আজকে আমাদের আলোচনার বিষয়: মহাকাব্য শিল্পশৈলীর উপন্যাস। এটি বাংলাদেশের উপন্যাসের শৈলীবিচার এর মহাকাব্য শিল্পশৈলীর উপন্যাস এর অন্তর্গত।

মহাকাব্য শিল্পশৈলীর উপন্যাস
উপন্যাস বিবেচনায় সমালোচকগণ নানা সময়ে কিছু উপন্যাসকে মহাকাব্যিক উপন্যাস হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন। যদিও মহাকাব্যিক উপন্যাসের সংজ্ঞা ও স্বরূপ সম্পর্কে কোনো সুনির্দিষ্ট অভিমত পাওয়া যায় না, তবুও স্পষ্ট বোঝা যায়, প্রাচীন মহাকাব্যের চারিত্র্য লক্ষণের সঙ্গে উপমিত করে কিছু উপন্যাসকে মহাকাব্যিক উপন্যাসের আখ্যা দেয়া হয়েছে।
প্রাচীন মহাকাব্য থেকে মধ্যযুগে রোমান্সের পথ অতিক্রম করে আধুনিক যুগের অনিবার্য শিল্পাঙ্গিক যে উপন্যাস তার সৃষ্টির নেপথ্যে রয়েছে শিল্পবিপ্লবোত্তর আধুনিক সমাজ। মানব সভ্যতার যে স্তরে গতি ও গদ্যের আবির্ভাব সমাজ বিকাশের এই পর্ব থেকেই আধুনিকতার সূত্রপাত বলে ইতিহাসবিদরা মনে করেন। আধুনিকতার এই বোধ ও অভিজ্ঞতা অর্জনের সঙ্গে সঙ্গে খুলে যায় মানুষের চারপাশের বোধের দরজা, বহু দিগন্ত, যুক্ত হয় অবলোকনের নতুন মাত্রা।
প্রজ্ঞা ও প্রচেষ্টা দিয়ে গদ্যের মাধ্যইে মানুষ হাজির করে জীবন ও জগতের যুক্তিপূর্ণ ব্যাখ্যা। গদ্যের আবির্ভাবে সঙ্গে উপন্যাসের উদ্ভব তাই কোনো আকস্মিক ঘটনা নয়, কারণ গদ্যই ধারণ করেছিল একই সঙ্গে অনেক মানুষের শ্রুতি ও চেতনা। গদ্যের গর্ভেই উপন্যাসের ভ্রূণ সুপ্ত ছিল। উপন্যাসকে তাই বলা যায়, মহাকাব্যের মহিমাদ্রষ্ট সন্তান।
আধুনিক সমাজে উপন্যাস, মহাকাব্যের স্থান দখল করলেও মানুষের মন থেকে মহাকাব্যের মহিমা পরিপূর্ণভাবে মুছে যায় নি। উপন্যাস লিখতে গিয়ে মানুষ মহাকাব্যের বিশালতা, প্রলম্বিত কাহিনী ও নায়কোচিত চরিত্রের কথা স্মরণ করেছেন। পটভূমি ও যুগমানস সঞ্চার করে উপন্যাসকে দান করেছেন মহাকাব্যিক মহিমা। কারণ, উপন্যাসের লক্ষ্য মানুষের সমগ্র জীবন। Ralf Fox বলেছেন :
‘The novel is not merely fictional prose, it is the prose of man’s life, the first art to attempt to take the whole man and give him expression.”

উপন্যাস কেবল মানব জীবনের গণ্য নয়, মানব জীবনকে সমগ্রভাবে গ্রহণ করার শিল্পরূপই হলো উপন্যাস। ‘সমগ্র জীবন বলতে মানুষের অন্তর্ধশ্বময়, বিচিত্র, বহুভুজ ব্যক্তিজীবন এবং পরিবর্তমান সমাজ সময়ের স্রোড়ে নিত্যসংকটদীর্ণ বস্ত্রময় বর্হিজীবনকে বোঝায়। কিন্তু অধিকাংশ উপন্যাসেই মানবজীবনের সামগ্রিকতা খুঁজে পাওয়া যায় না। মুষ্টিমেয় যে সব উপন্যাসে মানুষের ব্যক্তিজীবন ও সমাজ জীবন বিস্তীর্ণ পরিধির মধ্যে শিল্পরূপ লাভ করে, সেখানেই প্রকাশিত হয় মানুষের ‘সমগ্রজীবন’।
এই উপন্যাসসমূহকেই প্রাচীন মহাকাব্যের সঙ্গে উপমিত করে বলা হয়েছে মহাকাব্যিক উপন্যাস। W. Somerset Maugham তাঁর Ten novels and their Authors (১৯৫৪) গ্রন্থে মহাকাব্য শৈলীর উপন্যাসের আদর্শ দৃষ্টান্ত হিসেবে জেন অস্টিনের ‘প্রাইড এ্যান্ড প্রেজুডিস’ এবং লিও তলস্তয়ের ‘ওয়ার এ্যান্ড পীস’ উপন্যাসের কথা উল্লেখ করেছেন। মম বলেছেন:
‘War and Peace is surely the greatest of all novels. It could only have been written by a man of high intelligence and of powerful imagination, a man with wide experience of the world and a penetrating insight into human nature. No novel with so grand a sweep, dealing with so momentous a period of history and with so vast an array of characters, was ever written before; nor I surmise, will ever be written again.
Novels as great will perhaps be written, but none quite like it. With the mechanization of life, with the state assuming ever greater power over the lives of men, with the uniformity of education. the extinction of class distinctions and the diminution of individual wealth, with the equal opportunities which with he offered to all (if such is the world of the future) men will still be born unequal.

সমাজ, সময় ও ইতিহাসের বিচিত্র উপাদানের সম্মিলনে, ঘটনা ও চরিত্রের অভূতপূর্ব বিন্যাসে ‘ওয়ার এ্যান্ড পাস’ চিরায়ত শিক্ষাদর্শের মানে উন্নীত। অর্থাৎ ঔপন্যাসিক যখন নির্লিপ্ত প্রেক্ষণবিন্দু নিয়ে জীবনের সার্বজনীন, সামগ্রিক রূপকে প্রকাশ করনে, তখনই উপন্যাস, মহাকাব্যিক হয়।
সমালোচকদের” বিবেচনায় বাংলা উপন্যাস সাহিত্যে রবীন্দ্রনাথের ‘গোরা’ (১৯০৯) বিভূতিভূষণের ‘পথের পাঁচালী’ ‘অপরাজিত’ (১৯২৯) তারাশঙ্করের ‘গণদেবতা’ চণ্ডীমরূপ’ ‘পঞ্চগ্রাম’ (১৯৪৩-৪৪) অন্নদাশঙ্করের ‘সত্যাসত্য” (১৯৩২-৪২) সতীনাথ ভাদুড়ীর ‘টোঁড়াই চরিতমানস’ (১৯৪৯-৫১) এবং দেশ বিভাগোত্তর (১৯৪৭) বাংলাদেশের পটভূমিতে রচিত শহীদুল্লা কায়সারের ‘সংশপ্তক’ (১৯৬৫) আলাউদ্দিন আল আজাদের ‘ক্ষুধা ও আশা’ (১৯৬৪) আবু জাফর শামসুদ্দীনের ‘পদ্মা মেঘনা যমুনা’ (১৯৭৪) আবু ইসহাকের ‘পদ্মার পালিদ্বীপ’ (১৯৮৬) রিজিয়া রহমানের বং থেকে বাংলা’ (১৯৭৮) ইত্যাদি এপিকধর্মী বা মহাকাব্যিক উপন্যাস।
আমাদের আলোচ্য কালপর্ব যেহেতু ১৯৪৭ সালে ভারত বিভাগ থেকে ১৯৭১ সালে বাংলাদেশ স্বাধীনের পূর্ব পর্যন্ত এবং এই সময় পরিসরে প্রকাশিত মহাকাব্য শৈলীর উপন্যাস, শহীদুল্লা কায়সারের ‘সংশপ্তক’ এবং আলাউদ্দিন আল আজানের ‘ক্ষুধা ও আশা’ । সঙ্গত কারণেই এদুটি উপন্যাসের আলোচনাই আমরা এখানে উপস্থিত করছি।
ভারত বিভাগোত্তর (১৯৪৭-৭১) কালপর্বে বাংলাদেশের ঔপন্যাসিকরা আপন সমাজের সংস্কৃতি, রাজনীতির দ্বন্দ্বম পরিস্থিতি ও জীবন জিজ্ঞাসার প্রশ্নে মহাকাব্য শৈলীর (epic form) উপন্যাস রচনায় উৎসাহী হন। এই নবধারা উদ্ভাবনার পেছনে জাতিসত্তার সমকালীন বহুকৌণিক সংকটচেতনার ভূমিকাই মুখ্য।
সময় ও ইতিহাসের পটে ব্যক্তি ও সমষ্টির সংগ্রামশীল জীবন-অবলোকনের মধ্য দিয়ে বাঙালির আত্মসন্ধান, সপ্তসিন্ধান ও জাতিসত্তাসন্ধানকে ইতিহাসের মূলধারায় স্থাপন করার ক্ষেত্রে এপিকধর্মী উপন্যাসের উপযোগিতা সর্বাধিক” সময়ের ক্রমবর্ধমান চাহিদা, মহাকাব্যের এই শিল্পায়তনিক ফর্মকে অনিবার্য করে তুলে ছিল।

আলোচ্য কালপর্বে মধ্যবিত্ত শ্রেণীর রাজনৈতিক সচেতনতা, বাঙালী জাতীয়তাবাদী আন্দোলন জনজীবনকে তরঙ্গায়িত করেছিল। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ (১৯৩৯-৪৫), দুর্ভিক্ষ (১৯৪৩), দাঙ্গা (১৯৪৬) দেশ বিভাগের (১৯৪৭) পটভূমিতে ব্যক্তি ও সমষ্টি জীবনের সংকট ও যুগমানস সঞ্চারে শহীদুল্লা কায়সারের ‘সংশপ্তক’ মহাকাব্য শৈলীর সচেতন শিল্প প্রয়াস। আমাদের কথাসাহিত্যে এপিক ফর্মের উপন্যাস রচনায় যে প্রতিশ্রুতি হুমায়ুন কবিরের ‘নদী ও নারী’তে উৎসারিত হয়েছিল, শহীদুল্লা কায়সারের (১৯২৬-১৯৭১) ‘সংশপ্তক’ (১৯৬৫)-এ তার সিদ্ধি।
গ্রাম ও নগর জীবনের সুবৃহৎ ক্যানভাসকে উপন্যাসের পটভূমি হিসেবে ব্যবহার করে সামন্ত সমাজের অবক্ষয় এবং মধ্যবিত্তশ্রেণীর উত্থান প্রক্রিয়াকে ‘সংশপ্তক’। এ বিন্যাপ্ত করেছেন লেখক। যুগচেতনা, শিল্পচেতনা এবং জীবনচেতনার সমন্বিত বিন্যাসে জীবনের সমগ্রতা এ উপন্যাসে হয়ে উঠেছে আন্দোলিত, স্পন্দিত।৬
ঔপন্যাসিকের সর্বজ্ঞ দৃষ্টিকোণ (omniscient point of view) প্রয়োগই মহাকাব্য শৈলীর উপন্যাসের ক্ষেত্রে সচেতন শিল্পসূত্র। শহীদুল্লা কায়সার, ‘সংশপ্তক’ উপন্যাসে ঔপন্যাসিকের এই সর্বজ্ঞ দৃষ্টিকোণ সফলভাবে প্রয়োগ করেছেন।