আজকে আমাদের আলোচনার বিষয়ঃ বাঙালি সংস্কৃতি : স্বরূপ ও বৈশিষ্ট্য। যা সংস্কৃতি ও বাঙালি সংস্কৃতি এর অন্তর্গত।
বাঙালি সংস্কৃতি : স্বরূপ ও বৈশিষ্ট্য
পৃথিবী নামক গ্রহে যে মানুষের বাস, সে মানুষ বিশ্বখণ্ডের যে প্রান্তেই অবস্থান করুন না কেন, তার বসবাসকৃত সমাজে একটি সংস্কৃতি রয়েছে, যা বহুবর্ণিল, বহুভাবে ব্যাখ্যাযোগ্য এবং সদা পরিবর্তনশীল। এই সংস্কৃতি তার আবহমান সংস্কৃতি। তবে কোনো দেশেই একটি সংস্কৃতির অস্তিত্ব এককভাবে গড়ে ওঠা সম্ভব নয়।
শতাব্দীকাল একই ভূখণ্ডে নৃতাত্ত্বিকভাবে বিভিন্ন মানব জাতির বসবাস, নানা জাতির পারস্পরিক মেলামেশা, বিভিন্ন শাসন ব্যবস্থা আর বিনিময় প্রথায় বিবর্তিত, সমন্বয়বাদী, সেই সাথে মিশ্র এক সংস্কৃতি গড়ে ওঠাই স্বাভাবিক। জাতিগত বৈশিষ্ট্য, ধর্ম বা আচার সেখানে একক প্রভাব বিস্তার করতে পারে না। সে বিবেচনায় বাংলাদেশ এক সংস্কৃতি গোষ্ঠীর দেশ নয়। তবে সব কিছুর মিশেলে এক সমন্বয়বাদী সংস্কৃতিকে আমরা বাঙালি সংস্কৃতি বলে অভিহিত করতে পারি।
এ প্রসঙ্গে মুহম্মদ মতিউর রহমান (২০০৪ : ১৪৯) মনে করেন, এককভাবে কোনো বাঙালি সংস্কৃতির অস্তিত্ব এখানে কখনো ছিল না, এখনো নেই। যা ছিল বা এখনো আছে তা হলো বাঙালি জৈন সংস্কৃতি, বাঙালি হিন্দু সংস্কৃতি, বাঙালি বৌদ্ধ সংস্কৃতি, হিন্দু-বৌদ্ধ সংকর সংস্কৃতি, বাঙালি মুসলিম সংস্কৃতি ইত্যাদি।
মুসলিম আগমনের পূর্বে রাজনৈতিকভাবেও বাঙালির কোনো একক পরিচয় ইতিহাসের কোনো পর্যায়েই গড়ে ওঠেনি। কারণ হিসেবে মতিউর রহমান (২০০৪ : ১৫০) লিখেছেন, গুপ্ত যুগ ও ব্রাহ্মণ সেন আমলে যে হিন্দু সংস্কৃতির বিকাশ ঘটে সেটারও রূপ ও প্রকৃতিতে বৈচিত্র্য ছিল। উচ্চ বর্ণের আর্য হিন্দুদের ভাষা ও সংস্কৃতি সংখ্যালঘিষ্ঠ ব্রাহ্মণ সম্প্রদায়ের মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল, যার সাথে দেশের নিম্নবর্ণীয় অনার্য হিন্দুদের ভাষা সংস্কৃতির মিল ছিল না।
নানা বিবর্তনের মধ্য দিয়ে তাদের ভাষা অপভ্রংশ থেকে বাংলা হয়। এসব নিয়ে, ঐতিহাসিকদের নানা মন্তব্যের আলোকে মতিউর রহমান লিখেছেন, বাংলা একটি প্রাচীন দেশ হলেও রাজনৈতিকভাবে এটা ঐক্যবদ্ধ হয় মুসলিম শাসনামলে এবং বাঙালি জাতি হিসেবে এর পরিচিতি ঘটে সুলতান শামসুদ্দীন ইলিয়াস শাহের আমলে। সে দিক থেকে বাঙালি জাতির প্রথম রূপকার ও প্রতিষ্ঠাতা শামসুদ্দীন ইলিয়াস শাহ বলে মনে করেন তিনি।
অপর দিকে, সামাজিক ও ধর্মীয় বিধিনিষেধের বাড়াবাড়ি, বাঙালি জাতিকে উত্তর-পূর্ব ভারতীয় সংস্কৃতি থেকে স্বতন্ত্র করেছে, এমন তথ্য দেন Samaren Roy তাঁর The Roots of Bengali Culture গ্রন্থে
A serious anthropological study into the history and culture of Bengal will perhapsreveal significant facts abou rigour of the distinctive social and religious practices of Eastern India, which kept its tradition so much apart from the Aryan vedic tradition of Northern India. This distinctive social tradition which permeated even the later Brahmin-dominated society of Bengal, should be studied properlyin order to discover the roots and history of Bengali culture, which still distinguishes Bengalis from the peoples of other parts of India (Samaren, 1981:23)
বাঙালি বলতে আমরা মাত্র তাদেরই বুঝি যাদের মাতৃভাষা বাংলা এবং যারা বাংলাদেশে এক বিশেষ সংস্কৃতির বাহক। এখানে অন্য ভাষাগোষ্ঠীর মিশ্রণ থাকলেও, সবাই এক পর্যায়ে বাঙালি সংস্কৃতির অন্তর্ভূক্ত হয়ে ওঠে, এমন তথ্য উল্লেখপূর্বক অতুল সুর মনে করেন :
বাঙলার এক স্বকীয় ভাষা ও এক বিশেষ সংস্কৃতি আছে। বাংলার স্বকীয় ভাষা হচ্ছে বাংলা অন্যান্য রাজ্যের ভাষার তুলনায় বাংলা ভাষা অত্যন্ত সমৃদ্ধশালী। এ ভাষার ভিত্তি স্থাপন করেছিল বাগুলার আলিম অধিবাসীরা। তারা যে প্রাক-দ্রাবিরগোষ্ঠীর লোক ছিল সে বিষয়ে কোনও সন্দেহ নেই।
কেননা, বাংলা ভাষার অন্তর্ভূক্ত এই গোষ্ঠীর লোকদের ভাষার শব্দসমূহের প্রাচুর্য তার সাক্ষ্য বহন করছে। এই নরগোষ্ঠীর ভিত্তির ওপরই পরবর্তীকালে অন্যান্য নরগোষ্ঠী সমূহ স্তরীভূত হয়েছিল। এই অন্যান্য নরগোষ্ঠীর অন্তর্ভূক্ত ছিল দ্রাবিড় ভাষাভাষী, আর্য-ভাষাভাষী জাতিসমূহ ইত্যাদি। এদের সকলেরই ভাষা বাংলাভাষার অন্তর্ভূক্ত হয়ে গিয়েছে। (অতুল, ২০০৮ 80 )
তবে, প্রাচীন বাংলায় জনবসতি কখন শুরু হয়েছিল এবং তাদের পরিচয় কি ছিল সে সম্পর্কে পণ্ডিতদের মধ্যে মতপার্থক্য আছে। রিয়াজ-উস-সালাতী এর লেখক গোলাম হোসেন সেলিমের উদ্ধৃতি দিয়ে এ.বি.এম. শামসুদ্দীন আহমদ (২০০৭: ১৪৯) লিখেছেন, প্রায় সাড়ে সাত হাজার বছর পূর্বে প্রাচীন বাংলায় বঙ জনগোষ্ঠী বসতি স্থাপন করেছিল। যে বঙ জনগোষ্ঠী তাদের অধ্যুষিত অঞ্চলকে বসবাসযোগ্য ও সুন্দর করে তোলে এবং তারা সে অঞ্চল শাসনও করেন। তবে তারা কতকাল শাসন করেছিলো তা জানা যায় না।
একই সাথে কে.এম.মোহসীনের বাংলাদেশের উৎপত্তি ও বিকাশ গ্রন্থেরও উদ্ধৃতি দিয়ে শামসুদ্দীন আহমদ লেখেন, বঙ জনগোষ্ঠীর পরে আরও কয়েকটি জনগোষ্ঠী-নিগ্রোটা, অস্ট্রো-এশিয়াটিক অথবা অস্ট্রিক, দ্রাবিড় গোষ্ঠী, মঙ্গোলয়েড, হোমো-আলপাইনাস প্রভৃতি প্রাচীন বাংলায় আসে এবং বসতি স্থাপন করে। এসব জনগোষ্ঠী প্রাক আর্যযুগে বাংলায় এসেছিলো বলে, এদেরকে বাংলার জনগণের আদি পুরুষ বলে বিবেচনা করা হয়।
প্রাপ্ত তথ্যাদি থেকে (শামসুদ্দীন, ২০০৭: ১৪৯) আরও জানা যায় যে, আর্যদের আগমনের পূর্বে বাংলার আদিম অধিবাসীগণ, বিশেষ করে অস্ট্রিক ও দ্রাবিড়গণ এক বিশিষ্ট সংস্কৃতি ও সভ্যতার অধিকারী ছিল।
আর্যরা বাংলায় কখন এসেছিল বা তারা কখন তাদের প্রভাব বিস্তার করেছিল তা নিশ্চিত করে বলা না গেলেও, একথা জোরালোভাবেই বলা যায় যে, খ্রিষ্টপূর্ব ১৫০০ অব্দের পূর্বে আর্যরা উপমহাদেশে প্রবেশ করে। এবং বাংলায় প্রবেশ করে তারও অনেক পরে। পণ্ডিতগণ মনে করেন যে, প্রথম শতকে বা তার কিছু পূর্বে আর্যরা বাংলায় আসে। কিন্তু তাদের প্রভাব দৃঢ়ভাবে বিস্তার লাভ করে গুপ্তদের শাসনামলে। রমেশচন্দ্র মজুমদারের তথ্য মতে শামসুদ্দীন লিখেছেন, বাংলায় আর্যদের বৈশিষ্ট্যাবলি বিশেষভাবে পরিলক্ষিত হয় পাঁচ শতক থেকে।
এদিকে, জাতি পরিচয়ে আমরা অস্ট্রিক-মঙ্গোলদের বংশধর, যাদের নিজস্ব একটা সংস্কৃতি ছিল; এমন মত আহমদ শরীফের। এই সংস্কৃতিকে চিরকাল বাঙালির নিজস্ব সংস্কৃতির ধারা উল্লেখ করে আহমদ শরীফ লিখেছেন যার প্রভাবমুক্ত হওয়া বাঙালির জন্য অসম্ভব। সে পরিচয় মুছে ফেলবার চেষ্টা করলেও মুছে দেয়া যাবে না।
বাঙালির চেতনায় স্নায়ুতে, রক্তধারায় তা মিশে আছে- যুগ যুগ ধরে চলছে। সাংখ্য, যোগ, তন্ত্র, দেহতত্ত্ব – এগুলো হচ্ছে বাংলার আদি মঙ্গলদের দান, আর নারী দেবতা, পশু-পাখি, বৃক্ষদেবতা, জন্মান্তর প্রভৃতি হচ্ছে অস্ট্রিকদের দান। এগুলোর মধ্যে মন-মানসিকতা ও মননের যে বৈশিষ্ট্য লুক্কায়িত আছে, তার প্রভাব থেকে বাঙালি হিন্দু-মুসলমান-বৌদ্ধ কখনও মুক্ত ছিল না, আজও মুক্ত হয়নি, ভবিষ্যতেও হতে পারবে না।
এ বৈশিষ্ট্য বাঙালির চরিত্রে ও জীবনে অন্তর্নিহিত (আহমদ শরীফ, ২০১৬ : ৪৪)। তিনি আরও যোগ করেন, বাঙালি বৌদ্ধ, ব্রাহ্মণ্য, ইসলাম প্রভৃতি ধর্ম গ্রহণ করে নানা সম্প্রদায়ের রূপ লাভ করেছে বটে কিন্তু কখনও সে সাংখ্য, যোগ ও তন্ত্রের প্রভাব ছাড়তে পারেনি। ফলে বহিরাগত প্রতিটি মতবাদ এখানে এসে নতুন রূপ পেয়েছে। সব শাস্ত্রই নতুন চরিত্র নিয়ে বাঙালি চেতনার বৈশিষ্ট্য লাভ করেছে।
প্রকৃতপক্ষে খ্রিষ্টেরও চার হাজার বছর পূর্বের এবং এই উপমহাদেশে আর্যদের আগমনেরও দুই হাজার বছর পূর্বের দীর্ঘ ইতিহাস ও ঐতিহ্য এই সভ্য জাতির রয়েছে। বর্তমানের বাংলাদেশে তখন দ্রাবিড়দের বসবাস ছিল, যারা বেবিলনীয় অঞ্চলের সেমিটিক বংশের সভ্য জনগোষ্ঠী ছিল, এমন তথ্য পাওয়া যায় আবুল মনসুর আহমদের (২০০৪ : ৩৮৬) লেখায়। তিনি উল্লেখ করেন, দ্রাবিড়রা ভারতে আসে আর্যদেরও বহু আগে এবং সিন্ধু অঞ্চলে বসতি গড়ে ভারতের দক্ষিণাঞ্চলে ছড়িয়ে পড়ে, সেই সাথে বাংলাদেশেও আসে।
তাই প্রাচীন বাঙালিরা এবং যারা পাকিস্তানের মহেঞ্জোদারো ও হরপ্পার গোড়াপত্তন করেছিল, তারা একই বংশীয়। আবুল মনসুর ধারণা করেন, বাংলাদেশে সহজলভ্য উপকরণ দিয়েই তারা ইমারত তৈরি করে। যদিও সেই পুরাতাত্ত্বিক নিদর্শন, শিল্প ও সাংস্কৃতিক স্মৃতিচিহ্ন বাংলাদেশে বিরল। মহাস্থানগড় ও ময়নামতির তৎকালীন নিদর্শনগুলো বাংলাদেশের শিল্প ও স্থাপত্যের পর্যাপ্ত পরিচয় বহন করে না।
সাংস্কৃতিক নানা বিবর্তনের প্রক্রিয়ার মধ্যেই সুপ্ত ছিল বাঙালি লোকগোষ্ঠী গঠনের সম্ভাবনা। তবে, বাঙালি লোকগোষ্ঠীর সাক্ষাৎ মেলে কবে থেকে, এমন প্রশ্নের উত্তর খুঁজেছেন মমতাজুর রহমান তরফদার। তিনি Professor Barrie M. Morrison-এর প্রসঙ্গ টেনে বলেন (২০১৬ : ৩১৬), মরিসন প্রাক-মোগল যুগে বাঙালি লোকগোষ্ঠীর অস্তিত্ব স্বীকার করে বলেছেন- মোগল ও বৃটিশ আমলে বাঙালিগণ তাদের নিজস্ব সংস্কৃতি সম্বন্ধে সচেতন হয়েছিল। সে যুগের সংস্কৃতি সম্বন্ধে মরিসনের নিম্নোক্ত উক্তি তুলে ধরেন মমতাজুর রহমান :
There is sufficient evidence in copper plates as well as in the texts and traditions to suggest that there was developing within the sub-regions of Bengal a more homogenous local culture. These local cultures were expressed in the material culture with distinct agricultural implements, housing types and forms of village organization. They were reflected in caste distributions and social practices within families. At various times these differences have been observed in religious distributions with Buddhists, Brahmanas. Chaitanya Vaisnavas and Muslims. (মমতাজুর, ২০১৬ : ৩১৬ )
মমতাজুর রহমান উপসংহারে মরিসনের ( ২০১৬ ৩১৪) উদ্ধৃতি দেন, ‘মোগল ও বৃটিশ আমলে শান্তির পরিবেশে পোষকতা পেয়ে বাঙালিগণ তাদের ধ্যান ধারণা প্রকাশের যখন সুযোগ পেল, তখন তারা সাহিত্য, ভাস্কর্য, বিদ্যাচর্চা ও চারুকারুশিল্পের ক্ষেত্রে সমৃদ্ধ ও বিচিত্র সাংস্কৃতিক অবদান রাখল। আত্মপ্রকাশের এই ক্রিয়াকর্মের মাধ্যমেই নিজেদের চিহ্নিত করল, আত্মত্মপরিচয়ের ধারণাও লাভ করল।’
বাংলা ভাষাও নির্দিষ্ট রূপ নিয়েছিল প্রাক-মোগল যুগেই; এমন কথার প্রমাণে মমতাজুর রহমান লিখেছেন, চর্যাগীতির ভাষা যদি সমগ্র পূর্ব ভারতের ভাষা রূপেও গড়ে উঠে থাকে তবুও তো এই ভাষারূপের মধ্যেই বাংলা ভাষার আদি উৎসকে খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে। উড়িয়া, ভোজপুরী, মৈথিলি, আসামি, বাংলা প্রভৃতি একই উৎস থেকে আগত বলে উল্লেখ করেন তিনি (২০১৬ : ৩১৪-৩১৫)।
প্রাক-মোগল যুগের এই বাঙালি লোকগোষ্ঠী একটি People বা সংগঠিত লোকগোষ্ঠীই, ‘নেশন’ বা জাতি নয়: উল্লেখ করে মমতাজুর রহমান (২০১৬ : ৩২২) যোগ করেন, উক্ত আঞ্চলিক সংস্কৃতিতে এবং লোকগোষ্ঠীর বিভিন্ন অংশের মধ্যে বিভিন্নতা ও বৈচিত্র্য স্বত্ত্বেও প্রবল রকমের কোনো বিরোধ ছিল না। তবে, বাঙালি লোকগোষ্ঠী গঠনের স্বাভাবিক প্রক্রিয়াকে ব্যবহৃত করেছিল মোগল শাসনের বহির্মুখী চরিত্র এবং বৈষ্ণব আন্দোলন।
বহু দ্বিধাদ্বন্দ্ব সত্ত্বেও দক্ষিণপূর্ব বাংলার কিছুসংখ্যক শিক্ষিত মুসলমান বাংলা ভাষাকে তাঁদের আত্মপরিচয়ের প্রতীক রূপে চিহ্নিত করেছিলেন বলে উল্লেখ করেন মমতাজুর রহমান।
বাংলাদেশের অধিবাসী বাংলাভাষী হলেও, অঞ্চলবিশেষে ভাষারীতির পার্থক্য, আচার, ধর্ম, শিল্প-সংস্কৃতির বৈচিত্র্য এই আঞ্চলিক জনগোষ্ঠীর প্রতিনিধিত্ব করে। জাতিভেদে নানা সাংস্কৃতিক প্রবণতা সত্ত্বেও, সাধারণ কিছু বৈশিষ্ট্য, যেমন – সংখ্যাগরিষ্ঠের ভাষা, অর্থনৈতিক জীবন, ধর্মানুপ্রেরণার মতো বিষয়গুলো মুখ্য ভূমিকা রাখে জাতি হিসেবে বাঙালি পরিচয় নির্ধারণে।
এ প্রসঙ্গে বদরুদ্দীন উমর তাঁর সংস্কৃতির সংকট গ্রন্থে লিখেছেন :
বাংলাদেশের যে কোন অংশে যারা মোটামুটি স্থায়ী ভাবে বসবাস করে, বাংলা ভাষায় কথা বলে, বাংলাদেশের আর্থিক জীবনে অংশগ্রহণ করে এবং বাংলার ঐতিহ্যকে নিজেদের ঐতিহ্য বলে মনে করে। তারাই বাঙালী। (বদরুদ্দীন, ১৯৭৪:৫-৬)
বাঙালি সংস্কৃতি বলতে তিনি (১৯৭৪ : ১৮) দেশের অগণিত কৃষক, শ্রমিক আর মধ্যবিত্তের মাঝে প্রচলিত সংস্কৃতিকে বুঝিয়েছেন। সময়ের সাথে সাথে সে সংস্কৃতির পরিবর্তন সাধিত হলেও, এই সাংস্কৃতিক বৈশিষ্ট্য সামাজিক জীবনযাত্রার সাথে তার বৈশিষ্ট্যকে অনুসরণ করে।
তবে, ধর্মীয় পটভূমি এই সংস্কৃতিকে প্রভাবিত করার কারণে, প্রতিটি বাঙালির সংস্কৃতিতে ভিন্নতা বা বৈচিত্র্য পরিলক্ষিত হয়। আচার-অনুষ্ঠান আর ভাষার ব্যবহারে পার্থক্য দেখা যায় এসব কারণেই। বদরুদ্দীন এক্ষেত্রে আঞ্চলিক প্রভাব, অর্থনৈতিক অবস্থাকেও সংস্কৃতির ভেদাভেদ তৈরিতে সুদূরপ্রসারী ভূমিকা রাখে বলে উল্লেখ করেন।
বাঙালির এবং বাংলাদেশের প্রাগৈতিহাসিক বা তার পরবর্তীকালের ইতিহাসে বঙ্গসংস্কৃতির উৎস ও ধারা অনুসন্ধান করেছেন নীলিমা ইব্রাহিম। অষ্টম শতকের মাঝামাঝি পাল বংশ প্রতিষ্ঠায় বাংলাদেশের পরিচয় ঐতিহাসিক ধারাবাহিকতায় প্রথম পাওয়া যায় উল্লেখ করে তিনি লিখেছেন, একাদশ শতাব্দীতে বাংলাদেশ বলতে প্রায় সমগ্র পূর্ববঙ্গ এবং দক্ষিণবঙ্গের সমুদ্র তটশায়ী সমস্ত ভূখণ্ডকেই বোঝাত।
ধারণা করা হয়; বাঙ্গাল বা বাঙ্গালদেশের কেন্দ্রস্থল ছিল বর্তমান বাংলাদেশ। রাজা শশাঙ্ক অথবা বাংলার পাল এবং সেন রাজারা ‘গৌড়’ নাম নিয়ে বাংলার সমগ্র জনপদকে একত্র করবার যে চেষ্টা করেছিলেন, তা সাফল্যমণ্ডিত হয়নি। যে অংশ বঙ্গ নামে গৌরব অর্জন করল আর্যসভ্যতা ও সংস্কৃতির দিক থেকে সে অংশ ছিল ঘৃণিত ও অবজ্ঞাত। এ কারণেই শুরু থেকে অবহেলিত ও শুদ্ধ বাঙালির পরিচয় আমরা পাই প্রবাসে অমার্জিত রূপে।’ (নীলিমা, ২০১৬ : ৩২৮)
বাংলার ভৌগোলিক বৈশিষ্ট্য, সামাজিক রীতি, প্রতিকূলতা, পাশাপাশি বাংলা সাহিত্য, সঙ্গীত, নৃত্যকলা শিল্পকলা নিয়ে বাঙালির ঔপনিবেশিক যুগের যে অহংবোধ, সে থেকে ধারণা করা যায়, জাতি হিসেবে বাঙালির আবির্ভাবের আগে উদ্ভব হয়েছে বাংলার সংস্কৃতি। এমন ভাবনার অবতারণা করে গোপাল হালদার লিখেছেন:
‘বাঙলার সংস্কৃতি’ – বাংলার মাটি, বাঙলার জল ও বাঙলার জনজীবনের সঙ্গে জড়াইয়া গড়িয়া উঠিয়াছিল হাজার বৎসর হইতে, ভারতীয় সংস্কৃতির কোলে। প্রায় হাজার বৎসর আগে “পাল ও সেন রাজাদের আমলে বাঙালী সংস্কৃতির ভিত্তি স্থাপিত হইল, ইহার মূল সুর বাঁধা হইল।” … সপ্তম শতাব্দী হইতে ভারতীয় শিষ্ট- সংস্কৃতির সহিত সমসাময়িক বাংলা শিষ্ট-সংস্কৃতির যোগাযোগ দেখা যায়। তারপর পালযুগে বাঙালী নিজের একটা বিশিষ্ট স্থান সেই সংস্কৃতির ইতিহাসে করিয়া ফেলিয়াছিল। (গোপাল, ১৯৭৬ ১৭১-১৭২)
পাল ও সেন আমলের পর মধ্যযুগে তুর্কিবিজয় ও মুসলমান আধিপত্যের মাধ্যমে বাংলার সংস্কৃতি নতুন রূপে উন্নীত হয়। গোপাল হালদার লিখেছেন :
বাংলায়ও তখন দেখা যায় তেমনি সুযোগ ও সমন্বয় সেই আউলিয়া, বাউল, সুফী দরবেশ ও নানা – সম্প্রদায়ের সহজিয়া দল সে মুসলমান শাসক, ব্রাহ্মণদের পৌরাণিক ধর্মপ্রচার, বৈষ্ণব মহাজনদের চেষ্টায় বাঙলা সাহিত্যের বিকাশ, আর তেমনি ব্রাহ্মণ্যধর্মের আত্মরক্ষার দায়ে লৌকিক রচনা। বৈষ্ণব প্রেরণায় সেই সংস্কৃতিতে ষোড়শ শতাব্দীতে একটা প্রবল স্রোত বহিয়া যায় বাঙলা সাহিত্য ও বাংলা জীবনযাত্রা একটা নিজস্বতা লাভ করে। ( গোপাল, ১৯৭৬ ১৭২ )
মুসলমানদের মধ্যে সৈয়দ ও পাঠানরা দাবি করে যে তারা এশিয়ার বিভিন্ন দেশ থেকে এই পাক-ভারত উপমহাদেশে এসেছে; এমন তথ্য দেন মুহম্মদ শহীদুল্লাহ্ (২০০৪ : ৩৫৬)। চট্টগ্রামের কিছু অধিবাসীদের দাবি তাদের শরীরে বইছে আরবদের রক্ত। হিন্দু সম্প্রদায়ের ব্রাহ্মণদের দাবি তারা পুরোপুরি আর্য বংশোদ্ভূত।
সামাজিক আচার-আচরণ ও রীতিনীতিতে হিন্দু ও মুসলমানদের মধ্যে পার্থক্য থাকলেও সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যগত দিক দিয়ে এই দুই সম্প্রদায়ের মধ্যে অনেক মিল আছে বলেও উল্লেখ করেন মুহম্মদ শহীদুল্লাহ্। এ দেশের ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট বিচারে তিনি জানান; খ্রিষ্টপূর্ব ১৫০০ অব্দে আর্যরা পশ্চিম থেকে পাক-ভারত উপমহাদেশে আসে।
পশ্চিমে তারা ইরানিদের এক জাতি ছিল। এখানে এসে তারা অনার্যদের বাস করতে দেখে, যারা হয়তো আগে পশ্চিম ও অস্ট্রোএশিয় দ্রাবিঢ় ছিল। আর্যরা পূর্ব বাংলায় বিস্তার লাভের শেষভাগে মোঙ্গলীয় জাতির তিব্বতীয়-বর্মীরা পূর্ব বাংলায় প্রবেশ করে। আনুমানিক খৃস্টপূর্ব ৪০০ অব্দে আর্যরা উপমহাদেশের পূর্বাঞ্চলে প্রবেশ করে, উল্লেখ করে শহীদুল্লাহ লিখেছেন :
পূর্ববাংলার ভাষাগত উচ্চারণ এটাই নির্দেশ করে যে তাদের ভাষায় তিব্বতীয়-বর্মীদের প্রভাব রয়েছে। আর্যদের বিশুদ্ধ তালব্য ধ্বনি তালব্য-দন্ত ধ্বনিতে রূপান্তরিত হয়েছে। যেমন আর্যদের ঘ ধ ভ এর উচ্চারণ হয়েছে দেবে। এছাড়া প্রতিবেশী তিব্বতীয় বর্মীদের ভাষার কিছু শব্দ পূর্ব পাকিস্তানের ত্রিপুরা ও চট্টগ্রামের ভাষায় চলে এসেছে। অস্ট্রো-এশীয় লোকেরাই সম্ভবত বাংলার গণমানুষের ভিত্তিমূল। তবে একথা নিশ্চিন্তে বলা যায় যে বাঙালিদের জীবনে আর্যদের সংস্কৃতির ছাপ সুস্পষ্ট বিদ্যমান। (শহীদুল্লাহ্, ২০০৪ : ৩৫৬- 029)
বৌদ্ধ পাল রাজাদের পূর্ববর্তী সময়ের ইতিহাস সেভাবে জানা না গেলেও, বাঙালির লিখিত ইতিহাস অন্তত বারোশো বছরের। যার উল্লেখ পাওয়া যায় পাল রাজাদের সময় থেকেই। তবে, বাংলাদেশে যারা আদিকাল থেকে বাস করে আসছেন তারাই বাঙালি, এই যুক্তিকে দুর্বল আখ্যা দিয়ে আবুল কাসেম ফজলুল হক (১৯৯৫)।
পালটা যুক্তি দিয়েছেন, ‘এই বৃহৎ বাংলার ভৌগলিক পরিমণ্ডলে নানা জাতির আগমন হয়েছে। পুরনো ভূখণ্ডে ‘বাংলাদেশ’ নামের অঞ্চলটি প্রতিষ্ঠিত হয় অনেক চড়াই-উৎরাই পেরিয়ে। তাই কোনো বিশেষ বৈশিষ্ট্যের কারণে এক শ্রেণির মানুষের নাম হয় বাঙালি হিসেবে।’ কিন্তু ‘এই বাঙালি কারা?’ এমন প্রসঙ্গের ব্যাখ্যা হিসেবে ফজলুল হক বলেন, খুব সাধারণ ভাবে বলা যেতে পারে নানা রক্তের মিশ্রণ থাকলেও, – বাংলা ভাষায় যারা কথা বলে তারাই বাঙালি।
অপর এক গ্রন্থে ‘বাঙালি সংস্কৃতি বলতে গোপাল হালদার (১৯৭৫ : ১) বুঝিয়েছেন ‘বাঙালী জাতির জীবন- যাত্রা আর তার সংস্কৃতিকে।’ আর সংস্কৃতির স্বরূপ তাঁর কাছে ‘অধিকাংশ ক্ষেত্রে মানুষের বাস্তব ও মানসকি কীর্তি ও কর্ম, আধ্যাত্মিক চিন্তা, তার জীবনযাত্রার আর্থিক ও সামাজিক রূপ, অনুষ্ঠান ও প্রতিষ্ঠান; বৈজ্ঞানিক আবিষ্কার, সেই সাথে নানা শিল্পসৃষ্টি।’ এ প্রসঙ্গে তিনি আরও বলেন :
‘বাঙালী সংস্কৃতি’ কথাটিকে আমরা সাধারণত বাংলার কালচার’ কথাটির প্রতিশব্দ রূপেই প্রয়োগ করে থাকি। সে হিসাবে বাঙালী সংস্কৃতি বললে বোঝাতে চাই- আধুনিক বাঙালী সংস্কৃতি বা ইংরাজ আমলের “বাংলার কাচার। নইলে বাঙালী সংস্কৃতি বললে বোঝান উচিত যে-দিন থেকে বাঙালী জাতি জন্মেছে। সেদিন থেকে এই প্রায় হাজার খানেক বছরের বাঙালী সংস্কৃতিকে – বাঙালী সমাজের হাজার বছরের রূপ ও তার বাস্তব ও মানসিক সমস্ত সৃষ্টিকে (গোপাল, ১৯৭৫ ১৫)
মূলত বাঙালি সমাজের সনাতন রূপ, তার বাস্তব ও মানসিক সমস্ত সৃষ্টিসম্ভার নিয়েই গড়ে ওঠে বাঙালি সংস্কৃতি। প্রায় হাজার বছর আগে বাংলা ভাষার উদ্ভব ও বিকাশ ভারতীয় অন্যান্য প্রধান ভাষার সাথেই; এমন প্রসঙ্গের উল্লেখ করে গোপাল হালদার লিখেছেন :
বাঙালী সংস্কৃতি, মহারাষ্ট্রীয় সংস্কৃতি প্রভৃতি আধুনিক ভারতীয় সংস্কৃতি জন্মিল এতদিনকার (প্রাক-মুসলিম) ভারতীয় সংস্কৃতির উত্তরাধিকার লইয়া। বাঙালি সংস্কৃতি উহার মাধ-মণ্ডলের রূপ ঐতিহ্যের বিশেষভাবে অংশীদার হয়।
কাজেই বাঙালী সংস্কৃতির আদিযুগে (আনুমানিক খ্রি ১,০০০-১,২০০ শতক) এ মধ্যযুগে (সাধারণভাবে মুসলমান আমলে) মোটামুটি এই সংস্কৃতির যে ভিত্তি ও যে গঠন ছিল প্রাচীন ও মধ্যযুগের ভারতীয় সংস্কৃতির আলোচনা সূত্রেই আমরা তাহার পরিচয় পাইয়াছি – শুধু পূর্বপ্রত্যন্তবাসী বলিয়া বাঙলার অধিবাসীরা ছিল উত্তর ভারতের বা পশ্চিম ও দক্ষিণ ভারতের প্রধান প্রধান সংস্কৃতিকেন্দ্র হইতে আরও বিচ্ছিন্ন, ঐ সব সংস্কৃতি দ্বারা ক্রমপ্রভাবিত এবং ঐ সব উন্নাসিক শাসক শাস্ত্রকারদের চক্ষে (বেদ ও আরণ্যকের যুগ হইতেই) একটু অবজ্ঞাত, আচার-বিচারে শিথিল, ধ্যান-ধারণায় ‘পাষণ্ডী” (heretic); ভাষায় সৃষ্টিতেও হয়ত অনিয়ন্ত্রিত, রাষ্ট্র সংগঠনেও কেন্দ্রানুগ নয় বঙ্গ, সমতট, হরিকেল, রাড়, গৌড় বরেন্দ্র প্রভৃতি বিবিধ অঞ্চলে অঞ্চলে অনেকাংশে স্বতন্ত্র।
আবার উহারই মধ্যে আদিম বা অতি প্রাচীন ঔপজাতিক (tribal) কৌম-বন্ধন ও রাষ্ট্র-বন্ধনের অথবা ভারতীয় সমাজের বর্ণভেদ, জাতিভেদ শ্রেণীভেদের মধ্যে এই বাঙালী একেবারে তলাইয়া যায় নাই (গোপাল, ১৯৭৬ – ১৭২-১৭৩)
বাঙালি সংস্কৃতির বিকাশ প্রসঙ্গে বিভিন্ন জাতি-প্রথা এবং তাদের মিশ্র সংস্কৃতির মেলবন্ধনের কারণকে মুখ্য মনে করেন সমাজবিদরা। যার আভাস পাওয়া যায় আনিসুজ্জামানের (২০১৬ : ৫০) ‘আমাদের সংস্কৃতি’ প্রবন্ধে। সেখানে বলা হয়েছে, নানা ভাষার সংস্কৃতির যোগসাধনে বাঙালি সংস্কৃতির বিকাশ ঘটলেও, বাঙালি সংস্কৃতির উত্তরাধিকার অনেক পুরনো। বাংলা ভাষা ইন্দো-ইউরোপীয় গোষ্ঠির ভাষা। উপমহাদেশের উত্তরাঞ্চলে এই গোষ্ঠির অন্যান্য ভাষা ছড়িয়ে আছে বিধায়, সেখানে বাংলার অনেক নিয়ম-নীতিরও মিল খুঁজে পাওয়া যায়।
আবার বাংলার আদি জনগোষ্ঠি ছিল প্রাক আর্য। তাই দক্ষিণাঞ্চলে বসবাসরত আর্য জনগোষ্ঠির সাথে ধান, তেল, হলদি, পান-সুপারি, সেলাইবিহীন কাপড় ব্যবহারে মিল আছে। এই রীতি-নীতিগুলো বাঙালির দেশজ উপকরণে পরিণত হয়েছে।
পরে মুসলমানদের দেশবিজয়ের ফলে, সেই সংস্কৃতিতে প্রভাব ফেলে তুর্কি-আরব-ইরান-মধ্য এশিয়ার মুসলিম সংস্কৃতি। খ্রিস্টিয় সপ্তম-অষ্টম শতাব্দী থেকে শাসন ব্যবস্থা, সামাজিক জীবন ও অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে বাংলার সাংস্কৃতিক স্বাতন্ত্র্য দেখা দেয়। বাংলা ভাষা, সাহিত্য ও লিপির বিকাশ সে স্বাতন্ত্র্যকে অর্থপূর্ণ করে তোলে। আনিসুজ্জামান বলেন :
বহিরাগত মুসলমানরা এদেশ জয় করেন ত্রয়োদশ শতাব্দীর শুরুতে। মুসলমান শাসকেরা ভাষা সাহিত্যের পৃষ্ঠপোষকতা করে তার বিকাশে সহায়তা করেন। ষোড়শ শতাব্দীর শেষে মুঘলরা বাংলাদেশ জয় করেন। মুঘল আমলে বাংলা ভাষা সাহিত্য আগের মত রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতা লাভ করে নি। তবে একটা বৃহত্তর পরিবেশের সঙ্গে তখন বাংলার সংস্কৃতির যোগ ঘটে। তারপর আঠারো শতকের মধ্য ভাগে ইংরেজ শাসন প্রবর্তিত হলে যোগাযোগের পরিধি আরো বিস্তৃত হয়। বিশ্বসংস্কৃতির সঙ্গে বাংলার যোগসাধিত হয়। (আনিসুজ্জামান, ২০১৬ : ৫১)
ইতিহাসের এমন বাস্তবতার নিরীখে একটি বিষয় লক্ষণীয়, বাঙালির জীবনে কালের গ্রাসে ও প্রকৃতির অবিরাম তাণ্ডবলীলায় যা অক্ষয় রয়েছে, তা হল বাংলাদেশের সংস্কৃতি। এর কারণ হিসেবে আবুল মনসুর (২০০৪ : ৩৮৬) উল্লেখ করেন, এটি এ দেশের বদ্ধমূলে। বাংলার কৃষ্টি ও সংস্কৃতি গড়ে উঠেছে বাঙালির আত্মায়। মাঝে মধ্যে এই সংস্কৃতি বিদেশি সংস্কৃতি দ্বারা নিমজ্জিত হলেও, অন্তর্নিহিত উজ্জ্বলতার গুণে বাঙালি সংস্কৃতি তার প্রাক দ্যুতি পুনরুদ্ধার করেছে সগৌরবে।
সব শেষে সুনীতিকুমার চট্টোপাধ্যায়ের ভাবনায় বাঙালি জাতি তারা যে জনসমষ্টি বাংলা ভাষাকে মাতৃভাষা রূপে বা ঘরোয়া ভাষা রূপে ব্যবহার করে। একই সাথে তিনি বাঙালি সংস্কৃতির নিম্নরূপ সংজ্ঞা দেন :
বাংলা দেশে, বাংলাভাষী জনসমষ্টির মধ্যে দেশের জলবায়ু ও তাহার আনুষঙ্গিক ফলস্বরূপ এই দেশের উপযোগী বিশেষ জীবনযাত্রার পদ্ধতিকে অবলম্বন করিয়া এবং মুখ্যতঃ প্রাচীন ও মধ্যযুগের ভারতের ভাব- ধারায় পুষ্ট হইয়া, শত সহস্র বৎসর ধরিয়া যে বাস্তব, মানসিক ও আধ্যাত্মিক সংস্কৃতি গড়িয়া উঠিয়াছে, তাহাই বাঙালি সংস্কৃতি। এবং এই সংস্কৃতি, বাংলাভাষার সৃষ্টিকাল হইতে বাংলাভাষায় রচিত যে সকল কাব্যে কবিতায় ও অন্য সাহিত্যে আত্মপ্রকাশ করিয়াছে, তাহাই বাংলা সাহিত্য।’ (সুনীতিকুমার, ২০১৬ : ৪৩৯)
ভাবনার সমর্থনে সুনীতিকুমার ( ২০১৬ : ৪৩৯ ) আরও যোগ করেন, এই যে বাংলা ভাষা-ভাষী, যারা বাংলাদেশের প্রত্যন্ত অঞ্চল জুড়ে বাস করছে এবং বাংলার বাইরে অ-বাঙালিদের দেশে গিয়ে বাস করে, তারা সবাই একে অন্যের মধ্যে ভাষাগত স্বাজাত্য অনুভব করে। কারণ, জাতীয়তা বা স্বাজাত্যের প্রধান আধার হইতেছে ভাষা।
ধর্ম, মানসিক সংস্কৃতি, অতীত ইতিহাস এবং অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক সংস্থান এক হলেও, ভাষা যদি ভিন্ন হয়, তবে সেখানে সম্পূর্ণ ঐক্য বা স্বাজাত্যবোধ আসা প্রায় অসম্ভব। এমনি নানাবিধ আলোচনার পরিসমাপ্তি টানা যায় গোলাম মুরশিদের বক্তব্য দিয়ে। তিনি লিখেছেন :
ত্রয়োদশ-চতুর্দশ শতাব্দীর আগে সত্যিকার বাংলা ভাষা বিকাশ লাভ করেনি। চতুর্দশ শতাব্দীর আগে অখণ্ড বঙ্গদেশও গড়ে ওঠেনি। আর এ অঞ্চলের লোকেরা বাঙ্গালি বলে পরিচিত হননি আঠারো শতকের আগে। সুতরাং তেরো-চোদ্দ শতকের আগেকার সংস্কৃতিকে বাঙালি সংস্কৃতির ভিত্তিভূমি হিসেবে বিবেচনা করতে পারি, কিন্তু তা সত্যিকার অর্থে বাঙালি সংস্কৃতি নয়। ( গোলাম মুরশিদ, ২০০৬ 26 )
বাঙালি সংস্কৃতির স্বরূপ ও আদ্যপান্ত জানতে পূর্ববর্তী সংস্কৃতির ধারা সম্বন্ধে সম্যক জানা আবশ্যক মনে করেন মুরশিদ।
আলোচনার বক্তব্য হিসেবে বলা যায়, হাজার বছর ধরে বাংলা ভূখণ্ডে বিচিত্র জাতির আগমন, তাদের জীবনসংগ্রামের যুথবদ্ধ মনোভাব তাকে বেগবান ও বিকশিত করেছে।
নানা বর্ণের মিথস্ক্রীয়ায় পরস্পর বিরোধীতা, বিচ্ছিন্নতা, নানা বৈচিত্র্য সামাজিক জীবনের সাধারণ ঘটনা হলেও, শান্তিপূর্ণ সহাবস্থানের নিরন্তর চেষ্টায় সমাজ ও পরিবেশের সাথে নিজেকে খাপ খাওয়ানোর চেষ্টা করেছে বাংলার মানুষ। এর মাঝে শাসনব্যবস্থার পরিবর্তন, ধর্মপ্রচার, বাণিজ্য, সামাজিক বা অর্থনৈতিক উৎসবের মতো রীতি-প্রথা দৃঢ় করেছে সামাজিক বন্ধনকে। সময়ের সাথে সাম্প্রদায়িকতা অগ্রাহ্য করে তৈরি হয়েছে নিজস্বতা গড়ে উঠেছে বঙ্গীয় সংস্কৃতি; যা জাতি হিসেবে বাঙালির অর্জন।
বাঙালি সংস্কৃতির সংকট
একটি জাতির অধিকার-চেতনা, দেশপ্রেম, আত্মসম্মানবোধ সবকিছু তার সাংস্কৃতিক জীবনের সঙ্গে অবিচ্ছিন্ন। তাই কোনো দেশের সংস্কৃতিকে প্রভাবিত করা গেলে সে জাতির সামগ্রিক জীবনকে নিশ্চিতভাবেই নিয়ন্ত্রণ করা সহজ হয়।
ঐতিহাসিক দৃষ্টান্ত তুলে ধরে অতুল সুর (২০০৮ : ১২) লিখেছেন, পাল বংশের রাজত্বকালই হচ্ছে বাঙলার ইতিহাসের গৌরবময় যুগ। সে সময় শিক্ষা, সংস্কৃতি, সাহিত্য, স্থাপত্য ও ভাস্কর্য বিশেষ উৎকর্ষ লাভ করে। বাঙালির প্রতিভা বিকাশের এটাই ছিল এক বিস্ময়কর সময়। পালেদের পর সেনবংশের আমলে ব্রাহ্মণ্যধর্মের পুনঃপ্রতিষ্ঠা হয়।
বর্তমানে প্রচলিত জাতিভেদ প্রথা সেনযুগেই প্রথম দৃঢ় রূপ ধারণ করে। সেন বংশের লক্ষণসেনের আমলেই বাঙলা মুসলমানগণ কর্তৃক বিজিত হবার পর আরম্ভ হয় বাঙলার বিপর্যয়ের যুগ। মূর্তি ও মঠ-মন্দির ভাঙা হয়। হিন্দুদের ব্যাপকভাবে ধর্মান্তরিত করা হয়। আর শুরু হয় ব্যাপকভাবে নারীধর্ষণ। এটাই ছিল ধার্মান্তরকরণের প্রশস্ত রাস্তা, কেননা ধর্ষিতা নারীকে আর হিন্দুসমাজে স্থান দেওয়া হতো না। হিন্দুসমাজ এসময় প্রায় অবলুপ্তির পথেই চলেছিল।
সে যুগে নতুন করে একটা সমাজবিন্যাস ঘটে, উল্লেখ করে অতুল সুর (২০০৮ : ১৩) যোগ করেন, সে সমাজে উদ্ভূত কৌলীন্যপ্রথা সমাজে এক যৌনবিশৃঙ্খলতা আনে। অতুল তাঁর লেখায় রামনারায়ণ তর্করত্ন ও ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের উদ্ধৃতি দিয়ে লেখেন, তাঁদের মতে এমন কৌলিন্য প্রথার ফলে বাঙলার কুলীন ব্রাহ্মণ সমাজে এভাবে দুষিত রক্ত প্রবাহিত হতে থাকে। বাঙালি সমাজকে আরও বিশৃঙ্খল করে তুলেছিল। বিদেশি বণিকদের আগমন :
ষোড়শ শতাব্দীতে পর্তুগীজরাই প্রথম এদেশে আসে। তাদের আগমনের সঙ্গে সঙ্গেই নতুন পর্যায়ে শুরু হয় নারী ধর্ষণ ও অবৈধ যৌনমিলন। বাঙালি মেয়েদের রক্ষিতা হিসেবে রাখবার ফারমান (firman ) পর্তুগীজরা পায় মুঘল দরবার থেকে। কিন্তু পর্তুগীজদের পরে ইংরেজরা যখন এদেশে আসে তখন তারা বিনা ফারমানেই বাঙালি মেয়েদের রক্ষিতা হিসেবে রাখতে শুরু করে। …. এক কথায় সমাজ ক্রমশ অবক্ষয়ের পথেই চলছিল। (অতুল, ২০০৮: ১৩)
এরই পরিপ্রেক্ষিতে ঊনবিংশ শতাব্দীতে সংঘটিত হয় নবজাগৃতি (Renaisance)। নবজাগৃতির ফলে সমাজ সুসংহত হয়েছিল বটে, কিন্তু স্বাধীনতা-উত্তর যুগের সমাজে আবার প্রকাশ পেয়েছে সামাজিক বিশৃঙ্খলা ও নৈতিক শৈথিল্য। অতুল ( ২০০৮ : ১৩) আক্ষেপের সাথে লিখেছেন, বাঙালির যে প্রতিভা একদিন মহামতি গোপালকৃষ্ণ গোখেলকে উদ্বুদ্ধ করেছিল উদাত্ত কণ্ঠে ঘোষণা করতে যে, “What Bengal thinks today India thinks tomorrow”, তা যেন আজ কালান্তরের গর্ভে চলে গিয়েছে। বাঙালি আজ তার নিজস্ব সংস্কৃতির স্বকীয়তা হারিয়ে ফেলেছে। অশনে-বসনে আজ সে হয়েছে বহুরূপী। আজ সে এক বর্ণচোরা জারজ সংস্কৃতির ধারক। বাঙালির বিবর্তনের এটাই শেষ কথা।
ঐতিহাসিক নানা চড়াই-উত্রাইয়ে সংস্কৃতির যে ধারা বাংলাদেশে বিকশিত হয়েছিল এবং যা এখনো কিছু বহমান, সেই ধারার সাথে আধুনিক বিবর্তিত সভ্যতা যোগসূত্র হারিয়ে ফেলছে, এমন আশঙ্কার কথা বলেন গোপাল হালদার
‘কৃষ্টি’ বলিতে আমরা যদি উহার মূলগত কৃষ্ণধাতু ও কৃষির উপর জোর দিই, তাহা হইলে বলিতে পারি – ‘বাগুলার কালচার’ কৃষি বা কৃষকের সহিত সম্পর্ক প্রায় রাখে না- ইহা বারুদের জিনিস, ‘বাবু কালচার’। এই জন্যই আমরা ‘বানার কালচার’ বলিলেই বুঝাই ভদ্রলোকের জিনিস। এই কথা মনে মনে বুঝি বলিয়াই বলি, অন্য প্রদেশে ‘ভদ্রলোক’ নাই (গোপাল, ১৯৭৬ ১৯১ )
উপর্যুক্ত ভাবনায় মিল পাওয়া যায় রবীন্দ্রনাথের কাছেও। সভ্যতার সংকটে তিনি বলেছেন : সভ্যশাসনের চালনায় ভারতবর্ষের সকলের চেয়ে যে দুর্গতি আজ মাথা তুলে উঠেছে সে কেবল অন্ন বস্ত্র শিক্ষা এবং আরোগ্যের শোকাবহ অভাবমাত্র নয়, সে হচ্ছে ভারতবাসীর মধ্যে অতি নৃশংস আত্মবিচ্ছেদ, যার কোনো তুলনা দেখতে পাই নি ভারতবর্ষের বাইরে মুসলমান স্বায়ত্বশাসন-চালিত দেশে। (রবীন্দ্রনাথ, ১৩৯৮ : ৭৪৩ )
বাঙালির জীবনে সভ্যতার এই সংকট তার সাংস্কৃতিক জীবনকে করে তুলেছে দুরূহ।
উত্তরাধিকার সূত্রে বাঙালি মুসলমানরা সনাতন সাহিত্যিকদের শিল্পকর্মকে বাঙালি ঐতিহ্য থেকে বিচ্ছিন্ন করার ব্যর্থ চেষ্টা করে সাংস্কৃতিক সংকটকে ঘনিভূত করেছে। পূর্ব পাকিস্তানী মধ্যবিত্ত মুসলমানদের অনেকের ধারণা ছিল, বাঙালি হিসেবে নিজেদের পরিচয় দিলে ধর্মনাশ হবে, সেই সঙ্গে তাদের রাষ্ট্রের বুনিয়াদ শিথিল হবে। ফলে, বাঙালি মুসলিম সংস্কৃতি এই দ্বন্দ্বের মুখোমুখি হলো- তাদের পরিচয় ‘বাঙালি’ না ‘মুসলিম’ ! – দৃষ্টিভঙ্গীর ভারসাম্যের এই অভাববোধই তাদের সৃষ্টিহীনতার জন্যে দায়ী। উপরের তথ্যসমূহ উল্লেখ করে বদরুদ্দীন উমর যুক্তি দেখিয়েছেন
রবীন্দ্রনাথ যে অর্থে ভারতীয়, কাজী নজরুল সে অর্থেই রবীন্দ্রনাথের চেয়ে অনেক বেশী ভারতীয়। … কিন্তু রবীন্দ্রনাথের বিরুদ্ধে মুমীনের দল যতখানি আত্মবিশ্বাসের সাথে মাদল বাজিয়েছেন, নজরুলের বিরুদ্ধে খোলাখুলিভাবে ততখানি করার সাহস তাঁদের এখনো নেই। কিন্তু সে ক্ষেত্রেও বিশ্বাসের বিস্ফোরণ হলে বিস্মিত হওয়ার কিছু নেই। কারণ নজরুল- রবি ঠাকুরকে বাতিল না করলে হাতিম তাঈয়ের পুঁথি, কাওয়ালি আর মর্সিয়া সাহিত্যে রসিকজনের মন বসবে কেন? (বদরুদ্দীন, ১৯৭৪ ১১২-১১৩)
রবীন্দ্রনাথ ‘হিন্দু’ এবং ‘ভারতীয়’ বিধায়, তাঁর গান শোনা ও তাঁর সাহিত্যচর্চায় ধর্মনাশ হবে বলে যারা মনে করেন, তারাই মহেঞ্জোদারো, হরপ্পা, তক্ষশীলাকে পাকিস্তানের ইতিহাস এবং সংস্কৃতির অবিচ্ছেদ্য অংশ বলে সগৌরবে প্রচার করতে দ্বিধাবোধ করেন না বলে মন্তব্য করেন বদরুদ্দীন (১৯৭৪ ১১২)। রবীন্দ্র- বিরোধিতা যেন উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে বাংলা ভাষা সরলীকরণ, নববর্ষ উৎসব বন্ধ করার এক দুরভিসন্ধি। যার সাথে ১৯৪৮ ও ১৯৫২’র ভাষা বিরোধী প্রচেষ্টার যোগসূত্র খুঁজে পাওয়া যায়। বদরুদ্দিন আশঙ্কা প্রকাশ করে বলেন :
যতদিন না আমরা চন্ডীদাস, বিদ্যাসাগর, বঙ্কিমচন্দ্র, মাইকেল মধুসূদন, রবীন্দ্রনাথ, শরৎচন্দ্র অতুলপ্রসাদ, অবনীন্দ্রনাথ প্রভৃতিকে নিজেদের সাহিত্য সংস্কৃতির ঐতিহ্যের ধারক এবং বাহক হিসেবে গণ্য এবং স্বীকার করতে শিখবো ততদিন পর্যন্ত আমাদের সংস্কৃতির মধ্যে সৃষ্টির গতিবেগ সঞ্চার করতে আমরা সমর্থ হবো না। আমাদের চারিধারে নানাপ্রকার কৃত্রিম বাধার দেওয়াল তুলে আমরা নিশ্চল ডোবার পানিতেই শুধু অবগাহন করবো। এর বেশী অন্য কিছু সংস্কৃতি ক্ষেত্রে আমাদের দ্বারা আর সম্ভব হবে না। (বদরুদ্দীন, ১৯৭৪ ১০-১১ )
বাঙালি সংস্কৃতির সংকট ধর্ম প্রভাবিত হলেও, বদরুদ্দীন মনে করেন, কে কোন ধর্মাবলম্বী – এটি সংস্কৃতির ক্ষেত্রে যেমন প্রাসঙ্গিক হওয়া উচিত নয়, তেমনি পাশ্চত্য বিদ্বেষও অপ্রাসঙ্গিক :
ইংরেজ বিদ্বেষের ফলে তারা পাশ্চাত্য শিক্ষাদীক্ষার প্রতি অনেক ক্ষেত্রে হয় বিরূপ মনোভাবসম্পন্ন। আবার হিন্দু বিদ্বেষের ফলে তারা ভারতীয় সংস্কৃতি এবং বাংলা সংস্কৃতি থেকেও নিজেদেরকে বিচ্ছিন্ন করার চেষ্টা করে। পাশ্চাত্য এবং বাঙালী সংস্কৃতিকে প্রায় অস্বীকার করে অধিকাংশ ক্ষেত্রে তারা গঠন করতে উদ্যত হয় তাদের স্বতন্ত্র ধর্মীয় এবং সাম্প্রদায়িক সংস্কৃতি।
এ প্রচেষ্টা যে কৃত্রিম এবং অস্বাভাবিক সেটা তার ব্যর্থতার দ্বারাই অনেকাংশে প্রমাণিত হয়। অর্থনৈতিক এবং রাজনৈতিক কারণে হিন্দুদের থেকে নিজেদের পৃথক করে দেখার চেষ্টার মধ্যেই আমরা বাঙালী না মুসলমান? এ প্রশ্নের উদ্ভব এবং সাম্প্রদায়িক আবহাওয়ার মধ্যেই এ চিন্তাধারার বিকাশ। (বদরুদ্দীন, ১৯৭৪: ২-৩)
ধর্মকে স্বার্থসাধনে ব্যবহার করার অবান্তর কিছু কৌশল, প্রকৃতপক্ষে সামাজিক দুর্বলতাকেই জোরদার করে। আর ধর্ম নিয়ে বাড়াবাড়ির মনোবৃত্তি যেন কুসংস্কারাচ্ছন্ন, হীনমন্য জাতির পরিচায়ক। বাঙালি সংস্কৃতির প্রবহমান স্রোত, স্বার্থচিন্তা ছাপিয়ে যুক্তিবাদ দ্বারা পরিচালিত নয় বলেই, বাংলা ভাষাভাষি জনগণ সত্যিকার অর্থে তাদের সংস্কৃতির সুফল ভোগ করতে পারেনি বলে মনে করা হয়।
এর সাথে যোগ হয়েছে আধুনিকতা ও পাশ্চাত্যবাদ, যা ধীরে ধীরে ঐতিহ্যিক সংস্কৃতির ধারাকে বিলীন করে দিয়েছে বলে মনে করেন কে. এম. মোহসীন
এখনকার যুবক শ্রেণি সাধারণত ঐতিহ্যকে অস্বীকার করে উগ্রপন্থি দল হিসেবে পরিচিতি লাভ করছে। তারা উচ্চ কন্ঠের গান শুনছে এবং বিদেশী ফ্যাশন গ্রহণ করছে। অধিকন্তু চলচ্চিত্র ও প্রেক্ষাগৃহে, চলচ্চিত্রের পোস্টারে, চলচ্চিত্রের বিজ্ঞাপনে এবং বিভিন্ন পণ্যদ্রব্যের বাণিজ্যিক বিজ্ঞাপনে পাশ্চাত্য সংস্কৃতির প্রভাব পরিলক্ষিত হয়। একদিকে সবশেষের প্রযুক্তির সুবিধাদিসহ প্রলোভনদায়ক আধুনিক জীবনের হাতছানি আছে, অন্যদিকে রয়েছে দারিদ্র, নিরক্ষরতা, অপব্যবহার ও শোষণের ব্যাপকতা। পাশ্চাত্যের আধুনিক ও আধুনিকোত্তর সংস্কৃতির প্রভাব বিভিন্ন চ্যানেলের মাধ্যমে আমাদের সমাজকে প্রভাবিত করছে। এর ফলে আমাদের ঐতিহ্যিক মূলোর ব্যাপক পরিবর্তন ঘটছে। (মোহসীন, ২০০৭: ৬৩৫)
সামাজিক অবকাঠামোকে ভিত্তি করেই ধর্মনীতির মতো সংস্কৃতির বিচরণ। যেখানে আছে নীতিবোধ, শিল্পসাধনা, রাজনীতি, বৈশ্বিক জ্ঞান। সামাজের পরিবর্তনশীল প্রক্রিয়ায় ভাঙা-গড়ার মাঝেও মূলত সাম্প্রদায়িকতা যে পর্যন্ত বাঙালির মনজগতে বিরাজ করবে, সে পর্যন্ত মুক্তি মিলবে না এই বিপর্যয়ের হাত থেকে এমন আশঙ্কা সমাজবিজ্ঞানীদের।
বাঙালি সংস্কৃতির সম্ভাবনা
প্রাগৈতিহাসিক কাল থেকে মানুষ বিচ্ছিন্ন, নিঃসঙ্গ সময় যেমন অতিক্রম করেছে, তেমনি সাধনা আর সংগ্রামে প্রতিহত করেছে সেই দুঃসময়কে। আশার কথা এই যে, সংকট মোকাবেলা করে সামনে এগিয়ে যাওয়ার ইতিহাস বাঙালির জীবনে অন্তহীন। সীমাহীন প্রচেষ্টায় মানুষ শোধন করেছে বিরুদ্ধ সমাজব্যবস্থাকে, জয় করেছে ‘ব্যক্তি আমি’র ষড়ঋপুকে। এর চালিকা শক্তি ছিল অসাম্প্রদায়িক মনোভাব, যোগ্য নেতৃত্ব, সর্বপোরি নিজের ক্ষমতায় বিশ্বাস। এই আচরণসমূহ সুস্থ সংস্কৃতির বিকাশে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।
ইতিহাসের আলোকে দেখা যায়, রাষ্ট্রীয় এবং সামাজিক পরিবর্তনের ফলে যে সাংস্কৃতিক সংকট তৈরি হয়েছিল, তা মুসলমান মধ্যবিত্তের উপর দিয়ে প্রবাহিত হলেও গ্রামবাংলায় এ জাতীয় সংকট তৈরির সুযোগ হয়নি। এর কারণ ব্যাখ্যা প্রসঙ্গে বদরুদ্দীন উমর (১৯৭৪ ১১-১২) বলেন, গ্রাম বাংলার সংস্কৃতি ক্ষেত্রে অনেক আগে থেকেই হিন্দু-মুসলমানের সামাজিক ও ধর্মীয় চিন্তাধারার মেলবন্ধন ঘটেছিল। যার উদাহরণ- বাংলার লোকসাহিত্য।
মধ্যবিত্তের এ সংকট মুখ্যত সাম্প্রদায়িকতা-সৃষ্ট এবং মধ্যবিত্ত শ্রেণিই এই সাম্প্রদায়িকতার জনক। সাম্প্রদায়িকতার জন্যই বাংলার সাধারণ সংস্কৃতি এবং ঐতিহ্যকে মুসলমানেরা নিজেদের সংস্কৃতি এবং ঐতিহ্য বলে স্বীকার করতে সহজে প্রস্তুত হন না। এই সংকট থেকে উত্তরণের পথ হিসেবে, বদরুদ্দীন সাম্প্রদায়িকতা মুক্তির পথ খুঁজেছেন :
সাম্প্রদায়িকতা যখনই তাঁর আকার ধারণ করেছে ‘আমরা বাঙালী না মুসলমান” এ প্রশ্ন তখনই আনুপাতিক প্রচণ্ডতার সাথে মাথা তুলে এ সাংস্কৃতিক সংকটকে করে তুলেছে দুরূহত্তর। এজন্যেই সাম্প্রদায়িকতা যে পর্যন্ত আমাদের মানসলোকে রাজত্ব করবে সে পর্যন্ত আমরা এই সাংস্কৃতিক সংকটের হাত থেকে রেহাই পাবো না।
এ সংকট উত্তীর্ণ হওয়ার একমাত্র পথ সাম্প্রদায়িকতাকে সর্বস্তরে এবং সর্ব ভাবে খর্ব করা এবং উত্তীর্ণ হওয়া। এ প্রচেষ্টায় সফলকাম হলে আমরা ान, না মুসলমান, পাকিস্তানী?’ এ ধরনের অদ্ভুত প্রশ্ন বাঙালী মুসলমানেরা আর কোনদিন নিজেদের কাছে উত্থাপন করবে না। এবং তখনই তারা সঠিকভাবে নির্ণয় করতে সক্ষম হবে নিজেদের জাতীয় এবং সাংস্কৃতিক পরিচয়। (বদরুদ্দীন, ১৯৭৪ – ১১-১২)
বাংলার ঐতিহাসিক নিদর্শন, সাহিত্য আর পুরাকীর্তিগুলোও সংস্কৃতির অংশীদার হয়ে স্বমহিমা প্রকাশ করে চলেছে। সে প্রসঙ্গ তুলে ধরে আবুল কাসেম ফজলুল হক লিখেছেন
কালের ক্ষয় অতিক্রম করে পাহাড়পুর, মহাস্থানগড়, ময়নামতি, লালমাই প্রভৃতি স্থানে বাঙালির প্রাচীন সভ্যতার যেসব নিদর্শন টিকে আছে, সেগুলো এক আলোকোজ্জ্বল অতীতের প্রমাণ দেয়। শীলভদ্র- দীপঙ্করের কালের পরিচয় নিতে গেলে বুঝতে অসুবিধা হয় না যে, সে কালটা ছিল বাঙালির ইতিহাসে এক জাগ্রত চেতনার কাল। পাল রাজাদের সময়টাতে বৌদ্ধ ধর্মকে অবলম্বন করে, বাঙলাভাষী প্রায় সমগ্র ভূ- ভাগে দেখা দিয়েছিল এক জাগরণ। পরে পাঠান সুলতানদের কালে বাংলা ভাষায় অত্যন্ত সমৃদ্ধ সাহিত্য সৃষ্টি হয়েছে।
সেকালের বাস্তবতায় অত্যন্ত সমৃদ্ধ চিন্তারও পরিচয় আছে সেকালের অনেক গ্রন্থে। একদিকে। ইসলামের স্পর্শে বাঙালির জীবনে নবচেতনা, অপরদিকে শ্রীচৈতন্য প্রচারিত গৌড়ীয় বৈষ্ণব ধর্ম অবলম্বনে বাঙালির জাগরণ। ষোড়শ শতাব্দী বাঙালীর ইতিহাসে আর এক জাগরণের কাল। তারপর ইউরোপীয় জ্ঞান-বিজ্ঞান আত্মস্থ করে উনিশ শতকে বাঙালি আবার জেগেছে।
প্রথমে বৌদ্ধিক জাগরণ, পরে গণজাগরণ – উনিশ শতকের শুরু থেকে বিশ শতকের ষাটের দশক পর্যন্ত। বিশ শতকে নানা বিপর্যয় অতিক্রম করে ঢাকা কেন্দ্রিক নতুন জাতীয় সংস্কৃতি দানা বেঁধেছে ও বিকশিত হয়েছে। (আবুল কাসেম, ২০১৫ : ৫৯)
বাংলার প্রকৃতি ও ভৌগলিক অবস্থান বাংলার সংস্কৃতিকে দান করেছে স্বাতন্ত্র্য। যার প্রভাব পড়েছে সঙ্গীত, শিল্পকলা, কাব্য, মৃৎশিল্পে। আনিসুজ্জামানের ভাষায় :
ভৌগোলিক বৈশিষ্ট্যের দরুণ বাংলায় বিভিন্ন রাজত্ব যেমন স্থায়িত্ব লাভ করতে সমর্থ হয়েছে, তেমনি বাংলার এই বিচ্ছিন্নতার ফলে ধর্মমতের ক্ষেত্রে বিদ্রোহ ও উদ্ভাবন দেখা দিয়েছে। বাংলার সাহিত্য- সঙ্গীতের ক্ষেত্রে প্রাকৃতিক বৈচিত্র্যের প্রভাব লক্ষ করা যায়।
সর্পদেবী মনসার মাহাত্মা গান করে লেখা ‘মনসা মঙ্গল’ কাব্যের উত্তর পূর্ববঙ্গের জলাভূমিতে, পশ্চিমবঙ্গের রুক্ষ মাটিতে বিকাশ বৈষ্ণব পদাবলীর। নদীমাতৃক পূর্ব বঙ্গে ভাটিয়ালি গানের বিস্তান, শুষ্ক উত্তরবঙ্গে ভাওয়াইয়ার, আর বাংলার পশ্চিমাঞ্চলে কীর্তন ও বাউলের। শিল্পসামগ্রীর লভ্যতাও প্রকৃতির ওপর নির্ভরশীল। তাই বাংলার স্থাপত্যে পাথরের চেয়ে ইট আর মাটির প্রধান্য, মৃতফলক এখানকার অনন্য সৃষ্টি। (আনিসুজ্জামান ২০১৬ ৫০-৫১)
বাংলার মানস-সংস্কৃতি প্রধানত আশ্রয় করেছে আধ্যাত্ম চিন্তা, সাহিত্য ও বঙ্গীয় দর্শনকে। খুব বড় পরিসরে না হলেও, স্থাপত্য, ভাস্কর্য ও চিত্রকলার ক্ষেত্রে বাংলার দান অস্বীকার করার উপায় নেই, বলে মনে করেন তিনি।
বাঙালি সংস্কৃতিকে বিকশিত করার প্রচেষ্টা হিসেবে বদরুদ্দীন উমর (১৯৭৪ ১১৪) ইতিহাসকে বিবেচনায় নিয়ে বলেন, রাষ্ট্রভাষা-আন্দোলন জনগণের আন্দোলনে পরিণত হয়েছিল, কারণ সমস্যাটি ছিল তাদের দৈনন্দিন জীবনের সাথে অচ্ছেদ্য।
সেই বাংলা ভাষাকে রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি দেয়ার পরও থেমে নেই ভাষা সাহিত্যের ওপর আক্রমণ। এখন এই আক্রমণ সাফল্যের সাথে প্রতিহত করতে ভাষা-সাহিত্যের সাথে বৃহত্তর জীবনের নিবিড় যোগাযোগের বিষয়ে সচেতন হতে হবে। এই চেতনাই পারে দুরভিসন্ধিমূলক প্রচেষ্টার স্বরূপ উদ্ঘাটন করে, বাংলা ভাষা সাহিত্যচর্চাকে অব্যাহত রাখার আন্দোলন সফল করতে।
আবু জাফর শামসুদ্দীন (১৯৮৮: ১০-১১) মনে করেন, দুঃশাসনের ফলে দেশবাসীর দৈনন্দিন জীবন দুর্বিষহ হয়ে পড়লে সশস্ত্র অভ্যুত্থানের মাধ্যমে শাসক এবং শাসন পদ্ধতি পরিবর্তন করা যায়। তবে, প্রবহমান সাংস্কৃতিক ক্ষেত্রে এমন সশস্ত্র বিপ্লব না হলেও, এর ওপর জবরদস্তির ফল কখনোই ভালো হয় না।
বঙ্গীয় সংস্কৃতির সম্ভাবনাকে ফলপ্রসূ করতে আত্মপ্রবঞ্চনা পরিহার করে সচেষ্ট হবার আহ্বান জানান আহমদ শরীফ :
আমদের কিছু নেই, কিছু সম্ভাবনা তো আছে? আমরা গড়ে নেব, চেষ্টা করব। কিন্তু আমাদের কিছু আর্য, কিছু আরবি, কিছু ইরানি ইত্যাদি করে আমরা যেন আর আত্মপ্রবঞ্চনা না করি। আমাদের প্রাচীন যুগের ইতিহাস রচিত হবে জনপদভিত্তিক, মধ্যযুগের ইতিহাস হবে অঞ্চলভিত্তিক, আধুনিক যুগের ইতিহাস হবে বাঙালি জাতিসত্তার চেতনা ও পরিচিতিভিত্তিক।
আমাদের প্রাচীন ঐতিহ্য খুঁজব জীবিকা পদ্ধতিতে এবং সাংখ্য, যোগ ও তন্ত্র দর্শনে, মধ্যযুগে খুঁজব জীবন-জীবিকার অরি-মিত্র দেবকল্পনায় ও বিদেশি প্রভাবে এবং আধুনিক যুগের ইতিহাসে সন্ধান করব ইউরোপীয় জ্ঞান-বিজ্ঞান-মনন সংস্কৃতির প্রভাবের ব্যাপকতা ও গভীরতা। আত্মপ্রবঞ্চনা ত্যাগ করলে, চেষ্টা করলে বাঙালি উন্নতি করবেই এটা বিশ্বাস করি। (আহমদ শরীফ ২০১৬ ৪৯)
এমন নানা বাস্তবতায় আবুল কাসেম ফজলুল হক মনে করিয়ে দেন, সমাজের খেটে খাওয়া মানুষেরা সবদিক থেকেই পশ্চাত্ত্বর্তী। আর আমাদের জাতীয় সংস্কৃতি অবক্ষয়ক্লিষ্ট। তবে, পশ্চাৎবর্তীতার সমস্যা আর অবক্ষয়ক্লিষ্টতার সমস্যা এক ব্যাপার নয়, উল্লেখ করে তিনি লিখেছেন :
পশ্চাৎবর্তী জাতি উন্নতিশীল হতে পারে। কিন্তু অবক্ষয়ক্রিয় জাতি অবক্ষয়ের ব্যাধি থেকে মুক্ত হতে পারলেই কেবল উন্নতির উপায় করতে পারে। বাংলাদেশে জনগণের সংগ্রামী চেতনার মধ্য দিয়ে সুস্থ সংস্কৃতির প্রকাশ ঘটলে গণবিরোধী নেতৃত্ব আর বাইরের আধিপত্যবাদী শক্তি নানা ষড়যন্ত্রের দ্বারা অচিরেই তাকে বিকৃত করে দেয়। জনগণের মধ্য থেকে, জনগণের জন্য, জনগণের দ্বারা সৃষ্ট নেতৃত্বে পরিচালিত রাজনৈতিক সংগ্রামের মধ্য দিয়ে গণচেতনার বিকাশ ঘটলেই অপসংস্কৃতির স্থলে সংস্কৃতির সূচনা হবে। (আবুল কাসেম, ২০১৬ : ৬৪-৬৫)
মানুষ যা চায়, তাতে ব্যর্থতা অবশ্বস্তারী জেনেও, ইতিহাসের সাফল্য তুলে ধরে তিনি যোগ করেন, সমূহ ধ্বংসের আয়োজনও আমাদের ধ্বংস করতে পারেনি। কারণ আমাদের অবস্থা পরিবর্তনের সম্ভাবনা আছে এবং অবস্থার উন্নতি ঘটাতে সবাই সচেষ্ট। সে জন্যই মানুষ চিন্তা করে, কাজ করে, গড়ে উঠতে ও গড়ে তুলতে চায়। নিজেদের কল্যাণে ঐক্যবদ্ধ হয়ে যোগ্য নেতৃত্ব গড়ে তুললে জয় সুনিশ্চিত বলে মনে করেন তিনি।
মানুষের অপার সম্ভাবনার প্রতি শেষ পর্যন্ত বিশ্বাস রেখেছেন রবীন্দ্রনাথও। তাঁর সভ্যতার সংকটে আছে সেই স্তুতি :
আশা করব – মহাপ্রলয়ের পরে বৈরাগ্যের মেঘমুক্ত আকাশে ইতিহাসের একটি নির্মল আত্মপ্রকাশ হয়তো আরম্ভ হবে এই পূর্বাচলের সূর্যোদয়ের দিগন্ত থেকে। আর একদিন অপরাজিত মানুষ নিজের জয়যাত্রার অভিযানে সকল বাধা অতিক্রম করে অগ্রসর হবে তার মহৎ মর্যাদা ফিরে পাবার পথে। মনুষ্যত্বের অন্তহীন প্রতিকারহীন পরাভবকে চরম বলে বিশ্বাস করাকে আমি অপরাধ মনে করি। (রবীন্দ্রনাথ, ১৩৯৮ 488 )
এ যাবৎ আলোচনার পরিপ্রেক্ষিতে বলা যেতে পারে, প্রাচীন যুগ থেকে শুরু করে এ পর্যন্ত বাংলা ভূখণ্ডে যত জাতি, ধর্মের বা ভাষাভাষি জনগণের আগমন ঘটেছে, তার বিশেষ প্রভাব রয়েছে বাঙালি সংস্কৃতির ওপর। সে অর্থে বাঙালি সংস্কৃতি মূলত সমন্বয়বাদী। এই সমন্বয় ধর্মীতার প্রভাব আছে সমাজ, শিল্প, কারুকলা, স্থাপত্যসহ সব বিষয়ে।
ধারণা করা হয়, আর্যদের আগমনের পূর্বে বাংলা অঞ্চলে বসবাসকারীরা হয়তো সর্বপ্রাণবাদে বিশ্বাসী ছিল। পরবর্তীতে ব্রাহ্মণ্যবাদ থেকে শুরু করে আবির্ভাব ঘটে হিন্দু, জৈন, বৌদ্ধ এবং ইসলাম ধর্মের। তাই ধর্ম, লোকাচার, অভ্যাস, মূল্যবোধ বা ব্যবহার্য উপকরণে একটি বিশেষ ছাপ, বাঙালি হিসেবে তার সংস্কৃতিকে বিশিষ্ট্য ও মহিমান্বিত করে।
আলোচনায় বাঙালি কারা, জাতি হিসেবে তার উদ্ভব, বৈশিষ্ট্য, বাঙালি সংস্কৃতির সতন্ত্র রূপ, সময়ের সাথে তার বিবর্তন ইত্যাদি সম্পর্কে নিখুঁত ধারণা পাওয়া দূরূহ। তবে একথা বলা যায়, প্রাচীন কালের গুহাচিত্র সংস্কৃতি থেকে আজকের নগর সভ্যতায় পৌঁছুতে মানবিক ও প্রাকৃতিক সবকিছুই একটি জাতির সংস্কৃতির অন্তর্গত। সেই ধারায় ইতিহাসের নানা চড়াই-উতরাই পেরিয়ে বাঙালি তার ভাষা-সাহিত্য, সঙ্গীত, শিল্প নৈপূণ্যে তৈরি করতে পেরেছে সংস্কৃতির নিজস্ব রূপ।
ইতিহাস পর্যালোচনায় বাঙালি সংস্কৃতির ভিত্তি নির্মাণে অনেক সীমাবদ্ধতা, নেতিবাচক দিক ও ভ্রান্তচিস্তার নজির পাওয়া যায়। বাঙালির হাজার বছরের ভাষা ও সংস্কৃতিকে তার ইতিহাস ও ঐতিহ্য থেকে বিচ্যুত করার গভীর ষড়যন্ত্র, ভাষা বিকৃতির অপচেষ্টা, সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা উচ্চে দেবার মতো অপ্রীতিকর ঘটনা নিয়ে হতাশা আর সংকট আবর্তিত হলেও, সীমাবদ্ধতার গণ্ডি পেরিয়ে দেখা মিলেছে অমিত সম্ভাবনার।
বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, জাতিগত সংকীর্ণ সীমানা আর সংকট কাটিয়ে ওঠার জন্য সর্বাগ্রে প্রয়োজন সর্বস্তরে সাম্প্রদায়িকতামুক্ত সমাজব্যবস্থা প্রতিষ্ঠিত করা। এই প্রচেষ্টায় অংশগ্রহণকারীগণ নির্ণয় করতে সক্ষম হবেন নিজেদের জাতীয় এবং সাংস্কৃতিক পরিচয়। মনন ও দর্শনে, কৃষ্টি ও সাহিত্যে, ইতিহাস ও চেতনায় বাঙালির যে নিজস্বতা, তা চর্চার মাধ্যমেই পরিশীলিত হতে পারে উন্নত চেতনার প্রকাশ।
