যে দেশে মানুষ বড় । জসীম উদ্দীন

আজকের আলোচনার বিষয়ঃ যে দেশে মানুষ বড় । যা চীন ও রাশিয়া ভ্রমণ অবলম্বনে রচিত বাংলা সাহিত্যের রাশিয়া ভ্রমণ কাহিনী এর অন্তর্গত।

 

যে দেশে মানুষ বড় । জসীম উদ্দীন

 

যে দেশে মানুষ বড় । জসীম উদ্দীন

কবি জসীম উদ্দীন ১৯০৩ সালে ফরিদপুর জেলার তাম্বুলখানা গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। তিনি কিছুকাল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগে অধ্যাপনা করে পরে সরকারী তথ্য ও প্রচার বিভাগের উচ্চ পদে যোগদান করেন। ছাত্রজীবন থেকেই তাঁর কবি-প্রতিভার বিকাশ ঘটে। বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যয়নকালে তাঁর ‘কবর’ কবিতাটি প্রবেশিকা বাংলা সংকলনের অন্তর্ভুক্ত হয়। তিনি কবিতা, উপন্যাস, স্মৃতিকথা ও ভ্রমণ কাহিনী রচনা করেছেন। কবির উল্লেখযোগ্য কাব্যগ্রন্থের মধ্যে রয়েছে :

‘নকশী কাঁথার মাঠ’ (১৯২৮), ‘সোজন বাদিয়ার ঘাট’ (১৯৩৩), ‘রাখালী’ (১৯২৭), ‘বালুচর’ (১৯৩০), ‘ধানক্ষেত’ (১৯৩১), ‘মাটির কান্না’, ‘রঙিলা নায়ের মাঝি’, ‘হাসু’, ‘সখিনা’, ‘একপয়সার বাঁশী’ প্রভৃতি।

স্মৃতিকথা ও ভ্রমণ কাহিনী : ঠাকুর বাড়ীর আঙ্গিনায় (১৩৬৮), ‘হলদে পরীর দেশে (১৯৬৫), যাদের দেখেছি’, ‘চলে মুসাফির’ (১৯৫৭), ‘জীবনকথা’ (১৯৬৪), ও ‘যে দেশে মানুষ বড়’ (১৯৬৮)। উপন্যাস : ‘বোবা কাহিনী’ (১৯৬৪)। গল্প : ‘বাঙ্গালীর হাসির গল্প’ (১৯৬০)। কাব্যনাট্যের মধ্যে রয়েছে : ‘বেদের মেয়ে’, ও ‘পল্লীবধু’।

‘নক্সী কাঁথার মাঠ’ গ্রন্থটি ‘দি ফিল্ড অব দি এব্রডারি কুইন্ট’ নামে ইংরেজিতে অনূদিত ও প্রকাশিত হয়। পল্লী কবি হিসেবেই তিনি পরিচিতি পেয়েছিলেন। পল্লী প্রকৃতি এবং জীবনের সহজ সরল রূপটি নিয়ে তিনি লিখেছেন বেশী। বাংলার মাটি ও মানুষের সাথে কবির সম্পূর্ণ অস্তিত্বই যেন এক হয়ে মিশে আছে। ১৯৭৬ সালের ১৪ই মার্চ ঢাকায় এই প্রখ্যাত কবির মৃত্যু হয়। ১

১৯৬৭ সালের আগষ্ট মাসে পাক-রুশ মৈত্রী সমিতির সহ-সভাপতি ডাঃ গঙ্কোভস্কির আমন্ত্রণে তিনি রাশিয়া সফরে যান। ডাঃ গঙ্কোভস্কির সহায়তায় বিজ্ঞান একাডেমী থেকে তাঁকে এ নিমন্ত্রণ পত্র পাঠানো হয়েছিল। সোভিয়েত ইউনিয়নে প্রায় মাসাধিককাল ঘুরে তিনি সেদেশের বহু জায়গা দেখবার সুযোগ পান। মস্কো, লেনিনগ্রাড়, তাসখন্দ, সমরকন্দ, বোখারা তাজাকিস্তান প্রভৃতির বিভিন্ন জায়গা পরিদর্শন করে কিছুদিন মস্কোর হসপিটালে চিকিৎসাধীন থেকে সুস্থ শরীরে দেশে ফিরে আসেন।

সোভিয়েতের যে জায়গাগুলো তাঁকে বেশী আলোড়িত করেছিল তিনি সেখানে বসেই সে সম্পর্কিত কিছু না কিছু লিখে রেখেছিলেন। বলাবাহুল্য সোভিয়েত ভ্রমণ কাহিনীটি তিনি লেখা শুরু করেন সোভিয়েত দেশ থেকেই। স্বদেশে ফিরে তিনি কিছুকালের মধ্যেই যে দেশে মানুষ বড়’ নামে বইটি লেখেন। গ্রন্থটি প্রথম প্রকাশিত হয় ১৯৬৮ সালে। গ্রন্থকারে প্রকাশিত হবার আগে এর কিছু অংশ সাপ্তাহিক চিত্রালীতে ছাপা হয়েছিল।

চিত্রালীর বহু পাঠক তাঁর এই ভ্রমণ-বৃত্তান্তের প্রশংসা করে তাঁকে চিঠি পাঠিয়েছিলেন। একটি চিঠি তিনি ভূমিকাতে তুলে ধরেছেন-

খুলনা হইতে আমার না দেখা বোন মিনা লিখিয়াছে, “দাদু। আপনার ভ্রমণ বৃত্তান্ত পড়ে মনে হ’ল আপনি যেখানে যেখানে গেছেন সেখানে বসেই সব কিছু লিখেছেন। তা না হলে আপনার বৃত্তান্ত এমন ছবির মতো স্পষ্ট হত না”।

 

যে দেশে মানুষ বড় । জসীম উদ্দীন

 

দুই

ভ্রমণের শুরুতেই তিনি মস্কোর প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের মুগ্ধ বর্ণনা দিয়েছেন। প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের সাথে সাথে সে দেশের মানুষগুলোও যে আশ্চর্য সুন্দর তারও কাব্যিক বর্ণনা দিয়েছেন তিনি। শহর ঘুরতে বেরিয়ে মস্কোর বিখ্যাত রেডস্কোয়ারে এসে তিনি লেনিনের সমাধিক্ষেত্র সহ সেখানকার বিশেষত্ব সম্পর্কে তথ্য সংগ্ৰহ করেন।

রেডস্কোয়ারের অদূরেই পৃথিবীর সপ্তম আশ্চর্যের অন্যতম রুশদেশের অতিকায় ঘন্টার কাছাকাছি এসে লেখক জেনে নেন এর সংগে জড়িয়ে থাকা নানা ইতিহাস। আড়াইশ বছর আগে ১৮৩৫ খ্রীষ্টাব্দে বিভিন্ন ধাতুর সংমিশ্রনে প্রসিদ্ধ কারিগর আইভান নোটেরিন ও তাঁর ছেলে এই বিশাল আকৃতির ঘন্টাটি নির্মাণ করেন বলে জানা যায়। মস্কোর ক্রেমলিন প্রাসাদে এসে এর ঐতিহাসিক গুরুত্বসহ সেখানকার বহু অজানা তথ্য তাঁর কাছে পরিষ্কার হয়েছিল।

এশীয় সংস্কৃতি সংস্থায় এসে লেখকের পরিচয় হয় মিসেস রিকোভার সংগে। বিকোভা বাংলা ব্যাকরণের একজন গবেষক। সংস্থার ডিরেক্টর লেখককে পাকিস্তানী সাহিত্য সম্পর্কে কিছু বলতে অনুরোধ জানালে তিনি দ্বিধাহীন বলেন স্বাধীনতার আগে মুসলমান লেখকের সংখ্যা খুব কম ছিল। তখনকার সাহিত্যে হিন্দু জীবনচিত্রের রূপায়ণ ঘটত সর্বত্রই।

স্বাধীনতার পরে সাহিত্যের অঙ্গনে কয়েকজন ভালো মুসলিম লেখকের উদয় হয়েছে। এদের মধ্য সৈয়দ ওয়ালিউল্লার উপন্যাস ‘লালসালু’ ইংরেজী ও ফরাসী ভাষায় অনূদিত হয়ে সমালোচকের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে। আবু ইসহাকের ‘সূর্য দীঘল বাড়ী’ অনূদিত হয়েছে চেক ভাষায়। ডঃ আশরাফ সিদ্দীকীর শিশুদের জন্য লেখা দু’খানা বই ইংরেজীতে অনূদিত হয়ে আমেরিকায় প্রকাশিত হয়।

লেখক নিজের কথাও বলেন। তাঁর নকশী কাথার মাঠ’ ও ‘বাঙ্গালীর হাসির গল্প’ অনূদিত হয়েছে ইংরেজী ভাষায়। ‘মাটির কান্না’ বইটি রুশ ভাষায় অনূদিত হয়ে ব্যাপক প্রশংসা কুড়িয়েছে। এ ছাড়াও তিনি লোকসাহিত্যের প্রসঙ্গ আলোচনা করে দেশজ ঐতিহ্যের গৌরবকে স্থান দিয়েছেন সবার ওপরে।

অনুবাদের ক্ষেত্রে আগ্রহী লেখকদের উদ্দেশ্যে তিনি ‘শহীদুল্লা কায়সারের’ ‘সংশপ্তক’, ‘কাজী আতাহার উদ্দীনের’ ‘পিপাসা’, ‘সরদার জৈনুদ্দীনের’ ‘অনেক সূর্যের আশা’, ‘শওকত ওসমানের’ ‘জননী’ প্রভৃতির নাম উল্লেখ করেন। মহিলা লেখকদের মধ্যে তিনি প্রাধান্য দেন সুফিয়া কামাল, দিলারা হাশেম, মনোয়ারা বেগম প্রমুখ।

আলোচনা শেষে লেখক এশীয় সংস্কৃতি সংস্থার গ্রন্থাগার দেখতে গিয়ে সেখানে পূর্ব পাকিস্তানের কোন বই খুঁজে পাননি। এর মূল কারণ হিসেবে জানা যায় অতীতে দু’দেশের সাথে ভালো বন্ধুত্ব না থাকায় কাষ্টমস সমস্যা সংক্রান্ত ব্যাপারগুলো বাঁধা হয়ে দাঁড়াতো আদান প্রদানের ক্ষেত্রে। তবে সময় এ বাধা কাটিয়ে উঠেছে। এবং দু’দেশের মধ্যে মৈত্রীবন্ধন দৃঢ় হবার লক্ষ্যে উভয় দেশই মনোযোগী হওয়ায় দেয়া-নেয়ার সম্পর্ক ক্রমশই সহজ হয়ে উঠেছে বলে কর্তৃপক্ষ জানান।

মস্কোতে মরিয়ম সালজনিকের (লেনিন প্রাইজখ্যাত ফয়েজ আহম্মদ ফয়েজের বান্ধবী)। সাথে লেখক দেখা করতে গেলে তিনি সাহিত্য সংক্রান্ত ব্যাপারে লেখকের একটি দীর্ঘ সাক্ষাৎকার গ্রহণ করেন। সাক্ষাৎকারে তাঁর খোলামেলা জবাবে পূর্ব-পাকিস্তানের সাহিত্যধারায় প্রবহমান তিনটি উল্লেখযোগ্য ধারা প্রাধান্য পায়। সাহিত্য বিষয়ক এই দীর্ঘ সাক্ষাৎকারটি লেখকের ছবিসহ একটি পত্রিকায় প্রকাশিত হয়।

লেনিনগ্রাড়ে তিনি রুশদের মহান আত্মত্যাগের স্থানটি পরিদর্শন করে পৃথিবীর বিভিন্ন আগ্রাসী শক্তির পরাজয়ের ইতিহাস সম্পর্কে অবহিত হন। এরপর লেখক লেনিনগ্রাড বিশ্ববিদ্যালয় ঘুরে এশীয় সংস্কৃতি ভবনের লেনিনগ্রাড শাখায় পৌঁছলে সেখানে ভারতীয় কৃষ্টির গবেষণায় নিয়োজিত বহু পন্ডিত ব্যক্তির সংগে তাঁর আলাপ হয়।

লেনিন স্মৃতি মিউজিয়ামটি ঘুরে দেখেছিলেন তিনি। লেনিনের স্মৃতি জড়িত সমস্ত কিছু এ মিউজিয়ামে সংরক্ষণ করে রাখা হয়েছে। মহান নেতা লেনিনকে সমগ্র সোভিয়েত জাতি যে শ্রদ্ধাভরে স্মরণ করে তার প্রকাশ ছড়িয়ে আছে মিউজিয়ামের সর্বত্রই। লেনিনগ্রাডের রাজপ্রাসাদে রক্ষিত মিউজিয়ামটি ঘুরে লেখক উপলব্ধি করেছিলেন রাজারা স্বৈরতন্ত্রী ছিলেন বটে তবে তাদের মধ্যে সুরুচি ও শিল্পবোধের অভাব ছিলনা। এটি তাদের প্রাসাদে রক্ষিত বিবিধ রুচিসম্পন্ন সামগ্রী দেখেই আন্দাজ করা যায়।

সোভিয়েত দেশের সাংবাদিক লিউবারস্কির সহায়তায় তিনি Field of mars নামে খ্যাত যুদ্ধে শহীদদের কবরস্থানটি দেখতে যান। সাংবাদিক লিউবারস্কি লেখকের ওপর একটি প্রবন্ধও লেখেন ‘টুলা’ নামক একটি পত্রিকায়। লেনিনগ্রাডের মালি অপেরা ও ব্যালে থিয়েটারে গিয়ে তিনি দেখেন সাহিত্যকলাকেও রুশরা প্রগতির নব সৃষ্টির আওতায় এনেছে।

পায়নিয়ার সেন্টার নামক শিশুরাজ্যে এসে লেখক জানতে পারেন এ ধরণের শিশুশিক্ষা প্রতিষ্ঠান সেদেশের সর্বত্রই রয়েছে এবং শত শত শিশুরাজ্য থেকে সেদেশের শিশুরা তাদের প্রয়োজনীয় শিক্ষা গ্রহণ করে। কৃষি খামারগুলোতে লেখক দেখতে পেয়েছিলেন রুশরা একটুকরো জমিও অনাবাদী ফেলে রাখে না। কৃষি, শিক্ষা ও বিদ্যুৎশক্তি উৎপাদনে রুশদের অগ্রণী ভূমিকা সর্বত্রই তাঁর চোখে পড়েছিল।

মস্কো ফিরে তিনি তাঁর হোটেলের ইংরেজী অনুবাদিকা সাতলানার সংগে সাহিত্য বিষয়ক আলোচনায় কবিতার বিষয়বস্তু সম্পর্কে রুশদের পছন্দের বিষয়গুলো জেনে নেন। দেশজ ঐতিহ্যের প্রতি সোভিয়েতবাসীর আগ্রহ তাঁকে মুগ্ধ করে। মস্কো বেতার কেন্দ্র থেকে লেখকের একটি সাক্ষাৎকার নেয়া হয় এবং সাক্ষাৎকার শেষে কবিকন্ঠের দুটো আবৃত্তিও তারা রেকর্ড করে রাখেন। মস্কোতে লেখক গিয়েছিলেন সেখানকার এক ছবির গ্যালারী দেখতে।

গ্যালারীতে রুশ দেশের নানাকাহিনী চিত্রের মাধ্যমে তুলে ধরা হয়েছে। চিত্রকরেরা রেখাঙ্কনের চেয়ে বিষয়বস্তুর ওপরই নজর দিয়েছেন বেশী। চিত্রকর্মগুলো অবাস্তব নয়। দেশীয় ইতিহাসের সংগে সম্পৃক্ত সেগুলো। মস্কোর এক রেস্টুরেন্টে ইউক্রেনের পাঁচটি মেয়ের সংগে লেখকের পরিচয় হয়েছিল। ঐ পাঁচ মেয়ের সৌন্দর্যে মুগ্ধ হয়ে কবি তাঁর অনুবাদক মিঃ বারানভের অনুরোধে একটি কবিতা লিখে রুশ সুন্দরীদের অভিভূত করেন।

ক্রেমলিনের এক শীতল ঘরে লেনিনের মরদেহ রাখা হয়েছে। পৃথিবীর বহু দেশ থেকে বহু লোক এসে ভীড় জমায় এখানে এই মহান নেতাকে এক নজর দেখবার জন্য। খুব ভোরে এসে লাইনে দাঁড়ালে বেলা বারোটায় লেনিনের সমাধি মন্দিরে পৌঁছানো যায়। সমাধির কাছে গিয়ে লেখক দেখেন লেনিনকে যেরূপ বিরাটদেহী পুরুষ বলে মনে হয় আসলে তিনি তা নন। খর্বাকৃতি সুন্দর এক পুরুষ তিনি। রুশরা এই মহান নেতাকে পীর বা দেবতা বানিয়ে তাঁর করবের ধূলি পায়ে মাখেন না বা তাঁর মৃতদেহের কাছে এসে রোগমুক্তির জন্য মানত করেন না ঠিকই তবে তাঁর আদর্শকে তারা মনে-প্রাণে অনুসরণ করেন।

 

যে দেশে মানুষ বড় । জসীম উদ্দীন

 

ষোলই আগষ্ট তিনি তাসখন্দ যান। তাসখন্দের ঐতিহাসিক গুরুত্ব হচ্ছে রক্তক্ষয়ী পাক-ভারত যুদ্ধের অবসান এখান থেকেই ঘোষিত হয়েছিল। মিঃ শেরজিক বারানভ নামে একজন গবেষক তাঁকে তাসখন্দের নানা ইতিহাস ও দর্শনীয় স্থানগুলোর সাথে পরিচিত হতে সাহায্য করেন। তাসখন্দের ভূমিকম্পের কাহিনী, সেখানকার বড় বড় ইমারত, এশীয় কৃষ্টি সমিতির অফিস, মসজিদ, গায়নিয়ার কেন্দ্র এবং তাসখন্দের বাজার প্রভৃতি অজানা ও দর্শনীয় বিষয়গুলোর সাথে তিনি পরিচিত হন।

মিঃ সেরজিক বারানভ জানান সোভিয়েতবাসীরা বিভিন্ন প্রদেশে এবং বিভিন্ন ভাষায় বিভক্ত হলেও তারা প্রত্যেকেই প্রত্যেকের দুঃখে সমানভাগী। তাসখন্দ শহর ঘুরে লেখক ভূমিকম্পের চিহ্ন প্রায়শই কোথাও দেখতে পাননি। সমস্ত শহর জুড়ে সুন্দর সুন্দর অট্টালিকার চাকচিক্য তাঁর নজরে পড়েছিল।

তাসখন্দ থেকে কবি চলে আসেন সমরকন্দ। সমরকন্দ ও বোখারা কবি হাফিজ ও মহাকবি ওমর খৈয়ামের লীলা ভূমি । রুজবেলা নামের এক অনুবাদিকাকে সঙ্গে করে লেখক সমরকন্দের ঐতিহাসিক ও বিখ্যাত জায়গাগুলো ঘুরে দেখেন। তিনি উলুক বেগের স্মৃতি জড়িত স্থান, সমরকন্দের বিখ্যাত বিবি হানুর মসজিদ, তৈমুরের সামাধিক্ষেত্র, উলুক বেগের সামাধিক্ষেত্র দেখে সমরকন্দের এক নাট্যশালায় গিয়ে সোভিয়েত নৃত্যকলা সম্পর্কে তথ্য সংগ্রহ করেন।

দুসাম্বায় তিনি সেখানকার লেখক সংঘের সদস্য আব্দুর রহমানকে সংগে করে শহর ঘুরে দেখেছিলেন। দুসাম্বার জাতীয় গ্রন্থশালা পরিদর্শন করে লেখকের ভালো লেগেছিল। কারণ সেখানে পাকিস্তানের ওপর যাবতীয় ছাপা বই সংরক্ষণ করা হয়েছে। গ্রন্থশালার একটি পুঁথি বিভাগে প্রায় দু হাজার হাতে লেখা পুঁথি সংরক্ষিত আছে। কবি ফেরদৌসী রচিত ‘শাহানামা’ গ্রন্থটি স্বচক্ষে দেখতে পেয়ে লেখক অভিভূত হয়েছিলেন। লেখক তাঁর নিজের লেখা ‘মাটির কান্নার রুশ অনুবাদটিও সেখানে দেখতে পান। প্রায় ২০লক্ষ বই এই ‘জাতীয় গ্রন্থশালায়’ সংরক্ষণ করা হয়েছে।

দুসাম্বার Institute of language and literature এ গিয়েছেন লেখক। সেখানে সাহিত্যসংক্রান্ত নানা আলোচনায় তিনি বলেছিলেন পাকিস্তানী সাহিত্যকলা অনেকখানি ইউরোপীয় সাহিত্যকলার অনুরূপ বলে পাকিস্তানী সাহিত্য ইউরোপেও একটি স্থান দখল করে নেবে বলে তিনি মনে করেন। তিনি তাজিকিস্তানের প্রসিদ্ধ লেখক “সদরউদ্দীন আইনির” মাজার, তাজিকিস্তানের লেখক সংঘ, পৃথিবীর সবচেয়ে বড় দাম- নুরেন দাম, লেনিনগ্রাড সমবায় খামার প্রভৃতি দেখে মস্কো ফিরে আসেন।

মস্কো ফিরে লেখক অনুবাদিকা সাতলানার সংগে দেখা করেন এবং নকশী কাঁথার মাঠের ইংরেজী অনুবাদসহ সাতলানাকে নিয়ে লেখা একখানা কবিতা তাকে উপহার দেন। দেশে ফেরার আগে মস্কো রেডিওতে তিনি তাঁর সোভিয়েত ভ্রমণ অভিজ্ঞতার ওপর একটি বিবৃতি দিয়ে এসেছিলেন।

৬ই সেপ্টেম্বর দেশে ফেরার কথা থাকলেও অসুস্থতার জন্য তাঁকে মস্কোর হসপিটালে থাকতে হয় কিছুদিন। সেখানে ডাক্তারদের আন্তরিকতা ও সুচিকিৎসার ফলে তিনি অল্পেই সেরে ওঠেন। হসপিটালের ক্লান্তিকর জীবনে রুশ মেয়ে ‘লেনার’ সাহচর্য তাঁর ভালো লেগেছিল। হাসপাতাল থেকে ছাড়া পেয়ে তিনি চলে আসেন হোটেলে।

মিঃ সিডারফ নামের একজন গবেষক হসপিটালে লেখককে দেখাশুনা করতেন এবং এই ভদ্রলোকই তাঁকে দেশে যাবার আগ-মুহূর্ত পর্যন্ত সঙ্গ দিয়েছিলেন। মিঃ সিডারফের সহায়তায় তিনি পুনঃরায় বলসাই থিয়েটারে যাবার সুযোগ পান। এ ছাড়াও তিনি কেনাকাটা থেকে শুরু করে বিভিন্ন স্থানে যাবার ব্যাপারে মিঃ সিডারফের আন্তরিক সাহায্য পেয়েছেন।

পাকিস্তান দূতাবাসে গিয়ে তিনি পাক-রুশ মৈত্রী সমিতির সভাপতি মিঃ সিডারিংকোকে পাকিস্তানী ছাত্রদের জন্য উল্লেখযোগ্য সংখ্যক স্কলারশীপের ব্যবস্থা করতে অনুরোধ জানান। দেশে ফেরার আগে তিনি মিঃ লঙ্কোভস্কির সাথেও দেখা করেছিলেন।

তিন

কবি জসীম উদ্দীন একজন লেখক হিসেবে সোভিয়েত দেশের বহু সাহিত্য বিষয়ক সংস্থায় যান এবং সাহিত্য সংক্রান্ত নানা আলোচনায় অংশগ্রহণ করেন। তবে সাহিত্যজগতের মানুষ হয়ে তিনি যে কেবল সেদেশের কলা-সংস্কৃতির দিকটাই দেখে এসেছেন তা নয়। সোভিয়েত দেশের যাবতীয় বিষয় তাঁর দৃষ্টিতে গুরুত্ব পেয়েছিল।

নির্দিষ্ট সময়ের ভেতরও সেদেশের সমস্ত দিকের গভীরে যাবার প্রয়াস ভ্রমণের সর্বত্রই স্পষ্ট। তিনি সোভিয়েতের প্রকৃতি থেকে শুরু করে সেদেশের মানুষ ও রাষ্ট্রের প্রতিটি ছোট-বড় বিষয়ের প্রতি মনোযোগী ছিলেন এবং উন্নত সোভিয়েত দেশের সাথে উন্নয়নশীল পাকিস্তানের ঐক্য ও অনৈক্যের বিষয়গুলো স্পষ্ট করেছেন।

সোভিয়েত দেশে গিয়ে সেখানকার প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের ব্যাপারটি তাঁর চোখে পড়েছিল। প্রাকৃতিক সৌন্দর্য ছাড়াও সেদেশের মানুষগুলোর সৌন্দর্য, বিশেষ করে নারীরূপের সৌন্দর্য লেখককে বিশেষভাবে আকৃষ্ট করেছিল। রুশ দেশ এবং সেদেশের মানুষের সৌন্দর্য বর্ণনায় তিনি বলেছেন।

কী সুন্দর এই দেশ! আর কী সুন্দর এর নরনারী। পথে পথে যেন রূপকথার ছেলেমেয়েরা ঘুরিয়া বেড়াইতেছে। উড়োজাহাজের ময়দান হইতে গাড়ী করিয়া সহরে আসিলাম। এতো সহর নয়-যেন গাছ-গাছালী ভরা কুঞ্জবন । ২

 

যে দেশে মানুষ বড় । জসীম উদ্দীন

 

সোভিয়েত রাষ্ট্র ব্যবস্থায় জনগণের সর্বোচ্চ মর্যাদার অধিকার এবং সে দেশের সরকার ও জনসাধারণের মধ্যে একটা সম্প্রীতির ভাব লেখককে সবচেয়ে বেশী মুগ্ধ করেছিল। সোভিয়েত দেশের ব্যাপক উন্নতি ও অগ্রগতির মূলে যে শক্তিটি বেশী সক্রিয় তা সরকার ও জনসমষ্টির মধ্যে সদ্ভাব । এ প্রসঙ্গে তিনি বলেছেন-

আমি বলিলাম, এদেশে আসিয়া আমার সব চাইতে ভাল লাগিল, আপনারা আপনাদের জনগণকে সব চাইতে উচ্চ আসন দিয়াছেন। আর আপনাদের গভর্নমেন্টের সহিত আপনাদের জনগণ একাত্ম। সেইজন্য আপনাদের দেশ যেন কোন যাদুকরের যাদু স্পর্শে উন্নতির শিখর হইতে শিখরে আরোহণ করিতেছে। মস্কো, লেনিনগ্রাড যেখানেই গিয়াছি সেখানেই আমি আপনাদের এই অগ্রগতির কাহিনী রূপায়িত হইতে দেখিয়াছি। ৩

সোভিয়েত দেশে তিনি লক্ষ্য করেছিলেন যে, সেদেশে কবি, সাহিত্যিক, শহীদ বুদ্ধিজীবী, মহান নেতা এদের প্রত্যেককেই অত্যন্ত সম্মানের চোখে দেখা হয়। রাষ্ট্র এবং জনগণ একাত্ম হয়ে তাদের শ্রেষ্ঠত্বকে সবার উচ্চে স্থান দিয়ে রাখে। সেদেশে মহান ব্যক্তিদের দেবতা, বা পীর আউলিয়া মনে করা হয় না।

শুধু তাদের মহৎ কর্মগুলোকে সমগ্র দেশবাসী শ্রদ্ধাভরে অনুসরণ করেন এবং তাদের প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদনে জনগনের গঠনমূলক কাজ এবং মনোগত আলোড়নের নীরব প্রকাশ ছাড়া কোন উচ্ছ্বসিত আবেগের প্রকাশ সেখানে নেই। লেখক স্বদেশ ভাবনায় কাতর হয়েছেন দেশীয় কুসংস্কার এবং কর্মবিমুখতার কথা ভেবে। স্বদেশে লেখক লক্ষ্য করেছেন প্রখ্যাত ব্যক্তিদের অলৌকিক কিছু ভেবে তাদের কাছে বা তাদের সমাধিস্থলে জনতা ছুটে যান ব্যক্তিগত স্বার্থোদ্ধারের জন্য।

এভাবেই পাকিস্তানী জনগণ নিজেদের জড়িয়ে রাখে শত বৎসরের কুসংস্কারে আর এই পার্থকাই রুশদেশকে নিয়ে গেছে উন্নতির শিখরে এবং পাকিস্তান পিছিয়ে পড়েছে গতানুগতিকতার কবলে। লেখক লক্ষ্য করেছিলেন রুশরা কবি সাহিত্যিকদের কবরগুলি যত্নভরে সংরক্ষণ করে অথচ পাকিস্তানে বহু বিখ্যাত কবির কবরও অরক্ষিত অবস্থায় পড়ে থাকতে দেখা যায়।

সোভিয়েত দেশে সমালোচনা নেই বলে যে দেশে দেশে মিথ্যে প্রচলিত আছে, তা যে একেবারেই মনগড়া কথা লেখক নিজের চোখে দেখে সেটা বিশ্বাস করেছিলেন। তিনি লক্ষ্য করেছিলেন সোভিয়েতবাসীরা যে কোন অন্যায়ের বিরুদ্ধে সবাই সোচ্চার। কোন কাজেই ফাঁকি দেবার প্রবণতা তাদের নেই।

যদি বা কেউ কোন কাজে কিছুটা গড়িমসি করে তো তার বিপক্ষে সমালোচনা সভা বসে এবং তার প্রতিকার জরুরী হয়ে পড়ে। কিন্তু সেখানে কোন বিক্ষোভ বা বিশৃংঙ্খলা নেই। নিয়মের সুষ্ঠু পরিকল্পনাকে তারা সবাই মেনে নেয়। প্রত্যেকটি মানুষকে দেয় তারা ব্যক্তির যোগ্য মর্যাদা।

ছোট-বড় ভেদাভেদ সেখানে নেই। বৈষম্যহীন সমাজ ব্যবস্থায় সেদেশে সবাই সমান এবং একে অপরের প্রতি আন্তরিক ও শ্রদ্ধাশীল। সোভিয়েতবাসীরা প্রত্যেকেই অতিথিপরায়ণ। আগত অতিথিদের সম্মানার্থে তারা সবরকম সাহায্য সহযোগিতা করে থাকেন। বিশেষ করে ডাক্তাররা সেখানে জনগণের বন্ধু।

হাসপাতালের ডাক্তারেরা রোগীদের বন্ধু। কোন রোগী নিয়ম ভঙ্গ করিলে নার্সরা হাসিমুখে আসিয়া বারণ করে। আমাদের দেশের নার্সদের মত তিরস্কার করে না ।

সেদেশের মানুষের নৈতিক মানও অনেক উন্নত। সোভিয়েত দেশে চুরি, ডাকাতি একেবারেই নেই। রাষ্ট্রের সুপরিকল্পিত ব্যবস্থায় জনগণের মৌলিক অধিকারগুলো নিশ্চিত হয়েছে বলে সেখানে কারো অন্যায়ের পথে পা বাড়ানোর প্রয়োজন পড়ে না।

লেখক লক্ষ্য করেছিলেন প্রত্যেকটি বাড়ী এমনকি রাস্তার দুধারের গাছগুলো প্রচুর ফলে ভরে রয়েছে অথচ সেগুলো কখনই চুরি যাচ্ছেনা। এর মূলে রয়েছে পর্যাপ্ততা এবং জনগণের সন্তুষ্টি। সোভিয়েতের যেখানেই লেখক গিয়েছেন সেখানেই দেখেছেন জাতীয় অগ্রগতির জয়যাত্রা প্রবল হয়ে উঠেছে।

জাতীয় চরিত্রে সোভিয়েত দেশ অনেক এগিয়ে গেছে। সেখানে কোন মানুষের অসৎ উপায়ে সঞ্চয় করবার প্রবণতা নেই। চুরি নেই, মিথ্যে নেই, অপচয় নেই। রাষ্ট্রের সুব্যবস্থায় প্রত্যেকটি মানুষ আত্মিক শুদ্ধিতে শুদ্ধ। প্রত্যেকেই তাদের প্রাপ্তিতে তুষ্ট। দেশের সর্বত্রই এক নিয়ম। কোথাও এতটুকু হেরফের নেই। জিনিস পত্রের দাম গোটা সোভিয়েত জুড়েই এক দাম। পাকিস্তানের জাতীয় চরিত্র বলতে কিছু নেই।

মানুষ হন্যে হয়ে যে কোন পন্থায় সঞ্চয়ের পেছনে ধাবিত হয়। চুরি, মিথ্যা, অপচয়, অবিচার, অনাচারে এদেশ জর্জরিত। সর্বত্রই প্রতিযোগিতা। দুর্বলকে মেরে সবলের মুষ্টি ভরার প্রয়াস দেশের সর্বত্রই প্রকট। যার ফলে জাতির ভবিষ্যৎ হয়ে পড়েছে অন্ধকারময়।

এদেশে আসিয়া বারবার এই কথাই মনে হয়, আহা! আমাদের পাকিস্তানে এরূপ রাষ্ট্র করা যায় না ? বন্ধু বলিলেন, “করা যায় বটে কিন্তু সে কাজের ভার যাকে দিবে তিনিই সেখান হইতে দুগ্ধের সর তুলিয়া লইবেন। দেখিতেছ না আমাদের পাঠ্য বইগুলি জাতীয়করণ করা হইল।

কয়েক বছরে কত লোক এখান হইতে বরখাস্ত হইল, কত লোক এ্যান্টিকরাপশনে ধরা পড়িল । আমাদের জাতীয় চরিত্র খারাপ। আমাদের এখানে ওসব হওয়ার জো নাই”। আর এক বন্ধু বলিলেন, “কেন হওয়ার জো নাই। শুধু পাঠ্যবই জাতীয়করণ করিলে কি হইবে ? সব কিছু জাতীয়করণ করিতে হইবে।

দেশের সব লোক যদি সোভিয়েতবাসীদের মত সুযোগ-সুবিধা পায় তবে তারা চুরি করিবে কার জন্য ? আমাদের ভবিষ্যৎ অন্ধকার বলিয়াই তো দেশের বহু লোক যে যেখান হইতে পারুক যে প্রকারেই পারুক কিছু সঞ্চয় করিতে চায়। বড় লোকদের মত জীবন যাপন করিতে চায়। দেশের সব লোকই যদি একই রকম হয় তবে আর বড় লোক হইবে কার অনুকরণে ৪৫

সোভিয়েত রাষ্ট্রব্যবস্থায় সে দেশের নাগরিকদের কিছু নির্দিষ্ট নিয়ম মেনে চলতে হয়। নগরজীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রেই তারা রাষ্ট্রনির্ধারিত নিয়মগুলো মেনে চলে ফলে হাটে বাজারে, যাতায়াত ক্ষেত্রে, কোন দর্শনীয় স্থানে অর্থাৎ প্রাত্যহিক জীবনের প্রতিটি পদক্ষেপে তাদের অহেতুক কোন ঝামেলায় পড়তে হয়না। যে যার মত এসে লাইনে দাঁড়িয়ে যায়।

ফলে অযথা কোন হৈ চৈ বা অবাঞ্ছিত ভীড় জমে ওঠেনা কোথাও। সে দেশের আরও একটি বৈশিষ্ট্য তাঁর নজরে পড়েছিল, সোভিয়েত দেশের মানুষের আয় বেশী। প্রত্যেকটি মানুষই স্বচ্ছল। কিন্তু তারা ইচ্ছে করলেই বিলাস সামগ্রী কিনতে পারেন না যখন তখন। এজন্য সরকারের কাছে লিখিত আবেদন পত্র পাঠাতে হয়। অপেক্ষামান তালিকার ক্রমানুসারে আবেদন পত্রের পরি প্রেক্ষিতে অনুমতি পেলে তবেই তারা নির্দিষ্ট সামগ্রী কিনতে পারে।

সোভিয়েত ইউনিয়নে কোন ভিখারী লেখকের চোখে পড়েনি। রাষ্ট্রকাঠামোর সুব্যবস্থায় সেখানে সব লোক খেতে পড়তে পায়। অথচ পাকিস্তানে কত কৃষক, প্রজা, সাধারণ মানুষ অনাহারে অর্ধাহারে মরছে তার হিসেব রাখা কঠিন। বন্যা, খরা, দুর্ভিক্ষ, মহামারী, অপুষ্টিজনিত কারণ এবং আহার বাসস্থানের অভাবে অগুন্তি মানুষ পথে পথে ঘুরছে। পাকিস্তানের রাষ্ট্রকাঠামোয় যে অসঙ্গতি রয়েছে, যে সুষ্ঠু নেতৃত্বের অভাব রয়েছে তা দূর করার জন্য সোভিয়েত রাষ্ট্র ব্যবস্থাকে অনুকরণ করা উচিত বলে তিনি মনে করেন।

এমন সুন্দর দেশে আমাদের সকল থাকিয়াও যেন কিছুই নাই। তোমাদের দেশে যেমন সব লোক সমান, আমাদের দেশে তেমন নয়। বিশ বছর হইল আমরা স্বাধীনতা পাইয়াছি। ভাবিয়াছিলাম স্বাধীনতা পাওয়ার পরে আমার দেশের জনগণ দুমুঠো পেট ভরিয়া খাইতে পাইবে। কিন্তু তাহা হইল না।

তুমি যদি আমাদের দেশে যাও দেখিবে, মুষ্টিমেয় লোক কেহ কেহ বড় বড় শিল্প কারখানা পড়িয়া, কেহ কেহ দেশ বিদেশে বানিজ্য প্রসারিত করিয়া, কেহ কেহ বড় বড় রাষ্ট্রীয় পদে আসীন হইয়া ধনসম্পদে ফুলিয়া ফাঁপিয়া উঠিতেছে আর অগণিত জনগন রোগে ব্যাধিতে অনাহারে ধাপে ধাপে নিচে নামিয়া যাইতেছে। দেশের সম্পদ মুষ্টিমেয় কতকগুলি লোকের করতলগত হইয়াছে। সেই করতল দিনে দিনে আরও প্রসারিত হইতেছে। ৬

সোভিয়েতে দেশের আর একটি বৈশিষ্ট্য, তারা জনশক্তির অপচয় করেনা। জনশক্তির অপব্যবহাররোধে তাদের সব সময়ই সজাগ দৃষ্টি থাকে। প্রয়োজনের তুলনায় অতিরিক্ত কোন কিছু সোভিয়েত দেশে নেই। যেখানে যতগুলো দোকানের প্রয়োজন সেখানে ঠিক ততগুলোই দোকান রাখা হয়েছে। এটা শুধুমাত্র দোকানের ক্ষেত্রে নয় সবক্ষেত্রেই এ নিয়ম তারা মেনে চলে। পাকিস্তানে অপচয়ের দৃশ্য সর্বত্রই চোখে পড়ে। এ প্রসঙ্গে লেখক বলেছেন-

আমাদের দেশে প্রয়োজনের চাইতেও বেশী দোকান। প্রত্যেক দোকানে আলাদা আলাদা কর্মচারী। ইহাতে জনশক্তির কত অপব্যয় হইতেছে। সোভিয়েত দেশে তাহা হইবার যো নাই। ৭

 

যে দেশে মানুষ বড় । জসীম উদ্দীন

 

সোভিয়েত দেশে শিক্ষার ক্ষেত্রে শিশুকাল থেকে সর্বোচ্চ শিক্ষাক্রম পর্যন্ত কোন ছাত্র-ছাত্রীকেই বেতন দিতে হয় না। সরকার তাদের শিক্ষার সমস্ত ব্যয়ভার বহন করে। শিশু বয়স থেকেই তারা যেন কোন অন্ধগোড়ামী বা মিথ্যা কুসংস্কার শিখতে না পারে সেদিকে বিশেষ খেয়াল রাখা হয়। সেদেশের পাঠ্যবইগুলি বিশেষ সতর্কতার সঙ্গে লেখা হয়। পাকিস্তানে এ ধরণের সতর্কতা কোথাও দেখা যায়না। পাকিস্তানের কথায় লেখক বলেছেন-

আমাদের দেশে যেমন শিশুরা ইতিহাসের ক্লাসে বাবা আদমের কাহিনী হইতে মানুষের জন্ম বৃত্তান্তের ঘটনা শিখিতে আরম্ভ করে, আবার বিজ্ঞানের ক্লাসে যাইয়া ইভোলিউশনের থিয়োরী শিখিয়া দুই বিপরীত ঘটনা লইয়া মুস্কিলে পড়ে, এদেশের শিক্ষায় তেমন হইতে পারে না। বিজ্ঞানের গবেষণা যন্ত্রে যে তথ্য টিকে না তাহা সোভিয়েত দেশ বিশ্বাস করে না। ছাত্রদিগকে তাহা শিক্ষা দেওয়া হয় না।

তবে সে দেশে ধর্মীয় ব্যাপারে কোন বিধিনিষেধ লেখকের চোখে পড়েনি। এ প্রসঙ্গে তিনি স্বদেশী প্রপাগান্ডার প্রতিবাদ জানিয়ে বলেছেন-

সমাজতন্ত্র বিরোধী কোন কোন লোক আমাদের দেশে ঘটা করিয়া প্রচার করেন সোভিয়েত দেশে মুসল্লিদিগকে নামাজ পড়িতে দেওয়া হয়না। মসজিদগুলি হয় ভাঙ্গিয়া ফেলা হইয়াছে অথবা সেখানে গভর্ণমেন্টের অন্যান্য অফিস বসিয়াছে। আমাদের অসাম্য-ভরা দেশে যদি কেহ জনগণের সুযোগ- সুবিধার জন্য কোন প্রচেষ্টা আরম্ভ করেন তাহাদিগকে থামাইয়া দেওয়ার জন্য উপরোক্ত মিথ্যা প্রচারকার্য এক অভিনব কৌশল।

সোভিয়েত দেশের অতিথি হইয়া ইহাদের অতিথিপরায়ণতায় বহুবিধ উপাদেয় খাদ্য সামগ্রী খাইয়া দেশে ফিরিয়া আসিয়া কেহ কেহ মন্তব্য করিয়াছেন এ দেশে ধর্মাচরণের স্বাধীনতা নাই। চক্ষু মেলিয়া যাহারা সত্যকে অস্বীকার করেন আল্লা যেন তাহাদের ক্ষমা করেন।

সোভিয়েত দেশে ধর্মপালনকারীদের মধ্যে দু’একজন যুবক ছাড়া বৃদ্ধের সংখ্যাই তাঁর চোখে পড়েছিল। স্বদেশেও এ চিত্রই দেখতে পাওয়া যায় বলে তিনি জানিয়েছেন।

পাইওনিয়ার সেন্টার অর্থাৎ শিশুরাজ্য সেদেশের একটি অন্যতম বৈশিষ্ট্য। সোভিয়েত দেশের সব জায়গাতেই রয়েছে পায়ওনিয়ার সেন্টার। সেখানে শিশুদের বিনোদনের মাধ্যমে নানারকম শিক্ষা দেয়া হয়। দুবছর বয়স থেকেই শিশুরা তাদের শিক্ষাক্রম শুরু করে।

প্রথম ছয় বছর নাচ-গান শিখে, গল্প শুনে, ছবি দেখে তাদের শিক্ষাক্রম শেষ হবার পর তারা কিন্ডারগার্টেনে আসে এবং বই এর শিক্ষা শুরু করে। লেখক লক্ষ্য করেছিলেন সোভিয়েত রাষ্ট্রব্যবস্থায় ভবিষ্যৎ নাগরিক সংগঠনের ক্ষেত্রে সবচেয়ে বেশী জোর দেওয়া হয়।

সোভিয়েতের আর একটি বৈশিষ্ট্য লেখকের চোখে বিশেষ ভাবে ধরা পড়েছিল; সেদেশের শিক্ষকরা তাদের কর্তব্যকর্মে কখনই অবহেলা করেন না। প্রত্যেকেই তাদের নিজ নিজ দায়িত্ব একাগ্রতার সাথে পালন করে থাকেন। কখনও দেখা যায় ছাত্রদের চেয়ে তাদের ভূমিকাই বড় হয়ে দাঁড়ায়। এ প্রসঙ্গে লেখক বলেছেন-

ওদেশের শিক্ষকেরা কেমন, তার একটি গল্প বলি। আমাদের দেশ হইতে যাহারা ওদেশের কোন উচ্চতর শিক্ষার জন্য যায় প্রথম ছয়মাস তাহাদিগকে রুশ ভাষা শিক্ষা দেওয়া হয়। এই ছয়মাসের মধ্যে শিক্ষকেরা তাহাদিগকে রুশভাষা শিখাইয়া ছাড়েন। একজন ছাত্র আমাকে বলিলেন “ভাইরে। শিক্ষকদের জ্বালায় গেলাম। আঠার মত তাহারা আমাদের সঙ্গে লাগিয়াই আছেন। ক্লাসে তো প্রতিদিন। নানা ছবি দেখাইয়া, টেপ রেকর্ড বাজাইয়া, বই-পুস্তক পড়াইয়া শিক্ষাদান চলে। তাছাড়া আমাদের শয়ন ঘরে পর্যন্ত আসিয়া তাঁহারা শেখান আরম্ভ করেন। এমনকি বাথরুমে যাইয়াও তাহাদের হাত হইতে রেহাই পাওয়া মুস্কিল। ১০

শিক্ষা ক্ষেত্রে এবং বিদ্যুৎ শক্তি উৎপাদনের ক্ষেত্রে রুশবাসী খুব বেশী মনোযোগী। শিক্ষার প্রসার এবং বিদ্যুৎ শক্তি বৃদ্ধির ফলে দেশের সার্বিক উন্নয়ন সম্ভবপর হয়েছে। বিদ্যুৎ শক্তিতে রুশ দেশ পৃথিবীর দ্বিতীয় স্থানীয়। এছাড়া আরও একটি বৈশিষ্ট্য তাঁর চোখে পড়েছিল; নারী শিক্ষায় সে দেশ অনেক উন্নত। সেদেশের ডাক্তারদের মধ্যে শতকরা নব্বই জন মেয়ে এবং শিক্ষয়িত্রীদের অনুপাতও তেমনি। ফসল উৎপাদনে কোনরকম ঔদাসীন্য সোভিয়েত রাষ্ট্র সহ্য করে না।

সোভিয়েতে প্রচুর জমি। তবুও কোন জমি পতিত অবস্থায় ফেলে রাখা হয় না। সেখানকার বিশেষজ্ঞরা জমির মাটি পরীক্ষা করে বলে দেন পরবর্তীতে জমিতে কি সার ব্যবহার করতে হবে। নির্দেশানুসারে সার ফেলে প্রত্যেক বছরই তারা জমিতে ফসল ফলান। সেখানে শস্যক্ষেত্রে কীট পোকার উপদ্রব তারা বিশেষ সতর্কতার সাথে প্রতিরোধ করেন। বীজ বোনার আগেই চারপাশের আগাছা কেটে জমিতে কিছুটা কীটনাশক ছিটিয়ে দেয়া হয় বলে পোকার আক্রমন হয় না। দেশের কথায় লেখক বলেছেন-

আমাদের দেশে কীটনাশক বিশেষজ্ঞদের মত আগে জমিতে কীট পোকার অবাধ বংশবিস্তারের সুযোগ দিয়া পরে স্থানে স্থানে কীটনাশক ঔষধ ছড়াইয়া গরু এবং মানুষের জীবন বিপদগ্রস্ত করিয়া তুলে না । ১১

সাহিত্য বিষয়ক আলোচনায় তিনি প্রগতিশীল নারী ও অনগ্রসরমান বঙ্গনারীর মধ্যে একটি জাতিগত সাদৃশ্যের ভাব লক্ষ্য করেছিলেন। অনুবাদের ব্যাপারে তিনি পুরুষ লেখকদের নাম উল্লেখ করলে জনৈক ভদ্রমহিলা নারী-লেখিকার নাম জানতে আগ্রহী হন এবং প্রখ্যাত লেখিকাদের নামগুলো নোট করেন।

১. ভদ্রমহিলা ফোড়ন কাটিলেন, “আপনি শুধু পুরুষ লেখকদেরই নাম করিতেছেন। আপনাদের ওখানে কি মেয়ে লেখিকা নাই ?১২

২. এদেশের মেয়েরা পুরুষের পাশে এক সঙ্গে কাজ করিলে কি হইবে ? মেয়েদের জন্য মেয়েদের একটি আলাদা টান সকল দেশেই আছে। আমার বক্তব্য শেষ হইলেই তিনি এই লেখিকা দুইজনের নামধাম টুকিয়া লইলেন। ভাব দেখিয়া মনে হইল বই দুইখানি হাতের কাছে থাকিলে তিনি এখনই অনুবাদের কাজে লাগিয়া যাইতেন। ১৩

সোভিয়েতের বিভিন্ন জায়গায় সাহিত্য সংক্রান্ত নানা আলোচনায় এবং সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানগুলোর যেখানেই তিনি গিয়েছেন সর্বত্রই লক্ষ্য করেছেন রুশদের জানবার আগ্রহ প্রবল। অবিরাম তথ্য সংগ্রহে ও সংযোজনে তাদের কোন ক্লান্তি নেই। রুশ রমনীরা এ ব্যাপারে আরও বেশী সক্রিয়। এক্ষেত্রে স্বদেশের রমনীকূলের সংগে এদের বৈসাদৃশ্য তিনি লক্ষ্য করেছিলেন।

শিল্পকলা ও সাহিত্যের বিকাশে সোভিয়েত দেশ অনেক উন্নত। সেখানকার নৃত্যকলা পৃথিবী বিখ্যাত। লেখক একটি জিনিস পরিস্কার বুঝতে পেরেছিলেন তারা শুধুমাত্র প্রচার সর্বস্ব সৃষ্টিতে আবদ্ধ নয়, সাহিত্য-কলার নানা শাখায় তাদের অবাধ ও অনলস বিচরণ এবং মৌলিক সৃষ্টিতে তাদের গভীরতার ব্যাপ্তি বিশাল। বিষয়টি তুলনামূলক পর্যায়ক্রমিক উদাহরণে আরও স্পষ্ট হবে।

১. আমাদের দেশের মেয়েরা এককালে পুরুষের প্রতি নয়নবাণ নিক্ষেপ করিতে ওস্তাদ ছিল। তাহাতে আমরা অভ্যস্ত ছিলাম, কিন্তু সোভিয়েত দেশের মেয়েদের তার উল্টো দেখিতেছি। তাহারা বিদেশীকে পাইলে প্রশ্নবাণে তার সবকিছু জানিয়া লইতে চায় । ১৪

২. চীন দেশের মতো বর্তমান কালের রাশিয়া তার সাহিত্যকলাকে শুধু প্রচার যন্ত্র হিসাবেই ব্যবহার করিতেছে না। এ দেশের লেখকেরা সাহিত্য বিভাগের নানা দিগন্তে বসিয়া এক এক জন এক এক রকমের সৃষ্টি কার্যে নিযুক্ত আছে। ১৫

রুশ সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানগুলোতে প্রায়শই বহু শিল্পীর উপস্থিতি লেখকের চোখে পড়েছিল। হাজার হাজার শিল্পকর্মী নিয়ে তারা বড় আকারের বিভিন্ন ধরণের অনুষ্ঠানমালা পরিবেশন করে। তবে ছোট গ্রুপের অনুষ্ঠানও তিনি দেখেন এবং সেগুলো বড় গ্রুপের মতই আকর্ষণীয়, গভীর আবেদন সমৃদ্ধ এবং জীবন্ত।

রুশ- পাক সংস্কৃতির তুলনামূলক ভাবনায় তিনি কিছু মিল-অমিলের ব্যাপার খুঁজে পেয়েছিলেন। প্রথমত সরকারী সহযোগিতার ফলে রুশ সাংস্কৃতিক অঙ্গনের ব্যাপক বিস্তৃতি, দর্শক সমাবেশ, শিল্প নৈপুণ্য এবং জীবন্ত পরিবেশসহ সমগ্র রুশ সাংস্কৃতাঙ্গনকে যেমন হৃদয়গ্রাহী করে তোলা সম্ভব হয়েছে পাকিস্তানের ক্ষেত্রে তা সম্ভব নয়।

মানবমনের যতগুলি প্রকাশের পথ আছে সোভিয়েত গভর্নমেন্ট তার সবগুলি দরজাই শুধু খুলিয়া দেন নাই, জনগণ যাহাতে সেই পথে আগাইতে পারে রাষ্ট্র সে জন্যও কম সতর্ক নয়। সোভিয়েত দেশের নৃত্যকলা যাহা বিশ্বের উপভোগের সামগ্রী হইয়াছে, কোন দেশের নৃত্যকলাই এদের মত জনগণের স্বীকৃতি পায় নাই ।১৬

তবে ছোট আকৃতির অনুষ্ঠানগুলোতে তারা যে পারদর্শিতার ছাপ রাখে পাকিস্তানের পক্ষে সেসব সম্ভব বলে তিনি মনে করেন। দ্বিতীয়ত রুশ নৃতনাট্যগুলোতে সারকথা খুব কম। পাকিস্তানী কাহিনী যদি তাদের নৈপুণ্যে ঢেলে সাজানো যায় তাহলে সেটি অধিক শৈল্পিক মর্যাদার অধিকারী হবে।

আমার মনে হইল, আমাদের দেশে সোভিয়েত দেশের মত বহু নটনটী এবং বাদকমন্ডলী লইয়া নৃত্যাভিনয় করা সম্ভব নয়। কারণ এ দেশের নাট্য এবং নৃত্যাভিনয়ে দেশের রাষ্ট্র অর্থ উপকরণ ও উৎসাহ লইয়া ইহাদের সম্মুখে আসিয়া দাঁড়ায়।

আমাদের রাষ্ট্র যবনিকার অন্তরালে থাকিয়া যে অর্থসম্পদের ছিটেফোঁটা চুড়িয়া দেন তাহা লইয়া বিরাট কিছু গড়া সম্ভবপর নয়। কিন্তু এই ক্ষুদ্র নাটুকে দলটির মত আমাদের নৃত্যকারেরা যদি অল্প কয়েকজন নটনটা মিলিয়া ভালমত রিাহর্সেল দিয়া দু একটি কাহিনী রূপায়িত করেন আমার বিশ্বাস আমাদের জনসাধারণও তাহাদিগকে উৎসাহ দিবে। ১৭

আমার মনে হয়, আমার নকসী কাঁথার মাঠে’র নৃত্যনাট্য লইয়া মান্নান যদি এদেশে আসে, সে এদেশ হইতে বেশ সুনাম লইয়া ফিরিবে। কিন্তু এদেশে আসিবার আগে তাহাকে এই নৃত্যনাট্য লইয়া আরও বহু মহড়া দিতে হইবে। নায়কের পাঠে নতুন লোক দিয়া, আরও বহু নাচিয়ে লইয়া তাহাকে নৃত্যনাট্যটি নতুন করিয়া ঢালিয়া গড়িতে হইবে। কিন্তু এসবের উপকরণ সে কোথায় পাইবে ? আমাদের ঢাকায় নাচিয়ের দলগুলি বহুভাগে বিভক্ত।

মান্নান আর গহর জামিল এই দুইজনে একত্র হইয়া যদি এদেশে আসে, আমার বিশ্বাস শুধু নিজেদের জন্য নয়-পাকিস্তানের জন্য তারা একটি গৌরবের আখ্যা লইয়া দেশে ফিরিবে । ১৮

রুশ দেশের কৃষ্টি ও কালচারের সাথে লেখক স্বদেশের বহু মিল খুঁজে পান। সোভিয়েতের বিভিন্ন জায়গা ঘুরে তিনি যে সত্য উপলব্ধি করেন তা উদ্ধৃতিগুলো থেকে আরও স্পষ্ট হবে।

 

যে দেশে মানুষ বড় । জসীম উদ্দীন

 

কোন নিকট আত্মীয়ের সঙ্গে বহুদিন পরে দেখা হইলে, পরস্পর যেভাবে একে অপরের দিকে বিস্ময়ে চাহিয়া থাকে, কেহ কোন কথা বলিতে পারেনা, আপনাদের দেশে আসিয়া আমি তেমনি মূক হইয়া গিয়াছি। প্রথমেই আপনাদের রেডিও যন্ত্রে যে সব গান বা বাদ্য বাজে আমার মনে হয় সেগুলি যেন আমারই অন্তর হইতে বাজিতেছে। আমাদের কৃষ্টির কতখানি আপনাদের সাহিত্য সঙ্গীত নৃত্যকলার সঙ্গে মিশিয়া আছে তাহা কে নিরুপণ করিবে। ১৯

আমি মনে করি, সমরকন্দ, বোখারা ও তাজিকিস্তান এশিয়া ইউরোপের মিলন কেন্দ্র। কারণ আপনাদের কালচার ও কৃষ্টির অনেকখানি আমাদের সংগে মেলে। আপনাদের মারফত আমরা সমগ্র রাশিয়ায় তথা সমগ্র ইউরোপে আমাদের সাহিত্যকলার জন্য একটি স্থান গড়িয়া লইতে পারিব। ২০

সেদেশের মুসলিম প্রজাতন্ত্রগুলোর পাকিস্তান প্রীতি বিশেষভাবে লেখকের চোখে ধরা পড়েছিল। এ সংক্রান্ত উদাহরণ-

তাজেকিস্তান সমরকন্দ আর বোখারা প্রভৃতি দেশের লোকেরা পাকিস্তানের প্রতি বড়ই আগ্রহশীল। পূর্বকালে ধর্মীয় বন্ধনে আমরা আবদ্ধ ছিলাম। এখন তাহারা ধর্মকে বড় স্থান না দিলেও পূর্বের সেই ভালোবাসার সূত্র এতটুকুও শিথিল হয় নাই। এসব দেশের সাহিত্য-কলায় যে সব উপমা অলঙ্কার ব্যবহার করা হয় তাহা একেবারে আমাদের সাহিত্যেরই অনুরূপ।

এদের ভাষায় আমাদের সাহিত্য অনূদিত হইলে আর এদের সাহিত্য আমাদের ভাষায় অনূদিত হইলে এদের সংগে আমাদের পূর্ব আত্মীয়তা আরও গভীর হইবে। সাহিত্যের মাধ্যমে আমরা একে অপরকে আরও গভীরভাবে জানিতে পারিব। বহুদিন বিস্মৃত- আত্মীয়জনদের সঙ্গে মিলনের অভিজ্ঞতা আরও হৃদয়গ্রাহী। ২১

তবে লেনিনগ্রাড ও মস্কো ছাড়া বাঙলা ভাষা সম্পর্কে গবেষণা হতে তিনি কোথাও দেখেননি। বিষয়টি লেখকের কৌতূহলী মনকে এর নেপথ্য কারণ জানবার জন্য আগ্রহী করে তোলে। বিষয়টির পেছনে যে সুনির্দিষ্ট কারণ রয়েছে তা উদাহরণের মাধ্যমে পরিস্কার বোঝা যায়।

ভদ্র মহিলা বলিলেন, “আমরা এক এক প্রদেশের এক একটি শাখা এশিয়ার বিভিন্ন ভাষা লইয়া গবেষণা করি। লেনিনগ্রাড আর মসকো শাখায় বাঙলা ভাষার উপর গবেষণা হয়। তাহা হয়ত আপনি দেখিয়া আসিয়াছেন। আমাদের শাখায় আরবী ও পারস্য ভাষা লইয়া গবেষণা হয়। সেই সঙ্গে উর্দু ভাষারও দু-একজন বিশেষজ্ঞ আছেন। আপনি শুনিয়া খুশী হইবেন মহাকবি রবীন্দ্রনাথের সমস্ত গ্রন্থাবলী আমরা তাসখন্দের ভাষায় অনুবাদ করিয়াছি। আর এই অনুবাদ গ্রন্থ আমাদের দেশে লক্ষ লক্ষ সংখ্যা বিক্রি যাচ্ছে। ২২

সোভিয়েত দেশের আর একটি বৈশিষ্ট্য লেখকের চোখে পড়েছিল; রুশরা পুরাতনের সাথে নতুনের সংমিশ্রণ ঘটিয়ে তাদের সৃষ্টিকে সবার কাছে আদৃত ও গ্রহণীয় করে তোলে। স্বদেশে এমনটি তাঁর চোখে পড়েনি কোথাও। এ প্রসঙ্গে তিনি দ্বিধাহীনভাবে বলেছেন-

সেখানেও বহুকাল হইতে বহু শিল্পী তাঁর নাটকের চরিত্রগুলি রূপায়িত করিতে নতুন নতুন অভিনয় কলার প্রকাশ করিয়াছেন, তাহা পরবর্তীকালের অভিনেতারা গ্রহণ করিয়া তাহার সঙ্গে নিজেদের অভিনয় কৌশল যোগ করিয়া শেক্সপিয়ারের নাটকগুলির অভিনয়ে নতুন নতুন মাধুৰ্য আনিয়াছেন। আমাদের দেশের নাট্যসাহিত্য অতি আধুনিক বলিয়া ইহার অভিনয়ে তেমন পূর্বসূরীদের নাট্য প্রতিভাযুক্ত হইবার সুযোগ পায় নাই। ২৩

লেখক গভীর মনোযোগের সাথে লক্ষ্য করেছিলেন; যে কোন ব্যাপারেই কঠোর অনুশীলনের মাধ্যমে বিষয়টিকে যোগ্য করে তোলা রুশদের বৈশিষ্ট্য। স্বদেশের সর্বত্রই অনুশীলনের ব্যাপক অভাবের কথায় তিনি আহতকণ্ঠে বলেছেন

মনে মনে আমাদের দেশে যাহারা নাচে তাহাদের কথা ভাবিতে লাগিলাম। দুইচারিটি পদক্ষেপ শিখিয়াই তাহারা নৃত্যপটিয়সী হয়, আর এদেশে যাহারা মঞ্চে উঠিয়া নাচে কত বৎসর ধরিয়া তাহাদিগকে নাচ শিখিতে হয়। ২৪

চিত্রকলার ক্ষেত্রেও লেখক লক্ষ্য করেন রুশরা রেখাঙ্কনসর্বস্ব অবাস্তব স্বপ্নীল বিষয়কে উপেক্ষা করে বাস্তবতার দিকেই নজর দিয়েছেন বেশী। চিত্রকর্মগুলো দেশীয় বিষয়বস্তুর পটভূমিতে অঙ্কিত বলে তা জনস্বার্থ থেকে বিচ্ছিন্ন নয়। স্বদেশের কথায় তিনি বলেছেন –

আমাদের দেশের চিত্রকলার ন্যায় সেগুলি স্বপ্নালু অবাস্তব হইয়া দেশের জনগণ হইতে দূরে বিরাজ করিতেছে না। ২৫

সোভিয়েতের বিভিন্ন ঐতিহাসিক স্থান ঘুরে যে বৈশিষ্ট্যটি লেখকের চোখে গুরুত্ব পেয়েছিল সেটি সেদেশের মানুষের দৃষ্টান্তমূলক আত্মদান। রুশরা মহান আত্মত্যাগের মাধ্যমে স্বদেশকে মুক্ত করে পৃথিবীর নির্যাতিত নিপীড়িত মানুষের কাছে শান্তির নিদর্শন হিসেবে তাদের দেশকে তুলে ধরেছে। Field of mars নামক স্থানটিতে গিয়ে তিনি দেশপ্রেমীদের আত্মত্যাগের মর্মস্পর্শী কাহিনী শুনে গভীর ব্যাথায় আচ্ছন্ন হয়ে পড়েন এবং সেখানে বসেই শহীদদের উদ্দেশ্যে লেখেন একটি অমর কবিতা ।

রক্ত লেখায় লিখিত হেথায়

জীবনের জয়গান,

চিত্রিত এক অমর কাহিনী

উজ্জ্বল অম্লান।

যাহা আজো শোষিত শাসিত

জালিমের পদতলে,

যারা আজো দহে পর-পীড়নের

নিষ্ঠুর কালানলে

যারা আজো চায় মানুষের মত

বাঁচিতে ধরায় সুখে,

মানুষেরে তার দিতে অধিকার

ক্রুশ কাঠ লয় বুকে,

তাদের মধ্যে তোমরা বন্ধু

চিরকাল বেঁচে রবে,

তোমাদের এই কাহিনী লইয়া

পৃথিবী নতুন হবে।

মৃত্যু পারেনি থামাতে বন্ধু

তোমাদের চলা পথ,

লঙ্ঘিয়া শত সাগর সিন্ধু

বাধা ঘেরা পর্বত;

আপন দেশের সীমারেখা ছাড়ি

চলেছে যাত্রীদল,

দেশে দেশে আনি মানবতা আর

শান্তির শুভজল । ২৬

সোভিয়েত দেশে নারী-পুরুষের অবাধ মেলামেশার ব্যাপারটি অনেক দিক থেকেই লেখকের কাছে ভালো মনে হয়েছে। এতে অপরাধ প্রবণতা অনেক কমে যায়। নানা কাজকর্মের পাশাপাশি প্রিয়জনের সাথে বাধাহীন কিছুটা ব্যক্তিগত সময় মানুষকে অনেকটাই মানবিক করে তোলে। জাতীর জীবনে এ ধরনের মেলামেশার কিছুটা হলেও যে প্রয়োজন আছে সেখানকার বিশেষজ্ঞরা হযত এটা ভেবেই তরুন-তরুনীর মেলামেশার ক্ষেত্রে অনেকটাই স্বাধীনতা দিয়েছেন।

পাকিস্তানে অবাধ মেলামেশায় রাষ্ট্রীয় অনুমোদন নেই। তবে মানুষের মনে যে শাশ্বত ভালোবাসার প্রবণতা রয়েছে তাতো কোন দেশ কাল পাত্র মানে না। কিন্তু সামাজিক বাঁধা থাকায় যে যাকে পছন্দ করছে সহজেই তার কাছে যেয়ে মনের কথাগুলো বলতে পারছে না বলেই মানুষ নিষ্ঠুর হয়ে ওঠে। আপরাধের দিকে ঝুঁকে পড়ে।

পাকিস্তানে অহরহ শোনা যায় পুলিশের হাতে প্রেমিক- প্রেমিকাদের গ্রেফতার হওয়ার কথা। পরস্পরের সম্মতিক্রমে তারা যদি কিছুটা সময় নিজেদের মত করে কাটায় সেখানে ত অপরাধের কিছু নেই। কিন্তু রাষ্ট্রীয় কড়াকড়ির ফলে মানুষের স্বাভাবিক বৃত্তিগুলোর বিকাশে বাঁধা দিয়ে যে মানবতার অপমান করা হয় তাতে মানুষ উচ্ছৃঙ্খল হয়ে পড়ে। নানা অসামাজিক কাজে জড়িয়ে পড়ে এবং রাষ্ট্রেরই অপমান বাড়ায়। এ ব্যাপারে স্বদেশের সরকারের কিছুটা চিন্তাভাবনা করা উচিত বলে তিনি মনে করেন।

সর্বোপরি লেখক লক্ষ্য করেন রুশ সভ্যতা সেদেশবাসীর উপর চাপিয়ে দেয়া হয়নি। প্রগতির যন্ত্রে দীক্ষিত হয়ে তারা প্রত্যেকেই দেশ ও জাতির সামগ্রিক কল্যাণে স্বতঃস্ফুর্ত, সচেতন, সক্রিয় ও আদর্শ মানুষ হয়ে উঠেছে।

 

যে দেশে মানুষ বড় । জসীম উদ্দীন

 

চার

জসীম উদ্‌দীন মূলত কবি। পল্লী কবি হিসেবেই তিনি সর্বাধিক পরিচিত। তবে তাঁর গদ্য রচনায়ও বিশেষ আকর্ষণ রয়েছে। তাঁর সাধু ভাষায় লেখা রচনাশৈলীটি সরল, সরস এবং গভীর আন্তরিকতার স্পর্শে হৃদয়গ্রাহী।

‘যে দেশে মানুষ বড়’ নামক ভ্রমণ কাহিনীতে লেখকের বর্ণনা প্রায়শই কবিত্বময়। রূপমুগ্ধ কবি যেখানেই রূপের সন্ধান পেয়েছেন সেখনেই তিনি কাব্য করার প্রয়াস পেয়েছেন। সৌন্দর্য আহরণে লেখকের কোথাও কোন ক্লান্তি নেই। সোভিয়েতের প্রকৃতি ও নর-নারীর রূপের বর্ণনা তাঁর রচনায় এসেছে বারবার। বিশেষ করে নারীরূপের বর্ণনায় তাঁর অন্তর ছিল সবটুকু সক্রিয়। সোভিয়েতের প্রকৃতি ও নর-নারীর রূপের বর্ণনায় তিনি বলেছেন-

শুনিলাম মস্কো শহরের চারিদিকে ঘন বনানী ভরা আরও গভীর অরণ্যানী। সহরের বৃক্ষশ্রেণীর মাঝে মাঝে কত নাম-না-জানা ফুলের গাছ। সেই সব গাছে রঙ-বেরঙের শত শত ফুল ফুটিয়া হাসিয়া কুটিকুটি হইতেছে। রাস্তার দুইপাশে ফুটপাথে নানা কাজে ব্যাস্ত মানুষগুলি চলিতেছে। তাহাদের মাঝে মাঝে সেই ফুলগুলির সঙ্গেই যেন প্রতিযোগিতা করিয়া রুশদেশের সুন্দরী মেয়েরা একাজে ওকাজে চলিতেছে। ওরা যেন জনতার মধ্যে স্রোতে ভাসা ফুল। ২৭

সোভিয়েত দেশে লেখকের রুশ অনুবাদিকা সাতলানার রূপ তাঁর অন্তরকে স্পর্শ করেছিল। রুশ দেশের বহু নারীর রূপে তিনি মুগ্ধ হয়েছেন। কিন্তু সাতলানার রূপের বর্ণনায় তাঁর হৃদয় কবিতা হয়ে ফুটেছিল।

লেনিনগ্রাড যাইয়াও মাঝে মাঝে তার কথা মনে পড়িয়াছে। অর্কেষ্ট্রার সঙ্গীতের মত প্রথমেই তার সুর আমাদের অন্তরে প্রবেশ করেনা। সঙ্গীতের সুর কানে প্রবেশ করিয়া যখন সমস্ত মনের মাধুরীতে মিশিয়া যায়, তখনই সে গান আমাদের অন্তর স্পর্শ করে। মানুষের রূপও বুঝি তেমনি। সিনেমায় – থিয়েটারে পথে-ঘাটে কত রূপসীকেই ত দেখি। কিন্তু তাহারা ত সেই মনের মাধুরীতে মিশিয়া কবিতা হইয়া ফুটিয়া ওঠেনা।

সেইজন্য বোধ হয় একজন যাহাকে দেখিয়া মুগ্ধ হয় অপরের চোখে সে কিছুই নয়। রূপ হইল কতকটা মনেরই সৃষ্টি। সাতলানার মিষ্টি ব্যবহার আর তার সুন্দর রূপশ্রী এতদিন আমার মনের আক্ট্রোয় প্রবেশ করিয়া কিছুটা কারুকাজ করিতেছিল। তাই আজ তাহাকে দেখিয়া আরও সুন্দর বলিয়া মনে হইল। ২৮

সৌন্দর্য বর্ণনায় লেখকের উপমা, রূপক, অলঙ্কার ব্যবহার মানব মনের সূক্ষ্ম অনুভূতিগুলোর দরজা খুলে দিয়েছে। সাতলানার রূপকে তিনি অর্কেস্ট্রার সঙ্গীতের সাথে তুলনা করে তার রূপঐশ্বর্যকে প্রতিষ্ঠিত করেছেন ধ্রুপদী আসনে। লেখকের নিখুঁত অলঙ্কার ব্যবহারে নারীর রূপ হয়ে উঠেছে গভীরতার ব্যাপ্তিতে বিশাল। মস্কোর এক রেস্টুরেন্টে ইউক্রেনের পাঁচটি মেয়ের সংগে লেখকের পরিচয় হয়েছিল। তিনি তাদের রূপে আকৃষ্ট হয়ে হোটেলে বসেই লেখেন

একটি রূপমুগ্ধ কবিতা ।

পাঁচটি মেয়ে চলেছে ত

পাঁচটি রঙের ফুল,

একটি মেয়ের রূপ দেখে যে

সব হয়ে যায় ভুল।

পাঁচটি মেয়ে কথা কয়না

গান বাজিছে তারে,

একটি মেয়ের কথা যে চাই

শুনতে বারে বারে।

পাঁচটি মেয়ে হাসে যেন

চাঁদে ঝলক পড়ে,

একটি মেয়ের হাসি যে চাই

আঁকতে বুকের ঘরে।

পাঁচটি মেয়ে পাঁচটি যেন

জীবন্ত এক খুশী,

ধন্য হলাম কবি আমি

ছন্দে তাদের তুষি। ২৯

তাঁর বর্ণনা বস্তুনির্ভর হলেও কল্পনার ছড়াছড়ি চোখে পড়ে সর্বত্রই। বাস্তব বর্ণনার পাশাপাশি সুযোগ পেলেই তিনি ছড়িয়ে দিয়েছেন কল্পনার নানা রং। আক্ষেপে-বিক্ষোভে, মুগ্ধতায় আনন্দে যেখানেই তার মন প্রবল হয়ে উঠেছে সেখানেই লেখক রোমান্টিক। যেমন- পায়নিয়ার সেন্টার দেখতে গিয়ে তিনি ছোট্ট ফুটফুটে শিশুদের দেখতে পেয়ে বলেছেন- ‘এ যেন নন্দনের দেব শিশুরা।

মস্কো শহরের সৌন্দর্য বর্ণনায় তাঁর মুগ্ধ হৃদয়ানুভূতির প্রকাশঃ ‘এতো শহর নয় যেন গাছগাছালী ভরা কুঞ্জবন।’ সোভিয়েত নারী-পুরুষের সৌন্দর্য বর্ণনায় তাঁর বিস্ময়ঃ ‘পথে পথে যেন রূপকথার ছেলেমেয়েরা ঘুরিয়া বেড়াইতেছে’।

অপর এক শিশুকেন্দ্রে ছোট্ট ছেলেমেয়েদের সাঁতার কাটতে দেখে তিনি বলেছেনঃ ‘এ যেন সোনালী রঙের হাসগুলি পানিতে সাঁতার কাটিতেছে। তাসখন্দের একটি পাইওনিয়ার কেন্দ্রে গিয়ে তিনি একসংগে অনেক ঘুমন্ত শিশু দেখতে পেয়ে আনন্দে উজ্জ্বল হয়ে ওঠেন এবং এ সম্পর্কিত তাঁর বর্ণনাঃ ‘আকাশের শত শত তারার মত তাহাদের সুন্দর মুখগুলি’।

নুরেন দাম দেখে ফিরবার পথে পাহাড়ী সৌন্দর্য দেখে মুগ্ধ লেখক বলেছিলেনঃ ‘কোন স্বপ্ন রাজ্য দিয়া যেন ভাসিয়া চলিয়াছি’। আলোচিত দৃষ্টান্তগুলোতে লেখকের কল্পনা প্রবণ হৃদয়ের সংগে তাঁর নান্দনিক সৌন্দর্য বোধের অনিন্দ্য যোগ ঘটেছে।

তাঁর রচনাশৈলীতে সংবেদনশীলতার প্রভাব খুব বেশী। সুখে-দুঃখে বড় বেশী বিচলিত রোমান্টিক কবিপ্রাণ লেখকের রচনায় আবেগের ছড়াছড়ি। সোভিয়েত ইউনিয়নে এক বিয়ের অনষ্ঠানে গিয়ে তিনি বর বউকে দেখে আবেগ উচ্ছ্বসিত ভালোলাগায় উৎফুল্ল হয়ে উঠেন এবং তাদেরকে আশীর্বাদ করেন।

তুমি এতদিন বরষার বারিধারা ছিলে, আজ দুইকুলের বাঁধন পরিয়া নদী হইয়া জীবন পথে ছুটিবে। এতদিন তুমি ছিলে শুধু মেঘ, আজ রংধনু হইয়া তোমার মেঘে রঙের রেখা পরাইবে। প্রেমাদের ঘর যেন সুন্দর হয়, তোমাদের মন যেন সুন্দর হয়। তোমাদের মাটির কলস যেন শীতল পানিতে ভরা থাকে পিপাসিত পথিকের জন্য। তোমাদের নবীন দাম্পত্য জীবনের সর্বপ্রকার শুভ কামনা করিয়া আমরা বিদায় লইতেছি । ৩০

সোভিয়েত দেশ থেকে বিদায় নেবার সময় তাঁর অনুবাদক মিঃ সিডারফকে ছেড়ে আসতে লেখকের দরদী মন ব্যাথায় কুঁকড়ে উঠেছিল। তিনি তাকে বুকে জড়িয়ে ধরে প্রকাশ করেন তাঁর ব্যাথাতুর হৃদয়ের আর্তি।

সিডারফ। আমার অনেকগুলি সন্তান-সন্ততি আছে। কিন্তু তোমার মত একটি ছেলের জন্য চিরদিন আমার মন হাহাকার করিবে । ৩১

 

যে দেশে মানুষ বড় । জসীম উদ্দীন

 

জসীম উদ্দীনের রচনাশৈলী একঘেয়ে নয়। কোথাও কোথাও হাস্যরসের রসিকতায় সরস এবং বৈচিত্র্যময়। লেনিনগ্রাড শাখার এশীয় সংস্কৃতি ভবনে ‘মিস উনা স্কেটোভিডোভার’ নামে এক লেখিকার সংগে লেখকের পরিচয় হয়। চন্ডীদাসের ‘শ্রীকৃষ্ণকীর্তন’ অনুবাদের কাজ করছিলেন তিনি। অনুবাদের কাজে লেখিকা তাঁর সাহায্য চাইলে লেখক রসিকতা মিশ্রিত জবাবে বলেন ঃ

“এককালে আমি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে বৈষ্ণব সাহিত্য পড়াইতাম। সব কি মনে আছে ? তবে সাধ্যানুসারে আমি আপনাকে সাহায্য করিব। কিন্তু আপনার মত সুন্দরী মেয়েটিকে সাহায্য করিতে গিয়া সেই সংগে যদি প্রেমপত্রও লিখিয়া পাঠাই, তাতে আপনার অনুমতি আছে তো”? আমার কথা শুনিয়া উপস্থিত সকলেই হো হো করিয়া হাসিয়া উঠিলেন। ইত্যকার উপহাস ওদেশে সুন্দরী মেয়েদের লইয়া অচল নয়। মেয়েটি মাথা নাড়িয়া বলিলেন, “তাতেও আমার অনুমতি আছে” আবার সকলে হাসিয়া উঠিলেন ৩২

তাঁর রচনাশৈলীতে কবিমনের নিষ্পাপ ভালোবাসার পরশ প্রচ্ছন্ন হয়েছে। মস্কোতে প্রিয় অনুবাদিকা সাতলানাকে ঘিরে তাঁর ভালোলাগা, ভালোবাসার কথাগুলো তিনি অকপটে লিখেছেন।

সারাদিন প্লেনে ভ্রমণ করিয়াছি। রাতে ঘুমাইয়া পড়িলাম। ঘুমাইয়া ঘুমাইয়া যদি সাতলানাকে স্বপ্ন দেখিয়া থাকি পাঠক আমাকে ক্ষমা করিবেন। ৩৩

সাতলানা নামে তন্বী মেয়ের দেহখানি মোহময় আর কিছু নয় আর কিছু নয়, করিও তা প্রত্যয়। মুখখানি তার আপেলের রঙ, ঠোঁট রাঙ্গা টুকটুক। তরমুজ ফালি হইতে যেনবা হরিয়াছে কিছুটুক। দেহখানি তার, ধবল তুষারে ঊষসীর কিছু হাসি, আঁখি সরসীর আরসীতে যেন তারারা নাচিছে আসি। সাতলানা নামে তন্বী সুঠাম দেখেছিনু মেয়েটায় আর কিছু নয়, আর কিছু নয়, আন ভাবিও না তায় । ৩৪

কল্পনা, আবেগ, হাস্যরস, মুগ্ধতা এসবের পাশাপাশি বাস্তব অভিজ্ঞতার বর্ণনায় তাঁর রচনাশৈলী অকপট ও সাবলীল। যেখানে যেটুকু দেখেছেন তার বিস্তারিত বর্ণনা দেবার প্রয়াস গ্রন্থের মূল্যবান বৈশিষ্ট্য। তুলনামূলক আলোচনায় সাদৃশ্যে, বৈসাদৃশ্যে তিনি সোভিয়েত দেশের সামগ্রিক প্রেক্ষাপটকে পাঠকের চোখের সামনে তুলে ধরেছেন। সত্যকে তিনি কখনও অস্বীকার করেননি। সোভিয়েত দেশের সৌন্দর্যে মুগ্ধ কবি যখনই তাঁর প্রিয় অনুবাদিকা সাতলানার প্রশ্নের মুখোমুখি হয়েছেন তখনও তিনি সত্য গোপন করেনি।

সাতলানা জিজ্ঞাসা করিল, “আচ্ছা বলেন তো আপনার পূর্ব বাঙলা কেমন দেশ” ?

আমি বলিলাম, “পৃথিবীতে কত দেশই ত দেখিলাম, তোমাদের দেশও দেখিলাম। ভারি সুন্দর কিন্তু আমার পূর্ববাঙলাকে আমার আরও ভাল লাগে। “৩৫

এই সরল স্বীকারোক্তির পাশাপাশি তিনি পূর্ববাঙলার জাতীয় জীবনের অসঙ্গতিগুলোও তুলে ধরেছেন তাঁর রচনায়, সর্বোপরি তিনি সত্য কথাটি বলেছেন নিতান্ত সহজ করেই। এছাড়াও তাঁর রচনারীতির মধ্যে এমন একটি গভীর আন্তরিকতার ছোঁয়া আছে যা হৃদয়কে স্পর্শ করে। এ সংক্রান্ত বহু উদাহরণের মধ্যে একটি

শুধু অতিথিপরায়ণতায় নয়, আদর আপ্যায়নে নয়, আপনাদের লোক গীতিকায়, আপনাদের সাহিত্যে, আপনাদের চলনে বলনে আমরা যেন এক প্রাণ, এক আত্মা, এককালে ধর্মের বন্ধনে আমাদের মধ্যে আত্মীয়তা গড়িয়া উঠিয়াছিল, আজ যদিও ধর্মের বন্ধন শিথিল কিন্তু প্রাণের সংগে যেখানে প্রাণ মিলিয়াছিল সেই ভালবাসার বন্ধন টুটিবে কি প্রকারে ৩৬

শেষ কথায় বলতে হয় যে দেশে মানুষ বড়’ ভ্রমণ কাহিনীতে জসীম উদ্দীনের রচনাশৈলী কল্পনা, কবিত্ব, আবেগময়তা ও বাস্তবতার পাশাপাশি সহজ, সরল, অকপট এবং সরস। ভ্রমণ কাহিনীর প্রতিটি বিষয় শীলিত, মার্জিত, শিক্ষিত এবং সাহিত্য পদবাচ্য হয়ে উঠেছে।

Leave a Comment