শিশু চরিত্র

আজকে আমাদের আলোচনার বিষয়ঃ শিশু চরিত্র। যা মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের পাঁচটি উপন্যাসে জীবন ও সমাজ এর মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের উপন্যাস জীবন এর অন্তর্গত

 

শিশু চরিত্র

 

শিশু চরিত্র

আলোচিত উপন্যাসগুলোতে শিশু চরিত্রের সংখ্যা তুলনামূলকভাবে কম। কেবলমাত্র ‘জননী’ ও ‘জীবনের জটিলতায়’ শিশু চরিত্র রয়েছে। এর মধ্যে ‘জননীতে সাতটি এবং ‘জীবনের জটিলতায়’ মাত্র দুটি। এই চরিত্রগুলো প্রায় সকলেই লেখাপড়া করে, একটি চরিত্র রাণী গৃহপরিচারিকা। মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় নৈপুণ্যের সঙ্গে শিশু চরিত্রগুলো অংকন করেছেন। নিচে এর বিশদ আলোচনা করা হলো:

উপন্যাস

চরিত্র

পেশা

মন্তব্য

জননী

বিধান

ছাত্র

উপন্যাসের আদ্যপান্ত জড়িয়ে আছে।

জননী

বকুল

ছাত্র

১ম থেকে ৮ম পরিচ্ছেদ পর্যন্ত পাওয়া যায়।

জননী

কানু

ছাত্র

২য় পরিচ্ছেদে পাওয়া যায় ।

জননী

কালু

ছাত্র

২য় পরিচ্ছেদে পাওয়া যায় ।

জননী

রাণী

গৃহপরিচারিকা

১ম থেকে ৬ষ্ঠ পরিচ্ছেদ পর্যন্ত পাওয়া যায়।

জননী

শঙ্কর

ছাত্র

৩য় থেকে ৮ম পরিচ্ছেদ পর্যন্ত পাওয়া যায়।

জননী

শামু

ছাত্র

৯ম পরিচ্ছেদে পাওয়া যায়।

জীবনের জটিলতা

বিমল

ছাত্র

১ম পরিচ্ছেদে পাওয়া যায় ।

জীবনের জটিলতা

প্রমীলা

ছাত্র

১ম পরিচ্ছেদে পাওয়া যায় ।

 

‘জননী’ উপন্যাসে প্রধান শিশু চরিত্র বিধান। বিধানের জন্মের আগে শ্যামার আরো একটি ছেলে হয়েছিল, সে বার দিনে মারা যায়। তাই বিধানের জন্মটা অনেক সাধনার হলেও শ্যামা বলে: “অযত্ন করব না তো। নাওয়াবো, খাওয়াবো, যেমন যেমন দরকার সব করব। তার বেশি কিছু নয়। কী হবে করে?” (১খ, পৃ-২৩)

অনেক যত্ন করে আশার দীপ জ্বেলে প্রথম সন্তানকে শ্যামা বাঁচাতে পারে নি, তাই বিধানের বেলা এই নিয়ম। বিধান বেঁচে থাকুক এই প্রত্যাশায়। শীতলও এই ছেলেকে নিয়ে আশান্বিত। সে বলে:

“এটার কিন্তু পয় আছে শ্যামা। হতে না হতে কমল প্রেসের চাকরিটা পেলাম।” (১খ, পৃ-২৩)

 

শিশু চরিত্র

 

মা-বাবার এমনি আশার দুলুনিতে বিধান বেড়ে উঠেছে। কিন্তু ছেলেবেলা থেকেই লিভার খারাপ হওয়ায় তার শরীর শীর্ণ এবং মাঝে মাঝে অসুখে ভোগে। তবে তার বুদ্ধি আছে, যা শ্যামাকে আশান্বিত করে:

“বুলি ফুটিবার পর হইতেই প্রশ্নে প্রশ্নে সকলকে সে ব্যতিব্যস্ত করিয়া তুলিয়াছে, জগতের দিকে চোখ মেলিয়া চাহিয়া তাহার শিশুচিত্তে যে সহস্র প্রশ্নের সৃষ্টি হয়, প্রত্যেকটির জবাব পাওয়া চাই। মনোজগতে সে দুরে রহস্য থাকিতে দেবে না, তাহার জিজ্ঞাসার তাই সীমা নাই।” (১খ, পৃ-৩৫)

শিশুমন এমনই। ‘কি’ এবং ‘কেন’র উত্তর দিতে দিতে বড়রা হিমশিম খায়। মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় চিরন্তন শিশু মনোবৃত্তিতে বিধান চরিত্রটি এঁকেছেন। শিশু বিধানের চরিত্রে লেখক যেটি অতিরিক্ত সংযোজন করেছেন তা হলো বিধানের নীরবতা:

“দিনের মধ্যে এমন কতগুলি প্রহর আছে শ্যামাকে যখন বাচিয়া ছেলের মুখে মুখরতা আনিতে হয়। বিধান মাঝে মাঝে গম্ভীর হইয়া থাকে। গভীর অন্যমনস্কতায় ডুবিয়া গিয়া সে স্থির হইয়া বসিয়া থাকে, চোখ দুটি উদাসীন হইয়া যায়।” (১খ, পৃ-৩৫)

এখানে বিধানের ভেতরে একটি আশার আলো জ্বালিয়েছেন লেখক। যেন কালে বিধান সমাজে দার্শনিক শ্রেণির একজন হবে। ছোট্ট বিধানের মধ্যে লেখক এক উদাস গাম্ভীর্যতা এঁকেছেন।

বিধান সাধারণ শিশুর মতো হয় নি। একদিকে তার যেমন মমতা, অন্যদিকে তেমনি নির্মমতা। এই বৈশিষ্ট্য শিশুদের ক্ষেত্রে একটু অস্বাভাবিক, খাপছাড়া, অদ্ভুত প্রকৃতির । যে বিড়ালকে সে ভালোবাসে, খাওয়ায়, সেই বিড়ালকেই গলায় দড়ি বেঁধে জানালার শিকের সঙ্গে ঝুলিয়ে কাঁদতে কাঁদতে মৃত্যুযন্ত্রণা দেখে। আবার একদিন কুড়িয়ে পাওয়া পাখির ছানাকে সে খাঁচায় রেখে সম্মানিত অতিথির মতো ছাতু-জলখাবার দিচ্ছিল। এক দুপুর বেলা সে নিজে হাতে পাখিটিকে ঘাড় মটকিয়ে মেরে ফেললো ।

 

শিশু চরিত্র

 

“শ্যামা আসিয়া দেখে মরা পাখির ছানাটিকে আগলাইয়া বিধান যেন পুত্রশোকেই আকুল হইয়া কাঁদিতেছে।” (১খ, পৃ-৩৬)

শিশু বিধানের এ রকম প্রকৃতি দেখে তার বাবা-মা আতঙ্কিত হয়। শ্যামার মার খেয়েও বিধানের এ স্বভাব যায় না।

বিধান বুদ্ধিদীপ্ত। যে কোনো কথা অনেক শিশুর চেয়ে বেশি মনে রাখতে পারে এবং ঠিক সময়ে বলতেও পারে। শিশুদের যে নানা রকম শিশুসুলভ আচরণ রয়েছে তা অনৰ্থক বলে লেখক তাকে অবজ্ঞা করেননি। বিধানের মধ্যে শিশুসুলভ বায়না, বিভিন্ন জিনিসের অর্থ জিজ্ঞাসা করা ইত্যাদি দেখা যায়। শিশুরা নিজের ইচ্ছেকে বেশি প্রাধান্য দেয়। এর বাস্তবিক চিত্র বিধানে রয়েছে। শ্যামা তাকে অনর্থক টর্চের আলো জ্বেলে ব্যাটারি খরচ করতে নিষেধ করলেও বিধান তা শোনে নাঃ

“একটু পরেই ঘরে টর্চের আলো বারকয়েক জ্বলিয়া নিভিয়া যায়, দেয়ালের গায়ে টিকটিকির ডাক শুনিয়া বিধান তাকে খুঁজিয়া বাহির করে। “(১খ, পৃ-৩৯)

বিধানের মধ্যে যে মাতৃভক্তি দেখা যায়, শিশু বিধানের মধ্যেই তার সূচনা হয়েছিল। শিশুকালেই মাকে সে সাহায্য করত। শীতল সন্ধ্যায় না এলে বিধান ছোট বকুলকে কোলে করে রাখত।

এরপর শুরু হয় বিধানের স্কুলজীবন। সে ধনী বিষ্ণুপ্রিয়ার বোনের ছেলে শঙ্করের সঙ্গে তাদের গাড়িতে স্কুলে যায়। স্কুল শিশুদের নিজস্ব স্থান। বাবা-মায়ের বিধিনিষেধ না মেনে ইচ্ছেমত খেলা যায়, খাওয়া যায়। বিধানও প্রথম দিন স্কুলে গিয়ে ফুলুরি আর ঝাল বড়া খেয়ে পেট ব্যাথা বানিয়ে আনে।

স্কুল থেকে সে অনেক শব্দ আর সংকেত শিখে আসে, যার তল শ্যামা পায় না। বাড়িতে বিধানের জিজ্ঞাসা কমে যায়। শিশু বিধানের নতুন জগৎ গড়ে ওঠে। আস্তে আস্তে তার মন বাইরের পৃথিবীতে বিচরণ করে। এ সময়ই বিধান বাড়িতে না বলে চিড়িয়াখানায় যায়। সে স্বাবলম্বী হয়ে ওঠে।

বিধানের শিশুমন ভালোমন্স বুঝতে শেখে। তাই সে শীতলের জীবনযাপন পছন্দ করে না। শীতলকে লজ্জা দেওয়ার জন্য ইংরেজি শব্দের মানে জিজ্ঞাসা করে। আবার শীতল জেলে গেলে শীতল সম্পর্কে সে কোনো প্রশ্ন উত্থাপন করে না। যেন তার কোনো বাবা নেই, কখনো ছিল না। শিশু বিধানের মধ্যেই জন্ম নেয় প্রবল ব্যক্তিত্ববোধ আর দৃঢ় চেতনা।

শীতলের জেলে যাওয়ার পর বিধানকে না নিয়ে শঙ্করের গাড়ি স্কুলে চলে যায়। পরদিন আবার গেলে ড্রাইভার তাকে গাড়িতে উঠতে বারণ করে, বিষ্ণুপ্রিয়া নিষেধ করেছে। এতে বিধানের শিশুমন অপমানিত হয়। শ্যামাও দুপুরবেলা গিয়ে বিষ্ণুপ্রিয়ার সঙ্গে দেখা করতে পারে দোতলায় যাওয়া নিষেধ আছে। শ্যামা বাড়ি ফিরলে বিধান বলে

“ওদের গাড়িতে আমি আর স্কুলে যাব না মা, কখখনো কোনোদিন যাব না।” (১খ, (পৃ-৬৭)

বিধানের আত্মপ্রত্যয় দেখে শ্যামা খুশি হয়, তার ভেতরের ব্যক্তিত্ব জাগ্রত হয়। বিধান ট্রামে করে স্কুলে যাবে। সে তার মাকে চিন্তা করতে নিষেধ করে। শঙ্কর বিধানের কাছে আসলে সে বিধানের সঙ্গে কথা বলে না। অবশেষে শ্যামার বকুনিতে দুজনের মিলন হয়। এ মিলন তাদের বরাবর থাকে। কিন্তু গরমে শঙ্কররা দার্জিলিং যাবে, বিধানকে যেতে বললে সে কিছুতেই রাজি হয় না। বিধান বনগাঁ গিয়েও প্রত্যয়ী থাকে, তাই শঙ্করের বনগাঁ আসা উপলক্ষে সে স্কুল কামাই করে না। তাকে ফার্স্ট হতেই হবে। ভবিষ্যতের কত কল্পনা সে করে। সে শ্যামাকে বলে:

“বড়ো হইয়া সে মস্ত চাকরি করিবে, তারপর শঙ্করের মতো একটা মটর কিনবে।” ‘(১৭, পৃ.-৮৪-৮৫)

 

শিশু চরিত্র

 

শিশুমন অভিমান ভুলে যায় নি, অপমানের কথা এত দিনেও মনে রেখেছে। অবশেষে বিধান ক্লাসে ফার্স্ট হয়ে উত্তীর্ণ হয়। শিশু মনের এই দৃঢ় মনোভাব বাস্তবের সঙ্গে একাকার করেছেন লেখক।

উপন্যাসের আরেকটি শিশু চরিত্র বকুল। মেয়ে বলে শ্যামার কাছে তার খাতির নেই। আমাদের বাস্তব জীবনের চিত্রই তাই। মেয়ের লেখাপড়া দরকার নেই, ভালো খাওয়ার দরকার নেই, যা তা একখানা কাপড় পরলেই চলে। ছয় বছর বয়সে সে বুড়ি। মায়ের কাজে সে সাহায্য করবে। সংসারের হাল-চাল বুঝে চলবে। শ্যামার কাছে বকুলের জীবনও এমনিভাবে শুরু হল। শ্যামা ‘সময় পাইলে প্রথম ভাগ খুলিয়া একটু একটু পড়ায়।’ (১খ, পৃ-৪৪)

এমনি বকুলের জীবন। বকুল দেখতে সুন্দর, দুরন্ত, কিন্তু বুদ্ধি একটু কম। অক্ষর চিনতেই তার একমাস লেগেছে। পড়াতে বসে শ্যামা তাকে মারে আবার বিধানও মারে। কিন্তু শিশু বকুলের মধ্যে একটি নিজস্বতা তৈরি হয়।

“বকুল বড়ো অভিমানী মেয়ে, কারও সামনে নে কখনও কাঁদে না; ছাদে চিলেকুঠির দেয়াল আর আলিসার মাঝখানে তাহার একটি হাতখানেক ফাঁক গোসাঘর আছে, সেইখানে নিজেকে গুঁজিয়া দিয়া সে কাঁদে। তারপর গোসাঘরখানাকে পুতুলের ঘর বানাইয়া সে খেলা করে। যে পুতুলটি তাহার ছেলের বউ তার সঙ্গে বকুলের বড়ো ভাব, দু জনে যেন সই। তাকে শোনাইয়া সেসব মনের কথা বলে। বলে, বাবাকে সব বলে দেব, বাবা দাদাকে মারবে, মাকেও মারবে, মারবে না ভাই বউমা?” (১খ, পৃ- ৪৫)

বকুল আত্মমগ্ন। আপন মনেই খেলা করে। বাইরের কলুষতা তাকে ছোঁয় না। সকলের অনাদর অবহেলাকে উপেক্ষা করে সে আপন ভুবনে ডুব দেয়। এই আত্মমগ্নতা বনগাঁ গিয়েও বকুলের মধ্যে থাকে। এমনকি বড় হওয়ার পরও তা বিদ্যমান। শিশু বকুল ভালোবাসে শীতলকে। বকুলের স্বাস্থ্য ভালো, দেখতে ভালো তাই সকলেই তাকে ভালোবাসতে চায়, কিন্তু বকুল কাউকে ধরা দেয় না, ‘নির্মমভাবে উপেক্ষা করিয়া চলে (৫৫)। শ্যামার সঙ্গেও তার ভাব নেই। শুধু শীতলের জন্য সে পাগল:

“মেয়েটার মন বড়ো বিচিত্র, যা কিছু খাপছাড়া যা কিছু অসাধারণ তাই সে ভালোবাসে। শীতলও বোধহয় খোঁড়া কুকুর, লোম ওঠা ঘা ওলা বিড়াল, ভাঙা পুতুল এই সবের পর্যায়ে পড়ে, বকুল তাই, শ্যামার ভাষায় বাবা বলিতে অজ্ঞান।” (১খ, পৃ- ৫৫)

বকুলের যেমন অভিমান তেমনি জেল। একবার কোনো কথা বললে তা করা চাই। শ্যামা পায়েস রান্না করে বকুলকে খেতে বললে সে বলে বাবা দুটোর সময় আসবে। শ্যামাও বকুলের সঙ্গে জেদ ধরে, এভাবে শ্যামা তাকে জোর করে খাওয়াতে যায়, বকুল দাঁতে দাঁত চেপে থাকে। এবার বকুলের জেদ আরো বেড়ে যায়।

 

শিশু চরিত্র

 

শীতল দুটোর সময় আসলে তারা পরামর্শ করে বাইরে চলে যায়। দুজনের কেউ পায়েস খায় না। এরই জের ধরে শীতল বকুলকে নিয়ে নিরুদ্দেশ হয়। তখন শিশু বকুল বিপাকে পড়ে। যে শিশু জগতের ভালোমন্দ জানে না, প্রকৃতির নিষ্ঠুরতা জানে না, বেঁচে থাকার নির্মমতা বোঝে না, তাকে নিয়ে শীতল দিরুদ্দেশ হয়, এতে বকুলের ওপর অনেক ঝড়ই বয়ে চলে। শীতের সময়ে একটি মাত্র আলোয়ান তার গায়ে, ঠকঠক করে সে কাঁপছে।

যখন বকুলকে নিয়ে শীতল বাড়ি এলো তখন তার ঠোঁট ফেটে গেছে, গাল ফেটেছে, মরা চামড়া উঠে মুখ বীভৎস দেখাচ্ছে। তারপরও শীতলের ওপর থেকে তার মমতা উঠে যায় না। শীতল জেলে গেলে পুতুল খেলতে খেলতে গোপনে সে শীতলের জন্য কাঁদে। এতটুকু মেয়েও গোপনে কান্না শিখেছে। বকুলের প্রকৃতি এতোটাই আত্মনিয়ন্ত্রণলীল

“এ বাড়ির সেই জেলের কয়েদিটাকে ও ছাড়া আর তো কেহ কোনোদিন ভালোবাসে নাই।” (১খ, পৃ-৬৮)

বনগাঁ যাওয়ার পর সংসারের একটি প্রতিকূল পরিস্থিতিতে বকুল মা, ভাইবোন সকলকে ভালোবেসে ফেললো। সুপ্রভা যখর বকুলকে এটা-ওটা ভালো খাবার খেতে দেয় তখন সে ভাইদের দিতে বলে, একা কোনো জিনিস খায় না। বকুলের এই মায়াভরা মনকে সুপ্রভার খুব ভালো লাগে। সুপ্রভা বারবার করে বলেঃ

“যেমন দেখিতে সুন্দর, তেমনি মিষ্টি স্বভাব, ও যেন রাজরানি হয় ভগমান।” (১খ, পৃ-৮২)

কিন্তু এই বকুল দুবছর পর শীতল জেল থেকে বাড়ি এলে তাকে অস্বীকার করে বলেছিল ‘ও আমার বাবা নয়’।

শিশু বকুলের মধ্যে মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় ফ্রয়েডীয় মনস্তত্ত্ব দেখিয়েছেন। শঙ্করের প্রতি বকুলের যে টান তা সে সাক্ষ্য দেয়। কবে বকুলের কাছে শঙ্কর প্রতিজ্ঞা করেছিল পুজোর সময় সে বনগাঁ আসবে, তা কেউ জানে না। কিন্তু শঙ্কর পরে এলে বকুল অভিমান করে। যে বকুল মারলে কাঁদে না সে কিন্তু শঙ্করের পা কেটে রক্ত বের হলে ‘হাউহাউ করিয়া কাঁদিতে থাকে।’ (৮৬)

আবার পা কাটার কারণে শঙ্কর বাইরে ব্যথায় বাইরে যেতে পারে নি, বকুল তখন সারা সময় শঙ্করকে দখল করে রেখেছে। তিন দিন পর শঙ্কর চলে গেলে সে মনমরা হয়েছিল। -এ সবের ভিত্তিতে আমরা বলতে পারি লেখক এখানে ফ্রয়েডীয় মনস্তত্ত্বের অবতারণা করেছেন। বকুলের শিশু বেলাটা দেখলে তার পূর্ণাঙ্গ নারী চরিত্রের পূর্ভাবাস পাওয়া যায়।

বিষ্ণুপ্রিয়ার বোনের ছেলে শব্দরও শিশু চরিত্র। সে সরল এবং লাজুক। উপন্যাসে শিশু হিসেবে তাকে দুবার পাওয়া যায়। একবার সে বিধানের অভিমান ভাঙতে এসেছিল শ্যামার শহরতলীর বাড়িতে। বড়রা যখন বিধানদের অবজ্ঞা করছে, তখন শঙ্করের শিশুমন কোনো ভেদাভেদ মানে নি, বিধানকে সে বন্ধু ভেবেছে এবং যত দিন তারা নিজেদের বাড়ি থেকেছে তত দিন শঙ্কর আন্তরিকভাবে ওদের সঙ্গে মিশেছে, খেলেছে। তারপর আরেকবার পাওয়া যায় বনগাঁ গিয়েছিল। শঙ্কর। সেখানেও সে সাবলীল। শ্যামাকে গরিব বলে অবজ্ঞা করে নি, পা ছুঁয়ে প্রণাম করেছে। বকুল, কালু, কানু সকলের সঙ্গে মিশেছে।

 

শিশু চরিত্র

 

এ উপন্যাসে কালু, কানু নামে মন্দার দুই ছেলের শিশু চরিত্র পাওয়া যায়। তবে তারা পূর্ণাঙ্গ। ভাবে আসে নি। লেখক এদের কাহিনীর প্রয়োজনে এনেছেন। এরা দুজন খুব দুরস্ত। তারা মায়ের চেয়ে ঠাকুর মায়ের প্রতি বেশি আগ্রহী। শ্যামার আরো দুটি ছেলে মণি আর ফপি এবং তার অন্ধ মেয়ে খুকি শিশু চরিত্র। তবে এদের কোনো সক্রিয়তা দেখা যায় না। কেবল অন্ধ খুকির জন্য শ্যামার মাতৃহৃদয়ে হাহাকার ওঠে। শ্যামা আরো একটি শিশুর জন্য কষ্ট পেয়েছিল, সে মন্দার অসুস্থ মেয়ে, যে হাঁটতে পারে না, মুখ দিয়ে সব সময় লালা পড়ে।

মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় জীবনকে দেখেছেন বিভিন্ন দিক থেকে বিভিন্নভাবে। তাই জীবনের প্রতিটি খুঁটিনাটি বিষয় তার লেখায় উঠে এসেছে। ‘জীবনের জটিলতা’ উপন্যাসে মাত্র একটি পরিচ্ছেদে শিশু বিমল আর শিশু প্রমীলার কথা তিনি বলেছেন, কিন্তু শিশুদের প্রকৃতি বুঝতে অসুবিধা হয় না, এমন কি পারিবারিক ও সামাজিক পরিস্থিতিও বোঝা গেছে সমূলে।

বিমল আর প্রমীলা দু ভাইবোন। তাদের দুজনের হৃদ্যতা যেমন আছে, তেমনি তারা একে অন্যের সঙ্গে সংঘাতেও পটু। আবহমান বাংলার দৃশ্যও তাই। শিশুরা অসংলগ্ন কিছু করবে এটাই নিয়ম। বিমল আর প্রমীলাও এর ব্যতিক্রম নয়। তবে প্রমীলা বিমলের চেয়ে তুলনামুলক শান্ত। উপন্যাসের শুরুতে সকাল বেলা তাদের মা তাদের হাতে একটি করে পয়সা দিয়েছে মুড়ি কিনে খাওয়ার জন্য।

বিমল নতুন বিড়ি খাওয়া শিখেছে, সে বিড়ি কিনে পুকুরপাড়ে তিনটা বিড়ি শেষ করে পড়তে বসল। আর প্রমীলা দোকানে যাওয়ার পথে কুড়িয়ে পেল একটা সিকি। এই সিকি নিয়েই দুটি শিশুমনকে মানিক ফুটিয়ে তুলেছেন। প্রমীলার হাতে সিকি দেখে বিমল নিজের বলে দাবি করে। হই চই-এ তাদের মা এসে সিকিটি নিয়ে গেলে প্রমীলা কাঁদতে থাকলে বিমলের ভেতর আত্মধিক্কারের জন্ম নেয়, প্রমীলার জন্য তার মন কাঁদে। সে বিভিন্নভাবে চেষ্টা করে প্রমীলার সিকি জোগাড়ের, কিন্তু পারে না।

অবশেষে মুদির দোকান থেকে মায়ের জিনিস আনতে গিয়ে সে প্রমীলার পাওয়া অচল সিকিটি মাকে ফেরত দেয়। আর বোনকে পয়সা দেয় মোটর কেনার জন্য। একটি পয়সাও সে নিজের জন্য রাখে নি, শুধু প্রমীলার মুখে হাসি ফোটানোর জন্য, প্রমীলার কাছে যে অপরাধ করেছে তা খণ্ডনের জন্য। এখানে বিমলের শিশুমনে দুষ্টুমির পাশাপাশি একটি কোমল মনের পরিচয় পাওয়া যায়।

অন্যদিকে প্রমীলাকে দেখা যায় ভাইয়ের কাছে মা-বাবার কাছে একটি অসহায় শিশু হিসেবে। তাকে কেউ বোঝে না। ভাই তাকে খুব জ্বালা-যন্ত্রণা করে। কিন্তু পয়সা পাওয়ার পর মনে হয় ভাই তাকে ভালোও বাসে। শিশু বয়সে ভাইবোনের যে খুনসুটি লেগেই থাকে তাও লেখক উপস্থাপন করেছেন।

 

শিশু চরিত্র

 

“সাদার এই লাভের হিসাবটা প্রমীলা কোনোদিন বুঝিতে পারে না। সেদিন জলের কলসি ভাঙিয়া ফেলার কথাটা বলিয়া দিয়া ওর লাভ কী হইয়াছিল? স্কুল হইতে রঙিন মলাটের ছবির বই আনিয়া সে তাহাকে দেখিতে দেয় না অনেক পায়ে পড়িলে দেয়। সে তার পুতুল লুকাইয়া রাখে, তাকে মিছিমিছি কাঁদায়, তার চুল ধরিয়া টানিতে ভালোবাসে।” (২খ,পৃ-১০২)

শিশুদের এই চালচিত্র বাংলার প্রতিটি ঘরেই বিদ্যমান। এভাবে মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় বাস্তবিক ঘরের জীবন চিত্রই এঁকেছেনঃ

“আমাদের ব্যক্তিগত, পারিবারিক, সামাজিক জীবনের সবকিছুকে সব মূল্যবোধকে যাচাই করে দেখার সূচনা হল মানিকের উপন্যাসে। সূক্ষ্ম বিচারে মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের প্রভাব তাঁর পরবর্তীদের মধ্যে কেউ-ই অতিক্রম করতে পারেন নি । ৫৮

শিশুমনের সরলতা, অকারণ নিষ্ঠুরতা, নানা রকম আগ্রহ, প্রশ্নের পর প্রশ্ন, মানুষের প্রতি বিশ্বাস, উদ্ভট আচরণ, অন্যায়কে বর্জন করা, কোনো কারণ ছাড়াই একটি কাজ করা এবং সেই কাজ করার পর আবার তার সুখী অথবা দুঃখী প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করা সকল কিছুই মানিক তাঁর শিশু চরিত্রগুলিতে দেখিয়েছেন। উচ্চবিত্ত, মধ্যবিত্ত এবং নিম্নবিত্ত সকল শ্রেণির শিশু চরিত্রই মানিকের উপন্যাসগুলোতে উঠে এসেছে। শ্রেণি অনুযায়ী তাদের চারিত্রিক বৈশিষ্ট্যও ফুটে উঠেছে।

Leave a Comment