আজকে আমাদের আলোচনার বিষয়ঃ শেখ মুজিবুর রহমানের শাসনকাল। যা বাংলাদেশের উপন্যাসে নৈতিক বিবেচনার উপন্যাসে নৈতিক বিবেচনা শ্রেয়ের সন্ধান এর অন্তর্গত।

শেখ মুজিবুর রহমানের শাসনকাল
স্বাধীন বাংলাদেশের মুক্তি-সংগ্রাম হচ্ছে, আর্থ সামাজিক, রাজনৈতিক, সাংস্কৃতিক এবং মানবিক মুক্তির আন্দোলন। রক্তিম স্বাধীনতা অর্জনে জাতির যে আশা আকাঙ্ক্ষা বাস্তবায়নের স্বপ্ন ছিল, তা দেশের সার্বিক পরিস্থিতির কারণে সম্ভব হয়নি। যদিও ১৯৭২ সালে আওয়ামী লীগ সরকার বাংলাদেশকে সংবিধান অনুযায়ী সংসদীয় গণতান্ত্রিক রাষ্ট্ররূপে পরিগণিত করেন।
সার্বিক দৃষ্টিভঙ্গী অনুসারে এই যুদ্ধকে সশস্ত্র সংগ্রাম বলে চিহ্নিত করা যায় না, এবং এর ছিল না কোন স্পষ্ট আদর্শগত এবং দার্শনিক ভিত্তি। তথাপি এটাই ছিল স্বাভাবিক যে, সশস্ত্র অথবা নিরস্ত্র অবস্থায় এই মুক্তি সংগ্রামে অংশগ্রহণকারী লক্ষ লক্ষ মানুষের মধ্যে নতুন আদর্শ ও চেতনা বিস্তৃত হবে। কারণ তাদের স্বপ্ন ও প্রত্যাশা ছিলো একটি মুক্ত ও স্বাধীন জন্মভূমির।
১৯৭২ সালের ১০ জানুয়ারি মহান নেতা হিসেবে শেখ মুজিব বাংলাদেশে প্রত্যাবর্তন করেন। ১১ জানুয়ারি অস্থায়ী সংবিধান আদেশ জারী করেন।
১৯৭২ সালের ২৩ মার্চ গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতি বাংলাদেশে গণপরিষদ আদেশ জারী করেন। সরকার ঘোষণা প্রদান করেন যে, এই আদেশ ১৯৭১ সালের ২৬শে মার্চ থেকে কার্যকর হবে। এই আদেশ অনুসারে ১৯৭০ সালের ডিসেম্বর ও ১৯৭১ সালের জানুয়ারি মাসে নির্বাচিত জাতীয় ও প্রাদেশিক পরিষদ সদস্যগণ এর সদস্য বলে পরিগণিত হবেন।২
১৯৭২ সালের সংবিধানে মৌলিক আদর্শের উপর ভিত্তি করে একটি প্রস্তাবনা এবং ৪টি তফসিল সমেত, বাংলাদেশের জনগণ যে সমস্ত মূলনীতি বাস্তবায়নের জন্য জাতীয় মুক্তির সংগ্রামে অংশ নিয়েছিলেন, সংবিধানের প্রস্তাবনায় সেগুলোর উপর গুরুত্ব দেয়া হয়। এই আদর্শগুলো ছিলো জাতীয়তাবাদ, সমাজতন্ত্র, গণতন্ত্র এবং ধর্মনিরপেক্ষতাবাদ। প্রস্তাবনায় এগুলোকে গণতন্ত্রের ভিত্তিতে শোষণমুক্ত সমাজব্যবস্থা প্রবর্তনের লক্ষ্যে বাস্তবায়ন যোগ্য’ মূলনীতি হিসেবে চিহ্নিত করা হয়।
সেদিনই পুনরায় রাষ্ট্রপতি শেখ মুজিবুর রহমান এক আদেশে রাষ্ট্রপতি শাসিত সরকারের পরিবর্তে সংসদীয় সরকার (Parliamentary Government) প্রবর্তন করেন। সমগ্র বাংলাদেশের ১৯৭০ সালের ডিসেম্বর ও ১৯৭১ সালের জানুয়ারি মাসে নির্বাচিত সকল জাতীয় পরিষদ সদস্য ও পূর্ব পাকিস্তান প্রাদেশিক পরিষদ সদস্য সম্মিলিতভাবে বাংলাদেশের প্রথম গণপরিষদের (First constituent Assembly) সদস্য বলে বিবেচিত হন।

এই প্রথম গণপরিষদের সদস্যগণের উপর সদ্য স্বাধীনতা প্রাপ্ত বাংলাদেশের সংবিধান রচনার ভার অর্পণ করা হয়। ১৯৭২ সালের সংবিধানে সংবিধান প্রধানমন্ত্রীর ভূমিকাই প্রধান বলে স্বীকৃত হয়।
১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর থেকে ১৯৭২ সালের ১৫ ডিসেম্বর পর্যন্ত সময়ে বিভিন্ন ধরণের প্রায় দেড়শত আইন প্রণয়ন করা হয়েছে। এদের মধ্যে বেশ কয়েকটি ছিল মৌলিক আইনের পর্যায়ভুক্ত। ২৬টি আইন পাকিস্তান আমল থেকে প্রচলিত ছিল। অপর একটি আইন সংবিধানের মাধ্যমে রক্ষা করা হয় এবং সংবিধানের সাথে তাদের কোন অসামঞ্জস্যতা নেই বলে স্বীকার করে নেয়া হয়।
এ সময় ১৯৭০-৭১ সালের নির্বাচনে সবগুলি রাজনৈতিক দল থেকে মূল ইস্যু হিসাবে গ্রহণ করা হয় অর্থনৈতিক মুক্তি ও উন্নতির প্রশ্ন। এই দাবির প্রেক্ষাপটে ডানপন্থী ও বামপন্থীদলগুলো তাদের কর্মসূচী ঘোষণা করে। এক সময় মওলানা ভাসানীর ন্যাশনাল আওয়ামি পার্টির প্রগতিশীলতায় আওয়ামী লীগ একটি ডানপন্থী দল হিসেবে পরিচিত ছিল।
১৯৬০ সালে মওলানা ভাসানীর নেতৃত্বে বামপন্থী দলগুলো চীনপন্থী নীতির কারণে আইউব খানকে সমর্থন দিলে আওয়ামী লীগ একটি গণতান্ত্রিক রাজনৈতিক দল হিসেবে তার অবস্থান পুনরুদ্ধারে পুরোপুরি ভাবে সফল হয় এবং মওলানার সৃষ্ট রাজনৈতিক শূন্যতার সুযোগে একটি জাতীয়তাবাদী শক্তি হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে।
১৯৬৫ সালে পাক ভারত যুদ্ধে এবং পূর্ব পাকিস্তানের ৬ দফা দাবির আন্দোলনে আওয়ামী লীগ হয়ে উঠে অত্যন্ত জনপ্রিয় এবং জনপ্রচারণায় থাকে তুঙ্গে। কিন্তু জাতীয়করণ ইস্যুতে ডানপন্থী দলগুলো ইসলামী আদর্শ ও ইসলামী মূল্যবোধের উপর গুরুত্ব দেয়া।
দেশে সমাজতান্ত্রিক অর্থনীতি প্রবর্তনের জন্য প্রয়োজনীয় ন্যূনতম রাজনৈতিক অথবা অর্থনৈতিক ভিত্তি থাকুক আর নাই থাকুক, অনেকদিন এমনকি বাংলাদেশের স্বাধীনতা অর্জনের আগে থেকেই বিভিন্ন আন্দোলনে জড়িত দেশের প্রায় সবগুলো বৃহৎ রাজনৈতিক দলই ছিলো দেশে সমাজতান্ত্রিক অর্থনীতি প্রতিষ্ঠায় ওয়াদাবদ্ধ।
স্বাধীনতা যুদ্ধের পর রাজনৈতিক দলের মাত্রা বেড়ে যায়। শেখ মুজিব স্বাধীনতা সংগ্রামে যারা অংশ গ্রহণ করেননি তাদেরসহ দক্ষিণপন্থীদের দলগুলো বাতিল ঘোষণা করেন। এমতাবস্থায় ১৯৭২ সালের সংবিধানের অধীনে ১৯৭৩ সালের মার্চে দেশে সাধারণ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়।
এই নির্বাচনে ৭টি দল অংশ গ্রহণ করলেও আওয়ামী লীগ নিরঙ্কুশ সংখ্যা গরিষ্ঠতা পায়। অনেক এলাকায় আওয়ামী লীগ ভোট কারচুপি করেছে বলে বিরোধী দলগুলো জানায়। কিন্তু সংখ্যাগরিষ্ঠ ভোটে এগিয়ে থাকায় আওয়ামী লীগের দ্বারা রুগ্ন আর্থ সামাজিক সঙ্কটপূর্ণ স্বাধীন বাংলাদেশে প্রথম সংবিধান সৃষ্টি হয় এবং ১৯৭৩ সালের ১৫ জুলাই জাতীয় সংসদের প্রথম আইন প্রণয়ন ও বিধিবদ্ধ হয়।
গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের জনগণের জন্য ১৯৭২ থেকে ১৯৯২ পর্যন্ত ১২ বার সংবিধান সংশোধনীর প্রয়োজন হয়েছে। সরকার দেশ ও জাতিকে স্বাধীনতার পর একটি গণতান্ত্রিক আদর্শপুষ্ট উন্নত সংবিধান উপহার দিলেও ১৯৭৫ সালের ২৫ জানুয়ারি ৪র্থ সংশোধনী প্রণয়ন করে গণতান্ত্রিক সংবিধানের পরিবর্তে সমাজতান্ত্রিক ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করেন।
বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠায় ১৯৭৩ এর নির্বাচনের পর আওয়ামী লীগ সরকার অর্থনৈতিক পরিকল্পনার পুনর্বিন্যাস করে, ১৯৭৩-৭৮ সালের প্রথম পাঁচসালা পরিকল্পনা প্রণয়ন করেন। এই পাঁচশালা পরিকল্পনার প্রধান উদ্দেশ্য সমাজতান্ত্রিক রূপরেখা প্রণয়ন করা। ফলে ১৯৭৪-৭৫ সালের বার্ষিক উন্নয়ন পরিকল্পনায় দেখা যায়, লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে ব্যর্থ এবং এই তৎপরতা অত্যন্ত নাজুক, অসন্তোষজনক, দুর্বল, ও স্বাবলম্বনহীন।
১৯৭২ সালের ২৩ মার্চ গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতি বাংলাদেশে গণপরিষদ আদেশ জারী করেন। সরকার ঘোষণা প্রদান করেন যে, এই আদেশ ১৯৭১ সালের ২৬শে মার্চ থেকে কার্যকর হবে। এই আদেশ অনুসারে ১৯৭০ সালের ডিসেম্বর ও ১৯৭১ সালের জানুয়ারি মাসে নির্বাচিত জাতীয় ও প্রাদেশিক পরিষদ সদস্যগণ এর সদস্য বলে পরিগণিত হবেন।
দেশ স্বাধীনের পর জনগণ চেয়েছিল শাস্তি-শৃঙ্খলা, নিরাপত্তা, নিজস্ব জমি ও অগ্রগতি। কিন্তু আইন শৃঙ্খলায় দেখা দেয় অস্থিতিশীলতা। ১৯৭৩-৭৪ সনের বাংলাদেশ অত্যন্ত ভয়াবহ রূপ লাভ করে। বিশ্ব বাজারে দ্রব্য মূল্যের স্ফীতি এবং তৈলসংকট।

‘৭৪ এর ভয়াবহ বন্যার করাল গ্রাসে জনজীবন নিমজ্জিত। চারিদিকে অভাব নৈরাশ্য, হতাশাপূর্ণ সদ্যস্বাধীন দেশে জনসাধারণ প্রাণ শক্তি হারাতে বসল। দেশে দুর্ভিক্ষ দেখা দিল চরম ভাবে। বন্যা, খরা মানুষের অভাব কালোবাজারী দালালি ও ডাকাতি বৃদ্ধি পেয়ে স্বাভাবিক জীবনকে আর্থ-সামাজিক, রাজনৈতিক ভাবে ব্যাহত করে তোলে। সুতরাং বঙ্গবন্ধুর শাসনকাল সব মিলিয়ে বঙ্গবন্ধুর শাসনকাল সব মিলিয়ে আর্থ সামাজিক রাষ্ট্রিক দিক থেকে হয়ে ওঠে, অত্যন্ত সংকটপূর্ণ।
The regimes failure on the economy front – its mismanagement of the econ- omy and the continuing high prices of assential commodities – resulted in tremendous economic hardship for the masses of the people… Armed attack on police stations. Which increased in alarming proportion after june 1973, was an indication of the regime’s loss of support in the countryside.
জাতি গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় যাত্রা শুরু করলেও দেশের পরিস্থিতি দুর্নীতি, খাদ্যাভাব, রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দের অনৈতিক কর্মকাণ্ড, রক্ষীবাহিনী এবং সেনাবাহিনীদের বিরোধপূর্ণ আচরণে গণতন্ত্র অনুসারীগণ ক্ষুদ্ধ হয়ে ওঠেন। বেশ কিছু সংখ্যক ডানপন্থী ও বামপন্থী রাজনীতিক এ সুযোগ পূর্ণমাত্রায় গ্রহণ করে।
তাঁরা উপলব্ধি করেন যে, রাজনৈতিক ভাবে আওয়ামী লীগ তথা শেখ মুজিবের নেতৃত্বকে বাধা দেয়া সম্ভব হবে না। তাই তাঁরা সেনাবাহিনীর বিক্ষুব্ধ অংশের সঙ্গে গোপন আঁতাত শুরু করেন এবং পরিশেষে ১৯৭৫ সালের ১৫ই আগস্ট এক সামরিক অভ্যুত্থানের মাধ্যমে শেখ মুজিব তথা আওয়ামী সরকারের পতন ঘটায়।
যুদ্ধোত্তর একটি স্বাধীন ভূখণ্ডের শাসক হয়েছিলেন শেখ মুজিবুর রহমান। প্রশাসনিক ব্যর্থতার কারণে অসম বন্টন ব্যবস্থা, অগণতান্ত্রিকতাই হয়ে দাঁড়িয়ে ছিল তখনকার যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশের পরিস্থিতি।
স্বাধীনতালাভের অব্যবহিত পরবর্তী কালেই আওয়ামী ছাত্র সংগঠনে মতদ্বৈততা দেখা দেয়। এ সময় বেশকিছু বামপন্থীদলের আবির্ভাব ঘটে। তাঁরা আওয়ামী সরকারের বিরোধীতা করে। অল্পকিছুদিনের মধ্যেই একাংশ বৈজ্ঞানিক যুক্তিতে দলের বিভক্তি ঘটায়।
১৯৭৪ সালের শেষার্ধে বাংলাদেশে গুপ্ত বৈপ্লবিক রাজনৈতিক তৎপরতা বৃদ্ধি পায় বহুগুণে। বিভিন্ন গুপ্ত মার্কসবাদী সংগঠন সরকার বিরোধী কর্মকার পরিচালনা করতে থাকে। বিভিন্ন স্থানে গুপ্তহত্যা, খুন ও রাহাজানি চলতে থাকে অবাধে। উদ্দেশ্য ক্ষমতাসীন আত্তামি লীগ সরকারের সুনাম বিনষ্ট করা এবং তাদের মতে বুর্জোয়া শাসনের মূলে কুঠারাঘাত করা।
গুপ্ত সংগঠনগুলোর মধ্যে ছিল বাংলাদেশ কমিউনিস্ট লীগ (BCL), বাংলাদেশ কমিউনিস্ট পার্টি লেনিন বাদী (BCP-L), ইস্ট বেঙ্গল কমিউনিস্ট পার্টি, মার্কসবাদী-লেনিনবাদী (EBCP-ML), বাংলা কমিউনিস্ট পার্টি (BCP), সর্বহারা পার্টি, সাম্যবাদী দল : ১০
ছাত্রলীগের মূল অংশ থেকে বের হয়ে আ.স.ম আবদুর রব ও শাহজাহান সিরাজ একটি নতুন রাজনৈতিক দল (১৯৭২ সালের ৩১ শে অক্টোবর) জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল (জাসদ) গঠন করেন। তাঁরা মস্কোরা বামপন্থী মতের সাথে মিলিত না হয়ে চীনাপন্থীর সাথে তাল মিলিয়ে ১৯৭১ সালের স্বাধীনতা যুদ্ধকে অসমাপ্ত বিপ্লব বলে আখ্যা দেন।
১৯৭৫ সালের পট পরিবর্তনে আওয়ামী লীগের মধ্যে বিভক্তি দেখা দেয় আদর্শগত কর্মসূচী নিয়ে। বাকশালের পক্ষ বিপক্ষের মতামতে আওয়ামী লীগ থেকে মিজানুর রহমান ও ইউসুফ আলী আনুষ্ঠানিক ভাবে বের হয়ে আসে। আরও পরে শেখ মুজিবুর রহমানের মৃত্যুর পর ১৯৭৯ সালের শেষ দিকে মস্কোপন্থী মতিয়া চৌধুরী সহ কতিপয় নেতৃবৃন্দ আওয়ামী লীগে যোগদান করেন।
এদিকে শ্রমিক আন্দোলন থেকে উত্থিত, পেশায় ইঞ্জিনিয়ার কমরেড সিরাজ শিকদার সর্বহারা পার্টির উদ্ভব করেন। এই দলের মতে মুক্তি এবং গণতান্ত্রিক অধিকার আদায় সম্ভব মেহনতি শ্রমজীবী মানুষের সশস্ত্র বিপ্লবের দ্বারা। তাঁরা রাশিয়া ও আমেরিকার সাম্রাজ্যবাদী নীতিকেও উপেক্ষা করে বিপ্লবী সাংগঠনিক তৎপরতায় লিপ্ত হয়ে পড়েন।
স্বাধীনতার পর এদের সাংগঠনিক তৎপরতা মারাত্মকভাবে বৃদ্ধি পায়। জোর পূর্বক বিভিন্ন থানা লুণ্ঠন করে অস্ত্র-শস্ত্র সংগ্রহের জন্য তারা তৎপর হয়ে উঠে। কিন্তু ১৯৭৫ সালের ২রা জানুয়ারি, সিরাজ শিকদার পুলিশ কর্তৃক ধৃত ও নিহত হয়। ১১
মহৎ গুরুদায়িত্ব বহনকারী একজন মডারেট পলিটিশিয়ান এবং লিবারেল ডেমোক্র্যাট হিসেবে পরিচিত শেখ মুজিব মানবাধিকার ও গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা পুনঃপ্রবর্তনের লক্ষ্যে সংগ্রাম করেছেন বছরের পর বছর, সহ্য করেছেন অবর্ণনীয় নির্যাতন। অসংখ্যবার এবং সংখ্যাতীত কারণে শেখ মুজিবকে কারাবরণ করতে হয়েছে এবং জীবনের সৃষ্টিশীল সময়গুলোর বিশালতম অংশ তিনি কাটিয়েছেন কারাভ্যন্তরে।
জনগণের একজন নন্দিত নেতা হিসাবে তিনি চষে বেড়িয়েছেন গ্রাম থেকে গ্রামান্তর। ১২ আর জনগণেরই ভালোর উদ্দেশ্যে দেশ পরিচালনার আইন প্রণয়নে মতবিরোধের জের ধরে মানুষের হাতে নিহত হন এই বৃহৎ মনের অধিকারী অবিসংবাদী নেতা।
১৯৭২ সালে প্রণীত বাংলাদেশের সংবিধানের সংসদীয় গণতন্ত্রের রীতি ছিল। ১৯৭৩ সালের ৭ই এপ্রিল প্রথম জাতীয় সংসদ গঠিত হয়। মুজিব আমলের সংবিধানে চতুর্থ সংশোধনীর মাধ্যমে সংসদীয় শাসনের বদলে রাষ্ট্রপতি শাসন ব্যবস্থা কায়েম হয় এবং দেশে একদলীয় শাসন ব্যবস্থা প্রবর্তিত হয়।

কিন্তু তিনি সদ্য স্বাধীন দেশে বাকশাল পরিণামে সমাজতন্ত্র কায়েম করতে না চেয়ে রাজনীতিবিদদের কাছ থেকে সহযোগিতা নিতে পারতেন। তিনি দেশের হিতার্থে সাময়িকভাবে হয়তো বাকশাল কায়েম করেছিলেন। কিন্তু একথা ঐতিহাসিক ভাবেই সত্য যে, “বাকশাল” প্রবর্তন করে শেখ মুজিব ক্ষমতার অপব্যবহারই করেছিলেন।
রক্তাক্ত যুদ্ধের শেষে মানুষ যে আশা আকাঙ্ক্ষা নিয়ে স্বাধীনতা বাস্তবায়নের ও মানুষের অভাব মোচনের চিন্তা করেছিল তা বাস্তবায়িত না হয়ে বরং জনসাধারণের কণ্ঠ হলো স্তব্ধ। হতাশা নৈরাশ্য ও নৈরাজ্যের সংকটক্ষেত্রে পরিণত হলো মানুষের ব্যক্তিমানস । এই আশাহত সদ্যস্বাধীন দেশে ঔপন্যাসিকগণ মানুষের কল্যাণে, বিপর্যস্ত নিমজ্জিত সমাজ গঠনে উপন্যাস রচনায় হাত দিলেন।
মুক্তিযুদ্ধের পরে দেশে গুণগত ও মানগত পরিবর্তন হয়েছে যথেষ্ট। তার ফলে কেউ হয়েছে অসম্ভব ধনী আবার কেউ হয়েছে উনুলিত বিচ্ছিন্ন। ব্যক্তি অর্জিত স্বপ্ন এবং অস্তিত্ব ধরে রাখতে পারেনি। তাই আমাদের ঔপন্যাসিকগণ উপন্যাস সাহিত্য সৃষ্টিতে স্থান দিলেন স্বপ্নভঙ্গ, সংগ্রাম, স্বাধীনতা যুদ্ধ, লড়াই, ভাষা আন্দোলন, ৬৯এর গণঅভ্যুত্থান ও হতাশামগ্ন জীবন কাঠামোর ক্রমভঙ্গুরতা। ১৯৭১-৭৫ সময় পরিসরে প্রকাশিত উপন্যাসসমূহ-
সরদার জয়েনউদ্দিনের ‘শ্রীমতী ক ও খ এবং শ্রীমান তালেব আলী’ (১৯৭৫), ‘বিধ্বস্ত রোদের ঢেউ’ (১৯৭৫), আবু জাফর শামসুদ্দীনের ‘পদ্মা মেঘনা যমুনা’ (১৯৭৪), অসীম রায়ের ‘আবহমান কাল (১৯৭৫), আমজাদ হোসেনের ‘অবেলায় অসময়’ (১৯৭৫), রাবেয়া খাতুনে ‘ফেরারী সূর্য’ (১৯৭৪), রিজিয়া রহমানের ‘ঘরভাঙ্গা ঘর’ (১৯৭৪), ‘শ্যামল ছায়া’ (১৯৭৩), ‘নির্বাসন’ (১৯৭৪), ‘অচিণপুর’ (১৯৭৪), সেলিনা হোসেনের ‘জলোচ্ছ্বাস’ (১৯৭২), ‘জ্যোস্নায় সূর্য জ্বালা’ (১৯৭৩), আহমদ ছফার ‘ওঙ্কার’ (১৯৭৫), রশীদ করীমের ‘আমার যত গ্লানি’ (১৯৭৩), রশীদ হায়দারের ‘খাঁচায়’ (১৯৭৫), শওকত ওসমান ‘নেকড়ে অরণ্য’ (১৯৭৩), ‘দুই সৈনিক’ (১৯৭৩), সৈয়দ শামসুল হকের ‘খেলারাম খেলে যা’ (১৯৭৩), আনোয়ার পাশার ‘রাইফেল রোটি আওরাত’ (১৯৭৩), সুকান্ত চট্টোপাধ্যায়ের ‘একজন’ (১৯৭৫) প্রভৃতি।
উপরোক্ত উপন্যাস সমূহে উন্মোচিত হয়েছে আর্থ-সামাজিক, রাষ্ট্রিক পরিস্থিতিতে ব্যক্তি ও সামাজিক জীবনে অত্যন্ত অসঙ্গতি, অস্থিরতা, উত্তেজনা, ক্ষোভ ও দ্রোহ। দেশে একটা উপলক্ষকে কেন্দ্র করে রাজনৈতিক ও প্রাকৃতিক বিরুদ্ধাচারণ, দুর্ভিক্ষ ও দুর্যোগ উপস্থিত হয়। মানুষ তা বাধা ও প্রতিরোধ দেয়ার জন্য হয়ে উঠে সংগ্রামী বুর্জোয়া ।
কারণ এ সময়ে প্রশাসন ও আইন শৃঙ্ক্ষলার পরিস্থিতি ছিল অত্যন্ত দুর্বল। আমাদের ঔপন্যাসিকগণ উপন্যাসে তা তুলে ধরতে গিয়ে বাস্তবের কঠিন অবস্থার সম্মুখীন হন। তাই কাহিনী ব্যবচ্ছেদে গ্রহণ করেন রূপক ও প্রতীকধর্মীতা। তাই উপন্যাসে বঙ্গবন্ধুর দেশের জন্য প্রাণান্ত চেষ্টার বক্তব্যে বাংলার মানুষ বাঁচতে চায়, গণতান্ত্রিক অধিকার চায়, মানবিক মূল্যবোধ চায়, প্রতীকী চালচিত্রে উঠে এসেছে অত্যন্ত নির্ভীক ও নির্মোহ কলমের আচড়ে ঔপন্যাসিকদের লেখনী ।