Site icon Literature Gurukul [ সাহিত্য গুরুকুল ] GOLN

সৈয়দ শামসুল হকের কাব্যনাটক : ইতিহাস, সমাজ, রাজনীতি ও শিল্প এর সূচিপত্র [পিএইচডি অভিসন্দর্ভ] – জান্নাত আরা সোহেলী

সৈয়দ শামসুল হকের কাব্যনাটক : ইতিহাস, সমাজ, রাজনীতি ও শিল্প এর সূচিপত্র [পিএইচডি অভিসন্দর্ভ] – সোহেলী, জান্নাত আরা। এই অভিসন্দর্ভের (পিএইচডি) বিষয় বাংলা নাটক – ইতিহাস ও সমালোচনা। প্রকাশিত হয়েছিল বাংলা বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, শিক্ষাবর্ষ: ২০১৭-২০১৮। গবেষণাকর্মটি সাহিত্যের শিক্ষার্থীদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ হওয়ায় আমরা সাহিত্য গুরুকুলে পুন-প্রকাশ করলাম।

 

সৈয়দ শামসুল হকের কাব্যনাটক : ইতিহাস, সমাজ, রাজনীতি ও শিল্প এর সূচিপত্র

সৈয়দ শামসুল হকের কাব্যনাটক : ইতিহাস, সমাজ, রাজনীতি ও শিল্প আমার ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, বাংলা বিভাগ থেকে পিএইচ. ডি. ডিগ্রি অর্জনের জন্য প্রস্তুতকৃত অভিসন্দর্ভ। এ বিষয়ে গবেষণার জন্য আমি বাংলাদেশ বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরী কমিশন থেকে বৃত্তিপ্রাপ্ত হই এবং আমার কর্মস্থল জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন আমাকে প্রয়োজনীয় শিক্ষাছুটি প্রদান করে। এ দুটি প্রতিষ্ঠানের প্রতি আন্তরিক কৃতজ্ঞতা জানাই।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় বাংলা বিভাগের প্রফেসর, আমার পরম শ্রদ্ধেয় শিক্ষক, ডক্টর মোহাম্মদ গিয়াসউদ্দিনের (গিয়াস শামীম) তত্ত্বাবধানে রচিত হয়েছে এ-অভিসন্দর্ভ। গবেষণা- পরিকল্পনা প্রণয়ন ও গবেষণার বিভিন্ন পর্বে তাঁর অভিজ্ঞতাসমৃদ্ধ মতামত, নির্দেশনা, সিদ্ধান্ত আমাকে দুরূহ প্রসঙ্গসমূহের মীমাংসায় প্রভূত সাহায্য করেছে। তাঁর কাছে আমার ঋণ অপরিসীম। গবেষণাকালে আমি স্যারের ব্যক্তিগত গ্রন্থাগার অবাধে ব্যবহার করেছি। এসময় স্যারের সহধর্মিনী, আমাদের প্রিয় লুৎফুননাহার শেলি ভাবির সস্নেহ আপ্যায়ন শ্রমক্লান্তি দূর করেছে। তাঁর প্রতি জানাই আন্তরিক ভালোবাসা ।

 

 

গবেষণার বিভিন্ন পর্যায়ে যাঁরা আমাকে নিরন্তর উৎসাহ যুগিয়েছেন তাঁদের মধ্যে জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় বাংলা বিভাগের সহকারী অধ্যাপক শরীফ সিরাজ, পাবনা বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় বাংলা বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক মীর হুমায়ূন কবীর বিপ্লব, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় বাংলা বিভাগের সহকারী অধ্যাপক তানিম জসিম, বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয় বাংলা বিভাগের সহকারী অধ্যাপক মোহসিনা হোসাইনের নাম বিশেষভাবে স্মরণ করছি।

গবেষণার শুরু থেকেই ব্যক্তিগত গ্রন্থাগার ব্যবহারের সুযোগ দিয়েছেন জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় বাংলা বিভাগের অধ্যাপক ডক্টর চঞ্চল কুমার বোস, ডক্টর আরজুমন্দ আরা বানু, ডক্টর পারভীন আক্তার জেমী, সহযোগী অধ্যাপক ডক্টর শিল্পী খানম। তাঁদের সকলের প্রতি আন্তরিক কৃতজ্ঞতা জানাই।

করোনা মহামারীকালে গৃহবন্দী অবস্থায় যখন তথ্যসংগ্রহ কষ্টসাধ্য হয়ে পড়ছিল, তখন প্রয়োজনীয় কিছু গ্রন্থ ও পত্রিকা প্রদান করে সাহায্যের হাত বাড়িয়েছেন জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় বাংলা বিভাগের অধ্যাপক ডক্টর হোসনে আরা জলী, সহযোগী অধ্যাপক ডক্টর রাহেল রাজীব, ইতিহাস বিভাগের সহকারী অধ্যাপক তপন পালিত । তাঁদের তিনজনকে জানাই আন্তরিক শ্রদ্ধা ও ধন্যবাদ।

 

 

গবেষণাকালে আমি প্রধানত ব্যক্তিগত সংগ্রহের উপর বেশি নির্ভর করেছি। এছাড়া সহায়তা নিয়েছি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় গ্রন্থাগার; বাংলা বিভাগের মুহম্মদ আবদুল হাই স্মৃতি পাঠকক্ষ; জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় বাংলা বিভাগ, ইংরেজি বিভাগ ও ইতিহাস বিভাগ গ্রন্থাগারের। এসব গ্রন্থাগারের কর্মকর্তা ও কর্মচারীর প্রতিও আন্তরিক কৃতজ্ঞতা জানাই ।

গবেষণার দীর্ঘসময়ে সন্তান ও সংসারের দায় থেকে মুক্ত রেখে গবেষণা-বান্ধব পরিবেশ তৈরি করে দিতে আমার আব্বা ও আম্মার যে অপরিসীম ত্যাগ, তা সমস্ত কৃতজ্ঞতা প্রকাশের ঊর্ধ্বে। অগ্রজ তিন ভাই, বিশেষত বড় ভাই আবুল বাশারের সস্নেহ তাগিদ ও পরামর্শ আমাকে গবেষণাকর্ম সম্পাদনে যারপরনাই অনুপ্রাণিত করেছে। তাঁদের সকলের প্রতি আমার আন্তরিক শ্রদ্ধা ও অনিঃশেষ ভালোবাসা।

নিজের পেশাগত শত ব্যস্ততার পরও থিসিস সম্পাদনের দীর্ঘ যাত্রায় সকল কারিগরি সহায়তা-পরামর্শ প্রদান এবং পাশে থেকে একনিষ্ঠ সমর্থন যুগিয়েছে আমার জীবনসঙ্গী ওবায়েদ শিশির। শ্রমক্লান্ত মুহূর্তে আত্মজা নৈসর্গিক নামিরা ও আত্মজ নির্ভীক জুলকারনাইনের নিষ্পাপ মুখশ্রী আমাকে তৃপ্ত করেছে। এরা সকলেই আমার নিরন্তর প্রেরণার উৎস।

 

প্রথম অধ্যায় : সৈয়দ শামসুল হকের কাব্যনাট্য

প্রথম পরিচ্ছেদ : কাব্যনাট্যের সংজ্ঞার্থ ও স্বরূপ

দ্বিতীয় পরিচ্ছেদ : বাংলাদেশের কাব্যনাট্যের পরিপ্রেক্ষিত ও ধারা

 

দ্বিতীয় অধ্যায় : সৈয়দ শামসুল হকের কাব্যনাট্য

প্রথম পরিচ্ছেদ : সৈয়দ শামসুল হকের ইতিহাস-নির্ভর কাব্যনাটক

দ্বিতীয় পরিচ্ছেদ : সৈয়দ শামসুল হকের সামাজিক কাব্যনাটক

তৃতীয় পরিচ্ছেদ : সৈয়দ শামসুল হকের রাজনীতি-আশ্রিত কাব্যনাটক

চতুর্থ পরিচ্ছেদ : শৈলিবিচার

 

সৈয়দ শামসুল হকের কাব্যনাটকের উপসংহার

কাব্যগুণ ও নাট্যগুণের মিলিত সমবায়ে নির্মিত হয় একটি সফল কাব্যনাটক; যেখানে ঘটনার ঘাত-প্রতিঘাতে সৃষ্ট পরিণামের তুলনায় চরিত্রের অন্তর্দহন, ব্যক্তিক চিন্তা-চেতনার প্রতিফলন মুখ্য হয়ে ওঠে। অর্থাৎ কাব্যনাটকে বর্ণিবাস্তবতার তুলনায় অন্তর্বাস্তবতার উপস্থাপনই মুখ্য ভূমিকা পালন করে।

আধুনিক কাব্যনাটকের যাত্রা শুরু হয় পাশ্চাত্য কবি টি এস এলিয়টের হাত ধরে। তিনি মৌলিক কাব্যনাটক যেমন রচনা করেছেন, তেমনি কাব্যনাটক বিষয়ক একাধিক প্রবন্ধ রচনা করে এ ধারাটিকে সাহিত্যাঙ্গনে জনপ্রিয় করে তুলেছেন। বাংলাসাহিত্যে অনেকেই কাব্যনাটক রচনা করেছেন, যাঁদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য কাব্যনাট্যকার হলেন রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, বুদ্ধদেব বসু ও সৈয়দ শামসুল হক প্রমুখ।

বাংলাদেশের সাহিত্যে কাব্যনাটক রচনায় সৈয়দ শামসুল হকের কৃতিত্ব অবিস্মরণীয়। একাধারে জনপ্রিয় ও শিল্পসফল কাব্যনাটক রচনায় তিনি তুলনারহিত শিল্পী। সৈয়দ শামসুল হক পেশাগত কারণে ইংল্যান্ডে থাকার সময় প্রচুর মঞ্চ নাটক প্রত্যক্ষ করেন। এ সময় তিনি গ্রিক ও শেকসপিয়রিয়ান নাটকে ব্যবহৃত কবিতার লালিত্যপূর্ণ শক্তি গভীরভাবে প্রত্যক্ষ করেন।

 

 

বিশেষত, টি এস এলিয়ট, হেনরিক ইবসেন রচিত কাব্যনাট্যের ধরন সৈয়দ হককে দারুণভাবে আকৃষ্ট করে। আবার এদেশীয় লোকসমাজ, লোকসংস্কৃতি, লোকগাঁথা, মৈমনসিংহ গীতিকা এমনকি মধ্যযুগের পদাবলি সাহিত্যের মাটিগন্ধী মাধুর্যে সৈয়দ শামসুল হক ব্যাপকভাবে প্রভাবিত ছিলেন। ফলত, পাশ্চাত্য নাট্যকর্ম ও প্রাচ্যের বিষয় – এ দুইয়ের অপূর্ব সমন্বয়ে তিনি কাব্যনাটক রচনায় ব্রতী হয়েছেন।

সৈয়দ শামসুল হক তাঁর প্রথম কাব্যনাটক পায়ের আওয়াজ পাওয়া যায়ে প্রেক্ষাপট হিসেবে বেছে নিয়েছেন বাঙালি জাতির মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক ইতিহাসকে। তবে মুক্তিযুদ্ধ এ নাটকের প্রেক্ষাপট হিসেবে উপস্থাপিত হলেও, নাট্যকার এখানে ইতিহাসের ঘটনাবলির ধারাবিবরণী উপস্থাপন করেননি। তিনি অত্যন্ত সুকৌশলে এ নাটকের মাধ্যমে দেখাতে চেয়েছেন – যুদ্ধের প্রেক্ষাপটে শ্রেণিদ্বন্দ্ব, শ্রেণি রাজনীতির স্বরূপ, সর্বোপরি সাধারণ জনগণের ওপর ধর্মীয় রাজনীতির প্রভাব।

ইতিহাসের প্রেক্ষাপটে ঘটনার বিবরণী নয়, ঘটনার কার্যকারণ ও তৎসূত্রে চরিত্রের মনোকখন উন্মোচনই এখানে নাট্যকারের প্রধান উদ্দেশ্য। সম্পূর্ণ আঞ্চলিক ভাষায় এ নাটকটি রচনা করে তিনি বাংলাসাহিত্যে নাট্যভাষার এক নতুন ধারার সূচনা করেছেন।

নূরলদীনের সারাজীবন কাব্যনাটকটি বাস্তব ইতিহাসের পাতা থেকে উঠে আসা এক বীরযোদ্ধাকে নিয়ে রচিত হয়েছে। এখানে বাংলার বৃহত্তর রংপুর অঞ্চলের সাধারণ কৃষকজীবনের চাওয়া-পাওয়া, ক্ষোভ, দ্রোহ ও বঞ্চনার কথকতা যেমন উপস্থাপিত হয়েছে, তেমনি ভাগ্যান্বেষণে সমুদ্র পাড়ি দিয়ে সুদূর বিলেত থেকে আগত ব্রিটিশ কর্মচারীদের শোষণ-শাসনের স্বরূপ, ব্যক্তিগত হতাশা ও জীবন নিয়ে স্বপ্ন দেখার গল্প উপস্থাপন করেছেন নাট্যকার।

 

 

সৈয়দ শামসুল হকের রচনাগুণে ও ভাষানির্মাণ দক্ষতায় নূরলদীনের সারাজীবন নাটকের প্রায় অধিকাংশ সংলাপ আজও মানুষের মুখে মুখে ফেরে। যখনই অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদে জনগণ জেগে ওঠে, তখনই তাঁদের কণ্ঠে ধ্বনিত হয় নূরলদীনের ‘জাগো বাহে, কোনঠে সবায় সংলাপ।

এখানে এখন নাটকটি সৈয়দ শামসুল হকের একটি নিরীক্ষামূলক সামাজিক কাব্যনাটক। যুদ্ধোত্তর কালপরিসরে বিপর্যস্ত সমাজ, বিনষ্ট রাজনীতি, সর্বোপরি মানুষের মজ্জমান চেতনার স্বরূপ চমৎকারভাবে উপস্থাপিত হয়েছে আলোচ্য নাটকে। নাটকের প্লট নির্মাণ, চরিত্রায়ণ কৌশল কিংবা মঞ্চ উপস্থাপনকৌশল সবকিছুতেই নাট্যকারের অভিনব ভাবনা নজর কাড়ে। ভাষাবিন্যাসেও তিনি তাঁর অন্যন্য রচনাশৈলীর মতো কুশলী ও সার্থক।

ষোড়শ শতাব্দীর কিংবদন্তিতূল্য ব্রিটিশ নাট্যকার উইলিয়াম শেক্সপিয়রের বিখ্যাত ট্র্যাজিক নাটক জুলিয়াস সিজার অবলম্বনে সৈয়দ শামসুল হক তাঁর গণনায়ক কাব্যনাটকটি রচনা করেন। এ নাটকটি রচনার পেছনে নাট্যকারের প্রগাঢ় দেশপ্রেম, দেশের ইতিহাস-রাজনীতি-সমাজ সম্পর্কে প্রবল সচেতনতাবোধ কাজ করেছে।

বস্তুত, গণনায়ক নাটকটিতে রাজনীতির অন্তর্দ্বন্দ্ব ও বহির্ভূদ প্রকাশিত হয়েছে। খুব কাছের মানুষের বিশ্বাসঘাতকতা, প্রতারণা দ্বারা একজন রাষ্ট্রপতি কীভাবে খুন হতে পারে, বাস্তবতার আলোকে তার বর্ণনা চমৎকারভাবে ফুটে উঠেছে এখানে। এ নাটকে বঙ্গবন্ধুর ছায়া প্রবলতর।

বস্তুত, পঁচাত্তর-উত্তর সময়ে যখন সমগ্রজাতি এক অদ্ভূত নিশ্চুপতায় ডুবে ছিল, সমগ্র দেশে যেখানে জাতির জনকের নাম মুখে নেয়াই নিষিদ্ধ ছিল; তখন সৈয়দ শামসুল হক অত্যন্ত সাহসিকতার সঙ্গে বিভিন্ন লেখায় বিশেষত, এ কাব্যনাট্যের মাধ্যমে তাঁর প্রতিবাদী মানসিকতার প্রকাশ ঘটিয়েছেন।

 

 

বাংলাদেশের নাট্যসাহিত্যের ইতিহাসে এককভাবে সৈয়দ হকই সম্ভবত শেকসপিয়রের অধিকসংখ্যক নাটকের অনুবাদ করেছেন, কিংবা শেকসপিয়র রচনাবলি থেকে নির্যাস সংগ্রহ করে তা এদেশের পরিপ্রেক্ষিতের সঙ্গে সমীকৃত করে বিনির্মাণ করেছেন। কাব্যনাটক ঈর্ষা এমনই একটি রচনা। এর মৌলবিষয় মানবিক ঈর্ষা।

শেকসপিয়রের ওথেলো নাটক থেকে ঘটনাংশ আহরণ করলেও তাকে একান্ত নিজের মতো করে আলোচ্য নাটকে উপস্থাপন করেছেন নাট্যকার। তিনটি মাত্র চরিত্রের সাতটি মাত্র সংলাপে তিনি মানবজীবনে জৈবিক ঈর্ষার বিষময় ফল চিত্রিত করেছেন। এ নাটকের ভাষা কবিত্বের মাধুর্যে অনন্য নাট্যকাঠামোও অভিনব।

ইতিহাসের প্রেক্ষাপটে রচিত হয়েছে সৈয়দ শামসুল হকের কাব্যনাটক নারীগণ। তবে পলাশির করুণ ইতিহাস এ- নাটকের প্রেক্ষাপট হলেও পূর্বজ নাট্যকারদের অনুসরণে তিনি সিরাজদ্দৌলা-বিষয়ক দেশাত্মবোধক ও ভাবাবেগসম্পন্ন ঐতিহাসিক নাটক রচনা করেননি।

বরং তিনি এখানে রাজমহলের উচ্চবংশীয় নারীদের মনোকথনের পাশাপাশি উপস্থাপন করেছেন উপেক্ষিত সেইসব দাসীদের অনুক্ত কথা, যারা দাসপ্রথার নিমর্ম শিকার হয়ে পিতা-মাতা, গৃহ হারিয়ে অন্তঃপুরবাসিনীর জীবনযাপনে বাধ্য হয়, এবং রাজপরিবারের সুখ-দুঃখের সঙ্গে নিজেদের জড়িয়ে ফেলে। এ নাটকে বারবিলাসিনীদের জীবনগাথাও অত্যন্ত দরদের সঙ্গে চিত্রিত করেছেন নাট্যকার।

তিনি কৃতবচরিত্রের সংলাপে নারীগণ নাটক লেখার অনুপ্রেরণা সম্পর্কে বলেছেন: স্মৃতির প্রচ্ছদপটে আঁকা শুধু রাজাদেরই মুখ! / নারীর কথা কে লেখে ? কার মনে থাকে ? (কাব্যনাট্যসমগ্র: ৩৮০ )

কবি জসীম উদ্‌দীন রচিত জনপ্রিয় লোকনাটক বেদের মেয়ে অনুসরণে সৈয়দ হক তাঁর চম্পাবতী কাব্যনাটক রচনা করেছেন। নাট্যকার মনে করেছিলেন জসীম উদ্‌দীন বাংলাসাহিত্যে প্রায় অনালোচিত বেদেসমাজকে পাঠক-দর্শকের সম্মুখে বাস্তবতার নিরিখে তুলে ধরার বাসনায় রচনার নাট্যগুণ ক্ষুণ্ণ করে ফেলেছেন।

ফলে তিনি মূলরচনার সুর অক্ষুণ্ণ রেখে প্রয়োজনীয় পরিমার্জন-পরিশোধন করে সেটি নতুন রূপ সাজিয়েছেন। এক্ষেত্রে সৈয়দ হক জসীম উদ্দীনের মতো গতানুগতিক নাট্যধারা অনুসরণ না করে ১০টি দৃশ্যের মাধ্যমে আদ্যন্ত সম নাটকটি নির্মাণ করেছেন। ফলে নাটকটি লোকনাট্যের শিথিলতা পরিত্যাগ করে আধুনিক কাব্যনাটক হয়ে উঠতে পেরেছে।

অপেক্ষমাণ নাটকটি সৈয়দ শামসুল হক ইবসেন- নাট্যোৎসবে উপস্থাপনের জন্য নির্দেশক আতাউর রহমানের বিশেষ পরিকল্পনা ও পরামর্শে রচনা করেছিলেন। এটি মূলত তিনটি নাটকের মিথস্ক্রিয়া। এখানে সৈয়দ শামসুল হক ও নরওয়েজিয়ান নাট্যকার হেনরিক ইবসেন যুগলভাবে ব্যবহৃত হয়েছেন।

সৈয়দ শামসুল হক হেনরিক ইবসেনের এমন দুটি কালোত্তীর্ণ নাটককে বেছে নিয়েছেন, যেখানে নাটকগুলোর প্রধান চরিত্ররা সত্যের প্রয়োজনে সমাজের বিরুদ্ধে লড়েছে। সমাজের বিপক্ষে কথা বলায় স্বভাবতই তারা একা হয়ে গেছে, তবু সত্যের পথ থেকে বিচলিত হয়নি। অন্যদিকে, তিনি তাঁর ঈর্ষা নাটকের প্রৌঢ় চরিত্রকেও এ-নাটকের সঙ্গে যুক্ত করে করেছেন – যিনি শেষপর্যন্ত সত্যের আয়নায় দাঁড়িয়ে জীবনের প্রকৃত সত্যকে আবিষ্কার করতে সক্ষম –
হয়েছেন।

মরা ময়ূর নাট্যকারের একটি রূপকধর্মী রচনা। এ-নাটকে ‘আজানে’র প্রয়োগ ও এতদ্বিষয়ক সংলাপকে কেন্দ্ৰ করে ইসলাম ধর্মাবলম্বী মৌলবাদী গোষ্ঠী প্রতিবাদে সোচ্চার হয়ে ওঠেন। এতৎসত্ত্বেও নাটকটি বেশ জনপ্রিয়তা অর্জন করে। এটি সমকালীন বাংলাদেশের আর্থ-সামাজিক-রাজনৈতিক বাস্তবতার প্রতিফলনে সমৃদ্ধ একটি অসাধারণ নাট্যকর্ম।

অন্যদিকে যুদ্ধপরাধী ও মানবতাবিরোধীদের বিচারের দাবি নিয়ে সৈয়দ শামসুল হক তাঁর উত্তরবংশ নাটক রচনা করেছেন। একটি বিশেষ রাজনৈতিক সরকারের আমলে, মুক্তবুদ্ধির ওপর মৌলবাদীগোষ্ঠীর রক্তাক্ত হামলার প্রসঙ্গটিও এখানে উল্লেখিত হয়েছে।

 

 

এখানে নাট্যকারের মূল উদ্দেশ্য ছিল একাত্তরের ঘাতক-দালালদের প্রকৃত ইতিহাস বর্তমান প্রজন্মের কাছে তুলে ধরা, যেন তারা প্রকৃত সত্য অবগত হয়ে দেশ থেকে ঘাতক, রাজাকার, মৌলবাদী শক্তির বিনাশে বলিষ্ঠ ভূমিকা পালন করতে পারে। সম্পূর্ণ রাজনৈতিক বিষয়বস্তু নিয়ে কাব্যনাটকটি রচিত হলেও সৈয়দ শামসুল হকের সৃষ্টিশীল প্রতিভাগুণে এটি একটি সার্থক কাব্যনাটক হয়ে উঠতে পেরেছে।

বস্তুত, সৈয়দ শামসুল হক কাব্যনাট্যসৃজনে নিজস্ব কল্পনা ও পর্যবেক্ষণশক্তি যেমন কাজে লাগিয়েছেন, ঠিক তেমনি বিভিন্ন ভাষার সাহিত্য পঠন-পাঠনসূত্রে অর্জিত জ্ঞান ও অভিজ্ঞতাকে সমীকৃত করে তাঁর সৃষ্টিকে উত্তীর্ণ করেছেন অনন্য স্থানে। তিনি বরাবরই নিরীক্ষাপ্রিয় নাট্যকার। নাটকের বিষয়বস্তু নিয়ে যেমন তিনি অনন্য রুচিশীলতা দেখিয়েছেন, তেমনি কাব্যনাট্যের ফর্ম নিয়ে নিরীক্ষাপ্রিয়তার স্বাক্ষর রেখেছেন। বস্তুত, সৈয়দ হকের সাহিত্যধারায় তাঁর নাট্যসাহিত্য অতি উজ্জ্বল অংশ অধিকার করে আছে। সমগ্র বাংলা কাব্যনাট্যসাহিত্যের ইতিহাসে তাঁর অবদান অবিস্মরণীয়।

Exit mobile version