Site icon Literature Gurukul [ সাহিত্য গুরুকুল ] GOLN

মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের পাঁচটি উপন্যাসে জীবন ও সমাজ প্রস্তাবনা

মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের পাঁচটি উপন্যাসে জীবন ও সমাজ প্রস্তাবনা

আজকে আমরা মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের পাঁচটি উপন্যাসে জীবন ও সমাজ প্রস্তাবনা আলোচনা করবো।। যা মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের পাঁচটি উপন্যাসে জীবন ও সমাজ এর অন্তর্ভুক্ত।

 

 

মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের পাঁচটি উপন্যাসে জীবন ও সমাজ প্রস্তাবনা

সাহিত্য সমাজের দর্পণ। তাই বলা যায় সাহিত্য সময় এবং সমাজের প্রতিনিধিত্ব করে। ফেলে আসা সময়কে জানতে, চিনতে, বুঝতে, অভিজ্ঞতায় সিক্ত হতে মানুষ অন্বেষণ করে সেই সময়ের সাহিত্যকর্ম। পৃথিবীর বিবর্তনের ইতিহাসে বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন পরিস্থিতির উদ্ভব হয়েছে: আদিম সাম্যবাদী সমাজ, নাস প্রথা, সামন্ত প্রথা, পুঁজিবাদ; এরপর সমাজতন্ত্র আর বিশ্বায়ন। তবে এ কথা বললে অত্যুক্তি হবে না যে, প্রতিটি অবস্থানেই দুটি শ্রেণি বিদ্যমান: শোষিত এবং শোষক। মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় শোষিতের প্রতি দরদী লেখক ।

লেখক শুধু তাঁর বক্তব্যই বলেন না, শৈল্পিকভাবে উপস্থাপনও করেন। সেই সাহিত্যই সার্থক সাহিত্য যা উপকরণ-মূল্যকে ছাপিয়ে চরম-মূল্যে পৌঁছায়। উপন্যাস সামগ্রিকতার প্রকাশ। পূর্ণাঙ্গ জীবন বোধক না হলে উপন্যসের সার্থকতা নেই। বাংলা উপন্যাসের ক্ষেত্রে প্যারীচাঁদ মিত্র যে সম্ভবনার ইঙ্গিত দিয়েছিলেন, বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের হাতে তার যার উন্মোচন, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর একে কাব্যময় করেছেন আর শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় করেছেন আত্মার সংযোজন।

বঙ্কিম-রবীন্দ্রনাথ শরৎচন্দ্রের পরই উপন্যাস শিল্পে মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের নাম উচ্চারিত হয়। তাঁর জীবদ্দশায় প্রকাশিত উপন্যাস ৩৩টি, মৃত্যুর পর প্রকাশিত হয় আরো ৪টি এবং অপ্রকাশিত-অসমাপ্ত উপন্যাস ২টি। এই বিশাল উপন্যাস সম্ভারে তিনি বিচিত্র বিষয়, বিচিত্র জীবন, বিচিত্র পরিবেশ অংকন করেছেন।

 

 

সমাজজীবনের বিভিন্ন ঘটনা সাহিত্যিকের উপর প্রভাব ফেলে। মানিকের সমকালে রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থায় বিভিন্ন ঘটনার সন্নিবেশ ঘটেছে। ব্রিটিশ বিরোধী আন্দোলন, সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা, স্বাধীন ভারতে উদ্বাস্তু সমস্যা, শাসকদের অরাজকতা ইত্যাদি বিষয় মানিকের মনোজগতে প্রভাব ফেলেছে। তাঁর লেখায় তাই এই পরিস্থিতি এবং এ থেকে উত্তরণের চেষ্টা প্রবলভাবে দেখা যায়। বিভিন্ন মতবাদও সাহিত্যিকের চলার পথকে প্রভাবিত করে।

ফ্রয়েড এবং মার্কস দুজনই মানুষের কল্যাণের চিন্তা করেছেন। মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় এই দুই তত্ত্ব দ্বারাই প্রভাবিত। তবে তাঁর মানস বৈশিষ্ট্যের প্রধান দিক বৈজ্ঞানিক বিশ্লেষণ। যে কোনো অবস্থাই তিনি বৈজ্ঞানিকের দৃষ্টিকোণ থেকে বিচার করেছেন, চুলচেরা বিশ্লেষণ করেছেন; তাই তাঁর পূর্ববর্তী সাহিত্যিকদের চেয়ে তাঁর রচিত চরিত্র ও সমাজ স্বকীয় বৈশিষ্ট্য নিয়ে প্রকাশিত হয়েছে।

বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের উপন্যাসে জীবন ও সমাজ এসেছে রাজন্যবর্গ সংশ্লিষ্ট; খুব বেশি হলে তিনি সামন্তপ্রভু পর্যন্ত নেমে এসেছেন। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর তাঁর কথাসাহিত্যে সামন্ত জীবন ও সমাজকেই মুখ্য করেছেন। তবে উদীয়মান ইংরেজি শিক্ষায় শিক্ষিত এলিট শ্রেণির প্রতি আগ্রহও ধরা পড়ে রবীন্দ্রনাথের কথাসাহিত্যে। শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের উপন্যাসে বাঙালির জীবন এসেছে সত্য কিন্তু সে জীবনও সীমিত থেকেছে সম্পন্ন গৃহস্থ পরিবার বা সংসারের মধ্যে।

 

 

তিরিশের লেখককুলের মধ্যে তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায় উপন্যাসে অঞ্চলবিশেষের অন্ত্যজ মানুষকে রূপায়িত করলেও এ কথা স্বীকৃত যে লেখকের পক্ষপাত ছিল এবং বলা যায় খানিকটা দুর্বলতাও, ক্ষয়িষ্ণু সামসমাজের প্রতি। আর বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায় তাঁর উপন্যাসে নিয়ে এলেন সেই বাঙালি পরিবার, যে পরিবার মূলত উত্তাপহীন, সর্বংসহা। সে দিক থেকে মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় অবশ্যই ব্যতিক্রম ও অনন্য এ কারণে যে, তিনি তাঁর কথাসাহিত্যে মানুষের জীবনের শ্রেণিচেতনা, স্বার্থচেতনা, কাম-প্রকাশ ইত্যাদি বৈশিষ্ট্যকে বাঙালির জীবনকেন্দ্রে স্থাপন করে উপন্যাস রচনা করেন।

১৯৪৪ সালে ভারতীয় কমিউনিস্ট পার্টিতে যোগদান মানিকের জীবনের খুবই গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা। এরপর পার্টির নিয়ন্ত্রণ তাঁর জীবন ও সাহিত্যে কমবেশি প্রতিষ্ঠা হয়। তবে তার আগের রচনায় মানিক যথেষ্ট স্বাধীন চিন্তার অধিকারী এবং সে চিন্তার প্রয়োগও তিনি উপন্যাসে করেছেন। তাঁর এ চিন্তায় পাশ্চাত্য তত্ত্ব ও দর্শনের প্রভাব হয়তো ছিল, কিন্তু এ সব কিছুই তিনি স্বকীয় বোধের সংশ্লেষে গ্রহণ করেছেন।

মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের ‘জননী’, ‘জীবনের জটিলতা’, ‘শহরতলী’, ‘অহিংসা’, ‘চতুষ্কোণ’ উপন্যাস পাঁচটি তাঁর ভারতীয় কমিউনিস্ট পার্টিতে যোগদানের পূর্বে রচিত ও প্রকাশিত হয়।

Exit mobile version