পুরুষ চরিত্র পর্ব ২

আজকে আমাদের আলোচনার বিষয়ঃ পুরুষ চরিত্র পর্ব ২। যা মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের পাঁচটি উপন্যাসে জীবন ও সমাজ এর মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের উপন্যাস জীবন এর অন্তর্গত

 

পুরুষ চরিত্র পর্ব ২

 

পুরুষ চরিত্র পর্ব ২

‘অহিংসা’ আশ্রমকেন্দ্রিক উপন্যাস। আশ্রমের সাধু সদানন্দ। প্রথম সদানন্দের পরিচয় পাওয়া যায় এভাবে:

“এবার যে দিন প্রথম রাধাই নদীর বুকে স্রোত দেখা দিল, সে দিন অহিংসা ও প্রেমের কথা বলিতে বলিতে সদানন্দ হঠাৎ আনমনে চুপ করিয়া গেল। নদীর স্রোতের দিকে পলকহীন চোখে এমনভাবে চাহিয়া রহিল যে, কারও বুঝিবার উপায় রহিল না, অন্যমনস্ক সে ইচ্ছা করিয়া হইয়াছে।” (৩খ, পৃ.-২৭৭)

সদানন্দ সাধু এমনি করেই সকলের চোখে ধুলো দেয়, বিপিন তাকে আড়াল করে রাখে। আশ্রমটি মূলত বিপিনের, সে তার বন্ধু সদানন্দকে আশ্রমের সাধু বানিয়েছে। আবার শিষ্যত্ব বজায় রাখার জন্য সে সকলের সামনে এবং আড়ালে সদানন্দকে প্রভু বলে সম্বোধন করে। সদানন্দ বিপিনের কাছে এ সুযোগও মাঝে মাঝে গ্রহণ করে। এতে দুজনের ঝগড়াও কম হয় না, দুজনের আবার মিলও হয়ে যায়। তারা দুজনেই বাইরের ঠাঁট বজায় রেখে চলে।

সদানন্দ প্রেম ও অহিংসার বাণী প্রচার করে। তার কথা সকলে তন্ময় হয়ে শোনে “যার কথা মনের মধ্যে কাঁটার মতো বেঁধে, মধুর মতো মাথা হইয়া যায়, মধুপের মতো গুঞ্জন করে, শুনিতে শুনিতে থাকিয়া থাকিয়া হয় রোমাঞ্চ, ….. …]” (4,7-299)

তার সম্পর্কে সকলের মনোভাব এরকম

“রাগ কি সদানন্দের আছে? শান্তি কি কারোকে সে দেয়? মায়া কি তার হয়? শুধু তাকে দর্শন করিয়া আর দর্শনের ব্যাখ্যা শুনিয়া কে তা অনুমান করিতে পারিবে।” (৩খ, পৃ. ২৭৮)

সদানন্দ নিজের অস্তিত্বকে জোরদার করার জন্য শতরঞ্জি ঘোড়া ভদ্রলোকের ভিড়ে, এককোণে মাটিতে বসা সাতুনার মূর্খ দোকানদার বলাইকে সম্বোধন করে জিজ্ঞাসা করে ‘নদীতে এবার অনেক আগেই জল এলো’। অধ্যাত দোকানদার বলাই যে এসেছে তা-ই কেউ লক্ষ করে নি কিন্তু সকলে দেখলো সদানন্দের কাছে কোনো বিভেদ নেই, সকলেই সমান। সকলের দিকে তার সমান দৃষ্টি। এভাবেই বুদ্ধির জোরে ছোট ছোট কথা এবং কাজের মাধ্যমে সে সকলের কাছে অবতার হয়ে থাকে।

মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় সদানন্দ চরিত্রটি যৌন বিকারমূলক একমুখী একটি চরিত্র অংকন করেছেন। ধর্মীয় আবরণে ঢাকা একটি ভণ্ড মানুষ সে। তার চারদিকে খোলস তুলে রেখেছে বিপিন। এক যুগেরও বেশি সে নারীবর্জিত। লোকে তাকে ভক্তি করে, ভর করে, ভালোবাসে। আশ্রমে অনেক লোকসমাগম হয়। আশ্রমের পরিধিও আস্তে আস্তে বৃদ্ধি পায়। সবই বিপিনের বুদ্ধিতে সদানন্দকে ঘিরে।

সদানন্দ নিজের অস্তিত্ব সম্পর্কে সচেতন। শুভদের কাছে সে সাধুবাবা হলেও বিপিনের ওপর প্রকাশ্যে হুকুম জারি করে নিজের কর্তৃত্ব ফলায়। দর্শনকারী মেয়েদের গায়ে রোদ লাগে, বিপিনকে আগে থেকে বলে ছায়ার ব্যবস্থা করা যেত, কিন্তু সকলের সামনেই সে বলে: “মেয়েদের গায়ে রোপ লাগছে বিপিন।” (তখ, পৃ. 298 )

সকলের ভক্তি দেখেও সদানন্দের মন ভরে না। বিপিনের ওপর কর্তৃত্ব ফলিয়ে নিজের অস্তিত্বের জানান দেয় সে। পালকিতে করে সকল সময় মহীগড়ের রাজা আশ্রমে আসে। পালকি এসে সদানন্দের কুটিরের সামনে থামলে সদানন্দের কথা বন্ধ হয়ে যায়। বিপিন তাকে বলে, রাজা সাহেব দর্শন লাভ করতে এসেছেন। সদানন্দ রাজা সাহেবকে চালাঘরে আসতে বলে, সকলের সঙ্গে। সে রাজা-প্রজাকে একসঙ্গে দেখতে চায়। আশ্রমে সকলের সমান অধিকার প্রতিষ্ঠা করে সদানন্দের অস্তিত্বশীল হওয়ার এ এক নতুন প্রক্রিয়া:

“সদানন্দের আকস্মিক বিদ্রোহ বিপিন প্রত্যাশা করে নাই, মুখে অনেকগুলি রেখা সৃষ্টি করিয়া সে চাহিয়া রহিল। হোক গুরুদক্ষিণা, আশ্রমের ভূমি তো রাজাসাহেবের দান, নিজে সে আশ্রমে পায়ের ধুলা দিয়াছে তাই কি যথেষ্ট নয়? তার প্রজাদের এই আসরে তাকে ডাকিয়া আনার তো কোনো মানে হয় না। যার কলমের এক খোঁচায় আশ্রম উঠিয়া যাইতে পারে, সে শিষ্য হইলেও তাকে একটু, খুব সামান্য একটু খাতির করিলে দোষ কী?” (৩খ, পৃ. ২৮০ )

পরিস্থিতি বুঝে সদানন্দ বারবার এরূপ নিজের উদ্ধত্যও প্রকাশ করে। সে কোনভাবে বিপিনকেও বরদাশত করে না। বিপিন রাজপুত্র নারায়ণকে নিয়ে সদানন্দের ঘরে এসে জানায়, রাজপুত্র একটি নিরাশ্রয় মেয়েকে আশ্রমে ভর্তি করতে এসেছেন।

সদানন্দ তাদের বসবার সুযোগ না দিয়ে মেয়েটির ব্যবস্থা করে দিতে বলে এবং তাদের চলে যেতে বলে। তাদের তাড়িয়ে দিচ্ছে দেখে নারায়ণের সামনে যাতে দোষ না হয়, তাই সে ‘আসনে বসবে কিনা জিজ্ঞাসা করে বিপিন। এবারও সে নিজের কর্তৃত্ব প্রকাশের জন্য বলে

“যেতে বললাম যাও না বিপিন, আমায় একটু একা থাকতে দাও।” (তখ, পৃ.-২৮৩) বিপিনের বুদ্ধি আর তীক্ষ্ণতার কাছে সদানন্দ এতটাই পরান্ত যে মাঝেমধ্যে সকলের সামনে বিপিনের ওপর কর্তৃত্ব ফলিয়ে সে কিছুটা স্বস্তি নিতে চায়। একযুগ পরে একটি নারী দেহের স্বাদ গ্রহণ করে তা গোপন রেখে সদানন্দ বিপিনকে দোষ দেয় এভাবেঃ

“বড়লোকের পা চাটা আর টাকা রোজগারের ফন্দি আঁটবার জন্য কি আশ্রম করেছিলি বিপিন? তা হলে ব্যবসা করলেই হত।” (৩খ, পৃ. ২৮৫)

এসব বলে সদানন্দ নিজেকে তোষামোদী এবং লোভ থেকে মুক্ত প্রমাণ করতে চায়। সে বিপিনকে বলে তার মনের শান্তি নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। বিপিনের যদি টাকার এতো লোভ হয়, তাহলে সে থাকুক তার টাকা নিয়ে, সদানন্দ চলে যাবে। সদানন্দ বিপিনের কাছে আদর্শের কথা বলে।

যে মহৎ উদ্দেশ্যে আশ্রম করা হয়েছিলো তা বাদ দিয়ে বিপিন শুধু টাকার পেছনে ছুটছে, এরূপ আচরণ সদানন্দের পছন্দ নয়। টাকা অনেক হয়েছে এবার টাকার চিন্তা বিপিনকে সে বাদ দিতে বলে। সে যে একটি অসহায় মেয়ের কুমারীত্ব নষ্ট করে এসেছে কিছুক্ষণ আগে, তা যেন তার মনে থাকে না, সে বিপিনকে বড় বড় আদর্শের কথা শোনায়।

সদানন্দ ধর্মের আবরণে নিজেকে জড়িয়ে রেখে কৌশল আর ভণ্ডামির মাধ্যমে নিজেকে সকলের কাছে সাধু করে রাখে। রাধাই নদীতে জল আসার ব্যাপারে জনশ্রুতি রয়েছে যে চারবাদল নামলে মরা নদীটিতে জল আসে। শ্রীধর সদানন্দকে উদ্দেশ্য করে সে কথা বলে। সদানন্দ তখন স্ত্রী-পুরুষ নির্বিশেষে সকলকে তিরস্কার করে বলে:

“এ সব ধারণা পোষণ করা কেন, এ ধরনের সব কুসংস্কার? সাধুজির স্নেহমধুর আবেগভরা ধমক শুনিয়া মনে হয় আর যে সব কুসংস্কার তাদের আছে সে সব যেন কিছু নয়; এটাই তাদের কুসংস্কারের চরম।” (৩খ, পৃ. ২৭৯)

এরপর সদানন্দ শুষ্ক নদীতে স্রোত দেখা দেওয়ার কারণ ব্যাখ্যা করে; তারপর আসে রহস্যময়ী প্রকৃতির আসল রহস্যের কথা। মানুষ মুগ্ধ হয়ে তা শোনে। অত্যন্ত কৌশলে কথা বলে এবং পদক্ষেপ ফেলে সদানন্দকে একেকজনের আস্থা অর্জন করতে হয়; কারো কৌতূহল এবং সংশয়ের অবসান ঘটাতে হয়। নিজেকে সাধু প্রমাণ করতে হয়। মাধবীলতাকে ধর্ষণ করে পরে আবার তার আস্থা অর্জন করা সহজ নয়। তবে যেহেতু সে ঘর ছেড়ে এসেছে, তাই তাকে আয়ত্তে আনার জন্য সে ধর্মীয় অনুভূতি নয়, মাধবীর জীবনের ভালো-মন্দের কথা বলতে শুরু করলো:

“এমন কাজ কেন করলে মাধবী, কেন বাড়ি ছেড়ে এলে? দুদিন পরে নারাপ যখন তোমাকে ফেলে পালাবে কী করবে তখন তুমি? সমস্ত জীবনটা নষ্ট করে ফেলেছো, নিজের একটু ভুলের জন্য, এমন ছেলেমানুষি করে?” (৩খ, পৃ.-২৮৬)

 

পুরুষ চরিত্র পর্ব ২

 

এতে অল্পবয়সী মাধবীলতা অনাগত ভবিষ্যৎ চিন্তায় বিভোর হয়ে ওঠে। সে পেট-কাপ সদানন্দের দিকে ছুড়ে মেরেও সদানন্দের কোলে মুখ রেখে কাঁপতে থাকে। এরপর মাধবীকে সদানন্দ আশ্রমের অন্য মেয়েদের কাছে দিতে যায়। আশ্রমে এই বয়সী মেয়ের আবির্ভাবে উমা সন্দিহান হয়ে ওঠে। সন্দিগ্ন দৃষ্টিতে মাধবীলতার দিকে তাকায়। সদানন্দ তখন মেরুদণ্ড সোজা করে দেবতার মতো বসেছে। তার ডান হাতের তালুতে বাঁ হাতের তালু, আনন্দ বেদনা

অতীত ধীরস্থির বিকারহীন সংহত ও সচেতন “বজ্রগম্ভীর ধমকের আওয়াজে সদানন্দ বলিল, তুমি কি ভাবছো উমা?” (তখ, পৃ- ২৮৮)

তখন উষা সদানন্দের পায়ে লুটিয়ে পড়ে। উমার দেহ থরথর করে কাঁপে। সে প্রলাপ বকতে থাকে। তার মনে হয়
“গুরুদেবের সম্বন্ধে অন্যায় কথা মনে আসিয়াছে; গুরুদেব সঙ্গে সঙ্গে তাহা জানিতে পারিয়া ক্ষুব্ধ হইয়াছেন। এ কী আকস্মিক সর্বনাশের সূচনা।” (তথ, পৃ. 288)

এমনি করে সদানন্দ উমার মনের ঝঞ্জাল পরিষ্কার করে দেয়। আবার মাধবীকেও ভীত করে তোলে। এই ধরনের ভণ্ডামি করেই সদানন্দ জীবনযাপন করে। বাংলা সাহিত্যে মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় একটি নতুন দিকের সূচনা করলের
“শরৎচন্দ্র-তারাশঙ্করের ধারায় আখড়া-আশ্রম ইত্যাদি নিয়ে যুক্তির চেয়ে ভক্তিকে বড়ো করে যে সাহিত্য ধারা তৈরি হচ্ছিল, মানিকের ‘অহিংসা’ উপন্যাসে সেই ধারার বিরোধিতা দেখা গেল।

এখানে সাধু-সন্ন্যাসী শ্রদ্ধার উপযুক্ত নয়, তারা একটি ফাঁকির ওপর দাঁড়িয়ে আছে। মহেশ চৌধুরি সদানন্দের চরণদর্শনের জন্য জেদ ধরলে মুমূর্ষু মহেশ চৌধুরিকে মাধবী নিজেই বুদ্ধি করে সদানন্দের কাছে নিয়ে আসে। সদানন্দ তখন মহেশ চৌধুরির ওপর প্রচণ্ড খেপে যায়। মাধবীর চেষ্টা ব্যর্থ হচ্ছে দেখে সে কেঁদে ফেলে। মাধবীর কান্না দেখে সদানন্দ মহেশ চৌধুরিকে বলে যে সে মহেশ চৌধুরিকে পরীক্ষা করছিলো। সে আরো ভণ্ডামি করে বলে।

“আমি সব জানি মহেশ, তুমি আসবার একমুহূর্ত আগে আমি আসন ছেড়ে উঠেছি। দরজা বন্ধ ছিলো, তুমি আসবে বলে দরজা খুলে রেখেছি। তোমার দেখে রাগের ভান করেছিলাম, আমায় না জানিয়ে কেউ কি আমার কাছে আসতে পারে মহেশ? এখন বাড়ি যাও, ক’দিন বিশ্রাম করে আমার সঙ্গে এসে দেখা করো। দেখি তোমার প্রার্থনা। পূর্ণ করতে পারি কি না?” (৩খ, পৃ. ৩১০ )

পরবর্তীতে মহেশ চৌধুরি যখন বিভূতি আর মাধবীকে নিয়ে আশ্রমে আসে তখন সদানন্দ তাদের সামনে এলে মহেশ চৌধুরি তাকে প্রণামও করে। কিন্তু বিভুতি কিছুতেই পায়ে হাত দিয়ে প্রণাম করতে চায় না। সদানন্দ বলে ওর প্রণাম পাওয়ার জন্যে সে ব্যাকুল নয়। তখন মহেশ চৌধুরি বলে সদানন্দেরতো কিছু আসবে যাবে না, কিন্তু বিভূতির সর্বনাশ হবে।

সদানন্দ মহেশ চৌধুরিকে অভয় দিয়ে বলে, ভয় নেই ওর কিছু হবে না। সে প্রণামের বিনিময়ে আশীর্বাদ বিক্রি করে না। আশীর্বাদ করা তার ব্যবসা নয়। ছেলেমানুষের কথার যদি সে রাগ করে, তবে যে সে আরো বেশি ছেলেমানুষ হয়ে যাবে। এ কথায় মহেশ চৌধুরির শ্রদ্ধা আরো বেড়ে যায়।

সে সদানন্দের প্রতি গদগদ হয়ে তাকে দেবতা বলে সম্বোধন করে। অন্যদিকে মহেশ চৌধুরির বাড়ি ত্যাগ করে পুনরায় আশ্রমে ফিরে এসে প্রথম দিন দর্শনার্থীদের দিকে তাকিয়েই সকলকে অপদার্থ করে দেয়। জনগণ এই দিন বেশি ভাবপ্রবণ হয়ে ওঠে। অনেকের মনে হয় কথা শুনতে শুনতে তার পায়ে মাথা খুঁড়ে মরে যাবে। প্রণামী দিতে গিয়ে দু-একজন আছড়িয়ে পড়ে। প্রথমজনকে সদানন্দ বলে:

“উঠে বসো। তিন মাস মাছমাংস মেয়েমানুষ ছুঁয়ো না। এবার যাও, যাও। দ্বিতীয়জনকে সংক্ষেপে বলিলঃ পাঁচ বছরের মধ্যে তুমি আমার কাছে এসো না।” (৩খ, পৃ. ৩৬৭)

অনেকে এতে সম্মোহিত হলো, তবে শ্রীধর বললো- ঠাকুরমশায় বদলে গেছেন।’ সদানন্দ ধর্মের খোলসে থাকা রক্ত-মাংসের মানুষ। মাধবী আসার প্রথম দিনেই এর প্রমাণ পাওয়া যায়। শুধু তার বলবার কৌশলের কারণে আশ্রমে গণজমায়েত হয়। দুর্বোধ্য কথাগুলো তারা জলের মতো সহজভাবে বুঝতে পারে। কী বুঝেছে সেটা কেউ ভাবে না, শুধু ভাবে যে তারা জীবন বোধের কথা, প্রেমের কথা, অহিংসার কথা বুঝতে পেরেছে।

এই ধারণার উন্মাদনায় তারা বিভোর হয়ে থাকে। কিন্তু সদানন্দের নিজের মনে শান্তি নেই। তার ভিতরে এক অস্থিরতা ক্ষোভ আর আকস্মিক ক্রোধের সঞ্চার হয়। তার নিজের কুটিরও তার ভালো লাগে না। প্রকৃতির মায়ায় সে দিশেহারা হয়ে ওঠে। আশ্রমে মাধবীর প্রথম আগমনের দি নিজের ইচ্ছের বিরুদ্ধে সে কুটিরে ঢুকে মাধবীকে দেখতে পায়। মাধবী মদ্যপ অবস্থায় সদানন্দের গলা জড়িয়ে ধরলে সদানন্দ তাকে ঠেলে ফেলে দিয়ে ঘরে চলে যায়।

পরবর্তীতে এই মাধবীই তার সমস্ত জীবন নিয়ন্ত্রণ করে। সঙ্গে মাধবীকে স্থায়ীভাবে আশ্রমে রাখার জন সচেতনভাবে চেষ্টা করে। রাজপুত্র সম্পর্কে মাধবীর মনে সংশয় এনে দেয়। তারপর দুজনকে একটু নির্জনে আলাপ করতে দেয়। সদানন্দ জানে এ সময় দুজনের কোনো বোঝাপড়া হবে না,

এ রকম অবস্থায় বোঝাপড়া হয় না- শুধু আবোল-তাবোল কথা বলার সুযোগ পাবে দুজন। অন্যদিকে বিপিনকেও বোঝানো যাবে মাধবী নিজের ইচ্ছায় আশ্রমে থাকলো, নারায়ণ স্বেচ্ছায় মাধবীকে রেখে গেলো। সদানন্দ এদিক দিয়েও দূরদৃষ্টিসম্পন্ন। তারপরও তার মধ্যে ভয় জাগে, মাধবী যদি রাজপুত্রের ঐশ্বর্যের মোহে চলে যায়? সদানন্দ তো মাধবীর প্রেমে ভেসে গেছে:

“আহা, কী মিষ্টিই ছিল মাধবীলতাকে উমার জিম্মা করিয়া দিয়া আসিবার পর হইতে, প্রায় সমস্ত রাত্রির অযাচিত জাগরণের ছটফটানি রীতিমতো আরম্ভ হওয়া পর্যন্ত, সেই বীভৎস করুণ পাশবিক মায়ার স্বাদ। অনাস্বাদিতপূর্ব সেই মাধুর্যের লোভেই হাল ছাড়িয়া দিয়া ধৈর্যহীন ক্লেদাক্ত দুঃখে কী কাবুই হইয়া পড়ে মহাতেজস্বী সদানন্দ।” (৩খ, পৃ.-২৯০)

তবে সদানন্দ মাধবীর মায়া থেকে নিজেকে যুক্ত করতে চায়। তাই সে সাতদিন ধ্যান করবে বলে সকলের সঙ্গে দর্শন বন্ধ করে দেয়। বাইরে থেকে আগত দর্শনার্থীদের বিপিন সে কথা জানিয়ে দেয়। প্রথম দিনই মাধবীকে নিয়ে সদানন্দ ভুল করে ফেলেছিল। তারপর মাধবীকে সে তার কুটিরে বন-তখন আসার অনুমতি দিয়েছিলো।

বিপিন মাধবীর এই সহজ ভঙ্গিটিকে আড়ষ্ট করে সদানন্দের সম্পর্কে একটি শ্রদ্ধার ভাব জাগিয়ে দেয়, এতে সদানন্দ রেগে যায়। পরদিন দুপুরে সে মাধবীকে ডেকে পাঠায়। আদর করার জন্য সদানন্দ তাকে বুকে তুলে নেয়। ভক্তদের নিয়ে মেতে না থেকে সদানন্দ এ কদিন আরো বেশি করে মাধবীকে নিয়ে মেতে থাকলো। তবে তার একবার অনুভব হয়

“মাধবীকে বাহুবন্ধন হইতে মুক্তি দিয়া তার কেন মনে হইতেছে নিজে সে মুক্তি পাইয়াছে- একটা অদৃশ্য দানবের নিবিড় আলিঙ্গনের অকথ্য যন্ত্রণা হইতে?” (৩খ, পৃ.-২৯৮)

তবু সাতদিন পর ভোরবেলা সে মাধবীকে অভিসারের নিমন্ত্রণ করে । তাকে একা সদানন্দের কুটিরে রাত এগারোটা, সাড়ে এগারোটায় আসতে বলে। মাধবী সময়টা পিছিয়ে এক দিন পর যেতে চাইলে সে ধমক দেয়, মাধবী নিরুপায় বিদ্রোহ করলে তাকে বোঝাতে শুরু করে, এয়োদেশীর জ্যোৎস্নার লোভ দেয়ার। মাধবী কেলেঙ্কারির কথা বললে, যে নিজে ব্যবস্থা করবে জানায়। মাধবী দুপুরে এসে আবার একই কথা বললে সদানন্দের মনে হয় মাধবী বাজারের বেশ্যার মতো

“মাধবীর ভিতরটা শুধু শক্ত নয়। পাথর। বোঁটা ছেড়া ফলের মতো বছরের পর বছর ধরিয়া শুকাইয়া কাঁকড়াইয়া যাইতে পারিলে যেমন হইতে পারে সেই রকম শক্ত। ” (৩খ-পৃ -২৯৮)

তবু সাতদিন পর ভোরবেলা সে মাধবীকে অভিসারের নিমন্ত্রণ করে । তাকে একা সদানন্দের কুটিরে রাত এগারোটা, সাড়ে এগারোটায় আসতে বলে। মাধবী সময়টা পিছিয়ে এক দিন পর যেতে চাইলে সে ধমক দেয়, মাধবী নিরুপায় বিদ্রোহ করলে তাকে বোঝাতে শুরু করে, অয়োদেশীর জ্যোৎস্নার লোভ দেয়ার। মাধবী কেলেঙ্কারির কথা বললে, যে নিজে ব্যবস্থা করবে জানায়। মাধবী দুপুরে এসে আবার একই কথা বললে সদানন্দের মনে হয় মাধবী বাজারের বেশ্যার মতো
“মাধবীর ভিতরটা শুধু শক্ত নয়। পাথর। বোঁটা ছেড়া ফলের মতো বছরের পর বছর ধরিয়া শুকাইয়া কাঁকড়াইয়া যাইতে পারিলে যেমন হইতে পারে সেই রকম শক্ত।” (৩খ, পৃ.-৩১৩)

সদানন্দ মাধবীর ব্যাপারে আস্তে আস্তে নিষ্ঠুর হতে থাকে। বিপিনের কাছে বিতাড়িত হয়ে সে যখন মহেশের বাড়ি এসে আশ্রয় নেয় মাধবী সদানন্দকে ব্যঙ্গ করে মহাপুরুষ বলে। উত্তরে সদানন্দ মাধবীকে বলেছে মহাপুরুষ না ভেবে মাধবীর কোনো উপার নেই, কারণ তা হলে তাকে বিচারিণী হতে হবে। তখন মাধবীর মুখ লাল হওয়ার পরিবর্তে বিবর্ণ হয়ে যায়, সে বাইরে চলে যায়। মাধবী-বিভূতির বিয়ের কথায় সদানন্দ দিশেহার হয়ে পড়ে। সদানন্দ মহেশ চৌধুরীকে বোঝাতে থাকে মাধবী আশ্রয়ের মেয়ে ওর বিয়ে হতে পারে না। সদানন্দ কামকে জয় করতে পারে না। সে বলে:

“আমি ওকে দীক্ষা দেব, নিজে ওকে সাধনপথে চালিয়ে নিয়ে যাব। ওর বিয়ের প্রশ্নই তো উঠতে পারে না।” (৩থ, পৃ. ৩৪৯ )

মহেশ চৌধুরিকে সে আরো বলে মাধবীর মধ্যে খাঁটি জিনিস আছে, একদিন ও অনেক উঁচুতে ওঠে যাবে, হাজার হাজার মানুষের জীবনে সে সুখ এনে দেবে, ওর ভেতরের খাঁটি জিনিস নষ্ট হতে দেওয়া যায় না। এদিকে মহেশ চৌধুরি কোনো বিষয়ে হার মানতে শেখে নি, সদানন্দকে বলে বিয়ের পর দুইজনকেই দীক্ষা নিতে দুজনই সদানন্দের সন্তান। দুজনই তার কাজে সাহায্য করবে, দুজনকেই যে গড়ে তুলবে।

সদানন্দের মনে হয় মহেশ চৌধুরি তাকে ভক্তিমাখা চাবুক মারছে। সে আরো বেশি বেপরোয়া হয়ে ওঠে। মাধবীকে যে ডেকে পাঠায়, কিন্তু মাধবী আলে না। অতঃপর বিভূতিকে দিয়েই মাধবীকে ডাকে। মাধবী এলে তার রাগ আরো চরমে ওঠে। একদিন যে মাধুবীকে নিজের আঙুল পাখির পালকের চেয়ে কোমল করে আদর করার ইচ্ছে হয়েছিল, আজ তাকে মারতে ইচ্ছে হয়, তার ইচ্ছে হয় চামড়া কেটে ছিঁড়ে রক্তপাত ঘটাতে, সে সব দরোজা জানালা বন্ধ করে দেয়, তখন ভয়ে মাধবী অজ্ঞান হয়ে গেলে রাগে সে প্রলাপ বকতে থাকে।

বিয়ের পর মাধবীর সুখ দেখে সে আরো ক্রোধে উন্মাদ হয়ে যায়। তাকে ঘিরে মহেশ চৌধুরির আশ্রমও তার অনর্থক মনে হয়, বিপিন আসে তাকে ফিরিয়ে নিতে। তৎক্ষণাৎ সে রাজি হয় না, বিপিনকে শর্ত দেয় মাধবীকে তার চাই। বিপিন বুঝতে পারে মাধবীকে পাওয়ার কথা না দিলে সদানন্দ এ বাড়ি থেকে যাবে না। তবু সে বলে মাধবীর বিয়ে হয়ে গেছে, সে আগে বলেনি কেন যখন মাধবী তার কথায় উঠতো বসতো।

সদানন্দের চোখ জ্বলে ওঠে। মানুষ খুন করার সময় মানুষের চোখ এমন হয়। বিপিন নিজেই এ সময় অস্বস্তি বোধ করে। এ রকম কথা মানুষের মনে এলে মুখে আনতে লজ্জা হওয়ার কথা। সদানন্দ আরো বেপরোয়া হয়ে বলে: “একটা রাত্রির জন্য ওকে শুধু আমি চাই, বাস, তারপর চুলোয় যাক, যা খুশি করুক,

আমার বয়ে গেল। ওর অহংকারটা ভাঙতে হবে।” (৩খ, পৃ.-৩৬৫)

ফ্রয়েডীয় যৌনচেতনার এমন নির্লজ্জ প্রকাশ সদানন্দের মধ্যে মূর্ত হয়ে ওঠে। মাধবী হাতছাড়া হয়ে গেছে বলে সদানন্দ বেশি করে জ্বালা অনুভব করে, মাধবী তাকে প্রত্যাখ্যান করছে, অবহেলা করছে এই বিষয়টি সদানন্দের কামবোধকে আরো জোরালো করে তুলছে। আশ্রমে ফিরে এসেও সে একই চিন্তায় মগ্ন হয়ে থাকে। কেলেঙ্কারির কথা, পুলিশের ভয় কিছুই তাকে টলায় না। সে বিপিনকে বলে

“উষা আর রতনকে দিয়ে মাধবীকে আনতে হবে। এই ঘরে মাধুকে বসিয়ে রেখে ওরা চলে যাবে, তারপর আমি না ডাকলে কেউ আমার মহলে আসবে না।” (৩খ, পৃ.-৩৬৭)

 

পুরুষ চরিত্র পর্ব ২

 

সদানন্দ কাম চেতনায় উন্মাদ হয়ে যায়। শেষ পরিণতির কথা যে চিন্তা করে না। আশ্রমের ভবিষৎ নিয়েও তার কোনো মাথাব্যথা নেই। সে তার নিজের মোহে অন্ধ। সে বিপিনের কাছে প্রতিজ্ঞা করে সে ওর সর্বনাশ করবে, মহেশকে পথে বসাবে, তবে তার নাম সদানন্দ। এটাইসদানন্দের প্রকৃত স্বরূপ

“ধর্মের আবরণে অবদমিত স্বার্থবুদ্ধি, অর্থলালসা এবং যৌন-ক্ষুধা কি প্রচণ্ড বিকারের সৃষ্টি করে এই উপন্যাসে আছে তার জটিল এবং দুরূহ মনোবিশেষণ । ”

সদানন্দ মহেশের বাড়ি পুলিশ পাঠায়। পুলিশের একজন লোক সদানন্দকে প্রণাম করতে গিয়েছিলো, তখন সদানন্দ তাকে এমন কতকগুলো কথা বলে যে তাড়াতাড়ি তলাশি না করে পুলিশের কোনো উপায় থাকে না। একথা শুনে মাধবী প্রায় খেপে যায়। সে সদানন্দের আশ্রমে যায় তাকে শিক্ষা দিতে, তার মুণ্ডুপাত করতে। মাধবী তার ঘরে ঢোকা মাত্র সে দরজা বন্ধ করে দেয়।

বিপিন তখন সদানন্দকে নিবৃত করার জন্য চেষ্টা করে; কিন্তু সদানন্দ বিকৃত চিন্তা- চেতনার ধারক। সে বিপিনকে বলে- কোন কিছু না বলে মহলের প্রধান দরোজায় দাঁড়িয়ে পাহারা দিতে, কেউ যেন এদিকে না আসতে পারে। বিপিন তখন সদানন্দের পায়ে পড়ে মিনতি করে, সদানন্দ তার দৃঢ়তা থেকে সরে না।

“পায়ে পড়িস আর যাই করিস কিছু লাভ হবে না। দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে গাধার মত কেন সময় নষ্ট করছিস, একজন কেউ এসে পড়লে ভালো হবে? এই সোজা কথাটা তুই বুঝতে পারছিস না নচ্ছার। মাধু একা ফিরে গেলে ও কারো কাছে কিছু বলবো না । কিন্তু অন্য কেউ জানতে পারলে, না বলে মাধুর উপায় থাকবে না।” (৩খ, পৃ.-৩৭৬)

সদানন্দ চরিত্রটি একটি সুস্থ মনোবিশেষণমূলক চরিত্র। নিজের অস্তিত্ব সম্পর্কে যে বার বার সন্দিহান হয়। নিজেই নিজের সম্পর্কে বিভিন্ন ধারণা বিশেষণ করে, সমালোচনা করে, মুক্তির পথ খোঁজে আবার উপায়হীনভাবে আত্মবিকারে পতিত হয়। সে নিজের মনে নানা বিষয়ে বিশেষণ করে।

কখনো তার আর ভক্তদের সম্পর্ক নিয়ে কখনো বিপিনকে নিয়ে কখনো মাধবীলতার জীবনযাপন নিয়ে, কখনো মহেশ চৌধুরির সঙ্গে নিজের ব্যক্তিত্বের সংঘাত নিয়ে, কখনো একান্ত নিজের মনে সুখ-দুঃখ নিয়ে। সদানন্দ বর্ষাকালে ভক্তদের নিয়ে বিশেষণ করে বেশি। এ সময় জলকাদার জন্য ভক্তরা আসে কম। সদানন্দ চিন্তা করে লোক কী হুজুগে পড়ে তার কথা শুনতে আসে, কষ্ট করার দরকার হলে তাই আসাটা বাতিল করে দেয়, কিন্তু প্রণামী তো তাকে দেয়, বিনিময়ে পুণ্য তারা পায়। বর্ষার দিনে পুণ্যের দরকার কী কমে যায়:

“সবচেয়ে বেশি ক্ষোভ হয় সদানন্দের, বর্ষার জল ভক্তদের কাছে তাঁর আকর্ষনকে জোলো করিয়া দিতে পারে বলিয়া। অহংকার বড়ো আহত হয়।” (৩খ, পৃ. ২৯৪)

মানুষ কোন কিছু নিয়ে বেশি চিন্তা করলে তখন তা নানাভাবে উল্টে পাল্টে চিন্তা করে। তখন সেই মনটি বিশেষণমুখী হয়ে ওঠে। মাধবীলতা আশ্রমে আসার পর থেকেই সদানন্দের চিন্তার জগতে মাধবী এসে যোগ হয়।

মাধবী যখন তার কাছে থাকে ততক্ষণ সে সম্মুখের মাধবীর বিভিন্ন আচার-আচরণ, কথা-বার্তা সম্পর্কে নিজের মনে বিভিন্ন ব্যাখা করে, বিশেষণ করে, এর ভিতর দিয়ে সে নিজের মনকে বিচার করে। সে মাধবীকে রত্নাবলী আর উমার কাছে রেখে এসেছিল। উমা আর রত্নাবলী দেখা শোনার ভার পেয়ে আদরযত্নে মাধবীকে অতিষ্ঠ করে তুলেছিল সদানন্দ সে খবর আর রাখেনি ।

আবার আশ্রমের উদ্দেশ্য সম্পর্কে সে মাধবীকে অনেক দিন বুঝিয়েছে কিন্তু মাধবী তা ভালো রকম বুঝতে পারে নি, বিপিন মাধবীকে এই অবস্থা থেকে মুক্তি দিয়েছে। মাধবীর সময় কাটানোর জন্য দিয়েছে কাজ আর দু-এক কথায় আশ্রমের উদেশ্যও বুঝিয়ে দিয়েছে। বিপিন আরো একটা কাজ করেছে, মাধবী আর সদানন্দের মধ্যে একটি অদৃশ্য দেওয়াল তুলে দিয়েছে।

মাধবীর মুখে বিপিনের প্রশংসা শুনে, সদানন্দ রেগে যায়। মাধবীর চোখ কখনো ছলছল করে, সদানন্দের কখনো মনে হয় মাধবী সরল বিশ্বাসের ভান করছে। তারপর এ সম্পর্কে বিশেষণমুখী হয় সদানন্দ আবার মনে করে এটা তার নিজের ভুল। সেটা মাধবীর ভান মনে হচ্ছে মাধবী আসলে সে রকমই। এই চিন্তার সে অস্বস্তি বোধ করে এক দুর্বোধ্য জ্বালাবোধ তাকে পীড়া দিতে থাকে।

সে মাধবীর ওপর রাগ করে তাকে চলে যেত বলে। আবার মাধবী চলে গেলে তাকে আবার ডেকে পাঠানোর ইচ্ছা হয়। সে বিশ-বাইশ বছর আগে কোনো নারীকে ঘর ঝাঁট দিতে দেখেছিল । সদানন্দের মনে হয় এখন মাধবীও কুটিরের মেঝে ঝাঁট দিচ্ছে, তার শাড়ি-শেমিজ এলোমেলো, চুল এলোমেলো, কথা এলোমেলো, হাসি এলোমেলো, তাকে ডেকে পাঠালে হয়তো সে একটু পরিপাটি হয়ে ছিলতোলা জুতা পায়ে ঠকঠক করে উঠান পর্যন্ত এসে তারপর ধীরে ধীরে ঘরে ঢুকবে।

সদানন্দ মাধবীকে দেখতে অন্দরে গেলো, সেখানে কেউ নোই। তারপর সদরে গিয়ে দাঁড়িয়ে দেখতে পেলো মাধবী বাগান থেকে ফুল তুলছে।

পরদিন দুপুরে সদানন্দ মাধবীকে ডেকে পাঠায় আদর করে বুঝে শুনে নেয়, যে চলে গেলে অসময়ে কেন সদানন্দের ঘুম আসে। তার পাপ-পুণ্যের কথা মনে হয়।

“এত জ্ঞান ও অভিজ্ঞতা সদানন্দের এত তেজ ও সংযম, জীবনকে বিশেষণ করিতে করিতে কী তীক্ষ্ণই হইয়াছে তার বিচারবুদ্ধি, এখন যেন জানিবার বুঝিবার ক্ষমতাটুকুও আর নাই। অন্ধ আবেগের মতো অমর সংস্কারের মতো, কেবল একটা কথা মনে জাগিতেছে, তবে কী সত্যই দেবতা কেউ আছেন অন্তরালে, মানুষ যাকে সৃষ্টি করে নাই পাপপুণ্য যাচাইয়েরর একটি করিয়া কষ্টিপাথর প্রত্যেক মানুষের মধ্যে দিয়া মানুষকে যিনি স্বাধীনতা দিয়াছেন, কিন্তু বিচারের ক্ষমতাটা রাখিয়াছেন নিজের হাতে, অহরহ পাপপুণ্যের ওজন রাখিয়া মানুষকে যিনি শান্তি আর পুরস্কার দিয়েছেন?” (৩খ, পৃ.-২৯৮)

মাধবীলতাকে নিয়ে নিজের আচরণে তার মধ্যে পাপবোধ জেগে ওঠে। এরপর নিজের আদর্শ সম্পর্কে ভীতি দেখা দেয়। বাস্তব অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে যে আদর্শ নিজের মধ্যে সে জাগ্রত করেছে তা অবাস্তব কি না অর্থহীন স্বপ্ন কি না সে বিষয়ে সন্দিহান হয়ে ওঠে।

দৃঢ় ব্যক্তিত্বসম্পন্ন মহেশ চৌধুরির সামনে দাঁড়িয়ে থাকতে তার রীতিমতো ভয় করে, কারণ মহেশ চৌধুরির কাছে সে মহাপুরুষ, প্রায় দেবতার সমান। আর সকলে তাকে ঠকায়, দাবি মেটায়, তাই তাদের ভুলাতে সদানন্দের কষ্ট হবে না, কিন্তু মহেশ চৌধুরিকে ভুলানোর ক্ষমতা তার নেই, তার পূজা গ্রহণ করলে বর দেওয়ার সময় ফাঁকি বা ভেজাল চলবে না।

নিজের আশ্রমে দাঁড়িয়েই মহেশ চৌধুরি সম্পর্কে সদানন্দের এখন অনুভূতি জাগে। পরবর্তীতে বিপিন তাকে তাড়িয়ে দিলে মহেশ যখন নিজের বাড়িতে তাকে নিয়ে আশ্রম খোলে, তখন এই ভাবনায় সে সর্বক্ষণ পীড়িত হয়। মহেশ চৌধুরির কথা শুনে তার মনে হয় আশ্রম পরিচালনার কায়দাকানুন। যেন সে শিখিয়ে দিচ্ছে। এখানে যেন তার চেয়ে সদান্দকেই লোকে বেশি খাতির করে, লোকের কাছে নিজের দাম যেন কমে গেছে। নিজের চালচলন সম্পর্কে সে সচেতন হয়ে ওঠে

“আগের মতো তেজ কী আর তার নাই। আগের যেই সহজ আত্মবিশ্বাস? একটু একটু ভয় কি সে করিতে আরম্ভ করিয়া দিয়াছে সাধারণ তুচ্ছ মানুষগুলিকে ” (৩খ, পৃ. ৩৫৬-৩৫৭)

মানুষের সংস্পর্শে আসলে সে নিজেকে বাচাই করার চেষ্টা করে, নিজের মধ্যে কোথায় ঢিল হয়েছে তা অনুধাবন করার চেষ্টা করে, এও বুঝতে চেষ্টা করে যে, সকলে কী বুঝতে পারছে তার এই আকস্মিক ব্যক্তিত্বহীনতা।

সব সময় একটি অস্বস্তিবোধ তার মধ্যে জেগে থাকে, আত্মবিশেষণের অন্যমনস্কতা আরো জোরালো হয়ে উঠে, তার মন খুঁতখুঁত করে- আগে কথা বলার সময় সে আনন্দ পেত নিজের কথা শুনে নিজেই মুগ্ধ হতো, সকলের অভিভূত ভাব দেখে অপার্থিব শক্তির সঞ্চার হতো। তার আবার মনে হয় সকলের ভীরু অসহায়, অসুখী শিষ্যগুলোকে শাস্তির বাণী প্রচারের সময় তার কোনো জড়তা নেই, কিন্তু পরক্ষণেই সে আড়ষ্ট হয়ে পরে, তার মনে হয় সকলের ওপর তার প্রভাব আগের মতো নেই।

নিজেকে নিজের কাছে দুর্বোধ্য মনে হয়। কখনো মনে হয় সে এখন একটু বেশি কল্পনাপ্রবণ হয়েছে, আবার মনে হয় এখানকার খোলাখুলি জীবন ভালো লাগছে না, আশ্রমে বিপিন তাকে আড়াল করে রাখতো, এখানে সেই আড়াল নেই বলে বিরক্তি আসছে, কখনো মনে হয় স্বাধীনতার জন্য তার মन খারাপ হয়েছে, কখনো মনে হয় মাধবী চিরদিনের জন্য হাতছাড়া হয়ে গেছে, তার অবচেতন মন এটা মেনে নিতে পারছে না।

তার মানসিক জগৎ আরো বিস্ময়করভাবে উদ্বেলিত হয়ে ওঠে। তার ঘুমের এবং জাগরণের স্বপ্ন খাপছাড়া- অস্বাভাবিক হয়ে পরে, এর কোনো ব্যাখ্য সে খুঁজে পায় না, তার ফ্রয়েডীয় চিন্তা মাথায় আসে:

“এই কী প্রেম, প্রিয়কে হারানোর পর প্রেম যা হয়, আসল খাঁটি প্রেম? মাধবীলতাকে হারানোর পর হইতেই তো তার মধ্যে এ রকম হইতেছে?” (৩খ,পৃ.-৩৫৮)

কিন্তু পরক্ষণেই এ আশংকা সে বাতিল করে দেয়, নিজের সঙ্গে নিজের যুদ্ধে সে ক্ষত-বিক্ষত হয়ে যায়। সে চিরদিনের অবিশ্বাস ঈশ্বরের কাছে নিজেকে সঁপে দেয়। ঘরের দরোজা বন্ধ করে, এক কোপে মাটিতে জোড় আসনে বসে বিড়বিড় করে ঈশ্বরের দয়া ভিক্ষা চায়:

“তুমি তো জানো আমি স্বীকার করি না তুমি আছ, তবু যদি থাক, দয়া কর। তুমি তো সব জানো— তুমি তো জানো কী উদ্দেশ্যে আমি এখন মেনে নিচ্ছি যে তোমায় আমি স্বীকার করি না তোমায় স্বীকার করি না মেনে নেওয়ার উদ্দেশ্যটা কেন মেনে নিচ্ছি তাও যে তুমি জানো-” (৩খ, পৃ.-৩৫৮)

তার কথা বন্ধ হয়ে যায় প্রণামের ভঙিতে সে মাটিতে মাথা নামিয়ে রাখে, এভাবে যে অন্যমনস্ক হয়, নিজেকে ঘুমও পাড়ায়, কিন্তু শান্ত হতে পারে না। আবার একদিন সে মহেশ চৌধুরির পায়ের ওপর পড়ে কাঁদেত কাঁপতে তাকে বাঁচাতে বলে।

মহেশ চৌধুরির তুলনায় নিজের তার অপদার্থ মনে হয়। যে চিন্তা করে সাধনার কোন স্তরে সে পৌঁছেছে, নিজে তা জানে না কেন? অথচ মহেশ চৌধুরি জানে তার মনে হয় আসন করে বসে থাকলেই কি সাধনা হয় ? জীবনের তুচ্ছতম বিষয়টির মধ্যে রহস্যময় দুর্বোধ্যতা আবিষ্কার করা হতে বিশ্বব্রহ্মাণ্ডের বিরাট রহস্যগুলোর ফাঁকি ধরা পর্যন্ত নানা ধরনের চিন্তা যে সে করেছে- তা তার খেয়াল হয় না। তার কাছে মনে হয় এগুলো সাধারণ বেঁচে থাকাই

“নিজের অজ্ঞাতসারে সাধনার পথে অগ্রসর হইয়া চলা এবং কঠিন ও বিপজ্জনক অবস্থায় আসিয়া পৌঁছানো যে কেমন করিয়া সম্ভব হইতে পারে কোনোমতেই তার মাথায় ঢুকিতে চায় না।” ( ৩, পৃ. ৩৬০ )

রাতে তার ঘুম হয় না, ছটফট করে। সে মহেশ চৌধুরিকে ডেকে পাঠায়। মহেশ চৌধুরি ভয়ের কথা বললে সে টের পায় তার ভয় করছে। সে মহেশ চৌধুরির সঙ্গে নিজের সাধন ভজনের ফাঁকির কথা বলে। মহেশ তাকে নানাভাবে তার মহত্ত্ব সম্পর্কে বুঝায়। গভীর হতাশায় তার মন বিষাদময় হয়, আবার রাগ হয়।

এরপর সে দেখে মহেশ চৌধুরির বড় রকমের ক্ষতির চিন্তা করলে তার মন শান্ত হয়। সে মহেশকে সকলের কাছে হীন করার নানা রকম মতলব করে আত্মরক্ষার চেষ্টা করে। তার একটা নতুন অনুভুতি আরম্ভ হয়— জীবনে ব্যর্থতার অনুভূতি। তার সমস্ত জীবন ব্যর্থ মনে হয়। সভায় কথা বলতে বলতে হঠাৎ থেমে সকলের মুখের দিকে তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে চেয়ে থাকে, বুঝতে চেষ্টা করে সকলের শ্রদ্ধা-ভক্তি কমে গেছে না কি ?

তার উন্মাদের মতো আর্তনাদ করতে ইচ্ছা হয়। আগে তার এ ধরনের ভাব প্রবণতা জাগলে হাসি পেত, এখন ভয় হয়। আসলে বিপিনের আড়াল নেই বলেই সদানন্দের এতো ভয়। সে যে সাধু নয়, সাধু হওয়ার চেষ্টা করেছে, বিপিন তার কাছে ভক্তদের অপদার্থ করে রেখেছে, মহেনের আশ্রয়ে এসে কোনো আক্র না থাকায় সে ধরা পড়ার ভয় করছে।

সরাসরি মানুষের কাছে এসে এতো দিনের সঞ্চিত জ্ঞানকে তার নিজের কাছে অর্থহীন মনে হয়েছে। তার যে বাণী প্রচার অভ্যাস হয়ে গেছে তা নিজের মনে স্বীকার করতে দ্বিধা এসেছে। সে প্রকৃতপক্ষে ভীতু একজন মানুষ। তাই বিপিনের আশ্রম ছেড়ে মহেশের বাড়ি এসে আশ্রয় নিয়েও সে বিপিনের কাছে ফিরে যাওয়ার জন্য দিনের পর দিন উন্মুখ থেকেছে। মহেশ তার জিনিসপত্র আশ্রম থেকে নিয়ে আসতে চাইলে সে বারণ করেছে। যতক্ষন জিনিসপত্র আশ্রমে থাকে ততক্ষণ যেন যোগাযোগটা বাজায় থাকে।

“জিনিসপত্রগুলি আনাইয়া নিলে বিপিন যদি আরও রাগিয়া যায়, তাকে ডাকিয়া ফিরাইয়া নিয়া যাওয়ার সাধ থাকিলেও যদি ওই কারণেই সে মতটা বদলাইয়া ফেলে!” (৩খ, পৃ.-৩৩৮)

কিন্তু সদানন্দ বাস্তব বুদ্ধিহীনভাবেই বিপিনের দিকে তাকিয়ে থাকে, বিপিন আটঘাট বেধেই তার বিরুদ্ধে লেগেছে। সে আশ্রমে ছড়িয়েছে সদানন্দ সন্ন্যাস ছেড়ে দিয়েছে, তাই গেরস্তের বাড়ি সে তিন রাতের বেশি অতিবাহিত করছে।। রত্নাবলীর মুখে এ কথা শুনে সে আরো বুদ্ধিহীনতার পরিচয় দেয়। যে রত্নাবলীকে জিজ্ঞাসা করে, এ কারণেই রত্নাবলী তাকে প্রণাম করে নি না-কি।

 

পুরুষ চরিত্র পর্ব ২

 

সদানন্দের বন্ধুর প্রতি প্রবল আকর্ষণ। বিপিনকে সে ছাড়তে পারে না। মহেশের আশ্রমে একটি বিধ্বস্ত মানসিক অবস্থায় জীবন অতিবাহিত করার পর বিপিন তাকে ফিরিয়ে না নিলেও বিপিনের প্রতি তার রাগ নয়, অভিমান থাকে। তার চেহারা খারাপ হয়ে গেছে বিপিন বললে সে অভিমান করে বলে

“গেছে তো গেছে, তার কী?” (৩খ, পৃ.-৩৬৩)

প্রথম দিকে আশ্রমে মাধবী আসার পর বিপিন যখন একবার তাকে কিছু না বলে চলে গিয়েছিল। তখন যেমন তার বিপিনের জন্য মন কেমন করতো, এখনও যেন সেই একই অবস্থা। তবে বিপিনের বৈষয়িক জ্ঞানকে সে ঈর্ষাও করে। তবে তার ভিতরে একটি পাশবিক চরিত্র আছে। একে সে এড়াতে পারে না। তার জীবন সম্পর্কে সবচেয়ে সত্যকথা মহেশের চিন্তায় প্রকাশ পায়:

“সুযোগ পাওয়ামাত্র সুযোগের সদ্ব্যবহার করা সদানন্দের পক্ষে অসম্ভব নয়।” (৩খ, পৃ. ৩৯৯)

সে মহেশ চৌধুরী আর মাধবীর সম্পর্কের সুযোগ পেয়ে তা হাতছাড়া করেনি। আশ্রমে বিভূতি যখন মারামারি করছে, দু পক্ষে যখন তুমুল লড়াই হচ্ছে:

“তখন দু-হাত মেলিয়া বিভূতিকে আড়াল করিয়া দাঁড়াইয়া সকলকে ঠেকানোর কল্পনাটা মনের মধ্যে আসিয়াই অন্য একটা কল্পনার তলে মিলাইয়া গেল। চোখের সামনে এমন একটা ভীষণ কাণ্ড ঘটিতে যাইতেছে, অথচ এই অবস্থাতেও সদানন্দের মনে পড়িয়া গেল যে জগতে মাধবীলতার একজন মাত্র মালিক আছে তার নাম বিভুতি। বিভূতির যদি কিছু হয় মাধবীলতার তবে কেউ কর্তা থাকিবে না। চিন্তাটা মনে আসিতে সদানন্দ একটু সরিয়া দাঁড়াইল।” (৩খ, পৃ.-৩৯৪)

বিভূতির মৃত্যুর পর সদানন্দ আর মাধবী ‘মাঝরাত্রে আশ্রমের পিছনের ঘাটে বাঁধা নৌকায় উঠিয়া’ চলে গেল।

ধর্মের খোলসে ঢাকা প্রৌঢ় বয়সী সদানন্দের মধ্যে ফ্রয়েডীয় যৌন চেতনার প্রবল হুড়াহুড়ি ঘটেছে। অন্তরের এবং বাইরের মনোবিশেষণ তাকে একটি জীবন্ত চরিত্রে পরিণত করেছে। বিকৃত পুরুষের চরিত্র অঙ্কনে মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় একটি সাহসী পদক্ষেপে এগিয়েছেন।

হেরঘ, শশী, রাজকুমার এরাও মালিকের সদানন্দধর্মী চরিত্র। তবে এরা সদানন্দের মতো পৈশাচিক নয়, তাদের মধ্যে মানবতাবোধ, সামাজিকতাবোধ বিদ্যমান। কিন্তু সদানন্দ শুধুমাত্র নিজের মনের বিকৃত চিন্তা, যৌন লালসা চরিতার্থ করার জন্য একের পর এক ঘটনা ঘটিয়েছে।

অহিংসা উপন্যাসে মহেশ চৌধুরি একটি রহস্যময় চরিত্র। যে সদানন্দের অন্ধ ভক্ত। কিন্তু আশ্রমে সদানন্দ বিপিনসহ অন্যান্য সকলে মিলে তাকে অপাঙক্তেয় করে রাখে। তার ওপর রাজা সাহেবের রাগ বলেই আশ্রমে তার সম্মান নেই। তবে চারদিকে কয়েকটি গ্রামে তার প্রভাব-প্রতিপত্তি আছে।

সকলে তাকে শ্রদ্ধা করে, বিশ্বাস করে ভালোবাসে। সে বুদ্ধিমান, কিন্তু চালাক নয়, ভিতরে বাইরে তার মিল আছে। তার ভক্তি ও নিষ্ঠা আন্তরিক। সকল বিষয়ে তাকে নিশ্চিন্ত মনে বিশ্বাস করা যায়। সে ব্যক্তিত্ববান, বাস্তববুদ্ধিসম্পন্ন এবং একগুঁয়েঃ

“মহেশের বিকারের মধ্যে যৌনতা নেই, আছে অহং-এর স্ফীতি। ”৪৭

মহেশ চৌধুরি প্রতিদিন আশ্রমে যাতায়াত করে। সদানন্দ বিপিনসহ সকলেই তাকে অবজ্ঞা করে। কিন্তু সে হাল ছাড়ে না:
“সদানন্দের অবজ্ঞা, অবহেলা, কড়া কথা এসবও যেন তার কাছে পরম উপভোগ্য।”(৩,পৃ.-300 )

সদানন্দ মহেশ চৌধুরিকে ভয় পায়। সদানন্দের নিজের আদর্শ সম্পর্কে নিজেরই সন্দেহ আছে। মহেশ চৌধুরির কাছে তা ধরা পড়ে যায় কি না সে বিষয়ে সদানন্দ শঙ্কিত। সে বুঝতে পারে মহেশ চৌধুরিকে ফাঁকি দেওয়া যাবে না। মহেশ চৌধুরি যখন শ্রীধরের বাড়িতে জানতে পারে সদানন্দ সাতদিন কাউকে দর্শন দেবে না, তবে যে প্রকৃত ভক্ত, সদানন্দের জন্য জীবন উৎসর্গ করতে পারে, তাকে দর্শন দেবে। মহেশ চৌধুরি আশ্রমে সদানন্দের চরণ দর্শন করতে যেতে চায়।

“আমি প্রভুর চরণ দর্শন করতে যাব শ্রীধর।” ( ৩, পৃ. ৩০১ )

শুনে সকলে অন্ধ হয়ে থাকে। সকলে এ কথাও চিন্তা করে যে এ তার অহংকারের কথা নয়, তার অহংকার নেই।

মহেশ চৌধুরি একগুঁয়ে প্রকৃতির মানুষ। সে সদানন্দের চরণ দর্শনের জন্য সদানন্দের কুটিরের সামনে কদম গাছতলায় তাঁর বসে থাকে। বাড়ি থেকে তিন-চারবার লোক এসেও তাকে নিয়ে যেতে পারে না। ঘণ্টাখানেক বৃষ্টি হয়ে তারপর কড়া রোদ উঠলো কিন্তু মহেশ চৌধুরি ওঠে না। না খেয়ে, জলে ভিজে, রোদে পুড়ে সে তপস্যায় বসেছে। তার ভাগনে ও স্ত্রী আসে। স্ত্রী কান্না শুরু করল কিন্তু মহেশ চৌধুরি টলবার লোক নয়। তার উদ্দেশ্যের কেউ প্রতিবন্ধক হলে সে তার প্রতি বিরূপ হয়, তাই স্ত্রীর প্রতি সে দাঁতে দাঁত চেপে রাগ প্রকাশ করে।

রাতে আবার বাতাস আর বৃষ্টি শুরু হলো, সে ছাতাও নিল না। মহেশ চৌধুরির সকল বিষয়ে বাহাদুরি করা চাই। কেউ যখন দর্শন পাবে না, তখন তার দর্শন পেতে হবে। প্রকারান্তরে এ তার অহংকারেরই কথা। আশপাশের গ্রাম থেকে তাকে শতাধিক নারী-পুরুষ দেখতে আসে। মাধবীলতার বকুনিতে সে সকলকে চলে যেতে বলে। মহেশ চৌধুরির এককথায় সকলে চলে যায় বলে মাধবীলতা বিস্মিত হয়। এরপর মাধবীলতার মধ্যস্থতায় সে প্রভুর চরণ দর্শন করে। শ-দুই নর-নারী কদমগাছের তলায় ভিড় করে দাঁড়ায়। তারা জয়ধ্বনি করে :

“মহেশ চৌধুরি কী জয়!” ( ৩খ, পৃ. ৩১০ )

যে কোনো বিষয়ে মহেশ চৌধুরি মনস্থির করলে তাকে কেউ টলাতে পারে না। একগুঁয়েমির চরমে পৌঁছে সে তার কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্যে পৌঁছাবেই। বিভূতি জেল থেকে ছাড়া পেলে বিস্তৃতি আর মাধবীকে নিয়ে সে আশ্রমে আসে। বিভূতিকে সদানন্দের পায়ে হাত দিয়ে প্রণাম করতে বলে, কিন্তু বিভূতি তা করতে রাজি নয়।

মহেশ চৌধুরি ছেলেকে বলে এঁকে প্রণাম না করলে যে দিকে দু চোখ যায় সে চলে যাবে আর ফিরে আসবে না। কিন্তু বিভূতি নিজের সিদ্ধান্তে অবিচল, এদিকে মহেশ চৌধুরি মিথ্যা কথা বলে না, যা বলবে তাই করবে বিভূতি প্রণাম না করলে তাকে বাড়ি ছেড়ে গ্রাম ছেড়ে চলে যেতে হবে। মহেশ চৌধুরির বাড়াবাড়িতে সদানন্দ তাকে একটা চড় বসিয়ে দেয়।

বিভূতি পিতার অপমানের প্রতিশোধ নিতে দ্রুত লাঠি নিয়ে সদানন্দকে মারতে আসে, কিন্তু মহেশ বিভূতির হাত থেকে লাঠি ছিনিয়ে নিয়ে সদানন্দের পায়ে মাথা গুঁজে দিয়ে ‘আপনাকে রাগিয়েছি, আমায় মাপ করুন প্রভু। ছেলে আমার আপনাকে লাঠি নিয়ে মারতে উঠেছিল, আমার মাপ করুন প্রভু।’ বলতে থাকে।

অবশেষে মাধবীর বুদ্ধিতে বিস্তৃতি সদানন্দকে প্রণাম করে মহেশ চৌধুরিকে বাড়ি নিয়ে যায় মহেশ চৌধুরি স্বাধীনচেতা বলেই স্বেচ্ছাচারী। নিজের বুদ্ধির ওপর তার অবিচল আস্থা। নিজের সিদ্ধান্তের প্রতি অটল। নিজের সম্পর্কে তার অহংকারও কম নয়:

“আমি আবোল-তাবোল কথা কোনোদিন বলি না, খাপছাড়া কাজ করি না। মাঝে মাঝে ভুল হয়ে যেতে পারে, তা সেটা সবারই হয়।” (৩খ, পৃ. ৩৩৪)

আত্মমর্যাদা সম্পর্কে সে ছেলেকে বলে:

“আত্মমর্যাদা বলতে তোরা কী বুঝিস জানিস? ফাঁকা গর্ব গোঁয়ারতুমি। মানুষের সঙ্গে সংঘর্ষ ছাড়া তোদের আত্মমর্যাদা টেকে না, ব্যক্তিত্বের সঙ্গে ব্যক্তিত্বের ঠোকাঠুকি লাগবে, দরকার হলে প্রকাশ্যেও হাতাহাতি হয়ে যাবে, লাঠি মারতে উঠবি, তবে তোদের আত্মমর্যাদা খাড়া থাকতে পারবে। “(৩খ, পৃ. ৩৩৪ )

মহেশ চৌধুরি মূলতঃ অহিংসনীতির অনুসারীঃ

“মহেশের কাছে অহিংস থাকাটাই পৃথিবীর সবচেয়ে বড় ন্যায়, মনুষ্যত্বের মাপকাঠি । মহেশ এই সত্যটা দেখতে পায় না যে, হিংসার মৌল কারণ কি।

সে ভালো কাজ দিয়ে সকল কিছু মোকাবিলা করতে চায়। বিপিন সদানন্দকে আশ্রম থেকে তাড়িয়ে দিলে সদানন্দ মহেশ চৌধুরির বাড়ি আশ্রয় নেয়। রত্নাবলী এসে যখন বলে বিপিন ছাড়িয়েছে সদানন্দ সন্ন্যাস ছেড়ে মাধবীকে বিয়ে করে সংসারী হচ্ছে তখন মহেশ চৌধুরি কারো কোনো মতামত না নিয়েই বলে:

“বিয়ের কথাটা মিথ্যে নয় মা। তবে বিপিনবাবু একটু ভুল শুনেছেন। মাধুর বিয়ে

হবে আমাদের বিভূতির সঙ্গে।” (৩খ, পৃ.-৩৪৭) এরপর বিস্তৃতির মারের আপত্তি, এমনকি স্বয়ং সদানন্দের আপত্তি থাকা সত্ত্বেও মহেশ মাধবী আর বিভূতির বিয়ে দিলো। এর আগে বিস্তৃতি ঘুষি দিয়ে সদানন্দের নাক ফাটিয়ে দিলে মহেশ চৌধুরি নিজের মতানুযায়ী হাতুড়ি দিয়ে নিজের নাকে আঘাত করে অজ্ঞান হয়ে যায়।

আবার জ্ঞান ফেরার পরও সে ডাক্তারের চিকিৎসা নেয় না। মহেশ সবচেয়ে আশ্চর্যজনক আচরণ করে বিভূতির মৃত্যুর পর। বিভূতির জন্য কতকগুলো লোক জেলে যাবে বলে তার আফসোস হলো । সে আশ্রমে গিয়ে বিপিনকে বলে

“বিভূতির দোষে এতগুলি লোক জেলে যাবে বিপিনবাবু?” (৩খ,পৃ.-৪০১) তারপর আদালতে দাঁড়িয়ে সে নিজের ছেলে সম্পর্কে ধীরস্থির শান্তভাবে বললো:

“বিভূতি কেমন একগুঁয়ে ছিল, মেজাজটা তার কী রকম গরম ছিল, আগে একবার সে একটা ছোটখাটো হাঙ্গামা সৃষ্টি করিবার ফলে মহেশ কীভাবে কয়েকজনের হাতে মার খাইয়াছিল এবং বাপকে কারা মারিয়াছিল তাদের শাস্তি দিবার জন্য কীর্তনের আসরে গিয়া সে কীভাবে হাঙ্গামার সৃষ্টি করিয়াছিল।

এই প্রসঙ্গে ছেলের চরিত্রের কয়েকটা বৈশিষ্ট্য বিশেষণ করিয়া সকলকে বুঝাইয়া দিবার চেষ্টাও করিল যে, কর্তব্যজ্ঞান, নিষ্ঠা, তেজ, সাহস এসব মানুষের যতই থাক ভালোমন্দ উচিত-অনুচিত, ন্যায়-

অন্যায় বিচার করিবার ক্ষমতা না থাকিলে ওসব কোনো কাজেই লাগে না।” ( ৩, পৃ.- ৪০২ )

মহেশ চৌধুরির এই আচরণে অনেকে হতভম্ব হয়ে গেলো, কেউ কেউ সকৌতুকে হাসতে লাগলো। বিভূতির মা মাথা কুটল এবং মাধবী গলায় দড়ি দিতে চেয়ে হুঁ হুঁ করে কাঁদতে শুরু করল। মহেশ চৌধুরি কোনো কিছুতেই বিব্রত হলো না। শান্ত সৌম্য স্থির অবিচল হয়ে রইল। তার ভেতরে যেন ধ্বনিত হলো।

“এক পুত্র শোকে তুমি আকুলা, ললনে,
শত পুত্র শোকে বুক আমার ফাটিছে
দিবা নিশি !”

মহেশ চৌধুরি দৃঢ় ব্যক্তিত্বসম্পন্ন মানুষ। সে খুব বেশি কথা বলে না, তবে যা বলে তা এমন দৃঢ়তার সঙ্গে বলে যে তার কোনো অন্যথা হয় না। সে সদানন্দের চরণ দর্শনের জন্য যখন কদমতলায় বসেছিল তখন শতাধিক নারী-পুরুষ এসে ভিড় করে। এতে আশ্রমের কাজের ক্ষতি হচ্ছে বলে মাধবী অভিযোগ করলে মহেশ চৌধুরি তাদের অল্প কথায় আশ্রম থেকে বিতারিত করে।

একটু অনুযোগ দিয়ে এবং নিজের মৃত্যুর ভয় দেখিয়ে সে কথা শেষ করল। শ্রোতারা সকলে তার শুভাকাঙ্ক্ষি আত্মীয়র মতো আশ্রমের ভিতর থেকে চলে গেলো। মঝে মাঝে দু একজন আশ্রমে ঢুকলেও তাকে দেখে আবার চলে গেলো। আশ্রমের ভিতরে আর ভিড় হলো না। সদানন্দ মহেশ চৌধুরীর বাড়ি এসে আশ্রয় নিলে মহেশ চৌধুরির তীব্র ব্যক্তিত্ব আরো স্পষ্ট হয়ে ওঠে। সদানন্দ তার সম্পর্কে ভাবে।

“কারও সামান্য একটু ক্ষতি করার চিন্তা মহেশের পক্ষে মনে আনাও সম্ভব নয়, L… … […] মহেশের এমন কতকগুলি গুণ আছে, বিপিনের যা নাই। বিপিনের মধ্যে এমন কতকগুলি দোষ আছে, মহেশের যা নাই।” (তখ, পৃ. ৩৪৩ )

তবে মহেশ চৌধুরি সুন্দরভাবে জীবনযাপনের জন্য এবং নিজের ভাবনাকে বাস্তবে রূপ দেওয়ার জন্য চাতুরতার আশ্রয়ও নেয়। সদানন্দ তার বাড়িতে আসলে সে একটি আশ্রম খোলার চিন্তা করে। দলে দলে ভক্ত সমাবেশ হলে তাদের প্রণামী নেওয়া নিয়ে একটু সমস্যা হয়।

মহেশ বলে এখন প্রণামী নিলে নিজের জন্য নেওয়া হবে, আশ্রম খোলার পর প্রণামী নিলে দোষের কিছু হবে না। সে সদানন্দকে বলে আশ্রম বিপিনের সম্পত্তি নয়, সদানন্দ যেখানে থাকবে আশ্রমও সেখানে। মাধবীলতাকে নিয়ে সদানন্দের নামে যেন বিপিন কিছু না বলতে পারে তাই সে হঠাৎ করেই বিস্তৃতি আর মাধবীর বিয়ের ঘোষণা দেয়। সে জানে সদানন্দের মাধবীলতা সম্পর্কে একটি আকর্ষণ আছে, তাই সদানন্দকে সে বাড়ির বাইরে আটচালার পাশে ঘর তুলে দেয়, সদানন্দকে বলে:

“সাধনার যে স্তরে আপনি পৌঁছেছেন, এখন আর আপনাকে ঘরগেরস্থালির মধ্যে রাখতে ভরসা হয় না।” (৩খ, পু.-৩৫৯)

এখানে মহেশের তীক্ষ্ণবুদ্ধির পরিচয় পাওয়া যায়। মহেশের ব্যক্তিত্বের কাছে সদানন্দ কুঁকড়ে আসে। মহেশ সদানন্দকে নানা বিষয়ে বুঝিয়ে দেয়। দেখা যায় মহেশের দেখানো পথে সদানন্দ চলতে শুরু করে। সদানন্দ যে মানুষেকে ফাঁকি দেয় সে ব্যাপারে সে বলেঃ

“আজ্ঞে, দশজনকে জানিয়েছেন, আপনি সাধু-তাতে তো ফাঁকিবাজি কিছু নেই। দশজনের ভালোর জন্য নিজেকে সাধু ঘোষণা করাও সাধু ছাড়া অন্যের যারা হয় না। প্রভু।” (৩থ, পৃ.-৩৬১)

মহেশ সব জানে কিন্তু কাউকে কিছু বুঝতে দেয় না। তাই সাধু সদানন্দ মহেশের পায়ে পড়ে কাঁদতে কাঁদতে তাকে রক্ষা করতে বললে মহেশ বিচলিত হয় না। বরং সে সদানন্দকে শক্ত হতে বলে। নিজেকে নিজেই রক্ষা করতে বলে। আবার বিপিন এসে সদানন্দকে ফিরিয়ে নিতে চাইলেও সে বলে এখানে উনি যন্ত্রণা পাচ্ছেন, বললেই চলে যাবে। মহেশ চৌধুরি বিবেকবান মানুষ। সে নিজের সম্পর্কে বলে:

“কেউ জেনেশুনে ভুল করে, কেউ বুদ্ধির দোষে ভুল করে, কেউ কেউ আবার ভুল করছে কি না করছে গ্রাহ্যও করে না। আমি একটু চালাক মানুষ কিনা তাই সব সময় চেষ্টা করি যাতে ভুল না হয়।” (৩খ, পৃ.-৩৬৪)

নিজের নাক হাতুড়ি দিয়ে আঘাত করার পরে সে বলে এ কাজ না করলে গ্রামের মানুষ তাদের মারতে আসতো। এতে অবশ্য বোঝা যায় সদানন্দের প্রতি ভক্তির চেয়ে নিজের এবং ছেলের স্বার্থচিন্তাই এখানে বড়ো হয়ে দেখা দিয়েছে। সে সদানন্দ এবং মাধবীকে পরীক্ষা করার জন্য মাধবীকে নিয়ে আশ্রমে যায় এবং মাধবীকে দিয়ে সদানন্দকে ডাকতে পাঠায়। মাধবী একঘণ্টা পর ফিরে আসে। মহেশ বলে

“ভেবেছিলাম মানুষটা বুঝি হঠাৎ বদলে গেছে, কিন্তু মানুষ কী কখনো বদলায়?” (৩খ,পৃ.-৩৮১)

বিভূতির মৃত্যুর পর মাধবীকেও সে স্পষ্ট ভাষায় বলে “তুমি আগেও ভাবতে সদানন্দ তোমার জন্য এমন পাগল যে বিভূতিকে খুন পর্যন্ত করতে পারে। তাই এত সহজে সদানন্দকে দোষী ভেবে নিয়ে অস্থির হয়ে পড়েছ যে- একবার একটু সন্দেহও জাগেনি। তোমার কোনো দোষ না থাকলে এসব কথা ভাবতে কেন ?” (৩, পৃ. 800)

 

পুরুষ চরিত্র পর্ব ২

 

স্পষ্টভাষী কঠোর ব্যক্তিত্ববান মহেশের একটি স্নেহপ্রবণ হৃদয়ও আছে। স্ত্রী এবং সন্তানের প্রতি সে দায়িত্ববান।

কদমতলার মহেশকে ফিরিয়ে নেওয়ার জন্য তার স্ত্রী এসে তার সঙ্গে বৃষ্টিতে ভিজতে থাকলে তাকে সে বারবার দাওয়ার উঠে বসতে বলে। তারপর যে সদানন্দকে মনে মনে আবদার জানায়, একজন স্ত্রীলোকের এতো কষ্ট চোখে দেখে স্থির থাকার মতো মনের জোর তার নেই। বিভূতির মৃত্যুর পর তার জন্য কান্নার কেউ তখন আশ্রমে নেই দেখে সে কষ্ট পায়, তার মনে হয় বিস্তৃতি যেন অন্যায় রকম ফাঁকিতে পড়েছে, তার জন্য শোক করার কেউ নেই।

মাঝরাত্রি পার হওয়ার পর বাড়িতে খবর পাঠায়, কয়েক মিনিট যেতে না যেতেই তার মনে হয়, বাড়ির মেয়েরা আসতে দেরি করছে, সে নিজেই হাউহাউ করে কাঁপতে থাকে। এরপর দাঙ্গার জের চলতে থাকে। মহেশ চৌধুরি বিষাদ আর অবসাদের ভারে জীর্ণ শীর্ণ হয়ে পড়ে আরো শোক বাড়ানোর জন্য সে চেষ্টা করে।

মাধবীলতার নতুন বেশের দিকে তাকায়। মহেশ চৌধুরি দার্শনিক বুদ্ধিসম্পন্ন মানুষ। মৃত বিভূতিকে নিয়ে আশ্রমে বসে সে চিন্তা করে, চাপা দিলে রোগ সারে না, হিমালয় পাহাড়ের মতো এক স্তূপ সুগন্ধি ফুলের নিচে চাপা দিলেও নয়। তার মনে হয় পৃথিবীর মানুষ অনেক দিন থেকে রোগে ভুগছে। দু-একজন মহাপুরুষ এই রোগ সারানোর চেষ্টা করছে, কিন্তু ফল হয়নি। তারা রোগের কারণ জানে না, অর্থ বোঝে না, চিকিৎসার পথও খুঁজে পায় না। তারা নিজেরাও রোগী:

“মানুষ হইতে যে মানুষের জন্ম, মানুষের কাছ হইতে খুঁটিয়া ছুটিয়া যার আত্মসংগ্রহ, মানুষের যা আছে তা ছাড়া মানুষের যা নাই তা সে কোথায় পাইবে ?” (তখ,পৃ.- ৩৯৭)

প্রথম থেকেই মহেশ তত্ত্বীয় জ্ঞানসম্পন্ন। সদানন্দকে প্রণাম করার কথা বিভূতিকে সে বোঝায়

যে মানুষ নয় সে মানুষকে দেবতার মতো ভক্তি করে না কেন বলো তো ? সবাই যদি মানুষ হত বিভূতি, পৃথিবীটা স্বর্গ হয়ে যেত।” (তখ, পৃ. ৩৩৫)

আশ্রম থেকে মাধবীকে মেয়েদের ব্রতে রত্নাবলী আর উমা নিমন্ত্রণ করে যায়, সঙ্গে মহেশ আর বিভূতিকেও খাওয়ার নিমন্ত্রণ করে। তারা বলে যায় সদানন্দ কোথায় যেন গিয়েছে। আসলে মাধবীকে শিক্ষা দেওয়ার উদ্দেশ্যেই সদানন্দ এই চাল চালে। মাধবী আর বিভূতি আশ্রমে যায় না, শুধু মহেশ যায়। গিয়ে দেখে সদানন্দ যেখানেই যাক ফিরে এসেছে, মেয়েদের ব্রত কোন কোপে হচ্ছে ভারও দেখা মেলে না। মহেশকে কেউ খেতেও দেয় না। মহেশ সব বুঝতে পারে। সে সদানন্দকে পরামর্শ দেয়।

“মানুষ যখন উঁচু পাহাড় পর্বতে ওঠে, কত যত্নে কত সাবধানে প্রাণপণ চেষ্টায় তিল তিল করে ওঠে, সময়ও লাগে অনেক । কিন্তু মানুষ যখন উঁচু থেকে হাত-পা এলিয়ে নীচে পড়ে, পড়বার সময় কোনো কষ্টই হয় না, সময়টা কেবল চোখের পলকে ফুরিয়ে যায়।” (তখ, পৃ. ৩৬৮)

আত্মহত্যা যে সহজ নয় যে কথাও সে সদানন্দকে বুঝিয়ে বলে। সাধুরা ঈশ্বরকে চায় না, পরকালের কথা ভাবে না, তাও বলে। তার মতে মূল্য যাচাই করার ক্ষমতা অর্জন করার নাম সাধনা। সে আরো বলে

“মানুষকে জানেন তো, মরুভূমিতে তৃষ্ণায় মরবার সময় পর্যন্ত এক গাস জল আর একদলা সোনার মধ্যে বেছে নিতে বললে -” (তখ, পৃ. ৩৬৯)

মহেশ চৌধুরি দূরদৃষ্টিসম্পন্ন বলে সে সদানন্দকে আশ্রম থেকে সরানোর কথা বিপিনকে বলে এবং সে নিচ্ছে আশ্রমের ভার নিবে। সে সদানন্দ আর মাধবীলতাকে এক সঙ্গে পাঠিয়ে দেওয়ার পরিকল্পনা করে

“তার বিচার নীরব এবং নির্মম।”

মহেশ চরিত্রটি ধীর-স্থির-শাস্ত প্রকৃতির, তবে তার দূরদর্শিতা চরম। সে স্বার্থান্বেষী এবং কঠোর। পুত্রকে বিসর্জন দিয়ে ভেঙে পড়ে না। সকলের অলক্ষ্যে সে চরম প্রতিশোধ নেয়।

বিপিন নিজের বুদ্ধিতে আশ্রম গড়ে তোলে। সদানন্দ প্রভুর আশ্রমটি মূলত বিপিনের সম্পত্তি। বন্ধু সদানন্দকে সে আশ্রমের শিক্ষক হিসাবে রেখেছে। এটা ভিতরের কথা। সকলে জানে সে সদানন্দের শিষ্য, ম্যানেজার। বিপিন বৈষয়িক বুদ্ধিসম্পন্ন, লোভী, ঈর্ষাকাতর কিন্তু আত্মনিয়ন্ত্রণশীল। সে চতুর প্রকৃতির মানুষ। কৌশলের মাধ্যমে সকল কার্য উদ্ধার করে। সে স্বাধীনচেতা এবং অস্তিত্বশীল। তার ভেতরে যৌন আকাঙ্ক্ষাও আছে, কিন্তু আশ্রমের স্বার্থে পরিস্থিতির মোকাবিলাও করতে পারে। সদানন্দকে সাধু হিসাবে সকলের কাছে গ্রহণযোগ্য করার জন্য:

“প্রকাশ্যে-অপ্রকাশ্যে সব সময়েই সে শিষ্যত্বের খোলসটা বাজায় রাখিয়া চলে।” (৩খ, পৃ.-২৭৮)

সদানন্দ বন্ধু হলেও তার সঙ্গে জোড়হাত করে প্রভু আড্ডা বলে কথা বলে:

“তার চিন্তা ঈশ্বরকেন্দ্রিক নয়, অর্থকেন্দ্রিক।

বিপিনের বিষয়বুদ্ধি পাকা। আশ্রমটি তার স্বপ্ন। আশ্রমের স্বার্থে সে অক্লান্ত পরিশ্রম করে এবং তার প্রতিটি ভাবনার সঙ্গে জড়িয়ে থাকে বৈষয়িক চিন্তা। আশ্রমে ভক্ত সমাগম ঘটলে, সদানন্দ বিভোর হয়ে বাণী প্রচার করলে, ভক্তরা তন্ময় হয়ে যায়, তখন বিপিনের একমাত্র চিন্তা জাগে: ‘আজ প্রণামী জুটিবে ভালো।’ (৩খ, পৃ. ২৭৯)

আবার সব ভক্তকে বিপিন আমলও দেয় না। প্রভাব প্রতিপত্তিশীল মহেশ চৌধুরিকে সে অপাত্তক্তেয় করে রাখার চেষ্টা করে। কারণ মহীগড়ের রাজা মহেশ চৌধুরির ওপর রাগান্বিত। আর আশ্রমটি রাজা সাহেবের দান। তাই রাজাকে না চটানোর জন্য মহেশ চৌধুরিকে সে দূর দূর করে তাড়িয়ে দেয়, আবার আশ্রমের সকলকে নিষেধ করে দিয়েছে তার সঙ্গে কথা বলতে, এমনকি প্রেম আর অহিংসার বাণী প্রচারক সদানন্দকেও বলে দিয়েছে মহেশ চৌধুরীকে অবজ্ঞা -অবহেলা করতে।

বিপিন শুধু নিজের স্বার্থের কারণেই মানুষকে সমীহ করে, কিংবা অবজ্ঞা করে। তার মানুষের সঙ্গে সম্পর্ক গড়ে তোলার একমাত্র মাপকাঠি স্বার্থ। তাই পালকিতে করে রাজা সাধুর দর্শন লাভের জন্য এসে সদানন্দের কুটিরের সামনে পালকি থামালে সর্বসাধারণের সঙ্গে আটচালার নিচে তাকে সে ডেকে আনার পক্ষপাতী নয়। তার মতে:

“যার কলমের এক খোঁচায় আশ্রম উঠিয়া যাইতে পারে, সে শিষ্য হইলেও তাকে একটু, খুব সামান্য একটু খাতির করিলে দোষ কী ?” (৩খ, পৃ.-২৮০ )

সদানন্দ তাকে নদীর ধারে আটচালায় সকলের মধ্যে আসতে বললে, বিপিন ক্ষুণ্ন হয়, আবার সকলের সামনে সে সদানন্দকে কিছু বলতেও পারে না, কারণ বাইরের মানুষের সামনে ঠাঁট রাজায় রাখতে হবে:

“জীবনের সমস্ত অসংযম তার গোপনীয়। সদানন্দের বোকামিতে রাগে গা জালিয়া গেলেও সে শুধু বলিল, প্রভু” ( ৩খ, পৃ. ২৮০ )

বিপিন চলে গিয়ে আর ফিরে আসে না। পালকিতে রাজা সাহেবের পরিবর্তে এসেছে রাজপুত্র।

সে সাধুর দর্শন লাভের জন্য আসে নি, এসেছে একটি মেয়েকে নিয়ে কয়েক দিনের জন্য আশ্রমে তাকে লুকিয়ে রাখতে হবে। মেয়েটির নাম মাধবী। আর কেউ হলে বিপিন এ ঝামেলা আশ্রমে নিত না, কিন্তু রাজপুত্র কিছুদিন পর সবকিছুর মালিক হবে সে, তাকে চটানো বিপিনের স্বভাববিরুদ্ধ।

এই মেয়েটিকে কেন্দ্র করে বিপিন আরো কিছুটা স্বার্থসিদ্ধি করে। সে রাজার কাছ থেকে সবকিছুর পাকা দানপত্র করে নেয়। এবং নিজের নামে সমস্ত কিছু আসার সঙ্গে সঙ্গে রাজা সাহেবের প্রতি তার আর কোনো সমীহ থাকে না:

“রাজা সাহেব ? রাজা সাহেব কী করবেন? দুদিন আগে রাজা সাহেবের যা খুশি করার ক্ষমতা ছিল, এখন আর নেই। এখন সমস্ত কিছুর মালিক আমি। তুই কী ভাবিস সেবার গিয়ে আমি শুধু আমবাগানটা বাগিয়ে এনেছি? সব নিজের দখলে এনেছি। টাকা পয়সার মালিক তো ছিলাম প্রথম থেকেই, এবার জমিজমারও মালিক হয়েছি। কী করবেন বল রাজা সাহেব, ক-বিঘা জমির জন্য ছেলেকে তো আর জেলে পাঠাতে পারেন না।” (৩খ, পৃ. ৩৩৯)

বিপিনের অতীত ইতিহাস জানা যায় না। আশ্রমটি-ই তার সব কিছু। আশ্রমের পরিধি বৃদ্ধি করা, সব দিকে দিয়ে এর উন্নতি করা, এর কোনো ক্ষতি না হওয়া-এ সবই তার এক মাত্র লক্ষ্য। এর জন্য একটু ফন্দি আঁটা বা ভড়ং করা তার কাছে দোষের নয়। সদানন্দ তাকে টাকার জন্য লোভী বললে সে সদানন্দকে বোঝায় তার নিজের জন্য টাকার লোভ নেই, আশ্রমে কত মানুষ এসে থাকতে চায়, তাদের থাকবার জায়গা বানানোর জন্য এই আশ্রমের নাম পৃথিবী ব্যাপী ছড়িয়ে দেওয়ার জন্যই তার সকল প্রচেষ্টা। সে সদানন্দকে বলে

“ভেবে দ্যাখ, এই যে আশ্রমটা হয়েছে, এতগুলি লোক আশ্রমে বাস করছে, দলে দলে লোক এসে তোর উপদেশ শুনে যাচ্ছে, আমি ফন্দি না আঁটলে এটুকুও কি হতো?” (৩থ, পৃ.-২৮৬)

বিপিন অত্যন্ত কৌশল করে চলে। মাধবীলতা স্থায়ীভাবে আশ্রমে বসবাসের সিদ্ধান্ত নিলে সদানন্দ আর মাধবীলতার সম্পর্কের স্বরূপ দেখবার জন্য একদিন দুপুর বেলা সদানন্দর ঘরে মাধবীলতা আসার পর সে সদানন্দকে জানিয়ে বাইরে চলে যায় এবং বলে যায় সন্ধ্যায় ফিরবে।

তারপর হঠাৎ সে আধাঘণ্টা পর ফিরে আসে। এসে সে মাধবীলতাকে আগের মতোই বসে থাকতে দেখে তাই সে স্বস্তিবোধ করে সদানন্দ আর মাধবীলতা মিলে আশ্রমটাকে রসাতলে দিচ্ছে না। সদানন্দকে মানসিকভাবে মাধবী সম্পর্কে একটি ন্যায়সঙ্গত সম্পর্কে পৌঁছে দেওয়ার জন্য বিপিন চেষ্টা করে। তাই সে সদানন্দকে বলে।

“তোর পাতানো মেয়ে, তুই ছাড়া কে বলবে? বাবা বলে ডাকে না তোকে?” (৩খ, পৃ. ২৯১)

কিন্তু সমান এ কথায় সমর্থন করে না। সে বলে:

“পাতানো মেয়ে আবার কীসের?” (তখ, পৃ. ২৯১)

সদানন্দের রকম দেখে বিপিন চিন্তিত হয়। সে মাধবীকে ওর মামার বাড়ি ফিরিয়ে দিয়ে আসতে চায়, সদানন্দ রাজি হয় না। বিপিন স্পষ্টভাষী মানুষ। সে সদানন্দকে সরাসরি মাধবীর ব্যাপারে আঘাত করে কচি মুখ দেখে সদানন্দ বিশ্বব্রহ্মাণ্ড ভুলে গেছে বলে অভিযোগ করে। পরদিন সদানন্দ তাকে বুঝিয়ে বলতে গেলে বিপিন আরো রেগে যায়। সে সদানন্দকে ফেরানোর জন্য রূঢ়ভাবে লজ্জা দিয়ে বলে

“ভয় নেই, তোর প্রেমের পথে কাঁটা হয়ে থাকব না, আমি বিদায় হচ্ছি।” (তখ, পৃ. 22)

বিপিন কৌশলে মাধবীলতাকে মানসিকভাবে সদানন্দর কাছ থেকে সরিয়ে দেয়। সে মাধবীকে আশ্রমের কাজে সক্রিয় করে তোলে আর সদানন্দ সম্পর্কে তার মনে একপ্রকার ভীতি ঢুকিয়ে দেয়। সাধু সদানন্দের সম্পর্কে নানা রকম কথা বলে সদানন্দের কাছে তাকে আড়ষ্ট করে দেয়।

মাধবীলতাকে তাই আশ্রমে হালকা হাসিখুশিতে থাকে, অনেক কথা বলে মনের আনন্দে চঞ্চল পদে ঘুরে বেড়ায়, কাজের ফাঁকে গুনগুন করে গানও গায় কিন্তু সদানন্দ কাছে গেলে তার মনের সকল দরোজা বন্ধ করে শুধু সভয় শ্রদ্ধা ভক্তিটা বজায় রাখে। অন্যদিকে বিপিনের সঙ্গে সে অঙ্ক রঙ্গ হয়ে ওঠে।

 

পুরুষ চরিত্র পর্ব ২

 

বিপিন আশ্রমের স্বার্থে সদানন্দ আর মাধবীর মধ্যে দূরত্ব সৃষ্টি করার জন্য কৌশলে তার কাজ সম্পন্ন করে। এর পরও সদানন্দর মনের ভাব মাধবীর প্রতি অপরিবর্তিত থাকে। সঙ্গত কারণে বিপিন চিন্তিত হয়। এ সময় মহেশ চৌধুরি অসুস্থ হয়ে মাধবীকে দেখতে চাইলে সে রাত্রেই মাধবীকে মহেশ চৌধুরির বাড়ি দিয়ে আসতে চায়। সে শশধরকে বলে

“অসুখ-বিসুখের সময় কি দিনরাত্রির বিচার করলে চলে? সময় বুঝে মানুষের অসুখ হয় না। বুড়ো মানুষ এমন অসুখে পড়েছেন, তাঁর সামান্য একটা ইচ্ছা যদি আমরা না পূর্ণ করতে পারি, আমাদের আশ্রমে থাকা কেন? নিজেরা সুখে থাকার জন্য আমরা আশ্রমে বাস করি না শশধরবাবু।” (৩খ, পৃ.-৩১৫)

রাজা সাহেব দানপত্র করে দিয়েছে বিধায় মহেশ চৌধুরিকে বিপিন আর এড়িয়ে চলবে না। সে চিন্তা করে মহেশ চৌধুরির সঙ্গে ভাব জমিয়ে তাকে বুঝতে চেষ্টা করবে। সে আশ্রমের কয়েকটি শাখা খোলার কথা চিন্তা করে। সাধারণ মানুষ মহেশ চৌধুরিকে খুব পছন্দ করে, তাই তাকে কাজে লাগানো যায়:

“জনসাধারণের ভক্তিকে আকর্ষণ করে আশ্রমিক ব্যবসা জমে ওঠে। জনসাধারণের সঙ্গে যোগাযোগ রাখাটা সে জন্য এ ব্যবসায়ের একটি প্রধান দিক। ৫২

বিপিন চিন্তা করে, মহেশ চৌধুরি মানুষ হিসাবেও ভালো, শুধু রাজা সাহেবের কারণে এতো দিন তাকে এড়িয়ে চলছে। বিপিন মহেশ চৌধুরী সঙ্গে হৃদ্যতা গড়ে তোলে। এদিকে মাধবী সম্পর্কে সদানন্দের আচরণে বিপিন খুব চিন্তিত হয়ে পড়ে। সে সরাসরি সদানন্দকে বলে তার কথামত না চললে সদানন্দকে সে বিদায় করে দিবে।

সদানন্দ এ কথায় উদ্ধত আচরণ করে, সে গর্ব করে বিপিনকে বলে, সে বললে সবাই বিপিনকে কেটে মাটিতে পুঁতে ফেলবে। কিন্তু বিপিন জানে কেউ তার বিরুদ্ধে যাবে না। সে নির্বিকারভাবেই থাকে। সে সদানন্দকে বোঝানোর চেষ্টা করে:

“তুই বড়ো বোকা সদা। সবাই টিপটিপ করে প্রণাম করে আর তুই ভাবিস তোর জন্য প্রাণ দিতে সবাই ছটফট করছে। প্রাণ পাওয়া অত সহজ নয় রে। আমি তোকে ভড়ং শিখিয়েছি, সেই ভড়ং করে লোকের মনে তুই জন্মিয়েছিস একটা ভয়। তুই থাকিস একটা ধোঁয়ার আড়ালে, তোর সম্বন্ধে কেউ কিছু জানে না, সকলের সামনে মহাপুরুষের মতো চলিস ফিরিস, সবাই তাই তোকে মহাপুরুষ ভেবে রেখেছে।

কল্পনা জগতের অবাস্তব প্রমাণ দেখিয়ে দেখিয়ে তোকে আমার মহাপুরুষ দাঁড় করাতে হয়েছে। তুই যে মহাপুরুষ নোস তার একটা বাস্তব প্রমাণও কেউ যাতে না পায় সেই জন্যই তোকে আমার লুকিয়ে রাখতে হয়। সকলে তোকে কী রকমের ভয়ভক্তি করে জানিস? কাল যদি আমি রটিয়ে দেই তোর অত্যাচারে মাধুকে আশ্রম ছাড়তে হয়েছে, সবাই তাই বিশ্বাস করে বসবে। মাধুকে নিয়ে কয়েকটা যে বোকামি করেছিস, সেগুলি হবে তার বাস্তব প্রমাণ। এত বড়ো সাধু তুই, কিন্তু তোর সাধুত্বের বাস্তব প্রমাণ নেই কিনা, তাই মাধুর সম্বন্ধে তোর বোকামির ওই কটা তুচ্ছ প্রমাণেই তোর সাধুত্ব ফেঁসে যাবে।” (৩খ, পৃ. ৩৩৯)

সদানন্দকে কোনোভাবেই বোঝাতে না পেরে সে সদানন্দকে আশ্রম থেকে তাড়িয়ে দেয় এবং শেষ কথা বলে:

“মাধুকে তুই নিস। ওকে দিয়ে আমার আর দরকার নেই।” (৩খ, পৃ. ৩৪০ )

এই বক্তব্যের মধ্য দিয়েও বিপিনের চতুরতা এবং নিষ্ঠুরতা ধরা পড়ে। আশ্রমটা পুরোপুরি নিজের দখলে আনার জন্য মাধবীকে তার প্রয়োজন ছিল, তাই আশ্রম নিজের দখলে আনার পর মাধবী তার কাছে প্রয়োজনহীন হয়ে পড়েছে। সদানন্দ আশ্রম ছেড়ে চলে গিয়ে মহেশের বাড়ি উঠলে বিপিনের পক্ষে সদানন্দ সম্পর্কে মানুষের মনে অবজ্ঞা সৃষ্টি করা আরো সহজ হয়ে পড়ে ।

সন্ন্যাসীরা গেরস্তের বাড়ি তিনরাত্রির বেশি বাস করতে পারে না। বিপিন সকলকে জানায়, সদানন্দ সন্ন্যাস ছেড়ে দিয়েছে এবং সে সন্ন্যাস ছেড়েছে মাধবীলতাকে বিয়ে করবে বলে। সে এখন মাধবীকে নিয়ে সংসারী হবে। বিপিন আশ্রমকে নির্ঝামেলায় টিকিয়ে রাখার জন্য এরূপ কৌশল অবলম্বন করে।

বিপিন স্বাধীনচেতা, একগুঁয়ে এবং নিষ্ঠুর। তার এই বৈশিষ্ট্যের কারণেই আশ্রমের সকলে তাকে ভয় করে। মহেশ চৌধুরির বাড়িতে মাধবীকে সে যখন দিয়ে আসতে যাবে, রত্নবলীও তাদের সঙ্গে যাওয়ার জেদ ধরে। তখন তাকে বিপিন একবারে আশ্রম থেকে বিতাড়িত করতে চায়। সবাইকে ডেকে সে বলতে চায় রত্নাবলীর আশ্রমে ভালো লাগছে না, সে চলে যেতে চায়।

আগেও এরকম কয়েকজনকে সে তাড়িয়ে দিয়েছে, রত্নাবলী সে কথা চিন্তা করে শংকিত হয়ে ওঠে। তারপর বিপিনের কাজে আর বাধা দেওয়ার সাহস পায় না। এ অবস্থায় বিপিন রত্নাবলীকে দেখতে থাকে। দেখতে দেখতে তার দেহ সম্পর্কে বিপিন সচেতন হয়। ফ্রয়েডীয় যৌন চেতনা বিপিনের মধ্যে সক্রিয় হয়ে ওঠে। হঠাৎ রত্নাবলী আর মাধবীলতার মধ্যে সে তুলনা করে।

রত্নাবলীকে মনে হয় গদি, আর মাধবীলতা কাঁথা। আগেও বিপিন রত্নাবলীর শরীর দেখছে। রত্নাবলী তার মনকে বহুবার বিচলিত করেছে। তার দিকে না তাকিয়ে থাকা যায় না। সে মনে মনে রত্নাবলী আর মাধবীলতাকে খোলা জায়গায় জ্যোৎস্নালোকে দাঁড় করিয়ে দিল। তার মনে হলো:

“দুটি চোখই তার অপলক হইয়া থাকিবে রত্নাবলীর দিকে কিন্তু মন তার পড়িয়া থাকিবে মাধবীলতার কাছে।” (৩খ, পৃ.-৩১৮)

এই বয়সে নারীদের নিয়ে ভাবতে বিপিনের এতো ভালো লাগছে দেখে সে অবাকও হলো। কিন্তু এটা শুধু তার মনোজগতেই রইল না, সে রত্নাবলীর গালও টিপে দিলো আবার মাধবীলতাকে নিয়ে যাওয়ার সময় ফাঁকা জাগায় সে মাধবীলতার মাথা বুকে চেপে ধরল।

মাধবীলতার হাত ধরে দাঁড়িয়ে থাকতে তার মনে হয় আঙুলগুলো পাখির পালকের মতো নরম করে মাধবীলতার সর্বাঙ্গে হাত বুলিয়ে না দিলে পৃথিবী রসাতলে যাবে। মাধবীলতা কাঁদতে থাকলে সে মাধবীলতাকে বলে যে তার মনে কষ্ট দিয়েছে তার নাম বলতে, তাকে বিপিন আশ্রম থেকে তাড়িয়ে দেবে। বিপিন উন্মাদের মতো বলে:

“যেখানে যেতে চাও পাঠিয়ে দেব। নিজে আমি তোমার নামে বাড়ি কিনে দেব, ব্যাংকে তোমার নামে টাকা জমা রেখে দেব ” ( ৩খ, পৃ.-৩২১)

এরপর মাধবীকে মহেশ চৌধুরির বাড়িতে রেখে আসার পর তার মধ্যে আর এই মনোবিকার দেখা যায় না। সে মাধবীর বিয়েতেও যায়। আবার তার মন চলে যায় আশ্রমের ভালো-মন্দের দিকে। আশ্রমে বিভূতি মারা গেলে সে চিন্তিত হয়ে ওঠে। সদানন্দের সঙ্গে আলোচনা করে সে ফন্দি আঁটে বিভূতির দোষ ছিল একথা আদালতে প্রমাণ করবে। কিন্তু মহেশ চৌধুরি-ই তা আদালতে প্রমাণ করার পর সে পরমাত্মীয়ের মতো বিনা ভূমিকায় মহেশ চৌধুরিকে বললো “কিছু ভালো লাগছে না।” সে মহেশ চৌধুরিকে আরো বলে, “আপনাকে যদি আশ্রমে পেতাম।”(৪০৩)

পরমবন্ধু সদানন্দের বিষয়ে সিদ্ধান্ত নিতে কুণ্ঠিত হয় না। সে আশ্রমের স্বার্থে সদানন্দকে বিতাড়িত করে মহেশ চৌধুরিকে গ্রহণ করে।

‘অহিংসা’ উপন্যাসে একটি উল্লেখযোগ্য চরিত্র বিভূতি। উপন্যাসে একমাত্র সেই স্বার্থহীন ব্যক্তি। সে একগুঁয়ে তবে অহংকারহীন, ন্যায়ের প্রতি শ্রদ্ধাশীল, স্বদেশি আন্দোলনের সঙ্গে জড়িত। স্বদেশি করার অপরাধে অনেক দিন তাকে জেল খাটতে হয়েছে। সে পিতা-মাতাকে ভক্তি করে, তবে আশ্রম এবং সাধু-সন্ন্যাসীর প্রতি তার কোনো শ্রদ্ধা নেই। বিয়ের পর স্ত্রীকে মায়া-মমতায় ভালোবাসায় জড়িয়ে রাখে।

বিভূতি একটি জীবন্ত চরিত্র। একটি অল্প বয়সী যুবকের নীতিবোধ, আদর্শ, পরোপকার, প্রতিশোধপরায়ণতা যে রূপ থাকে বিভূতির মধ্যে তা বিদ্যমান। বিস্তৃতি চরিত্রটি শুরু হয়েছে সে জেল থেকে মুক্তি পেয়ে বাড়িতে এসেছে। মহেশ চৌধুরির অসুখের জন্য তাকে বাড়িতে আসতে দিয়েছে। না বলে সে গ্রাম ত্যাগ করতে পারবে না, সূর্যাস্ত থেকে সুর্যোদয় পর্যন্ত বাড়িতে থাকতে হবে।

এসে সে দেখে তখন তাদের বাড়িতে আশ্রমের মেয়ে মাধবী স্থায়ীভাবে অবস্থান করছে। মহেশ চৌধুরি সকালবেলা ছেলে আর মাধবীকে নিয়ে আশ্রমে যেতে চায়। ছেলেকে বলে আমাদেরকে আশ্রম থেকে ঘুরিয়ে আনবি চল। বিভূতির কাছে দেবতার চেয়ে মানুষের আকর্ষণটাই বেশি। সে সদানন্দের ভড়ৎ সহ্য করতে পারে না, তার আশ্রমে যাওয়ার চেয়ে গ্রামের মানুষের সঙ্গে দেখা করাটা বেশি গুরুত্বপূর্ণ।

গ্রামের মানুষ ভয়ে বিভুতির সঙ্গে দেখা করতে আসে নি, তার খবর নিতে আসে নি, তাই বিস্তৃতি নিজেই সকলের সঙ্গে দেখা করে ভয় ভাঙিয়ে দিয়ে আসবে। কিন্তু মহেশ চৌধুরি আর মাধবীর পীড়াপীড়িতে তাকে আশ্রমেই আগে যেতে হলো। সদানন্দকে প্রণাম করা নিয়ে বিভূতির সঙ্গে মহেশ চৌধুরির দ্বন্দ্ব শুরু হলো। মহেশ বললো সদানন্দের আশীর্বাদে সে ছাড়া পেয়েছে। বিভূতি সদানন্দকে স্পষ্ট অবজ্ঞা দেখালো

“বসিয়া থাকিয়াই সে দু-হাত একত্র করিয়া কপালে ঠেকাইয়া বলিল, নমস্কার, ভালো আছেন? অনেকদিন পরে দেখা হল। আপনার আশীর্বাদ গভর্নমেন্টকেও টলিয়ে দিতে পারে, তা তো জানতাম না।” ( ৩খ, পৃ.-৩২৯)

 

পুরুষ চরিত্র পর্ব ২

 

এইখানে বাবা আর ছেলের ভিতরে এক খণ্ড যুদ্ধ বেঁধে গেল। একসময় সদানন্দ মহেশ চৌধুরির গালে চড় দেয়। পিতার অপমানের প্রতিশোধ নিতে গিয়ে বিস্তৃতি লাঠি হাতে দেয় সদানন্দকে মারার জন্য। মহেশ তখন সদানন্দর দুপায়ের ভিতরে মাথা গুঁজে দেয়। অগত্যা বিভূতি সদানন্দকে প্রণাম করে মহেশকে বাড়ি নিয়ে আসে। মাধবীর সঙ্গে বিভূতির বিয়ের কথা হওয়ার পর মাধবীকে সদানন্দ অপমান করলে বিস্তৃতি সদানন্দকে ঘুষি দিয়ে নাক ফাটিয়ে দেয়।
বিয়ের পর মাধবীকে নিয়ে সুখের সংসার পাতে বিস্তৃতি। তার মনে হয়

“কত জন্ম তপস্যা করিয়া সে এমন বউ পাইয়াছে, কত ভাগ্য তার।” ( ৩খ, পৃ.- ৩৭২)

তাকে নিয়ে মাধবীর ভাবনা দেখে সে মুগ্ধ হয়, কৃতজ্ঞ হয়। এই বউ সম্পর্কে বিস্তৃতির সন্দেহ এলো মনে। মাধবী সদানন্দের আশ্রমে গিয়ে সদানন্দকে হাতে-পায়ে ধরে বলে এসেছে তাদের বাড়িতে পুলিশ না পাঠাতে। আসলে সদানন্দের প্রতি যে মাধবী আরো দুর্বল হয়ে পড়েছে বিভূতি তা বুঝতে পারে।

বিভূতির মন খারাপ হয়ে গেলো। জেলে আটক থাকার সময় যেমন সব কিছু ফাঁকা মনে হতো। মাধবীলতাকে তার পর মনে হতে শুরু হলো। তার মন অশান্ত, বিক্ষিপ্ত হয়ে ওঠে। এ অবস্থায় সামান্য করণে সে মহেশের পোষা বিড়ালটা পর্যন্ত এক বাড়ি দিয়ে মেরে ফেলে। পরে তার অনুশোচনা হয়। এরপর মাধবীর ভালোবাসার তার সন্দেহ দূর হয়। তারপর আবার সে মাধবীকে জেরা শুরু করে আশ্রমে যাওয়া নিয়ে। এমনি বিশ্বাস- অবিশ্বাসের দোলায় সে দুলতে থাকে। অবশেষে স্ত্রীর ব্যাপারে সে স্থির হয়:

“শেষ রাত্রে ঘুমাইয়া পরদিন যখন অনেক বেলায় ঘুম ভাঙ্গে, মনের অবস্থাটা একেবারে বদলাইয়া গিয়াছে। পাশে যে অসতী স্ত্রী ছিল গতরাত্রে, অবিশ্বাসের সব কিছু ঝাড়িয়া ফেলিয়া আজ সকালে সে যেন চোখের আড়ালে সংসারের কার্য করিতে গিয়াছে। আগের রাত্রের ধারণা আজ বিভূতির নিছক ছেলেমানুষি মনে হয়।”( তথ, প. -৩৮৭)

হঠাৎ-ই বিস্তৃতি গ্রাম্য পলিটিক্সে জড়িয়ে পড়ে। পাশের গ্রামের ভদ্রলোকেরা গ্রামে গ্রামে চাঁদা তুলে নাটমন্দিরের অভাব পূরণের জন্য খড়ের চালা তুলেছে। কিন্তু সেখানে এ গ্রামের ভদ্রলোকদের তাদের ভদ্রলোকদের সঙ্গে চালার নিচে চেয়ারে বসতে দেয় না। বিভূতি বলে ফেলে

“তোমরা সবাই আমার সঙ্গে যেও, দেখি কেমন বসতে না দেয়।” ( ৩খ, পৃ.-৩৮৮)

কিন্তু যাত্রার দিন বিপত্তি দেখা দিল নানা বয়সী প্রায় দেড়শো মানুষ তার সঙ্গ দিন। বিভূতি তাদের অনেক বুঝিয়ে নিল কোনোভাবেই যেন মারামারি না হয়, সবাইকে শান্ত হয়ে থাকতে হবে। কিন্তু অন্যপক্ষই বেয়াদবি শুরু করলো। এর জের ধরে আশ্রমে মারামারিতে বিস্তৃতিকে জীবন দিতে হলো।

‘অহিংসা’ উপন্যাসে শশধর একটি অপ্রধান চরিত্র। সে সঙ্গীক মামার বাড়িতে আশ্রিত। মহেশ চৌধুরি সদানন্দর দর্শন প্রার্থনায় কদমগাছের নিচে ধরনা দিলে তাকে প্রথম দেখা যায়। মামা এবং মামির প্রতি সে ভীত, কারণ আশ্রয় হারাবার ভয়। আশ্রমের মেয়ে রত্নাবলীর প্রতি সে অনুরক্ত।

মহেশ মাধবীকে দেখতে চাইলে সে সংবাদ বিপিনকে বলা উচিত, কিন্তু শশধর তা না করে রত্নাবলীকে গিয়ে বলে, এবং তার সঙ্গে রীতিমতো গল্প জুড়ে দেয়। তার নিজের বউয়ের সঙ্গে কোনো সম্পর্কের টানাপোড়েন লেখক দেখান নি। তবে এ কথা বলেছেন আশ্রমে যাওয়ার কোনো সুযোগ সে হাতছাড়া করে না, আবার রাতের আঁধারে রত্নাবলী মহেশের বাড়িতে শশধরের ভরসায়ই বেড়াতে আসে, শশধর তাকে আশ্রম পর্যন্ত পৌঁছে দিতে যায়। এ সম্পর্কে সমালোচকের মন্তব্য:

“মানিকের শিল্পী সত্তায় জীবন-রহস্যের উপলব্ধি এসেছে নানা পথ বেয়ে, তা কখনো মৃত্যু, কখনো বা অতিলৌকিক অনুভূতি-কিন্তু নিঃসন্দেহে সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ পথ হলো নর-নারীর প্রেম-যৌনতা নির্ভর জটিল অন্তর্লোকের পথ। wee
একান্তভাবে নর-নারীর প্রেম যৌনতানির্ভর উপন্যাস ‘চতুষ্কোণ’। ‘চতুষ্কোন’ উপন্যাসে রাজকুমার কেন্দ্রীয় চরিত্র। শারীরিক অসুস্থতা এবং মানসিক বিকারগ্রস্ততা তার চরিত্রের প্রধানতম বৈশিষ্ট্য। এ চরিত্রে লেখকের একটি অসঙ্গতি রয়েছে- উপন্যাসের প্রথমেই লেখক জানিয়েছেন রাজকুমারের তীব্র মাথা ব্যথার কারণে সে পরদিন কাজে যেতে পারবে না,

“রাজেনকে একটা ফোন করিয়া দিতে হইবে, কাল সকালে কাজে ফাঁকি না দিয়া তার উপায় নাই।” (৪৭,পৃ.-১২)

উপন্যাসের শেষের দিকে আছে,

“রাজকুমার বেকার, তার ছুটিও নাই। একটু সে ঈর্ষাবোধ করিল বন্ধুদের জীবনে কাজের দিনগুলির মধ্যে ছুটির দিন সত্য সত্যই অনেকখানি পৃথক হইয়া আসে বলিয়া।” (৪খ,পৃ.-৭৬)

লেখক একবার বলেছেন সে কোথাও কাজ করে, আবার পরবর্তীতে বলেছেন, সে বেকার। পুরো উপন্যাসে রাজকুমারকে মালতীকে পড়ানো ছাড়া অন্য কোনো কাজ করতে দেখা যায় না। এমনকি সে একসময় মালতীকে পড়ানোও বাদ দেয়। তবে তার একটি নিজের বাড়ি আছে, পরিবার পরিজন কেউ নেই। বাড়িতে ভাড়াটে মনোরমা এবং তার পরিবার।

মনোরমা সম্পর্কে তার দিদি হয়। সে প্রথম মাসে ভাড়া দিয়ে দ্বিতীয় মাস থেকে রাজকুমারের চারবেলা খাওয়ানোর ভার নেয়। রাজকুমারের ছেলেবন্ধুর চেয়ে মেয়েবন্ধু বেশি। তার চেহারায় এবং ব্যক্তিত্বে এমন কিছু আছে, যার জন্য যে কোনো মেয়ে তার প্রতি আকৃষ্ট হয়। সে মালতীর কাছে বলে রাস্তার কম বয়সী একটি বিদেশী মেয়ের পা মাড়িয়ে দিয়েছে, সে মনে করেছিল গালে অন্তত একটা চড় মারবেই, কিন্তু ঘটনা অন্য রকম ঘটে:

“আমি অ্যাপলজি পর্যন্ত চাইলাম না। চুপ করে দাঁড়িয়ে তার চোখের দিকে তাকিয়ে রইলাম, কুড়ি কি বাইশ সেকেন্ড। তারপর হঠাৎ মুখ ঘুরিয়ে সে চলতে আরম্ভ করল। কী বলে গেল জানো ? সরি।” (৪খ, পৃ.-৬৯)

রাজকুমার এমন অহংকারী যুবক। মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় একজনের মধ্যে অনেককে রূপ দিয়েছেন। তিনি ভূমিকায় বলেছেন:

“রাজকুমারের মতো অসংখ্যা ছেলে দেখেছি। তারা নানা রকম, কিন্তু আসলে এক।”

উপন্যাসের প্রথমেই রাজকুমারের প্রকৃতি সম্পর্কে জানা যায়। তার প্রচণ্ড মাথা ধরেছে। মাথাধরা বাড়ার আগে এবং স্থায়ীভাবে গা এলিয়ে দেবার আগে তার কয়েকটি ব্যবস্থা করতে হবে।

সেগুলো হলো রসিকবাবুর বাড়ি গিয়ে গিরীন্দ্রনন্দিনীর মাকে বলে আসতে হবে, রাতে তাদের বাড়ি সে যাবে না, অবণীবাবুর বাড়ি গিয়ে মালতীকে বলে আসতে হবে আজকে তাকে পড়াবে না, স্যার কে এল-এর বাড়িতে গিয়ে রিপিকে বলে আসবে তার সঙ্গে পার্টিতে যাবে না, কেদারবাবু বাড়ি গিয়ে সরসীকে বলে আসবে তার ঘরোয়া সভার আজ সে বক্তৃতা দেবে না আর রাজেনকে ফোন করে বলতে হবে পরদিন সে কাজে যাবে না।

অসুস্থ রাজকুমার নিজের অসুস্থতার জন্যই তার এতোগুলো প্রোগ্রাম বাতিল করছে, তবে সে কাউকে দিয়ে খবর না পাঠিয়ে নিজেই যাচ্ছে। রাজকুমার চরিত্রটি এ রকম একটু খাপছাড়া। লেখক রাজকুমারকে দেখিয়েছেন শৌখিন এবং সে অন্যের চেয়ে চাল-চলন পোশাকে ব্যতিক্রমী থাকতে ভালোবাসে। এমনকি সে নিজের ডিজাইনে পোশাক পরে

“কতটা পাঞ্জাবি এবং কতটা শার্টের মতো দেখিতে তার নিজস্ব ডিজাইনের জামাটি গায়ে দিয়া রাজকুমার ঘরের বাহিরে আসিল।” (৪খ, পৃ.-১২)

তার নিজের ঘরের প্রতি বিশেষ দুর্বলতা আছে। তার চারকোনা মাঝারি আকারের ঘর, আসবাব ও জিনিসপত্রে ঠাসা। এই ঘরটি যেমন জিনিসপত্রে বোঝাই অনেক দিনের অভ্যাস ও ঘনিষ্ঠতার স্বস্তিতেও ঠাসা। গিরির মার কাছে অপমানিত হয়ে সে দিশেহারা হয়ে পড়ে। কোনো কাজের কথা তার মনে থাকে না, সোজা নিজের বাড়ির সামনে চলে আসে।

নিজের ঘরের জন্য তার মন ছটফট করে, জিনিসপত্রে ঠাসা ঘরে যেন তার মানসিক যন্ত্রপার ভালো টনিক আছে। নিজের ঘরে বন্দী থাকলেও তার নিজেকে বন্দী মনে হয় না। নিজের ঘরটি তার তৃপ্তির আশ্রয়

“ঘরে বন্দী থাক দেহ, কোটি বছর অমনই তৃপ্তি আর আনন্দের সঙ্গে মন রাজত্ব কনক নিজের কাজে। (৪খ, পৃ.-৩০)

বাইরের জগতের যন্ত্রণা, জটিলতাজর্জর জীবন থেকে স্বস্তি আর মুক্তি ঘটে তার নিজের ঘরে। রিপির নিরাবরণ দেহ দেখার ইচ্ছে পোষণ করলে, রিণি তাকে অনেক কটু কথা বলে অপমান করে, সে তার চারকোণা ঘরে এসে খাটে চিত হয়ে পড়ে থাকে আর উত্তেজিত চিন্তা তার মনে ছুটোছুটি করে। তার সিলিং-এর নিচে মাকড়সা উপরে উঠতে দুবার ব্যর্থ হলে সেও সিদ্ধান্ত নেয় সে আরেকবার কোনো নারীর দেহ দেখার কথা বলবে না।

এই উপন্যাস একটি চতুষ্কোণিক যৌনসর্বস্ববাদী প্রেমের কাহিনী। রাজকুমারকে ঘিরে চারটি মেয়ে আবর্তিত হয়েছে। রাজকুমার আধুনিক শিক্ষায় শিক্ষিত যুবক। তার চলাফেরার গতি সীমাবদ্ধ। একটি ডাক্তার বন্ধুর সঙ্গে তার যোগাযোগ আছে। উপন্যাসের প্রথমে এই বন্ধুর নাম লেখক অজিত বলেছেন, এবং উপন্যাসের শেষে বলেছেন পরেশ।

অজিত এবং পরেশ নামে রাজকুমারের দুটি বন্ধু কি না তাও স্পষ্ট নয়। একমাত্র এই ডাক্তার বন্ধুর কাছে রাজকুমার যায়, এছাড়া ছুটির দিনে তার বাড়িতে বন্ধুবান্ধব আসে সে উলেখ আছে। কিন্তু রাজকুমারের চিন্তার জগতে এরা কোনো প্রভাব ফেলে না। তার বেশির ভাগ চিন্তা গিরি, রিণি, মালতী, সরসী, কালীকে নিয়ে। উপন্যাসে ভেতরগত বোধের প্রকাশ ঘটেছে:

“এই উপন্যাসের মানুষজনের পারস্পরিক সম্পর্ক টানাপোড়েনের মধ্য দিয়ে মানুষের অবচেতন মনের বোধসমূহের আত্মপ্রকাশ ঘটেছে।

জীবনে সম্পর্কে রাজকুমারের একটি পাকা মন আছে। কোনো পরিস্থিতিতে যা ঘটে তার চেয়ে বেশি চিন্তা করা তার স্বভাব। এই স্বভাবটি তার সমাজের কাছে থেকেই পাওয়া। স্ববিরোধী বক্তব্য এবং ঘটনা ঘটনোও তার স্বভাবের অন্তর্গত।

রাজকুমার গিরিদের বাড়ি গেলে গিরি দরোজা খুলে দেয়, গিরি শেমিজ ছাড়া শুধু শাড়ি পরেছে। রাজকুমারের মনে হয় সংকোচে গিরি একেবারে কাবু হয়ে পরেছে, শাড়ি দিয়ে ক্রমাগত নিজেকে আরো ভালোভাবে ঢাকবার জন্য অনাবশ্যক চেষ্টা করছে। কিছুক্ষণ পর কথা প্রসঙ্গে গিরি যখন খিলখিল করে হাসলো তখন সে ভাবলো নিজের অতিরিক্ত পাকা মন দিয়ে সহজ সরল গিরিকে সে বিচার করেছে।

 

পুরুষ চরিত্র পর্ব ২

 

হয়তো সে এমনি করে আরো অনেক মানুষের প্রতি অবিচার করেছে। এরপর পাকা মনের রাজকুমার একটি কাঁচা কাজ করে ফেলে যে গিরির হার্ট দেখাতে গিয়ে শাড়ির নিচে বুকে হাত রাখে। গিরির প্রতিক্রিয়ায় সে আশ্চর্য হয়, হতবাক হয়। তখন আর তার মনে হয় না ষোল বছরের একটি মেয়ের বুকে হাত রাখা অপরাধ।

এরপর সে গিরির মায়ের কাছে অপমানিত হয়। রাজকুমার গিরিদের বাড়ি ছেড়ে বাইরে চলে আসে। সে ক্ষুব্ধ, আহত, উদভ্রান্ত। ব্যাপারটা ভালো করে যেন বুঝতে পারে না। তার মনে হয়

“নিছক দুর্ঘটনা—কারও কোনো দোষ নাই, দোষ থাকা সম্ভব নয়। ভুল বুঝিবার মধ্যেও তো যুক্তি থাকে মানুষের ভুল বুঝিবার সপক্ষে ভুল যুক্তির সমর্থন ? গায়ে কেউ ফুল ছুড়িয়া মারিলে মনে হইতে পারে ফাজলামি করিয়াছে, সহানুভূতির হাসি দেখিয়া মনে হইতে পারে ব্যঙ্গ করিতেছে, কিন্তু ফুল আর হাসির আঘাতে হত্যা করিতে চাহিয়াছে এ কথা কি কোনোদিন কারও মনে হওয়া সম্ভব।” (৪খ, পৃ. ১৬)

রাজকুমারের নিজের মনে যে আবহমান বাংলার সংস্কার আছে সে বেমালুম ভুলে গিয়ে নিজেকে নিরপরাধী ভাবছে। কিন্তু রিপি নিছক ভাবপ্রবণতায় চুম্বনের জন্য মুখ বাড়িয়ে দিলে সেই একই সংস্কারেই রাজকুমার চুম্বনোন্মুখ রিপিকে ফিরিয়ে দেয়। অথচ গিরি আর তার মাকে মনে হয় অসভ্য গেঁয়ো মনোবৃত্তি।

তবে রিণিকে ফিরিয়ে দেওয়ার পর তার মনে হয় রিশিও তাকে তাই ভাবছে সে গিরিদের সম্পর্কে যা ভেবেছে। এভাবে একটি জটিল ঘূর্ণাবর্তে রাজকুমার ঘুরতে থাকে। রাজকুমার চরিত্রের সবচেয়ে বড় দিক তার আত্মকথন। নিজের মনে চিন্তা করে সে জীবনে আরো জটিলতা আনয়ন করে। চারদিকে তার প্রতি উন্মুখ নারীর দল তাকে আরো বেশি করে জটিলতার দিকে ঠেলে দেয়।

গিরি সংক্রান্ত ঘটনা রাজকুমারকে বাইরের জগৎ সম্পর্কে সচেতন করে তোলে। সে মূলত আত্মিকেন্দ্রিক মানুষ। আপন খেয়ালে চলে। চলার পথে কখনো হোঁচট খায়নি । গিরি এবং গিরির মা প্রথম তাকে বাইরের জগতের সঙ্গে সামঞ্জস রেখে চলতে ভাবতে শেখায়। তাই সে গিরিদের কথা মনোরমাকে বলতে পারে না, দ্বিধান্বিত হয়।

মনোরমা উদারভাবে খোকার হাত ধরার অজুহাতে নিজের স্তন ধরতে বলে রাজকুমারকে, কিন্তু রাজকুমার খোকাকে ছোঁড়া বললে সে খেপে যায়। রাজকুমার দ্বিতীয়বারের মতো মানুষের মন সম্পর্কে অভিজ্ঞ হয়। কথা এবং আচরণে নিজের মন নয় মানুষ কী চায় তাও ভাবতে হবে।

সে মনোরমা সম্পর্কেও সাবধান হয়ে ওঠে। নিজের ঘরে শুয়ে শুয়ে নিজের মনে পরিস্থিতি সম্পর্কে বিশেষণ করতে থাকে। সে মনে করে

“তবে কি গিরি আর গিরির মার দোষ ছিল না, সে-ই বোকার মতো একটা অসংগত কাজ করিয়া তার স্বাভাবিক ফল ভোগ করিতেছে ?” (৪খ, পৃ.-১৮)

তার প্রথমবারের মতো বিকৃত চিন্তা মাথায় আসে। তার মনে হয়। “একবার রিপিদের বাড়ি গিয়া খেলার ছলে রিণির হাত ধরিয়া টানিয়া আর ব্লাউসের একটা বোতাম পরীক্ষা করিয়া সে যদি আজ প্রমাণ না করে যে ভদ্রমানুষ সব সময় সব কাজের কদর্য মানে করিবার জন্যই উদগ্রীব হইয়া থাকে না, তবে তার মাথাটা ধীরে ধীরে বোমায় পরিণত হইয়া ফাটিয়া যাইবে।” ( ৪খ, পৃ. ১৯)

অসতর্কতায় একটি ঘটনা ঘটিয়ে তার জের সে টেনে চলে। সে রিপিদের বাড়ি যায়। রিপি তখন গান গাইছিল। রিণির গান শেষ হওয়া পর্যন্ত রাজকুমার অপেক্ষা করে। গান গেয়ে রিণি বিচলিত চুম্বন প্রত্যাশায় রাজকুমারের দিক মুখ উঁচু করে ধরে। কিন্তু রাজকুমার সে আহ্বানে সাড়া দিতে পারে না, তার চিরন্তন সংস্কার তাকে বাধা দেয়। সমাজ যেটা সমর্থন করে না, তা সেও করতে পারে না।

রিপির সঙ্গে সে গল্প করতে চায়, কিন্তু গল্প জমে না সে বিদায় নিয়ে বাইরে এসে সিঁড়ির কয়েক ধাপ নামলে রিণি আবার গানের প্র্যাকটিস শুরু করে। সিঁড়িতে দাঁড়িয়ে রাজকুমার আবার নিজের মনে রিণি, রিণির আচরণ, রাজকুমার সম্পর্কে রিণির ভাবনা, সমাজের সাধারণ বোধ সবকিছু সম্পর্কে ভাবতে শুরু করে।

রাজকুমারের ভাবনা আস্তে আস্তে গাঢ় হয়। সে ভেবেছিল সামলে উঠতে রিপির সময় লাগবে সে অপমানিত হয়েছে, লজ্জিত হয়েছে। কিন্তু রিপি গানের প্র্যাকটিস শুরু করে বলে সে ভাবনার পড়ে যায়

“সাগ্রহে মুখ বাড়াইয়া দিয়া চুম্বনের বদলে ধিক্কার শোনাটা এমনভাবে তুচ্ছ করিয়া দেওয়া তো মেয়েদের পক্ষে স্বাভাবিক নয়।” (৪খ, পৃ.-২০)

সে ভাবতে থাকে তার ব্যবহারকে রিপি অসভ্যতা বলেছে, রিণি তাকে অবজ্ঞা করছে, সে সত্যিই রিণি সঙ্গে ছোটলোকের মতো ব্যবহার করেছে, সে আত্মপীড়া অনুভব করে, একটু প্রীতি বিনিময় করলে কোনো ক্ষতি হতো না, নর-নারীর আলগা চুম্বন এমন কোনো গুরুতর ব্যাপার নয়। এতে তাদের সহজ বন্ধুত্বের সম্পর্ক বজায় থাকত, অসঙ্গত ঘনিষ্ঠতায় পরিণত হত না।

বাঙালি পরিবারের চিরন্তন সংস্কারকে সে মনে মনে ঘৃণা করে, কিন্তু সে নিজেও এর থেকে বের হতে পারে না। তার তখন মনে হয় অসংযমের চেয়ে সংযম বেশি স্বাভাবিক। প্রতিটি বিষয় নিয়ে রাজকুমার চুলচেরা বিশেষণ করতে থাকে। সে মাদ্রাজে চার মাস ছিল, মাদ্রাজি মেয়েদের সম্পর্কে বক্তৃতা করার জন্য সরসী মিটিং ডেকেছে।

তার নাম ঘোষণা হলে সে দাঁড়িয়ে কিছুক্ষণ হতভম্ব হয়ে থাকে, কী বলবে বুঝতে পারে না। তার কান গরম হয়, কথা জড়িয়ে যায়, তারপর সে আরম্ভ করে এবং আস্তে আস্তে স্বাভাবিক হয়। তার মনে হয় সকলে মুগ্ধ হয়েছে, শ্যামল তাকে বিপর্যস্ত করতে চায় কিন্তু রুক্মিণী এবং রিণির চেষ্টায় তা ব্যর্থ হয়।

সভা থেকে ফেরার পর রাজকুমার সভার আগাগোড়া নিয়ে ভাবতে শুরু করে। তার মনে হয়। সবটাই ফাঁকি, যদিও সকলে খুব হইচই করেছে, হাততালি দিয়েছে, কিন্তু যারা একটু চিন্তা করে তাদের কাছে ফাঁকি ধরা পড়েছে। এই চিন্তা করতে করতে তার মনে হয়, চারদিক থেকে।

বাতাস তার মাথায় চাপ দিচ্ছে। নিজের সঙ্গে নিজের কথোপকথনে সে শরীরিকভাবে অসুস্থ হতে থাকে। কালীর হার্ট পরীক্ষা করার জন্য সে কালিকে বেষ্টন করে ধরে, কালী এক মুহুর্ত চুপ করে থেকে ছুটে বের হয়ে যায়, এবং তার এক ঘন্টা পর সে মশলা নিয়ে ফিরে আসে ততক্ষণে রাজুর খাওয়া শেষ হয়েছে।

অন্ধকার ঘরে ঢোকে কালী, সে রাজকুমারকে জিজ্ঞাসা করে আলো জ্বালাবে কি না? কালীর এই ‘জ্বালাবে?’ শব্দ নিয়েও সে বিশেষণ করতে থাকে। মালতী, সরসী বা রিণি এ কথা এ সময় বললে যেন মহাকাব্য হয়ে যেতো, কিন্তু কালীর বেলার হয়েছে প্রশ্নঃ

“আলো জ্বালিয়া কালী চলিয়া গেলে রাজকুমার ভাবে, অভিধান নিরর্থক। শব্দের মানে তারাই ঠিক করে, যে বলে আর যে শোনে কাজ ও উদ্দেশ্যের বেলাতেও তাই। কী ব্যাপক মানুষের ব্যক্তিগত স্বাধীনতা!” (৪খ, পৃ.-৩৯)

আবার বহু পরেশের সঙ্গে কথা কাটাকাটি করেও সে এ বিষয় নিয়ে বিশেষণ শুরু করে। চিন্তা করে পরেশকে না চটালেই হতো। ছেলেবেলাতেও ফাঁপানো বেলুন দেখলে ফুটা করতে ইচ্ছে হতো, এখনো ফাঁকা মানুষের সংস্পর্শে এলে তাকে খোঁচাতে ইচ্ছে হয়। এ জন্য আত্মীয় বন্ধু অনেকের কাছেই সে অপছন্দের লোক।

দশজনের সঙ্গে খাপ খাওয়ানোর বিষয়টিই তার নেই। ভাবতে ভাবতে একাকিত্বের অনুভূতি তাকে বিষণ্ন করে দেয়। মানুষের সঙ্গ লাভের জন্য সে মরিয়া হয়ে ক্লাবে যায়। ক্লাবের মেম্বার সে। নিয়মিত চাঁদা দেয়, কিন্তু যাতায়াত করে কদাচিৎ ।

 

 

পুরুষ চরিত্র পর্ব ২

 

ক্লাবের জন্য সে আকর্ষণ অনুভব করে না, সে ক্লাবে এসে আবার অনুভব করে মানুষের সঙ্গ কি সে ভালোবাসে না, সে কি কুনো? না-কি দশজনের সঙ্গে মানিয়ে চলতে পারে না বলে সকলকে সে এড়িয়ে চলে । পারিপার্শ্বিক জগতের প্রভাব তার মানসজগতে আলোড়ন তোলে:

“শহুরে জীবনের নিঃসঙ্গতা, বিচ্ছিন্নতা, অস্বাভাবিকতা, ব্যক্তিকেন্দ্রিকতার ফলে যে অশান্তি ও অ-সুখ দেখা দেয় রাজকুমার তারই প্রতিনিধি। জীবনে অবসাদ ও উদ্যমহীনতা আসলে জীবনবিমুখতা, রাজকুমার তারই শিকার।

একাকিত্বের যন্ত্রনাও তাকে ক্ষত-বিক্ষত করে। এক ভোরে ঘুম ভেঙে দেখে রোদ নেই, আকাশে মেঘ করেছে। বৃষ্টি নামলে তার মনে উলাস জাগে, সে বিশ্ব সংসারের সম্রাট হয়ে যায়, কিন্তু বৃষ্টি থামলে তার নিজেকে ভিখারি মনে হয়। তার যেতে ইচ্ছে করে গিরি, রিণি, সরসী, মালতীর জগতে। কিন্তু তার ভয় হয়, তাদের কাছে যাওয়ার জন্য অজুহাত চাই।

যার কাছেই যাক, সে ভাববে ভিখারি এসেছে। শুধু কাব্য আর হাসি ভিক্ষা দিতেও হয়তো তারা কার্পণ্য বোধ করবে। আবার সে ভাবতে থাকে সারা দিন সে নিজেকে পূর্ণ করে রেখেছিল আবার সে কেন একা হয়ে গিয়েছে। হয়তো ওদের সঙ্গে কথা বিনিময়ের সুযোগ নেই বলে তার মন কেমন করছে। ওরা হয়তো ভাববে

“হে আত্মভোলা মহাপুরুষ তোমার এত দিনের উদাসীন অবহেলার ফাঁকিটা তবে আজ ধরা পড়িয়া গেল? হে সিনিক, শেষ পর্যন্ত আমিই তবে তোমাকে রোমালের মধুতে ডুবাইয়া দিয়াছি ? এই হাসি হাসিবার এবং এই কথা বলিবার অধিকার ওদের চিরন্তন, একদিন না হয় অধিকারটা সে খাটাইতে দিল?” (৪খ,পৃ.-৩১)

কারো সঙ্গে গল্প করার দুর্নিবার আকাঙ্ক্ষা থাকা সত্ত্বেও সে কারো কাছে কাছে যেতে পারে না। বারবার নিজের মনেই বিশেষণ করতে থাকে, একই বিষয় নিয়ে বিভিন্ন বিশেষণ করে চলে।

প্রতিটি নারীর সঙ্গেই তার জটিল সম্পর্ক তৈরি হয়েছে, কেউ হয়তো তার সহজ ভাবে কথা বলবে না। একের সত্যতা অন্যকে পীড়ন করবে। অবশেষে সে মালতীর বাড়ি যাওয়া নিরাপদ মনে করে, কারণ মালতীকে সে টাকার বিনিময়ে পড়ার। সেখানে বেতন পায় বলে বাদল উপেক্ষা করে যাওয়াটা অসংগত মনে হবে না। রাজকুমারের জৈবিক ক্ষুধা মেটানোর ছলের অভাব হয় না:

“উপন্যাসটির বিষয়বস্তু নর-নারীর দেহজ কামনাকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠেছে। ফ্রয়েডীয় মনোবিকলনকে কেন্দ্র করে লেখক এই উপন্যাসে একটি জটিল কাহিনীর বিন্যাস ঘটিয়েছেন, যেখানে সমাজনীতি-অর্থনীতি প্রসঙ্গ রীতিমতো গৌণ ব্যাপার।

আত্মকথনের কারণে তার মধ্যে বিকারগ্রস্ত চিন্তার উদয় হয়। গিরিদের ব্যবহারে তার মনে হয় রিপির হাত ধরে টেনে আর বাউজের একটা বোতাম পরীক্ষা করতে। রাজকুমারের চিন্তা রোগটা বেশি

“মানুষের সঙ্গে আলাপ-আলোচনায় অনেক সময় কথার অভাবে তাকে মূক হইয়া থাকিতে হয় কিন্তু আলাপ-আলোচনার উপরের স্তরের চিন্তাগুলিকে খুব সহজেই শব্দের রূপান্তর দিতে পারে। কোনো বিষয় ব্যাখ্যা করিয়া বুঝাইবার সময় সে মশগুল হইয়া যায়।” (৪খ,পৃ.-30 )

বৃষ্টির দিনে রাজকুমার মালতীকে পড়াতে গেলো। কিন্তু সে ভুলে গেলো কোথায় বসে কাকে সে পড়াচ্ছে। সে শ্রান্ত হাসি হেসে মালতীকে জানালো, তার পড়াতে ভালো লাগছে না। চারকোনা টেবিলের যে কোনো জায়গায় দাঁড়িয়ে মালতী মোট নিয়েছে কি না জিজ্ঞাসা করা চলতো, কিন্তু মালতীর চেয়ারের পিছনে দাঁড়িয়ে সে খাতা উল্টালো, মালতীর মাথা তার বুকে লেগে নত হয়ে গেলো। মালতী মাথা নামিরে রাজকুমারের হাতের আংটির ওপর মুখ রাখলো, তখন রাজকুমার প্রেমিক হয়ে উঠল। একটি কোমল অনুভূতি তার চিন্তাজগতে পাবন আনলো।

“মালতীকে বিশ্বজগতের রানি করিয়া দিলে তার সাধ মিটবে না, ফুলের দুর্গে লুকাইয়া রাখিলে ভয় কমিবে না, তাই শুধু মালতী ছাড়া কিছুই সে রাখিতে চায় না, নিজেকে পর্যন্ত নয়।” (৪খ, পৃ.-৩২)

এই দিনই শ্যামল রাজকুমারকে গিরির কথা বলে অপমান করালে তার ভিতরে বিকৃত চিন্তা দ্রুতগামী হয়। সে কালীর পালস দেখার জন্য তার কাছে ঘেঁষে আসে, এক হাতে তাকে বেষ্টন করে হৃদস্পন্দন দেখে। কালীকে সে খুব মনোযোগের সঙ্গে লক্ষ করে। তার মনে হয় কেবল কথা-বার্তা, চাল-চলন, শিক্ষা-দীক্ষার দিক থেকে নয় কালীর গড়নটি পর্যন্ত ঘরোয়া ছাঁচের।

কালীর দেহ বাঙালি নারীর আদর্শে গড়া। অন্য সব মেয়ের সঙ্গে কালীকে তার মিলিয়ে দেখতে ইচ্ছে করে। রিণি, সরসী, মালতী এবং আত্মীয়-বন্ধু পরিবারের মেয়েদের দেহের গড়ন দেখে কালীর দেহের রহস্যভেদ করার চেষ্টা করে, আবার ট্রামে-বাসে ঘোমটা টানা, ঘোমটা খোলা বউ, স্কুল- কলেজের মেয়েদের দেখে দেখে সে মনে মনে কালীকে মিলিয়ে দেখার চেষ্টা করে ।

মানবদেহের এক গোপন রহস্য আবিষ্কারের নেশায় সে উৎসাহিত হয়ে ওঠে। এর যে একটি বিপজ্জনক দিকও আছে তা তার খেয়াল থাকে না। বন্ধু-আত্মীয়স্বজনের বাড়ির মেয়েদের চমক লেগে যায়। রাজকুমারের দৃষ্টি দেখে কেউ দারুণ অস্বস্তি বোধ কের, কেউ মনে মনে রেগে যায়, কেউ রোমাঞ্চ অনুভব করে। প্রত্যেকেই বিস্ময়ের সঙ্গে ভাবতে থাকে এতকাল পরে তার মধ্যে কী দেখেছে যে এমন করে তাকিয়ে থাকছে।

কেউ সামনে আসা বন্ধ করে দেয়, কেউ ব্যবহারে কঠিন্য আনে দূরত্ব সৃষ্টি করে আবার কেউ আরো কাছে যায়। সরসী রিপি মালতীও ভিন্ন ভিন্ন ভাবে রাজকুমারকে ব্যাখ্যা করতে থাকে। সরসী আর রিনি মনে করে রাজকুমার তাদের ভালোবাসে। কিন্তু মালতী ভাবে

“চোখে তার ভালোবাসা নাই। মনে মনে কী যেন সে হিসাব করিতেছে, যার যাচাই করার দৃষ্টিতে তার সর্বাঙ্গে চোখ বুলাইতেছে।” (৪খ, পৃ.-৪১)

কালী তার ব্যবহারে আড়ষ্ট হয়ে যায়। আর মনোরমা চিন্তায় পড়ে যায়। এদিকে কালীর অঙ্গ- প্রত্যঙ্গের বৈশিষ্ট্য মনে করে অন্য মেয়েদের সঙ্গে মিলানো তার পক্ষে কঠিন হয়ে যায় বলে সে মনোরমাকে বলে কালীকে সঙ্গে নিয়ে একেক দিন একেকজনের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেয়। এরপর সে মনে মনে একটি থিওরি আবিষ্কার করে গর্বিত হয়ে ওঠে:

“কালীকে দেখিয়া তার মনে হইয়াছিল, তার দেহের গড়ন ঘরোয়া, অন্তঃপুরের একটি বিশেষ আবেষ্টনীতে একটি বিশেষ জীবনের সে উপযোগী। এখন সে জানিতে পারিয়াছে কেবল কালী একা নয়, সকলের দেহের গড়নেই এই সংকেত আছে, দেহ দেখিয়া বুঝিতে পারা যায় সমাজের নানা স্তরে জীবনের বহু ও বিচিত্র পরিবেশের কোনটিতে সে খাপ খাইবে। শুধু মন নয়, দেহের গঠন দেখিয়াও বিচার করিতে হয়।

কোন জীবন কার পক্ষে স্বাভাবিক, কোন জীবনে কার বিকাশ বাধা পাইবে না।”(8,-85)

তার মনে হয় শুধু মনের হিসাব ধরে নিজেদের স্থান বেছে নিয়ে অনেকের জীবন ব্যর্থ হয়। এবার তার খেয়াল জাগে অনেকগুলো মেয়ের একটি গ্রুপ ছবি তুলবে। সরসীকে সে বলে তার থিয়োরির কথা। মেয়েদের দেহের গড়নের সঙ্গে মনের ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক আছে। সে সরসীকে বুঝায় দেহের গড়নের জন্য মনের কতগুলি বৈশিষ্ট্য থাকবেই। দেহের গড়ন নষ্ট না করে কোনো প্রভাবে মনের বৈশিষ্ট্য পরিবর্তন করা সম্ভব নয়।

রাজকুমারের অনেকবার অনেক রকমের ঝোঁক এসেছে, এবারের ঝোঁকটি একেবারে খাপছাড়া। নারীর নগ্ন দেহ দেখে সে থিয়োরি আবিষ্কার করতে চায়। মোটা মোটা ডাক্তারি বই আর নোটবুকের পাতা উল্টাতে উল্টাতে সে এ সব চিন্তা করে। পরীক্ষার জন্য ভাড়া করা নারী দেহ দিয়ে তার কাজ চলবে না।

যাদেরকে সে জানে, যাদের আশা-আকাঙ্ক্ষার সঙ্গে তার পরিচয় আছে, তাদের কয়েকজনকে নিরাবরণ দেখতে পারলে তার থিয়োরির জন্য কাজ দিত, সে একদিন রিণিকে প্রস্তাব দেয় বাথরুমে দাঁড়িয়ে সে রিপির ‘নাওয়া দেখবে। তার এ প্রস্তাব রিণি সহজভাবে গ্রহণ করতে পারে না। সে আরো রেগে যায় এ জন্য যে রাজকুমারের চাওয়ার মধ্যে কোনো প্রেম-ভালোবাসা নেই। রাজকুমারের মাথার যন্ত্রণা বাড়ে।

নিজের চারকোনা ঘরে চারকোনা খাটে শুয়ে সে চিন্তা করে দ্বিতীয়বার আর সে চেষ্টা করবে না। অবশেষে সরসী তার দুর্নিবার আকাঙ্ক্ষর নিবৃত করে। একদিন রাতে বাড়ির সকলে বিয়ে বাড়ি গেলে সরসী রাজকুমারকে নিয়ে নিজের ঘরে এসে তাকে নিবারণ দেহ দেখায়। এবার রাজকুমারের মনে হয় সে কখনো কাউকে ভালোবাসে নি, কাউকে ভালোবাসে না। সরসীকে বলে

“মনে মনে কতখানি কষ্ট পাচ্ছিলাম এতদিন ভালো বুঝতে পারিনি, এখন মন শান্ত হয়েছে, এখন বুঝতে পারছি। কোনো মেয়ের সংস্পর্শে এলেই আপনা থেকে মনে হত, এও গিরির জাতের জীব, এর মধ্যেও নিশ্চর খানিকটা গিরির উপাদান আছে, তোমার সম্বন্ধে পর্যন্ত তাই মনে হত। যুক্তি দিয়ে বুঝতাম অন্য রকম, কিন্তু কিছুতে চিন্তাটা ঠেকাতে পারতাম না। তুমি আজ আমার বিকারটা কাটিয়ে দিয়েছ সরসী। ( ৪, পৃ. ৬৩)

রাজকুমারের মানসিক বিকারগ্রস্ততার পিছনে তার পরিচিত নারীরাও অনেকাংশে দায়ী। উপন্যাসের প্রথমে রাজকুমার রিপিদের বাড়ি গেলে, তার যাওয়া দেখে মালতী রিপিদের বাড়ি ঢোকে রাজকুমারের আসার কারণ জানতে। রাজকুমারকে নিজের আয়ত্তে আনতে তাদের দুজনের বন্ধ শুরু হয়।

তারা একজন অন্যজনের মাথা হেঁট করে দিতে চায়। রাজকুমার চিন্তা করে নিজেকে দুভাগ করে ফেললেও দুজনকে খুশি করা যাবে না। এদের এই দ্বন্দ্বে পড়বার আগে সে নিজের বাড়িতে মনোরমার হাতে পড়েছিল। ছেলের হাত ধরাবার অজুহাতে মনোরমা তাকে দিয়ে নিজের স্তন ছুঁয়ে দিয়েছে। মেয়েরা তার চারদিকে ঘিরে আছে। সরসী তার বক্তৃতার জন্য সভা ডাকে।

এই সরসীর চলাফেরা, ওঠাবসার ভঙ্গিতে রাজকুমার আকর্ষণ অনুভব করে, প্রতিটি অঙ্গ সঞ্চালনে সে মুগ্ধ হয়। কিন্তু সে কাউকে ভালোবাসে না। সরসীকে সে পছন্দ করে, স্নেহ করে, একটু ভয়ও করে।

রাজকুমার আস্তে আস্তে নিজেকে অন্যদিকে নিয়ে যায়। সরসীর নিবারণ দেহ দেখার পর সে হয়ে ওঠে শাস্ত । সকলের আয়ত্তের বাইরে যেতে থাকে। সে সকলের সামনে বা পাশে থাকে ঠিকই কিন্তু, মানসিকভাবে থাকে বহুদুর

“যারা উচ্চারণ করার আগেই তার দুচারটি মনের কথা এতকাল টের পাইয়া আসিয়াছে, চেষ্টা না করিলে তারাও আর মনের তার নাগাল পায় না, ব্যক্তিগত খুঁটিনাটি তুচ্ছ একটি কথারও পুনরাবৃত্তি যেন হয় না কারও সঙ্গে তার দুচার ঘণ্টার আলাপে।” (৪খ, পৃ. ৬৪)

সে মালতীকেও বুঝিয়ে বলে নিজের কাছে থেকে সরাতে চায়। মালতী ভাবছে তার এখানেই চলা শেষ, কিন্তু তাকে বোঝাতে হবে এখানে তার চলার শেষ নয়, তাকে অনেক দূরে যেতে হবে। এরই মধ্যে রাজকুমার রিণির সঙ্গে দেখা করে বুঝতে পারে সে পাগল হয়ে গিয়াছে।

রিপি কাউকে সহ্য করতে পারে না, শুধু রাজকুমারের কথা শোনে, তখন মনে হয় সে সুস্থ মানুষ। রাজকুমার আরো বেশি করে নিজেকে বিশেষণ করে। সে নিজেকে সৃষ্টি ছাড়া ভাবে। আর দশজন স্বাভাবিক মানুষের মত তার জীবন নয়, তার সবকিছু বাঁকা, জটিল। সাধারণ রিণির সঙ্গে নয়, পাগল রিণির সঙ্গে তার সম্পর্ক গড়ে উঠল:

“আমি এমন খাপছাড়া মানুষ যে পাগল হয়ে তবে রিণি আমার সইতে পারল। চোখে আঙুল দিয়ে দেখানোর কথা বলে না? রিণি আমায় তাই দেখিয়াছে সরসী। সুস্থ মনে আমায় বন্ধু বলে ও গ্রহণ করতে পারে নি, বিকারে শুধু আমায় চিনেছে।” (৪খ, পৃ. -৮৩)

সরসীর কাছে সে নিজেকে তুলে ধরে এভাবে

“যদি বলি, ভেতর থেকে ঘুড়িয়ে যেন ঠান্ডা হয়ে যাচ্ছি, ঠিক বলা হবে না। যদি বলি, বহুকাল থেকে আমি যেন ধীরে ধীরে স্যুইসাইড করে আসছি, তাও ঠিক বলা হবে না। আমার এই কথাগুলি কীভাবে নিতে হবে জানো? গন্ধ বোঝাবার জন্য তোমায় যেন ফুল দেখাচ্ছি।” (৪খ, পৃ.-৮১)

 

পুরুষ চরিত্র পর্ব ২

 

এরপর রাজকুমার রিপির ভার নেয়। রিণিকে শান্ত রাখবার জন্য সে চব্বিশ ঘণ্টা রিপির সঙ্গে থাকে। তাদের আচরণ স্বামী-স্ত্রীর মতো হয়ে ওঠে। এমনকি সে রিপিকে বিয়েও করতে চায়, কিন্তু রিণির বাবা রাজকুমারের যাওয়ার পথ খোলা রাখে। তবে এর মধ্য দিয়ে রাজকুমারের মানবীয় জীবনে পদার্পণ ঘটে। তাই

“চতুষ্কোণ’কে রিরংসার ছবি মনে না করে নায়কের সুস্থ জীবনবোধে প্রত্যাবর্তনের আন্তরিক প্রয়াস-কাহিনীরূপে দেখাই সঙ্গত।’

শ্যামল চরিত্রটি ‘চতুষ্কোণ’ উপন্যাসের একটি জীবন্ত চরিত্র। সে মালতীকে ভালোবাসে কিন্তু মালতী রাজকুমারকে ভালোবাসে। তাই রাজকুমারের প্রতি তার একটি বিশেষ রয়েছে। সে মালতীর উদ্ভ্রান্ত প্রেমিক। ফোন করার অজুহাতে মালতীদের বাড়ি সময়-অসময়ে আসে, মালতী এতে বিরক্ত হয়, কিন্তু তাকে একেবারে উপেক্ষাও করতে পারে না।

একটি ঘরোয়া মিটিং- এ রাজকুমার মাদ্রাজি মেয়েদের সম্পর্কে বক্তৃতা দেয়। এই বক্তৃতার ফাঁকি ধরে দেওয়ার জন্য সে অনাহুত মিটিং- এ উঠে দাঁড়ায়। সে এভাবে শুরু করে “রাজকুমারবাবুর বক্তৃতার কয়েকটা মারাত্মক ভুল দেখিয়ে দেওয়া আমার উদ্দেশ্য” ( ৪, পৃ. ২৬)

রিণি রুক্মিণীর কারণে সে বেশিদূর এগুতে পারে না। সে আরেকবার রাজকুমারকে সরাসরি আক্রমণ করে। রাজকুমার বৃষ্টির দিন মালতীর চুলে মাথা রাখে। সেদিন বৃষ্টিতে ভিজে রাজকুমারের বাড়ি গিয়ে তাকে জিজ্ঞাসা করে সে মালতীকে বিয়ে করবে কি না। গিরিকে নিয়ে রাজকুমারের অসংগত আচরণের উল্লেখ করে সে বলে:

“আপনাকে আমি শ্রদ্ধা করতাম, সে শ্রদ্ধা বজায় থাকলে মালতীর সম্বন্ধে আমার এতটুকু ভাবনা হত না।” ( ৪খ, পৃ.-২৬)
শ্যামল মালতীর কাছে রাজকুমারকে রাসকেল বলে। তার মতে

“পেটে বিদ্যে থাকলেই লোকের মনুষ্যত্ব থাকে না।” ( ৪খ, পৃ. ৫৬)

তাই সে রাজকুমারের সঙ্গে কথা বলে না। রাজকুমার তাকে কেমন আছে জিজ্ঞাসা করলে উত্তর দেয় না। মালতীর সকল অপমান মেনে নিলেও সে একসময় মালতীর কথার প্রতিবাদ করে। সে মালতীকে বলে নানা ছুতোয় এলেও মালতী তাকে প্রশ্রয় দিয়েছে, তা ছাড়া আপনা থেকেই তার আসা বন্ধ হয়ে যেত। সে বলে:

“তুমি হয়তো সত্যি আমায় অপমান করেছ, বাদর নাচিয়েছ, আজ তাড়িয়ে দিয়ে কাল আবার ডেকে পাঠিয়ে পোষা কুকুরের মতো খেলা করেছ আমার সঙ্গে। করে থাকলে বেশ করেছ। আমি বোকা, বোকাই থাকতে চাই, আমার যা ইচ্ছা তাই আমি বিশ্বাস করব। তবে তোমাকে আর জ্বালাতন করব না মালতী, প্রতিজ্ঞা করছি। তুমি আর টেরও পাবে না শ্যামল বলে কেউ এ জগতে আছে।” ( ৪খ, পৃ.-৬৬)

এত কথা বলার পর আবার শ্যামল আবেগের সঙ্গে বলে মালতী বারণ করলে সে আর আসবে না। শ্যামলের প্রেমিকসত্তা এতটাই জোরালো।

পরিসর খুব স্বল্প হলেও স্যার কে এল-এর চরিত্রটি মানব চরিত্র হয়ে উঠেছে। সে রিপির বাবা। পিতা হিসেবে তার দায়িত্ব সে অবিচলভাবে পালন করেছে। সে ক্লাবে যায়, মদ খায়। সমাজে তার ভদ্রলোক এবং সম্রাপ্ত লোক হিসেবে নাম রয়েছে। সরসীর ঘরোয়া সভায় তাকে সভাপতি করে।

উপন্যাসে এখানেই তার আগমন। সভা শেষে রাজকুমার তার সঙ্গে গাড়িতে তার বাড়ি পর্যন্ত আসে। সে একদিন বিলেতে এ রকম সভায় উপস্থিত ছিল জানায়। সেই সভার সঙ্গে এই সভার তুলনায় তরুণদের সম্পর্কে তার দর্শন উঠে আসে।

“অবিকল এই রকম। ইয়ং বয়েজ অ্যান্ড গার্লস। আমার মতোই একজন আধবুড়োকে প্রেসিডেন্ট করেছিল। একটা ব্যাপার লক্ষ করেছ রাজু? অল্পবয়সী ছেলেমেয়েরা সভা করে কিন্তু প্রেসিডেন্ট করে বুড়োকে? কমবয়সী কাউকে প্রেসিডেন্ট করতে বোধহয় তাদের হিংসা হয়। কিংবা হয়তো প্রেসিডেন্ট বলতেই এমন একটা গম্ভীর জবরদস্ত মানুষ বোঝায় যে বুড়ো ছাড়া প্রেসিডেন্টের আসনে কাউকে বসাবার কথা তারা ভাবতেও পারে না।” (৪, পৃ.-২৯)

সে তরুণদের সহজ চপলতাকেও স্বাগত জানায়। তরুণরা কত সহজে চপল হতে পারে, অথচ তাদের মতো মানুষদের শ্যাম্পেন আর ককটেল দরকার হয়। তাতেও তাদের হয় ঘুম পায়, নয়তো দার্শনিক চিন্তা আসে। রাজকুমারের সঙ্গে এরূপ কথা বলে সে সেদিন ক্লাবে চলে গিয়েছিল। তার মাধ্যমে উচ্চবিত্তদের সামাজিক অবস্থান বোঝা যায়। একদিন সে হঠাৎ ডেকে পাঠায় রাজকুমারকে।

রিণি তাকে রাজুমার সম্পর্কে বলেছে। সে রাজকুমারকে জিজ্ঞাসা করে রিণিকে সে বিয়ে করবে কি না? পিতা হিসেবে তার দায়িতবোধই নয় মানুষ হিসেবে তার কতটুকু করণীয় তাও সে ভেবে দেখে রাজকুমারের সঙ্গে কথা বলে। কিন্তু রাজকুমার রিণির সঙ্গে অভদ্রতা করেছে বললে সে খেপে যায়।

“L… …] এক বছর একটি মেয়ের সঙ্গে খেলা করা যখন তোমার কাছে শুধু … অভদ্রতা, তোমাকে আর কিছু জিজ্ঞেস করতে চাই না। তোমাকে বলা বৃথা, তবু বলছি, যদি পার স্যুইসাইড কোরো। তোমার মতো মন নিয়ে কারও বেঁচে থাকা উচিত নয়।” (৪খ, পৃ. 92 )

তারপর রাজকুমার রিণির সঙ্গে দেখা করলে বুঝতে পারে রিণি পাগল হয়ে গেছে। আর স্যার কে এলও বুঝতে পারে রিপি ভুল বলেছে। রাজকুমার রিপিকে বিয়ে করতে চায়, কিন্তু সে এবার আর রাজি হয় না। শুধু পিতা নয়, মানুষ হিসেবে তার দায়িত্ববোধ জাগ্রত হয়। সে বলে:

“তোমাকে আমি বাঁধতে চাই না রাজু । আমি চাই যখন খুশি তোমায় চলে যাবার পথ খোলা থাকবে। তুমি ভিন্ন ঘরে বিছানা করেছ, দরকার হলে রিণির ঘরে গিয়ে শুয়ে থাক, আমাকে জিজ্ঞাসা করারও প্রয়োজন নেই। আমার মেয়েকে তুমি ভালো করে দাও, আমি আর কিছু চাই না, রাজু।”(৪খ, পৃ.-৮৬)

স্যার কে এল-এর মধ্য দিয়ে অসহায় পিতৃহৃদয় এবং মানবিকবোধ প্রকাশ পেয়েছে।

মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের পুরুষ চরিত্রগুলো নারী চরিত্রের মতো অতোটা সক্রিয় নয়। সমাজ জীবনে যেরূপ পুরুষ চরিত্র আমরা পাই মানিকের চরিত্রগুলিও সেরূপ- দাম্ভিক, আত্ম- অহংকারী, নিজের মতের প্রতি অন্ধবিশ্বাসী, প্রতিক্রিয়াশীল, আরামপ্রিয়। শীতল, বিধান, মোহিনী, তারাশঙ্কর, বিমল, অধর, নগেন, নগেনের কাকা, ধনঞ্জয়সহ শ্রমিকরা, সদানন্দ-এরা সকলেই এইরূপ চরিত্র।

তবে, রাখাল, সত্যপ্রিয়, জ্যোতির্ময়, শ্যামল, বিপিন, মহেশ এদের চেয়ে ব্যতিক্রম। এরা নিজেদের ভাগ্যোন্নয়নে সর্বদা তৎপর থেকেছে। আবার নিঃস্বার্থ পরোপকারী হারাণ ডাক্তারকেও আমরা পাই। সর্বোপরি মানিকের পুরুষ চরিত্রগুলোর মধ্যে সকল শ্রেণির চরিত্রই পাওয়া যায় ।

Leave a Comment