Site icon Literature Gurukul [ সাহিত্য গুরুকুল ] GOLN

পরিবেশ পর্যবেক্ষণ এবং জীবনধারা

পরিবেশ পর্যবেক্ষণ এবং জীবনধারা

আজকে আমাদের আলোচনার বিষয়ঃ পরিবেশ পর্যবেক্ষণ এবং জীবনধারা। যা মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের পাঁচটি উপন্যাসে জীবন ও সমাজ এর মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের উপন্যাস সমাজ এর অন্তর্গত।

 

 

পরিবেশ পর্যবেক্ষণ এবং জীবনধারা

বাড়ি এবং তার পরিবেশের বর্ণনায় মানুষের জীবনধারার প্রেক্ষাপট স্পষ্ট হয়। ‘জননী’ উপন্যাসে শহর, শহরতলী এবং গ্রাম তিনটি পরিবেশের বর্ণনা আছে। বিয়ে হয়ে শ্যামা এসেছিল শীতলের শহরতলীর বাড়ি। শহরের মতো অতটা ঘিঞ্জি নয় ইটের অরণ্যের মধ্যে দুএকটি গাছ, যেন ছেলেভুলানো পার্ক। প্রতিবেশী থেকেও নেই। সবাই ঘরের কোণে নিজেদের নিয়ে ব্যস্ত থাকতো। শীতল জেলে যাওয়ার পর শ্যামার সংসার সংকীর্ণ হয়ে আসে। একতলাটা সে ভাড়া দেয়। শ্যামার সংগ্রাম সকল অবস্থায়

“দোতলার ঘরখানা আর ছাদটুকু ছিল শ্যামার গৃহ, জিনিসপত্রসহ সে বাস করিত ঘরে, রাধিত ছাদে, একখানা করোগেটেড টিনের নীচে।” (১খ, পৃ-৮০ )

মন্দার বাড়িটি গ্রামে। এখানে জীবনের সঙ্গে জীবনের বড় মেশামেশি। প্রকাণ্ড অঙ্গন, বাগান, পুকুর, ধুলাবালি, খেলার সাথী, প্রতিবেশী সব মিলে জীবনের জয়জয়কার। মন্দার বাড়ির বর্ণনায় ধরা পরে তারা গ্রাম্য ধনী পরিবার:

“বড়ো রাস্তা ছাড়িয়া ছোট রাস্তা, পুকুরের ধারে বিঘাপরিমাণ ছোট একটি মাঠ, লাল ইটের একতলা একটি বাড়ি ও কলাবাগানের বেড়ার মধ্যবর্তী দুহাত চওড়া পথ, তারপর রাখালের পাকা ভিত টিনের দেয়াল ও শনের ছাউনির বৈঠকখানা। তিনখানা তক্তপোশ একত্র করিয়া তার উপরে শতরঞ্জি বিছানো আছে। তিন জাতের মানুষের জন্য হুঁকা আছে তিনটি। [… …..] অনেকটা উকিল-মোক্তারের কাছারি ঘরের মতো … তাহার বৈঠকখানা। বৈঠকখানার পরেই বহিরাঙ্গন, সেখানে দুটো বড়ো বড়ো ধানের মরাই। তারপর রাখালের বাসগৃহ, আট-দশটি ছোটবড়ো টিনের ঘরের সমষ্টি, অধিবাসীদের সংখ্যাও বড়ো কম নয়।” (১খ, পৃ. ৮১)

বিধানের ভাড়া করা বাড়িটি ছিল কলকাতায়। ঘিঞ্জি এলাকা। মানুষের গাদাগাদি, একজনের সঙ্গে অন্যের হিংসা-দ্বেষ, ভদ্রতার খোলস, সরযূর পরিবার দেখিয়ে লেখক এখানে একটি সাংস্কৃতিক পরিবারও এঁকেছেন। এ পরিবারে বাবা-মা আর মেয়েরা যেন বন্ধু। আনন্দ-উল্লাসে ওদের দিন কার্টে, সেজেগুজে ফিটফাট হয়ে থাকে, গান করে, গ্রামোফোন বাজায়, চারজন মিলে তাস খেলে, একসঙ্গে সিনেমায় যায়। এই হলো শহরের চিত্র। এই বাড়িটি দোতলা

“দোতলার মাঝামাঝি কাঠের ব্যবধান, প্রত্যেক ভাগে দুখানা ঘর। রান্নার জন্য ছাদে দুটি ছোট ছোট টিনের চালা। শ্যামারা থাকে দোতলার সামনের অংশটাতে, রাস্তার উপর ছোট একটু বারান্দা আছে।” (১৭, পৃ.-১০৪)

 

 

‘জীবনের জটিলতায়’ বিমলদের পারিবারিক অবস্থা তাদের বাড়ির বর্ণনার মধ্যে স্পষ্ট হয়ে ওঠে

“গলির নাম জীবনময় লেন, দু পাশের বাড়ির চাপে বহুকালজীবন ত্যাগ করিয়াছে- শবের মতো শীতল। বারচারেক দিক পরিবর্তন করিয়া এই গলি যে পুরাতন বাড়িটির বাহিরে জীর্ণ দরোজায় শেষ হইয়াছে সেই বাড়িতে প্রমথ আজ সাত বৎসর সপরিবারে বাস করিতেছে।” (২, পৃ. ১০৩ )

প্রমথ বিমল প্রমীলার পিতা। তাদের দারিদ্র্যের সংসারে সচ্ছলতার লেশমাত্র নেই। বাহিরের জীর্ণ দরোজার মতোই জীর্ণ তাদের পারিবারিক জীবন। তাদের মাথা গুজবার স্থানটির বর্ণনায় তাদের রিক্ততা স্পষ্ট হয়েছে। অন্যদিকে, উচ্চবিত্ত নগেনের বাড়ির বর্ণনায় আভিজাত্যের ছোঁয়া পাওয়া যায়:

“নগেনের বাড়িটা প্রকাণ্ড, সামনে বাগান আছে। বাগানের আকৃতিতে সামঞ্জস্য নাই বলিয়া ভারী চমৎকার দেখায়। বাড়ির ডানদিক ঘেঁষিয়া অন্যলোকের বাড়ি, বাঁদিকে পিছনের দেয়াল পর্যন্ত বিস্তৃত কয়েক হাত চওড়া গোলাপের ফুলসজ্জা। (২খ, পৃ.- ১০৮)

‘শহরতলী’ উপন্যাসের দুই খণ্ডের শুরুতে লেখক পরিবেশের বর্ণনা দিয়ে সেই সমাজকে তুলে ধরেছেন। প্রথম খণ্ডে শহরতলীর জীবনযাত্রা এবং দ্বিতীয় খণ্ডে শহরতলীর শহরে রূপান্তরিত হবার ধারণা সম্পূর্ণরূপেই বোঝা যায়। প্রথম খণ্ডের প্রথমেই আছে সে অঞ্চলের বিদ্যুতের অবস্থা। বিদ্যুতের ব্যবস্থা আছে অনেক দূরে দূরে। ছোট গলিতে কাঠের থামে টিমটিমে তেলের বাতি জ্বলে। রাতে ট্রামের আওয়াজ শোনা যায়। লেখক বর্ণনা দিয়েছেন এভাবে:

“পথের দুপাশে সচ্ছলতা ও দারিদ্র্যের, স্বাচ্ছন্দ্য ও দুর্ভোগের, রুচি ও অরুচির, সুন্দর ও কুৎসিতের, পরিচ্ছন্নতা ও নোংরামির, সম্মুখ ও পিছনের, অতীত বর্তমান ও ভবিষ্যতের (যথা-গৃহনির্মালোপকরণের সমাবেশ) কত যে আশ্চর্য সমন্বয় ও গলাগলি ভাব! নাম লেখা গেট, বাগান ও লন, আধুনিক ফ্যাশনের সুদৃশ্য দোতলা বাড়ি, বিচিত্র শাড়ি, সুন্দরী নারী, রেডিওর গান, ইট বাহির করা পুরোনো একতলা বাড়ি, সামনে সিমেন্ট-ফাটা রোয়াকে ছেঁড়া ন্যাকড়া, কাগজের টুকরা, আধপোড়া বিড়ি, কোমরে ঘুনসি বাঁধা উলঙ্গ শিশু। পথের এদিকে ছবির মতো সাজানো মনিহারী দোকান- সাবান, কেশতৈল, পাউডার, স্নো, ক্রিমে ঠাসা; পথের অপর দিকে নিছক একটা কয়লার আড়ত, খুচরা ও পাইকারি বিক্রয় হয়, মালিক শ্রীভূষণচন্দ্র নন্দী । ………..

কাছেই ডাইমন্ড র‍্যাস্টরাস্ট, ফাস্টক্লাস চা রুটি মাখন চপ কাকলেট ডবল ডিমের মামলেট (মাত্র তিন পয়সা) ইত্যাদি পাইবেন বলিয়া মালিক রাধানাথ দে স্বহস্তে সাইনবোর্ড লিখিয়া রাখিয়াছে। এক রকম গা ঘেঁষিয়াই টিনের চালার নীচে লোচন সাইয়ের মুড়িচিড়ার দোকান, কাঁচ বসানো টিনের পাত্রে বাতাসা, দড়িতে ঝুলানো তিলুড়ি, এক ছড়া চাঁপাকলা [… … …] । ছোট স্যাকরার দোকান, কামারের দোকান, টিনের মগ-বালতি তৈরি আর ঘটিবাটি ঝালাই করার দোকান, সাইকেল মেরামতের দোকান এ সবও আছে। আর কিছু দূরে আছে বড়ো বড়ো কারখানা।” (তখ, পৃ.-১২৩)

সত্যপ্রিয়র বড় বাড়ির পেছনে বাগান। বাগানে রয়েছে ফুল-ফল আর কৃত্রিম নির্জনতা। দ্বিতীয় খণ্ডে শহরতলীর রূপান্তর ঘটেছে সে বিষয়ে লেখক অবহিত করেছেন। একে তুলনা করেছেন মাটির বাসনের সঙ্গে:

“মাটির বাসন যেন দেখিতে দেখিতে কৃত্রিম ধাতুতে দাঁড়াইয়া যাইতেছে আর চাকচিক্য বাড়িতেছে প্রতিদিন।” (তখ, পৃ. ২১৫)

এবড়ো থেবড়ো রাস্তা পিচ ঢেলে নতুন করা হচ্ছে, সরু গলি চওড়া হচ্ছে, পথের গায়ে আটা হচ্ছে জমকালো নাম। ছোট বাড়ি ভেঙে আধুনিক ফ্যাশনের বাড়ি উঠছে, দোকানের সংখ্যা বেড়েছে। এলোমেলো জিনিসের দোকান নয়, ছবির মতো সাজানো দোকান, দোকানে রয়েছে ঝলমলে আলো, বাজারেরও সংস্কার হয়েছে – এলোমেলো যেখানে সেখানে মাছ-তরকারি বসে না, সন্ধ্যার পর অর্ধেকটা অন্ধকারে ঢেকে থাকে না। অনেক বস্তিও উঠে গেছে, শুধু ভদ্রপাড়ার পিছনের বস্তিগুলি রয়েছে। এভাবেই হয়েছে সভ্যতার পরিবর্তন:

“শহরতলী উপন্যাসে শহরতলী’ শুধু নিষ্ক্রিয় বিমূর্ত পটভূমি থাকে নি-এই উপন্যাসের নর-নারীর সম্পর্ক ও চরিত্রগুলির পরিবর্তনের মতোই অঞ্চলটির পরিবর্তন এক জীবন্ত রূপ ও স্বতন্ত্রমাত্রা লাভ করেছে।

 

 

এখানে শহর এসে যেমন শহরতলীকে শহরে পরিণত করেছে, তেমনি পিছনের গ্রামগুলো নতুন শহরতলীতে রূপান্তরিত হয়েছে।

‘অহিংসা’ আশ্রমকেন্দ্রিক উপন্যাস। আশ্রমকে কেন্দ্র করেই এর ঘটনাপ্রবাহ আবর্তিত। লেখক উপন্যাসের প্রথমেই বর্ণনা দিয়েছেন:

“সদানন্দ সাধুর আশ্রমের তিন দিকটা তপোবনের মতো। বাকি দিকটাতে একটা নদী আছে। আশ্রম ঘিরিয়া অবশ্য তপোবনটি গড়িয়া ওঠে নাই, স্থানটি তপোবনের মতো নির্জন আর শান্তিপূর্ণ দেখিয়াই আশ্রম গড়িয়া তোলা হইয়াছে।” ( ৩খ, পৃ.-২৭৭)

এই তপোবনের পুরোটা আশ্রমের সম্পত্তি নয়। শুধু দলিলে আশ্রমের সীমানা দেওয়া আছে বলে বন, উপবন, আমবাগান, কলাবাগান সমস্তই আশ্রমের তপোবন বলে মনে হয়। একদিকের নদীটি একটি উপশাখা নদী। লোকে একে রাধা বলে ডাকতে ডাকতে আরো একটি ‘ই’কার যুক্ত হয়ে এর নামকরণ হয়েছে রাধাই। গ্রীষ্মের সময় নদীর জল শুকিয়ে বালি চিকচিক করে । বর্ষাকালে বৃষ্টি হলেই এর নবযৌবন দেখা যায়।

এই নদীর কাছে আটচালা ঘরে প্রেম আর অহিংসার কথা শুনতে গণজমায়েত হয়। সদানন্দ সাধু এখানে বাণী প্রচার করে, প্রণামী নেয়। এ সম্পর্কে অচ্যুত গোস্বামী বলেছেন:

“আমাদের দেশে শুধু যে সাধু-সন্ন্যাসীই অনেক তা নয়, সাধু-সন্ন্যাসীদের ঘিরে থাক যে ভক্তবৃন্দ তাদের মনোভাবের মধ্যেও কতকগুলো অস্বাস্থ্যকর বিশেষত্ব আছে। L… ….. সাধু এবং তাঁর ভক্তবৃন্দর মধ্যেকার সম্পর্ক প্রতারণা এবং অন্ধ জবরদস্তিমূলক বিশ্বাসের অদ্ভুত সমন্বয়ের দ্বারা গঠিত। ” ১৭

সদানন্দের কুটিরে বড়ো একটা ঘর। মেঝে লাল সিমেন্ট করা, দেওয়াল গেরুয়া রঙের। আশ্রমের ছোট-বড় সকল ঘরই এই রকম, উপরের ছাউনি ছাড়া বাকি সব চুনসুরকি ইটকাঠের ব্যাপার। সদর পার হয়ে এলে অস্পরের উঠান-ফুলের চারার আর ফলের গাছে বাগানের মতো। একপাশে প্রকাণ্ড বাধানো ইঁদারা। উঠানের একদিকে সদর, বাকি তিন দিকেই ঘর- কোনটার বারান্দা আছে, কোনোটার নেই। অন্দর পার হয়ে অন্তঃপুর। ঝকঝকে, তকতকে পরিচ্ছন্নতা, এককোণে শুধু একটি তালগাছ আছে।

‘চতুষ্কোণ’ উপন্যাসে রাজকুমারের ঘরের বর্ণনার মধ্য দিয়ে ব্যাচেলর জীবন স্পষ্ট হয়েছে । লেখক বলেছেন, আসবাব ও জিনিসপত্রে ঠাসা চারকোনা মাঝারি আকারের ঘরটি তার শোবার ঘর, বসিবার ঘর, লাইব্রেরি, গুদাম এবং আরও অনেক কিছু। উপন্যাসে আছে।

“বই বোঝাই তিনটি আলমারি ও একটি টেবিল, দাড়ি কামানোর সরঞ্জাম, ওষুধের শিশি, কাচের গ্লাস, চায়ের কাপ, জুতা পালিশের কৌটা, চশমার খাপ প্রভৃতি অসংখ্য খুঁটিনাটি জিনিসে বোঝাই আরেকটি টেবিল, তিনটি চেয়ার একটি ট্রাঙ্ক এবং দুটি বড়ো ও একটি ছোটো চামড়ার সুটকেস, ছোটো একটা আলনা, এ সমস্ত কেবল পা ফেলিবার স্থান রাখিয়া বাকি মেঝেটা আত্মসাৎ করিয়াছে। তবে রাজকুমার কোনোরকম অসুবিধাবোধ করে না। এ ঘরে থাকিতে তার বরং রীতিমতো আরাম বোধ হয়। ঘরখানা যেমন জিনিসপত্রে বোঝাই, তেমনি অনেকদিনের অভ্যাস ও ঘনিষ্ঠতার স্বস্তিতে ঠাসা।” ( ৪খ, পৃ.-১১)

আধুনিক মানুষ আধুনিকতার বেড়াজালেই আবদ্ধ

আমরা যে অবরুদ্ধ সমাজে বাস করি, চতুষ্কোণ বা চার দেয়ালের সংক্ষিপ্ত পরিচয় তারই প্রতীক। ১৮

‘অমৃতস্য পুত্রাঃ’ উপন্যাসে বীরেশ্বরের বিলাসবহুল বাড়ির পরিবেশ এবং অনুপমদের নিম্নবিত্ত বাড়ির পরিবেশ দুটি পৃথকভাবে দেওয়া আছে। শহরের যে অংশে বীরেশ্বর থাকে তা নির্জন ও গম্ভীর। বীরেশ্বরের বাড়ি তিনতলা, সামনে ছোট একটি বাগান আছে। পথের দুদিকে প্রায় সবগুলিই বাগানওয়ালা বাড়ি:

“বাগানগুলি যেন বেঁটে বেঁটে উদ্ভিদের সাজানো গোছানো দোকান, অল্প একটু জায়গায় যতগুলি সম্ভব অরণ্যানীর প্রতিনিধিকে ঠাই দেওয়া হইয়াছে।” ( ২খ,পৃ.– ২৫২)

আর অনুপমের বাড়ি বড়ো রাস্তা ছেড়ে নোংরা ছোট গলির ভিতরে। রংচটা সদর দরোজা, কাঁচা হাতেখড়ি দিয়ে বাড়ির নম্বর লেখা ।

‘পদ্মা নদীর মাঝি’ তে জেলে পাড়ার বর্ণনা দিয়েছেন লেখক:

পুবদিকে গ্রামের বাহিরে জেলেপাড়া। চারিদিকে ফাঁকা জায়গার অন্ত নাই কিন্তু জেলে পাড়ায় বাড়িগুলি গায়ে গায়ে ঘেঁষিয়া জমাট বাঁধিয়া আছে।” (২৭, পৃ. 17 ) কলকাতার ঘর-বাড়ি অলি-গলি পথে গড়ে উঠেছে সে বর্ণনাও লেখক দিয়েছেন। পশ্চিমে বড়ো রাস্তার ধারে স্যার কে এল- এর প্রকাণ্ড বাড়ি। এই বাড়ির আড়ালে পরেছে রাজকুমারের বাড়ি তাই স্যার কে এল এর পাশের গলি দিয়ে ঢুকে তার বাড়ির সদরে ঢুকতে হয়।

উত্তরে গলির মধ্যে রাজকুমারের বাড়ির অপর দিকে কেদারবাবুর বাড়ি, পুরে গলির মধ্যে এগিয়ে ডান দিকে আরো ছোট গলির মধ্যে অবনীবাবুর বাড়ি, দক্ষিণে ছোট গলির ধারে ডানদিকে মোড় ঘোরার পর রসিকবাবুর বাড়ি। স্যার কে এল- এর বাড়ি সম্পর্কে বলা হয়েছে সদরের সুশ্রী দরজা পার হয়ে ভিতরে পা দিলে বোঝা যায় রাস্তাটি কত নোংরা। আরাম উপভোগের আধুনিকতম অনেক আয়োজন এখানে:

ভিতরটা শুধু দামি ও সুশ্রী আসবাবে সুন্দরভাবে সাজানো নয়, সদর দরজার এ পাশে বাড়ির বিস্ময়কর রূপ ও শ্রীর মহিমাটাই শুধু স্পষ্ট হইয়া নাই, কী যেন একটা ম্যাজিক ছড়ানো আছে চারিদিকে, পার্থক্য ও দূরত্বের ইঙ্গিতভরা এক অহংকারী আবেষ্টনীর দুর্বোধ্য প্রভাবের ম্যাজিক। ( ৪খ, পৃ.-১৯)

 

 

সরসীর বাড়িটিও যে প্রকাণ্ড তার ইঙ্গিত আছে। নিচে তাদের বসবার জন্য বড় হলঘর আছে আর উপরে অনেক ঘরের সঙ্গে সরসীর দুটি ঘর। একটি শোওয়ার ঘর, অন্যটি বসবার। বসবার ঘরের একপাশে একটি চারকোণা টেবিলে সে লেখা পড়া করে, তার সভাসমিতির কাগজপত্র টেবিল জুড়ে থাকে। একটি ছোট শেলফে বাছা বাছা বই।

অন্যদিকে, গিরিদের বাড়ির উঠানের বর্ণনায় তার শ্রেণির প্রতিফলন ঘটেছে ছোট উঠান, অতিরিক্ত ঘষামাজায় ঝকঝকে, তব যেন অপরিচ্ছন্ন। কলের নিচে ছড়ানো এঁটো বাসন, একগাদা ছাই, বাসন মাজা ন্যাতা, ক্ষয় পাওয়া ঝাঁটা, নালার ঝাঁঝরার কাছে পানের পিকের দাগ, সিঁড়ির নিচে কয়লা আর ঘুঁটের স্তূপ [… …] । ( ৪খ, পৃ. ১৪)

মানুষের জীবনধারা অঙ্কনে সংসারের অন্দরটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ‘জননী’ উপন্যাসে শ্যামার বাড়ি শহরতলীতে। শহরতলীর মানুষ অনেকাংশে অভাবী, শীতল জেলে গেলে শ্যামার অভাব আরো বেড়ে যায়। একতলা ভাড়া দিয়ে সে একটি ঘিঞ্জি পরিবেশে জীবনযাপন করে। আবার, যশোদার দুটি বাড়িও ঘিঞ্জি। একটি বাড়িতে অনেকগুলো ঘর তুলে কুলি-মজুরদের ভাড়া দিয়েছে, তাদের স্ত্রী-সন্তান এখানে নেই।

সকলে মিলে তাদের একটি সংসার। অন্য বাড়িটিতে কয়েকটি পরিবার থাকে। তারা একদিকে ঝগড়া করে, অন্যদিকে ভালোবাসে। তাদের জীবন চলার সঙ্গে সঙ্গে হিংসা-দ্বেষ খুনসুটি সমান্তরালে চলে। চাঁপা ভালোবাসে জগতকে, সে জগতের বোন কালোকে সহ্য করতে পারে না, সুযোগ পেলেই তাকে কোণঠাসা করে দেয়।

কালো বাসন মাজতে গেলে তাকে ধাক্কা দিয়ে উঠিয়ে দিয়ে নিজে বাসন মাজে। তাদের অসুখ-বিসুখ লেগেই আছে। চাঁপার মা প্রায়ই জ্বরে ভোগে। জগতের মা আধা পাগলা। সে বউ সাজবার পাগলামি করে। বড় ঘোমটা দিয়ে বসে বসে বিড়বিড় করে। পরেশ চুরি করতে গিয়ে পায়ে গত ৰানিয়েছে, সেখানে যা হয়ে গেছে। পরেশের সাত মাসের ছেলে হাত-পা ছুঁড়ে চেঁচামেচি করছে। এমনি করে কুলি-মজুরের সংসার দিনযাপন করে। জ্যোতির্ময়ের বাড়িও শহরতলীতে।

উচ্চমধ্যবিত্ত পরিবারের প্রতিনিধি জ্যোতির্ময়। দোতলা বাড়ি তার। লেখক জ্যোতির্ময়ের ঘরের বর্ণনা দিয়েছেন এভাবে:

“ বেশ সাজানো ঘরখানা, আসবাব একটু বেশি রকম ঠাসা। এক ঘরে খাট, ড্রেসিং টেবিল, লেখাপড়ার জন্য মাঝারি আকারের একটি টেবিল ও চেয়ার, ট্রাংক, সুটকেস, অর্গ্যান, আলনা ইত্যাদি অনেকগুলি জিনিস ভর্তি করায় নড়াচড়ার স্থানাভাব ঘটিয়াছে।” (৩খ, পৃ. ১৮০ )

জ্যোতির্ময়ের স্ত্রী অপরাজিতা। স্বামী তাকে ভালোবাসে, উপহারে আসবাবে ঘর ভরে দেয়, কিন্তু নিজের অসুখের কথা সে জ্যোতির্ময়কে বলার সময় পায় না। যশোদা তাদের সম্পর্কে চিন্তা করে:

“ভদ্র স্বামী-স্ত্রীর ভালোবাসার খেলা এই রকম ভদ্রতা বজায় রাখিয়া চলে না কি?” ( তখ, পৃ. ১৮১)

অপরাজিতার শীর্ণ-বিবর্ণ মুখ দেখে তাদের বাড়ির লোকও কিছু বলে না। বউয়ের অসুখ করেছে বলে কেউ চিন্তিত হয় না। ননদ সুবর্ণ বউদিকে আড়ালে নিয়ে শুধু গতরাতের ঘটনা জিজ্ঞাস করে, বিধবা সুধীরা হিংসায় মুখ বাঁকায়, তার অসুখের চিন্তা কারো মাথায় আসে না ।

এদিকে, সত্যপ্রিয়র বাড়িতে পরিবারের লোক ছাড়াও অনেক আত্মীয়স্বজন আশ্রিত থাকে। সত্যপ্রিয়র পরিবারের মেয়েরা গায়ে রাশ রাশ গহনা পরে। বাড়ির লোকের কাছে বাড়ির কর্তা কতকটা রাজার মতো। কর্তার কর্তৃত্বের চাপে অন্যদের স্বাভাবিক বিকাশ হয় না। তাছাড়া যে বিষয়টি স্পষ্ট তা হলো:

“এ বাড়ির মেয়ে হওয়ার অর্থই যে অন্য বাড়ির মেয়ের মতো না হওয়া, এটা সকলেই জানে। আশ্রিত আছে বহু, কারও দাবির জোর বেশি, মানমর্যাদাও বেশি, কারও দাবির জোর কম, মানমর্যাদাও কম এবং এই হিসাবমতো এ ওর মন জোগাইয়া চলে, এ ওকে অবজ্ঞা করে, হিংসাটা হইয়া থাকে বিশ্বব্যাপী।” ( ৩খ, পৃ. ১৭৬)

অন্যদিকে সত্যপ্রিয়র স্ত্রী শান্ত ও নিরীহ। সে সকলের চেয়ে আলাদা, একা একজন মানুষ। তার কথার মূল্য পরিবারে নেই। সে স্বামী-সন্তানের ভুলের জন্য অনুতপ্ত হয়।

মানুষ অভ্যাসের দাস। ‘জননী’ উপন্যাসে মন্দার অসুখের সময় রাখাল কলকাতায় থাকে। শ্যামা চেয়েছিল রাখাল কলকাতাতেই থাকুক। কিন্তু রাখালের বাড়ি গ্রামে, চাকরি নিয়ে সে গ্রামে চলে গেলো। কলকাতায় থাকার কোনো ইচ্ছে তার নেই। গ্রাম থেকে প্রথম যারা শহর বা শহরতলীতে আসে, তারা শহরকে পছন্দ করে না।

গ্রামের প্রতি তাদের প্রবল এক আকর্ষন রয়ে যায়। তাই ধনঞ্জয় চাকরির জন্য শহরতলীতে এসে আবার গ্রামে ফিরে যায়। জগৎ অল্প দিন ধরে শহরতলীতে এসেছে। শহরের গরমকেও সে গ্রামের গরমের সঙ্গে তুলনা দেয়। সে বলে

“গরমটা সত্যি যেন খারাপ হেথা, গায় সয় না। দেশের গরম এমন নয়।” (৩খ, পৃ.- ১৩২)

ধনঞ্জয় আবার শহরে ফিরে এলে তাকে নিয়ে যশোদা কালীঘাটে গেলে কথা প্রসঙ্গে ধনঞ্জয় কলকাতাকে নরক বলে। সে বলে:

“বাঙালীরা খুব বজ্জাত কিনা তাই ইংরেজরা তাদের জন্যে এই নরক বানিয়েছে, কলকাতা শহর আছে বলেই তো বাঙালীর এই দুর্দশা। ছেলেগুলো একবার কলকাতা আসে আর বিগড়ে যায়, আমাদের গাঁয়ে কত ছেলে অমন গেছে। একটা বছর তুমি কলকাতা থাক, বাস্ আর গাঁয়ে গিয়ে বাস করতে পারবে না। কলকাতার মতো পাঁজি জায়গা আছে। পেট ভরে মানুষ খেতে পর্যন্ত পায় না বাছা তোমাদের কলকাতায়, অ্যা।” (৩ৰ, পৃ.-১৬৫)

 

 

মানুষের জীবনধারার রাস্তা এবং যানবাহনের গুরুত্ব অপরিসীম। শহরতলীর রাস্তা বেলা দশটা- এগারোটার সময় গাড়ি আর মানুষের ভিড়ে জমাট বেঁধে যায়। শহরতলীর রাস্তাও অপরিচ্ছন্ন নোংরা, পথের যেখানে সেখানে বুদবুদ তোলা নর্দমা, গেঁয়ো ধরনের দোকানপাট, সেকেলে ধরনের বাড়ি, বড় বড় মিল, মালবাহী গাড়ির জড়াজড়ি। আর শহরের রাস্তা পরিষ্কার, দামি ও সুদৃশ্য প্রাইভেট কারের স্রোত কেবল রঙিন বৈদ্যুতিক আলোর ইংগিতে কিংবা ট্রাম বাস মানব জাতীয় মালবাহী গাড়ি আর মানুষের ভিড়ে গতিহীন।

পথের ধারে প্রতিটি বাড়ি রাজপুরী, প্রত্যেকটি দোকান সুসজ্জিত যেন শুধু ধনীর জন্য তৈরি। ‘জননী’ উপন্যাসে ব্যক্তিগত গাড়ি এবং ট্রামের উল্লেখ আছে। ‘জীবনের জটিলতায়’ ট্রাম এবং ট্রেনের উল্লেখ আছে। ‘শহরতলী উপন্যাসে সত্যপ্রিয়র ব্যক্তিগত গাড়ি, ঠেলাগাড়ি, মহিষের গাড়ি, লড়ি, বাস, গরুরগাড়ি, ট্রাম ট্রেনের উল্লেখ আছে। ‘অহিংসার’ পালকি, নৌকা ও গরুরগাড়ির কথা পাওয়া যায়। ‘চতুষ্কোণে’ ট্রাম ও ট্যাক্সির উল্লেখ আছে।

Exit mobile version