মরা ময়ূরের শৈলিবিচার রচনাটি সৈয়দ শামসুল হকের কাব্যনাটক : ইতিহাস, সমাজ, রাজনীতি ও শিল্প [পিএইচডি অভিসন্দর্ভ] এর অংশ। গবেষনাটির অথোর জান্নাত আরাসোহেলী। এই অভিসন্দর্ভের (পিএইচডি) বিষয় বাংলা নাটক – ইতিহাস ও সমালোচনা। প্রকাশিত হয়েছিল বাংলা বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, শিক্ষাবর্ষ: ২০১৭-২০১৮। গবেষণাকর্মটি সাহিত্যের শিক্ষার্থীদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ হওয়ায় আমরা সাহিত্য গুরুকুলে পুন-প্রকাশ করলাম।

মরা ময়ূরের শৈলিবিচার
সৈয়দ শামসুল হকের মরা ময়ূর কাব্যনাটকটি একটি দৃশ্য ও তিনটি মাত্র চরিত্রে সমাপ্ত হলেও নাট্যকার তাঁর অনন্য মেধাগুণে এর মধ্যে পঞ্চাঙ্ক নাটকের যাবতীয় বৈশিষ্ট্যের সন্নিবেশ ঘটিয়েছেন। এছাড়া প্রতিটি চরিত্রের সামাজিক পরিচিতির পাশাপাশি তাদের অভ্যন্তরীণ মানসসংকটের এমন বাস্তব উপস্থাপন ঘটিয়েছেন যে, স্বল্পপরিসরের এ নাটকটির মধ্যেও একটি শিল্পসফল কাব্যনাটকের যাবতীয় গুণাবলি পরিস্ফুট হয়েছে।
এ নাটকের তিনটি চরিত্র একই সমাজকাঠামো থেকে উদ্ভূত। ধাঙড়, ধাঙড় সর্দার ও নারী চরিত্র সবাই অন্ত্যজ সমাজভুক্ত। কিন্তু সামাজিক বিনষ্টি আর অস্থির রাজনৈতিক পরিবেশের অভিঘাতে তাদের জীবনেও ধীরে ধীরে পরিবর্তন এসেছে। নাট্যকার অত্যন্ত সুচারুরূপে পরিবর্তনের এই বিষয়টি চরিত্রায়ণ কৌশলে যুক্ত করেছেন। ধাঙড় সর্দার অতীতে যেহেতু ধাঙড়ের জীবনযাপন করেছে, তাই সে প্রকাশ্যে কঠোরতার মুখোশ পরে থাকলেও ভেতরে ভেতরে ধাঙড়ের প্রতি সহানুভূতিশীল। সামাজিক শ্রেণিবাস্তবতায়, নিজের অস্তিত্বরক্ষার প্রয়োজনে সেও আজ সর্দারের (শাসক) ভূমিকায় অভিনয় করে যাচ্ছে। অন্যদিকে নারীচরিত্রটি একসময় ছিল গ্রামের সরলাবধূ।
দারিদ্র্যের কশাঘাতে এক বুক স্বপ্ন নিয়ে সে ধাঙড়ের সঙ্গে এই শহরে পা রেখেছিল। কিন্তু অচিরেই সে চিনে ফেলে নাগরিক জীবনের কুৎসিত রূপ। ফলে এই কুৎসিত ও ক্লেদপঙ্কিল জীবন থেকে মুক্তি পাওয়ার আকাঙ্ক্ষায় ধাঙড়কে ছেড়ে পালিয়ে যায় সমাজের উঁচুতলার এক গাড়িওয়ালার সঙ্গে ।

মরা ময়ূর কাব্যনাটকটি বাংলাদেশের মঞ্চে প্রথম আনে নাট্যদল চারুনীড়ম। এটি চারুনীড়ম প্রযোজিত দ্বিতীয় নাটক। চারুনীড়ম নাট্যদল সাধারণত নিরীক্ষাধর্মী রচনা নিয়ে মঞ্চে কাজ করতে ভালোবাসে। ফলে সৈয়দ শামসুল হকের সমকাল সমাজ, রাজনীতি নিয়ে এমন নিরীক্ষাধর্মী রচনা এ নাট্যদলের দৃষ্টি আকর্ষণে সহজেই সক্ষম হয়েছিল।
জাতীয় শিল্পকলা একাডেমীর পরীক্ষণ থিয়েটার হলে ২০১৩ সালে নাটকটি প্রথমবারের মতো মঞ্চস্থ হয়ে দর্শক সমালোচকের দৃষ্টি আকর্ষণ করে। তবে এই নাটকটি যেহেতু নাট্যকার প্রথম ইংরেজি ভাষায় রচনা করেছিলেন, তাই চারুনীড়ম তাদের প্রযোজিত নাটকে দুটিভাষারূপই পরিবেশন করে থাকে। নির্দেশক গাজী রাকায়েত তাঁর নান্দনিক নির্দেশনাগুণে নাটকটি অত্যন্ত সাবলীলরূপে মঞ্চে উপস্থাপন করতে সক্ষম হয়েছেন। একঘণ্টা পনেরো মিনিট ব্যাপ্তির এ নাটকটি তিনি বিরতিহীনভাবে পরিবেশন করিয়েছেন।
প্রথমে ইংরেজি ভাষায় মূল নাটক :- The Dead Peacock পরিবেশনের পর বিরতি দিয়ে একই অভিনেতা-অভিনেত্রী নাটকটির বাংলা রূপান্তর মঞ্চে উপস্থাপন করেন। ফলে নাটকটির মধ্যে একটি আন্তর্জাতিক প্রচ্ছায়া ফুটে ওঠে। বস্তুত এ নাটকে নাগরিক মানসের যে পঙ্কিলতা, বিবেকহীনতা, রাজনৈতিক শঠতা দেখানো হয়েছে সেটি নির্দিষ্ট দেশ-কাল-সমাজকে অতিক্রম করে এক বিশ্বজনীন সংকটকে উপস্থাপন করেছে। ফলে নাটকটির ইংরেজি-রূপ আন্তর্জাতিক দর্শক মহলেও সমান দৃষ্টি আকর্ষণে সমর্থ হয়েছে।
নাট্যদল চারুনীড়ম নাটকটির জন্য যে পোস্টার বানিয়েছিল, সেখানে দেখা যায় – ময়লার স্তূপকে ঘিরে একদল কাক উড়ছে, পাখা ঝাপটাচ্ছে; অন্যদিকে ময়লার স্তূপকে কোনোমতে পাশ কাটিয়ে উপরে উঠে এসেছে একটি হাত। সেটি এমন একটি হাত, যেটি কোনো কিছু আঁকড়ে ধরে বাঁচার প্রত্যাশা করছে। বস্তুত, এই পোস্টারটির মাধ্যমেই উপস্থাপিত হয়েছে নাটকের মূল সার ও সুর।
সমাজের নিম্নবিত্ত মানুষগুলো যে জীবনের পঙ্কিলতাকে পশ্চাতে ফেলে সুন্দরের মধ্যে বেঁচে থাকার জন্য প্রাণপণ আকুতি জানাচ্ছে তা প্রতীকী অর্থে এই উত্তোলিত হাতের মাধ্যমে দৃশ্যায়িত হয়েছে। মরা ময়ূর নাটকে ধাঙড় চরিত্রে মঞ্চে অভিনয় করেছেন নাটকটির নির্দেশক ও প্রযোজক গাজী রাকায়েত নিজেই। অন্যদিকে ধাঙড় সর্দারের ভূমিকায় অভিনয় করেছেন গোলাম সারোয়ার। নারী চরিত্রে অভিনয় করেছেন শর্মীমালা।

নাটকটির মঞ্চপরিকল্পনায় ছিলেন উজ্জ্বল ঘোষ। আলোক পরিকল্পনায় ছিলেন সুদীপ চক্রবর্তী ও খান মোহাম্মদ রফিকুল ইসলাম। ‘ এখনও এ-নাটকটি চারুনীড়ম নাট্যদল মঞ্চে নিয়মিত পরিবেশন করে যাচ্ছে। ২০২০ সাল অব্দি নাটকটি সর্বমোট ২৪বার মঞ্চায়িত হয়েছে।
বর্তমান মঞ্চায়নে ধাঙড় চান্দু চরিত্রে গাজী রাকায়েত অভিনয় করলেও ধাঙড় সর্দার ও নারী চরিত্রে পরিবর্তন এসছে। ধাঙড় সর্দার চরিত্রে বর্তমানে অভিনয় করছেন আশিউল ইসলাম ও নারী চরিত্রে নীলুফার ইয়াসমিন। বর্তমানের সেট ডিজাইনেও আছেন সুদীপ চক্রবর্তী আর নৃত্যনির্দেশক কাজি আনিসুল হক বরুণ।’
মরা ময়ূর নাটকটি স্বল্পাকৃতির হলেও নাট্যকার এরই মধ্যে উপযুক্ত মঞ্চনির্দেশনা প্রদান করেছেন। নাটকটিতে চরিত্রের উপস্থিতি ও অঙ্গভঙ্গি, মঞ্চ পরিকল্পনা সংক্রান্ত তাঁর প্রয়োজনীয় নির্দেশনা অভিনেতা-নির্দেশক ও প্রযোজকের জন্য হয়ে উঠেছে অভিনয়বান্ধব। যেমন নাটকের শেষের দিকে নারীচরিত্রটির হঠাৎ রূপবদলের মোহময় চিত্রায়ণ প্রসঙ্গে নাট্যকারের আলোক প্রক্ষেপণসংক্রান্ত নির্দেশনাবলি উল্লেখ করা যেতে পারে :
নারী তার হাত দুটি দু’দিকে নাটকীয়ভাবে ছড়িয়ে দেয়। সঙ্গে সঙ্গে মঞ্চে আলো এসে ঝাঁপিয়ে পড়ে – রঙিন আলো, নৃত্যপর আলো, নানা রঙের আলোর খেলায় আর নারীর গাউনের চুমকির বিচ্ছুরণে এক জাদুময় বিস্ময়ের সৃষ্টি হয়। নারী নৃত্যের একেকটা স্থির ভঙ্গি রচনা করে সুরে সুরে বলে যায় ( কাব্যনাট্যসমগ্র : 858)
সৈয়দ শামসুল হকের অন্যান্য কাব্যনাটকের মতো শব্দচয়ন, উপমা, উৎপ্রেক্ষা, চিত্রকল্পের নান্দনিক উপস্থাপনায় আলোচ্য নাটকের ভাষা হয়ে উঠেছে অনন্য। বিশেষত, একজন ধাঙড়ের রুচি, স্বভাব এবং তার সঙ্গে তাল মিলিয়ে উপযুক্ত শব্দচয়নে নাটকটি হয়ে উঠেছে বাস্তব ও বিশ্বাসযোগ্য। ধাঙড় চরিত্রটি যেমন কথায় কথায় অশ্লীল শব্দ, অপভাষা ব্যবহার করেছে তেমনি সর্দার চরিত্রের মুখের সংলাপেও আছে ব্যঙ্গ-বিদ্রুপাত্মক শব্দ, কখনো কখনো শাসকের মতো আধিপত্যবাদী শব্দ। যেমন ধাঙড়ের মুখে চাঁদের রূপ বর্ণিত হয়েছে এভাবে :
আকাশে মন্ত গোলা একটা চাদ ছিলো,
সে যদি আপনি দেখতেন!
ঠিক একবারে মেয়েছেলের মাইয়ের মতো
টসটসে – ইয়া বড়! চোখ ঠিকরে তাকিয়ে আছি। ( কাব্যনাট্যসমগ্র : ৪৮৪)
আলোচ্য নাটকের ধাঙড়সর্দার তোষামুদে, স্বার্থপর একটি চরিত্র। যতক্ষণ তার সামনে নারী চরিত্রের উপস্থিতি ছিল না ততক্ষণ সে ধাঙড়ের কথা মন দিয়ে শুনেছে; তার প্রতি সহানুভূতি জ্ঞাপন করেছে। কিন্তু মঞ্চে যখনই নারীটি এসে হাজির হয়েছে, অমনি সে খোলস পাল্টে নারীকে তোষামোদ করতে শুরু করেছে।

সে ধাঙড়কে ধমক দিয়ে তাকে চাকুরিচ্যুত করার ভয় দেখিয়ে নিজেই নেমে পড়েছে রাস্তা থেকে মৃত ময়ূরটি সরানোর কাজে। ধাঙড় সর্দারের রূপ বদলের এই বিষয়টি নাট্যকার তার সংলাপে চমৎকার ভাবে উপস্থাপন করেছেন। সর্দার যখন ধাঙড়ের সঙ্গে কথা বলেছে তখন সে সংলাপে মিশে আছে ব্যঙ্গ-বিদ্রূপ, শ্লেষ আর ধমকের সুর :
এই! এই যে চান্দু! বসে বসে পাছা ঘষছো ! [ … ]
শালা তোমাকে খুঁজে বেড়াচ্ছি! আর তু!ি
এখানে পাছা পেতে পা ছড়িয়ে আয়েস করছো!
বসে আছো কী করতে ? হাতে নুলা বাতাস লেগেছে! (কাব্যনাট্যসমগ্র : ৪৮২)
আবার এই সর্দার যখন গাড়িওয়ালা নারীটির সঙ্গে সংলাপ বিনিময় করেছে, তখন তার মুখের ভাষায় বিনয়- বদান্যতা ঝরে পড়েছে। নাট্যকার বাস্তবতার সঙ্গে খাপ খাইয়ে তখন তার মুখের ভাষায় যুক্ত করেছেন তোষামুদে শব্দাবলি :
আপনাকে তো বললাম, ম্যাডাম,
লোকটা পাগল। বদ্ধ উন্মাদ।
আমি ওকে এক্ষুণি বরখাস্ত করছি।
এই, এই ব্যাটা, তোর চাকরি খতম!
ম্যাডাম, আমি নিজেই মরা ময়ূরটা সরাচ্ছি।
এক্ষুণি! আপনার কষ্ট হলো।
মাফ করে দেবেন। ( কাব্যনাট্যসমগ্র : ৪৯২-৪৯৩)
অন্যদিকে নারী চরিত্রটির মাধ্যমো সামরিক মদদপুষ্ট পাকিস্তানপন্থি শাসকের রূপচিত্রাঙ্কন করতে গিয়ে তার মুখে বাংলা শব্দের পাশাপাশি ইংরেজি, উর্দু শব্দের উপস্থাপন অত্যন্ত নৈপুণ্যের সঙ্গে করেছেন নাট্যকার। নারী চরিত্রটি যখন নৃত্যরত অবস্থায় অকস্মাৎ মঞ্চে উপস্থিত হয়, তখন তার মুখের সংলাপে ইংরেজি-উর্দুভাষার শব্দ মিলেমিশে এক অদ্ভুত দ্যোতনা ও ছন্দলালিত্য সৃষ্টি করে, যেটি নৃত্যের তালের পক্ষে অত্যন্ত সহায়ক হয়েছে।
যেমন :
হঠ যাও সব, হঠ যাও!
তফাৎ তফাৎ হো যাও!
দেখো মেরি জান,
হামারি হাত ছে ক্যায়সে বানার্ড
দেশ মে নয়াস্তান।
ফির নারা লাগায়া ! ফির মেশিন গান!
হল্ট। মেশিনগান। (কাব্যনাট্যসমগ্র : ৪৯৬)

এছাড়াও নাটকের ভাষায় ব্যবহৃত অলঙ্কার উপমা, চিত্রকল্পের কিছু দৃষ্টান্ত নিম্নে উপস্থাপন করা হলো :
উপমা :
১. আকাশে মন্ত গোলা একটা চাঁদ ছিলো, […]
ঠিক একেবারে মেয়েছেলের মাইয়ের মতো / টসটসে – ইয়া বড়! (কাব্যনাট্যসমগ্র : ৪৮৪)
২. হঠাৎ বললে বিশ্বাস যাবেন না- চাঁদটা হঠাৎ / পাশেই পুস্কুরিনিতে ঝপ করে দিলো একটা ডুব ! / ঠিক আমার বৌয়ের মতো! (কাব্যনাট্যসমগ্র : ৪৮৪)
৩. চোখে বিশাল সানগ্লাস, প্রজাপতির পাখার মতো ফ্রেম। (কাব্যনাট্যসমগ্র : ৪৯২)
উৎপ্রেক্ষা :
১. পেট ফুলে ঢোল । গতর ফুলে উঠে মাই যেন ফুটবল। (কাব্যনাট্যসমগ্র : ৪৮২)
২. হঠাৎ সেই লোকটা! মাটি ফুঁড়ে বেরুলো। / সটান! ঠিক যেন গাছ একটা গজালো। (কাব্যনাট্যসমগ্র: ৪৮৫)
৩. তাহলে, শহর যেন পরিষ্কার ফিটফাট থাকে, / সুন্দর থাকে, তারই জন্যে তো!/ যেন বেহেশতের বাগান মনে হয় দেখে – (কাব্যনাট্যসমগ্র : ৪৮৮)
8. বোঁটা! তার গাড়িতে। সেই শাদা ইয়াব্বড় গাড়িতে।/ এক ঝলকই দেখেছি। যেন একটা অচিন সুন্দর পাখি, (কাব্যনাট্যসমগ্র : ৪৯০)
মরা ময়ূর কাব্যনাটকটি সৈয়দ শামসুল হকের লেখা ইংরেজি নাটকের অনুবাদ হলেও নাট্যকার শিল্পসৌন্দর্যে যথেষ্ঠ মুন্সিয়ানা দেখিয়েছেন। বাংলা কাব্যনাট্যের ধারায় ক্ষুদ্র কলেবরের এ নাটকটি উল্লেখযোগ্য সংযোজন ।