রূপক প্রতীকী শিল্পশৈলীর উপন্যাস । বাংলাদেশের উপন্যাসের শৈলীবিচার

আজকে আমাদের আলোচনার বিষয়: রূপক প্রতীকী শিল্পশৈলীর উপন্যাস । এটি বাংলাদেশের উপন্যাসের শৈলীবিচার এর রূপক প্রতীকী শিল্পশৈলীর উপন্যাস এর অন্তর্গত।

 

রূপক প্রতীকী শিল্পশৈলীর উপন্যাস

 

রূপক প্রতীকী শিল্পশৈলীর উপন্যাস

উপন্যাস-সাহিত্যের এক বিশেষ ধারা রূপক প্রতীকী শিল্পশৈলীর উপন্যাস। শিল্পকলার প্রায় প্রতিটি আঙ্গিককে রূপক এবং প্রতীকের প্রয়োগ লক্ষ করা যায়। তবে আঙ্গিকগত স্বাতন্ত্র্যের কারণে উপন্যাসে রূপক এবং প্রতীকের প্রয়োগ, তাকে অন্যান্য শিল্প অভিপ্রায় থেকে পৃথক করেছে। রূপক এবং প্রতীক-এ আলংকারিক শব্দ দু’টি পাশাপাশি উচ্চারিত হলে বোধ ও ব্যবাহরিক ক্ষেত্রে শব্দদু’টির সূক্ষ্ণ পার্থক্য রয়েছে।

‘প্রতীক ভাবের দ্যোতক, আর রূপক বস্তুর। প্রতীকে ক্ষুদ্রের মধ্যে বৃহত্তের ব্যঞ্জনা লাভ করা যায়, কিন্তু রূপকে সাধারণত এ সম্ভাবনা নেই।” ব্যবহৃত শব্দ যখন তার সহজ সাধারণ আক্ষরিক অর্থকে অতিক্রম করে ভিন্নতর অর্থের ইঙ্গিত দেয় তখনই বলা হয় শব্দটি প্রতীকী ‘পরবাসে যাবা মাঝি, মনে ভেবো ভরাগোলা রেখে গেছ ঘরে।” এখানে ‘ভরাগোলা যুবতী স্ত্রী বা প্রেমিকার প্রতীক।

প্রতীক আসলে কোনো বিশেষ অর্থে আবদ্ধ নয়, অনেক অভিজ্ঞতার সমষ্টি দিয়ে তৈরি হয় একটি প্রতীক, যার মধ্যে লুকিয়ে থাকে বিচিত্র ও বহুমাত্রিক ব্যঞ্জনা। রূপক হচ্ছে উপমান ও উপমেয়ের অভেদ কল্পনা অর্থাৎ রূপক (allegory) বলতে এমন এক ধরনের নীতিমূলক আখ্যানকে বোঝায়, যার অন্তর্নিহিত অর্থ দ্বিবিধ উপাখ্যান ও উপাখ্যান অতীত ভাবের অর্থ। কোনো গভীর অন্তসত্যকে প্রকাশ করার জন্য একটি আখ্যানের আশ্রয় নিয়ে অস্পষ্টতার আচ্ছাদনে নতুন আখ্যান তৈরি করা, যাতে সমাজ ও সময়ের ইঙ্গিতময় রূপমূর্তি ফুটে ওঠে।

এ শিল্পসত্যই রূপকের মূল কথা। সাধারণত বিরুদ্ধ সমাজ ও প্রতিকূল রাষ্ট্রীয় পরিস্থিতিকে প্রকাশ করার জন্য ঔপন্যাসিকরা রূপক প্রতীক ধর্মী শিল্পাঙ্গিকের আশ্রয় নিয়ে থাকেন। সাতচল্লিশে দেশ বিভাগ থেকে একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধ অর্থাৎ বাংলাদেশের স্বাধীনতার পূর্ব পর্যন্ত, সময়ের দিক থেকে খুব বেশি নয় কিন্তু বাঙালীর সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক জীবনের জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়।

 

রূপক প্রতীকী শিল্পশৈলীর উপন্যাস

 

বাঙালির আত্ম-অনুসন্ধান তথা আইডেন্টেটির প্রশ্নে, অস্তিত্ব সংকট ও জাতীয় মুক্তির প্রশ্নে ১৯৪৭-১৯৭১ সময় পর্ব ছিল বাঙালির দ্বন্দ্বজটিল আত্মবিকাশের রক্তাক্তকাল। ধর্মকে ঐক্যের ভিত্তি করে প্রতিষ্ঠিত পাকিস্তানের প্রশাসন শুরু থেকেই স্বৈরাচারী ও সমরমুখী একটি প্রবণতা প্রকাশ করতে থাকে, যার চূড়ান্ত পরিণতি ঘটে ষাটের দশকে। প্রথমে ভাষাকে কেন্দ্র বন্দ্বের সূত্রপাত হয় পাকিস্তানী শাসকগোষ্ঠীর সঙ্গে দ্বন্দ্ব, বায়ান্নর রক্তাক্ত অভিজ্ঞতার মধ্যদিয়ে বাঙালির জাতীয় চেতনার মূলভিত্তি রচিত হয়।

৫৪ সালের নির্বাচন, *৫৮ সালে সামরিক শাসন, ‘৬১ সালে রবীন্দ্র জন্মবার্ষিকী পালনে বাধা দান, ৬২-তে তথাকথিত মৌলিক গণতন্ত্র, ৬৩-তে শিক্ষা কমিশন রিপোর্ট, ৬৬-তে ছয়দফা আন্দোলন, আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা, ৬৯-এ গণঅভ্যুত্থান এবং ‘৭১-এ মুক্তিযুদ্ধ ইত্যাদি ঐতিহাসিক ঘটনার অভিঘাতে সমৃদ্ধ এদেশের জনগণের চেতনা প্রতিমুহূর্তে বিবেকের আশ্রয় সন্ধান করেছে।

ভাষা আন্দোলনের রক্তাক্ত পরীক্ষায় উত্তীর্ণ জাতি ১৯৫৪ সালের সাধারণ নির্বাচনে পাকিস্তানের বিরুদ্ধে ভোট প্রাদান করে কিন্তু বেনিয়া শাসকগোষ্ঠী সে রায়ের প্রতি শ্রদ্ধাশীল না হয়ে। ১৯৫৮ সালে জারি করে সামরিক শাসন। এদেশের জনগণ ক্রমশ সামাপ্ত মূল্যবোধ ও ধর্মীয় আদর্শপুষ্ট রাজনীতির প্রতি ভীত সন্ত্রস্ত হয়ে ওঠে।

রবীন্দ্রজন্মশতবার্ষিকী পালনে বাধা দান ও রবীন্দ্র-বর্জনের ঘোষণা, তথাকথিত মৌলিক গণতন্ত্র, শিক্ষাকমিশন রিপোর্ট, ইত্যাদি শাসকগোষ্ঠীর আরোপিত কার্যক্রম সচেতন বাঙালির বিবেককে মুগ্ধ করে তোলে। আইয়ুবের সামরিক শাসন জনগণের মৌলিক অধিকারই হরণ করেনি, অস্তিত্বেরও সংকট তৈরি করে, অবরুদ্ধ হয়ে পড়ে বাঙালির প্রগতিশীল ও জাতীয়তাবাদী চেতনা।

 

রূপক প্রতীকী শিল্পশৈলীর উপন্যাস

 

বি.এন.আর প্রেস ট্রাস্ট, পাকিস্তান রাইটার্স গিল্ড, আদমজী, দাউদ পুরস্কার এবং নানা উপাধি বিতরণের মাধ্যমে এদেশের একশ্রেণীর বুদ্ধিজীবী, শিল্পী-সাহিত্যিকদের বেতন দাসে পরিণত করে পাকিস্তানী প্রশাসন ‘পরিবর্তন ঘটল মার্কসবাদী সাহিত্যিকদেরও তাঁরা জীবিকার উন্নতির ও নিরাপত্তার সঙ্গে সৎভাবেই সাতিহ্যভাবনা এবং শিল্প-শরীরের রূপান্তর করলেন। কেউ হলেন ফ্রয়েডে আশ্রয়ী, কেউ-বা আত্মগোপন করলেন রোম্যান্টিক স্বপ্নালোকে, ব্যঙ্গ-বিদ্রূপে।

মানবতাবাদী শ্রেণী অংশ আক্রান্ত হলেন, কারণ অশক্ত বুর্জোয়া মানবতাবাদ যতখানি বর্ণচোরা ততোখানি নিরাপদ। এদের অধিকাংশই হলেন আত্মরোমন্থনে তুষ্ট, কল্পলোকের জ্বলন্ত জতুগৃহে যন্ত্রণাদগ্ধ, ক্রমবিকাশে শাগ্রস্থ দেহবাদী পক্ষে আকণ্ঠ নিমজ্জিত। সময়তন্ত্র ও ধর্মীয় আবরণে এ ভাবে পাকিস্তানি শাসক গোষ্ঠী রাষ্ট্রীয় আদর্শকে বিন্যস্ত করলেন যে, ব্যক্তি ও সমষ্টির জীবন অবরুদ্ধ পড়ে, সৃষ্টিশীল চেতনা হয়ে পড়ে সংকট দীর্ঘ অন্তর্দ্বন্দ্বময়।

এই অবরুদ্ধ, আতঙ্ক শিহরিত পরিস্থিতিতে (borderline situation) শিল্পীর সত্য সন্ধানের পথ হয়ে পড়ে দ্বিধাগ্রস্ত হয়ত তাকে এই পরিস্থিতিতে বিরুদ্ধ শক্তির সঙ্গে আপোস করা অথবা নিঃশঙ্কচিত্তে সমাজসত্যকে প্রকাশ করা। বিরুদ্ধ রাষ্ট্রশক্তির দমবন্ধ পরিবেশে জীবনার্থের ইতিবাচক রূপ নিমার্ণে বাংলাদেশের সমকালীন ঔপন্যাসিকরা নতুন বিষয়বস্তু সন্ধানে মনোযোগী হন।

বিরুদ্ধ শক্তির সঙ্গে আপোস কিংবা পলায়নবাদী মনেবৃত্তির পরিবর্তে ঔপন্যাসিকরা মিথ, পুরাণ, ইতিহাস, কিংবদন্তির রূপকের আশ্রয় খুঁজে পেলেন। লেখা হয় রূপক প্রতীকশৈলীর উপন্যাস এবং বাংলাদেশের উপন্যাস-সাহিত্যের নতুন সম্ভাবনার পথ আবিষ্কৃত হয়।

 

রূপক প্রতীকী শিল্পশৈলীর উপন্যাস

 

সমাজজীবনের গভীর সত্যকে অভিবান্বিত করে শওকত ওসমান রচনা করেন তাঁর রূপকাশ্রয়ী, ফ্যান্টাসীধর্মী উপন্যাসসমূহ । ‘সৃষ্টিশীল শিল্প-অভিপ্রায়ের দিক থেকে রূপক বা allegory উপন্যাসের এক আবহমানরীতি। নরপ ফ্রাই-এর মতে (genuine allegory is a structural element in literature) রূপকের এই সংজ্ঞার্থের আলোকে শওকত ওসমানের শিল্পমনস্তত্ত্বকে ইতিবাচক সত্যের ওপর স্থাপন করা যায়।

শতক ওসমান ঘটনাংশ নির্বাচনে ইতিহাস, পুরাণ, রূপকথা, কিংবদন্তির আশ্রয় গ্রহণ করেছেন। উপন্যাসের এই নব আঙ্গিক উদ্ভাবনায় শওকত ওসমানের শিল্প এষণা ইতিবাচক জীবনার্থ নিমার্ণের পরিচয়বাহী। সচেতন শিল্পীর সামাজিক দায়িত্ববোধ থেকে শওকত ওসমান ক্রীতদাসের হাসি’ (১৯৬২) উপন্যাসে সামরিক শাসন শৃঙ্খলিত জাতীয় মুক্তির আকঙ্ক্ষাকে রূপকের আশ্রয়ে প্রতিবিম্বিত করেছেন।

রূপকাশ্রয়ী, প্রতীকধর্মী তাঁর অন্যান্য উপন্যাসগুলোর মধ্যে ‘সমাগম’ (১৯৬৭) ‘রাজাউপাখ্যান’ (১৯৭১) বিষয় প্রকরণের দৃষ্টি কোণে ব্যতিক্রমী। এই উপন্যাসগুলোর মধ্যদিয়ে শওকত ওসমান শুধু আধুনিক মননশীল এক প্রকরণের উদ্ভোধন করেননি, বরং জনমানুষের অস্তিত্বসংকট ও সংগ্রামী চেতনার প্রতীকী রূপায়ণ ঘটিয়েছেন। সভ্যতার সময়-গর্ভে লুকায়িত প্রত্নবীজকে সংকটদীর্ণ সমকালের পটভূমিতে নবরূপায়ণের ফলে ‘ক্রীতদাসের হাসি ‘সমাগম’ ‘রাজা উপাখ্যান’ নতুন মাত্রা লাভ করেছে।

Leave a Comment