পায়ের আওয়াজ পাওয়া যায় এর শৈলিবিচার রচনাটি সৈয়দ শামসুল হকের কাব্যনাটক : ইতিহাস, সমাজ, রাজনীতি ও শিল্প [পিএইচডি অভিসন্দর্ভ] এর অংশ। গবেষনাটির অথোর জান্নাত আরাসোহেলী। এই অভিসন্দর্ভের (পিএইচডি) বিষয় বাংলা নাটক – ইতিহাস ও সমালোচনা। প্রকাশিত হয়েছিল বাংলা বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, শিক্ষাবর্ষ: ২০১৭-২০১৮। গবেষণাকর্মটি সাহিত্যের শিক্ষার্থীদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ হওয়ায় আমরা সাহিত্য গুরুকুলে পুন-প্রকাশ করলাম।

পায়ের আওয়াজ পাওয়া যায় এর শৈলিবিচার
সৈয়দ শামসুল হকের প্রথম কাব্যনাটক পায়ের আওয়াজ পাওয়া যায় শিল্পসার্থকতায় অনন্য। এ নাটকের কাহিনি সংঘটিত হয়েছে একটি নির্দিষ্ট স্থানে, এবং উপস্থাপিত কাহিনির কালপরিসরও একদিন। নাটকে মাতবরের সভাগৃহ বা বৈঠকখানার খণ্ড কালপরিসরের মধ্য দিয়ে উপস্থাপিত হয়েছে মুক্তিযুদ্ধকালের সমগ্র কাহিনি। চরিত্রপাত্রের মুখনিঃসৃত সংলাপে দর্শক-পাঠক সে-সময়ের বাস্তবতা উপলব্ধি করতে পারেন।
নাট্যকার টানটান উত্তেজনার মধ্যদিয়ে নাটকের মূলগল্প উপস্থাপন করেছেন। নাটকের প্রারম্ভেই দেখা যায়, সতেরো গ্রামবাসী নিজেদের সমস্যা-সংকটের কারণ ও প্রতিকার জানতে চেয়ে মাতবরের নিকট এসেছে। এ দৃশ্যটিকে গ্রিক নাট্যকার সোফোক্লিসের (৪৯৬-৪০৬ খ্রি.পূ.) ইডিপাস নাটকের প্রারম্ভিক দৃশ্যের সঙ্গে তুলনা করা যায়।
বস্তুত, কোরাস চরিত্রের এই প্যাটার্ন প্রাচীন গ্রিক নাটকের অন্যতম প্রধান বৈশিষ্ট্য। আবার, পরবর্তীকালে বুদ্ধদেব বসুর (১৯০৮-১৯৭৪) কাব্যনাটকের মধ্যেও আমরা ‘জনতা’ চরিত্রের এই প্রবণতা প্রত্যক্ষ করি। তবে পায়ের আওয়াজ পাওয়া যায় নাটকে চরম উত্তেজনাকর পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়েছে তখন, যখন মাতবরের মেয়ে হঠাৎ সভায় প্রবেশ করে; এবং ব্যক্ত করে বিগতরাতে পাক-সেনাকর্তৃক তার ধর্ষিত হওয়ার করুণ কাহিনি।
একজন পিতা যখন নিরুপায় হয়ে বিবাহ নামক প্রহসনের দোহাই দিয়ে স্বীয় কন্যাকে মিলিটারি বাহিনীর হাতে তুলে দিতে বাধ্য হয়, তখন সহজেই অনুমান করা যায় ১৯৭১-এ বাংলাদেশের আপামর জনগণের করুণ অবস্থা। এরকম আরও একটি কাহিনির বর্ণনা আছে ঔপন্যাসিক শওকত ওসমানের (১৯১৭- ১৯৯৮) দুইসৈনিক (১৯৭৩) নামক উপন্যাসে।
সেখানেও পাকিস্তানি আদর্শে উদ্বুদ্ধ মিলিটারিদের সেবক মখদুম হাজী মিলিটারি সদস্য মেজর হাকিম ও ক্যাপ্টেন ফৈয়াজের লালসার হাত থেকে নিজকন্যা সাহেলী ও চামেলীকে রক্ষা করতে ব্যর্থ হয়। অতঃপর আত্মহত্যার মাধ্যমে সে তার পাপাচারদগ্ধ জীবন সাঙ্গ করে। পায়ের আওয়াজ পাওয়া যায় নাটকে মেয়েটি লজ্জায়, ঘৃণায়, শঙ্কায় বিষপানে আত্মহত্যা করেছে, আর মাতবরকে জনতা ক্রোধে উন্মত্ত হয়ে হত্যা করেছে।
পায়ের আওয়াজ পাওয়া যায় নাটকে প্রকাশ্য চরিত্র চারটি – মাতবর, মাতবরের মেয়ে, পীরসাহেব ও পাইক। – আর বৃন্দচরিত্র – গ্রামবাসী। এছাড়া নেপথ্যচরিত্র হিসেবে আরও কিছু চরিত্রের নাম ও তাদের ভূমিকা প্রকাশ্য চরিত্রগুলোর মুখে উচ্চারিত হয়েছে। যেমন শেষদৃশ্যে আগত মুক্তিযোদ্ধারা, পাকিস্তান আর্মির ক্যাপ্টেন, – মাতবরের স্ত্রী, মাতবরের মেয়ের হবুস্বামী, মুক্তিযোদ্ধা স্কুলমাস্টার প্রমুখ চরিত্র।
নাটকে গ্রামবাসী চরিত্রের আদল কিছুটা গ্রিক নাটকের কোরাস চরিত্রের মতো। এখানে ভিন্ন ভিন্ন বয়সের বিভিন্ন পেশার মানুষ একত্র হয়ে একটি সামগ্রিক চরিত্র সৃষ্টি করেছে। বস্তুত, ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধের প্রেক্ষাপটে অবরুদ্ধ বাংলাদেশের গ্রামীণ সাধারণ মানুষের অবস্থা ও অবস্থানের সর্বজনীন চিত্র প্রকাশিত হয়েছে এই কোরাস চরিত্রের মাধ্যমে। গ্রামবাসী চরিত্রে কারা থাকবেন, তার একটি সুস্পষ্ট নির্দেশনা লেখক সৈয়দ শামসুল হক নাটকের প্রারম্ভেই প্রদান করেছেন।
চরিত্রের সংলাপ রচনার সময় গ্রামবাসী লেখা থাকলেও এগুলোকে ভেঙে ভেঙে বিভিন্ন বয়সের চরিত্রের মুখে ঢেলে সাজাবার নির্দেশনা দিয়েছেন তিনি। এ-কারণেই এখানে অশীতিপর বৃদ্ধা, যুবক, কৃষক, শ্রমিকসহ সাধারণ মানুষের একটি সমন্বয় ঘটানো হয়েছে। এ প্রসঙ্গে নাটকের প্রারম্ভে নাট্যকারের নির্দেশনা ছিলো নিম্নরূপ :
গ্রামবাসীর সংখ্যা প্রয়োজন অনুসারে নির্ধারিত করা যেতে পারে। তবে নারী-পুরুষ অবশ্যই বিভিন্ন বয়সের হতে হবে । নিরপেক্ষ গ্রামবাসীর সংখ্যা কুড়ি হলে ভালো হয়। আমি অন্তত একজন বৃদ্ধকে কল্পনা করেছি যার বয়স একশত বৎসরের কাছাকাছি, একজন বৃদ্ধা, যে অন্তত নব্বই।’
উল্লেখ্য যে, পায়ের আওয়াজ পাওয়া যায় নাটকে কোরাসকে প্রথমে সাধারণ নিরুপায় নির্যাতিত ও অসহায় চরিত্র মনে হলেও ক্রমশ তারাই হয়ে উঠেছে প্রতিবাদী চরিত্র। শোষকের অন্যায়ের বিরুদ্ধে পরিশেষে জাগরণ ঘটেছে সংঘশক্তির। কোরাসের এই মানস-বিবর্তনকে ১৯৭১-এর প্রেক্ষাপটে সাধারণ বাঙালির মানসিকতার বিকাশ-বিবর্তনের সঙ্গে তুলনা করা চলে। অত্যাচারিত বাঙালি একটা সময় হয়ে উঠেছে প্রতিবাদমুখর, এবং বলাবাহুল্য যুবসম্প্রদায়ই মুক্তিযুদ্ধকে ইতিবাচক পরিণতির দিকে এগিয়ে নিয়ে গেছে। যার ফল স্বাধীন সার্বভৌম বাংলাদেশ।

অন্যদিকে, পায়ের আওয়াজ পাওয়া যায় নাটকের প্রধান চরিত্র এবং মুক্তিযুদ্ধবিরোধী মাতবর। তার মধ্যেই মূর্ত হয়ে উঠেছে স্বাধীনতাবিরোধী ঘাতকশক্তি : রাজাকার আলবদর ও শান্তিবাহিনী। নাট্যকার গ্রামবাসীর মুখের সংলাপে সমাজের এই ঘৃণ্য চরিত্র সম্পর্কে নিম্নরূপ ধারণা দিয়েছেন :
মানুষের বেশে
এরচেয়ে বড় কোনো দাঁতাল আপনারা
গহীন জঙ্গলে গিয়া ঘেরা দিয়া, পিটাইয়া ঢেড়া
পাইবেন না, মুশকিল আছে।
আমাদের সুখ শান্তি আশা
নিজের স্বার্থের লোভে জলে দিছে ভাসা
এই সেই লোকটা যতক্ষণ জীবিত সে আছে
নাই আমাদের নিজের জীবন। (কাব্যনাট্যসমগ্র ৫৬-৫৭ )
পায়ের আওয়াজ পাওয়া যায় নাটকের মাতবর একটি খল চরিত্র হলেও নাট্যকার আশ্চর্য কুশলতায় তাকে অপেক্ষাকৃত সংবেদনশীল করে নির্মাণ করেছেন। যে কারণে নাটকে মাতবরের রাজাকার ভূমিকার তুলনায় ধর্ষিত-মেয়ের অসহায় পিতা-রূপ অধিক মূর্ত হয়ে উঠেছে। নাটকের শুরুতে মাতবর চরিত্রটিকে বলিষ্ঠ, দাম্ভিক ও খল মনে হলেও মাতবরের মেয়ের মঞ্চ-উপস্থিতির পর থেকে মাতবর চরিত্রটি যেন বিবর্ণ হয়ে গেছে; এবং দর্শকের নিকট থেকে সে শেষপর্যন্ত সমবেদনা আদায় করতে সক্ষম হয়েছে।
অবশ্য নেতিবাচক চরিত্রের প্রতি নাট্যকারের এই ইতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি পরবর্তীকালে তাঁর অন্যান্য কাব্য নাটকেও লক্ষ করা যায়। যেমন নূরলদীনের সারাজীবন (১৯৮২) নাটকের ইংরেজ খল চরিত্রগুলির সংকট, নেতিবাচক আচরণের কার্যকারণ, স্বপ্ন, হতাশার ছবি তুলে ধরে নাট্যকার এক ধরনের ইতিবাচক আবহ তৈরি করেছেন। একই কথা বলা চলে তাঁর এখানে এখন (১৯৮১), গণনায়ক (১৯৭৬), ঈর্ষা (১৯৯০) প্রভৃতি কাব্যনাটকের নেতিবাচক চরিত্রগুলোর ক্ষেত্রেও।
আলোচ্য নাটকটি মঞ্চে বাস্তবে দেখার পর মাতবরের পরিণতিতে অশ্রুসিক্ত একজন দর্শক নাট্যকারকে প্রশ্ন করেছিলেন – আপনি রাজাকার চরিত্রটিকে এমন সংবেদনশীল করে কেন নির্মাণ করলেন – – যার ফলে আমার দুচোখ অশ্রুসিক্ত হলো! দর্শকের প্রশ্নের উত্তরে নাট্যকার মন্তব্য করেছিলেন নিম্নরূপ :
পানি আসে এজন্য যে, ঐ লোকটির এরকম হওয়ার কথা ছিল না। এজন্যই ঈশ্বরের মত আপনার চোখেও পানি আসে। একজন যখন পাপ করে এবং পাপের শাস্তি হিসেবে সে যখন দোজখে যাবে। ভাবার কোন কারণ নেই যে ঈশ্বর তাকে হেসে হেসে দোযখে পাঠাবে। ঈশ্বরের অবশ্যই মায়া হবে কারণ তার সৃষ্টির তো এমন হওয়ার কথা ছিল না। যেহেতু হয়ে গেছে তাই অনিচ্ছা সত্ত্বেও সাজা দিতে হলো। তো আমি যখন লিখি তখনতো আমি ঈশ্বর। এক একটি চরিত্র সৃষ্টি করেছি। আবার দর্শক যখন দেখে সেও একজন ঈশ্বর, তাই সৃষ্টির পতন দেখে কাঁদে।’
তবে নাটকে মাতবর চরিত্রের অন্তর্গত শূন্যতা, হাহাকার, মানসদ্বন্দ্ব কাব্যনাটকের আবশ্যকীয় অংশ হিসেবে নাট্যকার চমৎকার ভাবে উপস্থাপন করেছেন। একদিকে মাতবর ধর্মের দোহাই দিয়ে নানান কথায় জনতাকে পাকিস্তানের পক্ষে ভোলানোর চেষ্টা করেছে, অন্যদিকে তার মন জানে যে, গতরাতেই মিলিটারি কর্তৃক তার কন্যা সম্ভ্রম হারিয়েছে। এই মানসিক দ্বন্দ্ব চমৎকার একটি লোকপ্রবাদের মাধ্যমে লেখক প্রকাশ করেছেন। পাইক যখন মাতবরকে গ্রামীণ যুবকদের প্রতিরোধে মিলিটারিকে সংবাদ দেবার কথা বলে, তখন মাতবর বলে ওঠে :
শরীলের কোনোখানে যখন চুলকায়
মানুষ হাতের কাছে যাই তাই পায়।
তাই দিয়া চুলকানি থামায়।
সময়ে হাতের কাছে গোক্ষুরার ল্যাজ,
যখন মালুম হয় সাপে কাটা শ্যাষ
আর কোনো পথ নাই ? (কাব্যনাট্যসমগ্র : ২৯-৩০)
প্রকৃতপক্ষে মাতবর তার অহংবোধ আর পরাধীন মানসিকতা থেকে বের হতে পারছে না। বস্তুত, ‘ইংরেজদের ২০০ বছরের শোষণ শেষে, ১৯৪৭ সালে স্বাধীনতা লাভের পর […] ব্রিটিশদের পরিবর্তে শোষকের ভূমিকায় অবতীর্ণ হয় পাকিস্তানিরা। বাঙালি-অধ্যুষিত এ অঞ্চলে পাকিস্তানি শাসন জন্ম দেয় আরেকটি নব্য উপনিবেশের।”
পায়ের আওয়াজ পাওয়া যায়ের মাতবর চরিত্র সেই নব্য উপনিবেশবাদী মানসিকতার শিকার। যার পরিপ্রেক্ষিতে প্রভুকর্তৃক অত্যাচারিত হয়েও সে প্রভুর আজ্ঞাবহ গোলাম হয়ে বেঁচে থাকাকে উপযুক্ত কর্তব্য বলে মনে করেছে। সৈয়দ শামসুল হক এক সাক্ষাৎকারে পায়ের আওয়াজ পাওয়া যায়-এর মাতবর চরিত্র নির্মাণ সম্পর্কে বলতে গিয়ে ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতার আলোকে একটি বাস্তব ঘটনার কথা উল্লেখ করেছিলেন। এটি দ্বারা মাতবর চরিত্র প্রসঙ্গে নাট্যকারের ভাবনালোক উন্মোচিত হয়। জনৈক সমালোচক এ প্রসঙ্গটি উল্লেখ করে লিখেছেন :
৭২-এ আমি দেশে এসেছিলাম। আমাদের বাণিজ্য এলাকার নাম মতিঝিল। সেখান দিয়ে দুপুরবেলা আমি হাঁটছি। সেই মাসেই ছিল স্বাধীনতা দিবস। হঠাৎ দেখলাম ৭০-৭৫ বছর বয়সের আধা গ্রাম্য এক বৃদ্ধ ভদ্রলোক, তিনি মাটিতে পড়ে কাতর হয়ে ক্ষমা চাইছেন আর তিন দিক থেকে ঘেরাও করে আছে ছেলেরা। […] একটা ১২-১৩ বছরের ছেলে একটা লোহার শিক দিয়ে ওকে খোঁচাচ্ছে।
যেখানে খোঁচাচ্ছে রক্ত বেরুচ্ছে আর বলছে, তুই রাজাকার।’ […] বৃদ্ধ বলে, ‘না বাবা, কখনো নয়।’ কিন্তু ছেলেটা সমানে খোঁচাচ্ছে। চারপাশে এতগুলো লোক দাঁড়িয়ে আছে, কেউ জিজ্ঞেস করছে না, It’s true or not, […] বিষয়টা আমি কখনোই মানতে পারিনি। […] সে আমারই লোক। তার এমনটা না হওয়ারই কথা ছিল। অন্তত এরকম না হলেও পারত। এজন্য আমার চোখে জল আসে। […] কেন সে (এরকম?) হলো, সেটা রাজনীতিবিদ, Sociologist, Historian তারা বুঝবে, আমিত লেখক।
আলোচ্য নাটকে মাতবর চরিত্রের আদর্শিক অবস্থান সুস্পষ্ট ও সংহত হলেও পীরসাহেব চরিত্রটি কিছুটা রহস্যে ঘেরা। নাটকের প্রারম্ভে তাকে মনে হয় সে রাষ্ট্র ক্ষমতার সঙ্গে আপসকারী ব্যক্তিত্ব; মাতবরের ঘনিষ্ঠ সহচর।
কিন্তু নাট্যকাহিনি যতই অগ্রসর হতে থাকে, ততই স্পষ্ট হয় যে, পীরসাহেব ধর্মের ধ্বজাধারী হলেও সে মূলত স্বাধীনতার পক্ষের শক্তি। সমালোচকের মতে :
পীরসাহেবের ভাবনার সাথে সাধারণ মানুষের প্রাথমিক যে বিরোধ তা মূলত ধর্মের সাথে বস্ত্রজাগতিক জীবনের অসামঞ্জস্যের। এ প্রসঙ্গে মনে রাখা দরকার, ধর্মে কারো নিষ্ঠা থাকার কারণে আমরা কোনো মানুষকে নঞর্থক চিন্তা চেতনার মানুষ হিসেবে বিবেচনা করতে পারি না।’
আমাদের বিবেচনায় পীরসাহেব চরিত্রটি একটি স্থিতিস্থাপক চরিত্র; ধর্ম যার প্রধান অস্ত্র, ধর্মকে কাজে লাগিয়ে সে পরিবর্তিত পরিস্থিতির সঙ্গে নিজেকে সহজেই বিবর্তিত করে অভিযোজিত হতে পেরেছে সমাজে, জনমনে। উল্লেখ্য, পায়ের আওয়াজ পাওয়া যায় নাটকটি যখন নাট্যকার রচনা করেন, তখন পীরসাহেব চরিত্রটি নির্মাণ করার সময়, এ চরিত্রে অভিনয়ের জন্য বার বার অগ্রজপ্রতিম নাট্যকার মুনীর চৌধুরীর কথা তাঁর স্মরণে এসেছিল। এক লেখনীতে সৈয়দ শামসুল হক এ প্রসঙ্গে জানান :
আমার ‘পায়ের আওয়াজ পাওয়া যায় যখন লিখি, তখন পীরসাহেবের চরিত্র রচনা করতে গিয়ে আমার বারবারই মনে হতো মুনীর ভাই থাকলে এই চরিত্রটিতে তাঁকে অভিনয় করতে বলতাম।
আলোচ্য নাটকে মাতবরের পেয়াদা আর একটি সুবিধাবাদী চরিত্র। একদিকে সে যেমন মাতবরের স্বার্থের পক্ষে কথা বলেছে, অন্যদিকে পরিস্থিতি বিরূপ দেখে সহজেই ভোল পাল্টে মুক্তিযোদ্ধাদের দলে ভিড়ে নিজের নিরাপত্তা সুনিশ্চিত করেছে। এমনকি নিজের গ্রহণযোগ্যতা বাড়াতে স্বীয় মুনিব মাতব্বরকে গুপ্তির আঘাতে হত্যা করেছে।

বস্তুত, নাটকে পাইক চরিত্রটি বিশ্বাসঘাতক শ্রেণির। সে তাদেরই প্রতিনিধিত্ব করেছে, যারা গোপনে এদেশ ও জাতির বুকে ছুরি চালিয়েছে। যুদ্ধকালে এরা পাকিস্তানিদের সহায়তা করে স্বজাতির সাথে বেইমানি করেছে। আবার দেশ স্বাধীন হবার পূর্বলগ্নে ভোল পাল্টিয়ে মুক্তিযোদ্ধাদের দলে ভিড়ে গিয়ে প্রকৃত মুক্তিযোদ্ধাদের কলঙ্কিত ও বিতর্কিত করে তুলেছে।
এরা সেই পুরোনো চেনা শকুন, যারা বার বার এদেশের বুকে নেমে এসে জাতির লালসবুজের পতাকাটিকেই খামচে ধরেছে। এদের বিনাশ নেই। এরা এদেশের বুকে অমোচনীয় কলঙ্ক, দীর্ঘশ্বাসময় অন্ধকার। নাট্যকার সৈয়দ শামসুল হক ইতিহাসের এই নিমর্ম বাস্তব সত্যটিকে অত্যন্ত ছোট অথচ গভীর পরিসরে এ চরিত্রের মাধ্যমে দর্শকের সামনে উপস্থাপন করেছেন।
নাট্যকাহিনির প্রথম পর্যায়েই পাইক চরিত্রটির মধ্যে মাতবরের আদেশ উপেক্ষা করার প্রবণতা তার সুযোগসন্ধানী মানসিকতাকেই প্রকটিত করে। মুক্তিযুদ্ধের শেষ পর্যায়ে এ পর্যায়ে মাতবরের স্বার্থরক্ষা কিংবা নিরাপত্তা বিধানে তার নির্লিপ্ত মানসিকতা প্রকাশ করেছেন নাট্যকার :
ওর মইধ্যে কি আছে জানি না
অচিন হইয়া যায় চিরকাল্যা চিনা
এতকাল যা দেখেছি দুইচক্ষু দিয়া
য্যান কেউ নিয়া গ্যাছে এক্কো থাবা দিয়া
য্যান একটা ছোঁ মারলো আচাড়ুয়া পাখি
সোনার দালান খইসা ঝরে কাদামাটি। (কাব্যনাট্যসমগ্র : ২২)
যুদ্ধের শেষদিকে পাকিস্তানি সৈন্যদের অসহায় অবস্থা প্রত্যক্ষ করে মুক্তিযুদ্ধবিরোধী শক্তি ভীত-সন্ত্রস্ত হয়ে পড়ে। সে-কারণে মাতবর যখন প্রতিবাদী যুবককে গ্রেফতারের জন্য তার পাইককে নির্দেশ দেয়, তখন সে সরাসরি গ্রেফতারের বিষয়টি এড়িয়ে হানাদার বাহিনীর সহযোগিতা নিতে বলে। অথচ যুদ্ধের শুরুতে পাকবাহিনী ও তাদের এদেশীয় দোসরদের সঙ্গে হাত মিলিয়ে এরা হত্যা, গুম, ধর্ষণ, ঘরবাড়ি জ্বালানোসহ ক্যাম্পে মুক্তিযোদ্ধাদের ওপর নির্মম অত্যাচার চালিয়েছে। অন্যদিকে, যুদ্ধশেষে মুখোশ পাল্টে এরা মুক্তিযোদ্ধাদের সঙ্গে যোগ দিয়েছে।
এ নাটকের শেষে তাই দেখা যায়, মাতবর খুন হয় তারই সকল অপকর্মের বিশ্বস্ত দোসর পাইকের হাতে। আর পাইক চরিত্রটি সহজেই মিশে যায় মুক্তিযোদ্ধাদের ভিড়ে :
পাইক। এইমাত্র শেষ করছি বড় শয়তান
ছোটখাটো আরো আছে। এখনি সন্ধান করা না গেলে আবার
বেবাক চম্পট দিয়া হয়া যাবে পার। […]
অবিলম্বে সারা দেশ ঘেরা প্রয়োজন
জলদি জলদি সব চলেন এখন। (কাব্যনাট্যসমগ্র: ৫৯)
তবে নাটকের সব থেকে ট্রাজিক ও মর্মস্পর্শী চরিত্র হলো মাতবরের মেয়ে চরিত্র। নাটকের ভুক্তভোগী অন্যচরিত্রগুলোর সমস্যা সামষ্টিক সমস্যার সঙ্গে একীভূত; সমগ্র মুক্তিযুদ্ধের প্রেক্ষাপটে যেটা অনিবার্য ছিল। কিন্তু মাতবরের মেয়ের সংকট, পরাজয় একান্ত ব্যক্তিগত। নিজ পিতার কুকীর্তির ফলভোগ করতে হয়েছে তাকে সম্পূর্ণ বিনা অপরাধে। রক্ষক পিতাই তাকে পাকিস্তানি ক্যাপ্টেনের হাতে তুলে দিয়ে বিনাশকের ভূমিকা পালন করেছে।
নিজ পিতার এহেন আচরণ তার জীবনকে বিষিয়ে তুলেছে। তাই নাটকের মধ্যবর্তী পর্যায়ে তার এই ব্যক্তিগত শোকের অন্তরবিদারী হাহাকার স্পর্শ করে গেছে নাটকের চরিত্র ছাপিয়ে নাট্য-দর্শক ও পাঠকের হৃদয়তন্ত্রীতে। জন্মদাতা পিতা যেখানে তাকে পুরুষতান্ত্রিক সমাজের লালসাবহ্নি থেকে রক্ষা করতে ব্যর্থ হয়েছে, ধর্মও যখন তাকে বর্ম হয়ে রক্ষা করেনি, তখন সে শোকে উন্মাদপ্রায় হয়ে জনক ও আচারসর্বস্ব ধর্মের বিরুদ্ধেই হয়ে উঠেছে দ্রোহী।
সে স্পষ্টভাবে সন্দেহের আঙুল তুলেছে ধর্মের সেসব বিধি-বিধানের প্রতি, যা সাধারণ মানুষের কল্যাণে কার্যকর নয়। তার কেবলি মনে হয়েছে ধর্ম এবং ভিন্নভাষায় রচিত ধর্মগ্রন্থ কেবলি চিত্তমোহন বুলিমাত্র; ব্যক্তির রক্ষাকবচ নয় মোটেও। পীরকে উদ্দেশ্য করে তাই সে বলেছে :
আমপারা, সুরা, দোয়া দরুদ, কোরান
পার হইয়া গেছি বাবা আপনের সহায়ে
য্যান এক বিশাল গেরাম, আমার ডাইনে বায়ে
লোকে কথা কয় কিন্তু অচিন ভাষায় তার কিছুই বুঝি না ;
নিশ্চয় নিশ্চয় বাবা, নিরঞ্জন আল্লা নিরাকার –
আরো সত্য, তাঁর ভাষা বহুদূরে আমার ভাষার। (কাব্যনাট্যসমগ্র : ৫১)
উল্লেখ্য, পায়ের আওয়াজ পাওয়া যায়-এর নারী চরিত্রের মুখে এই আল্লাহ, ধর্ম ও ধর্মগ্রন্থ-সম্পর্কিত সংশয়বচন নাট্যকারের ব্যক্তিজীবনের অভিজ্ঞতা থেকে নেয়া। নাট্যকারের পিতা পুরুষতান্ত্রিক সমাজের একজন সার্থক প্রতিনিধি হিসেবে নানা কারণে স্ত্রীকে বেত্রাঘাত করতেন, যা কিশোর শামসুল হকের চেতনালোকে এক ক্ষোভ ও বেদনামিশ্রিত অনুভূতির জন্ম দিয়েছিল।
নাট্যকারের জননী একটা সময় চরম ক্ষোভে নাট্যকারকে উদ্দেশ্য করে ঈশ্বরের অস্তিত্ব প্রশ্নে এমন একটি গভীরতর উক্তি করেছিলেন যে, লেখক সারাজীবনেও তা ভুলতে পারেননি। এমন কি মাতবরের মেয়ের ঈশ্বরসংক্রান্ত এ ভাবনার উৎস যে তাঁর জননী, সে কথা পরবর্তীকালে তিনি তাঁর আত্মজীবনীমূলক রচনা প্রণীত জীবন (২০১০)- এ উল্লেখ করেছেন। প্রাসঙ্গিক এলাকা উপস্থাপন করা হলো :
আমি যখন কিশোর, মায়ের মুখে এরই বিপরীতে আচমকা একবার শুনেছি – আল্লা যে আছে, আমার আপদকালে বিশ্বাসও তো পাই নাই তিনি আমার পাশে!’ মর্মমূলে এখনো আমি চমকে উঠি – এই উক্তি ছিল তাঁরই ? – রক্ষণশীল মুসলিম পরিবারে জন্ম নেয়া, বড় হওয়া, এক পীরেরই পুত্রবধূ, নিয়মিত নামায-রোযা করা সেই বধূটির! […] মায়ের কথাটি নিয়ে যে অনেক ভেবেছি ও নারীর অবস্থান থেকে আপদকাল নির্ণয় করে মন্তব্যটির সততা ও বাস্তবতা বুঝে উঠতে চেয়েছি, এর প্রমাণ নিশ্চয় পাওয়া যাবে আমার কাব্যনাট্য ‘পায়ের আওয়াল পাওয়া যায়’-এ। […] গামপধানের মেয়ের […] অন্তিম উচ্চারণে আমারই মায়ের কণ্ঠস্বর হয়তো আবিষ্কার করা যাবে :
আল্লাতালার নাম যদি দয়াময়
যদি সত্যই পারেন বান্দারে নির্ভয়
যদি সত্যই সকল শক্তি তাঁর হাতে হয়।
যদি সত্যই সকল বিষ তাঁর নামে ক্ষয়।
তবে কোথায় সে দয়াময় আছিলেন, কোথায় ? কোথায় ?
সৈয়দ শামসুল হক যতগুলো মৌলিক কাব্যনাটক রচনা করেছেন, তার প্রায় সবগুলো নাটকই ছিল মঞ্চসফল। কিন্তু মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক নাটক পায়ের আওয়াজ পাওয়া যায়ের মঞ্চসফলতা ছিল শিখরস্পর্শী। কেননা সমকালীন সমরশাসনের রুদ্ধ পরিবেশে ‘পায়ের আওয়াজ পাওয়া যায় নাটকটি শুধু তাৎপর্যময় মঞ্চসাফল্য অর্জনই করেনি, এ হয়ে উঠেছে মুক্তিযুদ্ধের এক দর্পণ।

১৯৭৬ সালের ২৬ নভেম্বর এই নাটকটি প্রথম মঞ্চস্থ হয়। সে সময় বাংলাদেশের সামাজিক বাস্তবতায় এটি ছিল সাহসী মঞ্চায়ন। [..] সামাজিক অন্ধকার বুকে নিয়েও মহৎ উদ্দেশ্য ও সদিচ্ছা থাকলে বৃহৎ কাজ যে করা যায় পায়ের আওয়াজ পাওয়া যায় তারই প্রমাণ। নাটকের সমাপ্তিতে মঞ্চনির্দেশের অংশ হিসেবে একটি ব্যঞ্জনাধর্মী গুরুত্ববহ বাক্যে নাট্যকার লিখেছেন :
সবশেষে পতাকার ওপর আলো থাকে। (কাব্যনাট্যসমগ্র : ৬০)
এটির মাধ্যমে নাট্যকার দেশের সামগ্রিক বাস্তবতায় ইতিবাচক আশার কথা ব্যক্ত করতে চেয়েছেন। দীর্ঘকালের রক্তক্ষয়ী সংগ্রামের মধ্যদিয়ে অর্জিত এদেশে বিরাজিত অন্ধকারের মধ্যেও জাতীয় পতাকাই যে এদেশবাসীর আশার আলো, উজ্জ্বল ঠিকানা, এ সত্যই যেন অভিব্যঞ্জনা পেয়েছে এই উক্তিতে।
এ-নাটকে সৈয়দ শামসুল হকের মঞ্চনির্দেশনা অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। সরাসরি মঞ্চের মানুষ না হয়েও মঞ্চনাটকের ফৌশল সম্পর্কে তাঁর ছিল নিবিড় জ্ঞান। হতে পারে নাট্যকার প্রবাসকালে লন্ডনের থিয়েটার হলে অসংখ্য মঞ্চনাটক দেখার অভিজ্ঞতাকে এখানে দক্ষ হাতে কাজে লাগিয়েছেন। আবার, স্বাধীনতা-উত্তর ঢাকার মঞ্চনাটকের পুরোধা ব্যক্তিত্বদের সঙ্গে ব্যক্তিগত সম্পর্কও তাঁকে মঞ্চাভিনয় বিষয়ক অভিজ্ঞতা অর্জনে সাহায্য করেছে। নাটকের প্রারম্ভে ‘সবিনয় নিবেদন’ অংশে পায়ের আওয়াজ পাওয়া যায় নাটকের মঞ্চায়ন নিয়ে নাট্যকারের বক্তব্য উপস্থাপিত হয়েছে। তিনি বলেছেন :
আমার কল্পনায়, বর্তমান নাটকের মঞ্চ তিনদিকই কালো পর্দায় সজ্জিত। মঞ্চের মাঝখানে একটি চেয়ার; কাঁঠাল কাঠের তৈরী, বহু ব্যবহারে তৈলাক্ত এবং মসৃণ। […] নাটকের শেষভাগে যে পতাকার কথা বলা হয়েছে তার আয়তন গোটা মঞ্চ-ক্ষেত্রের এক চতুর্থাংশ হতে হবে। দর্শক সমাগমের শুরু থেকেই মঞ্চ অনাবৃত থাকবে ; স্তিমিত একটা সাধারণ আলোর ভেতরে অপেক্ষাকৃত জোরালো আলোয় চেয়ারটি উদ্ভাসিত থাকবে। নেপথ্য থেকে বাঁশি ও ঢাকের মিলিত একটা সঙ্গীত শোনা যাবে; সে সঙ্গীত হৃদস্পন্দন অথবা তালে তালে বহু পদশব্দ এগিয়ে আসবার অভিব্যক্তি। প্রতিভাবান পরিচালক উপরোক্ত যেকোনো বা সব ক’টি নির্দেশই অনুপস্থিতি গণ্য করে নিজের কল্পনা প্রয়োগের পূর্ণ স্বাধীনতা অবশ্য রাখবেন।
নাট্যপ্রযোজনার ক্ষেত্রে পরিচালককে সম্পূর্ণ স্বাধীনতা প্রদানের এই বিষয়টি তিনি যে বাস্তবে অক্ষরে অক্ষরে পালন করেছেন, তা নাট্যপরিচালক আতাউর রহমান এক স্মৃতিচারণমূলক রচনায় উল্লেখ করেছেন। তিনি বলেছেন :
পায়ের আওয়াজ পাওয়া যায় থিয়েটার নাট্যদলের যোগ্য প্রযোজনায় এবং সু-অভিনয়ের কারণে দেশে- বিদেশে সুনাম অর্জন করে। পরবর্তীকালে ‘থিয়েটার স্কুল’ এর ছাত্র-ছাত্রীরা আমার নির্দেশনায় স্কুলের বার্ষিক প্রযোজনা হিসেবে এই নাটকটি ধানমণ্ডি ২ নম্বর সড়কে অবস্থিত জার্মান কালচারাল সেন্টারের মিলনায়তনে মঞ্চায়ন করে। আমি সৈয়দ হকের সর্বাধিক নাটকের নির্দেশক হিসেবে বেশ কিছু স্বাধীনতা নিয়েছি। তিনি একজন প্রজ্ঞাবান নাট্যকারের মতো তা সানন্দে মেনে নিয়েছিলেন।
তবে পায়ের আওয়াজ পাওয়া যায়ের প্রথম মঞ্চায়নে নাট্যনির্দেশক হিসেবে কাজ করেছিলেন খ্যাতিমান নাট্যপরিচালক আবদুল্লাহ আল মামুন। ‘থিয়েটার নাট্যগোষ্ঠী প্রায় ছয় মাস মহড়ার পর ১৯৭৬-এর ২৫ নভেম্বর গৌরবোজ্জ্বল স্বাধীনতা সংগ্রামের রক্তবর্ণ আলেখ্য পায়ের আওয়াজ পাওয়া যায় মঞ্চে আনে। এর প্রথম প্রদর্শনী হয় মহিলা সমিতি মঞ্চে। এ প্রদর্শনীতে দর্শক সংখ্যা ছিল প্রায় দু’শ পঞ্চাশজন এবং টিকেটের মূল্য ছিল পাঁচ, দশ ও পনের টাকা।’ নাটকের প্রথম মঞ্চায়নের কলাকুশলীদের একটি তালিকা নিম্নে প্রদান করা হলো :
মঞ্চাভিনয় :
মাতব্বর চরিত্রে আব্দুল্লাহ আল মামুন, মাতবরের মেয়ে চরিত্রে ফেরদৌসী মজুমদার। অন্যান্য চরিত্রে ছিলেন তারিক আনাম খান, খায়রুল আলম সবুজ, ঝুনা চৌধুরী, শংকর দাস, ভাম্বর চক্রবর্তী, তোফা হাসান, রেখা আহমেদ, মুসা আহমেদ, জোবায়ের জার্জিস, নাসরীন রিয়াজ, নাসরীন লাকী, আব্দুল কাদের, সাজ্জাদ খান, হাফিজুর রহমান সুরুজ, নাহিদ রেজা রুমু, সমর দেব, রিয়াজ উদ্দীন বাদশা, আব্দুর রহীম দুলাল, আবরার মো. শাহীন, খুরশীদ আলম এবং ফরিদউদ্দীন।
আর মঞ্চের নেপথ্যে কাজ করেছেন :
নির্দেশনা :
আব্দুল্লাহ আল মামুন,
মঞ্চ :
কেরামত মাওলা,
রূপসজ্জা :
সালাম,
আবহসঙ্গীত:
আলম খান,
আলো :
তারিক আনাম খান,
কোরিওগ্রাফি :
আমির হোসেন বাবু,
প্রযোজনা :
রামেন্দু মজুমদার।
নাটকটির প্রথম প্রযোজনা দর্শক-সমালোচকের বিপুল প্রশংসা অর্জন করেছিল। বিশেষ করে নাটকের প্রধান দুটি চরিত্রের অভিনয় দর্শক-সমালোচক ছাপিয়ে সরাসরি নাট্যকারের হৃদয়তন্ত্রী নাড়া দিয়েছিল। সৈয়দ শামসুল হক পরবর্তীকালে এক আলাপচারিতায় মাতবরের মেয়ে চরিত্রে রূপদানকারী ফেরদৌসী মজুমদারকে এ প্রসঙ্গটি উল্লেখ করে বলেছিলেন :
আপনার এবং আবদুল্লাহ আল মামুনের অভিনয়ের কারণেই অন্তত এ মাধ্যমটি, কাব্যনাট্য মাধ্যমটি একটি স্থায়ী আসন করে নিতে পেরেছে।
তবে নাটকটির মঞ্চপরিবেশনা নিয়ে সমকালে যথেষ্ঠ সমালোচনা হয়েছিল। বিশেষত এ ধরনের সিরিয়াস নাটকে চটুল সংগীত ও নৃত্যের প্রয়োগ অনেকের কাছে বাহল্য ও নাটকটির পক্ষে মর্যাদাহানিকর বলে বিবেচিত হয়েছে।
‘আঞ্চলিক ভাষার যথার্থ ব্যবহারে যে নাট্যকার পারঙ্গম তা পায়ের আওয়াজ পাওয়া যায় নাটকের সমগ্র শরীর জুড়ে ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে।” তবে নাটকের সংলাপ নির্মাণের ক্ষেত্রে আঞ্চলিক ভাষার প্রয়োগ করায় প্রশংসার পাশাপাশি নাট্যকার সৈয়দ শামসুল হক সমালোচনারও শিকার হয়েছিলেন।
অনেকে মনে করেছিলেন বিশেষ একটি অঞ্চলের ভাষা দিয়ে নাট্যকার সার্বিকভাবে দেশের সকল পাঠক-দর্শকের বোধগম্যতা স্পর্শ করতে সক্ষম হবেন না। কিন্তু সৈয়দ শামসুল হক কুশলী শব্দচয়ন দক্ষতায়, আঞ্চলিক আবহ অতিক্রম করে নাটকটিকে করে তুলেছেন সর্বজনগ্রাহ্য।
নাট্যকার মফিদুল হক এ প্রসঙ্গে বলেছিলেন – ‘আমাদের কোন ক্ষমতাবান কবি কিংবা – কথাসাহিত্যিক নাটকের ফর্মের প্রতি আগ্রহ দেখালেন এই প্রথম।” বস্তুত সৈয়দ শামসুল হক নাটকের দর্শন ও শ্রাব্য উভয় গুণের কথা বিবেচনা করেই নাটকের সংলাপ উপযুক্ত অলঙ্কারময় কাব্যভাষায় রচনা করেছেন। মঞ্চনির্দেশক আতাউর রহমান নাট্যকারের ভাষাবৈশিষ্ট্য নিয়ে চমৎকার একটি বিশ্লেষণমূলক মন্তব্য করেছেন :
সৈয়দ শামসুল হক আদি ও অকৃত্রিম কাব্য ভাষাকেই প্রধানত তাঁর নাট্যভাষা হিসেবে গ্রহণ করেছেন। কাব্যে যেমন রূপালঙ্কার, সঙ্কেত, প্রতীক ও বিমূর্ততা ব্যবহার করার সুযোগ আছে, তেমনটি গদ্যভাষায় নেই। […] সৈয়দ শামসুল হক প্রথমত একজন কবি বলেই যথার্থভাবে তিনি কাব্যভাষাকেই তাঁর নাট্যভাষা হিসেবে বেছে নিয়েছেন।
নাটকে নাট্যকার গ্রামবাসীর মুখের সংলাপে যোগ করেছেন লোকজ অনুষঙ্গযুক্ত আঞ্চলিক শব্দ। এতে করে গ্রামবাসী চরিত্রগুলি আরও বাস্তব হয়ে দর্শকের সামনে উপস্থিত হয়েছে। আবার, ধর্মের ধ্বজ্জাবাহী পীরসাহেবের সংলাপে যুক্ত করেছেন লোকজ বাংলাভাষার সঙ্গে আরবি-ফারসি শব্দবহুল মিশ্রভাষা, যার মাধ্যমে ধর্মপ্রাণ মানুষের মুখের ভাষার স্বরূপ অনুধাবন করা গেছে সহজেই।

অর্থাৎ চরিত্রানুযায়ী মুখের ভাষা নির্মাণ তথা শব্দচয়নে নাট্যকার অত্যন্ত মেধার স্বাক্ষর রেখেছেন। গ্রামবাংলার পেশাজীবী মানুষের চালচিত্র উপস্থাপিত হয়েছে ভিন্ন ভিন্ন চরিত্রের সংলাপে, তাদেঁর মুখের ভাষায়। এক্ষেত্রে তাঁদের সংলাপে তাৎপর্যপূর্ণ শব্দ, অলঙ্কার- উপমার প্রয়োগ তাদের শ্রেণি-অবস্থান দর্শকের সম্মুখে সুস্পষ্ট হয়েছে। যেমন : বিপদে সাধারণ মানুষকে টিকে থাকার কৌশল বর্ণনা করতে গিয়ে মাতবর বিভিন্ন পেশাজীবীর জীবিকার্জনের কৌশলকে উদাহরণ হিসেবে ব্যবহার করেছেন। নাট্যকার অত্যন্ত দক্ষতায় এই বিষয়টি উপস্থাপন করেছেন :
খ্যাতে যে কিষাণ হাল দিয়া শস্য করে
– শস্য না দুঃখের দানা ওঠে তার ঘরে ।
গহীন গাঙে যে মাঝি জালে মাছ ধরে
– মাছ না নিজের জান বড় জালে পড়ে।
ফলবৃক্ষ যে জননী বাচ্চা কোলে করে
– বাচ্চা না মাটির দিয়া নিভা যায় ঘরে ।
যে জোলা রঙীন সুতা দিয়া নকশা ধরে
– নকশা না নিজের ভাইগ্য ভিজাচক্ষে পড়ে। (কাব্যনাট্যসমগ্র : ৩৩)
গ্রামবাসীদের মধ্যে আবার বিভিন্ন বয়সের মানুষ রয়েছে। সংলাপ রচনার সময়ে নাট্যকার চরিতের বয়স ও লৈঙ্গিক পরিচয় বিবেচনায় রেখেছেন। যেমন : পীরসাহেব ও মাতবরের সঙ্গে বয়স্কা নারীদের সংলাপে যেখানে রয়েছে সমীহ-ভাব, সেখানে যুবাদলের মুখে ব্যবহৃত হয়েছে প্রতিবাদের ভাষা। বিরূপ পরিস্থিতিতে যুবকরা যেহেতু ক্রোধে টগবগ করে ফুটছে, সেহেতু তাদের সংলাপে যুক্ত হয়েছে দ্রোহাত্মক শব্দ।
জনতার উদ্দেশে মাতবর প্রসঙ্গে তাদের সংলাপ উল্লেখ্য :
অতো কাকুতি-মিনতি ক্যান ?
তোতো-বোতো ক্যান ?
দ্যাখা যদি তিনি নাই দিতে চান
হাতে ধইরা না, পায়ে ধইরা না,
ঘাড়ে ধইরা না আন। (কাব্যনাট্যসমগ্র : ১৯)
অন্যদিকে, সাধারণ গ্রামবাসী একই প্রসঙ্গে অপেক্ষাকৃত নমনীয় ভাষায় সংলাপ উচ্চারণ করেছে :
দোহাই বাবা আসতে বলেন তারে। (কাব্যনাট্যসমগ্র : ১৮)
আবার, সমাজপতি মাতবরের মদদপুষ্ট অস্ত্রধারী পেয়াদার মুখের ভাষাও হয়ে উঠেছে ঔদ্ধত্যপূর্ণ, অসংযমী । নিজে দরিদ্র সাধারণ গ্রামবাসীর অংশ, অথচ মালিকের ক্ষমতার প্রভাবে সাধারণ জনতার জমায়েতকে সে তুলনা করেছে ছাগলের পালের সঙ্গে :
ফাঁকে যাও সব, সইরা খাড়াও
মাতবর সাবে আসতে আছেন, জায়গা দাও
ছাগলের মতো ভিড় কইরো না। (কাব্যনাট্যসমগ্র : ২০)
নাটকে পীরসাহেব চরিত্রটি আরবি-ফার্সি শব্দবহুল ভাষায় ধর্মীয় নানান কাহিনির দৃষ্টান্ত টেনে জনগণকে ধর্মনিষ্ঠ ও সংযমী হওয়ার পরামর্শ দিয়েছে। বলাবাহুল্য, পীর চরিত্রের এই ভূমিকা আরও সার্থক ও বাস্তবসম্মত মনে হয়েছে লেখকের ভাষানির্মাণ দক্ষতার অনন্যতায়।
পীর যখন জনগণের উদ্দেশে কারবালার মর্মান্তিক কাহিনি বর্ণনা করেছেন, তখন তিনি ইসলামের সত্যঘটনাকে পাশ কাটিয়ে প্রচলিত গ্রামীণ পুঁথিসাহিত্য ও মীর মশাররফ হোসেন (১৮৪৭-১৯১১) রচিত বিষাদ-সিন্ধু : উদ্ধারপর্ব (১৮৯১)-র কাল্পনিক কাহিনির আশ্রয় নিয়েছেন। কেননা, সত্য- ইতিহাস ছাপিয়ে গ্রামীণ জনগণ এরকম আবেগাত্মক শোধ প্রতিশোধের গল্পে অধিক আকর্ষণ বোধ করে। জনতার উদ্দেশ্যে তার বক্তব্য উল্লেখ্য :
একে একে খুন হইল নবীর দুলাল
প্রতিশোধ নিতে আবু হানিফা ভয়াল
তরোয়াল হাতে নিয়া সোয়ার ঘোড়ায়
মহাতেজে দুষমনের দিকে ধায়া যায় ।
হানিফার ঘোড়া ছোটে আওয়াজ ঠাঠার
হানিফার ডরে সূর্য হইল আন্ধার
এই প্রতিশোধে হবে সৃষ্টি ছারখার
জরুরি হুকুমে নামে তখন পাহাড়
পাহাড় ঘেরিয়া ধরে আবু হানিফায়
হানিফা চলার বেগ তবু না থামায়
তবুও সোয়ার আবু হানিফা ঘোড়ায়
এখনো পাহাড়ে কান দিলে শোনা যায়। (কাব্যনাট্যসমগ্র : ৩২-৩৩)
এখানে নৈপুণ্যের সঙ্গে আরবি-ফারসি শব্দের পাশাপাশি আঞ্চলিক শব্দ (তরোয়াল, ঠাঠার) ব্যবহার করেছেন তিনি। পীরের উচ্চারিত সংলাপে প্রচুর আরবি-ফার্সি শব্দ যুক্ত করেছেন তিনি; এমন কি কুরআনের আয়াতও হুবহু সংলাপে জুড়ে দিয়েছেন। যেমন পবিত্র ‘সুরা ফিল’ প্রসঙ্গে যখন আবরার বাদশাহ ও আবাবিল পাখির কাহিনি বর্ণনা করেছেন, তখন তার সংলাপে ব্যবহৃত হয়েছে মিশ্র ভাষারূপ :
আলামতারা কাইফা ফা’লা রাব্বুকা বিয়াস হা বিল ফিল।
তোমাদের মনে নাই আইসাছিল হাতির মিছিল ?
জগৎ-পালক তার পরিণাম করেন ওসিল ?
পাঠান কি নাই তিনি পাখি আবাবিল?
হাতির উপরে তারা মারে লাখো ঢিল।
চক্ষের নিমিষে শেষ, নিড়া দেওয়া খ্যাতের সামিল। (কাব্যনাট্যসমগ্র : ৩৫)
আলোচ্য সংলাপে পবিত্র কুরআন-এর আয়াত সংযুক্ত হলেও যেহেতু এটি সাধারণ গ্রামবাসীকে বোঝাবার জন্যে বলা হচ্ছে, তাই বাদশাহের হাতির পাল ধ্বংস হবার সঙ্গে কৃষকের নিড়ানি দেওয়া ফসলের খেতের তুলনা করা হয়েছে। এভাবেই সংলাপে উপযুক্ত শব্দ, উপমা, অলঙ্কার প্রয়োগের আশ্চর্য দক্ষতায় নাট্যকার বাংলাদেশের ধর্মপ্রবণ সাধারণ এক গ্রাম ও গ্রামবাসীর বাস্তব চিত্র অংকন করতে সক্ষম হয়েছেন।
তবে পায়ের আওয়াজ পাওয়া যায়-এর ভাষাশৈলী অধিক শিল্পসার্থক ও বাস্তবানুগ হয়ে উঠেছে নাট্যকারের অলংকার নির্মাণ ও প্রবাদ-প্রবচন চয়নের দক্ষতায়। অভিনেত্রী ফেরদৌসী মজুমদার নাট্যকারের উপমা চয়নের নান্দনিকতায় মুগ্ধ হয়ে তাঁকে অভিষিক্ত করেছেন ‘উপমার রাজা’ অভিধায়। স্মৃতিচারণমূলক এক লেখনীতে তিনি বলেন :
আমার সৌভাগ্য আমি তাঁর বিখ্যাত কাব্যনাট্য ‘পায়ের আওয়াজ পাওয়া যায়’তে মুখ্য নারী চরিত্র মাতবরের মেয়ের ভূমিকায় অভিনয় করেছি, যেটা এখন আমার মেয়ে ত্রপা করছে। চরিত্রটা বুঝতেই আমার অনেক সময় লেগেছিল। কী অসাধারণ উপমা : ‘হঠাৎ আছাড় দিয়া আসমানে দেখা দিল চান, এক ফালি কদুর লাহান।’ লাউর ফালির মত চাঁদ হতে পারে একমাত্র তাঁরই উপলব্ধি। […] আমি বেশি অভিভূত ও আবেগতাড়িত হই,
সংলাপে তাঁর উপমার ব্যবহার দেখে। মাতবরের মেয়ে যখন বলে, – ‘আমার কী আছে / গ্যাছে সুখ / য্যান কেউ / নিয়ে গ্যাছে গাভীনের বাটে যতটুকু / দুধ আছে নিষ্ঠুর দোহন দিয়া।’ উপমার রাজা তিনি। এই একটা সংলাপেই, মেয়েটির বুক খালি করা আর্তনাদ, যেন দর্শকশ্রোতার মনেও সমবেদনার সৃষ্টি করে, চোখকে সিক্ত করে দেয়। এ সংলাপ এমন করে, গভীর ভাবে উপলব্ধি করে লেখা সম্ভব হয়েছে এ অসাধারণ কবি প্রতিভা সৈয়দ শামসুল হকের পক্ষেই। বোঝা যায় তাঁর গ্রামীণ পরিবেশের সঙ্গে আত্মিক যোগাযোগ ছিল, যেমন ছিল গভীর এবং প্রত্যক্ষ পর্যবেক্ষণ শক্তি।’
বস্তুত লেখকের প্রতিটি উপমা প্রয়োগ এমনি শিল্পিত, বুদ্ধিদীপ্ত ও ইঙ্গিতপূর্ণ। এ-নাটকে উপমার প্রয়োগ ঘটেছে চরিত্র ও ঘটনানুযায়ী। গ্রামবাসীর অসহায়ত্ব নাট্যকার বুঝিয়েছেন ‘মহররমের ধূলা,’ ‘যমুনার বানা প্রভৃতি উপমান ব্যবহার করে; অন্যদিকে পীরসাহেবের সংলাপে মাতবর প্রসঙ্গ উপস্থাপিত হয়েছে ক্ষমতাধর, শোষক, ‘বড়গাছের ডাল’, ‘যমুনার বোয়াল’, ‘শকুনের বাপ’, ‘আজদাহা সাপ’ প্রভৃতি উপমানের মাধ্যমে। যেমন :
পীর। ঝড়ের খবর আগে পায় বড়গাছের ডাল বানের খবর আগে পায় যমুনার বোয়াল খরার খবর পয়লা জানে ছিলা-শকুনের বাপ আর, জারের খবর পয়লা জানে আজদাহা সাপ সে না আইসা কি পারে ? (কাব্যনাট্যসমগ্র : ১৮ ) আবার, মাতবর সম্পর্কে অন্যত্র পীরের উচ্চারণ :
সে তো কয় নাই
খোড়লে সানধাই
শিয়ালের মতো পলাইয়া যাই
নিজের গেরাম থিকা। (কাব্যনাট্যসমগ্র : ১৯)
এখানে যুদ্ধের শেষদিকের প্রেক্ষাপটে অন্যায়কারী মাতবরের অন্তর্ধানকে ভীত ও ধূর্ত শিয়ালের গর্তে আত্মগোপনের সঙ্গে তুলনা করা হয়েছে। আবার, বন্যাপ্রধান বাংলাদেশের সমাজচিত্র ও কুসংসকারাচ্ছন্নতার চিত্র স্পষ্ট হয়েছে নিম্নোক্ত উপমা দ্বারা :
যখন উঠছে খলখলাইয়া যমুনা
জ্বিনে ধরা যুবতীর লম্বা কালা ক্যাশর লাহান
চৈত্রের ঝড়ের ঝুটি ধইরা দিছে টান। (কাব্যনাট্যসমগ্র : ২২)
যুদ্ধের বাজারে সাধারণ মানুষের অবস্থা বোঝাতে ব্যবহার করেছেন দারুণ একটি উপমা, যেটির মধ্যে চিত্রিত
হয়েছে সেকালের মোল্লা-নির্ভর সমাজব্যবস্থা :
আকাট মোল্লার হাতে আধাজবেহ গরুর মতন
মানুষের হালৎ এখন। (কাব্যনাট্যসমগ্র: ২৩ )
যুদ্ধের শেষপর্যায়ে হানাদার বাহিনী এবং তাদের এদেশীয় দোসরদের ভয়বোধকে লেখক নিম্নোক্ত উপমার
মাধ্যমে প্রকাশ করেছেন :
মাতব্বর। (স্বগত) আসলে, ডর লাগছে, ডর পাইছে,
ভর ধরছে, ডর
চিকন সাপের মতো ডর ঢুকছে বেহুলার লোহার বাসর। (কাব্যনাট্যসমগ্র : ২৩ )

এখানে মধ্যযুগের মঙ্গলসাহিত্যের অন্যতম জনপ্রিয় লোকপুরাণ বেহুলা-লখিন্দরের কাহিনি উল্লেখ করা হয়েছে। চাঁদ সওদাগর যেমন সর্বোচ্চ চেষ্টা ও সতর্কতা অবলম্বন করেও তার প্রাণপ্রিয় সন্তান লখিন্দরের লৌহনির্মিত বাসরঘরে ঘাতক সর্পের প্রবেশ বন্ধ করতে পারেনি, তেমনি স্বাধীনতাবিরোধী অপরাধী শ্রেণির অজান্তেই মনের মাঝে ঢুকে গেছে ভয়। এরকম আরও কিছু সার্থক ও শিল্পিত উপমার উদাহরণ নিম্নে দেয়া হলো :
ক) কুলনষ্ট মেয়েছেলে কুত্তাচাটা থালার সমান। (কাব্যনাট্যসমগ্র : ৫৬)
খ) সে ক্যান ফালায়া গেল আমার জীবন
হঠাৎ খাটাশে খাওয়া হাসের মতন। (কাব্যনাট্যসমগ্র : ৪৫)
আলোচ্য নাটকে একাধিক স্থানে উৎপ্রেক্ষার তাৎপর্যপূর্ণ প্রয়োগ রয়েছে। যেমন :
সেই ফুল সেই ফল মানুষের মেলা
সন্ধ্যার আগেই য্যান ভরা সন্ধ্যাবেলা। (কাব্যনাট্যসমগ্র :১৭ )
যুদ্ধের প্রেক্ষাপটে জাতির বুকে আকস্মিক নেমে এসেছে অকাল সন্ধ্যার ধূসর অন্ধকার, এটি উপস্থাপনের প্রয়োজনে তিনি উপর্যুক্ত উৎপ্রেক্ষা অলংকার ব্যবহার করেছেন। এরকম আরও কিছু শিল্পসার্থক, নান্দনিক উৎপ্রেক্ষার উদাহরণ নিম্নে দেয়া হলো :
ক) কবর খোঁড়ার আওয়াজ উঠাইছে য্যান কামানের তোপ। (কাব্যনাট্যসমগ্র: ২৪)
খ) য্যান একটা ছোঁ মারলো আচাভুয়া পাখি
সোনার দালান খইসা ঝরে কাদামাটি। (কাব্যনাট্যসমগ্র: ২২)
গ) ডরাইন্যার দিল
দেখতে না দেখতেই য্যান ঝুরঝুরা পুরাণ দলিল। (কাব্যনাট্যসমগ্র: ২৫)
ঘ) গ্যাছে সুখ
য্যান কেউ নিয়া গ্যাছে গাভীনের বাঁটে যতটুকু
দুধ আছে নিষ্ঠুর দোহন দিয়া। (কাব্যনাট্যসমগ্র: ৫৫)
ঙ) গরীব গেরস্ত ঘরে য্যান এক নতুন পোয়াতি
বিরাট আন্ধারে শোয়া, নিভা গেছে বাতি। ( কাব্যনাট্যসমগ্র: ২১)
সমাসোক্তি :
ক) মরা খ্যাতের লু-হাওয়া কয়, কোথায় হানিফা ?
খরা যমুনার পানি কয়, কোথায় হানিফা ? (কাব্যনাট্যসমগ্র : ৩৩)
খ) যখন আসল সত্য ওঠে লাফ দিয়া
তখন দুনিয়া
আচানক মনে হয় সোনার শিকল কাটা পাখির লাহান। (কাব্যনাট্যসমগ্র : ৫৫)
রূপক/প্ৰতীক :
মিলিটারির অনৈতিক উদ্ধত আক্রমণে বিধ্বস্ত বাঙালির করুণ ছবি প্রকাশিত হয়েছে নিম্নোক্ত লোকায়ত প্রতীকের মাধ্যমে। বসন্তে ধরা কচি আমের মুকুল যেমন বৈশাখের আকস্মিক শিলাবৃষ্টির আক্রমণে ঝরে পরে, তেমনি করুণ দশা ১৯৭১ সালের যুদ্ধবিধ্বস্ত বাঙালি জাতির। যেনো সুশোভিত পুষ্পবৃক্ষ থেকে বিচ্যুত হয়েছে গোটাসমেত ফুল :
আমগাছে আম নাই শিলে পড়ছে সব
ফুল গাছে ফুল নাই গোটা ঝরছে সব। (কাব্যনাট্যসমগ্র :১৭ )
আলোচ্য নাটকে ব্যবহৃত আরও কিছু রূপক প্রতীকের দৃষ্টান্ত নিম্নে উপস্থাপন করা হলো :
ক) রাগ হইল একখান আর্শীর উপর
এক পরদা ধূলার আস্তর
না মুছলে জিলকি তার অবিলম্বে লয়। (কাব্যনাট্যসমগ্র : ২৩)
খ) বুদ্ধিমান নাড়ায় না ডাল যে ডালে নিজেই বসা,
পয়সার দাম নাই যে পয়সা ঘষা। (কাব্যনাট্যসমধু : ৩৪)

প্রবাদ / প্রবাদপ্রতিম বাক্য :
১৯৭১ সালে সম্পূর্ণ স্রোতের বিপরীতে গিয়ে মুক্তিবাহিনীর জয় ছিলো আকস্মিক, অবিশ্বাস্য। প্রশিক্ষিত সামরিক বাহিনীর সমরাস্ত্রের সামনে সাধারণ জনগণের যুদ্ধ ছিলো বিস্ময়কর। তেমনি রাজাকারদের ঘৃণ্য পরিণতি ছিল তাদের কুকর্মের ফল। লেখক এইবিষয়টিকে উপস্থাপন করেছেন পীরের মুখের কিছু দার্শনিক সংলাপের মাধ্যমে। গ্রাম্য পীরের দর্শনতত্ত্বে লোকজ প্রবাদ প্রবচনের প্রয়োগ অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক :
পীর। আম পুতলে চিরকাল আম
হইয়াছে, জাম পুতলে জাম।
পানির উপর দিয়া
খালি পায়ে মানুষ না গিয়া
চিরকাল খোঁজ করছে নাও।
ভিতরে ভেদের কথা যদি শুনতে চাও
সময়ে দুই একজন পার হয়া যায় খালি পায়।
সময়ে ফলের গাছে অতি মিষ্টফল
না ধইরা ধরে কর্মফল। (কাব্যনাট্যসমগ্র : ২৩)
সংলাপে ব্যবহৃত আরও কিছু প্রবাদ-প্রবচন, প্রবাদপ্রতীম বাক্যের দৃষ্টান্ত নিম্নে উপস্থাপন করা হলো :
ক) ডর হইল ডংকার লাহান
একবার বাড়ি দিলে যায় না থামান। (কাব্যনাট্যসমগ্র : ২৫)
ঘ) যেমন জাইলার জালে পড়ে চিতবোয়াল
মানুষ ধরতে চায় গুজবের জাল। (কাব্যনাট্যসমগ্র : ৩৮)
ঙ) ঝড়ের খবর আগে পায় বড় গাছের ডাল
বানের খবর আগে পায় যমুনার বোয়াল। (কাব্যনাট্যসমগ্র : ১৮)
চ) অন্যে করে ঠুকঠাক, কামারের একখান বাড়ি। (কাব্যনাট্যসমগ্র : ৩৯)
বস্তুত, সৈয়দ শামসুল হক তাঁর অসাধারণ সৃজনী প্রতিভার স্বাক্ষর রেখে নান্দনিক সব অলঙ্কার, প্রতীক, প্রবচনের ব্যঞ্জনায় পায়ের আওয়াজ পাওয়া যায় নাটকটিকে নিয়ে গেছেন অনন্য উচ্চতায়। ‘গ্রামীণ ও দেশজ চিত্রকল্প, উপমা, রূপক ও আঞ্চলিক ভাষার সুনিপুণ ব্যবহারে এবং সমিল অমিত্রাক্ষর ছন্দের বন্ধনে এ কাব্যনাটক অনবদ্য।
অসাধারণ সংলাপ, ভাষার গীতময়তা ও নাটকীয় পরিবেশ সব মিলিয়ে এ নাটক আমাদের সাহিত্যে মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক একটি শ্রেষ্ঠ শিল্পকর্ম। মুক্তিযুদ্ধের চেতনা বিকাশে এবং স্বাধীনতা বিরোধী ঘৃণ্য দালালদের বিরুদ্ধে প্রতিবাদী চেতনা সঞ্চারে এ কাব্যনাটক প্রজন্ম থেকে প্রজন্ম এক বলিষ্ঠ ভূমিকা পালন করবে নিঃসন্দেহে।” এ কথা বললে অত্যুক্তি হবে না যে, সমগ্র বাংলাসাহিত্যে সৈয়দ শামসুল হকের পায়ের আওয়াজ পাওয়া যায় একটি শিল্পঋদ্ধ কাব্যনাটক হিসেবে বিশেষ স্থান দখল করে আছে।