আজকে আমরা পশ্চিম বাংলায় রচিত ভ্রমণ কাহিনীর সঙ্গে তুলনামূলক আলোচনা করবো । যা চীন ও রাশিয়া ভ্রমণ অবলম্বনে রচিত বাংলা সাহিত্যের চীন ভ্রমণ কাহিনী এর অন্তর্গত।
পশ্চিম বাংলায় রচিত ভ্রমণ কাহিনীর সঙ্গে তুলনামূলক আলোচনা
বাংলা ভাষায় পশ্চিম বাংলায়ও অনুরূপ বিষয়ে অনেকগুলি ভ্রমণ কাহিনী রচিত হয়েছে। কালের বিচারে প্রথমেই রচিত হয়েছিল পশ্চিম বাংলায় (অবশ্য তখনও দেশ বিভাগ হয়নি) রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের (১৮৬১-১৯৪১) ‘রাশিয়ার চিঠি’ (১৯৩১)। বিভাগোত্তর পশ্চিমবঙ্গেও রাশিয়া সফর নিয়ে অনেকে ভ্রমণ কাহিনী লিখেছেন।
এদের মধ্যে মৈত্রেয়ী দেবীর ‘মহাসোভিয়েট’ (১৩৬৩), প্রবোধকুমার স্যান্যালের (১৯০৫-১৯৮৩) ‘রাশিয়ার ডায়েরী’ (প্রথম ও দ্বিতীয় খন্ড; ১৯৬০-৬২) এবং শুভময় ঘোষের ‘মস্কোর চিঠি’ (১৩৭০) উল্লেখযোগ্য রচনা। চীন সফর অভিজ্ঞতার উপর লেখা ভ্রমণ কাহিনীর মধ্যে কেদারনাথ বন্দ্যোপাধ্যায়ের (১৮৬৩-১৯৪৯) ‘চীনযাত্রী ও মনোজ বসুর (জ. ১৯০১) চীন দেখে এলাম’ (প্রথম পর্ব ১৩৬০; দ্বিতীয় পর্ব ১৩৬২) অত্যন্ত প্রশংসনীয় ভ্রমণ সাহিত্য। এগুলির মধ্যে বিশিষ্ট রচনা ‘রাশিয়ার চিঠি’, ‘রাশিয়ার ডায়েরী’ ও ‘চীন দেখে এলাম’। পূর্ব বাংলায় রচিত ভ্রমণ কাহিনীর সংগে এ সাহিত্যগুলির তুলনামূলক আলোচনা এখানে করা হলো।
ক. রাশিয়া ভ্রমণ কাহিনী
১. রাশিয়ার চিঠি
রাশিয়া ভ্রমণ নিয়ে রচিত সাহিত্যগুলির মধ্যে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের (১৮৬১-১৯৪১) ‘রাশিয়ার চিঠি’ (১৯৩১) উল্লেখযোগ্য। ১৯৩০ সালে তিনি ইউরোপ যাত্রার পথে রাশিয়া সফরে যান এবং মস্কোতে ১১ই সেপ্টেম্বর থেকে ২৫শে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত অবস্থান করে সেখানকার বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানাদি পরিদর্শন করেন। এ সময়কার অভিজ্ঞতাগুলো তিনি মস্কো ও ইউরোপের বিভিন্ন শহর থেকে প্রিয়জনদের কাছে চিঠি আকারে লিখে পাঠাতেন। পরবর্তীকালে এসব চিঠি মাসিক প্রবাসীতে প্রকাশিত হয় এবং গ্রন্থকারে প্রথম প্রকাশিত হয় ১৩৩৮ সালের ২৫শে বৈশাখ।
১৯৩০ সালে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের বয়স প্রায় সত্তরের কাছাকাছি। তাঁর জীবনদর্শনের একটি বড় পরিচয় ছিল মানুষের প্রতি ভালোবাসা। মানবতাবাদী হিসেবে মানবকল্যাণে কাজ করেও নানা বিরুদ্ধাবস্থায় সফল হতে পারেননি পুরোপুরিভাবে। সেই পরিস্থিতিতে তিনি রাশিয়া সফরে যান।
জীবনের শুরু থেকে যে স্বপ্ন তাঁর বুকে জমা, জীবনের শেষ প্রান্তে এসে দেখলেন তার বাস্তবরূপ। অন্তরের উপলব্ধিগুলোর অবিকল রূপ দৃষ্টি সীমার মধ্যে পেয়ে তিনি আনন্দে অভিভূত হয়ে পড়েন। শুচি স্নিগ্ধ এক ভালোলাগায় আপ্লুত হয়ে তিনি এ সফরকে তীর্থদর্শনের সংগে তুলনা করেছেন।
বেনিয়া জাতির মুনাফার লোভ, ধনবৈষম্য, শ্রেণী বৈষম্য, ব্যক্তিস্বার্থ, পারস্পরিক বিদ্বেষ ও হানাহানির আবিলতামুক্ত রাশিয়ার নয়াবিধানে রবীন্দ্রনাথ দেখেছেন এক ভিন্ন ছবি। সাম্যে ঐকো-ভ্রাতৃত্বে সেদেশের মানুষ এক ও অভিন্ন জাতি। নতুন সমাজ ব্যবস্থায় সেখানে সবাই স্বতঃস্ফূর্তভাবে সমর্পিত হয়েছে এক অখন্ড আদর্শের বেদীমূলে মানুষে মানুষে সহজ ব্যবহার দেখে তিনি সবচেয়ে বেশী আনন্দিত হয়েছিলেন।
রাশিয়া ভ্রমণে কবির যে উদ্দেশ্যটি সবচেয়ে বেশী সক্রিয় ছিল তা হলো ওখানে জনসাধারণের শিক্ষা বিস্তারের কাজ কীরকম চলছে আর ওরা তার ফল কী রকম পাচ্ছে সেইটে অল্প সময়ের মধ্যে দেখে নেওয়া। রাশিয়ায় এসে সমাজের সর্বত্র শিক্ষার বিস্তার দেখে তিনি বিস্মিত হয়েছেন।
তিনি উপলব্ধি করেছেন সেখানে শিক্ষার পরিমান শুধু সংখ্যায় নয়, তার সম্পূর্ণতায়, তার প্রবলতায়। কবি স্বদেশের সংগে রাশিয়ার তুলনা করে দেখেছেন- ভারতবর্ষ শিক্ষার এই পূর্ণ সুযোগ থেকে বঞ্চিত। তবে তাদের শিক্ষার আয়োজন দেখে তিনি যেমন বিস্মিত হয়েছেন তেমনি তাদের শিক্ষা ব্যবস্থার গলদ সম্পর্কেও সচেতন হয়েছেন। তাঁর মতে- শিক্ষাবিধি দিয়ে এরা ছাঁচ বানিয়েছে। কিন্তু ছাঁচে ঢালা মনুষ্যত্ব কখনো টেকে না।
রাশিয়ার জনগণ তিনটি জিনিসের ওপর বিশেষ গুরুত্ব দিয়ে থাকে- শিক্ষা, কৃষি ও যন্ত্র। এই তিন পথ দিয়ে এরা সমস্ত জাতি মিলে চিত্ত, অন্ন এবং কর্মশক্তিকে সম্পূর্ণতা দেবার চেষ্টা করছে। রাশিয়ায় এসে তিনি দেখেছেন ভারতবর্ষের মতো সেখানকার মানুষও কৃষিজীবী। আধুনিক হলযন্ত্রের সংগে পরিচয় এবং ঐকত্রিক চাষে এখানে কৃষিক্ষেত্রে প্রভূত অগ্রগতি সাধিত হচ্ছে। অন্যদিকে ভারতবর্ষে মান্ধাতার আমলের একজোড়া গরু আর কাঠের লাঙ্গলের সাহায্যে জমি চাষ করা হয়। ফলে কৃষি একদিকে মূঢ় আর একদিকে অক্ষম, শিক্ষা এবং শক্তি দুই থেকেই বঞ্চিত।
যে পুরাতন ধর্মতন্ত্র এবং পুরাতন রাষ্ট্রতন্ত্র বহুকাল ধরে এদের বুদ্ধিকে অভিভূত এবং প্রাণশক্তিকে নিঃশেষ প্রায় করে দিয়েছে, সোভিয়েট বিপ্লবীরা তাদের দুটোকেই নির্মূল করেছে। কিন্তু আর্ট সামগ্রীকে কোনমতেই নষ্ট হতে দেয়নি।
শিক্ষা ব্যবস্থার পাশাপাশি স্বাস্থ্য ব্যবস্থারও ব্যাপক উন্নতি সাধিত হয়েছে রাশিয়ায় বিরলবসতিপূর্ণ তুর্কমেনিস্তানে ১৩০টি হাসপাতাল খোলা হয়েছে। সেখানে ডাক্তারের সংখ্যা ছয়শো। এর বাইরেও লোকশিক্ষার জন্য বিপুল উদ্যম চলছে। সে প্রয়াসের ক্ষেত্র যাদুঘর, চিত্রশালা, সঙ্গীতশালা, থিয়েটার ও ভ্রমণ প্রভৃতি। এখানে ব্যক্তিগতভাবে নিজের ভোগের জন্য বা প্রতাপের জন্য কেউ সমগ্র সমাজকে ডিঙ্গিয়ে যেতে পারে না। তবে রাশিয়ায় অনুসৃত অর্থনৈতিক ও রাষ্ট্রীয় দর্শন সম্পর্কে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর সন্দেহমুক্ত হননি।
তাদের ব্যষ্টিগত ও সমষ্টিগত সীমারেখা নিয়েও তাঁর মনে দ্বিধা দ্বন্দ্বের সৃষ্টি হয়েছে। তাঁর মনে হয়েছে সমাজতান্ত্রিক এই বিধি ব্যবস্থা কিছুকালের জন্য, নিত্যকালের জন্যে নয়। মার্কসীয় অর্থনীতি সম্পর্কে তিনি বলেছেন এখনও শেষ কথা বলার সময় আসেনি কেননা তার প্রয়োগ সবেমাত্র শুরু হয়েছে।
রাশিয়া ভ্রমণে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের দৃষ্টিতে দু’টো জিনিস স্পষ্ট করে ধরা পড়েছে তা হলো- এখানে একদিকে মানুষের ব্যক্তিগত স্বাধীনতাকে পীড়ন করা হচ্ছে অন্যদিকে সাধারণভাবে শিক্ষার দ্বারা চর্চার দ্বারা ব্যক্তির আত্মনিহিত শক্তিকে বাড়ানো হচ্ছে। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর আশান্বিত হয়েছেন এই ভেবে যে জারের একনায়কত্ব ও বলশেভিকদের একনায়কত্বে প্রচুর পার্থক্য রয়েছে।
জারেরা রাষ্ট্রনৈতিক একনায়কতার সাথে সাথে শিক্ষা ধর্ম প্রভৃতিকে ধ্বংস করে পুরো সমাজ মানসকে ক্লীবে পরিণত করত। তাঁরা চাইতো মনকে মেরে যুক্তির পা খোঁড়া করতে। কিন্তু এ আমলে তা নয়। মানুষকে এরা দেহের দিক থেকে নিপীড়িত করেছে, মনের দিকে নয়। যারা যথার্থই দৌরাত্ম্য করতে চায় তারা মানুষের মনকে মারে আগে এরা মনের জীবনী শক্তি বাড়িয়ে তুলছে এখানেই পরিত্রাণের রাস্তা রয়ে গেল।
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের পত্র সাহিত্যগুলোর মধ্যে রাশিয়ার চিঠি অন্যতম। এতে কবির ভাবনার প্রান্তগুলো শতধারায় উৎসারিত। তাঁর চিন্তা এবং উপলব্ধি যেমনই গভীর তেমনি মৌলিক। সোভিয়েট দেশের নানা দিক নিয়ে তিনি আলোচনা করেছেন। কবির দর্শনচিন্তা এবং মানবতত্ত্বের অনেক মূলসূত্র এ সাহিত্যে খুঁজে পাওয়া যায়। এ ছাড়াও রাশিয়ার চিঠিতে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের সুপরিণত মেধা, মনন এবং বিচিত্র অভিজ্ঞতালব্ধ জ্ঞানের ঘনিষ্ঠ সমন্বয় ঘটেছে।
বিপ্লবোত্তর রাশিয়ায় অনুসৃত নববিধানের সংগে রবীন্দ্রনাথের দর্শন তত্ত্বের সংযোগ ঘনিষ্ঠতর। সোভিয়েট দেশের নতুন বিধি ব্যবস্থার ইতিবাচক দিকগুলোর সাথে তাঁর আদর্শের মিল রয়েছে। তবে এর নেতিবাচক দিকের যৌক্তিক সমালোচনায় কবির দৃষ্টিভঙ্গি স্বতন্ত্র।
অর্থাৎ চিন্তার একটা বৃহৎ পরিধিতে রবীন্দ্রদর্শনের সংগে সোভিয়েট সমাজতান্ত্রিক দর্শন এক ও অভিন্ন নয়। গভীর পর্যবেক্ষণ শক্তিগুণে দূরদর্শী ও বিচক্ষণ রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর রাশিয়ার মহান আদর্শের বিপুল সমুদ্র মন্থন করে অমৃত ও গরল দু’য়েরই সন্ধান লাভ করেছিলেন। প্রত্যেকটি চিঠিতেই লেখকের সামগ্রিক মানস প্রবণতার উৎসারণ ঘটেছে বিচক্ষণতার সূত্রে। তিনি মনে করেন একনায়কতা সর্ব অবস্থাতেই খারাপ। সেটা গুরুর মধ্যেই থাক আর রাষ্ট্রনেতার মধ্যেই থাক। মনুষ্যত্ব হানির পক্ষে এমন উপদ্রব আর কিছুই নেই।
মানুষের ব্যষ্টিগত ও সমষ্টিগত সীমা এরা যে ঠিক মতো ধরতে পেরেছে তা আমার বোধ হয় না। সে হিসাবে এরা ফ্যাসিস্টদেরই মতো। এই কারণে সমষ্টির খাতিরে ব্যষ্টির প্রতি পীড়নে এরা কোন বাঁধাই মানতে চায় না। ভুলে যায় ব্যষ্টিকে দুর্ব্বল ক’রে সমষ্টিকে সবল করা যায় না, ব্যক্তি যদি শৃঙ্খলিত হয় তবে সমষ্টি স্বাধীন হ’তে পারে না। এখানে জবরদস্ত লোকের একনায়কত্ব চলছে। এই রকম একের হাতে দশের চালনা দৈবাৎ কিছুদিনের জন্য ভালো ফল দিতে পারে, কিন্তু কখনই চিরদিন পারে না।
তবে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের সামগ্রিক বোধে এই গলদটুকুর মধ্যে দিয়েই বড় হয়ে উঠেছে তাদের চিন্তা ও কর্মের সমন্বয় সাফলা যার মধ্যে দিয়ে কবি দেখতে পেয়েছেন রাশিয়ার সামগ্রিক আয়োজনের পরিত্রানের পথ। যা দেখচি আশ্চর্য ঠেকচে। অন্য কোনো দেশের মতোই নয়। একেবারে মূলে প্রভেদ। আগাগোড়া সকল মানুষকেই এরা সমান ক’রে জাগিয়ে তুলছে। ২
মানবাত্মার প্রকৃত সুখের মূল উৎস সন্ধানে কবির নিজস্ব অনুভব একটি প্রগাঢ় সত্যকে উপলব্ধির জগত থেকে প্রকাশের জগতে টেনে এনেছে। পশ্চিমী সভ্যতায় এত বিদ্যা এত জ্ঞান এত শক্তি এত সম্পদ কিন্তু সেখানে কেন সুখ নেই, শান্তি নেই ? সুখের আধার আসলে কোথায় ? এর উত্তরে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর তাঁর আপন দর্শনতত্ত্ব মেলে ধরেছেন।
আমাদের গভীর পরিতৃপ্তি সেখানে যেখানে কেবলমাত্র ব্যবহারিক সম্বন্ধ নয়, সুযোগ সুবিধার সমন্ধ ব্যবসার সম্বন্ধ নয়, কিন্তু সকল রকম স্বার্থের অতীত আত্মীয় সম্বন্ধ। সেখানে মানুষ আর সমস্ত থেকে বঞ্চিত হ’তে পারে, কিন্তু মানব আত্মার তৃপ্তি তার প্রচুর পরিমাণে হয়। মানুষ সুখী হয় সেখানেই যেখানে মানুষের সংগে মানুষের সম্বন্ধ সত্য হয়ে ওঠে। ৩
পশ্চিমী মহাদেশের সাধনাকে কবি মনে প্রাণে শ্রদ্ধা করলেও তাদের সুখ শান্তি বিবর্জিত অন্তরাত্মার হাহাকার সর্বস্ব দীনতার চেহারা উন্মোচনে তিনি কিছুমাত্র কুণ্ঠিত নন। পররাজ্য শোষণ করে পশ্চিমী দেশ যে সম্পদ সৃষ্টি করেছে তা বিপুল প্রচন্ড শক্তিসম্পন্ন যন্ত্রযোগে ধনের বাহন হয়েছে যন্ত্র আবার সেই যন্ত্রের বাহন হয়েছে মানুষ। এভাবে বৈষয়িক সাফল্যের পেছনে ছুটে ছুটে সেখানকার মানুষ আত্মিক দিক থেকে হয়ে পড়েছে সম্পূর্ণ নিঃস্ব।
বিশ্ব প্রাচুর্যের শিখর চূড়ায় পৌঁছেও তারা ক্রমাগত জন্ম দিচ্ছে হতাশা বিক্ষুব্ধ মানুষ। সর্বাধুনিক প্রযুক্তির বদৌলতে তারা হাত বাড়ালেই যা পাচ্ছে তাতে না আছে আনন্দ না আছে তৃপ্তি। আসলে যান্ত্রিক প্রাপ্তিতে মানবিক বোধগুলো সক্রিয় হতে না পারার ফলই এই নিরানন্দময়তা।
যে জিনিস মানুষ সমাজ-ধর্মের ভেতর দিয়ে দৈহিক এবং আত্মিক পরিশ্রমের সমন্বয়ে অর্জন করে সেখানেই থাকে পাওয়ার সবটুকু আনন্দ। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের মতে মানুষের সকলের চেয়ে বড়ো জিনিষ, সে হ’লো মানব- সম্বন্ধ। এই সত্য রাশিয়ার চিঠিতে নানা প্রায়োগিক ব্যাখ্যা বিশ্লেষণে গভীর হয়ে উঠেছে।
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর পাশ্চাত্য সভ্যতার অভ্যুদয় তার সুফল-কুফল এবং রাশিয়ার সমাজব্যবস্থার সাথে তার মূল পার্থক্যকে চিহ্নিত করেই থেমে থাকেননি; চিন্তার সূক্ষ্ণ তন্ত্রী মেলে সেসব পার্থক্যের কারণ উদ্ঘাটন করেছেন এবং যে বৈশিষ্ট্যগুণে রাশিয়া আজ এই তাৎপর্যপূর্ণ স্বাতন্ত্র্যে অবস্থান নিয়েছে সেসব বৈশিষ্ট্যগুণ ভারতবর্ষের রন্ধ্রে রন্ধ্রে ঢুকিয়ে দেবার আত্মিক প্রয়াসেও তিনি অধিক আগ্রহী। রাশিয়ার চিঠির পাতায় পাতায় তাঁর মানবতাবাদী চিন্তা প্রতিফলিত। তাঁর লেখায় সাম্প্রতিক মনটিও অবিকল ফুটে উঠেছে।
রীতিকর্ষণা তাঁর রচনার বড় আকর্ষণ। স্বাতন্ত্র্য প্রকাশের একটি বড় উপায় হলো রীতি বা ষ্টাইল। তবে তিনি ফর্মের প্রতিই অধিক মনোযোগী একথা বলা যায় না। বিষয় এবং ফর্ম দুটোতেই তিনি সমান যত্নবান। তাছাড়া প্রায়শই তাঁর লেখায় একটা আপন অন্তর্জাত তাগিদের উৎসারণ প্রাবল্য অনুভূত হয়। রাশিয়ার চিঠির কোথাও তিনি রোজনামচা রাখেননি। সমাজতান্ত্রিক দেশটির বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানাদি পরিদর্শন করে হৃদয়ে সৃষ্ট অনুভূতিগুলির তাৎক্ষণিক প্রকাশের নির্ভেজাল লিপিচিত্র এই রাশিয়ার চিঠি। এমন সাড়াজাগানো বই বাংলা সাহিত্যে দুর্লভ।
২. রাশিয়ার ডায়েরী
১৯৫৮ সালের ৭ই অক্টোবর তাসখন্দে অনুষ্ঠিত এশিয়া আফ্রিকা লেখক সম্মেলনের অধিবেশন উপলক্ষে প্রবোধকুমার সান্যাল ভারতীয় দলের প্রতিনিধি হিসেবে প্রথমবারের মত রাশিয়া যান। ১৩ই অক্টোবর সম্মেলন শেষে তিনি আরও কিছুদিন সেদেশে অবস্থান করে তাসখন্দ, জর্জিয়া, মস্কো, লেনিনগ্রাড প্রভৃতি স্থান ঘুরে দেখেন। পরবৎসর তিনি লেখক সঙ্ঘের আমন্ত্রণ পাওয়া সত্ত্বেও নিজ অর্থব্যয়ে সোভিয়েত দেশে গমন করেন। এ যাত্রায় লেখক সরকারী আতিথ্যের বাইরে থাকার সুবাদে সোভিয়েট ইউনিয়নকে খুব কাছ থেকে দেখবার সুযোগ পেয়েছিলেন। পর পর দুবার সোভিয়েট ভ্রমণের অভিজ্ঞতার উপর ভিত্তি করে রচিত হয়েছিল এই ভ্রমণ কাহিনী। রচনাকাল ১৯৬০-৬২ খ্রীষ্টাব্দ ।
রাশিয়া সম্পর্কিত যে অস্পষ্টতা তাঁর অন্তরে জমা ছিল, সেদেশে গিয়ে দেখেছেন এক বিপরিত জগৎ। সমগ্র দেশ জুড়ে সেখানে রয়েছে সাফল্য শান্তি আর ভ্রাতৃত্বের এক প্রসন্নতা। লেখক সেদেশের মানুষের আচরণে দৃষ্টিকটু কিছু দেখতে পাননি। কোথাও কোন হৈ চৈ, উচ্ছৃঙ্খলতা, দলাদলি, অসভ্যতা, নোংরামি তাঁর নজরে পড়েনি।
তিনি ব্যাপক অনুসন্ধান চালিয়ে জেনেছেন জুয়া, পতিতাবৃত্তি, রাহাজানি, স্ত্রীলোকের প্রতি অনাচার, ডাকাতি, গুন্ডামি, ধর্মান্ধতা, জিনিসপত্র কেনার সময় দরকসাকসি এসব বিষয় আলোচনা ওদের নিকট হাসির বস্তু। সামাজিক চিন্তাধারায়, রাজনীতিক উদ্দেশ্যে, অর্থনীতির প্রয়োগ পন্থায়, সমস্যার প্রতিকার ব্যবস্থায় সেদেশে কোন বিরোধ নেই। কারণ সোভিয়েট ইউনিয়ন মানেই কমিউনিষ্ট পার্টি- এর চেয়ে যেনো সত্য আর কিছু নেই। তবে গলদ যে কিছুই চোখে পড়েনি তা নয়।
সোভিয়েটের গৌরবময় অগ্রগতি উন্নতি আর চোখ ধাঁধানো ঐশ্বর্যের অন্তরালে বয়ে চলেছে যে নীল বেদনার দুঃখ ধারা সেই দুঃখের প্রস্রবণ তাঁর নজরে পড়েছিল। তিনি দেখেছেন এদের জীবনযাত্রার মানোন্নয়নের কাজ এখনও অনেক বাকি। এই আপাত চেহারার চাকচিক্যের আশে পাশে বৃহত্তর জীবন এখনও অনেক দুর্গত।
বিরাট অট্টালিকাশ্রেণী চলেছে রাজপথের দুই ধারে, কোথাও ফাঁক নেই। এমন সুদৃশ্য সালঙ্কৃত হর্ষরাজির পিছনবাগে কী আছে কোনও পর্যটক দেখতে চায় কি ? রাজপথ দিয়ে মোটর পেরিয়ে যায়, দুধারে দেখে যাই নগরের ঐশ্বর্য এবং সম্পদভান্ডার। কিন্তু গলি-ঘুঁজি, পাড়াপল্লী, আনাচ-কানাচ? রবীন্দ্রনাথের ভাষায় যেখানে পড়ে থাকে “মাছের কানুকা কাঁঠালের খোসা ও ভূতি, মরা বিড়ালের ছানা, ছাইপাঁশ আরো কতো কি যে– -1” দু’একটি গলির মধ্যে একা ঢুকে খানিক দূর অগ্রসর হয়েছিলুম। ভয় ছিল পাছে পথ হারাই।
অদূরে পাশ দিয়ে আমাদের ‘ঢাকুরিয়ার কাঁচা নোংরা নর্দমা কেনদিকে যেন বয়ে চলেছে। এক একখানা বাড়ির জরাজীর্ণ এক একটি অংশ দেখতে পাচ্ছি। কোনও কোনও বাড়ির প্রবেশ পথ গুহান্ধকারে আচ্ছন্ন।
এছাড়াও শ্রেণীহীন সমাজ বলতে যে একটি বিশেষ সংজ্ঞা রয়েছে তার সাথে সোভিয়েট সমাজের ঈষৎ পার্থক্য তাঁর পর্যবেক্ষণে ধরা পড়েছে। চাকুরীক্ষেত্রে বড় বড় পদগুলোতে উঁচু-নীচু ভেদাভেদ কিছুটা রয়েছে। গরীব-গৃহস্থরা যখন বাজারের পুটুলি ঝুলিয়ে ধীর গতিতে রাস্তা পেরিয়ে চলে তখন চট্ করেই আলাদা করা যায় পাশাপাশি চলমান অবস্থাসম্পন্ন অর্থশালীদের। তিনি সেদেশে গরীব বস্ত্রহীন দেখেননি তবে ভিখিরি দেখতে পেয়েছিলেন।
এ ছাড়াও সেদেশে যা কিছু নিষিদ্ধ সেখানেও কিছুটা ব্যতিক্রম তাঁর চোখে পড়েছিল। সোভিয়েট ইউনিয়নে তিনি সেদেশের ৪৫ বছরের নির্ভুল ইতিহাস খুঁজে পাননি। যত্র তত্র ছড়িয়ে থাকা লেনিন ও ষ্টালিনের মূর্তির আধিক্য তাঁকে পীড়া দিয়েছিল। তাই তিনি সোভিয়েট দেশকে পুতুলের দেশ হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন।
এসব অসঙ্গতির পরও সোভিয়েট ইউনিয়ন সম্পর্কে তিনি যে মন্তব্য রেখেছেন তাতে সেদেশের সাফল্য উন্নতি আর অগ্রগতির কথাই বড় হয়ে উঠেছে।
প্রবোধকুমার সান্যাল প্রখ্যাত লেখক। রাশিয়ার ডায়েরীতে তাঁর অন্তরঙ্গ উপস্থাপনা সেদেশের খুব কাছের একটি ছবি পাঠকের চোখে ধরিয়ে দিয়েছে। কুটিলতা চাতুরি ষড়যন্ত্র লৌহ যবনিকার দেশ হিসেবে সোভিয়েট ইউনিয়নের যে নাম বিশ্ব পরিচিতিতে ছড়িয়ে পড়েছিল সেখানে তাঁর তীক্ষ্ণ দৃক্ষণের সত্যানুসন্ধিৎসা রাশিয়া সম্পর্কে সব ধরণের অস্পষ্টতা দূর করেছে। দেশটির প্রতিটি দিকের আলোচনাই এসেছে তাঁর গ্রন্থে বিভিন্ন আঙ্গিকে।
স্পষ্টবাদী লেখক যেখানে যেমন দেখেছেন ঠিক সেভাবেই সাজাতে চেষ্টা করেছেন দৃশ্যপটগুলো এবং তাঁর উপলব্ধিগত সত্যগুলোকে অবিকৃত রেখেই প্রকাশের জগতে টেনে এনেছেন। তিনি দেশটির ভালো-মন্দ দুটো দিক নিয়েই কথা বলেছেন। সমালোচনার চোখ নিয়ে দেখেছেন তিনি সেদেশের প্রতিটি বিষয়। তাই তাঁর বর্ণনা পক্ষপাতিত্ব বা বিদ্বেষের একপেশে ভিত্তির বদলে একটি বিজ্ঞানসম্মত বুদ্ধিগ্ৰাহ্য ভিত্তির উপর আসীন। তিনি সোভিয়েট ইউনিয়নকে কোন অলৌকিক বা অত্যাশ্চর্য সাফল্যের দেশ হিসেবে চিহ্নিত করেননি বরং ভালো-মন্দ মিশিয়ে একটি উদার উন্নত দেশের পরিচয়ই এতে প্রধান হয়ে উঠেছে।
নিয়ন্ত্রিত ভ্রমণের বাইরে থাকার সুবাদে তাঁর হাতে যে তথ্যগুলো এসেছে তা সরকারী সফরকারী বা অন্যান্য প্রতিষ্ঠানের উদ্যোগে যারা গিয়েছেন তাঁদের আলোচনায় নেই। তাই এ ভ্রমণ কাহিনী অন্যান্যদের মত নয়। রাশিয়ার বৈষম্যহীন সমাজব্যবস্থায় তিনি বৈষম্যের স্পষ্ট চেহারা দেখেছেন; দেখেছেন কঠোর নিয়মতান্ত্রিক মানুষগুলোর মধ্যেও কিছুটা ব্যতিক্রম।
সোভিয়েট ইউনিয়নে বকশিস দেওয়া এবং নেওয়া সম্পূর্ণ বিষিদ্ধ। কিন্তু লোকচক্ষুর একটু আড়ালে দাঁড়িয়ে আমি যখন এক আধবার আমার বদ অভ্যাস মতো এই বেআইনী কাজ করেছি, তারা প্রীতি ও খুশী হয়ে সেটি গ্রহণ করেছে।
মদ খেয়ে মাতলামী করা সেদেশে সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ; মাতালও তাঁর চোখে পড়েছিল। তিনি আরও উপলব্ধি করেছিলেন সেখানে প্রকাশ্য বিরোধিতা না থাকলেও অপ্রকাশ্যে তা আছে।
পৃথিবীর প্রায় সব গণতন্ত্রে যেমন প্রকাশ্যে বিরোধীদল আছে, সোভিয়েট ইউনিয়নের পার্টির মধ্যে তেমনি ‘অপ্রকাশ্য বিরোধীরা আছে। ৩
নারী-পুরুষের বিভেদহীন সমাজব্যবস্থায় তিনি দেখে এসেছেন আবহমান কালের চিরাচরিত এক ছবি যেখানে ঝাড়ুদার মাত্রই মেয়ে। পারিবারিক জীবনের যে চিত্র তাঁর শৈলিতে মূর্ত হয়েছে তাও আবহমান কালের ঐতিহ্যবাহী পারিবারিক সমস্যারই প্রতিরূপ। মূলত সোভিয়েট জনসমাজ ও জনজীবনের বিভিন্ন দিক নিয়ে তিনি আলোচনা করেছেন।
ডায়েরী বা রোজনামচার আকারে এ গ্রন্থ লিখিত হয়নি। তাঁর ষ্টাইলটি অকেকটাই কথপকথনের মতো। সরস রসিকতার মধ্যে দিয়ে ছোট-খাট থেকে শুরু করে বড় বড় ঘটনার খবরগুলো তিনি কখন যে কোন কৌশলে প্রকাশ করেছেন মুগ্ধ পাঠক তা চট করেই বুঝে উঠতে পারেননি।
৭ই অক্টোবর সোভিয়েট দেশে যাত্রার কথা তিনি উল্লেখ করেছেন ঠিকই কিন্তু কোন সালের উল্লেখ তিনি সেখানে করেননি। পরে এক ফাঁকে অন্য প্রসঙ্গে এমনি কৌশলে সালটির উল্লেখ তিনি করেছেন যে মশগুল পাঠক তা টের পাননি। এমনি অসংখ্য দৃষ্টান্ত তাঁর গ্রন্থে ছড়িয়ে আছে যা প্রথমটায় প্রশ্নের উদ্রেক করে এবং পরে গ্রন্থের কোথাও না কোথাও এর সমাধান মেলে।
এই বৈশিষ্ট্যগুণই পাঠককূলকে গ্রন্থটিতে গভীর মনোনিবেশের সুযোগ সৃষ্টি করে দিয়েছে। লানা, লিডিয়া, অকসানা, মামুদড প্রভৃতি উল্লেখিত চরিত্রগুলি মানব মনের বিচিত্র অনুভুতির একটি স্বাশ্বত রূপকে তুলে ধরেছে যেখানে দেশ-কাল-পাত্রকে ছাড়িয়ে বড় হয়ে উঠেছে মানবাত্মার সম্বন্ধ।
লেখক ১৯৫৮ এবং ১৯৫৯ সালে পর পর দু’বার সোভিয়েট দেশে গিয়েছিলেন। এসময়ের অভিজ্ঞতাগুলো তিনি ডায়েরীর পাতায় টুকে রেখেছিলেন। এই নোটের উপর ভিত্তি করেই রচিত হয়েছিল রাশিয়ার ডায়েরী। এই বিচারে গ্রন্থের নামকরণ সার্থক বলা চলে। বইটি নির্ভরযোগ্য সত্যে ও শিল্পকৃতিত্বপূর্ণ সাহিত্যরসে ভরপুর। দু’এক জায়গায় যেমন লেনিনের মৃত্যু তারিখ এবং মস্কো শহর সম্পর্কিত দু’ধরনের কথা পাঠককে অনেকখানি বিভ্রান্তিতে ফেলে দেয়। তবে লেখক আগেই বলে নিয়েছেন সোভিয়েট দেশে তিনি পঁয়তাল্লিশ বছরের কোন নির্ভুল ইতিহাস খুঁজে পাননি।
এসব ছোট-খাট ত্রুটি বাদ দিয়েও তাঁর গ্রন্থ উন্নত রচনার সকল গুণাবলি সমৃদ্ধ একটি ভালো সাহিত্যের মর্যাদা পেয়েছে।
৩. তুলনামূলক আলোচনা
উনিশশো সাতচল্লিশ থেকে একাত্তর পর্যন্ত সময়ে রাশিয়া ভ্রমণকারী পূর্ববাংলার লেখকদের মধ্যে রয়েছেন মোহাম্মদ আবদুল ওয়াহ্হার বশিকপুরী, রোকাইয়া জাফরী, শহীদুল্লা কায়সার, সুফিয়া কামাল ও জসীম উদ্দীন। এরা প্রত্যেকেই সরকারী সফরকারী দলের সদস্য কিংবা কোন প্রতিষ্ঠানের আমন্ত্রণে রাশিয়া ভ্রমণ করেছেন।
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর পর পর দু’বার আমন্ত্রণ ফিরিয়ে দিয়ে তৃতীয়বার দাওয়াত কবুল করেন। বিপ্লবের মাত্র তের বৎসর পর তিনি রাশিয়া ভ্রমণে যান। যুদ্ধোত্তর ধ্বংস এবং দুর্ভিক্ষ কাটিয়ে রুশ জনগণ যখন নতুন সৃষ্টির প্রেরণায় আত্মনিয়োগ করেছে ঠিক তখনই তিনি সেদেশে গিয়ে তাদের অগ্রযাত্রার বিপুল আয়োজন দেখে অভিভূত হয়ে পড়েন। এ আনন্দ-আবেগ কবির প্রতিটা চিঠিতেই প্রকাশিত।
তিনি বিপ্লবের অল্প কিছুকাল পরে সেদেশে যাবার ফলে নব গঠনের যে প্রয়াস তাঁকে আনন্দ উচ্ছ্বসিত করে তুলেছিল পরবর্তীকালে বহুপরে যারা গেছেন তাঁদের রচনায় অনুরূপ আবেগ-উত্তেজনা নেই। প্রবোধকুমার সান্যাল প্রথমবার আমন্ত্রিত অতিথি হিসেবেই রাশিয়া যান। পর বৎসর তিনি নিমন্ত্রণ পাওয়া সত্ত্বেও নিজ অর্থ বা যে রাশিয়া গমন করেন।
এক্ষেত্রে অন্যান্যদের তুলনায় প্রবোধকুমার সান্যাল ব্যতিক্রম। সরকারী আতিথ্যের বাইরে থাকার সুবাদে তিনি রাশিয়াকে যতখানি কাছ থেকে দেখবার সুযোগ পেয়েছিলেন অন্যরা তা পাননি। ফলে তাঁর বর্ণনায় যে বিষয়গুলো এসেছে অন্যদের ক্ষেত্রে সেসবের সন্ধান মেলে না।
তবে মোহাম্মদ আবদুল ওয়াহহাবের দৃক্ষণে রাশিয়ার যে চিত্র ধরা পড়েছে তার সাথে প্রবোধকুমার সান্যালের পর্যবেক্ষণ অনেকখানি মেলে। সেদেশের কমিউনিষ্ট সমাজব্যবস্থার বৈষম্যের যে ছবি উভয়েই তুলে ধরেছেন তাতে তাঁদের দৃষ্টিভঙ্গিগত সাযুজ্য স্পষ্ট।
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর রাশিয়ার অভাবনীয় সাফল্যের পাশাপাশি সেদেশে অনুসৃত অর্থনৈতিক ও রাষ্ট্রীয় দর্শন এবং তাদের ব্যষ্টিগত ও সমষ্টিগত সীমারেখা, তাদের সমাজতান্ত্রিক বিধি ব্যবস্থা প্রভৃতি সম্পর্কে সমালোচনামূলক মন্তব্য রেখেছেন। আবদুল ওয়াহবের বর্ণনায়ও দেখা যায় তিনি তাদের আধুনিকীকরণের নব প্রয়াসকে অভিনন্দন জানানোর পাশাপাশি সেদেশের সাম্যবাদী প্রপাগান্ডার অন্তরালের ক্ষতস্থান; রাশিয়ার ক্ষয়িষ্ণু মুসলিম সম্প্রদায়ের দুঃখ-দুর্দশা সম্পর্কে বিরূপ মন্তব্য রেখেছেন।
প্রবোধকুমার সান্যাল সেদেশের ছোট খাট অতি তুচ্ছ ঘটনা থেকে শুরু করে বড় বড় অসঙ্গতিগুলো তুলে ধরার পরও তাঁর সামগ্রিক বোধে সোভিয়েট ইউনিয়নের সাফল্যের দিকটিই প্রধান হয়ে উঠেছে। রাশিয়ার ভালো-মন্দ দুটো দিক নিয়েই কথা বলেছেন এই লেখকত্রয়। অর্থাৎ সার্থক সমালোচনার দৃষ্টিতে দেখবার চেষ্টা করেছেন তাঁরা উন্নত সোভিয়েটের প্রতিটি বিষয়। তাই তাঁদের বর্ণনা একচেটিয়া প্রশংসা বা বিদ্বেষের একপেশে বিষয় হয়ে উঠেনি।
তাছাড়া এদের প্রত্যেকেরই রয়েছে একটি জীবনশীল মন যেখানে তাঁরা দরদী মানুষ। বিশ্বের একটি শ্রেষ্ঠ দেশে যেখানে মানবজীবনের এক বিচিত্র জটিল পরীক্ষা নিরীক্ষা চলছে সেখানকার জীবনের কথা জানতে চেয়েছেন এঁরা প্রত্যেকেই। সমাজতান্ত্রিক রাশিয়ার প্রকৃত অবস্থা ও উৎস অনুসন্ধানের ক্ষেত্রে এদের প্রত্যেকেরই নিরপেক্ষ মনের পরিচয় মেলে।
রোকাইয়া জাফরীর ‘লেনিনের দেশে লালনের মেয়ে ভ্রমণ কাহিনী হিসেবে অনবদ্য। সোভিয়েট দেশের নানা দিকের আলোচনা এসেছে তাঁর গ্রন্থে কিন্তু কমিউনিজমের ব্যাপারটিকে তিনি এড়িয়ে গেছেন বলে মনে হয়। অপরপক্ষে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর এবং প্রবোধকুমার সান্যাল এর দৃষ্টিভঙ্গি তাঁর নেই। লেখিকার রচনার ধরণটি সুন্দর। গল্প বলার ঢং এ লিখেছেন তিনি।
তাঁর আনন্দ-উচ্ছল বর্ণনা পড়তে গেলে মনে হয় গল্প করার আনন্দে তিনি মেতে উঠেছেন। ভ্রাম্যমাণের রোজনামচা, বিদেশের তথ্যপঞ্জী বা তত্ত্বাকারে এ গ্রন্থ লিখিত হয়নি। এদিক থেকে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর এবং প্রবোধকুমার সান্যালের সাথে তাঁর কিছুটা মিল রয়েছে।
শহীদুল্লা কায়সারের ‘পেশোয়ার থেকে তাসখন্দ স্বল্প পরিসরের একটি ভ্রমণ কাহিনী। এটিকে তাসখন্দ বৈঠকের রোজনামচাও বলা যায়। তবে নিরেট রোজনামচা এটি নয়। সোভিয়েট ইউনিয়নের তাসখন্দ নগরীতে অনুষ্ঠিত পাক-ভারত নেতৃত্বের শীর্ষ বৈঠককে কেন্দ্র করে লেখা কাহিনীর ক্ষুদ্র পরিসরে রয়েছে পৃথিবীর অনাদি ইতিহাস, তাসখন্দের পরিচয় এবং সেদেশের জীবনধারার নানা অনুসন্ধানমূলক তথ্যালোচনা।
কাহিনী খুব কম হলেও লেখকের বক্তব্য সম্পূর্ণ। সংক্ষিপ্ত বক্তব্যে তিনি বিধৃত করেছেন একটি বিশাল অঞ্চলের ক্রান্তিকালের ঘটনাপ্রবাহ। কমিউনিষ্ট আদর্শের ইতিবাচক দিকগুলোই তার রচনায় প্রধান হয়ে উঠেছে। একটি দিক লক্ষ্য করা গেছে যে, প্রবোধকুমার সান্যাল এবং রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর যেমন বিষয়ের গভীরে প্রবেশ করেছেন শহীদুল্লা কায়সার তা করেননি। খুব বেশী গভীরে তিনি যাননি বা যেতে চাননি বলে মনে হয়।
তাঁর খোলামেলা প্রকাশরীতিতেও ধরা পড়ে বিতর্ক তিনি যথাসম্ভব এড়িয়ে গেছেন। তবে মানবতাবাদী চিন্তাবিদ হিসেবে রবীন্দ্রনাথ যেমন ছিলেন সাম্যবাদী শহীদুল্লা কায়সারও ছিলেন জীবনাদর্শের দিক থেকে শোষিত মানুষের মুক্তির সমর্থক। তাই উভয়ের রচনাতেই মানবতাবাদী চিন্তাতত্ত্ব প্রতিফলিত।
সুফিয়া কামাল রচিত ‘সোভিয়েটের দিনগুলিতে’ নারী প্রসঙ্গই বেশী আলোচিত হয়েছে। সোভিয়েট দেশের অন্যান্য দিকের আলোচনাও এসেছে এ গ্রন্থে, সেসবের গুরুত্বও কম নয়। তবে সমগ্র রাশিয়ার উন্নত সামাজিক, রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক প্রেক্ষাপটে মানুষ বিশেষ করে নারীর লক্ষযোগ্য সম্মানজনক অবস্থানের ব্যাপকতা তাঁর নির্মাণ কৌশলে গভীর হয়ে উঠেছে।
নারীর গৌরবময় অবস্থানের প্রেক্ষিতে তিনি যেখানে আনন্দিত সেখানে প্রবোধকুমার সান্যাল উন্মোচন করেছেন আর এক দুঃখের ছবি, যেখানে অন্যান্য দেশের মত সোভিয়েট দেশেও ঝাড়ুদার মাত্রই মেয়ে। তিনি আক্ষেপ করে বলেছেন মেয়ের হাতে ঝাঁটা যেন সব দেশেই মানানসই। লেখিকা বলেছেন সাম্যের দেশ সোভিয়েট ইউনিয়নে কোন শ্রেণীবৈষম্য তাঁর চোখে পড়েনি।
আরও একটি বৈশিষ্ট্যের কথা তিনি বলেছেন সেখানে কেউ টিপস্ নেয় না। দেবার রেওয়াজ নেই। অথচ প্রবোধকুমার সান্যাল গ্রন্থের নানা জায়গায় সেদেশের বৈষম্যের চেহারা তুলে ধরেছেন এবং তিনি নিজ হাতে টিপস দিয়েছেন এমন দৃষ্টান্তেরও উল্লেখ করেছেন।
জসীম উদ্দীনের ‘যে দেশে মানুষ বড় সাধু ভাষায় রচিত একটি আকর্ষণীয় ভ্রমণ কাহিনী। লেখকের কবিত্বময় শৈলী পাঠক অন্তরকে স্পর্শ করেছে। রোমান্টিক কবির বর্ণনায় তাঁর সংবেদশীল হৃদয়ের ছবিটিও স্পষ্ট। আনন্দ-বেদনায় উদ্বেল কবি কল্পনা, আবেগ, হাস্যরস, মুগ্ধতা এসবের পাশাপাশি বাস্তব অভিজ্ঞতাকেও বর্ণনা করেছেন সাবলীলভাবে।
রূপমুগ্ধ কবি সোভিয়েট দেশের সৌন্দর্য বর্ণনার সাথে সাথে সেদেশের সামগ্রিক প্রেক্ষাপটকে তুলে ধরতে চেষ্টা করেছেন পাঠকের চোখের সামনে। সোভিয়েট দেশের ইতিবাচক দিকগুলোর কথাই তাঁর রচনায় এসেছে বেশী। জসীম উদ্দীন গ্রন্থের এক স্থানে উল্লেখ করেছেন সেদেশে কোন ভিখারী তাঁর চোখে পড়েনি অথচ প্রবোধকুমার সান্যাল বলেছেন বস্ত্রহীন তাঁর নজরে না পড়লেও ভিখিরি তিনি দেখতে পেয়েছিলেন।
খ. চীন ভ্রমণ কাহিনী
চীন দেখে এলাম
চীনদেশে ভ্রমণ নিয়ে রচিত সাহিত্যগুলির মধ্যে পশ্চিম বাংলার কেদারনাথ বন্দ্যোপাধ্যায়ের (১৮৬৩- ১৯৪৯) ‘চীনযাত্রী’ এবং মনোজ বসুর (জ. ১৯০১ – ) ‘চীন দেখে এলাম’ (প্রথম পর্ব ১৩৬০ ; দ্বিতীয় পর্ব ১৩৬২) অত্যন্ত বিশিষ্ট। বিখ্যাত সাহিত্যিক মনোজ বসুর বইটি বিপ্লবোত্তর চীন ভ্রমণ অবলম্বনে লেখা।
১৯৫২ সালে চীনের স্বাধীনতার তৃতীয় বর্ষ পূর্তি ও ২৫শে সেপ্টেম্বর শান্তি সম্মেলন উপলক্ষে আয়োজিত অনুষ্ঠানে ভারতীয় দলের অন্যতম প্রতিনিধি হিসেবে তিনি সেদেশে গমন করে চল্লিশ দিন অবস্থান করেছিলেন। সে অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে তিনি রচনা করেছিলেন এই অনবদ্য ভ্রমণ কাহিনী। ১৯৫২-৫৪ সালের শ্রেষ্ঠ সাহিত্য পুস্তক হিসেবে এটি দিল্লী বিশ্ববিদ্যালয় থেকে নরসিংহ দাস পুরস্কারে ভূষিত হয়।
শৈশবে ও কৈশরে পূর্ব বাংলার জল হাওয়ায় বেড়ে ওঠা লেখক বাঙালী রীতি-নীতির সবই জানেন। যৌবনে এসেছেন ভারতবর্ষে। তারপর এই এতটা সময় তিনি ইতিহাসের অধ্যায়ে অধ্যায়ে সভ্যতার ভাঙ্গা-গড়ার কত কিছুই না দেখেছেন, জেনেছেন। তাঁর সেসব বিচিত্র অভিজ্ঞতার প্রতিফলন ঘটেছে এ রচনায়।
নিতান্ত এ পাড়া ও পাড়ার মতো চীন ও ভারতের সুপ্রাচীন পড়শী সুলভ সহজ সম্পর্কে পশ্চিমী শার্দুলের আবির্ভাব আর তার বৈরী প্রভাব কতটুকু ক্ষতির কারণ হয়েছিল সে সম্পর্কিত তথ্য তিনি তির্যকভাবে চিহ্নিত করেছেন কাহিনীতে। কায়েমী স্বার্থের জুলুমে হিমালয় আর সমুদ্রের সহজ পথ ঘুরে গেছে তাদের জটিল পথে। অচেনা পথের নানান বাধায় জড়িয়ে ক্রমেই দু’দেশের মৈত্রী সম্পর্কে শৈথিল্যের ভাব এনে দিয়েছে ঐ দস্যুচক্র।
তাই ব্রিটিশ এলাকা হংকং ঘুরে চীনে যাবার বিধানটি হয়েছে কার্যকর। এমনি আরও এশিয়ার শান্তিপ্রিয় সমৃদ্ধ সুপ্রাচীন দেশগুলোতে পশ্চিমী বণিক আধিপত্যবাদের দৌরাত্ম্যের অন্ধকারময় ইতিহাস এবং ঐসব ফন্দিবাজদের ছোট-বড় নানা দুরভিসন্ধির খবর বর্ণনার ফাঁকে ফাঁকে অনাবৃত হয়েছে।
আগ্রাসী শক্তির ষড়যন্ত্রে একসময় আফিঙের নেশায় নিঃশেষিত চীন মৃত্যুশয্যা থেকে উঠে এসে কিভাবে ঠেকিয়েছিল তাদের নিশ্চিত মৃত্যুর দুর্দিন সেসব ভয়াবহ কাহিনীর বাস্তব চিত্র এতে প্রতিফলিত। তিনি মুগ্ধ হয়েছেন নয়াচীনের বিস্ময়কর সাফল্যে। শান্তিবাদী লেখক আপন অন্তরে গণতন্ত্রের যে ছবিটি দীর্ঘকাল ধরে লালন করে এসেছেন বিপ্লবোত্তর চীনের সামগ্রিক কর্মকান্ডে যেন তারই অবিকল রূপ তিনি দেখেছেন।
চীনের প্রতিটি দিকের আলোচনা এসেছে তাঁর গ্রন্থে বিভিন্ন আঙ্গিকে। ভৌগোলিক বিবরণ থেকে শুরু করে পুরোনো চীন সহ নতুন চীনের নানা ইতিহাস কাহিনী পাশাপাশি ভারতবর্ষ সহ পৃথিবীর বিভিন্ন দেশের প্রসঙ্গ এবং নয়াচীনের আদর্শ, উদ্দেশ্য, লক্ষ্য, ধ্যান-ধারণা, শিক্ষা, কৃষি, শিল্প, সংস্কৃতি, অর্থনীতি ও সমাজনীতির কথা গ্রন্থের প্রতিটি লাইনে আলোচিত হয়েছে।
তারপরেও এই সামগ্রিক আলোচনার ভেতর দিয়ে সে জাতির বৈশিষ্ট্যগুলোই যেন মাথা তুলে দাঁড়িয়েছে সর্বাগ্রে। পূর্ণ আত্মবিশ্বাস, গভীর অধ্যাবসায়, ধৈর্য, সংযম, সততা, নিষ্ঠা, দৃঢ়তা, সাম্য, ভ্রাতৃত্ব, সদা প্রস্তুত, চিন্তায় ও কাজে একাত্মভাব, ব্যক্তি চিন্তার ঊর্ধ্বে সমষ্টির ভাবনা, দেশ ও জাতিসহ বিশ্বহিতার্থে জাগ্ৰত কল্যাণবোধ, সময়ের যথাযথ মূল্যায়ন প্রভৃতি বৈশিষ্ট্যগুলোকে রক্ষা ও বিকাশের ক্ষেত্রে নিয়ন্ত্রক শক্তি হিসেবে কাজ করছে সেদেশের যোগ্য নেতৃত্ব, প্রয়োজনীয় শিক্ষা ও তার সঠিক প্রয়োগ এবং পরিকল্পিত অর্থনৈতিক ব্যবস্থা।
মানুষে-মানুষে সত্য পরিচয় হোক, বিশ্বশান্তি আসুক এটাই চীনাদের বড় কাম্য। এ সম্পর্কে লেখক বলেছেন- সমস্ত বিতর্ক ছেড়ে দিয়ে তোমরা যে মানব-সমাজ নিয়ে অতি আশ্চর্য এক্সপেরিমেন্ট করছ এবং বিস্ময়কর সাফল্যও পেয়েছ-শত চেষ্টাতেও এ সত্য লুকানো যাবে না। চিরাচরিত ভাবনার মূল ধরে নাড়া দিয়েছ তোমরা। শুধু মাত্র থিয়োরি নয়- হাতে-কলমে তা রূপায়িত করে দেখিয়েছ। আরো দেখাবে। ১
শিক্ষা ব্যবস্থার ক্ষেত্রে চীনের সর্বত্রই তিনি এক নীতি দেখতে পেয়েছেন। এ সম্পর্কে তাঁর মন্তব্য-
সত্যি, এ কী অমোঘ সঙ্কল্প। শতকরা আশিজন ছিল অশিক্ষিত তাদের একটি প্রাণীকে আর অজ্ঞ থাকতে দেবে না। সেন-চুন ষ্টেশনে পা দিয়ে দেখেছিলাম, গাড়ির মধ্যেও ঠিক সেই ব্যাপার। ইস্কুল কলেজ ম্যুনিভার্সিটি তো আছেই। পথযাত্রী, এখন একটু ফাঁক পেয়েছ, শিখে নাও যেটুকু পারো। ২
অর্থনৈতিক ব্যবস্থার কথায় বলেছেন-
মানুষ বিষম জীবন্ত হয়ে উঠেছে, ভীষণ খাচ্ছে। এত খেয়েও ফুরোয় না, তাই বাজারে দিচ্ছে। সেই সচ্ছলতা আমরা দেখে এসেছি। ৩
বিলাসিতাকে চীনারা কিভাবে বর্জন করেছে আর ভারতবর্ষে বিলাস সামগ্রীর প্রকোপ কতটুকু প্রাধান্য বিস্তার করেছে সে সম্পর্কে তিনি তীব্র কটাক্ষ করেছেন।
এ-পথে সাধারণের জন্য বিমান চলাচলের ব্যবস্থা নেই। হয়ে ওঠেনি- প্লেনের ঘাটতি আছে, মনে হয়। এই দিক দিয়ে ভারতীয় আমরা জিতে আছি। জিত আরো কত। শীতে চামড়া চৌচির হলেও ওদের এক আঙ্গুল ক্রীম জোটে না আর আমাদের মেয়েগুলো, অহরহ দেখতে পাচ্ছেন, কটকটে কালো মুখে পক্ক আপেলের আভা ধরাচ্ছে।
মনোজ বসুর রচনায় চীনের একচেটিয়া প্রশংসার কথা চোখে পড়ে ঠিকই তবে তা কিছুমাত্র পক্ষপাতদুষ্ট নয় । যে নিষ্ঠা ও একাগ্রতার সাথে কাজ করলে কোন কিছুর যথার্থ মূল্যায়ন সম্ভবপর হয় লেখক সেই শ্রদ্ধার সঙ্গেই চীনকে খতিয়ে দেখবার চেষ্টা করেছেন। তাঁর দৃক্ষণ এবং উপলব্ধির প্রকাশ ঘটেছে রচনায় ।
যদিও একটা জাতিকেই তিনি দেখেছেন কমিউনিষ্ট রাষ্ট্রনীতির কথাও নাই, প্রচারও নাই তবুও ‘চীন দেখে এলাম’ নামকরণের মধ্যে প্রগাঢ় হয়ে উঠেছে একটি ঋজু অন্তদৃষ্টির পরিতৃপ্ত অভিব্যাক্তি যা চীনকে জানার ক্ষেত্রে সহায়তা করে। আর সে বিচারেই গ্রন্থের নামকরণ সার্থক।
তাঁর বর্ণনাশক্তির চমৎকারিত্বের গুণে মনে হয় লেখক নিজেই আসরে বসে চীনের গল্প শোনাচ্ছেন। ছোট বড় নানান ঘটনা তাঁর লিপিচাতুর্যে অভিনব হয়ে উঠেছে। হালকা চটুল পরিহাস ও প্রবলকলহাস্যের মধ্যে দিয়ে তিনি উত্থাপন করেছেন অতি তুচ্ছ ঘটনা থেকে শুরু করে বহু গুরুগম্ভীর তত্ত্ব এবং তথ্য। মনে হয় তিনি যেন ফাঁকি দিয়ে পাঠকের হৃদয়ে প্রবেশ করিয়ে দিয়েছেন আপাত নিরস অথচ মূল্যবান সব খবর।
চীয়াং- আমলের মুদ্রাস্ফীতি- কলঙ্কের পাশাপাশি নবীন চীনের মুদ্রার দৃঢ়তা ও স্থিতিশীলতার একটি তুলনামূলক চিত্র আঁকতে বসে ক্রয়-বিক্রয়, লেন দেন, ব্যাঙ্কিং প্রভৃতি গুরুতর নীরস তত্ত্ব তথ্য সহ পরিবেশন করতে গিয়ে তিনি সেদিনের পরম দুর্গতির একটুখানি স্মরণচিহ্ন যে এখনও লেগে রয়েছে- নোটের উপর ছাপা মোটা অঙ্ক সে বিষয়টিও তুলে ধরেছেন রসিকতা ছলে-
দামের কাগজ আঁটাই ছিল জিনিসের গায়ে, ছিড়ে ফেলতে যেন ভুলে গিয়েছি। বন্ধুরা চমকে ওঠেন- কি কান্ড, দশ হাজার এটার দাম ? এত খরচ করে নিয়ে এলে ?
প্রেম- গদগদ কণ্ঠে বলি, তা কি হবে তুমি তো পর নও। চীনের একটা স্মরণ-চিহ্ন- জীবনে আর যাবো না টাকার মায়া করলে চলবে কেন ?
চুপি-চুপি বলছি, দশ হাজারের ঐ মহার্ঘ বস্তুর আমাদের হিসাবে দাম দাঁড়িয়েছে দু-টাকা এক আনার মতো। আটচল্লিশ শ চীনা ইয়ুয়ানে এক টাকা। কিন্তু চেপে যান। খবরদার, যেন চাউর হয়ে না পড়ে আমার বন্ধুজনের মধ্যে। পশার ভেস্তে যাবে।
তুলনামূলক আলোচনা
১৯৪৭ থেকে একাত্তর পর্যন্ত সময়ে চীন ভ্রমণকারী পূর্ববাংলার লেখকদের মধ্যে রয়েছেন আবুল কালাম শামসুদ্দীন, আবদুল আহাদ, ইব্ররাহীম খাঁ, মওলানা ভাসানী ও আবদুল খালেক। মনোজ বসু ও এদের মধ্যে একটি দৃষ্টিভঙ্গিগত সাজুয্য রয়েছে। তাঁরা প্রত্যেকেই গভীর অভিনিবেশের সাথে চীন সম্পর্কিত বহু বিচিত্র ও মূল্যবান তথ্য বিধৃত করেছেন। তবে প্রকাশ ভঙ্গির ক্ষেত্রে এরা প্রত্যেকেই স্বতন্ত্র।
দেশ বিভাগের পর থেকে বিদেশ গমন ও বিদেশ দেখবার সুযোগ হয়েছে অনেকেরই। তাঁদের সবাই লেখক না হলেও মানসিক উৎসুকা নিবৃত্তি এবং আত্মীয় স্বজনের অনুরোধে ভ্রমণ বৃত্তান্ত লিখেছেন অনেকেই। এদের কেউ তাঁদের ভ্রমণ অভিজ্ঞতা ব্যক্ত করেছেন বিদেশের তথ্যপঞ্জীর আকারে, কেউ বা রোজনামচার আকারে, কেউ লত্তাকারে, আবার কেউ বা কাহিনী বা গল্পের ঢং এ ।
মনোজ বসুর রচনা যেমন সরসতায় পাঠককে প্রবল নাড়া দেয় তেমনি তাঁর আলাপনী ঢঙের আনন্দ উচ্ছল বর্ণনা পাঠককে দেয় আনন্দ। তথ্যপঞ্জী বা দিনলিপির আকারে এটি লিখিত হয়নি। কাহিনীর গঠন পারিপাট্যে চোখে পড়ে লেখকের নিজস্ব কল্পনা বা পরিকল্পনাকে ছাপিয়ে ঘটনাগুলো যেন একের পর এক সেজে উঠেছে স্বয়ংসৃষ্টের মত করে। এই শিল্প কৃতিত্বই গ্রন্থটিকে দিয়েছে ভিন্ন মাত্রা।
আবুল কালাম শামসুদ্দীনের ‘নতুন চীন নতুন দেশ’ গ্রন্থখানি সজাগবোধের স্বকীয়তায় অনন্য তবে এটি অনেকটাই ভ্রাম্যমাণের রোজনামচার আকারে লিখিত। লেখক এতে সংক্ষিপ্ত সফরের টুকরো অভিজ্ঞতাগুলোকে ধারাবাহিকভাবে সাজিয়ে দিয়েছেন মাত্র। কখনও কখনও সে বর্ণনা সাহিত্যমন্ডিতও হয়ে উঠেছে তবে তা সম্পূর্ণ রসোত্তীর্ণ নয়।
সঙ্গীত শিল্পী আবদুল আহাদের ‘গণচীনে চব্বিশ দিন’ একটি প্রাণবন্ত ভ্রমণ কাহিনী। লেখকের চিন্তা ও কর্মের সমন্বয় ঘটেছে এ রচনায়। তাঁর বর্ণনার ধরণটি অনেকটাই বৈঠকী আলাপের। মনোজ বসুর ষ্টাইলটি যেমন যাদুকরী লিপিচাতুর্যে ভরপুর, আবদুল আহাদের ক্ষেত্রে তা নয়। ফর্মের চেয়ে বিষয়ের প্রতিই তিনি ছিলেন মনোযোগী।
চার অধ্যায়ে বর্ণিত এ ভ্রমণ কাহিনী লেখকের প্রথম রচনা হলেও নয়া চীনের জীবনধারা সম্পর্কিত এবং নানা তথ্যবহুল আলোচনা সম্বলিত সমগ্র চীনকে জানবার জন্য ভালো একটি বই। সাহিত্য বিচারেও এ সৃষ্টি নানা দিক থেকে সার্থক ।
বস্তুনিষ্ঠ বর্ণনায় বিচিত্র অভিজ্ঞতালব্ধ জ্ঞানে ইব্ররাহীম বার ‘নয়াচীনে এক চক্কর’ গ্রন্থখানি রসোত্তীর্ণ। তাঁর বর্ণনার ধরনটিও অনেকটাই দিনলিপির কাছাকাছি। তিনি সফর অভিজ্ঞতার খন্ড খন্ড চিত্রগুলোকে পরিকল্পিতভাবে ছোট ছোট শিরোনামের আওতায় এনে ধারাবাহিকভাবে গেঁথে দিয়েছেন।
আপন সচেতনতার ক্রম অনুসারে গড়ে উঠেছে তাঁর শৈলী। মনোজ বসুর রচনা যেমন তাঁরই অজান্তে ইতিহাসের নির্দেশে আপন সজ্জায় সচেতনতায় পূর্ণ হয়ে উঠেছে, ইব্ররাহীম খাতে তা অনুপস্থিত। অথচ পরিহাসপ্রিয়তার ক্ষেত্রে তাঁদের রচনায় প্রচুর মিল লক্ষ্য করা যায়। হালকা রসিকতার ভেতর দিয়ে গুরুগম্ভীর ও মূল্যবান বিষয় তুলে ধরবার ক্ষেত্রে এরা দু’জনেই সফল।
মওলানা ভাসানী রচিত ‘মাও সে-তুঙ এর দেশে’ গ্রন্থটিতে সাম্যবাদের প্রয়োগ সাফল্যের দিকটিই আলোচিত হয়েছে বেশী। এ গ্রন্থ অন্যান্য ভ্রমণ কাহিনীর মত নয়। কমিউনিষ্ট আদর্শের প্রতি লেখকের প্রতীতি ও শ্রদ্ধাবোধের নির্ভেজাল লিপিচিত্র গ্রন্থটি। অপরদিকে মনোজ বসুর ‘চীন দেখে এলাম’ রাষ্ট্রনীতির কথা বা প্রচার বিবর্জিত চীনের সামগ্রিক রূপরেখার বিশেষ করে সমগ্র চীনা জাতির এক পূর্ণাঙ্গ লেখাচিত্র।
মনোজ বসু তাঁর রাজনৈতিক মতবাদ নিয়ে আলোচনায় মেতে উঠেননি এবং তাঁর আবেগকে এমন কোন তত্ত্বস্রোতে প্রবাহিত হতে দেননি যা অরাজনৈতিক বা বিরুদ্ধবাদী পাঠককে ক্ষেপিয়ে তুলতে পারে। অর্থাৎ দলমত নির্বিশেষে এ গ্রন্থ সকল শ্রেণীর পাঠকের কাছে সমানভাবে আদৃত হয়েছে।
অপরদিকে মওলানা ভাসানী তাঁর কমিউনিষ্ট মতবাদপুষ্ট রচনায় বিরুদ্ধবাদী ও প্রতিক্রিয়াশীলদের কখনও কখনও সরাসরি আক্রমণ করেছেন, যা ঐ শ্রেণীর পাঠককে স্বভাবতই বিরূপ করে তুলেছে। গভীর তত্ত্ব ও তথ্য প্রকাশে মনোজ বসুর রচনা যেমন পরিহাসপ্রিয়তার কৌশলগত শিল্পচাতুর্যে ভরপুর মওলানা ভাসানীর ক্ষেত্রে সেসবের প্রকাশ ঘটেছে সরাসরি বক্তব্যে।
তবে তা কখনই সাহিত্যরস বিবর্জিত নয়। মাও সে-তুঙ এর দেশে রোজনামচার আকারে লিখিত হয়নি ঠিকই কিন্তু এতে কাহিনীও রয়েছে খুব কম, তবে সাহিত্য বিচারে এ গ্রন্থ সুপাঠ্য। লেখকের প্রাজ্ঞপূর্ণ শৈল্পিক রচনা পাঠককে মুগ্ধ করে। অপরপক্ষে মনোজ বসুর রচনা সৌষ্ঠবে যে সৌন্দর্য বিরাজিত তার সাথে এর বিস্তর তফাৎ রয়েছে। পর্যায়ক্রমে এদের একটি ব্যক্ত এবং অপরটি গুপ্ত সৌন্দর্যের শিল্প কৃতিত্বের দাবিদার।
‘পদ্মা থেকে ইয়াংসি’ গ্রন্থে আবদুল খালেক চীন সম্পর্কে যে মনোভাব ব্যক্ত করেছেন তা যতটা নির্ভরযোগ্য অন্যদের উক্তি ততখানি নয়। লেখক চীনা জীবনের সাথে পরিচিত হবার সুযোগ ও সময় পেয়েছিলেন পুরো দশমাস। যেখানে সরকারী সফরকারী বা অন্যান্য উদ্যোগে যাঁরা যান তাঁরা সময় পেয়ে থাকেন নিতান্তই খুব কম।
সময় সংক্ষিপ্ততার কারণেই অনেক সময় যথেষ্ট যত্নবান এবং প্রকৃত সত্যানুসন্ধিৎসুদের পক্ষেও আসল সত্য উদ্ঘাটন করা সম্ভবপর হয়ে ওঠে না। আবদুল খালেক এই সীমাবদ্ধতা থেকে অনেকটাই মুক্ত। চীনা জীবনের ছোট খাট বিষয়াদি থেকে শুরু করে অনেক বড় বিষয়ের খবর, বিশেষ করে চীনা জাতীয় ও সমাজ জীবনের যে চিত্র তিনি তুলে ধরেছেন তা তাঁর সত্যোপলব্ধির সরল স্বীকারোক্তি। তিনি গণচীনের ভালো-মন্দ দুটো দিক নিয়েই কথা বলেছেন।
এ পর্যন্ত অন্যান্যদের আলোচনায় চীনের ইতিবাচক দিকগুলোর কথাই এসেছে বারবার। আবদুল খালেক তাঁর প্রতি মুহূর্তের গভীর পর্যবেক্ষণের যৌক্তিক সমালোচনায় প্রমাণ করেছেন যে, অন্যদের সত্যনিষ্ঠ বর্ণনার সবটুকুই বিশ্বস্ত নয়। তিনি বলেছেন গণচীনের সমাজ-ব্যবস্থা, আদর্শ ও মতবাদ সম্পর্কে পুঁথিগত অভিজ্ঞতার সাথে বাস্তব অভিজ্ঞতার বেশখানিক পার্থক্য রয়েছে।
‘পদ্মা থেকে ইয়াংসি’ মূলত গণচীনের জীবন প্রণালীর বাস্তব অভিজ্ঞতালব্ধ রচনা। আর এ কারণেই অনেকের সংগে আবদুল খালেকের বক্তব্যে পার্থক্য দেখা দেয়। তিনি চীনের সামগ্রিক কর্মকান্ডের মুগ্ধ বর্ণনার পাশাপাশি বলেছেন সেখানকার কমিউনগুলো দারিদ্রা আক্রান্ত এবং সেসব জায়গার পরিবেশ এতটাই নোংরা ও অস্বাস্থ্যকর যে তা পাকিস্তানের যে কোন নোংরা বস্তিকেও হার মানায়। এছাড়াও চীনে প্রয়োজনের তুলনায় বাড়ী ঘরের সংখ্যা কম এবং সেগুলো আকৃতিতে এত ছোট যে খোলামেলা পরিবেশ সেসব আবাসগৃহে একেবারেই পাওয়া যায় না।
তাছাড়া কমিউনিষ্ট রাষ্ট্র ব্যবস্থায় নিজস্ব বলতে কিছু না থাকায় সেখানে মানুষে মানুষে মায়া- মমতার বন্ধন শিথিল। লেখক তুলনামূলকভাবে দীর্ঘ সময় চীনে কাটিয়েও সরলভাবে স্বীকার করেছেন বিশাল চীনকে তিনি সম্পূর্ণভাবে জানতে পারেননি। তিনি আরও বলেছেন গণচীন সম্পর্কে তিনি সব সত্য কথা অকপটে প্রকাশ করতে পেরেছেন- এমন দাবিও তিনি করেন না।
অর্থাৎ তাঁর সীমাবদ্ধতার সত্যটিও তিনি সকলকে জানিয়ে দিয়েছেন অসংকোচে। মনোজ বসুর রচনায় চীনের যে একতরফা প্রশংসার কথা রয়েছে তাও তাঁর অকাট্য যুক্তিতে মোটেই পক্ষপাত দুষ্ট নয়। তবে সময় সংক্ষিপ্ততার কারণেই সেদেশের চোখ ধাঁধানো সৌন্দর্য এবং নানাবিধ মুগ্ধতার পাশাপাশি যে কিছুটা দৈন্য লেগে আছে তা তাঁর সতর্ক দৃষ্টিকেও এড়িয়ে গিয়েছে বলে মনে হয়।

