Site icon Literature Gurukul [ সাহিত্য গুরুকুল ] GOLN

নাগরিক সমাজ জীবনে মধ্যবিত্তের বোধন ও অস্তিত্ব অন্বেষণ

নাগরিক সমাজ জীবনে মধ্যবিত্তের বোধন ও অস্তিত্ব অন্বেষণ

আজকে আমাদের আলোচনার বিষয়ঃ নাগরিক সমাজ জীবনে মধ্যবিত্তের বোধন ও অস্তিত্ব অন্বেষণ। যা বাংলাদেশের উপন্যাসে নৈতিক বিবেচনার যুদ্ধোত্তর কালে রচিত ও প্রকাশিত উপন্যাসের নৈতিক বিবেচনার অন্তর্গত।

 

 

নাগরিক সমাজ জীবনে মধ্যবিত্তের বোধন ও অস্তিত্ব অন্বেষণ

১৯৭১ এর মুক্তিযুদ্ধের পর ঢাকা শহর হয় সারা বাংলাদেশের রাজধানী। তখনও ঢাকা শহর ছাড়া ঢাকার আশপাশের গ্রামপ্রধান মফঃস্বল শহরগুলি নাগরিক চারিত্র ধারণ করতে পারেনি।

‘বাংলা উপন্যাসের আধুনিকতায় উত্তরণ ঘটেছে প্রধানত নগরবাসী মানুষের জীবন ও নাগরিক সমাজ মানসের ইতিবৃত্তের উন্মোচনে সমাজ বিবর্তনে ‘দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের ক্রান্তিকালে বিশ্বব্যাপী যখন ধনতন্ত্রের অবক্ষয়ের সূচনা হয়েছিল, যুগের সেই সঙ্কটময় সময়ে পূর্ব বাঙলায় সামন্ত অর্থনীতি ভেঙে নগর ও শিল্প কেন্দ্রিক অর্থনীতির পথে যাত্রা শুরু হয়।

সুতরাং একটি অবক্ষয় আক্রান্ত যুগপ্রবাহে অভিঘাতের মধ্যে পূর্ব বাঙলায় নাগরিক মধ্যবিত্ত শ্রেণীর উদ্ভব ও বিকাশ হতে থাকে। আধুনিক জীবনদৃষ্টি ও নাগরিক বৈদগ্ধ্যমণ্ডিত মানুষের প্রথম আবির্ভাব ঘটে রবীন্দ্রনাথের উপন্যাসে। তাঁর উপন্যাসেই আমরা লক্ষ্য করি, না শহর, না গ্রামের মানুষের জীবন প্রবাহের অন্তর্ভেদী চরিত্র রূপায়ন।

স্বাধীনতা উত্তরকালে রাজনৈতিক বিবর্তন, অর্থ ও পেশিশক্তির প্রভুত্বে, নাগরিক জীবনে মধ্যবিত্তের বিকাশ স্বাভাবিক প্রক্রিয়ায় আসেনি। মধ্যবিত্ত শ্রেণীর গুণগত ও মানগত অপূর্ণতা রয়েছে যথেষ্ট। ব্রিটিশ কলোনি গহ্বরে যে মধ্যবিত্তের অঙ্কুরোদ্‌গম হয়েছিল, দেশ বিভাগোত্তর তেইশ বছরের নয়া ঔপনিবেশিক শাসন কাঠামোতে তার স্বাবলম্বী অগ্রযাত্রা বারবার বাধাগ্রস্ত হয়েছে।

স্বাধীন বিকাশের পরিবর্তে প্রতিকূল ও প্রতিদ্বন্দ্বী পরিস্থিতির সঙ্গে সংগ্রাম করেই অস্তিত্ব রক্ষা করতে হয়েছে এ ভূখণ্ডের মধ্যবিত্ত শ্রেণীকে। যুদ্ধের অভিঘাতে ক্রমবর্ধমান নগরজীবনের জটিলতা অপ্রাপ্তি, প্রত্যাশা, নৈরাশ্য, হতাশা, যন্ত্রণা, অবক্ষয়িত চিত্র উপস্থাপনের সঙ্গে সঙ্গে ব্যক্তি অস্তিত্বের আত্মজিজ্ঞাসা প্রকট হয়ে দেখা দিয়েছে। একটা নতুন রাষ্ট্রের উন্মেষ পর্বে জনজীবনের মুক্তি, আশা, আকাঙ্ক্ষার অন্বেষণ পর্যবসিত হয় হতাশায়।

 

 

যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশের তরুণ সম্প্রদায় বা মুক্তি যুদ্ধে অংশগ্রহণকারী জনগণের কর্মসংস্থান ও পুনর্বাসনের অভাব প্রকট হয়ে দেখা দিল। সদ্য স্বাধীন দেশে গণতন্ত্রায়ন অসম্ভব হয়ে দেখা দেয়। সমাজ বিকাশের ক্ষেত্রে বাধা, দ্বিধান্বিত মনোভাব। পাকসেনাদের দ্বারা ক্ষতিগ্রস্ত ও পঙ্গু মুক্তিযোদ্ধা, তাদের মা-বোন-স্ত্রী-কন্যা লাঞ্ছিতা। তাদের ভরণপোষণ ও রক্ষণাবেক্ষণে সরকার অপারগ।

বেকার সমস্যা দূরীকরণে সরকারি কর্মচারীদের বেতন বৃদ্ধিতে অনেক ক্ষেত্রেই বাধাগ্রস্ত। দুর্নীতি, কালোবাজারি, দুর্ভিক্ষ, স্বজনপ্রীতি মানুষকে করল হতাশাগ্রস্ত। মধ্যবিত্ত সমাজে সৃষ্টিহয় পরাজয় ক্লিষ্টতা। তাদের সামষ্টিক জীবন হয়ে উঠল অমিমাংসীত আত্মরতি, ক্ষুধার্ত, যন্ত্রণা ও স্বপ্নভঙ্গের ট্রাজেডি।

যুব সমাজ হতাশাগ্রস্ত অবস্থায় যুদ্ধের প্রস্তুতি স্বরূপ অস্ত্র ব্যবহারে হল নিয়োজিত। তাদের চিন্তা-চেতনায় দেখা দিল বুর্জোয়া সর্বহারা চরমপন্থী মনোভাব। সেখানে প্রশাসন ব্যবস্থা প্রায় নিজের অক্ষমতার পরিচয় দিয়ে যেতে লাগল। মধ্যষিত্ত মানসিকতা ও ক্রমপ্রসারিত হল সম্ভোগ চেতনায় মূল্যাবোধের পালাবদলে। এদের মানসিক বোধ ও নিঃসঙ্গতা মধ্যবিত্তের চেতন সমম্বিত আত্মোপলব্ধি মূলক এসব উপন্যাসকে ইনাররিয়েলিটি ধর্মী’ ও বলা যেতে পারে। দর্শনহীন ‘আত্মকথন’ আত্মদহন, যন্ত্রণাদগ্ধ আত্মানুসন্ধানই দেখানে মুখ্য।

 

 

১৯৭১ এ অনেক বিশিষ্ট কবি, সাহিত্যিক, সাংবাদিক চলে গেছেন পার্শ্ববর্তী রাষ্ট্র আশ্রয় লাভের জন্য আরও জনশ্রেণীর সঙ্গে। হায়েনা মুক্ত বাংলায় স্বাধীনতার স্রোতমুখী জনগণ দেশে ফিরে আসেন। দেশের ক্রমভগ্ন উল্লক্ষনধর্মী বাস্তব সত্য প্রত্যক্ষণ উপলব্ধি করেন ভবিষ্যৎ স্পন্দিত, প্রতিবন্ধী চেতনায়।

নাগরিক মধ্যবিত্ত সমাজে যে যুদ্ধের পরে আলোড়ন হয় ঔপন্যাসিকগণ সেই বেদনাদীর্ণ, জটিল সংকটপূর্ণ সংঘাত সমষ্টিকেই রূপদান করেছেন সমাজসত্যকে ধারণ করে তাদের উপন্যাসে। তবে মুক্তি সংগ্রামের আঘাতে সমাজসত্তার মৌলিক কোনো পরিবর্তন হয়েছিল কিনা, মূল্যবোধ, বিশ্বাস ও সংস্কারে ব্যাপক রদবদল হয়েছিল কিনা হয়ে থাকলে স্বাধীনতা উত্তর বাংলা উপন্যাসে তার প্রতিফলন কতোখানি ঘটেছিল এবার তা দেখা যেতে পারে ।-

সুতরাং, ঔপন্যাসিকের এই উপন্যাস সমূহে আছে মধ্যবিত্ত জীবনের বাইরের চাকচিক্য ভিতরে তারাই বিপন্ন বিদীর্ণ। সমাজের রুঢ় বীভৎস রূপ ফুটে উঠে তাদের ক্রম ভগ্ন মানসিক বিকাশে তারা প্রত্যেকেই স্টেটাস রক্ষায় ব্যস্ত এক্সপোর্ট-ইম্পোর্ট-ইনডেন্টিং ঠিকাদারী মহাজনী ব্যবসায়ী হয়ে। এ শ্রেণীর উপন্যাসসমূহ –

সরদার জয়েনউদ্দীনের ‘শ্রীমতী ক ও খ এবং শ্রীমান তালের আলী’ (১৯৭৩); সৈয়দ শামসুল হকের ‘খেলারাম খেলে যা’ (১৯৭৩), ‘দ্বিতীয় দিনের কাহিনী’ (১৯৮৪) অন্তর্গত’ (১৯৮৪), ‘স্তব্ধতার অনুবাদ’ (১৯৮৫); হুমায়ূন আহমদের ‘নন্দিত নরকে’ (১৯৭২), ‘শঙ্খনীল কারাগার’ (১৯৭৩), সুকান্ত চট্টোপাধ্যায়ের ‘একজন’ (১৯৭৫) রশীদ করিমের ‘প্রেম একটি লাল গোলাপ’ (১৯৭৮), ‘সাধারণ লোকের কাহিনী’ (১৯৮১); রিজিয়া রাহমানের ‘রক্তের অক্ষর’ (১৯৭৮), ‘একটি ফুলের জন্য’ (১৯৮৬); শওকত আলীর ‘অপেক্ষা’ (১৯৮৫); বশীর আল হেলালের ‘কালো ইলিশ’ (১৯৭৯); হাসনাত আব্দুল হাই-এর ‘আমার আততায়ী’ (১৯৮০), রাজিয়া খানের ‘হে মহাজীবন’ (১৯৮৩), ‘চিত্রকাব্য’ (প্রথম খণ্ড ১৯৮০, ২য় খণ্ড ১৯৮৭), ‘প্রতিচিত্র’ (১৯৭৬); শামসুর রাহমানের ‘অক্টোপাস’ (১৯৮৩), ‘নিয়ত মন্তাজ’ (১৯৮৫); রশীদ হায়দারের ‘অন্ধকথা মালা’ (১৯৮২); মঞ্জু সরকারের ‘তমস’ (১৯৮৪), এ প্রবণতার প্রাগ্রসর চিন্তা চেতনার দৃষ্টান্ত।

Exit mobile version