আজকে আমাদের আলোচনার বিষয়: পাপের সন্তান । এটি বাংলাদেশের উপন্যাসের শৈলীবিচার এর মিথ ইতিহাস ঐতিহ্যের নবমূল্যায়নধর্মী নতুন শিল্পশৈলীর উপন্যাস এর অন্তর্গত।

পাপের সন্তান
সত্যেন সেন (১৯০৭-১৯৮১) বাংলাদেশের উপন্যাসসাহিত্যে আবির্ভূত হন ব্যক্তিগত জীবনের সুদীর্ঘ রাজনৈতিক অভিজ্ঞতা নিয়ে, বয়সের তুলনায় অনেক দেরিতেই তিনি উপন্যাস রচনা শুরু করেন। তাঁর উপন্যাস সচেতন প্রজ্ঞার ফসল। সামাজিক ও রাজনৈতিক ইতিহাস, মানবিকবোধ, ভীষ্মজীবন চেতনা তাঁর উপন্যাসের অন্যতম বৈশষ্ট্য। মানব সভ্যতার ইতিহাসের দিকে তাকিয়ে ছিলেন তিনি একজন সমাজ বিজ্ঞানীর দৃষ্টিতে।
ওল্ড টেস্টামেন্ট-এর ‘বুক অব দ্য প্রফেট যেরেমিয়া খন্ড-এর উপাদান নিয়ে তিনি রচনা করেন দুটি উচ্চাকাঙ্ক্ষী উপন্যাস ‘অভিশপ্ত নগরী’ (১৯৬৭) এবং ‘পাপের সন্তান’ (১৯৬৯)। দু’টি উপন্যাসের পটভূমি জেরুশালেম এবং বাইবেলে বর্ণিত মিথ কাহিনীকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠলেও দু’টি উপন্যাসেই মূলত একটি দেশ, একটি জাতির উত্থান-পতনের ইতিহাস বর্ণিত হয়েছে।
পাপের সন্তান-কে বলা যায়। অভিশপ্ত নগরীর দ্বিতীয় খন্ড। দু’টি উপন্যাসের ঘটনাকালের ব্যবধান অর্ধশতাব্দীর একটু বেশি। ‘অভিশপ্ত নগরী’র ভাববস্তু, জীবনকল্পনা ও চরিত্রভাবনা ‘পাপের সস্তান’ উপন্যাসে পরিপূর্ণতা লাভ করেছে। সময়প্রবাহ, ঘটনাপ্রবাহ ও চরিত্র প্রবাহের ধারাবাহিকতা দু’টি উপন্যাসকে গ্রথিত করেছে অভিন্ন সূত্রে।” “অভিশপ্ত নগরী-তে সমষ্টিচেতনার গুরুত্ব ও ঐশীবিধানের অনিবার্যতা ধ্বনিত হলেও ‘পাপের সন্তান’। উপন্যাসে বর্ণিত হয়েছে ব্যক্তির মানবীয় চেতনার উত্তরণ।
‘পাপের সন্তান’ উপন্যাসের প্লটগঠন, চরিত্রচিত্রণ, ঘটনাবিন্যাস, ভাষাশৈলী বাইবেলীয় ক্লাসিক দৃষ্টিতে বিন্যস্ত : The “Plot” of the Bible might be visualized as not merely horizontal line from the beginning to the end of historical time, but also, just above such a time, a grodually rising one leading in time from mankind’s expulsion form the earthly paradise to his reunion with God in the celestial one.”

‘পাপের সন্তান’-এর পটভূমি, কাহিনী ও চরিত্র জেরুশালেম থেকে শুরু হয়ে মিশরের নীলনদ পর্যন্ত প্রসারিত হওয়ায় প্লটবিন্যাস অনেকাংশে আনুভূমিক সমাজ দ্বন্দ্ব তথা শ্ৰেণী সংঘাত, ধর্মীয় বিধানের সঙ্গে মানবীয় আবেগের সংঘাত ‘পাপের সন্তান’ উপন্যাসে ঘটনাংশে সমান্তরালভাবে বিস্তৃত।
মিকা এবং শব্দরার জীবন যেন নিয়তি নির্ধারিত, তাদের জীবনে একই সঙ্গে উপস্থিত হয় সমাজদ্বন্দ্ব। ধর্মাদেশের সঙ্গে মানবীয় আবেগের বিরোধ তাদের জীবনকে করে তোলে ট্রাজেডীময়। যদিও পরিণামে স্ব-ভূমি ছেড়ে দূরে যেতে হয় এবং মানবীয় চেতনায় তাদের আত্মমীমাংসা ঘটে। অর্থাৎ ঔপন্যাসিক ধর্মনিরপেক্ষ এক মানবিক বোধের উজ্জ্বীবন ঘটিয়ে উপন্যাসের রসনিম্পতি সাধন করেন।
বাবিলরাজ নেবুকাढনাজারের ক্যালদীয় সৈন্যদের আক্রমণে বিরুশালেম ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয় এবং যিরুশালেম অধিবাসী যিহুনীদের অনেককে হাতে পায়ে বেড়ি দিয়ে নিয়ে যাই দাস হিসেবে। এই বিহুনী দাসদের কোনো সামাজিক মর্যাদা ছিলোনা এবং তাদে উপর চালাতো অমানবিক নির্যাতন। এমনকি য়িহুদী মেয়েদের উপর চালাতো জোরপূর্বক বলৎকার। অত্যাচারিত য়িহুদীরা এই নিপীড়ন থেকে বাচার জন্য নানা প্রকারে সাহায্যের আবেদন করতো –
পার নারাজার কাছে। প্রায় অর্ধশতাব্দীর পর পারসিকদের আক্রমণে মহাপার ক্রশীল বাবিল সাম্রাজ্যের পতন ঘটে এবং বাবিল সাম্রাজ্যভুক্ত এলাকা পারস্য সম্রাজ্যের অধিভুক্ত হয়। পারস্য রাজের য়িহুদী পানপাত্রবাহক নেহেমিয়া যেরুশালেমের তীরশথ বা শাসনকর্তা নিযুক্ত হন। নেহেমিয়া এবং পারস্য রাজকর্মচারীদের নেতৃত্বে প্রতিবেশী জাতির প্রবল বাধা অতিক্রম করে গড়ে তোলে যিরুশালেম ।
“ইহুদী জনসাধারণের প্রাণপাত প্রচেষ্টার ফলে নতুন যিরুশালেম গড়ে উঠল বটে, কিন্তু ‘মর্মোম্মাদ ইহুদী সমাজপতিদের ধর্মের গোঁড়ামি, কঠিন রক্ষণশীল মনোভাব ও তীব্র পরজাতিবিদ্বেষ সমাজকে এক আত্মধ্বংসী আবর্তের দিকে ঠেলে নিয়ে চলল। শাস্ত্রীয় বিধান মানবিকতাকে গ্রাস করে চলল- ধর্মীয় অন্ধতার বেদী মুলে নিষ্পাপ নিষ্কলঙ্ক ‘পাপের সন্তানদের’ বলি হতে লাগল।
দুর্ভাগা ইহুদী সমাজকে এজন্য ভবিষ্যতে বড় কঠিন মূল্য দিতে হয়েছিল ইতিহাস তার সাক্ষী । ” নারগেল শারেজের যুবক মিকা, ছোটবেলা থেকেই সে বাবিলদের মতো লেখাপড়ায়, পোষাকে, সামাজিক মর্যাদায় বড় হয়েছে। দীর্ঘদিন বাবিলের পরিবেশে থেকে লেখা পড়া শিখে মানুষ হয় এবং গৃহস্বামীর মেয়ে শদরাকে ভালোবাসে, শদরাও প্রাণের আবেগে মিকার দিকে এগিয়ে আসে।
একটি য়িহুদী মেয়েকে একয়েকটি বাবিল যুবক ধর্ষণ করলে মিকা তার প্রতিবাদ করে কিন্তু এজন্য সে ঐ যুবকদের হাতে লঞ্ছিত হয়। মেয়েটির বাবাকে মিকা নিজের সত্য পরিচয় দেয় সে আসলে একজন দাসপুত্র। মিকার মুখে বাবিলদের ভাষা, পোষাক থাকার কারণে মেয়েটির বৃদ্ধবাবা তাকে ভৎর্সনা করে, তখন মিকার মধ্যে স্বাজাত্যবোধ ও আত্মপরিচয়ের চেতনা উদ্দীপ্ত হয়।
মিকা, য়িহুদী জাতির সেবা করাকে নিজের পবিত্রতম কর্তব্য মনে করে এবং সিদ্ধান্ত নেয় থ্রিরুশালের ফিরে যাওয়ার। মিকা যিরুশালেম যেতে চাইলে প্রেমিকা শদরা তাকে একা যেতে দিতে চায় না, নিজেও ছদ্মবেশে মিকার সঙ্গী হয়। পথে মাঠের মধ্যে আকস্মিকভাবে শাসনকর্তা নেহেমিয়ার সঙ্গের মিকা-শব্দরা পরিচয় ঘটে। যিরুশালেম পৌঁছে মিকার স্বপ্নভঙ্গ হয় এতদিন মিকা মনে মনে যিরুশালেমের যে ছবি কল্পনা করেছে বাস্তবে প্রবেশ করে সে হতাশ হয়। শব্দরাও বুঝতে পারে ক্যালদীয় বলে য়িহুদীদের মধ্যে তার স্থান নেই।
বিভিন্ন স্থান থেকে ফিরে আসা গরীব উদ্বাস্তু য়িহুদীরা দরিদ্র পল্লীতে স্থান নিয়েছে, নেহেমিয়ার আদেশ অনুসারে মিকা এই পল্লীতেই সাধারণ য়িহুদীদের প্রাচীর নির্মাণের জন্য একত্রিত করে। প্রাচীর নির্মাণে অভিজাত য়িহুদীদের বাধা সত্ত্বেও শেষ পর্যন্ত নানা প্রতিকূলতা অতিক্রম করে প্রাচীর তৈরী শেষ হয়। বাবিল থেকে আসা য়িহুদীদের প্রথম দলের ধর্মীয় প্রধান আচার্য ইষ্রা। আচার্য ইষ্রা ধর্মীয় দৃষ্টি দিয়ে যিরুশালেমকে গড়ে তুলতে চান, তাকে সাধারণ য়িহুদীরা সর্বোতভাবে সমর্থন জানায়।

আচার্য ইষ্রা যিহোবার নামে য়িহুদী সমাজকে রক্তের বিশুদ্ধতা রক্ষা করতে আদেশ প্রচার করেন যে, যে-সব য়িহুদীদের ঘরে ভিন্ন জাতীয় মেয়েরা বধূ হয়ে আছে, তাদেরকে গর্ভজাত সন্তানসহ পরিত্যাগ করতে হবে। নেহেমিয়ার দক্ষিণ হস্ত মিকার বন্ধু হানানি এর প্রতিবাদ করে সভার মধ্যে নিজের স্ত্রীর পরিচয় তুলে ধরে। যিহোবার নামে প্রচারিত আচার্য ইস্ত্রার আদেশে মানবিকতা পদদলিত হয়, অসংখ্য য়িহুদী পরিবারে শোকের ছায়া নামে। মিকা যিহোবার পূজারী হয়েও আদেশ মেনে নিতে পারে না।
ধর্মের নামে আচার্য ইয়ার আদেশে য়িহুদীদের সংহতি নষ্ট হয়ে যায়, চারপাশের অন্য ধর্মাবলম্বি জাতিগুলিরও শত্রু হয়ে পড়ে য়িহুদীরা। শদরা জল আনতে গিয়ে অন্যদের হাতে অপমাণিত হয়, হানানির ছেলেমেয়েদের পাড়ার ছেলেরা চিলছুঁড়ে মারে ‘পাপের সস্তান’ বলে গালি দেয়। নেহেমিয়া বুঝতে পারে আচার্য ইষ্রার মাধ্যমে অর্থনীয় দাস টোবিয়ার চক্রান্ত সফল হতে চলছে।
পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের ক্ষমতা তার হাতের বাইরের চলে গেছে। মিকার মনে বারবার প্রশ্ন জাগে এই যিরুশালেমের স্বপ্নে বিভোর হয়েই কি সে বাবিল ছেড়ে এসেছে ? এর মধ্যে নারগেল শারেজের খোলা চিঠি আচার্য ইয়ার কাছে আসে। যাতে পে আছে মিকা নারগেল দাসীর পুত্র অর্থাৎ মিকা ও শব্দরা একই পিতার সন্তান। নেহেমিয়া, মিকাকে জানিয়ে দেয়, রাতের মধ্যে যিরুশালেম থেকে পালিয়ে যেতে। নইলে আচার্য ইষ্রা তাদের প্রাণদন্ড দেবে। মিকা ও শব্দরা পালায় না। পরদিন বিচার সভায় নেহেমিয়ার সাহয্যে প্রাণদন্ড থেকে তারা রক্ষা পেলেও তাদের যিরুশালেম থাকার অধ্যি কেড়ে নেয়া হয়।
নেহেমিয়া ও হানানি তাদেরকে যিরুশালেমের শেষ সীমানা পর্যন্ত এগিয়ে দিয়ে যায়। মিকা ও শব্দরা এসমসয় মিশরের নীলনদের তীরে এসে উপনীত হয়। তাদের দুজনের মনেও নানা প্রশ্ন, দ্বিধা, দ্বন্দ্ব। তারা দুজনই একই পিতার ঔরশজাত সন্তান কিন্তু তারা প্রেমের এক মানবীয় বন্ধনে আবদ্ধ। শাদরা গর্ভেই রয়েছে মিকার অনাগত সন্তান, তাদের ভালোবাসার ফসল। পিতা নারগেল শারেজের দেয়া নতুন পরিচয় এবং তাদের এই সম্পর্ককে সে মেনে নিতে পারেনা। আত্মজিজ্ঞাসা তাকে আত্মমীমাংসার পথে নিয়ে যায় :
আমার মন সুস্থ হয়ে উঠল, সাহসী হয়ে উঠল। ভাবলাম, নিষ্পাপ আমরা, নিষ্কলঙ্ক আমরা, আমরা কেন ওদের কাছে মাথা করে থাকবো ? কে, কবে, তার অসংযত প্রবৃত্তি চরিতার্থ করার ফলে এক সন্তানের জন্ম দিয়েছিলে- তার দায়-দায়িত্ব কি আমাদের বরে নিয়ে চলতে হবে। বাইরের লোকের কাছে যাই হই না কেন, আজ আমার নিজের মনের কোনই গ্লানি নেই। ৩
মিকা ও শব্দরার এই আত্মমীমাংসার মধ্য দিয়ে উপন্যাসের পরিসমাপ্তি ঘটে এবং তারা ধর্মবিশ্বাসের সংকীর্ণতা থেকে মুক্তিলাভ করে প্রেম ও মানবীয় চেতনায় উজ্জীবিত হয় তারা।
“পাপের সন্তান’ উপন্যাসের চরিত্র চিত্রণে ঔপন্যাসিকের দৃষ্টিকোণ, জীবনবোধ, সময় ও সভ্যতার বিবর্তনশীল চেতনা, মানবীয় অস্তিত্বসংগ্রামে বহুমাত্রিক জিজ্ঞাসা নবতর তাৎপর্যে অভিষিক্ত। মিথের উপদানে সঞ্চিত জীবনসংবেদকে বিশ্বমানবিকতা বোধে দীপান্বিত করেছেন ঔপন্যাসিক বস্তুবাদী দর্শনের আলোকে। বাবিলরাজ নেবুকাডনাজার কেবল বিরুশালেমকে ধ্বংসস্তূপেই পরিণত করেনি, নগরীর য়িহুদীদের বাবিলে নির্বাসিত করে দাসত্বের শৃঙ্খলে আবদ্ধ করেন। নির্বাসিত য়িহুদীদের সঙ্গে ক্যালনীয়দের রক্ত সম্পর্কর গড়ে ওঠে।

‘পাপের সন্তান’ উপন্যাসের নয়ক চরিত্র মিকা বাবিলের জন্মজাত য়িহুদীর একজন। ক্রীতদাস হলেও সে অন্যান্য ক্রীতদাসের মত গ্লানিময় জীবন থেকে মুক্ত। প্রভু নারগেল সারজের স্নেহের আশ্রয়ে এবং প্রভুর কন্যা শব্দবার প্রণয় স্পর্শ তার দাসজীকে করেছে আনন্দময়। একটি য়িহুদী ধর্ষনের ঘটনায় প্রতিবাদ করতে গিয়ে তার জীবন অন্যরকম হয়ে যায়।
স্বজাত্যবোধ ও আত্মপরিচয়ে উজ্জীবীত মিকা উপলব্ধি করে- ‘আমার জীবনের সবচেয়ে বড় কথা এই যে, আমি একজন য়িহুদী, এই বোধ-চেতনা থেকেই সে মূল্যবান পোষাক, স্বাচ্ছন্দ্যের জীবন তুচ্ছ করে বাবিল ত্যাগের সিদ্ধান্ত নেয়। যিরুশালেম যাত্রাকালে প্রেমিকশদরাও তার সঙ্গী হয় কিন্তু যিরুশালেম এসে তার স্বপ্নভগ্ন হয়। যিরুশালেম এসে মিকা গরীব য়িহুদীদের দুঃখ লাগবে প্রাচীর নির্মাণে সঙ্গে হয়।
স্বাজাত্য বোধ-চেতনা মিকার মধ্যে ক্রমশ জেগে ওঠে নিজের শ্রেণী ভাবনা ও শ্রেণী সংগ্রামের আদর্শ। নিজের জন্ম পরিচয় উদ্ঘাটিত হওয়ার পর বিচার সভার সামনে দাঁড়িয়ে নিশ্চিত মৃত্যুদণ্ডের কথা জেনেও মিকা যিরুশালেম ছেড়ে পালাতে চায়নি। যিরুশালেম ও যিহুদী সমাজ নিয়ে তার মনে ছিলো স্বপ্ন। নারগেল সারেক্সরে চিঠি পাওয়ার পর তার আত্মদ্বন্দ্ব ও সমাজদ্বন্দ্বময় জীবনের সংগ্রাম আরও তীব্রতর হয়।
যদিও ধর্মের অমোঘ বিধান ও আত্মপরিচয়ের গ্লাণিকর পরিস্থিতি তাকে যিরুশালেম ত্যাগ করতে বাধ্য করে শেষ পর্যন্ত। মিকা চরিত্রটি কর্মে উদ্দীপনায়, সংযমের প্রতিশ্রুতিতে, মানবতা ও ভালোবাসায় যেমন উজ্জ্বল হয়ে উঠেছে, তেমনি ধর্মীয় বিধানের বিরুদ্ধে মানসিক দ্বন্দ্ব, শ্ৰেণীদ্বন্দ্ব, সর্বোপরি পিতৃপরিচয়ের আত্মদ্বন্দ্বে এ চরিত্রটি বহুমাত্রিকতা লাভ করেছে।
মিকা চরিত্রের বৈশিষ্ট্য ও পটভূমির সঙ্গে বিভাগ (১৯৪৭) উত্তর বাঙালি মুসলামানের আইডেনটিটি ক্রাইসিসের একটি মিল খুঁজে পাওয়া যায়। ১৯৪০ সালে লাহোর প্রস্তাবের পর বাঙালি মুসলমান পাকিস্তান আন্দোলনে ঐক্যবদ্ধ হয়েছিল এই জন্য যে, দেশ বিভাগের পর সংখ্যা গরিষ্ট মুসলামানদের নিয়ে পাকিস্তান গঠিত হলে তাদের স্বপ্ন পুরণ হবে। কিন্তু বিভাগোত্তর কালে রাষ্ট্রভাষা প্রশ্নে তাদের মধ্যে আত্মপরিচয়ের সংকট সৃষ্টি হয়।
বায়ান্ন ভাষা আন্দোলনের রক্তাক্ত অভিজ্ঞতার মধ্যদিয়ে তারা উপলব্ধি করে যে, তারা শুধু মুসলমান নয় একই সঙ্গে বাঙালিও এবং ধর্মনিরপেক্ষ চেতনা তাদের মধ্যে নতুনভাবে মূল্য পেতে থাকে। ‘পাপের সন্তান’ উপন্যাসের মিকা চরিত্রের সঙ্গে সমকালীন বাঙালির আত্মপরিচয় সংকট, শ্রেণীয়র ও রাজনৈতিক সচেতনতাকে সমন্বিত করার মধ্যে ঔপন্যাসিক সত্যেন সেনের প্রজ্ঞাময় পরিচয় স্পষ্ট হয়।
শব্দরা চরিত্রটি উপন্যাসের বড় অংশজুড়ে থাকলেও মিকার মতো ততো বৈশিষ্ট্যপূর্ণ নয়। তার সংগ্রাম মূলত প্রেম ও মানবিকতার সংগ্রাম। সুদূর অতীতকাল থেকে যেসব নারী ভালোবাসার পথে, সুখ-ঐশ্বর্যকে ত্যাগ করে প্রেমাস্পদের হাত ধরে পথে নেমেছে, শদরা সেই নরীদেরই প্রতিমূর্তি।
বাবিলে পিতার গৃহে অবস্থানকালে শদরা ছিল সাধারণ নারী, প্রেমের কারণে, বাবিল শহর ও ঐশ্বর্যশালী পিতার আশ্রয় ত্যাগ করে প্রেমিক মিকার সঙ্গের যিরুশালেমের মন্দিরে, য়িহুদী বেষ্টিত সমাজে, প্রাচীর গড়ার কাজে অগ্রহণে তার উপস্থিতি আমরা কেবল প্রেমিক শব্দরাকেই দেখি না, আত্মর্যাদাসম্পন্ন, স্থির সংকল্পময়ী এক প্রতিমূর্তি হিসেবেও আমরা তাকে দেখি। শব্দরার মত একটি প্রেমময়ী নারী পাশে ছিলো বলেই মিকার সংগ্রাম মানবীয় চেতনায় উন্নীত হয়েছে।
উপন্যাসে অন্য যে চরিত্রগুলো গুরুত্বপূর্ণ তাদের মধ্যে তীরশথ বা শাসনকর্তা নেহেমিয়ার চরিত্র উজ্জ্বল। একজন পানপাত্রবাহক থেকে সে একটা জাতির নেতার পরিণত হয়েছে এবং জাতি গঠনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে। যিরুশালেম শাসন করতে গিয়ে সে বার বার আর্মেনীয় ক্রীতদাস টোবিয়াদের ষড়যন্ত্রের শিকার হয়েছে। কিন্তু নেহেমিয়া পেয়েছেন হানানির মত বিশ্বস্ত বন্ধুকে।
মিকার মত একজন সংগ্রামী যুবককে, যারা তাকে শুধু প্রাচীর নির্মাণ নয়, সব বিষয়ে সাহায্য করেছে। চিরকুমার নেহেমিয়া শব্দরার প্রতি আকর্ষণ অনুভব করলেও সে আকর্ষণের জন্য যিহোবার কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করেছেন, অনুশোচনায় নিজেকে দগ্ধ করেছেন। উপন্যাসের শেষের দিকে নেহেমিয়াকে মিকা এবং শব্দরার শুভাকাঙ্খী হিসেবে দেখা যায়।

নেহেমিয়া তাদেরকে যিরুশালেম সীমান্ত পর্যন্ত এগিয়ে দিতে আসে। সবমিলিয়ে লেখক নেহেমিয়া চারিত্রটিকে ইতিহাসে বর্ণিত চরিত্রের অনুরূপ করে সৃষ্টি করতে সমর্থ হয়েছেন। উপন্যাসের কাহিনী পরিকল্পনায় ও ঘটনা বিন্যাসে মিকার চরিত্র প্রাধান্য পেলেও অন্যান্য চরিত্রের মধ্যে হানানি, আচার্য ইষ্র, নহিমা, সানবক্সট, আর্মেনীয় দাস টোবিয়া, গেশেম, প্রমুখ স্ব-স্ব অবস্থানে অনিবার্য ভূমিকা পালন করেছে।
মিথ-ইতিহাসের অন্তঃসূত্রে গ্রথিত মিকা এবং শব্দরার জীবনপরিক্রমায় উপস্থাপিত হলেও ‘পাপের সন্তান’ উপন্যাসের ভাষা ক্লাসিক অরাকলধর্মী গদাশেণীতে বিন্যাস্ত :
‘আমরা যিহোবার দাস মোশি কর্তৃক প্রদত্ত যিহোবার ব্যবস্থা মত চলব যিহোবার আদেশ, শাসন ও বিধিসকল যত্নপূর্বক পালন করব। পরজাতীয় লোকদের সংগে আপনাদের কন্যাদের বিবাহ দেব না ও আমাদের পুত্রগণের জন্য তাদের কন্যাদের গ্রহণ করব না।’
মন্দিরে সমবেত এই শপথ উচ্চারণের ভাষা বাইবেলে ভাষার সমগোত্রীয় শব্দ ব্যবহার, বাক্যের গঠনশৈলীতে সাধুভঙ্গি প্রয়োগের ফলে গাম্ভীর্যপূর্ণ আবহ তৈরি হয়েছে। মানব কন্ঠে উচ্চারিত ঐশ্বরিক প্রত্যাদেশের মধ্যে যে ভাবগম্ভীর্য, শব্দের ওজস্বিতা থাকে উদ্ধৃতাংশের মধ্যের তা লক্ষ্য করা যায়। যেমন, ‘মোশি কর্তৃক প্রদত্ত’ না বলে ‘মোশির দেয়া’ ‘বিধিসকল’ না বলে “নিয়মগুলো’ ‘কন্যাদের’ না বলে ‘মেয়েদের’ ‘বিবাহ’ না বলে ‘বিয়ে’ ‘পুত্রগণের” না বলে ‘ছেলেদের ইত্যাদি শব্দ ব্যবহার করতে পারতেন।
কিন্তু তাতে ভাষার ঔজন্বিত নষ্ট হয়ে যেত। ভাষা ব্যবহারে সত্যেন সেনের ‘পাপের সন্তান’ উপন্যাসকে ক্লাসিকমাত্রায় উন্নীত করেছে। ‘অভিশপ্ত নগরী’র ঐশীবাণীর প্রচারক যেরেমিয়া এবং ‘পাপের সন্তান” এর যিহোবার প্রত্যাদেশ প্রচারক আচার্য ইয়ার ভাষণে যুগপৎভাবে রাষ্ট্রিক ও ধর্মীয় বিধানের আবহ সংকেত্রয়িত হয়েছে।
উপন্যাসের কাহিনীর প্রয়োজনে কখনো সংলাপের ভেতরে সংলাপ ব্যবহৃত যদিও ‘অভিশপ্ত নগরী’র তুলনায় ‘পাপের সন্তান’ এর ভাষা আরো জীবন সত্যের অনুষঙ্গী। সত্যেন সেনের বস্তুবাদী দর্শন ও বিজ্ঞানমনস্ক প্রায় জীবনবোধের প্রতিফলন ‘পাপের সস্তান’কে এক সর্বজনীন শিল্পমাত্রায় উন্নীত করেছে।