আজকে আমাদের আলোচনার বিষয়ঃ বাংলাদেশের উপন্যাসে শ্রেণী চেতনার পটভূমি। যা বাংলাদেশের উপন্যাসে শ্রেণী চেতনার স্বরূপ এর অন্তর্গত।

বাংলাদেশের উপন্যাসে শ্রেণী চেতনার পটভূমি
আধুনিক সাহিত্যের সর্বাপেক্ষা জীবন ঘনিষ্ঠ রূপায়ণে জীবনের বহুভঙ্গিম বাস্তবতার দ্বন্দ্বাকীর্ণ সফল শিল্পরূপ হল উপন্যাস। উপন্যাস শিল্পে প্রতিফলিত ঔপন্যাসিকের শ্রেণীগত পরিচয়, ভূমিকা এবং তাঁদের সৃষ্টিকর্মে বিধৃত শ্রেণীচেতনার ক্রমবিকাশের পরিচয় লাভ করতে হলে এ কালের সামাজিক রূপান্তর ও বিবর্তন সম্পর্কে জানা দরকার।
বৃহৎ বাংলার নবাবি শাসনের অবসান এবং ইংরেজ শাসনের প্রতিষ্ঠা, পুরাতন সামন্তশ্রেণীর বিলোপ এবং মুৎসুদ্ধি জমিদার, চাকুরীজীবী-ব্যবসায়ী মহাজনদের নিয়ে গঠিত নতুন মধ্য শ্রেণীর উদ্ভব ও প্রতিষ্ঠার ইতিহাস লক্ষ করলে স্পষ্টতই বাংলাদেশের সামাজিক শ্রেণী রূপান্তরের ধারা দৃশ্যমান হয়ে ওঠে। ঔপনিবেশিক শাসনব্যবস্থায় সৃষ্ট নব্য মধ্যবিত্ত শ্রেণীর উদ্ভব প্রসঙ্গে ইংরেজ শাসকদের প্রতিনিধি টি. বি. মেকলে’র উক্তি স্মরণযোগ্য:
“এখন আমাদের যথাসাধ্য চেষ্টা করতে হবে এমন একটি শ্রেণী গড়ে তোলার জন্য যে শ্রেণীর লোকেরা হবে আমাদের ও আমরা যে কোটি কোটি লোককে শাসন করছি সেই শাসিতদের মধ্যে ভাবের আদান প্রদানকারী; এই শ্রেণীর অন্তর্ভুক্ত ব্যক্তিরা হবে রক্তে ও রঙে ভারতীয় আর রুচিতে, মতে, নীতিতে ও বুদ্ধিতে ইংরেজ। ”
লর্ড বেন্টিংকের আমলে, ১৮৩৫ খ্রি:, এদেশে ইংরেজি মাধ্যমের যে নতুন শিক্ষাব্যবস্থা প্রবর্তন করা হয়, শাসকদের দিক থেকে তার উদ্দেশ্য ব্যক্ত হয়েছিল মেকেলের উল্লিখিত উক্তির মধ্য দিয়ে। আর উক্ত শিক্ষাব্যবস্থা প্রবর্তনের মধ্য দিয়েই ইউরোপীয় বুর্জোয়া ধ্যান ধারণার সঙ্গে বাংলাদেশের মধ্যশ্রেণীর পরিচয় এবং তাদের মধ্যে প্রচলিত পুরাতন ধর্মীয় চিন্তা ভাবনা ও ধ্যান ধারনার পরিবর্তন ইত্যাদি ঘটনার সঙ্গে সঙ্গে আধুনিক বাংলা সাহিত্যের ধারাসমূহের সূচনা, প্রতিষ্ঠা ও বিকাশ ঘটে।
বস্তুত, ইংরেজ আমলের মধ্যশ্রেণীর অর্থনৈতিক, সামাজিক, রাজনৈতিক ইত্যাদি প্রতিটি অগ্রগতির সঙ্গে সমান তালে বিকশিত হয়েছে আধুনিক বাংলা সাহিত্য। মূলত এই মধ্য শ্রেণীর বিকাশের প্রক্রিয়ার মধ্যেই অন্তলীন ছিল আধুনিক সাহিত্য ও একালের সামাজিক রূপান্তরের মূল উৎস ধারা। মধ্যশ্রেণীর বিকাশের প্রক্রিয়া সংক্ষেপে এরকম: “আঠারো শতকের প্রথমার্ধে বহুকালের প্রচলিত ক্ষয়িষ্ণু ধ্বংসোন্মুখ সামাজিক শ্রেণীর প্রাথমিক উপাদান সমূহের অঙ্কুরোদগম হয়।
আঠারো শতকের সমাপ্ত শাসনের চাপ থেকে মুক্ত হবার ও অবাধ বিকাশের আকাঙ্ক্ষায় মধ্যশ্রেণী বাংলাদেশে আগত ইউরোপীয় বণিকদের সাথে আঁতাত করতে গিয়ে খাল কেটে কুমীর আনে এবং দেশকে পরাধীনতার অভিশাপে অভিশপ্ত করে। আঠারো শতকের অন্তিমপাদে চিরস্থায়ী বন্দোবস্তের (১৭৯৩) পরে এই শ্রেণী একটি ঐতিহাসিক যুগের জন্য নিজেদের অর্থনৈতিক অবস্থান নিশ্চিত করে নেয়, এবং নব্য-জমিদার-চাকুরিজীবী-ব্যবসায়ী-মহাজন হিসেবে সুপ্রতিষ্ঠিত হয়।
সমগ্র উনিশ শতক ধরে এই শ্রেণী পরাধীন স্বদেশে বিদেশী শাসকদের সঙ্গে সহযোগিতা করে স্বদেশের সম্পদ বিদেশী শাসক-শোষকদের হাতে তুলে দিয়ে সেই শাসক-শোষকদের উচ্ছিষ্ট লাভ করে বিকশিত হয়। এই শ্রেণীর একাংশ ইউরোপীয় বুর্জোয়া সভ্যতা-সংস্কৃতি-সাহিত্যের সঙ্গে পরিচিত হয়ে সেই আলোকে বিদেশী শাসকদের সহযোগিতায় পরাধীন দেশের স্বদেশের পশ্চাৎবর্তী সমাজের সংস্কার সাধনের চেষ্টা চালায়।
প্রথম দিকে এই শ্রেণীতে মুসলমান উপাদানের পরিমাণ ছিল নিতান্ত কম। বিশ শতকের প্রথম পাদে মুসলমান উপাদান উল্লেখযোগ্য পরিমাণে বৃদ্ধি পেলে এই শ্রেণীর হিন্দু অংশ ও মুসলমান অংশ হিন্দু-মুসলিম সাম্প্রদায়িকতার ভিত্তিতে বিভক্ত ও বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে। হিন্দু-মুসলিম বিরোধের পেছনে শাসক ইংরেজদের বিভেদ সৃষ্টি করে শাসন চালানোর নীতিও ইন্ধন যুগিয়েছিল। ১৯৪৭ সনে ব্রিটিশরাজ বিদায় নেবার সময়ে ভারতীয় উপমহাদেশ বিভক্ত হয়, এবং এই শ্রেণীর হিন্দু অংশের নেতৃত্বে স্বাধীন ভারত ও মুসলমান অংশের নেতৃত্বে স্বাধীন পাকিস্তান প্রতিষ্ঠিত হয়।
পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার পরে পূর্ব বাঙলায় এই শ্রেণী অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক সকল দিক দিয়ে একান্ত বার্ধক্যজীর্ণ ও ক্ষয়িষ্ণু হয়ে পড়ে এবং দ্রুত অধঃপতনের গহ্বরে তলিয়ে যেতে আরম্ভ করে। এ অবস্থায় বিগত কয়েক দশক ধরে বাংলাদেশের সমাজ পুনরায় এক ক্রান্তিকাল বা যুগসংক্রান্তির মধ্য দিয়ে চলেছে।

কিন্তু পাকিস্তান আমলেই আবার পূর্ব বাংলার সমাজে নতুন উপাদানের আত্মপ্রকাশ ঘটতে থাকে এবং ১৯৭১ সনে বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার মধ্য দিয়ে এই নতুন সামাজিক উপাদানসমূহ রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক ক্ষমতার অধিকারী হয়। তথাপি বাংলাদেশের সমাজ যুগসংক্রান্তিকে অতিক্রম করে কোন নব যুগে প্রবেশ করেনি, কারণ কোন নতুন সমাজব্যবস্থা ও জীবনপদ্ধতি এখানে গড়ে ওঠেনি। মোটামুটিভাবে এই হল বাংলাদেশের আর্থ-সামাজিক-সাংস্কৃতিক প্রেক্ষাপট।
উক্ত বাস্তবতাকে স্মরণ রেখে বাংলাদেশের উপন্যাসে শ্রেণী-চেতনার পটভূমি তুলে ধরতে গিয়ে একটু পেছন ফিরে তাকালে দেখা যায়, উনিশ শতকের প্রথম দিকে ধনতান্ত্রিক অর্থনীতি, গণতান্ত্রিক রাজনীতি ও বুর্জোয়া সংস্কৃতির সামনে বিকাশের সম্ভাবনা ছিল প্রচুর, এবং ধনতান্ত্রিক সমাজব্যবস্থার ভূমিকা ছিল প্রগতিশীল। কিন্তু এই ব্যবস্থার চূড়ান্ত বিকাশের পর বিশ শতকের প্রথম দিকে এর অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক সংকটসমূহ প্রকটভাবে প্রকাশ পায় এবং প্রথম মহাযুদ্ধ সংঘটিত হয়।
তখন পৃথিবীর অনেক দেশের মতোই বাংলাদেশেও এই শ্রেণীর তরুণদের মনে নিদারুন সংশয় দেখা দেয়। অথচ ভারত জুড়ে মধ্যশ্রেণীর সাধারণ লোকদের এবং বিপুল কৃষক জনতার মনে স্বাধীনতার স্পৃহা তখন প্রবল, সেই সময়টাতে ভবিষ্যত স্বাধীন দেশকে নিয়ে নানা রকম স্বপ্ন ও কল্পনা জেগেছিল তাদের মনে। এই শ্রেণীর শ্রেষ্ঠতম প্রতিভা রবীন্দ্রনাথ তখন সাহিত্যকে আলোকিত করে রেখেছেন, এবং তাঁর সৃষ্টি ক্ষমতা তখনও সক্রিয়।
রাজনীতি, শিক্ষা এবং সংস্কৃতি প্রভৃতি ক্ষেত্রেও এই শ্রেণীর শ্রেষ্ঠ প্রতিভাবা তখন কর্মতৎপর। ধনতন্ত্রের আদি জন্মভূমি ও লালনভূমি ইউরোপে ধনতান্ত্রিক অর্থনীতির স্বাভাবিক বিকাশের সম্ভাবনা তখন নিঃশেষ হয়েছে আর বুর্জোয়া সংস্কৃতির সামনেও তখন হতাশার কালো মেঘ দেখা দিয়েছে। অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক সঙ্কটের আবর্তে ধনতান্ত্রিক সমাজের মানুষের জীবন তখন হতাশাগ্রস্ত, ক্ষত-বিক্ষত, পঙ্গু, বিকৃত ও জড়াগ্রস্ত। প্রথম মহাযুদ্ধের কিছু পূর্ব থেকেই ইউরোপের সাহিত্যে ও শিল্পকলায় এই অবক্ষয়ের লক্ষণ প্রকাশ পেতে থাকে।
প্রথম বিশ্বযুদ্ধ ও তৎকালীন ইউরোপীয় জীবন ভাবনার প্রভাব তৎকালীন বাঙালি মধ্যশ্রেণীর বিভিন্ন অংশে বিভিন্ন রকম হয়েছে। বাঙালি মধ্যশ্রেণীর শিক্ষিত তরুণদের একাংশ তখন সঙ্কটাপন্ন বিধ্বস্ত ইউরোপের অবক্ষয় ক্লিষ্ট ভাবধারা দ্বারা তীব্রভাবে প্রভাবিত হন। তাঁরা অনেকে ইউরোপীয় সাহিত্যের বুর্জোয়া যুগের এই অবক্ষয়ের পর্বটিকে মনে করেছিলেন ঐ সাহিত্যের একটা নতুন যুগ বলে।
বাংলা সাহিত্যেও তাঁরা এর অনুসরণে এই নতুন যুগ প্রবর্তনে প্রয়াসপর হন। ‘কল্লোল’, ‘কালি-কলম’, ‘প্রগতি’ প্রভৃতি পত্রিকা এই আগ্রহ নিয়েই এগিয়ে এসেছিল। রবীন্দ্রনাথ ও রবীন্দ্রানুসারীদের প্রতি তাদের মনোভাব ছিল বিরূপ। তাঁরা রবীন্দ্র সাহিত্যের শান্ত-সমাহিত কল্যাণকামী আদর্শকে অস্বীকার করে অগ্রসর হতে চেয়েছিলেন সৃষ্টির নতুন পথে।
শিল্প শিল্পের জন্যই এই তত্ত্ব এদেরকে উদ্বুদ্ধ করেছিল, আর তাঁরা বিশেষভাবে সচেষ্ট ও সক্রিয় ছিলেন জীবনের অবসাদ, হতাশা, যৌনতা, নিঃসঙ্গতা, অবক্ষয়, দারিদ্র্য, পরাজয়, বিকৃতি, ক্লেদ, গ্লানি ও অস্বাভাবিকতাকে সাহিত্যের মধ্য দিয়ে শিল্পায়িত করে প্রকাশ করতে। সকল প্রকার সামস্ত প্রভাব থেকেও এঁরা বাংলা সাহিত্যকে মুক্ত করতে চেষ্টা করেছিলেন।
বুর্জোয়া সভ্যতার সীমাবদ্ধতা সম্পর্কে পর্যাপ্ত সচেতনতার অভাবে তখন তাঁরা চেষ্টা করেছিলেন অবক্ষয়পূর্ব বুর্জোয়া দৃষ্টিভঙ্গি ও জীবনভাবনার ওপর সাহিত্যকে প্রতিষ্ঠিত করতে প্রকৃত পক্ষে রবীন্দ্রোত্তর বাংলার মধ্যশ্রেণীর সাহিত্য ও সংস্কৃতির এই ধরনেরই একটি স্বাভাবিক পরিণতির সম্ভাবনা ছিল। প্রথম মহাযুদ্ধ ও ইউরোপীয় সাহিত্যের প্রভাব এই প্রক্রিয়াকে দ্রুততর করে।
ইউরোপের ঐ সাহিত্য যে কোন নতুন ঐতিহাসিক যুগের বা নতুন সামাজিক শ্রেণীর সাহিত্য নয়, তা যে বুর্জোয়া শ্রেণীর সাহিত্য প্রতিনিধিদের দ্বারাই রচিত ও বুর্জোয়া যুগেরই অবক্ষয়-পর্বের সাহিত্য- এটা কল্লোল গোষ্ঠীর কর্মীরা উপলব্ধি করতে পারেননি।
এ জন্যই নিজেদের সাহিত্যকে নবযুগ সৃষ্টিকারী’ সাহিত্য বলে প্রচার করার এবং ‘কল্লোল-যুগ’ কথাটাকে চালু করার এত চেষ্টা ছিল তাঁদের। কল্লোল গোষ্ঠীর লেখকেরা পরবর্তীকালে সম্ভবত উপলব্ধি করতে পেরেছিলেন, আধুনিক যুগের বাংলা সাহিত্যের ক্রমবিকাশের ধারায় তাঁদের অবস্থান কোথায়, আর সেজন্যই হয়তো তাঁদের রবীন্দ্র-বিরোধিতা শেষ পর্যন্ত আর বজায় থাকেনি।
বর্তমান শতকের তিরিশোত্তর কালে মধ্যশ্রেণীর সাহিত্যকে যারা সমৃদ্ধ করেছেন, তাঁদের রচনাবলি পাঠ করলে দেখা যায়, তাঁদের অনেকেই রবীন্দ্রনাথের শান্ত-সমাহিত মানবতাবাদী চিন্তা-চেতনার ধারা অনুসরণ করেছেন। তবে এই কালের শক্তিমান লেখকদের অধিকাংশই হতাশা ও অবক্ষয়ের চেতনা হৃদয়ে অনুভব করেছেন, লালন করেছেন, সাহিত্যে রূপায়িত করেছেন।

বলা বাহুল্য, রবীন্দ্রনাথের যে জীবনপ্রেম, মর্ত- প্রীতি, মানবমহিমা, ব্যক্তি স্বাতন্ত্র্য, অতীন্দ্রিয় অনুভব, জাতীয় ভাব ও আন্তর্জাতিকতার সাক্ষাৎ মেলে তাকে লালন করার মতো পরিস্থিতি উত্তরকালে ক্রমেই ধ্বংস প্রাপ্ত হয়েছে। বাংলাদেশে পঞ্চাশ ও ষাটের দশকে যে কবি-সাহিত্যিকেরা আত্মপ্রকাশ করেন উদীয়মান হিসেবে, তাঁদের অধিকাংশের রচনাতেও এই হতাশা ও অবক্ষয়ের চেতনাই শিল্পরূপ লাভ করেছে।
বলা বাহুল্য, আমাদের আলোচিত মধ্যশ্রেণীর বর্তমান পর্যায়ের হতাশা ও অবক্ষয়ের অভিব্যক্তিও ঘটেছে তাদের রচনার মধ্য দিয়ে। সমাজের নিম্নস্তর থেকে, জনগণের মধ্য থেকে, শ্রমজীবী মানুষের মধ্য থেকে সাম্প্রতিক দশক গুলোতে জাতীয় ও আন্তর্জাতিক বিভিন্ন ঘটনার প্রভাবে নবজাগরণের যেসব স্বতঃস্ফূর্ত আন্দোলন আত্মপ্রকাশ করেছে, সেগুলো উক্ত লেখকদের মনে ক্ষণিক অনুভূতি ছাড়া আর কোন স্থায়ী প্রভাব ও নির্দ্বন্দ্ব আস্থার ভাব জাগাতে পারেনি।
১৯১৭ সালের রুশ বিপ্লবের পর থেকেই পৃথিবীব্যাপী দ্রুতগতিতে মার্কসীয় চিন্তাধারার প্রসার ঘটতে থাকে। মার্কসীয় চিন্তাধারা ও রুশ বিপ্লবের প্রেরণা তৎকালীন বাঙালি তরুণদের একাংশের মনেও সঞ্চারিত হয়। তার ফলে ১৯২০ অথবা ১৯২১ সনে গঠিত হয় ভারতের কমিউনিষ্ট পার্টি।
দেশের কৃষক জনতার মধ্যেও তখন থেকে জমিদার-বিরোধী মনোভাব ব্যাপকতর ও তীব্রতর হয়, এবং মধ্যশ্রেণীর কোনো কোনো দল কৃষকদের মধ্যে রাজনৈতিক সংগঠন গড়ে তুলতে এগিয়ে যায়। দেশের অনুসন্ধিৎসু ও ন্যায়কারী লেখকেরা বিপ্লবোত্তর রাশিয়ার নবনির্মাণ ও রুশ বিপ্লবের আদর্শ সম্পর্কে জানতে আগ্রহী হন।
এ অবস্থায় বাংলা সাহিত্যেও একটা নবচেতনার ও নতুন ধারার সূত্রপাত লক্ষ করা যায়। কাজী নজরুল ইসলাম, মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়, সুকান্ত ভট্টাচার্য, সুভাষ মুখোপাধ্যায়, গোপাল হালদার, অরবিন্দ পোদ্দার ও আরও অনেক কবি সাহিত্যিকের রচনার মধ্য দিয়ে মার্কসীয় এই নতুন ধারাটি বিকশিত হয়। কিন্তু চিন্তার ও সাহিত্যের এই নতুন ধারার অগ্রগতির সঙ্গে সঙ্গে শক্তিশালী, সংগঠিত ও ধারাবাহিক রাজনৈতিক, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক আন্দোলন গড়ে না ওঠার ফলে এ ধারা যথেষ্ট বিকাশ লাভ করতে পারেনি।
তথাপি, বাংলাদেশের উপন্যাসে শ্রেণী চেতনার পটভূমি তুলে ধরতে যেয়ে ঐতিহাসিক বস্তুবাদ তথা মার্কসীয় চেতনার অনুপ্রবেশ বাংলা সাহিত্য ও সংস্কৃতি ক্ষেত্রে কিভাবে ঘটে তার আলোচনা প্রাসঙ্গিক। এর কারণ শ্রেণী চেতনা ধারণাটি মূলত ঐতিহাসিক বস্তুবাদ তথা মার্কসীয় চেতনার সাথে ঘনিষ্টভাবে সম্পৃক্ত। এ কারণে বাংলাদেশের উপন্যাসে শ্রেণী চেতনার পটভূমি আলোচনা করতে গিয়ে প্রথমেই বাংলা সাহিত্যে মার্কসীয় চেতনার প্রভাব বা পটভূমি জেনে নেয়া দরকার।
বাংলা সাহিত্যে মার্কসীয় চেতনার প্রভাব বা পটভূমি
আধুনিক সমাজতন্ত্রের মূল প্রবক্তা জার্মান সমাজতাত্ত্বিক কার্ল মার্কস (১৮২০-১৮৮৩) তাঁর পাশে আর যার নাম স্মরণীয়, তিনি ফ্রেড্রিক এঙ্গেলস। তাঁরা জীবন উৎসর্গ করেছিলেন বিপ্লব সংগঠনে ও সমাজ পরিবর্তনের তাত্ত্বিক ভিত্তি নির্মাণে। কার্ল মার্কস প্রথম জীবনে কবিতা লিখেছেন, পরবর্তী জীবনে দর্শন রচনা করেছেন, মুক্তি আদর্শের অনুসন্ধান করেছেন। এঙ্গেলসও তাই। তবুও সাহিত্য সম্পর্কে তাঁরা কখনও কখনও মত প্রকাশ করেছেন। তাঁরা বলেছেন, নতুন তত্ত্ব উদ্ভাবন, নতুন সত্য নির্মাণ ও মুক্তির জন্য সাহিত্য। বুদ্ধির মুক্তি অন্বেষা ছিল তাদের মূল চালিকাশক্তি। মার্কসবাদীরা বিশ্বাস করেন-
- সমাজে প্রগতির জন্য, উন্নতির জন্য সাহিত্য।
- সংগ্রামী চেতনাকে জাগ্রত করার জন্য সাহিত্য।
মার্কস ও এঙ্গেলস যদিও এঁরা কেউই সাহিত্য ও শিল্পকলার তত্ত্ব সম্পর্কে পূর্ণাঙ্গ গ্রন্থ রচনা করেন নি. তবে বিবিধ সাহিত্যকর্ম সম্পর্কে অভিমত জানিয়ে তাঁরা লেখকদের কাছে প্রায়ই চিঠি লিখতেন। সে চিঠিগুলো একত্রে করলে অবশ্য একটি পূর্ণাঙ্গ গ্রন্থের অভাব মিটে যায়। সে ধরণের সংকলন বেশ কয়টি প্রকাশিতও হয়েছে। তা থেকে নন্দনতত্ত্বের প্রকৃতি, শিল্পকলার সঙ্গে প্রমের সম্পর্ক, শিল্পকর্মের শ্রেণী উৎস ও আপেক্ষিক স্বায়ত্তশাসন, সমাজ ও শিল্পকলার অসম বিকাশ, বাস্তবতার সঙ্গে শিল্প সাহিত্যের সম্পর্ক, ধনতন্ত্রের যুগে শিল্প সৃষ্টি ও বস্তুগত উপাদান সাহিত্যের উদ্দেশ্য প্রবণতা প্রভৃতি প্রশ্নে তাঁদের মতামত পুনর্গঠিত করা যেতে পারে।
এছাড়া মার্কসের অপরাপর রচনায় সাহিত্য ও শিল্পকলার মৌলিক দিক নিয়ে প্রচুর মতামত ছড়িয়ে আছে। মার্কস এঙ্গেলসের টুকরো টুকরো মন্তব্য অবলম্বন করে মার্কসবাদীরা গভীরতর অনুসন্ধান করেছেন। এভাবে পৃথিবীর দেশে দেশে মার্কসীয় সাহিত্য চিন্তার বিস্তার ও সমৃদ্ধি ঘটেছে। ৩
মার্কসীয় জীবনদৃষ্টি ও চেতনা অনুযায়ী জন্মের ইতিহাস থেকেই বোঝা যায় সাহিত্য শিল্পকলার নির্বাস লুকিয়ে আছে মানবিকতার মধ্যে। সেটা সৃষ্টি হয় মানুষের দ্বারা ও মানুষের জন্য এবং বেঁচে থাকে মানুষের মধ্যে ও মাধ্যমে। তারপর মানুষ সমাজ গড়ে। প্রথম যুগের সমাজ ছিল সদস্যদের সম অধিকারের, সমবন্টনের ও সম সুযোগভোগের বৈশিষ্ট্যে চিহ্নিত। কাল পরিক্রমায় সমাজের পরিধি বাড়লে সম্পর্ক জটিল রূপ নেয় ।
সমবন্টনের সুযোগ নষ্ট হয়ে অধিকাংশের উপর অল্পের আধিপত্য প্রতিষ্ঠিত হয়। স্বাধীন অবস্থায় জন্মগ্রহণ করার পর এই সমাজে প্রতিটি শিশুই আটকে পড়ে শোষণের সহস্রজালে। জীবনের পথে সে যতই এগোয়, বন্ধন ততই তীব্রতা পায়। বিরূপ বিশ্বের প্রভাবে তার ব্যক্তিত্ব হয় খণ্ডিত, প্রতিভা থাকে অবিকশিত, মানবীয় সৌরভ প্রকাশের পথ না পেয়ে গুমরে গুমরে কাঁদে। সে অবস্থা থেকে মানুষকে মুক্তি দেবার সাধনায় কার্ল মার্কস ও তার অনুসারীরা আবিষ্কার করেছেন কমিউনিস্ট সমাজের পথ।
তাঁদের বিশ্বাস মতে কমিউনিস্ট সমাজে, এমনকি প্রাক কমিউনিস্ট সমাজতান্ত্রিক সমাজেও শোষণের নাগপাশ লোপ পেয়ে মানুষ যথার্থ স্বাধীনতায় উপনীত হবে। মানব বিকাশের পথ হবে দ্বিধাহীন নির্দ্বন্দ্ব। পৃথিবীর অনেক প্রাচীন ধর্মেও ভগবানের কৃপায় শেষ পর্যন্ত স্বর্গরাজ্য স্থাপিত হবার ভবিষ্যৎবাণী আছে। সেটা সম্ভব হবে ভগবানের কৃপায়, কিন্তু কমিউনিস্টরা তা করতে চায় সংঘবদ্ধ মানুষের বাহুবলে।
সে প্রয়াসে তথা প্রচলিত সমাজের সংকট উত্তরণে প্রতিদিনের সংগ্রামে বিপ্লবীদের নিত্যসঙ্গী হবে সাহিত্য ও শিল্পকলা। কারণ, সৎসাহিত্য মানুষকে জানায় তার অন্তহীন সম্ভাবনার কথা, তার কাছে বার্তা পৌঁছে দেয় বৃহৎ জীবনের ।
দিনানুদৈনিকের গ্লানি, দুর্দশা ও প্রবলের উৎপীড়ন যে চিরস্থায়ী নয়, উদার আনন্দময় জগত রচনা যে মানুষের দ্বারা সম্ভব, সে সুসমাচার পাওয়া যায় মহৎ সাহিত্যে। মার্কস এঙ্গেলস-লেনিন ব্যতীত অন্য বিপ্লবীরাও সে কারণে দ্বারস্থ হতেন সাহিত্য জগতের কাছে।

সমাজতান্ত্রিক সমাজ পুনর্গঠনকালে স্ট্যালিন স্থাপন করেছিলেন সাহিত্য শিল্পকলার জন্য পৃথক মন্ত্রাণালয়, পৃথক সংগঠন। —– আসলে সমাজতন্ত্রীরা শিল্প-সাহিত্যকে সমাজ জীবনের জন্য কতটা গুরুত্বপূর্ণ মনে করেন, এ থেকে তা বুঝা যায়। তারা বিশ্বাস করতেন শোষণমুক্ত নবীন পৃথিবী যখন বিকশিত হবে, তখনও বই হবে মানুষের নিত্য সঙ্গী। সে সময়ে নাগরিকেরা সকালে যাবে মাছ শিকারে দুপুরে যাবে কর্মস্থলে, কর্মক্লান্ত বিকালে সপরিবারে গোল হয়ে বসে পড়বে প্লেটোর বই”- মাকর্স ভবিষ্যতের ছবি এঁকেছিলেন এভাবে।”
মার্কসবাদীদের কাছে সাহিত্য রচনা তাই উদ্দেশ্য নিরপেক্ষ নয়। শিল্পের জন্য শিল্প’ তত্ত্বকে তারা বর্জন করেন। মানবিকতাই শিল্পের আদি উৎস বলে তারা মনে করেন। মার্কসের অনুসারীরা শিল্পীর কাছ থেকে আশা করেন দৃঢ় ভূমিকার। অনুভূতিপ্রবণ ব্যক্তি বিধায় তিনি মানুষের দুঃখে বিচলিত হবেন। তিনি মানুষের দুঃখমোচনের সংগ্রামে এগিয়ে যাবেন। সমাজের দ্বান্দ্বিকতা আগ্রহের সাথে নিরীক্ষণ করে তিনি অবস্থান নেবেন সমাজের বৃহৎ অংশের অনুকূলে।
যে শ্রমজীবী জনতা যুগযুগ ধরে সভ্যতাকে গড়ে তুলেছে, অথচ সমাজে যোগ্য আসন পায়নি, তাদের দুঃখ একজন সাহিত্যিকের মনে করুণা জাগাবে। তাঁর সৃষ্টিতে তারা কথা বলে উঠবে। তিনি নিবেদিত হবেন শ্রমজীবী মানুষের জন্য সুন্দর পৃথিবী গড়ার প্রয়াসে। হয়ত তাকে সবসময় কথা বলতে হবে না, কিন্তু সমাজের নিরন্তর দ্বন্দ্বে তিনি পরোক্ষ বা প্রত্যক্ষভাবে ইতিহাসের পক্ষে থাকবেন।
সমাজবিকাশে এমন সময় আসে যখন শিল্পীকে সৈনিক হতে হয়। সে অবস্থা রাশিয়ায় এসেছিল, চীনে এসেছিল, আমাদের দেশেও এসেছিল ১৯৭১ সালে। সে ক্রান্তি কালে সাহিত্যিককে গণমানুষের কাতারে সামিল হতেই হবে। এটিই লেনিনের বিখ্যাত ‘পার্টিজানশিপ তত্ত্ব’।
সাহিত্যের সঙ্গে সমাজের সম্পর্ক নির্ধারণ করা মার্কসীয় সমালোচনা শাস্ত্রের গুরুত্বপূর্ণ কাজ। সাহিত্য ও শিল্পকলার নতুন ধারা ও আঙ্গিকের উদ্ভব ঘটে সমাজকাঠামোর পরিবর্তনের ফলে। সমাজ বিন্যস্ত দু’ভাগে উপরিকাঠামো ও অবকাঠামো। উৎপাদনের উপকরণ ও উৎপাদন সম্পর্ক দুয়ের সমন্বয়ে গঠিত হয় কাঠামোর স্তর। উৎপাদন উপকরণ বলতে বুঝায় উৎপাদন যন্ত্র, শ্রমজীবী মানুষ ও কাঁচামাল।
আর উৎপাদন যন্ত্রের মালিকানা, উৎপাদিত পণ্যের বন্টনের পদ্ধতি ও সমাজের বিভিন্ন শ্রেণীর স্থান ও সম্পর্ক সেসবের যৌগিক ফলই উৎপাদন সম্পর্ক। অবকাঠামো নির্মাণ করে উপরিকাঠামোকে। রাজনীতি, ধর্ম, দর্শন, শিক্ষা, বিজ্ঞান, সাহিত্য, শিল্পকলা, সংস্কৃতি প্রভৃতি অন্তর্গত উপরিকাঠামোর।
সাহিত্যের সাথে সবগুলোর সম্পর্ক আছে। যেমন আছে অবকাঠামোর সঙ্গে। মার্কসবাদীদের মতে- অর্থনীতি ও উৎপাদন প্রক্রিয়ার ভিত্তির উপর দাঁড়িয়ে থাকা উপরিকাঠামোর সৃষ্টিশীল প্রয়াস হল সংস্কৃতি। কাঠামো বদলালে উপরিকাঠামো বদলায়, তার সাথে পরিবর্তন পরিলক্ষিত হয় সাহিত্যের আধার ও আধেয়র। সামন্ত সমাজের সঙ্গে সরাসরি জড়িয়ে আছে রোমন্সমূলক কাব্য। প্রাচীনতর সমাজে শতাব্দীর সাধনায় রূপলাভ করেছে রামায়ণ, মহাভারত, ইলিয়াড়, ওডেসী। সামন্ত সমাজ ধনতান্ত্রিক সমাজে বিবর্তিত হওয়ার সাথে নিয়ে আসে গদ্য, গীতিকবিতা ও উপন্যাস।
সমাজের সাথে সাহিত্যের সম্পর্ক ওতপ্রোত বলে আধুনিক বুর্জোয়া যুগের দিকে যখন বাঙালি সমাজ এগিয়ে যাচ্ছিল তখনও হেম-নবীন- কায়কোবাদ প্রমুখ পুরোনো ধাচের মহাকাব্যের আঙ্গিক নিয়ে ব্যাপৃত ছিলেন। প্রাচীন গ্রিক সাহিত্য থেকে নজির টেনে তা বোঝাতে গিয়ে কার্ল মার্কস চিহ্নিত করেছেন তার ‘অসম বিকাশের তত্ত্ব।’
ধনতন্ত্রের সঙ্গে শিল্প সাহিত্যের বিরোধের কথা মার্কস বলেছিলেন। কারণ ধনতন্ত্রের মূল কথা মুনাফা সঞ্চয়। যে দ্রব্যের যত কদর, ধনতন্ত্রীদের নিকট সে জিনিস তত মূল্যবান। শেষ পর্যন্ত মানবীয় সম্পর্কও হেরে যায় অর্থের কাছে। জড়জগৎ ও জীবজগতকে মানবিকীকরণের আকাঙ্ক্ষা ক্রিয়াশীল ছিল শিল্পকলার উদ্ভবে। শিল্পের প্রেরণা চারপাশের জগতে মানবীয়তার প্রসার ঘটানো- অপরপক্ষে ধনতন্ত্রের আকাঙ্ক্ষা মানুষকে পণ্যে রূপান্তরিত করা। সে জন্যে পুঁজিবাদ শিল্পের বিকাশকে বাধা দেয়, শিল্পের সাথে পুঁজিবাদের বিরোধ এখানেই।
বাংলা সাহিত্যে মার্কসীয় ভাবনার প্রবেশ ঘটে রুশ বিপ্লবের (১৯১৭) পরে পরেই। তৃতীয় দশকের গল্প- কবিতা-উপন্যাস-প্রবন্ধে বিপ্লবের কথা, সাধারণ মানুষের ছবি, সাম্রাজ্যবাদ বিরোধিতা প্রভৃতি স্থান পায়। ম্যাক্সিম গোর্কির রচনার প্রতি আগ্রহ সৃষ্টি হয়।
বস্তুত তিরিশের দশকের শুরুতে ডঃ ভূপেন্দ্রনাথ দত্ত (১৮৮০-১৯৬১) শিল্প সাহিত্যের বিচারে মার্কসবাদের প্রয়োগ শুরু করেন। তাঁর প্রবন্ধাবলি সংকলিত হয়েছে সাহিত্যে প্রগতি’ (১৯৪৫) নামক গ্রন্থে। সেকালে ধূর্জটি প্রসাদ মুখোপাধ্যায়ও (১৮৯৪-১৯৬১) এ ক্ষেত্রে ছিলেন যথেষ্ট সক্রিয়। আরো ক’জন মার্কসবাদী বুদ্ধিজীবী সম্মিলিত হয়েছিলেন ‘পরিচয়’ পত্রিকাকে কেন্দ্র করে। কবি সুধীন্দ্রনাথ দত্ত সম্পাদিত এই পত্রিকাকে কেন্দ্র করেই সর্বপ্রথম মার্কসীয় যুক্তিবিজ্ঞানে বিশ্বাসী কয়েকজন বুদ্ধিজীবীর আবির্ভাব ঘটে।
মূলত তৎকালীন সময়ে প্রকাশিত সংহতি, আত্মশক্তি, বিভাগী, কল্লোল (১৯২৩), কালিকলম (১৯২৬), প্রগতি (১৯২৭), গণবাণী, নবশক্তি, বঙ্গবাণী প্রভৃতি পত্র-পত্রিকায় প্রকাশিত শৈলজানন্দ মুখোপাধ্যায়, মনীন্দ্রলাল বসু, নৃপেন্দ্রকৃষ্ণ চট্টোপাধ্যায়, নারায়ণ ভট্টাচার্য, জগদীশ গুপ্ত, প্রেমেন্দ্র মিত্র প্রমুখ নতুন যুগের লেখক সৃজনশীল রচনায় তখন তুলে ধরেছিলেন সমাজের নিচুতলার জীবন যন্ত্রণা এবং বিপ্লবের সদর্থক ভূমিকা। আর এক্ষেত্রে ‘কল্লোল’ (১৯২৩) পত্রিকার নাম বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য।
দীনেশরঞ্জন দাশের সম্পাদনায় কলকাতা থেকে এই মাসিক সাহিত্য পত্রিকাটি অতি আধুনিক লেখকগোষ্ঠীর মুখপত্র হিসেবে ১৯২৩ সালে প্রথম প্রকাশিত হয়। কল্লোল প্রায় সাত বছর চলেছিল, কিন্তু এই অল্প সময়েই পত্রিকাটি একটি প্রগতিশীল লেখকগোষ্ঠীর সমাবেশ ঘটাতে পেরেছিল। তৎকালীন তরুণ লেখকগণ রবীন্দ্র বিরোধিতার নাম করে এখানে সমবেত হয়েছিলেন। অচিন্ত্যকুমার সেনগুপ্ত, মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়, শৈলজানন্দ মুখোপাধ্যায়, প্রেমেন্দ্র মিত্র, বুদ্ধদেব বসু, কাজী নজরুল ইসলাম, মোহিতলাল মজুমদার প্রমুখ অনেকেই কল্লোলের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট হয়েছিলেন।
ডঃ অসিতকুমার বন্দ্যোপাধ্যায় মন্তব্য করেছেন, “কল্লোল পত্রিকায় একদল নব্য তরুণ সাহিত্যিক ও কবি নতুন সাহিত্য সৃষ্টির তাগিদ অনুভব করলেন যুদ্ধোত্তর ইউরোপের, বিশেষত রুশ ও ফরাসি সাহিত্য থেকে। তাঁরা এমন সমস্ত সংকীর্ণ গলি পথে যাতায়াত করতে লাগলেন যে, যাঁরা সনাতনী পন্থায় অভ্যস্ত ছিলেন, তাঁরা এতে প্রমাদ গুনলেন।” এই লেখকেরা তৎকালীন ইউরোপীয় আদর্শে বাস্তব জীবন, মনস্তত্ত্বের সূক্ষ্মাতিসূক্ষ্ম বিশ্লেষণ এবং রাজনৈতিক অর্থনৈতিক বিষয়কে তাঁদের রচনার উপজীব্য করলেন।
কল্লোলের আদর্শেই সে সময়ে কলকাতায় ‘কালিকলম’ (১৯২৬) এবং ঢাকা থেকে ‘প্রগতি’ (১৯২৭) সাহিত্য পত্রিকা প্রকাশিত হয়েছিল। পরবর্তী সময়ে অবিভক্ত বাংলায় ১৯৩৬ সালের লক্ষ্মৌ কংগ্রেসের প্রাক্কালেই মুন্সী প্রেমচন্দর সভাপতিত্বে গঠিত হয়েছিল নিখিল ভারত প্রগতি লেখক সংঘ’। এটি প্রতিষ্ঠার ছিল মার্কসবাদী বুদ্ধিজীবী ও কম্যুনিস্ট পার্টির সক্রিয় উদ্যোগ।
ইউরোপে প্রত্যাগত সাজ্জাদ জহির, হীরেন্দ্রনাথ মুখোপাধ্যায় প্রমুখ। মার্কসবাদী বুদ্ধিজীবী ও লেখকদের সচেতন প্রচেষ্টা এতে ক্রিয়াশীল ছিল। এরা অনুপ্রাণিত হয়েছিলেন রোঁলা, বারবুস, গোর্কি, ফস্টার, স্ট্যার্ট প্রমুখ মনীষীদের ফ্যাশিবাদ বিরোধী সংগ্রামের আহবানে।
১৯৩৬ সালের ১৮ জুন গোর্কির মৃত্যু সংবাদ ঘোষিত হলে নিখিল ভারত প্রগতি লেখক সংঘের সম্পাদক সাজ্জাদ জহির ‘গোর্কি দিবস’ পালনের আহ্বান জানানোর পূর্বে, বাংলার প্রগতি লেখক সংঘের সাংগঠনিক কমিটি গোর্কির মৃত্যুতে ১৯৩৬, ১১ জুলাই এলবার্ট কমিটির রুমে একটি শোকসভার আয়োজন করে। গোর্কির এই শোকসভা থেকেই আনুষ্ঠানিকভাবে ডঃ নরেশচন্দ্র সেনগুপ্তকে সভাপতি ও অধ্যাপক সুরেন্দ্র নাথ গোস্বামীকে সম্পাদক করে ‘বঙ্গীয় প্রগতি লেখক সংঘ’ গঠনের কথা ঘোষণা করা হয়।

‘প্রগতি লেখক সংঘ’ প্রতিষ্ঠিত হয় ১৯৩৬ সালে। পর বছর বেরোয় ‘প্রগতি’ নামক সংকলন। এতে ছিল চারটি প্রবন্ধ ধূর্জটি প্রসাদের ‘প্রগতি’, ভূপেন্দ্রনাথ দত্তের ‘সাহিত্য প্রগতি’, বিজয়লাল চট্টোপাধ্যায়ের (১৮৯৮-১৯৭৪) প্রগতি সাহিত্যের রূপ এবং সুরেন্দ্র গোস্বামীর (মৃত্যু ১৯৪৫) ‘সাহিত্যে বাস্তব কল্পনা’। ১৯৩৯-৪০ সালে প্রকাশিত হয় বিনয় ঘোষের (১৯১৭-৮০) শিল্প সংস্কৃতি ও সমাজ’ এবং ‘নতুন সাহিত্য ও সমালোচনা’। তাছাড়া ১৯৩৯ সালে মাসিক ‘অগ্রণী’ ও ১৯৪১ সালে সাপ্তাহিক ‘অরণি’ প্রকাশিত হয়ে এই ধারাকে পুষ্ট করে।
প্রকৃতপক্ষে, বাংলা ভাষায় গোর্কির ‘মা’ (১৯৩৩) উপন্যাসটি নৃপেন্দ্রকৃষ্ণ চট্টোপাধ্যায় কর্তৃক অনূদিত হবার পর ১৯৩৫ সালে ধূর্জটি প্রসাদ মুখোপাধ্যায় লিখলেন ‘অন্তঃশীলা’ গ্রন্থ, ১৯৩৭-৩৮ সালের মধ্যে প্রকাশিত হল মনোরঞ্জন হাজারীর কৃষক সংগ্রামকে ভিত্তি করে রচিত ‘নোঙরহীন নৌকা’ এবং ১৯৩৯ সালে যখন প্রকাশ পেল সদ্য কারামুক্ত গোপাল হালদারের সন্ত্রাসবাদ থেকে মার্কসবাদে উত্তরণের কাহিনী ভিত্তিক উপন্যাস ‘একদা। সবকিছু মিলিয়েই বলা যায়, বাংলা সাহিত্যে মার্কসীয় চিন্তা, চৈতন্য আর তখন দুর্লক্ষ্য নয়, যুদ্ধ, দামামার সঙ্গে তাঁর হাঁটি হাঁটি পা-পা অবস্থারও অবসান ঘটতে চলেছে।
এরপর চল্লিশের দশক। এই দশকে বাংলাদেশে কমিউনিস্ট আন্দোলন এবং মার্কসবাদী মতাদর্শ প্রচার ও প্রসারের দশকরূপে নিশ্চিতভাবে চিহ্নত করা যায়। প্রগতি লেখক সংঘের আন্দোলনে ১৯৩৯-৪০ সালের মধ্যে ভাটার টান লক্ষ্য করা গেলেও ঢাকা, কুমিল্লা, শ্রীহট্ট, যশোহর, ফরিদপুর, প্রভৃতি এই আন্দোলন কিছু তরুণ বুদ্ধিজীবীকে প্রগতিশীল সাহিত্য তথা সংস্কৃতি চর্চায় উদ্বুদ্ধ করতে সক্ষম হয়েছিল। তাঁরা সাময়িক পত্রিকা প্রকাশের মাধ্যমে সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড এবং মার্কসীয় চিন্তাচর্চায় বেশ কিছুকাল তৎপর ছিলেন।
এই চিন্তা চর্চার ফল স্বরূপ ১৯৩৯-৪০ সালে প্রকাশিত হয় বিনয় ঘোষ এর শিল্প, সংস্কৃতি ও সমাজ’ এবং ‘নতুন সাহিত্য ও সমালোচনা’ নামে দু’খানি গ্রন্থ। নতুন মার্কসীয় চেতনার আতিশয্যের ফলে বিনয় ঘোষ এর সমালোচনায় বিদ্ধ হন অতুলচন্দ্র গুপ্ত, বুদ্ধদেব বসু, অমিয় চক্রবর্তী, বিষ্ণু দে ও সমর সেন। আর রবীন্দ্রনাথকে তিনি চিত্রিত করলেন ভাববাদী বুর্জোয়া মতাদর্শের প্রবক্তা এবং আন্তর্জাতিক কল্পনাবিলাসী সৌখিন সাহিত্যের স্রষ্টারূপে।
কারণ রবীন্দ্রনাথের কাছে বুর্জোয়া শ্রেণী সমাজের শ্রেণী শৃংখল ছিঁড়বার আবশ্যকতা ছিল না। তাঁর হাতে ঐ সমাজের ভিতরই ব্যক্তি উঠল বাস্তবের সীমাবদ্ধতার উর্ধ্বে, বাস্তবকে বাস্তবক্ষেত্রে যেন মেনে নিল; মনোজগতের রোমন্থনে ইচ্ছাশক্তি দ্বারা বাস্তবের সীমার বন্ধনকে জয় করে। এই হল ধনিক সভ্যতার ব্যক্তিত্ববাদের প্রচার। ধনিক সভ্যতার অন্তর্বিরোধ গোপন করা যায় না, তার শ্রেণী অনুশাসনের কাছে মানবত্বকে হার মানতেই হয়। তাকে ন্যায্য ও স্বাভাবিক বলে গ্রহণ করতেই হবে এর জন্য ধনিক সভ্যতাকে আঘাত করো না এ যেন এমনি ধরণের কিছু।
যাই হোক, চল্লিশের দশকের শুরুতে বাংলার প্রগতি সংস্কৃতি শিবিরের অভ্যন্তরে যখন জাতীয় সংস্কৃতির অতীত আর বর্তমান নিয়ে কিছুটা বিতর্ক শুরু হতে চলেছে তখনি দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের তাণ্ডব শুরু হয়ে গেছে। কমিউনিষ্ট পার্টি এই যুদ্ধকে সম্রাজ্যবাদী যুদ্ধ বলে ঘোষণা করে এর বিরুদ্ধে ‘না এক পাই, না এক ভাই’ মনোভাব নিয়ে অগ্রসর হল প্রচার অভিযানে।
স্বভাবতই আতঙ্কিত বৃটিশ সরকারের দমননীতি নেমে আসে কমিউনিস্ট পার্টির উপর। ব্রিটিশ সরকারের দমননীতি এড়াবার জন্য অনেক নেতা ও কর্মী বাধ্য হলেন আত্মগোপনের আশ্রয় নিতে। এর ফলে বাংলার কমিউনিস্ট পার্টির নির্দেশে পরিচালিত প্রথম ‘সাংস্কৃতিক পত্রিকা ‘অগ্রণীর প্রকাশ বন্ধ হয়ে যায়। প্রগতি লেখক সংঘের কাজকর্মও হয় স্তব্ধ।
সংস্কৃতি ক্ষেত্রের এই আপাত শূন্যতাকে পূর্ণ করতে সেদিন অগ্রসর হয়েছিল ছাত্র ফেডারেশনের নেতৃত্বে সংস্কৃতি মনস্ক একদল ছাত্রকর্মী। ১৯৪০ সালের মাঝামাঝি এদের সহযোগিতায় গড়ে ওঠে ‘Youth Cultural Institute’ (YCL) নামে একটি ভিন্ন সংগঠন। এই YCL সেদিন আরম্ভ করেছিল নিয়মিত সংস্কৃতি বিষয়ক আলোচনার আসর, বিতর্কসভা, অভিনয়, পোস্টার প্রদর্শনী এবং গান।
পরবর্তীকালে গণনাট্য সংঘ বাংলার সস্কৃতিতে প্রগতিমুখী ভাবধারা সঞ্চারে যে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে সম্ভবত YCL ছিল তার সূতিকাগার। এসব ঘটনা মূলত কেন্দ্রীভূত ছিল সংস্কৃতির প্রাণকেন্দ্র কলকাতায়। তবে ঢাকায় মার্কসবাদী তরুণ বুদ্ধিজীবীদের উদ্যোগে ঢাকার নতুন সাহিত্য ভবন থেকে ১৯৪০ সালে প্রকাশিত হয় ‘ক্রান্তি’ নামক প্রগতিশীল সাহিত্য সংকলন।
ঐ সংকলনে ঢাকা জেলা লেখক সংঘের অন্যতম নেতা রনেশ দাশগুপ্ত ‘নতুন দৃষ্টিতে উপন্যাসের’ পর্যালোচনা করলেন, নৃপেনচন্দ্র গোস্বামী লিখলেন ‘সাহিত্যে সৌন্দর্যবাদ’। নৃপেন বাবু তার প্রবন্ধে অসংকোচে জানালেন আমরা এমন সাহিত্য চাই না যা আমাদের হাতুড়ি পিটিয়ে মানুষ করতে পারে। আমরা বাংলা সাহিত্যে একজন গোর্কির অভ্যুদয় দেখতে চাই। ” সোভিয়েত ইউনিয়ন আক্রান্ত হওয়ায় ভারতের কমিউনিস্ট পার্টির বদলের কথা পূর্বে উল্লেখ করা হয়েছে।
প্রকৃতপক্ষে, পেটি বুজোঁয়া বুদ্ধিজীবীদের মধ্যে সর্বদেশ সর্বকালে যেসব ঝোঁক ও প্রবণতা লক্ষ করা যায়, আমাদের দেশেও তার ব্যতিক্রম ঘটেনি। এ দেশের অসম বিকাশের ফলে গ্রামীণ সভ্যতা সংস্কৃতি আর নাগরিক সভ্যতা সংস্কৃতির মধ্যে আশৈশব লালিত-পালিত ব্যক্তি মানসিকতার যে দ্বন্দ্ব থাকা স্বাভাবিক সে দ্বন্দ্ব থেকে এসব বুদ্ধিজীবীরা সম্ভবত কেউ মুক্ত ছিলেন না। এতদসত্ত্বেও এরাই ছিলেন সাহিত্য তথা সংস্কৃতির ক্ষেত্রে মার্কসবাদী ধ্যান-ধারণার প্রয়াসে নিবেদিত প্রাণ ব্যক্তিত্ব।
১৯৪২ সালের ২৮ মার্চ রামানন্দ চট্টোপাধ্যায়ের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত হয় ফ্যাশিস্ট বিরোধী লেখক সম্মেলন এবং এই সম্মেলনের মঞ্চেই গঠিত হয় ‘ফ্যাশিষ্ট বিরোধী লেখক ও শিল্পী সংঘ সংঘের সাংগঠনিক সভাপতি রূপে নির্বাচিত হন অতুলচন্দ্র গুপ্ত এবং সম্পাদকের দ্বায়িত্বভার গ্রহণ করেন বিষ্ণু দে ও সুভাষ মুখোপাধ্যায়। স্থির হয় ‘ফ্যাশিষ্ট বিরোধী লেখক ও শিল্পী সংঘ’ অতঃপর ‘নিখিল ভারত প্রগতি লেখক সংঘের’ শাখা হিসেবে কাজ করবে।
১৯৪৩ সালের মে মাসে বোম্বাই সম্মেলনে গঠিত হয় ভারতীয় গণনাট্য সংঘ। এরপর দ্বিতীয় মহাযুদ্ধের অবসান পর্যন্ত লেখক সংঘ ও গণনাট্য সংঘ পাশাপাশি গড়ে তোলে ব্যাপক ভিত্তিক এক সাংস্কৃতিক আন্দোলন। বাংলার সর্বস্তরের প্রবীণ ও নবীন শিল্পী সাহিত্যিক ও বুদ্ধিজীবীরা এসে মিলিত হন এ দুটি সংঘের মধ্যে। দ্বিতীয় মহাযুদ্ধের অবসানে, ১৯৪৫ সালের মার্চ মাসে এক সম্মেলনের মাধ্যমে ‘ফ্যাশিষ্ট বিরোধী লেখক ও শিল্পী সংঘ’ নাম বদল করে আবার পরিণত হয় ‘প্রগতি লেখক সংঘে’ পঞ্চাশের দশক পর্যন্ত এই ধারা অব্যাহত ছিল।
তারপর চলছে এক জীবনত অবস্থা। বাংলার সংস্কৃতিতে মার্কসবাদী চেতনার সূচনা ও সংগঠিত আন্দোলনের ইতিহাস এ রকমই। এভাবে বাংলা সাহিত্যে মার্কসবাদী চেতনা প্রয়োগের প্রথম পর্বের অবসান ঘটে। এই পর্যায়ের লেখকেরা কমুনিস্ট পার্টির আওতায় থেকে মার্কসবাদের চর্চা করতেন। ফলে তাদের মধ্যে সৃষ্টিশীলতার নিদর্শন কম। তারা মূলত নির্ভর করতেন। সাহিত্য সমাজের দর্পণ শীর্ষক ধারণাটির ওপর।
যাই হোক সীমাবদ্ধতা সত্ত্বেও, এঁরাই সুদৃঢ় করলেন সাহিত্যের সমাজমুখী ধারাকে এবং প্রতিক্রিয়াশীলতাকে পরাভূত করার সংগ্রামকে। সেকালে কম্যুনিস্ট পার্টির সহযোগিতায় অনেক সাংস্কৃতিক সংগঠন গড়ে ওঠে, নাট্যান্দোলন জোরদার হয়। সে পথেও মার্কসবাদী চিন্তা দ্রুত জনপ্রিয় হয়।
“১৯৪৮ সালে বেরোয় কমুনিস্ট পার্টির তাত্ত্বিক পত্রিকা ‘মার্কসবাদী’। ১৯৫০ সালের অক্টোবর পর্যন্ত এর আটটি সংকলন প্রকাশিত হয়েছিল এবং তাতে ছিল শিল্প-সাহিত্য বিষয়ক পাঁচটি প্রবন্ধ প্রবন্ধগুলো ছিল বিতর্কমূলক- বিষয় ছিল বাংলা সাহিত্যে ঐতিহ্যবিচার, প্রগতিশীল ধারা নির্ণয় সম্পর্কে। বিতর্কের সমাপ্তি টানেন কম্যুনিস্ট পার্টির পলিটব্যুরোর সদস্য ও পত্রিকা সম্পাদক ভবানী সেন (১৯০৯-১৯৭২)।

‘বাংলা প্রগতি সাহিত্যের আত্মসমালোচনা’ শীর্ষক উক্ত প্রবন্ধটিতে তিনি রামমোহন- বঙ্কিম-রবীন্দ্রনাথের ধারাকে বাদ দিয়ে প্রগতির ধারা বলে স্বীকার করলেন, সিপাহী বিপ্লব ও নীলবিদ্রোহ প্রভাবিত সাহিত্য ধারাকে। রবীন্দ্র সাহিত্য সম্পর্কে তাঁর মূল্যায়ন ছিল এরূপ ‘রবীন্দ্রদর্শন ভারতীয় শাসকশ্রেণীর দর্শন। রবীন্দ্রদর্শনকে আক্রমণ করতে হবে শাসক শ্রেণীকে পরাস্ত করার জন্য। রবীন্দ্র সাহিত্যের সঙ্গে মার্কসবাদের বিরোধ এত প্রচণ্ড যে, প্রগতির শিবিরে তাঁর স্থান হতে পারে না।
এধরণের হটকারী সিদ্ধান্ত নেবার কারণ ছিল রাশিয়ার স্ট্যালিন ও ঝদানভের ভ্রান্ত সাংস্কৃতিক নীতির যান্ত্রিক অনুসরণ । যান্ত্ৰিক অনুসরণের ফল ভালো হয় না, ফলে প্রতিভাবান বুদ্ধিজীবীরাও মার্কসীয় তত্ত্বকে সৃষ্টিশীলভাবে প্রয়োগে ব্যর্থ হয়েছেন। তবে সৃষ্টিশীল রচনায় সাম্যবাদী চিন্তার ভালো প্রভাব পড়েছে। মানিক-সুভাষ-সুকান্ত ধারাটির উদ্ভব হয় সেকালে। অনেক ভালো নাটক রচিত হয়েছে গণনাট্য সংঘের তত্ত্বাবধানে।
সাহিত্য রীতির কৌলীন্য ঘুচে গিয়ে গণমুখিতার ছোঁয়া লেগেছে। নিম্নবিত্ত ও বিত্তহীন মানুষের ছবি, সাম্রাজ্যবাদ- বিরোধিতার ধারণা সাহিত্যে এসেছে। সমাজ পরিবর্তনে সাহিত্যের ভূমিকা সামাজিক স্বীকৃতি লাভ করে এবং সাহিত্যকে সমাজের পটভূমিতে রেখে মূল্যায়ন করার রীতি জনপ্রিয় হয়।” কিন্তু এতসব সত্ত্বেও পঞ্চাশ ও ষাটের দশকে পূর্ব বাংলায় এ ধারার বিকাশ তেমন উল্লেখযোগ্য নয়।
এবং বর্তমানে বিগত শতাব্দীর শেষ পাদে ১৯৮০-এর দশকে এসে রাশিয়ান প্রজাতন্ত্র ভেঙ্গে যাবার পর এ ধারার গতি তুলনামূলক ভাবে স্তিমিত হয়েছে। রাজনীতি, সংস্কৃতি, সাহিত্য সকল ক্ষেত্রে এই ধারাকে অগ্রসর হতে হচ্ছে প্রবল বিরুদ্ধ পরিবেশের মধ্য দিয়ে চরম প্রতিযোগিতার মোকাবেলা করে। ১৯৪৭-৭১ কালপর্বে বাংলা উপন্যাসে শ্রেণী চেতনার পটভূমির পরিচয়গত ইতিহাস মোটামুটি এরকমই ।