Site icon Literature Gurukul [ সাহিত্য গুরুকুল ] GOLN

বাংলায় ষড়ঋতুর উৎসব : উৎস সন্ধান

আজকে আমাদের আলোচনার বিষয়ঃ বাংলায় ষড়ঋতুর উৎসব : উৎস সন্ধান। যা বাঙালির উৎসব এর অন্তর্গত।

 

 

বাংলায় ষড়ঋতুর উৎসব : উৎস সন্ধান

বাংলায় ষড়ঋতুর উৎসব

বিশেষ একটি দিনের সুন্দর ও শুভ সূচনা প্রাণিত করে সব বাঙালিকেই। সে দিনটি অন্য সব দিনের থেকে ভিন্ন, কারণ সেখানে থাকে আশাদীপ্ত মঙ্গলের প্রত্যাশা। বাঙালির বিশেষ সেই দিন-উৎসবের দিন। এ দিনের মধ্যে অনেকগুলোই প্রকৃতি-ঘনিষ্ঠ, ঋতু উৎসবের দিন। যে দিনে প্রকৃতিকে শুধু ভালোবাসার উজ্জ্বলতা প্রকাশই নয়, বহিঃপ্রকাশ ঘটে প্রকৃতির কৃপা লাভের কৃতজ্ঞতারও। সামাজিক বিধি নিষেধ, লোকাচারের বাড়াবাড়ি কখনো ঠাঁই পায় না এই উৎসবে।

পূর্ববর্তী আলোচনা থেকে জানা যায়, উৎসব এক প্রাচীন সাংস্কৃতিক রীতি। নৃ-বিজ্ঞানীরা এর উদ্ভবকাল বিষয়ে নিখুঁত ধারণা দেয়া প্রায় অসম্ভব মনে করলেও, অতীতের অনেক নিদর্শন থেকে তাঁরা এই মতে পৌঁছেন; মানুষের উৎসব উদ্ভবের ইতিহাস মানব জাতির পৃথিবীতে আবির্ভাবের সময় থেকেই। পর্যায়ক্রমে সামাজিক বিবর্তনের মধ্য দিয়ে বিকশিত হয়েছে সে সব উৎসব।

উৎসব উদ্ভবের মতো বাংলায় ঋতুভিত্তিক উৎসবের উদ্ভব ঠিক কবে থেকে, তার দালিলিক প্রমাণ পাওয়া না গেলেও, পূর্ববর্তী অধ্যায়ে ইতিহাসবিদদের আলোচনার সূত্রে প্রতীয়মান হয় যে- প্রাগৈতিহাসিক যুগে প্রকৃতির ফুল-ফল ভক্ষণ, পশুশিকারকেন্দ্রিক খাদ্যসংগ্রহ, আগুনের আবিষ্কার এবং যৌথ কৃষি কার্যক্রমে শুরু হওয়া মানুষের দলীয় জীবনের বাঁকে বাঁকেই এর উদ্ভব। তাই বলা যায়, বাঙালি জনরুচিও গড়ে উঠেছে বাংলা বারো মাস আর ছয় ঋতুর বৈচিত্র্যময় অভিজ্ঞতার সঞ্চয়ে।

অনুমান করা হয়, চতুর্থ শতকের দিকে গঙ্গা নদীর অববাহিকায় গড়ে ওঠা নতুন জনপদ গঙ্গারিডাই মূলত প্রাচীন বাংলাদেশ (মৃত্যুঞ্জয়, ২০১০ ১৩)। সভ্যতার বিকাশ ধারায় এ দেশে নানা যুগের শাসন আমল বৌদ্ধ, হিন্দু, সুলতানী, মুঘল এবং দীর্ঘদিন পাশ্চাত্য সংস্কৃতি দ্বারা প্রভাবিত হয়ে, আপন সংস্কৃতির সঙ্গে বোঝাপড়া করে বাঙালি জাতি স্বতন্ত্র্যভাবে খুঁজে পেয়েছে আত্মপরিচয়, নিজের উৎসব।

পারিবারিক আনন্দ আবহ থেকে শুরু করে, সমাজ ও ধর্মীয় রীতি-প্রথা পালনের পাশাপাশি প্রকৃতির ঋতুভিত্তিক উৎসব- উদযাপনের আকাঙ্ক্ষা দেখা যায় উৎসবপ্রিয় বাঙালি জাতির মনে। হাজার বছরের সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্য নিয়ে আপন শক্তিতে উদ্ভাসিত হয়েই হয়তো বারো মাসে তেরো পার্বণের দেশ হয়ে ওঠে বাংলাদেশ।

ভালো ফসল প্রাপ্তির কামনা এবং ফললাভের কৃতজ্ঞতা স্বরূপ শুরু হয় নানা লোকাচার, উল্লেখ করে মৃত্যুঞ্জয় রায় লিখেছেন :

বৈশাখে যেমন পালন করা হয় বিহু উৎসব ও গুষ্ঠিপুকুর ব্রত, তেমনি শ্রাবণে বারি বর্ষণের জন্য দেয়া হয় বরুণ দেবের পূজা বা শিব পূজা, পৌষে করা হয় বায় পূজা। তেমনি অতীতে গোকুল ব্রত, বসুন্ধরা এত জয়মঙ্গল এত ভাদ্র মাসে ভানুরি ব্রত, চৈত্রে সোমেশ্বরীর ব্রত ইত্যাদিও প্রচলিত ছিল। পরবর্তীতে হল প্রবাহ, হালাকা ছানি, সাইতরোয়া, কীরবাস, গোহোরবোনা, আগধান ইত্যাদি বৃত্তিতের প্রচলন লক্ষ করা যায়। (মৃত্যুঞ্জয় ২০১০ 20-23)

যুগ যুগ ধরে প্রকৃতির পালাবদল ও ঋতুর বৈচিত্র্য গভীর প্রভাব ফেলে চলেছে এ দেশের মানুষের জীবনে। গ্রামাঞ্চলে সময় গণনায় ঋতু ও বাংলা মাসের ওপর নির্ভরশীলতা থেকে শুরু করে এখন পর্যন্ত ভূ-প্রকৃতি ও জলবায়ু প্রবাহের ধরন, প্রাণির জীবনচক্র, জীবিকার উৎসব বা জীবন ধারণে বৈচিত্র্য সবই প্রভাবিত হয়। ঋতুচক্র দ্বারা।

‘বিপর্যন্ত ঋতুচক্র’ প্রবন্ধে দীপিকা ঘোষ (২০১৪) লিখেছেন, ঋতুচক্রের আবর্তনক্রিয়া মহাবিশ্বের অন্য কোনো গ্রহে অস্তিত্বমান রয়েছে বলে এখনো জানা যায়নি। তাই মহাবিশ্বে আবিষ্কৃত গ্রহগুলোর মধ্যে এখনো অবধি পৃথিবী নামক গ্রহেই জলবায়ু ও আবহাওয়ার বৈচিত্র্যময় প্রকৃতি বজায় থাকায়, সব ধরনের প্রাণ টিকে থাকার অনুকূল পরিবেশ বিরাজমান। এদিকে, মহাদেশগুলোর মধ্যে শুধু এশিয়া মহাদেশের বাংলাদেশ ও পশ্চিম বাংলার কিছু অংশে সুস্পষ্ট পার্থক্যে ছয় ঋতুর উপস্থিতি উল্লেখযোগ্যভাবে অনুভব করা যায় বলে উল্লেখ করেন দীপিকা।

এই ষড়ঋতুর রূপ ও প্রকৃতি বন্দনায়, সুদূর অতীত থেকেই বাঙালি কবি-সাহিত্যিকেরা অবগাহন করেছেন। যেমন- মধ্যযুগের বৈষ্ণব পদাবলিতে বিদ্যাপতি লিখেছেন, এ সখি হামারি দুখের নাহি ওর/ এ ভরা বাদর মাহ ভাদর/ শূন্য মন্দির মোর। এই বিরহের অনুভূতি গাঢ় হতে পেরেছে বর্ষা ঋতুর প্রভাবে। মহাকবি কালিদাসের মহাকাব্য ‘মেঘদূত’-এ একখণ্ড মেঘ হয়ে ওঠে বিরহীর বার্তাবাহক।

আবার রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের গান- শীতের হাওয়ার লাগলো নাচন আমলকির এই ডালে ডালে’ বা ‘রোদন-ভরা এ বসন্ত, সখি / কখনো আসেনি বুঝি আগে; শুনলেই বোঝা যায়, ঋতু কবি মনে কতখানি প্রভাব ফেলতে পেরেছে। কিংবা প্রকৃতিই কাজী নজরুল ইসলামকে উচ্চারণ করিয়েছে, ‘এসো শারদ প্রাতের পথিক/ এসো শিউলি বিছান পথে / এসো ধুইয়া চরণ শিশিরে / এসো অরুণ কিরণ রথে। বেগম সুফিয়া কামাল সাঁঝের মায়া কাব্যগ্রন্থে ‘তাহারেই পড়ে মনে’ কবিতায় স্মৃতিকাতর হয়ে লেখেন, ‘কুহেলী উত্তরী তলে মাঘের সন্ন্যাসী/ গিয়াছে চলিয়া ধীরে পুষ্পশূন্য দিগন্ধের পথে / রিক্ত হস্তে।

বাংলার মানুষের ঐতিহ্যগত সাংস্কৃতিক পরিচয়ে অসংখ্য বৈচিত্র্য নিয়ে বার বারই এসেছে ঋতুবন্দনা। আর একে উৎসবে পরিণত করতে কবিগুরুর বিশেষ অবদান রয়েছে। তিনি শান্তিনিকেতনের আশ্রমে ঋতু উৎসবের আয়োজন করতেন বেশ ঘটা করেই। সত্যেন সেন শিল্পীগোষ্ঠী আয়োজিত শরৎ উৎসব-১৪২৮ বঙ্গাব্দের স্মরণিকায়, রবীন্দ্রনাথের উৎসব-ভাবনা প্রসঙ্গে আনিসুজ্জামান (২০২১) লিখেছেন
রবীন্দ্রনাথ ছিলেন উৎসবপ্রিয়। তাঁর জীবদ্দশায় শান্তিনিকেতন ও শ্রীনিকেতনে ঋতু-উৎসব থেকে শুরু করে বৃক্ষরোপন ও হলকর্ষণ উৎসব অনুষ্ঠিত হয়েছে। সব উৎসব যে কবি নিজেই প্রবর্তন করেছিলেন, তা নয়। যেমন, ১৯০৭ সালে ব্রহ্মচর্যাশ্রমে প্রথম যে ঋতু-উৎসব অনুষ্ঠিত হয়, তার উদযোগ করেছিলেন কবিপুত্র শমীন্দ্রনাথ – মৃত্যুর কয়েক মাস আগে। পরের বছর ক্ষিতিমোহন সেন শাস্ত্রীকে কবি দিয়েছিলেন বর্ষ উৎসব আয়োজনের ভার।
রবীন্দ্রনাথ নিজে অবশ্য তাতে যোগ দিতে পারেননি তিনি শিলাইদহে বস্ত ছিলেন পল্লী পুনর্গঠনের কাজে। অনুপস্থিতির সেই ক্ষতি পুষিয়ে নিতে তিনি শারদোৎসবের আয়োজন করেন এবং সেই থেকে শারদোৎসব নাটকের মতো প্রত্যেক ঋতুতেই তার উপযোগী নাটক ও গান রচনা করেন । বসন্ত আসে রাজা ও ফাল্গুনীতে, বর্ষা অচলায়তনে ছয় ঋতুর সমাবেশ হয় নটরাজ- কতুরঙ্গশালায়। (আনিসুজ্জামান, 2021 )
আনিসুজ্জামান লিখেছেন, বর্ষা-শরৎ-বসন্তে নানা উৎসবের সাজ দেখা যায় প্রকৃতিতে। নব আনন্দ, নব উৎসব সবকিছুই বিরাজমান। শুদ্ধচিত্তে প্রবেশের অপেক্ষা শুধু। বসন্ত উৎসব – রবীন্দ্রনাথের আদর্শ শীর্ষক এক লেখায় পাওয়া যায়
দুর্গাপুজো এড়িয়ে শারদোৎসব, বিশ্বকর্মাকে সম্মান দিয়ে শিল্পোৎসব বাংলাভাষা ও সমাজে শান্তিনিকেতন নতু শব্দ ও ভাবনার সংযোজন করেছে।
নববর্ষের দিন শ্রীগণেশ বা এলাহি ভাসা, আমপাতা-সিঁদুর, পঞ্জিকা, হালখাতা আর লাড্ডু ছাড়াও যে নববর্ষ পালন হতে পারে সেটা শিখিয়েছেন স্বয়ং রবীন্দ্রনাথ ও তাঁর শান্তিনিকেতন। আজকের বাংলাদেশ সেই ধর্মীয়-অনুযহীন অনুষ্ঠানকে এক অন্যমাত্রায় নিয়ে গিয়েছে। কিন্তু সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ও উল্লেখযোগ্য অনুষ্ঠান-বিবর্তন হল এই বসন্তোৎসব। তখন থেকেই দেশ-বিদেশের নানা অতিথির পাশাপাশি উৎসবে সামিল করা হতো আদিবাসীদেরও। সেই প্রথা আজও চলছে। (২০২০)
সেই প্রথার রেষ ধরে বলা যায়, বাঙালির স্বতন্ত্র ভাষা জাতিগত বৈশিষ্ট্য ছাড়াও নিজস্ব সংস্কৃতির ধারার সাথে যুক্ত তার ধর্ম, ভৌগলিক স্বাতন্ত্র্য, পারিবারিক কাঠামো, শ্রেণিগত সম্পর্ক ও অর্থনৈতিক কাঠামো। সাথে যোগ হয়েছে সময় গণনার রীতি, বিভিন্ন লৌকিক ক্রীড়া, লোক-উৎসব, মেলা, লোকশিল্প, লোকগীতি, নৃত্য ও বাদ্য। তাই ঋতু ঋতুউৎসবের উৎস সন্ধানে এ দেশের সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্যগুলোর পর্যবেক্ষণ জরুরি।

ঋতুভিত্তিক উৎসবের সূচনা

বাংলা বছরকে ঘিরে বাঙালির নানা উৎসব আয়োজনের উদ্ভব ও বিকাশ ঘটে। গ্রামাঞ্চলে লোকমুখে বলা হয়ে থাকে ‘ব্রত’ শব্দ থেকে ‘ঋতু’ শব্দটির উৎপত্তি। ‘দুই মাস নিয়ে এক একটি পর্ব রত বলে, দুই মাসে এক ঋতু – এমন তথ্য দেন সাইমন জাকারিয়া। ‘বাংলা ঋতু-মাসের নামবিচার’ (২০১১) প্রবন্ধে ‘ঋতু’ শব্দের অর্থ – আরোপ ও ব্যবহার বিধির ব্যাখ্যা প্রসঙ্গে তিনি বাংলা অভিধান প্রণেতা হরিচরণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের উদ্ধৃতি তুলে ধরেন : ‘অগ্রহায়ণ হইতে দুই দুই মাস যথাক্রমে শিশির বসন্ত গ্রীষ্ম বর্ষা শরৎ হিম বৎসরে এই ছয় ঋতু।
অর্থাৎ এক সময় অগ্রহায়ণ থেকে বাংলা বর্ষ গণনা শুরু হয়ে ধারাবাহিক ভাবে শিশির বা শীত, বসন্ত, গ্রীষ্ম,বর্ষা, শরৎ ও হিম তথা হেমন্ত দিয়ে বর্ষ গণনা শেষ করা হতো পুরোনো ঋতু আবর্তনে। পাশাপাশি বাংলা ঋতু গণনার অন্য মতান্তরে বাংলার প্রথম ঋতু গ্রীষ্ম বলেও উল্লেখ করেছেন হরিচরণ। এই আলোচনা থেকে প্রাচীন বাংলার প্রথম ঋতু অগ্রহায়ণ না বৈশাখ, সে সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর আগে প্রথম ঋতু উৎসব উদযাপনের বিষয়ে আরও তথ্য সমৃদ্ধ হওয়া প্রয়োজন।
অবিভক্ত বাংলাদেশের কৃষির উৎপত্তি হয়েছিল নব্য প্রস্তর যুগের শুরুতেই (৩০০০-২৫০০ খ্রি. পূর্বাব্দ)- এমন তথ্য দেন মাধুরী সরকার ( ২০১৪ : ৭৭)। প্রাচীন বাংলায় ধানই প্রধান শস্য হওয়ায়, আমন ধান তোলাকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠে আদিম খাদ্যপ্রাপ্তির উৎসবের এক বিবর্তিত রূপ, যেখানে মানুষের বিশ্বাসে খাদ্য অর্থাৎ অতি আদরের ধান হয়ে উঠেছে স্বয়ং শস্যদেবী লক্ষ্মী। মাধুরী সরকার লিখেছেন :
সর্বপ্রাণবাদে বিশ্বাসী মানব সমাজ শুধু ফসলকে দেবীরূপে পুজো করেই ক্ষান্ত নয়। ধান গাছকে একজন পরিপূর্ণ রমণীর মতো সম্মান প্রদান করেছে। রমণীর সন্তান ধারণের ঘটনাকে কেন্দ্র করে বিভিন্ন জাদু- বিশ্বাস – যা প্রচলিত মনুষ্য সমাজে, তা আদৃত হয়েছে ধান চাষের বিভিন্ন পদ্ধতি, রীতি রেওয়াজ ও সংস্কারের মধ্যে। ফসলের মাস অগ্রহায়ণ-পৌষ। প্রাচীনকালে ভারতবর্ষে নববর্ষ শুরু হতো অগ্রহায়ণ মাসে। সামাজিক ও রাজনৈতিক প্রয়োজনে নববর্ষ স্থানান্তরিত হয় বৈশাখ মাসে। আজও শ্যামদেশে অগ্রহায়ণ মাসে নববর্ষ পালিত হয়।
এই অগ্রহায়ণ ও পৌষ মাস উল্লেখযোগ্য ফসল প্রাপ্তির সময়। এই ফসল প্রাপ্তিকেন্দ্রিক যে উল্লাস – তা থেকেই জন্য নিয়েছে ‘নবান্ন’ নামক শস্যোৎসব। এই উৎসব মাঠের ফসল ঘরে তোলার চাঞ্চল্য ও মাটির সঙ্গে একাত্মতার উৎসব। বাংলার প্রধান ফসল আমন ধান ঘরে ওঠার সময় পালিত হয় তোষলা, নবান্ন, পৌষালী, টুসু প্রভৃতি সমজাতীয় এতগুলি শুধুমাত্র সময় ও নামের সামান্য হেরফেরে এই ব্রতগুলি প্রত্যেকটিই নব অন্ন (খাদ্য) প্রাপ্তির উৎসব, পিঠেপুলির পার্বণ। (মাধুরী 2014 : 79 )
শস্য ও জীবন একার্থক বিধায় সুপ্রাচীন কাল থেকে শস্যকে কেন্দ্র করে বিভিন্ন দেশে ও জাতির মধ্যে শস্য উৎসব উদযাপিত হয়ে আসছে। প্রদ্যোত কুমার (১৯৮৮: ১৩৭) যোগ করেন, ভিন্ন ভিন্ন সময়ে বিভিন্ন শস্যের সমাগমে মানুষ মুখর হয়ে ওঠে। তাদের শ্রম স্বার্থক হয়েছে এই ভাবনায় শস্যগুলিকে সাদর সম্ভাষণ, জানানোর জন্যে তারা নানা রকম উৎসব ও পূজাচারের আয়োজন করে। তাছাড়া বাংলাদেশে বিভিন্ন শস্যের সঙ্গে অনেক দেবদেবীর ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক কল্পনা করে নেওয়ার জন্যে শস্য উৎসবের কদর অনেক বেশি, যেটা পৃথিবীর আর কোথাও নেই।
প্রাচীন বাংলায় প্রাণবাদে বিশ্বাসী মানুষ কৃষিব্যবস্থায় শস্য উৎপাদনের বিভিন্ন পর্যায়ে বিভিন্ন সংস্কার, ব্রত, উৎসব, পার্বণ ইত্যাদি পালন করতো। শস্যকে দেবতা জ্ঞানে বিভিন্ন পূজা বা ব্রতও উদযাপিত হতো নানা আড়ম্বরে, উল্লেখ করে মৃত্যুঞ্জয় রায় লিখেছেন :
প্রাচীন বাংলায় হাল চাষের দিন শুরু হতো চাষের অনুষ্ঠান জমিকে উর্বর ও উৎপাদনক্ষম করার অনুষ্ঠান। এ অনুষ্ঠানে কৃষকেরা একজোড়া আনাড়ি ষাঁড়ের গলায় নতুন ফলাযুক্ত লাঙ্গল জুড়ে দিত। ষাঁড় তাড়া খেয়ে এলাপাথাড়ি দৌড়ে যতগুলো ক্ষেত স্পর্শ করত আসন্ন মৌসুমে সেসব জমিতে ভালো ফসল ফলবে বলে লোকেরা বিশ্বাস করত। আষাঢ়ের প্রথম সপ্তাহে জমি কতুবর্তী হয় বলে তারা বিশ্বাস করত এবং এজন্য তারা সে সময় জমিতে চাষ করত না।
প্রাচীন রোমের ‘দিয়া’ পূজার মতো এদেশেও অনাবৃষ্টির সময় বৃষ্টির জন্য প্রার্থনা জানিয়ে পূজা দেয়া হতো। ধান গাছ গর্ভবর্তী হলে বা শিষ দেখা দিলে ধানকে সাথ দেওয়ার রেওয়াজ ছিল। সাধারণত আশ্বিন মাসের সংক্রান্তিতেই মেয়েরা এ দিন শিখ ভরা মাঠে গিয়ে ধানকে সাধভক্ষণ করাত। ওল, মানকচু, রাইসরিষা আউশের আতপ চাল, ঘি, মধু, হলুদ বাটা, সর্ষের তেল ক্ষেতে ছিটিয়ে তারা বলত-
ধানরে ধান, সাধনা
পেকে ফুল বাড়ি যা
এরপর আসত ধান পাকা ও পাকা ধান কাটা-মাড়াইয়ের অনুষ্ঠান (মৃত্যুঞ্জয়, ২০১০ : ১৯)
এমন তথ্য উপাত্ত থেকে ধারণা করা যায় ঋতুভিত্তিক উৎসব আয়োজনের ধারণা হয়তো অগ্রহায়ণ থেকেই শুরু হয়েছিল।
বঙ্গ অঞ্চলে প্রাচীনকাল থেকে নবান্ন উৎসব পালনের রীতি চলে আসছে, এমন তথ্য সূত্রসহ উল্লেখ করেন।
শামসুজ্জামান খান :
পশ্চিম বঙ্গের চব্বিশ পরগনা জেলার চন্দ্রকেতু গড় উৎখননে ফলে নবান্ন উৎসবের চিত্র আবিষ্কৃত হয়েছে। খ্রিষ্টীয় তৃতীয় চতুর্থ শতাব্দীর এই ঐতিহাসিক স্থান গুপ্তযুগের স্মৃতি বহন করছে। এই অনুষ্ঠানের পেছনে আদিম সংস্কার এবং যাদু বিশ্বাসের প্রভাব থাকাও খুবই সম্ভব। (শামসুজ্জামান, ২০১৩ ৫৮-৫৯)
গ্রামবাংলায় নবান্ন উৎসব লোক ঐতিহ্য ও লোকসংস্কৃতির একটি অংশমাত্র এবং এর উৎপত্তি লোকবিশ্বাস ও লোকসংস্কার থেকেই; এমনটি উল্লেখ করে তিতাস চৌধুরী (২০১৪ : ৪৭) নবান্নকে মূলত লেকাচার (ritual ) সম্পৃক্ত উৎসব হিসেবে সংজ্ঞায়িত করেন। লোকাচারে সাধারণত ম্যাজিক, ট্যাবু, টোটেম, অ্যানিমিজম প্রভৃতি আদিম বিশ্বাস ও চেনারই প্রতিফলন ঘটে।
নবান্ন উৎসবে লোকাচার প্রাধান্য পেতো, এর প্রমাণ পাওয়া যায় বিজনকুমার মণ্ডলের লেখায়। প্রাচীন বিশ্বাস মতে, নতুন ধান উৎপন্নের সময় পিতৃপুরুষেরা অন্ন প্রার্থনা করে। নবান্ন শ্রাদ্ধ না করে নতুন অন্ন গ্রহণ করলে পাপের ভাগী হতে হবে, এই জ্ঞানে নতুন অন্ন প্রথমে পিতৃপুরুষ, দেবতা এবং কাককে নৈবেদ্য দিয়ে আত্মীয়-স্বজনকে পরিবেশন করার রীতি প্রচলিত ছিল- উল্লেখ করে বিজনকুমার লেখেন :
ভারতীয় পুরাণ ও শাস্ত্র অনুযায়ী যমের পরিকল্পনা, ঋগ্বেদে যম-পরলোকের রাজা – পিতৃপতি’। পরলোকে পিতৃগণ যমের সঙ্গে মিলিত হন। কাক হল মৃত্যু দেবতা যমের প্রতিনিধি। তাছাড়া বিশ্বাস মানুষের মৃত্যু হলে তার আত্মা যে পাখি বিশেষত কাক হয়ে ঘুরে বেড়ায়।
সেই অনুযায়ী শ্রদ্ধা পর্যন্ত প্রতিদিন পুকুরে ভাসানো পিণ্ডের প্রতি মৃতের আত্মীয়রা অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করত, কোনো দাঁড়কাক তা খাচ্ছে কিনা। এই বিশ্বাস বাংলায় সর্বত্র প্রচলিত রয়েছে। সাধারণের ভাষায় মৃতের প্রতি ঐ পিদানকে বলা হয় ‘কাকবলি। তাই মনে করা হয় শুভ উৎসব নবান্নোর অর্ঘ্য আগে দিতে হয় কারুকে। (বিজনকুমার ২০১৪ঃ১৬)
আদিম বিশ্বাস মতে, নশ্বর দেহ মৃত্যুর পর বিনাশ হয়ে গেলেও আত্মার মৃত্যু হয় না। এ বিশ্বাস হিন্দুদের ভেতর আছে এবং প্রতিবেশী মুসলমানরাও এই ভাবনায় প্রভাবিত ছিলেন উল্লেখ করে মোমেন চৌধুরী বলেন, ‘লোকবিশ্বাস মতে অবিনশ্বর আত্মা বৃক্ষ বা পশুপাখিকে আশ্রয় করে টিকে থাকে এবং মৃত পিতৃপুরুষেরা তাদের ছদ্মাবরণে বাসগৃহে আসেন। তাঁদের অন্ন দিয়ে আশীর্বাদ কামনাই হল এর উদ্দেশ্য। … পিতৃতর্পনের সংস্কার থেকে এর উদ্ভব।’ (মোমেন, ২০১৪ঃ৪১ )
প্রচীনকালে ভারতবর্ষে নববর্ষ শুরু হতো অগ্রহায়ণ মাসে। অগ্র অর্থ আগে, আর হায়ণ অর্থ বছর। বছর শুরুর মাস বলেই হয়তো এই নামকরণ। তবে অগ্রহায়ণ শব্দের আভিধানিক অর্থ; যে সময় শ্রেষ্ঠ ব্রীহি (ধান) উৎপন্ন হয়। মূলত অগ্রহায়ণ ও পৌষ মাস ছিল উল্লেখযোগ্য ফসলপ্রাপ্তির সময়।
বিজনকুমার মণ্ডল (২০১৪: ৬০) লিখেছেন, মধ্যযুগ পর্যন্ত বাংলা বছর ভারম্ভের মাস অগ্রহায়ণ ছিল বিধায়, এই মাসকে বলা হয় মাগশীর্ষ। কৃষিভিত্তিক সমাজব্যবস্থায় যে মাসে বছরের নতুন শস্য বাড়িতে আনা হয় এবং যে মাসে নবান্ন উৎসব হয়, সেই মাস বছরের প্রথম মাস হওয়াটাই ছিল স্বভাবিক নিয়ম।
“আধুনিককালের কোনো কোনো গবেষক দুর্গাপূজাকে কৃষি উৎসব বলে মনে করেন – এমন ধারণা প্রদ্যোত কুমারের (১৯৮৮: ১৩৬)। কারণ হিসেবে উল্লেখ করেন, দুর্গাপূজায় নবপত্রিকার ব্যবহার ও নবপত্রিকাকে গঙ্গায় স্নান করানোর প্রথাই যথেষ্ট ইঙ্গিত বহুল। তাছাড়া বর্ষণের পরে শস্য প্রাপ্তির প্রাক্কালে এ পূজোর প্রচলনও শস্য ঘনিষ্ঠতার পরিচয় দেয়। আবার কেউ নবপত্রিকার ব্যবহার দেখে এবং শরৎকালে আউশ ধানের সংগ্রহ থেকে অনুমান করেন দুর্গাপূজা নবান্নের উৎসব।
লোকউৎসব ‘নবান্ন’ বাঙালি ঐতিহ্য আর সংস্কৃতির সাথে হৃদয়ের বন্ধনকে অটুট রাখার এক চেতনার নাম। আবহমানকাল ধরে বাংলাদেশের সংস্কৃতি, উৎসব, পার্বণ এবং জীবনধারার সবটাতে কৃষি অর্থাৎ প্রধান খাদ্যশস্য ‘ধান’ জীবনধারণের মূল শক্তি বলে বিবেচিত হতো বিধায়, প্রধান ও অনেক উৎসব শস্যকে কেন্দ্র করে অনুষ্ঠিত হতো। ‘নবান্ন’ এর প্রকৃষ্ট নিদর্শন।

গ্রীষ্মকালীন উৎসবের সূচনা

ইংরেজি বছরের পাশাপাশি বাংলা বছর যখন শুরু হলো, তখন থেকেই তা পালিত হতো। তবে পহেলা বৈশাখ থেকে বাংলা বছর গণনা শুরু করা নিতান্তই প্রয়োজনে। যার প্রমাণ পাওয়া যায় মুহম্মদ তকীয়ুল্লাহর লেখায়। তিনি (২০০১ : ৪৬-৪৭) লিখেছেন, ১২০১ সালে বখতিয়ার খিলজির বঙ্গ জয়ের পর মুসলমান শাসন আমলে তৎকালীন প্রচলিত শকাব্দ ও লক্ষণাব্দ সনের পাশাপাশি শাসনতান্ত্রিক কর্মকাণ্ডে হিজরি সনের প্রচলন শুরু হয়। ১৭৫৭ সালে ব্রিটিশ রাজত্বকালের আগ পর্যন্ত হিজরি সনই প্রচলিত ছিল।
১৫৭৬ সালে বাংলাদেশ মুঘল সাম্রাজ্যের শাসনভুক্ত হয়। সামাজিক ক্ষেত্রে ও ফসলের মৌসুমের দিকে লক্ষ্য রেখে খাজনা আদায়ের সুবিধার্থে হিজরি সনের পরিবর্তে ঋতুভিত্তিক সৌর সনের প্রয়োজনীয়তা উপলব্ধি করে তখনকার প্রচলিত হিজরি সনকে ‘ফসলি সন’ হিসেবে নামকরণ হয়। যার মাধ্যমে বর্তমান বাংলা সন বা বঙ্গাব্দের জন্ম হয়।
এতদসংক্রান্ত সম্রাট আকবরের নির্দেশনামা জারি হয় ৯৯৩ হিজরি, ৮ রবিউল আউয়াল মোতাবেক ১০ মার্চ ১৫৮৫ সালে এবং তা কার্যকরী করা হয় সম্রাটের সিংহাসন আরোহণের স্মারক বর্ষ ১৫৫৬ সাল মোতাবেক হিজরি ৯৬৩ চান্দ্র সনকে ৯৬৩ বাংলা সৌর সনে রূপান্তরিত করার মধ্য দিয়ে। বাংলা সনের জন্ম সম্পর্কে বিভিন্ন মত থাকলেও ৯৯৩ হিজরির ১৪ রবিউসসানি মোতাবেক ১৫৮৫ সালের ১১ বা ১২ এপ্রিল। ভারত উপমহাদেশে বাংলাভাষী অঞ্চলে এই বাংলা সন বা বঙ্গাব্দ প্রচলিত আছে। (তকীয়ুল্লাহ, ২০০১ : ৪৬- 89)
আবার মুনতাসীর মামুন (১৯৯৪ : ১৪) জানাচ্ছেন, বাংলা নববর্ষের ইতিহাস খুব পুরনো নয়। খুব সম্ভব বাংলা সনের সঙ্গে যোগ আছে বাংলা নববর্ষ পালনের। সম্রাট আকবর বাংলায় বাংলা সন প্রবর্তন করেছিলেন ১৫৮৫ সালে, কিন্তু তার হিসাব ধরা হয় ১৫৫৬ সাল অর্থাৎ তাঁর সিংহাসনারোহনের সময় থেকে।
বাংলা সনের ভিত্তি হিজরি চান্দ্রসন ও বাংলা সৌরসন। বাংলার তৃণমূল পর্যায়ে গ্রহণ করা হয়েছিল বাংলা সন। এর একটি কারণ হতে পারে এই বাংলা সনের ভিত্তি কৃষি এবং বাংলা সনের শুরুর সময়টা কৃষকের খাজনা আদায়ের। যেমন চৈত্রে বৃষ্টি হলেও কিন্তু কৃষক লাঙল দেয় না খেতে লাগুল দেয়া হয় সাধারণত বৈশাখে, বৃষ্টির কামনাও সেজন্য। অবশ্য, চৈত্রে বৃষ্টি হলেও লাঙল দেয়া হয়। তবে, যাই হোক, এখনও সাধারণ মানুষ তাঁর নিত্যকর্ম সম্পাদন করেন বাংলা সনের নিরিখে।
মুনতাসীর মামুনের (১৯৯৪ : ১৫) মতে, পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে একেক ঋতুতে নববর্ষ শুরু হয়। বাংলা নববর্ষ গ্রীষ্মে, যেটা খুব মনোরম মাস নয়। উৎসব ও আনন্দও তেমন হতে পারে না তখন, যেমন হতে পারে শীত বা বসন্তের শুরুতে। অনেকের ধারণা, কৃষির দিক বিবেচনা করলে বাংলা নববর্ষ অগ্রহায়ণেই হওয়া বাঞ্ছনীয় ছিল। যেমন, অগ্রহায়ণ ফসল কাটার মাস। কিন্তু, নতুন বছর শুরু হচ্ছে বৈশাখে।
এ প্রসঙ্গে পল্লব সেনগুপ্তের উদ্ধৃতি তুলে ধরে মুনতাসীর (১৯৯৪ ৯৫) লিখেছেন, ‘হয় হেমন্তে নয় বসন্তে অর্থাৎ শস্য এবং ফুল-ফল যখন নতুন করে জন্মাতে শুরু করে, তখন থেকেই নতুন বছরের হিসাব ধরা। এটিই ছিল প্রাথমিক রেওয়াজ। পরে নানান ব্যবহারিক প্রয়োজনে সেটি অন্যান্য ঋতুতে সরে গেছে কালের বিবর্তনে। পয়লা জানুয়ারি বা পয়লা বৈশাখ থেকে বছর আরম্ভ করার রেওয়াজ তাই অনেক অর্বাচীন। এনামুল হকের উদ্ধৃতি তুলে ধরে মুনতাসীর আরও লিখেছেন :
যেখানে যে ঋঋতু প্রধান্য পেয়েছে, সেখানে সে ঋতুকেই কেন্দ্র করে প্রধান উৎসব সম্পন্ন হয়েছে। তদুপরি ছোটখাট, আর্তব উৎসব তো নিয়মিতভাবে চলতই। এ বিষয়ে বাংলার স্থান নিয়ে স্বতন্ত্র ছিল। তার প্রধান “আতৰ উৎসৱ’ যে গ্রীষ্মকালে ছিল, তা সহজেই অনুমেয়।
পৃথিবীর সর্বত্র যেমন প্রধান ‘আর্তব উৎসব’ নববর্ষের উৎসব রূপে পরিগণিত হয়েছে, আমাদের দেশের গ্রীষ্মকালীন প্রধান উৎসবও নববর্ষের উৎসব রূপে পরিগণিত হয়ে থাকবে, আমার মনে হয়, কাল-বৈশাখীর তান্ডব লীলা ও তার পরে পরেই প্রকৃতির নতুন সৃষ্টির যে রূপটি বাংলাদেশে দেখা দিয়ে থাকে, তাই আমাদের প্রাচীন সংস্কৃতিতে গ্রীষ্মকালের এবং গ্রীষ্মকালীন উৎসব অনুষ্ঠানের প্রাধান্য স্বীকার করে চিনতে বাধ্য করেছিল।
নইলে, এখানকার নববর্ষের অনুষ্ঠান ও উৎসবাদি ধর্মের প্রভাবে বিপুলভাবে প্রভাবিত হত। কেননা, আমাদের দেশ আদিম অধিবাসী, হিন্দু, বৌদ্ধ, মুসলমান ও খৃস্টান অধ্যুষিত দেশ। অথচ এ সমস্ত ধর্মের কোনো বিশিষ্ট প্রভাব আমাদের
নববর্ষের অনুষ্ঠানে ও উৎসবে দেখা যায় না। (মুনতাসীর মামুন, ১৯৯৪ ৯৫-৯৬)
নববর্ষ উৎসবকে প্রায় চার হাজার বছরের পুরনো উল্লেখ করে মুহাম্মদ হাবিবুর রহমান (২০০১ : ৬০) বলেন, সারা পৃথিবীতে বহু যুগ ধরে ধর্মীয়, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানাদির মধ্যে নববর্ষের উৎসব এক উল্লেখযোগ্য স্থান দখল করে আসছে। বিশ্বনিখিলে সৃষ্টি ও সংহারের যে পরিবর্তন অবশ্যম্ভাবী হয়ে দেখা দেয়, তাকে গ্রহণ করে সৃষ্টির যে বার্ষিকী পালন করা হয়, তাকে ঘিরে জমে ওঠে নববর্ষ উৎসব।
বিশ্বজিৎ ঘোষ (২০১৯ ২৫৪ ) মনে করেন, ইংরেজদের দেখাদেখি শতাধিক বছর পূর্ব থেকে বাঙালি আড়ম্বর করে নববর্ষ উদযাপন শুরু করে। যার পেছনে কাজ করেছে জাতীয়তাবাদী চেতনা। রাজনারায়ণ বসু নিজেকে এই উৎসবের প্রবর্তক বলে দাবি করেন, এমন উল্লেখ করে বিশ্বজিৎ ঘোষ আরও লিখেছেন, এর বহু আগে থেকেই ঘরোয়া পর্যায়ে এবং রাজস্ব আদায়-সূত্রে বাঙালি সমাজে নববর্ষ উদযাপিত হতে থাকে।
নববর্ষের উৎসবের সঙ্গে শুরু থেকেই আছে কৃষির সম্পর্ক, আবহাওয়ার সম্পর্ক, গ্রামীণ জীবনের প্রতিদিনের সম্পর্ক। উনিশ শতকের দ্বিতীয় ভাগে পহেলা বৈশাখ উৎসব হিসেবে স্বীকৃতি লাভ করেছে।
১৯৪৭ সালে দেশবিভাগের আগে পর্যন্ত কলকাতা শহরে শিক্ষিত, সম্ভ্রান্ত হিন্দু বা মুসলমান পরিবারে, বাংলা নববর্ষ উদযাপনে উৎসাহ দেখা যায়নি উল্লেখ পূর্বক, সৈয়দ আলী আহসান স্মৃতিচারণ করে বলেন, সে সময় কলকাতা শহরে ইংরেজদের দাপটে ইংরেজি নববর্ষ এবং বড়দিন পালনে জাঁকজমক দেখা যেত
আমি তখন অল ইন্ডিয়া রেডিওতে চাকরি করতাম। আমার স্থায়িত্বগুলোর মধ্যে একটি দায়িত্ব ছিল আরবি মাস এবং বাংলা মাসের খোঁজ-ববর রাখা এবং সেসব মাসগুলোতে কি কি পূজা-পার্বন আছে সেগুলোর ঘোষণা রেডিও থেকে দেয়া। আমার অনুষ্ঠানগুলোর মধ্যে আরেকটি অনুষ্ঠান ছিল প্রতি রবিবার সকালে সাহিত্য বাসর’ এ সাহিত্য পাঠের ব্যবস্থা করা। বাংলা নববর্ষ এলে তার নিকটবর্তী সাহিত্য বাসরে আমি নববর্ষের অনুষ্ঠান করতাম। (আলী আহসান,২০০১ : ৩৩)
বাংলা কাব্যের মধ্যযুগে নববর্ষ পালন বলে কিছু নেই উল্লেখ করে আলী আহসান (২০০১ : ৩২) আরও যোগ করেন, মধ্যযুগের কাব্যে ঋতুর বর্ণনা আছে, আবার বারোমাসি আছে। ঋতুর বর্ণনায় বসন্তঋতুর ক্ষেত্রে চৈত্র ও বৈশাখ এ দুটি মাসের কথা আসত। তবে বসন্ত ঋতুর মাসের হিসেবে বৈশাখের উল্লেখ থাকলেও বৈশাখকে সুস্পষ্টভাবে ‘বারোমাসি’তেই পাওয়া যায়। আলী আহসান বলেন, ‘বারোমাসি’ হিন্দি কাব্যেও আছে, বাংলাতেও আছে। ‘পূর্ববঙ্গ গীতিকায়’ও ‘বারোমাসি’ আছে। তিনি তাঁর মতের সমর্থনে আরও যোগ করেন, মধ্যযুগের কাব্যে পহেলা বৈশাখের চর্চা নেই। পহেলা বৈশাখটি আধুনিক সময়ের সৃষ্টি – উনিশ শতকে এই উৎসব নাগরিকতা পায়।
কবে, কোথায় বর্ষবরণ উৎসবের সূচনা হয়, সে কথা সঠিকভাবে জানা না গেলেও, আ. ন. ম. নুরুল হক (২০০১ ১২১ ) বলেন, বাংলা সনের প্রবর্তক হচ্ছেন সম্রাট আকবর। ইংরেজি ১১ এপ্রিল ১৫৫৬ খ্রিষ্টাব্দে শুরু হওয়া বাংলা সনের শুভযাত্রায় এই সনের নাম ছিল ‘ফসলি বছর’। ফসল কাটার মৌসুমে বাদশাহী খাজনা আদায়ের সুবিধার জন্যই তিনি এই সনের প্রবর্তন করেছিলেন।
মুনতাসীর মামুন (১৯৯৪ ৯৭) মনে করেন, সাংস্কৃতিক আন্দোলনের একটি উপাদান হিসেবে পহেলা বৈশাখ পালন শুরু হয়। আইয়ুব আমলে, রবীন্দ্র সঙ্গীত ও বাঙালি সংস্কৃতির ওপর আক্রমণ শুরু হলে, ছায়ানট ১লা বৈশাখে নববর্ষ পালন উপলক্ষে রমনার বটমূলে আয়োজন করে রবীন্দ্রসঙ্গীতের। গোঁড়া ধর্মবাদের বিরুদ্ধে তা ছিল প্রতিবাদ। ছায়ানটের এই প্রচেষ্টা ক্রমেই জনপ্রিয় হয়ে ওঠে এবং স্বাধিকার আন্দোলনের পরিপ্রেক্ষিতে শাসকগোষ্ঠীর আদর্শের প্রতিবাদে ঘটা করে বাংলা নববর্ষ পালিত হতে থাকে। এভাবে তৃণমূল পর্যায়ের নববর্ষ পালনের সঙ্গে যুক্ত হয় শাহরিক প্রচেষ্টা।
বাঙালি মুসলমানদের নববর্ষমনস্ক হয়ে ওঠার পেছনে সামাজিক-রাজনৈতিক চেতনার বিবর্তন গভীর সম্পর্কিত ছিল। জিল্লুর রহমান সিদ্দিকী (২০০১ : ৯২) মনে করেন, বাঙালির মজ্জাগত বাঙালিত্ববোধ তার সত্তায় মিশে থাকলেও, দৃশ্যমান সাংস্কৃতিক উচ্চারণ ছিল অবদমিত। দীর্ঘকালের সুপ্ত সেই জাতিসত্তাবোধ নিজেকে প্রকাশের সুযোগ পায় উনিশশ সাতচল্লিশের পর থেকে।
মাতৃভাষা বাংলার ওপর পশ্চিম পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠীর আঘাত ছিল এর মূল কারণ। তিনি বলেন, ‘ভূমিকম্পের আঘাতে যেমন নদীর উৎসমুখ খুলে যায়, ভাষা আন্দোলনের ওপর রাষ্ট্রীয় আঘাত সেভাবেই কাজ করেছিল, বাঙালি সংস্কৃতির স্রোতে তখন থেকেই আমাদের অবগাহনের শুরু। (জিল্লুর, ২০০১: ৯২)
বাংলা বছরের প্রথম দিনটি পুণ্যাহ নামে প্রচলিত ছিল। পুণ্য দিন বা পুণ্য কর্ম দ্বারা উদযাপনীয় বিধায় দিনটিকে বলা হত পুণ্যাহ। করুণাময় গোস্বামী (২০০১ : ৬৮) বলেন, ইংরেজ আমলে চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত প্রবর্তনের পর থেকে বাংলা বছরের প্রথম দিন পুণ্যাহ হিসেবে স্বীকৃত ছিল। যেদিন জমিদারগণ আনুষ্ঠানিকভাবে খাজনা আদায় শুরু করতেন। শুধু সেই দিনটিই নয়, পুরো আয়োজনটিও পরিচিত ছিল পুণ্যাহ নামে।
তবে প্রাচীন গ্রন্থাদিতে পাওয়া বিবরণের উল্লেখ করে তিনি বলেন, কোনো ব্যক্তি পূর্ব পরিকল্পিতভাবে যে কোনো দিনকে পুণ্য কর্ম দ্বারা পুণ্যাহ হিসেবে উদযাপন করতে পারেন। তাই সেই অর্থবছরে পুণ্যাহ একাধিক দিনও হতে পারত। করুণাময় গোস্বামী হরিচরণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের বঙ্গীয় শব্দকোষে উল্লেখিত পুণ্যাহের অর্থ তুলে ধরেন এভাবে – বাংলায় জমিদারদের নববর্ষের শুভ প্রথমদিন যে দিন নববর্ষের খাজনা আদায় করা হতো।
করুণাময় (২০০১ : ৭০) আরও উল্লেখ করেন, ময়মনসিংহের গৌরিপুর জমিদার বাড়িতে পুণ্যাহতে প্রথিতযশা হিন্দুস্তানীরা সমবেত হয়ে আসর বসাতেন। এই নিয়মের প্রচলন ছিল রবীন্দ্রনাথের জমিদার বাড়িতেও। মিলনের আদর্শে উজ্জীবিত হতেই রবীন্দ্রনাথ নববর্ষসহ নানা ঋতু উৎসবের প্রচলন করেন শান্তিনিকেতনের আশ্রমিক পরিমণ্ডলে। এই আবহ বিরাজ করত জোড়াসাকোর ঠাকুর পরিবারের কাছারি বাড়িতেও। নববর্ষ প্রভাতে চলত পুণ্যাহর আয়োজন।
কৃষির সাথে সম্পৃক্ত জনগোষ্ঠীর বিশেষ উৎসবের দিন পহেলা বৈশাখ। আর পহেলা বৈশাখে উৎসবের গুরুত্বপূর্ণ আয়োজন হালখাতা। বর্ষবরণ উৎসবের সূচনা সম্ভবত ‘হালখাতা’ থেকেই এমন মন্তব্য করে আ ন. ম. নুরুল হক বলেন :
সেকালে ক্রেতাগণ নির্দিষ্ট কোন দোকান থেকে বাকিতে কেনাকাটা করতেন।
দোকানি একটা লাল রঙের খেরো খাতায় বাকির হিসাব লিখে রাখতেন। নববর্ষের ‘হালখাতা’ অনুষ্ঠানে কার্ড দিয়ে নিমন্ত্রন জানানো হত ক্রেতাগণকে। ক্রেতাগণ কখনো পুরা পাওনা, কখনো আংশিক পাওনা পরিশোধ করতেন। দোকানি মিষ্টি দিয়ে সবাইকে আপ্যায়ন করতেন। (রু, ২০০১ঃ ১২২)
সঙ্গীত শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ‘ছায়ানট’ পহেলা বৈশাখের ভোরে নববর্ষকে বরণ করে আসছে এক বর্ণাঢ্য সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের মাধ্যমে। রাজধানী ঢাকার রমনা লেকের বটমূলে আয়োজিত অনুষ্ঠানে সূর্যের আলো ফোটার সাথে সাথে প্রভাত বীণায় মুখর হয়ে ওঠে শিল্পী-শ্রোতা বেষ্টিত পরিবেশ। রবীন্দ্রসঙ্গীত, নজরুল গীতি এবং আবৃত্তি পরিবেশনায় হাজারো মানুষের ভিড়ে পরিপূর্ণ হয়ে ওঠে রমনা বটমূলের গাছ-গাছালি ঘেরা সবুজ চতুর।
১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলনের পর বাঙালির সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য তুলে ধরার ব্যাপারে সংস্কৃতি কর্মীরা সচেষ্ট হয়ে ওঠেন। তারই অঙ্গ হিসেবে শুরু হয় নববর্ষ উদযাপন। যার পেছনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে ছায়ানট এমন প্রসঙ্গের অবতারণা করে আনিসুজ্জামান (২০০১ : ৩১৪) বলেন, একথা অনস্বীকার্য, তখন পরিবেশ ছিল অবরুদ্ধ। আর এই পরিবেশই মনের জোরকে যেন বাড়িয়ে দেয়, করে তোলে প্রতিবাদী। এই প্রতিবাদ সাংস্কৃতিক আগ্রাসনের বিরুেদ্ধে। নববর্ষ একটা সামাজিক মিলনের ভিত্তি হিসেবে কাজ করতে শুরু করে বলে মন্তব্য করেন তিনি।
ছায়ানটের বর্ষবরণ শুরুর সময়টা নিয়ে কিছুটা বিভ্রান্তি আছে। রমনার অশত্থ তলে নববর্ষের সঙ্গীতানুষ্ঠানটি ১৯৬৮ সালে শুরু হলেও, ১৯৬৩ সাল থেকে ছায়ানট সঙ্গীত বিদ্যালয়, শান্তিনিকেতনের আবহে পহেলা বৈশাখ উদ্‌যাপন করত – এমন তথ্য হাবিবুর রহমানের (২০০১ : ৬২)। অজয় দাশগুপ্ত (২০০১ ৮৬) – উল্লেখ করেন, ১৯৬৪ সালে রমনার অশত্থমূলে এর সূচনা।
রবীন্দ্র জন্মশতবর্ষ উদযাপনের প্রেরণা থেকে ছায়ানট রমনার বটমূলে নববর্ষ পালনের সিদ্ধান্ত নেয় (করুণাময়, ২০০১: ৭১)। রমনার বটমূল বেছে নেয়ার ধারণায় ছিল – একটি নিবিড় প্রাকৃতিক পরিবেশে বিপুল সংখ্যক মানুষকে উৎসবে সমবেত হতে উজ্জীবিত করা। ততদিনে গণতান্ত্রিক রাজনৈতিক সংগ্রামের বিস্তার লাভের পাশাপাশি জোরালো হয়েছে ‘বাংলাদেশ বোধ’। ফলে নববর্ষ উদযাপনের ভাবাদর্শ দারুণভাবে প্রভাবিত করে বাঙালিকে। এর ফলাফল তুলে ধরে
 করুণাময় লেখেন
সেই যে সূচনা ঘটলো, এর পর থেকে শুধুই এগিয়ে চলা শুধুই বিস্তার, শধুই বহুমাত্রিক বিকাশ এই নববার্ষিক উৎসবের। সার্বভৌম রাষ্ট্ররূপে বাংলাদেশের অভ্যুদয়, নববর্ষ পালনের অঙ্গীকারকে বৃহত্তর পটভূমি রচনা করে দিল। রমনার বটমূলকে কেন্দ্র করে আজ সারা বাংলাদেশের নববর্ষ উৎসব বিস্তার লাভ করেছে। নতুন নতুন সৃজনশীল উদ্যোগ এর সঙ্গে যুক্ত হচ্ছে। (করুণাময়, ২০০১ ৭১)
পহেলা বৈশাখের সকালে, নানা ধরণের ভাস্কর্য, মুখোশ ও প্ল্যাকার্ড হাতে বাদ্যযন্ত্রের তালে তালে চারুকলা অনুষদ থেকে ছাত্র-শিক্ষকের একটি শোভাযাত্রা বের হয়; যা মঙ্গল শোভাযাত্রা নামে পরিচিত।
পহেলা বৈশাখে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা অনুষদের মঙ্গল শোভাযাত্রা একটি সর্বজনীন উৎসবে পরিণত হয়েছে। যশোরে প্রথম শুরু হওয়া শৈল্পিক এই আয়োজন ধীরে ধীরে হয়ে উঠেছে বাঙালি জীবনের ঐতিহ্য। মাঠ পর্যায়ে সাক্ষাৎকার (সাক্ষাৎকার নং ৫) থেকে এই আয়োজনের উদ্ভবকাল সম্পর্কে ধারণা পাওয়া যায়।
বাংলা ১৩৯৫ সালের চৈত্র মাসে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের তৎকালীন চারুকলা ইন্সটিটিউটের কয়েকজন শিক্ষার্থী বাংলা বর্ষবরণে এক উৎসবের আয়োজন করে। লোকজ শিল্পের রঙ, রূপ, আকার, সাজ ও কাঠামোগত বিশাল নির্মাণই এই উৎসবের বৈশিষ্ট্য। প্রথম বছরর শিল্পি হাসেম খান এ উৎসবের নাম দেন আনন্দ শোভাযাত্রা। পরের বছর এই নাম পরিবর্তন করে ভাষা সৈনিক-চিত্রশিল্পী ইমদাদ হোসেন উৎসবটি মঙ্গল শোভাযাত্রা নামে পরিচয় করান সারা দেশে। সেই থেকেই পালিত হয়ে আসছে উৎসব; মঙ্গল শোভাযাত্রা।
সেখানে গৃহীত এক সাক্ষাৎকারে আমিনুল হাসান লিটু, যিনি প্রথমবার আয়োজিত আনন্দ শোভাযাত্রা উদ্যোক্তাদের একজন, জানান প্রথমে উদ্যোগ ছিল খুব ছোট আকারে উৎসব করার। উদ্দেশ্য ছিল লোকজ ঐতিহ্যকে এবং লোকজ শিল্পকর্মের প্রধান বৈশিষ্ট্যগুলোকে আনন্দ শোভাযাত্রায় উপস্থাপন করা। পরবর্তী কালে যে এটা এত বড় হয়ে ছড়িয়ে যাবে সেটা তখন ছিল ভাবনাতীত। তখন ভাবনায় ছিল কিছু একটা করতে হবে।
সবচেয়ে অসাম্প্রদায়িক একটি বড় উৎসব বৈশাখের মঙ্গল শোভাযাত্রা, দেশ ছাড়িয়ে বহির্বিশ্বে ছড়িয়ে পড়া এর উদ্দীপনা উদ্বেলিত করে বাঙালিকে। বিবিসি বাংলার এক প্রতিবেদন (১৩ এপ্রিল ২০১৭) থেকে জানা যায়, মূলত রাজনৈতিক উদ্দেশ্যকে সামনে রেখে, বিশেষ করে স্বৈরাচার বিরোধী আন্দোলনে নিজ নিজ অবস্থান থেকে ভূমিকা রাখার প্রচেষ্টায় ১৯৮৯ সালে সচেতন শিল্পী ও নাগরিক সমাজ এই আয়োজন শুরু করে।
প্রতি বছর উৎসবের বর্ণাঢ্যতা ও অংশগ্রহণের বিচারে ২০১৬ সালে মঙ্গল শোভাযাত্রা ইউনেস্কোর বিশ্ব সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের তালিকায় স্থান করে নেয়। এই শোভাযাত্রা সকল অপসংস্কৃতি ও কূপমণ্ডুকতার বিরুদ্ধে মানবতাবাদী, অসাম্প্রদায়িক এক আনন্দ আয়োজন। প্রতিবেদনে চারুকলা অনুষদের ডিন নিসার হোসেনের বক্তব্য তুলে ধরে বলা হয়, আশির দশকের স্বৈরাচার সরকার ক্ষমতায় টিকে থাকতে ধর্মকে অপব্যবহার শুরু করলে, এর বিপরীতে সব ধর্মের মানুষের জন্য বাঙালি সংস্কৃতি তুলে ধরার চেষ্টা ছিল শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের। সেই প্রচেষ্টা থেকে মঙ্গল শোভাযাত্রার আয়োজন। প্রতিবছর একটি মূল ভাবনা থেকে আয়োজন করা হয় এই শোভাযাত্রা।
চারুকলার নবীন-প্রবীন শিক্ষক-শিক্ষার্থীর মিলিত প্রয়াসে, বাঁশ-বেত কাগজ দিয়ে ভাস্কর্য তৈরির ধরণ প্রসঙ্গে নিসার হোসেন বলেন, ‘লোকসংস্কৃতির ধর্ম নিরপেক্ষ উপাদানগুলো যেমন – সোনারগাঁয়ের লোকজ খেলনা পুতুল, ময়মনসিংহের ট্যাপা পুতুল, নকশি পাখা, যাত্রার ঘোড়া এসব নেয়া হয়েছিল।
সর্বপ্রথম, ১৯৮৫ সালে, যশোরে চারুপীঠ নামে একটি সংগঠন এ ধরণের একটি শোভাযাত্রার আয়োজন শুরু করে, যার নাম ছিল আনন্দ শোভাযাত্রা। এমন তথ্যের উল্লেখ করে প্রতিবেদনে জানানো হয়, যশোরের শোভাযাত্রার ধারাবাহিকতায় তৎকালীন উদ্যোক্তরা প্রথমে ঢাকায়, পরবর্তীকালে চারুকলায় মঙ্গল শোভাযাত্রা প্রচলন করেন। এই মঙ্গল শোভাযাত্রা দেশের গন্ডি ছাপিয়ে দক্ষিণ এশিয়ার সর্ববৃহৎ অসাম্প্রদায়িক উৎসব।

ঋতুভিত্তিক অন্যান্য উৎসব

বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর তাঁর ব্রহ্মচর্যাশ্রম শান্তিনিকেতনে দিয়ে গেছেন ঋতু-অবগাহনে আনন্দলোক উদযাপন করার শিক্ষা। গানে কবিতায় রেখে গেছেন তাঁর সৃষ্টি উৎসবের আবেদন, বিশ্বপ্রকৃতির ছাত্র হবার আহ্বান। প্রকৃতির সাথে মিলে সহজে আনন্দ করার শক্তিটাই তাঁর কাছে ঋতু উৎসবের সামিল।
শান্তিনিকেতন আশ্রমে আনন্দ ধারার প্রধান প্রস্রবণই যে এই উৎসব অনুষ্ঠান, তার পরিচয় উঠে আসে সাত্ত্বকি দত্তর (১৪ অগাস্ট ২০১৬) ‘বর্ষামঙ্গল’ নিবন্ধে। তাঁর লেখায় পাই, সে সময় আনুষ্ঠানিকভাবে ঋতু উদযাপনের কোনো রীতি না থাকলেও, শান্তিনিকেতনের ছাত্রদের এক ঋতুর এক এক রকম আবেদনের সাথে সামঞ্জস্য রেখে প্রকৃতির সাশে মেশার সহজ শিক্ষাটুকু ছিল।
তবে ঋতু-উৎসব আয়োজনের নেপথ্য কারিগর কবিপুত্র শমীন্দ্রনাথ; উল্লেখপূর্বক সাত্ত্বকি বালক শমী তাঁর সহজ রসবোধ থেকে যে ঋতু উৎসবের আয়াজন করেছিলেন, তার মধ্যে হয়ত কোনো বিশেষ সংস্কৃতির বিশেষ রূপটি প্রকাশের কোনো অভিপ্রায় ছিল না, বিশুদ্ধ আনন্দের প্রকাশই ছিল একমাত্র অভিপ্রায় ও উদ্দেশ্য। ১৩১৩ সালে পঞ্চমীর দিন শমীর উদ্যোগেই শান্তিনিকেতনে প্রথম ঋতু উৎসব হল।
সে উৎসবে শর্মী আর দুজন সাজে বসন্ত, তিনজন সাজে শরৎ। এই উৎসবের নয়মাস পরেই শমী আকস্মিকভাবে মারা যায়। এর আটমাস পরেই বর্ষা তুতে শান্তিনিকেতনে পুনরায় ঋতু-উৎসব অনুষ্ঠিত হয় রবীন্দ্রনাথের নির্দেশে, আসলে শমীন্দ্রনাথের ঋতু-উৎসবের ধারণাটি গভীরভাবে নাড়া দেয় কৰি হৃদয়কে তাছাড়া রবীন্দ্রনাথের অন্তরে পৌরাণিক ঋতু-উৎসবের প্রতি একটা আকর্ষণ তো ছিলই প্রথম থেকে।
সাত্ত্বকি দত্ত (২০১৭) আরও উল্লেখ করেছেন, শান্তিনিকেতনে এর পর থেকে প্রতি বছরই বর্ষা উৎসব পালন করা হয়। প্রিয় ঋতু বর্ষার সঙ্গে প্রিয়জনের মৃত্যু জড়িয়ে থাকা সত্ত্বেও রবীন্দ্রনাথ কোনো উৎসব বন্ধ করেননি।
শান্তিনিকেতনে বর্ষামঙ্গল আয়োজন করতেন রবীন্দ্রনাথ। ধরণীকে সবুজে ভরিয়ে তুলতে সেদিন চারাগাছ রোপন করতেন তিনি। সেই পথ ধরে উদীচীতে শুরু হয় বর্ষা বরণের আয়োজন। সন্ধ্যায় বউবসঙ্গী নাটক শুরুর আগে বিকেলে অনুষ্ঠিত হতো বর্ষাবরণ। তবে প্রথমবারই শুধু এই উৎসব আয়োজন করা হয় উদীচীর প্রাতিষ্ঠানিক অঙ্গনে। এর পর থেকে বরাবরই চারুকলায়। রাজধানীতে আষাঢ়ের প্রথম দিনে নববর্ষাকে উদযাপন করতে অনুষ্ঠানের আয়োজন করে সত্যেন সেন শিল্পী গোষ্ঠী। প্রায় ১৫ বছর ধরে চলছে এই অনুষ্ঠান।
রাজধানীতে শরৎ উৎসব কিছু দিন চারুকলায় উদযাপন করেছে ছায়ানট। এরপর তা অনিয়মিত হয়ে যায়। এরপর সত্যেন সেন শিল্পীগোষ্ঠীর পক্ষ থেকে প্রায় ১৪ বছর যাবৎ শরৎ উৎসব উদযাপিত হয়ে আসছে। প্রতি বছর শারদীয় দূর্গাপূজার আগে সেপ্টেম্বরের শেষ বা অক্টোবরের শুরুতে এই উৎসব পালিত হয়।
শুধু শান্তিনিকেতন কেন রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর নবান্নর উচ্ছ্বসিত প্রসংশায় মুখর। তিনি পল্লীবাংলার ধান-চাল ঘিরে নানা উৎসবকে খুব গুরুত্ব দিয়েছিলেন। তাই বিশ্বভারতীতে নবান্ন উৎসব আয়োজিত হতো সাড়ম্বরে। ১৯৩৫ সালে বিশ্বভারতী নিউজ এর ডিসেম্বর সংখ্যার উদাহরণ দিয়ে দীপককুমার বড় পণ্ডা (২০১৪ : ৬৬) তখনকার নবান্ন বিষয়ে লিখেছেন।
সংহত সমাজের সৃষ্টি বলেই সমগ্র সমাজের বাসনালোক মুক্তি পায় উৎসব-কলায়, মানুষের আচার, আচরণে, নাচে, গানে, এমন মত মাধুরী সরকারের (২০১৪ : ৮০)। সেই ধারাবাহিকতায় বর্ষবিদায় থেকে বর্ষবরণে ঋতুভিত্তিক উৎসবগুলো মানুষের প্রকৃতগত চেতনার আনন্দমুখর অভিব্যক্তি, মানুষে মানুষে ঐক্য ও মিলনের প্রতীক। রূপবৈচিত্র্যে ভরা এ দেশকে আরও প্রাণবন্ত করেছে ষড়ঋতুর উৎসব।

শারদীয় দুর্গোৎসবের সূচনা

ইতিহাস থেকে জানা যায় হিন্দু-মুসলমান পুনর্জাগরণবাদী আন্দোলন জোরদার হওয়ার আগে গ্রামাঞ্চলের দুর্গাপূজায় যোগ দিতেন আপামর জনতা। তবে শরৎকালে শারদীয় দুর্গাপূজার উৎস বিচার ও বিকাশের ধারা নিয়ে দ্বিধা আছে ইতিহাসবিদদের। কৃত্তিবাসের ‘রামায়ণের উদ্ধৃতি দিয়ে মুনতাসির মামুন (১৯৯৪ : ৮১- ৮২) জানাচ্ছেন, শরৎকালে রামকে দিয়ে অকাল বোধন করিয়ে দুর্গাপূজা করানো হয়। আবার পুরাণে আছে, বসন্তকালে রাজা সুরথ করিয়েছিলেন দুর্গাপূজা, যা বর্তমানে বাসন্তী পূজা নামে পরিচিত। রমাপ্রসাদ চন্দর বিবরণ থেকে মুনতাসীর আরো জানান, দুর্গাপূজার যত প্রাচীন উৎসই খুঁজি না কেন, এর প্রাচীনতম মহিষমর্দিনীর মূর্তিটি পঞ্চদশ শতকের।
মুনতাসীর মামুন (১৯৯৪ ৮২-৮৩) লিখেছেন, কথিত আছে, আষাঢ় থেকে কার্তিক এ ক’মাস দক্ষিণায়নে নিদ্রিত থাকেন দেবতা। সময়টি দেবীপক্ষ এবং পূজার সহায়ক কাল। অপর দিকে আষাঢ় আলস্যের মাস। ভাই শারদীয় উৎসবের উৎসাহে এই তামসিকতা পরিহার করতে পূজার আড়ম্বর। এমনও শোনা যায়, আকবরের চোপদার রাজা কংসনারায়ণ ষোড়শ শতকে বাংলার দেওয়ান নিযুক্ত হলে তিনি প্রায়। আট-নয় লক্ষ টাকা খরচ করে মহাসমারোহে দুর্গাপূজা করেন। সেই থেকেই এর প্রচলন।

বসন্ত উৎসব

মাঘের শেষে শীত শীত ভাব যখন কিছুটা হালকা হয়, উত্তুরে বাতাসও পালটে যেতে শুরু করে। আরম্ভ হয় বসন্তকে বরণ করার আয়োজন। বসন্ত উৎসব ইতিহাস ও করণীয়’ (২০২০) নিবন্ধে এইচ এম মুশফিকুর রহমান ইতিহাসের সূত্র ধরে লিখেছেন, ভারতবর্ষের পূর্বাঞ্চলের প্রাচীন আর্য জাতির হাত ধরে এই উৎসবের গোড়াপত্তন। খ্রিষ্টের জন্মেরও কয়েকশ বছর আগে থেকে উদ্যাপিত হয়ে আসছে এই উৎসবটি। আনুমানিক খ্রিষ্টপূর্ব ৩০০ অব্দে পাথরের উপর খোদাই করা অবস্থায় পাওয়া গেছে এর নমুনা। যদিও এই তথ্যের গ্রহণযোগ্য সূত্র লেখক উল্লেখ করেননি।
মুশফিকুর রহমান আরও লেখেন, (২০২০) এখন যে দোল উৎসব পালিত হয়, এর নেপথ্যে রয়েছে বৈষ্ণব ধর্মাবলম্বীদের কিছু আদি বিশ্বাস। যে বিশ্বাসের অন্যতম দোল পূর্ণিমার দিনে (ফাল্গুণী পূর্ণিমার অপর নাম) বৃন্দাবনে আবির ও গুলাল নিয়ে রাধা ও অন্যান্য গোপিদের সাথে রঙ ছোঁড়াছুড়ির খেলায় মেতেছিলেন। শ্রীকৃষ্ণ। আর সে কারণেই এখন দোল পূর্ণিমার দিন রাধা-কৃষ্ণের যুগল মূর্তিকে আবির গুলালে স্নাত করিয়ে, দোলনায় চড়িয়ে বের করা হয় শোভাযাত্রা। এই শোভাযাত্রা শেষ হলে ভক্তেরা এবার নিজেরাও পরস্পরের গায়ে রং মাখানোর খেলায় মেতে ওঠেন।
বাংলায় বসন্ত উৎসব শুরুর ইতিহাস প্রসঙ্গে মুশফিকুর ( ২০২০) লিখেছেন, পুরীতে ফাল্গুন মাসে যে দোল উৎসব হতো, তার অনুকরণে বাংলায় এ উৎসব পালনের রেওয়াজ শুরু হয়। বাংলায় বসন্তকালে রাসমেলা বা রাসযাত্রারও প্রচলন হয় মধ্যযুগে। শ্রীচৈতন্যদেবের জন্য খ্যাত নবদ্বীপেই রাসমেলার উৎপত্তি। এছাড়া, বাংলাদেশের খুলনাসহ বিভিন্ন অঞ্চলে রাসমেলায় কীর্তন আর নাচের আসর বসে। আরও উল্লেখ আছে, প্রাচীন ও মধ্যযুগের বাংলায় বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বীরা ফাল্গুনী পূর্ণিমা উদযাপনের মাধ্যমে বসন্তকে বরণ করে নিত।
১৫৮৫ সালে সম্রাট আকবর বাংলা বর্ষপঞ্জী হিসেবে আকবরি সন বা ফসলী সনের প্রবর্তন করার পাশাপাশি প্রতি বছর ১৮টি উৎসব পালনের রীতিও প্রবর্তন করেন, যার অন্যতম বসন্ত উৎসব।
আজ সমগ্র বাংলাদেশ জুড়ে বসন্তের প্রথম দিন পহেলা ফাল্গুন উদযাপনে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা অনুষদের শিক্ষার্থীদের অবদান উল্লেখ করে মুশফিকুর লিখেছেন, ১৯৯১ সালে অনেকটা পূর্বপ্রস্তুতি ছাড়াই বসন্ত বরণ উৎসব পালন করেন অনুষদের কয়েক শিক্ষার্থী। ফাল্গুনের আগের রাতে মৈত্রী হলে রাত জেগে শাড়িতে ব্লকপ্রিন্ট করে, পরদিন সেই শাড়ি পরে, নিজ বিভাগে উদযাপন করেন ফাল্গুন। সে সময় অদূরে, বাংলা একাডেমিতে চলমান গ্রন্থমেলা, তৈরি করে উৎসব আবহ। পরবর্তী সময়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের অন্যান্য অনুষদের শিক্ষার্থীরাও আগ্রহী হয়ে উঠলে ১৯৯৪ সাল থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে চারুকলা অনুষদে শুরু হয় বসন্ত উৎসব উদযাপন।
এদিকে, বসন্ত উৎসব মানেই রং আর আবিরে রাঙা হয়ে ওঠা সকাল। ‘ওরে গৃহবাসী, খোল দ্বার খোল, লাগলো যে দোল’ গানে গানে বসন্ত উৎসব পূর্ণতা পায় রঙের উৎসব ‘হোলি’ বা ‘হোরী’ খেলার দিনে অর্থাৎ রাধাকৃষ্ণের ‘দোলযাত্রা’ তিথিতে।
‘বসন্ত উৎসব-রবীন্দ্রনাথের আদর্শ (২০২০) প্রবন্ধে পাওয়া তথ্যমতে : কেউ কেউ মনে করেন, ১৯০৭ সালের ১৭ই ফেব্রুয়ারি, বসন্ত পঞ্চমীতে শমীন্দ্রনাথ ঠাকুরের উদ্যোগে যে ঋতু উৎসবের সূচনা হয়, তারই পরিবর্তীত ও মার্জিত রূপ শান্তিনিকেতনের আজকের এই বসন্ত উৎসব বা বসন্তোৎস সরস্বতী পূজার দিন শুরু হলেও পরবর্তীকালে সে অনুষ্ঠান বিভিন্ন বছর ভিন্ন ভিন্ন তারিন ও তিথিতে হয়েছে। শান্তিনিকেতনের প্রাণপুরুষ রবীন্দ্রনাথের বিদেশ যাত্রা বা অন্য আরও দিক মাথায় রেখে কোন এক নির্দিষ্ট দিনে আশ্রমবাসী মিলিত হতেন বসরে আনন্দ অনুষ্ঠানে।
‘শান্তিনিকেতনে বসন্ত উৎসব’ (২০১৭ ) শিরোনামে অপর এক লেখায় আছে : আগে বসন্তের যেকোনো দিন অনুষ্ঠিত হতো এ উৎসব। পরবর্তীকালে বসন্ত পূর্ণিমার দিন অনুষ্ঠিত হয় এ উৎসব। এ উৎসব ঋতুরাজ বসন্তে স্বাগত জানানোর উৎসব। বিশ্বভারতী উপাচার্য স্বপন কুমার দত্তের উদ্ধৃতি তুলে লেখা হয়, ‘আমাদের সবার মাথায় রাখতে হবে আজকের উৎসব বসন্ত উৎসব। হোলি উৎসব নয়। বসন্তকে স্বাগত জানানোর উৎসব।
বাংলাদেশে যে উৎসব একেবারেই অসাম্প্রদায়িক চেতনায় উজ্জীবিত। কারণ, পশ্চিমবঙ্গে দোল পূর্ণিমার দিন বসন্ত উৎসবের আয়োজন করা হয়। যা অনেকাংশে ধর্মের সাথে সম্পর্কিত। বিবর্তনের ধারায় এখন বাংলাদেশের বাঙালি বসন্ত উৎসব উদযাপনে আরও স্বাধীন। শীতের ঝরা পাতাকে বিদায় জানিয়ে গাছে গাছে দেখা দেয় নতুন কুঁড়ি, ঋতুরাজ বসন্তে ফুলের মেলা, দখিনা বাতাসে কোকিলের কুহুতান মোহিত করে বাঙালিকে। ফাল্গুনের প্রথম দিনেই এই উৎসব আয়োজন। বসন্ত উৎসবের ধারাবাহিকতায় রূপ পেল পৌষমেলার মতো অন্যান্য উৎসব।
মূলত বাঙালির জীবনে ঋতু উৎসব যেন চিরপুরাতনের মধ্যে নতুনের আবির্ভাব। এই নতুনত্বকে অস্বীকার করার উপায় নেই, এর জয়ধ্বনির জন্য। তাই দিনটি সবার কাছেই খুব কাঙ্ক্ষিত। উৎসব প্রচলিত জীবনে হঠাৎ নব আলোর স্ফুরণ ঘটায় বলে, এক স্বতঃস্ফূর্ত আমেজে জীবনকে প্রেরণাদায়ক মনে হয়। বাঙালির আত্মপরিচয়ের স্বরূপ তুলে ধরার পাশাপাশি এ এক ধর্মবিভেদনাসী সাংস্কৃতিক অভিযাত্রা, জাতির ঐক্যবদ্ধ হবার প্রয়াস ।

পৌষমেলা

বাংলাদেশে ঋতু উৎসব শুরু হয় রবীন্দ্রনাথের হাত ধরে। এমন তথ্য দেন মানজারুল ইসলাম চৌধুরী সুইট। “ফিরে দেখা পৌষমেলা’ (২০১৭) নিবন্ধে তিনি লিখেছেন, ধারণা করা হয় ১৮৪৫ খ্রিষ্টাব্দে রবীন্দ্রনাথের বাবা প্রিন্স দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুর শান্তিনিকেতন থেকে প্রায় ২০ কিলোমিটার দূরের একটি গ্রামে প্রথম পৌষমেলার আয়োজন করেন। ‘পৌষমেলাই শান্তিনিকেতনের সৃষ্টি করেছে।’
রবীন্দ্রনাথের এমন উক্তির রেষ ধরে মানজারুল ইসলাম লিখেছেন, শান্তিনিকেতনের শিক্ষা পাঠের শুরু থেকে আজ অবধি যেমন পৌষমেলা জমজমাট রূপে পালিত হয়ে আসছে, তেমনি তার প্রচলন ছিল বাংলার গ্রামে-গঞ্জেও। কারণ হিসেবে উল্লেখ করেন :
নবান্নে ধান কাটা শেষে গোলা ভরা ধান থাকে কৃষকের ঘরে। এ সময় নিকট কুটুম্বদের নিমন্ত্রণ করা হয় পিঠা পুলি খাবার জন্য। মেলা বসে হাট-বাজারে। প্রয়োজনীয় তৈজসপত্র থেকে শুরু করে ঢেঁকি, কুলা ও কৃষকের নানান সরঞ্জাম তৈজস এবং নানা ধরণের শুকনো খাবারের পসরা জমে। পাশাপাশি লোকজ সংস্কৃতির নানা উপাদান যুক্ত হয়। যেমন যাত্রাপালা, লাঠি খেলা, কবিগান, সংযাত্র ইত্যাদি। এরই ধারাবাহিকতায় নগর জীবনে পৌষ মেলার আয়োজন করা হয়।
মানজারুল ইসলাম চৌধুরী সুইটের সাক্ষাৎকার (সাক্ষাৎকার নং ২) থেকে জানা যায়, ১৯৯৯ সালে রমনার বটমূলে শুরু হয় পৌষমেলার যাত্রা। তখন একদিনের উৎসব হলেও, পরবর্তী সময়ে সরকার কর্তৃক রমনা বটমূল স্থানকে হেরিটেজ হিসেবে ঘোষণা করায়, বর্তমানে বাংলা একাডেমিতে তিন দিনব্যাপী আয়োজিত হচ্ছে পৌষমেলা। ইতোমধ্যে এই মেলা দেশের সকল ধারার সংস্কৃতি কর্মীদের শ্রমের ফসল হিসেবে মিলনমেলায় পরিণত হয়েছে।
উৎসব প্রাঙ্গনের প্রায় অর্ধশত স্টলে নানা নকশা ও স্বাদের পিঠেপুলির সম্ভার দেখা যায়। এ প্রজন্ম কখনো দেখেইনি আগের দিনে দাদি-নানির হাতে বানানো পিঠার মাধুর্য। নতুন ঐতিহ্যের সাথে লোকশিল্পের দারুণ এক মেলবন্ধন এ যাবৎকালের পৌষমেলা।
পৌষে কৃষকের সমৃদ্ধি, প্রকৃতিও অনুকূলে। আর যাতায়াত ব্যবস্থার উন্নয়ণে ঢাকার বাইরে জেলা শহরগুলোতেও এখন আয়োজিত হয় পৌষমেলা। পৌষের কিছু বৈশিষ্ট্য আছে। বাঙালি জীবনে উত্তাপ নেয়ার বিষয় আছে বাড়িতে বাড়িতে। আগে গ্রামাঞ্চলে আইলা জ্বালিয়ে উত্তাপ নেয়া হতো। সেই প্রতীক হিসেবে শহুরে এই অনুষ্ঠানে আইলা জ্বালানোর প্রথা দেখা যায়।
এই উৎসবের মাধ্যমে প্রত্যাশা করা হয় সুবিধা বঞ্চিত প্রতিটি মানুষের ঘরে ঘরে যেন সমৃদ্ধির আলো ছড়িয়ে যায়। উৎসবের স্বকীয়তা ও স্বতঃস্ফূর্ততা বজায় রাখতে বাণিজ্যকরণের হাত থেকে উৎসবগুলোকে বাঁচানোর চেষ্টা করা এখন সময়ের দাবি।
বাংলার ঋতুভিত্তিক আয়োজনগুলো আমাদের প্রকৃত বাঙালিত্বের কাছে নিয়ে যায়। খেটে খাওয়া মানুষের কাছে নিয়ে যায়, সভ্যতার কাছে নিয়ে যায়, ইতিহাসের কাছে নিয়ে যায়, পূর্বপুরুষের কাছে নিয়ে যায়। এটাই বাঙালির অস্তিত্ব, এটাই স্বকীয়তা। তাই বাঙালি জাতির যে উৎসবগুলো আছে, যে ঐতিহ্যগুলো আছে, সেগুলোকে লালন করা, বিকৃতির হাত থেকে রক্ষা করা বাঙালির অস্তিত্ব রক্ষার জন্যই প্রয়োজন। সে কারণেই হাজার বছরের বাঙালি সংস্কৃতির এই উপাদানগুলো ধরে রাখতে সচেষ্ট হওয়া উচিত সবার।
Exit mobile version