়া ভালতলির নিস্তরঙ্গ জীবন-প্রকৃতির স্বরূপ উপস্থাপনায় ঔপন্যাসিক কখনো বা বর্ণনাকে (narration) প্রাধান্য দিয়েছেন। যেমন :

বাকুলিয়া আর ভালগুলি। পাশাপাশি দুটো গ্রাম।

দু গ্রামকে ফারাক করে রেখেছে বিস্তীর্ণ এক শস্যক্ষেত্র। পাশ তার সোয়া

মাইল। লম্বায় মাইলেরও উপর বাকুলিয়ার দক্ষিণে, ভাই ক্ষেত্রটার নাম

দক্ষিণ ক্ষেত। তলতলির মানুষেরা বলে উত্তরের ক্ষেত।

বাকুলিয়ার প্রবেশ পথে সৈয়দ বাড়ির সদর ফটক আর বেরুবার পথে মিঞা

বাড়ির মসজিদ। দুটো খানদানী বাড়ি। দুই প্রহরীর মতো গোটা গ্রামটিকে

যেন হাতের বেষ্টনে ধরে রেখেছে।

সৈয়দরা প্রায় সকলেই কলকাতাবাসী, মিঞাদেরও অনেকে কলকাতা থাকে, শুধু ফেলু মিঞা বাকুলিয়াতে রয়েছে। ফেলু মিঞার ইচ্ছে মিঞা বাড়ির অতীত ঐতিহ্য ও ঐশ্বর্যকে ফিরিয়ে আনার, তাই রামদয়ালের কাছ থেকে বন্ধক- দেয়া তালুক সে ফিরিয়ে পেতে চায়। করিৎকর্মা রমজানকে সে পাঠায় রামদয়ালের কাছে। রামদয়াল, রমজানকে প্রলোভন দেখায় যে, আট হাজারের বেশি যা দাম হবে সেই অতিরিক্ত টাকার অর্ধেক পাবে রমজান।

 

সংশপ্তক উপন্যাস

 

ফেলু মিঞা সাত নম্বর মৌজা কেনার জন্য স্ত্রীর গহনা বিক্রি করেও যখন টাকা হয়না দেখে, তখন রমজানের পরামর্শে বাকী খাজনার জন্য লেকু-কসিরদের চাপ দেয়। খাজনা মিটিয়ে দেয়ার জন্য লেকু-কসির মুরুব্বির ধরে সেকান্দর মাস্টারকে কিন্তু ফেলু মিঞা বকেয়া খাজনা মকুবে সম্মত হয় না। খাজনার দায়ে লেকুর বাদবাকী জমি বন্ধক দিতে হয় রামদয়ালের কাছে। কসিরকে হতে হয় ভিটে-বাড়ি ছাড়া।

কসিরের পরিত্যাক্ত ভিটের ঘর তোলাকে কেন্দ্র করে রমজান, লেকুর শরীরে দায়ের কয়েক কোপ বসিয়ে দেয়। ফেলু মিঞার ইচ্ছা বিচারটা গ্রামেই সেরে ফেলবে কিন্তু সেকান্দর মাস্টার চায় মামলা করতে। মামলা করতে গিয়ে সেকান্দর মাস্টার বুঝতে পারে, নিজে বি.এ. পাশ করলেও মামলা বিষয়ে তাঁর চেয়ে ফেলু মিঞা বেশ অভিজ্ঞ।

উপন্যাসের গতিময় ও ক্রমনির্ধারক উপাদান হচ্ছে প্লট। চরিত্র এবং অন্যান্য উপাদানও উপন্যাসের প্লটকে গতিশীল করতে পারে কিন্তু সেগুলোও অনিবার্যভাবে প্লটেরই অংশ। আধুনিক এপিক শিল্পশৈলীর উপন্যাসে ঘটনা ও চরিত্র প্রায় সমান গুরুত্বে বিবেচিত হয় এবং প্লট অনেকাংশে চরিত্রের ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়ার সঙ্গে যুক্ত

“The epic plot is to a certain extent bespoken by epic characterization. The plot is inherent in the concept of the protagonist, but that concept is not realised in the narrative until this character is expressed through action.”

সময় এবং সমাজকে সংশপ্তক উপন্যাসের শিল্পায়তনের কেন্দ্রে প্রতিষ্ঠিত করলেও সময়শৃঙ্খলার প্রেক্ষাপটে ঘটনা বা চরিত্রের উপর প্লট কোনো নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করেনি। ১৯৩৮-১৯৫১ কাল পরিসরের অসংখ্য ঘটনা ও চারিত্রের গতিশীল ও দ্বন্দ্বময় প্রবাহকে শহীদুল্লা কায়সার সংশপ্তক উপন্যাসের বিশাল আয়তনে রূপ দিয়েছেন।

সর্বজ্ঞ দৃষ্টিকোণের বহুমুখী প্রয়োগে বিচিত্র ঘটনা ও চরিত্র সময়স্বভাবের অন্তর্নিহিত শৃঙ্খলার অনুবর্তী হয়েছে। বাকুলিয়া- তালতলির নিস্তরঙ্গ গ্রামীণঞ্জীবনে, কাহিনীর এই পটভূমিতে সৈয়দ বাড়ির কলেজ পড়ুয়া ছেলে জাহেদ এসে প্রবেশ করে। ঔপন্যাসিক যেন ক্ষেত্র প্রস্তুত করে মূল চরিত্রকে স্থাপন করলেন। জাহেদ কলকাতা থেকে এসে সেকান্দর মাস্টারকে বোঝাতে থাকে মুসলিমলীগের কার্যাবলী, তার প্রচেষ্টার গড়ে ওঠে সংগঠন।

গ্রাম থেকে গ্রামান্তরে সভা- সমিতি করে জাহেদ, সেকান্দর, মাস্টার, ফেলু মিঞা। মালু তাদের সঙ্গী হয়। “শিকল ভাঙ্গার গান’ গেয়ে মালু জাহেদের সভা জমিয়ে তোলে। আত্মদ্বন্দ্ব ও সমাজদ্বন্দ্বের সঙ্গে ঔপন্যাসিক মতাদর্শের দ্বন্দ্বটাও ] স্পষ্ট করে তোলেন জাহেদ এবং সেকান্দর মাস্টারের কথপোকথনে :

তুমি মুসলমান কিনা ?

না।

তবে তুমি কে?

মানুষ।

অপমান বোধে মুখটা লাল হয়ে আসে জাহেদের। তুমি কি বলতে চাও আমি মানুষ নই?

না। তুমি মুসলমান।

আলবৎ। আমি প্রথমে মুসলমান তারপর মানুষ

সে জন্যই কি এমন বর্বরের মত আচরন করছ? গলাটা হাড় তো এবার।

যেন বিরক্ত হয়েই বলল সেকান্দর।

আমি মুসলমান। আমি মুসলমান।

সেকান্দর মাস্টার ও জাহেদের কণ্ঠেরুপকথনে উন্মোচিত হয়েছে ঔপন্যাসিকের জীবনার্থের পরিচয়। পাশ্চাত্য উপন্যাস তত্ত্ববিদ নরম্যান ফ্রায়াডম্যান এবং পার্সি লুবক উপন্যাসের বিষয়বস্তু ও শিল্পরূপ ব্যাখ্যায় ঔপন্যাসিকের দৃষ্টিকোণকে (point of view) অধিক গুরুত্ব দেন। পার্সি লুবক এর মতে :

The whole intricate question of method, in the craft of fiction, I take to be governed by the question of the point of veiw – the question of the relation in which the narrator stands to the story.

ঔপন্যাসিকের শিল্পকৌশলের জটিলতর বিষয় হচ্ছে দৃষ্টিকোণ। লুবক এর মতে উপন্যাসের আঙ্গিক নিয়ন্ত্রিত হয় ‘point of veiw’ বা দৃষ্টিকোণের মাধ্যমে। এপিক শিল্পশৈলীর উপন্যাসের ক্ষেত্রে ঔপন্যাসিকের সর্বজ্ঞ দৃষ্টিকোণ প্রয়োগ করাই স্বীকৃত শিল্পকৌশল। শহীদুল্লা কায়সার সংশপ্তক উপন্যাসে ঔপন্যাসিকের সর্বজ্ঞ দৃষ্টিকোণ প্রয়োগ করেছেন।

সমাজ সময়ের যুগমানস সঞ্চার করে সংশপ্তক উপন্যাসের মহাকাব্যিক আঙ্গিককে উচ্চকিত করেছে। ১৯৪০ সালে লাহোর প্রস্তাব এবং তার পরবর্তী সময় বাঙালী মসুলমানদের পাকিস্তান আন্দোলনের প্রেক্ষাপটে মুসলীমলীগের কর্মী জাহেদের বক্তব্য প্রতিধান যোগ্য।

 

সংশপ্তক উপন্যাস

 

ব্রিটিশ সাম্রজ্যবাদ ও উপনিবেশ বিরোধী সুদীর্ঘ আন্দোলন, দেশ বিভাগোত্তর নানা ঘটনার প্রেক্ষাপটে বাঙালী মুসলমানের আশা ও স্বপ্নভঙ্গের ফলে জাহেদের পাকিস্তান বিরোধী মনোভাব এবং গ্রেপ্তার, ঔপন্যাসিকের ক্রমপরিবর্তমান চেতনাকে রূপান্বিত করেছে। সমাজ, পরিবেশের পরিবর্তনের সঙ্গে চরিত্রের মনোভঙ্গির পরিবর্তন কাহিনীর বিকাশকে সংহত করেছে।

জাহেন এক সভা থেকে এসে শোনে দরবেশ চাচা তার মারফতি দলবল নিয়ে বাড়ি এসেছে এবং পীর গোলাম হায়দার মোজাদ্দেদীর সঙ্গে রাতে রাবুর বিয়ে দেয়া হয়েছে। জাহেদ লেকুদের সহায়তায় পীর ও তার মারফতি দলকে মারপিট করে গ্রাম ছাড়া করে। কন্যা রাবুর আবদার সত্ত্বেও দরবেশ চাচা মারফতি দলের সঙ্গে নিরুদ্দেশ হয়। সৈয়দ পরিবার বাকুলিয়ার মায়া ছেড়ে কলকাতায় চলে যায়। দ্রুত পরিবর্তন শুরু হয় বাকুলিয়ার। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের প্রতিক্রিয়া পড়তে থাকে জনজীবনে।

‘সংশপ্তক’ এর প্লট গঠনে ঔপন্যাসিক সময় এবং স্থানকে (time and spece) একটি শিল্পমাত্রায় ব্যবহার করেছেন। সময়ের পরিধি ও স্থানের বিশালতা (বাকুলিয়া থেকে কলকাতা এবং পরবর্তীতে ঢাকা- বাকুলিয়া) ‘সংশপ্তক’-এর মহাকাব্যিক মহিমাকে সফলতা দান করেছে। কাহিনীর দ্বিতীয় পর্বে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের প্রেক্ষাপটে কলকাতার পটভূমিতে মালুর চোখ দিয়ে পরিবর্তনটা দেখানো হয়। মালু প্রথমে মেসে রান্নার কাজ পেলেও পরে সঙ্গীত শিল্পী হিসেবে পরিচিতি লাভ করে। কলকাতায় মালু ভিন্ন বাস্তবতার মুখোমুখি হয়।

প্রথমে কলকাতায় গিয়ে মালু যে আশ্রয়ে উঠে ১৯৪৬ সালের সাম্প্রাদায়িক দাঙ্গায় সেই আশ্রয় কেড়ে নেয়। হোটেল মালিক শচীনবাবু নিজের জীবন বিপন্ন করে মালুকে পৌঁছে দেয়, পথে মালু দেখতে পায় সাম্প্রদায়িক দাঙ্গার শিকার নানা বয়সের মানুষের লাশ। শচীন বাবুর গাড়ি থেকে প্রায় চলন্ত অবস্থায় নেমে পড়ে মালু, রাবুর কলেজ হোস্টেলের কাছে। আশোক মেসের মত এখানেও তার জীবন বিপন্ন হওয়ার উপক্রম, পাড়ার হিন্দু ছেলেদের সহায়তায় এক সময় মালু বাবুরা নিরাপদে পার্ক সার্কাসে সৈয়দ বাড়িতে পৌঁছায়।

মানুকে সঙ্গে নিয়ে রাবু, জাহেদের খোঁজে পার্ক সার্কাসের একটি হোটেলে যায়, সেখানে দেখা হয় জাহেদের সঙ্গে। জাহেদ দেশের কাজে আত্মোৎসর্গ করেছে। জাহেদের সংগে মালুও যোগ দেয়। তাদের কাজ হলো ইংরেজের কাছ থেকে স্বাধীনতা লাভের জন্য কাজ করা এবং সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি বজায় রাখা। রকীব সাহেবের চেষ্টায় মালু একসময় খ্যাতিমান পল্লীগীতি শিল্পী হয়ে ওঠে।

১৯৪৭ সালে দেশ বিভাগের পর সৈয়দ সাহেবের পদোন্নতি ঘটে এবং তাকে চলে আসতে হয় ঢাকা। মালুও ঢাকা বেতারের শিল্পী হিসেবে কাজ পায় । রিহানা নামের একটি মেয়ে মালুর প্রেমে পড়ে এবং তারা বিয়ে করে কিন্তু সে বিয়ে খুব সুখকর হয় না। মানু যখন নানা দ্বিধাদ্বন্দ্বে ক্ষত-বিক্ষত তখন রাবু চাকরি ছেড়ে গ্রামে যায়। পিতা দরবেশের সেবার জন্য এবং গ্রামে স্কুলে প্রতিষ্ঠা করে শিক্ষার আলো জ্বালাবার বাসনা নিয়ে রাবু বাকুলিয়া যায়।

রেডিওর চাকরী ছেড়ে দিয়ে মালুও এক সময় বাকুলিয়ায় যাত্রা করে। বাকুলিয়া গ্রামে ঢোকার পথে দেখা হয় রমজানের সঙ্গে। অবশ্য তখন সে কাজী মোহাম্মদ রমজান আলী। দেখা হয় সেকান্দর মাস্টারের সঙ্গে এবং বাকুলিয়ার নানা পরিবর্তনের কথা শোনার পর, মহামারির কথা শুনে আতঙ্কিত হয়। রাবুও সে মহামারিতে আক্রান্ত, মাস্টার তার জন্য ঔষধ আনতে শহরে যাচ্ছে। জাহেদ তার ভালোবাসার পাত্রীকে বসন্ত রোগে আক্রান্ত দেখে বিচলিত হয়।

জাহেদকে ভালোবেসে অসুখের মধ্যেও প্রলাপ বকে রাবু। জাহেদ, সেকান্দর মাস্টার, লেকু, হুরমতি নিরলস পরিশ্রম করে রাবুকে সারিয়ে তোলে। কয়েকদিন পরই পুলিশ এসে জাহেদকে গ্রেপ্তার করে

“রাবুর দিকে তাকিয়ে হাত তুল জাহেদ। বলল আসি

অশ্রু টলটল ৱাবুর চোখ। টপ টপ করে ঝরে পড়ল দুটো ফোটা।

রাবু হাসল। বলল, এসো।

সাম্পান পৌঁছে গেছে মাঝ গানে। পকেট থেকে রুমাল বের করল

জাহেদ। উড়িয়ে দিল নিশানের মত। চেঁচিয়ে চেঁচিয়ে বলল,

চিন্তা করিসনে রানু, আমি আবার আসর। আমি আসব

২.

সংশপ্তক উপন্যাসের এই পরিণতি শহীদুল্লা কায়সারের শিল্পচেতনার পরিচয় বহন করে। উপন্যাসের বিশাল ক্যানভাসে ঔপন্যাসিক আপন শিল্প চৈতন্যের বিকাশ ঘটিয়েছেন সময়োপযোগী বিভিন্ন দৃশ্য ও চরিত্রের উপস্থাপনার মাধ্যমে। ঔপন্যাসিকের তত্ত্ববাসনা সত্ত্বেও চরিত্রগুলো জীবন্ত, বাস্তবানুগ এবং সংগ্রামমুখর।

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের কিছু পূর্বে উপন্যাসের কাহিনী শুরু হয় এবং শেষ হয়েছে ঔপনিবেশিক শাসন থেকে মুক্তি লাভের পর দ্বি-জাতিতত্ত্বের ভিত্তিতে প্রতিষ্ঠিত পাকিস্তান সৃষ্টির কিছু পরে। অর্থ্যাৎ সময়ের দিক থেকে ১৯৩৮ থেকে ১৯৫১ খুব বেশি নয় কিন্তু বাংলাদেশ তথা উপমহাদেশের প্রেক্ষাপটে এসময় কাল খুবই তাৎপর্যপূর্ণ।

বস্তুত এই সময় উপমহাদেশে রাজনৈতিক, সামাজিক, অর্থনৈতিক নানা প্রকার পরিবর্তন সূচিত হয়েছিল। বিশ্বযুদ্ধের প্রত্যক্ষ প্রভাব না থাকলেও পরোক্ষ প্রভাব জনজীবনে ব্যাপকভাবে পড়েছিল। ১৯৪৩ এ মন্বন্তর, ঔপনিবেশ বিরোধী আন্দোলন, দ্বি-জাতিতত্ত্বের ভিত্তিতে মুসলমানদের জন্য স্বতন্ত্র ভূখন্ডের দাবি ত পাকিস্তান আন্দোলন।

১৯৪৬ সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা, উপনিবেশের বিদায়, দেশবিভাগ (১৯৪৭) পাকিস্তান রূপী নতুন ধর্মীয় উপনিবেশের পত্তন, ভাষা আন্দোলন (১৯৪৮-৫২), জমিদারী প্রথা বিলোপ (১৯৫০) ঢাকা কেন্দ্রিক নতুন মধ্যবিত্ত শ্রেণীর উত্থান ইত্যাদি যুগচঞ্চল ঘটনা, বাঙালী মুসলমানের আশা ও স্বপ্নভাঙ্গার প্রেক্ষাপটে আর্থ-সামাজিক, রাজনৈতিক স্বাতন্ত্র্য্য প্রচেষ্টাকে শহীদুল্লাহ কায়সার সংশপ্তক উপন্যাসের কাহিনী ক্যানভাসে স্থাপন করেছেন।

বাঙালীর স্বাধিকার ও স্বাতন্ত্র্য্য প্রচেষ্টার পটভূমিতে গ্রাম ও শহর, ঢাকা ও কলকাতা, স্থান ও কালের পরিধি তাৎপর্যপূর্ণ হয়ে উঠেছে অসংখ্য চরিত্রকে সঙ্গী করে। সংশপ্তক উপন্যাসের প্লট বিন্যাস নির্যন্ত, সচেতন শিল্পকৌশলে সুনিপুণ। সময় ও সমাজের বিশাল প্রেক্ষাপট ও চরিত্রাবলী, তাদের সূক্ষ্মানুসূক্ষ্ম অংশের উদ্ভাসন ‘সংশপ্তক’-এর গঠনশৈলীর অন্যতম বৈশিষ্ট্য। চরিত্রের মুখে সঙ্গীত ও সংলাপের প্রয়োগ সংশপ্তক উপন্যাসকে স্বচ্ছন্দ গতি দান করেছে।

উপন্যাসের সূচনার হুরমতির লঞ্চনা এবং পরিণামী দৃশ্য পুলিশ কর্তৃক জাহেদের গ্রেপ্তার ঘটনা নাটকীয় পদ্ধতিতে বিন্যস্ত করায় ‘সংশপ্তক’-এর প্লট বিন্যাস শিল্প সফলতা লাভ করেছে।

ঔপন্যাসিকের জীবনার্থ সন্ধানের মূল উপাদান হচ্ছে চরিত্র। উপন্যাসের কাহিনী-ক্যানভাসে একক, স্বয়ম্ভূ বৃক্ষ-চরিত্রই ঔপন্যাসিকের দৃষ্টিকোণ, অবলোকন অভিজ্ঞতা ও অনুভব প্রকাশের প্রচারের ভার বহন করে। উপন্যাস বিবেচনায় প্রাতীচ্যের উপন্যাসতাত্ত্বিকরা সর্বাধিক গুরুত্ব দিয়েছেন চরিত্রের উপর। ডব্লিউ.জে হার্ডে-র মতে ‘most great novels exist to reveal and explore character.”

উপন্যাসকাহিনীতে বিধৃত চরিত্র সমূহ ব্যক্তিত্বময় হয়ে ওঠে ঔপন্যাসিকের সৃজন দক্ষতায়। ‘শহীদুল্লা কায়সার তাঁর উপন্যাসের জন্য কোনো নায়ককর চরিত্রের ধারণা নিয়ে অগ্রসর হননি। গুণগত দিক থেকে যে সকল চরিত্র সমকালের অন্যান্য মানুষ থেকে অগ্রসর কিন্তু স্বাভাবিকতা অতিরেক নয় ‘সংশপ্তক’-এর চরিত্র কল্পনায় এ ধারণারই বিন্যাস ঘটেছে।

এই সব স্বাভাবিক, জনজীবনসংলগ্ন অথচ সক্রিয়তা ও সংবেদনশীলতায় সামাজিক নেতৃত্বদানের গুণসম্পন্ন চরিত্রকেই উপন্যাস কাহিনীর কেন্দ্রে স্থাপন করা হয়েছে। নেতৃত্বের গুণ জাহেদ কিংবা সেকান্দর মাস্টার উভয়ের মধ্যেই বিদ্যমান। কিন্তু জাহেদের চিন্তা ও কর্মের যে দ্বন্দ্বময় অগ্রগতি লক্ষ করা যায়, সেকান্দর মাস্টারের ক্ষেত্রে তেমন ঘটে না। জাহেদের চেতনা ও কর্মের সংগে নির্দিষ্ট কালখণ্ডের সমাজ মানসের সঙ্গতি বিদ্যমান।

সেকান্দর মাস্টার গোড়া থেকেই মীমাংসিত এবং ঔপন্যাসিকের জীবনবোধের আদর্শরূপ হিসেবে উপস্থাপিত। জাহেদ প্রথমে মুসলিম লীগের দৃষ্টিতে জীবন ও জগতকে দেখে; অনেকটা রবীন্দ্রনাথের প্রথম পর্বের ‘গোরা’ যেমন হিন্দুর চোখ দিয়ে ভারতবর্ষের স্বাধীনতাকে দেখেছিল। পরে আত্মদ্বন্দ্ব ও সমাজদ্বন্দ্বের রক্তাক্ত অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে জাহেদ প্রগতিশীল রাজনৈতিক চেতনার অগ্নিপুরুষে পরিণত হয়।

চরিত্র পরিকল্পনায় তারাশঙ্করের ‘গনদেবতা’ ‘পঞ্চগ্রাম’-এর দেবু ঘোষ, শ্রীহরি পাল এর সঙ্গে শাহীদুল্লা কায়সারের সেকান্দর মাস্টার,ফেলু মিঞা, জাহেদের অনেক মিল খুঁজে পাওয়া যায়। তবে সময় ও সমাজদ্বন্দ্বের স্বরূপ বাস্তবতায় তারাশঙ্কর গান্ধীবাদী আর শহীদুল্লা কায়সারের চরিত্রগুলো সমাজতান্ত্রিক বাস্তবতায় বিশ্বাসী। উপন্যাসের শুরুতে যে কর্মচঞ্চল জাহেদকে দেখা যায়, কাহিনীর পরিণতিতে সে হয়ে পড়ে স্নান।

জাহেদ রাবুর প্রেম গোপন থাকে না, প্রথাগত রোমন্টিক চরিত্র হয়ে উঠে জাহেদ। মালুর চরিত্র ব্যাপকভাবে ভাববাদী। ঢাকা বেতারের জনপ্রিয় সঙ্গীত শিল্পী মালু প্রেম করে রিহানাকে বিয়ে করে কিন্তু রিহানার উপর নিজের অধিকারকে ব্যক্তিত্ব নিয়ে প্রতিষ্ঠা করতে পারেনি। রিহানার আচরণে ক্ষুব্ধ মালু জাহদের চিঠি পেয়ে বাকুলিয়ায় ফিরে আসে এবং রাবুর কথায় সে জাহেদের সহকর্মী হয়ে যায়।

সৈয়দ পরিবারের অন্যান্য চরিত্র আরিফা, সৈয়দ গিন্নি, সৈয়দ সাহেব উপন্যাসের ঘটনাংশে গৌণ চরিত্র। সেকান্দর মাস্টারের চরিত্রটি ব্যতিক্রমী। তার জীবন উপলব্ধি, আদর্শ, কর্মতৎপরতা, মহাভারতের সেই সংশপ্তকদের মিথিক চরিত্রের মাত্রা পায়। ফেলু মিঞা ক্ষয়িষ্ণু সামস্ত চরিত্রের যোগ্য প্রতিনিধি | কিন্তু রমজান চরিত্রবৈশিষ্ট্যের দিক থেকে সামন্ত হলেও নীতি আদর্শে বুর্জোয়া শ্রেণীর সফল প্রতিনিধি। উপন্যাসে লেকু, কসির, হুরমতি জীবনযুদ্ধে দুঃখজয়ী। কোনো বঞ্চনাই তাদের বঞ্চিত করতে পারে না। বঞ্চনার পথ ধরেই তারা মহাপ্রাপ্তির দিকে এগিয়ে যায়। তাদের জীবনমুখী সংগ্রাম জীবনজয়ী করে তুলেছে।

 

সংশপ্তক উপন্যাস

 

৩.

উপন্যাসের শৈলী বিচারে ভাষা একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক। ভাষা মানুষের ভাব প্রকাশের প্রধান বাহন। রচয়িতা ভাষার লিখিত রূপের মাধ্যমে পাঠকের অনুভূতির আঙ্গিনায় নিজের ভাবকে পৌঁছে দেন। তাই সাহিত্যাঙ্গিকের নানা মাধ্যম- কবিতা, গল্প, উপন্যাস, নাটক ইত্যাদির ভাষা ও বাক্যের গঠন বিভিন্ন। সাহিত্যাঙ্গিকের এই বিভিন্ন রূপের ভাষার বিজ্ঞান ভিত্তিক বিশ্লেষণ বেশ দুরূহ। দুরূহ বলেই বাংলা সমালোচনা সাহিত্যে শৈলী বিজ্ঞান আজো অবিকশিত।

শৈলী বিজ্ঞানের দৃষ্টিতে, ব্যক্তি ভেদে তার শব্দ প্রয়োগ, বক্সগঠনের ভিন্নতা পরিসংখ্যান ও গ্রাফের মাধ্যমে তুলে ধরা হয়। বাক্যের দীর্ঘতা ও চুষতা, তৎসম, তদ্ভব, দেশি, বিদেশি শব্দ প্রয়োগের হারও শৈলীবিজ্ঞানে বিশ্লেষিত হয়। শব্দের মালা গেঁথেই সৃষ্টি করা হয় বাক্য। সুতরাং শৈলী চর্চায় শব্দের পাশাপাশি বাক্য গঠনের প্রতিও দৃষ্টিপাত প্রয়োজন। ১৬

আমরা জানি উপন্যাস একটি বিমিশ্র শিল্পাঙ্গিক। উপন্যাসের আঙ্গিকের মধ্যেই রয়েছে সেই সম্ভাবনা, যাতে অবলীলায় স্থান করে নিতে পারে কবিতা, গান, নাট্য, সংলাপ, বর্ণনা, বিবরণ ভাষ্য, সব কিছু। সুতরাং সব উপন্যাসের ভাষাশৈলীর বিচার এক পদ্ধতিতে করা যায় না। শৈলীবিজ্ঞানের বিভিন্ন নিরিখ বিভিন্নভাবে প্রয়োগ করে একেকটি উপন্যাসের ভাষাশৈলী একেক ভাবে বিশ্লেষণ করাই স্বীকৃত পদ্ধতি ।

উপন্যাস যেহেতু বিমিশ্র শিল্পমাধ্যম, সেহেতু ‘সংশপ্তক’ এর মহাকাব্যিক শিল্পাঙ্গিকের মধ্যে রয়েছে বিচিত্র ভাষা- ভঙ্গির প্রয়োগ। ‘সংশপ্তক’-এর ঘটনা ও চরিত্রের ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়া রূপায়ণে ঔপন্যাসিক ব্যবহার করেছেন চিত্রশৈলী (pictorial manner),বিশ্লেষণশৈলী (analytical manner); সংলাপনির্ভর নাট্যশৈলী (dramatic manner) এবং বর্ণনা (narration).

চিত্রশৈলী (Pictorial manner)

‘বিরাট বটের অসংখ্য শিকড় যেমন এঁকে বেঁকে মাটির ভেতর ছড়িয়ে যায়, মাটির সাথে অচ্ছেদ্য বন্ধনে ধরে রাখে বিশাল মহীরুহকে, রস সিক্ষন করে প্রতিনিয়ত, তেমনি ওই শান্ত আর ছোট ছোট বালগুলো অন্যগুলি বাকুলিয়াকে ধরে রেখেছে অসংখ্য বাহুর আলিঙ্গনে। রসে ভরে যায় ডালগুলি বাকুলিয়ার মাটি, বৃষ্টি বন্যার পানি আর আবর্জনা বয়ে নিয়ে অটুট রাখে দুগ্রামের স্বাস্থ্যশ্রী ।

এখানে ঔপন্যাসিক বাকুলিয়া ও তালতলির স্বাস্থস্ত্রীর কথা বলতে গিয়ে গার্ড ও ছোট ছোট খালগুলোকে বটগাছের সঙ্গে তুলনা করেছেন। বটগাছের চিত্রকল্প উপস্থাপন করতে গিয়ে ঔপন্যাসিক কমা (‘)র সাহয্যে দীর্ঘ বাক্য ব্যবহার করেছেন। তাঁকে সাহায্যে নিতে হয়েছে অসমাপিকা ক্রিয়ার।

ক. ভেতরে ছড়িয়ে যায়

খ. অচ্ছেদ্য বন্ধনে ধরে রাখে

গ. রস সিঞ্চন করে প্রতিনিয়ত

ঘ. বাকুলিয়াকে ধরে রেখেছে।

বাক্যের রূপবন্ধ দীর্ঘ করতে হলে অসমাপিকা ক্রিয়ার প্রয়োগ অনিবার্য। চিত্রকর যেমন ছবি আঁকার জন্য তুলি চলিষ্ণু রাখে, তেমনি ঔপন্যাসিক চিত্ররীতি প্রয়োগ করতে গিয়ে অসমাপিকা ক্রিয়া দিয়ে ভাবকে চলিষ্ণু রেখে বাক্যকে দীর্ঘ করেছেন।

বিশ্লেষণশৈলী (Analytical manner )

কিছুদূর এগিয়ে ফেলু মিঞা উদাস চোখে তাকায় সমনের দিকে যেখানে একটি রূপোর সুতোর মতো চিকচিক করছে বড় খাল। ওই খালের এপার-ওপার একদা সবটাই ছিল মিঞাদের সম্পত্তি। তালতলি, চাটখিল, সুলতানপুর এসব গ্রাম ছিল মিঞানেরই জমিদারীর অংশ। কিন্তু কর্নপ্রয়ালিসের চিরস্থায়ী বন্দোবস্তের সময় কেমন করে যে জমিদারীটা বেহাত হয়ে যায়, সে ইতিবৃত্ত এখানো উদ্ধার করতে পারেনি ফেলু মিঞা। শুধু শুনেছিল প্রাচীন সম্পত্তি পূর্নবার বন্দোবস্ত নেবার মতো নগদ টাকা নাকি ছিল না। তাদের দুর্ভাগা পূর্বপুরুষদের হাতে।

এখানে ফেলু মিঞাদের হারিয়ে যাওয়া প্রাচীন ঐতিহ্যের ব্যাখ্যায় ঔপন্যাসিক বিশ্লেষণরীতি প্রয়োগ করেছেন। যেমন- ফেলু মিঞার ভাবনা বিশ্লেষণ কেমন করে যে জমিদারীটা বেহাত হয়ে যায়’- এর কারণ বিশ্লেষণ করতে ব্যবহার করতে হয়েছে- ‘পুর্নবার বন্দোবস্ত নেবার মতো নগদ টাকা নাকি ছিলনা’ পূর্বপুরুষদের। স্বগতোক্তির মতো ফেলু মিঞার মনোবিশ্লেষণের মাধ্যমে ফুটে উঠেছে তার বর্তমান ক্ষয়িষ্ণু অবস্থা এবং রূপোর সুতোর মতো চিকচিক’ বড় খালের এপার-ওপারের হারানো সম্পত্তির বেদনা।

নাট্যশৈলী (Dramatic manner )

হারামজাদী ছিনাল।

বজ্জাত মাগী।

খানকী বেইশ্যা ।……

এই কসবী হারামজাদী; ঘোমটা দে। ধমকে উঠে ফেলু মিঞা।

আবার দেমাক দেখো না। কিরে খানকি মাগী ‘যারবা পেটে নেবার সময় খেয়াল ছিল না? দেয়াগটা তখন কোথায় ছিল। মুনিবের চেয়ে কন্ঠস্বর আর এক ডিগ্রি চড়া করে বিছিয়ে ওঠে রমজান।

সংশপ্তক উপন্যাসের শুরুতে হুরমতি বিচার সভার নাটকীয় আয়োজনের সঙ্গে সংলাপের এব্যবহার গ্রামীণ সমাজ বাস্তবতাকে তীব্রতর করেছে।

সংলাপের শব্দ ও বাক্যবন্ধনে স্পষ্ট, চরিত্রের সামাজিক অবস্থান এবং ভাষার আঞ্চলিকশৈলী। কারণ ব্যক্তির ব্যবহৃত ভাষার ভেতরেই রয়ে যায় সেই নির্দিষ্ট বাস্তাবতার সংকেত। হুরমতির উদ্দেশ্যে ছুঁড়ে দেয়া ফেলু মিঞার ভৎসনা বা গালিতে ব্যবহৃত শব্দ উৎস :

সংস্কৃত : ছিলান, বেইশ্যা

ফার্সী : বজ্জাত, খানকী, দেমাক, খেয়াল, হারামজাদী

অসমীয়া : কসবা

বাংলা : ঘোমটা, পেট।

 

সংশপ্তক উপন্যাস

 

সংশপ্তক উপন্যাসের চরিত্রসমূহের সংলাপের ভাষা বিচারের ক্ষেত্রে নিম্ন ছকটি লক্ষ্য করা যায় :

চরিত্র

স্ত্রী/পুরুষ

পেশা

শিক্ষাগত যোগ্যতা,

সম্প্রদায়

কোন অঞ্চলের অধিবাসী

ফেলু মিঞা

পুরুষ

জমিদারী

অস্পষ্ট

মুসলিম

নোয়াখালী

রমজান

পুরুষ

পেয়াদা / ব্যবসায়ী

অস্পষ্ট

মুসলিম

নোয়াখালী

জাহেদ

পুরুষ

ছাত্র/ নেতা

শিক্ষিত

মুসলিম

নোয়াখালী

সেকান্দর মাস্টার

পুরুষ

চাকুরীজীবী /নেতা

শিক্ষিত

মুসলিম

নোয়াখালী

লেকু

পুরুষ

দিনমজুর

অশিক্ষিত

মুসলিম

নোয়াখালী

দরবেশ চাচা

পুরুষ

বাউণ্ডেলে

শিক্ষিত

মুসলিম

নোয়াখালী

মালু

পুরুষ

সঙ্গীত শিল্পী

স্বল্পশিক্ষিত

মুসলিম

নোয়াখালী

হুরমতি

স্ত্রী

মহিলা শ্রমিক

অশিক্ষিত

মুসলিম

নোয়াখালী

রাবু

স্ত্রী

ছাত্রী/চাকুরীজীবী

শিক্ষিত

মুসলিম

নোয়াখালী

আরিফা

স্ত্রী

গৃহিণী

শিক্ষিত

মুসলিম

নোয়াখালী

সৈয়দ শিল্পী

স্ত্রী

গৃহিণী

অস্পষ্ট

মুসলিম

নোয়াখালী

রিহানা

স্ত্রী

গৃহিণী

শিক্ষিত

মুসলিম

ঢাকা

রাম দয়াল

পুরুষ

জমিদারী

স্বল্পশিক্ষিত

হিন্দু

নোয়াখালী

শচীন বাবু

পুরুষ

শিল্পী

স্বল্পশিক্ষিত

হিন্দু

কলকাতা

আমাদের বিবেচনায় সংশপ্তক উপন্যাসের প্লট এবং স্থান-কালগত গঠন বিন্যাস এরূপ কল্পিত :

 

সংশপ্তক উপন্যাস

 

‘ক’ উপন্যাসের কাহিনীর উৎসভূমি বাকুলিয়া। ” সময় ও সমানুবাস্তবতার অনিবার্য কারণে কুশিলবদের কলকাতা গমন, বিশ্বযুদ্ধের প্রভাব, দাঙ্গা ইত্যাদি সমাজ ও রাজনীতির জন্ম অবলোকন, ‘খ’- কলকাতা। দেশবিভাগের প্রেক্ষাপটে কুশিলবদের ঢাকায় প্রত্যাবর্তন; ‘গ’- ঢাকা। কাহিনীর বাস্তব প্রয়োজনে, এ্যারিস্টেটোলীয় ত্রিনীতি সূত্রে- দ্বন্দ্ব, বিকাশ, পরিণতির জন্য ঘটনাংশ বাকুলিয়ায় ফিরে আসে।

Leave a Comment