আজকে আমাদের আলোচনার বিষয়ঃ বাংলাদেশের ঔপন্যাসিক ও উপন্যাস। যা বাংলাদেশের উপন্যাসে শ্রেণী চেতনার স্বরূপ এর অন্তর্গত।
বাংলাদেশের ঔপন্যাসিক ও উপন্যাস
“বাংলাদেশের উপন্যাসে শ্রেণী চেতনার স্বরূপ বিশ্লেষণ’ শীর্ষক মূল অধ্যায়ে প্রবেশের পূর্বে ১৯৪৭-১৯৭১ এই সময়কালের মধ্যে শ্রেণী চেতনা বিষয়টি প্রতিনিধিত্ব করে এমন সাত জন নির্বাচিত প্রধান ঔপন্যাসিক ও তাঁদের উপন্যাস কর্ম সম্পর্কে সংক্ষিপ্ত পরিচিতি এ অধ্যায়ে সন্নিবেশিত হল।
সত্যেন সেন (১৯০৭-১৯৮১)
জন্ম: সোনারঙ গ্রাম, বিক্রমপুর, মুন্সিগঞ্জ, ১৯০৭ সাহিত্যিক ও রাজনীতিবিদ।
পিতা ধরণীমোহন সেন। শান্তিনিকেতনের আচার্য ক্ষিতিমোহন সেন তাঁর পিতৃব্য। সোনারঙ স্কুল থেকে এন্ট্রান্স পাস করে উচ্চশিক্ষা লাভের জন্য কলকাতায় আগমন করেন। সেখানে যুগান্তর দলের ব্রিটিশবিরোধী গোপন রাজনৈতিক তৎপরতার সঙ্গে যুক্ত হন। আই.এস.সি. এবং বি.এ. পাস করার পর ইতিহাসে এম.এ. ক্লাসে ভর্তি হন।
সন্ত্রাসবাদী রাজনীতির সঙ্গে সম্পৃক্ততার জন্য গ্রেফতার (১৯৩১) হন। বহরমপুর বন্দি শিবিরে একটানা পাঁচ বছর আটক থাকেন। জেলে বসেই বাংলা ভাষা ও সাহিত্যে এম.এ. পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হন। জেল থেকে মুক্তিলাভের (১৯৩৮) পর শান্তিনিকেতনে গবেষণা বৃত্তিলাভ করেন। শান্তিনিকেতনে প্রবেশ না করে মার্কসবাদে দীক্ষা গ্রহণ করেন। সমাজতন্ত্রের পক্ষে মেহনতি মানুষকে সংগঠিত করার জন্য সোনারঙে প্রত্যাগমন করেন। কৃষক আন্দোলনে যোগদান করেন। ঢাকা জেলা কৃষক সমিতির নেতৃত্ব প্রদান করেন।
১৯৪৯-এ দ্বিতীয়বার গ্রেফতার হন। প্রায় চার বছর কারা নির্যাতন ভোগের পর ১৯৫৩-তে মুক্তি লাভ করেন। ১৯৫৪-র ৩০ মে পূর্ব বাংলায় ৯২-ক ধারা জারি হলে আবার গ্রেফতার হন। কিছুকাল পর জেল থেকে মুক্তি পেয়ে দৈনিক সংবাদে সহকারী সম্পাদক হিসেবে যোগ দেন। ১৯৫৮-এর ৭ অক্টোবর দেশে সামরিক আইন জারি করা হলে পুনরায় গ্রেফতার হন। দীর্ঘ পাঁচ বছর জেলে বাস করার পর ১৯৬৩-র শেষের দিকে মুক্তিলাভ করেন।
অতঃপর দৈনিক সংবাদে পুনরায় সাংবাদিকতায় যোগদান করেন। এরপর ১৯৬৫-র আগস্ট থেকে ১৯৬৮ পর্যন্ত আবার কারাবাস ভোগ করেন। মুক্তি পাওয়ার পর পুনরায় যুক্ত হন সংবাদের সাথে। ১৯৭১-এ মুক্তিযুদ্ধের সময়ে কলকাতায় গমন করেন। দেশ স্বাধীন হওয়ার (১৬ ডিসেম্বর ১৯৭১) পর ১৯৭২-এ ঢাকায় প্রত্যাবর্তন করেন। এরপর কমিউনিস্ট পার্টির সাংগঠনিক কাজে আত্মনিয়োগ করেন। প্রধানত রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব হিসেবে পরিচিত সত্যেন সেনের সাহিত্য-কৃতীর উল্লেখযোগ্যতা নিঃসন্দেহে অনস্বীকার্য।
তাঁর সাহিত্যসাধনা শুরু যখন, তখন তিনি বয়সে পঞ্চাশ অতিক্রান্ত। পরবর্তী দু’দশক লিখেছেন অজস্র প্রধানত উপন্যাস। তার বিষয় সমাজ, রাজনীতি, সমকালীন ও অতীত ইতিহাস। বিজ্ঞান সম্পর্কিত গ্রন্থ, আন্দোলন-সংগ্রামের আলেখ্যমালা ও শিশুতোষ গ্রন্থ রচনায়ও তিনি পারদর্শিতার পরিচয় প্রদান করেন। মার্কসবাদের শ্রেণী সংগ্রাম ও গণমানুষের মুক্তির বাণী তাঁর সাহিত্যকর্মে উজ্জ্বলভাবে প্রকাশিত। রবীন্দ্র- সংগীত ও গণ-সংগীতের তিনি সুকণ্ঠ গায়ক ছিলেন। পণ-সংগীত রচনায় তিনি দক্ষতা প্রদর্শন করেন। সাংস্কৃতিক সংগঠন ‘উদীচী’র (১৯৬৯) প্রতিষ্ঠাতা তিনি ।
প্রকাশিত উপন্যাস:
ভোরের বিহঙ্গী (১৩৬৬), অভিশপ্ত নগরী (১৩৭৪), পাপের সন্তান (১৯৬৯), রুদ্ধদ্বার মুক্তপ্রাণ (১৯৭৩), পদচিহ্ন (১৩৭৫), সেয়ানা (১৩৭৫), কুমারজীব (১৩৭৬), বিদ্রোহী কৈবর্ত (১৩৭৬), পুরুষ মেধ (১৯৬৯), আলবেরুনী (১৩৭৬), সাত নম্বর ওয়ার্ড (১৩৭৬), উত্তরণ (১৯৭০), এ কূল ভাঙে ও-কূল গড়ে (১৯৭১), মা (১৩৭৭), অপরাজেয় (১৩৭৭)।
বাংলা সাহিত্য ও সংস্কৃতিতে তাঁর অবদান অনস্বীকার্য। উপন্যাস রচনায় তিনি বাংলা একাডেমী পুরস্কার লাভ (১৯৭০) করেন।
মৃত্যু: শান্তিনিকেতন, ৫ ডিসেম্বর ১৯৮১।
শওকত ওসমান (১৯১৯-১৯৯৮)
জন্ম: ২ জানুয়ারি, ১৯১৭ খ্রিঃ, হুগলী জেলার সবলসিংহপুর গ্রামে। তার প্রকৃত নাম শেখ আজিজুর রহমান। শওকত ওসমান তাঁর সাহিত্যিক ছদ্মনাম । তিনি কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে এম.এ. পাস করেন এবং শিক্ষকতাকে পেশা হিসেবে গ্রহণ করেন। তিনি ঢাকা কলেজে দীর্ঘদিন বাংলা বিভাগের অধ্যক্ষ পদে কর্মরত ছিলেন।
একজন শক্তিশালী কথাশিল্পী হিসেবে শওকত ওসমান সুপরিচিত। তিনি বিষয়ের দিক থেকে বৈচিত্র্যানুসন্ধানী, তেমনি আঙ্গিকের দিক থেকেও অবিরাম নিরীক্ষণ প্রয়াসী। তিনি সামাজিকভাবে যথেষ্ট সচেতন। তিনি তাঁর সাহিত্য কর্মে সমাজের পরিবর্তন ধারাটি তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে অবলোকন ও অনুধাবন করেন।
প্রাক-বিভাগ, বিভাগোত্তর ও স্বাধীনতা-উত্তর কালের বাংলার সমকালীন রাজনৈতিক, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক জীবন তাঁর উপন্যাস ও গল্পে স্থান পেয়েছে। অতীত ইতিহাসকেও তিনি উপন্যাসের পটভূমি হিসেবে গ্রহণ করেছেন। তাঁর রচিত ক্রীতদাসের হাসি (১৯৬৬), রাজা উপাখ্যান (১৯৭০) ইত্যাদি প্রতীকধর্মী ঐতিহাসিক উপন্যাস। তাঁর সামাজিক উপন্যাস জননী (১৯৬১) সবচেয়ে জনপ্রিয়তা লাভ করে।
এছাড়া তাঁর অপরাপর উপন্যাসগুলো হল: বনি আদম (১৯৪৩), সমাগম (১৯৬৭), চৌরসন্ধি (১৯৬৮), জাহান্নাম হইতে বিদায় (১৯৭১), নেকড়ে অরণ্য (১৯৭৩), দুই সৈনিক (১৯৭৩), পতঙ্গ পিঞ্জর (১৯৮৩), রাজসাক্ষী (১৯৮৫), জলাঙ্গী (১৯৮৬), আর্তনাদ (১৯৮৬) ইত্যাদি ।
মৃত্যু: ১৪ মে, ১৯৯৮ খ্রিঃ।
সরদার জয়েন উদ্দীন (১৯১৮-১৯৮৬)
জন্ম: কামারহাটি গ্রাম, পাবনা, ১৯১৮। কথা সাহিত্যিক। কৃষক পরিবারে জন্ম। পিতা তাহের উদ্দিন বিশ্বাস। স্ত্রী রাবেয়া খাতুন। স্থানীয় খলিলপুর হাইস্কুল থেকে ম্যাট্রিক (১৯৩৯) পাস করেন। পাবনা এডওয়ার্ড কলেজে আই.এ. ক্লাস পর্যন্ত অধ্যয়ন করেন। অতঃপর সেনাবাহিনীতে হাবিলদার ক্লার্ক পদে যোগদান করেন। দেশ বিভাগের (১৯৪৭) পর সামরিক বাহিনীর চাকরি থেকে অব্যাহতি লাভ করেন।
ঢাকায় নতুন করে কর্মজীবন শুরু করেন। ১৯৪৮-এ ‘পাকিস্তান অবজারভার’ পত্রিকার বিজ্ঞাপন বিভাগের সহকারী পদে যোগদান করেন। ১৯৫১ সালে দৈনিক সংবাদের বিজ্ঞাপন বিভাগের ম্যানেজার নিযুক্ত হন। ১৯৫৫ পর্যন্ত এ পদে দায়িত্ব পালন করেন। পাকিস্তান কো-অপারেটিভ বুক সোসাইটির শিশু-কিশোর ম্যাগাজিন ‘সেতারা’ ও ‘শাহীন’-এর সম্পাদক (১৯৫৫-১৯৫৬) ছিলেন। ১৯৫৮ সালে দৈনিক ইত্তেফাক’ পত্রিকার বিজ্ঞাপন বিভাগের ম্যানেজার নিযুক্ত হন। ১৯৬০ সালে ইস্টার্ন ফেডারেল ইন্সিওরেন্স কোম্পানিতে ইন্সপেক্টর পদে যোগ দেন। ১৯৬২-তে বাংলা একাডেমীর প্রকাশন ও বিক্রয় শাখার সহকারী অফিসার নিযুক্ত হন।
১৯৬৪ পর্যন্ত এ পদে দায়িত্ব পালন করেন। অতঃপর ন্যাশনাল বুক সেন্টার (পরবর্তীকালে জাতীয় গ্রন্থকেন্দ্র)-এর রিচার্স অফিসার পদে যোগ দেন। ১৯৭২-এ উক্ত প্রতিষ্ঠানের পরিচালক নিযুক্ত হন। ১৯৭৮-এ জাতীয় গ্রন্থকেন্দ্র থেকে বদলি হয়ে বাংলাদেশ টেক্সট বুক বোর্ডের ঊর্ধ্বর্তন বিশেষজ্ঞ পদে যোগদান করেন। ১৯৮০-তে চাকরি থেকে অবসর গ্রহণ করেন।
তিনি ছিলেন খ্যাতনামা কথা সাহিত্যিক। সমকালীন সমাজের সংকট, মানবিক মূল্যবোধের অবক্ষয়, গ্রামীণ সমাজের অবহেলিত মানুষের দুঃখ-বেদনা এবং জমিদার, জোতদার ও মহাজনদের শোষণ-নিপীড়নের চিত্র তাঁর উপন্যাস ও গল্পে নিষ্ঠার সাথে অংকিত।
প্রকাশিত উপন্যাস ঃ
আদিগন্ত (১৯৫৯), পান্নামতি (১৯৬৪), নীল রং রক্ত (১৯৬৫), অনেক সূর্যের আশা (১৯৬৭), বেগম শেফালী মীর্জা (১৯৬৮), শ্রীমান তালেব আলী ও শ্রীমতি ক খ (১৯৭৪), বিধ্বস্ত রোদের ঢেউ (১৯৭৫)।
উপন্যাসের জন্য বাংলা একাডেমী পুরস্কার (১৯৬৭) এবং ‘অনেক সূর্যের আশা’ উপন্যাসের জন্য আদমজী পুরস্কার (১৯৬৭) লাভ করেন।
মৃত্যু: ঢাকা, ২২ ডিসেম্বর ১৯৮৬।
শহীদুল্লা কায়সার (১৯২৭-১৯৭১)
জন্ম: মজুপুর গ্রাম, ফেনী, ১৬ ফেব্রুয়ারি, ১৯২৭। তিনি সাংবাদিক ও সাহিত্যিক। পুরো নাম আবু নঈম মোহাম্মদ শহীদুল্লা। তাঁর পিতার নাম মাওলানা মোহাম্মদ হাবীবুল্লাহ। তিনি ছিলেন কলকাতা মাদ্রাসা-ই- আলিয়ার অধ্যাপক ও পরবর্তীতে অধ্যক্ষ নিয়োজিত হন।
মাদ্রাসা-ই-আলিয়ার অ্যাংলো পার্শিয়ান বিভাগ থেকে তিনি প্রবেশিকা পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হন (১৯৪২)। অতঃপর প্রেসিডেন্সি কলেজে ভর্তি হন। এ কলেজ থেকে আই.এ. (১৯৪৪) ডিগ্রী লাভ করেন। কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে অর্থনীতিতে এম.এ. ক্লাসে ভর্তি হন। একই সঙ্গে রিপন কলেজে আইন বিষয়ে অধ্যয়ন করেন।
পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার (১৪ আগস্ট, ১৯৪৭) পর কলকাতা ত্যাগ করে ঢাকায় আগমন করেন। অতঃপর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে অর্থনীতিতে এম.এ ক্লাসে ভর্তি হন। রাজনীতিতে অতিমাত্রায় জড়িয়ে পড়ায় কিছুকাল পর বিশ্ববিদ্যালয়ের পাঠ ত্যাগ করেন। প্রেসিডেন্সি কলেজে অধ্যয়নকালে মার্কসবাদ-লেনিনবাদের প্রতি আকৃষ্ট হয়ে বামপন্থী ছাত্র-রাজনীতিতে সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করেন।
ঢাকার আগমনের পর তিনি কমিউনিস্ট পার্টির রাজনীতিতে যোগদান করেন। তিনি গণতান্ত্রিক যুবলীগ (সেপ্টেম্বর ১৯৪৭) গঠনে অগ্রণী ভূমিকা পালন করেন। পূর্ব পাকিস্তান প্রাদেশিক কমিউনিস্ট পার্টির সদস্য নির্বাচিত হন (১৯৫১)। কমিউনিস্ট পার্টির পক্ষ থেকে ১৯৫২-র ফেব্রুয়ারির ভাষা আন্দোলনের নেতৃত্ব প্রদান করেন।
এ আন্দোলনে বলিষ্ঠ ভূমিকা রাখায় ৩ জুন, ১৯৫২ তিনি গ্রেফতার হন। প্রায় সাড়ে তিন বছর কারা নির্যাতন ভোগ করেন। ১৯৫৫-তে পুনরায় গ্রেফতার ও কারারুদ্ধ হন। ১৯৫৬-র ৮ সেপ্টেম্বর তিনি মুক্তি লাভ করেন। ১৯৫৮-র ৭ অক্টোবর দেশে সামরিক আইন জারি হলে ১৪ অক্টোবর (১৯৫৮) আর একবার গ্রেফতার হন। প্রায় চার বছর কারাভোগের পর ১৯৬২-র সেপ্টেম্বর মাসে তিনি মুক্তিলাভ করেন।
সাপ্তাহিক ইত্তেফাক (১৯৪৯) পত্রিকায় যোগদানের মাধ্যমে সাংবাদিক জীবনে প্রবেশ করেন। ১৯৫৮-তে দৈনিক ‘সংবাদ’-এর সহকারী সম্পাদক পদে নিযুক্ত হন । ষাটের দশকে এ পত্রিকার যুগ্ম-সম্পাদক পদে উন্নীত হন। এতে দেশপ্রেমিক ছদ্মনামে ‘বিচিত্র কথা’ শীর্ষক উপ-সম্পাদকীয় রচনা করতেন। পশ্চিমবঙ্গের মন্ত্রী ডাঃ আর আহমদের কন্যা কমিউনিস্ট কর্মী জোহরা বেগমের সঙ্গে পরিণয়সূত্রে আবদ্ধ (১৯৫৮) হন।
একই বছর ১৪ অক্টোবর সামরিক সরকার কর্তৃক শহীদুল্লা কায়সার গ্রেফতার হলে জোহরা বেগম ঢাকা ত্যাগ করেন। অতঃপর ১৯৬৯-এর ১৭ ফেব্রুয়ারি পান্না চৌধুরীর (পান্না কায়সার) সঙ্গে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হন। তিনি ছিলেন খ্যাতনামা কথাসাহিত্যিক। জনজীবনের আলেখ্য রূপায়ণে দক্ষতার পরিচয় দেন। বাঙালি জীবনের আশা-আকাঙ্ক্ষা, দ্বন্দ্ব-সংঘাত ও সংগ্রামী চেতনা তাঁর উপন্যাসে উজ্জ্বলভাবে প্রকাশিত।
সারেং বৌ (১৯৬২) ও সংশপ্তক (১৯৬৫) তাঁর দু’খানি বিখ্যাত উপন্যাস। রাজবন্দীর রোজনামচা (১৯৬২) তার কথাস্মৃতি। পেশোয়ার থেকে তাসখন্দ (১৯৬৬) ভ্রমণবৃত্তান্ত । ‘সারেং বৌ’ উপন্যাসের জন্য আদমজী পুরস্কার (১৯৬২) ও উপন্যাস রচনায় বাংলা একাডেমী পুরস্কার (১৯৬২) লাভ করেন।
মৃত্যু: মুক্তিযুদ্ধের চূড়ান্ত বিজয়ের মাত্র দিন কয়েক পূর্বে ১৯৭১-এর ১৪ ডিসেম্বর পাক হানাদার বাহিনীর এ দেশীয় দোসর আলবদর বাহিনীর সদস্যগণ কর্তৃক তাঁর ঢাকার কায়েতটুলীর বাসভবন থেকে অপহৃত হন। এরপর তাঁর আর কোন সন্ধান পাওয়া যায়নি।
শামসুদ্দীন আবুল কালাম (১৯২৬-১৯৯৮)
জন্ম: ১৯২৬ খ্রিস্টাব্দ, বরিশালের কামদেবপুরে। বহুদিন দেশ ছাড়া, বর্তমানে বিদেশে কর্মরত আছেন। তার প্রথমে নাম ছিল আবুল কালাম শামসুদ্দীন । কিন্তু এই নামের আরো একজন সাহিত্যিক থাকাতে (দৈনিক আজাদ-এর তৎকালীন সম্পাদক) নাম কিছুটা ওলোট-পালট করে রাখেন শামসুদ্দীন আবুল কালাম।
বাংলাদেশের প্রথম সারির ঔপন্যাসিকদের একজন হলেও ছোট গল্পকার হিসেবেও শামসুদ্দীন আবুল কালাম যথেষ্ট প্রতিভাবান। তিনি সমাজ-সচেতন শিল্পী। তাঁর গল্পে অবহেলিত ও দরিদ্র মানুষের জীবন সংগ্রামের সার্থক বর্ণনা রয়েছে। গ্রামীণ জীবনের শাশ্বত রূপকে তিনি তাঁর রচনায় আঁকতে চেয়েছেন।
অবশ্য মানুষের অবক্ষয় ও দুর্দশার চিত্র তিনি সহজে আঁকতে চাননি। তিনি সুস্থ রঙিন জীবনের প্রত্যাশী। এই জন্য দেখা যাবে তাঁর গল্প উপন্যাসে নর-নারীর আবেগ ও আনন্দের একটা চিরকালীন রূপ ফুটিয়ে তোলার ব্যাপারে তার আগ্রহ বেশি এবং এই অর্থে শামসুদ্দীন আবুল কালাম রোমান্টিক। তবে শামসুদ্দীন আবুল কালামের সাহিত্য-দর্শনে সমাজতান্ত্রিক বা সাম্যবাদী চেতনারও প্রভাব লক্ষনীয় ।
নিম্নবিত্ত জীবনের বর্ণনায় মানবতাবাদের অনুসারী হলেও তাঁর সৃষ্ট চরিত্র এবং উপন্যাসের সমাজ ভাবনায় মার্কসবাদের বিশেষ ভূমিকা রয়েছে। শামসুদ্দীন আবুল কালামের উপন্যাসের বিষয়বস্তু নির্মাণে সমাজ অন্বেষাই তাঁকে যোগায় নতুন প্রেরণা। চরম হতাশার মধ্যেও তিনি প্রতিষ্ঠা করেন আশাবাদের ইঙ্গিত।
গ্রন্থ প্রকাশের ক্রম হিসেবে শামসুদ্দীন আবুল কালাম বাংলাদেশের উপন্যাসের প্রথম সমাজতান্ত্রিক জীবনধারার লেখক। তাঁর ‘কাশবনের কন্যা’ (১৯৫৪) এবং ‘আলমনগরের উপকথা’ (১৯৫৫) উপন্যাস দু’টি বিষয়বস্তু এবং চরিত্র নির্মাণের দিক থেকে সাম্যবাদী জীবন চেতনার পরিচয় বহন করে। ঔপন্যাসিক শামসুদ্দীন আবুল কালামের উপন্যাসে সমাজের অপকর্মকারী ব্যক্তির বিরুদ্ধে লড়াইয়ের মাধ্যমে সমাজকে পাল্টে দেয়ার আহ্বান লক্ষণীয়। লড়াইয়ে তিনি সবসময়ই সমাজের অধিকার বঞ্চিত সাধারণ মানুষের পক্ষে কলম ধরেছেন।
প্রকাশিত উপন্যাস :
আলমনগরের উপকথা (১৯৫৫) এই গ্রন্থটি পরে ‘দুই মহল’ নামে প্রকাশিত হয়। কাশবনের কন্যা (১৯৫৪), আশিয়ানা (১৯৫৫), কাঞ্চনমালা (১৯৬১), জায়জঙ্গল (১৯৭৮), সমুদ্র বাস (১৯৮৬) ও কাঞ্চনগ্রাম (১৯৮৮) ইত্যাদি ।
মৃত্যু ১৯৯৮ খ্রিস্টাব্দ।
আবু ইসহাক (১৯২৬-২০০৩)
জন্ম : ১৯২৬ খ্রিস্টাব্দ, ১ নভেম্বর, শরীয়তপুর জেলার নাড়িয়া থানার ফতেজঙ্গপুর ইউনিয়নের শিরঙ্গল গ্রামে। তার পিতার নাম মোঃ এবাদ উল্লাহ। ১৯৪২ সালে তিনি বিঝারী তারা প্রসন্ন উচ্চবিদ্যালয় থেকে মাধ্যমিক পাশ করেন। ফরিদপুর রাজেন্দ্র কলেজ থেকে তিনি স্নাতক পাশ করেন। কর্মজীবনে তিনি সিভিল সাপ্লাইয়ের পরিদর্শক পদে চাকরি নেন। ১৯৪৯ থেকে ১৯৭৩ সাল পর্যন্ত তিনি পুলিশ বিভাগের কর্মকর্তা ছিলেন। ১৯৭৪-৭৬ সালে তিনি আকিয়াবে (মিয়ানমার) বাংলাদেশের দূতাবাসের ভাইস কনসাল, ১৯৭৬-৭৮ এ ফাস্ট সেক্রেটারী এবং ১৯৭৯-৮৪ সাল পর্যন্ত তিনি জাতীয় গোয়েন্দা বিভাগের উপপরিচালক হিসেবে খুলনায় কাজ করে অবসর গ্রহণ করেন।
বাংলা সাহিত্যের অনন্য সাধারণ উপন্যাস ‘সূর্য দীঘল বাড়ি’র রচয়িতা আবু ইসহাক, যে ক’জন ঔপন্যাসিক বাংলা সাহিত্যকে সমৃদ্ধির পথে এগিয়ে নিতে বিশেষ ভূমিকা রেখেছেন, তাদের মধ্যে অন্যতম। সাহিত্য সাধনায় তিনি স্বীয় বৈশিষ্ট্যের অধিকারী। এদেশের সামাজিক সমস্যা, গ্রামজীবনের ছবি তাঁর উপন্যাস ও গল্পে খুব সুন্দরভাবে রূপায়িত হয়েছে।
প্রকাশিত উপন্যাস :
সূর্য দীঘল বাড়ি (১৯৫৫), পদ্মার পলিদ্বীপ (১৯৮৭), জাল (১৯৮৮)।
১৯৬০ সালে তিনি উপন্যাসের জন্য বাংলা একাডেমী পুরুস্কার লাভ করেন। তাঁর ‘সূর্য দীঘল বাড়ি’ উপন্যাসের ওপর নির্মিত চলচ্চিত্র ১৯৭৯ সালের শ্রেষ্ঠ চলচ্চিত্র হিসেবে জাতীয় পুরস্কার পায়। এছাড়া তিনি বাংলা একাডেমী পুরস্কার (১৯৬৩), সুন্দরবন সাহিত্য পদক (১৯৮১), বাংলাদেশের কথাশিল্পী সংসদ পুরস্কার (১৯৯৭), একুশ পদক (১৯৯৭) লাভ করেন। এছাড়া সমকালীন বাংলা ভাষার অভিধানের (স্বরবর্ণ অংশ) জন্য মানিক মিয়া বৃত্তি’ লাভ করেন।
মৃত্যু তিনি ১৬ ফেব্রুয়ারি ২০০৩ সালে মৃত্যুবরণ করেন।
আহমদ ছফা (১৯৪৩-২০০১)
জন্ম ৩০ জুন ১৯৪৩, গাছবাড়িয়া, চট্টগ্রাম শিক্ষা : মাধ্যমিক গাছবাড়িয়া নিত্যানন্দ গোরিচন্দ্র উচ্চ বিদ্যালয় (১৯৬০); উচ্চ মাধ্যমিক- মাজিরহাট কলেজ, চট্টগ্রাম (১৯৩২); স্নাতক- ব্রাহ্মণবাড়িয়া কলেজ (১৯৬৭), স্নাতকোত্তর রাষ্ট্রবিজ্ঞান, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় (১৯৭১), পেশা- লেখালেখি। সম্পাদক- উত্থানপর্ব ।
প্রকাশিত উপন্যাস:
সূর্য তুমি সাথী (১৯৬৭), ওস্কার (১৯৭৫), একজন আলী কেনানের উত্থান-পতন (১৯৮৯), মরণ বিলাস (১৯৯০), অলাত চক্র (১৯৯০), গাভি বিত্তান্ত (১৯৯৪), অর্ধেক নারী অর্ধেক ঈশ্বরী (১৯৯৬), পুষ্পবৃক্ষ এবং বিহঙ্গ পুরাণ (১৯৯৬) ইত্যাদি।
মৃত্যু, ২৮ জুলাই, ২০০১।

