বাংলা শিশুসাহিত্যের অঙ্গনে গত চার দশক ধরে যে কজন সাহিত্যিক তাদের লেখনীর জাদুতে শিশুদের মন জয় করে চলেছেন, তাদের মধ্যে লুৎফর রহমান রিটন অন্যতম শীর্ষস্থানীয়। তিনি একাধারে ছড়াকার, কবি এবং শিশুসাহিত্যিক। বিশেষ করে সত্তরের দশকে আত্মপ্রকাশের পর আশি ও নব্বইয়ের দশকে তাঁর লেখা ছড়াগুলো শিশু-কিশোরদের মাঝে বিপুল জনপ্রিয়তা অর্জন করে। তাঁর ছড়ার ছন্দ, হাস্যরস এবং সহজবোধ্য উপস্থাপনা তাঁকে আধুনিক বাংলা ছড়াসাহিত্যের এক অপরিহার্য ব্যক্তিত্বে পরিণত করেছে।

লুৎফর রহমান রিটন
জন্ম ও শৈশব:
লুৎফর রহমান রিটনের জন্ম ১৯৬১ সালের ১লা এপ্রিল। তাঁর শৈশব ও কৈশোর কেটেছে ঐতিহ্যবাহী পুরনো ঢাকার ওয়ারী এলাকায়। পুরনো ঢাকার বর্ণিল জীবনযাত্রা, উৎসবমুখর পরিবেশ এবং সেখানকার ভাষার নিজস্বতা তাঁর মানস গঠনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে, যার ছাপ আমরা পরবর্তীতে তাঁর ছড়াগুলোতে দেখতে পাই।

শিক্ষাজীবন:
রিটনের শিক্ষাজীবনের শুরুটাও ঢাকায়। তিনি ১৯৭৯ সালে পুরনো ঢাকার ঐতিহ্যবাহী নবাবপুর সরকারি উচ্চ বিদ্যালয় থেকে এসএসসি পাশ করেন। এরপর ১৯৮১ সালে ঢাকা কলেজ থেকে এইচএসসি সম্পন্ন করেন। পরবর্তীতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধিভুক্ত আবুজর গিফারি কলেজ থেকে ১৯৮৯ সালে স্নাতক ডিগ্রি অর্জন করেন। ছাত্রজীবন থেকেই তিনি লেখালেখি ও সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডের সাথে সক্রিয়ভাবে জড়িত ছিলেন।
সাহিত্যিক পথচলা ও অবদান:
লুৎফর রহমান রিটন মূলত সত্তরের দশকে লেখালেখির জগতে প্রবেশ করেন। তবে তাঁর জনপ্রিয়তার তুঙ্গ মুহূর্ত আসে বিংশ শতাব্দীর শেষ দুই দশকে। তাঁর ছড়ার প্রধান বৈশিষ্ট্য হলো প্রাঞ্জলতা এবং কৌতুকময়তা। তিনি শিশুদের মনস্তত্ত্ব খুব গভীরভাবে বোঝেন এবং তাদের ভাষায় কথা বলেন। তাঁর ছড়ায় যেমন নিখাদ আনন্দ আছে, তেমনি আছে সমাজ সচেতনতার সূক্ষ্ম বার্তা।
কেবল নিছক আনন্দদানই নয়, বিভিন্ন জাতীয় সংকট ও গণআন্দোলনেও তাঁর ছড়া শক্তিশালী ভূমিকা পালন করেছে। নব্বইয়ের স্বৈরাচার বিরোধী আন্দোলনে তাঁর শানিত ছড়াগুলো মানুষের মুখে মুখে ফিরত।
লেখালেখির পাশাপাশি তিনি সম্পাদনাতেও দক্ষতার স্বাক্ষর রেখেছেন। তিনি শিশু-কিশোরদের জন্য জনপ্রিয় পত্রিকা ‘ছোটদের কাগজ’-এর সম্পাদক ছিলেন (যা বর্তমানে অধুনালুপ্ত)। তাঁর সম্পাদনায় পত্রিকাটি শিশুসাহিত্যে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিল।
কর্মজীবন ও প্রবাস:
সাহিত্যচর্চার পাশাপাশি লুৎফর রহমান রিটন বর্ণাঢ্য কর্মজীবনের অধিকারী। তিনি কূটनीতিক দায়িত্ব পালন করেছেন। ২০০০-২০০১ সালে তিনি জাপানে বাংলাদেশ দূতাবাসের ফার্স্ট সেক্রেটারি এবং পরবর্তীতে কালচারাল এটাশে হিসেবে নিযুক্ত ছিলেন। সেখানে তিনি বাংলাদেশের সংস্কৃতিকে তুলে ধরতে কাজ করেছেন।
গত কয়েক বছর ধরে তিনি সপরিবারে কানাডায় বসবাস করছেন। প্রবাসে থাকলেও বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের সাথে তাঁর নাড়ির টান ছিঁড়ে যায়নি, লেখালেখি চালিয়ে যাচ্ছেন নিয়মিত।
পুরস্কার ও সম্মাননা:
বাংলা শিশুসাহিত্যে অসামান্য অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ লুৎফর রহমান রিটন অসংখ্য পুরস্কারে ভূষিত হয়েছেন। এর মধ্যে সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য হলো ২০০৭ সালে প্রাপ্ত ‘বাংলা একাডেমি সাহিত্য পুরস্কার’।
লুৎফর রহমান রিটনের প্রকাশিত গ্রন্থসমূহ:
লুৎফর রহমান রিটনের লেখার ব্যাপ্তি বিশাল। তাঁর প্রকাশিত গ্রন্থের সংখ্যা শতাধিক। এর মধ্যে সিংহভাগই শিশু-কিশোরদের জন্য লেখা ছড়া ও কবিতার বই। তাঁর সৃষ্ট কিছু চরিত্র এবং ছড়ার বই শিশুদের কাছে ক্লাসিকের মর্যাদা পেয়েছে।
তাঁর জনপ্রিয় বইগুলোর তালিকা অনেক দীর্ঘ। পাঠকদের সুবিধার্থে আরও কিছু বিখ্যাত বইয়ের নাম নিচে যুক্ত করা হলো, যা তাঁর সৃষ্টিশীলতার পরিচয় বহন করে:
- ধুতুরির ছড়া: এটি রিটনের অন্যতম জনপ্রিয় ছড়ার বই। এই বইয়ের ছড়াগুলো একসময় শিশুদের মুখে মুখে ফিরত।
- ঢাকা আমার ঢাকা: নিজের শহর ঢাকাকে নিয়ে লেখা চমৎকার সব ছড়ার সংকলন।
- বোকাবাক্স: টেলিভিশন ও সমসাময়িক বিষয় নিয়ে লেখা রম্য ছড়ার বই।
- তুতুরির ছড়া
- হৈচৈ
- ভূতের ছড়া পেত্নীর ছড়া
- একাত্তরের ছড়া (মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক ছড়া)
- রাজাকারের ছড়া (মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় শানিত ব্যঙ্গাত্মক ছড়া)
- কচি ও কাঁচাদের জন্য
- ছড়াসমগ্র (তাঁর উল্লেখযোগ্য ছড়াগুলোর সংকলন)

লুৎফর রহমান রিটন তাঁর জাদুকরী ছন্দের মাধ্যমে কয়েক প্রজন্মের শৈশবকে রাঙিয়ে দিয়েছেন। তাঁর ছড়াগুলো কেবল পাঠ্যবই বা পত্রিকার পাতায় সীমাবদ্ধ থাকেনি, তা হয়ে উঠেছে শিশুদের আনন্দের সঙ্গী। বাংলা শিশুসাহিত্যের ইতিহাসে তাঁর নাম তাই উজ্জ্বলাক্ষরে লেখা থাকবে।
২ thoughts on “লুৎফর রহমান রিটন ও তার সৃষ্টি”