আজকের আলোচনার বিষয়ঃ পদ্মা থেকে ইয়াংসি । যা চীন ও রাশিয়া ভ্রমণ অবলম্বনে রচিত বাংলা সাহিত্যের চীন ভ্রমণ কাহিনী এর অন্তর্গত।

পদ্মা থেকে ইয়াংসি । আবদুল খালেক
সিরাজগঞ্জ জেলার শাহজাদপুর থানার চরনবীপুর গ্রামের এক সম্ভ্রান্ত পরিবারে ১৯৩৬ সালের ২৫শে ডিসেম্বর আবদুল খালেক-এর জন্ম। পিতা ডাঃ মোহাম্মদ আলী ছিলেন একজন বিশিষ্ট হোমিও চিকিৎসক।
চরনবীপুর গ্রামে কোন পাঠশালা না থাকায় পাশের গ্রাম চরতারাবাড়ীয়ার পাঠশালায় তাঁকে প্রাথমিক শিক্ষা গ্রহণ করতে হয়। মাধ্যমিক শিক্ষা তিনি গ্রহণ করেন তালগাছি উচ্চ বিদ্যালয় থেকে। তালগাছি স্কুল থেকে মেট্রিক পাশ করার পর তিনি ঢাকা কলেজ থেকে উচ্চমাধ্যমিক, রাজশাহী সরকারী কলেজ থেকে বাংলা বিষয়ে বি.এ অনার্স ডিগ্রী এবং রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় থেকে এম.এ ডিগ্রী লাভ করেন ১৯৬২ সালে।
এম.এ ডিগ্রী লাভের পর তিনি পাবনা এডওয়ার্ড কলেজে বাংলার প্রভাষক পদে যোগদান করেন। ১৯৬৪ সালের মার্চ মাস পর্যন্ত এডওয়ার্ড কলেজে সাফল্যের সাথে অধ্যাপনার পর তিনি রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগে প্রভাষক পদে যোগ দেন। ১৯৬৫ সালে গনচীন সরকারের একটি বৃত্তি নিয়ে পিকিং বিশ্ববিদ্যালয়ে তিনি উচ্চ শিক্ষা গ্রহণ করতে যান।
১৯৬৬ সালে চীনা ভাষায় ডিপ্লোমা লাভের পর যখন গবেষণামূলক পঠন-পাঠন শুরু হবে, সে সময় চীন দেশে ঐতিহাসিক সাংস্কৃতিক বিপ্লব শুরু হওয়ায় তাঁকে দেশে ফিরে আসতে হয়। দেশে ফিরে তিনি রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে তাঁর নিজ পদে যোগদান করেন। বর্তমানে তিনি সে বিভাগের প্রফেসর পদে কর্মরত।
তাঁর উল্লেখযোগ্য প্রকাশিত প্রবন্ধ উত্তরাঞ্চলের লোক সংস্কৃতি, পাক-চীন লোক গল্পের গতি-প্রকৃতি, ফোকলোরের স্বরূপ সন্ধান, বাঙালী জাতিসত্তার স্বরূপ সন্ধানে ফোকলোর, বাংলা মংগল কাব্যে লোক উপাদান, কবি পাগলা কানাইয়ের গানে শিল্প মাধুর্য, বাউল গান ও লালন শাহ, ফোকলোর তত্ত্ব ও লোক সাহিত্য প্রভৃতি।
গণচীন ও পাকিস্তানের মধ্যে কিছু শিক্ষার্থী বিনিময়ের সূত্র ধরে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের নির্বাচিত শিক্ষার্থী হিসেবে মুহম্মদ আবদুল খালেক ১৯৬৫ সালের ৮ই ডিসেম্বর চীনে গিয়েছিলেন।
হঠাৎ চীনে সাংস্কৃতিক বিপ্লব শুরু হওয়ায় তিনি ভাষা শিক্ষা কোর্স শেষে দেশে ফিরে আসেন। চীনা ভাষা শিক্ষা কোর্সে তাঁর সময় লেগেছিল দশমাস। পদ্মা থেকে ইয়াংসি’ লেখকের দশমাসের অর্জিত অভিজ্ঞতার সার্থক সৃষ্টি।
তুলনামূলকভাবে সরকারী সফরকারী অতিথিদের চেয়ে তাঁর চীনকে জানবার সুযোগ ছিল বেশী। সমগ্র দেশটিকে খুব কাছ থেকে দেখবার সময় তিনি পেয়েছিলেন। তাঁর সফর অভিজ্ঞতা ‘পদ্মা থেকে ইয়াংসি’ তাই অন্যান্য ভ্রমণ কাহিনী থেকে একটু আলাদা ধাঁচের হয়েছে। বইটি প্রকাশিত হয়েছে ১৯৬৯ সালে। প্রকাশ করেছে ঢাকার নওরোজ কিতাবিস্তান।

দুই
লেখক ৮ই ডিসেম্বর ঢাকা থেকে পি.আই.এ. বিমানে করে ক্যান্টন আসেন। ক্যান্টন থেকে চীনা বিমানে তিনি পিকিং পৌঁছান। বিমান বন্দরে কমিটির প্রধান হয়ে অভ্যর্থনা জানাতে এসেছিলেন পিকিং ভাষা বিশ্ববিদ্যালয়ের চাকুরে “কমরেড শে”। বিমান বন্দর থেকে পিকিং ভাষা বিশ্ববিদ্যালয়ের দূরত্ব প্রায় ২০ মাইল। পথে যেতে যেতে লেখক চীনের প্রকৃতি ও মানুষকে প্রথমবারের মত দেখতে পেয়েছিলেন। নতুন দেশ চীনে লেখকের চোখে সবকিছুই নতুন মনে হয়েছিল।
পিকিং ভাষা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রাবাসটি ৪তলা বিশিষ্ট। ছেলে মেয়ে একই ছাত্রাবাসে থাকে। উপরের তলাটি শুধু মেয়েদের জন্য বরাদ্দ করা হয়। সারা হলে একটি মাত্রা দরজা রয়েছে। সেখানে দারোয়ান অত্যন্ত নিষ্ঠার সাথে তার দায়িত্ব পালন করেন। হলটিতে ছাত্র-ছাত্রী যারা রয়েছেন তারা সবাই বিদেশী। রুমগুলো খুব ছোট ছোট। স্বচ্ছন্দে চলাচল করবার অনুপযোগী। বিশ্বের নবগুলো দেশের মুসলিম ছাত্রদের জন্য ছাত্রাবাসটিতে আলাদা খাবার ঘর রয়েছে। সেখানে প্রত্যেককেই নিজের টাকায় খাবার কিনে খেতে হয় ।
চীনা ভাষা আয়ত্ত করা কঠিন। এই ভাষার প্রকৃত নাম হচ্ছে হান ভাষা। প্রাচীনকালে হান সম্প্রদায় কয়েক শতাব্দী ধরে চীন শাসন করেছে। তাদের মুখের ভাষাই শেষ পর্যন্ত সমগ্র চীনের জাতীয় ভাষায় প্রতিষ্ঠা পেয়েছে। এই ভাষায় কোন রকম অক্ষর নেই। চিত্রের মাধ্যমে এ ভাষা গড়ে উঠেছে। মোট ৫০হাজার চিত্র রয়েছে চীনা ভাষায়।
চিত্রগুলো মনে রাখা দুরূহ ব্যাপার। তবে তিন হাজার চিত্র আয়ত্ত্বে এলেই কোন রকম কাজ চালিয়ে নেয়া যায়। ১৯৫৮ সালের আগে চিত্রগুলো আরও কঠিন ছিল। ১৯৫৮ সালে সেগুলো কিছুটা সংষ্কার করা হয়। যেমন ‘রাআন’ শব্দটির অর্থ মানুষ।
‘রাআন’ শব্দটির চিত্ররূপ ছিল ১৯৫৮-এর আগে মানুষের দেহ, একটি মাথা, দুটো হাত এবং দুটো পা। সংস্কারের পরে রাআন শব্দটির দেহ, মাথা, পা বাদ পড়ে শুধু হাতদুটো টিকে আছে। চিত্রাক্ষরগুলোকে চীনা ভাষায় হাজি বলা হয়।
বিশ্বের অন্যতম প্রাচীন সভ্যদেশ চীনের সঠিক ইতিহাস জানবার জন্য ভাষা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভাষা শিক্ষার পাশাপাশি সপ্তাহে একদিন ইতিহাসের ক্লাসের ব্যবস্থা ছিল।
অতি প্রাচীনকাল থেকে চীনদেশের নানারকম প্রচলিত নাম এবং ‘চীন’, ‘হান’, ‘বাং’, ‘চিং’ প্রভৃতি রাজবংশের নানা ইতিহাস, চীন নামের উৎপত্তি, চীনের ভৌগলিক পরিবেশ প্রভৃতি বিষয়গুলো লেখকের কাছে স্পষ্ট হয়েছিল।
চিন থেকে চীন নামের উৎপত্তি হয়। করদ রাজ্য চিন্ চৌ বংশের প্রচেষ্টায় শক্তিশালী হয়ে ওঠে এবং রাজ্যের নাম অনুযায়ী চৌ বংশের নাম হয় ‘চীন’ রাজবংশ। এই নামটি বিশ্বের বিভিন্ন দেশে ক্রমেই ছড়িয়ে পড়ে এবং সারা বিশ্বে চিন্ নামটিই প্রতিষ্ঠা পায়। চীনের পরিধি পায় ৫০ হাজার বর্গমাইল। এদেশের প্রাচীন অধিবাসীদেরকে ৬টি সম্প্রদায়ে ভাগ করা হয়েছে। (১) হান (২) মিয়াও (৩) মাঞ্চু (৪) মঙ্গোল (৫) মুসলমান (৬) তিব্বতীয়। হান সম্প্রদায় চীনের প্রকৃত প্রতিনিধি। এদের ভাষাই চীনের জাতীয় ভাষারূপে স্বীকৃতি পেয়েছে। বিপ্লবের আগে চীনে মুসলমানের সংখ্যা ছিল প্রায় ১০ কোটি। মুক্তির পরে সে সংখ্যা ৯ কোটিতে এসে দাঁড়ায়।
২৮শে ডিসেম্বর গণচীনের উচ্চশিক্ষা অধিদপ্তর বিশ্বের সমস্ত ছাত্রছাত্রীকে গ্রেটহলে অভ্যর্থনার জন্য আমন্ত্রণ জানান। গ্রেট হলে ঢুকে লেখক এর পরিধির সংগে নামের সার্থকতা খুঁজে পেয়েছিলেন। চীনারা বাইরে আড়ম্বরহীন জীবন যাপন করে তবে এদের মঞ্চের জীবন অত্যন্ত চাকচিক্যপূর্ণ। বিরাট মঞ্চ, ২০০ হাত লম্বা ও ১০০ হাত চওড়া হবে। ঘরময় ফুল সাজানো।
গ্রেট হলের মূল ঘরে ১০ হাজার লোকের বসবার ব্যবস্থা রয়েছে। সমস্ত হলঘর আলোর তরা মেঝে ঝকঝকে দামী কার্পেটে মোড়া। তিনি দেখেছিলেন মন্ত্রীর বা কোন বিশিষ্ট ব্যক্তির আগমনে সেদেশে কোন রকম চাঞ্চল্য সৃষ্টি হয়না। বৈষম্যহীন সমাজ ব্যবস্থায় সেখানে সবাই সমান। অভ্যর্থনা অনুষ্ঠানে বিশ্ব রাজনীতির গতি-প্রকৃতি নিয়ে আলোচনা করা হয়।
মঞ্চ পরিচালনায় চীনারা প্রশংসার দাবী রাখে। একটির পর একটি প্রোগাম তারা বিন্দুমাত্র সময় অপচয় না করেই পরিবেশন করতে পারে। চীনা সংস্কৃতিতে মূলত সংগ্রামী দিকটাই বেশী স্পষ্ট হয়ে ওঠে। তবে ইংরেজদের বর্ষবরণ উৎসব চীনারা উৎসাহ ও উদ্দীপনার সাথে পালন করে। সেখানে বছরে দু’বার নববর্ষের উৎসব পালন করা হয়। ২০শে জানুয়ারী পালন করা হয় গনচীনের জাতীয় নববর্ষ।
লেখক দেখতে পেয়েছিলেন গনচীনের প্রতিটি ক্ষেত্রে মাও সে-ভূত এর আদর্শ প্রতিষ্ঠিত। প্রতিটি কথায়-কাজে, চিন্তায়-ভাবনায়, শিল্পে, সাহিত্যে, সঙ্গীতে সর্বত্রই মাও সে-তুঙ এর প্রসঙ্গ। সেদেশের সংস্কৃতি মূলত প্রচারমূলক। সঙ্গীত চীনাদের জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ। তাঁরা প্রত্যেকেই সংগীত চর্চা করেন। ইংরেজী বর্ষবরণ অনুষ্ঠানে লেখককেও একটি পাকিস্তানী গান গেয়ে শোনাতে হয়েছিল। তাদের প্রত্যেকটি উৎসবই আকর্ষণীয় ও সুন্দর।
চীনের সম্রাটদের গ্রীষ্মকালীন বাসভবনটি দেখতে গিয়েছিলেন লেখক। অপরূপ প্রাকৃতিক সৌন্দর্যে ঘেরা এই ভবনগুলো দর্শনার্থীদের মুগ্ধ করে। তাছাড়া বিভিন্ন শিল্পকর্ম ভবনের সৌন্দর্যকে আরও আকর্ষণীয় করে তুলেছে। ভাস্কর্যগুলো এত বেশী জীবন্ত যে লেখক একটি সাপের ভাষ্কর্য দেখে ভয়ে চিৎকার করে উঠেছিলেন। বাং চিং অথবা মাঞ্চু সম্রাটদের সময় নির্মিত হয় এই সব গ্রীষ্মভবন।
গণচীনে মুসলিম সম্প্রদায়ের পবিত্র ঈদুলফেতর উৎসব উদ্যাপিত হয় না। পিকিং এ লেখক ও অন্যান্য মুসলমান ছাত্ররা প্রথম ঈদ পেয়েছিলেন ২৩শে জানুয়ারী। বিভিন্ন দেশের মুসলিম ছাত্র-ছাত্রীরা নিজ নিজ দেশের রাষ্ট্রদূত ভবনে নামাজ আদায়ের সুযোগ পেয়ে থাকেন। মসজিদের ইমামের দাড়ি পাগড়ী আলখেল্লা থাকে ঠিকই তবে ইমাম সাহেব তার ভাষণে মূলত মাও সে-তুঙ এর বাণীর প্রচার করে থাকেন। চীনা মুসলমানদের সংখ্যা খুব কম। নামাজীদের মধ্যে তরুণ বা কর্মক্ষম লোক একেবারেই চোখে পড়ে না। যারা ধর্মকর্ম করেন তারা সবাই বৃদ্ধ।
পিকিং থেকে থিয়েন চীয়েন ট্রেনে দুঘন্টার পথ। লেখক আবদুল খালেকসহ অন্যান্য ছাত্র-ছাত্রীরা পিকিং আসার পর এই প্রথম বাইরে যাবার সুযোগ পেয়েছিলেন। পিকিং রেলওয়ে ষ্টেশনটি লেখকের খুব ভালো লেগেছিল। বিরাট ষ্টেশনের চারিদিক ফুলে ফুলে ভরা। চলন্ত সিঁড়ির ব্যবস্থা রয়েছে ষ্টেশনে। ষ্টেশনের ওপর তলায় রয়েছে পাঠাগারের ব্যবস্থা। চীনারা মুহূর্ত সময়ও অপচয় করেনা। সময় পেলেই তারা পড়ে।
ষ্টেশন বলতেই যে ছবিটি ফুটে ওঠে তার সাথে লেখক পিকিংএর ষ্টেশনের কোন মিল খুঁজে পাননি। ষ্টেশনে কোন ভীড় নেই কোন হৈ চৈ নেই। হকার বিক্রেতাদের দৌরাত্ম্য নেই। পিকিং এর ট্রেনে দুটো শ্ৰেণী আছে। প্রথম শ্রেণীতে আরামপ্রদ ব্যবস্থা শুধুমাত্র বৃদ্ধ এবং বিদেশীদের জন্য আর দ্বিতীয় শ্রেণী বাকিদের জন্য। ছাত্র-ছাত্রীরা অবশ্যই দ্বিতীয় শ্রেণীতে ভ্রমণ করবে। ট্রেনের প্রতিটি কামরায় মাইক সেট করে রাখা হয়েছে। এগুলোতে মাও সে-তুঙ বাণী প্রচার করা হয়। ট্রেনে মহিলা পরিচারিকা আছেন তারা যাত্রীদের সমস্যাগুলো দেখেন। ট্রেনের কামরাগুলো ঝকঝকে পরিষ্কার। রেল কর্মচারীদের বেশীর ভাগই মহিলা।

থিয়েন চিয়েন শহরটি সুন্দর। জাপানীদের হাতে গড়া এই শহরটিতে অসংখ্য শিল্প কারখানা রয়েছে। থিয়েন চিয়েন সাইকেল তৈরীর কারখানায় গিয়েছিলেন লেখক। ১৯৩৬ সালে জাপানীদের হাতে কারখানাটি প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল। বিপ্লবের পরে কারখানাটি অনেক উন্নত হয়ে ওঠে। পাঁচ’শ নারী-পুরুষ সেখানে কাজ করে। প্রতি ৫ মিনিটে কারখানায় একটি করে সাইকেল প্রস্তুত হয়। থিয়েন-চিয়েনের একটি কাপড়ের মিলে গিয়েছিলেন লেখক। এই মিলটিও জাপানীদের হাতে তৈরী। মিলের প্রতিটি শ্রমিক মাও সে-তুঙ আদর্শে অনুপ্রাণিত।
চীনে লেখাপাড়ার ফাঁকে ফাঁকে ছাত্র-ছাত্রীরা বিভিন্ন দর্শনীয় স্থান দেখবার সুযোগ পান। চীনের যাদুঘর দেখবার সুযোগ পেয়েছিলেন লেখক। তিয়েনআনমেন স্কোয়ারের এক পাশে গ্রেট হল অন্যদিকে চীনের ঐতিহাসিক যাদুঘর অবস্থিত। ১৯৫৮ সালে এটি নির্মিত হয়। দুষ্প্রাপ্য প্রায় নয় হাজার দর্শনীয় বস্তু এই যাদুঘরে সংরক্ষণ করা হয়েছে।
আধুনিক স্থাপত্যকলার নিদর্শন হিসেবে পরিচিত চীনের এই যাদুঘর। যাদুঘরটিতে হলগুলোর বিভিন্ন নাম রয়েছে ১. প্রিমিটিভ সমাজের হল ২, স্লেভ সমাজের হল ৩. ফিউডাল সমাজের হল। এই হলগুলোতে স্ব-স্ব সমাজের উল্লেখযোগ্য বৈশিষ্ট্য ও নিদর্শনগুলো স্থান পেয়েছে।
ঐতিহাসিক যাদুঘরটির সামনেই নির্মিত হয়েছে শহীদ স্মৃতিস্তম্ভ। সাদা মার্বেল পাথরে তৈরী এই স্মৃতিস্তয়টি মুক্তি সংগ্রামে বিপ্লবী শহীদদের উদ্দেশ্য নির্মিত হয়েছে। এখানে ১৮৪০ এর আফিম যুদ্ধ থেকে শুরু করে গণচীনের মুক্তি পর্যন্ত যে ইতিহাস রচিত হয়েছে, মার্বেল পাথরে খোদাই করে সে ইতিহাস চিত্রের মাধ্যমে ধরে রাখা হয়েছে।
চীনে ২১শে ফেব্রুয়ারী পালন করেছিলেন লেখক সহ অন্যান্য পকিস্তানীরা। পাক-রাষ্ট্রদূত অফিসের ষ্টেনো মিঃ সোলায়মান সাহেবের বাসায় তারা এ অনুষ্ঠান পালন করেন। সন্ধ্যায় পাক-চীন মৈত্রী সংঘের পক্ষ থেকে ডিনার পার্টি ছিল। সংঘের সভাপতি ছিলেন মুসলমান। তিনি পাকিস্তান সম্পর্কে অনেক উচ্চ ধারণা পোষণ করেন। ডিনারের বিশেষ আকর্ষণ ছিল চীনের বিখ্যাত পিকিং ডাক্।
লেখক ও তাঁর সঙ্গীরা এই ডিনার পার্টিতে প্রথম পিকিং ডাকের স্বাদ গ্রহণ করেন। এছাড়াও চীনারা কোন ভোজসভায় বহু আইটেম তৈরী করে। কমপক্ষে ২০টি আইটেম রাখেন তারা যে কোন ভোজসভায়। খাবার ফাঁকে নানা আলোচনায় রাষ্ট্রভাষার প্রসঙ্গ এলে পাকিস্তানীরা উর্দু নয়, বাংলাই একমাত্র পাকিস্তানীদের রাষ্ট্রভাষা এই সত্য কথাটি জানিয়ে চীনাদের ভুল ভাঙ্গিয়েছিলেন এবং তাঁরা চীন দেশের বিশ্ববিদ্যালয়ে উর্দুর সংগে বাংলাভাষাকেও বহাল রাখার দাবী জানান। পিকিং রেডিওতে তাঁরা বাংলা প্রোগ্রাম চালু করার পরামর্শ দেন।
২৩শে মার্চ পাকিস্তানের সাধারণতন্ত্র দিবস উপলক্ষে পাক-চীন মৈত্রী সংঘ এক ভোজ সভার আয়োজন করেছিল। গ্রেট হলে অনুষ্ঠিত এই ভোজ সভায় প্রধানমন্ত্রী চৌ এন-লাই সহ বহু মানী লোকের সমাগম হয়েছিল। সাধারণ পোশাক পরিহিত চৌ এন-লাই তাঁর বক্তব্যে চীন-মৈত্রী বন্ধনকে আরও জোরদার করবার অভিপ্রায় ব্যক্ত করেছিলেন।
ভোজ শেষে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান পরিবেশিত হয়েছিল। অনুষ্ঠানের ফাঁকে ফাঁকে দেখানো হয়েছিল চীনা এক্রোবাইটিক্স। অনুষ্ঠানের শেষে পাক-বন্ধুদের অনুরোধে লেখক একটি লোক সঙ্গীত পরিবেশন করেছিলেন। যা চীনাদের প্রচুর আনন্দ দিয়েছিল।
পাক-চীন মৈত্রী সংঘের কর্মকর্তারা পিকিং এ বাংলা বিভাগ খোলার যে প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন সে অনুযায়ী তারা খুব তাড়াতাড়ি পিকিং ব্রডকাষ্টিং ইনস্টিটিউটে বাংলা বিভাগ চালু করেন। পশ্চিম পাকিস্তান থেকে অধ্যাপনা করতে এসেছিলেন অধ্যাপক আনোয়ার এবং পূর্ব পাকিস্তান থেকে এসেছিলেন ফয়েজ আহমেদ।
পিকিং ভাষা বিশ্ববিদ্যালয়েও বাংলা এবং উর্দু বিভাগ খোলা হয়। এবং বাংলা পাড়ানোর দায়িত্ব পড়ে লেখকসহ তিনজন পূর্ব পাকিস্তানীর উপর। যে অধ্যাপকরা পাকিস্তানী ছাত্রদের চীনা ভাষা শিক্ষা নিতেন তারাই আবার সেই ছাত্রদের কাছে বাংলা ভাষা শিক্ষা নিতেন। তবে চীনা ভাষার তুলনায় বাংলা অনেক সহজ ও বিজ্ঞানসম্মত বলে শিক্ষার্থীরা সহজেই তা বুঝতে পেরেছিলেন।
পিকিং ভাষা বিশ্ববিদ্যালয়ের কাছাকাছি কমিউনগুলোতে লেখক প্রায়ই যেতেন। কমিউনগুলোর সর্বত্রই দারিদ্রোর ছাপ সুস্পষ্ট। ছোট ছোট আধভাঙ্গা ঘরে কোন রকমে মানুষ বসবাস করছে। পরিবেশ আবর্জনাপূর্ণ, নোংরা। চলাফেরা করতে রুমালে মুখ ঢাকতে হয়। কমিউনগুলোতে বিদেশীদের অবাধ চলাচলের ব্যবস্থা নেই।
চীনারা ঈদ উৎসব পালন করেন না বলে বিশ্বের মুসলমান ছাত্র-ছাত্রীরা কোন অসুবিধায় পরেননি। তারা দুম্বা কোরবানী করে পিকিং এর মসজিদ টুম-সি পাইলোতে নামাজ আদায় করেছিলেন।
পিকিং জেলখানাটি প্রতিষ্ঠিত হয় ১৯১১ সালে। বিপ্লবের আগের তুলনায় বন্দীর সংখ্যা সেখানে অনেক কম। চীন দেশে চুরি, ডাকাতি নেই বলে এই সংখ্যা প্রায় শূন্যের কোঠায় এসে দাঁড়িয়েছে। এখন যারা বন্দী হয়ে আছেন জেলখানায় তারা সবাই রাজবন্দী। বন্দীদের মারপিট বা গালাগাল দেবার রেওয়াজ এখানে নেই। বন্দীরা সবাই যার যার কাজে ব্যস্ত থাকে। আট ঘন্টা দৈহিক পরিশ্রম, আট ঘন্টা লেখাপড়া এবং আট ঘন্টা ঘুম এই নিয়মের বাইরে তাঁরা যেতে পারেন না। তবে মাসে একদিন আত্মীয় স্বজনের সংগে দেখা করবার সুযোগ আছে। বন্দীদের খাবার, পোশাক-পরিচ্ছদ এবং কাজকর্মের সাথে সাধারণ মানুষের কোন পার্থক্য লক্ষিত হয়না।
পিকিং-এর ইসলামিক একাডেমিতে গিয়েছিলেন লেখক, ডিরেক্টর জানিয়েছিলেন মুসলমানরা চীনে ধর্মীয় স্বাধীনতা পুরোপুরি ভোগ করবার সুযোগ পান।
চীনে ১লা মে বিশেষ মর্যাদার সাথে পালন করা হয়। দেশের সব মানুষ সেদিন ছুটি পায় উৎসবে যোগ দেবার জন্য। সমগ্র চীন সেদিন উৎসবমুখর হয়ে ওঠে।
৩রা মে লেখকসহ অন্যান্য ছাত্র-ছাত্রীরা গিয়েছিলেন চীনের প্রাচীর দেখতে। প্রাচীরের পাদদেশে রয়েছে আন্ডার গ্রাউন্ড প্যালেস (মিং রাজাদের সমাধিভূমি)। প্রাচীরের দৈর্ঘ্য ১৬৮৪ মাইল। এটি সম্ভবতঃ খ্রীঃ পুঃ পঞ্চম থেকে তৃতীয় শতাব্দীর মধ্যে নির্মিত হয়েছিল। আন্ডার গ্রাউন্ড প্যালেসের কথায় গাইড জানিয়েছিলেন। ২০ হাজার শ্রমিক এবং ইঞ্জিনিয়ারের চেষ্টায় এই স্বর্গরাজ্য গড়ে ওঠে। এবং সেই সব কর্মীদের আর বাইরে আনা হয়নি। জীবন্ত সমাধি দেয়া হয়েছে। সমাধিক্ষেত্রে গিয়ে সেখানকার বিচিত্র ইতিহাস দেখেশুনে লেখক বিস্মিত হয়েছিলেন।
সমাজতান্ত্রিক ভাবাদর্শে দীক্ষিত চীনারা শ্রেণীভেদ প্রথাকে একবারেই নিশ্চিহ্ন করে দিতে চায়। শিক্ষাবিদদের জীবনযাত্রার মান সমাজে কয়েক ধাপ ওপরে রয়েছে। এটা তাদের পছন্দ নয়। সব শ্রেণীর মানুষকে একই আদর্শে অনুপ্রানিত করবার জনাই সমগ্র চীন জুড়ে শুরু হয়েছিল সাংস্কৃতিক বিপ্লব।
দেশের বুদ্ধিজীবী সম্প্রদায়ের সাথে রেডগার্ডদের মতপার্থক্য চরমে পৌঁছলে সাংস্কৃতিক বিপ্লব চূড়ান্ত রূপ নেয়। শুরু হয় অত্যাচার নিপীড়ন। পরে দেশই চলে যায় রেডগার্ড অর্থাৎ সমাজতান্ত্রিক বিপ্লবীদের হাতে। মাও সে-তুঙ এর আদর্শ বাস্তবায়নে যেটুকু অপূর্ণতা ছিল তা পুরো করবার জন্যই এই সাংস্কৃতিক বিপ্লবের সূচনা হয়েছিল।
গ্রীষ্মের ছুটিতে ২৩শে জুলাই ট্রেনযোগে ভাষা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র-ছাত্রীরা গিয়েছিলেন চীনের হ্যাংচাও এ। পিকিং থেকে হ্যাংচাও ৪০ ঘন্টার পথ। হ্যাংচাও এর প্রাকৃতিক দৃশ্য খুব সুন্দর। ইয়াংসি নদী দেখে লেখকের পদ্মাকে মনে পড়ে গিয়েছিল। হ্যাংচাও থেকে তাঁরা গিয়েছিলেন সাংহাই। সাংহাই এর সরল জীবন যাত্রা লেখকের ভালো লেগেছিল। এখানে তাঁরা বিপ্লবী কবি পুসুন এর সমাধিভূমি দেখেছিলেন।
সাংহাই থেকে শিক্ষার্থীরা গিয়েছিলেন ঊষিতে। ঊষি প্রাকৃতিক সৌন্দর্যে ভরপুর এক ছোট শহর। এখানকার মানুষেরা ধীর-স্থির এবং নম্র। ছোট শহর হলেও দেখবার মতো কারখানা, চা বাগান, কমিউন, শিল্প কারখানা আছে এখানে। উষি থেকে তাঁরা গিয়েছিলেন নানকিং। আড়াই হাজার বছর আগে ইয়াংসি নদীর নিচু অঞ্চলে নানকিং শহর গড়ে ওঠে। গণচীনের প্রথম প্রেসিডেন্ট ডঃ সানিয়াৎ সেন নানকিংকে গণচীনের রাজধানী ঘোষণা করেছিলেন।
ছুটি শেষে শুধুমাত্র বিদেশীদের জন্য ক্লাস, বিশ্ববিদ্যালয় খোলা রেখে চীনাদের জন্য সব বন্ধ করে দেয়া হয়। কিন্তু অল্পকালের মধ্যেই সাংস্কৃতিক বিপ্লব দেশময় ছড়িয়ে পড়ায় সরকার সেদেশের সমস্ত বিশ্ববিদ্যালয় বন্ধ করে দেন এবং সমস্ত বিদেশী ছাত্র-ছাত্রীদের দেশ ত্যাগ করবার নির্দেশ দেয়া হয়। ৫ই অক্টোবর লেখক ও অন্যান্য ছাত্ররা পিকিং থেকে দেশে ফিরে আসেন।

তিন
গণচীনের পিকিং এ চীনা ভাষা পড়তে গিয়ে লেখক শুধু ভাষা শিক্ষার কাজেই নিজেকে ব্যাপৃত রাখেননি। লেখাপড়ার পাশাপাশি তিনি প্রতিটি মুহূর্তকে কাজে লাগিয়েছেন চীন সম্পর্কিত নানা তথ্য সংগ্রহে। গণচীনের মানুষ, রাষ্ট্র, সমাজ ব্যবস্থা, সভ্যতা, সংস্কৃতি, আদর্শ ও মতবাদ প্রভৃতি বিষয়গুলো নিয়ে তিনি অনুসন্ধান করেছেন। মূলত গণচীনের সামগ্রিক জীবন পদ্ধতির একটা বাস্তব অভিজ্ঞতার পটভূমিতে তিনি চীনের নানা বৈশিষ্ট্যের সন্ধান দিয়েছেন এবং স্বদেশের সাথে তুলনামূলক আলোচনায় দু’দেশের মধ্যে সাদৃশ্য ও বৈশাদৃশ্যের বিষয়গুলো নির্দিষ্ট করেছেন।
চীনের সমাজ ব্যবস্থা লেখককে সবচেয়ে বেশী মুগ্ধ করেছিল। মানুষে মানুষে বিভেদ তিনি দেখতে পাননি কোথাও। সমাজে সব শ্রেণীর মানুষ সেখানে সমমর্যাদায় প্রতিষ্ঠিত। চীনের বিভেদহীন সমাজব্যবস্থা, যা মুক্তির একমাত্র পথ স্বদেশের বৈষম্যনীতির জন্য তিনি এ ব্যবস্থাকে জরুরী মনে করেছেন।
সোলায়মান সাহেব জিজ্ঞেস করলেন এ দেশের জীবন প্রণালী কেমন লাগছে? অদ্ভুত, অপূর্ব। সামান্য দু’দিনের মাত্র দেখা, তবুও এখানকার জীবন প্রণালী এত ভালো লাগছে যে তা ভাষায় প্রকাশ করতে পারবো না। এদেশের কে ধনী, কে গরীব, কে রাজা, কে প্রজা কে শ্রমিক, কে মালিক, কে কৃষক কে অধ্যাপক কিছুই তো পার্থক্য দেখছি না। মোটের ওপর সে দেশের সমাজ ব্যবস্থা আমাকে মুগ্ধ করেছে। এ ধরণের সমাজ ব্যবস্থাই আমাদের কাম্য। আমাদের মুক্তির একমাত্র পথ। আমাদের দেশেও এই ধরনের সমাজ ব্যবস্থার জন্য সংগ্রাম চালাতে হবে। ২
পিকিং এর মানুষ ও প্রকৃতির সংগে লেখক স্বদেশের কোন মিল খুঁজে পাননি। সেখানকার সব কিছুই তাঁর কাছে নতুন মনে হয়েছিল। তবে ক্যান্টনের সাথে লেখক দেশের আবহাওয়া, প্রকৃতি ও ঘরবাড়ির প্রচুর সাদৃশ্য খুঁজে পেয়েছিলেন। তিনি লক্ষ্য করেছিলেন ক্যান্টন থেকে পিকিং এর আবহাওয়া একেবারেই আলাদা । ডিসেম্বরে ক্যান্টনে যখন কোট গায়ে রাখা যায়না পিকিং এ তখন হাড় কাঁপানো শীত। দিনরাত বরফ পড়ে। গাছে কোন পাতা থাকেনা।
জানুয়ারীতে সেখানে বাঘা শীত পড়ে। অনবরত তুষারপাত হয় তখন। পথে ঘাটে হাটু পর্যন্ত বরফ জমে ওঠে। চলাচল সমস্যা হয়ে যায়। পিকিং এর আবহাওয়াকে ঠিক বোঝা যায় না। মার্চে সেখানে কখনও ভালো আবহাওয়া আবার কখনও তুষার বৃষ্টি হয়। জুলাই এর দিকে শীতের দাপট অনেকটা কমে আসে। সেখানকার গ্রীষ্মকালীন আবহাওয়া খুব সুন্দর।
পরিষ্কার পরিচ্ছন্নতায় চীন দেশ অনেক অগ্রসর। প্রায় সর্বত্রই লেখকের চোখে পড়েছে ঝকঝকে সুন্দর পরিবেশ। পরিষ্কার পরিচ্ছন্নতার কাজে সেদেশের সকল স্তরের লোক পালাক্রমে অংশগ্রহণ করে। এটাই সেদেশের স্বাভাবিক নিয়ম। চীনাদের বাজারগুলোও অত্যন্ত পরিষ্কার। প্রতি ঘন্টায় ঘন্টায় তারা বাজারের পরিচ্ছন্নতার কাজটি সম্পন্ন করে।
তবে কোথাও কোথাও যে অপরিচ্ছন্ন পরিবেশ তাঁর চোখে পড়েনি এমন নয়।
ঝকঝকে উজ্জ্বল চীনের সজাগ পরিচ্ছন্নতার আড়ালেও যে কোথাও অপরিচ্ছন্ন পরিবেশ রয়ে গেছে লেখকের অনুসন্ধিৎসু চোখ সেটি আবিষ্কার করেছিল। বাসগুলোতে লেখক লক্ষ্য করেছেন যাত্রীদের পোশাক পরিচ্ছদ যথেষ্ট অপরিষ্কার। এছাড়াও চীনের কমিউনগুলোর পরিবেশ উল্লেখযোগ্যভাবে নোংরা এবং অস্বাস্থ্যকর যা পাকিস্তানের নোংরা বস্তিকেও হার মানায়।
কমিউনগুলোর আশ-পাশ ময়লা আবর্জনায় ভরপুর। পাশদিয়ে চলবার সময় রুমালে মুখ ঢাকতে হয়, অথচ সেখানে অবাধে এদেশের লোকজন বসবাস করছে। আমাদের দেশের সবচেয়ে নোংরা বস্তি এলাকা অপেক্ষাও এগুলোকে অধিক নোংরা এবং দুর্গন্ধময় মনে হোল । ৩
চীন দেশের রাস্তাগুলো প্রশস্ত। যানবাহন চলাচলের সুব্যবস্থাও রয়েছে সেখানে। কিন্তু সেখানকার যানবাহনগুলোর মান ভালো নয়। শুধুমাত্র বাস ছাড়া সেদেশে চলাচলের কোন ভালো বাহন নেই। আকাশ পথেরও ঐ একই অবস্থা। বিমানের আসনগুলোর মান খুবই নিচু এবং জায়গা কম। বাসগুলোতেও চলাফেরা সুখকর নয়। প্রচন্ড ভীড়ের চাপ সর্বত্রই লেখকের চোখে পড়েছে। চীনের কিছু জাতীয় বৈশিষ্ট্য এবং সেখানকার আরো কয়েকটি বৈশিষ্ট্যের সন্ধান পেয়েছিলেন লেখক।
পোশাকে তালি, হাতে কাজ, মুখে গান, বিলাসিতার পরিবর্তে কৃচ্ছতা সাধন, সাম্যেরনীতি, সর্বত্রই কঠোর নিয়ম শৃঙ্খলা মেনে চলা ও সময়ের প্রতিটি মুহূর্তের সদ্ব্যবহার করা এবং রাষ্ট্র ও সমাজের প্রতিটি ক্ষেত্রে নিষ্ঠা ও দায়িত্ব বোধ সম্পর্কে সজাগ দৃষ্টিভঙ্গি – প্রভৃতি বৈশিষ্ট্যগুলো চীনা জনজীবন, দেশ ও জাতিকে দিয়েছে নতুন দিকনির্দেশনা ।
লেখক লক্ষ্য করেছিলেন চীনে প্রয়োজনের তুলনায় বাড়ী ঘরের সংখ্যা কম এবং সেগুলো আকৃতিতে ছোট। কোন রকম স্থান সংকুলানের জন্য তৈরী হয়েছে সেসব। খোলামেলা পরিবেশ ঐসব আবাসগৃহে একেবারেই পাওয়া যায় না।
ঘর তো নয় যেন একটি কবুতরের খোপ। পাশাপাশি দুটো বেড। পা ফেলবার জায়গা নেই। ঘরের অবস্থা দেখে দম বন্ধ হয়ে এলো । 8
শ্রেণীহীন সমাজ ব্যবস্থায় লেখক লক্ষ্য করেছিলেন চীনের প্রতিটি মানুষ সমান মর্যাদার আসনে প্রতিষ্ঠিত। ছোট বড়র পার্থক্য সে দেশ সহ্য করে না। সেখানে মন্ত্রীর জন্য কোন আলাদা গাড়ীর ব্যবস্থা নেই। সবার সাথে তাদের ও বাসে চলাচল করতে হয়। শুধু মন্ত্রীই নয় সমাজের উচ্চপদস্থ থেকে শুরু করে নীচু পদমর্যাদা সম্পন্নদেরও মানুষ হিসেবে সামাজিক মর্যাদা এক।
আরে। এ যে আমাদের বাবুর্চী আমিন! আজকের এই নববর্ষের আনন্দ উৎসবে সাধারণ বাবুর্চীও বাদ পড়েনি। এ দেশে মানুষে মানুষে কোন রকম ভেদাভেদ নাই। আমিন হতে পারে একজন বাবুর্চী কিন্তু মানুষ হিসেবে তার মর্যাদা সমাজের সর্বস্তরে স্বীকৃত। কর্মক্ষেত্র ভিন্ন হতে পারে, কিন্তু পিকিং বিশ্ববিদ্যালয়ের ভাইস-চ্যান্সেলর এবং আমাদের রান্নাঘরের বাবুর্চীর সামাজিক মর্যাদা এক। ৫
বিপ্লবোত্তর চীনের শিক্ষাপদ্ধতিতে প্রতিটি মানুষ শিক্ষালাভ করতে বাধ্য। দেশের প্রতিটি ছেলেমেয়েকে লেখা-পড়া শেখানোর দায়িত্ব সরকারের। সে দেশে কোন নিরক্ষর মানুষ তাঁর চোখে পড়েনি। শিক্ষকদের ক্লান্তিহীন কর্মপ্রচেষ্টায় প্রতিটি নাগরিক সুশিক্ষিত এবং স্বশিক্ষিত হয়ে উঠেছে। লেখক বিশেষভাবে লক্ষ্য করেছিলেন চীনা শিল্প ও সাহিত্যে মাও সে তুঙ প্রসঙ্গটি থাকে। মাওহীন কোন কিছু তারা কল্পনাও করতে পারেনা।
গণচীনের বর্তমান শিল্প-সাহিত্য মাও সে-তুঙ এর দ্বারা বিশেষভাবে মোহাচ্ছন্ন। ছোট গল্প উপন্যাস নাটক অথবা কবিতার সূচনা যে ভাবেই হোক না কেন শেষের দিকে মাও সে-তুও এর প্রশংসা অবধারিত। এটি তাদের বর্তমান সাহিত্য চর্চার একটি বিশেষ ধারা। ৬
তবে শিল্প ও সাহিত্য চর্চায় চীনারা মুক্ত বুদ্ধির অধিকারী নয়। কতগুলো বিশেষ গন্ডিতে আবদ্ধ থেকে তারা সাহিত্যচর্চা করে। মূলত ব্যক্তিবিশেষের প্রশংসা এবং একঘেয়ে ও প্রচারমূলক শিল্প ও সাহিত্য সৃষ্টি এদের বৈশিষ্ট্য। প্রেমের কবিতা পাঠ সেদেশে নিষিদ্ধ। তাদের ধারণা প্রেম বিষয়ক কিছু মানুষের মনকে দুর্বল করে ফেলে।
চীন দেশের ব্যালাড পৃথিবী বিখ্যাত। পাকিস্তানের নৃত্যের সাথে চীনা নৃত্যকলার অনেক মিল দেখতে পেয়েছিলেন তিনি। স্বদেশের সাঁওতাল নৃত্যের সাথে চীনাদের নাচের সাদৃশ্য বিশেষভাবে তাঁর চোখে পড়েছিল। সেদেশের গানগুলো একঘেঁয়ে ও বৈচিত্রহীন মনে হয়েছে লেখকের কাছে। প্রতিটি গানের বিষয়বস্তু এক, মাও সে-তুঙ প্রসঙ্গ। অনেকটা বাংলাদেশের এক সময়ের কানুর গীতের মতো।

আরেকটি ব্যাপার লেখকের চোখে বিশেষভাবে ধরা পড়েছিল; সেটি সে দেশের মানুষের সততা। কাথায়, চিন্তায়, কাজে সেদেশের প্রতিটি মানুষ বাধ্যতামূলকভাবে সৎ। সমাজতান্ত্রিক রাষ্ট্র ব্যবস্থার সুনিয়ন্ত্রিত পদ্ধতিতে সরকার পরিচালিত অর্থনৈতিক কাঠামো এই সততার মূল কারণ। সেদেশে চুরি, ডাকাতি, শঠতা প্রবঞ্চনা ইত্যাদি বিষয়গুলো সমূলে উঠে গেছে। চীনে কোন ভিখিরি লেখকের চোখে পড়েনি। ভিক্ষাবৃত্তি সেখানে আইন করে নিষিদ্ধ করা হয়েছে। লেখক সেদেশে ফেত্রা দেবার মত কোন লোক খুঁজে পাননি অথচ স্বদেশে ভিখিরি বিহীন কোন স্থানের চিত্র কল্পনাও করা যায় না।
বুর্জোয়া শ্রেণীর অত্যাচারে জর্জরিত দেশের মেহনতী মানুষ না খেয়ে মরছে। তাদের ঘরে ভাত নেই, পরনে কাপড় নেই, রোগের ওষুধ নেই, তাদের প্রতি জুলমের বিচার নেই। মানবতার এত বড় অবমাননা ক্ষমাহীন। এখন তো প্রায় ১০টা কিন্তু কই, এর মধ্যে একটি ভিখারীও তো এসে বলেনি। আজ তিন দিন হোল পেটে এক ফোঁটা দানা পানি পড়ে নি বাবা, দুটো পয়সা ভিক্ষে দাও।
পথের পাশে এমন কাউকে তো দেখছি না যে নগ্ন দেহের উপর একটি খালা রেখে চীৎকার করে বলছে আমি একজন অন্ধ আঁতুর বাবা, দয়া করে দুটো পয়সা দাও, আল্লাহ তোমার রহম করবে’। কই, এমন দৃশ্য তো এখানে চোখে পড়ছেনা যে একদল লোক হাজার টাকা দামের কোট-প্যান্ট পড়ে অফিসে যাচ্ছেন, আর একদল মানুষ খালি পায়ে লাঙ্গল কাঁধে দাঁত ঠকঠক করতে করতে মাঠের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। মানুষে মানুষে এই যে আকাশ-পাতাল বৈষম্য এর অবসান অপরিহার্য। ৭
চীনে কোন রোগা চেহারার শিশু লেখকের নজরে পড়েনি। সেখানকার প্রত্যেকটি শিশুই সবল ও সুস্থ দেহের অধিকারী এবং প্রত্যেকেই শিশুকাল থেকে স্বাবলম্বী হয়ে উঠবার সুযোগ ও শিক্ষা পায়। তবে চীনে বৈষম্য যে একেবারেই নেই তা বলা যাবে না। কমিউনের জীবনযাত্রা অত্যন্ত দারিদ্রপূর্ণ। বাসগৃহের ব্যাপারে গ্রাম ও শহরের মধ্যে সমতা আসেনি। গ্রামের মানুষের জীবন প্রণালীতে লেখক কষ্টের ছাপ লক্ষ্য করেছিলেন।
তিনি লক্ষ্য করেছিলেন চীনারা শুধুমাত্র বিশেষদিনে পরিমিত মদ পান করে। এছাড়া মনে তাদের কোন নেশা নেই। ‘মানথো’ নামক এক প্রকার পিঠা চীনাদের প্রিয় খাবার। চীনারা খাবারের ব্যাপারে একটা নির্দিষ্ট সময় মেনে চলে। এর বাইরে কেউ খেতে পারেনা। তাদের খাবারগুলো বৈচিত্র্যহীন। নিজের ঘরে ইচ্ছেমত বাবার বানিয়ে খেতে তারা পারে না। এ ব্যাপারে সরকারী নিষেধাজ্ঞা আছে।
সমাজের প্রতিটি মানুষের কাজের চাপে রান্না করার কোন সুযোগ না থাকায় খাদ্য সরবরাহ কেন্দ্র থেকে তাদের খেয়ে নিতে হয়। লেখক লক্ষা করেছিলেন সেখানে টেবিলে এসে কেউ কাউকে খাবার পরিবেশন করে না। যার যার খাবার তাকেই নিজ হাতে নিয়ে আসতে হয়। আরও একটি ব্যাপার তাঁর চোখে পড়েছিল খাবার ঘরে যারা কাজ করেন তাদের প্রত্যেকের কোর্টের সাথে ব্যাজ লাগানো থাকে।
অধ্যাপকের কোর্টেও ঐ একই ব্যাজ তিনি দেখেছিলেন। চীন দেশের মানুষকে দুটো সম্প্রদায়ে ভাগ করা হয়েছে (১) ‘শোয়ে শান’ (ছাত্র সম্প্রদায়) (২) কুংচুঅ রাআন (কাজের মানুষ) ছাত্র জীবন শেষ করার সাথে সাথেই এরা সবাই কুংচুঅ রাজন।
শুধু খাবার নয় গোসলের ব্যাপারেও সেদেশে একটা নির্দিষ্ট সময় আছে। খাবার ব্যাপারে সেখানে মুসলমানদের জন্য পুরোপুরিভাবে ইসলামী বিধিবিধান মেনে চলা হয়। সরকার সেদেশের মুসলমানদের প্রতি সহানুভূতিশীল। তবে সেখানে মুসলমানদের সংখ্যা খুব কম এবং দিন দিনই সে সংখ্যা কমে আসছে। মুসলিম সম্প্রদায়ের ভবিষ্যৎ ভেবে লেখক শঙ্কিত হয়েছিলেন।
সেদেশে নারী-পুরুষের বৈষম্য তাঁর চোখে পড়েনি। উপরন্ত কর্মক্ষেত্রগুলোতে নারীর সংখ্যাধিক্যই তাঁর নজরে পড়েছে। ছেলে মেয়েরা সেখানে একই খেলায় সমবেতভাবে অংশ গ্রহণ করে। পোশাক পরিচ্ছদেও ছেলেমেয়ে অভিন্ন। মহিলাদের জন্য বাসে কোন নির্দিষ্ট আসন তিনি সেদেশে দেখতে পাননি। স্বদেশের নারীর চিত্র মনে করে এবং নারীর কর্মক্ষমতা সম্পর্কে বানোয়াট সীমাবদ্ধতার কথা ভেবে তিনি মর্মাহত হয়েছিলেন।
মেয়েদের কর্মক্ষমতা সম্পর্কে আমাদের দেশে যে সমস্ত মতবাদ প্রচলিত আছে সেগুলো যে কত বড় মিথ্যে প্রবঞ্চনা এদেশের প্রতি পদক্ষেপে তা হারে হারে উপলব্ধি করা যায়।
রাষ্ট্র ও জীবনের সব ক্ষেত্রেই চীনারা কঠোর নিয়ম শৃঙ্খলা মেনে চলে। কোন অবস্থাতেই তারা শৃঙ্খলা ভঙ্গ করেনা। সেখানে শৃঙ্খলা ভঙ্গের দৃশ্য কোথাও তাঁর চোখে পড়েনি। লেখক আরও লক্ষ্য করেছিলেন প্রত্যেকটি চীনা নাগরিক সময়ের যথাযথ মূল্য দিয়ে থাকেন। একটি মুহূর্তকেও তারা অপচয় করতে নারাজ। চীনের সর্বত্রই তিনি এ দৃশ্যের মুখোমুখি হয়েছেন। সেদেশের অনুষ্ঠানগুলো যথাসময়ের এক চুলও এদিক সেদিক করে শুরু হয় না। বাসগুলো যে স্টেশনে যতটুকু থামবার কথা তা থেকে এক সেকেন্ড এদিক-সেদিক হবার উপায় নেই।
নিষ্ঠা ও দায়িত্ববোধে চীনারা অতুলনীয়। দেশাত্মবোধ তাদের ভেতর প্রবল। চীনের যেখানেই তিনি। গিয়েছেন প্রতিটি বিষয়েই তাদের এই একাগ্রতা তাঁর চোখে পড়েছিল। লেখক একটি বিষয় বিশেষভাবে লক্ষ করেছিলেন ফাঁকির প্রবণতা চীনের কোথাও নেই। সেদেশের প্রতিটি নাগরিক নিষ্ঠার সাথে তাদের নিজ নিজ দায়িত্ব পালন করে থাকেন।
নিয়মের ব্য তিক্রম করা এদের স্বভাবে নেই। বৃষ্টির দিনেও মালিরা তাদের গাছে পানি দেবার কাজটি বন্ধ রাখেন না। এ প্রসঙ্গে স্বদেশের কথায় তিনি বলেছেন বাঙ্গালীরা পুরোমাত্রায় সুযোগ সন্ধানী। নিয়মভঙ্গ এদের জাতীয় বৈশিষ্ট্য। এমনকি দেশের বাইরেও তারা শৃংঙ্খলা ভঙ্গ করে তাদের স্বকীয়তার পরিচয় দেয়।
চীনে নেতৃত্ববিরোধ কোথাও লেখকের চোখে পড়েনি। প্রিয় নেতা মাও সে-তুঙ কে দেশের প্রতিটি লোক দেবতা জানে। তাঁর আদর্শকে সামনে রেখে তারা পথ চলে এবং সেই আদর্শকে মনে প্রাণে গ্রহণ করে তারা শুদ্ধ হয়। অথচ স্বদেশে ক্ষমতার দ্বন্দ্ব প্রতিটি স্তরেই রয়েছে।
শিক্ষাক্ষেত্রে চীনারা কঠোর নিয়ম মেনে চলে। যার ফলে সে দেশের প্রতিটি মানুষ শিক্ষিত হয়ে উঠবার সুযোগ পায়। খেলাধূলার ব্যাপারে তিনি দেখেছেন চীনে ক্রিকেট খেলার রেওয়াজ নেই। আরও একটি ব্যাপার তার চোখে পড়েছিল সেদেশে সামরিক কুচকাওয়াজ প্রতিটি নরনারীর জন্য বাধ্যতামূলক।
সঞ্চয়ের প্রবৃত্তি চীনের মানুষের মধ্যে দেখতে পাননি লেখক। গণচীন সরকার সেদেশের প্রতিটি মানুষের জীবনের নিরাপত্তার নিশ্চয়তা বিধান করেছে। জনগণের মৌলিক চাহিদা থেকে শুরু করে প্রতিটি মানুষের প্রয়োজনীয় বিষয়গুলো সরকারী দায়িত্বে সমভাবে পরিচালিত হয়।
চীনে আসার পর থেকেই লেখক লক্ষ্য করেছিলেন সব কিছুকে চেপে রাখা চীনাদের চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য । গোয়েন্দাগিরিতে চীনারা যে পৃথিবী বিখ্যাত এ সত্য তিনিও উপলব্ধি করতে পেরেছিলেন।
সেদেশের একটি জিনিস লেখককে সবচেয়ে বেশী পীড়া দিয়েছিল। চীন দেশে মায়া মমতার বন্ধন বড় শিথিল। তিনি সেখানে দশমাস থাকার পরও একটি পরিবারের সাথে তাঁর ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক গড়ে ওঠেনি। বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকরা কখনও তাদের বাসায় যেতে বলেন না কাউকে। সেদেশে নিজস্ব বলে কিছু নেই। সবই চলছে সরকারী তত্ত্বন্নধানে।
চীনের বিভিন্ন অঞ্চল ঘুরে তিনি বুঝতে পেরেছিলেন সেদেশের সর্বত্রই মানুষের জীবনদর্শন এক তারে বাঁধা নয়। পিকিং এর বাইরে যেমন হ্যাংচাও, সাংহাই, নানকিং এই অঞ্চলগুলোতে মানুষের জীবনযাত্রায় পিকিং এর মত ততোটা কড়াকড়ি নেই। অনেকটাই স্বাধীন এরা চলাফেরায়। চীনের এই শহরগুলোতে ঘুরতে গিয়ে লেখক নিজ দেশের সংগে অনেক মিল খুঁজে পেয়েছিলেন।
তবে চীন সংক্রান্ত নানা বৈশিষ্ট্য এবং তুলনামূলক আলোচনায় লেখকের বক্তব্যে স্পষ্ট হয়েছে সমাজতান্ত্রিক দেশ চীনে ব্যক্তি স্বাধীনতার চেয়ে গোষ্ঠী স্বাধীনতাকেই প্রাধান্য দেয়া হয় বেশী।

চার
‘পদ্মা থেকে ইয়াংসি শুধু একটি ভ্রমণ-কাহিনীই নয়। এ যেন আরো কিছু। সাধারণত ভ্রমণ-বৃত্তান্ত যারা লেখেন প্রায়শই সময়ের স্বল্পতার কারণে নির্ভেজাল সত্য প্রকাশে তাঁরা অপারগ হন। সরকারী সফরকারী অতিথি হিসেবে যারা যান তাঁদের ক্ষেত্রেও ঐ একই সমস্যা সময়ের অভাব এবং সতর্ক প্রহরার বিধিনিষেধ ডিঙ্গিয়ে প্রকৃত সত্য উদ্ঘাটন করা সম্ভব হয়ে ওঠে না। আবার অনেকের দুর্বল অনুসন্ধিৎসা এবং প্রয়োজনীয় জ্ঞান ও সদিচ্ছার অভাবে আসল সত্য চাপা পড়ে থাকে।
আলোচ্য গ্রন্থে এসব ত্রুটির সম্ভাবনা অনেক কম। কারণ দশমাসের প্রতিটি মুহূর্তের গভীর পর্যবেক্ষণ লেখকের চোখে সেদেশের সমাজব্যবস্থা এবং সেখানকার জীবনপদ্ধতির খুব কাছের একটা ছবি ধরিয়ে দিতে পেরেছিল। আর এই সুযোগটি তিনি এই গ্রন্থে পুরোপুরি কাজে লাগিয়েছেন। সেই সাথে যুক্ত হয়েছে লেখকের নিষ্ঠা, সংযম অধ্যাবসায়ী মন সহ প্রয়োজনীয় শিক্ষা।
গ্রন্থটিতে সমসাময়িক চীনের খুঁটিনাটি বিষয়াদি থেকে শুরু করে অনেক গুরুত্বপূর্ণ তথ্যের সন্ধান মেলে, বিশেষ করে চীনের জাতীয় ও সমাজবাস্তবতার অন্তর্নিহিত খবরগুলো মূল্যবান।
পটভূমির বিস্তারে পদ্মা পারের মানুষ এবং ইয়াংসি নদী বিধৌত জনগোষ্ঠীর সমাজ সংস্কৃতি দেশ, কাল, জাতির অনেক অন্তরঙ্গ চিত্র এতে বিধৃত হয়েছে। লেখক শ্রীহীনা প্রিয় পদ্মা এবং ঐশ্বর্যময়ী ইয়াংসির যে চিত্র এঁকেছেন তাতে তাঁর স্বদেশ ভাবনার ব্যাকুলতা বিস্তৃত পরিসরে ছড়িয়ে পড়েছে।
আন্তর্জাতিক সমস্যায় চিন্তাম্বিত তিনি অকপটে অঙ্গুলি নির্দেশ করেছেন অপরাধীদের দিকে। এশিয়ারই এক অংশের একটি দেশ চীনকে সেবায় শিল্পে, শিক্ষায়, স্বাস্থ্যে সকল দেশের সেরা করে গড়ে তোলার জন্য সেদেশবাসীর যে সাধনা এবং অনবদ্য প্রয়াস পাকিস্তানীদের তা অনুকরণের যোগ্যতা অর্জন এবং প্রাচুর্যে ভরা স্বদেশের ক্রম অবনতির মূলে যে আন্তর্জাতিক শোষণ এই অন্যায়ের বিরুদ্ধে দেশবাসীকে জাগ্রত করবার জন্য করুন আর্তি ঝরে পড়েছে তাঁর বিদ্রোহী কন্ঠে।
মাত্র বছর দশেকের ব্যবধান। এর মধ্যে পদ্মার জীবনে ব্যাপক পরিবর্তন এসেছে। পদ্মা আজ তার যৌবন শ্রী হারিয়ে ফেলেছে। কঙ্কালসার একটি প্রতিমূর্তি প্রতি পদক্ষেপে রিক্ততা আর হাহাকার, এখন যে বন্ধ্যা। পদ্মা পারের মানুষ, ধন-ধান্যে পুষ্পে ভরা ছিল যাদের জীবন, প্রাণের প্রাচুর্যে যারা ছিল কানায় কানায় ভরপুর, আজ তারা সর্বহারা, নিঃস্ব।
ইয়াংসির ঐশ্বর্যের দিকে চোখ মেলে তাকাতেই পদ্মার স্মৃতি আমার সমস্ত মন-প্রাণ জুড়ে বসলো। হৃদয়ের তারে তারে যেন সর্বহারা পদ্মার করুণ আর্তনাদ শুনতে পেলাম, আমার স্বাধীন চলার পথে যারা বাধার সৃষ্টি করেছে, আমার স্বাভাবিক গতিপথকে আটকে দিয়ে শ্বাস রুদ্ধ করে মেরে ফেলবার হীন ষড়যন্ত্র যারা করছে, এত বড় অনাচারের বিচার কি পৃথিবীতে নেই? শুনেছি, বন্ধু ইয়াংসির সুদিন এসেছে। তার আত্মশক্তিতে বিশ্বের বড় বড় শক্তি এখন বিচলিত। আমার বেদনার বাণী বলে দাও ইয়াংসির কাছে, ইয়াংসির প্রাণ শক্তি নিয়ে এসো আমার তীরে। আমরা সংবদ্ধ ভাবে সংগ্রাম করি বিশ্ব ভূবন থেকে অন্যায়-অত্যাচার আর জুলুমের শাসন নিশ্চিহ্ন করি।
এতে শুধু ঘটনার বর্ণনা নয়, প্রতিটি বিষয়কে সাহিত্য পদবাচ্য করে তুলেছেন তিনি। এ গ্রন্থে যেসব ঘটনার উল্লেখ করা হয়েছে তার প্রত্যেকটি ইতিহাসের মতই বাস্তব সত্য এবং এতে অভিরঞ্জন ও সত্য গোপনের প্রয়াস কম। অবশ্য কতগুলি বাস্তব ঘটনা পরপর সাজিয়ে গেলেই তা সাহিত্য হয়ে ওঠেনা; ঘটনার সাহিত্যিক রূপের জন্য যে অলংকারের প্রয়োজন হয় সে প্রয়োজনও তিনি মিটিয়েছেন ঘটনাকে আবিকৃত রেখেই ।

একটি ব্যাপারে তাঁর সতর্কতা লক্ষ্য করা গেছে। চীনের পক্ষ এবং বিপক্ষ এই দু’শ্রেণীর পাঠককে সামনে রেখেই তিনি গ্রন্থ রচনা করেছেন। লেখক তাঁর আবেগকে এমন কোন তত্ত্বস্রোতে প্রবাহিত হতে দেননি যা চীন সমর্থক ও বিরুদ্ধবাদী পাঠককে বিরূপ করে তুলতে পারে। মূলত দু’শ্রেণীর পাঠকের মুখের দিকে চেয়ে একটি সহনীয়, গ্রহণযোগ্য সত্য বিবরণের বাইরে তিনি যেতে পারেন নি। এ সম্পর্কে গ্রন্থের প্রসঙ্গ কথায় লেখক বলেছেন-
গণচীন সম্পর্কে আমাদের দেশে দু’ শ্রেণীর অতি উৎসাহী পাঠক বিদ্যামান। এক শ্রেণীর পাঠকের কাছে পণচীন স্বপ্নের দেশ। সে দেশের সবকিছুই সুন্দর। সে দেশের সমাজ ব্যবস্থা সমগ্র বিশ্বমানবের জন্য একমাত্র মুক্তি সনদ। অন্য শ্রেণীর পাঠকের মতে যে দেশে ধর্মের স্বীকৃতি নেই, সমাজ ব্যবস্থায় জনসাধারণের স্বাধীন মতামত প্রকাশের অধিকার নেই, সমগ্র বিশ্বমানবের জন্য সে সমাজ-ব্যবস্থা এক চরম অভিশাপ।
এই দু’শ্রেণীর চরম পন্থী পাঠককে সামনে রেখেই আমাকে ‘পদ্মা থেকে ইয়াংসি’ গ্রন্থটি রচনা করতে হয়েছে। গণচীনের সমাজ ব্যবস্থায় ভালো দিক যেমন আছে আবার মন্দ দিকটিও একেবারে উপেক্ষনীয় নয়। গণচীনের সমাজ ব্যবস্থায় ভালো যতটুকু দেখেছি, প্রশংসা করেছি, মদ যতটুকু পেয়েছি, তুলে ধরতে চেষ্টা করেছি।
তবে একথা ঠিক আমার এ গ্রন্থে গণচীন সম্পর্কে সব সত্য কথা অকপটে প্রকাশ করতে পেরেছি, এমন নারী আমি কিছুতেই করতে পারি না। এ গ্রন্থে যে সত্যটুকু নানাকারণে অলিখিত রয়ে গেল, আগামী দিনের ইতিহাস তার স্বরূপ উদঘাটন করবে। ১০
সমগ্র বইটি পড়ে লেখকের প্রচিত্তিগ্ধ একটি অন্তরের পরিচয় পাওয়া যায়। সরলতায় এ কাহিনী অনবদ্য হয়ে উঠেছে। রচনা শৈলীতে যদিও পেশাদারী লেখকের লিপিকুশলতার অভাব রয়েছে তবু তাঁর এই নিরাভরণ কাহিনী অন্তরকে স্পর্শ করে। রচনার মধ্যে একটি ভক্তিনিষ্ঠ বাঙ্গালী হৃদয়ের সন্ধানও মেলে।
সমগ্র কাহিনীর মধ্যে যে সারল্য এবং স্বতোৎসারিত স্বাভাবিক ভঙ্গীর শৈল্পিক কারুকাজ রয়েছে তা সত্যিই দুর্লভ। চীনের অভিজ্ঞতাগুলোকে লেখক ডায়েরীর পাতায় টুকে রেখেছিলেন। পরে সেগুলোই গ্রন্থকারে প্রকাশিত হওয়ায় পুনরাবৃত্তির ত্রুটি চোখে পড়ে। রচনার ধারাবাহিকতা রক্ষার ক্ষেত্রেও কিছুটা ত্রুটি পাঠককে সমস্যায় ফেলে দেয়।
তবে এসব ছোট খাট ভুল ভ্রান্তি বাদ দিলে যে বিষয়টি পাঠকের চোখে বড় হয়ে ওঠে তা লেখকের একনিষ্ঠ কর্মী মন। চীন দেশে থাকা কালে সেদেশকে গড়ে তোলার ব্যাপারে তিনি যতটুকু দেখেছেন, শিখেছেন এবং অবসরের সবটুকু সময় ওদের সর্বস্তরের মানুষের সংগে মিশে সে জাতির অন্তরের যে পরিচয় পেয়েছেন তা দেশের জনগণের কাছে পৌঁছে দেবার জনাই তিনি এ গ্রন্থ লিখেছেন।
বইটির নামকরণ সার্থক। কারণ পদ্মা পারের মানুষ ও ইয়াংসি নদী বিধৌত জনগোষ্ঠীর যে ছবি সামগ্রিক রূপ নিয়ে গ্রন্থে আবির্ভূত হয়েছে এর উপরে যেন আর কিছুই উঠতে পারেনি। লেখক আলোকচিত্রের মতো অতি খুঁটিনাটি বিষয়েরও স্পষ্ট এবং পরিষ্কার ছবি পাঠকের চোখে ধরে দিতে পেরেছেন। শুধু তাই নয় বস্তুনির্ভরতার সাথে কল্পনার অবধারিত মিশ্রণে তাঁর অভিজ্ঞতালব্ধ জ্ঞানগুলো প্রকৃত চীনা জীবনের সন্ধান দেবার চেষ্টা করেছে।
বস্তুনিরপেক্ষ সত্যে এবং শিল্পসতো, বিচিত্র তথ্যে ভরপুর ‘পদ্মা থেকে ইয়াংসি আধুনিক চীনা সাহিত্যের মধ্যে একটা বিশিষ্ট স্থানের দাবী রাখে।