আজকে আমাদের আলোচনার বিষয়ঃ মানুষ সম্পর্কে বোধ। যা মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের পাঁচটি উপন্যাসে জীবন ও সমাজ এর মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের উপন্যাস সমাজ এর অন্তর্গত।

মানুষ সম্পর্কে বোধ
মানুষ সম্পর্কে সাধারণ বোধ মহেশ চৌধুরির কথায় মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় প্রকাশ করেছেন। মহেশ চৌধুরি বিচক্ষণ ব্যক্তি। জীবন সম্পর্কে তার বোধ স্পষ্ট। ছেলেকে সে অনেক বুঝিয়েছে যে অকারণে জেলে গিয়ে কোনো লাভ নেই, কাজের মতো কাজ করে সে হাজার বার জেলে যাক মহেশ চৌধুরির আপত্তি নেই। বিভূতি এ কথা শুধু চুপচাপ শোনে কোনো তর্ক করে না। আবার এ কথাকে মেনে নিয়ে সে মোতাবেক কাজও করে না। মহেশ চৌধুরি তখন বুঝতে পারে:
“মানুষ যা করিতে চায় তাই করে।” ( ৩খ, পৃ.-৩৮২)

মানুষে-মানুষে বন্ধুত্বের সম্পর্ক সবচেয়ে কাছের সম্পর্ক। বিপিন আর সদানন্দ বন্ধু । তারা দুজন মিলে কাজ করে যাচ্ছে। তাদের মধ্যে ঝগড়াও হয়, আবার কয়েক দিন পর মিলও হয়। শৈশব থেকে তারা একে অপরকে ভালোবাসে, ঘৃণা করে। বিপিন রাগ করে সদানন্দকে কিছু না বলে চলে গেলে দু-তিন দিন পরই বিপিনের জন্য তার মন কেমন করে। আবার ফিরে এলে মাধবীলতাকে নিয়ে তাদের ঝগড়া শুরু হয়:
“নিজের নিজের ঘরে বসিয়া বিপিনের উপর সদানন্দের আর সদানন্দের উপর বিপিনের রাগে গা যেন জ্বলিয়া যাইতে লাগিল। একজন আর একজনের কত অন্যায়, কত অবিচার, কত স্বার্থপরতা আজ পর্যন্ত সহিয়া আসিয়াছে, কিন্তু আর সত্যই সহ্য হয় না একেবারে যেন পাইয়া বসিয়াছে।” ( তখ, পৃ. ৩১৪ )
মানুষের সঙ্গে মানুষের সম্পর্ক বিচিত্র। আবার এ সম্পর্কের ধারনা সর্বদা একরকম থাকে না । সম্পর্ক পাল্টে যায়। মাধবীলতার একসময় সদানন্দকে পিশাচ মনে হয়। আবার কিছু দিন পরই সে সদানন্দ সম্পর্কে বলে উনি বেশ লোক। মহেশ এবং বিপিন সম্পর্কেও তার এক সময় খারপ লোক মনে হয় আবার পৃথক পৃথকভাবে তাদের ভালো লোক মনে হয়। বিপিনের ভেতরও এই সমস্যা দেখা যায়:
“মহেশ চৌধুরি যখন সদানন্দকে মনে করিত দেবতা তখন তার জন্য বিপিনের মনে ছিল প্রায় অবজ্ঞারই ভাব, তারপর সদানন্দের অধঃপতনের জন্য মহেশ চৌধুরির ভক্তি যখন উবিয়া যাইতে আরম্ভ করিয়াছে, তখন বিপিনের মধ্যে জাগিয়াছে শ্রদ্ধা! মানুষের সঙ্গে মানুষের যোগাযোগের নিয়মকানুনগুলি খাপছাড়া নয়?” ( তখ, পৃ. – ৩৬৬)

মানুষের সঙ্গে মানুষের সম্পর্ক আসলেই খাপছাড়া। ব্যক্তিজীবন ও সাহিত্যজীবনে এর নজির কম নয়। মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় এর অন্যতম রূপকার। এ কথা সঙ্গত যে
“অহিংসায় ধর্মের পেলবতার আড়ালে মানিক এক নিরালোক সমবেদনাহীন, প্রেমহীন, পুরস্কার-শাস্তিহীন জগতের ছবি দেখালেন।৩৩
আসলে লেখক দেখাতে চেয়েছেন মানুষে-মানুষে স্থায়ী সম্পর্ক বলে কিছু নেই ।