আজকে আমাদের আলোচনার বিষয়ঃ মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের পদ্মানদীর মাঝি উপন্যাস । যা মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের পাঁচটি উপন্যাসে জীবন ও সমাজ এর মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের উপন্যাসে বিষয় বৈচিত্র্য এর অন্তর্ভুক্ত।

মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের পদ্মানদীর মাঝি উপন্যাস
‘পদ্মানদীর মাঝি” (১৯৩৬) মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের লেখা একটি আঞ্চলিক উপন্যাস। পদ্মার পাড়ে কেতুপুর গ্রাম। গ্রামের বাইরে পূর্ব দিকে জেলেপাড়া। জেলেপাড়ার বাড়িগুলো গায়ে গায়ে লাগানো। এই জেলেপাড়ার জেলেদের জীবন নিয়ে উপন্যাসটি লেখা। উপন্যাসের কেন্দ্রীয় চরিত্র কুবের।
কুবের একজন গরিব জেলে। সে ধনঞ্জয়ের নৌকায় কাজ করে। তার সাথে আছে গণেশ। সারা রাত মাছ ধরে তার অর্ধেক ধনঞ্জয়কে দিতে হয়, আর বাকি অর্ধেক তার আর গণেশের। কুবের না দেখলে এই অর্ধেক থেকেও ধনঞ্জয় মাছ সরিয়ে ফেলে। কুবেরের ঘরে মালা নামের খোঁড়া বউ আর কয়েকটি ছেলে মেয়ে। তার আরো একটি ছেলে হলে গণেশ খুশি হয়ে ওঠে, কিন্তু কুবের বাস্তববাদী, সে খুশি না হয়ে এতোগুলো সন্তানের ভার বহনের চিন্তায় অস্থির হয়:
“শেষে বিরক্ত হইরা কুবের বলিল, চুপ যা গণেশ’। পোলা নিয়া করুম কী নিজে গোল খাওন জোটে না, পোলা।” (২, পৃ-১৯)

সংসারের টানাপোড়েনে মাঝে মাঝে কুবেরকেও চুরি করে মাছ বিক্রি করতে হয়, আবার হোসেন মিয়ার পকেট থেকেও পয়সা চুরি করে। মালার অনুরোধে সে বন্যাকবলিত শ্বশুরবাড়ি যায় এবং শালিকা কপিলাকে নিয়ে আসে। কপিলার স্বামী আরেকটা বিয়ে করেছে, তাই সে স্বামীর বাড়ি থেকে বিতাড়িত। এই কপিলা আসার পর কুবেরের জীবনে পরিবর্তন হয়। সে মালা আর কপিলার পার্থক্য বুঝতে পারে। জীবন সম্পর্কে আহমদ শরীফ বলেছেন:
“জীবনকে শিল্পের রসের মতো, শিল্পের রূপের মতো, শিল্পের অনুভব-উপলব্ধির মতো ভোগ, উপভোগ ও সম্ভোগ করতে হয়, জানতে হয়।
এই বোধেই কুবের এবং কপিলা চরিত্র অঙ্কিত হয়েছে। কপিলার প্রেমে পড়ে সে। অন্যদিকে, হোসেন মিয়ার ময়নাদ্বীপ থেকে পালিয়ে আসা রাসু কুবেরের মেয়ে গোপীকে বিয়ে করতে চায়। কিন্তু কুবের ভালো ছেলে খোঁজে। এর মধ্যে গোপীর পা ভেঙে যায়। তখন কুবের রাসুর সাথে মেয়ে বিয়ে দিতে রাজি হয়। হোসেন মিয়া কুবেরকে তার নৌকায় চাকরি দেয়। কুবের ময়নাধীপে যায়, ময়না বীপ সম্পর্কে জানে। জেনে যায় হোসেন মিয়ার আফিম হেরোইনের ব্যবসা সম্পর্কেও। হোসেন মিয়ার পছন্দের ছেলের সাথে গোপীর বিয়ে দিতে বাধ্য হয় কুবের।

রাসু ক্ষেপে যায়। প্রতিশোধ নেয়ার জন্য তার মামা পীতমের বাড়ি চুরি করে রাসু কুবেরের বাড়ি ঘটি রেখে দিলে পুলিশ এসে তা উদ্ধার করে এবং কুবেরকে খোঁজে। হোসেন মিয়া এই সুযোগে কুবেরকে ময়নার্থীপে যেতে বলে। কুবের জানে হোসেন মিয়া একবার কাউকে ময়ন দ্বীপে নিতে চাইলে তাকে নেবেই। তাই জেল খেটে বের হলে অন্যভাবে তাকে ময়না দ্বীপে নেবে। তাই কপিলাকে নিয়ে সে ময়নার্থীপে রওনা হয়। উপন্যাসটিতে মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় সমাজে অর্থনীতির প্রভাব এবং সঙ্গে সঙ্গে নারী-পুরুষের একে অপরের প্রতি আসক্তি দেখিয়েছেন।