আজকে আমাদের আলোচনার বিষয়ঃ মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের মানস গঠন । যা মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের পাঁচটি উপন্যাসে জীবন ও সমাজ এর অন্তর্ভুক্ত।

মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের মানস গঠন
মানস গঠনের প্রক্রিয়াটি আমরা দুভাবে দেখতে পারি। একটি জেনেটিক ও প্রকৃতিগত এবং অন্যটি পারিপার্শ্বিক ও পরিবেশগত। মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের পূর্ব পুরুষের ইতিহাস বৈচিত্র্যময়। তাঁর পিতা হরিহর বন্দ্যোপাধ্যায়ের আত্মজীবনীতে পাওয়া যায়।
“প্রপিতামহ রাজকৃষ্ণ বন্দ্যোপাধ্যায় কুলীণ রীতিতে প্রথম বংশজে বিবাহ করিয়া ভঙ্গ হন, সুতরাং আমরা ভঙ্গ কুলীনরূপে চতুর্থ পুরুষে নামিয়াছি। । …. …] পিতৃদেব বহুদিন পর্যন্ত অর্ধপাগলের ন্যায় ছিলেন- কোন কাজ করিতেন না, চুপচাপ বসিয়া থাকিতেন [… […] মাঝে মাঝে হঠাৎ বিনা সম্বলে বাড়ী হইতে চলিয়া যাইতেন- হাতে একটিও পয়সা নাই। [… […] এক একবার ৬ মাস ৮ মাস নানাস্থানে পদব্ৰজে ঘুড়িয়া বাড়ী ফিরিতেন। তিনি এইরূপে বহু তীর্থস্থান ও প্রধান প্রধান শহর বেড়াইয়াছেন। ১
তাঁদের পারিবারিক কাজ ছিল বাধনিক ক্রিয়া। হরিহর বন্দ্যোপাধ্যায় তাঁর ঠাকুরদাদার সঙ্গে পুরহিতগিরি করেছেন। পারিবারিক এই কাঠামোর বড় রকম পরিবর্তন আনেন তাঁর জ্যেষ্ঠ ভ্রাতা বিশ্বেশ্বর বন্দ্যোপাধ্যায়, তিনি প্রতিবেশীদের আর্থিক সহায়তায় ঢাকা মেডিকেল স্কুলে ভর্তি হন। এবং ত্রিবার্ষিক পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে আসাম প্রদেশে সরকারি চাকরি গ্রহণ করেন।
এই প্রথম মালপদিয়ার বন্দ্যোপাধ্যায় বংশে পাশ্চাত্য শিক্ষা ও সরকারি চাকরির সূচনা হয়। এরপর হরিহর বন্দ্যোপাধ্যায়ও কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বি.এ. পাস করে চাকরি নেন এবং শেষ পর্যন্ত সাব-ডেপুটি কালেক্টরের দায়িত্বপূর্ণ পদে উন্নীত হন। মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের পূর্বপুরুষের এই বাঁধন ছেঁড়া এবং নিজেকে সকলের মধ্যে আলাদা করার প্রচেষ্টা মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের ক্রোমোজমে বহমান। তাই এ কথা বলা যায়, তিনি জন্মসূত্রেই নিজেকে ব্যতিক্রমী ব্যক্তিত্ব হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করার দৃঢ়তা অর্জন করেছেন।
পরিবেশগত দিকে মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের বোধ তৈরি হয়েছে মূলত তিনভাবে, মানুষ দেখা- উপলব্ধি করা, সাহিত্য পাঠ এবং বিজ্ঞানকে বিশ্বাস করা।
মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের প্রধানতম বৈশিষ্ট্য হলো তাঁর দৃষ্টি। তিনি যে দিকে তাকিয়েছেন, তার ভেতর-বাহির সমস্ত খুঁটিনাটি পর্যবেক্ষণ করেছেন। তাঁকে যারা দেখেছেন, সকলেই তাঁর চোখের কথা বলেছেন। ১৩৭৮ বঙ্গাব্দের মাঘ সংখ্যা অন্বিষ্ঠতে সন্তোষ কুমার বলেছেন:
“মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় প্রসঙ্গে আসল ব্যাপার হল তাঁর নিজের চোখ। একেবারে জ্বলজ্বলে, ড্যাবড্যাবে এক জোড়া চোখ। বোধ হয় তার রঞ্জনরশ্মিও ছিল। এমন আনকোরা নতুন চোখে জীবনকে তার আগে কেউ দীর্ঘকাল দেখেননি। আমাদের সমাজ, পরিবার, প্রেম, ভক্তি, বিশ্বাস সব কিছু দেখার ধরন আগাপাশতলা বদলে গেল। বিনা প্রশ্নে কোন মূল্যই আমরা আর গ্রহণ করিনি, সব ঘষে ঘষে যাচাই করে তবে রাখা আর না রাখা।
অনেক কিছু যে অচল, তখন, তখন থেকেই ঠিক এতটা ডাহা ভাবে বোঝা গেল। বুঝিয়ে দিলেন মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়, তাঁর ওই চোখ দুটো দিয়ে। বলতে কী আমার মনে হয় মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের পর বাংলাসাহিত্যে শরীর বদলেছে, সাজগোজ ঘটেছে অনেক কিছু। কিন্তু ওই দুটি চোখ? তারপর নতুন চোখ আর এল না, এখনও আসেনি।২

সুশীল রায় বলেছেন:
“চোখে পুরু কাঁচের চশমা পরে তিনি অনেক সময় রাস্তার মাঝখান দিয়ে হাঁটতেন। ফুটপাত ধরে নিরাপদ হন্টনে তিনি বোধহয় বিশ্বাসী ছিলেন না, তাই তাঁর মতি ছিল জনারণ্য ও যানারণ্য ভেদ করে চলায়। এভাবে পথ চলতে তাঁকে অনেক বার দেখেছি। একটা বলিষ্ঠ বিক্রম নিয়ে ঐ যে চলেছেন একটি ব্যক্তি-এ ছবি এখনো চোখে ভাসে, এবং ঐটেকেই হয়তো বলা চলে তাঁর ব্যক্তিত্ব।৩
সতীন্দ্রনাথ মৈত্র বলেছেনঃ
“সাধারণ সাজসজ্জা, কিছুটা অগোছালো কিন্তু সবচেয়ে আকর্ষণীয় ছিল তাঁর চোখ দুটি। কালো ফ্রেমের চশমার পুরু কাঁচের নিচে অদ্ভূত উজ্জ্বলতায় জ্বলত। “৪
মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের এই জলন্ত চোখ দিয়ে তিনি দর্শনীয় ব্যক্তি বা বস্তুর অস্তিত্বের মুলপর্যন্ত দেখেছেন এবং তাঁর নিজস্ব বোধে তা শাণিত করে প্রকাশ করেছেন। তাই তাঁর মানস গঠনের প্রধানতম অবলম্বন বাস্তববোধ।
মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের মানস বৈশিষ্ট্যের অন্যতম দিক মেহনতি মানুষের প্রতি মমত্ববোধ। মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের দেখা এবং উপলব্ধি করার ক্ষমতা ছিল অসাধারণ। তিনি ৭ম-৮ম শ্রেণিতে থাকাকালীনই মধ্যবিত্ত সম্পর্কে একটি তিক্ততা তৈরি হয়। তাঁর জ্যেষ্ঠ ভ্রাতার বাবা-মায়ের প্রতি অশ্রদ্ধা, ভাই বোনের প্রতি অবজ্ঞা তাঁকে বিশেষভাবে পীড়া দেয়। তিনি আস্তে আস্তে মধ্যবিত্তের অন্তঃসার শূন্যতার প্রতি বীতশ্রদ্ধ হন। ক্রমশই তিনি অন্ত্যজ শ্রেণির দিকে ঝুঁকে পড়েন।
‘সাহিত্য করার আগে’ প্রবন্ধে তিনি বলেছেন ভদ্রজীবনের কৃত্রিমতা, যান্ত্রিকতা, সংকীর্ণতা, প্রকাশ্য ও মুখোশ পরা হীনতা সবকিছুর বিরুদ্ধে তাঁর মন বিদ্রোহী হয়ে ওঠে। শ্রেণিবৈষম্য নিয়ে নিজের মনেই দ্বন্দ্ব তৈরি হয়।
“এই জীবন আমার আপন অথচ এই জীবন থেকেই মাঝে মাঝে পালিয়ে ছোটলোক চাষাভুষোদের মধ্যে গিয়ে যেন নিঃশ্বাস ফেলে বাঁচি। আবার ওই ছোটলোকদের অমার্জিত রিক্ত জীবনের রুক্ষ কঠোর নগ্ন বাস্তবতার চাপে অস্থির হয়ে নিজের জীবনে ফিরে এসে হাঁফ ছাড়ি।
এই দ্বন্দ্ব তাঁর মনে ‘অবর্ণনীয় প্রচণ্ডতা’র রূপ নেয়। মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় একে ভাববাদ আর বস্তুবাদের সংঘাত বলেছেন। এই সংঘাতে ক্ষত-বিক্ষত হতে হতে শেষ পর্যন্ত তিনি নিজ প বের করে নিয়েছেন। তাই আজীবন তিনি মেহনতি মানুষের মুক্তির স্বপ্ন দেখেছেন। তিনি প্রত্যক্ষ বাস্তব জীবনকে পঠিত সাহিত্যে খুঁজেছেন। কিন্তু বাস্তব জগৎ আর সাহিত্য জগতের মধ্যে বিস্তর বিভেদ।
তাঁর মনে প্রশ্ন জাগে সাহিত্যে বাস্তবতা আসে না কেন? সাধারণ মানুষ সাহিত্যে ঠাঁই পায় না কেন? সাহিত্যে ভদ্রজীবন সুন্দর ও মহৎ। মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় চিন্তা করেন ভদ্রজীবনের বিকারগ্রস্থতা সাহিত্যে আসে না কেন? সাহিত্যের মানুষ হয় ভালো হয়, নয় মন্দ হয়, ভালো-মন্দ মিশানো হয় না কেন। তিনি বলেন:
“[… … …] বাস্তবকে না পেয়ে, মধ্যবিত্ত জীবনে কৃত্রিমতা, বিকৃতি ইত্যাদির মুখোশ খুলে না দেওয়ার উদাসীনতা পরোক্ষ প্রশ্রয় হয়ে দাঁড়ানোয় এবং বাস্তব ঘেঁষা সতেজ ও বলিষ্ঠ জীবনের অধিকারী মানবতার বিরাট অংশকে ঠাঁই না দেওয়ায়, বড়ই আপসোস আর রাগ হতো। *
সাহিত্যের এই অসংলগ্নতা দূর করার জন্য মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের মধ্যে একটি দৃঢ়তা জন্ম নেয়। তিনি চিন্তা করেন তিনি একদিন লেখক হবেন, নিজেই এর প্রতিকার করবেন। সাহিত্য করার আগের জীবনকে মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় দুইভাগে ভাগ করেছেন: এক. স্কুল থেকে শুরু করে কলেজে দুই/এক বছর রবীন্দ্রনাথ, শরৎচন্দ্র প্রভাবিত সাহিত্য এবং সেই সঙ্গে হ্যামসুনের ‘হাঙ্গার’ থেকে শুরু করে শ-র নাটক পর্যন্ত বিদেশী সাহিত্য এবং ফ্রয়েডের সঙ্গে পরিচিতি, দুই. কল্লোল, কালি-কলমীয় ধারার বস্তুপন্থী বোধকে বিশ্লেষণ করা। সাহিত্যিকের চেতনা ও দৃষ্টিভঙ্গি গড়ে ওঠার ব্যাপারে তিনি বলেছেন:
“সাহিত্য করার আগে কয়েকটা বিষয়ে সকল হবু লেখকদের মিল থাকে। যেমন, সাহিত্য সম্পর্কে বিশেষ আগ্রহ, জীবন সম্পর্কে জিজ্ঞাসা ও জবাব খোঁজার তাগিদ, সাহিত্যে প্রতিফলিত জীবনকে বাস্তব জীবনে খুঁজে নেবার চেষ্টা, নতুন অভিজ্ঞতাকে চিন্তা জগতে সাহিত্যের টেকনিকে ঢেলে সাজা, ইত্যাদি এ সমস্তই সাহিত্য জীবনের জন্য প্রস্তুতির প্রক্রিয়াটা ঘটাবার কারণ স্বরূপ হয়।
দশজনের চেয়ে সাহিত্যকে ঘনিষ্ঠতর গভীরতরভাবে নেওয়ার ফলে চিন্তা ও ভাব জগতে সাহিত্যের প্রভাব সঞ্চিত হয়ে চলে, তার সঙ্গে মিশ্রণ ঘটে নিজের বাস্তব জীবনের সংঘাত ও পরিবেশের প্রভাব, আয়ত্ত করা জ্ঞানের প্রভাব আর সংস্কারের প্রভাব।
তাঁর মতে লেখক হওয়ার প্রস্তুতি নিয়ে আসতে আসতেই একজন লেখক হতে পারে, হঠাৎ করে কারো পক্ষে লেখক হওয়া সম্ভব নয়। ‘সাহিত্য করার আগে’ প্রবন্ধটি মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের মানস গঠনের স্বীকারোক্তি।
মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় টাঙ্গাইলে থাকাকালীন বাংলার শিক্ষক সতীশবাবুকে আশ্চর্য রকমের সব প্রশ্ন করতেন। আবার ‘বর্ষা’ বিষয়ক রচনা লিখতে গিয়ে সকলের চেয়ে এতটাই আলাদা লিখেছিলেন যে সতীশ মাস্টার নিজে সেটা ক্লাসে বুঝিয়ে দিয়েছিলেন। বাংলা বিষয়ক জ্ঞান তাঁর ছোটবেলা থেকেই শুরু হয়। তিনি প্রচণ্ড দুরস্ত ছিলেন। নিজের পরিবারের অসামঞ্জস্য তাঁকে পীড়া দিলে তিনি গাড়োয়ান কিংবা মাঝি-মাল্লাদের কাছে গিয়ে মুক্তি খুঁজতেন। তাই সকল শ্রেণির চেতনা তাঁর মধ্যে সঞ্চিত হয়। নারায়ণ গঙ্গোপাধ্যায় বলেছেন:
“মধ্যবিত্তের মধ্যগত যে অন্তঃসারশূন্যতা ও গ্লানি-তার সম্পর্কে কল্লোলীয় লেখকদেরও কোনো মোহ ছিল না। [… …..] প্রেমেন্দ্র মিত্র এবং অচিন্ত্যকুমারের … গল্পে তার নিদর্শন আছে। কিন্তু তা হলেও তাঁদের মধ্যে যে পরিমাণে আত্মধিক্কার ছিল, সে পরিমাণে আত্ম-সমালোচনা ছিল না। [… …… মানিক যেন বাইরে থেকে এসে দাঁড়ালেন। [… ….. একজন আদিম মানুষ যেন নিরঞ্জন দৃষ্টিতে বাঙালী মধ্যবিত্তের সমাজকে দেখে নিচ্ছে, তার ওপরের সমস্ত বর্ণ-প্রলেপের নেপথ্যে যে ভণ্ডামি, স্বার্থবাদ আর কুটকামনায় সর্পিল প্রবাহ বইছে- তার কিছুই তাঁর চোখ এড়িয়ে যায় নি।
প্রেমেন্দ্র মিত্র বলেছেন, মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় তাঁদের জন্য লেখেন, অর্থাৎ লেখকদের জন্য। মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় সাহিত্যিকদের কলম পেষা মঞ্জুর বলেছেন। তিনি বলেছেন সাহিত্যিকের শ্রমটি সার্বক্ষণিক। বাজারে মাছ কিনতে গেলেও তাঁর রক্ষে নেই। সতর্ক দৃষ্টিতে তাঁকে দেখতে হয়। কারা মাছ কিনতে এসেছে, কেমন মানুষরা কতটা মাছ কিনছে, যদি পোষায় তবে কিনবে বলে কারা শুধু দাম জিজ্ঞাসা করছে, কারা পচা মাছ কিনছে।
আবার যারা মাছ বিক্রি করছে তারা কেমন, মেঞ্চুনির পরনে কি শাড়ি, তার গায়ে কি গহনা, তার বসা, মাছ কাটা, কথা বলার ভঙ্গি কেমন। বাড়ির অন্দর মহলের মেয়ে আর মেছুনির পার্থক্য কি কি সকল কিছুই তাঁকে তন্ন তন্ন করে দেখতে হয়। তিনি বলেছেন:
“ঘরে শিল্প-সাহিত্য জ্ঞান-বিজ্ঞানের পুঁজি ঘাঁটা আর ঘরে বাইরে সর্বত্র সব সময় মানুষকে আর জীবনকে তন্ন তন্ন করে দেখা ও জানা এবং মনের মধ্যে তাই নিয়ে তোলপাড় করা, যোগ বিয়োগ করা, মিলিয়ে দেখা আর অমিল খোঁজা ও সব কিছুর মানে বোঝার চেষ্টা—লেখকের বিরামহীন এই শ্রম মাপাই বা হবে কিসে, দামই বা কথা হবে কোন নিরিখে? h
মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের চলার পথের প্রথম উদ্দেশ্য বাঁচা।
তাই তাঁর গল্প-উপন্যাস কিংবা কবিতা সকল মাধ্যমের বক্তব্য হলো বেঁচে থাকা বা টিকে থাকা। যত ঝড়-ঝঞ্জাই আসুক, পরিবেশ যত প্রতিকূলই হোক মানুষ মুক্তির পথ খুঁজে বের করবে। তাঁর একমাত্র উদ্দেশ্য ছিল মেহনতি মানুষের মুক্তির উপায় খুঁজে বের করা। সে মুক্তি অর্থনৈতিক এবং মানসিক দুই-ই। তাই ‘শহরতলী’ উপন্যাসে যশোদা শ্রমিকদের মুক্তির জন্য চিন্তা করেছে।

সে কল্পনা করে শ্রমিকরা যেন পেট ভরে খেতে পারে, পরিচ্ছন্ন বস্ত্র ও প্রয়োজনানুসারে স্ত্রী পায়, অবসরের 130 ফাঁকে ওরা যেন জীবনটা উপভোগ করতে পারে। কিন্তু যশোদার কল্পনা থেমে যায়।
“কল্পনাবোধ বাস্তবকে পর্যবেক্ষণ করে আর এগোতে চায় না,’ অন্যদিকে তারাশঙ্করের ‘পঞ্চগ্রামে’ কৃষকের পুত্র দেবু কৃষকের মুক্তির জন্য, স্বপ্ন দেখে, কিন্তু সে স্বপ্ন বাস্তব হবে কি না সে বিষয়ে চিন্তা করে না। দেবু কল্পনায় মধ্যবিত্ত ভদ্রলোক হয়ে ওঠে। মানস জগতে তারাশঙ্কর আর মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের পার্থক্য এখানেই। মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় উপন্যাসের চরিত্রের সঙ্গে মিলে মিশে একাকার হয়েছেন। তিনি সমস্যার বাইরে থেকে দেখেন নি, সমস্যার ভিতরে প্রবেশ করে পাঠককে দেখিয়েছেন। পিয়ের ফালো এস. জে. বলেছেন:
“ফরাসি লেখক মোপাসার কথা আপনা-আপনি মনে পড়ছে। মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের সঙ্গে মোপাসাঁর সুনিপুণ শৈলী বাস্তবধর্মী চিত্রাঙ্গন প্রণালী তুলনীয় বটে। বাস্তবের সূক্ষ্ম বিশ্লেষণে ও সাধারণ মানুষের চরিত্র রূপায়ণে দুজনে সমান কৃতিত্বের পরিচয় দিয়েছেন। তবুও তফাৎ অনেকখানি।
মোপাসাঁর মধ্যে কি একটা উপেক্ষাপূর্ণ আভিজাত্যের ভাব রয়েছে, তিনি সাধারণ মানুষকে হয়তো চিনতেন কিন্তু ভালোবাসতেন না। তাঁর বর্ণনা কতকটা নিষ্ঠুর, নিজেকে তিনি তাঁর চরিত্রগুলির ঘনিষ্ঠ আত্মীয় বলে বোধ করতেন না। মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের সেই নিষ্ঠুরতার লেশমাত্র নেই। অন্ত তঃপক্ষে ‘পদ্মানদীর মাঝি’ বইখানির মধ্যে নেই-ই। রুশ লেখক গর্কির মতো তাঁর বাস্তবধর্মী মনে মমতার অন্ত নেই। ”
মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় বেঁচে থাকার জন্য পথ খুঁজেছেন, কল্পনার ফানুস উড়িয়ে পথহীন অবাস্তব স্বপ্ন দেখেন নি। যে স্বপ্নের বাস্তবায়ন সম্ভব নয়, সে দিকে তিনি মানুষের দৃষ্টি ফেরান নি। তিনি বাস্তবকে উপলব্ধি করে, প্রতিকূল পরিবেশের বিরুদ্ধে সংগ্রাম করে বাস্তবতার নিরিখে সঠিক পথের সন্ধান করেছেন। যাতে করে বাস্তব জীবনে মানুষের মুক্তি ঘটে। তিনি বলেছেন:
“খুব সহজ করে বলতে গেলে বলা যায় যে, লেখক যে ভাব আর ভাবনাই সাজিয়ে দিন উপন্যাসে, ভিটা তাঁকে গাঁথতেই হবে ঘাঁটি বাস্তবতার। যতই খাপছাড়া উদ্ভট হোক উপন্যাসেরই চরিত্র, মাটির পৃথিবীর মানুষ হয়ে তাকে খাপছাড়া উদ্ভট হতে হবে। [… …… উপন্যাসেও কাব্য সৃষ্টি করা যায়, কল্পনা পার হয়ে যেতে পারে বাস্তবতার সীমা, গড়ে উঠতে পারে এমন এক মানস জগৎ যার অস্তিত্ব লেখকের মন ছাড়া কোথাও নেই। কিন্তু বাস্তব মানুষ বাস্তব জীবন বাস্তব পরিবেশ অবলম্বন করেই এসব ঘটাতে হবে। ১
মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের মানস গঠন হয়েছে সম্পূর্ণ তাঁর প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতার ফলে। ১৯৩৩ সালে king’s carnival কলকাতায় এসেছিল। এখানে নানা ধরনের পুতুলনাচ দেখানো হতো। মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় এই পুতুলনাচ দেখে চিন্তা করেন, মানুষ তো পুতুলেরই মতো, কেউ একজন বসে নাচাচ্ছে। মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় মানুষের জীবনকে অবলম্বন করে ‘পুতুলনাচের ইতিকথা’ লেখেন। ১৯৩৬ সালে মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের দাদা।
হিমাংশুবাবুর বিয়ে উপলক্ষে পূর্ববঙ্গের বিভিন্ন জায়গায় তিনি ঘুরে বেড়ান পরানদীর মাঝিদের সঙ্গে তিনি বেশ কিছুদিন কাটান। এরপর তাঁর ‘পদ্মানদীর মাঝি’ প্রকাশিত হয়। মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় যে নিজের বর্তমান আবহ নিয়ে লেখেন তাঁর প্রমাণ ১০ই আগস্ট ১৯৪৬ তারিখে মাসিক বসুমতীর সম্পাদকের কাছে লেখা চিঠিতে পাওয়া যায়:
” পদ্মানদীর মাঝি’র মত আবার একটি উপন্যাস লিখতে অর্ডার করেছেন, কিন্তু তখনকার মন আর চোখ এখন আর নেই। সেই পারিপার্শ্বিকতাকে হারিয়েছি বহুকাল আগে। এখন আমি শহরের বাসিন্দা। যান্ত্রিক কলকাতার সংস্পর্শে এসে গ্রামীণ সরলতাকে প্রায় ভুলতে বসেছি। ১০
মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় যখন ‘বঙ্গশ্রী’ পত্রিকার সহকারী সম্পাদক পদে চাকরি করেন, তখন পত্রিকা অফিসে বিভিন্ন ব্যক্তির আগমনে তিনি সকলকে গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করতেন। পত্রিকার মালিক সচ্চিদানন্দ ভট্টাচার্যকেও তিনি গভীরভাবে দেখেন। পরবর্তীকালে শহরতলী’ তে সচ্চিদানন্দকে অবলম্বন করে সত্যপ্রিয় চরিত্রটি অংকন করেন।
এমনকি ‘শহরতলী’ তে সত্যপ্রিয় জ্যোতির্ময়ের বিয়েতে যে নকল নেকলেস উপহার দেয়, তা-ও সচ্চিদানন্দবাবুর আদলেই আঁকা। সচ্চিদানন্দ সম্পাদক কিরণকুমার রায় এবং স্বয়ং মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের বিয়েতে ১২৫ টাকার জরোয়া সেট উপহার দেন।
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের প্রভাবে ১৯৪৩ সালে বাংলাদেশে ভয়াবহ দুর্ভিক্ষ দেখা দেয়। সরকারি দুর্ভিক্ষ কমিশনের মতে এ সময় পনের লক্ষ লোক মারা যায়, বেসরকারি কমিশনের মতে ৩৫ লক্ষ লোক মারা যায়। এ প্রসঙ্গে বলা হয়েছে।
“১৯৪৩ ও ১৯৪৪ বছর দুটি যেন মানুষের জীবনে দুঃসহ অভিজ্ঞতার ঝাঁপি উপুড় করে দিয়েছে। আকাল মহামারী অবক্ষয় মৃত্যু এই বুঝি তার বিধিলিপি। সর্বাত্মক ধ্বংসের কিনারায় এসে পৌঁছেছে গোটা দেশ ও সমাজ তার বর্তমান ও ভবিষ্যৎ। চেতনার স্পন্সনটুকুও কোথাও অবশিষ্ট নেই।
এই দুর্ভিক্ষের সময় মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় গ্রামে গ্রামে ঘুরে বেড়িছেন। মানুষের না খেয়ে মারা যাওয়ার দৃশ্য স্বচক্ষে দেখেছেন। তিনি বলেছেন:
“দুশো বছরের পরাধীনতায় বাঙলার মেরুদণ্ড গেছে ভেঙে। গরীবগুলোকে কত বললাম- না খেয়ে নেয়াল কুকুরের মতো রাস্তাঘাটে মরে পড়ে না থেকে তোৱা একবার উঠে দাঁড়া। সরকারের ভালাবদ্ধ শস্যের গুদামগুলো লুট করে একদিনও পেট পুরে খেয়ে বাঁচি-তারপর না হয় ভেজাল খাটবি, কিন্তু ব্যাটাদের কি সাহস আছে ১ এই দুর্ভিক্ষ সম্পর্কে সুকান্ত ভট্টাচার্য বলেছিলেন:
“সে ইতিহাস একটা দেশ শ্মশান হয়ে যাওয়ার ইতিহাস, ঘর ভাঙা গ্রাম ছাড়ার ইতিহাস, সোরে সোরে কান্না আর পথে পথে মৃত্যুর ইতিহাস, আমাদের অক্ষমতার ইতিহাস।
বাংলাদেশের এই ভয়াবহ পটভূমিকে কেন্দ্র করে মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় যে সকল গল্প লিখেছেন। তা ‘আজ কাল পরশুর গল্প’ সংকলনে প্রকাশিত হয়। এই গল্পগুলোতে তিনি শুধু দুর্ভিক্ষ ও মন্বন্তরের করাল ছায়াই আঁকেন নি, তার থেকে উদ্ধর পাওয়ার, বাঁচার সংগ্রামও দেখিয়েছেন। এছাড়া যুদ্ধের সময় ভীত-সন্ত্রস্ত মানুষ ভিটেমাটি ত্যাগ করে যায়। এসব মানুষের মনে সাহস যোগানোর জন্য জনরক্ষা কমিটি সাহসী কাজ করে। এই কাহিনী নিয়ে তিনি ‘ভিটেমাটি’ নাটক লেখেন।
যুদ্ধের সময় চোরাকারবারিদের দৌড়াত্ম্য ভয়ংকররূপে বেড়ে যায়, সঙ্গত কারণে দুর্ভিক্ষের ভয়াবহতা নেমে আসে একটভাবে। মানুষের মূল্যবোধ নষ্ট হয়ে যায়। মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় এই সংকটের মুহূর্তে মানুষের ভেতরে দৃঢ়তা জাগানোর স্বপ্ন দেখেন, মানবিক অবক্ষয়ের কালে খাঁটি প্রেমের অন্বেষণ করেছেন। এই পটভূমির উপর ভিত্তি করে লিখেছেন উপন্যাস ‘চিন্তামনি’।
১৯৪৫ সালের ২রা সেপ্টেম্বর দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের অবসান ঘটে। এ সময় ভারতে আন্দোলন তুঙ্গে ওঠে। রাজনৈতিক নেতা ও কর্মীদের মুক্তির দাবিতে কলকাতায় ছাত্র আন্দোলন তীব্র হয়। ছাত্র-পুলিশ সংঘর্ষ হয়। ২৯শে নভেম্বর আজান হিল ফৌজ দিবসে বিক্ষোভ চরম আকার ধারণ করলে পুলিশ গুলি চালায়।
এই ঘটনার অভিজ্ঞতায় মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় ভিন্ন এক আঙ্গিকে ‘চিহ্ন’ উপন্যাস লেখেন। এ আন্দোলন তাঁর ব্যক্তিজীবনেও প্রভাব ফেলে। ছাত্রদের এরূপ দৃঢ়তা দেখে মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় নিজে মদ্যপান থেকে কয়েকদিন বিরত থাকেন। ১৯৪৬ সালের ১৬ই আগস্ট কলকাতায় সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা হয়। সমালোচকের মন্তব্যে এর যথার্থ চিত্র পাওয়া যায়।

“সেই মর্মান্তিক ভ্রাতৃঘাতী ঘটনাবলী বিবৃত করার ভাষা কারো সে দিন ছিল না। বিদারক দৃশ্য, সকাল থেকে সমস্ত বড় রাস্তার ধারে ধারে সারি সারি মৃতদেহ। হিন্দু সংখ্যাধিক এলাকায় শত শত হিন্দু নরনারীর মৃতদেহ, আর মুসলিম সংখ্যাধিক এলাকায় শত শত মুসলমান নরনারীর মৃতদেহ। শ্রমিক এলাকাগুলিও বাদ নেই। শুধু ইংরেজ সাহেবরা স্বচ্ছন্দে ঘুরে বেড়াচ্ছেন। ১৭
এ সম্পর্কে তিনি ডায়েরিতে বিস্তারিত লিখেছেন। তিনি মনে-প্রাণে বিশ্বাস করতেন হিন্দু- মুসলমানের দাঙ্গা বাঁধানো ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদের রাজনৈতিক চাল। তিনি এই দাঙ্গা থেকে সকলকে নিবৃত করার জন্য চেষ্টা করেন, শান্তিকমিটি গঠনের কথা উঠলে নিজে উদ্যোগী হয়ে সকলকে কমিটির কথা বলেন।
এর কারণে কিছু উগ্র হিন্দু ছেলের কাছে ‘শালা কমিউনিস্ট- মুসলমানের দালাল’ শোনেন এবং মারের মুখে পরেন। তবু তাঁর মনে ভয়ের সঞ্চার হয় না, বরং নিজেদের ভেতরের এই হাঙ্গামা মিটিয়ে ফেলার জন্য প্রাণপণে চেষ্টা করেন। হিন্দু মুসলিম সকল নেতারা এ দাঙ্গা থামানোর জন্য চেষ্টা করেন। তাঁরা বিবৃতি দেন:
“ভাই-ভাইয়ের মধ্যে এই যুদ্ধ অবিলম্বে থামাইবার জন্য আমরা আপনাদের নিকটাবেদন জানাইতেছি। …. […] আপনারা যে যাহার মহল্লায় থাকুন, অপরের মহল্লায় বা পাড়ায় অনধিকার প্রবেশ করিবেন না। সমস্ত সম্প্রদায়ের প্রতিনিধি লইয়া মহল্লা শান্তিরক্ষাবাহিনী গঠন করুণ এবং সম্মিলিত ভাবে শান্তিরক্ষার জন্য আপ্রাণ চেষ্টা করুন। ১৮
এই পটভূমিতে তিনি ‘স্বাধীনতার স্বাদ’ উপন্যাস লিখেছেন। এ সময় দশম গল্প সংকলন ‘পরিস্থিতি ও প্রকাশিত হয়। এই গল্প সংকলনের গল্পগুলোতে চারদিকে দ্রুত পরিবর্তনের ছাপ রয়েছে। তিনি আরেকটি গল্প সংকলন প্রকাশ করেন- খতিয়ান’। এ গ্রন্থের গল্পগুলোর বিষয়বস্তু যুদ্ধ ও দুর্ভিক্ষ। দুর্ভিক্ষপীড়িত মানুষ যে আত্মরক্ষার শক্তি হারিয়ে ফেলে সে সত্যও এর গল্পে প্রকাশিত হয়েছে।
এক একটি বিশেষ পরিস্থিতি মানুষের মানস গঠনে সাহায্য করে। কিশোর কবি সুকান্ত ভট্টাচার্যকে মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় ভালোবেসেছিলেন, তাঁর নিজের মতাদর্শ, মানবিক চাওয়া, বৈজ্ঞানিক দৃষ্টিভঙ্গি সকল বিষয় তিনি সুকান্তের কবিতায় খুঁজে পান। তাই তিনি আশা করেন কবি সুকান্ত নতুন যুগের সূচনা করবে। কিন্তু মানিকের সে আশা পূরণ হয় না।
সুকান্ত যক্ষ্মায় আক্রান্ত হন। মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের হৃদয় মন হাহাকার করে ওঠে, এই মানসিক অস্থিরতায় তিনি ‘সুকান্ত ভট্টাচার্য’ কবিতাটি লেখেন। ১৯৪৬ সালের জানুয়ারিতে চীনা সাহিত্যিক ড. সেন হানুংসের- এর সঙ্গে মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের এক ঘণ্টা আলাপ হয়। তাঁর সম্পর্ক মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় ডায়েরিতে নিজের মতামত লিখেছেন। এর মধ্যদিয়ে মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের নিজের মানসজগৎও স্পষ্ট হয়:
“সহজ পরিস্কার খোলাখুলি স্পষ্ট কথা- দম্ভ নেই অথচ স্পষ্টবাদী।
….. ….. শান্তি নিকেতনে ছাত্রদের ঘর বাড়ির চেয়ে কবির ঘরের উন্নত অবস্থায় বিস্মিত। ………. চীনের এক পরিবারে বিভিন্ন রাজনৈতিক মত: নিজের ভাইবোনেরা এমন যে ভাইবোন বলে মানতে পারেন না।১৯
মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের পর্যবেক্ষণ প্রবণতা তাঁকে জীবনচিত্রশিল্পী রূপে প্রতিষ্ঠিত করেছে। তিনি যখন যে কাজে যেখানেই গিয়েছেন, চারদিকে পরিপূর্ণ নীরিক্ষা করেছেন। এক স্থানের সঙ্গে অন্য স্থানের, এক ব্যক্তির সঙ্গে অন্য ব্যক্তির এক পরিবেশের সঙ্গে অন্য পরিবেশের তুলনা করে দেখেছেন। তাই তাঁর লেখায় জীবনের অনুপুঙ্গ সত্য উন্মোচিত হয়েছে। ১৯৪৭ সালের ২৮শে ডিসেম্বর বোম্বে ছাত্র ফেডারেশনের সর্বভারতীয় সম্মেলনে গিয়ে তিনি বোঘে আর কলকাতার পার্থক্য নিরূপণ করেন।
“কলকাতার চেয়ে অনেক বিষয়ে পৃথক সমৃদ্ধিশালী, পরিচ্ছন্ন, লোকের নাগরিক কর্তব্যবোধ জাগ্রত। বাসের জন্য স্বেচ্ছায় ‘Q’ – বসার সিট পূর্ণ হলে কেউ উঠতে পারবে না। তবে ট্রামগুলি বাচ্ছে শামুকের গতিতে চলে। তবে সহরের মাঝখান দিয়ে electric train চলার যাতায়াতের আশ্চর্য সুবিধা হয়েছে। এখানে দেশী মুলধন, শিল্পীকরণের মুনাফা দেশে থাকে কলকাতায় বিদেশী মূলধন। লাভের টাকা বিদেশে যায়।
তাছাড়া, কলকাতার চেয়ে বোম্বেতে বিভিন্ন প্রদেশের লোক সমাবেশ বেশী। এছাড়া এ্যালিফেন্ট কেস এ যেতে জোয়ার-ভাটার প্রভাব, বাতাস এবং পালের টান, ট্রেনের ভাড়া বৃদ্ধি, যুক্ত প্রদেশে অনাবাদি জমি, ইংরেজের হতাশা কোনোটিই তাঁর দৃষ্টি এড়ায় না। ১৯৪৯ সালে কুচবিহারে গেলে আধা জমিদার আধা কংগ্রেসী দুই ভাই বাঙালি বিষেষ জয় করে আখের গুছিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করে।
তাদের একজনের স্ত্রী ধরমশালায় গিয়ে মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় আর বিষয়লালকে চায়ের নিমন্ত্রণ করে আসে। সকালে মোটর দিয়ে মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়দের নিয়ে যায়। মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় রক্ষণশীলতা সম্পর্কে বলেছেন:
“যে মহিলা ধরমশালায় গিয়ে নেমন্তন্ন করে এসেছিলেন বৈঠকখানায় তার খোঁপাটি দেখা গেল না তার হাতের ঘরোয়া খাবার আর চা এলো!
তিনি যেমন মানুষ দেখেছেন, তেমনি তার বসবাসের পরিবেশ দেখেছেন। যেমন সভা- সমাবেশ সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে গিয়েছেন, তেমনি নিছক ব্যক্তিগত অভিপ্রায়ে আব্দুল উৎসব, লাঠিখেলা, মেলায় গিয়েছেন। তাঁর ভেতরে একটি শিশু-কিশোর মন জেগে থেকেছে সর্বক্ষণ। ১৯৫২ সালে যখন তিনি প্রচণ্ড অসুস্থ তখনও তাঁর মধ্যে ছেলেবেলার মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় উকি দেয়। ১৭ই অক্টোবর তারিখে তাঁর ডায়েরিতে লিখেছেন:
“সন্ধ্যায় বাজী পোড়াতে আঙ্গুল ঝলসানো মূলত মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের মানস গঠনের মূল ভীত তাঁর কৈশোরোই স্থাপিত হয়েছিল। বয়ঃসন্ধিক্ষণে এর বিকাশ ঘটে এবং সময়ের সঙ্গে সঙ্গে পরিপূর্ণতা আসে। মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের বিদ্রোহী মনোভাব এখন থেকেই বিদ্যমান। এছাড়া তিনি দূরদৃষ্টিসম্পন্ন। বাংলাসাহিত্যের রিক্ততা লক্ষ্য করে তিনি সাহিত্য করতে উদ্যেগী হন। এম.কে. প্রোডাকশন নামক চলচ্চিত্র-প্রযোজক সংস্থার অন্যতম অংশীদার শ্রী মাধব ঘোষালকে ২রা আগস্ট ১৯৫২ সালে চিঠিতে লিখেছেন:
“অঙ্কশাস্ত্রে অনার্স নিয়ে বি.এসসি পড়বার সময় আমি সাহিত্য করতে নামি-বাড়ির লোকের সঙ্গে ঝগড়া করে। কারণ, তখন আমি অনুভব করছিলাম যে সাহিত্যজগতে একটা বড় রকম পরিবর্তন ঘটতে চলেছে, এরকম সন্ধিক্ষণে সাহিত্য সৃষ্টি করার বদলে অন্যকাজে সময় নষ্ট করা যায় না। তখন কল্লোল যুগের সমারোহ কিন্তু আমি টের পেয়েছিলাম সাহিত্য যে মোড় ঘুরছে কল্লোলী সাহিত্য তার লক্ষণমাত্র, আসল পরিবর্তন আসবে অন্যরূপে-সাহিত্য ক্রমে ক্রমে বাস্তবধর্মী হয়ে উঠবে। ২৩ তাঁর বাড়িতে আর্থিক অনটনের সময় তিনি এ রকম একটা কথা বলেছিলেন:
“মৃত্যুর পর সব বুঝতে পারবে কি সম্পদ আমি রেখে গেলাম। ২৪
পারিবারিক জীবন তাঁর জীবনে সকল সময়ই প্রভাব ফেলেছে। ১৯৪৯ সালে তাঁর পারিবারিক ইতিহাসে স্মরণীয় ঘটনা ঘটে। ধনতান্ত্রিক সভ্যতার স্বাভাবিক নিয়মেই তাঁদের মধ্যবিত্ত একান্নবর্তী পরিবার ভেঙে যায়। স্ত্রী-সন্তানদের নিয়ে তিনি ভাড়া বাড়িতে ওঠেন। কিছুদিন পর তাঁর বৃদ্ধ পিতাও তাঁর সঙ্গে থাকতে শুরু করেন। যৌথ পরিবারের অস্বাস্থ্যকর মানসিক পরিবেশের বলয় থেকে যেন তাঁর মুক্তি ঘটে।

“পারিবারিক মালিন্য থেকে মুক্ত হয়ে তিনি যেন স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেললেন। তাঁর লেখায় পারিবারিক জীবন, তাদের মানসিক দিক, ভাঙন, স্বাভাবিক বোধ সব-ই পুষ্পানুপুঙ্খভাবে এসেছে।
২৫ নভেম্বর সম্মেলনে চাষী বৌয়ের নির্ভীক, সংকোচহীন, স্পষ্ট বক্তৃতায় তিনি বিস্মিত হন। তাঁর লেখায় বলিষ্ঠ নারী চরিত্র পাওয়া যায়। বেঁচে থাকার সংগ্রামে যারা অকুতোভয়ে ঝাঁপিয়ে পড়েছে। বাস্তবজীবনই তাঁর লেখার অবলম্বন। তিনি ‘গল্প লেখার গল্প’ প্রবন্ধে বলেছেন:
“কলেজ থেকে তখনকার বালিকা বালীগঞ্জের বাড়িতে ফিরতাম, আলোহীন, পথহীন অসংস্কৃত জলার মতো লেকের ধারে গিয়ে বসতাম চেনা অচেনা কোন একটি প্রিয়ার মুখ স্মরণ করে একটু চলতি কাব্যরস উপলব্ধি করার উদ্দেশ্যে। ভেসে আসতো নিজের বাড়ির আত্মীয়-স্বজন আর পাড়াপড়শীর মুখ, জীবনের অকারণ জটিলতায় মুখের চামড়া যাদের কুঁচকে গিয়েছে।
ভেসে আসতো স্টেশনে ও ট্রেনে ডেলি প্যাসেঞ্জারদের মুখ তাদের আলাপ আলোচনা, ভেসে আসতো কলেজে সহপাঠীদের মুখ-শিক্ষার খাঁচায় পোরা তারুণ্য-সিংহের সব শিশু, প্রাণশক্তির অপচয়ের আনন্দে যারা মশগুল। তারপর ভেসে আসতো খালের ধারে, নদীর ধারে, বনের ধারে বসানো গ্রাম-চাষী, মাঝি, জেলে, তাঁতিদের পীড়িত ক্লিষ্ট মুখ। ২৬
তিনি আরো বলেছেন, এই সকল মধ্যবিত্ত আর চাষাভুষো মুখগুলো মুখর অনুভূতি হয়ে চ্যাঁচাতো- ‘ভাষা দাও-ভাষা দাও।’ মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় সাহিত্যকর্মে সকল শ্রেণির ভাষা জুগিয়েছেন।
সমাজের উপরতলার লোভী মানুষদের তিনি ক্ষমা করেন নি, উচ্চবিত্তদের দিকে তাকিয়ে যে মধ্যবিত্ত হাহুতাশ করে তাদের তিনি করুণা করেছেন। নিম্নবিত্ত মেহনতি মানুষের প্রতি-ই তাঁর মমতা ও সহানুভূতি। অনেক ছোটগল্প-উপন্যাসের বিষয়বস্তু বিকৃতবুদ্ধি ও বিভ্রান্ত মানুষ। এদের তিনি আঘাত করেছেন। সমাজের নানা অসঙ্গতি, বিচ্যুতি সম্পর্কে তাঁর অশ্রদ্ধা ছিল। কিন্তু তিনি তাদের ব্যঙ্গ করেন নি, তাদের জন্য তাঁর বেদনা ছিল।
প্রকৃতপক্ষে, তাঁর মানস বৈশিষ্ট্যই আলাদা। তিনি ঘটনার উপর থেকে না দেখে ভেতরে প্রবেশ করে জটিল আবহ তুলে ধরেছেন। তাই নদী নিয়ে কবিতা না লিখে লিখেছেন ‘পদ্মানদীর মাঝি’ উপন্যাস। তীরবর্তী জেলে সম্প্রদায়ের মানবেতর জীবনযাপন এবং তাঁদের স্বচ্ছলতার স্বপ্ন ‘ময়নাধীপ’। তিনি তাঁর সময়ের সময়কেই অঙ্কন করেছেন।
স্বাধীনতা-উত্তরকালে শোষিত শ্রেণিগুলো এক একটি সামাজিক অবস্থান থেকে বেরিয়ে আসার জন্য প্রতিপক্ষ শ্রেণির বিরুদ্ধে সংগ্রামশীল ছিল। এই সমাজ বাস্তবতাকে মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় গল্প-উপন্যাসে তুলে ধরেছেন এবং সমাজ জীবনের ভাঙনের সঙ্গে তিনি পুনর্গঠনের বিষয়ে আশাবাদী হয়ে কাজ করার প্রেরণা জুগিয়েছেন:
“প্রতিবাদী সাহিত্যে মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় সৃষ্টি করলেন নতুন আদর্শ, নতুন সমাজ ও শ্রেণী চেতনা। ২৭
১৯৪৮-৪৯ সালে লেখক, শিল্পী, সংস্কৃতিকর্মীদের ওপর সরকারি আক্রমণ শুরু হয়। তাঁদের বক্সা ক্যাম্পে বিনা বিচারে আটকে রাখে সরকার। এ সময় কৃষকদের তেভাগা আন্দোলন জোরদার হয়ে ওঠে। মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় বড়া-কমলাপুরে গিয়ে স্বচক্ষে পুলিশী সন্ত্রাস দেখে আসেন। এই পটভূমিতে তিনি লেখেন ‘ছোট বকুলপুরের যাত্রী।
সন্ত্রাসের হুমহুমে আবহাওয়া মূর্ত হয়ে উঠেছে এর নাম গল্পে। মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের মন সর্বক্ষণ কৌতূহলী এবং সন্ধানী। বক্সা ক্যাম্প থেকে ফিরে চিন্মোহন সেহানবিশসহ অনেকে তাঁকে কৃতজ্ঞতা জানাতে গেলে তিনি সে দিকে মনোনিবেশ না করে অতি আগ্রহে জেলখানার গল্প শুনতে ব্যস্ত হয়ে ওঠেন। বক্সা ক্যাম্পে বন্দীদের সঙ্গে একাত্মতার জন্য এ সময় অনেক প্রকাশকের দরোজা তাঁর জন্য বন্ধ হয়ে যায়।
এমন কি সাময়িকী পত্রিকার পূজা সংখ্যাগুলোও তাঁর থেকে মুখ ফিরিয়ে নেয়। এতেও তাঁর মানসিক অবস্থা ছোট হয়ে যায় না। তিনি নিজের মতো উদারই থাকেন। অনিলকুমার সিংহ জানিয়েছেন, ‘শারদীয়া নতুন সাহিত্যের জন্য গল্প চেয়ে সেটা আবার তিনি মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়কে ফেরৎ পাঠান। এ সময় মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় খুব চটে যান। পরে অনিলকুমার সিংহ তাঁর বাড়িতে এলে তিনি নিজস্ব বৈশিষ্ট্যে অবিচল থাকেন। এ বিষয় সম্পর্কে মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের প্রতিক্রিয়া অনিলকুমার সিংহ বলেছেন।
“লেখা ফেরত দেবার অধিকার আপনার আছে। কিন্তু তাই বলে আমার লেখা আপনি পিওন দিয়ে ফেরত পাঠাবেন? নিজে আসতে পারলেন না? তারপরই কমলাদিকে চা করতে বলে গরম সিঙ্গাড়া আনতে বেরিয়ে গেলেন। বরানগরের বাড়িতে গেলে এই সিঙ্গাড়া তিনি প্রায়ই খাওয়াতেন।”
শান্তির পক্ষে মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়েরদৃপ্ত পদচারণা। তাঁর সমস্ত লেখাই জীবনমুখী। ব্যক্তিগত জীবনে তিনি সকল ভালো কাজের সঙ্গে যুক্ত থেকেছেন। আণবিক অস্ত্রের প্রয়োগ নিষিদ্ধ করার দাবি নিয়ে স্টকহলম শান্তি আবেদনের পক্ষে যে স্বাক্ষর সংগৃহীত হয় তাতে মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ও স্বাক্ষর করেছিলেন। মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় কমিউনিস্ট পার্টির সকল কাজেই যোগ দিতেন। মার্কসবাদ সম্পর্কে ছিল তাঁর অপরিসীম শ্রদ্ধা এবং নির্ভরশীলতা। মার্কসবাদ সম্পর্কে তাঁর সুস্পষ্ট বক্তব্য:
“মার্কসবাদই যখন মানবতাকে প্রকৃত অগ্রগতির সঠিক পথ বাতলাতে পারে, অতীত কি ছিল, বর্তমান কি হয়েছে এবং কিভাবে কোন ভবিষ্যৎ আসবে জানিয়ে দিতে পারে তখন মার্কসবাদ সম্পর্কে অজ্ঞ থেকে সাহিত্য করতে গেলে এলোমেলো উল্টাপাল্টা অনেক কিছু তো ঘটবেই।
মার্কসবাদই আবার আমাকে এটাও শিখিয়েছে যে, এজন্য আপশোষ করলেও নিজেকে ধিক্কার দেবার প্রয়োজন নেই। মার্কসবাদের সঙ্গে পরিচিত হবার আগে কেন সাহিত্য করতে নেমেছিলাম ভেবে আত্মগ্লানি বোধ করলে সেটা মার্কসবাদের শিক্ষার বিরুদ্ধেই যাবে, যান্ত্রিক একপেশে বিচারে সৃষ্টি হবে আরেকটা বিভ্রান্তির ফাঁদ | 26 ১৯৫৩ সালের ৫ই মার্চ জোসেফ স্তালিন মৃত্যুবরণ করেন। স্তালিনের মৃত্যুতে মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় গভীরভাবে শোকাহত হন। ‘পরিচয়’ পত্রিকার বিশেষ সংখ্যায় তিনি ‘মহামানব স্তালিন’ প্রবন্ধ লেখেন। সেখানে তিনি বলেছেন:
“আলিনের মতো মহামানবের মৃত্যুর প্রভাব পর্যন্ত জীবিতের উপর হয় অভিনব। তাই, তাঁর জন্য শোক অনুভব করার মধ্যে পর্যন্ত আমরা মহত্তর প্রেরণা পাই, কর্তব্য করে যাওয়ার সঙ্কল্প দৃঢ়তর করার শক্তি পাই। ”
মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় জীবনে স্থবিরতার আমদানি করেন নি, নিষ্ঠা এবং সততার সঙ্গে তিনি জীবন সত্য আবিষ্কারের দিকে এগিয়েছেন। মানুষকে টিকিয়ে রাখার জন্য ‘শুভাশুভ’ উপন্যাসে ধনাঢ্য ব্যবসায়ী পরিবারকে ভাঙতে ভাঙতে শ্রমজীবী পরিবারে পরিণত করেছেন। তিনি জীবন এবং কর্মে আপসহীন। অন্যরা যখন সংসারের অনিয়ম-অব্যবস্থার সঙ্গে মানিয়ে চলেছে, মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় তখন আপসহীন সংগ্রামে ক্ষত-বিক্ষত হয়েছেন। একদিকে সাংসারিক দারিদ্র্য, অন্যদিকে প্রকাশকদের অসহযোগিতা এর ভেতরে শারীরিক অসুস্থতা মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় অবিচল নাবিকের মতো হাল ধরে থাকেন।
নিজেকে সুস্থ করার চেষ্টা করেন, লিখে টাকা উপার্জনের চেষ্টা করেন। এই দুরাবস্থায়ও তিনি দেশের দশের চিন্তা করেন। সকলের সঙ্গে তাঁর হৃদ্যতা অপরিসীম। তিনি নবীনদের উৎসাহ দিতে তাদের বৈঠকে যেতেন, তাদের জন্য সৃষ্টিশীল গঠনমূলক কিছু করতে চাইতেন। প্রসুন বসু ছোটদের পত্রিকা প্রকাশের কথা তাঁকে বললে, তিনি উৎসাহিত হয়ে ওঠেন
“[… ….. সবাইকে অবাক করে মানিকবাবু আমার পিঠে সজোরে হাত রেখে বললেন, সাবাস, এই তো চাই। ঠিকই ভেবেছ তোমরা। ছোটদের জন্যে সত্যিই কিছু করা দরকার। প্যানপ্যানানি নাকে কান্না আর ভুতুড়ে গল্প দিয়ে ছোটদের কিছু হবে না । ৩১
তাঁর ধারণা সকল সময়ই স্বচ্ছ। বাস্তবতাকে বাদ দিয়ে কল্পনার উপর ভর করে উপন্যাস লেখা যায় না।
তিনি সকল অবস্থাতেই বাংলা, বাংলাসাহিত্য এবং বাংলার মানুষের চিন্তা করতেন। ১৯৫৫ সালে ইসলামিয়া হাসপাতালে চিকিৎসাধীন সময়ে তিনি ভবানী মুখোপাধ্যায়বে বলেছিলেন:
“যাই বলো বাস্তবের রাজত্ব ছেড়ে পিছু হটে কল্পনার ক্ষেত্রে চলে গিয়ে পিরিয়ডের রোমান্টিক কাহিনীতে কৃতিত্ব থাকতে পারে গবেষকের, কিন্তু তাতে শিল্পীর পরিচয় পাওয়া যাবে না। মাল-মসলা জোগার করে ঠিকাদারের বাড়ি তৈরির মত ইটের স্তুপ হবে। তার মধ্যে শিল্প-নৈপুণ্য কোথায়? আশেপাশের মানুষকে ছেড়ে দিয়ে যাদের কখনো দেখিনি শুনিনি তাদের ব্যথা-বেদনার কি ইতিহাস লিখবো আমরা?”
তাঁর গল্প-উপন্যাসের চরিত্রগুলো একা, বিচ্ছিন্ন মানুষ। প্রতিটি চরিত্রই আলাদা- সুখ-দুঃখের অংশীদার কেউ হয় না, বরং রেষারেষি থাকে, আঘাত করার জন্য উন্মুখ। এটাই জীবনের ধর্ম।
চলার পথে জনবহুল আবেষ্টনীর মধ্যে মানুষ একা। তাঁর ডায়েরিতে তিনি সবচেয়ে বড় সত্য উচ্চারণ করেন।
“আমি তো চিরদিন একা.৩৩
এই একাকিত্বকে মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় উপভোগ করেছেন- এর কোনো যন্ত্রণা উপলব্ধি করেন নি। বরং সৃষ্টিশীল কর্মে মগ্ন থেকেছেন।

মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের বিজ্ঞানের সঙ্গে আত্মীয়তা প্রথম থেকে। তাঁর সকল চিন্তা-চেতনা- বিশ্বাস বিজ্ঞাননির্ভর। বিজ্ঞানের সঙ্গে সাহিত্যের কোনো বিরোধ তিনি স্বীকার করেন নি। তিনি বলেছেন:
“[… …. এ যুগে বিজ্ঞান বাদ দিয়ে সাহিত্য লেখা অসম্ভব, তাতে শুধু পুরানো কুসংস্কারকেই প্রশ্রয় দেওয়া হবে।
বিজ্ঞান বলেই তিনি ফ্রয়েডীয় তত্ত্বকে গ্রহণ করেন। তাঁর প্রথম দিকের লেখায় ফ্রয়েডীয় মনোবিকারমূলক বিশ্লেষণ রয়েছে। এরপর তিনি মার্কসবাদকে বিজ্ঞান বলেই গ্রহণ করেন এবং আমৃত্যু মার্কসবাদের ওপর বিশ্বাস রেখেছিলেন। তাঁর মতে বর্তমান কালে জনতার দাবি লেখক-কবি-বৈজ্ঞানিকের একাকার হওয়ার দাবি। তিনি বলেছেন, বৈজ্ঞানিকরা টের পাচ্ছে তাদেরকেও কবিসাহিত্যিকদের মতো জনতাকে ভালোবাসতে হবে। কবি-সাহিত্যিকদের সম্পর্কে বলেছেন:
“… […] লেখক-কবিও টের পাচ্ছেন যে, নিছক হাসি-কান্নার আরক আর ভূমার মূলধনে প্রেম চলবে না মানুষের সঙ্গে, বৈজ্ঞানিকের মতো মানুষের রোগ উপবাস লড়াই নিয়ে গবেষণা করা ছাড়া উপায় নেই।’৩৫
তাঁর মতে কবিতার সঙ্গে বৈজ্ঞানিকের সম্পর্ক খুঁজে বের করা দুঃসাধ্য, তিনি বলেনঃ “সাহিত্যের ক্ষেত্রে উপন্যাস হলো সভ্যতার অগ্রগতির ক্ষেত্রে বিজ্ঞানের প্রত্যক্ষ অবদান। ৩৩৬
তিনি বলেছেন, বিজ্ঞান নতুন নতুন আবিষ্কারে সমাজ, জীবন ও মানুষের চেতনাকে বদলে দেয়। এই নতুন চেতনায় সাহিত্যিকের কাছে নতুন চাহিদা জন্ম নেয়, সাহিত্যিক নতুন আঙ্গিকে উপন্যাস রচনা করেন। বিজ্ঞানকে, বস্তুবাদি চেতনাকে উপেক্ষা করতে না পেরে যুক্তিবাদের সাহায্যে উপন্যাসের নতুনধারা শুরু হয়।
নিজের জীবনকে তিনি যুক্তিতর্কের ঊর্ধ্বে রাখেন নি। তাই প্রথম গল্পেই তিনি নিজের নাম নিয়ে চিন্তা করেছিলেন। তাঁর মতে ‘অতসীমামী’র মতো উচ্ছ্বাসময় নিছক পাঠকের মন ভুলানো গল্পে নিজের পোশাকী নাম ‘শ্রীপ্রবোধকুমার বন্দ্যোপাধ্যায়’ না দিয়ে ডাক নাম ‘মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়” দিলেন।
তিনি ‘গল্প লেখার গল্পে জানিয়েছেন, পরে ভালো লেখা লিখলে প্রবোধ নামে লিখবেন। কিন্তু ‘মানিকের ‘মানিক’ নামটিই রয়ে গেলো চিরন্তন। প্রাণেশ্বরের উপাখ্যান’ উপন্যাসে নামের ব্যাপারে তাঁর সুচিন্তিত মতামত পাওয়া যায়, এতে তাঁর মানসবৈশিষ্ট্যও ফুটে ওঠে:
“যার নামের ঠিক নেই, তার গুণ থাকে? যারা মানুষ করবে তারাই তো নাম দেবে? ছেলের ভালো একটা নাম যারা দিতে পারবে না, তারা কোন গুণে গুণী করতে পারবে ছেলেটাকে? যেমন ধরো, একজন খুব নামকরা লোকের নাম মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়। নামটার কোনো মানে হয়? নামটা আর উপাধিটা জগতের কোনো ভাষায় কোনো ব্যাকরণে টিকতে পারে না।
তবু, মানুকে শর্মা নাম নিলেও লোকটার নাম হত। কেন জানিস? লোকে জানে এটা ছদ্মনাম। এটা বিনয়ের প্রমাণ- আরেকটা গুণের প্রমাণ। যে গুরুতর কাজে নামলাম, যে কাজ অনেকে প্রাণ দিয়েও ঠিকমতো করতে পারে না, যে কাজ করতে পারলে খুব নামডাক হয় আর না করতে পারলে নিন্দা হয়- সে কাজ করতে নেমে নিজের নাম জাহির করার কী দরকার।
তার মানেই সাহস নেই নিজের নামটা জাহির করার। প্রশংসা হয় ভালো, না হলেও কেউ জানবে না। লেজ গুটিয়ে ফিরে আসা যাবে। তা নয় রে, তা নয়। এটা বিনয়ের লক্ষণ। আত্মীয়স্বজনের মান রাখা। একটু নাম হলেই কম বয়েসি বন্ধুরা মাথায় তুলে নাচবে-এ লোভটা সামলাতে হয়।
মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় জীবন ও শিল্পকে এক করে দেখেছেন। তাঁর মানস গঠনে বিজ্ঞানবোধই প্রধানতম উপাদান। তিনি বিজ্ঞানের ছাত্র ছিলেন। মানবজীবনের প্রতিটি দিককে বৈজ্ঞানিক দৃষ্টিকোণ থেকে বিশ্লেষণ করেছেন। বৈজ্ঞানিকভাবেই মানুষের মুক্তির পথ খুঁজেছেন। সাহিত্য পড়ে তিনি বাস্তব জীবনের সঙ্গে মিলাতেন, বাস্তব আর সাহিত্যের অসঙ্গতি তাঁকে পীড়া দিত, তাঁর মানস জগত বাস্তবসত্য প্রকাশের জন্য উদ্বেলিত হতো, তিনি মনে মনে দৃঢ় প্রতিজ্ঞ হতেন, একদিন লেখক হবেন, সাহিত্যের দীনতা দূর করবেন।
তাঁর প্রচেষ্টা ছিল শুধুমাত্র বাস্তব জগতের সারল্য-জটিলতা কাঠিণ্য-পাশবিকতাকে তুলে ধরা। তাঁর পর্যবেক্ষণ দক্ষতা, সত্যপ্রকাশের দৃঢ়তা, বৈজ্ঞানিক দৃষ্টিভঙ্গি এবং পঠিত সাহিত্যের প্রতি অসন্তোষ ইত্যাদি তাঁর মানস জগতে নতুন বোধের সঞ্চার করেছে। সেই বোধকে সাহিত্যে প্রকাশের মাধ্যমে তিনি সমকালীন শ্রেষ্ঠ ঔপন্যাসিকের মর্যাদা পেয়েছেন।