আজকে আমাদের আলোচনার বিষয়ঃ মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের শহরবাসের ইতিকথা উপন্যাস। যা মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের পাঁচটি উপন্যাসে জীবন ও সমাজ এর মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের উপন্যাসে বিষয় বৈচিত্র্য এর অন্তর্ভুক্ত।

মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের শহরবাসের ইতিকথা উপন্যাস
“শহরবাসের ইতিকথা’ (১৯৪৬) উপন্যাসটি কলকাতা শহরকেন্দ্রিক লেখা। গ্রামের সম্ভ্রান্ত যুবক মনোমোহনের শহর সম্পর্কে স্বর্গীয় কল্পনা এবং শহরে এসে হাফিয়ে ওঠার চিত্র মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় দেখিয়েছেন। এখানে মধ্যবিত্তের উচ্চাকাঙ্খা প্রকাশ পেয়েছে:
“জীবনের বিভিন্ন অধ্যায়ে মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় বিভিন্ন দৃষ্টিকোণ থেকে মধ্যবিত্তের জীবন সংকটকে রূপ দেয়ার প্রয়াস পেয়েছেন, এর একটি বড় প্রমাণ ‘শহরবাসের ইতিকথা’ উপন্যাসটি। ”
উপন্যাসের শুরু হয়েছে শহরের পথে একজন প্রৌঢ় হাঁটছে, তার বাস গ্রামে, সে শহরে দুদিন আগে কাজে এসেছে। কাজ শেষ হওয়ার পরও তার হাঁটতে ভালো লাগছে। সে হোটেলে ফেরার জন্য রাস্তা পার হতে গিয়ে দোতলা বাসের নিচে পড়ে কয়েক মিনিটের মধ্যে মারা যায়। এই প্রৌঢ় মনোমোহনের পিতা। পিতার মৃত্যুর পর সে সকলের অমতে সকলকে সঙ্গে নিয়ে কলকাতায় বসবাস শুরু করলো।

হাল ফ্যাশানের বাড়ি ভাড়া নিলো, সোসাইটিতে মেশার জন্য বার বার পার্টি দিলো। এতে তার মা ভাই বোন এবং স্ত্রী অসন্তুষ্ট হয়। তারা সকলে মনোমোহনকে এড়িয়ে চলতে থাকে। মোহনের বন্ধু চিন্ময় এবং তার স্ত্রী সন্ধ্যার জীবনের জটিলতা মোহনকে পীড়া দেয়। সন্ধ্যা ইচ্ছে মতো জীবনযাপন করতো, চিন্ময় টাকা কমিয়ে দিলে সন্ধ্যা আবার চিন্ময়ের কাছে ফেরে। মোহনের সঙ্গে গ্রাম থেকে এসেছে শ্রীপতি।
মোহন তাকে কারখানার কাজে লাগিয়ে দেয়। শ্রীপতি টাকা রোজগার করে কিন্তু স্ত্রী কদমের জন্য তার মন কেমন করে তাই পতিতালয়ে দুর্গার কাছে যায়। দুর্গার কাছে যেতে হলে টাকা লাগে তাই সে কদম দুর্গা সকলকে ভুলে নির্লিপ্ত হয়ে যায়। শ্রীপতি কারখানার কাজে মন দেয়, নিজের অধিকার বোধ সম্পর্কে সচেতন হয়ে ওঠে। গ্রামের অশিক্ষিত মানুষ সংগ্রামী শ্রমিক হয়।

মোহন শহুরে জীবনে তাল মেলাতে পারে না, সে শ্রীপতিকে দেখে। পরিবারের সকলে তাকে পরোক্ষভাবে যন্ত্রণা দেয়। ভাই নগেন অকারণে গাড়ি দখল করে রেখে বাবার টাকায় অধিকার দেখায়। মোহন দেখে এতে মাসহ আত্মীয় স্বজনের সমর্থন আছে। মোহন কিছু বলে না। আস্তে আস্তে তীক্ষ্ণ হয়ে যায়। সংঘর্ষ এড়িয়ে চলে, মিথ্যে আশায় নিজেকে ভোলায়। সে মনে মনে টাকা উপার্জনের নানা পরিকল্পনা করে। সে বুঝতে পারে ঢাকা উপার্জন করলে আবার সব ঠিক হয়ে যাবে। তার মনে হয়।
“সবচেয়ে বড় প্রয়োজন, অনিবার্য প্রয়োজন, তার নিজের অন্য ধরনের মানুষ হওয়া।” (৫খ, পৃ-১০৬)
মোহন সব বোঝে কিন্তু কিছুই করতে পারে না। শহরের জীবন স্রোতে শুধু ভেসে বেড়ায়। এখানে উপন্যাসের শেষ হয়েছ। লেখক দেখিয়েছেন মধ্যবিত্ত মানুষের অপ্রাপ্তির যন্ত্রণা। সে কি চায় জানে না, শুধু ভেতরে অসন্তোষ জন্ম নেয়। প্রাপ্তির জন্য কিছু করতে পারে না।