ভাওয়াল গড়ের উপাখ্যান । বাংলাদেশের উপন্যাসের শৈলীবিচার

আজকে আমাদের আলোচনার বিষয়: ভাওয়াল গড়ের উপাখ্যান। এটি বাংলাদেশের উপন্যাসের শৈলীবিচার এর মিথ ইতিহাস ঐতিহ্যের নবমূল্যায়নধর্মী নতুন শিল্পশৈলীর উপন্যাস এর অন্তর্গত।

 

ভাওয়াল গড়ের উপাখ্যান

 

ভাওয়াল গড়ের উপাখ্যান

আবু জাফর শামসুদ্দীনের (১৯১১-১৯৮১) ভাওয়াল গড়ের উপাখ্যান’ (১৯৬৩) ইতিহাসখ্যাত ফরাজী আন্দোলনে পটভূমিতে রচিত হলেও এটিকে প্রকৃতপক্ষে ঐতিহাসিক উপন্যাস বলা যায় না। কারণ, ঐতিহাসিক ঘটনা বা চরিত্রকে তিনি অবলম্বন করেন নি বরং ইতহাসের ভাবসত্যকে তিনি অনুসরণ কেরছেন মাত্র।

ব্যক্তিগত জীবনে আবু জাফর শামসুদ্দীন ছিলেন একজন প্রাজ্ঞ ও সফলকাম সাংবাদিক, ফলে দৃষ্টি-নিরপেক্ষ চোখ দিয়ে তিনি অবলোকন করেছিলেন বাঙালীর স্বাতন্ত্র্য ও স্বাধিকার অর্জনের সংগ্রামী চেতনাকে। ভাওয়াল গড়ের উপাখ্যান’ তাঁর আত্ম- অনুসন্ধান ও স্বাতন্ত্র্য আবিষ্কারের বিশ্বস্ত শিল্পভাষ্য।

বিভাগ (১৯৪৭) উত্তর সমকালীন অন্যান্য বাঙালী মুসলমান লেখক যখন পশ্চিম এশীয় পুঁথি পুরাণের মধ্যে নিজেদর ঐতিহ্যের সন্ধানে ব্যস্ত তখন আবু জাফর শামসুদ্দীন আপন শ্লাঘারবোধ উজ্জীন প্রচেষ্টায় স্ব ভূমির ইতিহাস-ঐতিহ্যের প্রতি দৃষ্টিপাত করেন। প্রদোষ লগ্ন থেকে ধাবমান কাল পর্যন্ত শতমূলে সঞ্চারিত বাঙালির আত্মরক্ষার সংগ্রামী চেতনা এক্ষেত্রে তাঁকে আকর্ষণ করেছে।

ঐতিহাসিক চরিত্র বা ঘটনা তাঁকে প্রলোভিত করেনি বরং ইতিহাসের ভাবসত্য তাঁকে প্রেরণা যুগিয়েছে। এর কারণ, ইতিহাস নির্জীব, নিশ্চল, অতীতের কাহিনী, ইতিহাসের সত্যকে হুবহু অনুসরণ করতে গেলে ঔপন্যাসিক ইতিহাসের সত্য-শৃঙ্খলে বাঁধা পড়েন। শিল্প কখনো সত্য-শৃঙ্খলে আবদ্ধ থাকতে পারে না-শিল্পের স্বভাবই বন্ধন মুক্তি। তাই রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর (১৮৬১-১৯৪১) তাঁর ‘ঐতিহাসিক উপন্যাস’ প্রবন্ধে বলেছেন- ইতিহাস পড়িব না আইভানহো পড়িব? ইহার উত্তর অতি সহজ। দুই-ই পড়ো।

সত্যের জন্য ইতিহাস পড়ো, আনন্দের জন্য আইভানহো পড়ো। …. কাব্যে যদি ভুল শিখি, ইতিহাসে তাহা সংশোধন করিয়া লইব।” আবু জাফর শামসুদ্দীন এক্ষেত্রে শিল্পে প্রতিশ্রুত ও ইতিহাসের ভাবসত্যে অনুশ্রুত বিষয় অবলম্বন করেন। ফরায়েজি আন্দোলন, ইংরেজদের বিরুদ্ধে পরিচালিত ধর্মপ্রাণ বাঙালি মুসলমানদের আত্মরক্ষা ও স্বাতন্ত্র্য রক্ষার সংগ্রামে এক রক্তাক্ত অধ্যায়।

ঊনবিংশ শতাব্দীর কলকাতা কেন্দ্রিক বাঙালির রেনেসাঁসের মৌল বৈশিষ্ট্য হিসেবে ধর্ম ও সমাজ সংস্কারের যে প্রাবল্য দেখা যায়, মুসলমান জনগোষ্ঠীও বাঙালির রেনেসাঁসের মৌল বৈশিষ্ট্য হিসেবে ধর্ম ও সমাজ সংস্কারের যে প্রাবল্য দেখা যায়, মুসলমান জনগোষ্ঠীও সেরূপ সংস্কার আন্দোলন থেকে বিচ্ছিন্ন ছিলনা।

 

ভাওয়াল গড়ের উপাখ্যান

 

হিন্দু সমাজের ধর্ম ও সমাজসংস্কার আন্দোলনের পাশাপাশি মুসলমান সমাজের ধর্ম ও সমাজসংস্কার আন্দোলন ঊনবিংশ শতাব্দীর প্রথমার্ধেই প্রবলরূপ ধারণ করে। উত্তর ভারতের সৈয়দ আহমদ তৎকালী পূর্ব বাংলার ফরাজি নেতা হাজী শরীয়তুল্লাহ (১৭৮১-১৮৪০) এবং চব্বিশ পরগনার (হাজী নিসার আলী ) তিতুমীর (১৭৮২-১৮৩১) হজ্ব পালন করতে মক্কায় গিয়ে ওহাবিদের সংস্পর্শে আসেন এবং দেশে ফিরে এসে এই সংস্কার আন্দোলনে আত্মনিয়োগ করেন। এর পূর্বে ফকিরমজনু শাহ-র নেতৃত্বে বাংলার ফকির বিদ্রোহের কথা স্মরণ করা যায়।

বাংলাদেশ ভূখন্ডে ফরাজি আন্দোলন তথা এই সংস্কার আন্দোলনের নেতা ছিলেন হাজী শরীয়তুল্লাহ। তিনি বর্তমান শরীয়তপুর জেলার অধিবাসী ছিলেন। তাঁর মৃত্যুর পর পুত্র মহসীন আলদীন আহমদ দুদুমিঞা (১৮১৯-১৮৬০) এ আন্দোলনের নেতৃত্ব নেন। মূলত এই দুদুমিঞার প্রচে য়ে ফরাজী আন্দোলন’ ধর্মীয়, সমাজিক, রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক আন্দোলনের এক মিশ্র রূপ ধারণ করে।

বাংলার ফরাজি আন্দোলনের কর্মীদের সঙ্গে সমকালীন শাসকগোষ্ঠী বার বার সংঘর্ষে অবতীর্ণ হলেও এ সংঘাতের কোনো রাজনৈতিক রূপ ছিলো না। তবে এ আন্দোলন বাংলার মুসলিম মানসে সংগ্রামের বীজ উপ্ত করেছিল, যা উত্তরকালে সর্বভারতীয় ওহাবি আন্দোলনের প্রেরণা যোগায়। ওহাবি আন্দোলন প্রথমে ধর্ম সংস্কার আন্দোলন হিসেবে শুরু হলেও পরিণামে ব্রিটিশ বিরোধী রূপ ধারণ করে।”

আবু জাফর শামসুদ্দীন ইতিহাসের সময় গর্তে লুকায়িত প্রশ্ন সম্ভাবনা থেকে প্রেরণা লাভ করেছেন। তাঁর ‘ভাওয়াল গড়ের উপাখ্যান’ ইতিহস সমৃদ্ধ রোমান্সধর্মী উপন্যাস। বাংলাসাহিত্যে ঐতিহাসিক উপন্যাসের যে ধারা বঙ্কিম চন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের (১৮৩৮-১৮৯৪) ‘রাজসিংহ’ (রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের (১৮৬১-১৯৪১), ‘রাজর্ষি’, ‘বৌ- ঠাকুরাণীর হাট’ ইত্যাদিতে পরিশ্রুত, সেই ধরার থেকে আবু জাফর শামসুদ্দীনের ‘ভাওয়াল গড়ের উপাখ্যান’ ভিন্ন। তাঁর অন্বেষণ ছিলো বাঙালির সংগ্রাশীল চেতনা আবিষ্কার।

 

ভাওয়াল গড়ের উপাখ্যান

 

২.

আবু জাফর শামসুদ্দীনের ‘ভাওয়াল গড়ের উপাখ্যান’ ইতিহাসের ভারসত্যে সমৃদ্ধ, বাঙালির সংগ্রামীচেতনা ও জাতিসত্তার উজ্জীবনমূলক উপন্যাস। বিষয় ও মূল্যবোধ প্রতিষ্ঠায় তিনি প্রগতিশীল চিন্তার স্বাক্ষর রাখলেও প্রকরণ- পরিচর্যায় ততটা যত্নশীল নন। উপন্যাসের কাহিনী বিন্যাস, চরিত্র-চিত্রণ, ভাষা ও জীবনবেদ নির্মাণের ক্ষেত্রে তিনি অনেকটা প্রধাগত।

প্রায় সাড়ে চার’শ পৃষ্ঠার বিশাল আয়তনের এই উপন্যাসে অসংখ্য উপকাহিনীর সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে অনেকগুলো চরিত্র। সময় ও সমাজবাস্তবতাকে অধিক গুরুত্ব দিতে গিয়ে এই উপন্যাসের কাহিনীর বিস্তৃতি ও অজস্র চরিত্রের সমাবেশ ঘটেছে। ‘ভাওয়াল গড়ের উপাখ্যান’ ‘গ্রন্থননৈপুণ্য ও বর্তমান শতকের সমান্তরাঘটনার সাদৃশ্যে গত শতকের ঘটনাকে নবতাৎপর্য দানে মূল্যবান হয়ে উঠেছে।”

কাহিনী নির্বাচনে ঔপন্যাসিকের ইতিহাসবোধ ও ঐতিহ্যের অঙ্গীকার সুস্পষ্ট। ঊনবিংশ শতাব্দীর বাঙালি মুসলামনের স্বাতন্ত্র্য্যসাধনার রক্তক্ষয়ী প্রচেষ্টা ফরাজি আন্দোলনের পটভূমিকায় এ উপন্যাসের আখ্যান গড়ে উঠেছে। ইংরেজ শাসনের বিরুদ্ধে মুসলামনদের বিদ্রোহের প্রস্তুতি এবং ইংরেজ রাজশক্তি ও তাদের অনুচর হিন্দুদের সঙ্গে সংঘাত, পরিণামে আন্দোলনকারীদের বিপর্যয় উপন্যাস কাহিনীর সারাংশ।” কাহিনীর পরিকল্পনা করা হয়েছে ফরাজি আন্দোলনের অন্যতম নেতা চুরুলিয়ার গুলাম নবী’র ভাওয়ালের আস্তানাকে কেন্দ্র করে। উপন্যাসটির শুরু হয়েছে এভাবে :

“ফালগুন মাস। পথে ঘাটে আমের বোলের সুস্নিগ্ধ গন্ধ; শিমুল আর কৃষ্ণচূড়া ফুলের বর্ণ সমারোহ। চোখ ঝলসে যায়, মনে হয় চারিদিকে যেন বর্ণের আগুন লেগেছে। নূর বখশ সফরে বের হয়েছেন। সঙ্গে একমাত্র পুত্র কমরুদ্দীন। বয়স বারো তেরো…

বর্ণাঢ্য প্রাকৃতিক পরিবেশে ঔপন্যাসিক চরিত্রকে স্থাপন করেছেন। নূর বখ্শ তার একমাত্র পুত্র কমরুদ্দীনকে সঙ্গে নিয়ে অভিযাত্রায় বের হয়েছেন। এই নূরবংশ ফরাজি আন্দোলনের একজন নিবেদিত প্রাণ কর্মী। নূর বখশ অনেক বন-জঙ্গল, গ্রামপথ অতিক্রম করে ভাওয়ালের বনে গুলাম নবীর আস্তানায় এসে উপস্থিত হয়। পুত্র কমরুদ্দীন সেখানে সঙ্গী হিসেবে পায় গুলাম নবীর কন্যা নুরুন্নাহারকে উভয়ে সমবয়সী।

ভাওয়াল আস্তানায় অবস্থান করার সময় একদিন নূর বখ্শ শুনতে পান, তাদের আন্দোলনের অন্যতম প্রধান কেন্দ্র “সিতানার ঘাটি’ নাসারারা পুড়িয়ে দিয়েছে। নূর বখশের মধ্যে আন্দোলনে স্পৃহা বাড়ে। গুলাম নবীর আস্তানার কাছেই একটি ভাঙ্গা মসজিদ। এই মসজিদে আন্দোলনের কর্মীরা আসে, গুলাম নবী তাদের নানা আদেশ উপদেশ, কৌশল শিক্ষা দেন। জাহান্দার ও আসে, বয়সে নবীন হলেও কর্তব্যে সে নিষ্ঠাবান।

নূর বখন দীর্ঘদিন আস্তানায় থাকার পর একদিন বাড়ি উদ্দেশ্যে যাত্রা করে। পুত্র কমরুদ্দীন নুরুন্নাহারের সঙ্গে গুলাম নবীর কাছে শিক্ষালাভ করতে থাকে। বাংলার নীল চাষের শেষ সময়। নীলকর বাঙালী হিন্দু জমিদার সত্যানারায়ণ এবং ইংরেজ রয়েসটন সাহেব নীলের চাষ বাড়ানোর জন্য অন্য নীলকর সাহেবদের মত অত্যাচারের মাধ্যমে দুঃসহ করে তুলেছিল সাধারণ চাষীর জীবনকে।

নীলকর সাহেবরা ছিলো ফরাজি আন্দোলনের কর্মীদের আক্রমণের লক্ষ্য বস্তু। রয়েসটন সাহেবকে একাবর বোলাই বিলে হাতে পেয়েও জাহান্দার কেবল তার থেকে প্রতিশ্রুতি আদায় করিয়ে ছেড়ে দেয়। কিন্তু এর ফল ভোগ করতে হয় আশপাশের গ্রামের চাষীদের। রয়েসটন সীমাহীন অত্যাচার করে নীরিহ চাষীদের উপর। নীলকর সাহেবদের অত্যাচার থেকে গরীব চাষীদের বাঁচাবার জন্য ফরজি আন্দোলনের যোদ্ধারা কৃষকদের সঙ্গে যোগ দেয়।

অপর দিকে নীলকরদের সাহায্য করে এদেশের কিছু হিন্দু জমিদার, সেপাই-সান্ত্রী। প্রথম দিকে ফরাজি আন্দোলনের কর্মীদের সঙ্গে ইংরেজদের তেমন কোন দ্বন্দ্ব না থাকলেও পরে বাংলার কৃষক জমিদার দ্বন্দ্বসূত্রে সংঘাত অনিবার্য হয়ে ওঠে। উপন্যাসের ভাষায় :

প্রকাশ্যে মৌলভী মুন্সীদের প্রচার ছিল খাঁটি ধর্মীয় জীবন পুন: প্রতিষ্ঠার আন্দোলন। সুতরাং আলেমদের সঙ্গে সংগ্রামে লিপ্ত হওয়ার অর্থ ছিল ইসলাম ধর্মের বিরুদ্ধে সংঘর্ষে লিপ্ত হওয়া। ইংরেজী রাজশক্তি রাজনৈতিক এবং অর্থনৈতিক জীবনে মসুলমানদের সর্বনাশ সাধনে তৎপর ছিল বটে কিন্তু তারা সমগ্র ভারতের মুসলমান সমাজকে ধর্ম রক্ষার জেহাদে আহবান করতে প্রস্তুত ছিলনা।

 

বাংলাদেশের উপন্যাসের শৈলীবিচারের সূচীপত্র

 

নূর বখ্শ নিজের উদ্দেশ্য সাধনের জন্য নসু প্রধানকে জমিদার সত্যনারায়ণের অত্যাচার থেকে রক্ষা করার জন্য নসুপ্রধানের বাড়িতে অবস্থান করে। কিন্তু শেষ রক্ষা হয় না। কুঠিখালের আক্রমণে আহত হয়ে নসু প্রধান ও তার সাঙ্গপাঙ্গরা বন্দী হয়। এখবর পেয়ে জাহান্দার কুঠি আক্রমণ করে এবং যুদ্ধ করে তাদেরকে মুক্ত করে, কিন্তু সেই খণ্ডযুদ্ধে নসু প্রধান মারা যায়।

এদিকে পুলিশ গুলাম নবীর আস্তানা আক্রমণ করে। সংঘর্ষে দলনেতা গুলাম নবী নিহত হয়। জাহান্দার এসে গুলাম নবীর রক্তাক্ত দেহ দেখে এবং তার লাশ পেছনে রেখে নূরুন্নাহারকে নিয়ে বনে আত্মগোপন করে। নুরুন্নাহার দেখতে পায় জাহান্দারও আহত। কমরুদ্দীন বাড়ি থেকে ফিরে এসে দেখে গুলাম নবীর আস্তানা লন্ডভন্ড, কেবল কয়েকটি মৃতদেহ পড়ে আছে, নূরুন্নাহর সেখানে নেই। নুরুন্নাহারের জন্য তার হৃদয় হাহাকার করে ওঠে। কারণ নুরুন্নাহারের সঙ্গে রয়েছে তার অনেক স্মৃতি, ভালোবাসার নিবিড়বন্ধন। উপন্যাসটির শেষ হয়েছে এভাবে

“দেশ শান্ত সমাহিত হয়।বাজনা উনবিংশ শতাব্দীর মুক্তি সংগ্রামের উপর যবনিকা পড়ে। ইংরেজ সরকার স্বস্তির নিঃশ্বাস ছাড়ে।

উপন্যাসের এই পরিসমাপ্তিতে কোনো বিজয় কিংবা উজ্জীবন লক্ষ্য করা যায় না। উপন্যাসের ভাষায় ‘বাংলার মুক্তিসংগ্রামের যবনিকা’ ধ্বনিত হয়েছে। তবু ঔপন্যাসিকের কাহিনী বিন্যাস ও চরিত্র চিত্রণে বাঙালির সংগ্রামশীল চেতনার স্পন্দন সঞ্চারিত। উপন্যাসের ঘটনাক্রমে, চরিত্ররে আচরণ উচ্চারণে বাঙালি মুসলমানের আত্ম-অনুসন্ধান স্পষ্ট। গুলাম নবীর অভিব্যক্তিতে তারই আভাস পাওয়া যায় :

তিস্তা, গঙ্গা, পদ্মা, যমুনা, ব্রহ্মপুত্র, মেঘনা আর তাদের শত সহস্র শাখা-প্রশাখার ঐশ্বর্যবান বাঙ্গলার পলিমাটির মানুষ পরাধীনতা বরদাশত করতে পারে না। এখানকার মানুষ চায় বৃক্ষলতা ও লোকবসতী হীন নদী চরের সূর্যালোকের মতো নির্ভেজাল মুক্ত আলোবাতাস। মন তার ছুটে বল্গাহারা অশ্বের মতো। সে চায় না তার জীবনে বাইরের লোকের খবরদারী। রজ্জুর বন্ধন আর চির বন্ধন তার কাছে এক বরাবর। ভাইসব, এ জনতাকে এক কর। বর্ণ হিন্দু কেউ কেউ যদি নাসারাদের সঙ্গে যোগ দিয়ে থাকে, কিছু আসে যায় না তাতে। মুসলামান গদারদের কথাও ভুলে যাও দেশের বাকী শতকরা নব্বই জনই আমাদেরকাজের জন্য যথেষ্ট। কোচ, কোল, সাঁওতাল এবং সাধারণ হিন্দু আর মুসলমানের সমন্বয়ে গঠিত শক্তির মোকাবেলায় নাসারা আর তার সহায় দেশী হিন্দু মুলমান গাদ্দারের দল এক ফুৎকারে তৃণের মতো উড়ে যাবে ।

এই সংজ্ঞামী জীবনচেতনার প্রদীপ্ত উচ্চারণ ভাওয়াল পড়ের উপাখ্যান’ উপন্যাসে শিল্পায়িত হয়েছে। উপন্যাসের মধ্যপর্যায়ে ইংরেজদের সঙ্গে যুদ্ধ করে নুর বখশ মারা যায়, বাংলার স্বাধীনতার জন্য প্রাণ দেয় গুলাম নবী। এই সংগ্রামী চেতনার উত্তরাধিকার বহন করার জন্য কেবল বেঁচে থাকে গুলাম নবীর যোগ্য শিষ্য জাহাপার, কমরুদ্দীন, নুরুন্নাহার। উপন্যাসের চরিত্র পাত্রে সংগ্রামী চেতনার বাস্তবসম্মত জীবনাকাঙ্ক্ষা প্রতিষ্ঠা করতে সমর্থ হয়েছেন, এখানেই ঔপন্যাসিকের কৃতিত্ব।

“ভাওয়াল গড়ের উপাখ্যান’ উপন্যাসে আবু জাফর শামসুদ্দীন প্রধানত বিবরণধর্মী উপস্থানরীতির উপর নির্ভরশীল ছিলেন। ফলে ঘটনা ও চরিত্রের ক্রিয়-প্রতিক্রিয়া উপস্থাপনে তিনি ব্যবহার করেছেন চিত্রশৈলী (pictorial manner) পক্ষান্তরে গ্রামীন জীবনপ্যাটার্নের স্বরূপ উন্মোচনে ব্যবহার করেছেন বর্ণনা (narration)।

সময় প্রবাহ ও জীবনপ্রবাহের অনিবার্য প্রয়োজনে এসেছে অনেক চরিত্র নূর বখশ, গুলাম নবীম, জাহান্দার, কমরুদ্দীন, নসু প্রধান, জমিদার সত্যনারায়ণ, কুঠিয়াল ওয়েসটন সাহেব, বলাই ঠাকুর, প্রসন্ন ঘোষ, নুরুন্নাহার প্রমুখ। তবে নুর বখশ গুলাম নবী, জাহান্দার কমরুদ্দীন ও নুরুন্নাহার এ উপন্যাসের মূল সত্য ও বক্তব্যকে প্রকাশ করেছে। নূর বখ্শ দুটি উদ্দেশ্য সামনে রেখে বাড়িতে মাদ্রাসা স্থাপন করেছে :

এক. ধর্মীয় শিক্ষায় শিক্ষিত করে মুসলমান সমাজকে উন্নত করা। দুই, ইংরেজদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করার জন্য খাঁটি সৈনিক তৈরি করা। ইংরেজদের বিরুদ্ধে জেহাদকে ত্বরান্বিত করার জন্য তিনি মাদ্রাসা থেকে অর্জিত অর্থের একটা অংশ পাটনা মূল ঘাটিতে পাঠান। নূর বখ্শ এ উপন্যাসে আদর্শের প্রতীক।

 

ভাওয়াল গড়ের উপাখ্যান

 

সে যেমন নিজে ইংরেজের বিরুদ্ধে সশস্ত্র সংগ্রাম করে স্বাধীনতার জন্য আত্মোৎসর্গ করে, তেমনি আপন পুত্র কমরুদ্দীনকেও উৎসর্গ করেছে। তবু এ চরিত্রটির ত্রুটি কিছুতেই ঢেকে রাখা যায় না। পুরো উপন্যাসে নূর বখ্শ চরিত্রটি রক্ত মাংসের মানুষনা হয়ে, আদর্শের প্রতীক হয়ে থেকেছে। সম্ভাবনা থাকা সত্ত্বের নূর বখ্শ চরিত্রটি বহুমাত্রিকতা লাভ করতে পারেনি।

গুলাম নবী চরিত্রটি এ উপন্যাসের মূল বক্তব্য ও সত্যের স্থপতি। গুলাম নবী ফরাজি আন্দোলনের অন্যতম নেতা, একদিনের জন্যও সে নিজের কর্তব্য অবহেলা করেনি। শিশুকন্যা নুরুন্নাহারকে সঙ্গী করে সে ভাওয়ালের বনঅঞ্চলেই আস্তানা গড়ে তোলে আন্দোলনরত কর্মীদের শিক্ষা ও কৌশল, পরামর্শ প্রদান করে। যদিও তার চরিত্র স্বাধীনতার আকাঙ্ক্ষার চেয়ে ধর্মীয় অনুশীলনের তাগিদ বেশি। তার কর্মকান্ড গোয়েন্দা চরিত্রের সঙ্গে তুলনীয়। শেষ পর্যন্ত গোলাম নবী ইংরেজদের সঙ্গে যুদ্ধ করে পরজিত ও নিহত হন।

এ উপন্যাসের বিস্তৃত পরিসর জুড়ে রয়েছে নুরুন্নাহার এবং কমরুদ্দীনের চরিত্র। নুরুন্নাহারের সঙ্গে একই আস্তানায় থাকতে গিয়ে ধীরে ধীরে বুঝতে পারে নুরুন্নাহার তার হৃদয়ের অমোঘ আসন লাভ করেছে। নুরুন্নাহার ছাড়া যেন ে অসম্পূর্ণ। এদিকে নুরুন্নাহারও কমনুদ্দীনের প্রেমের স্পর্শে কিশোরী থেকে যুবতী নারীতে পরিণত হয়ে ওঠে। যদিও উপন্যাসে শেষে বিধ্বস্ত আস্তানায় গিয়ে কমরুদ্দীন নুরুন্নাহারকে পায় না, তার আর্তনাদ ও হাহাকারই ধ্বনিত হয় কেবল, তবু স্পষ্ট যে, কমরুদ্দীন এবং নুরুন্নাহারের প্রেমকেই উপন্যাসিক প্রয়োজনীয় পরিচর্যা দিয়েছেন। তারা এই সংগ্রামী রক্তধারার উত্তরাধিকার বহন করে ভাবীকালের যাত্রী হয়।

 

বাংলাদেশের উপন্যাসের শৈলীবিচারের সূচীপত্র

 

৩.

‘ভাওয়াল গড়ের উপাখ্যান’ উপন্যাসের ভাষা চিত্ররূপময়। গদ্যভঙ্গি সাবলীল। বিষয় ও চরিত্রের ভাব অনুযায়ী শব্দ প্রয়োগের ফল বাক্যের গঠন সরল, অজটিল, নিরাক্ষানতবে কাব্যময় :

“ফালগুন মাস। পথে ঘাটে আমের বোলের সুস্নিগ্ধ গন্ধ, শিমুল আর কৃষ্ণচূড়া ফুলের বর্ণ সমারোহ। চোখ ঝলসে যায়, মনে হয় চারিদিকে যেন বর্ণের আগুন লেগেছে। ১

উদ্ধৃতাংশে বাক্যের গঠন ছোট, বড়, অসমান। চলিত শব্দের সহজ ব্যবহারে তা হয়ে উঠেছে সাবলীল। তবে কখনো কখনো চরিত্রের ভাব প্রকাশে আবু জাফর শামসুদ্দীনের ভাষা হয়ে উঠেছে পিনন্ধ কিন্তু গতিশীল :

“তিস্তা, গঙ্গা, পদ্মা, যমুনা, ব্রহ্মপুত্র, মেঘনা আর তাদের সহস্র শাখা প্রশাখায় ঐশ্বর্যবান বাঙ্গলার পলিমাটির মানুষ পরাধীনতা বরদাশত করতে পারে না। এখানকার মানুষ চায় বৃক্ষলতা ও লোকবসতীহীন নদীচরের সূর্যলোকের মতো নির্ভেজাল মুক্ত আলো বাতাস। মন তার ছুটে বরাহারা অশ্বের মতো। সে চায় না তারজীবনে বাইরের লোকের খবরদারী

উদ্ধৃতাংশে বাক্যের গঠন অজটিল, গতিশীল, শব্দ নিরালঙ্কার। চলতি শব্দের পাশে ফারসি শব্দের সহজ ব্যবহার লক্ষ্যনীয় – ‘বরদাশত’ (অর্থ-সহ্য করা) ‘খবরদারী’ (অর্থ-তত্ত্বাবধান)। সমকালীন বাঙালী মুসলাম লেখকদের আরবি, 10 ফার্সি শব্দ ব্যবহারের যে অতি উৎসাহী প্রবণতা লক্ষ করা যায়, তার তুলনায় আবু জাফর শামসুদ্দীনের গদ্যভাষায় আরবি ফারসি শব্দের ব্যবহার খুবই কম। যেটুকু ব্যবহার করেছেন তাও বিষয় ও চরিত্রের বিশেষ মানসপ্রবণতার প্রয়োজনেই।

Leave a Comment