আজকে আমাদের আলোচনার বিষয়: মিথ ইতিহাস ঐতিহ্যের নবমূল্যায়নধর্মী নতুন শিল্পশৈলীর উপন্যাস। এটি বাংলাদেশের উপন্যাসের শৈলীবিচার এর মিথ ইতিহাস ঐতিহ্যের নবমূল্যায়নধর্মী নতুন শিল্পশৈলীর উপন্যাস এর অন্তর্গত।

মিথ ইতিহাস ঐতিহ্যের নবমূল্যায়নধর্মী নতুন শিল্পশৈলীর উপন্যাস
সময়, সমাজ ও ইতিহাসবোধ যে কোনো সৃষ্টিশীল জাগর চৈতন্যের অনিবার্য অবলম্বন। লেখকের চেতনার গভীরে প্রোথিত ইতিহাস চেতনা এবং সমাজ বোধের স্পর্শে ঐতিহ্যিক উপদানের পুনর্জন্ম ঘটে, সমকালের অভিজ্ঞতার উত্তাপে ঐতিহ্যিক চরিত্রের অনুসরণে সৃষ্টি হয় নতুন নতুন চরিত্র।
কল্লোলিত সমকাল থেকে তুলে নেয়া কোনো ঘটনাংশ যখন চেতনাসঞ্চারী ঐতিহ্যের স্পর্শে নতুনমাত্রায় অভিব্যঞ্জিত হয় তখন স্রষ্টার জীবনার্থ সন্ধান ও জাতিসত্তা সন্ধানের পরিচয় স্পষ্ট হয়ে ওঠে। বিরুদ্ধ সমাজ-প্রতিবেশ, ও বৈরী রাষ্ট্র-পরিস্থিতিতে বিভাগোত্তর (১৯৪৭-১৯৭১) বাংলাদেশের ঔপন্যাসিকরা সমকাল থেকে দৃষ্টি ফিরিয়ে উপন্যাসের বিষয় সন্ধানে মিথ ইতিহাস-ঐতিহ্যের আশ্রয় গ্রহণ করেছিলেন।

‘স্বাধীনতা-পূর্বকালে কলোনি-শোষণ ও সামরিক শাসনের বিরুদ্ধে ক্ষোভ ও প্রতিবাদ জ্ঞাপনের বিকল্প উপায় হিসেবে মিথ ঐতিহ্য ও ইতিহাস অবলম্বী রূপক ও প্রতীকী উপন্যাসের উদ্ভব ঘটে। আধুনিক উপন্যাসের এ-এক মননশীল প্রকরণ। এর শিকড় সংলগ্ন থাকে সংগ্রামী সভ্যতার সময় গর্ভে। মিথ-ঐতিহ্য ও ইতিহাস এক্ষেত্রে উপন্যাসের উপরকণ মাত্র নয়, বরং বিষয়, বা Author’s attitude towards life. লোকপুরাণের ফিনিক্স পাখি যেমন নিজের ছাই থেকে নতুন দেহ নিয়ে জেগে ওঠে, তেমনি মৃত ইতিহাস থেকে দেগে ওঠে আর এক ইতিহাস। ২
ইতিহাসের সময়গর্ভে লুক্কায়িত প্রত্ন-সম্ভাবনা, ঐতিহ্যের কঙ্কালে সংক্ষুব্ধ জীবনাবেগকে নব নির্মাণের মধ্য দিয়ে এপর্বের ঔপন্যাসিকরা সঞ্চার করেছেন নবযুগের নতুনতর সংবেদনা। ‘জীবনার্থের মানবমুখিতায় একজন শিল্পী ইতিহাসের ঘটনাক্রম ও চরিত্রপাত্রের মধ্যের সমকালীন মানুষের আত্মসন্ধান, সত্তাসন্ধান ও জাতিসত্তা সন্ধানের নিগূঢ় ভাবনারীজ আবিষ্কারে সমর্থ হন। সকালের বন্ধি সমাজসত্তার মুক্তি আকাংক্ষায় বাংলাদেশের ঔপন্যাসিকরা ইতিহাস ও পুরাণলোকে উজ্জীবনের যে শক্তি-উৎস সন্ধান করেছেন, সমাজ পটভূমিকার বিচারে তার মূলা গৌণ নয়।

বিভাগোত্তর বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে জাতিসত্তার স্পন্দিত শক্তি সঞ্চয়ে, উপন্যাস শিল্পের নতুনমাত্রা সন্ধানে, ঔপন্যাসিকরের মিথ-ঐতিহ্য ইতিহাস আশ্রয়ী শিল্প অভিপ্রায়ের গুরুত্ব অপরিসীম।
আবু জাফর শামসুদ্দীনের (১৯১১- ১৯৮১) ‘ভাওয়াল গড়ের উপাখ্যান (১৯৬৩), ‘পদ্মা মেঘনা যুমনা’ (১৯৭৪) সত্যেনসেনের (১৯০৭-১৯৮১), ‘অভিশপ্ত নগরী’ (১৯৬০) ‘পাপের সন্তান’ (১৯৬৯) সেলিনা হোসেনের (জন্ম ১৯৪৭) ‘নীল ময়ূয়ের যৌবন’ (১৯৮৩), ‘চাঁদবেনে’ (১৯৮৪); শওকত আলীর (জন্ম ১৯৩৬) ‘প্রদোষে প্রাকৃতজন’ (১৯৮৪); রিজিয়া রহমানের (জাম১৯৩৯) ‘একাল চিরকাল’ (১৯৮৪), সৈয়দ শামসুল হকের (জন্ম ১৯৩৫) ‘আয়না বিবির পালা’ (১৯৮৪), এধারার উল্লেখযোগ্য উপন্যাস।
আমাদের আলোচ্য সময়সীমার (১৯৪৭-১৯৭১) মধ্যে প্রকাশিত এ ধারার উপন্যাস্- ভাওয়াল গড়ের উপাখ্যান’, ‘অভিশপ্ত নগরী’ এবং পাপোর সন্তান সিঙ্গত কারণে উল্লিখিত তিনটি উপন্যাসের আলোচনাই উপস্থাপন আমরা এখানে করবো।