পেশোয়ার থেকে তাসখন্দ । শহীদুল্লা কায়সার

শহীদুল্লা কায়সারের “পেশোয়ার থেকে তাসখন্দ” বাংলা ভ্রমণ সাহিত্যের এক অনন্য সংযোজন। এটি কেবল ভৌগোলিক ভ্রমণের বিবরণ নয়, বরং ইতিহাস, রাজনীতি, সংস্কৃতি এবং মানুষের গল্পে সমৃদ্ধ একটি রচনা। বইটিতে লেখক তার পেশোয়ার থেকে তাসখন্দ পর্যন্ত দীর্ঘ পথের অভিজ্ঞতা বর্ণনা করেছেন, যেখানে প্রাচীন সভ্যতার নিদর্শন, মধ্য এশিয়ার বৈচিত্র্যময় সংস্কৃতি এবং সোভিয়েত সমাজের পরিবর্তনশীল চিত্র প্রতিফলিত হয়েছে।

শহীদুল্লা কায়সার তার লেখনীতে ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট, সামাজিক বাস্তবতা এবং সাধারণ মানুষের জীবনের গল্পকে অত্যন্ত দক্ষতার সাথে তুলে ধরেছেন। তিনি শুধু ভ্রমণ করেননি, বরং প্রতিটি স্থানের ইতিহাস ও মানুষের জীবনকে গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করেছেন, যা পাঠকদের জন্য এক অনন্য অভিজ্ঞতা। এই বইটি ভ্রমণ সাহিত্যের পাশাপাশি সমাজতান্ত্রিক ভাবধারার প্রতিফলন হিসেবেও গুরুত্বপূর্ণ, যা পাঠককে মধ্য এশিয়ার জটিল বাস্তবতার সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেয়।

 

পেশোয়ার থেকে তাসখন্দ । শহীদুল্লা কায়সার

 

পেশোয়ার থেকে তাসখন্দ । শহীদুল্লা কায়সার

শহীদুল্লা কায়সারের জন্ম হয় ১৯২৭ খ্রীষ্টাব্দের ১৬ই ফেব্রুয়ারী ফেনী জেলার অন্তর্গত মজুপুর গ্রামে। তাঁর পিতা ছিলেন মাওলানা মোহাম্মদ হাবিবুল্লাহ। ১৯৪২ সালে শহীদুল্লা কায়সার প্রবেশিকা পাশ করে প্রেসিডেন্সী কলেজে ভর্তি হন। ১৯৪৬-এ কলকাতা প্রেসিডেন্সী কলেজ থেকে অর্থনীতিতে অনার্সসহ বি.এ. পাস করেন।

পরবর্তীকালে তিনি কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে অর্থনীতিতে এম.এ. ক্লাসে ভর্তি হন এবং একই সংগে আইন বিষয়ে পড়াশুনা শুরু করেন রিপন কলেজে। কিন্তু সমাপ্ত করেননি। দেশবিভাগের পর ঢাকায় এসে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে অর্থনীতিতে এম.এ. ভর্তি হন। কিন্তু তৎকালীন ছাত্র রাজনীতি ও ছাত্র যুব আন্দোলনের সংগে জড়িত থাকায় এম. এ. ডিগ্রী অর্জন শেষপর্যন্ত তাঁর ভাগ্যে আর হয়ে উঠেনি।

১৯৪৮ -এর জুন জুলাইয়ের দিকে তাঁর বিরুদ্ধে হুলিয়া জারী হয় এবং তখন তিনি আত্মগোপন অবস্থায় কমিউনিষ্ট পার্টির কাজ করেন। তাঁর কর্মজীবন শুরু হয় মওলানা ভাসানী পরিচালিত সাপ্তাহিক ‘ইত্তেফাক’ থেকে। ১৯৫৮-তে সহকারী সম্পাদক হিসেবে তিনি ‘সংবাদ’-এ যোগদান করেন এবং মৃত্যুকাল পর্যন্ত এই পত্রিকার সংগেই জড়িত ছিলেন। পূর্ব পাকিস্তান সাংবাদিক ইউনিয়নের সভাপতি নির্বাচিত হন তিনি। একাধিকবার।

ছাত্রজীবনেই বামপন্থী রাজনীতির সংস্পর্শে আসায় কমিউনিষ্ট পার্টির সদস্য হিসেবে তাঁকে বিশেষ দায়িত্ব পালন করতে হয়। ১৯৫২-র ৩রা জুন ভাষা আন্দোলনের পরিপ্রেক্ষিতে তিনি গ্রেফতার হন এবং ১৯৫৫- তে মুক্তিলাভের এক মাস পরই আবার তাঁকে গ্রেফতার করা হয় আইয়ুব খান কর্তৃক সামরিক আইন জারী হলে । ১৯৫৬ পর্যন্ত তিনি কারাভোগ করেন এবং ১৯৫৮-তে পুণরায় কারারুদ্ধ হন। ১৯৬২-তে তাঁর মুক্তিলাভ হয় ।

১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের চূড়ান্ত বিজয়ের মাত্র দিন কয়েক পূর্বে ১৪ই ডিসেম্বর পাক-হানাদার বাহিনীর এদেশীয় দোসর আলবদরের সদস্যরা তাঁকে ধরে নিয়ে যায়। তারপর থেকে তাঁর আর কোন খোঁজ পাওয়া যায়নি।

রাজনীতি এবং সাংবাদিকতার ক্ষেত্রে সক্রিয় শহীদুল্লা কায়সার লেখক হিসেবেও খ্যাতিমান। তাঁর প্রকাশিত গ্রন্থ-উপন্যাস : সারেং বৌ (১৯৬২), সংশপ্তক (১৯৬৫)। ভ্রমণ বৃত্তান্ত : পেশোয়ার থেকে তাসখন্দ (১৯৬৬)। স্মৃতিকথা : রাজবন্দীর রোজনামচা (১৯৬২)। তিনি ১৯৬২-তে আদমজী পুরস্কার, ১৯৬৯-এ বাংলা একাডেমী পুরস্কার লাভ করেন। ১৯৫২-র ভাষা আন্দোলনে তাঁর ভূমিকা ছিল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

তাছাড়া আগে পরে এদেশের প্রতিটি প্রগতিশীল তথা গণতান্ত্রিক সংগ্রামের সংগে ঘনিষ্ঠভাবে জড়িত ছিলেন। সাংবাদিকতা ছিল তাঁর রাজনৈতিক সংগ্রামেরই অংশ। তাঁর সাহিত্যও এই ধারা থেকে বিছিন্ন নয়। এদেশের জনজীবন, তার নানা অনুষঙ্গ রচনায় শহীদুল্লা কায়সার বিশেষ পারঙ্গমতার পরিচয় দিয়েছেন। ১

১৯৬৫ সালে পাক- ভারত উপমহাদেশে এক রক্তক্ষয়ী যুদ্ধ সংঘটিত হয়। যুদ্ধের স্থায়িত্বকাল ছিল সতের দিন। অল্প সময়ে যুদ্ধের অবসান হলেও দু’দেশের মধ্যে উত্তেজনা বিরাজ করছিল। উত্তেজনা প্রশমনের জন্য সোভিয়েট রাশিয়ার প্রধানমন্ত্রী মিঃ আলেক্সী কোসিগিন সোভিয়েট ইউনিয়নের তাসখন্দ নগরীতে পাক- ভারত নেতৃত্বের এক শীর্ষ বৈঠকের আয়োজন করেন। বৈঠক শুরু হয় ১৯৬৬ সালের ৪ঠা জানুয়ারী। এ উপলক্ষে আমন্ত্রিত পাক প্রেসিডেন্ট আইয়ুব খানের প্রতিনিধিদলের একজন সাংবাদিক সদস্য হিসেবে শহীদুল্লা কায়সার তাসখন্দ গিয়েছিলেন।

 

পেশোয়ার থেকে তাসখন্দ । শহীদুল্লা কায়সার

 

ওরা জানুয়ারী থেকে ১১ই জানুয়ারী সপ্তাহকালব্যাপী তাঁরা তাসখন্দে অবস্থান করেন। এ সময়ের মধ্যেই প্রতিনিধিদল নগরীর বিভিন্ন স্থান ঘুরে দেখেন। ১০ই জানুয়ারী ১৯৬৬ তারিখে রুশ প্রধানমন্ত্রী মিঃ কোসিগিনের সহায়তায় পাক-ভারত নেতৃদ্বয়ের মধ্যে তাসখন্দ চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। ঐতিহাসিক এই চুক্তিটি স্বাক্ষরিত হওয়ার কয়েক ঘন্টার মধ্যেই ভারতের প্রধানমন্ত্রী লালবাহাদুর শাস্ত্রী পরলোকগমন করেন। একদিকে চুক্তির আনন্দ অপরদিকে এই আকস্মিক শোক : যুগপৎ এক আনন্দ-বেদনার অনুভূতি নিয়ে প্রতিনিধিদল ১১ই জানুয়ারী দেশে ফিরে আসেন।

দেশে ফেরার পর এই ঐতিহাসিক ঘটনা; পাশাপাশি সোভিয়েট মধ্য এশিয়ার অন্যতম রিপাবলিক উজবেকিস্তানের জীবনধারা সম্পর্কিত তথ্য জানাবার জন্য বিভিন্ন মহল প্রত্যক্ষদর্শী শহীদুল্লা কায়সারকে অনুরোধ জানান। তাদের কৌতূহলকে সামনে রেখেই তিনি গ্রন্থ রচনায় হাত দেন। তাঁর এ বিবরণ মূলত তাসখন্দ বৈঠকের রোজনামচা। কিছুটা মূল্যবান ভ্রমণ বৃত্তান্ত সংযুক্ত হওয়াতে এটি ভ্রমণ-সাহিত্যের আওতাভুক্ত হয়েছে। বইটি প্রকাশিত হয় ১৯৬৬ সালে।

দুই

৩রা জানুয়ারী পাকিস্তান সময় বেলা সাড়ে ১১টায় প্রতিনিধিদল পেশোয়ার থেকে তাসখন্দ রওনা হয়ে যান। আকাশ পথের প্রাকৃতিক দৃশ্যাবলী সভ্যতার শুরু থেকে বিকাশ পর্যন্ত নানা বৈচিত্র্যময় ইতিহাস কাহিনী যাত্রীদের চোখের সামনে তুলে ধরেছিল। প্রাচীন থেকে মধ্যযুগ, মধ্য থেকে আধুনিকে পা রাখতে বিবর্তিত সভ্যতাকে যে কত চড়াই-উৎরাই পার হতে হয়েছে তার একটা পূর্ণাঙ্গ ছবি যেন তাসখন্দের পথে পথে আঁকা রয়েছে।

পি.আই.এ. বোয়িং তাসখন্দ বিমান বন্দরে অবতরণ করলে রুশ প্রধানমন্ত্রী আলেক্সী কোসিগিন সহ আরো অনেকে পাক প্রেসিডেন্টকে অভিনন্দন জানান। গার্ড অব অনার ও অন্যান্য আনুষ্ঠানিকতা শেষে রুশ তরুণী আদেলা সাংবাদিক শহীদুল্লা কায়সার সহ অন্যদের বিমান লাউঞ্জে নিয়ে যান।

সেখানে ভারতীয় রাষ্ট্রদূত মিঃ কাউল এবং কিসেন ভাটিয়া-সহ কয়েকজন ভারতীয় সাংবাদিকদের সংগে তাসখন্দ সম্মেলন নিয়ে কিছুটা আলাপ আলোচনা হয়। বেলা ৩টা নাগাদ তাঁদের হোটেলে পৌঁছে দেন তরুনী আদেলা। হোটেলের পথে যেতে যেতে রাস্তার দু’পাশে হাজার হাজার নরনারীসহ বহু বর্ণিল ফেষ্টুন, ব্যানার, পতাকা সজ্জিত তাসখন্দ নগরী লেখকের মুগ্ধ দৃষ্টি আকর্ষণ করেছিল।

তাপ নিয়ন্ত্রিত ছয়তলার তাসখন্দ হোটেলটি গোথিক স্থাপত্য-রীতিতে তৈরী। বৈঠক উপলক্ষে আগত পৃথিবীর বিভিন্ন দেশের প্রায় দেড় শতাধিক সাংবাদিক, ফটোগ্রাফার, রেডিও বা টেলিভিশন প্রতিনিধিদের এ হোটেলে তোলা হয়েছে। কর্মব্যাস্ততায় মুখর হয়ে আছে সমস্ত ভবনটি। সর্বএই এক আলাপ; পাক-ভারত শীর্ষ বৈঠক।

পাক প্রেসিডেন্ট আইয়ুব বানকে রাখা হয়েছে শহরতলীর একটি বাগান বাড়িতে এবং সরকারী প্রতিনিধিদের তোলা হয়েছে অদূরেই সিলকা ভিসনিয়াতে। নববর্ষের উৎসব আলোয় ঝলমল করছে তাসখন্দ নগরী। আগত অতিথিদের সম্মানার্থে আরও বিশেষভাবে সাজানো হয়েছে শহরটিকে। নগরীর অপরূপ দৃষ্টিনন্দন আলোকসজ্জা সহজেই পথিকের মুগ্ধ দৃষ্টি আকর্ষণ করে। লেখক সিলকা ভিসনিয়ার উদ্দেশ্যে পথে বেরিয়েছিলেন কিন্তু সেখানে প্রতিনিধিদের কাউকে না পেয়ে শহর ঘুরে তিনি হোটেলে ফিরে আসেন।

হোটেলে রুশ বৈদেশিক দফতরের প্রেসকর্তা মিঃ জেমিয়াটিনের সাথে তাঁর আলাপ হয়, তাঁর কাছ থেকে প্রয়োজনীয় খবরাখবর জেনে যে যার পত্রিকায় আর্জেন্ট প্রেস পাঠিয়ে সোজা চলে যান ডাইনিং হলে। খাবার টেবিলে তাঁরা দোভাষিণী নীনা ও ফয়ার সাথে পরিচিত হন। বিভিন্ন আইটেমের মধ্যে উজবেক কাবাব লেখকের খুব পছন্দ হয়েছিল। টেবিলে বিভিন্ন আলোচনায় মধ্য এশিয়ার দেশগুলোর সাথে বাঙ্গালী কৃষ্টির সাদৃশ্যগত দিকগুলো বেশ স্পষ্ট হয়ে ওঠে।

অথচ বিগত একশ বছরের ইতিহাসে এর কোন উল্লেখ পাওয়া যায় না। এর মূল কারণ ঔপনিবেশিক শাসনামলে ব্রিটিশরা যে ইতিহাস রচনা করেছিল তাতে বাঙ্গালীর গৌরবময় অতীতকে তারা কলংকিত করে রেখেছিল এবং বহির্বিশ্বে বিশেষতঃ মধ্য এশিয়ার সাথে বাংলার যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন রাখাও ছিল তাঁদের এই হীন অপচেষ্টার আরেকটি দিক। ক্রমে সেই পরাধীনতার শৃংখল মানুষ ছিন্ন করেছে। উঠে এসেছে মুক্তির আলোয় এবং ছড়িয়ে দিয়েছে হীরক দ্যুতি বিশ্বলোকের দুয়ারে দুয়ারে।

৪ঠা জানুয়ারী বিকেল চারটায় উদ্ভবেক সমাজতান্ত্রিক প্রজাতন্ত্রের দফতরে বহুল আলোচিত পাক- ভারত শীর্ষ বৈঠক শুরু হয়। আলোচনা শুরুর আগে প্রধানমন্ত্রী কোসিগিন উভয় দেশের ডেলিগেটদের ডিনার দেন ডুরমেট ভালায়। ডুরমেট থেকে ভেরাতে ফিরবার পথে লেখকের সঙ্গে দু’জন তরুণ-তরুণীর পরিচয় হয়। তাঁদের কাছ থেকে তিনি সোভিয়েট জীবনযাত্রার মান সম্পর্কিত অনেক খুঁটিনাটি তথ্যের সন্ধান পান। পথে যেতে যেতে তাঁর দৃষ্টি আকর্ষণ করেছিল রাস্তার দু’পাশে শীতের পত্রশূণ্য সুদৃশ্য চিনার গাছের সারি যেগুলো বসন্তে বা গ্রীস্মে ফুল আর পাতায় ভরে ওঠে।

সকাল থেকে সমস্তদিন ব্যাপক ছোটাছুটির পর রাত বারোটায় যাবার টেবিলে যান সবাই। টেবিলের দোভাষিনী ফয়া প্রতিনিধিদের পাশে বসে নানা গল্প করছিল। তাঁর প্রাসঙ্গিক আলোচনার বিভিন্ন দিকগুলোর মধ্যে সোভিয়েট তরুণ তরুণীর উন্নত চিন্তা ও চেতনাগত দিকটিই বেশী প্রকাশ পেয়েছিল।

 

পেশোয়ার থেকে তাসখন্দ । শহীদুল্লা কায়সার

 

পরদিন তাঁরা সিলকা ভিসনিয়া ঘুরে দেখবার উদ্দেশ্যে সেখানে গিয়ে কাউকে না পেয়ে গেলেন প্রেসিডেন্ট আইয়ুব খানের ভাষায়। টিলার ওপর মনোরম অট্টালিকায় গিয়ে তাঁরা প্রেসিডেন্টকে না পেয়ে অন্যান্য সভ্যদের সংগে কিছুক্ষণ গল্প করে বেরিয়ে আসেন। দুপুরের প্রোগ্রামের আগে কিছুটা সময় হাতে থাকার প্রতিনিধিদল শহর ঘুরতে বেরিয়ে পড়েন।

সমরকন্দ, বোখারা, ফারগানা প্রভৃতি নামগুলোর সংগে জড়িয়ে আছে কত যুগ-যুগান্তরের অমর ইতিহাস আর সেই সাথে যুক্ত হয়ে আছে তৈমুর লঙের মত বীরদের নাম। সমরকদেই তৈমুর তাঁর স্বীয় রাজধানী স্থাপন করেছিলেন। কাবুল কান্দাহারের দিকে অভিযান পরিচালনা করেছিল তাঁর সেনাবাহিনী। তাসখন্দের পথে পথে ছড়িয়ে আছে সেইসব বীর্যগাঁথা।

তাসখন্দ শব্দের আক্ষরিক অর্থ মূলত পাথরের শহর। লেখক তানিয়া নামের এক দোভাষিণীর কাছ থেকে জেনে নিয়েছিলেন এই নামটি সাধারণত রূপক অর্থে ব্যবহার করা হয়। কারণ তাসখন্দবাসীরা অবিচল পাথরের মতোই যুগে যুগে বহিঃশত্রুর আক্রমণকে রুখে দিয়েছে। কথাটি সত্য কারণ পাথরের নির্মিত কোন কিছুই সেখানে লেখকের চোখে পড়েনি। ১৯১৭ সালে সমাজতান্ত্রিক বিপ্লবের পর তাসখন্দ শহর আধুনিক শহরে পরিণত হয়েছে কিন্তু পুরোনো শহরে রয়েছে সরু গলি মাটির ঘর ইত্যাদি।

বিকেলে উজবেক সমাজতান্ত্রিক প্রজাতন্ত্রের প্রধানমন্ত্রী জনাব রহমাতু কুরবানভ এর সংগে সাংবাদিক প্রতিনিধিদলের সাক্ষাৎ হয়। প্রজাতন্ত্রটির মহিলা প্রেসিডেন্টের নাম ম্যাডাম নাসিরুদ্দীনতা। প্রধানমন্ত্রী কুরবানভ উজবেকিস্তানের একটা সামগ্রিক রূপ দলের সামনে তুলে ধরেন। চার লক্ষ ঊনপঞ্চাশ হাজার পাঁচশত বর্গকিলোমিটার অধ্যুষিত এই প্রজাতন্ত্রের লোক সংখ্যা ৯৮ লক্ষ। শহরের সংখ্যা ৩৫টি। দেশ জুড়ে প্রচুর যৌথ খামার ও রাষ্ট্রীয় খামার রয়েছে। নাট্যসংস্থা, কনসার্ট সংস্থা, সঙ্গীত বিদ্যালয়, ব্যালে স্কুল, সিনেমা থিয়েটার, ক্লাব, লাইব্রেরী, মিউজিয়াম,সংস্কৃতি মহাবিদ্যালয় প্রভৃতিও রয়েছে পর্যাপ্ত।

৬ই জানুয়ারী জানা গেল বৈঠকের আলোচনা পুরোদমে চলছে। খবরের জন্য অপেক্ষা করা ছাড়া বিশেষ কোন কাজ না থাকার সুবাদে সাংবাদিকরা বেরিয়ে পড়েন যে যার প্রয়োজনীয় কেনাকাটার জন্য। লেখক এক বই এর দোকানে গিয়ে দেখেন প্রচুর ভীড় সেখানে। তাছাড়া অন্যান্য সৌখিন অলংকার সামগ্রীর দোকানেও বেশ ভীড় দেখা গেল।

ভীড়ের কারণ সম্পর্কে দোভাষিণী ফয়া জানায় ১৯১৭ সালের সমাজতান্ত্রিক বিপ্লবের পরও সোভিয়েটবাসীকে বহু কষ্ট সহ্য করতে হয়েছে। বারবার বহিঃশত্রুর আক্রমন মোকাবেলায় কোটি কোটি প্রাণ বলি হয়েছে অকাতরে। তবু তাঁরা তিল তিল কষ্টে গড়ে তুলেছে তাদের স্বপ্নের সমাজতান্ত্রিক দেশ। আর এই দেশের সমাজব্যবস্থাকে তাঁরা এমন এক পর্যায়ে উন্নীত করেছে যেখানে জনসাধারণের সকল প্রকার আত্মিক ও বৈষয়িক চাহিদা মেটানোর কর্মসূচী বাস্তবায়িত হতে চলেছে।

জনসাধারণের জীবনযাত্রার মানোন্নয়নের কর্মসূচীকে অগ্রাধিকার দেয়া হয়েছে সর্বাগ্রে। সকলেরই আয় বাড়ছে এবং সকলের জন্যই পর্যাপ্ত পরিমান পণ্য সামগ্রীর যোগান দেয়া হচ্ছে। ফলে সর্বত্রই ভাঁড়ের চাপ চোখে পড়ে।
পরদিন তাঁরা তাসখন্দ থেকে ৩৫ মাইল দুরের একটি যৌথ খামার পরিদর্শনে যান। এই যৌথ খামার ব্যবস্থার মাধ্যমেই রুশ নবজীবনের শুরু হয়েছিল।

সেখানে পৌঁছতেই খামারের প্রেসিডেন্ট জনাব মাতকাবুলভ আবদুল জামিল ও অন্যান্য খামার কর্তারা প্রতিনিধি সাংবাদিকদের অভ্যর্থনা জানিয়ে তাঁদের প্রধান কার্যালয়ে নিয়ে যান। সেখানে তারা খামারের অর্থনৈতিক অবস্থাসহ বিভিন্ন কার্যক্রমের ওপর আগত অতিথিদের একটি সাধারন ধারণা দেন। কর্মকর্তারা জানান সভ্যদের প্রত্যেকের গড় পড়তা আয় সন্তোষজনক এবং ঐশ্বর্যে ভরপুর এই যৌথ খামারটির প্রতিটি সভ্যই পরিপূর্ণ সুখী।

দুপুরে খামারের নিজস্ব ভোজনালয়ে আহার এবং নানারকম গল্প-গুজব আর তরুণ-তরুণীর মনোরম নৃত্য পরিবেশনের মধ্যে দিয়ে প্রতিনিধিদল একটি আনন্দ উচ্ছল দিন উপভোগ করেন। বিকেলে হোটেলে নানা আলোচনার পর লেখক টেলিগ্রাফ অফিসের উদ্দেশ্যে বেরিয়ে রাতের তাসখন্দ নগরীকে আবিষ্কার করেন অন্যরূপে।

আকাশের উজ্জ্বল চাঁদ আর কুয়াশার মায়ায় ঘেরা তাসখন্দকে এক রহস্যময় স্বপ্নপুরীর মত মনে হয়েছিল তাঁর। কনকনে শীতের রাতেও ভীষণ ভালোলাগার আবহ তাঁকে ঠেলে নিয়ে গিয়েছিল গোর্কী স্ট্রীট, লেনিন এভিন্যু, আলীশের নভয় থিয়েটার, প্রশস্ত পার্ক প্রভৃতি দর্শনীয় জায়গায় ।

এদিকে ৮ই জানুয়ারী সাংবাদিকরা জানতে পারেন আলোচনা ক্রমশ জটিল আকার ধারণ করছে।কারণ বিরোধের মূল বিষয় কাশ্মীর নিয়ে কোন পক্ষই একটি সমঝোতায় আসতে পারছেন না। মিঃ কোসিগিন আন্তরিক এবং অক্লান্ত পরিশ্রম চালিয়ে যাচ্ছেন দু’পক্ষের মধ্যে একটি শান্তিপূর্ণ সমঝোতার। কাশ্মীরের একটা শান্তিপূর্ণ মিমাংসাই সোভিয়েটবাসীর একান্ত কাম্য ।

 

পেশোয়ার থেকে তাসখন্দ । শহীদুল্লা কায়সার

 

দুপুরে মেয়রের ভোজ এবং সন্ধ্যায় আলীশের নভয় অপেরার সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে অতিথিরা অংশগ্রহণ করেন। অনুষ্ঠানে ব্যালে ছাড়াও উজবেক লোক নৃত্য, পাকিস্তানী গান ও পাকিস্তানী নৃত্য তাঁদের মুগ্ধ করেছিল । আলীশের নভয় থিয়েটারের অপূর্ব সুন্দর স্থাপত্য রীতি ও এর প্রতিটি কক্ষে এশিয়ার এক একটি দেশের স্থাপত্যরীতির বিন্যাস ও সমন্বয় নৈপুন্যে প্রতিনিধিদল চমৎকৃত হন। মধ্য এশিয়ার অন্যতম শ্রেষ্ট কবি আলীশের নভয়ের নামে নির্মিত এই হলটিতে সমরকন্দ থেকে বোখারা, বদকশান থেকে তুর্কমেনিয়া সবই যেন ধরে রাখা হয়েছে।

৯ই জানুয়ারী পাক-ভারত শীর্ষ বৈঠকের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিন। পশ্চিমী সাংবাদিকদের মুখে মুখে ছড়িয়ে গেছে আলোচনা ব্যর্থ হয়েছে। তবু গোটা বিশ্বের শান্তিকামী মানুষ অন্তরে আশার আলো জ্বেলে রেখেছে শুভের মুখ দেখবে বলে। শীর্ষ বৈঠকের এহেন অবস্থায় আর কোন আলোচনার অবকাশ না থাকায় সাংবাদিক প্রতিনিধিরা সেদেশের ধর্মীয়ব্যাপার নিয়ে আলাপ শুরু করেন।

সোভিয়েট ইউনিয়নে ধর্মীয় স্বাধীনতা নেই বলে যে মিথ্যা প্রচার পশ্চিমী মহল করে থাকে এবং তা যে একেবারেই ভিত্তিহীন সে সম্পর্কে প্রেস প্রতিনিধিরা সকলেই একমত পোষণ করেন। কারণ তাঁরা সেদেশের মসজিদ মাদ্রাসা প্রভৃতি ধর্মীয় স্থানগুলো ঘুরে দেখেছেন এবং ঐ প্রপাগান্ডায় যারা বিশ্বাসী তাঁদের কথা ভেবে মর্মাহত হয়েছেন। প্রতিনিধিরা প্রজাতন্ত্রের বিভিন্ন জায়গায় গিয়ে বুঝতে পারেন সোভিয়েট রাষ্ট্র ধর্মনিরপেক্ষ রাষ্ট্র এবং ধর্মটা সেখানে নিতান্তই ব্যক্তিগত ব্যাপার।

দুপুরে তাঁরা যান এক চা-খানায়। তাসখন্দ নগরী আধুনিকতায় অনেকখানি এগিয়ে গেলেও প্রাচীন ঐতিহ্যকে তারা একেবারে বিসর্জন দেয়নি। আধুনিক হোটেল রেস্তোরা তৈরী হয়েছে ঠিকই তবে প্রাচীন চা- খানার সবগুলোকে তারা রেস্তোরায় পরিণত করেনি। গ্রীন-টি এবং লেবু চা পান করে থাকে উজবেক জাতি। দুধ চা তারা একেবারেই খায় না।

বিকেল ৪টার প্রেস ব্রিফিং এ পাক-ভারত উভয় দেশের মুখপাত্ররা ঘোষণা করেন প্রত্যেককেই ১১ই জানুয়ারী দুপুরের মধ্যে স্বদেশের দিকে রওনা দিতে হবে। এই কথাটুকুর মধ্যেই বৈঠকের পরিস্থিতির ব্যর্থতা প্রচ্ছন্ন হওয়ায় সকলের মুখেই বিষাদের ছায়া নেমে আসে।

কিন্তু পরদিন বেলা ১১টায় সিলকা ভিসনা থেকে আলতাফ গহরের ফোন পেয়ে প্রেস প্রতিনিধিরা সেখানে যান এবং তাঁদের সামনে পাক-ভারত যুক্ত ঘোষণার মূল বিষয়গুলো পড়ে শোনানো হয়। এবং তিনি আরও জানান মিঃ কোসিগিনের প্রচেষ্টায় সফল এই ঘোষণা “তাসখন্দ ঘোষণা” নামে অভিহিত হবে। সকলেরই মন আনন্দে উচ্ছল হয়ে উঠল। আর চক্রান্তকারীরা হল হতাশ। কারণ তাদের সকল হতাশাব্যাঞ্জক ভবিষ্যৎবাণীকে ব্যর্থ করে তাসখন্দ সম্মেলন সফলতা পেল; আর এটি তাদের জন্য হয়ে রইল এক চরম পরাজয়।

বিকেল ৪টায় উজবেক মন্ত্রীসভার দফতরে বিপুল করতালির মধ্য দিয়ে দু’দেশের নেতৃদ্বয় করমর্দন করেন এবং প্রধানমন্ত্রী মিঃ কোসিগিন তাঁদেরঅভিনন্দন জানান। পরে রুশ প্রতিনিধিদলের সেক্রেটারী ঘোষণাপত্র পড়ে শোনালে প্রেসিডেন্ট আইয়ুব ও প্রধানমন্ত্রী শাস্ত্রী তাতে স্বাক্ষর করেন। এবং তারা সাক্ষী হিসেবে স্বাক্ষর দেবার জন্য আমন্ত্রণ জানান মিঃ কোসিগিনকে। তুমুল করতালি ও হর্ষধ্বনির মধ্যে দিয়ে পৃথিবীর ইতিহাসে আর একটি নতুন অধ্যায় সূচিত হয়।

সন্ধার প্রেস ব্রিফিং শেষে লেখক ফিল্ম কেনার উদ্দেশ্যে তাসখন্দের রাস্তায় বেরিয়ে লক্ষ্য করেন সর্বত্রই। প্রচুর ভীড়। চুক্তির সাফল্যে সবাই উল্লসিত। স্বতঃস্ফুর্ত জনতার এই গণজমায়েত এই শুভকামনা কোন আরোপিত কিছু নয়, তাদেরই অন্তরের স্বতোৎসারিত অভিব্যক্তি। পাক-ভারত শাস্তির ব্যাপারে সোভিয়েটবাসীর তুমুল আগ্রহ ও উৎকণ্ঠার পেছনে যে কারণ রয়েছে; সেটি তাদের বিগত ইতিহাস।

১৯১৭ সালের নভেম্বর মাসে রুশ দেশের শ্রমিক শ্রেণী জারতন্ত্রকে উচ্ছেদ করে সোভিয়েট প্রজাতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করে। শুধু এটিই শেষ কথা নয়। এই জারতন্ত্র উচ্ছেদ প্রক্রিয়া হঠাৎ করেই সম্ভব হয়নি। বিপ্লবের বহু আগে থেকেই লেনিন ও তাঁর বিপ্লবী দল নতুন সমাজতান্ত্রিক সমাজগঠনের উদ্দেশ্যে যে নীতিগুলো ঘোষণা করেছিল সেই নীতিগুলোকেই তাঁরা পর্যায়ক্রমে কার্যকরী করে বাস্তবে।

তারা বহিবিশ্বের সাম্রাজ্যবাদী দেশগুলোর সাথে যুদ্ধ নয় শান্তির নীতি মেনে চলেন। কারণ তারা মনে করেন রাষ্ট্রে রাষ্ট্রে বিরোধ থাকতে পারে তবে রাষ্ট্রের জনগণের মধ্যে কোন বিরোধ থাকেনা। কাজেই অযথা যুদ্ধ করে নিরপরাধ মানুষ হত্যা নিতান্তই অযৌক্তিক এবং ক্ষমাহীন অপরাধ। তাই মানুষে মানুষে কল্যাণের নিমিত্তে তারা বেছে নিয়েছে যুদ্ধ নয় শান্তির পথ। এ কারণেই পাক-ভারত শান্তি চুক্তির ব্যাপারে তাদের এতটা আগ্রহ।

প্রধানমন্ত্রী কোসিগিন প্রদত্ত নৈশ ভোজ সভায় উপস্থিত হয়েছেন সবাই, প্রেসিডেন্ট আইয়ুব খান ও প্রধানমন্ত্রী শাস্ত্রী বসেছেন পাশাপাশি। রুশ শিল্পীদের পরিবেশিত পাকিস্তানী ও ভারতীয় নৃত্য তাঁরা উপভোগ করছেন পরস্পর বন্ধুসুলভ ভঙ্গিতে। সোভিয়েটদের মনমাতানো নাচ-গান এবং প্রাণঢালা অভিনন্দনের মধ্য দিয়ে রাত ১১টায় পার্টি শেষে নেতৃদ্বয় একে অপরকে বিদায় জানান।

ভোজ সভা শেষে লেখক হোটেলে ফিরে দেখেন এলাহি কান্ড! বিরাট খাবার ঘরটি লোকে লোকারণ্য; এদের কেউ খাচ্ছে কেউ পা ছড়িয়ে আড্ডা মারছে, কেউবা নাচছে। সকলেই প্রায় পরিচিত মুখ এই সম্মেলনের অতিথি। তাসখন্দ ঘোষণার সাফল্যে এরা সবাই উল্লসিত। হৈ হুল্লোড় শেষে চেনা মুখদের কাছ থেকে বিদায় নিয়ে যে যার কামরায় ফিরেছেন ঘুমনোর তাগিদে। লেখক সবেমাত্র উদ্যোগ নিয়েছেন বিছানায় যাবার হঠাৎই টেলিফোন বেজে উঠল খবর এল ভারতের প্রধানমন্ত্রী লাল বাহাদুর শাস্ত্রী পরলোক গমন করেছেন।

 

পেশোয়ার থেকে তাসখন্দ । শহীদুল্লা কায়সার

 

খবরটা এমনি আকস্মিক শোক ছিল যে বিশ্বাস করতে কষ্ট হচ্ছিল সবার। এদিকে প্রধানমন্ত্রীর বাসভবন থেকে চিকিৎসকদের সই করা বুলেটিন বেরিয়ে গেছে। এতে উল্লেখ করা হয়েছে প্রধানমন্ত্রী মিঃ কোসিগিন ভোজসভা থেকে সুস্থ দেহেই তাঁর বাসভবনে ফিরেছেন। শোবার আগে দিল্লীতে তিনি তাঁর স্ত্রীর সংগে কথা বলেন।

শোবার কিছুক্ষণ পরেই তিনি বুকে ব্যাথা অনুভব করেন এবং হৃদযন্ত্রের ক্রিয়া বন্ধ হয়ে মারা যান। সমস্ত তাসখন্দ নগরীতে শোকের ছায়া। এমন আকস্মিক দুর্ঘটনায় সকলেই বিমূঢ়। পরদিন বেলা সাড়ে ১১টায় তাসখন্দ বিমান বন্দরে মিঃ কোসিগিন ও প্রেসিডেন্ট আইয়ুব খান আপন স্কন্ধে করে শাস্ত্রীর মরদেহ বিমানে তুলে দেন। বেলা সাড়ে ১২টায় পাক-দল দেশের উদ্দেশ্যে বিমানে আরোহন করেন।

তিন

সমাজতান্ত্রিক দেশ সোভিয়েট ইউনিয়নের তাসখন্দ নগরীতে লেখক সপ্তাহখানেক অবস্থান করেছিলেন। উপলক্ষ যদিও পাক-ভারত নেতৃত্বের শীর্ষ বৈঠক তবু এরই ফাঁকে ফাঁকে তাঁর আগ্রহী মন সেদেশের জীবনধারা সম্পর্কিত নানা তথ্য সংগ্রহে তৎপর ছিল। তাঁর স্বল্প সময়ের অভিজ্ঞতার আওতায় মধ্য এশিয়ার রিপাবলিক তাসখন্দের যে চিত্রটুকু ধরা পড়েছে তা থেকেই সেখানকার বৈশিষ্ট্য এবং পাকিস্তানের সাথে সেদেশের সাদৃশ্য ও বৈশাদৃশ্যের ব্যাপারগুলো অনেকখানি স্পষ্ট হয়ে ওঠে।

সোভিয়েটবাসীর সময় সচেতনতার দিকটি প্রথমেই তাঁর দৃষ্টি আকর্ষণ করেছিল। সময়ের ব্যাপারে তারা যে কোন আবেগের উর্ধ্বে। বিষয়টি লেখক টের পেয়েছিলেন তাসখন্দ বিমান বন্দরেই দোভাষীণী আদেলার চরিত্রে। সময়কে তারা এত বেশী প্রাধান্য দেয় যে আর সব কিছু সেখানে তুচ্ছ হয়ে যায়। বিষয়টি উদ্ধৃতিতে আরও স্পষ্ট হবে।

বোধ হয় মিনিট দশেক অতিবাহিত হয়েছে। কয়েকজন ভদ্রলোক এসে বসলেন আমাদের টেবিলে। পরিচয় হল। মস্কোস্থ ভারতীয় রাষ্ট্রদূত মিঃ কাউল এবং কিসেন ভাটিয়া-সহ কয়েকজন ভারতীয় সাংবাদিক। ঘন্টা দেড়েক বাদেই ভারতীয় প্রধানমন্ত্রী মিঃ শাস্ত্রী আসছেন। তাই তাঁরা বিমান বন্দরে অপেক্ষা করছেন।

স্বভাবতঃই তাসখন্দ সম্মেলন নিয়েই কথাবর্তা চলল। মিঃ কাউল কফির অর্ডার দিলেন। কিন্তু আদেলা এসে এত্তেলা দিল, উঠে পড়। ভদ্রলোক কফির অর্ডার দিয়েছেন, কি করে উঠে যাই। ইতস্ততঃ করছি। কিন্তু আদেলা নাছোড়বান্দা, বলল, উঠে পড় নইলে এখানেই পড়ে থাকবে। ভারতীয় রাষ্ট্রদূত নিজের পরিচয় দিলেন এবং পাঁচ মিনিট আমাদের রেহাই দেওয়ার জন্য অনুমতি চাইলেন। আদেলার কাছে। কিন্তু কঠিন মেয়ে আদেলা। বলল, এদের (অর্থাৎ আমাদের) হোটেলে পৌঁছে দিয়ে আবার আমাকে ছুটতে হবে, অতএব নো। ২

লেখক বিশেষভাবে লক্ষ্য করেছিলেন মধ্য এশিয়ার দেশগুলোর সাথে বাঙ্গালী কৃষ্টির অনেকখানি মেলে। ঐতিহাসিক সূত্রে এই দেশগুলোর সাথে রয়েছে বাঙলার অবিচ্ছিন্ন যোগ। তুর্কী মোগলারা এসব দেশ থেকেই গিয়েছিলেন উপমহাদেশের বিভিন্ন জায়গায়। তাই এই দেশগুলোর রীতি-নীতি আচার আচরণের সাথে বাঙলার প্রচুর সাদৃশ্য লক্ষ্য করা যায়। ধর্মে, আহারে, পোশাকে ভাষায় এই মিল সর্বত্রই চোখে পড়ে।

তিনি একটি মজার ব্যাপার লক্ষ্য করেছিলেন রুশ দেশে দুপুরের খাবারকে ডিনার’ বলা হয়। এ শব্দটির সংগে বাঙ্গালীরা পরিচিত অন্যভাবে। ডিনার বলতেই বাঙ্গালীর চোখের সামনে ভেসে ওঠে রাতের খাবারের দৃশ্য। অথচ সেখানে এ শব্দের ব্যবহার ঠিক তার উল্টো। সেদেশের মোগলাই খাবারের সংগে স্বদেশের খাবারের কিছুটা সাদৃশ্য তাঁর চোখে পড়েছিল।
ঐতিহাসিক দিক থেকে পাক-ভারত উপমহাদেশের সাথে মধ্য এশিয়ার একটি যোগসূত্র থাকায় এদের মধ্যে সাংস্কৃতিক দিক থেকেও প্রচুর মিল লক্ষ্য করা যায়। রুশ দেশের লোকনৃত্যগুলোর সাথে লেখক উপমহাদেশের একটি প্রখ্যাত নৃত্যের সাদৃশ্য খুঁজে পেয়েছিলেন।

আলীশের নভয় থিয়েটারে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান চললো রাত প্রায় একটা পর্যন্ত। ব্যালে নৃত্যের আদি ভূমি রুশ দেশ। সে ব্যালে নৃত্য ছাড়াও উজবেকিস্তানে একাধিক লোক নৃতো, পাকিস্তানী গানে, পাকিস্তানী নৃত্যে রুশ ও উজবেক শিল্পীরা আমাদের তন্ময় করে রাখলেন কয়েক ঘন্টা। মধ্য এশিয়ার এই লোক নৃত্যগুলো বার বার মনে করিয়ে দেয় পাক-ভারত উপমহাদেশের বিখ্যাত কথক নৃত্যের কথা। কথক নৃত্যের সাথে অনেকগুলো উজবেক লোক নৃত্যের আশ্চর্য সাদৃশ্য চোখে পড়ে। ৩

অবসর ভোগের রেওয়াজ কমিউনিষ্ট সোভিয়েট দেশেও রয়েছে এটি লেখক জানতে পারেন একটি বিশ্বস্ত সূত্রে। তবে সেদেশের রাষ্ট্র প্রধান থেকে শুরু করে সাধারণ মানুষ পর্যন্ত সবার জন্য একই ব্যবস্থা মেনে চলা হয়। রাষ্ট্রপ্রধানের বংশধররা বিশেষ ব্যবস্থায় বড় হবে এমন কোন রীতি সেদেশে নেই। স্বদেশের প্রসঙ্গে লেখক বলেছেন উচ্চপদস্থদের সন্তান সন্ততিরা বিশেষ কষ্ট করে উচ্চশিক্ষা বা অন্যান্য আত্মিক উন্নয়নমূলক শিক্ষা গ্রহণ করেন না। পিতার উচ্চপদের গুণেই তাঁদের একটা হিল্লে হয়ে যায়।

সোভিয়েটদের সাথে বাঙ্গালীর দৃষ্টিভঙ্গিগত পার্থক্য খুব প্রকটভাবে চোখে পড়েছিল তাঁর। তাদের উচ্চাকাঙ্খার আদর্শগত দিকটির সাথে বাঙ্গালী আদর্শের দিকটি মেলে না কিছুতেই। বৈষয়িক সাফল্যের দিকে অবিরাম ছুটে ছুটে যে বাঙ্গালী আত্মিক সাফল্যের অমূল্য রত্নটি হারিয়ে ফেলে সোভিয়েটরা সে ভুল করেনা কিছুতেই। আত্মিক সম্পদ আহরণে রুশবাসীর আগ্রহ সমস্ত বৈষয়িকতাকে ছাপিয়ে ওঠে।

কমিউনিষ্ট সমাজের প্রধান বৈশিষ্ট্য যে প্রাচুর্য সেই লক্ষ্য অর্জনেও সোভিয়েটরা সাফল্যের শিখরে এগিয়ে গেছে। জনজীবন উন্নয়নের প্রক্রিয়াকে অব্যাহত গতিতে এগিয়ে নেবার লক্ষ্যে তারা ব্যাপক কর্মসূচী হাতে নিয়েছে। ফলে সমাজতান্ত্রিক আদর্শের ভিত্তি ক্রমশই জোরালো থেকে জোরালো হয়ে উঠেছে। তিনি শুনেছিলেন ১৯৭০ সালের মধ্যে সোভিয়েট ইউনিয়ন উৎপাদনের সকল ক্ষেত্রে পৃথিবীর সর্বাপেক্ষা ধনী রাষ্ট্র আমেরিকাকে ছাড়িয়ে যাবে।

 

পেশোয়ার থেকে তাসখন্দ । শহীদুল্লা কায়সার

 

লেখক বিশেষভাবে লক্ষ্য করেছিলেন রুশদেশে সৌখিন জিনিসপত্র এবং গরম ও সুতী কাপড়ের দাম তুলনামূলকভাবে পাকিস্তানের চেয়ে অনেক বেশী। তবে সেখানকার নিচুমানের কাপড়গুলোর দাম স্বদেশের মতোই। দেশের কৃষক শ্রমিক শ্রেণীর মৌলিক চাহিদা মেটানোর জন্য সস্তায় কাপড় বিক্রির রেওয়াজ রয়েছে সেদেশে। কিন্তু জীবন যাত্রার মান উন্নত হওয়ায় ক্রেতাদের চাহিদা থাকে বিলাস সামগ্রীর দিকেই।

তাসখন্দের সর্বত্রই অত্যাধুনিকতার ছাপ তার দৃষ্টি এড়িয়ে যায়নি। নাগরিকদের চাল-চলনে, আচার- ব্যবহারে, বিভিন্ন সৃষ্টিতে, শৈলীতে সর্বোপরি সমাজের সকল স্তরের সুশৃঙ্খল ব্যবস্থার সংগে মিশে আছে এই আধুনিকতা। তবে সেদেশের ঐতিহ্যগুলোকে একেবারেই বিসর্জন দেয়া হয়নি বরং সেগুলো আধুনিকতায় পুরোপুরি সম্পৃক্ত। তাসখন্দের পুরোনো শহরে আধুনিকতার ছোঁয়া না থাকলেও সেসব জায়গায় কোথাও কোন দৈনা নেই। নেই কোন অপরিচ্ছন্ন পরিবেশ। লেখক একটি জিনিস বিশেষভাবে লক্ষ্য করেছিলেন অতীতের নিপীড়িত জনতা বিপ্লবের পর নিজেদের রূপান্তরিত করেছে অন্য মানুষে। প্রতিষ্ঠা পেয়েছে তারা আজ সমাজের প্রতিটি ক্ষেত্রে।

ধর্মীয় ব্যাপারে সেদেশের রাষ্ট্রের কোন মাথা ব্যাথা নেই। ধর্মটাকে তারা ছেড়ে দিয়েছে ব্যক্তিবিশেষের উপর। যার ইচ্ছে সে ধর্মপালন করবে যার ইচ্ছে না হয় সে করবে না। অর্থাৎ আস্তিক এবং নাস্তিক উভয় শ্রেণীর নাগরিকদেরই এ ব্যাপারে রয়েছে পূর্ণ স্বাধীনতা। তবে ধর্ম নিয়ে বাড়াবাড়ি কোন কপট ভন্ডামী বা ধর্মব্যাবসার কোন সুযোগ সেখানে নেই। পশ্চিমা মহল সোভিয়েট ইউনিয়নে ধর্মীয় স্বাধীনতা নেই বলে যে অপপ্রচার চালিয়ে থাকে এবং বিশ্ববাসীকে বিভ্রান্ত করে তা যে একেবারেই ভিত্তিহীন লেখক সেদেশে গিয়ে ব্যাপারটি বেশ বুঝতে পেরেছিলেন।

সোভিয়েট ইউনিয়নে ধর্মীয় স্বাধীনতা নেই। সোভিয়েট ইউনিয়নের বিরুদ্ধে পশ্চিমা পুঁজিবাদী মহলের এই একটানা প্রচার আমাদের দেশের মানুষ শুনে আসছে সোভিয়েট বিপ্লবের পর থেকেই। পশ্চিমা পুঁজিবাদের এই অপপ্রচারে আমাদের দেশের অনেকেই বিভ্রান্ত। অনেকেই এই অপপ্রচার বিশ্বাস করে থাকেন। সোভিয়েটে ধর্মীয় স্বাধীনতা নেই এটা যে ডাহা মিথ্যা কথা সোভিয়েট ভূমিতে পদার্পন করলেই সেটা বুঝতে পারা যায়। ৪

আর একটি বৈশিষ্ট্য তাঁর চোখে ধরা পড়েছিল, রুশ জনগণের কর্মে ও নিষ্ঠায় রয়েছে অন্তরের যোগ । নেতা থেকে শুরু করে সাধারণ মানুষ পর্যন্ত প্রত্যেকেই তারা কঠোর স্থৈর্যে সংকটের মোকাবেলা করেন। তাদের নির্লোভ উদার নিরহংকার মন সকলেরই মুগ্ধ দৃষ্টি আকর্ষণ করে। তাদের হৃদয়মিশ্রিত অমায়িক ব্যবহার মানবজীবনকে করে তুলেছে সরল সুন্দর। কথায় এবং কাজে তাদের দু’রকম মন নেই। তারা যা বলেন অন্তর ঢেলেই সেটুকু করেন। ফলে কপটতা, ভন্ডামীর লেশমাত্র তাদের চরিত্রের কোথাও খুঁজে পাওয়া যায় না।

চার

শহীদুল্লা কায়সার ছিলেন শোষণের বিরুদ্ধে প্রতিবাদী কণ্ঠ। শোষিত মানুষের মুক্তির সমর্থক হিসেবে জীবনাদর্শের দিক থেকে তিনি ছিলেন সাম্যবাদী। মানুষের কল্যাণকামী চিন্তায় তাঁর অন্তর ছিল সবটুকু নিবেদিত। শুধুমাত্র আদর্শের তত্ত্বগত উপলব্ধির মধ্যেই তিনি নিজেকে সীমাবদ্ধ রাখেননি; ছড়িয়ে দিয়েছিলেন তাঁর কর্মপ্রবাহ সমাজের অন্ধ গলির আনাচে কানাচে।

একদিকে তিনি যেমন ছিলেন একজন আপোষহীন রাজনৈতিক কর্মী অপরদিকে তেমনি ছিলেন একজন জীবন শিল্পী। এই সংঘাতময় পৃথিবীতে মানুষকে ভালোবেসে মানব জীবনের বৈচিত্র্যময় ঘাটে ঘাটে নোঙ্গর করেছে তাঁর কল্যাণ তরী। তাঁর এই অকৃত্রিম ভালোবাসার উপরে যেন আর কোন কিছুই উঠতে পারেনি। আলোচ্য বই এর ভূমিকাতেই মানুষের প্রতি তাঁর গভীর মমত্ববোধের পরিচয়টুকু মেলে-

তাসখন্দ ঘোষণা সাফল্য অর্জন করতে পারে। ব্যর্থও যেতে পারে। বস্তুতঃ ব্যর্থতার একাধিক অমঙ্গল চিহ্ন সকলেরই চোখে পড়েছে। কিন্তু সফলই হউক আর ব্যর্থই যাক তাসখন্দ ঘোষণা অমর হয়ে থাকবে। বন্যা মহামারী এবং চিরন্তন খাদ্যাভাবে জর্জরিত এই পাক-ভারত উপমহাদেশে, সতের দিনের রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষে ক্ষত-বিক্ষত নর-নারীর নিকট জনগণের শ্রীবৃদ্ধি ও কল্যাণকামী চিন্তা এবং শুভবুদ্ধির অমলিন স্বাক্ষর হিসেবেই স্মরণীয় হয়ে থাকবে তাসখন্দ ঘোষণা।

তাসখন্দবাসীরা আজ প্রকৃতির বিরুদ্ধে সংগ্রামলিপ্ত। গত এপ্রিল থেকে জুলাই পর্যন্ত তিন তিনটি মারাত্মক ভূমিকম্পে পুরানো তাসখন্দ প্রায় ধ্বংসপ্রাপ্ত। যে সব রুশ ও উজবেক চরিত্র এ বইতে স্থান পেয়েছে প্রকৃতির রুদ্ররোষ তাঁদের জীবনে যে কি অবর্ণনীয় দুঃখ ডেকে এনেছে, তাঁরা বেঁচে থাকলে কিভাবে বেঁচে আছে সেটা জানি না। আজ তাঁদের কথাই বার বার মনে পড়ছে। ৫

একজন লেখকের জন্য গুরুত্বপূর্ণ হচ্ছে বিষয়কে নিজের অভিজ্ঞতার মধ্যে ধারন করা। পেশোয়ার থেকে তাসখন্দ’ লেখকের বাস্তব অভিজ্ঞতার ফসল। এ কাহিনীর উপস্থাপনা কল্পনা প্রসূত কিছু নয়। মূলত তাসখন্দ নগরীতে অনুষ্ঠিত পাক-ভারত নেতৃত্বের শীর্ষ বৈঠককে কেন্দ্র করেই এ কাহিনীর উদ্ভব।

 

পেশোয়ার থেকে তাসখন্দ । শহীদুল্লা কায়সার

 

পেশোয়ার থেকে যাত্রা শুরু এবং গন্তব্য তাসখন্দ এই পটভূমির বিস্তারে তিনি গ্রন্থের নামকরণ করেছেন ‘পেশোয়ার থেকে তাসখন্দ। আসলে বিষয়বস্তুর বিচারে বইটির নামকরণ অন্যভাবেও করা যেত। কারণ এই শিরোনামের মধ্যে নিহিত রয়েছে উপমহাদেশের এক অঞ্চলের পরিচয় অথচ ঘটনার বিস্তৃতি ছিল পাক-ভারত উপমহাদেশ থেকে মধ্য এশিয়ার দেশ অবধি।

সারবস্তু বিচারে নামকরণের সার্থকতায় ত্রুটি রয়ে গেলেও ভ্রমণ সাহিত্যের বিচারে এই নাম সার্থক । কারণ এতে রয়েছে ভ্রমণের একটি দীর্ঘ ভৌগোলিক পথপরিক্রমা এবং সেই সাথে জড়িত সভ্যতার ক্রমবিবর্তনের নানা ইতিহাস ও ঐতিহাসিক মানুষ। মূল বিষয় যদিও তাসখন্দ বৈঠক তারপরও একটি বিশাল অঞ্চল ইতিহাসের অমোঘ গ্রন্থিতে বাধা, সভ্যতার ধারার নিকট আত্মীয়তা সূত্রে নিবিড়ভাবে আবদ্ধ এ সত্য উদ্ঘাটন কম গুরুত্বপূর্ণ নয়।

অর্থাৎ শীর্ষ বৈঠকের বিষয়টিকে ঘিরেই অনাদি ইতিহাস, তাসখন্দের পরিচয়, সেদেশের জীবনধারার নানা অনুসন্ধানমূলক তথ্যের উদ্ভব। কাজেই বিষয় এবং বক্তব্যের পরস্পর নির্ভর সম্পূর্ণতা নেই বললে ভুলই বলা হবে।

তাঁর বর্ণনাভঙ্গি কোথাও আড়ষ্ঠ নয়, কুণ্ঠিত নয়, অস্পষ্ট নয়। ঝরঝরে ভাষা ব্যবহারে, প্রকাশভঙ্গির ঋজুতায়, ভাষার সাবলীল গতিময়তায় তিনি প্রশংসার যোগ্য। তাঁর সচল সুন্দর আন্তরিক বর্ণনভঙ্গি পাঠককূলকে সহজেই কাছে টানে। তবে একটি ব্যাপারে লেখক বেশ সতর্ক ছিলেন। তাঁর খোলামেলা প্রকাশরীতিতে যাতে ভুল বোঝাবুঝির কোন অবকাশ না থাকে সে ব্যাপারে তিনি বেশ যত্নবান ছিলেন। কিন্তু সত্যি প্রকাশে তিনি ছিলেন নিঃসংকোচ।

ছোট মিকোয়ানের সাথে আলাপ হলো। তাঁর বাবা মিঃ আনতাস মিকোয়ান কিছুদিন আগ পর্যন্তও সোভিয়েট ইউনিয়নের রাষ্ট্রপ্রধান পদে অধিষ্ঠিত ছিলেন।

জিজ্ঞেস করলাম, আপনার বাবা এখন কি করছেন ? কোথায় থাকেন ?

এইধরণের প্রশ্নে ছোট মিকোয়ান যে অভ্যস্ত তা বুঝলাম তাঁর হাসি দেখে।

তিনি কৌতুক মিশিয়ে হাসলেন এবং বললেন, বাবা অবসর ভোগ করছেন। থাকেন মস্কোতেই। বর্তমানে একটি বই লেখায় হাত দিয়েছেন।

এসব ক্ষেত্রে পুঁজিবাদী প্রেস যে ধরণের ইঙ্গিত করে আমি তাতে বিশ্বাস করি না, একান্ত কৌতূহল বশতঃই আমি প্রশ্নটা করেছি, আপনি কিছু মনে করবেন না, ছোট মিকোয়ানকে আশ্বস্ত করার জন্যই বললাম।

ছোট মিকোয়ান এবার সত্যি সত্যি লজ্জা পেলেন। মিকোয়ান জর্জিয়ান। আর জর্জিয়ান মানেই সুন্দর। অনিন্দ দেহ সৌষ্ঠব। সুন্দর ত্বক।

না না, কি যে বলেন! বলতে বলতে ছোট মিকোয়ানের ফর্সা মুখটা বার বার রাঙ্গিয়ে উঠল।

ওর লজ্জাটা যে অহেতুক সেটা আর একবার প্রমাণ করার জন্য বললাম, বৃদ্ধ বয়সে অবসর গ্রহণ করাটা বুর্জোয়া গণতন্ত্রের রেওয়াজ হলেও এটা একটি ভাল রেওয়াজ। সমাজতান্ত্রিক গণতন্ত্র এই রেওয়াজটা গ্রহণ করে ভাল করেছে বলেই আমি মনে করি। নিয়ম হিসেবে এটাকে আরও আগে সোভিয়েট ইউনিয়নে চালু করলে হয়তো বহু অঘটন থেকে রেহাই পাওয়া যেতো। ৬

কাহিনীর স্বল্প পরিসরে তাঁর বক্তব্য সম্পূর্ণ এবং পটভূমির বিস্তারে বিধৃত হয়েছে একটি বিশাল অঞ্চলের প্রগাঢ় সখ্যতা ও ক্রান্তিকালের ঘটনা প্রবাহ। আর এই বর্ণনা নিসর্গের রূপটিতে যেমন সমর্পিত, তেমনি নিসর্গ মানুষ ও সভ্যতার সম্পর্কের বিস্তারেও প্রতিফলিত ।

মাথার উপর দুপুরের উজ্জ্বল সূর্য। নিচে বরফ ঢাকা পর্বতমালা। সূর্য কিরণে চিকচিক করছে বরফ ঢাকা পর্বতের মাথা রূপোর মূকুটের মতো।

এ পর্বতমালা অতি পরিচিত। এ পর্বত শ্রেণীর অভ্রভেদী চূড়োডিঙ্গিয়ে, পাথুরে রুক্ষতার বুক চিরে, দুর্গম উপত্যকার কোল ভেঙে পথ কেটেছে পৃথিবীর কত বিস্ময়কর সভ্যতা। গান্ধার থেকে তাকলা মাকান। তাসখন্দ থেকে পুস্কলাবতী। ছোটবেলায় ইতিহাসের বই হাতে নিয়েই পরিচয় হয়েছে মহাকালের নীরব প্রহরী এই পর্বতমালার সাথে।

আমরা উড়ে চলেছি সেই পথের উপর দিয়ে অনাদিকাল থেকে যে পথ স্পন্দিত হয়েছে সভ্যতার আনাগোনায়, বৌদ্ধ শ্রমণ শ্রমণার মন্ত্রগুঞ্জনের, তদবীরের উল্লাস ধ্বনিতে। ককেসাসের পাদপীঠ থেকে সভ্যতার প্রথম মানুষ যে পথ ধরে নেবে এসেছে, ছড়িয়ে পড়েছে মধ্যে এশিয়ায় পামীরের মালভূমিতে, হিন্দুকুশের দুর্গম গুহা পথে, হিমালয় ডিঙ্গিয়ে মিলিত হয়েছে হরপ্পা- মোহেনজোদাড়োর উত্তরাধিকারীদের সাথে। এ পথ কালের সাক্ষী। এ পথ ইতিহাসের নাট্যমঞ্চ।

কাবুল কান্দাহার হিরাত তাল বাদকসান। কাসগর থিবা সমরকন্দ বোখারা তাসখন্দ। আম দরিয়া, সির দরিয়া। ইরানী, তুরানী, তুর্কি, তাতার, তাজিক, উজবেক, মঙ্গোল । কত জাতির উত্থান-পতনে মুখরিত মধ্য এশিয়ার এই বিচিত্র ভূমি। আর সেই ঐতিহাসিক নামগুলো। বাবর, চেঙ্গিজ খান, তৈমুর লঙ্গ, আলীশের নভয়, ওমর খৈয়াম, ইবনে সিনা। নাসিরুদ্দীন খোজা। বীরত্বে, মহত্বে, হিংস্রতায়, বর্বরতায়, জ্ঞানে-বিজ্ঞানে, অনুপম শিল্পকলা আর সৃষ্টি-বৈচিত্রো এমন সংঘাতময় দেশ পৃথিবীতে আর কোথায় আছে !

মনোরম কাহিনী পরিবেশন তাঁর রচনার আসল উদ্দেশ্য নয়। ঘটনা ও চরিত্র বিশ্লেষণের মধ্যে দেশ কাল ও সমাজবাস্তবতার অন্তর্নিহিত তাৎপর্য তুলে ধরাই এ রচনার বৈশিষ্ট্য। রুশ দেশের মানুষ ও সেদেশের ইতিকথা ও পরের কথা তাঁর শৈলীতে যেভাবে রূপায়িত হয়েছে সেক্ষেত্রে তিনি সার্থক।

কিন্তু কালের চাকা ঘুরছে। ইতিহাস নতুন মোড় নিয়েছে। তৈমুর লঙের প্রাসাদে আজ হেরেম নেই। তৈমুর লঙের সমাধি সৌধ আজ কালের নিঃশব্দ সাক্ষী হয়ে দেখছে সমরকন্দে আজ ট্রাক্টরের ভীড়, চিমনীর ধূয়াঁ। তৈমুর লঙের বালাখানা আজ যাদুঘর। বাবরের জন্মভূমি আজ দেখছে বোখারা তাসখন্দে আর গুপ্ত ঘাতকের খড়গ উদ্যত হয় না। আমীর ওমরাহদের শোষণ আর নির্যাতনের অবসান হয়েছে চিরদিনের জন্য।

বাবরের দেশে আজ শ্রমজীবি মানুষের রাজত্ব কালের চাকা ঘুরেছে ১৯১৭ সালের অক্টোবর মাসে যখন রুশদেশের শ্রমিক শ্রেণী জারতন্ত্রের উচ্ছেদ করে সোভিয়েট শাসন প্রতিষ্ঠা করেছে, দুনিয়ার বুকে প্রথম সমাজতন্ত্রের পতাকা উড়িয়েছে। লাল ফৌজের সাথে মিলিত হয়ে তাসখন্দ বোখারা সমরকন্দের বিপ্লবীরা আমিরী শাসন ও শোষণের মৃত্যু-ঘন্টা বাজিয়েছে। ৮

তাঁর বাক্যবিন্যাস সরল অথচ গভীর এবং সংহত। আনন্দে বিপদে তিনি চিৎকার করে ওঠেননি কোথাও। এ সংক্রান্ত নিদর্শন গ্রন্থের সর্বত্রই ছড়িয়ে আছে। ভারতের প্রধানমন্ত্রী লালবাহাদুর শাস্ত্রীর আকস্মিক মৃত্যু সংবাদ তাঁকে কতটুকু আহত করেছিল সে শোক গভীর হয়ে উঠেছে তাঁর সংক্ষিপ্ত সংলাপে-

ঘুমের উদ্যোগ করছি। হঠাৎ বেজে উঠল টেলিফোন। বিস্মিত হলাম। এই শেষ রাত্রে এই তাসখন্দ শহরে কে আমাকে টেলিফোন করবে ? রিসিভারটা কানের কাছে এনে নির্বাক হলাম।

 

পেশোয়ার থেকে তাসখন্দ । শহীদুল্লা কায়সার

 

ভারতের প্রধানমন্ত্রী লাল বাহাদুর শাস্ত্রী পরলোক গমন করেছেন। অবিশ্বাস্য কথা। মাত্র কয়েক ঘন্টা আগে যে লোকটা নাচ দেখল, গান শুনল, স্বাভাবিকভাবে কথা বলল, সে লোকটা এখন এই পৃথিবীতে নেই ?

হোটেলের রিসিপশন থেকে খবরটা দিচ্ছে। শুধালাম, ভুল করছেন নাতো ? আপনি ঠিক শুনেছেন!

একটু আগেও তো প্রধানমন্ত্রী কোসিগিনের দাওয়াতে তাঁকে দেখলাম। তিনি সুস্থ স্বাবাভাবিক।

উত্তর এলঃ ঠিকই বলছি। প্রধানমন্ত্রীর বাসভবন থেকে বুলেটিন বেরিয়েছে। চিকিৎসকদের সই করা বুলেটিন।৯

পেশোয়ার থেকে তাসখন্দ’ গ্রন্থটি আপাতদৃষ্টিতে তাসখন্দ বৈঠকের রোজনামচার পর্যায়ভুক্ত হলেও এটি নিছক একটি রোজনামচা নয়। সত্তর এর দশকের একটি ঐতিহাসিক ঘটনা ‘তাসখন্দ বৈঠক’ এবং এর সংগে গ্রথিত হয়েছে মধ্য এশিয়ার অতীত বর্তমান সহ সেদেশের মানুষের জীবনধারা, তাঁদের উদারনীতি ও সর্বান্তকরণে বিশ্বের শোষণ মুক্তির উদগ্র কামনা ও ভ্রমণের অনাদি ইতিহাস। সে বিচারে তাঁর এ রচনা নিঃসন্দেহে ভ্রমণ-কাহিনীর আওতাভুক্ত এবং তা আগ্রহী পাঠকের প্রত্যাশা পূরণ করেছে।

Leave a Comment