আজকে আমাদের আলোচনার বিষয়ঃ পুরুষ চরিত্র পর্ব ১। যা মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের পাঁচটি উপন্যাসে জীবন ও সমাজ এর মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের উপন্যাস জীবন এর অন্তর্গত।

পুরুষ চরিত্র পর্ব ১
আলোচিত উপন্যাসগুলোতে পুরুষ চরিত্রের সংখ্যা অর্ধশতের উপরে। এর মধ্যে ‘শহরতলী’ তে পুরুষ চরিত্রের সংখ্যা সবচেয়ে বেশি, বাইশটি। ‘চতুষ্কোণ’ উপন্যসে সবচেয়ে কম; চারটি। এই চরিত্রগুলো সমাজের বিভিন্ন স্তরের পেশায় কর্মরত। চাকরি, ব্যবসা, ডাক্তারি, কবিরাজি, শ্রমিক, ফেরিওয়ালা ইত্যাদি পেশায় তারা নিয়োজিত। আবার কেউ কবিতা লেখে, পত্রিকায় প্রুফ দেখে, কেউ বেকার। যুগ যুগ ধরে পুরুষরা সমাজের সম্মানীয় কাজে অধিষ্ঠিত থেকে নারীদের অবদমন করেছে। মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের পুরুষ চরিত্রগুলো এর ব্যতিক্রম নয়। নিচে আলোচিত উপন্যাসেঞ্চরুষ চরিত্রগুলোর পরিচয় দেওয়া হলো:
|
উপন্যাস |
চরিত্র |
পেশা |
মন্তব্য |
| জননী | শীতল | চাকরি | উপন্যাসের আদ্যোপান্ত জড়িয়ে আছে। |
| জননী | রাখাল | চাকরি, ব্যবসা | উপন্যাসের আদ্যোপান্ত জড়িয়ে আছে। |
| জননী | হারাণ | ডাক্তার | ১ম থেকে ৭ম পরিচ্ছেদ পর্যন্ত পাওয়া যায়। |
| জননী | বিধানচন্দ্র | চাকরি | উপন্যাসের আদ্যোপান্ত জড়িয়ে আছে। |
| জননী | বিমানবিহারী | প্রেসের মালিক | ৫ম পরিচ্ছেদে পাওয়া যায়। |
| জননী | কমল বাবু | ছাত্র | ৩য় থেকে ৮ম পরিচ্ছেদে পাওয়া যায়। |
| জননী | শঙ্কর | সন্যাসী | ৪র্থ থেকে ৬ষ্ঠ পরিচ্ছেদে পাওয়া যায়। |
| জননী | তারাশঙ্কর | চাকরি | ৮ম থেকে শেষ পরিচ্ছেদ পর্যন্ত পর্যন্ত। |
| জননী | কনকের স্বামী | চাকরি | ৯ম পরিচ্ছেদে পাওয়া যায়। |
| জননী | মোহিনী | ফেরিওয়ালা | উপন্যাসের আদ্যোপান্ত জড়িয়ে আছে। |
| জননী | বনবিহারী | কবি, বেকার | উপন্যাসের আদ্যোপান্ত জড়িয়ে আছে। |
| জীবনের জটিলতা | বিমল | ধনী যুবক | উপন্যাসের আদ্যোপান্ত জড়িয়ে আছে। |
| জীবনের জটিলতা | নগেন | ধনী যুবক | উপন্যাসের আদ্যোপান্ত জড়িয়ে আছে। |
| জীবনের জটিলতা | অধর | চাকরি | উপন্যাসের আদ্যোপান্ত জড়িয়ে আছে। |
| জীবনের জটিলতা | নগেনের কাকা | পেশার কথা পাওয়া যায় না। | ২য়, ৪র্থ, ১০ম পরিচ্ছেদে পাওয়া যায়। |
| জীবনের জটিলতা | কমলবাবু | ৪র্থ পরিচ্ছেদে পাওয়া যায়। | |
| জীবনের জটিলতা | প্রমীলার বাবা | চাকরি | উপন্যাসের আদ্যোপান্ত জড়িয়ে আছে। |
| জীবনের জটিলতা | হিউউড সাহেব | পেশার কথা পাওয়া যায় না। | ৫ম পরিচ্ছেদে পাওয়া যায়। |
| জীবনের জটিলতা | যুবক | বেকার | ৫ম পরিচ্ছেদে পাওয়া যায়। |
| শহরতলী ১ম পর্ব | নন্দ | গায়ক | উপন্যাসের আদ্যোপান্ত জড়িয়ে আছে। |
| শহরতলী ১ম পর্ব | সুধীর | শ্রমিক | উপন্যাসের আদ্যোপান্ত জড়িয়ে আছে। |
| শহরতলী ১ম পর্ব | ধনঞ্জয় | বেকার | উপন্যাসের আদ্যোপান্ত জড়িয়ে আছে। |
| শহরতলী ১ম পর্ব | মতি | শ্রমিক | উপন্যাসের আদ্যোপান্ত জড়িয়ে আছে। |
| শহরতলী ১ম পর্ব | সত্যপ্রিয় | কারখানার মালিক | উপন্যাসের আদ্যোপান্ত জড়িয়ে আছে। |
| শহরতলী ১ম পর্ব | জ্যোতির্ময় | কারখানার প্রচার বিভাগের পরিচালক | উপন্যাসের আদ্যোপান্ত জড়িয়ে আছে। |
| শহরতলী ১ম পর্ব | পরেশ | শ্রমিক | ২য় পরিচ্ছেদে পাওয়া যায়। |
| শহরতলী ১ম পর্ব | জগৎ | শ্রমিক | ২য় থেকে ৪র্থ পরিচ্ছেদে পাওয়া যায়। |
| শহরতলী ১ম পর্ব | ভরদ্বাজ | শ্রমিক | ২য় পরিচ্ছেদে পাওয়া যায়। |
| শহরতলী ১ম পর্ব | কেষ্টবাবু | চাকরি | ৩য় পরিচ্ছেদে পাওয়া যায়। |
| শহরতলী ১ম পর্ব | মহীতোষ | পেশার কথা পাওয়া যায় না। | ৫ম পরিচ্ছেদে পাওয়া যায়। |
| শহরতলী ২য় পর্ব | ‘ধনঞ্জয় | বেকার | উপন্যাসের আদ্যোপান্ত জড়িয়ে আছে। |
| শহরতলী ২য় পর্ব | রাজেন | চাকরি | উপন্যাসের আদ্যোপান্ত জড়িয়ে আছে। |
| শহরতলী ২য় পর্ব | জ্যোতির্ময় | চাকরি | উপন্যাসের আদ্যোপান্ত জড়িয়ে আছে। |
| শহরতলী ২য় পর্ব | সত্যপ্রিয় | কারখানার মালিক | উপন্যাসের আদ্যোপান্ত জড়িয়ে আছে। |
| শহরতলী ২য় পর্ব | অজিত | চাকরি | ২য় থেকে শেষ পরিচ্ছেদ পর্যন্ত পাওয়া যায় । |
| শহরতলী ২য় পর্ব | রমেন | ছাত্র | ৪র্থ পরিচ্ছেদে পাওয়া যায় । |
| শহরতলী ২য় পর্ব | যামিনী | ঘর জামাই | ৫ম থেকে শেষ পরিচ্ছদ পর্যন্ত পাওয়া যায়। |
| শহরতলী ২য় পর্ব | কবিরাজ | একটি দৃশ্যে পাওয়া যায় । | |
| শহরতলী ২য় পর্ব | ডাক্তার | একটি দৃশ্যে পাওয়া যায় । | |
| শহরতলী ২য় পর্ব | বিধুবাবু | শ্রমিক নেতা | ৬ষ্ঠ পরিচ্ছেদে পাওয়া যায়। |
| শহরতলী ২য় পর্ব | মহীতোষ | উপন্যাসের আদ্যোপান্ত জড়িয়ে আছে। | |
| অহিংসা | আশ্রমের মালিক | উপন্যাসের আদ্যোপান্ত জড়িয়ে আছে। | |
| অহিংসা | সদানন্দ |
আশ্রমের গুরু |
উপন্যাসের আদ্যোপান্ত জড়িয়ে আছে। |
| অহিংসা | শ্রীধর | দোকানদার | উপন্যাসের আদ্যোপান্ত জড়িয়ে আছে। |
| অহিংসা | নারায়ন | রাজপুত্র | ১ম থেকে ৩য় পরিচ্ছেদে পাওয়া যায়। |
| অহিংসা | মহেশ চৌধুরী | গ্রামের সম্ভ্রন্ত ব্যক্তি | উপন্যাসের আদ্যোপান্ত জড়িয়ে আছে। |
| অহিংসা | বিভূতি | স্বদেশী | উপন্যাসের আদ্যোপান্ত জড়িয়ে আছে। |
| অহিংসা | শশধর | মহেশ চৌধুরির বাড়ি আশ্রিত | ৫ম থেকে শেষ পরিচ্ছেদে পাওয়া যায়। |
| অহিংসা | কল্যাণীর বাবা | আশ্রমে আশ্রিত | একটি দৃশ্য। |
| চতুষ্কোণ | রাজকুমার | শিক্ষিত, সম্ভ্রান্ত যুবক | উপন্যাসের আদ্যোপান্ত জড়িয়ে আছে। |
| চতুষ্কোণ | অজিত | ডাক্তার | উপন্যাসের আদ্যোপান্ত জড়িয়ে আছে। |
| চতুষ্কোণ | শ্যামল | ছাত্র | উপন্যাসের আদ্যোপান্ত জড়িয়ে আছে। |
| চতুষ্কোণ | স্যার কে এল | ব্যাবসা | উপন্যাসের আদ্যোপান্ত জড়িয়ে আছে। |
মানুষ এক সময় সংগ্রাম করেছে মানুষের বিরুদ্ধে; পরে মানুষ তার সংগ্রাম বিস্তার করেছে প্রকৃতির দিকে। কিন্তু আধুনিক মানুষ আবিষ্কার করে তার নিজের মধ্যেই আর এক ‘আমি’র বাস এবং তার সংগ্রাম বা বোঝা-পড়া নিয়ত সেই মানুষটির সঙ্গে। তাই আধুনিক কালের মানুষ আত্মপ্রতিপক্ষপ্রবণ। মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় মানুষের ভেতরের এই নিঃসঙ্গতাকে তুলে ধরেছেন।
‘জননী’ উপন্যাসে শীতল এমনই একজন নিঃসঙ্গ বিচ্ছিন্ন মানুষ। স্ত্রী, পুত্র, কন্যা সকলের সঙ্গেই তার দুরত্বের সম্পর্ক। কারো সঙ্গেই তার বন্ধুত্ব গড়ে ওঠেনি। মানিকের উপন্যাসে প্রায় সবগুলো চরিত্রই নিঃসঙ্গ মানুষ, কেবল একেকজনের আঙ্গিক একেক রকম। ‘দিবারাত্রির কাব্যে’ হেরম্ব নিঃসঙ্গ, কিন্তু শীতল আর হেরম্বের মধ্যে ব্যবধান বিস্তর। হেরম্ব মধ্যবিত্ত শ্রেণির বুদ্ধিজীবী, শীতলের পরিপ্রেক্ষিতে সে অনেকটা বিলাসী চরিত্র।
শীতল মধ্যবিত্ত শ্রেণির হতে পারতো, কিন্তু নিজের দোষে সে নিম্নমধ্যবিত্ত শ্রেণিতে পরিণত হয়েছে। শহরতলীতে শীতলের একটা বাড়ি আছে, আর নিজের একটা প্রেস আছে। কিন্তু প্রেসটি সে শেষ রক্ষা করতে পারে না। শীতলের প্রকৃতি সম্পর্কে লেখক বলেছেন:
“যেসব বোকার দল চিরকাল বুদ্ধিমানদের ভোজ দিয়া আসিতেছে, সে ছিল তাহাদের রাজা।” (১খ,পৃ-১৭)
সে বন্ধুদের টাকা ধার দিত, মোটা অঙ্কের চাঁদা দিত, থিয়েটারের বক্স ভাড়া করত, বন্ধুদের মদ ও অন্যান্য চাহিদা মেটাত। সে পরিস্থিতির কাছে অসহায় “সে জানিত বোকা পাইয়া সকলে তাহার ঘাড় ভাঙ্গে, তবুও ঘাড় ভাঙ্গিতে না দিয়াও
সে পারিত না।” (১খ, পৃ-১৭)
এভাবে সকলের কাছে নিজের মনকে ‘গড়ের মাঠ প্রমাণ করে শ্যামার বিয়ের চার বছর পর প্রেসটি সে বিক্রি করে দিয়ে নিজে নিঃস্ব হলো। ফ্রয়েডের মতে, মানুষের স্বাভাবিকভাবেই অস্বাভাবিক প্রবণতা রয়েছে। শীতলের ক্ষেত্রে এই অস্বাভাবিক প্রবণতার বাহুল্য দেখা যায় ।
শীতল একজন নিষ্ক্রিয় মানুষ। স্ত্রী, পুত্র, কন্যার প্রতি দায়িত্ব পালন করে না। সংসারের কোনো বিষয়ে তার কোনো ভ্রূক্ষেপ নেই। সে নিজের নিয়মেই চলে। মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় শীতল চরিত্রটি অস্তিত্ববাদ, বিচ্ছিন্নতাবাদ এবং নৈরাশ্যবাদের সমন্বয়ে গড়েছেন, যা বাস্তব সমাজের প্রতিনিধিত্ব করে। বিয়ের পর থেকেই শ্যামার সঙ্গে তার ভালো সম্পর্ক নেই। সে কাউকে ভালোবাসে না।

বিধানের জন্মের পর তার মধ্যে বাৎসল্য রস এসেছিল, দু-এক দিন বিধানকে সে কোলে নিয়েছে, এমনকি শ্যামাকে ফাঁকি দিয়েও নিয়েছে কিন্তু ওই পর্যন্তই। বিধানের বেড়ে ওঠার সঙ্গে সে এগিয়ে যায় নি, শিশু বিধানের সঙ্গে তার তাই মানসিক দূরত্ব তৈরি হয়েছে।
কমল প্রেসে চাকরি নিয়ে সে আর বন্ধুদের দিকে ঝোঁকেনি, তাই আরো নিঃসঙ্গ হয়ে পরে। মন খেয়ে একা একা ফুর্তিও জমে না, কোনো মেয়ের বাড়িতেও আর ভালো লাগে না। সংসারে তার যোগাযোগ কখনোই ছিল না। সে ছিটগ্রস্ত, বদমেজাজি। সঙ্গতঃ কারণে সে হয়ে পরে পরোপুরি একটি নিঃসঙ্গ মানুষ:
“শ্যামার সঙ্গে গোড়া হইতে মনের মিল করিয়া রাখিলে এখন সে বাড়িতেই একটি সুখদুঃখের সঙ্গী পাইত, … … …” (১খ, পৃ-৩৭)
কিন্তু শ্যামাকে সে সঙ্গী হিসেবে পেলো না:
“ যে এক দিন সম্পূর্ণভাবে তাহারই ছিল, সে ক্রমশ তাহার নিকট হইতে দূরে সরিয়া সংসাররূপ বিরাট যন্ত্রের গলার বরমাল্য অর্পণ করিয়াছে।
শীতলের এই নিঃসঙ্গ জীবনে বকুল একমাত্র আশার আলো। বকুলকে সে ভালোবাসে। বকুলও বাবার জন্য প্রায় পাগল। পায়েস খায় নি বলে শ্যামা বকুলকে মারলে শীতল বকুলকে বাইরে নিয়ে নতুন জামা, খেলনা কিনে দেয়, খাওয়ায় এবং তাকে নিয়ে বিভিন্ন জায়গায় ঘুরে আসে। বকুলের প্রতি কর্তৃত্ব দেখানোর জন্য শ্যামা গোপনে বকুলকে মামার সঙ্গে বনগাঁ পাঠায়। এতে শীতল রেগে যায়।
কমল প্রেস থেকে সে টাকা চুরি করে শ্যামাকে এক হাজার টাকা দিয়ে কাউকে কিছু না বলে বনগাঁ থেকে বকুলকে নিয়ে উধাও হয়ে যায়। এর সঙ্গে ‘দিবারাত্রির কাব্যে’র অনাথের তুলনা চলে। আনন্দও তার পিতা অনাথের ভক্ত। সে মায়ের চেয়ে বাবাকেই বেশি পছন্দ করে। শীতলের সঙ্গে অনাথের পার্থক্য অনাথ একবারে বাড়ি ছেড়ে চলে যায়।
কিন্তু সে মেয়েকে নিয়ে যায় না। অনাথও ছন্নছাড়া খেয়ালি মানুষ, তারও স্ত্রীর সঙ্গে সম্পর্ক ভালো না। তবে অনাথ সক্রিয় মানুষ, কারো ওপর নির্ভরশীল নয়। কিন্তু শীতল সক্রিয় নয়, শুধু বকুলকে নিয়ে শ্যামার ওপর প্রতিশোধ স্পৃহা জেগে ওঠলে তখনই সে সক্রিয় ভূমিকা পালন করে।
শীতল খেয়ালি মানুষ। বর্তমান এবং ভবিষ্যৎ সম্পর্কে সম্পূর্ণ উদাসীন। তার ভেতরে কোনো কর্তব্যবোধও জাগে না। ঋণ শোধের জন্য সে শ্যামার সেভিংস বই নিয়ে গিয়ে ঋণ শোধ না করে উধাও হয়ে যায় এবং সব টাকা শেষ করে মাত্র একশো টাকা নিয়ে বাড়ি ফেরে। যেখানে ছেলেমেয়েদের মুখে দুবেলা দুমুঠো ভাত তুলে দিতে শ্যামা হিমশিম খাচ্ছে, সেখানে শীতলের এই টাকা উড়ানো স্বভাব পাগলাটে খেয়ালি মানুষেরই পরিচয় বহন করে। নিজের খেয়ালে সে যে শুধু খারাপ কাজই করে তা নয়, মাঝে মাঝে প্রেমিকও হয়ে ওঠে। খেয়ালের বশেই সে শ্যামাকে প্রেমের কথা শোনায়:
“বুড়ো বয়সে তোমার যে চেহারার খোলতাই হচ্ছে গো, বয়েস কমছে নাকি দিনকে দিন?” (১খ,পৃ-৪৬)
আবার শ্যামার পরনে একটি ছেঁড়া কাপড় দেখে সে অফিসের উপরি পাওনা থেকে শ্যামার জন্য একটি রঙিন শাড়ি এনে দেয়। খেয়ালের বশে শীতল সবচেয়ে বিস্ময়কর যে কাজটি করে তা হলো, শীতলের বাড়িটি শ্যামার নামে লিখে দেওয়া। শ্যামা বিস্মিত হয়
“শ্যামার মনে হয় শীতলকে সে চিনিতে পারে নাই। মাথায় একটু হিট আছে, ঝোঁকের মাথায় হঠাৎ যা তা করিয়া বসে, কিন্তু বুকখানা স্নেহমমতায় ভরপুর।” (১খ, পৃ-৬৫)
শীতল বাড়ির কর্তা হলেও সে দায়িত্ব এড়িয়ে চলে, কিন্তু মাঝে মাঝে নিজের পৌরুষ আর কর্তাগিরি ফলানোর জন্য আস্ফালন করে। শ্যামা নিজের উদ্যোগে দোতলায় ঘর তুলছে, কাজ দেখছে, সারাদিন হাড় ভাঙা পরিশ্রম করছে, শীতল সেদিকে ফিরেও চায় না। কিন্তু কর্তৃত্ব করার জন্য সে মিস্ত্রিদের কাজে বিভিন্ন ভুল ধরিয়ে দেয়। এতে করে আরো কাজের ক্ষতি হয়। আবার বিধানের পড়ার সময় বিভিন্ন হাস্যকর উপদেশ দেয়। তখন বিধান বই থেকে একটি ইংরেজি শব্দের অর্থ জানতে চাইলে শীতল মানের বই দেখতে বলে, বিধান খিল-খিলিয়ে হাসে। শ্যামা বৈষয়িক ব্যাপারে অতিরিক্ত মাথা ঘামায় বলে তাকে জব্দ করার জন্য শীতল বলে:
“জন্তুর মতো হয়েছো তুমি, তোমার সঙ্গে একনও কথা কইলে মানুষের ঘেন্না জন্মে যায় [… […] বাজারের বেশ্যা মাগীগুলো তোমার চেয়ে ভালো, তারা হাসিখুশি জানে, ফুর্তি করতে জানে। রক্ত-মাংসের মানুষ তুমি নও, লোভ করার যস্তর। ( ১খ, 9.-20)
নিজের জেদ বজার রাখতে গিয়ে শীতল দু’বছরের জেল খাটে। স্ত্রী-সন্তানদের কাছ থেকে দূরে চলে যায়। যে বকুলের জন্য শীতল জেদ করেছিল, সেই বকুলও তাকে অস্বীকার করে।
“ও আমার বাবা না।” (১খ, পৃ-৯২) বকুলের এই মনোভাবে শীতলের কোনো আবেগ দেখা যায় না, তার কোনো আফসোসও নেই। সে বকুলকে কাছে টানার কোনো চেষ্টাও করে না। সকল বিষয়েই সে নিরাসক্ত। শুধু যা ঘটে তাকেই সে মেনে নেয় । নিজে থেকে কিছু ঘটাবার চেষ্টা আর করে না।
শীতল চরিত্রে ব্যক্তিত্ব ও অভিমান বলে কি কিছু নেই? আছে। তাই সে জেল থেকে ছাড়া পেয়ে বনগাঁ না গিয়ে হাড়কাঁপানো শীতে একটি আলোয়ান গায়ে দিয়ে শহরতলীর নিজের বাড়িতে একা পড়ে থাকে কাউকে কোনো খবরও দেয় না। স্ত্রী, সন্তান, বোন কেউ-ই যেন তার আপন নয়। জগৎ সংসার সকলের প্রতিই তার অভিমান ।
জেল থেকে ছাড়া পাওয়ার পর শীতল আরো একা হয়ে পরে, সে হয়ে পরে বিচ্ছিন্ন মানুষ। তার আচার-আচরণ হয়ে পরে নৈরাশ্যবাদী। শীতল জেল থেকে ছাড়া পাওয়ার পর অসুখ থেকে সেরে ওঠে। এদিকে বাড়ি বিক্রির টাকা শেষ হয়ে গেলে শ্যামা চোখে অন্ধকার দেখে, বিধানের পড়ার খরচ জোগানো তার পক্ষে অসম্ভব হয়।

তখন শ্যামা শীতলকে একটি চাকরি করতে বলে। শীতল প্রতি-উত্তরে বলেছে এতো দিন বাড়ি বিক্রির টাকা দিয়ে সব চলেছে পরোক্ষভাবে তা তো শীতলেরই টাকা। উপায় না দেখে শ্যামা রাখালকে বলে একটি চাকরি জোগার করে দিতে। রাখাল চাকরির খোঁজ আনলে শীতল বলে
“অসুখ যে আমার, আমি পারবো কেন? কলম ধরলে আমার যে হাত কাঁপে, আমি যে লিখতে পারিনে রাখাল। ” ( ১, পৃ-১০০ )
এই সময়ে শীতলের কোনো আশা আকাঙ্ক্ষা নাই, বেঁচে থাকার দুর্নিবার ইচ্ছে নাই। যেন মরে যাচ্ছে না, তাই সে বেঁচে আছে। বনগাঁয় তার একমাত্র সঙ্গী হয় একটি কুকুর। আর কলকাতায় বিধানের ভাড়া করা বাড়িতে আসার পর শ্যামার অন্ধ মেয়েটি হয় তার সঙ্গী। নীতল যেন বিচ্ছিন্ন এক দ্বীপের একা বাসিন্দা। শেষের দিকে শীতল একেবারে নির্লিপ্ত হয়ে পরে। তাকে রোদে বসালে সে বসে, লেপ দিয়ে গা ঢেকে দিলে কিছু বলে না, না দিলেও কিছু বলে না- এমনি করে এক দিন সে মৃত্যুকে বরণ করে।
উপন্যাসের প্রথমে শীতলের চাকরির বিষয়ে একটি অসঙ্গতি চোখে পরে। ১৮ পৃষ্ঠায় লেখা আছে, ‘অনেকদিন প্রেসের মালিক হইয়া থাকার গুণে একটা প্রেসের ম্যানেজারির চাকরি শীতল মাস ছয়েক চেষ্টা করিয়াই পাইরাছিল। শ্যামা প্রথমবার মা হওয়ার সময় শীতল এই চাকরিই করিতেছিল।’ আবার, ৩৭ পৃষ্ঠায় আছে, ‘কমল প্রেসে চাকরি পাওয়ার আগে সে দেড় বছর বেকার বসিয়াছিল,’।
শীতল সারাজীবন নৈরাশ্যবাদী এবং দায়িত্বহীন ভাবে কাটিয়েছে কিন্তু তার ছেলে বিধান সম্পূর্ণ উল্টো মানুষ। বিধান দায়িত্ববান, স্নেহপ্রবণ, কর্তব্য সচেতন। তার মধ্যে আশাবাদ প্রতীয়মান। একটি পথ বন্ধ হয়ে গেলে সে অন্য পথের সন্ধানে সদা তৎপর। তবে বিধান শুধু তার পরিবারের কথাই চিন্তা করেছে, বিয়ে করে তার স্ত্রী সুবর্ন সম্পর্কে সচেতন হয় নি। সুবর্ণকে শ্যামা অত্যাচার করছে জেনেও চুপ করে থেকেছে, নিজে নিজে চিন্তা করে উপায় খোঁজার চেষ্টা করেছে। কিন্তু মাকে কিছু বলে নি, পাছে মা কষ্ট পায়:
মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় বিধান চরিত্রটি জন্ম থেকে বড় করে তুলেছেন। বিধান দৃঢ়চেতা এবং নিজের সিদ্ধান্তে অটল। ছোট থেকেই সে নিজের অস্তিত্ব সম্পর্কে সচেতন
“বিধানের বাল্যজীবনে যে বৈশিষ্ট্যের ইঙ্গিত দেওয়া হইয়াছে, ভবিষ্যতে তাহার বিশেষ কোনো সার্থকতা দেখা যায় না। সে যৌবনের প্রারম্ভ হইতেই নিজ ব্যক্তিগত আশা-আকাঙ্ক্ষা বর্জন করিয়া সংসারের কার্যেই আত্মনিয়োগ করিয়াছে, মাতাল দুর্বল, কম্পিত হস্ত হইতে পরিচালনা ভার গ্রহণ করিবার জন্য প্রস্তুত হইয়াছে। শ্যামার ন্যায় তাহার জীবনেও প্রায় মুকুলিত হইবার অবসর পায় নাই- তাহার বিবাহ সংসার রসবার অঙ্গ-স্বরূপ।
বিধান চরিত্রের অন্যতম দিক হলো সে নীরবে কাজ করে। সে নিজের ভেতরে রাগ ক্ষোভ পুষে রেখে ঠিক সময়ে গর্জে ওঠে। সুপ্রভা যখন তাকে মায়ের দিকে তাকাতে বলে, বলে তার মায়ের শরীর ভালো না তখন সে রাগান্বিত হয়:
“বিধানের দু চোখ ভরা রোষ, বলিল, তবু তো খাটিয়ে মারছেন।” (১খ, পৃ-১০২)
শুধু তাই নয়, সুপ্রভার কথার ভরসায় সে নাই, আগেই সে বুঝেছে তার মাকে বনগাঁ থেকে সরাতে হবে। তাই বি এ পাস করার আগেই সে চাকরি নিয়েছে। কারো সঙ্গে কোনো পরামর্শ ছাড়া, পড়া বাদ দিয়ে চাকরি নেওয়া এবং সবাইকে নিয়ে কলকাতা থাকার সিদ্ধান্ত বিধান একাই নেয়। সে সবাইকে নিয়ে কলকাতা যাওয়ার কথাও বলে। এবং নিজের ভাড়া করা বাড়িতে সবাইকে নিয়ে ওঠে। প্রতিটি ক্ষেত্রেই বিধান নিজের সিদ্ধান্তে অটল। নিজের সিদ্ধান্তে অটল হলেও সে মাকে কখনো কষ্ট দেয় নি। এমনকি চাকরি নেওয়ার পর ভয় পেয়েছে। আশাভঙের কষ্ট যদি শ্যামা পায়।
“বিধান ভাবিয়াছিল সে দুশো চারশো টাকার চাকরি করিবে এই প্রত্যাশায় শ্যামা দিন শুনিতেছে, নব্বই টাকার চাকরি শুনিয়া সে যদি খেপিয়া যায়।” (১খ, পৃ-১02)
কিন্তু বিধানের চিন্তার উল্টোটাই ঘটলো। এই বয়সে মুরুব্বি ছাড়া চাকরি পেয়েছে বিধান, শ্যামা গর্বই করেছে। কলকাতায় তাদের পাশের ঘরে থাকে সরযূ ও তার পরিবার। সরযূর ছোট মেয়ে শামু বিধানের কাছে পড়া জানতে আসে। উদ্ধত যৌবনা শামুকে শ্যামা পছন্দ করে না। বিধান টের পেয়ে বাড়ি বদল করে তাদের নিজেদের বাড়ি ভাড়াটে হয়ে আসে। কিন্তু শামুকে বিধান ভুলতে পারে না। তাই মায়ের পছন্দ করা মেয়েকে বিয়ে না করে অনেকটা শামুর মতো বাড়ন্ত মেয়ে সুবর্ণকে বিয়ে করে। শ্যামা সুবর্ণকে দেখতে পারে না:
“বিধান সব বোঝে। চিরকাল বুঝিয়া আসিয়াছে। সুবর্ণ এখনও জানে না যে বুঝিয়াও বিধান কোনোদিন কিছু বলে না, চুপচাপ নিজের কাজ করিয়া যায়, চুপচাপ উপায় ঠাওরায়। বনগাঁয় শ্যামা একবার পাগল হইতে বসিয়াছিল এবারও সেই রকম আরম্ভ হইয়াছে দেখিয়া বিধান কম ভয় পায় নাই, প্রতিবিধানের উপায় শুধু সে খুঁজিয়া পাইতেছে না।” (১২, পৃ-১২২)
বিধান সংসারের পুরো দায়িত্বই মাথায় তুলে নিয়েছে।
ভাইয়ের স্কুলের বেতন দিতে গিয়ে তাকে পায়ে হেঁটে অফিসে যেতে হয়। বকুল সন্তানসম্ভবা হলে তাকে এনে রাখতে হয়। বকুলের স্বামী মোহিনীকে নিমন্ত্রণ করে খাওয়াতে হয়। বিধানের কোনো অভিযোগ নেই। শ্যামা যেমন আপন কাঁধে সংসারের বোঝা তুলে নিয়েছিল, বিধান যেন সেই শ্যামারই অন্য রূপ। বিধানের চরিত্র অংকনে মানিক বরন্দ্যাপাধ্যায় সমাজ জীবনের অতি স্বাভাবিক চিত্র এঁকেছেন।
এখানে অনাবশ্যক অশ্রু বিসর্জন, লোক দেখানো মহত্ত্ব, কিংবা অবাস্তব রোমান্টিকতা নেই। মানুষের জীবনের অন্তর্নিহিত সত্য প্রকাশিত হয়েছে। পারিপার্শ্বিকতার সংঘাতে মানবসত্তার যে বিভিন্ন পরিবর্তন সংঘটিত হয়- তারই জীবরূপ বিধান চরিত্র। ‘নাগপাশ’ উপন্যাসের নরেনের সঙ্গে বিধানের তুলনা চলে। তবে, নরেন গ্রাজুয়েট। সে আশি টাকা মাইনেতে চাকরি নিয়ে বিশ্বাन হবার সাধকে বিসর্জন দেয়। নরেন সম্পর্কে বলা হয়েছে:
“বুদ্ধি ছিল, আকাঙ্ক্ষা ছিল, চেষ্টা ছিল। ব্লু-বল্টু আলগা হয়ে নড়বড়ে হয়ে যাওয়া সেকেলে একটা ধীর মন্থর পরিবারের ছেলে হয়েও লেখাপড়া শেখার জন্য, জ্ঞান লাভ করার জন্য, তার সক্রিয় উৎসাহ-উদ্দীপনা দেখে আত্মীয়স্বজন, পাড়ার লোকে তারিফ করত।” ( ৮২, পৃ.-৪১৬)
তবে, নরেনের স্বাধীন জ্ঞান লাভের উৎসাহ কমে যায় না, বরং তা অব্যাহত থাকে। কিন্তু শেষ পর্যন্ত সে চাকরিটি ধরে রাখতে পারে না, তাই তার পরিবারের লোক বিরূপ হয়। বিধানের জীবন এতো জটিল হয় নি, সংসারে সে নিজের আসন অনড় রেখেছে।
‘জননী’ উপন্যাসে আরো দুটি রহস্যময় চরিত্র রাখাল এবং হারাণ ডাক্তার। এই চরিত্র দুটির তল শ্যামা খুঁজে পায় নি। শ্যামা বিয়ের পর দ্বিতীয়বার শ্বশুরবাড়ি এসে চোখে অন্ধকার দেখেছিল, অসুস্থ মা এক ঘরে পড়ে আছে, সারা বাড়িময় কোনো আলো নেই, দুটি লণ্ঠন টিম টিম করে আলো ছড়াচ্ছে, উঠানে পোড়া কয়লা ছাই ও হাজার রকম জঞ্জালের গাদা, দেয়ালে দেয়ালে ঝুল, পায়ের তলে ধুলাবালির স্তর।
এই অবস্থায় রাখাল শ্যামাকে সাহায্য করেছে। রাখাল উদ্যোগ নিয়ে বাড়িঘর সাফ করাল, কুকারের বদলে পাচক আসলো এবং ঠিকা ঝির পরিবর্তে দিবারাত্রির পরিচারিকা। মন্দার অসুখের জন্য যে পাঁচ-ছয় মাস ওরা এখানে ছিল সেই সময়টা শ্যামার ভালো কেটেছিল। রাখাল ছিল শ্যামার উপকারী বন্ধু:
“সে সময় মতো স্নানাহার করে কিমা রাখাল সে দিকে নজর রাখিত, হাসি-তামাশায় তাহার বিষণ্নতা দূর করিবার চেষ্টা করিত, শ্যামার বয়সোচিত ছেলেমানুসিগুলি সমর্থন পাইত তারই কাছে।” (১, পৃ-১৪)
রাখালের চরিত্রে ফ্রয়েডীয় তত্ত্ব দেখা যায়। স্ত্রীর সম্পর্কে এতোদিন সে নির্বিকার ছিল যখন শ্যামা এলো সে সক্রিয় হয়েছে। পাগলাটে শীতলকে শ্যামা ভয় পেত। রাখাল তাকে শীতলের হাত থেকে বাঁচাত। শুধু তাই নয়, নারীঘটিত দোষে সে পরেও দোবী হয়েছে যখন ঘরে তিন সন্তানের জননী থাকা সত্ত্বেও সুন্দরী সুপ্রভাকে সে বিয়ে করে। এই বিয়ের জন্য শ্যামা তাকে কোনো দিন ক্ষমা করতে পারে নি মন থেকে।
রাখাল একজন চতুর ব্যক্তি। শীতলের বিরুদ্ধে শ্যামার পক্ষ নেওয়া বিপজ্জনক, শীতল কিছু মনে করতে পারে, কিন্তু রাখাল এতোই চালাক ছিল যে সবদিকে সামলিয়ে চলার শক্তি তার ছিল। রাখাল সম্পর্কে শ্যামার অভিমত:
“লোকটার প্রকাণ্ড শরীরে যে মনটি ছিল তাহা শিশুর না শয়তানের কোনো দিন তাহা সঠিক জানিবার ভরসা শ্যামা রাখে না।” (১খ, পৃ-১৭)
সময়ে মানুষের পরিবর্তন হয়। রাখালও এর ব্যতিক্রম নয়। সাত-আট বছর পর শ্যামার ছেলে হলে রাখাল যখন বনগাঁ থেকে এলো তখন সে অন্য মানুষ, শ্যামা এবং তার ছেলে সম্পর্কে তার কোনো কৌতূহল নেই। ছেলের গাল টিপে আদর করে যেন রাখাল অপমানই করলো। এর পরের বার এসে রাখাল শীতলের কাছ থেকে ছলেবলে সাত শো টাকা নিয়ে যায়। তখন রাখালের চতুরতা শ্যামার কাছে আরো ধরা পরে।
রাখাল সংসারী মানুষ। বৈষয়িক ব্যাপারে সুনিপুণ। শীতল জেলে যাওয়ার পর শ্যামার অত্যন্ত খারাপ অবস্থা হয়, তখন শ্যামা সেই সাতশো টাকার কথা বললে রাখাল নিজেকে গরিব বলে, টাকা দিতে অস্বীকার করে। কিন্তু কোনো উপায় না দেখে শ্যামা যখন রাখালের আশ্রয়ে যায় তখন বুঝতে পারে রাখাল রীতিমত বড়লোক। সে সামান্য চাকরি করে ঠিক কিন্তু তার অনেক জমি আছে, অনেক টাকা সুদে খাটে। শ্যামা এসব দেখে বুঝতে পারে জগৎই এমন:
“এমন করিয়া মিথ্যা বলিতে না জানিলে, স্থল ও প্রবঞ্চনার এমন দক্ষতা না জন্মিলে সকালে উঠিয়া দশ-বিশটি খাতকের মুখ দেখিবার সৌভাগ্য মানুষের হয় না।” (১খ, 1-৮১)

রাখাল যে দয়ালু নয় তাও নয়, তার ভেতরেও মনুষ্যত্ব আছে। তাই নিজের কাজ ফেলে জেল থেকে ছাড়া পাওয়া শীতলকে সে আনতে যায়, শ্যামাকে সঙ্গে নিয়ে। শীতলের চাকরি জোগাড় করে দেয়, সবাইকে থাকতেও দেয়।
রাখাল চরিত্রটি একটি জীবন্ত চরিত্র। আমাদের সমাজে এ রকম চরিত্রের অভাব নেই। সে দূরদৃষ্টিসম্পন্ন, একই সঙ্গে তার ভেতরে ভালো এবং মন্দ দুটি দিকই বিদ্যমান।
হারাপ ডাক্তারও একটি সক্রিয় চরিত্র। সে রহস্যময়, নিজেকে কারো সামনে উন্মোচিত করে না। সে একজন কর্তব্যপরায়ণ, নীতিবান এবং মানবিক গুণসম্পন্ন ডাক্তার। শিশু বিধানের জ্বর হলে শ্যামা তাকে ডেকে পাঠায়, দেরি না করে সে শ্যামার বাড়ি আসে। প্রথম কথাতেই সে সচেতনতার পরিচয় দেয়:
“ কেঁদো না বাচ্ছা। রোগ নির্ণয় হবে না।” (১খ, পৃ-৩৩) হারাপ ডাক্তারের চিকিৎসার ধরন এবং আন্তরিকতায় শ্যামা তাকে বাবা বলে সম্বোধন করে। শ্যামার মনে হয়।
“জীবন মরণের ভার যে ডাক্তার পান চিবাইতে চিবাইতে লইতে পারে, সেই তো ডাক্তার, I… … …]”(১২, পৃ-৩৩)
হারাপ ডাক্তারের বড় গুণ সে গম্ভীর নয়, রোগীর আত্মীয়স্বজনের সঙ্গে ভাব জমাতে পারে, রোগীকে সে নিজের করে নেয়। শ্যামার বাবা ডাকে সে তাকে সত্যিই মেয়ে বানিয়ে ফেলে। শ্যামা এবং বকুলের মধ্যে হারাণ তার নিজের মেয়ে এবং নাতনির ছায়া খুঁজে পায়। হারাণ বারবার শ্যামাকে সাহায্য করেছে।
বনগাঁ থাকার সময় শ্যামার বাড়িতে ভাড়াটে না থাকলেও সে শ্যামার নামে পঁচিশ টাকা করে মনিঅর্ডার পাঠিয়েছে। জেল থেকে ছাড়া পাওয়ার পর অসুস্থ শীতলের সঙ্গে সে বনগাঁ এসছে। কিন্তু সে কারো কাছে কৃতজ্ঞতা চায় না। বনের পাখি যেমন আপন মনে গান গায়, সেও তেমনি আপন মনে সকলের উপকার করে। মানুষের প্রতি এ যেন তার দায়।
‘যোগাযোগ’ উপন্যাসে বিপ্রদাসকে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর যেমন করে এঁকেছিলেন। সে কারো দায় এড়াতে পারে না। হারাণ ডাক্তারকে বিপ্রদাসের সঙ্গে তুলনা করা যায় । হারাণ ডাক্তারের একটি শিশুর মতো মন আছে। তাই সে বকুলের ঢেঁকিঘরে বকুলের সঙ্গে গল্প করে। সে নিজেকে উন্মোচিত করে না। শুধু জানা যায় তার ভেতরে একটি কোমল মন আছে। তাই তার মৃত্যুর পর শ্যামা আহাজারি করে
“মরিবে না? কপাল যে শ্যামার মন্দ। হারাণ বাঁচিয়া থাকিলে শ্যামার ভাবনা কী ছিল?” (১খ, পৃ-৯৩)
হারাণ এমনই অস্তিত্ববান যে মৃত্যুর পরও তাকে অস্বীকার করার উপায় নেই ।
শ্যামার মামা তারাশঙ্কর একজন রহস্যময় চরিত্র। সে শ্যামার বিয়ের পর সমস্ত সম্পত্তি বিক্রি করে একটি সম্ভ্রান্ত বিধবা মেয়েকে নিয়ে উধাও হয়ে যায়। বার বছর পর সে নিঃস্ব অবস্থায় শ্যামার বাড়ি আসে। শীতল এবং শ্যামা মনে করে তার কাছে প্রচুর গচ্ছিত সম্পদ আছে। কিন্তু সে শ্যামার হাজার টাকা খরচ করে ফেলে।
শ্যামার সাহায্যের জন্য সে একবার দোকান করে, কিন্তু পোষাতে পারে না। শ্যামার মেয়ে বকুলকে সে বিশেষ পছন্দ করে, আবার কাজের ঝি রানিকেও সে স্নেহ করে। রাণীর অসুস্থ হলে কলকাতা থেকে লুকিয়ে ডাক্তার এনে দেখায়। এখানে লেখক স্পষ্ট করে নি, কেন লুকিয়ে ডাক্তার আনার প্রয়োজন হলো। শ্যামার টাকা খরচ করে, শ্যামার কাছে বিদায় নিয়ে সে আবার নিরুদ্দেশের পথে যাত্রা করে।
মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের প্রতিটি উপন্যাসই মানুষের ভেতরের মানুষকে খুঁজে বের করেছে। রবীন্দ্রনাথের ‘আঁতের মানুষ’য়েরই যেন জীবন্ত রূপ। ‘জীবনের জটিলতায় মানব মনের জটিল গ্রন্থিগুলোর উন্মোচন আরো স্পষ্ট। ‘জীবনের জটিলতায় বিমলের বড় বেলার জীবন শুরু হয়েছে এভাবে:
“সারা বিকালটা ঘুরিয়াও পাঁচটা টাকা জোগাড় করা গেল না। আবার নগেনের কাছে হাতপাতা ছাড়া উপায় নাই।” ( ২খ, পৃ-১০৩)
বিমল বেকার, পত্র-পত্রিকায় তার কবিতা ছাপা হয় এই একমাত্র আয়ের উৎস। মানুষের জীবন নিয়ন্ত্রণ করে তার অর্থনৈতিক অবস্থা। মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় এই অর্থনীতিকে কখনো ভোলেন নি। তাঁর উপন্যাসের পাত্র-পাত্রীরা অর্থনৈতিক সমস্যায় জর্জরিত। জটিল মানুষের জীবন। বেঁচে থাকা এবং নিজের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখার সংগ্রামে সে সদা তৎপর।
‘জীবনের জটিলতায়’ প্রতিটি মানুষই অল্প এবং বৃহৎ পরিসরে নিজের অস্তিত্ব জানান দিয়েছে। বিমলের জীবনে বিভিন্ন টানাপোড়েন আমরা লক্ষ করি। কখনো সে বেকার, কখনো নগেনের অনুগ্রহে চাকরি করছে, কখনো চাকরি ছেড়ে আবার চাকরি খুঁজছে। সে লাবণ্যর প্রেমকে অস্বীকার করেছে কিন্তু শাস্তা তাকে জয় করেছে-এ ক্ষেত্রে সে প্রেমিক। অন্যদিকে ভাই বিমলের অবস্থান অনেকটা সক্রিয় । আর সন্তান হিসেবে মা-বাবার জন্য সে কিছু করতে পারে না। মায়ের কাছে তাকে প্রায়ই কথা শুনতে হয়।
“ছেলে যে মানুষ হইল না। নইলে কি এত কষ্ট হয়।” (২ব, পৃ-১০৩)
বিমল ইচ্ছে করে অমানুষ হয়ে থাকে না। উপার্জনের চেষ্টা সে করে, কিন্তু কোথাও পায় না। এ সম্পর্কে তারও মনোকষ্ট আছে। আকাশে-বাতাসে টাকা উড়ে না যে ইচ্ছে করলেই ধরা যায়। মুরুব্বির জোর না থাকলে কোথাও চাকরি পাওয়া যায় না। সংসারের বড় ছেলে হিসেবে বিমল দায়িত্ব পালনে অসমর্থ হচ্ছে কিন্তু তা নিয়তিরই নিমর্ম পরিহাস। ‘নাগপাশ’ উপন্যাসে নরেনের অবস্থা প্রায় একই রকম:
“মামার চেষ্টায় একটা চাকরি পেয়ে সেটা হারিয়ে আবার বেকার হবার কটা দিনের মধ্যে সকলের কাছে সে যেন চোর ছ্যাঁচড়ের চেয়ে অধম ঘরের শত্রু দাঁড়িয়ে গেছে। শুধু অবজ্ঞা করা নয়, তাকে ভাত খেতে না ডেকে, নিজে গিয়ে আসন পেতে খেতে বসলে তাকে ভাত দিতে স্পষ্ট অনিচ্ছা দেখিয়ে, তাকে যেন আঘাত করতে চায় মা আর বোনেরা।” (৮খ, পৃ-৪৪৭ )
তবে বিমল বোনের কাছে অত অপমানিত হয় নি। প্রমীলা তাকে বাঁকা কথা শুনিয়েছে কিন্তু অপমান করে নি, প্রমীলার কানের মাকড়ি বিমল না বলে নিয়ে বন্ধক রেখেছে তবু প্রমীলা বোনের অধিকারে কথা শুনিয়েছে, কিন্তু সীমা অতিক্রম করে ভাইকে সে অবজ্ঞা করে নি। নিজেদের জীবনের জটিলতায় তারা সম্রান্ত:
“এই উপন্যাসের নায়ক-নায়িকাগুলো বিকারগ্রস্ত। ভাববাদ ও বস্তুবাদের সংঘাতে তারা বিপর্যন্ত। এই উপন্যাসে আছে সেই সংঘাতেরই কাহিনী।
বিমল কবি। সে নিম্নমধ্যবিত্ত পরিবারের সন্তান। সংসারে তার কাছে উপার্জন আশা করে, বাবা মা, ভাইবোনদের সে হতাশ করে। তার কাছে ভালো আর ভদ্র অশীল গল্প চেয়ে সম্পাদক কেদার পায় না। বিমল সৎ লেখক:
“আমি ফরমাশি ফাঁকিবাজ সাহিত্যিক নই মিলি। তিনদিন সিগারেট না খেয়ে থেকেছি, নির্লজ্জের মতো টাকা ধার করেছি, কিন্তু বাজে লেখা একটিও লিখিনি । M (২, পৃ-১৫৭)
তারপরও সংসারের প্রয়োজনে বিমল রাত্রি ৩টা পর্যন্ত খেটেখুটে গল্প লিখে কেদারের হাতে দিল:
“কেদার বলিলেন, সাংঘাতিক গল্প। দিস তো রে এ রকম আর একটা দুটো। ” (২খ, পৃ-১৫৭)
এই গল্পটি বিমল ঠিক কী রকম গল্প লিখলো, তার ব্যক্তিত্ব বজায় থাকল কি না সে বিষয়ে মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় আমাদের অবহিত করেন নি। তবে বিমল চরিত্রের বড় দিক, সে আপস করে নি, বাস্তবের সঙ্গে লড়াই করার জন্য শেষ পর্যন্ত সক্রিয় হয়েছে।
বিমল আর প্রমীলার অস্বাভাবিক প্রেম-ই ‘জীবনের জটিলতার কাহিনীর মূল কথা। বিএ পাস, আধুনিক, উচ্চবিত্ত লাবণ্য বিমলকে ভালোবাসে। বিমল তাকে ডাকলে সে বাসরঘর থেকে চলে আসবে। কিন্তু বিমল লাবণ্যকে ভালোবাসতে পারল না। তাকে জয় করলো: “রয়েল রিডার-পড়া পরের বউ গেঁয়ো মেয়ে শাা।” (২খ, পৃ-১০৫)
মানুষের মনের গভীরতা এতই গভীর যে বাইরে থেকে তার কোনো হিসাব মেলানো যায় না:
“নিষিদ্ধের প্রতি তীব্র আকর্ষণ যেন বিমলকে চালিত করেছে।
‘দিবারাত্রির কাব্যে’ সুপ্রিয়া নয়, হেরম্বকে জয় করে আনন্দ। ‘আরোগ্য’ উপন্যাসে কেশব প্রেমে জড়িয়ে পরে গরিব বিধবা মায়ার সঙ্গে। ‘হরফ’ উপন্যাসে কবি এবং লেখক শিক্ষিত মধ্যবিত্ত যুবক মানব বস্তির অশিক্ষিত গেঁয়ো আত্তিকে বিয়ে করার সিদ্ধান্তে উপন্যাস শেষ হয়েছে।
মানিকের উপন্যাসে এ রকম অনেক উদাহরণ আছে। ‘অমৃতস্য পুত্রাঃ’তে তরঙ্গ ধনী শঙ্করের প্রেমে না পরে অনুপমের প্রেমে পরে আত্মাহুতি দেয়। ‘প্রাণেশ্বরের উপাখ্যানে’ চপল কোনো সুন্দরী মেয়ের প্রেমে না পরে মোটা মৃদুলার প্রেমে পরে, ‘পরাধীন প্রেমে’ দেখা যায় অজিত উমাকে বাদ দিয়ে অন্য একজনকে বিয়ে করছে। প্রেমের এই বাধাহীন গতিকে মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় রূপায়িত করেছেন।
অনেকদিন ধরে বিমল কবিতা লেখে। পত্রিকায় তার লেখাও ছাপা হয়। কিন্তু সে জানে না তার কবিতা কে কতটা আগ্রহের সঙ্গে পড়ে। বনের পাখি গান গায় আপন মনে, কারো উদ্দেশ্যে নয়, তার জানার বিষয় নয় কে তার গান শুনে মুগ্ধ হচ্ছে। বিমল স্বভাবসিদ্ধ কবি। পৃথিবীর রং, রস, রূপে মুগ্ধ সে সমাজের কলুষতায় চিন্তিত, জীবনের জটিলতায় বিধ্বস্ত-কবিতা তার কথা বলার মাধ্যম। তার কটি কবিতা ছাপা হলো শাস্তা যে সে হিসেব রাখে এ তথ্য তার কাছে নেই কিন্তু এতো দিন পর শান্তাকে আবিষ্কার করে বিমল বিস্মিত হয়:
“এতখানি আগ্রহের সঙ্গে শান্তা সে দুটি আয়ত্ত করিয়া নিল যে বিমলের মনে হইল, যতকাল বাঁচিবে রাতদুপুরে বিনিদ্র বেদনা ও অসহ্য আবেগের পীড়ন সহিয়াও সে প্রত্যহ কবিতা লিখিবে।” ( ২খ, পৃ-১০৪ )
শান্তাকে বিমল ভালোবাসে। মানিক বলেছেন, বিমলের হৃদয়ের কারণেই ‘জানালা প্রেমটা বাজে হয় নি- এইটি একটি মাধুর্যতায় রূপ নিয়েছে। প্রেমিক বিমল খুব সাহসী এবং বেপরোয়া। শান্তাকে পাওয়ার জন্য সে অনেক সক্রিয়। বর্ষাকালের এক মেঘাচ্ছন্ন দুপুরে স্বপ্নবিভোর ঘুমের পরে বাস্তব স্বপ্নের মতো সে শান্তাকে আবিষ্কার করে
“পিঠে এলানো চুল, গায়ে সাদা শেমিজ আর পরনে নীলাম্বরী, আকাশের মেঘের গাঢ়তর প্রতিবিম্বের মতো। ” ( ২খ, পৃ-১০৫)

এরপর তাদের নির্বাক পরিচয় সবাক হয়। বিমল শাস্তাকে নিয়ে ঘর বাঁধার স্বপ্ন দেখে। সে সামাজিক বিধি-নিষেধের দেওয়াল ভেঙে ফেলতে চায়। শান্তার স্বামী অধরের সঙ্গে ট্রামে দেখা হলে কথার সংগ্রামে লিপ্ত হয় বিমল। অধরকে প্রতিপক্ষ ভাবতে থাকে এবং অধরের ভেতর থেকে দুর্বলতা খুঁজে বের করার চেষ্টা করে।
আবার পরদিন ভোরে অধর শাক্তার নাম করে বিমলকে চায়ের নিমন্ত্রণে ডেকে এনে অপমান করতে শুরু করলে বিমল ঘাবড়ে না গিয়ে নির্দ্বিধায় আবার যুদ্ধে লিপ্ত হয়। শান্তা বিমলদের বাড়ি এলে বিমল পুলকিত হয়, কিন্তু তার আসাটা বিমলের চোখে পড়ে না, প্রেমিকের বুভুক্ষু হৃদয়ে শুধু মনে হয়
“শান্তা কেবলই বিদায় নেয়। সে যে কখন আসে, জানিবার উপায় নাই। শুধু যাওয়াটাই চোখে পড়ে।” ( ২, পৃ-১০৭)
শান্তাকে বিমল হৃদয় দিয়ে গ্রহণ করে, শান্তাকে ছাড়া তার সব কিছু তুচ্ছ মনে হয় “আজিকার চাকরি পাওয়ার যত যশ, অর্থ, সম্মান যাই সে পাক, জীবনে সব তাহার তুচ্ছ হইয়া যাইবে, কারণ শাস্তা তাহার কবিতার বদলে শুধু কাব্যরসই দিল, প্রেমকে মানিল না। মাসে একশো পঁচিশ টাকায় শান্তাকে সে খাওয়াইতে পারে না? কিন্তু শান্তা খাইবে না। তাহাকে খাওয়াইবার লোক আছে, ছেলেমেয়ে দিয়া তার সংসার রচনা করিবার লোক আছে, সমাজের মধ্যে, মানুষের মধ্যে তার সম্মানের আসনটি রিজার্ভ রাখার লোক আছে।
জীবনে তাহার যাহা জোটে নাই, তার মতো মূর্খ অপদার্থ কবি ভিন্ন জগতে যে জিনিস দিবার ক্ষমতা কারও নাই শান্তা শুধু সেইটুকুই তার নিকট হইতে গ্রহণ করিল এবং এই ভাবিয়া নিশ্চিন্ত রহিল যে গ্রহণ করাটাই বিনিময়।” (২খ, পৃ-১৩২)
শাস্তারা চলে যাবে শুনে বিমল ক্ষিপ্ত হয়ে ওঠে। শাস্তা বিদায় নিতে আসলে সে তার ভালোবাসার কথা বলে। বিমল উম্মাদের মতো শান্তাকে চায়। সে বাড়ি ভাড়া করে শান্তাকে নিয়ে আলাদা থাকার কথা বলে। কোনোমতেই সে শান্তাকে হারানোর কথা ভাবতে পারে না। আপন হৃদয়ে প্রেমের যে সৌধ সে গড়ে তুলেছে তাকে প্রতিষ্ঠা দেওয়ার সব রকম সম্ভাবনার কথা সে উচ্চারণ করে যায়।
“শাত্তার গৃহত্যাগের সপক্ষে যত যুক্তি, যত আবেদন মাথায় আসিল একধার হইতে বলিয়া গেল। জীবনের নিশ্চিত দুঃখটাকে না ঠেকাইলে চলিবে না। যুক্তি ফুরাইয়া গেলে শিশুর মতো বিমল আবদার আরম্ভ করিল।।” (২খ, পৃ-১৩৯)
তারপর শান্তাকে বিমল বুঝতে পারে, সে শান্ত হয়। কিন্তু বিমলের প্রেমের পরীক্ষার এখানেই শেষ নয়। শান্তা ছাদ থেকে লাফিয়ে পড়লে মৃত্যুর মুখে পড়ে, বিমলের কষ্টও যেন মৃত্যুপথযাত্রীর কষ্ট। কোথাও ভালো লাগে না, নিজের ঘরে, গলির মোড়ে, চায়ের দোকানে, মানুষের সঙ্গে কিংবা নির্জনতায়। কী করবে সে ভেবে পায় না, মদ-বিষ কোনো কিছুতেই পোষাবে না, অবশেষে সিদ্ধান্ত নেয়
“বাড়ি ফিরিয়া শাস্তার রুদ্ধ বাতায়নটিকে সে পাহারা দিবে। ওদিকে চাহিয়া তার বিনিদ্র রজনী কাটিয়া যাইবে। মদ খাওয়ার চেয়ে, বিষ খাওয়ার চেয়ে সে হইবে আরও বড় নেশা, আরও গভীর বিস্মৃতি।” ( ২খ, পৃ-১৪৪ )
প্রেমিক বিমল প্রচণ্ড সক্রিয়। সে টাকা দিয়ে শাক্তার বাড়ির ঝি বিন্দুকে হাত করে খবর সংগ্রহ করে, জানালায় বসে শান্তাকে বোঝায়। উপন্যাসের প্রথমে প্রেমটাকে ঠিক জোরালো করে দেখানো হয় নি, কিন্তু শাস্তার অসুস্থতার সুযোগে দুই জানালায় দুজনের মধ্যে সম্পর্ক আরো জোরালো হয়েছে। তাদের প্রতিটি কথায়, প্রতিটি আচরণে এক নিবিড় প্রেমময় পরিবেশের সৃষ্টি হয়েছে।
তাদের প্রেমের পথে যেন কোনো বাঁধা নেই, কোনো ভয় নেই, লোক লজ্জা নেই। শাস্তার বাড়ির সামনে বিমল ছটফট করে, রাতে শান্তা জানালায় এসে কথা বলে। এ সময় শান্তা শুধু প্রলাপ বকছে, বিমল দিচ্ছে সান্ত্বনা। শান্তার মৃত্যুর পর বিমল রক্তে ভেজা ব্যান্ডেজটা এনে বালিশের নিচে রেখে দেয়। শ্মশানে সে যেতে পারে নি, শান্তাকে পুড়িয়ে ফেলার দৃশ্য সে দেখতে চায় না। শাস্তার মৃত্যুতে বিমলের শোক চোখে পড়ার মতো।
প্রথম চার-পাঁচ দিন সে শুধু ঘুমালো, তারপর তার মেজাজ হয়ে গেলো রুক্ষ এবং এরপর সে এতোই শান্ত হয়ে গেল যে রাগের কারণ থাকিলেও রাগ করে না, ঘাড় গুজিয়া খায়, অফিস যায়, বই পড়ে আর ভাবে।’ (পৃ. ১৫০) বিমলের মনে শোকটা চিরস্থায়ী হয়ে রইল।
প্রমীলা বিমলকে অনেক বোঝানোর চেষ্টা করে, মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় বলেছেন এ যেন বউ মরার চেয়েও বেশি শোক, বিমল ভুলতে পারে না।
বিমলের প্রেমিকসত্তার চেয়ে বেশি সক্রিয় তার ভাইসত্তা। প্রমীলাকে সে রাগে-দুঃখে-অভিমানে- ক্ষোভে বলেছে:
” একজন মরে বেঁচেছে, তুই বেঁচে মরে থাক।” ( ২, পৃ-১৫৪ )
বিমল প্রমীলাকে একটি নতুন জীবন দিতে চায়। ছেলে বেলার একটি কুড়িয়ে পাওয়া পয়সা নিয়ে বোনের জন্য বিমলের যে হাহাকার উঠেছিল, বড় হয়েও তা সে ভুলে যায় নি। বোনের প্রতি মায়া-মমতা-ভালোবাসা-দায়িত্ববোধ সবই বিমল চরিত্রে বিদ্যমান। প্রমীলাকে সে গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করে, কিন্তু প্রমীলা এতই চাপা স্বভাবের যে তার মনের তল পাওয়া যায় না। বিমলের সঙ্গে পরিচয়ের সূত্র ধরে নগেনের সঙ্গে প্রমীলার প্রেমের সম্পর্ক। নগেন লাবণ্যদের সঙ্গে লখনৌ যাবে শুনে বিমল ভীত হয়ে ওঠে, বোনের প্রতি কর্তব্যবোধের একটি সুখ তাগিদ অনুভব করে সে-
“প্রমীলাকে একটা খবর দেওয়া দরকার। সে খবর পাঠাইয়াছে এভাবে নয়, আপনা হইতে খবর পৌঁছাইয়াছে এইভাবে।” ( ২খ, পৃ-১১০)
নগেন প্রমীলাকে খবরটা পর্যন্ত দিতে চায় না- এ বিষয়টিও বিমলকে বিস্মিত করে। খবরটা প্রমীলাকে জানানোর পরই বিমল বুঝতে পারল বিষয়টি গুরুতর, কারণ লাবণ্য সম্পর্কে প্রমীলা কোনো হাসির কথাতো বললই না, বরং গুরুগম্ভীর হয়ে জিজ্ঞাসা করলো
“লাবণ্যকে শেষ পর্যন্ত নগেনদার পছন্দ হবে এটা তুই ভাবতে পেরেছিলি?” ( ২খ, পৃ-১২১)
তারপর প্রমীলা বিমলকে বলে স্টেশনে নগেনের কাছে নিয়ে যেতে। বিমল বোনের অপমানের কথাটা একবার ভাবে। আবার এও চিন্তা করে যদি স্টেশনে না গিয়ে ওর উপায় না থাকে তবে সে বারণ শুনবে না। তাই প্রমীলাকে সে স্টেশনে নিয়ে যায়, নগেনকে মহিলা ওয়েটিং রুমে ডেকেও দেয়, কিন্তু বিমল বুঝতে পারে পুরোটাই প্রমীলার ছেলে মানুষি, তখন সে বিরক্ত হয়। ভাই হয়ে বোনের ছোট হয়ে যাওয়াটা সে সহ্য করতে পারে না। নগেনের সুপারিশে চাকরি হলে তাই সে আনন্দিত হয় না:
“বাড়ি ফেরার পথে চাকরি পাওয়ার আনন্দে নিজেকে বিমল কিছুমাত্র উত্তেজিত দেখিল না। মনের মধ্যে কোথায় যেন বিধিতেছিল। বোনকে যে স্টেশনে ছুটিয়া যাইতে বাধ্য করে তার অনুগ্রহে চাকরি পাওয়া যেন খুব অগৌরবের কথা, অন্যায়।” (২, পৃ-১৩১)
বিমল চরিত্রের একটি দিক আত্মকথন। প্রমীলার নামে লখনৌ থেকে একশো টাকার নোট এলে বিমল বিব্রত এবং চিন্তিত হয়। সারা দিন তার মনের মধ্যে খচখচ করে। সে ভাবে এ সব খাপছাড়া ঘটনা কখনো ভালো হয় না নগেন পাঠাক আর লাবণ্যই পাঠাক, ও টাকার মধ্যে প্রমীলার অমঙ্গলের ইঙ্গিত আছে।” (২২, পৃ-১৩৬)
তার বোনের মন নিয়ে খেলা করার দাম কি নগেন পাঠাচ্ছে? এর কিছুদিন পর শান্তার মৃত্যু নিয়ে যখন বিমল শোকাহত তখন নগেন বিমলের নামে প্রমীলার বিয়ের উপহার পাঠিয়েছে হীরের গহনা। সোনা আর হীরের ঝলকে ভাইবোনের চোখ ঝলসে যায়। অপমানে বিমল বিক্ষুব্ধ হয়ে ওঠে। নগেনকে রাসকেল বলে গালি দেয়, রাস্তায় ধরে জুতোতে চায়।
এরপর বিমল প্রমীলাকে ভালো ছেলের সঙ্গে বিয়ে দিতে চায়, কিন্তু প্রমীলা রাজি হয় না। সে লাবণ্যকে বিয়ে করে প্রতিশোধ নিতে চায়, প্রমীলা তাতেও রাজি হয় না। প্রমীলা বলে আমরা কিছুই করবো না, চুপ করে থাকবো। বিমল অসহায় হয়ে পরে। বোনের এতো বড় অপমানের প্রতিশোধ সে নিতে পারে না, অন্যদিকে নিজের প্রেমও হারিয়ে ফেলেছে। সব হারিয়ে সে নিঃস্ব রিক্ত হয়ে যায়। কবি বিমল তাই স্বর্গের সম্ভাবনার কাছে আত্মসমর্পণ করে
“আমরা খেয়ালি, আমরা বোকা, আমরা ভীষণ ভুল করেছি-অন্যায়ও করেছি, কিন্তু আমরা রাসকেল নই। মরলে আমাদের স্বর্গে যাওয়ার সম্ভাবনা আছে ব্যস আমরা আর কিছু চাই না।” (২২, পৃ-১৫৫)
নগেনের দেওয়া চাকরি সে ছেড়ে দেয়, একটা দৈনিকের অফিসে প্রুফ দেখার চাকরি নিয়ে বাড়ি ফেরে। অধর প্রমীলাকে বিয়ের প্রস্তাব দিলে বিমল তার বাবাকে সরাসরি না করে দেয়। প্রমীলা ছাদে আলসের ওপর উঠলে বিমল বুঝতে পারে তার ভাবাবেগের দিন শেষ হয়েছে, এবার কর্তব্য পালন করতে হবে। প্রমীলাকে সে ছাদ থেকে নামিয়ে আনে। কর্তব্যপালনের জন্য সে শান্তার স্মৃতিচিহ্ন পুড়িয়ে ফেলে-তাকে অনেক কাজ করতে হবে:
“বিমলের ব্যর্থতার স্মৃতি উপড়ে ফেলার প্রয়াসের মধ্য দিয়ে বস্তুত বিঘোষিত হয়েছে জীবনযুদ্ধে তার অবতীর্ণ হওয়াই । ৩৬
লেখক বিমল চরিত্রকে একটু একটু করে গড়ে তুলেছেন। একজন দায়িত্বহীন কবিকে সংসারের সমস্ত দায়িত্ব কাঁধে তুলে দিয়েছেন। ভাববাদকে বস্তুবাদে রূপান্তরিত করেছেন। সংসার সম্পর্কে সম্পূর্ণ অন্য একজন মানুষ সংসারের জটিলতায় জীবনকে দেখতে শেখে, বুঝতে শেখে। সংসারের জটিল গ্রন্থি মোচনের দায়িত্বভার কাঁধে তুলে নেয়।
‘শুভাশুভ’ উপন্যাসে এ রকম দায়িত্ববান হয় সমরেশ। যে সমরেশের মাথায় ব্যবসা-বাণিজ্য ঢুকতো না, সে তার পিতার রেখে যাওয়া এতো বড় সংসার ঘাড়ে নিয়ে চালাতে থাকে। সে নিজের বুদ্ধিতে প্রকাশনার ব্যবসায় উন্নতি করে। ‘পরাধীন প্রেমে’ অনিল বিধবা বোন বকুলের বিয়ের দায়িত্ব নিতে চায়। তারপর সুমতির বিয়ের দায়িত্ব নেয়। আরোগ্য উপন্যাসে কেশব ড্রইভারকে দেখি অনেক আত্মদ্বন্দ্বে ভুগে, বিনিদ্র রজনীর পর জীবনমুখী হয়।
এ উপন্যাসে আরেকটি প্রধান চরিত্র অধর। অধর শাস্তার স্বামী। সে একরোখা, বদমেজাজি, দৃঢ় প্রত্যায়ী, ভয়ঙ্কর, গম্ভীর কঠিন মনের মানুষ। তবে তার একটি দুর্বল দিকও রয়েছে। ভেতরে ভেতরে সে শান্তাকে ভালোবাসে। দ্বিতীয় পরিচ্ছেদের শেষের দিকে অধর উপন্যাসে এসেছে। তবে এর আগে তার সম্পর্কে আমরা অবহিত হই এভাবে:
“বন্ধ জানালার ওদিকে বেলা দশটার সময় বিমল পুরুষ কন্ঠে খুব তর্জনগর্জন শুনিয়াছিল।” ( ২খ, পৃ-১০৫)
এখানে উপন্যাসে একটু অসঙ্গতি চোখে পড়ে। অধর-শাক্তা তো নতুন আসে নি, তবে এতোদিনে অধরের স্বরূপ ধরা পড়বে কেন? সে যাই হোক অধরকে বিমল লৌহমানব বলেই জানে। মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় অধরের বর্ণনা দিয়েছেন:
“লোকটার প্রকৃতি ভয়ানক গম্ভীর। হাসিলে তাহাকে ভারী সুন্দর দেখায়, কিন্তু হাসিবার প্রক্রিয়াটা সে আয়ত্ত করিতে পারে নাই বলিয়াই অনেকে সন্দেহ করে। মাঝে মাঝে সে মদ খায়, কিন্তু নেশা হয় না, এমনই সে কঠিন লোক।” ( ২খ, পৃ-১০৫)
এখানে উপন্যাসে একটু অসঙ্গতি চোখে পড়ে। অধর-শান্তা তো নতুন আসে নি, তবে এতোদিনে অধরের স্বরূপ ধরা পড়বে কেন? সে যাই হোক অধরকে বিমল লৌহমানব বলেই জানে। মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় অধরের বর্ণনা দিয়েছেন:
“লোকটার প্রকৃতি ভয়ানক গম্ভীর। হাসিলে তাহাকে ভারী সুন্দর দেখায়, কিন্তু হাসিবার প্রক্রিয়াটা সে আয়ত্ত করিতে পারে নাই বলিয়াই অনেকে সন্দেহ করে। মাঝে মাঝে সে মদ খায়, কিন্তু নেশা হয় না, এমনই সে কঠিন লোক।” ( ২খ, পৃ- ১১৩)
অধরের তর্জনগর্জনের পর-পরই শাস্তা আস্তে আস্তে বিমলের সঙ্গে ভালোবাসার সম্পর্কে জড়িয়ে পড়ে। অধর যখন বিষয়টি আঁচ করে তখন থেকেই তার চরিত্রের শুরু। অধরের চরিত্রের কয়েকটি দিক দেখা যায় শান্তার স্বামী অধর, প্রমীলার প্রতি দুর্বলচিত্ত অধর, আর প্রতিশোধপরায়ণ অধর।
অধর শান্তার হারানো হৃদয়টি ফিরে পেতে চায়। বিমলের প্রতি ঈর্বাস্থিত, গোপন একটি কষ্ট তার মনে প্রবাহিত হয়, শাস্তার ভালোবাসা না পাওয়ার কষ্ট। তাই প্রতিনিয়ত সে উপায় খুঁজতে থাকে তার কী করা উচিত। প্রথম দিকে সে শাস্তার কাছে বিমলের খুব প্রশংসা করে। একদিন ট্রামে বিমলের সঙ্গে দেখা হলে নিজেকে সংযমী রাখতে পারে না তাই সরাসরি যুদ্ধে নামে। এই দিনই অধরের দুর্বলতা বিমলের কাছে ধরা পড়ে
“ওর মধ্যে একটা দুর্বলতা আছে [… […] এ লোকটা খাঁটি লোহা দিয়া তৈরি নয়।” (২খ, পৃ-১১৪ )

অধরের ধৈর্যের বাঁধ ভেঙে যায় বিমল যখন তাকে রান্নার ঠাকুর পালিয়েছিল, পেয়েছে কি-না জিজ্ঞাসা করে, আর কোনো রাখঢাক রাখে না অধর স্পষ্টই জবাব দেয়-“ একদিনের বেশি শাস্ত াকে কষ্ট করে রাঁধতে হয়নি।” (১১৪) অধর এতোটাই সাংঘাতিক যে বিমলের মনে মনে কথা বলার উত্তরও সে দেয়। বাড়ি ফিরে শান্তাকে লিখতে দেখে বলে, কবিতা লিখছে কি-না?.. হিজিবিজি লেখাটা কবিতা লেখার পূর্ব লক্ষণ …. … কবিতা লিখলে আমাকে দেখিও…ইত্যাদি। শান্তা এ কথা শুনে আতঙ্কিত হয়ে ওঠে। বিমলের সঙ্গে নিজের তুলনা করে অধর শাস্তার সামনে নিজেকে মেলে ধরে।
অনেক অবহেলা আর অনাদরে শাস্তার পিপাসার্ত হৃদয় বিমলের দিকে গমন করেছে। শাস্তার পরিপূর্ণ শান্ত হৃদয় দেখে অধরের ভেতরে জন্ম নিয়েছে ক্ষোভ। তারপর সে শাক্তাকে পাবার জন্য হয়েছে উন্মাদ। রাতে যতক্ষণ বিমলের ঘরে আলো জ্বলে শাস্তা ঘুমায় না-এই কঠিন সত্যটি অধর বিছানায় ঘুমের মতো পরে থেকেই জানতে পারে।
শান্তার ঘুম না এলে সে ছাদে চলে যায়। অধর তা-ও জানে। মাঝে মাঝে নানা কথা শান্তাকে শোনায়, কিন্তু কোনো ফল হয় না। তাই অধর অসহায় হয়ে অন্য পথ ধরে। ভোরে বিমলকে শাস্তার নাম করে চায়ের নিমন্ত্রণ করে ডেকে এনে অপমান করে। সে সাবধান করে দিতে চায়, শাস্তার সঙ্গে যেন সম্পর্ক না আগায়:
“আমি ভারী বোকা। বুঝতে না পেরে চোরের হাতে আমি সবর্ষ তুলে দিতে পারি। সে একটু হাসিল, একটু একটু করে কেউ যদি আমার সর্বস্ব চুরি করে, চেয়ে দেখেও বুঝতে পারি না কী ব্যাপার চলছে। সব চুরি হয়ে গেলে ছেলেমানুষের মতো কী করি বল তো?” ( ২ৰ, পৃ-১১৯)
অধর হার মেনে নিরুপায়ের মতো বিমলের কাছে যেন মিনতি জানায় তার ভালোবাসার ধন ফিরিয়ে দিতে। কিন্তু অনেক দেরি হয়ে গেছে। শান্তা আর বিমল এখন প্রেমের সাগরে ভালোবাসার নৌকায় বিহার করছে। অনন্যোপার অধর আবার অন্য পথ ধরে, সে অফিস ছুটি নিয়ে দিনরাত শাঙ্কাকে নিয়ে মেতে থাকে।
শান্তা যেন তার হাতের খেলনা। অধর ভালো গান গায়, শান্তাকে সে তাই ভৈরবী শেখায়, মালকোবের নমুনা দেখায়, শাস্তার কাছে গান শুনতে চায়। দুজনে মিলে দাবা খেলে, ইচ্ছে করে শান্তাকে জিতিয়ে দেয়, বায়োস্কোপ-থিয়েটারে যায়। তবু সে শান্তার মন পায় না। তারপরও “জীবনকে সে ত্যাগ করতে চায় না, জীবনকে আঁকড়ে ধরতে চায় নিজের অস্তিত্বকে টিকিয়ে রাখতে চায়। ৩৭
কিন্তু টিকটকে লাল লোহা ফেলে রাখলেও মরিচা পড়ে’ (পুতুল নাচের ইতিকথা) অধর সম্পর্কে শাস্তার মনে আর তাই কোনো জায়গা নেই। অন্যদিকে প্রমীলার প্রতিও অধরের একটি দুর্বলতা মনের মধ্যে জন্ম নেয়। শাস্তা আর প্রমীলা দুজনের হৃদয়কেই পাবার জন্য সে অধীর হয়ে ওঠে। অধর একরোখা, হারানো সম্পত্তি ফিরে পাওয়ার জন্য সে দৃঢ়প্রতিজ্ঞ।
তাই শান্তাকে নিয়ে এ পাড়ার বাস উঠিয়ে সে অন্য পাড়ায় যেতে চায়। হঠাৎ-ই একদিন সে শান্তাকে বিমলদের বাড়িতে যাবার সুযোগ দিয়ে বাইরে যায়। শাক্তা বিমলের ঘরে গেলে অধর এসে অন্ধকার ঘরে বসে দেখে শান্তা আর বিমলের গভীর ভালোবাসা, নিবিড় আলিঙ্গন আর পাগলাটে চুম্বন। অধরের রক্তে আগুন ধরে, শান্তা বাড়ি ফিরলে সে শাস্তাকে ছাদ থেকে লাফিয়ে পরে আত্মহত্যায় প্ররোচিত করে বাড়ি থেকে বের হয়ে যায়।
প্রেমিক অধরের ক্ষতবিক্ষত হৃদয় তবু শান্তাকে ঘৃণা করে না। শান্তা মৃত্যুমুখে পতিত, অধর তার সেবা করে দিনরাত, যা চোখে না দেখলে বিশ্বাস করা যায় না:
“বিমল দেখিতে পাইল না কী অপরিসীম যন্ত্রণায় তার মুখ বিকৃত হইয়া গিয়াছে, কত যত্নে শান্তার অবচেতন দেহটা সে বুকে করিয়া খাটে তুলিয়া দিতেছে।” ( ২খ, পৃ- ১৪৫)
মৃত শান্তাকে শ্মশানে পুড়িয়ে এসে শাস্তার কাপড় মাথায় বেঁধে সে মেঝেতে পরে থাকে। এখানেই অধর থেমে যায় না। সে প্রতিশোধ স্পৃহায় উন্মাদ হয়ে ওঠে। বিমলের ওপর প্রতিশোধ নেওয়ার জন্য অধর প্রমীলাকে বিয়ে করতে চায়। প্রমীলাকে বিয়ে করার জন্য তাদের বাড়ি দুবেলা যাতায়াত শুরু করে।
সে প্রমথের মন জয় করে। তারপর প্রমীলাকে বিয়ে করার প্রস্তাব দেয়, প্রমথ এতে রাজি হয়। কিন্তু বিমল বাধা হয়ে দাঁড়ায়। অধর বিমলের ব্যাপারেও কৌশলী হয়ে ওঠে। বিমলের সঙ্গেও বন্ধুত্ব করতে চায়। সর্বোপরি অধর নিষ্ক্রিয় হয়ে থাকে নি। সে তার নিজের অভিপ্রায়ে অনড় থাকতে সম্ভাব্য প্রতিটি পথেরই সন্ধান করে।
অধর যে কতটা প্রতিশোধপরায়ণ তা শান্তার অসুস্থ অবস্থায় বিমলকে সে বলেছিল:
“বিমল, আমার সংযমের একটা সীমা আছে। বাড়িতে একটা গুলিভরা রিভলবারও আছে। মানুষের জীবনমৃত্যুর কোনো দামও আমার কাছে নেই-আমার নিজেরও না। অতিরিক্ত কৌতূহলী হয়ে কেন নিজের প্রাণটা হারাবে-আমাকে ফাঁসিকাঠে ঝোলাবে?
তোমাকে আমি অন্য শাস্তি দিতে চাই আমার সে সাথে বাদ সেধো না।” ( ২খ, পৃ- ১৪৫)
সব কিছুর পর শাস্তার মৃত্যুর পর সে বিমলের সঙ্গে বন্ধুত্ব করতে চায়
“আপনি শান্তার বন্ধু ছিলেন, কিন্তু আপনাদের বন্ধুত্ব আমি ঠিক বুঝতে পারিনি, ভুল করেছিলাম। আপনার সঙ্গে বন্ধুত্ব করা ছাড়া শাস্তার স্মৃতিকে সম্মান দেখানোর আর কোনো উপায় নেই।” (২, পৃ-১৫৮)
কিন্তু এর পরও সে বলে:
“কিন্তু ঘৃণা যে কথা শোনে না এ কথা সত্যি।” ( ২খ, পৃ-১৫৮) অধর হেরম্ব, শশীর মতো নিষ্ক্রিয় থাকে নি, নিয়তিকে মেনে নেয় নি। সে সর্বদা ভাগ্য পরিবর্তনের চেষ্টা করেছে।
নগেন চরিত্রটি একটি দুর্বোধ্য চরিত্র। সাধারণভাবে বললে বলা যায়, এটি একটি ঠক-জোচ্চোর চরিত্র। উচ্চবিত্ত সমাজের শিক্ষিত যুবক সে। তার একটি চিঠিতে বিমলের চাকরি হয়। সে বিমলকে অনেক সময়ই টাকা ধার দিয়ে আর ফেরত নেয় না। প্রমীলার সঙ্গে তার প্রেমের সম্পर्क:
“মানিক কোনও সময়েই সমাজ ও ব্যক্তি তথা শ্রেণীগত বিরোধ বিস্মৃত হননি, যখন মূল কাহিনীর বিষয়বস্তু মনস্তাত্ত্বিক, তখনও তাঁর চেতনার গভীরে থাকে সমাজ, শ্রেণী, গোষ্ঠী-মানুষ।
তাই দেখা যায় নিম্নমধ্যবিত্ত প্রমীলাকে নগেন ভালোবাসলেও তাকে বিয়ে করে নি। লাবণ্যর সঙ্গে সে লখনৌ বেড়াতে গেছে এবং লাবণ্যকে বিয়ে করেছে। এর ভেতরে সে যে অন্যায় করেছে তা হলো প্রেমের মূল্য হিসেবে সে প্রমীলাকে প্রথমে পাঠিয়েছে একশ টাকা, তারপর হীরের গহনা। আর সুধী মহলে গুজব ছড়িয়েছে প্রমীলার বিয়ে হয়ে যাচ্ছে। বিমলকে পাঠিয়েছে আহত বন্ধুর মতো একটি চিঠি। আর প্রমীলাকে লিখেছে:
“আমার মাথা খারাপ হয়ে গেছে। কী করলে তোমার পাথরের মতো শক্ত বুকে একটু আঁচড় কাটা যাবে বসে বসে তাই ভাবছি। তুমি সুখী হও, এ কামনা আমি করি, কিন্তু তোমার জন্য আমি অসহ্য মনোবেদনা নিয়ে দিন কাটাচ্ছি ভেবে সারাজীবন তুমি যে অতিরিক্ত সুখ পাবে আশা করছ, সেটুকু তোমাকে দেবার মতো উদারতা আমার নেই। আমার এ হীনতাকে তুমি ক্ষমা কোরো।” ( ২খ, পৃ-১৫৩)
এতোটাই নিচু নগেনের মন। প্রমীলাকে নিয়ে সে এ রকম খেলায় মত্ত হয়, তাকে এমন উপহাস করে। লাবণ্য তার সম্পর্কে বলেছে।
“প্রমীলার কথা আমি জানি। কিন্তু আমার সঙ্গে লখনৌ না গেলে নগেন বিস্তার সঙ্গে দার্জিলিং যেত। বিভাটা বোকা, ছ মাস পরে আর কার সঙ্গে নগেন কোথায় যেত কে জানে! আমি এক ঢিলে দুই পাখি মেরেছি। অনেকগুলি মেয়েকে বাঁচাচ্ছি, নিজের জীবনযাত্রাকে সহজ করছি।” (২খ, পৃ-১৬১)
মানিক এভাবে উচ্চবিত্তের স্বরূপ তুলে ধরেছেন।
“শহরতলী’ উপন্যাসে মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় সত্যপ্রিয় চরিত্রটির কোনো ভালো দিক দেখান নি। সত্যপ্রিয়র প্রতিটি কাজ কোনো খারাপ উদ্দেশ্যকে সামনে রেখে। এমনকি সে তার বেশভূষাও পরে উদ্দেশ্যপ্রণোদিত হয়ে। তার প্রতিটি কথা, প্রতিটি পদক্ষেপ, তার মুখের হাসি, সব কিছুর পেছনে কোনো না কোনো কারণ থাকে। সাধনা করে জীবন দিয়ে সে একটি কাজই করেছে-টাকা উপার্জন:
“সবার সঙ্গেই তার সম্পর্ক প্রতিষ্ঠিত অর্থের উপর ভিত্তি করে।
সত্যপ্রিয়র চারিত্রিক বৈশিষ্ট্যে যে বিষয়গুলো পাওয়া যায়, তা হলো- বড়লোকিপনা, স্বেচ্ছাচারিতা, ভণ্ডামি, নিষ্ঠুরতা, ধূর্ততা, কূটকৌশলতা আর ইংরেজপ্রীতি। সত্যপ্রিয় চরিত্রটি মানিক ‘বঙ্গশ্রী’ পত্রিকা এবং বঙ্গশ্রী কটন মিলসের মালিক সচ্চিদানন্দ বাবুর আদলে অঙ্কন করেন। মানিক ‘বঙ্গশ্রী’ পত্রিকায় চাকরি করতেন। সচ্চিদানন্দ বাবু ‘ভারতবর্ষের বর্তমান সমস্যা ও তাঁহার প্রতিকারের উপায়’ শিরোনামে দীর্ঘদিন প্রবন্ধ রচনা করেছেন। তিনি মানুষের বিয়েতে নকল নেকলেস উপহার দিতেন।
প্রচার বিভাগের পরিচালক জ্যোতির্ময়ের বিবাহোত্তর বউভাতে সত্যপ্রিয়র প্রথম আবির্ভাব। কিছুক্ষণের জন্য সে জ্যোতির্ময়ের বাড়ি আসে। সকলের সঙ্গে হেসে কথা বলে, নিজেকে নিরহংকারী, সহজ সরল প্রমাণ করার জন্য নিজ থেকেই এর-ওর দিকে এগিয়ে যায় “আমারইতো অপরাধ হয়ে গেলো, আমাদের জ্যোতির্ময় বাবুর বাড়ির কাজ, প্রথম থেকে এসে আমারই তো সব দেখাশোনা করা উচিত ছিলো- বড় দেরি করে ফেললাম।” (৩খ,পৃ.-১২৮)
তার পেছনে ভূষা উপহার হাতে আসে। বউ দেখে সত্যপ্রিয় মখমলে মোড়া নেকলেস দেয়। চোখ ঝলসানো সে নেকলেস দেখে সকলে অভিভূত হয়ে যায়। নেকলেসের দাম হাজার দেড়েক টাকা হবে। যশোদা চিন্তা করে।
“এত দামী জিনিসের দাম না তুলিয়া কি সত্যপ্রিয় ছাড়িবে।” (৩খ, পৃ. 128 ) সত্যপ্রিয় সম্পর্কে মানুষের ধারণা এ রকম, আর সে মানুষটি সত্যিকারে এরূপই। কারো সঙ্গে সে স্বাভাবিক সম্পর্ক তৈরি করে না। কিছুদিন পর চোখ ঝলসানো নেকলেসটি তামাটে হয়ে গেলো, হীরে আর মুক্তার জায়গায় দেখা দিল কাঁচ আর পুঁতি।
জ্যোতির্ময় এ কথা কাউকে বলতে পারলো না। জগতের কেউ জানলো না সত্যপ্রিয় কমদামি নকল নেকলেস দিয়ে বউয়ের মুখ দেখেছে। এভাবেই সত্যপ্রিয় সকলকে ধোঁকা দেয়। সত্যপ্রিয়র লেখা আর বক্তৃতা ছাপা হয় হরদম। এ গুলো একই সঙ্গে দেশের লোক এবং ইংরেজকে ধোঁকা দেয়:
“ভারতবর্ষের স্বাধীনতার কথা বলিতে বসিয়া প্রাচীন ভারতের স্বর্গের সঙ্গে বর্তমান ভারতের নরকের তুলনা করিয়া, ধর্ম আর ঈশ্বর আর দর্শনের কথা বলিয়া, সত্যপ্রিয় যেন একেবারে মনের ভিত্তি ধরিয়া নাড়া দেয়- আসল বক্তব্য সত্যপ্রিয় কী যুক্তি দিয়া প্রমাণ করিয়াছে সে বিষয়ে মাথা না ঘামাইয়াই তার কথা মানিয়া লইতে ইচ্ছা হয়। ” (৩খ,পৃ.-১৯৫)
তবে সে দেশের স্বাধীনতা চায় না। তার নিজের স্বার্থ জড়িয়ে রয়েছে দেশের পরাধীনতার ওপর। জ্যোতির্ময় তার সব প্রবন্ধ এবং বক্তৃতা দেখে এবং বিভিন্ন জায়গায় পাঠায়। পড়তে পড়তে সত্যপ্রিয়র জ্ঞান, নিষ্ঠা, একাগ্রতা দেখে মুগ্ধ হয়ে যায় সে পড়তে সত্যপ্রিয়র জ্ঞান, নিষ্ঠা, একাগ্রতা দেখে মুগ্ধ হয়ে যায় সে
“মাঝে মাঝে, বহির্জগতের চিন্তাধারার সঙ্গে হঠাৎ যখন জ্যোতির্ময়ের কোনো কারণে একটু সংস্পর্শ ঘটিয়া যায়, তখন দু-একবার তার মনে হইয়াছে, সত্যপ্রিয়র বলিবার যেন কিছুই নাই, সে শুধু ধর্ম, ঈশ্বর, শাস্ত্র, দেশ ও সমাজের দোহাই দিয়া দেশবাসীকে স্বাধীনতার প্রচলিত আন্দোলন বন্ধ করিতে বলিতেছে। এই একটি কথাই বলিবার আছে সত্যপ্রিয়র এবং এই একটি কথাই সে ফেনাইয়া ফাঁপাইয়া ঘুরাইয়া ফিরাইয়া পুনরাবৃত্তি করিয়া চলিয়াছে। (তখ, পৃ. ১৯৫)
সে জনসন সাহেবকে বলে স্বদেশি ছেলেদের নরম নরম মেয়ের সঙ্গে শাদী দিয়ে দিতে: “স্বদেশি না করে ইয়ংম্যান তখন বিশ রুপেয়ার কেরানি বনে যাবে।” (তখ, পৃ.-১৯৫)
সত্যপ্রিয়র ধূর্ততার যেন শেষ নেই। সে মানুষের রকম ফেরে নিজের বেশ পরিবর্তন করে। কোনো বিশিষ্ট ব্যক্তির আসার কথা থাকলে, কিংবা তার গিয়ে দেখা করার কথা থাকলে সেই উপযোগী পোশাক পরে সে। মানুষকে মানসিকভাবে পরাস্ত করার জন্য তার এই কুটকৌশল। কোনোদিন হ্যাটকোট পরা খাঁটি সাহেবি পোশাক, কোনোদিন মাথায় টুপি, গায়ে লম্বা কোর্ট খানিকটা পশ্চিম ভারতীয় পোশাক, কোনোদিন মটকার পাঞ্জাবি, কোঁচকানো ধুতি, কাঁধে ভাঁজ করা চাদর, কোনোদিন মুসলিম পোশাকের ধাঁচ।
সে যশোদাকে পরাস্ত করার জন্য খালি গায়ে হাঁটুর ওপরে গরদের কাপড় তুলে আসন-পিঁড়ি হয়ে বসে থাকে। যশোদা শ্রমিকদের দাবি দাওয়া নিয়ে শ্রমিক প্রতিনিধি হিসেবে মিল মালিক সত্যপ্রিয়র সঙ্গে কথা বলতে এসে তার বেশ দেখে একেবারে পা ছুঁয়ে প্রণাম পর্যন্ত করে ফেলে।
এরপর সত্যপ্রিয় অন্য কৌশল অবলম্বন করে যশোদাকে আরো পরাস্ত করার জন্য। সে নন্দর কীর্তনের প্রশংসা করে, তারপর দেশের বেকার ছেলেদের প্রসঙ্গ তুলে আফসোস করে। বিভিন্ন কথা বলে যশোদার মুখের ভাব পরিবর্তন লক্ষ করে। ‘পেটের ভাতের’ কথা যশোদার পছন্দ হয়েছে দেখে সে তার কথা সেই দিকে ঘুরিয়ে নেয়ঃ
“ইংরেজকে তাড়াও ধর্মঘট কর, স্বাধীনতা চাই-এই সব বলে বাবুরা চেঁচাচ্ছেন, এ দিকে দেশের চাষি মজুররা খেতে পাচ্ছে না, ছেলেরা সব বেকার যন্ত্রণা সইতে না পেরে আত্মহত্যা করছে।” (৩খ, পৃ.-১৭৫)
যশোদা বুঝতে পারে শ্রমিকদের কথা সে আর শুনবে না, নিজের বক্তৃতায় ডুবে থাকে সে। এভাবে শ্রমিক ধর্মঘট বাতিল করে সত্যপ্রিয়। মিলে প্রথমবার যখন ধর্মঘট হয়, তখনও নানা কৌশল অবলম্বন করে শ্রমিকদের ধর্মঘট উঠিয়ে নিতে বাধ্য করে। কাশীবাবু দশজনকে বরখাস্ত করার পর টিফিনের পর থেকে ধর্মঘট শুরু হয়। কাশীবাবু হেড অফিসে সত্যপ্রিয়কে ফোন করে। তারপর থেকে সত্যপ্রিয়র কানে ফোনটা লাগানোই থাকে কাশীবাবু ব্যাথা করতে গেলে আসল সত্য চাপা পড়ার ভয়ে সে বলেঃ
“ব্যাখ্যা আপনাকে করতে হবে না কাশীবাবু, যা ঘটেছে তাই শুধু বলে যান।”(৩, পৃ. ১৪৫)
তীব্র বুদ্ধিসম্পন্ন সত্যপ্রিয় কাশীবাবুকে গর্দভ বলে। সে আরো বলে বরখাস্ত না করে ওই দশজনকে পুলিশে দিলেই হতো। এরপর মিটমাটের জন্য বৈঠক বসলেও সত্যপ্রিয় আসে না। এ ব্যাপারে সে খুব ভীত। সে মিলের মালিক, শ্রমিকরা উত্তেজিত অবস্থায় যদি তাকে আক্রমণ করে, সে আতঙ্কে সে এ সময় ধারেকাছেও আসে না।
সত্যপ্রিয় যেমন কৌশল করে বারবার শ্রমিকদের পরাস্ত করেছে, তেমনি শ্রমিকরাও বারবার ধর্মঘট মারামারি করেছে। সত্যপ্রিয়ের মেয়ের বিয়ের তিনদিন আগে আবার ধর্মঘট শুরু হলে সে চিন্তিত হয়ে পড়লো। মারামারির জন্য সত্যপ্রিয়র কথায় কাশীবাবু অনেককে পুলিশে দিলো । যশোদাকে কাশীবাবু অশীল কথা বললে যশোদা তাকে রাস্তায় মুখ জোরে জোরে ঘষে দেয়। সে জন্যে অবশ্য যশোদাকেও জেলে যেতে হয়।
ফলে সত্যপ্রিয় আরো একটু মিথ্যে অভিনয়ের সুযোগ পায়। সে নিজে যশোদাকে ছাড়িয়ে আনে এবং যশোদার সামনে কাশীবাবুর কাছে হাতজোড় করে মিনতি করে পুলিশ দিয়ে নিজের মিলের লোকদের না ধরাতে। ফলে যশোদা অভিভূত হয়ে পড়ে। সত্যপ্রিয় এবার আসল উদ্দেশ্য হাসিলের জন্য যশোদাকে বলে।

“আমি যদি বলি তিনমাস পরে আমি নিজে খোঁজখবর নিয়ে ওদের সমস্ত নালিশ আর দাবির ব্যবস্থা করবো, হাঙ্গামাটা তুমি মিটিয়ে দিতে পারবে?” (তখ, পৃ. ১৯১) এভাবে ধূর্ত সত্যপ্রিয় বিভিন্ন কূটকৌশলের মাধ্যমে শ্রমিকদের আন্দোলন থামিয়ে দেয়।
সত্যপ্রিয় ব্যবসায়ী মানুষ। কয়েকটি মিল কারখানা আছে, কিছু ব্যবসার শেয়ার আছে, কিছু ব্যবসার শিপিং পার্টনার আবার কিছু ব্যবসায় সে শুধু ম্যানেজিং এজেন্ট। তার কাছে ব্যবসার মূল কথা হলো:
“লাভ হলে লাভটি নেব, লোকসান হলে আমার গায়ে লাগবে না।” (তখ, পৃ.- ২০৭ )
সত্যপ্রিয় যশোদার কাছে স্বীকার করে ব্যবসায় নানান রকমের প্যাঁচ কষতে হয়, নিয়ম করতে হয়। মিলের কর্মচারীরাও জানে সত্যপ্রিয়র নানান রকম নিয়মশৃঙ্খলার কথা। কাজের জন্য সে যে কতো নিষ্ঠুর হতে পারে তাও জানে। হেঁয়ালি করে সে কর্মচারীদের অনেক কথাই বলে, কিন্তু তাদের বুঝে নিতে হয় এ সত্যপ্রিয়র মনের কথা নয়; সে কোনো পরীক্ষা করছে। এ ব্যাপারে হঠাৎ কারো ভুল হলে তাকে তার জের টানতে হয়।
একদিন সত্যপ্রিয়র বাবার বার্ষিক শ্রাদ্ধে মিলের সকলের নিমন্ত্রণ আছে, সেদিন সত্যপ্রিয় আসবে না জেনে কাজে একটু শিথিলতা রয়েছে। কিন্তু সত্যপ্রিয় এসে হাজির। সকলের মধ্যে চাঞ্চল্য দেখা দিলো। কিন্তু জ্যোতির্ময় কাজে ফাঁকি দেয় না, সে নিবিষ্ট মনে কাজ করছিলো।
সত্যপ্রিয় সামনে এসে দাঁড়ালে সে তড়াক করে উঠে দাঁড়াল। সত্যপ্রিয় হেঁয়ালি করে তাকে বসতে বললো-এ যুগে এসব ফর্মালিটি অচল। কিন্তু এ ছিলো জ্যোতির্ময়ের জন্য ফাঁদ। সত্যপ্রিয় দেখতে চায় সে নিজে বসার আগে জ্যোতির্ময় বসে কিনা; ভক্তি ও সম্মান পরীক্ষায় সে পাস করে কিনা। জ্যোতির্ময় ফাঁদে ধরা পড়লো না। সে দাঁড়িয়ে রইলো; বললো:
“আজ্ঞে না, এটা ঠিক ফর্মালিটি নয়, অফিসের সুপিরিয়র অফিসারের সামনে দাঁড়ানোই নিয়ম।” (৩খ, পৃ. ১৫৪)
জ্যোতির্ময়য়ের দাঁড়ানো, কথা, সবকিছুর মধ্যে প্রভুভক্তির সমস্ত লক্ষণ দেখা যায়। সত্যপ্রিয় নীরবে এই পূজা গ্রহণ করে। চারিদিকে তাকিয়ে সত্যপ্রিয় কাজকর্মের অবস্থা পর্যবেক্ষণ করে এবং পাশ্চাত্যের মতো এতো শৃঙ্খলিতভাবে আমাদের দেশে কাজকর্ম করা যে কষ্টকর, সে কথা স্পষ্টভাবে কর্মচারীদের বলে বুঝিয়ে দেয় যে, তারা অন্যায় করছে। অনাথ বলে, আজকে ওবেলা নিমন্ত্রণের কারণে একটু কাজকর্মে ঢিল পড়েছে, তখন সত্যপ্রিয় ছুটি দিতে চায়। অনাথ সত্যপ্রিয়র মুখে তার মনের ভাবটি দেখতে পেয়ে সরাসরি ছুটির কথা বাতিল করে দেয়। সত্যপ্রিয় বলে
“দেখেন আপনারা, অপিসের ওপর এতটুকু জোরও আমার নেই। একদিন হাফ হলিডে দিতে চাইলেও দিতে পারি না।” (তখ, পৃ. ১৫৫)
সকলেই জানে এও সত্যপ্রিয়র রসিকতা, এমনটি ঘটলে হঠাৎ একদিন সে কয়েকটা পরিবর্তন, কয়েকটা নতুন নিয়ম চালু করবে, যা কোনো কর্মচারীর জন্য মঙ্গলের হবে না। জ্যোতির্ময়ের স্ত্র অপরাজিতা অসুস্থ হয়ে হাসপাতালে থাকলে সত্যপ্রিয় জ্যোতির্ময়কে কিছুদিন ছুটি নিতে বলে। কিন্তু জ্যোতির্ময় জানে, সে ইচ্ছে করে ছুটি দিলেও এই অপরাধে জ্যোতির্ময়ের বিপদই ঘটবে।ছুটি নিলে কাজের ক্ষতি হবে, আর কাজের ক্ষতি হলে সত্যপ্রিয় চাকরিরও ক্ষতি করে বসে। তাই জ্যোতিময় ছুটি নিতে অস্বীকৃতি জানায় নতুন প্রোগ্রাম চালুর কথা বলে। তখন সত্যপ্রিয়র মুখে আবেগ ভরা অভিনয়:
“ওসব প্রোগ্রাম-ট্রোগ্রামের কথা নিয়ে আপনি আর এখন মাথা ঘামাবেন না। জ্যোতির্ময়বাবু।” (তখ, পৃ. ১৯৯)
কিন্তু জ্যোতিময় জানে মূর্খের মতো এই উদারতার সুযোগ গ্রহণ করা যাবে না। সত্যপ্রিয় এমন উদারতা অনেকের সঙ্গেই দেখায়, কিন্তু কেউ সুযোগ নিলে তাকে ব্রহ্মান্ডে চরিয়া খাইবার জন্য মুক্তি দেয়। (১৯৯) এ সম্পর্কে সত্যপ্রিয়র থিওরি হলো:
“কর্মচারীদের সে এইসব কথা বলে, বন্ধু ও আত্মীয় হিসাবে, কর্মচারী ও উপরওয়ালার সম্পর্কটা তো তাতে বাতিল হইয়া যায় না, মাসাতে কর্মচারী মাহিনা তো গ্রহণ করে, সুতরাং কাজ সম্পর্কে আত্মীয়-বন্ধু হিসাবে সে যা বলে, কাজ সম্পর্কে সে কথা গুলি প্রয়োগ করা কি কর্মচারীদের উচিত? তার মতো অবস্থার আর একজন মানুষও কি আছে সামান্য মাহিনার কর্মচারীর সঙ্গে যে এমন সহজভাবে মেলামেশা করে, বিপদে-আপদে সহানুভূতি জানায়, পরামর্শ দেয়? এই মেলামেশার অনুগ্রহটুকু বাড়তি পাওনা মনে করিয়া তাদের কৃতার্থ থাকা উচিত।” (তখ, পৃ. ১৯৯)
এ সম্পর্কে শ্রীকুমার বন্দ্যোপাধ্যায় মন্তব্য করেছেন:
“তাহার রাজনৈতিক মতবাদের অসাধারণত্ব, অফিস পরিচালনা ও কর্মচারী পরীক্ষার অভিনব বিধি, বিনয় ও সহাস্য শিষ্টাচারের পিছনে অনমনীয় সংকল্প ও অমোঘ কূটনীতি-কৌশল-এই সমস্ত মিলিয়া এক দূরবগাহ মনুষ্য-চরিত্রের ছবি ফুটাইয়া তোলে।
গভর্নমেন্টের বড় বড় কন্ট্রাক্ট সত্যপ্রিয় পায়। সকলের কাছেই এ এক রহস্য। এ ব্যপারে জ্যোতির্ময় সত্যপ্রিয়কে বিশেষণ করার চেষ্টা করে। একজন ইংরেজ ভদ্রলোকের সঙ্গে সত্যপ্রিয়র পরিচয় আছে। সত্যপ্রিয়র যত লেখা ও বক্তৃতা ছাপা হয়, সত্যপ্রিয় তাতে নানা রকম মন্তব্য যোগ করে ইংরেজ লোকটিকে পাঠায়।
সত্যপ্রিয় তার প্রবন্ধ ও বক্তৃতায় স্বদেশীদের যেমন তীব্র ভাষায় সমালোচনা করে, গভর্নমেন্টের নিন্দাটা তেমন করে না। তার প্রবন্ধের নাম ছিলো “তেত্রিশ বৎসরে ভারতের স্বাধীনতা লাভের উপায়।” (১৯৪) সত্যপ্রিয় সেখানে বলেছে:
“ইংরেজবিদ্বেষ প্রচার করিয়া, স্বাধীনতার আন্দোলন তুলিয়া নেতৃবর্গ দেশের ধ্বংসের পথটাই পরিষ্কার করিয়া দিতেছে- স্বাধীনতাকে হাজার বৎসর ভবিষ্যতে ঠেলিয়া দিতেছে।” (৩খ,পৃ.-১৯৫)
সত্যপ্রিয়র এইসব কৌশল ইংরেজ সরকারকেও বশ করেছে। সত্যপ্রিয় এই কৌশলেই দেশকে ঠকার, দেশের মানুষকে ঠকার আর নিজের আখের গোছায়। দেশের লোক সম্পর্কে তার ধারণা
“দেশের জন্য যাঁরা জীবন উৎসর্গ করেছেন, অর্ধেক জীবন জেলে কাটিয়েছেন, তারা সবাই ভুল করে দেশকে টেনে টেনে নিয়ে যাচ্ছেন সর্বনাশের দিকে।” (তখ, পৃ. (১৪৯)
সত্যপ্রিয়র চরিত্রের অন্যতম বৈশিষ্ট্য নিষ্ঠুরতা। আত্মীয়-অনাত্মীয় সকলের প্রতি-ই তিনি প্রয়োজনে নিষ্ঠুর হতে পারেন। যশোদার ভাই হওয়ার অপরাধে নন্দকে অপমান করে সে। তার পিতার বার্ষিক শ্রাদ্ধে সকলের সঙ্গে নদ খেতে বসেছিল।
সত্যপ্রিয় হলঘরের এক পার্শ্বে কার্পেট পেতে রুপোর থালায় নন্দকে খেতে বসালো নন্দ অপমানে কেঁদে ফেললো। যশোদার সঙ্গে রেষারেষিতে নেমে সত্যপ্রিয় যশোদাকে সর্বস্বান্ত করে দেয়, তাকে শ্রমিকদের কাছে অবিশ্বাস করে বিচ্ছিন্ন মানুষে পরিণত করে। উপন্যাসের শেষে দেখা যায় যশোদাকে সত্যপ্রিয় বাড়ি বিক্রি করে অন্যত্র যেতে বাধ্য করে।
সত্যপ্রিয় শুধু বাইরের লোকের সঙ্গেই নিষ্ঠুর আচরণ করে না, নিজের কন্যা এবং জামাতার সঙ্গেও একই রকম ব্যবহার করে। কন্যা যোগমায়ার মন খারাপ দেখে সত্যপ্রিয় কন্যা-জামাতাকে আলাদা করতে চায়, জামাতার হাত খরচের টাকা দেওয়া বন্ধ করে, এমন কি জামাতাকে সে বাড়িতে পাঠিয়ে দেয়। অতঃপর যোগমায়াকে নিয়ে যামিনী চলে যেতে চাইলে তাদের বাধা তো দেয়ই না, উপরন্তু চলেই যেতে বলে:
“এই অন্দর মহলের ছবি যেমন একদিকে সত্যপ্রিয়ের পরিচয় সম্পূর্ণ করিয়াছে, তেমনি অন্যদিকে তাহার ব্যক্তিত্বের মধ্যে যে একটা সংকীর্ণ যান্ত্রিকতার দিক আছে। তাহার উপরও আলোকপাত করিয়াছে। যে ব্যক্তি মিলের শ্রমিক ও ঘরের কন্যা- জামাতা উভয়ের অবাধ্যতার জন্য একই শাস্তি বিধান করে, তাহার প্রকৃতিতে প্রসার ও নমনীয়তার যে একান্ত অভাব তাহা স্বীকার করিতেই হইবে।’
সত্যপ্রিয় সকল অবস্থাতেই তিনি আধিপত্য বিস্তার করে সুখ অনুভব করে। জ্যোতির্ময়ের জ অপরাজিতা সত্যপ্রিয়র মেয়ের বিয়েতে গিয়ে অসুস্থ হয়ে পড়লে ডাক্তারের মতামতকে অগ্রাহ্য করে সে মুমূর্ষু অপরাজিতাকে বাড়ি পাঠিয়ে দেয়। অবশেষে যশোদা নিজের উদ্যোগে তাকে হাসপাতালে নিয়ে যায়, কিন্তু শেষ রক্ষা হয় না। সত্যপ্রিয়র নিজস্ব মতামতের কারণে অপরাজিতা মৃত্যুবরণ করে।
জ্যোতির্ময় চরিত্রটি প্রভুভক্ত মেরুদণ্ডহীন চরিত্র। সে উচ্চমধ্যবিত্ত শিক্ষিত মানুষ। সত্যপ্রিয়র অফিসে কাজ না করে অন্য কোথাও কাজ জোগাড় করা তার পক্ষে অসম্ভব কিছু না। কিন্তু সে সত্যপ্রিয়র গুণমুগ্ধ কর্মচারী। সত্যপ্রিয়র প্রতি আনুগত্য তার একটি মোহ। সত্যপ্রিয়র প্রচার বিভাগের পরিচালক সে। সত্যপ্রিয়র কথামত একটি কচি মেয়েকে সে বিয়ে করে। অপরাজিতার বয়স তার অর্ধেকেরও কম।
জ্যোতির্ময় অফিসপাগল মানুষ। অফিসে ঢুকে জ্যোতির্ময় পুরনো কাগজের সোঁদা গন্ধ পায়। সঙ্গে সঙ্গে আরাম বোধ করে:
“টেবিৱে উপর বাঁধানো খাতা, ফাইল, কাগজপত্র, অভিধান পর্যায়ের কয়েকটি ইংরেজি বাংলা বই, কতকগুলি মাসিক ও সাপ্তাহিক পত্রিকা, আজের তারিখের সাত- আটখানা ইংরেজি বাংলা ছোটোবড়ো সংবাদপত্র, কাগজ চাপার তলে কয়েকটি প্রুফ, কাঁচের দোয়াতদান, বটিংপ্যাড, কলিংবেল, পিনকুশন এই সমস্ত খুঁটিনাটির অস্তিত্ব পর্যন্ত যেন চোখের পলকে অনুভব করিয়া সে খুশি হইয়া ওঠে।” ( তখ, পৃ.-১৫২)
জ্যোতির্ময় কখনো অফিস ফাঁকি দেয় না। সত্যপ্রিয়র পিতার বার্ষিক শ্রাদ্ধের দিন অফিসে সে আসবে না জেনে সকলেই যখন কাজে ঢিল দিয়েছে, জ্যোতিময় তখনো ঘাড় গুঁজে লিখে চলেছে। তারপর সত্যপ্রিয় এসে তার সামনে দাঁড়িয়ে কথা বললে সে তড়াক করে উঠে দাঁড়ায়। জ্যোতির্ময়ের নীরব পূজা সত্যপ্রিয় উপভোগ করে। জ্যোতির্ময় শুধু অফিসিয়াল কাজই করে না, সত্যপ্রিয়র মেয়ের বিয়ে উপলক্ষে প্রীতি উপহারের পদ্যও লেখে। জ্যোতির্ময় প্রকৃতপক্ষে সত্যপ্রিয়র গুণমুগ্ধ
“সত্যপ্রিয় অসাধারণ মানুষ, এ জগতে তার মতো মানুষ আর নাই, তার অতুলনীয় বিদ্যাবুদ্ধি, ব্যক্তিত্ব, কর্মশক্তি, চরিত্রবল, নিষ্ঠা সমস্ত মিলিয়া জ্যোতির্ময়কে শ্রদ্ধা ও ভক্তিতে গদগদ করিয়া দিয়াছে।” ( ৩খ, পৃ. ১৫৪-১৫৫)
মানুষ হিসেবে জ্যোতির্ময় খুব প্রাণখোলা এবং উপকারী। সে সকলের সঙ্গে মধুর ব্যবহার করে । যশোদা জ্যোতির্ময়ের বাড়ি গেলে আপনজনের মতো সে আহ্বান করে:
“এসো চাঁদের মা।” ( তখ, পৃ. ১৪০ )
মন খুলে কথা বলে যশোদার সঙ্গে। সে নদর চাকরির ব্যাপারেও কথা বলে। সে নন্দর চাকরির কথা ভোলে নি, যশোদা না এলেও সে চেষ্টা করতো। এরপর জ্যোতির্ময় নন্দকে সত্যপ্রিয়র মিলে একটি চাকরি দেয়, নিজের সাহায্যকারী হিসেবে। অপরাজিতার শারীরিক অসুস্থতার কথা বলতে যশোদা আরেকবার জ্যোতির্ময়ের বাড়ি যায়। সে যশোদাকে পেয়ে খুশি হয়ে ওঠে:
“তোমার সঙ্গে কথা বলতে এমন ভালো লাগে, এমন সহজভাবে তুমি কথা বলতে পার। কোনো বিষয়ে তোমার ন্যাকামি নেই। মানুষের মন রেখে কথা বলতে বলতে প্রাণ বেরিয়ে গেল চাঁদের মা।” (৩থ, পৃ. ১৮৮)
এই কথার মধ্য দিয়ে জ্যোতির্ময়ের অবস্থান স্পষ্ট হয়ে ওঠে। তার প্রকৃতি একাধারে ভয় আর দুর্বলতা, সাহস আর তেজ, বিষাদ আর হাসিখুশি ভাব, ভোঁতামি আর ধারালো বুদ্ধির সমন্বয়ে পরিপুষ্ট। সে চালাকচতুর। জ্ঞান, অভিজ্ঞতা, তেজ, অহংকার আর একগুঁয়েমিও আছে। সকল অবস্থাতেই জ্যোতির্মরের সত্যপ্রিয়কে তোষামোদ করা চাই।
সে অপরাজিতাকে বলে নিমন্ত্রণ খেতে গিয়ে সত্যপ্রিয় সামনে পড়লে তার পায়ে হাত দিয়ে প্রণাম করতে। এরপর জানতে পারে সত্যপ্রিয় অপরাজিতাকে নকল নেকলেস দিয়েছে। নেকলেসটা নকল বলে তার জেদ বেড়ে যায়। সে সকাল সকাল সকলকে নিয়ে সত্যপ্রিয়র বাড়ি নিমন্ত্রণ রক্ষা করতে যায়। তার মাথায় শুধু নেকলেসের কথাটি ঘুরতে থাকে। সে বিশ্বাস করতে পারে না যে সত্যপ্রিয় নকল নেকলেস দিতে পারে।
সত্যপ্রিয়র বাড়ি গিয়ে সে নতুন করে সত্যপ্রিয়কে দেখতে থাকে। যশোদার সঙ্গে কথা বলার জন্য সে সাজ পোশাক পরিবর্তন করে, তার মনে পড়ে যায় মাড়োয়ারি ব্যবসায়ী দেখা করতে আসবে বলে সে ইচ্ছে করে বেশে খানিকটা বাঙালিত্ব লোপ করে দেয়, যা আগস্তকের সঙ্গে অন্তরঙ্গ হতে সাহায্য করবে। সব কিছুর পরও সে সত্যপ্রিয়র জন্য গদগদ হয়ে থাকে। যশোদাকে বলে:
“এমন মানুষ আর দেখেছ?” ( ৩খ, পৃ. ১৭৬)

তবে নেকলেসের কথাটি জ্যোতির্ময় ভুলতে পারে না। সত্যপ্রিয় কেন এমন করে তাকে ঠকালো তাও সে বুঝতে পারে না। সত্যপ্রিয় যে সকলকেই কোনো না কোনোভাবে ঠকায়- এ কথাটি জ্যোতিময় একবারের জন্যও ভাবে না। নানা রকম চিন্তা করে সে। সত্যপ্রিয় ভালো একটা কাপড় দিতে পারতো, ছোটখাটো সোনার কিছু দিতে পারতো, কিছুই না দিতে পারতো:
“লোকের মনে এ রকম মিথ্যা ধারণা সৃষ্টির উদ্দেশ্যই যদি সত্যপ্রিয়র না থাকিবে, এমন জিনিস সে কেন দিবে প্রথম কয়েকদিন যা চোখে ধাঁধা লাগাইয়া দেয়, “( ৩খ,1. ১৮৮)
সত্যপ্রিয়র মেয়ের বিয়ের প্রীতি উপহারের পদ্য লিখতে গিয়ে সে এসব ভাবছে। কোনো প্রকারে যেন সত্যপ্রিয়র দোষ দিতে না পারলে সে বেঁচে যায়। সে চিন্তা করে, হয়তো সত্যপ্রিয় নেকলেসের ব্যাপারে কিছুই জানে না, যাকে দিয়ে নেকলেস কিনিয়েছে সেই এমন নকল জিনিস কিনেছে, কারণ ফাঁকি ধরা পড়লেও তো এ কথা জ্যোতির্ময় বলতে পারবে না।
সত্যপ্রিয় হয়তো অপরাজিতাকে দেওয়ার সময় শুধু নেকলেসটা দেখেছে, এর আগে দেখেও নি। সত্যপ্রিয়র মেয়ের বিয়েতে গিয়েও সে একই চিন্তা করে। তাকে দেখলে অসুস্থ মানুষের মতো মনে হচ্ছে। দু-একজন চেনা মানুষ তাকে জিজ্ঞাসাও করেছে তার মুখ শুকনো কেন। সত্যপ্রিয়র ভালো দিক এবং মন্দ দিক নিয়ে জ্যোতির্ময় ক্রমাগত পর্যালোচনা করতে থাকে। কিন্তু সে সত্যপ্রিয়র ব্যাপারে কোনো রূঢ় সিদ্ধান্ত নিতে পারে না। প্রকৃতপক্ষে তার মধ্যে মেরুদণ্ডহীন শিক্ষিত মধ্যবিত্ত শ্রেণির বিহ্বলতা প্রতীয়মান
“সে ভীরু কাপুরুষ, সত্যপ্রিয়র মত বড় লোকের মোসাহেবি করা তার স্বভাব। সত্যপ্রিয়ের মত বড় লোকের তোষামোদ করে তার জীবন কাটে বলেই সত্যপ্রিয়র বিরুদ্ধাচরণ করা তার পক্ষে অসম্ভব এবং এ কারণেই সত্যপ্রিয়র ভণ্ডামী প্রত্যক্ষ করা সত্ত্বেও সে কখনোই সত্যপ্রিয়ের ভণ্ডামীর বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করে নি।
কাজপ্রিয় জ্যোতিময় সারা দিন কাজ করে রাতে এসে সে অপরাজিতাকে ভালোবাসা উজাড় করে দেয়। অপরাজিতা অল্প অল্প গান জানে বলে জ্যোতির্ময় তাকে অর্গ্যান কিনে দেয়। ভালোবেসে তাকে একের পর এক আসবাব কিনে দেয়, শাড়ি কিনে দেয়। বেশি বয়সে নিয়ে করলে নাকি লোকে বউপাগল হয়। জ্যোতির্ময়ের পাগলামি শুরু হয় রাতে, সজ্জা গ্রহণের পর, যখন তার আর অন্য কাজ থাকে না:
“আগে বিশ্রাম ছিল শুধু ঘুম, এখন জুটিয়াছে পুতুল নিয়া খেলা করার আমোদ অপরিপুষ্ট ও অপরিণত অপরাজিতার বিবর্ণ মুখ ও উৎসুক দৃষ্টি শ্রান্তি দূর করিতে সাহায্য করে। সারাদিন মনের রাশ টানিয়া রাখিবার পর আলগা দেওয়ামাত্র প্রতিক্রিয়া আরম্ভ হয় প্রচণ্ডভাবে, মনের একটা সামরিক বিকারের মতো। কী যে সে করে অপরাজিতাকে নিয়া আর কী যে করে না, কিছুই ঠিক থাকে না।” ( তখ, পৃ. ১৫০ )
জ্যোতির্ময় খেয়ালও করে না অপরাজিতার মুখে একটি কথা নাই, আধমরা মানুষের মতো সে শিথিল হইয়া গিয়াছে । অতিরিক্ত ভালোবাসায় অপরাজিতা আস্তে আস্তে অসুস্থ হয়ে পরে। কিন্তু জ্যোতির্ময়ের চোখে তা পরে না। যশোদা জ্যোতির্ময়কে বললে সে বিশ্বাস করতে পারে না।
জ্যোতির্ময় এতোটাই প্রভুভক্ত যে অসুস্থতার কারণে অপরাজিতা সত্যপ্রিয়র মেয়ের বিয়েতে যেতে না চাইলেও সে জোর তরে মিষ্টি মিষ্টি কথা বলে নিয়ে যায়। বিয়েবাড়িতে সে বেশি অসুস্থ হয়ে পরে এবং পরদিন হাসপাতালে মারা যায়। স্বামী জ্যোতির্মর স্ত্রীকে প্রেম দিয়েছে, কিন্তু কর্তব্যপালনে সমর্থ হয় নি। অপরাজিতা হাসপাতালে ভর্তি হওয়ার পর রাতে সে একা হাসপাতালে বসে থাকে।
সুবর্ণ অপরাজিতাকে ভালোবাসে, জ্যোতির্ময় এই দুর্দিনেও অফি যাচ্ছে দেখে সুবর্ণ বলে বউদি যেন মরে। জ্যোতিময় সুবর্ণর গালে চড় বসিয়ে দেয়। এর মধ্য দিয়ে অপরাজিতার প্রতি ভালোবাসাই প্রকাশ পায়। সুবর্ণ-নন্দ যখন অপরাজিতার জন্য কাঁদছে তখন জ্যোতিষয়ের চোখ দিয়েও জল পরে।
অপরাজিতার মৃত্যুর পরও সত্যপ্রিয়র প্রতি জ্যোতির্ময় ক্ষুণ্ণ হয় না। সে আগের নিয়মেই চাকরি করে চলে। তার নিজের মধ্যে কোনো অনুশোচনার বোধও জন্ম নেয় না, কোনো অপরাধবোধও কাজ করে না। এ দিক দিয়ে জ্যোতিময় একটি নিষ্ঠুরপ্রকৃতির চরিত্র হিসেবে প্রতীয়মান হয়।
যশোদার একমাত্র ভাই নদ। সে একেবারে যশোদার বিপরীত। অপরিপুষ্ট শরীর, মুখে মেয়েদের মতো কোমলতা। সর্বদা কীর্তন নিয়ে ব্যস্ত থাকে। একদিন আসরে কীর্তন গাইলে দু/তিনদিন তার প্রভাবে বিছানায় পরে থাকে। তার বাস্তব জ্ঞানের অভাব।
দেহে এবং স্বভাবে তাকে যশোদার ভাই বলে মনে হয় না। নন্দর প্রকৃতি ভীত এবং কুঁড়ে, তবে তার মন সরল। যশোদাকে সে ভয় করে। যশোদার সামনে নন্দ অসহায়, সে বোনের ওপর নির্ভরশীল। বন্ধুদের সঙ্গে আড্ডা দিয়ে, তাস খেলে সে বন্ধুদের মতো উচ্ছন্নে যায় না, কুলি-মজুরদের বাস্তব জীবনের সংস্পর্শে থেকেও বাস্তব জ্ঞান তাকে নাড়া দেয় না। নন্দ অনেকটা আত্মভোলা মানুষ ।
‘মডার্ন ক্লাব ও লাইব্রেরির প্রতিষ্ঠা দিবসে সত্যপ্রিয়র বক্তব্য শুনে সে একটি চাকরির প্রয়োজনীয়তা অনুভব করে। সে বলে
“একটা চাকরি না হলে আর চলবে না দিদি।” ( তখ, পৃ. ১৩১ )
নন্দর এ কথা শুনে যশোদার প্রতিক্রিয়ায় নন্দর প্রকৃতি আরো স্পষ্ট হয়ে ওঠে। “তুমি যদি চাকরি করবে তো কেত্তন গেয়ে দিন কাটাবে কে? কাল সকালতক সুবুদ্ধি টিকবে না, টেকে তো কাল সকালে চাকরির ভাবনা ভাবিস।” ( তখ, পৃ. ১৩১)
নন্দকে যশোদা দোকান করে দিতে চায় কিন্তু অত পরিশ্রমে সে আগ্রহী নয়। সত্যপ্রিয়র মিলে জ্যোতির্ময়ের সাহায্যকারী হিসেবে সে চাকরিতে যোগ দেয়। এই কাজ পেয়ে সে খুশি হয়ে ওঠে:
“সে চাকরি করে কেবল এই জন্যই তার গর্বের সীমা নাই, তার উপর জীবনের হঠাৎ একটা অভূতপূর্ব পরিবর্তন ঘটিয়াছে, কী একটা অজানা রহস্যময় জগতে সে আসিয়া পড়িয়াছে যেখানে চলাফেরা ওঠাবসা কথা বলা চুপ করিয়া থাকা সব কিছুরই নিয়ম নতুন।” ( ৩খ, পৃ.-১৫২)
জ্যোতির্যয়ের রুমে এককোণে ছোট একটি টেবিল তার রাজ্য। মোটা মোটা খাতা, দোয়াতদান, বটিংপ্যাড, পিনকুশন নন্দর সম্পত্তি। সবকিছু যত্ন করে সাজিয়ে গুছিয়ে রাখে। লাল-নীল পেন্সিলের দুটি মুখ কাটে, লাল কালির কলম ভুলেও কখনো কালো কালিতে ডুবায় না।
অতি উৎসাহের সঙ্গে অফিসের নিয়মকানুন আয়ত্ত করার চেষ্টা করে। খামে ভরার আগে জ্যোতির্ময়ের লেখা পত্রটি ক্লিপ দিয়ে লাগাবে না-কি পিন দিয়ে লাগাবে এ কথাটিও জ্যোতির্ময়কে জিজ্ঞাসা করে নেয়। কে কে রুমে এলে দাঁড়াতে হবে তা-ও জ্যোতির্ময়কে জিজ্ঞাসা করে। সরল বিশ্বাসে একটি শিশুয়ন নিয়ে নন্দ কাজ শিখতে থাকে। কাজ শেখার প্রতি তার আগ্রহের কমতি নেই।
যশোদার ভাই হওয়ার কারণে নন্দর ভাগ্য সত্যপ্রিয়র রোষানলে পড়ে। সত্যপ্রিয় স্বেচ্ছাচারি মানুষ। তার পিতার বার্ষিক শ্রাদ্ধের দিন সে অফিসে এসে সমস্ত কর্মচারীকে বিব্রতকর অবস্থায় ফেলে দেয়। জ্যোতির্ময়ের রুমে এসে নন্দকে তার চোখে পরে। শীর্ণ দেহ হওয়ার কারণে সত্যপ্রিয়তে প্রণাম করার সময় নন্দর শিরদাড় যেন জামা ঠেলে বের হয়ে আসতে চায় ।
সত্যপ্রিয় ছেলে মানসি খেয়ালে নন্দর শিরদাঁড়ের উপর হাত বুলিয়ে দেয়। নন্দর শরীর নিয়ে সত্যপ্রিয়র ব্যঙ্গ করারটা নন্দর মোটা বুদ্ধিতে ধরা পরে না। সত্যপ্রিয় নন্দকে চূড়ান্ত অপমান করে তার বাড়িতে শ্রাদ্ধ খাওয়ার সময়। নদ জ্যোতির্ময়ের পাশে বসেছিল। সত্যপ্রিয় তাকে তুলে নিয়ে ঘরের একপাশে কার্পেটের উপর রুপোর থালাবাটিতে খেতে দেয়, এবং ভূষণকে রাখে শুধু নন্দর পরিবেশনের জন্য।
সত্যপ্রিয় বলে যশোদার ভাই বলে নন্দকে বিশেষভাবে আপ্যায়ন করা হচ্ছে। ঘরের কয়েকশ মানুষ স্তব্ধ হয়ে যায়। নন্দর প্রায় কেঁদে ফেলার উপক্রম হয়। মানুষ হিসেবে নিজের সম্মান সম্পর্কে নন্দ সচেতন হয়ে ওঠে। সে কিছু না খেয়ে হাত গুটিয়ে বসে থাকে। ফেরার সময় জ্যোতির্ময় তাকে অফিসে আসতে বারণ করে দেয়। বাড়ি ফিরে নন্দ যশোদাবে অভিযোগ করে।
“সকলের সঙ্গে ঝগড়া করবে তুমি, আর চাকরি যাবে আমার। সর্বনাশ করে ছাড়বে তুমি আমার।” তথ, প-১৫৭)
চাকরির প্রতি নন্দর প্রীতি দেখা যায়। চাকরিটি চলে গেলে সে যশোদার ওপর রাগ করে। যশোদা সব শুনে লুচি-পোলাও না খেয়ে চলে এসেছে জেনে বাজার থেকে লুচি-মিষ্টি এনে খাওয়ায়। নদ না খেয়ে চলে এসেছে শুনে যশোদা খুশি হয়।
জ্যোতির্ময়কে নদ বলে এসেছে তার বেতন লাগবে না। কিন্তু নন্দর জীবনীশক্তি অত প্রখর নয়, পরদিন বেতনের লোভ সে সামলাতে পারে না। সে জ্যোতির্ময়ের বাড়ি ছুটে যায়। যশোদার নিজের হাতে মানুষ করা নম্প যশোদার মতো হয় নি, সে টাকার লোভ ছাড়তে পারে না। সে জ্যোতির্ময়কে বলে।
‘আমার এক মাসের বেতনটা পাইয়ে দেবেন তো?” ( তখ, পৃ.-১৫৯)
নন্দ শিল্পী। দীননাথের কাছে সে কীর্তন শেখে। দীননাথের দলের সঙ্গে সে মাঝে মাঝে কীর্তন গাইতে যায়। মাঝে মাঝে তার একার ডাক পড়ে। সাধারণ জীবনে সে ভীরু ও লাজুক। কীর্তন গাওয়ার সময় তার লজ্জা থাকে না।
“কীর্তনের আসরে শ্রোতাদের মধ্যে আবেগ, রোমাঞ্চ ও শিহরণ বিতরণ করার সময় তার সবটুকু আড়ষ্ট ভাব কাটিয়া যায়, ” ( ৩খ, পৃ. 191)
শিল্পী নন্দ এক ভিন্ন মানুষ। শব্দে যা প্রকাশ করা যায় না, তারই অভিব্যক্তি নন্দ সর্বাঙ্গের ভাবভঙ্গি দিয়ে প্রকাশ করতে থাকে। কীর্তন গাইতে গাইতে নন্দ বিভোর হয়ে ওঠে। কোনো দিন সে গায় রাধার ভেজা কাপড়ে পরপুরুষকে দেখে লজ্জার কথা-নন্দর সর্বাঙ্গে অভিনীত হয় গৃহস্থ বধূর আড়ষ্ট ভাব। আবার কখনো সে গায় রাধার বিরহে কৃষ্ণের অবস্থা শুনতে শুনতে দীননাথও কেঁদে ফেলে নন্দকে বুকে চেপে ধরে। আরো অনেকে কেঁদে ফেলে।
বড়ো আসরে জমজমটি কীর্তন করার পর দু-তিনদিন নন্দ অসার হয়ে পরে থাকে। হাসে না, কথা বলতে চায় না, খেতে চায় না, নড়াচড়া করতে চায় না। প্রাণহীন জড়পিণ্ডের মতো শুয়ে-বসে সময় কাটায়। একদিন সত্যপ্রিয়র বাড়িতে কীর্তন গাওয়ার নিমন্ত্রণ আসলো নন্দর। সত্যপ্রিয়র অপমান সত্ত্বেও নন্দ কীর্তন গাইতে যায়। নারী-পুরুষ তন্ময় হয়ে নন্দর কীর্তন শোনে।

কীর্তন শুনে কঠোর প্রাণ যশোদারও মানসিক জগৎটা বদলে যায়, বুকের মধ্যে আকুলি-বিকুলি করে। অপরাজিতা সে রাতে সকলে ঘুমিয়ে গেলে কান্না করে, ননদ সুবর্ণকে বলে কীর্তন শুনে তার কেমন লাগছে। অন্যদিকে সুবর্ণ সারা রাত ঘুমোতে পারে না, নন্দর কাছে যাওয়ার জন্য সে ছটফট করে। সুবর্ণ নন্দর প্রেমে পরে। সুবর্ণের রূপে নন্দ আগেই মুগ্ধ হয়েছিল, তাই দুজনে এবার এক হয়।
প্রেমিক নন্দ প্রথম দিকে হাবা-গোবা প্রকৃতির। জ্যোতির্ময়ের চড় খেয়ে সুবর্ণ যশোদার কাছে এলে সেখানে কোনো সহনুভূতি মেলে না, নন্দ সুবর্ণর গাল দেখে বিস্মিত হলো। সুবর্ণ তাকে সঙ্গে নিয়ে চলতে থাকে। নন্দ সুবর্ণের সঙ্গে চলতে গিয়ে রোমাঞ্চিত হয়। প্রেমের ব্যাপারে নন্দ সুবর্ণের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পরে।
সত্যপ্রিয় আবার নন্দকে ষাট টাকা বেতনে চাকরি দিলে যশোদা সে চাকরি করতে নিষেধ করে, নন্দ যায় সুবর্ণের সঙ্গে পরামর্শ করতে। সুবর্ণ চাকরি ছাড়তে না করে। তার পর বলে বেতন যদি একশো হতো, কিংবা জ্যোতির্ময় যদি চাকরি ছেড়ে দিয়ে নন্দদের পর্যায়ে নেমে যেতো। এমনি করে দুজন নিজেদের ভবিষ্যৎ নিয়ে কথা বলে। এ ব্যাপারে নন্দ বলে
“ যদি না হয়?”( ৩খ, পৃ.- ২১০ )
সুবর্ণ বলে তাই করবো। অর্থাৎ কোনো উপায় না থাকলে দুজন হাত ধরাধরি করে নিরুদ্দেশ হয়ে যাবে। ‘শহরতলী’ দ্বিতীয় খণ্ডে দেখা যায়-নদ আর সুবর্ণ সত্যিই পালিয়ে গেছে। তারপর সিনেমার পোস্টারে নন্দকে দেখে যশোদা চিনতে পারে। সে সিনেমায় গিয়ে দেখে নন্দ আর সুবর্ণ সিনেমা করছে। রাজেনকে দিয়ে যশোদা খোঁজ নেওয়ায় নদ অনেক বড়ো লোক হয়ে গেছে, তার বসার ঘরে গদি আঁটা চেয়ার।
এমনি করে নন্দ ভীরু প্রকৃতি থেকে সিনেমার অভিনেতা পর্যায়ে উপনীত হয়। তবে নদ কোন উপায়ে সিনেমায় অভিনয়ের সুযোগ পেলো সে সম্পর্কে লেখক আমাদের অবহিত করেন নি।
‘শহরতলী’ উপন্যাসে সুধীর ফ্রয়েডীয় বিকারগ্রস্ত চরিত্র। সে যশোদার পাগলা প্রেমিক । যশোদাকে সে যেমন ভয় পায়, তেমনি ভালোবাসে। সুধীর বোকা এবং গোঁয়ার প্রকৃতির। বোকা বলে সে অকারণে অভিমান করে, আবার কোনো পরিণতির কথা বিবেচনা না করে যশোদার প্রেমে অন্ধ হয়ে সে ভয়ংকর কাজও করে ফেলে। লেখক সুধীরের বর্ণনা দিয়েছেন এভাবেঃ
“সুধীরের বয়স ত্রিশেরও কম, বেঁটে আর চওড়া শরীরটা তার লোহার মতো শক্ত, যেমন অশান্ত তেমনই নিষ্ঠুর তার প্রকৃতি এবং পৃথিবীর সকল গোঁয়ারের মত সে বোকা।” (তখ, পৃ. ১৪2 )
সুধীরের এই অল্প বয়সী জীবনের অভিজ্ঞতা মোটেই অল্প নয়। তার অভিজ্ঞতা একটানা পেষণের অভিজ্ঞতা। জগতে কিছু বঞ্চিত মানুষের জন্ম হয়, তারা কারো কাছে কোনো সরদ পায় না, সহমর্মিতা পায় না- সুধীরের জীবন সেই রকম। পরের আশ্রয়ে সে বড় হয়েছে, পরের অবজ্ঞা, অবহেলা, স্বার্থপরতা, ক্ষমাহীনতা তার কাছে স্বাভাবিক বিষয়:
“সুস্থ শরীরে খাটিতে পারিলে খাইয়াছে, অসুস্থ শরীরে খাটিতে না পারিলে উপবাস করিয়াছে, ভিক্ষা করিয়াছে, চুরি করিয়াছে, জেলেও গিয়াছে। একবার অনেক কষ্টে কিন্তু টাকা জমাইয়া বিবাহ করিয়াছিলো, দু মাসের মধ্যে বউটা একজনের সঙ্গে উধাও হইয়া গিয়াছে।” (৩খ, পৃ. ১৪৩)
সুধীরের মতে মানুষে মানুষে সম্পর্ক শুধু প্রাপ্য আদায়ের সম্পর্ক। সংসারে দরদের স্থান সম্পর্কে সে একেবারে অজ্ঞ।
সুধীর অত্যন্ত বোকা একটি মানুষ। তার মোটা বুদ্ধি। সূক্ষ্ম চিন্তা তার মাথায় ঢোকে না। সুধীর এবং মতি রাতে মদ খেয়ে বাড়ি ফিরেছিলো এবং ঘুম থেকে উঠতে তাদের দেরি হয়েছে দেখে যশোদা তাদের দুজনের খাওয়া বন্ধের ঘোষণা দেয়।
তারা আবার যশোদার সামনে সাহস করে খেতে আসবে না জেনে তাদের ভাত বেড়ে বাজারে যাওয়ার নাম করে বাড়ির বাইরে চলে যায়। সুধীর এই খাপছাড়া প্যাচালো দরদের ব্যাপারে বুঝতে পারে না। সে মনে করে যশোদাকে ফাঁকি দিয়ে তারা খেয়ে এসেছে।
মতি তাকে বুঝিয়ে বলে যে যশোদা তাদের খাওয়ার সুযোগ করে দিয়ে বাইরে গেছে। তখন সে আশ্চর্য হয়ে যায়। যশোদার আরো কয়েকটি কাজের কথা তার মনে পড়ে। তার জ্বর হয়েছিলো, যশোদা তখন তার সেবা করেছিলো। মারামারি করায় একবার তার পঁচিশ টাকা জরিমানা হয়েছিলো; যশোদা জরিমানার টাকা না দিলে তাকে জেলে যেতে হতো। একথাগুলো মনে করে সুধীর অভিভূত হয়ে পরে। সংসারে মায়া-মমতা- সহানুভূতির বিষয়টি তার মনে রেখাপাত করতে শুরু করে।
সুধীরের চরিত্রে উন্মোচিত হয় নতুন একটি দিক। এবার সুধীর মতির প্রতি সহানুভূতি দেখাতে গিয়ে আরেকটা বোকামি করে বসলো। কারখানায় মারামারি করলো। একঘন্টার মধ্যে মতি, সুধীর এবং আরো আটজন শ্রমিক বরখান্ত হলো। এরপর যশোদার মধ্যস্থতায় মীমাংসা হলো।
সবাইকে চাকরিতে বহাল রাখলো শুধু সুধীর ছাড়া। সুধীর এতই বোকা যে যশোদার সঙ্গে সে অকারণ অভিমান করে। যশোদা খেতে ডাকলে খায় না, কাছে গিয়ে দাঁড়ানো মাত্র গটগট করে নিচে নেমে যায়। অতঃপর যশোদার মিষ্টি কথায় তার রাগ ভাঙে, যশোদা তাকে কম খাটুনিতে বেশি মাইনের চাকরি পাইয়ে দিতে চায়, তার সাহসের প্রশংসা করে
“তোমার সাহস আছে, তুমি তাই রুখে দাঁড়ালে- আর কেউ পরের অপমান গায়ে মেখে নিত অমনি করে?” (৩খ, পৃ. ১৪৮)
সুধীর এবার যশোদার প্রেমে পড়ে
“সুধীর অভিভূত হইয়া যশোদাকে দেখিতে থাকে, সে দৃষ্টিতে অন্য কারও হয়তো রোমাঞ্চ হইত, যশোদা দেখিয়াও দেখে না।” (তখ, পৃ. ১৪৮)
সুধীর যশোদাকে তার সঙ্গে বসে গল্প করতে বলে। যশোদা তাকে কড়া কথা বলে সে সময়ের জন্য নিবৃত করে। কিন্তু সুধীরের মনে প্রেম জেগে থাকে। ধনঞ্জয়ের সঙ্গে যশোদার হাসাহাসি সুধীরকে দিশেহারা করে দেয়। সে ধনঞ্জয়কে ঈর্ষা করতে শুরু করে। এক ফাঁকে যশোদাকে বলে- ধনঞ্জয়কে পালান ঘরে থাকতে দিয়েছ, ওর কাছে কোনো কানাকড়ি নেই, ও ভাড়া দিতে পারবে না। কাজ করার মতলব ধনঞ্জয়ের নেই, যতদিন পারে সে যশোদার ঘাড় ভেঙে খাবে, ইত্যাদি নানান রকম বদনাম করে ধনঞ্জয়ের নামে।
এরপর সুধীরের কাছে যে যশোদা টাকা পাবে সে কথা যশোদা মনে করিয়ে দিলে সুধীর অপমানিত হয়ে চলে যায়। কিন্তু তার মনে যশোদা আর ধনঞ্জয়ের প্রেমের বিষয়টি আরো স্পষ্ট হয়। যশোদা আর ধনঞ্জয় কাছাকাছি থাকলেই সুধীর এদিক ওদিক যাওয়ার সময় তীব্র দৃষ্টিতে দুজনকে দেখে, গা জ্বালা করে সুধীরের। অতীতে সুধীরের সঙ্গে যশোদার সব ভালো ব্যবহারের একটি একটি করে কুটিল ব্যাখ্যা তৈরি করে:
“রেলের ইয়ার্ডে তাকে কাজটা জুটাইয়া দিয়া মাঝখান হইতে যশোদা কিছু টাকা মারিয়াছে কি না তাই বা কে জানে!” (৩খ, পৃ.-১৬৪)
সুধীর মধ্যবিত্তসুলভ মুখোশ পরতে পারে না।
“ঈর্ষা, ক্ষোভ, অকৃতজ্ঞতা প্রভৃতি দুপ্রবৃত্তিগুলি ইহাদের মধ্যে লজ্জায় আত্মগোপন না করিয়া অনাবৃত তীব্রতার সহিত অভিব্যক্তি লাভ করে।
যশোদার দিক থেকে তার মন সরে না। সে ধনঞ্জয়কে ঈর্ষা করে, যশোদার ওপর অভিমান করে। এদিকে যশোদার ভাড়াটে পরেশকে পুলিশ ধরে নিয়ে গেলে পরেশের বউ যশোদাকে মিনতি করে বলে বাপেরবাড়ি পৌঁছে দিতে। পরেশের বউয়ের কান্নায় যশোদা রাজি হয়। ধনঞ্জয়কে সঙ্গে নিয়ে যশোদা তাকে কালীঘাটে বাড়ি পৌঁছাতে গেলে সুধীর চোখে অন্ধকার দেখে। সুধীর ভাবে তাকে সঙ্গে নিয়ে গেলো না কেন; কিংবা তাকে বলে গেলো না কেন।
তাকে বলে যাওয়ার যে কোনো সঙ্গত কারণ নেই সেটাও তার মাথায় আসে না। সে সোজাসুজি যশোদার ওপর রাগ করে। সুধীর কাজের সময়ও এসব বিষয় নিয়ে চিন্তিত থাকে এবং কাজে ফাঁকি দেওয়ার অপরাধে রাজেনের কাছে গালমন্দ শোনে। সুধীর সম্পর্কে সমালোচকের মন্তব্য: “সুধীরের মধ্য দিয়ে ভালোবাসা ঈর্যামেশা মানুষের প্রকৃত স্বরূপ যেমন প্রকাশ পেয়েছে, তেমনি প্রকাশ পেয়েছে অবহেলিত নিপীড়িত মানুষের সামাজিক অবস্থানের স্বরূপ। 88
সুধীরের কাজের সময় ধনঞ্জয় এসে তাকে শোনায় যশোদার সঙ্গে কালীঘাটে গিয়ে মিষ্টি খাওয়ার কথা। ঈর্ষান্বিত সুধীর সকলের চোখের আড়ালে একটি ওয়াগন ঠেলে দেয় ধনঞ্জয়ের দিকে। ধনঞ্জয়ের একটি পা কেটে ফেলতে হয়। ধনঞ্জয় হাসপাতাল থেকে বাড়ি এসে সুধীরকে জিজ্ঞেস করে ওয়াগন কে ঠেলে দিয়েছে। তাদের কলহ বাঁধার উপক্রম হলে যশোদা এসে সুধীরকে গালমন্দ করে। সুধীরের রাগ আরো বেড়ে
“তার জন্য দরন ছিল যশোদার মনে, ধনঞ্জয় আসিয়া সে দরদ গাপ করিয়াছিল। এখনও, ধনঞ্জয়ের ঠ্যাং কাটা যাওয়ার পরেও, এই ধনঞ্জয়কেই যশোদা দরদ করিবে? সে তুচ্ছ হইয়া থাকিবে?” (তখ, পৃ. ১৮২)
যশোদা ধনঞ্জয়ের সেবা করে, বাটিভরা দুধ খাওয়ায়, দরকারমতো বিড়ি পর্যন্ত কিনে দেয় দেখে সুধীর ক্ষোভে ফেটে পড়ে। সে নানা ছুতায় কাজ কামাই করে বাড়ি থাকতে চায়। যতক্ষণ কাজে থাকে ততক্ষণ সে যশোদা আর ধনঞ্জয়ের কথা চিন্তা করে। চিন্তা করতে করতে তার মাথায় খুন চেপে যায়- তার মুখের ভাষও হয়ে যায় খুনির মতো। এক রাতে সে মদ খেয়ে মাতলামি শুরু করে এবং ভোরে বাইরে গিয়ে তিনদিন পর বাড়ি ফেরে। তারপর অনেকটা শান্ত হয়ে সে যশোদাকে বললো
“তোমার জন্যই তো। তুমি আমার সঙ্গে ওরকম করো কেন?’ (৩খ, পৃ.-১৮৪) কিছুদিন পর সুধীর যশোদাকে চূড়ান্ত কথা বলে:
“আর তো সুধীর থাকিতে পারে না যশোদাকে ছাড়া, সে যে পাগল হইয়া গেল যশোদার জন্য তা কি যশোদা দেখিতে পায় না? এমন ভাবে আর কতদিন চলিবে? তার চেয়ে এখানকার বাড়িঘর বিক্রয় করিয়া যশোদা চলুক না তার সঙ্গে দূরদেশে, যেখানে তারা দুজনে ঘর বাঁধিয়া পরম সুখে থাকিতে পারিবে?- তুমি ভাবছ আমার চেয়ে বয়স তোমার দু-এক বছর বেশি, চেহারাটা তোমার জবরদস্ত, তোমার জন্যে আমার মন কাঁদতে পারে না, বাড়ি বিক্রির টাকার পরে আমার লোভ? আগেই তো বলেছি তোমাকে, আমার কোনো কুমতলব নেই। বেশ বাড়িঘর থাক তোমার, এমনিই চল তুমি আমার সঙ্গে, আমিই রোজগার করে তোমায় খাওয়াবো।” (৩খ, পৃ. ১৮৪)
যশোদার গালমন্দে সে চোরের মতো পালিয়ে বেড়ায়। যশোদা সুধীর সম্পর্কে ভাবে “এসব মানুষকে বিচার করা বড়ো কঠিন। এদের মতো একাধারে এমন বোকাহাবা পাকা, বজ্জাত, ঝানু, শিশু, কোমল, কঠোর, সাহসী, ভীরু, ভালো আর মন্দ জীব আর হয় না।” (৩খ,পৃ. ১৮৫)

এরপর যশোদা বুদ্ধি করে ঘটকালি করে। সুধীরকে রাজি করিয়ে কালোর সঙ্গে তার বিয়ে দিয়ে দেয়। বিয়ের পরও সুধীর ধনঞ্জয় আর যশোদার নামে কুৎসা রটাতে থাকে। যশোদার প্রতি তার ভালোবাসা এবং ধনঞ্জয়ের প্রতি ঈর্ষা তাকে নিরন্তর দগ্ধ করে। তবে কালোর প্রতিও তার ভালোবাসা জাগে। তাই যশোদা কালোকে গালি দিলে সে ক্ষুব্ধ হয় যশোদার প্রতি ।
সুধীরের মাধ্যমে একটি জটিল চরিত্র প্রকাশিত হয়েছে। তার মাধ্যমে দেখা যায় মানুষের মন সুধীরের মাধ্যমে একটি জটিল চরিত্র প্রকাশিত হয়েছে। তার মাধ্যমে দেখা যায় মানুষের মন পরিবর্তনশীল, স্থির নয়। সম্পর্কের, ভালোবাসার কোনো নির্দিষ্ট রূপও নেই। সময়ে তা মোড় ঘোরায় ।
শহরতলীর চেয়ে গ্রামের মানুষের জীবনবোধ ভিন্ন। তাদের আচার-আচরণ, চাল-চলনও ভিন্ন। ধনঞ্জয়ের মধ্য দিয়ে এ সত্য প্রকাশিত হয়ে ওঠে। ধনঞ্জয় চাকরির খোঁজে গ্রাম থেকে শহরতলীতে আসে। মতি তাকে যশোদার বাড়ি নিয়ে আসে। তার শরীর দৈত্যদানোর মতো বড় কিন্তু মন শিশুর মতো কোমল। তার গ্রামপ্রীতি খুব বেশি সুযোগ পেলে শহর এবং শহরতলীকে গাল মন্দ করে।
ধনঞ্জয়ের মধ্যে আত্মসম্মানবোধ এবং অহংকার প্রকট। গরিবের যে বাছবিচার করা ঠিক না এই বাস্তববোধ তার মধ্যে জন্মে নি। যশোদা তাকে দুটি কাজের খোঁজ দেয়, কিন্তু একটিও তার পছন্দ হয় না। তার মধ্যে গ্রাম্যতা এখনো রয়ে গেছে। আবার যশোদা তাকে একবেলা ভাত বেড়ে দিতে বললে সে রেগে আগুন হয়ে যায়
“সবাইকে ভাত বেড়ে দিতে বলছ আমায়? আস্পর্ধা তো কম নয় তোমার! মাইনে করা বামুন নাকি তোমার আমি?” ( ৩খ, পৃ. ১২৫)
এমনই ধনঞ্জরের তেজ। জেদ করে সে ভাতও খায় না। তারপর শহরতলী আর যশোদার ওপর রাগ করে সে গ্রামে ফিরে যায়। কিছুদিন পর সে আবার শহরতলীতে ফিরে আসে। এবার যশোদার কাছে টাকাকড়ি নেই, তাই সে বিব্রত বোধ করে। তারপর যশোদার প্রশ্রয়ে সে যশোদার বাড়িতে থাকে। প্রথম দিনেই সে তার বউ মরার কথা বলে যশোদাকে এবং বলে যশোদার মতো কাউকে… যশোদা তার ওপর রাগ করার বদলে দমফাটা হাসি হাসে। এতে ধনঞ্জয় আরো প্রশ্রয় পায়।
ধনঞ্জয় আকৃতিতে বড়সড় হলেও সে কুঁড়ে প্রকৃতির। তার জন্য কাজ জোগাড় করা যশোদার জন্য কঠিন হয়ে গেলো, সে আবার সব ধরনের কাজ করবেও না, অপমানবোধ হয়। সে জানে চাষবাষের কাজ, শহরতলীতে তো চাষের কাজ নেই। সুধীরের সঙ্গে তাকে রেলের ইয়ার্ডে পাঠালো কাজ দেখতে। এদিকে সুধীর যশোদা আর ধনঞ্জয়ের মেলামেশায় খেপে আছে, সে একটি ওয়াগন ঠেলে দিয়ে ধনঞ্জয়কে পঙ্গু করে দিলো তার এক পা কাটা গেলো যশোদা চাঁদা তুলে তার একটা কাঠের পায়ের ব্যবস্থা করলো।
যশোদার সেবাযত্নে সে ভালো হয়ে উঠলো ঠিকই কিন্তু সে আরো কুঁড়ে হয়ে গেলো। যশোদা তাকে সকলের সঙ্গে বাইরে এসে খেতে বললে সে বলে:
“উঠলে যে মাথা ঘোরায় চাঁদের মা।” ( তব, পৃ. ২০৫ )
যশোদার প্রতি যেন তার কত অধিকার, যশোদাকে মনে মনে ভালোবাসতে শুরু করে। যশোদাকে সকলে ত্যাগ করে চলে গেলে সে আরো রোমাঞ্চিত হয়ে ওঠে। নন্দ চলে গেলে সে আরো বেশি খুশি হয়। এক বাড়িতে একা যশোদা আর সে থাকবে চিন্তা করে মনে মনে উল- শাসিত হয়। যশোদার পা কেটে গেলে সে বিচলিত হয়।
ন্যাকড়া এনে পা বেঁধে দেয় এমনকি দুঃখে যশোদার চোখে জল এলে সে কোঁচার খুঁট দিয়ে জল মুছে দেয়। নন্দর জেল হবে কি না। জিজ্ঞাসা করলে-এতো গুরুতর ব্যাপারে তার মতামত জানতে চাইছে ভেবে খুশি হয়ে ওঠে। যশোদা রাজেনের সঙ্গে ঠাট্টা করলে ধনঞ্জয় রাগ করে বসে থাকে। তার যেন একার অধিকার যশোদার প্রতি। ধনঞ্জয় যশোদার প্রতি প্রেমিকের ন্যায় আচরণ শুরু করে।
অনাথ সত্যপ্রিয়র সেক্রেটারি। মিলে কুলি-মজুরদের ধর্মঘটের আয়োজনে অনাথ এসে মঞ্জুরদের বোঝাতে চেষ্টা করে। শ্রমিকরা ধর্মঘট না তুললে যশোদাকে নিয়ে মিলে বৈঠক বসে, সেখানেও অনাথ উপস্থিত থাকে। অফিসের দলাদলিতে অনাথের একটি পক্ষ আছে।
নিজের দলের লোকজন নিয়ে সে অফিসে জোট পাকায়। সত্যপ্রিয়র পিতার বার্ষিক শ্রাদ্ধের দিন সত্যপ্রিয়র আসার সম্ভাবনা নেই জেনে কয়েকজন মিলে তারা দারোয়ানকে দিয়ে সিদ্ধি বাটায় এরপর সত্যপ্রিয় হঠাৎ করে চলে এলে সে তীক্ষ্ণতার সঙ্গে পরিস্থিতির মোকাবেলা করে। কাজে ঢিল দেখে সত্যপ্রিয় সকলের মন বোঝার জন্য অফিস ছুটি দিয়ে দিতে চাইলে অনাথ এক মুহূর্তে সত্যপ্রিয়র মুখের ভাব অধ্যয়ন করে দৃঢ়স্বরে বলে
“আজ্ঞে না, খেতে যাবে রাত্রে, এখন থেকে ছুটি কেন?” ( ৩খ, পৃ. ১৫৫)
অনাথের বড় শালা কেষ্টবাবু। জ্যোতির্ময় যে রুমে বসে, সে রুমে কাঠের পার্টিশন দিয়ে অন্যপাশে বসে কেষ্টবাবু। এককালে সে স্বদেশি করতো। এখন প্রৌঢ় বয়সে একটি আরামের চাকরি করে। সে সত্যপ্রিয়র প্রবন্ধের সংস্কৃত কোটেশনগুলো সংগ্রহ করে। শ্রোতা পেলে নিজের অতীত জীবনের গৌরবের কাহিনী শোনায়, শ্রোতা না পেলে টেবিলের সামনে মুখ গম্ভীর করে।
বসে থাকে, মাঝে মাঝে ফোন তুলে নিম্নপদস্থ কর্মচারীদের মধ্যে একে ওকে ডাকিয়া অর্থহীন প্রশ্ন করে এবং উপদেশ ও ধমক দেয়।
সত্যপ্রিয়র মিলে কাশীনাথ ম্যানেজার। সত্যপ্রিয়র একটি মিলের ভার তার ওপর। এই মর্যাদায় মিলে মারামারি হলে সে দশজনকে বরখাস্ত করে। তার এই বুদ্ধিহীন কর্মের জন্য মিলে ধর্মঘটশুরু হয়। সত্যপ্রিয় তাকে তিরস্কার করে
“আপনি একটা আস্ত গর্দভ কাশীবাবু। ওই দশজনকে দাঙ্গা করার জন্য পুলিশে দিলেই ঢুকে যেত বরখাস্ত করে ছেড়ে দিলে ওরা মিলের মধ্যে এসে গোল বাঁধাবে এটুকু বুঝবার মতো বুদ্ধিও আপনার ঘটে নাই। ” ( ৩খ, পৃ. ১৪৬)
কাশীবাবুকে দিয়ে সত্যপ্রিয় তার সমস্ত কার্য হাসিল করে। দ্বিতীয়বার দাঙ্গার সময় পুলিশ দিয়ে সে শ্রমিকদের ধরিয়ে দেয়। যশোদা গলির মোড়ে গিয়ে কাশীবাবুকে সুধীরের পুলিশ ধরার ব্যাপারে জিজ্ঞাসা করলে কাশীবাবু উত্তর দেয়:
“সুধীর তোমার পিরিতের লোক নাকি যশোদা? তা তো জানতাম না! জড়িয়ে ধরার সময় বেড় পায়?” ( ৩, পৃ. ১৯০)
এ কথার মধ্য দিয়ে কাশীনাথের চরিত্রের একটি নোংরা দিক বের হয়ে আসে। যশোদা এরপর কাশীবাবুর মুখ জোরে জোরে রাস্তায় ঘষে দেয়। সত্যপ্রিয়র কুটকৌশলের মধ্যস্থতায় কাশীবাবুর ঘুড়ি নেই। যশোদার সঙ্গে ভাব জমাতে সত্যপ্রিয়র কথায় কাশীনাথ যশোদার বাড়ি আসে। নন্দকে ষাট টাকা বেতনে চাকরি দেওয়ার কথাও সেই বলে।
নন্দ চাকরি নেওয়ার পর নন্দকে দিয়ে চরের কাজ করায় কাশীবাবু এবং মিলে একের পর একের চাকরি চলে যায়। কাশীবাবুই শ্রমিকদের বলে যশোদা মালিকপক্ষের সঙ্গে যোগ দিয়েছে এবং ধর্মঘটের পান্ডাদের চাকরি থেকে তাড়ানোর পরামর্শ দিয়েছে।
যশোদার বাড়ির সবচেয়ে বৃদ্ধ ভাড়াটে মতি। তার বয়স পঞ্চাশের কাছে। মতি সদা উৎফুল একজন মানুষ। এর-ওর সঙ্গে হাসি-তামাসা করতে পছন্দ করে। মানুষের সঙ্গে ভাব করে তাদের সঙ্গে পেশাদার রসও পান করে, রসিকতাও করে। সে নন্দ আর যশোদার শরীর এবং স্বভাবের পার্থক্যর জন্য সুধীরকে বলে:
“ওই যে ওরা দুজন যশুদা আর নন্দ, এক মায়ের পেটের ভাইবোন না হয় হল, কিন্তু বাপ কী ওদের একটা রে দাদা! ( ৩থ, পৃ.-১২৪)
বুড়ো মতি ধনঞ্জয়কে নিয়ে আসে শহরতলীতে। এসে সে সুধীরের কানে কানে বলে যশোদা একলা থাকে, ওর দুঃখ দেখে ধনঞ্জয়কে নিয়ে এলাম। বুড়ো মতি অল্পবয়সী সুধীরকে সঙ্গে নিয়ে মদ খায়। সুধীর বিয়ে করলে সে একাই যায় মদ খেতে। সত্যপ্রিয়র মিলে গাঁটে আলকাতরা দিয়ে নম্বর লেখে। একদিন মিলে গেলে ভরদ্বাজ এসে বলে গতকালের বিশটি গাঁটে লেখা হয় নি।
সে মতির গালে আলকাতরা লাগিয়ে দেয়। সে বুঝতে পারে হয় কাশীবাবু নয়তো ভরদ্বাজের নিজের ভুলে এই ভুল হয়েছে। চাকরির নিয়ম হলো কোনো ভুল হলে নিম্নপদস্থ কর্মচারীদের দোষ দেওয়া। তাই মতি কাউকে কিছু বলে না, বরং একটু গর্ববোধ করে কারণ:
“দোষ ঘাড়ে চাপানোর জন্য এতগুলি লোকের ভিতর হইতে তাকেই বাহিয়া নেওয়া হইয়াছে,” (৩খ, পৃ. 188 )
এই ঘটনা নিয়ে সুধীর এসে হলা মারামারি করে। ফলে মিলে ধর্মঘটের সূচনা হয়। মতি যশোদার কাজ সানন্দে করে দেয়। মাঝে মাঝে ভাত বাড়ার দায়িত্ব পেয়ে খুশি।
মতি বুদ্ধিমান মানুষ। যশোদা কায়দা করে তার আর সুধীরের ভাত খাওয়ার যুযোগ করে দিলে সে ঠিকই বুঝতে পারে। কখনো কখনো মদ খেয়ে সে বাস্তব বুদ্ধিহীন হয়ে পড়ে। যশোদার বাড়িতে দুটি বিয়ে একদিনে হয়, জগৎ আর চাঁপার এবং সুধীর আর কালোর। বিয়ের দিন মতি মদ খেয়ে যশোদাকে জড়িয়ে ধরে, যশোদাও তাকে কোলে শুইয়ে চামচে করে দুধ খাইয়ে দেয়। শ্রমিকরা সকলে যশোদাকে ত্যাগ করলে মতি ত্যাগ করে না। তবে, উপন্যাসের দ্বিতীয় খণ্ডে মতিকে আর পাওয়া যায় না।
‘শহরতলী’ দ্বিতীয় খণ্ডে যশোদার বাড়ি ভাড়া নেয় অজিত। সে কুলি-মজুরের মতো একটা চাকরি নেওয়ার অপরাধে তার দাদা তাকে ত্যাগ করেছে। স্ত্রীকে নিয়ে সে বাড়ি ভাড়া নিয়েছে। সত্যপ্রিয়র বড় ছেলে মহীতোষ তার বন্ধু। স্ত্রীর প্রতি সে দায়িত্বশীল। সুব্রতা তাকে গহনা বিক্রি করে চায়ের সরঞ্জাম কিনতে বললে সে তা করে না। এমন কি প্রয়োজনের সময়ও বিক্রি করে না। এদিক দিয়ে সে উদার মানসিকতার পরিচয় দেয়। ব্যক্তিজীবনে সে খুব শৌখিন ও আমোদপ্রিয়। বিনোদনের জন্য স্ত্রী এবং বন্ধুবান্ধব নিয়ে সিনেমায় যায়।