আজকে আমাদের আলোচনার বিষয়ঃ যৌন চেতনা। যা মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের পাঁচটি উপন্যাসে জীবন ও সমাজ এর মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের উপন্যাস সমাজ এর অন্তর্গত।
যৌন চেতনা
মানুষের মানসিক ও নৈতিক দিক, সামাজিক পরিস্থিতি, পারিবারিক ঐতিহ্য সকল বিষয়ের ওপর প্রভাব ফেলে যৌনতা।
“ফ্রয়েড যে কোন রকম আকর্ষণকেই যৌনতা বলেছেন, সমস্ত আকর্ষণই যৌনানুগ । যেন আকর্ষণ থেকেই সমস্ত আকর্ষণের উৎপত্তি। ৪১
মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় তাঁর উপন্যাসের চরিত্রগুলোর ওপর যৌনবোধের প্রভাবে চারিত্রিক বিভিন্ন বৈশিষ্ট্যের পরিচয় দিয়েছেন। ফ্রয়েডের মতে, মানুষের মনের উদ্দেশ্যগুলোর উৎস্য তিনটি- অস, অহং ও অধিশান্তা। অদস্ কারো কোনো কথা শোনে না, সে নিজের সুখ চায়, তার মধ্যে মূল্যবোধ, নীতিবোধ বা ভালো-মন্দ জ্ঞান নেই।
মানিকের উপন্যাসে কিছু চরিত্রের মধ্যে অদস্- এর আধিক্য দেখা যায়। এবং এর প্রভাব সমাজ জীবনের ওপর পড়ে। এর কারণে কখনো কখনো সামাজিক বিশৃঙ্খলতা দেখা দেয়। ‘জননী’ উপন্যাসে রাখাল যখন গ্রামে ফিরে যায়, তখন শ্যামা নিজের সঙ্গের লোভে রাখালকে যেতে দিতে রাজি হয় না। তার মধ্যে পর-পুরুষ সংক্রান্ত কোনো ন্যায়-অন্যায়বোধ কাজ করে না।
আবার বিধান কলকাতার বাড়ি ভাড়া নিলে শামু বিধানের কাছে পড়া দেখাতে আসে, কিন্তু তাদের আচরণে একটি আকর্ষণ পরিলক্ষিত হয়। বিধান বা শামু কারো মধ্যেই ন্যায়-অন্যায় বোধ জাগ্রত হয় না, তবে শ্যামা তাদের দেখে ভীত হয়। ‘জীবনের জটিলতা’ উপন্যাস অপস্-এর নিয়ন্ত্রণাধীন। শাস্তার মধ্যে একটি ন্যায়- অন্যায় বোধ আছে, কিন্তু সে মনে মনে চিন্তা করে, তাকেও বাঁচতে হবে, তাই সে বিমলের দিকে ঝুঁকে পড়ে। শাস্তার এ আকাঙ্ক্ষা সমাজ সংসার স্বীকার করে না।
অন্যদিকে নগেন সম্পূর্ণ নিজের খুশিতে প্রমীলার সঙ্গে মেলামেশা করে এবং নিজের খুশিতেই তাকে প্রতারিত করে। লাবণ্যকে বিয়ে করে। তার মধ্যে কোনো নীতিবোধের জন্ম নেয় না, বরং সে প্রতিনিয়ত প্রমীলাকে টাকা পাঠিয়ে, নেকলেস পাঠিয়ে, বিয়ের রটনা রটিয়ে অপমান করে। আবার অধরের মধ্যেও অদস্-এর ক্রিয়া বলবৎ দেখা যায়।
নিজের সুখের জন্য সে শান্তার সঙ্গে খারাপ ব্যবহার করে, আবার নিজের খেয়ালে শান্তাকে সুখী করতে গিয়ে আরো বেশি কষ্ট দেয়। শান্তা বিষলের ঘর থেকে বিদায় নিয়ে এলে অধর তাকে ছাদ থেকে লাফিয়ে পরে আত্মহত্যা করতে প্ররোচিত করে, অতঃপর শাস্তা মারা গেলে নিজের পাশবিক চরিত্র চরিতার্থ করতে প্রমীলাকে বিয়ের প্রস্তু বি দেয়। ‘শহরতলীতে নিজের ইচ্ছের জন্য সুধীর ধনঞ্জয়কে পঙ্গু করে।
আবার ধনঞ্জয় মনে মনে যশোদাকে বিয়ে করতে চায়, এ কারণেই সে যশোদার ওপর অনধিকার চর্চা করে, প্রকাশ্যে অভিমান করে, রাজেনকে ঈর্ষা করে। অন্যদিকে যশোদাও যৌন চেতনার বহির্ভূত নয়। সেও ধনঞ্জয়ের প্রতি মানসিক এবং শারীরিক দুর্বলতা অনুভব করে। তাই শেষ পর্যন্ত সে ধনঞ্জয়কে বাড়িতে রাখে। তাছাড়া, ধনঞ্জয়কে প্রথম থেকেই প্রশ্রয় দেয়। উপন্যাসের শেষে যশোদা সত্যপ্রিয়র যৌনতাবোধেরও শিকার হয়:
“বাড়ি ফিরিয়া যশোদা নিজের বিস্ময়ে নিজেই হতবাক হইয়া থাকে। তার জীবনে কখনও এমন সমস্যা উদয় হয় নাই। যা সে দেখিয়া আসিয়াছে সত্যপ্রিয়র চোখে, তাই কী ঠিক? অন্য আর কী হইতে পারে? যেভাবে সত্যপ্রিয় তাকে দু-চোখ দিয়া গ্রাস করিতে চাহিয়াছিল তার তো অন্য কোনো ব্যাখ্যা সম্ভব নয়? কিন্তু সত্যপ্রিয়ের পক্ষে কী ওটা সম্ভব? বিশেষত তাকে দেখিয়া? তার মতো বিরাটকায় মাঝবয়স রমণীকে সামনে বসিয়া থাকিতে দেখিয়া সত্যপ্রিয়র মতো প্রৌঢ় মানুষের মধ্যে জোয়ারের আকস্মিক বন্যার মতো প্রচণ্ড কামনার উদ্রেক হইতে পারে, এ তো বিশ্বাস করার মতো কথা নয়।
চোখ বুজিয়া বুজিয়া বাস্তবকে এড়ানোর ছেলেমানুষি যশোদার মধ্যে নাই। সে জানে, সত্যপ্রিয়ের মতো সবল সুস্থ সংযমী মানুষ প্রৌঢ়ত্বে পৌঁছিয়াছে বলিয়াই নিভিয়া যায় না। [… … …] সত্যপ্রিয়কে যশোদা ভালো করিয়াই চেনে, এক এক সময় ব্যাপারটা তার বড়োই কৌতুকজনক মনে হয়, আবার পরক্ষণে সে বুঝিতে পারে এর মধ্যে কৌতুকের কিছু নাই, বিষয়টা অতীব গুরুতর। সত্যপ্রিয় যা কিছু চায়, প্রচণ্ড আবেগের সঙ্গেই চায়।” (তখ, পৃ. ২৬৯)
যশোদার এই ভাবনা তাকে পথে বসিয়ে ছাড়লো। সে অন্য কোনো চিন্তা করার আগেই সত্যপ্রিয় তাকে ভিটাছাড়া করলো:
“মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় কখনোই আপাত সত্য নিয়ে সন্তুষ্ট ছিলেন না। সমস্ত ঘটনার ও আচরণের আপাত সত্যের আড়ালে যে আন্তর সত্য, তাকেই উদঘাটন করতে চাইতেন তিনি।
এই প্রবণতার ফলেই কখনো একক মানুষের আচরণের গভীরে অন্ত নিহিত বিকারকে আবিষ্কার করেছেন, কখনো-বা সামাজিক অসংগতির তলায় যে সমাজ ব্যবস্থাজনিত বিকার, যে অর্থনৈতিক অসাম্য ও অবিচার রয়েছে তা আবিষ্কার করেছেন। ৪২
‘অহিংসা’ উপন্যাসে সদানন্দ অদস্-এর ক্রিয়ায়ই সন্ন্যাস ছেড়ে বিধবা মাধবীকে নিয়ে প্রৌঢ় বয়সে পালিয়ে যায়। অদস্-এর শক্তিকে ফ্রয়েড কাম প্রেরণা বা লিবিডো বলেছেন। সদানন্দ পুরো উপন্যাস জুড়েই লিবিডো তাড়িত। তার ঈশ্বরভীতি, মহেশকে ভয়, নিজের অস্তিত্ব নিয়ে সন্দেহ সকলই লিবিডো তাড়নার ফল। একজন সমালোচক মন্তব্য করেছেন:
“মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় দেখেছেন তাঁর সমকালীন বাঙালী সমাজ ভীরুতার মধ্যে জীবন যাপন করছে, যে ভীরুতা তৈরি করেছে শান্তি ও নিরাপত্তার মিথ্যা আবরণ, সেই সঙ্গে ঢেকে রেখেছে সমাজের বিভিন্ন শ্রেণির যথার্থ স্বরূপ। ৪৩
এরূপ বিভিন্ন শ্রেণির স্বরূপ উদ্ঘাটনেই মানিক তৎপর হয়েছেন। সদানন্দের আচার-আচরণ, কথা, কামনা সকল কিছুই ঔদ্ধত। সে এক রাতের জন্য হলেও মাধবীকে চায়। যেমন করেই হোক মাধবীর অহংকার ভাঙতে চায়। বিভূতিকে মেরে ফেলার পেছনেও তার একটিই উদ্দেশ্য মাধবীকে লাভ করা। অন্যদিকে মাধবীর মধ্যে অহং এবং অধিশাস্তা দু-ই বিদ্যমান। কিন্তু সদানন্দের সামনে সে অদস্-কে দমন করতে পারে না।
তাই বিভূতির বিরুদ্ধে কেন পুলিশ লেলিয়ে দিল তার কৈফিয়ত তলব করতে এসে সে আবার সদানন্দের ফাঁদে আটকে নিজেকে সমর্পণ করে। এবং শেষ পর্যন্ত সদানন্দের সঙ্গেই রাত্রির অন্ধকারে পালিয়ে যায়। সুখভোগনীতি এবং বাস্তবতা-নীতি এ দুটির মধ্যে সংঘটিত দ্বন্দ্ব থেকেই অবদমনের জন্ম। বিপিনের মধ্যে যদিও মাধবী এবং রত্নাবলীর সম্পর্কে অসস্-এর ক্রিয়া দেখা যায় তথাপি সে তার ভেতরের লিবিডোকে অবদমন করে। তাই সে শেষ পর্যন্ত নিজে টিকে থেকেছে এবং আশ্রমকে টিকিয়ে রেখেছে। ফ্রয়েড বলেছেন:
“অদস্-এর প্রকাশিত হবার প্রচেষ্টা এবং অধিশান্তা ও বাস্তবতার কাছে অদস্-এর 88 আত্মসমর্পণ, এই দুয়ের মধ্যে ভারসাম্যই স্বাভাবিক লক্ষণ । 86
বিপিন এরূপ স্বাভাবিক মানুষের পর্যায়ে আসতে পেরেছে। কিন্তু মহেশ চৌধুরি এরূপ স্বাভাবিক মানুষ নয়, তার ভেতরে একঘেয়েমি আছে, সেখানে কখনো কখনো অদস্ আসে। সে নিজের সুখের জন্য আশ্রমে রোদ-বৃষ্টি উপেক্ষা করে ধরনা দিয়েছিল, নিজের ইচ্ছাকে চরিতার্থ করতে বিভূতিকে দিয়ে সদানন্দকে প্রণাম করিয়ে নেয়।
‘চতুষ্কোণ’ উপন্যাস জুড়ে রয়েছে চরিত্রগুলোর যৌন অসন্তোষ এবং মানসিক যন্ত্রণা। এখানে কেউ-ই স্বাভাবিক মানুষের মতো আচরণ করে না। ফ্রয়েডের মতে, কোনো প্রকার মানসিক ঘটনা কারণ ব্যতিরেকে ঘটতে পারে না। তাই রিণির মানসিক ভারসাম্যহীনতারও একটি সুনির্দিষ্ট কারণ আছে।
উপন্যাসে রাজকুমারের প্রতি আসক্তি ব্যতীত অন্য কোনো কারণ পরিলক্ষিত হয় না। রাজকুমার যদিও লিবিডোতাড়িত মানুষ, তবু তার এই লিবিডো তাড়না এবং মানসিক বিপর্যস্ততা সমাজেরই সৃষ্টি; তাই রাজকুমারের অনুভুতি হয়:
“গিরির মতো নারীকে স্পর্শ করলে ‘অসভ্যতা’, রিণির মতো নারীর স্পর্শের আবেদন প্রত্যাখ্যান করলে ‘অসভ্যতা- রাজকুমার ধাঁধায় পড়ে।
এ উপন্যাসে কোনো চরিত্রই অতিরিক্ত নয়, প্রতিটি চরিত্র তাদের নিজস্ব জায়গায় লিবিডোতাড়িত এবং অসন্তুষ্ট। মনোরমা নিজের ইচ্ছার প্রকাশ কালীর মধ্যে দেখতে চায়, আবার কালী অপরিপূর্ণ বয়সে রাজকুমার এবং মনোরমার পারস্পরিক টানাপোড়েনে বয়সের চেয়ে বেশি পেকে যায়। মালতী প্রবল যৌনবোধে রাজকুমার এবং শ্যামল দুজনের প্রতি-ই আকর্ষণ বোধ করে।
সরসীর মধ্যে অধিশাস্তার প্রবলতা আছে, কিন্তু রাজকুমারের প্রতি আকর্ষণে সে রাজকুমারের সকল চাওয়া পূরণ করে এবং তার সুখ-দুঃখের সঙ্গী হয়। মানুষের মনের সুক্ষ্মাতিসুক্ষ্ম অনুভূতির কারণে তার মন জটিল হয়ে ওঠে। মানুষের জটিল মনকে মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় যৌন চেতনার বিভিন্ন পর্যায় থেকে তুলে এনে উপন্যাসে স্থাপন করে উপন্যাস সাহিত্যের অপুর্ণতাকে পূর্ণ করেছেন।
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ‘রাশিয়ার চিঠি’র প্রথম লাইনে লিখেছেন:
“রাশিয়ায় অবশেষে আসা গেল। যা দেখছি আশ্চর্য ঠেকছে। অন্য কোনো দেশের মতোই নয়। একেবারে মুলে প্রভেদ। আগাগোড়া সকল মানুষকেই এরা সমান করে জাগিয়ে তুলছে। ৪৬
মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় এই জাগিয়ে তোলার কাজে আত্মনিয়োগ করেছেন। সমাজের অনিয়ম- বিশৃঙ্ক্ষলতাকে উপন্যাসে তুলে ধরে সমাজে একটি স্বর্ণযুগের প্রত্যাশা করেছেন।
“সমাজগঠনের মধ্যে মানুষের বিবিধ সংগ্রাম : নরনারীর সম্পর্ক, সমাজের মধ্যে স্বাধীনতার পরিসর, রাষ্ট্রের নির্যাতনমূলক চরিত্র, প্রকৃতির সঙ্গে মানুষের সম্পর্ক নির্ধারণ সবই সংগ্রামের বিভিন্ন ধরন। একজন লেখক সংগ্রামের বিভিন্ন ধরনের মধ্য দিয়ে সমাজ গঠনে হস্তক্ষেপ করে থাকেন। একজন মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় সংগ্রামের বিভিন্ন ধরনের মধ্য দিয়ে গেছেন আর তাঁর কাজে নিয়তিবাদ, মনস্তত্ত্ব এবং মার্কসিজমের পর্যায়ক্রমিক এবং সমান্তরাল অবস্থান ও উদ্ভাসন ঘটেছে। ৪৭
মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় তাঁর সমকালকে ধারণ করে, সেই কালের মানব-মানবীর জীবনযাপন, চাওয়া-পাওয়া, স্বপ্ন, পারিপার্শ্বিক অবস্থা, শ্রেণিবৈষম্য, ফ্রয়েডীয় মনোবিকার, মানবিক টানাপোড়েন, অর্থনৈতিক বৈষম্য, সামাজিক অবক্ষয়, ধর্মীয় ভণ্ডামি, বাঙালির চিরন্তন আনুষ্ঠানিকতা, মানব মনের বিভিন্ন জটিলতার প্রেক্ষিতে সামাজিক বোধ, সমাজে মানুষের অস্তিত্বের সমস্যা ইত্যাদিকে দেখিয়েছেন। তাঁর লেখায় বিমূর্ত অনুভূতি মূর্ত হয়ে উঠেছে।

