Site icon Literature Gurukul [ সাহিত্য গুরুকুল ] GOLN

শ্রেণী ও শ্রেণী চেতনা

শ্রেণী ও শ্রেণী চেতনা

আজকে আমাদের আলোচনার বিষয়ঃ শ্রেণী ও শ্রেণী চেতনা। যা বাংলাদেশের উপন্যাসে শ্রেণী চেতনার স্বরূপ এর অন্তর্গত।

 

 

শ্রেণী ও শ্রেণী চেতনা

আধুনিক যুগের বাংলা উপন্যাসে প্রতিফলিত হয়েছে এ কালের বাঙালি সমাজের সামাজিক শ্রেণীসমূহের পারস্পরিক বিরোধ ও সংগ্রামের চিত্র। আমার গবেষণা শিরোনামের শ্রেণী চেতনার স্বরূপ বিষয়টি শ্রেণী বিভক্ত সমাজের দ্বান্দ্বিক পরিচয়কে নির্দেশ করে। শ্রেণী চেতনা ধারণাটি তাই ঐতিহাসিক বস্তুবাদ বিষয়ের সাথে সম্পৃক্ত। একটি দেশের আর্থ-সামাজিক ব্যবস্থায় ধনিক ও শ্রমজীবী শ্রেণী, শোষক ও শাসিতের দ্বান্দ্বিক অবস্থানের সূত্র ধরেই শ্রেণী চেতনা ধারণাটির উত্থান। তবে আলোচনার সুবিধার্থে শ্রেণী চেতনা প্রসঙ্গ বিশ্লেষণের পূর্বে প্রথমেই জেনে নেয়া দরকার ‘শ্রেণী’র স্বরূপ ও এর তাত্ত্বিক ধারণা।

‘শ্রেণী’ কাথাটি unity বা একক নির্দেশক একটি শব্দ। পৃথিবীর সব সমাজেই শ্রেণী বা স্তর বিন্যাস রয়েছে। সমাজে ‘শ্রেণী’ বলতে বুঝায় একই মূল্যবোধ ও অবস্থানের উপর নির্ভরশীল একটি জনগোষ্ঠী যা অন্যান্য জনগোষ্ঠী হতে আলাদা।
প্রাচীন ও আধুনিককালে সামাজিক শ্ৰেণীসমূহ প্রধানত দু’টি ভিত্তির ওপর গড়ে ওঠে—- ভূমি ও পুঁজি। প্রাক-ধনতান্ত্রিক যুগে পৃথিবীর অধিকাংশ দেশে প্রধান সম্পদ ছিল ভূমি। ভূমি ছাড়াও কোথাও-কোথাও গৃহপালিত জন্তু ক্রীতদাস এবং ভূমিদাস সম্পদের অন্যতম মুখ্য উৎস হিসেবে গণ্য হতো।

যারা এ-সমস্ত সম্পদের মালিক হতো, তারাই উৎপাদনের উৎসকে নিয়ন্ত্রণ করতো। “এ্যারিস্টটল তাঁর ‘পলিটিক্স’ গ্রন্থে রাষ্ট্রের তিনটি স্তর বিন্যাসের উল্লেখ করেছেন-সম্পদশালী, মধ্যবিত্ত শ্রেণী ও দরিদ্র। ইতিহাসে যা প্রাচীন সমাজ হিসেবে পরিচিত, অর্থাৎ প্রাচীন ইউরোপের দু’টি সমাজ ব্যবস্থা গ্রীক ও রোম, সেখানে আমরা দুটো মুখ্য শ্ৰেণী দেখতে পাই। একটি হলো দাস-মালিক শ্রেণী ও অপরটি দাস। প্রাচীন ভারত বা এশিয়ায় এ ধরণের শ্রেণী বিন্যাস ছিল না।

এখানে যে বিশাল বিশাল সাম্রাজ্য বা রাজ্য গড়ে উঠেছিল, সেগুলোর ভিত্তি ছিল প্রধানত ভূমি কেন্দ্রিক গ্রাম-সমাজ। এসব অনেকটা স্বায়ত্তশাসিত গ্রাম সমাজে আমরা স্বাধীন কৃষক, গ্রামীন প্রধান, গ্রামীন জমিদার এবং তার উপরি স্তরে ছোট খাট জমিদার বা রাজস্ব সংগ্রাহক, রাষ্ট্রের অমাত্যবর্গ এবং ছোট ভূম্যধিকারী এবং রাজা-মহারাজা ইত্যাদি দেখি। আমাদের এশীয় সমাজে প্রধানতঃ ভারতবর্ষের গ্রামীণ সমাজে কৃষক ও কৃষিকে কেন্দ্র করে বিভিন্ন ধরণের উৎপাদক ও কারিগর শ্রেণীর অস্তিত্ব দেখতে পাই, যারা গ্রামীণ সমাজে নিজেদের অধিকার নিয়ে বাস করতো।

এসব কারিগরের মধ্যে বিশেষভাবে উল্লেখ করা যায়- কামার, কুমার, ছুতোর, নাপিত, গোয়ালা, তাঁতী, জেলে, স্বর্ণকার প্রভৃতি। এ ছাড়াও চর্যাপদ, দোহাকোষ ইত্যাদি বিভিন্ন গ্রন্থে আমরা অন্ত্যজ শ্রেণীর অস্তিত্ব দেখি। সমাজ বিজ্ঞানীরা মনে করেন, আদিম সাম্য সমাজের পরে যখন সভ্যতার বিকাশ ঘটেছে, তখন থেকেই মানব সমাজ শ্রেণীবদ্ধ। সামাজিক শ্রেণীকে কেন্দ্র করে সমাজ বিজ্ঞানীরা অসংখ্য গ্রন্থ রচনা করেছেন।

এসব সমাজ বিজ্ঞানীর মধ্যে দু’জন তাত্ত্বিক বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য, বাদের তত্ত্বই অধিকাংশ সামাজিক শ্রেণী বিশ্লেষনের ভিত্তি। এঁরা হলেন কার্ল মার্কস ও ম্যাকস ওয়েবার। কার্ল মার্ক্সের তত্ত্ব অনুযায়ী মানব সভ্যতার ইতিহাস প্রধানতঃ শ্রেণী সংগ্রামের ইতিহাস”।

 

 

প্রখ্যাত সমাজবিজ্ঞানী জিলবার্গ-এর মতে, ‘সামাজিক শ্রেণী হলো সমষ্টির একটি অংশ যারা পরস্পর সাম্যের ভিত্তিতে প্রতিষ্ঠিত এবং শিক্ষায়, বৃত্তিতে অন্যান্য গোষ্ঠী হতে আলাদা।’ অর্থাৎ কোন জনসমষ্টির যে অংশ বৃত্তি, সামাজিক মর্যাদার ভিত্তিতে পৃথকভাবে চিহ্নিত, সে অংশগুলোই সমাজের একটি স্বতন্ত্র শ্রেণী হিসেবে পরিচিত।

নৃ-বিজ্ঞানী Nadel (নেডেল) সমাজের মানুষের সামাজিক ভূমিকা সম্পর্কে বলেন,

‘সমাজ কাঠামোর অন্তর্গত শ্রেণী হল একটি নির্দিষ্ট জনসমষ্টির বিভিন্ন সদস্যদের পারস্পরিক সম্পর্কের একটি রূপ বিশেষ যা তাদের ভূমিকার মধ্য দিয়ে প্রতিফলিত হয়।

সমাজবিজ্ঞানী ‘মার্কস’-এর মতে, উৎপাদন শক্তি ও উৎপাদন সম্পর্কের সমন্বয়ে গড়ে ওঠে সমাজ কাঠামো। এই সমাজকাঠামোর মধ্য থেকে উৎপাদন শক্তি ও উৎপাদন সম্পর্কের ভিত্তিতে উদ্ভব ঘটে বিভিন্ন সামাজিক শ্রেণীর।

ভ.ই. লেনিন শ্রেণীর সংজ্ঞায় বলেন,

“ঐতিহাসিকভাবে নির্ধারিত সামাজিক উৎপাদন প্রণালীতে তাদের অবস্থান দ্বারা, উৎপাদনের উপায়গুলির সঙ্গে তাদের সম্পর্ক (অধিকাংশ ক্ষেত্রেই আইনে নির্ধারিত) দ্বারা এবং ফলত সামাজিক সম্পদে তাদের যে পরিমাণ অংশভাগ আছে তার বিলিবন্টন ও অর্জনের ধরণ দ্বারা পরস্পর থেকে পৃথক বৃহৎ জনবৰ্গ । ”

প্রকৃতপক্ষে পৃথিবীতে এমন কোন সমাজের অস্তিত্ব নেই যেখানে মানুষের সঙ্গে মানুষের পার্থক্য বা বৈষম্য নেই। সমাজের প্রত্যেকটি সদস্য বিভিন্ন শ্রেণীতে বিভক্ত- কেউ আয়ের দিক থেকে, কেউ শিক্ষার দিক হতে, আবার কেউ কেউ ক্ষমতার দিক থেকে। অর্থের দিক হতে মানুষকে সাধারণত তিন ভাগে ভাগ করা যায়। যেমন- (১) ধনী, (২) মধ্যবিত্ত, (৩) দরিদ্র।

শিক্ষার দিক থেকে সমাজে দুই শ্রেণীর লোক দেখা যায়, যেমন- শিক্ষিত এবং অশিক্ষিত। অশিক্ষিত আবার স্বাক্ষর ও নিরক্ষর এ দুই শ্রেণীতে ভাগ করা যায়। এই শ্রেণী বৈষম্যের উপর ভিত্তি করে সামাজিক শোষণ ও নিপীড়নের মাত্রাগত পার্থক্যও পরিলক্ষিত হয়ে থাকে ।

আবার ক্ষমতার ভিত্তিতে সমাজের মানুষ দুই শ্রেণীতে বিভক্ত। যেমন- (১) শাসক, (২) শাসিত। এভাবে সমাজের মানুষ বিভিন্ন শ্রেণীতে বিভক্ত। কোন সমাজই পুরোপুরি সাম্যের উপর প্রতিষ্ঠিত নয়। সমাজতাত্ত্বিক Maciver & Page বলেন, সামাজিক শ্রেণীবিন্যাস বলতে (১) মর্যাদাভিত্তিক স্তরবিভাগ বোঝায় এবং (২) উৎকৃষ্ট এবং নিকৃষ্টের ভিত্তিতে শ্রেণী বিভাগ নির্দেশ করে। তাঁদের মতে সামাজিক মর্যাদার ভিত্তি হল অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক।

কাজেই সামাজিক শ্রেণী বা স্তর বিন্যাসে অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক ভিত্তি দু’টি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। সুতরাং বলা যায় যে, সামাজিক শ্রেণী বিন্যাসের মূলে রয়েছে সমাজে ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর অসম অবস্থান। এই অবস্থানের এক প্রান্তে উচ্চশ্রেণী এবং অন্য প্রান্তে নিম্নশ্রেণী দেখা যায়। বাংলাদেশে এই সামাজিক বাস্তবতা প্রকট। এদেশে পাঁচতলার নিচে গাছতলায় মানুষের আশ্রয় গ্রহণের চিত্র উক্ত সামাজিক বাস্তবতারই প্রতিচ্ছবি।

পৃথিবীর সব সমাজেই শ্রেণী বিভাজন বিদ্যমান। অতীতেও ছিল, বর্তমানেও আছে, আদিম সমাজেও এর ব্যতিক্রম ছিল না। আদিম সমাজে গোত্র প্রধান বা দলপতি গোত্রের অন্যান্য সদস্য অপেক্ষা অতিরিক্ত সুযোগ-সুবিধা ভোগ করত। সেখানে স্ত্রী-পুরুষভেদে সামাজিক অসমতা দেখা দিত।

আদিম সমজে অসমতা ছিল একথা অবশ্য মার্কস স্বীকার করেন না। তাঁর মতে আদিম সমাজ ছিল সাম্যবাদী সমাজ। আদিম সমাজে ব্যক্তিগত মালিকানা ছিল না বলে সেখানে শ্রেণীবিন্যাসের উদ্ভব হয় নি। কিন্তু যখন থেকে সমাজে ব্যক্তিগত সম্পত্তির ধারণা সৃষ্টি হয় তখন থেকেই শ্রেণী বৈষম্যের সৃষ্টি হয়। মার্কসের মতে এটিই ছিল শ্রেণীবিন্যাসের অন্যতম কারণ।

বাংলাদেশের সামাজিক শ্রেণীবিন্যাসের পটভূমি লক্ষ করলে দেখি, ব্রিটিশ শাসনের পূর্বে সমাজব্যবস্থা পুরোপুরি বন্দী ছিল সামন্ততন্ত্রের হাতের মুঠোয়, “ইংরেজ শাসন তার এই বন্দিদশা ঘুচিয়ে শহরকে স্বমর্যাদায় প্রতিষ্ঠিত করে এবং তাকে আত্মনির্ভরশীল করে তোলে। অর্থনৈতিক জীবনের মাপকাঠিও রূপান্তরিত হয় জমি থেকে মুদ্রায়। …

অর্থনৈতিক কাঠামোর এই মৌলিক পরিবর্তনের সাথে সাথে নতুন সামাজিক শ্রেণীবিন্যাস দেখা দেয়। যেমন- বাংলাদেশে চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত প্রবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে একদিকে ব্যক্তিগত ভূমিস্বত্ত্বভোগী জমিদার শ্রেণী অন্যদিকে রায়েত শ্রেণী গড়ে উঠল। গ্রামাঞ্চলে এই দুই শ্রেণীর পাশাপাশি দেখা দিল বড় ও ছোট জোতদার, ক্ষেতমজুর, ব্যবসায়ী ও মহাজন শ্রেণীর। শহর এলাকায় তেমনি সৃষ্টি হল পুঁজিপতি, শিল্পপতি, বণিক শ্রেণী, শ্রমিক শ্রেণী। ছোট বড় ব্যবসায়ী এবং চিকিৎসক, আইনজীবী, শিক্ষক ও সাংবাদিক প্রভৃতি বৃত্তিভোগী শ্রেণী।

অর্থনৈতিক সংগঠনের মৌলিক রূপান্তর এবং নানা বিষয়ে অসম্পূর্ণতা সত্ত্বেও এই নতুন শ্রেণীবিন্যাস সাধনের মধ্যেই ইংরেজ শাসনের বৈপ্লবিক ভূমিকা নিহিত। এই সামাজিক বিন্যাসের উপর ভিত্তি করে বাংলাদেশের বর্তমান শ্রেণী কাঠামোতে ভিন্নতর প্রকৃতি পরিলক্ষিত হয়। গ্রামীণ সামাজিক বাস্তবতার স্তর বিন্যাসে যেসব উপাদান বিশেষ ভূমিকা পালন করে তার মধ্যে জমিই প্রধান। ভূ-সম্পত্তির পরিমাণ ও মালিকানার ভিত্তিতে গ্রামীণ সমাজে নিম্নলিখিত শ্রেণী দেখা যায়:

ভূমিহীন কৃষক :

এক) যাদের বসতবাড়ি ও কৃষি জমি কিছুই নেই। দুই) যাদের বসতবাড়ি আছে কিন্তু কৃষিজমি নেই ।

প্রান্তিক কৃষক :

যাদের জমির পরিমাণ এক একরের নিচে । ভূমিহীন ছাড়াও বাংলাদেশের গ্রামীণ নিম্নবর্গের একটা উল্লেখযোগ্য অংশ রয়েছে- যারা প্রান্তিক কৃষক। এদের অবস্থা প্রায় ভূমিহীন ।

 

 

পূর্ববঙ্গের কৃষক শ্রেণীর একটা খুব বড় অংশ বেশ আগেই ভূমির মালিকানার দিক থেকে প্রান্তবর্তী অবস্থানে এসে ঠেকেছিল। ১৯৪৭-এ দেশ বিভাগের সময়ে বাংলাদেশের অধিকাংশ কৃষকের ছিল স্বল্প পরিমাণ জমি- গড়ে পাঁচ একর বা তার চাইতেও কম। ডব্যু ডব্যু হান্টার বহুকাল পূর্বে এ পরিমাণ জমিধারীর আবস্থানকে বলেছেন নিম্ন স্তরের। ‘১৯৪৭-এ বা তার পরে যে কৃষকের জমির পরিমাণ ছিল এতটা, তার অবস্থান একেবারে প্রান্তবর্তী। আর এ-অবস্থান থেকে এ প্রান্তিক কৃষকেরা আরো নিম্নের দিকে গেছে; তাদের অবস্থা হয়েছে শোচনীয় থেকে শোচনীয়তর।

ফসলের স্বল্পতা, ঋণগ্রস্ততা, জনসংখ্যার চাপ ইত্যাদি নানা সমস্যায় আক্রান্ত প্রান্তিক কৃষক এক পর্যায়ে জমি হারিয়ে পরিণত হয়েছে ভূমিহীনে। স্বাধীনতার কয়েক বছরের মধ্যে পঞ্চাশের দশক থেকে ক্ষুদ্র প্রান্তিক কৃষকদের জমি হারানো দ্বিগুণ পরিমাণে বেড়ে যায়। এদের ভূমি হারানোর প্রক্রিয়া বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের পূর্ব পর্যন্ত অব্যাহত। ক্ষুদ্র কৃষকদের ভূমি হারানোর অনেকগুলো কারণের মধ্যে দারিদ্র্য ও জনসংখ্যার চাপ সর্বাপেক্ষা প্রকট।

বিশেষ করে একদিকে মাথাপিছু জমির স্বল্পতা, অন্যদিকে জনসংখ্য বৃদ্ধির ফলে সৃষ্টি হয় দুর্লঙ্ঘ্য সমস্যা সংকুল পরিস্থিতি। নির্দিষ্ট জমিকে কেন্দ্র করে জনসংখ্যার চাপে সৃষ্ট উত্তরাধিকারীদের প্রবৃদ্ধির ফলে কালে কালে জন্ম নিতে থাকে নতুন ক্ষুদ্র কৃষক শ্রেণী”। গ্রামাঞ্চলের এসব অভাবী মানুষ দুর্যোগপূর্ণ সময়ের মোকাবেলায় দ্বারস্থ হয় সমাজের অবস্থাপন্নদের।

মহাজন জমিদারের কাছে জমি বন্ধক রেখে সে অর্থ ঋণ নেয়; পরে তাকে সেই জমি নিজের অধিকারে ফিরিয়ে আনতে হয় চড়া সুদের বিনিময় মূল্যে। তখন তার অবস্থা এমনই দাঁড়ায় যে, কখনো কখনো নিজেরই আইন সঙ্গত জমিতে সে পরিণত হয় বর্গাচাষীতে; আর বন্ধককৃত জমিও সে ফিরে পায় না। সমাজ গবেষণা ভিত্তিক এক জরিপ থেকে দেখা যায়, পূর্ববঙ্গের আর বন্ধককৃত জমিও সে ফিরে পায় না।

সমাজ গবেষণা ভিত্তিক এক জরিপ থেকে দেখা যায়, পূর্ববঙ্গের গ্রামের ৭৫ শতাংশ ভূমিহীনই একসময় ভূমির অধিকারী ছিল। তাদের পিতা কিংবা পিতামহদের প্রধান পেশা ছিল কৃষি। অর্থাৎ কয়েক যুগ পূর্বেও যারা কৃষি জমির মালিক কয়েক যুগ পরে এসে তারা ভূমিহীন, দিন মজুর কিংবা ভিক্ষুকে রূপান্তরিত। এ থেকে বোঝা যায়, ক্ষুদ্র চাষীদের স্বল্প পরিমাণ জমি কখনই তাদের জীবনের চাহিদা মেটাতে পারেনি। ফলে তারা অপেক্ষাকৃত সম্পন্ন কৃষক কিংবা জমির মালিকের মুখাপেক্ষী। পরনির্ভরতা থেকে তারা ক্রমশ পরিণত হয়েছে দুঃস্থ মানুষে।

একদিকে গ্রামীণ নিম্নবর্গ ভূমি হারাতে থাকে, অন্যদিকে উচ্চ শ্রেণীর লাভের প্রক্রিয়া চলতে থাকে। ১৯৭১ সালের স্বাধীনতার পরেও দেখা যাচ্ছে, বাংলাদেশের ৬৫,০০০ গ্রামে নিম্নশ্রেণী থেকে উচ্চশ্রেণীতে ভূমি হস্তান্তরের প্রক্রিয়া বাংলাদেশের গ্রাম সমাজের একটি গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্যে দাঁড়িয়ে গেছে।

মধ্যম কৃষক :

এদের জমির পরিমাণ তিন থেকে সাত একরের মধ্যে। এরা সুবিধাবাদী এবং সুযোগ পেলেই ছোট ও প্রান্তিক কৃষককে শোষণ করে নিজেদেরকে উচ্চ পর্যায়ে উন্নীত করেছে।

ধনী কৃষক :

এদের জমির পরিমাণ সাত একর থেকে অনেক বেশি। এরা সরাসরি কৃষিকাজের সাথে যুক্ত হয় না। ব্যবসা, বাণিজ্য, গ্রামীণ রাজনীতি এরাই নিয়ন্ত্রণ করে থাকে। এদের অনেকেই শহরে বাস করে। অপরদিকে বাংলাদেশের শহর সমাজে শ্রেণী বা স্তর বিন্যাসের ক্ষেত্রে সম্পত্তির মালিকানা বা সম্পদ, ক্ষমতা ও শিক্ষা প্রভৃতি উপাদান গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। এসব উপাদানের ভিত্তিতে শহর সমাজ পাঁচ শ্রেণীতে বিভক্ত। যেমন

১. উচ্চ বিত্ত :

এদের মধ্যে পড়ে রাজনীতিবিদ, বুদ্ধিজীবী ও উচ্চপর্যায়ের শিক্ষিতগণ এই শ্রেণীর অন্তর্ভুক্ত। মানসিক ও কায়িক শ্রমে কর্মরতদের মধ্যে বিদ্যমান পার্থক্যের দরুন বুদ্ধিজীবীরাও একটি স্বাধীন সামাজিক গোষ্ঠী হিসাবে টিকে থাকে। মননকার্যে নিয়োজিতদের নিয়ে বুদ্ধিজীবী সম্প্রদায় গঠিত।

২. উচ্চ মধ্যবিত্ত

এরা পেশাদার ডাক্তার, ক্লিনিকের মালিক, প্রকৌশল ফার্মের মালিক, বিদেশী প্রতিষ্ঠানের চাকুরিজীবী, মাঝারি শিল্পপতি ও ব্যবসায়ী।

৩. মধ্যবিত্ত :

এরা হল সীমিত আয়ের মানুষ, যেমন- ডাক্তার, অধ্যাপক, আইন ব্যবসায়ী, প্রকৌশলী, সাংবাদিক, সরকারি কর্মচারী, শিল্পী-সাহিত্যিক ইত্যাদি।

৪. নিম্ন মধ্যবিত্ত :

এই শ্রেণীর আওতায় আসে স্কুল কলেজের শিক্ষক, চাকুরিজীবী। মূলত এদের অবস্থান নিম্নবিত্ত ও মধ্যবিত্তের মাঝে। প্রধানত স্বল্প বেতনের চাকুরিজীবী ও ছোট পুঁজির ব্যবসায়ী।

৫. নিম্নবিত্ত :

শহরের দিনমজুর, রিক্সাচালক, মুটে ফেরিওয়ালা, ইটভাঙ্গে যারা, ঠেলা গাড়ি চালক প্রভৃতি শ্রেণীর লোক। এছাড়া আছে আরো শহর অঞ্চলের নানা ভাসমান মানুষ।

 

 

শ্রেণী সম্পর্কে আলোচনার পর আসে শ্রেণীচেতনা ধারণাটির বিশ্লেষণ:

শ্ৰেণী চেতনা

শ্রেণী চেতনা ধারণাটি ঐতিহাসিক বস্তুবাদ ধারণার সাথে সম্পৃক্ত। সমাজে বিদ্যমান বিভিন্ন শ্রেণী, এক শ্রেণীর সাথে অপর শ্রেণীর সম্পর্ক, শ্রেণীভেদে বিরাজমান বৈষম্য এবং স্ব-স্ব শ্রেণী অস্তিত্ব রক্ষা ও মুক্তির লক্ষ্যে জাগ্রত চেতনা বা সজাগ উপলব্ধিজাত চেতনার সমষ্টিকেই মূলত শ্রেণীচেতনা বলে।

শ্রেণী চেতনার সদর্থক ভূমিকা সামাজিক প্রগতির লক্ষ্যে পরিচালিত। উপন্যাস সাহিত্যে শ্রেণী চেতনার রূপায়ণ বা প্রতিফলনের ক্ষেত্রে “শিল্পী সাহিত্যিকেরা সমাজের দ্বান্দ্বিক নিয়মে বিকাশ প্রাপ্ত সামাজিক বাস্তবতার দ্বন্দ্বাকীর্ণ জটিল অবস্থায় দাঁড়িয়ে সংশয়ের পীড়ন ও সংশয় মুক্তির প্রয়াস থেকে কল্পনা করেন, সম্ভাব্য এক নতুন মানব পরিস্থিতি যেখানে মানবজীবনের মহত্তম সম্ভাবনাসমূহ সবচেয়ে ভালোভাবে বাস্ত বায়িত হতে পারে।

উক্ত বোধ বা চেতনায় প্রাণিত হয়ে তাঁরা এমন সাহিত্য ও শিল্পকলা সৃষ্টি করেন যেগুলো জনগণকে জাগিয়ে তোলে, তাদের মধ্যে উদ্দীপনার আগুন জালিয়ে নেয় এবং পরিবেশের পরিবর্তন সাধনে তাদেরকে ঐক্যবদ্ধ হতে ও সংগ্রাম  চালাতে অনুপ্রাণিত করেন।

“সেই সঙ্গে শিল্পী সাহিত্যিক, স্বাপ্নিকেরা শ্রেণী বিভক্ত সমাজে সচেতনভাবে হোক বা অসচেতনভাবে হোক, কোন না কোন শ্রেণীতে অবস্থান করেন এবং নিজের বক্তব্য, কর্ম ও আশা-আকাঙ্ক্ষা দ্বারা কোন না কোন শ্রেণীর প্রতিনিধিত্ব করেন। লক্ষ করলে দেখা যায়, মহান শিল্পী সাহিত্যিক স্বাপ্নিকেরা যে শ্রেণীর উত্তরাধিকার নিয়ে কিংবা যে শ্রেণীতে অবস্থান করে জীবনযাপন করেন, নিজেদের সৃষ্টির মধ্য দিয়ে সেই শ্রেণীকে তাঁরা অতিক্রম করে যান। ফলে নিজেদের সৃষ্টির সাহায্যে তাঁরা শ্রেণী নিপীড়িত সমাজ জীবনের দুঃখ-দুর্দশা মুক্ত সমৃদ্ধ পৃথিবীর সৃষ্টিকে অবশ্যম্ভাবী করে তুলতে চান।

সামজিক দৃষ্টিকোণ থেকে লক্ষ করলে দেখা যায়, শ্রেণী বিভক্ত সমাজে মানুষের ব্যক্তিত্বও হয় শ্রেণী বৈশিষ্ট্যমণ্ডিত। আবার সমাজে বিদ্যমান বিভিন্ন শ্রেণীর চেতনাগত পার্থক্য লক্ষ করলেও দেখা যায় মানুষের অন্তরে শ্রেয়-প্রেয়, ন্যায়-অন্যায় ও উচিত-অনুচিতের দ্বন্দ্ব চিরন্তন এবং মানবসমাজে প্রগতি ও প্রতিক্রিয়ার বিরোধও চির চলমান। এই দ্বন্দ্বে, এই বিরোধে প্রগতির ভূমিকায় অংশ নেওয়াও শ্রেণী: চেতনার সদর্থক পরিচয় দান করে।

আবার আমরা এও দেখি, ব্যক্তির আত্মশক্তি ও প্রতিভা বিকাশের ক্ষেত্রে সব সমাজে পরিবেশ ও সমাজ ব্যবস্থা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। সামন্ততান্ত্রিক বা ঔপনিবেশিক, ধনতান্ত্রিক বা নয়া ঔপনিবেশিক যেই ব্যবস্থাই হোক সামন্ত ও বুর্জোয়া শ্রেণী সমাজের অপরাপর শ্রেণীর মানুষদের প্রতিভা বিকাশের পথ রুদ্ধ করে রাখার উদ্দেশ্যে নানা প্রকার সুদৃঢ় প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা তৈরি করে রাখে। কিন্তু এইসব প্রতিরোধের ব্যূহ ভেদ করেও সংগ্রামী মানুষদের প্রতিভা আত্মপ্রকাশ করে। এভাবেই সব কালে শ্রেণী চেতনার অসাধারণ মানবিক ও দৃঢ় ভূমিকা জয়যুক্ত হয়ে থাকে।

এ ছাড়া সামজিক ও রাজনৈতিক সমস্যার ক্ষেত্রে সমাজের বিভিন্ন শ্রেণীর মানুষের সক্রিয়তা, নিষ্ক্রিয়তা ও সচেতন-অসচেতন ভূমিকার মধ্যেও শ্রেণী চেতনার পরিচয় প্রকাশ পায়।

উপর্যুক্ত আলোচনা থেকে আমরা শ্রেণী চেতনার স্বরূপ বা প্রকৃতি সম্পর্কে অবহিত হই। আর শ্রেণী চেতনা যেহেতু তীব্র শ্রেণীসংগ্রামের মধ্যে জন্মে এবং বিকাশ লাভ করে; সে কারণেই বিষয়টি সরাসরি ঐতিহাসিক বস্তুবাদের সাথে সম্পৃক্ত। ঐতিহাসিক বস্তুবাদ তথা সমাজতন্ত্রের ধারণা অনুযায়ী শ্রেণী চেতনা শ্রেণীহীন সমাজ প্রতিষ্ঠার জন্য মানবমুক্তির লক্ষ্যে কাজ করে থাকে।

সামন্ত সমাজের ধ্বংসাবশেষ থেকে আধুনিক বুর্জোয়া সমাজের জন্ম। এই সমাজ প্রতিষ্ঠা করেছে নতুন শ্রেণী, অত্যাচারের নতুন অবস্থা, পুরাতনের বদলে সংগ্রামের নতুন ধরন। আধুনিক ধনতন্ত্র নির্ভর বুর্জোয়া সমাজের স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্যই হল, গোটা সমাজ দ্বন্দ্বৱত দুই শত্রুশিবির বা শ্রেণীতে বিভক্ত।

“একটি বুর্জোয়া এবং অপরটি প্রলেতারিয়েত। বুর্জোয়া বলতে আধুনিক পুঁজিপতি শ্রেণী বোঝায়, যারা সামাজিক উৎপাদনের উপায় গুলির মালিক এবং মজুরি শ্রমের নিয়োগকর্তা। আর প্রলেতারিয়েত হল আজকালকার মজুরী শ্রমিকেরা, যারা উৎপাদনের উপায় নিজেদের হাতে না থাকার দরুন বেঁচে থাকার জন্য স্বীয় শ্রমশক্তি বেচতে বাধ্য হয়।”

শাসক ও শোষিতের উক্ত বন্ধরত অবস্থানের সূত্র ধরে কার্ল মার্কস ঐতিহাসিক বস্তুবাদকে সংজ্ঞায়িত করতে গিয়ে বলেছেন- “আজ পর্যন্ত যত সমাজ দেখা গেছে তাদের সকলের ইতিহাস শ্রেণী সংগ্রামের ইতিহাস। … ….. এক কথায় অত্যাচারী এবং অত্যাচারিত শ্রেণী সর্বদাই পরস্পরের প্রতিপক্ষ হয়ে থেকেছে, অবিরাম লড়াই চালিয়েছে কখনও আড়ালে কখনও বা প্রকাশ্যে; প্রতিবার এ লড়াই শেষ হয়েছে গোটা সমাজের বিপ্লবী পুনর্গঠনে অথবা বন্দরত শ্রেণীগুলোর সকলের ধ্বংস প্রাপ্তিতে।

সামন্ত সমাজের ধ্বংসাবশেষ থেকে আধুনিক যে বুর্জোয়া সমাজ জন্ম নিয়েছে তার মধ্যে শ্রেণীবিরোধ শেষ হয়ে যায়নি। এ সমাজ শুধু প্রতিষ্ঠা করেছে নতুন শ্রেণী অত্যাচারের নতুন অবস্থা, পুরাতনের বদলে সংগ্রামের নতুন ধরণ। বুর্জোয়া যুগের একটা স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্যই হচ্ছে, শ্রেণীবিরোধ এতে সরল হয়ে এসেছে। গোটা সমাজ ক্রমেই দু’টি বিশাল শত্রু শিবিরে ভাগ হয়ে পড়েছে, ভাগ হয়েছে পরস্পরের সম্মুখীণ দুই বিরাট শ্রেণীতে বুর্জোয়া এবং প্রলেতারিয়েত।

সমাজে বিদ্যমান প্রচলিত বিভিন্ন শ্রেণীর ঐতিহাসিক পটভূমি বিচার করলে আমরা দেখি, সাম্রাজ্যবাদীরা কৌশল পরিবর্তন করে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পরবর্তী পর্যায়ে উপনিবেশবাদকে বাতিল করে সাহায্য ও লগ্নি পুঁজির মাধ্যমে পূর্ববর্তী উপনিবেশগুলিকে যখন তাদের নয়া উপনিবেশে পরিণত করলো তারপর থেকে ইংরেজ শাসিত পরাধীন ভারতবর্ষের বুর্জোয়া শ্রেণীর মধ্যে দুটি অংশ ক্রমশ অধিকতর নির্দিষ্টভাবে চিহ্নিত হতে থাকে। তাদের মধ্যে একটি হচ্ছে মুৎসুদ্দি বুর্জোয়া অপরটি জাতীয় বুর্জোয়া ।

 

 

১. মুৎসুদ্দি বুর্জোয়া

মুৎসুদ্দি বুর্জোয়া বলতে তাদেরকেই বুঝায়, যারা সাম্রাজ্যবাদের অনুগত, যারা সম্রাজ্যবাদের সঙ্গে যোগসাজসের মাধ্যমে জাতীয় স্বার্থের ক্ষতি করে নিজেদের শ্রেণীস্বার্থ উদ্ধার করে। এই শ্রেণীর বুর্জোয়া সামস্ত স্বার্থের সাথেও ঘনিষ্ঠসূত্রে জড়িত থাকে।

২. জাতীয় বুর্জোয়া

জাতীয় বুর্জোয়া শ্রেণীর চরিত্র এদিক থেকে স্বতন্ত্র। তারা সতেরো আঠারো, উনিশ শতকের ইউরোপীয় বুর্জোয়াদের মতো স্বাধীন বিকাশের পক্ষপাতী। তারা জাতীয় স্বার্থ ক্ষুণ্ণ অথবা বিপন্ন করে নিজেদের শ্রেণী স্বার্থ উদ্ধারের বিপক্ষে। এ জন্যেই সাম্রাজ্যবাদের সঙ্গে তাদের দ্বন্দ্ব। একদিকে যেমন দেশীয় বাজারের বিকাশ ও বিস্তৃতিতে তারা উৎসাহী অন্যদিকে তেমনি সেই বাজারে সাম্রাজ্যবাদী অনুপ্রবেশ ও আধিপত্যেরও তারা বিরোধী। এজন্যই তারা সামন্তবাদ ও অন্যদিকে সাম্রাজ্যবাদেরও বিরোধী। জাতীয় স্বার্থের প্রতি তাদের এই দৃষ্টিভঙ্গির জন্য তাদেরকে জাতীয় বুর্জোয়া বলা হয়।

ঔপনিবেশিক এবং নয়া ঔপনিবেশিক দেশগুলির জাতীয় বুর্জোয়াদের সংঘর্ষ শুধু সামন্তবাদের সঙ্গে নয়, সে সংঘর্ষ সাম্রাজ্যবাদী শক্তির সঙ্গেও। সামন্তবাদ ও সাম্রাজ্যবাদের সঙ্গে তারা বিরোধে লিপ্ত হয়ে জাতীয় অর্থনীতির বিকাশ ঘটাতে চায়; তাকে তারা বৈদেশিক শোষণের হাত থেকে রক্ষা করতে চায়।

উনিশ শতকে ইউরোপে যে বিপ্লব শুধু সামন্তবাদকে পরাভূত করে সম্ভব হয়েছিল, বর্তমানে আমাদের দেশে সে বিপ্লবকে সম্ভব করতে হলে শুধু সামন্তবাদ নয়, সাম্রাজ্যবাদকেও সম্পূর্ণভাবে পরাস্ত করে তা সম্ভব করতে হবে। সেই সাথে এই দুই শত্রু এবং তাদের সঙ্গে সংযুক্ত মুৎসুদ্দি বুর্জোয়াদেরকে দাবিয়ে দিয়ে জাতীয় স্বার্থ রক্ষা করে সমাজতান্ত্রিক বা গণতান্ত্রিক বিপ্লব অর্জন করা সম্ভব হতে পারে।

বুর্জোয়া শ্রেণীর বৈশিষ্ট্য অনুযায়ী বুর্জোয়া শ্ৰেণী মূলত, ব্যক্তি ও ব্যক্তিমূলাকে পরিণত করে তোলে বিনিময় মূল্যে। অগণিত অনস্বীকার্য সনদবন্ধ স্বাধীনতার স্থানে এরা এনে দাঁড় করে একটি মাত্র স্বাধীনতা তা হল অবাধ বাণিজ্য।

মানুষের যেসব বৃত্তিকে লোকে এতদিন সম্মান করে এসেছে, সশ্রদ্ধ বিস্ময়ের চোখে দেখেছে, বুর্জোয়া শ্রেণী তাদের মাহাত্ম্য ঘুচিয়ে দিয়েছে। চিকিৎসাবিদ, আইন বিশারদ, পুরোহিত, কবি, বিজ্ঞানী সকলকেই এরা পরিণত করেছে তাদের মজুরি ভোগী শ্রমজীবী রূপে।

সকল উৎপাদন যন্ত্রের দ্রুত উন্নতি ঘটিয়ে যোগাযোগের অতি সুবিধাজনক উপায় মারফত বুর্জোয়ারা সভ্যতায় টেনে এনেছে সমস্তই এমন কি অসভ্যতম জাতিকেও। ইতিহাস পর্যবেক্ষণে দেখি যে জগদ্দল কামান দেগে সে সমস্ত চীনা প্রাচীর চূর্ণ করে, অসভ্য জাতির অতি একরোখা বিজাতি বিদ্বেষকেও বাধ্য করে আত্মসমর্পণে তা হল তার পণ্যের সত্তা দর। এভাবে সকল জাতিকে বাধ্য করে তার বুর্জোয়া উৎপাদন পদ্ধতি গ্রহণ করতে। অর্থাৎ বাধ্য করে তাদের বুর্জোয়া বানাতে, এক কথায় বুর্জোয়া শ্ৰেণী চায় নিজের ছাঁচে জগৎ গড়ে তুলতে।

সেজনা গ্রামাঞ্চলকে বুর্জোয়া শ্রেণী শহরের পদানত করে সৃষ্টি করেছে বিরাট বিরাট শহর, গ্রামের তুলনায় শহরের জনসংখ্যা বাড়িয়েছে প্রচুর এবং এইভাবে জনগণের এক বিশাল অংশকে বাঁচিয়েছে গ্রামজীবনের মূঢ়তা থেকে। গ্রামাঞ্চলকে এরা যেমন শহরের মুখাপেক্ষী করে তুলেছে, ঠিক তেমনই বর্বর বা অর্ধবর্বর দেশগুলোকে দাঁড় করেছে সভ্য দেশগুলোর উপর। কৃষিনির্ভর জাতিকে করেছে বুর্জোয়া প্রধান জাতির, পূর্বাঞ্চলকে করেছে পশ্চিমাঞ্চলের উপর নির্ভরশীল।

দেখা যায় যে, উৎপাদন ও বিনিময়ের যেসব উপায়কে ভিত্তি করে বুর্জোয়া শ্রেণী নিজেদের গড়ে তুলেছে, তাদের উৎপত্তি সামন্ত সমাজের মধ্যে উৎপাদন ও বিনিময়ের শর্ত, সামন্ত কৃষি ও হস্তশিল্প কারখানার সংগঠন, এক কথায় মালিকানার সামন্ত সম্পর্কগুলি আর কিছুতেই বিকশিত উৎপাদন শক্তির সঙ্গে যখন খাপ খেল না তখন সে শৃংখল ভেঙ্গে ফেলা হল। সে জায়গায় এগিয়ে এল অবাধ প্রতিযোগিতা, সেই সঙ্গে তারই উপযোগী সামাজিক ও রাজনৈতিক ব্যবস্থা এবং বুর্জোয়া শ্রেণীর অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক কর্তৃত্ব।

শিল্পের মালিক কর্তৃক মজুরের শোষণ খানিকটা সম্পূর্ণ হওয়া মাত্র অর্থাৎ তার মজুরির টাকাটা পাওয়া মাত্র, তার উপর ঝাঁপিয়ে পড়ে বুর্জোয়া শ্রেণীর অপরাপর অংশ বাড়িওয়ালা, দোকানদার, মহাজন প্রভৃতি। মধ্য শ্রেণীর নিম্ন স্তর -ছোটখাট ব্যবসায়ী, দোকানদার, সাধারণত ভূতপূর্ব কারবারিরা সবাই হস্তশিল্প এবং চাষীরা তারা ধীরে ধীরে প্রলেতারিয়েতের মধ্যে নেমে আসে।

তার এক কারণ, যতখানি বড় আয়তনে আধুনিক শিল্প চালাতে হয় এদের সামান্য পুঁজি তার পক্ষে যথেষ্ট নয় এবং প্রতিযোগিতায় বড় পুঁজিপতিরা এদের গ্রাস করে ফেলে; অপর কারণ, উৎপাদনের নতুন পদ্ধতির ফলে এদের বিশিষ্ট নৈপুণ্যটুকু অকেজো হয়ে দাঁড়ায়। সুতরাং প্রলেতারিয়েতের পুষ্টি লাভ হতে থাকে জনগণের প্রতিটি শ্রেণী থেকে আগত লোকের দ্বারা।

আজকের দিনে বুর্জোয়াদের মুখোমুখি যেসব শ্রেণী দাঁড়িয়ে আছে তার মধ্যে শুধু প্রলেতারিয়েত হল প্রকৃত বিপ্লবী শ্রেণী। অপর শ্রেণীগুলি আধুনিক যন্ত্রশিল্পের বিশিষ্ট ও অপরিহার্য সৃষ্টি।

নিম্ন মধ্যবিত্ত, ছোট হস্তশিল্প কারখানার মালিক, দোকানদার, কারিগর, চাষী এরা সকলে বুর্জোয়াদের বিরুদ্ধে লড়ে মধ্যশ্রেণীর টুকরো হিসেবে নিজেদের অস্তিত্বটাকে ধ্বংসের মুখ থেকে বাঁচাবার জন্য। তাই তারা বিপ্লবী নয়, রক্ষণশীল।

তথাপি শ্রেণীসংগ্রামের ক্ষেত্রে বিকাশের নানা পর্যায়ের মধ্য দিয়ে প্রলেতারিয়েতকে যেতে হয়। বুর্জোয়া শ্রেণীর বিরুদ্ধে এ সংগ্রাম শুরু হয় বলতে গেলে জন্ম মুহূর্ত থেকে। প্রথমটা লড়াই চালায় বিশেষ বিশেষ মজুরেরা। তারপর লড়তে থাকে গোটা ফ্যাকটরির মেহনতিরা, তারপর কোনও একটা অঞ্চলের একই পেশায় নিযুক্ত সকল শ্রমিকেরা তাদের সাক্ষাৎ শোষণকারী বিশিষ্ট পুঁজিবাদীদের বিরুদ্ধে লড়ে।

 

 

তাদের আক্রমণের লক্ষ্য হয় উৎপাদনের উপকরণ; উৎপাদনের বুর্জোয়া ব্যবস্থাটা নয়। যে আমদানি মাল তাদের মেহনতের সাথে প্রতিযোগিতা করে সেগুলি তারা ধ্বংস করে, কল ভেঙ্গে চুরমার করে দেয়, কারখানায় আগুন লাগায় বাস্তবিকভাবে মেহনতকারীর যে মর্যাদা লোপ পেয়েছে, গায়ের জোরে চায় তারা তা ফিরিয়ে আনতে।

সুতরাং এই পর্যায়ে মজুরেরা লড়ে নিজেদের শত্রুর বিপক্ষে নয়, শত্রুর শত্রু অর্থাৎ নিরঙ্কুশ রাজতন্ত্রের অবশিষ্টাংশ, জমিদার, শিল্প বহির্ভূত বুর্জোয়া, পেটি (মধ্য শ্রেণীর) বুর্জোয়াদের বিরুদ্ধে। এ অবস্থায় ইতিহাসের সমস্ত গতিটি বুর্জোয়া শ্রেণীর হাতের মুঠোয় থাকে। এভাবে প্রলেতেরিয়েতরা শ্রেণী সংগ্রামের মাধ্যমে প্রকৃত বিজয় অর্জনে বাধাগ্রস্ত হয়।

শেষ পর্যন্ত শ্রেণী সংগ্রাম যখন চূড়ান্ত মুহূর্তে, তখন শাসকশ্রেণীর মধ্যে বস্তুতপক্ষে পুরানো সমাজের গোটা পরিধি জুড়ে যে ভাঙ্গনের প্রক্রিয়া চলে তা এমন একটা প্রখর হিংস্র রূপ নেয় যে, শাসকশ্রেণীর একটা ছোট অংশ পর্যন্ত ছিঁড়ে বেরিয়ে আসে। হাত মেলায় বিপ্লবী শ্রেণীর সঙ্গে, সেই শ্রেণীর সঙ্গে যার হাতেই ভবিষ্যত।

সুতরাং আগেকার এক যুগে যেমন অভিজাতদের একটা অংশ বুর্জোয়া শ্রেণীর দিকে চলে গিয়েছিল, ঠিক তেমনি এখন বুর্জোয়াদের একটা ভাগ যোগ দেয় শ্রমিক শ্রেণীর সঙ্গে। বিশেষ করে বুর্জোয়া ভাবাদর্শীদের কিছু কিছু যারা ইতিহাসের সমগ্র গতিকে তত্ত্বের দিক থেকে বুঝতে পারার স্তরে নিজেদের তুলতে পেরেছে। এ কারণে কার্ল মার্কস বলেন, ‘আজ পর্যন্ত যত সমাজ দেখা গেছে, তাদের সকলের ইতিহাস শ্রেণীসংগ্রামের ইতিহাস।

শ্রেণীসংগ্রাম হল “বিভিন্ন শ্রেণীর মধ্যে সংগ্রাম, যাদের স্বার্থ পরস্পরের পরিপন্থী বা বিরোধী, এটি বৈরগর্ভ শ্রেণী সমাজ বিকাশের মূল আধেয় ও চালিকাশক্তি। ১১

সংখ্যাগরিষ্ঠ মেহনতি মানুষ শোষণে জর্জরিত হয়ে মাঝে মাঝে বিদ্রোহী হয় তাদের উপর থেকে শোষণের বোঝা নামিয়ে ফেলার জন্য শোষকশ্রেণীর উপর আঘাত হানে। যে কোন শ্রেণীবিভক্ত সমাজে এ আঘাত এবং প্রত্যাঘাতের ক্রমান্বিত প্রক্রিয়াটির নামই শ্রেণীসংগ্রাম। সে ক্ষেত্রে সংখ্যাগরিষ্ঠ মেহনতি জনগণের বিজয়কে বেশিদিন অথবা অনির্দিষ্টকালের জন্য ঠেকিয়ে রাখা যায় না।

‘মার্কস ও এঙ্গেলস দেখিয়েছেন যে, বৈরগর্ভ সমাজের গঠনরূপগুলিতে শ্রেণীসংগ্রামই সমাজ বিকাশের চালিকাশক্তি। সমাজ বিবর্তনের একটি পর্যায়ে শ্রেণীসংগ্রাম অনিবার্যভাবে সমাজ বিপ্লবে পর্যবসিত হয় । আর বিপ্লব হল শ্রেণীসংগ্রামের চূড়ান্ত পর্যায়, যখন বিপ্লবী শ্রেণীটি রাজনৈতিক ক্ষমতা দখল করে এবং যাবতীয় সামাজিক সম্পর্কে একটি মৌলিক পরিবর্তন ঘটানো হয়। সমাজ বিপ্লবের মাধ্যমে পুরনো থেকে নতুন সমাজিক অর্থনৈতিক গঠনরূপে উত্তরণ ঘটে, অর্থাৎ ঐতিহাসিক প্রগতি অর্জিত হয়। সমাজ বিকাশের জরুরী কাজ সম্পাদনে বৈপ্লবিক শ্রেণী সংগ্রামের কোন বিকল্প নেই। ১৯২

শ্রেণীসংগ্রামের বিশেষ একটি দিক হল সাংস্কৃতিক শ্রেণীসংগ্রাম। সংখ্যাগরিষ্ঠ জনগোষ্ঠীর চিত্তকে শোষকদের শাসন মুক্ত করা বা রাখার সংগ্রাম জনগণের সাংস্কৃতিক শ্রেণীসংগ্রাম। এই সংগ্রাম যতদিন না কোন দেশে ব্যাপকভাবে সংঘটিত হয় ততদিন কোন রাজনৈতিক সংগ্রামও ফলপ্রসূ ভূমিকা রাখতে সক্ষম হয় না।

শ্রেণীসংগ্রাম সংগঠিত হবার নেপথ্যে শাসকশ্রেণী কর্তৃক আরোপিত যেসব শক্তিশালী উপকরণ বা উদ্দেশ্য প্রভাব ফেলে তার মধ্যে মেহনতি জনগণের সৃজনশীলতা, তাদের মানসিক বিকাশ ও সাংস্কৃতিক অগ্রগতিকে রোধ করাই হয়ে দাঁড়ায় প্রতিটি ক্ষেত্রে শোষকশ্রেণীর সংস্কৃতি চর্চার মুখ্য দিক।

মেহনতি জনগণের চিত্ত শাসনই তার মূল লক্ষ্য। এ ক্ষেত্রে তাদের কৌশল হল মেহনতি জনগণের চিন্তা চেতনার উপর নিয়ন্ত্রণ ও আধিপত্য প্রতিষ্ঠা। পুরাকালে ভারতবর্ষে শোষকশ্রেণী এই নিয়ন্ত্রণ ও আধিপত্যের যে সর্বশ্রেষ্ঠ হাতিয়ার আবিষ্কার করেছিল তার নাম হল জন্মান্তরবাদ। শোষক শ্রেণী পূর্বজন্মের পাপের ফল ভোগ করার দর্শন দিয়ে মেহনতি জনগণের শোষণের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করার স্পৃহাকে দমিয়ে রাখত।

সমজের নিচু শ্রেণীতে হিন্দু ধর্মের বিশ্বাস অনুযায়ী তারা মনে করত, পূর্ব জন্মের পাপের শাস্তি স্বরূপ সমাজের বিত্তবান উঁচু শ্রেণীর শাসক কর্তৃক তারা অত্যাচরিত হচ্ছে। এটি বিধির বিধান ও পাপ মুক্তির নিয়তি বলে তারা গণ্য করত। এভাবেই ধর্ম বিশ্বাস চাপিয়ে দিয়ে শোষকশ্রেণী শাসন ও নিপীড়নের কৌশলকে বজায় রাখত। বর্তমান সময়েও এই অন্ধ ধর্ম বিশ্বাস ও সংস্কারকে পুঁজি করে শোষকশ্রেণীর শোষণ, নিপীড়ন কায়েম রাখার নজির কম নেই। এছাড়া জনগণকে শিক্ষা থেকে বঞ্চিত রাখাও ছিল শোষক শ্রেণীসমূহের একটি সুপরিচিত কৌশল।

বর্তমান সময়ের শ্রেণী বৈষম্য পীড়িত সমাজ কাঠামোয় যার দৃষ্টান্ত প্রচুর। এ ক্ষেত্রে মেহনতী জনগণের অক্ষর পরিচিতি যেখানে বন্ধ করা সম্ভব হয় না সেখানে তারা চেষ্টা করে তাদের চিন্তা শক্তির বিকাশ যাতে না হয় অর্থাৎ তারা যাতে ভাবতে না পারে। তাও যখন বন্ধ করা সম্ভব হয় না তখন তারা চেষ্টা করে ভাবনা যাতে সঠিক পথে না এগিয়ে বিপথগামী হয়।

ইতিহাসের বিভিন্ন পর্যায়ে শোষকশ্রেণীর কলাকৌশল পরিবর্তন হলেও তাদের মূল লক্ষ্যের পরিবর্তন ঘটতে দেখা যায় না। এমন কি ধর্ম, দর্শন, সংস্কৃতি, সাহিত্য সব কিছুকেই যুগে যুগে কাজে লাগনো হয়েছে সংখ্যাগরিষ্ঠের ওপর সংখ্যালঘিষ্ঠের শোষণ শাসন কায়েম রাখার উপরিউক্ত উদ্দেশ্যাবলিকে কেন্দ্র করে ।

ঠিক এ কারণে কোন শ্রেণীবিভক্ত সমাজে মানুষের সৃষ্টিশীলতা এবং সাধারণভাবে জনগণের চেতনার পরিপূর্ণ বিকাশ সম্ভব হয় না। সভ্যতা, সংস্কৃতি ইত্যাদি বলতে যা কিছু বোঝায় সেটিই শ্রেণী বিভক্ত সমাজে সীমাবদ্ধ থাকে, শোষক শ্রেণীর মধ্যে অর্থাৎ মোট জনসংখ্যার ক্ষুদ্র অংশের মধ্যে। জনসংখ্যার অধিকাংশের সৃষ্টিশীলতা তাই দেখা যায় সমাজের ভিত্তিভূমিতে অর্থাৎ উৎপাদন কাঠামোতে। জনগণের এই বিপুল সৃষ্টি ক্ষমতার প্রতিফলন উপরি কাঠামোতে যাতে না ঘটে তার জন্য শোষকশ্রেণী থাকে সদা সতর্ক। তাঁর জন্য তারা আবিষ্কার করে চলে নিত্যনতুন কৌশল ।

পর্যবেক্ষণ করলে দেখা যাবে যে, মানব জাতির মানসিক ও সাংস্কৃতিক বিকাশ সাধারণভাবে শোষকশ্রেণীসমূহ এবং বিশেষভাবে বুর্জোয়া শ্ৰেণী যতখানি ঘটিয়েছে তার থেকে অনেক বেশি করে তারা বাধা প্রদান করেছে, সেই বিকাশকে গভীর ও ব্যাপক করার ক্ষেত্রে। এ প্রসঙ্গে দৃষ্টান্ত হিসেবে বাংলাদেশের প্রেক্ষাপট তুলে ধরা যায়। ১৯৪৭ পরবর্তী উর্দু রাষ্ট্রভাষা দাবির মূলেই ধর্মীয় বিশ্বাস ও সংস্কারকে পুঁজি করে গঠিত কৌশল বুর্জোয়া শ্রেণী শাসনের স্বরূপ চিহ্নিত করে।

শ্রেণী বিভক্ত সমাজে মেহনতি জনগণের অর্থনৈতিক জীবনের উন্নতি এবং সাংস্কৃতিক বিকাশের সম্ভাবনা তাই নিতান্তই ক্ষীণ। শুধু অর্থনৈতিক অথবা রাজনৈতিক ক্ষেত্রে নয়, সাংস্কৃতিক ক্ষেত্রেও আজ বাংলাদেশে সাম্রাজ্যবাদ তথা নয়া উপনিবেশবাদের ব্যাপক অনুপ্রবেশ লক্ষণীয়। এই সঙ্গে বৃদ্ধি পেয়েছে ধর্মীয় ও সাম্প্রদায়িক প্রচারণা। এই প্রচারণাও সাম্রাজ্যবাদী ও মুৎসুদ্দি বুর্জোয়ার অন্যতম হাতিয়ার। এইসব কর্মকাণ্ডের ফলে সংস্কৃতি ক্ষেত্রে এখন বিরাজ করছে এক গভীর নৈরাজ্য ও দিকশূন্যতা।

 

 

বর্তমানে সাম্রাজ্যবাদ শাসিত নয়া উপনিবেশে পরিণত বাংলাদেশে সংখ্যাগরিষ্ঠ শ্রমজীবী মানুষের মূল পরিচয়কে ‘দারিদ্র্য’ -এর মধ্যে আটকে ফেলাতে দেশী ও আর্ন্তজাতিক উভয় শাসকশ্রেণীরই বিশেষ আগ্রহ ধরা পড়ে। এই জনগোষ্ঠী তাই পুঁজিবাদী ও সাম্রাজ্যবাদী শক্তি শাসিত শাসকশ্রেণীর দৃষ্টিতে সক্রিয় সৃজনশীল জীবনযাপনের অভিজ্ঞতার মধ্যে নেই, তাদের পরিচয় তারা দরিদ্র, তাদের কেবলই পয়সার অভাব।

আমাদের দেশে এই পুঁজিবাদের অনুপ্রবেশের কারণে দারিদ্র্য দূরীকরণে দেশ ছেয়ে গেছে এনজিও সংগঠনে। উন্নয়ন, ক্ষমতায়ন, ধর্ম, আর দারিদ্র্য বিমোচনের বাণিজ্য কিংবা প্রহসন থেকে রাষ্ট্রের কোমরে বাঁধা প্রান্তটি যে পুঁজিবাদী শক্তির হাতে তা সহজেই অনুমান করা যায়।

প্রকৃতপক্ষে আমাদের সমাজ সম্পূর্ণরূপেই বিচ্ছিন্ন, শ্রেণীবৈষম্যের চিত্রই এখানে প্রধান। এদেশে অধিকাংশ লোক যে খাবার খায়, অতি অল্প কিছু লোকের কুকুরও এর চেয়ে পুষ্টিকর খাবার খায়। নদীমাতৃক এই দেশে গ্রামের শ্রমজীবীরা গ্রীষ্ম কালে যে পানি পান করে, এই সোনার দেশেই কিছু ভদ্রলোকেরা তা দিয়ে শৌচকার্য করার কথা কল্পনাও করতে পারেন না।

এই বৈপরীত্য আমদের সামজের অলি-গলি, আনাচে-কানাচে পরিপূর্ণ করে আছে। এদেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষের ভয়াবহ দারিদ্র্য আর অকথ্য জীবন সম্পর্কে একটি চিত্র মধ্যবিত্তের মাথায় আছে। এই শ্রেণীর বোদ্ধা ও লেখক শিল্পীরা সেই চিত্রে বিপর্যস্ত হয়ে মধ্যবিত্তের গুমোট, অতিশয় কিলবিলে, স্যাঁতস্যাঁতে, আত্মপ্রতারণার জগৎ থেকে বেরিয়ে আসার চেষ্টা করেন। কেউ কেউ অনেকটা এগিয়ে এসে বিপ্লবী রাজনৈতিক কর্মী হিসেবে ভূমিকা পালনেরও চেষ্টা করেন।
এ দেশে অসংখ্য এরকম কর্মীর ইতিহাস রয়েছে।

মধ্যবিত্তের যে অংশ বিপ্লবী রাজনীতির সাথে যুক্ত হয়ে বিভাগোত্তর কাল থেকে গত কয়েক দশকে অনেক লড়াই-সংগ্রাম, ত্যাগ-তিতিক্ষা অতিক্রম করেছেন, তাঁরা শ্রেণী সচেতন বিপ্লবী পরিচয়কে ধারণ করে আছেন। একই সঙ্গে মধ্যবিত্ত, মধ্যবিত্ত থেকে আসা রাজনৈতিক কর্মী, সম্পত্তিহীন শ্রমজীবী নারী পুরুষ, প্রত্যেকেরই ভূমিকা হয়ে ওঠে শ্রেণী চেতনা সম্পৃক্ত নিষ্পেষণহীন সামাজিক বঞ্চনামুক্ত সমাজব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করা।

এ লক্ষ্য পূরণে যে বাস্তবতা দৃশ্যমান তা হল জনগণের সংস্কৃতি বিকাশের প্রতিবন্ধকতা এবং তাদের অর্থনৈতিক জীবনের শোষণ মুক্তির প্রতিবন্ধকতা অভিন্ন। ঠিক এ কারণেই মেহনতি জনগণের সাংস্কৃতিক বিকাশের সংগ্রাম তাদের অর্থনৈতিক শোষণ মুক্তির সংগ্রামের সাথে ওতপ্রোতভাবে সংযুক্ত।

এক্ষেত্রে শ্রেণী চেতনার বৈপ্লবিক ভূমিকা এই যোগসূত্রকে সঠিকভাবে সক্রিয় করে নির্বিশেষ জনগণের জন্য সৃষ্টি করতে চায় শ্রেণী বিভক্ত সমাজ উচ্ছেদের মাধ্যমে শ্রেণীহীন, শোষণহীন একটি সুস্থ সমাজব্যবস্থা। শ্রেণী চেতনার মহৎ ভূমিকা এভাবেই সমাজতান্ত্রিক বিপ্লবের সাথে অভিন্ন যোগসূত্র স্থাপন করে সমাজিক প্রগতি নিশ্চিত করে।

Exit mobile version