Site icon Literature Gurukul [ সাহিত্য গুরুকুল ] GOLN

বাংলাদেশের উপন্যাসে মুক্তিযুদ্ধের রূপায়ণের সূচীপত্র

বাংলাদেশের উপন্যাসে মুক্তিযুদ্ধের রূপায়ণের সূচীপত্র

আজকে আমাদের আলোচনার বিষয়ঃ বাংলাদেশের উপন্যাসে মুক্তিযুদ্ধের রূপায়ণের সূচীপত্র

 

 

বাংলাদেশের উপন্যাসে মুক্তিযুদ্ধের রূপায়ণের সূচীপত্র

উপন্যাস হচ্ছে আধুনিকতম এবং সমগ্রতাস্পর্শী সেই শিল্প প্রতিমা যেখানে ধ্বনিত প্রতিধ্বনিত হয় জীবনের আদি, অন্ত্য, লেখকের জীবনার্থ এবং তাঁর স্বদেশ ও সমকাল। উপন্যাস উদ্ভবের কারণ নিহিত রয়েছে আধুনিক যন্ত্র সভ্যতার বৃহদায়তন, জটিল ও সঘর্ষতাড়িত জীবনাবর্তের শিল্পরূপ সন্ধানের মধ্যেই।

অবক্ষয়িত সামন্ত সমাজকে কেটে দিয়ে ষোল-সতের শতকে ইউরূপে নতুন অর্থনৈতিক ও সামাজিক শক্তির উদ্ভবের সাথে সাথে আবির্ভাব ঘটলো উপন্যাসের। উনিশ শতকের প্রারম্ভেই কোলকাতা কেন্দ্রিক হিন্দু মধ্যবিত্ত শ্রেণীর বিকাশ ঘটে। শতাব্দীর দ্বিতীয়ার্ধে এ নবজাগ্রত মধ্যবিত্ত শ্রেণীর হাতে রচিত হয় বাংলা উপন্যাস শিল্প। আর্থ-সামাজিক রাজনৈতিক কারণে পূর্ববঙ্গের মুসলিম মধ্যবিত্ত শ্রেণীর বিকাশ হয়েছে শতবর্ষ বিলম্বিত।

ব্রিটিশ শাসিত বাংলায় উনিশ শতকের নবজাগ্রত হিন্দু মধ্যবিত্ত শ্রেণী যেরূপ সহজভাবে পাশ্চাত্য সাহিত্য ও সংস্কৃতিকে গ্রহণ করতে সক্ষম হয়েছিল, বাঙ্গালী মুসলমানদের ক্ষেত্রে তা সম্ভব হয়নি। বাঙ্গালী মুসলমান সমাজ ১৭৫৭ খ্রীষ্টাব্দে পলাশীর বিপর্যয়কে নিজেদের বিপর্যয় বলে মনে করেছিল।

ফলে, কিছুটা অভিমান ও অসহযোগ তাদেরকে নিক্ষেপ করলো অতীতচারিতায়। এ অবস্থা অতিক্রম করতে বাঙ্গালী মুসলমানকে অপেক্ষা করতে হলো বিশ শতকের সূচনাকাল পর্যন্ত। ১৯২১ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা, ১৯২৬ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রিক ‘মুসলিম সাহিত্য সমাজ’ এর উদ্ভব দ্বিধান্বিত বাঙ্গালী মুসলমানকে আধুনিক জীবন চেতনার প্রতি আকৃষ্ট করতে অনেকাংশে সক্ষম হয়েছিল। এই পরিবর্তিত সময় ও সমাজের প্রেক্ষাপটে রচিত হয়েছিল বাংলাদেশের বাংলা উপন্যাসের ভিত্তিমূল।

 

 

ঐতিহাসিক নিয়তিই অথবা ঔপনিবেশিক শাসনের নতুন রূপের জন্যেই হোক, ১৯৪৭ সালের ভারত বিভক্তি বাঙ্গালীর শিল্প চর্চাকে সীমিত সময়ের জন্য হলেও দ্বিধান্বিত করেছিল। পূর্ব বাংলা একটা স্বাধীন ও স্বায়ত্ব শাসিত ভূখন্ড হিসাবে গড়ে উঠার পরিবর্তে রূপান্তরিত হলো আধা উপনিবেশিক ও আধা-সামন্তবাদী অঞ্চল হিসেবে।

ব্রিটিশ শাসিত পূর্ববাংলা প্রাকান্তরে পরিণত হলো পাকিস্তান শাসিত পূর্ববঙ্গে। এর ফলে বুর্জোয়া মানবতাবাদে আস্থাশীল শিল্পচৈতন্যে দেখা দিল সংকট। প্রাক-সাতচল্লিশ পর্বে গ্রামীন সংগ্রামশীল মানুষ এবং নবজাগ্রত মুসলিম মধ্যবিত্তের অতীত বর্তমান ভবিষ্যৎকে ধারণ করেই পূর্ব-বাংলার উপন্যাসের অভিযাত্রা।

এ পর্বের উপন্যাস-সাহিত্যে প্রাধান্য পেয়েছে সামন্ত-মূল্যবোধসমূহ, তবু মানবতাবাদী চেতনার শিল্পরূপ অংকনের প্রয়াস এ পর্বে, সীমিত হলেও, একেবারে উপেক্ষিত নয়। বিভাগ-পূর্ব কালের উপন্যাস প্রধানত গ্রাম্য জীৱন কেন্দ্রিক; তবে কখনো সেখানে এসেছে বিকাশমান নগর জীবনের খন্ডিত ছবি। প্রাক- সাতচল্লিশ পর্বের এই উত্তরাধিকারের ওপরেই নির্মিত হয়েছে বিভাগোত্তর কালের উপন্যাস সাহিত্য।

বায়ান্নর রক্তাক্ত উজ্জীবন ঔপন্যাসিকের মধ্যে যে স্বপ্ন এবং সম্ভাবনার দিগন্ত উন্মোচন করলো, চেতনার সেই গতি ব্যাহত হলো ১৯৫৮ সালে। আইয়ূব খানের সামরিক শাসনের আগ্রাসন শিল্পী চৈতন্যে সঞ্চার হলো প্রতিবাদী মনোভঙ্গি। অবশ্য ব্যতিক্রম যে একবারেই ছিল না তা নয়। কিন্তু শিল্পের উত্তরণ তো কেবল বিষয় কেন্দ্রিক নয়, প্রকরণ নির্ভর ও ।

প্রথম পর্বের ঔপন্যাসিকরা যেখানে সত্য অন্বেষায় জীবনকেন্দ্রিক, দ্বিতীয় পর্বের ঔপন্যাসিকেরা সেখানে আত্ম-পরায়ণ ও বিবরণ সন্ধানী। এর ফन প্রথম পর্বে ঔপন্যাসিকদের মধ্যেও সংগঠিত হলো অভাবিত বিবর্তন ১৯৫৮ সাল থেকে বাংলাদেশের স্বাধীনতার পূর্ববর্তীকাল পর্যন্ত বাংলাদেশের উপন্যাসের গতি যেমন বিচিত্রমুখী, তেমনি সংখ্যার দিক থেকেও আশাব্যঞ্জক এ পর্যায়ের ঔপন্যাসিকেরা শুধু বিষয় নয়, জীবনদৃষ্টির ক্ষেত্রে এবং ভাষা ও গঠনরীতির পরীক্ষা নিরীক্ষায় ও অবতীর্ণ হলেন।

ষাটের দশক থেকে আমাদের উপন্যাস গভীরতা পেতে থাকে নানান দিক থেকে। বাংলা উপন্যাসের এই মুক্তির কতোগুলি প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ কারণ ছিলো। প্রথমতঃ বাহান্নর আন্দোলনের পর বেশ কিছু তরুন উপন্যাসিকের আবির্ভব ঘটে, তাঁরা জীবন ও আধুনিক চেতনার নানা বিকাশকে করায়ত্ত করার চেষ্টা করেন। ভাষা আন্দোলনের সময়ে যারা তরুণ ছিলেন, ষাটের দশকে তারা সবদিক থেকেই পরিণত হচ্ছিলেন।

পাকিস্তানের মোহ তাঁদের অবশিষ্ট ছিলো বলে মনে হয় না, বরং পাকিস্তানে যে মধ্যযুগীয় চেতনাক্রমেই শক্তিশালী হয়ে উঠছিলো, তাঁদের বিদ্রোহ ছিলো তার বিরুদ্ধেই। ফলে তাঁদের উপন্যাসের বিষয় এবং শিল্পরীতিতে একটা নতুনত্ব পাওয়া গেলো, আধুনিকতা অসাম্প্রদায়িক ও গণতান্ত্রিক চেতনা যার উৎস।

দ্বিতীয়ত, উপন্যাসের এতোকাল পর্যন্ত ব্যবহৃত গ্রামীণ জীবনের বদলে নগর জীবন ও নাগরিক সমাজের পটভূমি স্থান পেতে থাকলো। সেই সঙ্গে লক্ষ্য করা গেলো উপন্যাসের কেন্দ্র বিন্দুতে আসছে ব্যক্তি।

ষাটের দশকে নতুন জীবন, চেতনা এবং প্রকাশ রীতি নিয়ে যারা উপন্যাস লিখলেন তাঁদের উপন্যাসে এই নতুন মধ্যবিত্ত শ্রেণীর চেতনা, আশা, কল্পনা, ব্যর্থতা এবং সংকট রূপায়িত হলো। এতোকাল দীর্ঘ গ্রাম পরিক্রমনে যে উপন্যাস ক্লান্ত, বিবর্ন এবং নিঃস্বাদ হয়ে উঠছিলো ষাটের দশকে নতুন ঔপন্যাসিক গোষ্ঠীর হাতে নানা অর্থে তার পুর্নজন্ম হলো।

একাত্তরের স্বাধীনতা সংগ্রাম বাঙ্গালীর জাতীয় জীবনে চৈতন্যের ক্ষেত্রে যে অভিঘাতের সূচনা করলো স্বাধীনতা-উত্তর বাংলাদেশের উপন্যাসে তার প্রতিফলন স্বভাবিকভাবেই প্রত্যাশা ছিলো। জীবন বিন্যাসের সামগ্রিক পরিবর্তনের সঙ্গে শিল্পীর একাত্মতার প্রশ্নটি এ প্রসঙ্গে তাৎপর্যপূর্ণ।

যে ব্যাপক আত্মত্যাগ রক্তক্ষয় এবং সংগ্রামের মধ্যদিয়ে বাঙ্গালী স্বাধীনতার সূর্য সম্ভাবনাকে আহরণ করলো, স্বাধীনতা-উত্তর এক দশকের উপন্যাসে তার প্রতিফলন হতাশাব্যঞ্জক।

মুক্তিযুদ্ধ বাংলাদেশের ঔপন্যাসিকদের আলোড়িত করেছে সত্য, তাদের বিষয় নির্বাচনেও সঞ্চার করেছে নতুনত্ব। কিন্তু জীবনের যে পরিবর্তন পরস্পরা ও সমগ্রতার অঙ্গীকারে বিষয় ও প্রকরণে উত্তরণ ঘটলো সম্ভব অধিকাংশ লেখকের মধ্যেই তা অনুপস্থিত। তবু জীবনের এই জাগরণ যে শিল্পীর অঙ্গীকারবোধ ও জীবনচেতনার ক্ষেত্রে আগ্রহের সঞ্চার করেছে তার গুরুত্ব কম নয়।

 

 

একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধের পর বাংলাদেশের আর্থ-সামাজিক রাজনৈতিক সংগঠনে পরিমানগত পরিবর্তনের সাথে চেতনার ক্ষেত্রেও ঘটেছে গুনগত বিকাশ। স্বাধীনতার সোনালী প্রভায় আমাদের মন আর মননে যে নতুন চেতনা জাগ্রত হয়েছে, উপন্যাসে তার প্রতিফলন ছিল একান্তই প্রত্যাশিত।

এ পর্বের উপন্যাসে আবেগ-উচ্ছ্বাস নিয়ে জড়িয়ে আছে সংগ্রাম ও বিজয়ের অবিমিশ্র অভিব্যক্তি, যা একান্তই আমাদের মুক্তিযুদ্ধের উত্তরাধিকার। যুদ্ধোত্তর সময়ে মূল্যবোধের অবক্ষয়, সর্বব্যাপী হতাশা, নৈরাজ্য এবং অর্থনৈতিক বিপর্যয় কাটিয়ে মহৎ শিল্পীমানস অনুসন্ধান করে জীবন ও শিল্পের জন্য সদর্থক এবং আলোকোজ্জ্বল এক মানস ভূমি, কোন কোন ঔপন্যাসিকের রচনায় এ জাতীয় অভিজ্ঞ মুক্তিযুদ্ধোত্তর উপন্যাস-সাহিত্যের আশাব্যঞ্জক দিক।

সমসাময়িক সমাজ জীবনের সঙ্গে উপন্যাসের সম্পর্ক যত নিবিড় অন্য কোনও শিল্প আঙ্গিকের সম্পর্ক ততটা নয়। বিভাগপূর্ব এবং বিভাগোত্তর কালের কয়েক দশকের মধ্যে এবং স্বাধীনতার পরিপ্রেক্ষিতে বাংলাদেশের সমাজ জীবনে যে সব পরিবর্তন ঘটেছে, বাংলাদেশের উপন্যাসে স্বাভাবিক ভাবে তার ছাপ পড়েছে।

একদিকে কৃষিভিত্তিক পল্লী জীবন অপরদিকে আধুনিক দ্বন্ধে পরিপূর্ণ নাগরিক জীবন; একদিকে বাংলাদেশের ঐশ্বর্যময় বহিঃ প্রকৃতির বর্ণনা, অপরদিকে আধুনিক মানুষের জটিল অন্তর প্রকৃতির মনস্তাত্ত্বিক বিশ্লেষণ; একদিকে প্রাচীন ঐতিহ্যের প্রতি আকর্ষন, অপরদিকে রোমান্টিক কল্পনার বিলাস, একদিকে স্বাধীনতা সংগ্রামের বিক্ষুব্ধ পটভূমিকায় মানুষের অস্থিরতা, অপরদিকে হৃদয়াবেগের চিরন্তন পটে প্রতিষ্ঠিত প্রেমিক মানুষ সবই আমাদের বাংলা উপন্যাসে প্রতিফলিত হয়েছে।

সৃষ্টিধর্মী লেখকরা তাঁদের রাজনৈতিক উপলব্দির রূপায়ণ রাজনৈতিক আন্দোলন ও সংস্কৃতি বিষয়ক বিক্ষোপে অস্তিত্বশীল করার প্রয়াসী। আর মুক্তিযুদ্ধের পটভূমিতে এই প্রয়াস স্বাধীনতা উত্তর বাংলাদেশের কথা সাহিত্যে শিল্প সফল বলা চলে। কেননা বাঙ্গালী জাতির ভাষা আন্দোলনের মধ্যদিয়ে একাত্তরের যে স্বাধীনতা অর্জন তা কথাসাহিত্যে নিয়ে আসে বিষয় বৈচিত্র্য যে বিষয় বৈচিত্র্যের মাঝে সমকালীন শিল্পী সাহিত্যিকরা তাদের শিল্পের মাধ্যমে স্বরুপ অন্বেষণ এবং সামাজিক ও নৈতিক দায়িত্ব পালনে হচ্ছেন প্রেরণা তাড়িত ।

মুক্তিযুদ্ধের উপন্যাস আমাদের বাংলাদেশের সাহিত্যে এক নতুন রূপে উদ্ভাসিত । বাঙালির জীবন সংগ্রাম, মুক্তির সংগ্রামে পরিণতি পেয়েছে মূলত মুক্তিযুদ্ধের ফলেই । বাঙালি ঔপনিবেশিকতার সাংস্কৃতিক, রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক শোষন ও নির্যাতনকে প্রতিহত করেছে এই যুদ্ধেই।

মুক্তিযুদ্ধ বাঙ্গালিকে স্বদেশ প্রেমে জাগ্রত করেছে, জাগিয়েছে দেশের প্রতি মমত্ববোধ, এনেছে বাঙালির মনোজগতে এক বিরাট পরিবর্তন। বাংলাদেশের লেখকবৃন্দও এ সকল দায়কে ধারণ করেছেন। স্বদেশের মমত্ববোধের প্রতি করেছেন একাত্মতা ঘোষণা।

বাঙালি সত্তা, জাতীয় জীবন চেতনার, ঐতিহ্যের ইতিহাসের ক্ষয় ১৯৪৭ – এর পর থেকেই শুরু হয়েছিল। চূড়ান্ত পরিণতি আসে একাত্তরের ২৫ মার্চের কালো রাতের মধ্য দিয়ে। যদিও তৎকালীন পাকিস্তান সরকার প্রত্যাশা করেছিল বাঙালির বিপর্যয়ের ক্ষয়প্রাপ্তির কিন্তু বাঙালি তার সমস্ত শক্তি দিয়ে তা প্রতিহত করে প্রেিরাধ করে। তাই পরিণতি আসে বাঙালি সত্তার বিকাশ সাধনে, স্বাধীনতা প্রাপ্তির প্রার্থিত নিরাপদ আশ্রয়ে।

সাহিত্যের সবচেয়ে জনপ্রিয় আঙ্গিক হচ্ছে উপন্যাস। আর বাংলাদেশের ইতিহাসের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধ। আমাদের উপন্যাসে মুক্তিযুদ্ধ এসেছে। কিন্তু মুক্তিযুদ্ধের উপন্যাসের সংখ্যা স্বল্পতা এবং শিল্পমান আশানুরূপ নয়। ফরাসী ও রুশদের গর্ব তাদের বিপ্লব আর আমাদের গর্ব হচ্ছে অমর একুশে ও একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধ।

বিশ্ব বিখ্যাত রুশ উপন্যাসিক লিউ তলস্তয়ের ‘ওয়ার এ্যান্ড পিস’ এবং ইলিয়ট এরন বুর্গের ‘ফল অব প্যারী’ হচ্ছে যুদ্ধ ভিত্তিক উপন্যাস। দুটি উপন্যাসই মহৎ এবং কালজয়ী সৃষ্টি । প্রথম এবং দ্বিতীয় দুটো বিশ্বযুদ্ধকে নিয়েও বিশ্ব সাহিত্যের অসংখ্য গল্প উপন্যাস লেখা হয়েছে।

 

 

মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে এদেশে লেখালেখি কম হয়নি। কিন্তু উপন্যাসে প্রকৃত মুক্তিযুদ্ধ প্রতিফলিত হয়েছে না লেখকদের কাল্পনিক মুক্তিযুদ্ধ রূপায়িত হয়েছে সেটাই প্রশ্ন। মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে আমাদের সাহিত্যে যে সব উপন্যাস লেখা হয়েছে তার মধ্যে উল্লেখযোগ্য হচ্ছে –

 

 

সূচীপত্র

প্রথম অধ্যায়

দ্বিতীয় অধ্যায়

তৃতীয় অধ্যায়

চতুর্থ অধ্যায়

উপসংহার

মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে লেখা উপন্যাসগুলিতে আমাদের ঔপন্যাসিকদের একটি প্রবণতা লক্ষ্য করা গেছে। যারা মধ্যবিত্ত শ্রেণীর তাদেরকেই উপন্যাসের কেন্দ্রবিন্দুতে এনেছেন, যারা সংকটের সময়ে নিজেদেরকে গুটিয়ে নিতে তৎপর। একথা সত্য বটে মধ্যবিত্তের একটি অংশ এমনিভাবে সংকট থেকে পালিয়ে যেতে চেয়েছিলো, কিন্তু যুদ্ধের সময়ে দেশের সমগ্র মানুষ, যাদের মধ্যে মধ্যবিত্ত শ্রেণীর অনেক মানুষও ছিলো, নিজেদেরকে গুটিয়ে নেয়নি, উদ্দীপিত হয়ে উঠেছিলো এটাও সত্য এবং প্রকৃত সত্য।

 

 

শহীদ আনোয়ার পাশার ‘রাইফেল রোটি আওরাত’ উপন্যাসের অধ্যাপক সুদ্দীপ্ত শাহিন চোখের সামনে নারকীয় হত্যায়ক্ত ঘটতে দেখেন। তিনি জানেন এবং চান আক্রমণকারীদের পরাভব। কিন্তু বন্ধু, সহকর্মী এবং নিরীহ মানুষের অগনিত মৃতদেহ দেখে তিনি শারীরিক এবং মানসিকভাবে সংকুচিত হয়ে পড়েন। স্ত্রী এবং সন্তানদের নিয়ে ছুটে বেড়ান নিশ্চিত আশ্রয়ের জনে। শহরের একটি অচেনা বাড়িতে আশ্রয় নিয়ে জানতে পারেন মুক্তির দূতেরা সংগঠিত হচ্ছে, একজন সাধারণ মহিলার আশ্রয়ে। তিনি আশান্বিত হয়ে ওঠেন, কিন্তু এর বেশী কোনো কিছু তাঁর করার থাকে না ।

অনুরূপ জনৈক অধ্যাপকের সাক্ষাৎ মেলে ১৯৭২ সালে রচিত শওকত আলীর ‘যাত্র উপন্যাসে। অধ্যাপক রায়হান ছিলেন এককালে প্রগতিশীল রাজনীতির সক্রিয় সদস্য। কিন্তু মুক্তিযুদ্ধ চলার সময়ে নেতৃত্ব দেবার সুযোগ এলেও তিনি মুক্তিযুদ্ধে যেতে পারেন না। স্ত্রী সন্তানদের নিয়ে নিরাপত্তা আর পুরানো স্বাচ্ছন্দ্য খুঁজে ফেরেন।

মধ্যবিত্তের এই মানুষরূপ আরো স্পষ্ট দেখতে পাই রশীদ হায়দারের ‘খাচায়’ উপন্যাসে অধ্যাপক তাহের সাহেবসহ আরো কয়েকজন মানুষ একটি ত্রিতল ফ্ল্যাটে শ্বাস রুদ্ধকর পরিবেশে সর্বক্ষণ মুক্তির প্রত্যাশা করেন। ভারতীয় বিমান বাহিনীর বিমানকে মনে হয় মুক্তির দূত, ইন্দিরা গান্ধীর বেতার ভাষনে তারা তাদের স্বাধীনতার আশ্বাস খোঁজেন। তারা সবাই মুক্তি চায়, কিন্তু মুক্তিযুদ্ধ থেকে তাদের অবস্থান অনেক দূরে। কখনো তাস খেলে, চা-কফি পান করে, ঘন ঘন রেডিও শুনে, ভয়-ভীতিতে মৃত প্রায় মানুষ কজন মুক্তির দিনগুনে।

মাহমুদুল হকের ‘জীবন আমার বোন’ উপন্যাসে মধ্যবিত্ত যুবকেরা চায়ের দোকানে আড্ডা দিয়ে রাজনৈতিক সংকটের স্বরূপ এবং ভাবী পরিণতি নিয়ে তর্ক করে। সবাই নিশ্চিন্তভাবে উপলদ্ধি করে সাংঘাতিক একটা কিছু ঘটবে বাংলাদেশ স্বাধীন হয়ে যাওয়াটাও বিচিত্র নয়। তবে – সকলেই সংকট থেকে দূরে, নিশ্চিত আশ্রয়ে চলে যাবার জন্যে ব্যস্ত হয়ে ওঠে। তাদের কেউ আবার রাজনৈতিক গোলযোগের ডামাডোলকে গালাগাল করে।

হাসনাত আব্দুল হাইয়ের ‘তিমি’ উপন্যাসের রেবেকা যুদ্ধের বর্ণনা করে সে শিহরিত হয়, সেখানকার ‘টয়লেটের দুর্দশার কথা ভেবে তার মনে হয় এর চেয়ে হানাদারদের কাছে রেপড হওয়াও বৈধ হয় কম বিভীষিকাময় ছিলো।

আবার সেলিনা হোসেনের ‘হাঙর নদী গ্রেনেড’ উপন্যাসের সলীম শহুরে মধ্যবিত্ত অথবা মধ্যবিত্ত নয় বলেই স্ত্রী, শিশুপুত্র, বৃদ্ধা মাকে পেছনে ফেলে সহজেই যুদ্ধে চলে যায়।

মধ্যবিত্ত মানুষও স্বশ্রেণীর সমাজভূমি থেকে নিজের শেকড় ছিঁড়ে গেলে কি অভাবিত মাত্রায় বেড়ে উঠতে পারে, মধ্যবিত্তের মানসসীমা অতিক্রম করে অসামান্য সম্ভাবনায় দীপ্তিমান হতে পারে, তার দৃষ্ঠান্ত মেলে সৈয়দ শামসুল হকের ‘নিষিদ্ধ লোবান’ এবং ‘নীল দংশন’ উপন্যাস দুটিতে।

পাকিস্তানী সৈনিকেরা বাঙালীদের মৃত্যুদেহ দাফন না করার ঘোষণা দিয়ে অজস্র মৃতদেহ শেয়াল কুকুরের জন্যে ফেলে রাখে, পশু আর বাঙালী জাতিকে এক প্রতিপন্ন করার উদ্দেশ্যে। কেননা পশুদের দাফন হয় না। বিলকিস এই অপমানের প্রতিবাদ জানায় অসম্ভব এবং অভাবনীয় এক প্রক্রিয়ায়, প্রতিশোধ নেয় আরো অসম্ভব পদ্ধতিতে’ ‘মশালের মতো প্রজ্জ্বলিত সমস্ত শরীর দিয়ে।

তেমনি একজন সাধারণ নজরুল ইসলাম পাকিস্তানী বাহিনীর হাতে ধরা পড়ে স্ত্রী সন্তানের কাছে ফিরে যাবার জন্য ব্যাকুল ও শংকিত হয়ে পড়লেও সে মিথ্যে কবি কাজী নজরুল সেজে মুক্তি পেতে চায়না। শেষে অবিরত অমানসিক পীড়নে সে বিদ্রোহ করে নিজের অজান্তেই বৈসরকারী অফিসের এক কেরানী নারুল ইসলাম বিদ্রোহী কবি কাজী নজরুল ইসলাম হয়ে যায়।

কঠোর কন্টে বলে ‘হ্যা আমি কবিতা লিখতে চাই’ তবে তোমাদের জন্যে নয়। সমালোচক আৰু হেনা মোস্তফা কামাল যথার্থই লক্ষ্য করেছেন বিলকিস ও নজরুল ইসলাম ‘যতটা অতিমাত্রিক হয়ে উঠে ব্যক্তি হিসেবে ততোটা স্বশ্রেণীর সম্প্রসারণ হিসেবে নয়।’

 

 

উল্লেখিত উপন্যাস সমূহে ছড়িয়ে আছে আমাদের মুক্তিযুদ্ধের নানা অনুষঙ্গ, তবে এর কোনটিই মুক্তিযুদ্ধের সময় সম্মিলিত বাঙালির চৈতন্যের জাগরনকে যথাযথ ভাবে অঙ্গীভূত করতে পারেনি। এর কারণ বহুবিধ প্রথমত, মুক্তিযুদ্ধ প্রসঙ্গে আমাদের ঔপন্যাসিকদের ধারণা। তাই মুক্তিযুদ্ধের অনুষঙ্গে তাদের উপন্যাস সমূহেও নেই প্রত্যক্ষ উত্তাপের স্পর্শ।

অধিকাংশ উপন্যাসই স্মৃতিচারণমূলক, কল্পনানির্ভর কিংবা আবেগ – উচ্ছ্বাসের মনোময় কথকতা। দ্বিতীয়ত, মুক্তিযুদ্ধোত্তর জাতীয় হতাশা আর বিপর্যয় থেকে উজ্জ্বল উত্তরণের দিকে পথ নির্দেশ নয় বরং সর্বব্যাপী হতাশা আর নিখিল নাস্তি’র গর্ভে বিলীন হতে চাইলেন আমাদের ঔপন্যাসিকরা এবং এভাবেই মুক্তিযুদ্ধের অনিঃশেষ অবিনাশী চেতনা খণ্ডিত ও বিপথগামী হলো।

তৃতীয়ত, আমাদের মুক্তিযুদ্ধের স্বল্প স্থায়িত্ব এটিকে যথার্থ জনযুদ্ধে পরিণত হতে দেয়নি, ফলে মুক্তিযুদ্ধের চেতনাও হয়নি সর্বব্যাপ্ত এবং এরই শিকার, অধিকাংশ বাঙালির মতো, বাংলাদেশের ঔপন্যাসিকরাও। এ কারণেই একটি স্বাধীন জাতির সুদূরস্পর্শী স্বপ্ন ও পরিকল্পনা শিল্প-সাহিত্যে যথার্থভাবে হলো না রূপায়িত।

চতুর্থত, এবং সম্ভবত এটিই প্রধান কারণ, মুক্তিযুদ্ধ এখনো অত্যন্ত কাছের একটি ঘটনা এবং এ-জন্যই অধিকাংশ ঔপন্যাসিকদের মুক্তিযুদ্ধের চেতনা আবেগ উচ্ছাস তাড়িত, সেখানে স্বভাবই ফুটে ওঠে শৈল্পিক নিরাসক্তির অভাব।

এ প্রসঙ্গে উল্লেখ্য নেপোলীয়নীয় যুদ্ধের (১৮০৪-১৮১৫) অনেক পরেই রচিত হয়েছে লিও তলস্তয়ের কালোত্তীর্ণ মহাকাব্যিক উপন্যাস ‘ওয়ার এন্ড পীস’ (১৮৬৫-৬৮) গৌরবোজ্জ্বল মুক্তিযুদ্ধের সামগ্রিকতাকে ধারণ করে, রচিত, বাঙালি জাতিসত্তার সম্মিলিত উজ্জীবনের মর্মমূল উৎসারিত, কালজয়ী মহাকাব্যিক উপন্যাসের জন্যে সম্ভবত আরও কিছু কাল অপেক্ষা করতে হবে ।

Exit mobile version