আজকে আমাদের আলোচনার বিষয়ঃ পায়ের আওয়াজ পাওয়া যায় । যা সৈয়দ শামসুল হকের ইতিহাস নির্ভর কাব্যনাটক এর অন্তর্গত।

পায়ের আওয়াজ পাওয়া যায়
সৈয়দ শামসুল হক রচিত প্রথম কাব্যনাটক পায়ের আওয়াজ পাওয়া যায় (রচনাকাল : ১৯৭৫) স্বাধীনতা-উত্তর বাংলাদেশের মঞ্চনাট্যের ইতিহাসে সর্বাধিকবার অভিনীত জনপ্রিয় মঞ্চনাটক; এবং ‘আমাদের মুক্তিযুদ্ধের ওপর এ যাবৎ রচিত সবচেয়ে সার্থক নাট্যকর্ম হিসেবে স্বীকৃত।’ নন্দিত নাট্যকার আবদুল্লাহ আল মামুনের (১৯৪২- ২০০৮) কুশলী নির্দেশনায়, থিয়েটার নাট্যগোষ্ঠীর নান্দনিক উপস্থাপনায় বাংলাদেশের মঞ্চে এ নাটকটি অভিনীত হয়েছে শতাধিকবার।
বাংলা সাহিত্যে আঞ্চলিক ভাষায় মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক কাব্যনাটক হিসেবে এটিই প্রথম। বলাবাহুল্য, মুক্তিযুদ্ধের সঙ্গে বাঙালির চিরন্তন যে আবেগ ও ভালোবাসা জড়িত, নাট্যকার সে আবেগকে আঞ্চলিক শব্দ ও ছন্দে উপস্থাপন করে নাটকটিকে দর্শকের মমত্বের আরো গভীরে নিয়ে গেছেন।
অন্যদিকে ঢাকার মঞ্চে ঠিকঠাক অভিনয়যোগ্য নাট্যরচনার আকালের মৌসুমে পায়ের আওয়াজ পাওয়া যায়-এর মতো শিল্পিত ও আতিশয্যবর্জিত সংহত নাট্যপ্রাপ্তি ছিল আশীর্বাদের মতো। এ প্রসঙ্গে নাটকটির প্রথম প্রযোজনা প্রতিষ্ঠান থিয়েটার নাট্যগোষ্ঠীর একটি মন্তব্য প্রণিধানযোগ্য :
এক. আমাদের স্বাধীনতা সংগ্রামকে নিয়ে রচিত একটি সার্থক নাটক প্রযোজনা করার বাসনা আমাদের দীর্ঘদিনের। আমাদের কাছে দর্শকদের এ ধরনের একটা প্রত্যাশা ছিল। দুই. সত্যিকার অর্থে একটি কাব্যনাটক মঞ্চস্থ করার ইচ্ছা আমাদের ছিল। তিন. আমরা চেয়েছি প্রযোজনায় দর্শকদের বৈচিত্র্যের স্বাদ উপহার দিতে।
আমাদের অনেক শ্রমের ফসল ‘পায়ের আওয়াজ পাওয়া যায়’-এর প্রযোজনাকে নাট্যামোদীরা যেভাবে সাধুবাদ জানিয়েছেন তাতে আমরা অভিভূত হয়েছি।’
সৈয়দ শামসুল হকের প্রতিটি রচনায় স্বদেশ, সমাজ তথা সাম্প্রতিক কালের প্রচ্ছায়া বিদ্যমান; পায়ের আওয়াজ পাওয়া যায় তার সর্বোৎকৃষ্ট দৃষ্টান্ত। মূলত ‘কাব্যনাট্যে সামাজিক রাষ্ট্রীয় সমস্যা যুক্ত করা সহজ নয়। কারণ, কবিতার কাঠামোতে তা প্রকাশ করা কষ্টকর। সৈয়দ শামসুল হক সেটা করতে পেরেছেন।” জনৈক সমালোচক নাটকটিকে মূল্যায়ন করতে গিয়ে লিখেছেন :
মুক্তিযুদ্ধকে অবলম্বন করে সবচেয়ে সার্থক ও মঞ্চসফল নাটক লিখেছেন সৈয়দ শামসুল হক। এ প্রসঙ্গে বিশেষভাবে স্মরণীয় তাঁর পায়ের আওয়াজ পাওয়া যায় (১৯৭৬) শীর্ষক কাব্যনাটক। […] কাব্যনাট্যের আঙ্গিকে রচিত এই নাটক আঞ্চলিক শব্দের নিপুণ ব্যবহারে যুদ্ধকালীন উত্তর-বাংলার জীবনকে যেন শব্দবন্দী করে ধরে রেখেছে। ভাষার গীতময়তা, আঞ্চলিক শব্দের কুশলী প্রয়োগ এবং যুদ্ধকালীন জীবনবাস্তবতার কাব্যিক উচ্চারণে পায়ের আওয়াজ পাওয়া যায় বাংলাদেশের নাট্য-সাহিত্যে একটি পালাবদলকারী নাটক হিসেবে বিবেচিত।

বাংলা সাহিত্যে মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসকে প্লট করে যে-কটি নাটক রচিত হয়েছে, সৈয়দ শামসুল হকের কাব্যনাটক পায়ের আওয়াজ পাওয়া যায় সেগুলোর মধ্যে শ্রেষ্ঠতম। মহান মুক্তিযুদ্ধের সামগ্রিক প্রেক্ষাপটকে এতটা গভীরভাবে আর কোনো নাটক ছুঁয়ে যেতে পারেনি।
নাট্যকার এখানে কাহিনির ধারাবর্ণনায় আশ্চর্য সংযম বজায় রেখে, লোকজ ভাষার সুষ্ঠু প্রয়োগে এবং শৈল্পিক কুশলতার অপূর্ব সমন্বয় সাধন করে যেন ভিন্ন ভিন্ন রঙের এক-একটি তুলির আচঁড়ে মুক্তিযুদ্ধকালীন গ্রামবাংলার চিত্র এঁকেছেন কাব্যনাট্যের ক্যানভাসে। নাট্যকার সৈয়দ হক স্বয়ং মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক নাটক হিসেবে পায়ের আওয়াজ পাওয়া যায়-এর শ্রেষ্ঠত্বের প্রশ্নে সুনিশ্চিত ছিলেন। এক সাক্ষাৎকারে তিনি এ বিষয়ে নিম্নরূপ মন্তব্য করেন :
আমি জানি যে, এ নাটক এই বাঙালিদেরকে একশো দুশো বছর পরেও পড়তে হবে। যেখানে একশো একান্নটা নাটক লেখা হয়েছে মুক্তিযুদ্ধের ওপর বা তারও বেশি। কিন্তু তোমাকে জিজ্ঞেস করলে তুমি প্রথমেই ‘পায়ের আওয়াজ পাওয়া যায়’ নাটকের কথা বলবে।
তবে কাব্যনাটকের বিষয়বস্ত্র হিসেবে নাট্যকার মুক্তিযুদ্ধের গৌরবোজ্জ্বল ইতিহাসকে নির্বাচন করলেও নাটকের প্লট পর্যবেক্ষণ করলে দেখা যাবে, ১৯৭১ সালে সংঘটিত মুক্তিযুদ্ধের সামগ্রিক কাহিনি বর্ণনা করা তাঁর মৌল উদ্দেশ্য ছিল না।
কেননা, এখানে নেই কোনো যুদ্ধের বাস্তবিক চিত্র বা রাজনৈতিক ঘাত-প্রতিঘাতের নিরবচ্ছিন্ন ঘটনা ; বরং যুদ্ধের প্রেক্ষাপটে রাজধানী থেকে বহুদূরে শান্ত এক নিরিবিলি গ্রামের সাধারণ কিছু মানুষের একান্ত অনুভূতি, মুক্তিযুদ্ধকে ঘিরে তাদের অন্তর্ভাবনা, বিবেকের তাড়না, ইতি-নেতির দ্বন্দ্ব, সংকট উপস্থাপিত হয়েছে। সেই সঙ্গে যুদ্ধের প্রেক্ষাপটে এদেশের স্বাধীনতাবিরোধীদের ভূমিকা, ধর্মান্ধতা এখানে সুস্পষ্ট গুরুত্ব পেয়েছে। তবে মুক্তিযোদ্ধা কিংবা পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী এখানে নেপথ্যেই রয়ে গেছে।
সাধারণ গ্রামবাসীর সংলাপে মুক্তিযোদ্ধাদের ভূমিকা এবং হানাদার বাহিনীর অত্যাচারের চিত্র উপস্থাপিত হয়েছে। হতে পারে, কাব্যনাট্যের আঙ্গিকবৈশিষ্ট্য অনুসরণ করেই নাট্যকার এমনটা করেছেন। কেননা, কাব্যনাট্যের মৌলপ্রবণতাই হলো সেখানে কোনো ধারাবাহিক কাহিনি বর্ণিত হয় না; বরং একটি কাহিনিকে কেন্দ্র করে বিচিত্র চরিত্রের ভাবনাপ্রবাহ চলমান থাকে। সে বিচারে পায়ের আওয়াজ পাওয়া যায়কে সফল কাব্যনাটক বলা যায়।
আলোচ্য নাটকে মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসকে নেপথ্যে ব্যবহার করার কারণ প্রসঙ্গে স্বয়ং নাট্যকার এক সাক্ষাৎকারে মন্তব্য করেছেন – ‘এদেশের আট কোটি লোক মুক্তিযুদ্ধ নেপথ্যেই দেখেছে।” অর্থাৎ ‘মুক্তিযুদ্ধ নয়, মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে বাংলাদেশের মানুষের পক্ষ-বিপক্ষের যুক্তি, অবস্থান ইত্যাদিই নাটকের মুখ্য বিষয়। মুক্তিযুদ্ধ আমাদের নিজস্ব সত্তার প্রতিচ্ছবি, তবু এর বিপক্ষে যায় একদল মানুষ, তারা এদেশে জন্মায়, তাদের উত্তরাধিকার থেকে যায় এদেশে। নাট্যকার সেদিকে পাঠকের দৃষ্টি ফিরিয়ে নিতে চেয়েছেন।
নাটকের শেষ দৃশ্যে পীর যখন বলে, ‘দাগ, একটা দাগ রাইখা যায়, তখন আমরা বুঝতে পারি নাট্যকার আমাদেরকে তাঁর মূল প্রবণতা সম্পর্কে ইঙ্গিত দিয়ে যাচ্ছেন।” তাই বলা যায়, মুক্তিসংগ্রামের কাহিনি বর্ণনা নয়, ১৯৭১ সালের দীর্ঘ নয় মাসের রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের প্রতিক্রিয়ায় গ্রামীণ সাধারণ মানুষের অন্তর্গত মনোভাব ব্যক্ত করাই এ নাট্যরচনার মৌল উদ্দেশ্য।
বস্তুত, বাঙালির স্বাধীনতা সংগ্রাম কেবল ১৯৭১ সালের ঘটনাপুঞ্জের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। এর পূর্বে ১৯৪৭ সালে ধর্মীয় সংখ্যাগরিষ্ঠতার অজুহাতে, দ্বিজাতিতত্ত্বের ভিত্তিতে অখণ্ড ভারতবর্ষ বিভাজিত হয়ে পাকিস্তান রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা হওয়ার অনতিকাল পরেই কার্যত এদেশের মানুষের সার্বিক মুক্তির চিরন্তন স্বপ্ন ও দাবি ক্রমশ নিষ্প্রভ হতে থাকে।
বাঙালি জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান স্বয়ং তাঁর আত্মজীবনীতে এ প্রসঙ্গে লিখে গেছেন : ‘পাকিস্তান হওয়ার সাথে সাথেই ষড়যন্ত্রের রাজনীতি শুরু হয়েছিল।” এসময় আন্দোলনের কেন্দ্রে থাকা মুসলিম লীগ নেতৃবৃন্দের নীতি নির্ধারণে একগুঁয়ে মানসিকতা, ধর্মান্ধতা, অগণতান্ত্রিক আচার-আচরণ, জন-বিচ্ছিন্নতা, সর্বোপরি দমনপীড়নমূলক নীতি সাধারণ মানুষের স্বপ্ন ও প্রত্যাশাকে গুঁড়িয়ে দেয়, এবং তাদের প্রতিবাদী হতে বাধ্য করে। সাধারণ মানুষের স্বপ্নভঙ্গের এই বেদনা নাট্যকারকেও ব্যাপকভাবে প্রভাবিত করে। কারণ, ‘সৈয়দ শামসুল হক একজন রাজনীতি সচেতন লেখক।

তৎকালীন পাকিস্তানি শাসকদের নানামুখী অত্যাচার শোষণ ও রাজনৈতিক চক্রান্তের একজন পর্যবেক্ষক হিসেবে সৈয়দ হককে বিবেচনা করা যায়। কারণ তাঁর সাহিত্যে সে সময়কার সামগ্রিক জীবনাচরণ লক্ষ করা যায়। ২
আবার, ‘১৯৪৭ এর ১৪ই আগস্টের পর থেকে এদেশে শাসকশ্রেণী ও ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত ব্যক্তিরা ইসলামী সমাজ প্রতিষ্ঠার কথা অনর্গল বলে এসেছেন। শুধু তাই নয়, তারা দাবী করে এসেছেন যে তারাই ইসলামের সত্যিকার পাবন্দ এবং অন্যেরা পাকিস্তান ও ইসলামের দুষমণ।” তাদের এই ঘৃণ্য মানসিকতার বাস্তব প্রয়োগ স্পষ্ট হয়েছে তাদের দেশ শাসন প্রক্রিয়ার মাধ্যমে। সরকার ও রাষ্ট্রব্যবস্থা তাদেরই আপন করে নিয়ে বিভিন্ন সুযোগ সুবিধা প্রদান করেছে, যারা এই মতবাদ বিশ্বাস করে প্রচার-প্রসারের মাধ্যমে তাদের যথার্থ দোসর হয়ে উঠতে পেরেছিল।
আলোচ্য নাটকের মাতবর চরিত্রটি মূলত শাসকগোষ্ঠীকর্তৃক সুবিধাভোগী জনসম্প্রদায়ের প্রতিনিধিত্ব করেছে। অথচ তাকেও শেষপর্যন্ত হানাদার বাহিনী দ্বারা প্রতারিত ও নির্যাতিত হতে হয়েছে; প্রাণপ্রিয় আত্মজাকে তুলে দিতে হয়েছে লম্পট পাকিস্তানি ক্যাপ্টেনের ভোগের সামগ্রীরূপে। এক্ষেত্রে হয়তো সাময়িক আত্মপ্রশান্তির নিমিত্তে সে সংক্ষিপ্ত বিবাহের নাটক সাজিয়েছিল, কিন্তু ভেতরে ভেতরে তার হৃদয় অনুশোচনায় ক্ষতবিক্ষত হয়ে গেছে, কেননা সে নিজেও জানে এটি প্রকৃত অর্থে বিয়ে নয়, বরং ধর্ষক কর্তৃক নারী সম্ভোগের নাটকমাত্র। প্রকৃতপক্ষে শোষকের কোনো আপন পর নেই; সে স্বীয়স্বার্থ বিবেচনায় রেখেই প্রতিটি পদক্ষেপ ফেলে। আলোচ্য নাটকে পাকিস্তানি ক্যাপ্টেন চরিত্রটি এই সামরিক শোষকগোষ্ঠীর প্রতীক।
১৯৭১ সালে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী এদেশীয় কিছু ভণ্ডপীর, বকধার্মিক মোল্লা মোড়লদের আশ্রয় করে ধর্মপ্রাণ সাধারণ মুসলমান জনসাধারণকে বোঝাতে সক্ষম হয়েছিল যে, মুক্তিবাহিনী এদেশের কল্যাণের জন্য, সাধারণ মানুষের উন্নতির জন্য প্রধান প্রতিবন্ধক।’ সাধারণ মানুষ যেন মুক্তিবাহিনীকে আশ্রয়-প্রশ্রয় না দিয়ে দেখামাত্র তাদের প্রতিহত করে।
সৈয়দ শামসুল হক আলোচ্য নাটকে ১৯৭১ সালের এই অপরাজনীতি, শোষণ-শাসনের ইতিহাস উপস্থাপন করেছেন গ্রামবাসীর সংলাপের মাধ্যমে। এখানে মাতবরকে উদ্দেশ্য করে সাধারণ গ্রামবাসী জানাচ্ছে – নিজেদের মঙ্গলের জন্যে, দেশের উন্নতিকল্পে তারা মাতবরের কথামতো মুক্তিবাহিনীকে প্রতিহত করে গেছে :
আপনার হুকুমমতো এই সারা সতেরো গেরামে
কোনোদিন কোনো ব্যাটা মুক্তিবাহিনীর নামে
আসলেই খেদায়া দিছি যেমন ভিটায়
খাঁ-খাঁ কাক ডাকলে দুপুর বেলায়
লাঠি হাতে বৌ-ঝি খেদায়। (কাব্যনাট্যসমগ্র ২১ )২
এই শাসকগোষ্ঠী সাধারণ গ্রামবাসীকে উদ্বুদ্ধ করেছে মুক্তিবাহিনীর সদস্যদের ছলে-বলে-কৌশলে তাদের হাতে ধরিয়ে দিতে। ধর্মপ্রাণ, সরলমনা জনগণ ধর্মের ও কল্যাণের কথা ভেবে তাই করেছে। একদিকে ধর্মীয় অনুশাসন, অন্যদিকে শাসকগোষ্ঠীর ভয়ে তারা বিভ্রান্ত হয়েছে এবং মুক্তিযুদ্ধের বিপক্ষে অবস্থান নিয়েছে। সরলপ্রাণ মানুষের সমর্থনের সুযোগে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী ও তাদের এদেশীয় দোসররা মুক্তিযোদ্ধাদের নির্মম অত্যাচার করে হত্যা করেছে।
ইতিহাসপ্রসিদ্ধ কারবালার মরুপ্রান্তরে অত্যাচারী এজিদ বাহিনীর হাতে ইমাম হোসেন ও তার অসহায় পরিবারের নিমর্ম মৃত্যুর সঙ্গে মুক্তিকামী বাঙালির মৃত্যুকে তুলনীয় করে নাটকে উপস্থাপন করেছেন নাট্যকার। পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী এবং তাদের এদেশীয় দোসর রাজাকার-আলবদর বাহিনীর নির্মম অত্যাচার, মুক্তিযোদ্ধাদের আর্তচিৎকার’ প্রসঙ্গ আলোচ্য নাটকে বিশ্বাসযোগ্য করে উপস্থাপন করেছেন নাট্যকার সৈয়দ শামসুল হক :
আপনের হুকুম মতো খোলা রাখছি – চাইরদিকে চোখ
গেরামের মধ্যে কোনো সন্দেহজনক ঘোরাফেরা দেখলেই পাছ নিছি সাপের মতন
হুজুরে হাজিরও করছি দুই চারজন।
তার মধ্যে কারো কারো রক্ত কাল্ করা চিৎকার
শোনা গ্যাছে । আচনক য্যান কারবালার
সিয়া-কালা বিরাট চাদর
জাপটায়ে ধরছে বাড়িঘর। (কাব্যনাট্যসমগ্র : ২১ )
কিন্তু শাসকগোষ্ঠীর ধর্মছড়ি আর শাসনদণ্ডের ভয়ে ভীত সাধারণ মানুষ নিজেদের প্রবোধ দিয়েছে এই ভেবে যে, নির্যাতিত মুক্তিযোদ্ধারা হয়তো ইসলাম ধর্মের শত্রু, দেশের শত্রু। ফলত, তাদের পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী ও রাজাকার-আলবদরদের হাতে ধরিয়ে দিয়ে তারা কোনো অন্যায় করছে না। কেননা, যা হচ্ছে আল্লাহর হুকুমেই হচ্ছে। নাট্যকার এ প্রসঙ্গে গ্রামবাসীর মনোভাব চমৎকারভাবে ফুটিয়ে তুলেছেন নিম্নোক্ত সংলাপের মাধ্যমে :
তবু কিছু কই নাই আপনের হুকুম
আল্লাহর রশির গোড়া শক্ত কইরা
ধইরা গেছি ঘুম
পইরা থাকছি মড়ার লাহান।
তফাৎ যখন নাই জীয়ন্তে ও মড়ার সমান
জাগনা আর ঘুম একই কথা (কাব্যনাট্যসমগ্র : ২১ )
১৯৭১ সালে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী এবং তাদের দোসরদের নির্মম আক্রমণে পুরো বাংলাদেশ পরিণত হয়েছিলো মৃত্যুকূপে । একদিকে লাশের সারি দীর্ঘ হতে থাকে, অন্যদিকে সমগ্র দেশজুড়ে দেখা দেয় তীব্র খাদ্য ও চিকিৎসা সংকট । দলে দলে ভীত সন্ত্রস্ত মানুষ নানাপথে সীমান্ত পাড়ি দিয়ে বন্ধুপ্রতিম প্রতিবেশী রাষ্ট্র ভারতে শরণার্থী হিসেবে আশ্রয় গ্রহণ করে।

অবশিষ্ট যারা এদেশে থেকে গেছে তাদের যুদ্ধে অবরুদ্ধ দেশের প্রেক্ষাপটে প্রতিমুহূর্তে বেঁচে থাকতে হয়েছে মৃত্যু আতঙ্ক কাঁধে নিয়ে; কখন আবার অত্যাচারী মিলিটারি বাহিনী রাজাকার সঙ্গে করে দরজায় কড়া নাড়ে, নির্মমভাবে গুলি করে হত্যা করে সেই দুর্ভাবনায়। গ্রামবাসীর একটি সংলাপে ১৯৭১ সালের বাংলাদেশের এমনই একটি বিভীষিকাময় অবস্থার ইতিহাসের কথা সুস্পষ্ট হয়েছে। সেই সঙ্গে প্রকাশিত হয়েছে সাধারণ মানুষের সহজাত অস্তিত্ববাদী দর্শন, সুস্থ স্বাভাবিকভাবে পৃথিবীতে বেঁচে থাকার প্রবল আকুতি :
মাতবর সাব, বেহুদা কথায় আমাদের কাম নাই,
সহজ কথায় এই দুনিয়ায় জীবিত থাকতে চাই
পানি দিয়া চাইল দিলেও
চুলায় ভাত ফুটতে না চায়
আগরবাতির মতো মউতের ঘেরাণে গেরাম ছারা
চারিদিকে য্যান ধপধপ পড়ে শত কোদালের কোপ
কবর খোঁড়ার আওয়াজ উঠতাহে য্যান কামানের তোপ। (কাব্যনাট্যসমগ্র : ২৪ )
মাতবর চরিত্রটি তবু পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠীর পক্ষে সাফাই গেয়ে গেছে। কেননা তার স্বার্থবাদী মন বিশ্বাস করে ‘বুদ্ধিমান নাড়ায় না ডাল যে ডালে নিজেই বসা’ (কাব্যনাট্যসমগ্র : ৩৪)। ফলে রাষ্ট্রযন্ত্রের স্বার্থরক্ষা আর নিজের অস্তিত্বরক্ষার প্রয়োজনে সে জনগণকে শুনিয়েছে মিথ্যে আশার বুলি :
সাধ্য নাই মুক্তিবাহিনীর
এতটুকু কানা ভাঙ্গে রূপার কলসীর। […]
দেশের যেখানে যত গাঁও গঞ্জ বাজার বন্দর,
বন্দুক কামানে ভরা। আর মেলেটারির বহর
চোরাগোপ্তা যত জাগা জঙ্গল বড়ার
সবখানে আছে হুঁশিয়ার।
আরো শোনো, উড়া জাহাজের ঝাঁক ১০/২০/২৫ হাজার
চক্কর দিতাছে তারা, যদি বোমা মারে একবার
পিপড়ার মতো মারা যাবে মুক্তিবাহিনী তোমার।
আরো আছে বিনা তারে খবর দিবার
জবর ব্যবস্থা, যদি হয় দরকার
জরুরী তলব যাবে সারা দুনিয়ায় […]
এ দেশ একা না জাইনো সাথী আছে সকল বিদাশে। (কাব্যনাট্যসমগ্র : ৩৯)
মাতবরের ‘এ দেশ একা না জাইনো সাথী আছে সকল বিদাশে।’ সংলাপটি বাস্তব ইতিহাসের নিরিখে রচিত। কেননা ১৯৭১ সালে বাংলাদেশের ন্যায্য অধিকারের প্রশ্নে বিশ্বের সব রাষ্ট্রই যে বাংলাদেশের পাশে ছিল এমনটা নয়। বরং বিশ্বের অধিকাংশ ক্ষমতাধর রাষ্ট্রের সমর্থন ছিল পাকিস্তানি সামরিক জান্তার প্রতি।
বিশেষত, যুক্তরাষ্ট্র এশিয়ান রাজনীতিতে রাশিয়ার সমর্থনপুষ্ট ভারতের উত্থান রহিত করার প্রয়োজনে প্রথম থেকেই পাকিস্তানকে সর্বতো সমর্থন দিয়ে আসছিল। এমনকি ৭১ সালের শেষদিকে ভারতের মিত্রবাহিনী যখন সরাসরি পাকিস্তানকে আক্রমণ করে বসে তখন পাকিস্তানিদের সহায়তার জন্য যুক্তরাষ্ট্র এদেশের সমুদ্রসীমায় সপ্তম নৌবহর পাঠানোর ব্যবস্থা নেয়।
ফলে পাকিস্তানি সরকার ও তাদের মদদপুষ্ট এদেশীয় মাতবর-মোল্লাশ্রেণি এই আন্তর্জাতিক শক্তির প্রভাবে আরও বেশি আত্মবিশ্বাসী হয়ে অপকর্মে লিপ্ত হয়; নিরীহ জনগণকে বিভ্রান্ত করে তোলে।
বস্তুত, যুগে যুগে দুবলের ওপর নানাভাবে অত্যাচার করে শাসকগোষ্ঠী ক্ষমতাকাঠামো কব্জা করে রাখতে চায় । তারা অবলা নারীকে অত্যাচারেও লজ্জিত কিংবা কুণ্ঠিত বোধ করে না। সে হিসেবে মুক্তিযুদ্ধকালে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী কর্তৃক পরিচালিত নৃশংসতম নারী নির্যাতন কোনো ব্যতিক্রমী ঘটনা নয়।
‘দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় জার্মানির নাৎসি বাহিনী, ইটালির ফ্যাসিস্ট বাহিনী কিংবা জাপানি সৈন্যদের নারী নির্যাতন ও ধর্ষণের বহু ঘটনা গ্রন্থাকারে প্রকাশিত হয়েছে এবং চলচ্চিত্রে রূপায়িত হয়েছে। কিন্তু একাত্তরে পাকিস্তানি দখলদার বাহিনী বাংলাদেশে নারী নির্যাতনের ক্ষেত্রে যে নৃশংসতার পরিচয় দিয়েছে তার দ্বিতীয় কোনও নজির নেই। আড়াই লাখেরও বেশি নারী এই সময় পাকিস্তানিদের দ্বারা ধর্ষিত হয়েছেন। নির্যাতন সহ্য করতে না পেরে বহু নারী আত্মহত্যা করেছেন।
পাকিস্তানিরাও তাদের ধর্ষকামী প্রবৃত্তির কারণে বহু নারীকে ভয়ঙ্কর সব নির্যাতনের পর হত্যা করেছে।’ দেশ স্বাধীন হবার পর বঙ্গবন্ধু যদিও এসব অসহায় নারীদের উপযুক্ত সম্মান দিয়ে বীরাঙ্গনা খেতাবে অভিষিক্ত করেছিলেন, কিন্তু নির্মম ও বাস্তব সত্য হলো – এ সমাজে এসব নারী কখনোই ন্যূনতম সম্মান ও সহানুভূতি অর্জন করেনি। বরং ক্যাম্পফেরত অসংখ্য মা-বোন তাদের পরিবারের নিকট প্রত্যাবর্তনের সুযোগ পেলেও তাদের কাছে বিন্দুমাত্র সহানুভূতি কিংবা আশ্রয় না পেয়ে চরম হতাশায় দিনাতিপাত করেছে, কেউ কেউ বেছে নিয়েছে আত্মহননের পথ।
অনেকে আবার, আপনজনকর্তৃক অসম্মানিত হবার চেয়ে যুদ্ধফেরত পাকিস্তানি সেনাদের সঙ্গী হয়ে পাকিস্তান চলে গেছে; আত্মবলিদানের চেয়ে যেটি তাদের কাছে অনেকবেশি ঔচিত্যের বলে মনে হয়েছে। মুক্তিযুদ্ধকালে পাকিস্তানিদের লালসার শিকার বীরাঙ্গনা নারী ফেরদৌসী প্রিয়ভাষিণী এক লেখায় এমন ঘটনার সত্যতা নিশ্চিত করে জানিয়েছেন :
শুধু সমাজ নয়, এই বীরাঙ্গনাদের পরিবারও তাঁদের গ্রহণ করতে রাজি হয়নি। অস্বীকার করেছে পিতা, অস্বীকার করেছে স্বামী। সমাজ ও পরিবারের লাঞ্ছনা গঞ্জনার হাত থেকে বাঁচার জন্য কয়েকজন বীরাঙ্গনা বর্বর পাকিস্তানী সৈন্যদের সঙ্গে পাকিস্তানে চলে যাওয়া শ্রেয় মনে করেছেন, যদিও তাঁরা জানতেন সেখানে তাঁদের পরিণতি কী হবে।২

সৈয়দ শামসুল হক আলোচ্য কাব্যনাটকে মাতবরের মেয়ে চরিত্রটির মাধ্যমে বস্তুত ১৯৭১ সালের অসহায়, সম্ভ্রম হারানো লাখো বীরাঙ্গনা নারীর গোপন দুঃখ, লজ্জাকর বাস্তব সত্যটি উপস্থাপন করেছে। মাতবরের মেয়েটি কোনো অপরাধ না করেও বিরূপ রাষ্ট্রযন্ত্রের ঘৃণ্য রাজনীতির শিকার হয়েছে। তার বিয়ে ঠিক হয়েছিলো গ্রামের এক তরুণ স্কুল শিক্ষকের সঙ্গে। অনাগত দিনের সুখস্বপ্নে বিভোর ছিল সে। অথচ এক কালরাতে পাকিস্তানি ক্যাপ্টেনের লোভী হাতের স্পর্শে তছনছ হয়ে গেছে তার জীবন।
যুদ্ধের পুরোটা সময় সে তার রাজাকার পিতার ছত্রছায়ায় নিরাপদে থাকলেও, যুদ্ধের শেষমুহূর্তে পাকিস্তানি ক্যাপ্টেন আসন্ন পরাজয় সুনিশ্চিত জেনে, এতদিনকার অন্যায় কাজের দোসর মাতবরের মেয়েকেই পাশবিক উল্লাসে সম্ভোগ করে স্বীয় ধর্ষকামী চিত্তের স্পৃহা চরিতার্থ করেছে। মাতবর যে পাকিস্তানিদের সাথে হাত মিলিয়ে নিজ দেশ ও জাতির সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা করেছে, প্রকৃতির কি এক অমোঘ নিয়মে সেই পাকিস্তানি বাহিনী তার সঙ্গেও করেছে নির্মম বিশ্বাসঘাতকতা।
মাতবরের মেয়েটি ভালোভাবেই অনুধাবন করতে পেরেছে যে, এতদিন এই সমাজে তার কদর থাকলেও ধর্ষিত হওয়ার পর সমাজে আর তার গ্রহণযোগ্যতা, সম্মান কিছুই অবশিষ্ট থাকবে না। তাই এক দিকে সম্ভ্রম হারানোর ক্ষোভ-দুঃখ-যন্ত্রণায়, অন্যদিকে অনাগত অন্ধকার জীবনের শঙ্কায় জনসম্মুখে বিষপানে আত্মহত্যা করেছে। সামাজিক গ্রহণযোগ্যতা হারানো নিয়ে তার এই শঙ্কা ও ভীতি যে অমূলক ছিল না, সেটি অচিরেই প্রকাশ পেয়েছে নাটকের পাইক চরিত্রটির একটি সংলাপে। মেয়েটি ধর্ষিত হয়েছে জেনে তার সম্পর্কে সে যে উক্তি করেছে তা এ-প্রসঙ্গে স্মরণ করা যেতে পারে :
কে চায় নিজের ঘরে নষ্ট মেয়ে, নিজের গেরামে
কে চায় কলঙ্ক দিতে, সমস্ত সতীর নামে […]
শোনেন এখনো যদি খোলা থাকে কান
কুল নষ্ট মেয়েছেলে কুত্তাচাটা থালার সমান। (কাব্যনাট্যসমগ্র : ৫৬)
বস্তুত, পাইক চরিত্রের এই উক্তি অশোভন মনে হলেও প্রকৃতপক্ষে এটিই মুক্তিযুদ্ধ কিংবা তার পরবর্তীকালের
বাঙালি সমাজের বাস্তবসত্য।
পায়ের আওয়াজ পাওয়া যায় নাটকে গ্রামবাসীর সংলাপে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীকে পিছু হটিয়ে মুক্তিযোদ্ধাদের বিজয়ের খবরও উঠে এসেছে। বাংলার দামাল ছেলেরা তাদের স্বল্পসংখ্যক অস্ত্র আর অজেয় মনোবলকে পুঁজি করে বিশ্বের সবচেয়ে দুর্ধর্ষ ও প্রশিক্ষিত সামরিক বাহিনীর বিরুদ্ধে দুর্বার প্রতিরোধ গড়ে তুলতে সক্ষম হয়েছিল।
ইতিহাসের সত্য এই যে, দীর্ঘ নয় মাসের রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের শেষদিকে মুক্তিবাহিনী গেরিলা আক্রমণে পাকিস্তানি বাহিনীকে পরাজিত করে একের পর এক গ্রাম জয় করতে থাকে, এবং দীপ্তভঙ্গিমায় ওড়াতে থাকে বাংলাদেশের মানচিত্রখচিত পতাকা। যুদ্ধজয়ের এই গর্বিত ইতিহাসও উপস্থাপিত হয়েছে নিম্নোক্ত সংলাপে
কেউ কেউ আরো কয় জেলার সদর
আর যত বড় বড় বাজার বন্দর
সবি তারা নিয়া নিছে তাদের দখলে
নতুন নিশান আইজ উড়ায় সকলে।
নিজ চক্ষে দেখি নাই, শোনাশোনা কথা
জঙ্গলে আগুন য্যান জ্বলে নিজথিকা। (কাব্যনাট্যসমগ্র : ২০)
বস্তুত, পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী বাঙালি নির্যাতন ও নিধনের সমস্ত প্রক্রিয়া অব্যাহত রাখলেও ১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর অত্যন্ত লজ্জাজনকভাবে পরাজয়বরণে বাধ্য হয়, এবং ঢাকার রেসকোর্স ময়দানে সম্মিলিত সামরিক বাহিনীর নিকট আত্মসমর্পণের দলিলে স্বাক্ষর করতে বাধ্য হয়। বাঙালি জাতি ফিরে পায় দেশ শাসনের অধিকার।
নাট্যকার সৈয়দ শামসুল হক আলোচ্য নাটকের শেষে বাঙালির এই বিজয়ের তথ্যটি সুস্পষ্ট করেছেন। নাটকে বার বার উচ্চারিত হয়েছে রণজয়ী মুক্তিযোদ্ধাদের আগমনের ইঙ্গিত, যা ‘পায়ের আওয়াজ’ প্রতীকের মাধ্যমে ইঙ্গিতময় হয়ে উঠেছে। মুক্তিযোদ্ধাদের আগমনের এই সংকেত নাট্যকারের মতে একাধারে অবরুদ্ধ দশা থেকে সমগ্র জাতির মুক্তির; যাবতীয় পাপাচারের অবসান এবং নতুন দিনের সূচনা। পীরের সংলাপে নাট্যকার এ প্রসঙ্গে লিখেছেন :
হানিফার ঘোড়ার লাহান;
শোনা যায় দুই পাড় ভাইঙ্গা আসে যমুনার বান; আসলে কিছু না –
আসলে পাপের শেষ, এ তারি সূচনা। (কাব্যনাট্যসমগ্র : ৩৪)
তবে মুক্তিযোদ্ধাদের আগমনের সঙ্গে সঙ্গেই যে এদেশ থেকে রাজাকার-আলবদর-আল শামস প্রভৃতি ঘাতকশ্রেণির সমূল উৎখাত ঘটেছে তা নয়। নাট্যকার সেই ঐতিহাসিক সত্যটিও বাস্তবতার নিরিখে উপস্থাপন করেছেন মাতবরের প্রধান সহযোগী পাইক চরিত্রটির উত্থান এবং পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে নিজের ভোল পাল্টানোর ঘটনা তুলে ধরে।
যে কারণে পীরের উক্তিতে প্রতিধ্বনিত হয়েছে : ‘দাগ একটা দাগ রাইখা যায় । বস্তুত, এই সামান্য ‘একটা দাগ’ই পরবর্তীকালে তুমুল রাষ্ট্রবিনাশক শক্তি হিসেবে বাংলাদেশের রাজনীতি ও রাষ্ট্রনীতিতে নিয়ে এসেছে নেতিবাচক আবহ তৈরি করেছে দুষ্ট ও দগদগে ক্ষত। ফলে ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট কালরাতে জাতির পিতাকে সপরিবারে শহিদ হতে হয়েছে। বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে বার বার কালো দাগ ফেলেছে এই পরিবর্তিত সুবিধাবাদী শ্রেণিই। জনগণের হাতে মৃত্যু অত্যাসন্ন জেনে রাজাকার মাতবর চরিত্রটিও বাংলায় বারবার এই কালোশক্তির উত্থানের ইঙ্গিত করে গেছে। মাতবরের সংলাপ নিম্নরূপ :
আমারে মারলেই হবে গেরামের বিপদ উদ্ধার? [ … ]
না হয় জালেম আমি, কও দেখি, একবার
বুকে হাত দিয়া কও, জালেম কি জন্মাবে না আর ?
কোনো দেশে? কোনো বংশে ? আবার ? আবার ?
আমার জীবন নিয়া তবে কও কি হবে তোমার ? (কাব্যনাট্যসমগ্র : ৫৮)
অন্যদিকে নাটকের শেষে পীরের সরব উপস্থিতি, সাধারণ জনগণ ও মুক্তিযোদ্ধাদের একই কাতারভুক্ত করে জানাজার জামাত পরিচলনা করার ঘটনায় নাট্যকার এ কথাই প্রমাণ করতে চেয়েছেন – বাংলাদেশের ধর্মপ্রাণ সরল জনগোষ্ঠীর মাঝে ধর্মধ্বজী পীরশ্রেণি আবহমানকালধরেই প্রতিনিধিত্ব করে যাবে। নাটকের শেষে পীর চরিত্রের উচ্চারিত সংলাপে এ-সত্যই যেন ভাষারূপ পেয়েছে :
পীর। সকলে শরিক হও তার জানাজায়।
আনো আনো লাশ আনো, আরো লাশ আছে
তোমার দক্ষিণে বামে লাশ আছে পাছে।
আনো লাশ, আরো লাশ, লাশের পাহাড়
সকলে দাঁড়াও ভাই কাতারে কাতার
অন্তত জীবিত আছো এইটুকু শোকর গোজার। (কাব্যনাট্যসমগ্র : ৬০)
বস্তুত, বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধকে কেন্দ্র করে স্বাধীনতা-পরবর্তীকালে অনেক নাট্যকারই নাটক রচনা করেছেন। “কিন্তু কাব্যনাটক রচনায় সৈয়দ হক প্রায় একক এবং অনন্য। একদিকে স্বাধীনতার জন্য দেশপ্রেমিক মানুষের আত্মবিসর্জন, করুণ জীবনযাপন, সংগ্রাম-যুদ্ধ; অন্যদিকে পাকিস্তানপন্থি মাতবর নিজ কন্যার ইজ্জতের বিনিময়ে হলেও আত্মস্বার্থ চরিতার্থ করতে চায়।

এই বেদনাদয়ক ট্রাজিক মুহূর্ত অসাধারণ প্রজ্ঞা ও শিল্পকুশলতায় নাট্যকার রূপায়িত করেছেন আলোচ্য নাটকে। সৈয়দ শামসুল হক তাঁর সদর্থক চিন্তনের প্রকাশ ঘটিয়ে এভাবেই স্বদেশ ও স্বজাতির নিকট একজন শিল্পীর দায় মিটিয়েছেন।
সৈয়দ শামসুল হকের প্রথম কাব্যনাটক পায়ের আওয়াজ পাওয়া যায় ইতিহাসের ঘটনাসূত্র অবলম্বন করে রচিত হলেও এর মধ্যে উপস্থাপিত হয়েছে আবহমান বাংলার সমাজচিত্র। পায়ের আওয়াজ পাওয়া য্যায়-এর পরতে পরতে ছড়িয়ে রয়েছে ঐতিহাসিক-রাজনৈতিক-সামাজিক-সাংস্কৃতিক উপাদান। আলোচ্য কাব্যনাটকের বিভিন্ন চরিত্রের জীবনাচরণ, ঘটনাংশ বা মুখনিঃসৃত সংলাপের মধ্যদিয়ে সমকালীন বাংলাদেশের গ্রামীণ মধ্যবিত্ত ও নিম্নবিত্তের আর্থ-সামাজিক-সাংস্কৃতিক বৈশিষ্ট্যসহ রাজনৈতিক ইতিহাসের পট-পরিবর্তনের একটি সুসংহত প্রতিচ্ছবি পাওয়া যায়।
জার্মান দার্শনিক কার্ল মার্কস (১৮১৮-১৮৮৩) সমাজপরিবর্তনের সঙ্গে অর্থনীতির সম্পর্কসূত্র নির্ণয় করে দেখিয়েছেন যে ‘যাবতীয় সামাজিক, রাষ্ট্রীয় ও অন্যবিধ অন্যায় মূলত সংঘটিত হয় অর্থনৈতিক শোষণের – মাধ্যমে প্রভুত্ব অর্জনের লিপ্সা থেকে। এই থেকেই সাম্রাজ্যবাদী-উপনিবেশবাদী শাসকগোষ্ঠী অন্য দেশকে পরাধীন রাখতে চায়, আবার পরাধীন দেশের নিজের মানুষের মধ্যেও শ্রেণীবিভক্ত সমাজব্যবস্থায় পুঁজিবাদী বিত্তশালী জমিদার-মহাজন-ব্যবসায়ী শ্রেণী শোষণ করে নিম্নবিত্ত মানুষকে, নির্যাতন চালায় শ্রমিক-কৃষকের উপর।”
এই সূত্রে সেকালে মাতবর শ্রেণির এমনই ক্ষমতার দম্ভ এবং সাধারণ মানুষের প্রতি অত্যাচারের নানান চিত্র পায়ের আওয়াজ পাওয়া যায় কাব্যনাট্যের পরতে পরতে চিত্রিত হয়েছে। মাতবর শ্রেণি একদিকে যেমন খাজনা আদায়, সুদিকরণ, মজুতবৃত্তি, দাদনপ্রথা প্রভৃতি দ্বারা সাধারণ মানুষকে অর্থনৈতিকভাবে পঙ্গু ও পরনির্ভরশীল করে রাখতো, তেমনি ব্যক্তিগত লাঠিয়াল, পাইক বাহিনী লালন করে সাধারণ শান্তিপ্রিয় নিরীহ মানুষকে জিম্মি করে রাখতো। এরই একটি বাস্তবচিত্র আলোচ্য নাটকে প্রত্যক্ষযোগ্য; যখন গ্রামীণ যুবকসম্প্রদায় মাতবরের বিরুদ্ধে তাদের ন্যায্য অধিকার হরণের প্রশ্ন তোলে, তখন যুবকদের প্রতি মাতবরের উচ্চারিত বক্তব্যে
মাতব্বর। বেয়াদপ বেশরম, আমারই উঠানে
আমারই মুখের পরে? তরে আর জানে
বাঁচাবো না। দাও দিয়া কোপায়া কাটবো ।
জিহ্বা ছিঁড়া কুত্তারে খাওয়াবো। […] এই, অরে ধর, অরে বান-
নিয়া আয় কাছি
অরে আষ্টেপিষ্টে বান। (কাব্যনাট্যসমগ্র : ২২ )
মূলত, বাঙালির সমাজব্যবস্থায় আদিকাল থেকেই বিরাজ করছে এই সামাজিক উঁচুনিচু স্তরভেদ, অর্থনৈতিক বৈষম্য। বর্ণভেদ প্রথা তো ছিলই, তদুপরি সামন্তপ্রভুদের আনুকূল্য ও পৃষ্ঠপোষকতা যারা পেতেন, তারাই হয়ে উঠতেন সমাজবিধায়ক ; জমি-জোতের মালিক। ১৭৯৩ সালে লর্ড কর্নওয়ালিসের (১৭৩৮-১৮০৫) চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত আইন প্রবর্তনের পর থেকে বাংলাদেশের সামাজিক ব্যবস্থায় ব্যাপক পরিবর্তন সাধিত হয়।
বাংলার চিরন্তন জমিদারি শাসনপ্রথা বদলে গিয়ে আবির্ভূত হয় মধ্যস্বত্বভোগী এক নব্য ধনিক শ্রেণির ; যারা না ছিল আভিজাত্যের অংশ, , না ছিল উৎপাদনব্যবস্থার সঙ্গে সরাসরি জড়িত। চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত, সূর্যাস্ত আইন প্রভৃতির সুযোগ নিয়ে অপেক্ষাকৃত দুর্বল জমিদারের সম্পত্তি ক্রয় করে এরা নব্যধনী হয়ে ওঠে।
কৃষিজীবী সমাজ থেকে এদের উত্থান হলেও এরাও সাধারণ জনগণের সঙ্গে বিরোধপূর্ণ সম্পর্ক গড়ে তোলে। নবগঠিত এই শ্রেণিই তখন হয়ে ওঠে এলিট শ্রেণি। এই শ্রেণির সঙ্গে শ্রমজীবী কৃষকশ্রেণির প্রকট হয়ে ওঠে। ভারতীয় সমাজ ও ইতিহাস গবেষক জে. এইচ. ব্রুমফিল্ড এই মধ্যবিত্তশ্রেণি নিয়ে নিম্নরূপ মন্তব্য করেছেন :
In city, town and village there was one group of Bengalis who was chained and were accorded recognition as superior in social status to the mass of their fellows. These were the bhadralok, literally the respectable people, the gentleman. They were distinguished by many aspects of their behavior- their style of housing, their cating habits, their occupations and their association and quite as fundamentally by their cultural values and their sense of social propriety.”
এই ভদ্রলোকশ্রেণি কালপরম্পরায় নিজেদের আত্মরক্ষার বর্ম হিসেবে ধর্মকে ব্যবহার করে। আলোচ্য নাটকে পীরসাহেব-চরিত্রের মাধ্যমে সাধারণ মানুষের ওপর ধর্মব্যাবসায়ীদের প্রভাব এবং তৎসংশ্লিষ্ট বাস্তবচিত্র উপস্থাপন করেছেন নাট্যকার। সেকালের শিক্ষার আলো-বঞ্চিত গ্রামবাংলার সাধারণ মানুষ রোগে শোকে ডাক্তারকে নয়, পির ফকিরকেই বিশ্বাস করত অধিক।
অর্থাৎ বিজ্ঞাননিষ্ঠতা নয়, অলৌকিক শক্তির ওপর ভক্তি ও আস্থাই ছিলো মানুষের মজ্জাগত বৈশিষ্ট্য। বস্তুত, অস্ত্র ও ধর্মের ব্যবহার – এ দুটিই সমভাবে নিম্নবর্গের মানুষকে শাসন, শোষণ করার চিরন্তন উপায়। সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহ্ (১৯২২-১৯৭১) ইতঃপূর্বে তাঁর লালসালু (১৯৪৮) উপন্যাসে গ্রামীণ মুসলিম সমাজে পির ফকিরের প্রভাব ও মোহাবেশ বেশ চমৎকার ভাবে উপস্থাপন করেছেন ভণ্ড মাজার ব্যবসায়ী মজিদ চরিত্রের মধ্যদিয়ে।
গ্রামাঞ্চলে অশিক্ষা, কুশিক্ষা ও বাস্তবতাবিবর্জিত ধর্মীয় শিক্ষার কারণে সাধারণ মানুষ পির ফকিরদের প্রতি অধিকতর আস্থাশীল হয়ে ওঠেন। এই বাস্তব সত্যটিই আলোচ্য নাটকে নাট্যকার অত্যন্ত দক্ষতার সঙ্গে নিম্নোক্ত সংলাপের মাধ্যমে উপস্থাপন করেছেন :
বাবা আপনেরে পীর বইলা মানি
বাচ্চা যখন জ্বরে কাতর আপনের কাছে আনি
মউতকালে আমরা চাই আপনের হাতে পানি
বাবা আপনেরে পীর বইলা জানি। (কাব্যনাট্যসমগ্র : ১৮)
সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহ্ লালসালু উপন্যাসে ধর্মকেন্দ্রিক মাজার ব্যবসা ও যুগোপযোগী স্কুল প্রতিষ্ঠার একটি দ্বন্দ্ব উপস্থাপন করেছিলেন। উপন্যাসের ভণ্ডপির মজিদ চরিত্রটি মাজার ব্যবসার স্বার্থে কখনোই চায়নি গ্রামে স্কুল প্রতিষ্ঠা হোক, সাধারণ মানুষ সত্যিকার জ্ঞানের আলোয় আলোকিত প্রেতারণা ধরে ফেলুক।
ফলে গ্রাম্য শিক্ষিত যুবক আক্কাস যখন গ্রামবাসীকে স্কুলঘর প্রতিষ্ঠার প্রস্তাব দেয়, তখন মজিদ গ্রামবাসীকে মসজিদ প্রতিষ্ঠার কথা বলে; ফলে আক্কাসকে ভরা মজলিসে অপমানিত হয়ে ফিরে যেতে হয়। আলোচ্য নাটকেও এই দ্বন্দ্বের বাস্তবচিত্র সৈয়দ শামসুল হক উপস্থাপন করেছেন। ক্যাপ্টেন কর্তৃক সদ্যধর্ষিতা মাতবরের মেয়ে ধর্মব্যবসায়ীদের প্রকৃত স্বরূপ উন্মোচন করে তাই বলে :
মানুষের অধিকার নাই তারে সোয়াল করার।
[…] আর কিছু নাই, খালি এক নাম,
নিরাকার নিরঞ্জন নাম
নামের কঠিন ক্ষারে লোহাও মোলাম
সেই এক নাম ।
নামের তাজ্জব গুণে ধন্য হয় পাপের মোকাম
চোরের আস্তানা হয় বড় কোনো পীরের মাজার। (কাব্যনাট্যসমগ্র : ৫৩)
চিরকালের আজ্ঞাবহ, অনুগত মাতবরের মেয়ের মুখে এমন তীব্র কটাক্ষ শুনে মাজারকেন্দ্রিক ব্যবসার ধ্বজ্জাধারী পীর চরিত্রটি ক্ষেপে যায়; এবং তার সমস্ত ক্রোধ গিয়ে পড়ে মেয়েটির ভাবীস্বামী মুক্তিযোদ্ধা স্কুল মাস্টারের ওপর। সে অনুমান করতে পারে, তার প্রদত্ত ধর্মজ্ঞান, নীতিশিক্ষা ছাপিয়ে স্কুলশিক্ষকের বিজ্ঞাননিষ্ঠ আলোকিত মনের প্রভাবেই মেয়েটি আত্মসচেতন হয়ে উঠেছে। তখন আলোচ্য নাটকে ধর্মব্যবসার সঙ্গে বিজ্ঞান শিক্ষার দ্বন্দ্ব প্রকটিত হয়ে ওঠে।
লালসালুর মজিদ চরিত্রটির মতোই এ নাটকের পীর চরিত্রটি তখন পুরো বিষয়টি ধামাচাপা দিতে প্রসঙ্গ পাল্টে ফেলে। মাতবরের মেয়ের সঙ্গে আদর্শিক যুক্তিতে না গিয়ে সে বরং ব্যক্তিগত আক্রমণকে আত্মরক্ষার উপায় হিসেবে বেছে নেয়। ফলে, স্কুলমাস্টারের শিক্ষার অসারতা এবং মুক্তিযুদ্ধে গমন প্রসঙ্গে কটাক্ষ করে মাতবরের মেয়ের উদ্দেশ্যে পীর মন্তব্য করে :
খবরদার বেটি খবরদার,
এ সব শিখায়া দিছে তরে ঐ জুয়ান মাস্টার
যার সাথে কথা তর আছিল বিয়ার। […]
তর সে মাস্টার কয়, সম্ভব কীভাবে?
পুস্তক ফালায়া তাই হাতে নেয় কামান-বন্দুক
বাপদাদা কাইল্যা যত দালান ভাঙ্গুক
তাতে তার কিছু নাই, পাগলা ঘোড়ার
দাপটে দুনিয়াটারে করা চাই নষ্ট ছারখার
এই কাম তার। (কাব্যনাট্যসমগ্র : ৫৩)
অন্যত্র, শৈশবে মক্তবে আরবি শিক্ষার আতঙ্কজনক প্রসঙ্গ এ-নাটকে মাতবরের মেয়ের স্মৃতিচারণাসূত্রে নিখুঁত ভাবে উপস্থাপন করেছেন নাট্যকার। একদিকে ভিনদেশি ভাষাশিক্ষায় শিশুদের সমস্যা ও অনাগ্রহ, অন্যদিকে
ধর্মগুরুদের কঠিন শাস্তিপ্রদানের বিষয়টিও এ প্রসঙ্গে উঠে এসেছে নাটকে :
আল্লাতালার নাম
কলমা কালাম
আপনের কাছেই শেখা, অতি ছোটবেলা
মনে আছে, সকালে বিকালে খ্যাতের ভিতর দিয়া বাবা আপনে
রোজ দুই বেলা
আসতেন, আমার পুতুল খেলা
ফালায়া তখন, ওজু নিয়া
মাথায় কাপড় দিয়া
বসতাম আমপাড়া হাতে। ভুল হইলে পর
হাতের পানখার বাড়ি পড়ত এই পিঠের উপর। (কাব্যনাট্যসমগ্র : ৫০)
আবার, বাংলার গ্রামীণ সমাজে আবহমান প্রচলিত সামাজিক কুসংস্কারের ছবিও নাট্যকার সৈয়দ শামসুল হক নিপুণ দক্ষতায় চিত্রিত করেছেন আলোচ্য নাটকে। যেমন, গ্রামীণ বাঙালি বধূর যাপিত জীবনছবির চিরায়ত চিত্র নিম্নে উপস্থাপিত হয়েছে
কাকা কাক ডাকলে দুপুর বেলায়
লাঠি হাতে বৌ-ঝি-খেদায়। (কাব্যনাট্যসমগ্র: ২১)
গ্রামীণ কৃষিনির্ভর সমাজে নানান আচারস্বর্বস্ব ধর্মীয় ও সামাজিক কুসংস্কার বরাবরই বিদ্যমান ছিল। যেমন- – যাত্রারম্ভে দধি ভক্ষণে শুভ, কিন্তু চলতিপথে এক শালিক, কালো বিড়াল কিংবা শৃগাল দর্শন অশুভ। তেমনি সাধারণের মনে গভীর বিশ্বাস ছিল যে, ভর দুপুরে কাকের কা কা ডাক আসন্ন দুর্যোগ, বিপর্যয় ও ঘোর অমঙ্গলের ইঙ্গতবহ।

বিশেষত, গ্রামীণ নারীদের মনে এই সংস্কার প্রবলভাবে বদ্ধমূল ছিল। ফলে তারা তাদের আঙিনা, ঘরকন্নার সীমানা থেকে এসব কুলক্ষণ দূর করতে চাইতো। আবার, ভূত, প্রেত, দেও, দানব প্রভৃতি অপদেবতার প্রতি সাধারণ গ্রামবাসীর অমূলক ভীতিও যে সমাজব্যবস্থায় ছিল, তাও মাতবরের সঙ্গে গ্রামবাসীর একটি সংলাপে সুস্পষ্ট হয়েছে :
মনে আছে, সেই সনে ঘোর এক অমাবইশ্যা রাইতে
হাজীগঞ্জ থিকা আমি রওনা দিয়াছি। সোজা বাড়িত যাইতে
পরে পরথমে পাথার। তারপর শ্মশান একটা, সাথে আছে
কয়েকজন দোকানদার। তারা কয় মিয়া সাব, পাছে পাছে কি য্যান আসতে আছে। […]
কও একবার সত্য কইরা কও,
যতই দুর্বল হও
দেওপরী তত বেশি জাঁক দিয়া ওঠে
কি না ওঠে? (কাব্যনাট্যসমগ্র : ২৪-২৫)
বস্তুত, পায়ের আওয়াজ পাওয়া যায় কাব্যনাট্যের অন্যতম প্রধান চরিত্র সমবেত গ্রামবাসীর মধ্যে প্রায় সকলেই কৃষিজীবী সমাজব্যবস্থার অংশ। নিরীহ এই গ্রামবাসীর সঙ্গে কথোপকথনসূত্রে মাতবর তাই কৃষিভিত্তিক জীবনঘনিষ্ঠ নানা অলংকার ব্যবহার করেছে।
গ্রামীণ সমাজে মাতবরকে মানুষ শ্রদ্ধা থেকে ভয় করে বেশি। আলোচ্য নাটকেও মাতবরের কূটকৌশল, পেয়াদা পাইকের ভয় গ্রামবাসীকে ভীত-সন্ত্রস্ত করে রাখে সবসময়। কিন্তু মুক্তিযুদ্ধের শেষ পর্যায়ে যুবসম্প্রদায়ের মধ্যে এমনই সাহস জন্মাতে শুরু করে যে, তারা আর মাতবরের চোখরাঙানিকে তোয়াক্কা করছে না ; বরং প্রতিবাদে মুখর হয়ে উঠেছে। এরকম একটি বাস্তবচিত্র, নাট্যকার উপস্থাপন করেছেন নিম্নোক্ত সংলাপের মাধ্যমে :
যুবক। কিছু যে কন না কথা মাতবর সাব?
আপনার মুখেতো আগে দেখি নাই কথার অভাব
কি বাহার কথা য্যান বিয়ার মজলিশে
বুড়া বর গাও ভইরা অলঙ্কার দিছে।
বর্ষার কইমাছ কথা ফাল পাড়ে
বাক্য না আমের ঝোপ ডাল ভাইঙ্গা পড়ে। (কাব্যনাট্যসমগ্র : ২২)
উপর্যুক্ত সংলাপে গ্রামীণ সমাজে বাল্যবিবাহের প্রসঙ্গপি ইঙ্গিতময় হয়ে উঠেছে। গ্রামীণ সমাজে স্ত্রীর অনুমতি ব্যতিরেকেই বিবাহিত পুরুষের একাধিক বিয়ে করার রীতি ছিল। লোভী এসব পুরুষের লক্ষ্যই ছিল সম্পত্তি ও গয়নার লোভ দেখিয়ে ছলে-বলে-কৌশলে অল্পবয়সী মেয়েদের অভিবাবককে প্রভাবিত করা।
সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহর বস্তুত, মানুষের দারিদ্র্য ও অসহায়ত্বকে পুঁজি করে বিচিত্রগামী পুরুষ তাদের বিকৃত রুচি চরিতার্থ করে। অর্থ, সম্পত্তি, অলঙ্কার এ ক্ষেত্রে তাদের হাতিয়াররূপে বিবেচিত হয়। রোকেয়া সাখাওয়াত হোসেন (১৮৮০-১৯৩২) তাঁর এক রচনায় সমাজে নারীদের অলঙ্কারপ্রীতি এবং পুরুষের ভূমিকা ব্যাখ্যা করতে গিয়ে লিখেছেন ‘অলঙ্কারের মুখ্য উদ্দেশ্য ঐশ্বর্য্য দেখান বই ত নয়।’
বস্তুত, এভাবেই সৈয়দ শামসুল হক তাঁর মুক্তিযুদ্ধের প্রেক্ষাপটে রচিত কাব্যনাটক পায়ের আওয়াজ পাওয়া যায়ের প্রতি পরতে পরতে ১৯৭১ সালে সংঘটিত মুক্তিযুদ্ধের ডামাডোলে তৎকালীন গ্রামীণ কৃষিজীবী সমাজব্যবস্থার চিত্র উপস্থাপন করেছেন শিল্পিত অবয়বে।
বাংলাদেশের কাব্যনাট্যান্দোলনের ধারায় সৈয়দ শামসুল হকের অনন্য সৃষ্টি পায়ের আওয়াজ পাওয়া যায় গণমুক্তি আন্দোলনের একটি মাইলপোস্ট। রাষ্ট্রিক পরিমণ্ডলে বিরাজিত অপরাজনীতি, অন্ধতা, কুসংস্কার আর শোষণ-বঞ্চনা-বৈষম্যের বিরুদ্ধে মানুষকে সোচ্চার করে তোলার যে মহতী উদ্যোগ তা এ-নাটকে প্রদর্শিত হয়েছে অসামান্যভাবে।
সৈয়দ শামসুল হক স্বয়ং এ-প্রসঙ্গে বলেছেন : ‘যদিও ‘পায়ের আওয়াজ পাওয়া যায়’ মুক্তিযুদ্ধের নাটক, কিন্তু আরও একটি বড় মুক্তিযুদ্ধের কথা আমি বলতে চেষ্টা করেছি। সেটা সংস্কার থেকে মুক্তি, ধর্মান্ধতা থেকে মুক্তি, মানবিকতার দিকে উত্তরণ। নাট্যকারের এই সদিচ্ছা পায়ের আওয়াজ পাওয়া যায় নাটকে শিল্পরূপ পেয়েছে নিঃসন্দেহে।