Site icon Literature Gurukul [ সাহিত্য গুরুকুল ] GOLN

বাংলাদেশের উপন্যাসের শৈলীবিচারের অবতরণিকা

বাংলাদেশের উপন্যাসের শৈলীবিচারের অবতরণিকা

আজকে আমাদের আলোচনার বিষয়: বাংলাদেশের উপন্যাসের শৈলীবিচারের অবতরণিকা

 

 

বাংলাদেশের উপন্যাসের শৈলীবিচারের অবতরণিকা

উপন্যাস একটি বিমিশ্র শিল্পাঙ্গিক। শৈলীবিজ্ঞানের সুনির্দিষ্ট দৃষ্টিকোণ থেকে উপন্যাসের নান্দনিক সৌন্দর্য বিশ্লেষণ করা দুরূহ বিষয়। কারণ শৈলীবিজ্ঞান মূলত ভাষাবিজ্ঞানেরই একটি শাখা রচনার ভাষিক উপাদান বিশ্লেষণই এর প্রধান লক্ষ্য। উপন্যাস ভাষিক উপাদানে নির্মিত হলেও এই শিল্পাঙ্গিকের রয়েছে স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্য। জীবনদর্শন, প্লট, চরিত্র, বিষয়, ভাষা সংগঠন, অবয়ব সব মিলিয়ে উপন্যাসের বিশাল শিল্পজগৎ। তাই নিঃসন্দেহে বলা যায়, একমাত্র ভাষা-বিশ্লেষণ দিয়ে উপন্যাসের শৈলী সৌন্দর্য আবিষ্কার করা সম্ভব নয় ।

উপন্যাস কেবল সমাজ ও ব্যক্তির দ্বন্দ্বের স্বরূপ নয়, উপন্যাসে থাকে লেখকের জীবনদর্শন, জীবন সম্পর্কে তাঁর স্বকীয় অভিজ্ঞান। Ralf Fox তাই বলেন- “it is true that all novel writing is a philosophical occupation. T কিন্তু দর্শন যখন শিল্পে রূপ নেয় তখন তা কিভাবে ঘটে। ঔপন্যাসিক কি জীবনদর্শন প্রকাশের জন্য একটা ছক সাজিয়ে নেন, নাকি ভাস্করের মত বাস্তবের মাটি দিয়ে কল্পনার মানুষের মূর্তি গড়ে তোলেন ? বিষয়ের চাপে উপন্যাসের সাজবদল ঘটে, নাকি জীবনদর্শনের অমোঘ প্রযোজনে চরিত্ররা আপন মূর্তি নিয়ে উপন্যাসে শরীর গড়ে তোলে ? উপন্যাসের শৈলী বিচারে এসব বিষয়ের আলোচনাও প্রাসঙ্গিক।

তাই উপন্যাসের শৈলী স্বাতন্ত্র্যকে কেবল ভাষাতত্ত্বের অনুগামী না করে উপন্যাসের নিজস্ব শিল্পবৈশিষ্ট্যের আলোকে বিশ্লেষণ করাই অধিক যুক্তিযুক্ত। ‘যেহেতু বহমান বর্হিবস্তুজগত এবং স্রষ্টার অনুভবসংবেদন মন এদুয়ের জটিল বাস্তবতা একাত্ম হয়ে প্রকাশ ঘটায় রূপের ; সে- কারণে উপন্যাসের ফর্ম নির্মাণের ক্ষেত্রে সাধিত হল জটিলতর রূপান্তর।

 

 

পুটবিন্যাসের কার্যকারণ, চরিত্রের বিকাশক্রম সময়ধারণা ও বাক্যগঠনশৈলীর মাঝে সঞ্চারিত হল এক অস্থির মন ও মননক্রিয়া। সৃষ্টি হল চৈতন্যপ্রবাহরীতির উপন্যাস। পরীক্ষাপ্রিয় ঔপন্যাসিকগণ রচনা করল anit-plot, anti hero ও anti-time উপন্যাস।” তাই রূপকল্প (Form) ও প্রকরণ পরিচর্যা (Treatment) উপন্যাসের শৈলী বিচারের প্রধান প্রতিপাদ্য বিষয় হওয়া উচিত বলে আধুনিক কালের উপন্যাসতাত্ত্বিকরা মনে করেন।

‘শৈলী’ শব্দের অর্থ অভিধানে ‘রীতি’ লেখা হলেও ‘শৈলী’ অর্থে রীতি শব্দে ‘শৈলী’-র সামগ্রিক চারিত্র্য প্রকাশিত হয় না। বাংলায় ‘রীতি’ শব্দটি একার্থ নয়; ‘রীতি’ বলতে বোঝায়-প্রণালী, প্রথা পদ্ধতি, ধরন, ধারা, দম্ভর (সামাজিক রীতি-নীতি, দস্তুর)ইত্যাদি। ইংরেজি Style শব্দের পারিভাষিক অর্থ ‘রীতি’ লেখার ফলে এই অসুবিধার সৃষ্টি হয়েছে।

Style শব্দটি যখন আমরা উচ্চারণ করি তখন বোঝাতে চাই ব্যক্তি বিশেষের স্বকীয় বৈশিষ্ট্য। যেমন, লোকটির কথা বলার স্টাইল, হাঁটার স্টাইল, পোশাকের স্টাইল ইত্যাদি। অর্থাৎ ব্যক্তিত্বের ছাপকল্পনাই স্টাইল শব্দ ব্যবহারের মধ্যে সক্রিয় থাকে।

‘শৈলী’ শব্দের অর্থ ‘রীতি’ বললে আরেকটি বিভ্রান্তি যোগ হওয়ার সম্ভাবনা থাকে। সেটি হচ্ছে ভারতীয় রীতিবাদের ধারণা। সংস্কৃত আলংকারিক দন্ডী, ভামহ-এর মতে ‘রীতিরাত্মা কাব্যস্য’ রীতিই হলো কাব্যের আত্মা। রীতির অর্থ বিশিষ্ট পদরচনার ভঙ্গি।

এই বিশিষ্টতার আত্মা হলো গুণ। এভাবে বৈদভী, গোড়ী, পাঞ্চালী নামে তিনটি রীতি বা কাব্যভঙ্গির কথা বলেছেন তাঁরা। স্টাইল অর্থে ‘রীতি’ ব্যবহারকারীদের মনে সংস্কৃত রীতিবাদের এই ধারণা অজান্তে ছায়া ফেলে গেছে। ‘স্টাইল’ শব্দের বাংলা পরিভাষা হওয়া উচিত শৈলী’। কেননা, স্টাইল বা শৈলী বলতে আমরা মূলত বোঝাতে চাই ব্যক্তিত্বের ছাপ বা বিশেষ বৈশিষ্ট্য। যদিও একই ব্যক্তি বা লেখকের ভিন্ন ভিন্ন রচনার ভিন্ন ভিন্ন শৈলী বা বৈশিষ্ট্য থাকে।

 

 

স্টাইল শব্দটি ল্যাটিন ‘স্টাইলাস’ শব্দ থেকে এসেছে। স্টাইলাস শব্দের অর্থ এক প্রকার লেখন দত্ত। বিশেষ্য পদ হিসেবে Stilistik শব্দটি ইংরেজি অভিধানে স্থান পায় ১৮৪৮ সালে। রচনার বিশেষ রূপ ও ভাবব্যঞ্জক শব্দার্থে Stylistique ফরাসী সাহিত্যের অভিধানে জায়গা করে নেয় ১৮৭২ সালে। ওল্ড ইংলিশ ডিসেনারীতে শব্দটি রেগুলার ওয়ার্ড হিসেবে ব্যবহৃত হয় ১৮৮২-৮৩ সাল থেকে।

ইংরেজি স্টাইল থেকে স্টাইলিস্টিকস্ শব্দের সৃষ্টি। প্রকৃতপক্ষে স্টাইল ও স্টাইলিস্টিকস্, ল্যাঙ্গুয়েজ ও লিঙ্গুইটিকস্ এর মত ভাষা বিজ্ঞানের বিষয়। তবে লিঙ্গুইস্টিকস্ এবং স্টাইলিস্টিকস্ এর মধ্যে পার্থক্য আছে। লিঙ্গুইস্টিকস্ ভাষার স্টাচার বিশ্লেষণ করে আর স্টাইলিস্টিকস্ শুধু স্টাচার নয় রচনার সৌন্দর্য এবং রসাবেদন ও বিশ্লেষণ করে।

কাজেই রচনার সামগ্রিক শিল্পসৌন্দর্য আবিষ্কার করা স্টাইলিস্টিকস্ এর বিষয়। অর্থাৎ রচনার ‘রেটোরিক্যাল এ্যাপিল’ কিভাবে গড়ে উঠেছে, তার পেছনে ভাষার গঠন ও নির্মাণকৌশল কতটুকু অবদান রাখে স্টাইলিস্টিকস্ তার অনুসন্ধান করে। Stylistics এর সংজ্ঞার্থ দিতে গিয়ে Stephen Ullman-Styliscs is not a branch iof linguistics, it is a parallel science which examines the same problmes from a different point of View.

Ullman-এর এই সংজ্ঞার্থের তাৎপর্য হচ্ছে, সাহিত্যকে শুধু ভাষানির্মিতি হিসেবে দেখা নয়, ভাষায় নির্মিত লেখকের কল্পনার মূর্তিরূপকেও দেখা। ভাষায় নির্মিত লেখকের শিল্পমূর্তির মধ্যে একটি অবয়ব কল্পনা থাকে, যার মধ্যে ভাষাও পড়ে।

তাই শৈলীবিজ্ঞানকে একান্তভাবে ভাষাবিজ্ঞান নির্ভর আলোচনার অনুগামী না করে, বলা যায়, বিচারবিভাগের সঙ্গে গোয়েন্দাবিভাগের সে সম্পর্ক খানিকটা সেই রকম সম্পর্ক সমালোচক আর শৈলীবিজ্ঞানীর। তার অর্থ এই নয় যে, বিচারক নিজে গোয়েন্দাগিরির কাজ করবেন না। প্রচুর বিচারক তা করেছেন।

আবার তার অর্থ এও নয় যে, গোয়েন্দা কখনো বিচারক হয়ে উঠবেন না। দুয়ের ভূমিকা যেখানে মিলে যায় সে এক তৃতীয় অবস্থা, বিচারকের গভীর অন্তদৃষ্টি এবং শৈলীবিজ্ঞানীর তথ্যসমৃদ্ধ সাক্ষ্যপ্রমাণ তখন বিচারকের সিদ্ধান্তকে এক প্রবল মৃদভূমির উপর দাঁড় করিয়ে দেয়, বিচারকের অনুমানকে দেয় সত্যের মর্যাদা।” বাংলাদেশের উপন্যাসের শৈলী বিচারের ক্ষেত্রে উপর্যুক্ত দৃষ্টিকোণ অবলম্বণ করা হয়েছে।

“বাংলাদেশের উপন্যাসের শৈলীবিচার (১৯৪৭-১৯৭১) শীর্ষক বর্তমান অভিসন্দর্ভে ‘উপসংহার’ ব্যতীত পাঁচটি অধ্যায় রয়েছে। প্রত্যেকটি অধ্যায়ের প্রারম্ভে সংশ্লিষ্ট শিল্পশৈলী-সংক্রান্ত তত্ত্ব-ব্যাখ্যা সংযোজিত হয়েছে।

প্রথম অধ্যায় “মহাকাব্যিক উপন্যাসের শিল্পশৈলী। এ অংশে আলোচিত হয়েছে শহীদুল্লা কায়সারের ‘সংশপ্তক’ এবং আলাউদ্দিন আল আজাদের ‘ক্ষুধা ও আশা’ উপন্যাস।

 

 

দ্বিতীয় অধ্যায়- ‘চেতনাপ্রবাহ শিল্পশৈলীর উপন্যাস’। সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহ্ ‘চাঁদের অমাবস্যা’ এবং ‘কাঁদো নদী কাঁদো’ উপন্যাসের শিল্পপ্রকৃতি অধ্যায়ে বিশ্লেষিত।

তৃতীয় অধ্যায়- ‘রূপক প্রতীকী শিল্পশৈলীর উপন্যাস’। শওকত ওসমানে ‘ক্রীতদাসের হাসি’, ‘রাজা উপাখ্যান’ এবং ‘সমাগম’ এ অধ্যায়ের আলোচিত উপন্যাস।

চতুর্থ অধ্যায়- ‘মিথ-ইতিহাস-ঐতিহ্যের নবমূল্যায়নধর্মী নতুন শিল্পশৈলীর উপন্যাস’। আবু জাফর শামসুদ্দীনের ‘ভাওয়াল গড়ের উপাখ্যান” এবং সত্যেন সেনের ‘অভিশপ্ত নগরী’ ও ‘পাপের সন্তান’ এ অধ্যায়ে আলোচিত হয়েছে। পঞ্চম অধ্যায়ে আঞ্চলিক জীবনরূপায়নমূলক শিল্পশৈলী’। শহীদুল্লা কায়সারের ‘সারেং বৌ’ এবং আলাউদ্দিন আল আজাদের কর্ণফুলী এ অধ্যায়ের আলোচিত উপন্যাস। সবশেষে সংযোজত হয়েছে ‘উপসংহার’।

আধুনিক উপন্যাসের শৈলীবিচারের ক্ষেত্রে কয়েকটি দিকে বিশেষ দৃষ্টি দেয়া হয়- চেতনাগত দিক, জীবনপর্যবেক্ষণ, সময়ের ব্যবহার, ভাষাতাত্ত্বিক বিবেচনা, আঞ্চলিক জীবন- অবলোকন ইত্যাদি। বর্তমান অভিসন্দর্ভে এসব দিকের প্রতি বিশেষ গুরুত্ব দেয়া হয়েছে। বিষয়কে বাদ দিয়ে উপন্যাসের শৈলীবিচার সম্ভব নয়, তাই উপন্যাসের শৈলীবিচারের সময় অনিবার্যভাবে বিষয়ের আলোচনাও বর্তমান অভিসন্দর্ভে সংযোজিত হয়েছে।”

কালপরিসরে বিপুল সংখ্যক উপন্যাসের প্রকাশ লক্ষ করা গেলেও একথা অনস্বীকার্য যে, এই পর্বের বাংলাদেশের ঔপন্যাসিকরা উপন্যাসের ফর্ম ও প্রকরণ পরিচর্যায় ততটা যত্নশীল নন। সুদীর্ঘকাল ঔপনিবেশিক শাসনের পর ১৯৪৭ সালে দেশ বিভাগ, নব্য ঔপনিবেশিক রাষ্ট্র শক্তির সঙ্গে বাঙালির দ্বন্দ্ব-সংঘাত, ৫২ সালের রক্তাক্ত অভিজ্ঞতা ও ৫৮ সালে সামরিক শাসনের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশে জাতীয় মুক্তির পথে অগ্রসর হয়েছে।

কিন্তু সংকট-সংকুল, জটিলতর জীবন-পরিস্থিতিতে উপন্যাসের নতুনতর ফর্ম উদ্ভাবনের যে অনিবার্যতা প্রত্যাশিত ছিলো, দু’একটি ব্যতিক্রম ছাড়া, তা লক্ষ করা যায় না। সঙ্গত কারণে বিপুল সংখ্যক উপন্যাসের মধ্যে খুব স্বল্পসংখ্যক উপন্যাসকে আলোচ্য শিরোনাম- সমীক্ষায় অন্তর্ভুক্ত করা সম্ভব হয়েছে।

Exit mobile version