প্রথম পর্যায়ের গল্প (পঞ্চাশের দশক)

আজকের আলোচনার বিষয়ঃ প্রথম পর্যায়ের গল্প (পঞ্চাশের দশক)। যা আলাউদ্দিন আল আজাদের ছোটগল্পে জীবনবোধের রূপ রূপান্তরের অন্তর্গত।

 

প্রথম পর্যায়ের গল্প (পঞ্চাশের দশক)

 

প্রথম পর্যায়ের গল্প (পঞ্চাশের দশক)

যে কজন সাহিত্যিকের সাধনায় বাংলাদেশের সাহিত্য পেয়েছিল পলল মৃত্তিকা আলাউদ্দিন আল আজাদ তাঁদের অন্যতম। তিনি সমকাল আত্মস্থ করে আগামীর স্বপ্ন নিয়ে সাহিত্য সাধনায় নিজেকে সমর্পণ করেন। কথাসাহিত্যে বাস্তবতানিবিড় বিষয় বৈচিত্র্যের তিনি বিশ্বস্ত রূপকার। তাঁর সময়ের ঝঞ্ঝাবিক্ষুব্ধ সমাজসত্তায় তিনি লালিত ও বর্ধিত হয়েছেন। কিশোর বয়সে প্রকাশিত তাঁর রচনা সুধীজনের দৃষ্টি আকর্ষণ করে। তাঁর সাহিত্যচর্চার প্রাথমিক পর্যায় পঞ্চাশের দশক। এ দশকের গল্পগুলোতে শিল্পীর জগৎভাবনা ও শিল্পবোধের যে পরিচয় পাওয়া যায় তা সত্যিই বিস্ময়কর।

পদ্মপাতার শিশিরে যেমন হেসে ওঠে প্রভাতের সম্পূর্ণ সূর্য, তেমনি তাঁর পঞ্চাশের দশকের গল্পও ১৯৪৭ সালের দেশবিভাগ, দাঙ্গা, মন্বন্তর যেমন তিনি গল্পে তুলে ধরেছেন তেমনি নব্য জন্মলব্ধকৃত পাকিস্তানের শাসন ও শোষণনীতির বিরুদ্ধে এদেশের জনগণের প্রতিবাদকে শিল্পিত করেছেন। বামপন্থী দৃষ্টিভঙ্গির সঙ্গে তাঁর সম্পৃক্ততা তাকে বিপ্লবী চেতনায় উদ্বুদ্ধ করেছে।

মূলত বাংলা সাহিত্যে তিরিশের দশকের শেষ দিকেই কবি কাজী নজরুল ইসলাম (১৮৯৯-১৯৭৬), মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় (১৯০৮-১৯৫৬), সোমেন চন্দ (১৯২০-১৯৪২), কবি সুকান্ত ভট্টাচার্য (১৯২৬- ১৯৪৭), প্রমুখ শিল্পীর রচনায় বামপন্থী চেতনার সফল রূপায়ণ লক্ষ্য করা যায়। এধারারই উত্তরসূরি কবি, কথাসাহিত্যিক আলাউদ্দিন আল আজাদ ।

ছোটগল্পে যে জীবনকে তিনি এঁকেছেন, তাঁর প্রেরণা তিনি মূলত আর্থ- সামাজিক-রাজনৈতিক নানা অবস্থা থেকে লাভ করেছেন। ১৯৫০ সালে তাঁর প্রথম গল্প গ্রন্থ ‘জেগে আছি’ প্রকাশের কিছুদিন পূর্বে কলকাতা দেশবন্ধু পার্কে অনুষ্ঠিত লিখিত ভারত শান্তি সম্মেলনে প্রতিনিধি হিসেবে তিনি যোগ দেন।

 

প্রথম পর্যায়ের গল্প (পঞ্চাশের দশক)

 

সেখানে মঞ্চে পরিচয় হয় সাহিত্যিক মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের সঙ্গে। আলাউদ্দিন আল আজাদের সঙ্গে ছিলেন সহপাঠী আবদুস সালাম। “সম্মেলনের উদ্যোক্তারা দুজনকে তালতলা বস্তির ভিতরে পাঠকল মজদুর ইউনিয়নের মাটি ওপড়ানো ভাঙা ছোটঘরে থাকার ব্যবস্থা করেন। পরদিন ভোরবেলা ভারতীয় পুলিশ সেখানে দলেবলে হাজির। আজাদ ও সালামকে গ্রেফতার করে লালবাজারে নিয়ে যায়।

ওখান থেকে দশদিন লর্ডসিংহা রোডে এসবিতে নিয়ে ইন্টারোগেট করে। পরে প্রেসিডেন্সী জেলে নিরাপত্তা বন্দী হিসেবে কারারুদ্ধ হন”। তিনি ১৯৪৯ সালের ২৭ নভেম্বর থেকে ১৯৫০ সালের ৬ জানুয়ারি পর্যন্ত কারাগারে ছিলেন। ছাত্রাস্থায়ই আলাউদ্দিন আজাদ প্রগতিশীল ধারার রাজনীতির সঙ্গে সরাসরি যুক্ত ছিলেন। তিনি তখন সমাজ প্রগতি আন্দোলনের এক সক্রিয় সংস্কৃতি কর্মী।

এ সময় প্রকাশিত ছোটগল্পে তিনি একজন প্রতিবাদী চেতনার শিল্পী। এ দেশের মানুষের আশা আকাঙ্ক্ষার প্রতিচ্ছবি তাঁর গল্পে ধরা দিয়েছে। আলাউদ্দিন আল আজাদের পঞ্চাশের দশকে প্রকাশিত গল্পের বিষয়বৈচিত্র্য লক্ষণীয়। প্রথমত প্রতিবাদী চেতনায় গল্প।

এ পর্বের গল্পগুলো হলো ‘মহামুহূর্ত’ “শিষ ফোটার গান’, ‘একটি সভ্যতা’, ‘কয়লা কুড়ানো দল’ প্রভৃতি। দ্বিতীয়ত সমকালের সরকারবিরোধী আন্দোলনকে যেসব গল্পে তুলে ধরেছেন তাহলো ‘অসমাপ্ত’, ‘মোচড়’ ও ‘চেহারা’ প্রভৃতি। তৃতীয়ত দেশবিভাগ, মন্বন্তর ও দাঙ্গা নিয়ে লিখেছেন ‘ছুরি’, ‘একটি কথার জন্ম’, ‘রোগমুক্তির ইতিবৃত্ত’ প্রভৃতি গল্প।

‘মহামুহূর্ত’ প্রতিবাদী চেতনার গল্প। জমির মালিকের পক্ষ নিয়ে পুলিশ ও সৈন্যরা এগিয়ে আসে। সশস্ত্র প্রতিরোধে এগিয়ে আসে কৃষকেরাও। এদেশের উত্তরপূর্ব অঞ্চলের বড় বড় হাওরগুলোতে পৌষমাসে ধানের মৌসুমে দেশের বিভিন্ন এলাকা থেকে চাষীরা ধান কাটতে যায়। ধানের ভাগের নির্ধারিত একটি অংশ চাষীদের দেওয়ার রীতি থাকলেও ধানকাটা শেষে সামান্য মজুরি দিয়ে তাদের বিদায় করতে চায় জমির মালিক। এর বিরুদ্ধে কৃষকরা ঐক্যবদ্ধ হয়।

এ গল্পে সাহসী প্রতিরোধে এগিয়ে আসে বৃদ্ধ রহিম বখশ। তাঁর তেজস্বী বক্তব্যে রয়েছে মুখের আঞ্চলিক ভাষা। যেমন :
“দেখুম নে কোন হালাধান নিতে না দেয়, খেলা আর কি? ধান কাটলাম এত কষ্ট কইরা আর নিতে দিবে না ই মগের মুল্লুক পাইছে না কি? বেশি তেরিমেরি করলে দেহাইয়া দিয়াম, হুঁ”।

অবিরত শোষণ আর বঞ্চনাকে মেনে নেয়া যায় না, রুখে দাঁড়াতে হবে, প্রতিরোধ করতে হবে, তাহলে শোষণের অবসান হবে। এই বোধই যেন লেখক রুগ্ন রহিম বখশের মাধ্যমে ব্যক্ত করেছেন। যেমন:

“না, না। আমি বুড়া মানুষ, মরলেও কোন ক্ষতি নাই। আমিই সামনে দাঁড়াই” ”

‘মহামুহূর্ত’ গল্পের মতো শিষ ফোটার গান’ গল্পে কৃষকেরা ঐক্যবদ্ধ হয়ে প্রতিরোধ করার প্রত্যয় ব্যক্ত করে। তাদের ইস্পাত কঠিন দৃঢ়তা থাকে যে, তারা জমির মালিকের কোন অন্যায় মেনে নেবে না। এর নেতৃত্বে আছে মজিদ। লাঠি, সুড়কি ও মশাল হাতে যুবকেরা খামারের চারপাশে পাহারা দেয়। তাদের জেগে ওঠাকে লেখক নতুন সূর্যের প্রতীক হিসেবে দেখেছেন।

 

প্রথম পর্যায়ের গল্প (পঞ্চাশের দশক)

 

‘মহামুহূর্ত’ ও ‘শিষফোটার গান’ গল্পে মূলত সংঘবদ্ধ কৃষক বিদ্রোহ শিল্পরূপ লাভ করেছে। প্রান্তিক মানুষের মধ্যে রুখে দাঁড়াবার ভাবনাই এখানে প্রধান। যেমন “বন্দর থেকে সারাদিন গতর খেটে এসেও জোয়ানেরা বসে থাকে না। চটপট খাওয়া দাওয়া সেরে বেরিয়ে পড়ে, প্রত্যেকের হাতেই একটা করে শক্ত লম্বা লাঠি। রাত্রে পাটশালার মশাল জ্বালায়, এদিক ওদিক কেবলই ঝলমলে আলো। লাল আগুনের আভায় একেকটি জোটের মুখ সকাল অবধি জাগে। কী যে আলোচনা করে কোন ধরনের গল্প করে, এরা ছাড়া আর কেউ জানে না ।

মূলত ১৯৪৭ সাল থেকে ১৯৪৯ সালের মধ্যে লেখা এসব গল্পের বিদ্রোহ শুধু লেখকের কল্পনার সৃষ্টি নয়। জানা যায় তখন পূর্ব বাংলায় স্থানে স্থানে ঘটেছিল কৃষক বিদ্রোহ। নাচোল ছিল এরকম একটি স্থান যেখানে কৃষক জনতার নেতৃত্ব দিয়েছিলেন ইলা মিত্র। সুতরাং “শিষ ফোটার গান’ ও ‘মহামুহূর্ত’ বাংলা ছোটগল্পের ধারায় অত্যন্ত তাৎপযপূর্ণ ।

রাশিয়ার বিপ্লবীনেতা ও তাত্ত্বিক মনীষী কার্ল মার্ক্স। তাঁর তত্ত্বানুযায়ী সাহিত্যিক হবেন সৈনিক। তিনি সমাজের শোষক শ্রেণীর মুখোশ খুলে দেবেন। আলাউদ্দিন আল আজাদের ‘একটি সভ্যতা’ ও ‘কয়লাকুড়ানো দল’ গল্প দুটোতে এই চেতনার অভিব্যক্তি রয়েছে। সমাজের বাস্তব স্তরের সংগ্রামের সঙ্গে উপরি কাঠামোর সংগ্রাম এভাবে যুক্ত করতে ভালবাসতেন আলাউদ্দিন আল আজাদ।

‘একটি সভ্যতা’ গল্পটি শ্রমিকদের ঐক্যবদ্ধতাকে কেন্দ্র করে রচিত। এক নীতিবান ও সংগ্রামী রাজমিস্ত্রি মজুরদের ন্যায্যদাবির মিছিলে নেতৃত্ব দিতে গিয়ে পুলিশের হাতে বন্দি হয়। তার অভাবের সংসারে অসুস্থ স্ত্রী ও পুত্রের সম্বল হিসেবে রয়েছে মিস্ত্রির তৈরি মূল্যবান নকশাগুলো। শোষক শ্রেণীর সহযোগী রহমান ওস্তাদগার সেগুলো কেনার জন্য মিস্ত্রীর পুত্রকে প্রস্তাব দেয়। কিন্তু নকশাগুলোর প্রতি অসহায় স্ত্রীর আকর্ষণ ও মমত্ববোধ এতো প্রবল যে, নিজের জীবনের বিনিময়েও তা সে ত্যাগ করতে চায় না এবং বলে ওঠে “কিছু না হোক, কোন কাজেই না আসুক, তবু এগুলো আমারই কাছে থাকবে, আমারই কাছে থাকবে।”

জীবন নিরীক্ষণে আলাউদ্দিন আল আজাদের প্রগাঢ় উপলব্ধির অন্যতম নিদর্শন হলো ‘কয়লা কুড়ানোর দল’ গল্পটি। নিপীড়িত, বঞ্চিত, শোষিত, হতদরিদ্র মানুষের জীবন সংগ্রাম এ গল্পে স্থান পেয়েছে। লেখক অপরিসীম সহানুভূতি ও মমত্ববোধ নিয়ে কয়লা কুড়ানো বুভুক্ষ মানুষের জীবিকার করুণ চিত্র তুলে এনেছেন।

বস্তির মনু, কানা, গেদু, সোনাভান, রূপবান এরা রেলের পোড়া সংগ্রহ করে বিক্রি করে এবং তা দিয়ে ক্ষুধার অন্ন যোগায়। কিন্তু পশ্চিমা স্টেশন মাস্টারের লোভ জাগে ওগুলোর ওপর। সে পুলিশ পাঠিয়ে কয়লা কুড়ানোর ঐ ছেলেমেয়েদের তাড়িয়ে দেয় কেননা ঐ কয়লা বিক্রি করে সে আরও অর্থ উপার্জন করতে চায়। কয়লা কুড়ানোর দল’ গল্পের অন্যতম দিক হলো পুলিশ কন্সটেবলের শেষ পর্যন্ত টোকাই দলের সঙ্গে একাত্ম হওয়া। কারণ সেও মাস্টারের শোষণ ও বঞ্চনার শিকার।

অভিজ্ঞতা ও আত্মচরিত্রকে শিল্পের উপাদান করে আলাউদ্দিন আল আজাদ পঞ্চাশের দশকে বেশ কিছু শিল্পসফল গল্প লিখেছেন। ‘অসমাপ্ত’, ‘চেহারা’ ও ‘মোচড়’ প্রভৃতি গল্পে পাকিস্তান সরকারের বিরুদ্ধে এদেশের ছাত্র-জনতার ঐক্যবদ্ধ সংগ্রাম স্থান করে নিয়েছে। মূলত ছাত্রাবস্থায় বাম গণতান্ত্রিক আন্দোলনের সঙ্গে তাঁর সংশ্লিষ্টতায় এ পর্বের গল্পে পেয়েছে ভিন্নমাত্রা। ১৯৪৮ সালের উত্তাল মার্চ মাসের নানা ঘটনা শিল্পরূপ পেয়েছে ‘অসমাপ্ত’ গল্পে।

কারখানার মঞ্জুর ব্যারাকগুলোতে নানা দাবিতে নীরবে সংগ্রামের অগ্নিমন্ত্রে উজ্জীবিত। নারায়ণগঞ্জ ও ঢাকার শ্রমিক সংঘ ঐক্যবদ্ধ হয়ে সরকারের বিরুদ্ধে আন্দোলন করেছে। তাদের সঙ্গে সংহতি প্রকাশ করেছে বাম ছাত্রসমাজ। ফলে অনেক ছাত্রই পুলিশের নির্যাতন ও নিপীড়নের স্বীকার হয়। মূলত এই কাহিনী ‘অসমাপ্ত’ গল্পের। এ গল্পে মাসুদ হারুণ নামের এক নেতার মৃত্যুতে শ্রমিকদের মধ্যে দেখা দিয়েছে অসন্তোষ ও ক্ষোভ।

 

প্রথম পর্যায়ের গল্প (পঞ্চাশের দশক)

 

তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানে সরকারের বিরুদ্ধে আন্দোলনরত নেতাদের প্রতি নির্যাতন, জেল জরিমানা ও গুপ্তহত্যার বিষয়টি এখানে উল্লেযোগ্য। ১৯৪৭ সালে পাকিস্তানের জন্মের পর সংবিধান প্রণয়ন ও রাষ্ট্রভাষার প্রশ্নে পূর্ব পাকিস্তান বৈষম্যের স্বীকার হয়। এদেশের মানুষের স্বার্থবিরোধী কর্মকাণ্ডের বিরুদ্ধে মধ্যবিত্ত শ্রেণী তুমুল প্রতিরোধ গড়ে তোলে। পাকিস্তান সরকারের বৈষম্যনীতির বিরুদ্ধে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় তখন সকল আন্দোলনের নেতৃত্বে ও কেন্দ্রবিন্দুতে অবস্থান করে।

আলাউদ্দিন আল আজাদের ‘মোচড়’ গল্পটিতে সরকারের নির্যাতন, দমন পীড়ন নীতির বিরুদ্ধে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ধর্মঘট ও উত্তাল জনতার বিক্ষোভ এক ভিন্নমাত্র পেয়েছে। সাহিত্য সমাজ ও সময়ের বিশ্ব। বিশ্বসাহিত্যের খ্যাতিমান ম্যাক্সিম গোর্কি, র‍্যালফ ফক্স এবং কিস্টোফার কড়ওয়েল প্রমুখ বিপ্লবী সাহিত্যিকের ন্যায় আলাউদ্দিন আল আজাদও এই জীর্ণ সমাজকে ভাঙতে চেয়েছেন।

গণমানবিক উপলব্ধি, বিপ্লবের জন্য মানুষকে ডাক দেয়া অর্থাৎ একটি বৈপ্লবিক অনুভূতিই তাঁর পঞ্চাশের দশকের গল্পের মূল ভিত্তি। সমকালের সামাজিক, রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক চিত্র ছোটগল্পে তুলে ধরার ক্ষেত্রে তাঁর অবদান অপরিসীম।

লেখকের বিপ্লবী চেতনা ‘চেহারা’ গল্পের মর্মবস্তু। এ গল্পে ফুটে উঠেছে দারিদ্র্য, বেকারত্বের চিত্র। ‘চেহারা’ গল্পের নায়ক আহসানের নেতৃত্বে শ্রমিক শ্ৰেণী ঐক্যবদ্ধ আন্দোলন করছে। গ্রাম থেকে শহরে আসা তারই বন্ধু স্কুল মাস্টারের দৃষ্টিতে আন্দোলনের সার্বজনীনতা ধরা পড়েছে। যেমন :

“এখানে যারা এসেছে তাদের কাব্যের পরিচয় আমার জানা নেই তবু এদের যেন কোথায় দেখেছি। এদের যেন সর্বাঙ্গে ঘামে ভিজিয়ে শহরের রাস্তায় রিকশা চালাতে, ওপরের আসন থেকে ঘোড়ার পিঠে চাবুক কষে গাড়ি হাঁকাতে, নর্দমা পরিষ্কার করতে, স্টেশনে লাগেজ টানতে।

১৯৪৭ সালে ধর্মের ভিত্তিতে ভারত – পাকিস্তান বিভক্ত হয়। দেশবিভাগ, সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা ও মন্বন্তরের পটভূমিতে আলাউদ্দিন আল আজাদ পঞ্চাশের দশকে বেশ কিছু শিল্পসফল গল্প লিখেছেন। একটি কথার জন্ম’, ‘ছুরি’ ও ‘রোগমুক্তির ইতিবৃত্ত’ প্রভৃতি। ‘একটি কথার জন্ম গল্পে উদ্ভ্রান্ত ক্ষুধাতুর দরিদ্র মানুষের অবর্ণনীয় দুঃখ কষ্ট স্থান পেয়েছে। কলকাতা থেকে আগত বিধবা উমরের স্ত্রী শেষ পর্যন্ত পতিতায় পরিণত হয়েছে। একটি কথার জন্ম’ গল্পে দেশ ভাগও দুর্ভিক্ষের এক করুণ ও নির্মম চিত্র ধরা পড়েছে। উমরের স্ত্রীর আঞ্চলিক কথাবার্তায় মন্বন্তরের দৃশ্য :

“টেহার লালচ দেহাইয়া আনছে, আমারে কাপড় দিছে। খাওন দিছে। আমার দোষ নাই; না খাইয়া আমার দুধের বাচ্চা মইরাছে, সোয়ামি মইরাছে। দেশ ছাইড়া আইছি। বাড়ি নাই, ঘর নাই । ”

আলাউদ্দিন আল আজাদ সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা নিয়ে রচনা করেছে ‘চুরি’ গল্পটি। এ গল্পের নায়ক মনসুর। তার প্রিয়তমা দাঙ্গায় প্রাণ হারায়। ফলে সে প্রতিশোধ পরায়ণ হয়ে ওঠে। । শেষ পর্যন্ত মনসুরের মধ্যে মানবভাবনা মুখ্য হয়ে দাঁড়ায়। প্রতিবেশী হিন্দু পরিবারকে বাঁচানোর জন্য মনসুর জীবন দেয়। ‘রোগমুক্তির ইতিবৃত্ত’ গল্পেও আছে মনীষা নামক এক নার্সের দাঙ্গায় প্রিয়জন হারানোর হাহাকার ও ধর্মঘটে জীবনদানের মর্মান্তিক কাহিনী। বাংলা সাহিত্যের আবু ইসহাক, সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহ প্রমুখ শিল্পীও দেশবিভাগ, মন্বন্তর প্রভৃতি বিষয় নিয়ে চমৎকার শিল্পসমৃদ্ধ গল্প লিখেছেন।

মূলত চল্লিশের দশকের শেষভাগে আলাউদ্দিন আল আজাদ একজন তরুণ প্রতিশ্রুতিশীল লেখক হিসেবে বাংলাদেশের ছোটগল্পে এনেছে নতুন প্রাণ । পঞ্চাশের দশকের গল্পে তাঁর তীক্ষ্ণ শ্রেণীচেতনাবোধ ও সামাজিক রাজনৈতিক “দায়বদ্ধতা সুষ্পষ্ট ৷

এ পর্বের গল্পের নায়কেরা সংঘবদ্ধশক্তির চেতনায় উজ্জীবিত। প্রতিবাদ থেকে প্রতিরোধে, ব্যক্তির গণ্ডি থেকে সংঘবদ্ধজীবনের উত্তাপে ঋদ্ধ পঞ্চাশের দশকের গল্পগুলো এ পর্যায়ের গল্প বাংলা সাহিত্যের ধারায় নির্মাণ করেছে স্বতন্ত্র মাত্রা। তাঁর গল্পের গতিপ্রকৃতি সম্পর্কে ডক্টর আনিসুজ্জামানের মূল্যায়ন এখানে উল্লেখ করা যায়। যেমন: “প্রথম জীবনে গ্রামের মানুষ ও তার সংগ্রাম, প্রকৃতি ও তার লালন ও সংহারমূর্তি-এসব তাঁর মনে প্রবল ছাপ ফেলে গেছে। নগরজীবনে যা তার গোচর হয়েছে, তার একদিকে রাজনৈতিক সংগ্রাম, অন্যদিকে নিপীড়ন, এই জীবনের অপেক্ষাকৃত কৃত্রিমতা ও প্রতারণা।’

Leave a Comment