আজকে আমাদের আলোচনার বিষয়ঃ নৈতিক বিবেচনা ও শ্রেয়-প্রেয় । যা বাংলাদেশের উপন্যাসে নৈতিক বিবেচনার উপন্যাসে নৈতিক বিবেচনা শ্রেয়ের সন্ধান এর অন্তর্গত।

নৈতিক বিবেচনা ও শ্রেয়-প্রেয়
ন্যায় বা নৈতিকতাকে জানতে হলে, আমাদের প্রথম জানতে হবে ‘নীতি’ সম্পর্কে। নীতি বিবেচনাবোধের অন্তর্ভুক্ত। নীতিবিদ্যাকে মানুষ আচরণের মূল্যায়ন বলে ভাবে। নীতি হচ্ছে একটি আদর্শ, আর আদর্শের একটি বিচার্য দিক হচ্ছে নৈতিক গুণাবলী।
ইংরেজি শব্দ Ethics বা গ্রীক শব্দ Ethica র বাংলা প্রতিশব্দ নীতিবিদ্যা। নীতিদর্শন শব্দের সঙ্গে moral philosophy সম্পর্কিত ল্যাটিন শব্দ mores থেকে এসেছে moral। এই উভয় শব্দেরই অর্থ আচার-ব্যবহার, রীতি-নীতি, অভ্যাস। সুতরাং নীতিবিদ্যার বিষয় হচ্ছে মানুষের আচার-ব্যবহার, রীতি-নীতি, ভাল-মন্দ, ন্যায়-অন্যায়, শ্রেয়-প্রেয় ইত্যাদি বোধ ।
নীতিবিদ্যার উদ্দেশ্য নীতিশিক্ষা নয়। নীতি এবং অনীতির পার্থক্য জানতেই নীতিবিদ্যা। জনৈক বাঙালি চিন্তকের ব্যাখ্যায় নৈতিক চেতনার স্বরূপ সম্পর্কে জানা যায় :
নৈতিক চেতনার মধ্যে রয়েছে শ্রেয়োনীতিবোধ ও দুর্নীতিবোধের দ্বান্দ্বিক সহাবস্থান। প্রত্যেক নর-নারীর প্রতিটি কাজের মধ্য দিয়েই হয় তার শ্রেয়োবোধের নাহয় দুর্নীতিবোধের প্রাধান্যের প্রকাশ ঘটে থাকে। ১
ঔচিত্যবোধে যুক্তিবিদ্যা, রাষ্ট্রীয় কার্য সম্পর্কে রাষ্ট্রবিদ্যা, মানসিক রহস্য জানতে মনোবিদ্যা সাহায্য করে। তেমনি ন্যায়-অন্যায়, ভাল-মন্দ, সদাচার-অসদাচার উচিত কি অনুচিত জানতে নীতিবিদ্যা । যে নীতিবান সে নীতিবিজ্ঞান না পড়েই, সততা প্রকাশে, মিথ্যা পরিহারে, পরোপকার ও মহত্ত্ব প্রদর্শনে সক্রিয় থাকে।
নৈতিক বিবেচকের মতে, মানুষ মানুষের জন্য। মানুষের দ্বারা মানুষ উপকৃত হবে নিঃশর্তে, কর্তব্যের খাতিরে, আচরণের বিনোদনে। নীতিবিদ্যার পরিধিকে এই বলে সংজ্ঞায়িত করা যায় : যা একই সাথে সমস্ত নৈতিক বিচারের মাপকাঠিতেই স্বাভাবিক, সাধারণ এবং বিশেষ, সে সার্বিক সত্যই নীতিবিদ্যার অন্তর্ভুক্ত।
“সুখই একমাত্র ভাল”- এ ধরণের মতবাদে বিচারবোধ, সততা, নিষ্ঠা, ন্যায়, কল্যাণ, সদগুণ ইত্যাদি গুণাবলী প্রতিষ্ঠা পেয়ে আসছে। কিন্তু তাই বলে ন্যায় এবং শ্রেয় সমাজের প্রতিটি দৃষ্টিঙ্গীতে যে একই রকম তা নয়। সামাজিক দৃষ্টিতে এক রকম রাষ্ট্রিক, দার্শনিক, রাজনৈতিক দৃষ্টিতে অন্য রকম। আবার ইসলাম ও ইসলাম ধর্মের দৃষ্টিতে বিভিন্ন রকম।
আজকাল সমাজে মুখোশধারী নীতিবাদীর সংখ্যা বেশি। রাজনীতি, ধর্ম, দর্শন ও সমাজনীতি সর্বত্র প্রায় একই অবস্থা। কিছু বিশেষ ব্যক্তি দেশের কথা, দশের কথা ও সমাজের কথা বলবে কেবল অন্যের জন্য; কিন্তু নিজেই তা পালন করে না। নীতিবিদ্যায় নীতির প্রয়োজনে যৌক্তিকতা নির্ভর করে রাস্তব শর্তে। কিন্তু নীতিবোধ আসে আপনা হতেই।
কারো কারো মতে নীতি এক ধরণের আবেগ থেকে উৎসরিত। তবে অনৈতিকতাই কি বাস্তব বিবেক ? তা হলে মানুষ অনৈতিকই হতো। পারিবারিক, সামাজিক, রাষ্ট্রিক বিষয়ের অন্তর্ভুক্ত হতে হলে তা বাস্তব এবং যৌক্তিকই হবে। পরিবারে, সমাজে, রাষ্ট্রে সবাই নীতিহীন নয় আবার নীতিবাদীও নয়। তাদের মধ্যে যে নীতিবাদী সৎপথ অবলম্বন করে সেই বাস্তব। কিন্তু যে অসৎ তাকে মিথ্যাচারের আশ্রয় নিয়ে এগুতে হয় । নৈতিকতা হচ্ছে আদর্শনিষ্ঠ মানসিকতা যা নাকি সর্বোচ্চ মানদণ্ডে উন্নীত। যার উর্দ্ধে আর কিছুই বাস করতে পারে না। তাই নৈতিকতা হবে বাস্তব, মনস্তাত্ত্বিক আদর্শের অন্তর্ভুক্ত। যা সবার জন্য প্রযোজ্য ।
দার্শনিক জেরোম এ, শেফার তার Philosophy of Mind গ্রন্থে বলেছেন:
যদি সব মানসিক ঘটনাকে নিয়ন্ত্রণযোগ্য কয়েকটি শ্রেণীতে (Categories) ভাগ করা যায়, তাহলে সেটা বেশ কাজে লাগত। যেমন, এটা বলা হয়েছে যে, তিনটি মৌলিক শক্তি, যাদের “বৃত্তি” (“Faculties”) বলা হত, মন এর তা রয়েছে। যথা, “জ্ঞানক্রিয়া” ( জানা) [“cognition” knowingl. “অনুভবক্রিয়া” (অনুভূতি) [“affection” (feeling)। এবং “ইচ্ছাক্রিয়া” (ইচ্ছা করা) [volition” (willing)। প্রতিটি মানসিক ঘটনাকে এই তিনটি বৃত্তির কার্য প্রক্রিয়ার ফল বলে মনে করা হত।
এভাবে ইন্দ্রিয় প্রত্যক্ষণ, স্মৃতি, অন্তদর্শন, স্বজ্ঞা, অনুমান এবং জানার অন্যান্য উৎসকে জ্ঞান এর অন্তর্ভুক্ত হিসাবে পাওয়া যেত।অনুভূতির অন্তর্ভুক্ত হিসাবে আমরা পেতাম সংবেদন, আবেগ, মেজাজ ব্যক্তিত্বের বৈশিষ্ট্য এবং অনুভূতির অপরাপর অভিব্যক্তি। ইচ্ছাক্রিয়ার অধীনে পাওয়া যেত উদ্দেশ্য, কামনা, বিচার-বিবেচনা, স পছন্দ, কঠোর প্রয়াস ও প্রচেষ্টা এবং ক্রিয়া, এসব উপাদানের সবগুলোই ইচ্ছা-ক্রিয়াকে প্রভাবিত ও প্রকাশিত করে থাকে। ২
বিজ্ঞান যুক্তি দিয়ে প্রমাণ করে। সৃষ্টির প্রমাণ হয় তথ্যের ব্যাখ্যায়। তেমনি বাস্তব ও বাস্তবতা এড়িয়ে একজন নীতিবান ব্যক্তি বা দার্শনিক ভালগুণ সম্পন্ন নৈতিক হতে পারেন না। আদর্শ, নৈতিকতা, ভাল, কল্যাণ, ন্যায় প্রভৃতির অধীন হচ্ছে অনৈতিকতা। মানুষ অনৈতিক আদর্শের যুক্তি খাটায় অপকর্মের বিন্যাসে।
দার্শনিক মরিজশ্লিক ১৯৩০ সনে প্রকাশিত Problms of Ethics গ্রন্থে নীতিদর্শন সম্পর্কে উল্লেখ করেছেন এটা মনোবিজ্ঞানের অন্তর্ভুক্ত। কিন্তু কোন স্বাধীন ও স্বতন্ত্র জ্ঞানের আধার নয়। ভাল ও মন্দের ধারণা নির্দেশ হয় নৈতিক নিয়ম থেকে। তাছাড়া নিম্নস্তরের নিয়মগুলো যৌক্তিকতায় প্রতিষ্ঠা লাভ করে উচ্চস্তরের অধীন থেকে। তিনি বলেন:
আচরণ ও চরিত্রের নৈতিক মূল্যায়ন সুখদায়ক ও দুঃখদায়ক ফলাফলের প্রতি মানবসমাজের আবেগধর্মী প্রতিক্রিয়া ব্যতীত অন্যকিছু নয়। আর সাধারণ অভিজ্ঞতা অনুযায়ী এই ফলাফল আচরণ ও চরিত্র হইতে অনুগমন করিয়া থাকে।৩

আচরণে উচিত, অনুচিত, ভুল-শুদ্ধ, ভাল-মন্দ, সুনীতি-দুর্নীতি নিয়ম-কানুন এবং অভ্যাসের মানবিক আদর্শগত কর্তব্যপরায়ণ ভাল আচরণ প্রকাশই সহানুভূতিপূর্ণ নীতিবিদ্যা। প্লেটোর রিপাবলিক গ্রন্থে থ্রাসিমেকাস ও সক্রেটিসের কথোপকথন থেকে সক্রেটিসের কর্তব্যবোধ :
নিয়ম কিংবা নিয়ামক যার কথাই তুমি বল না কেন, নিয়ামক হিসাবে ভার কর্তব্য হচ্ছে তার উপর ন্যাস্ত বিষয় বা শিল্প নিয়েই চিন্তা করা, তার নিজের স্বার্থ নিয়ে নয়। তাই যা কিছু সে বলে কিংবা করে তার প্রত্যেকটিরই লক্ষ্য থাকে তার সেই দায়িত্বকে পালন করা।৪
নৈতিকবাদীরা যদিও স্বেচ্ছায় নীতিকে পালন করেন, পরোপকার করেন, অন্যের সুখে সুখী, অন্যের দুঃখে দুঃখী এবং সৎ পথে চলেন। কিন্তু তারা অন্যদের থেকে নৈতিক আদর্শের ভিত্তিতে চারিত্রিক গুণাবলীসমুন্নত ব্যক্তিত্বই পছন্দ করেন। চরিত্র নৈতিকতার অধীন। সক্রেটিসের মতে “সততা হইল জ্ঞান”। অ্যারিস্টটল বলেন “সত্য হইল অভ্যাস”। থ্রাসিমেকাস বেলন
অন্যায় যেমন ব্যক্তির নিজের লাভালাভের চিন্তা বই অপর কিছু নয়, তেমনি ন্যায়ও আসলে শক্তির স্বার্থ- সাধন ব্যতীত অপর মহৎ কোন গুণের নাম।
মানুষের ইচ্ছা উদ্দেশ্য সাধন যদি হয় সহানুভূতিশীল ও নৈতিক তবে তা হয় পরম কল্যাণ। সমস্ত উদ্দেশ্যকেই কল্যাণকর বলা যাবে না। ভালচিন্তা ধারার ধর্মই হচ্ছে কল্যাণ। কল্যাণকর চিন্তা ভাবনা মানুষের ভাল চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য। যে ব্যক্তি নীতিবোধের সাহায্যে চলাফেরা করবে তার চরিত্র উত্তম বলে বিবেচিত হবে।
জীবনের সামগ্রিক ভারসাম্য রক্ষা করার প্রকৃতিই হচ্ছে সত্য (Truth), সুন্দর (Beautiful ) ও কল্যাণ (Good)। ব্যক্তির ব্যক্তিত্ব বিকাশে নৈতিকতা অপরিহার্য। চরিত্র নিরূপিত হয়, সংকল্প, কামনা ও উদ্দেশ্যের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ অভিপ্রায়ের ইচ্ছাক্রিয়ায়। নৈতিক অনৈতিক নিয়মের সাথে সমাজে বসবাসকারী অধিবাসীদের সঙ্গতিপূর্ণ আচরণ সম্পর্কীয় ভাল-মন্দ সত্য-মিথ্যার উচিত-অনুচিতের নির্ভুল জ্ঞানদানই নীতিবিদ্যা। Lilli বলেন
The Fittingness of a right action often appears to consist in its confornity to some rule
অনাদর্শিক জীবন যাপনে পরম কল্যাণ শ্রেয় আনয়ন করে না। ভাল, ন্যায়, শ্রেয়, আদর্শ, শুদ্ধাচার কল্যাণ, মঙ্গল, সত্য সুন্দর এসব কিভাবে ব্যবহৃত হবে এবং কিভাবে মানুষের কাছে উপস্থাপিত হবে, সঠিক পথ কি, আচরণে সময়ক্ষেপণ বা সুযোগ্য সময় কি ধরণের উচিত, কি অনুচিত তা নীতি বিদ্যায় উল্লেখ থাকে না। শুধু মানুষের একটি বিবেক সম্পন্ন অনুভূতি থাকে।
নৈতিক নিয়ম কানুন জানার জন্য The highest good of life হলেই চলবে না। ব্যক্তিকে মেনে নিতে হবে মানুষের জন্য সার্বজনীনতা। অনেকের জন্য শুভ ও মঙ্গল কামনা হবে, সকলের উদ্দেশ্য। জ্ঞানের প্রক্রিয়া বিশ্লেষণে এবং জ্ঞানার্জনে মার্কস- এঙ্গেলস-লেনিন-মাওসেতুঙের আরম্ভবিন্দু বস্তু ও বাস্তব। বাস্তবকে বিশ্লেষণ করে তাঁরা ভাবের বা তত্ত্বের জগতে যান এবং তারপর আবার বাস্তবে কর্মের জগতে ফিরে আসেন।
মার্কসের স্বীকারোক্তি অনুযায়ী তাঁর প্রিয় বাক্য হলো :
Nihil humani a me alionu puto (মানবিক কোন কিছুই আমার পর নয়। এবং Do omnibus dubitandum, (সবকিছু সম্পর্কে সংশয়ী হও)।
দার্শনিক উইলিয়াম জেম্স (১৮৪২-১৯১০) অভিজ্ঞতার আলোকে জ্ঞানের উৎপত্তি বিকাশ ও স্বরূপ ব্যাখ্যার পর সত্যের স্বরূপ ব্যাখ্যা করেন। তিনি বলেন :
জ্ঞানের ক্ষেত্রে যেমন অভিজ্ঞতার ভূমিকা অনস্বীকার্য, সত্য নির্ণয়েও তেমনি অভিজ্ঞতার ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ। বাস্তব অভিজ্ঞতার নিক্তিতে কোন ধারণা বা বিশ্বাসের কার্যকারিতা প্রতিপালনের মধ্যেই সত্যের পরশ পাথর নিহিত।

পরামর্শবাদ (prescriptivism) বা ব্যবস্থাবাদের প্রবর্তক আর. এম. হেয়ারের মতে:
মানুষ দৈনন্দিন জীবনে যে ব্যবহারিক আদর্শ অনুসরণ করে চলে এবং প্রয়োজনে পরিবর্তন পরিবর্তন বা প্রতিরক্ষা করে চলে সেই ব্যবহারিক আদর্শ হচ্ছে moral philosophy
সুতরাং হেয়ার নীতিবিজ্ঞানের বিশ্লেষণী নৈয়ায়িক ও দার্শনিক চর্চাকে ethics বলেছেন:
the student of the ethics will… find, for what we have just called ethics the more guarded terms, the logic of ethics metae ethics; theoretical ethics;
philosophical ethics and soon. (Essays on the Moral Concepts Macmillan, 1972, p 39-40)
জীবনের পরম কল্যাণ বা পরমার্থ হবে জীবনের জন্য। মানুষের ন্যায় আচরণ, সদাচার, কল্যাণকর চিন্তা, শুভইচ্ছা পরমার্থ লাভের সহায়ক। দেখা যাচ্ছে, ভালোর অধীন ভালো। ন্যায়ের অধীন কল্যাণ। এসব নৈতিক গুণাবলীর সাথে সংশ্লিষ্ট যে, সেই একজন নীতিবান ব্যক্তি এবং ব্যক্তিত্ব। যা সব কিছুই তাঁর চেতনায় থাকবে right is subordinaty to good। আদর্শবোধই হচ্ছে মানুষের সর্বস্বনীতি। আদর্শবোধ ছাড়া পরমার্থ বা পরম কল্যাণ এবং এর ও পরে আপেক্ষিক কল্যাণ সম্ভব নয়।
কর্তব্য, উচিত, শর্তহীন আদেশ এই শব্দগুলি একটির সাথে আরেকটি সংযুক্ত। কর্তব্য করা কর্তব্যনীতি অনুসরণ করা বা পালন করা ইত্যাদির যথার্থ সংজ্ঞায়ন চেষ্টায় দেখা যায় কর্তব্য, কল্যাণ, ন্যায়, শুদ্ধ, ভাল, আদর্শ কথাটির অন্তর্ভুক্ত। নীতিবিদ কান্ট বলেন।
সার্বিক নীতি বা নিয়ম অনুসারে কাজ করাই কর্তব্য। কর্তব্য অনুমোদিত কাজের মূল্য এবং পরিণতিতে নয়, বরং এর উদ্দেশ্যে নিহিত। উদ্দেশ্য যদি সং ও সার্বিক নীতির ওপর প্রতিষ্ঠিত হয়ে থাকে, তাহলেই সংশ্লিষ্ট কাজ নৈতিক বলে স্বীকৃত হবে। ১০
কোন একটি পরিবারে সমর্থ ব্যক্তির দায়িত্ব ভুল হতে পারে, আবার শুদ্ধও হতে পারে। পরিবারের অনেকের চাহিদাই হয়তো সে মিটাতে পারবে না। পারিবারের কেউ তার উপর সন্তুষ্ট কি অসন্তুষ্ট সে দিকে না তাকিয়ে দায়িত্ব পালনই তার কর্তব্য। কেউ দায়িত্ব নেয় বাধ্য হয়ে মানিয়ে । আবার কেউ পরিবারের সম্মানার্থে বা উচিত কর্তব্য জ্ঞানে।

কিন্তু যে উচিত বা কর্তব্যের কথা চিন্তা না করে দায়িত্ব পালন করছে, তারা নিজস্ব গুণে, তাকে জিজ্ঞেস করলে দায়িত্ব বা কর্তব্যের কথাই সে বলবে। কর্তব্যের সাথে ঔচিত্য জড়িত। নিঃশর্ত মায়া, আবেগ, ন্যায়, নীতি, মানবিকতা ছাড়া duty statement আসতে পারে না। কিন্তু উচিত এবং নিঃশর্তের জন্য মানবিকতা অবশ্য বিচার্য। মনুষ্যত্ববোধ শর্তহীন।
নিঃশর্ত তার নিয়ম অনুশীলন করবে। এই অনুশীলন ব্যক্তির চরিত্রের উন্নত নৈতিক দিক। উন্নত চরিত্র নৈতিক বলিষ্ঠ জ্ঞান, নৈতিক বুদ্ধিবৃত্তি যা নাকি সর্বোপরি The most ordinary human reason and fundamental ethics সর্বাপেক্ষা বুদ্ধিবৃত্তিতে বা সর্বপেক্ষা সাধারণ মানবিক বুদ্ধিবৃত্তির জন্য নীতিবিদ্যার প্রয়োজন পড়ে না। অভিজ্ঞতার জন্য প্রয়োজন নীতিবিদ্যা। ‘ম্যূর তাঁর প্রিন্সিপিয়া এথিকা’ গ্রন্থের প্রথম দিকে গুড বা শুভ সম্পর্কে আলোচনা করেছেন। এ প্রসঙ্গে তিনি বলেন :
শুভত্ব এমন একটি ধারণা যার কোন সংজ্ঞা দেয়া যায়না। কেউ যদি এর সংজ্ঞা নির্দেশের চেষ্টা করেন, তাহলে তা হবে একটি নিকৃষ্টতম সংজ্ঞা।
প্রকৃতিবাদী দার্শনিকগণ শুভের সংজ্ঞা দিতে গিয়ে যে ভুল করেছেন, ম্যুর সে ভুলের নাম দিয়েছেন ‘প্রকৃতিবাদী অনুপপত্তি’ (naturalistic fallacy)। এ অনুপপত্তির অর্থ বুঝতে হলে শুভ জিনিসটি কি, তা প্রথমেই বোঝা দরকার।
শুভত্ব একটি সরল গুণ। এটি যা আছে তা-ই; শুভ মানেই শুভ। এটি একটি সরল ও অসংজ্ঞায়নযোগ্য শব্দ এবং এজন্যই একে আর ক্ষুদ্রতর অংশে বিশ্লেষণ করা যায় না। ১১
নৈতিকতাকে পরামর্শ বা দার্শনিক মতবাদের পর্যায়ে পরিমাপ করা যায় না। আমরা অন্যায় এবং অপরাধ বুঝতে পারি বলেই, আমাদের নৈতিক হতে হবে বলে মনে করি। নীতির বিরুদ্ধাচারণ আমরা আমাদের মন থেকেই মেনে নিতে পারিনা। নৈতিকতার উপর ও পুরোপুরি আস্থা রাখতে পারছিনা, আবার অনৈতিকতার উপরও বিশ্বস্ত নই। উত্তম ও ভাল তার নিজ গুণেই ভাল। আর এম হেয়ার বলেন:
বিশ্বাস করেন যে নৈতিক বিতর্কের মধ্যে প্রায় প্রতি স্তরেই যুক্তির অবকাশ রয়েছে, নৈতিকতা ভাষার মধ্যে একটা স্বীয় যৌক্তিক বৈশিষ্ট্য বিদ্যমান, এবং নৈতিক উক্তি বিশ্বজনীন সাপেক্ষ। ১২
তাছাড়া যে মতবাদ উপযোগ অথবা সর্বাধিক শান্তিকে নৈতিকতার ভিত্তি বলে স্বীকার করে নেয়, তা এ মত পোষণ করে যে, কোন কাজ ন্যায় হবে সেই অনুপাতে যে অনুপাতে সে কাজ শান্তি বৃদ্ধি করে। কোন কাজ অন্যায় হবে সেই অনুপাতে যে অনুপাতে সে কাজ শাস্তির বিপরীত গুণ (দুঃখ) নিয়ে আসে। ১৩
নীতিবাদীগণ মনে করেন, অনুভূতির জন্যই মানুষের বিভিন্ন মতবাদের ও কাজের সৃষ্টি। বিবেকের সুস্থির পরিচালনায় মানুষ সচেতন অনুভূতিশীল। ব্যক্তির জন্য ব্যক্তির দায়িত্ব কল্যাণকর চিন্তাধারা মানবিক অনুভূতি কেউ কাউকে দিয়ে দেয় না। বিবেক তাকে সজ্ঞান দেয় মানুষের ঔচিত্য কর্তব্যে। কিছু মানুষ আছে যে ইচ্ছাকৃত ভাবেই অন্যের জন্য ক্ষতিকর কাজ করে আনন্দিত হয়। অপরের ব্যাথায় কষ্টে ব্যথিত না হয়ে সুখী হয়। সেসব মানুষ সত্যিকার অর্থে সত্য সুন্দর কল্যাণ, শান্তি ন্যায় ও শ্রেয়ের মানুষ নয়। ভাল, নায়, প্রেয়, শ্রেয় এসব কোন পড়ার বিষয়েও উল্লেখ থাকেনা। দার্শনিক হ্যামশায়ার বলেন:
যে-মতবাদ অনুযায়ী নৈতিক বাক্য সত্যায়ন সাপেক্ষ নয় বলে দাবি করা হয় এবং যুক্তির সীমানার বাইরের বস্তু বলে বিবেচিত হয়, সে মতবাদ যুক্তির এক ক্ষুদ্র ও খণ্ডিত অর্থের উপর স্থাপিত; নৈতিক বাক্য
are more or less striectly governed by recognised (though not necessarily formulated) rules of relevance.১৪
মানুষের লোভ, পাপ, বিভিন্ন ইচ্ছা প্রবৃত্তি, অসততা, মিথ্যা ইত্যাদি প্রলোভন দমন এবং ন্যায় ও নৈয়ায়িক মানসিক ইচ্ছাকে প্রতিষ্ঠিত করার নিদর্শনই নীতিশাস্ত্র। যা নাকি তত্ত্বমূলক বিজ্ঞান, theoretical science বা moral science বা philosophy, মানুষের সমুদয় কাজের মধ্যে থাকবে শ্রেয়ের অনুসন্ধিৎসা। নীতিশাস্ত্র স্বাস্থ্যগত শিল্পসমৃদ্ধ যন্ত্রের কলা কৌশল, পদার্থ বিজ্ঞান বা রসায়ন শাস্ত্রের কোন ব্যবহারিক শাস্ত্র নয় সমস্ত শাস্ত্র থেকেই তা আলাদা। কিন্তু নীতিকে সমস্ত শাস্ত্রই আশ্রয় করে নিতে পারে। এখানেই নীতিশাস্ত্রের পারদর্শিতা।
সমাজ কল্যাণে ব্যক্তি নিরলস চেষ্টা চালাচ্ছে। ব্যক্তি-কল্যাণ, সমাজ কল্যাণে নিবদ্ধ।
প্রয়োজনের তাগিদে মানুষই সৃষ্টি করে আদর্শ নীতি ও আইন এবং পরিবর্তনশীল পৃথিবীতে মানুষই প্রয়োজনমত এগুলো পরিবর্তন করে। যুগে যুগে কঠোর সংগ্রামের মধ্য দিয়ে মানুষ পুরাতন আদর্শ, নীতি ও আইনের স্থলাভিষিক্ত করেছে নতুন আদর্শ, নীতি ও আইনকে। নীতি ও আইন প্রণয়নের এবং আদর্শ প্রতিষ্ঠার পদ্ধতিও মানুষ যুগে যুগে পরিবর্তন করেছে।
আদিম সমাজ, দাসতান্ত্রিক সমাজ, ভূমিদাসতান্ত্রিক সমাজ, গণতান্ত্রিক সমাজ, সমাজতান্ত্রিক সমাজ ইত্যাদিতে নীতি নির্ধারণের, আইন প্রণয়ণের ও আদর্শ অনুশীলনের পদ্ধতি বিভিন্ন রূপ। তবে সমাজ বিকাশের সকল যুগেই আদর্শ, নীতি ও আইন প্রণয়ন ও প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে মানুষের ও তার পরিবেশের অন্তর্নিহিত নৈতিক চেতনা কোন না কোনোভাবে সক্রিয় থাকে।
কোনো সামাজিক বা রাষ্ট্রীয় আইন প্রণয়ন ও সেই আইন কার্যকর করার সময়ে সংশ্লিষ্ট প্রতিটি ব্যক্তি, হয় অন্তঃস্থিত শ্রেয়োনীতি বোধ না হয় অন্তঃস্থিত দুর্নীতিবোধ দ্বারা পরিচালিত হন। ফলে আইন জনগণের জন্য মঙ্গলকরও হয়, আবার অমঙ্গলকরও হয়। আইনের ব্যাখ্যা এবং প্রয়োগের বেলায়ও মানুষ একইরকম আচরণ করে। ১৫

নৈতিক আচরণে ব্যক্তির প্রকাশ, সামাজিক আচরণে সমাজের প্রকাশ, বাস্তবের ভিত্তিতে আদর্শের বিচার কার্য চলে না। আদর্শকে বাস্তবের সাথে মানিয়ে নিতে হয়। নীতি দার্শনিক মিলের মতে, মানুষের স্বাধীন ইচ্ছার অধিকার আছে। তাঁর মতে :
যে কাজ যতটুকু সুখ উৎপন্ন করবে, সে কাজ ততটুকু ন্যায়সঙ্গত বা ভাল এবং যে কাজ যতটুকু দুঃখ উৎপন্ন করবে, সে কাজ ততটুকু অন্যায়সঙ্গত বা মন্দ । সুখই কোন কাজের ভাল মন্দ বিচারের নৈতিক মানদণ্ড। ১৬
নীতিশাস্ত্র আদর্শ এবং বিষয়নিষ্ঠ বিজ্ঞান। এখানে বস্তু বা ঘটনার আদর্শ, নৈতিকতা সম্বন্ধে আলোচিত হয়। আদর্শ বিচার বিশ্লেষণ করে, পালন করা যায় না। ভালমন্দের সহজতায়ই একে মানা যায়। মনস্ত াত্তিকতায় আচরণের স্বরূপ উপাদান ভিত্তি নির্দেশ করে। ন্যায়, অন্যায়, ভাল-মন্দের, সুখ-দুঃখের বিচার করে না।
সুখবাদ চিরাচরিতভাবে সব যুগের নীতি দার্শনিকদের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে। তাই নীতিবিদ্যার ইতিহাসে দেখা যায় এর সূচনাকাল থেকেই সুখবাদী চিন্তাবিদগণ সক্রিয় রয়েছেন। প্লেটো, অ্যারিষ্টটল, ও কান্ট যদিও সুখকে মানুষের একমাত্র মঙ্গল বলে প্রত্যখ্যান করেছেন, তথাপি তাঁরা মানব জীবনে সুখের যথোপযুক্ত ভূমিকা সম্পর্কীয় প্রশ্নের দিকে যথেষ্ট দৃষ্টি দেয়ার প্রয়োজনীয়তার কথাও বলেছেন। ১৭
নীতির আচরণ কখনও আপেক্ষিক নয়, তা সর্বাবস্থায় সার্বিক। নীতিশাস্ত্রের লক্ষ্য পরম কল্যাণ। বেনথামের মতো দার্শনিক মিলও কামনা করেন সর্বাধিক সংখ্যক মানুষের জন্য সর্বাধিক পরিমান সুখ। Portraits from memory গ্রন্থে প্রখ্যাত দার্শনিক বার্ট্রান্ড রাসেলের ভাষ্যমতে,
চিন্তা-ভাবনার মৌলিকত্বের তুলনায় জে. এস. মিল বেশি অগ্রগতি সাধন করেন নৈতিক উন্নতি ও যথার্থভাবে জীবনের লক্ষ্য সন্ধানে। তিনি জোর দিয়ে আরও বলেন যে, বর্তমান বিশ্ব অধিকতর শান্তিময় হতো যদি মিলের নৈতিক আদর্শের প্রতি মানুষের অধিকতর শ্রদ্ধাবোধ জাগতো। ১৮
মূল্যাবধারণ নীতির নৈতিক মূল্য বিচার করতে হলে মানুষের স্বভাবের বৈশিষ্ট্য, জগৎ পরিকল্পনায় মানুষের স্থান, দায়িত্ব কর্তব্য, কল্যাণমূলক ভাবনা বিষয় জানা একান্ত আবশ্যক। নীতির লক্ষ্য যেমন পরম কল্যাণ, অধিবিদ্যার লক্ষ্য তেমনি জাগতিক কল্যাণ (cosmic good)। মোট কথা নীতিবিদ্যা অধিবিদ্যার উপর সাহায্য গ্রহণ করে এবং কামনা করে। হেগেল, গ্রীন প্রমুখ দার্শনিকদের মতে, নীতিশাস্ত্রের ভিত্তি অধিবিদ্যার উপর। র্যাশডাল ( Rashdall) ও তাঁর অনুসারীরা মনে করেন যে, অধিবিদ্যা, নীতিবিদ্যার উপর প্রতিষ্ঠিত ।
লেসলী ষ্টিফেন (Leslistefen) ও তাঁর অনুসারীরা মনে করেন যে, অধিবিদ্যার সাথে নীতিবিদার কোন সম্পর্ক নেই । কিন্তু মুইর হেড, ও ম্যাকেঞ্জীর মতে নীতিবিদ্যা ও অধিবিদ্যর সম্পর্ক গভীর। বিচারনিষ্ঠ এবং প্রাকৃতিক বিজ্ঞান যেমন যুক্ত হয় দর্শনে তেমনি আদর্শনিষ্ঠ বিজ্ঞান ও পর্যবসিত হয় দর্শনে। আদর্শনিষ্ঠ বিজ্ঞান ও দর্শনের সম্পর্ক বর্ণনায় অধ্যাপক মিত্র বলেন:
If the law of logic, Ethic and Aesthetics be not countenanced by the real constitution of the universe, then these sciences are to be regarded as altogether fictitious, if not mischievous. ১৯
নীতিশাস্ত্র সম্বন্ধে মানুষ তাত্ত্বিক ধারণা পোষণ করে। অথচ যে নৈতিক তাকে কখনও ভাবতেই হয় না কি করে তাকে নৈতিক হতে হবে। কারণ সে জন্মগত ভাবেই অভিজ্ঞতাভিত্তিক নৈতিক। ব্যক্তি সুখ কামনা করে ঠিকই কিন্তু সুখ কামনায় সুখই চায়, কেউ সুখী হতে পারে না। অনেকে সুখের বদলে দুঃখকে কামনা করে, পরিণামে সুখকেই চায়। নৈতিকতা মনস্তাত্ত্বিক কিন্তু নৈতিক শব্দাবলী মনস্তাত্ত্বিক নয়।
যে মতবাদ উপযোগিতা অথবা অধিকতম আনন্দনীতিকে নৈতিকতার ভিত্তি বলে গ্রহণ করে নেয়, সেটা এই অভিমত পোষণ করে যে কোন কার্য নীতিসঙ্গত হবে সেই পরিমাণে যে পরিমাণের আনন্দ সে কার্যত বাস্তবায়ন করতে সক্ষম হবে, এবং নীতিবিগর্হিত হবে তখনই যখন আনন্দের বিপরীতটাকে বাস্তবায়ন করবে। ২০
উপযোগবাদীরা মানসিক সুখকেই বেশি মুল্য দেয়। স্বাধীন ইচ্ছায় নৈতিক অনুভূতি প্রকাশ পায়। স্বাধীনতা ইন্দ্রিয় এবং যৌক্তিক উভয় জগতেই আছে। সুখানুভব ও উভয় জগতে বাস করে। বেনথাম বলেন:
প্রকৃতি মানব জাতিকে সুখ ও দুঃখ নামক দুটি প্রধান শাসকের অধীনে রেখেছে। এদের জন্যই কেবল আমরা বলতে পারি যে, কি আমাদের করা উচিত এবং এদের জন্যই আমরা কেবল এটা নিরূপন করতে পারি যে, কি আমাদের করতে হবে। একদিকে ন্যায় ও অন্যায়ের মানদত্ত এবং অপর দিকে কারণ ও কার্যের শৃঙ্খল এদের ক্ষমতার বন্ধনীতে আবদ্ধ। ২১
নৈতিকতায় ইচ্ছাবোধের স্বাতন্ত্র্যই একমাত্র নীতি। নৈতিকতার নীতি অবশ্যই শর্তহীন আদেশ হবে। আর শেষোক্তটা এই স্বাতন্ত্রের চেয়ে না বেশী কিছু না কম কিছুর আদেশ করে। ২২
কান্ট আরও বলেন:
এমন ভাবে কাজ করো যেন তোমার কাজের মূল সূত্রটা একটা সর্বজনীন নিয়ম হতে পারে বলে তুমি ইচ্ছা
করতে পারে। 20
কারণ মানুষ অন্যায় ইচ্ছার প্রবৃত্তিতে দোলায়িত হয় অনেক বেশি। আবার বুদ্ধিবৃত্তির সত্তায় যুক্তির কার্যক্রমই স্বাধীনতা। যুক্তির বাস্তবভিত্তিক ব্যবহারে স্বাধীনতা রক্ষা পাবে।

দার্শনিক কান্ট বলেন:
উভয় জগতের অধিবাসী হিসাবে মানুষের মধ্যে আর একটা বৈশিষ্ট্য দেখা যায়। মানুষ যখন স্বাধীনভাবে ইচ্ছা করে এবং স্বনিয়ন্ত্রিত হয়, তখন সে ইন্দ্রিয় জগতের পরিসীমা অতিক্রম করে বৌদ্ধিক জগতে প্রবেশ করে এবং তার যথার্থ নৈতিক বোধ কি হওয়া উচিত তা উপলব্ধি করে এবং কেবল কর্তব্যবোধই কর্তব্যসম্পাদন করে।
পক্ষান্তরে কোন মানুষ যদি কেবল ইন্দ্রিয় জগতের অধিবাসী হিসাবেই নিজেকে কল্পনা করে এবং প্রাকৃতিক জগতের কার্যকারণ নিয়মের নিগড়ে নিজেকে আবদ্ধ করে তখন তার চরম অধঃপতন হয়। অপর দিকে, কোন মানুষ যখন নিজেকে একই সময়ে বৌদ্ধিক ও ইন্দ্রিয়-এ দু’জগতের অধিবাসী হিসাবে মনে করে এবং সে হিসাবে কর্তব্য অনুযায়ী কাজ করার জন্য একটা চাপ অনুভব করে তখন তার এ অবস্থাকে আমরা নৈতিক বাধ্যবাধকতা (moral obligation) বোধ বলি । ২৪
সুতরাং স্বনিয়ন্ত্রণ কার্য ক্ষমতাকেই স্বাধীনতা বলা উচিত। যদিও নৈতিক স্বাধীনতা ও অনৈতিক স্বাধীনতা আলাদা। চুরি, ডাকাতি, খুন, ধর্ষণ সব কিছুরই চিন্তা করতে পারে অনৈতিকতা। আর নৈতিকতার স্বাধীনতা জ্ঞান, বুদ্ধি, যুক্তি, সৌন্দর্য, নীতি ইত্যাদি। সুতরাং স্বাধীনতা মানুষের আত্মগত ইচছাবোধের স্বাতন্ত্র্য।
নীতিবাদী মানুষকে আমরা সচেতন আত্মমর্যাদা সম্পন্ন, আত্মসংকল্পের ব্যক্তি ভাবতে পারি । নীতির বিরোধিতাকারীকে অমর্যাদাকর অসচেতন ভাবতে পারি। কিন্তু উভয়ে উভয়ের নীতিতে দেখা যায় সচেতন।
কেউ অন্যায়, অবিচার, জুলুম প্রভৃতি গর্হিত কাজ করে, কেউ ন্যায়নিষ্ঠার বশবর্তিতা স্বীকার করে। অপরাধ স্বাধীন মতবাদের কোন বিশিষ্ট স্বাতন্ত্র্য দিক নয়। স্বনিয়ন্ত্রিত নৈতিক ব্যক্তির কাজ হবে সার্বজনীন। প্রতিটি মানুষের অনুকূলে যা সম্ভব তাই নৈতিক। অ্যাপক আবুল কাসেম ফজলুল হক তাঁর মানুষ ও তার পরিবেশ গ্রন্থে বলেন:
যে কাজ মানুষ সচেতন ভাবে যুক্তির আশ্রয় নিয়ে করে না, আবেগের বশবর্তী হয়ে স্বতঃস্ফূর্তভাবে করে, অনেক সময় সে কাজ দুর্নীতির সহায়ক হয়। আবেগ মহত্ত্বের মর্যাদা পায় তখনই, যখন তা যুক্তি দ্বারা পরিশীলিত ও মার্জিত হয়। সমস্যার মুখোমুখী হয়ে যারা শ্রেয়োনীতি কিংবা দুর্নীতি কোনটিরই পক্ষ অবলম্বন করতে চায়না, ‘নিরপেক্ষ’ থাকে, তারা আসলে সুবিধাবাদী: সুনীতিরই নির্ভরযোগ্য সেবক তারা। সে ক্ষেত্রে লোভীর সঙ্গে গোতীর বিরোধ বাধে এবং বিরোধে উভয় পক্ষই শ্রেয়োনীতি পরিহার করে ও দুর্নীতির আশ্রয় নেয়। ২০
নৈতিকতার দিক থেকে ধর্ম এবং নীতি পরস্পর পৃথক। মানুষের মানবিক প্রয়োজনে নীতি আসছে। আবার ধর্মের সৃষ্টিও হয়েছে নৈতিকতা থেকে। পরনশক্তি বা সত্তার সাথে নিবিড় সম্পর্ক গড়ার লক্ষ্যে ধর্মের বিকাশ। কিন্তু বিবেক থেকে নীতির বিকাশ। পরম সত্তায় মানুষ আল্লাহর অনুগ্রহ লাভ করে। আল্লাহর নৈকট্য লাভ করে।
ধর্ম দ্বারা মানুষ সৎপথ অবলম্বন করে। কিন্তু নীতি বা আদর্শ দ্বারা মানুষ মহৎ ও উন্নত জীবন লাভ করে । নীতি ও ধর্ম পরস্পর পৃথক হলেও একে অপরের উপর প্রভাব ফেলে। ধর্মভাব বৃদ্ধিতে নীতিবোধ বৃদ্ধি । কিন্তু ধর্মাভাব বা তত্ত্বীয় নৈতিকতা ছাড়াও মানবতা বোধ মানুষকে এক নতুন সম্ভাবনার পথ দেখায়।
মানুষের জীবন, চিন্তা-ভাগৎ, চরিত্র, অনুভূতি এবং কার্যকলাপ সম্বন্ধে মানবতাবোধ এমন এক আলোক বর্তিকা দেখাতে সক্ষম হয়েছে যার তুলনায় যে কোন ধর্মের প্রভাবকে বিবেচনা করলে অতিক্ষুদ্র ও পূর্বাস্বাদন বলে মনে হতে বাধ্য। ধর্মীয় প্রভাবকে শুধুমাত্র যে যথেষ্ট নয় বলে মনে হবে তা নয়, এই বিবেচনায় ধর্ম ব্যক্তির স্বাধীনতা ও ব্যক্তিসত্ত্বার উপর অতিরিক্ত বাধা-বিপত্তি সৃষ্টি করছে বলেও মনে হবে। যারা উপলব্ধি করতে সক্ষম যে সমাজিক প্রভাব সমগ্র মানব জাতিকে কর্তব্যবোধে জাগ্রত না করা পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হবে, তাদের মনে উপযোগ নৈতিকতার বন্ধন শক্তির অনুভূতিকে জাগ্রত করার জন্য এই ধরণের ধর্মীয় প্রভাবের কোন প্রয়োজন নেই । ২৬

ইচ্ছানুযায়ী যখন কোন ব্যক্তি কাজ করে তাকে ঐচ্ছিক ক্রিয়া বা স্বেচ্ছাকৃত কাজ বলে। ঐচ্ছিক ক্রিয়া নির্বাচনমূলক এবং এতে ব্যক্তির স্বাধীনতা আছে। অনৈচ্ছিকতায় মানুষের নৈতিক মূল্যের যথেষ্ট অভাব রয়েছে। উচিত-অনুচিত এখানে বিচার্য বিষয় নয়। কান্টের মতে :
কোন ব্যক্তিকে তার কাজের জন্য একমাত্র তখনই দায়ী করতে পারি যখন আমরা একথা স্বীকার করি যে, সে নিজের স্বাধীন ইচ্ছায় সে কাজ সম্পাদন করতে পারে। সুতরাং দেখা যায় যে, বিশুদ্ধ যুক্তিতে (বুন্ধিতে) যাকে অস্বীকার করা হয়েছে, ব্যবহারিক জীবনে নৈতিকতার দ্বারা তাকেই প্রতিষ্ঠিত করা হয়েছে। ২৭
মানুষের চাওয়া, কামনা-বসনার শেষ নেই। একেক ব্যক্তির একেক ধরণের আকাঙ্ক্ষা। সৎ এবং অসৎ ব্যক্তিদের কামনায় সৎ এবং অসৎ কামনা। নিরাপরাধ এবং দৃকৃতকারী অপরাধীর চারিত্রিক কামনায় কখনও সামঞ্জস্য থাকবে না। একজন সৎ ঔচিত্যবোধসম্পন্ন ব্যক্তি চিন্তা করে তাঁর সাথে অন্য কারো চিন্তা-চেতনায় সমন্বিত কামনা। যে সৎ বুদ্ধিমান, তাঁর কামনা তেমনিভাবে পরিচালিত হবে। কামনার জগতে কামনার প্রাধান্য। অধাপক ম্যাকেঞ্জী কামনা সম্বন্ধে বলেন:
Each desire also belongs to a particular universe, and loses its meaning if we pass out of that universe into another. This universe to which a desire belongs is the universe that is constituted by the totality of what we call a man’s character as that character presents it self at the time at which the desire is felt. ২৮
সময় ও প্রয়োজনের উপর নির্ভর করে কামনার পরিবর্তন হয়। মানুষ বিবেচনা ও বিচারবোধে অনবরত পর্যবাসিত হয় মানুষে। দার্শনিক মিল বলেন:
It is better to be a human being dissatisfied than apig satisfied, better to be a Socrates dissatisfied than a fool satisfied. ২৯
শিক্ষিত ব্যক্তিবর্গ যদি নৈতিকতাকে এড়িয়ে চলেন, নীতিবাক্যের কিছু আসবে যাবে না, ব্যক্তির পদস্খলন বা ব্যক্তিত্বের স্থানচ্যুতি হবে মাত্র। সমস্ত নৈতিক দর্শনই নির্ভর করে বিতন্ধের উপর। বিশুদ্ধ ব্যক্তিই কেবল বলতে পারেন বিশুদ্ধ বাক্য। মানুষ যুক্তিতে যত বেশি অগ্রসর হয়, অনুশীলন বিশ্বাস ও অনুসন্ধানে তৎপর হয় তার চেয়েও বেশি। নীতিবিদ ম্যুর সত্য মিথ্যার বিষয়বস্তুকে ‘বচন’ বলে অভিহিত করেন। বচন কোনো বাক্য নয়। এটা হচ্ছে বাক্যের অর্থের অনুধাবন। ফলে সত্য-মিথ্যা প্রত্যেকটি বিশ্বাসের ক্ষেত্রে কোনো একটা বচন রয়েছে যাকে বিশ্বাস বা অবিশ্বাস করা হয়।
তাঁর মতে বিশ্বাস এমনি একটি মনোভাব যা বচনের জন্য সব সময় নিশ্চয়তা দান করে না।
তিনি বলেন, ‘বিশ্বাস কেবল তখনই সত্য হয়, যখন বচনের মাধ্যমে ব্যক্ত বিশ্বাসটি বিশ্বাসের নির্দেশিত বস্তুর অনুরূপ হয় ।
ইচ্ছা একটি আইন বা সার্বিক নীতি হতে পারে। আইন এবং নীতিকে এক করতে হলে সার্বিক কল্যাণে নিজেকে নিয়োজিত করতে হবে। বচনেরও তেমনি কল্যাণকর বিশ্বাস ও সত্যতায় পর্যবসিত হওয়া উচিত। শ্যূর বলেন:
মূর বলেন:
বিশ্বাসের সত্য ক্রিয়ায় যেসব বচন উপলব্ধি করা হয় সেগুলোর অবশ্যই এমন কিছু সাধারণ গুণ (common property) থাকে যা বিশ্বাসের মিথ্যা ক্রিয়ায় যে বচনগুলোকে উপলব্ধি করা হয় তাদের কোনটার মধ্যেই থাকে না। আর এমন কোনো যুক্তিই নেই যার জন্য আমরা এই গুণকে ‘সভ্যতা’ (truth) বলবো না। এবং একইভাবে বিশ্বাসের মিথ্যা ক্রিয়ায় যেসব বচনকে উপলব্ধি করা হয় সেগুলোর মধ্যেকার সাধারণ গুণকে মিথ্যাত্ব (falsity) বলবো না । ৩২
মানুষের অন্তর অনুমান নির্ভর। সমাজ স্বীকৃত কাজ, আলোচনার বিষয় এবং বিচারশক্তির মূল্যবোধ নৈতিকতার অন্তর্ভুক্ত। দার্শনিক হিউম বলেন:
যে কোনো লোক প্রকৃতপক্ষে এমন কোনো বচনকে কখনো জানে না যা অতীত, বর্তমান বা ভবিষ্যতের কোনকিছুর অস্তিত্বকে ব্যক্ত করে যদি না এ তিনটি শর্তের কোনো না কোনো একটি শর্ত পূরণ হয়। ৩৩
নৈতিক বিচার কোন কাজের নৈতিক মূল্যায়ন। নৈতিক বিচারের জন্য সবচেয়ে প্রয়োজন হচেছ, ব্যক্তিকে হতে হবে বিচারক্ষম বুদ্ধিদীপ্ত আদর্শের ভিত্তিতে নৈতিক। যুক্তির বিচার্যের চেয়ে নৈতিকতার বিচার্য বিষয় আবশ্যক। অধ্যাপক মুইর হেড বলেন:
যুক্তি বিদ্যার বাক্য ও আইনের বাক্যের মধ্যে যেমন পার্থক্য রহিয়াছে তেমনি বিষয় নির্ভর অবধারন ও নৈতিক অবধারনের মধ্যেও পার্থক্য বর্তমান। নৈতিক বিচার এই শেষোক্ত অর্থেই ব্যবহৃত হইয়া থাকে। ইহা আচরণকে আইনগত বাক্যের বিষয়বস্তু হিসাবে বিবেচনা করে, জাগতিক ঘটনা হিসাবে নয়।
নৈতিকতার সাথে চিন্তা-চেতনা, অনুভূতি এবং ইচ্ছার স্বাধীনতা নিহিত। মানুষ নিজের ইচ্ছায় যে কোন কাজ করতে পারে এবং বাইরের কোন শক্তি ছাড়া নিজেই কাজের কর্তা। উইলিয়াম লিলি বলেন:
We all know directly after we have done an action that we could have acted differently from what we actually have done.”
বিবেক এক প্রকার মানসিক শক্তির মানদণ্ড। বিবেক ছাড়া মহত্ত্ব বা বিচারবোধ দেখানো যায় না। অ্যারিষ্টটল বলেছেন:
যে মহৎ কার্য করিতে আনন্দ অনুভব করে না সেই ব্যক্তি ন্যায়পরায়ণ নয়।
মানুষের উচিত সৎইচ্ছা ব্যক্ত করা, কোন রকম শর্ত ছাড়া। শর্তে ইচ্ছা হয়ে যায় জোর পূর্বক কর্তব্য। একটি কার্যের জন্য উদ্দেশ্য হতে হবে নৈতিক। কান্ট বলেন:
জগতে এমন কি জগতের বাইরে কিছুই নাই, যাহাকে ভাল উদ্দেশ্যে এই শর্ত ব্যতিরেকে ভাল বলা যাইতে পারে। কোন একটি কার্যকে তখনি ভাল বলা যাইতে পারে, যখন কার্যটি ভাল উদ্দেশ্য দ্বারা চালিত হয়। ৩৭
রাষ্ট্রীয় কার্যে দেখা যায়, রাষ্ট্রের উদ্দেশ্য নীতি তৈয়ার করবে এবং তা রাষ্ট্র ও জনগণ মানতে বাধ্য। রাষ্ট্র এবং সমাজে ব্যক্তির পার্থিব উৎকর্য আর নীতি শাস্ত্রে ব্যক্তির আত্মিক উৎকর্ষ, আত্মিক উৎকর্ষ বা নৈতিক বোধ রাষ্ট্রীয় ধ্যান ধারণার অনেক ঊর্ধে। মানুষের অনৈতিক কাজকর্মে তাকে যদিও সব সময় রাষ্ট্রীয় বা সামাজিক আইনের অধীনে শাস্তি পেতে হয় না; কিন্তু মানুষ বিবেকের শাস্তি পায় ঠিকই।
বিবেকের দংশন দৈহিক শাস্তির চেয়ে কমতীব্র নয়। তবে ব্যক্তি বিশেষের এই তীব্রতা বোধ আলাদা। তাই কেউ কেউ সত্যিকার ভাবে খুব বেশী innocent হয়। নীতি যা প্রণয়ন করে রাষ্ট্র তাই হয়। অর্থাৎ রাষ্ট্রীয় নীতি অনুসরণ ব্যক্তির পক্ষে তখনই সম্ভব হবে, যখন ব্যক্তি মেনে নিতে পারবে। নীতিশাস্ত্রীয় আইনই পরিনামে রাষ্ট্রীয় আইন।

এ পর্যন্ত আমরা নৈতিকতা বিষয়ে অনেক কথা বলেছি, যেমন :- সামাজিক, রাষ্ট্রিক, ধর্মীয়, নীতিশাস্ত্র, দর্শন, মনোবিজ্ঞান ইত্যাদি তাতে প্রত্যেকটি নৈয়ায়িক বোধেই এসেছে সত্য-সুন্দর-কল্যাণ, ভাল-শুভ, ন্যয়, মঙ্গল, শ্রেয়-প্রেয় ইত্যাদি প্রসঙ্গ। দেশ, সমাজ, স্থানকাল, কার্যকারণ সত্যানুসন্ধানে অপরিহার্য নৈতিকতা। বর্তমান প্রেক্ষাপটে আদর্শ, বিবেক ও সততা ছাড়া রাষ্ট্রনীতি পরিচালনা সম্ভব নয়।
‘রাষ্ট্র একটি ভাব ও আদর্শের প্রতীক। এক একটি রাষ্ট্র একেকটি মতাদর্শকে তাদের মূলনীতি হিসেবে গ্রহণ করে। যেমনঃ- কোন রাষ্ট্র রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক ব্যবস্থা হিসেবে গ্রহণ করে সমাজতন্ত্রকে। কোথাও বহুদলীয় গণতন্ত্রকে। রাজনৈতিক আদর্শ এবং মুক্তবাজার ব্যবস্থাকে অর্থনৈতিক মুলনীতি হিসেবে গ্রহণ করে। কোন দেশে কোথাও রাজতন্ত্র কোথাও প্রজাতন্ত্র আবার কোথাও বা স্বৈরতন্ত্রকে গ্রহণ করা হয়েছে রাষ্ট্রনীতি হিসেবে।
ব্যক্তির অধিকার আছে যে কোন আদর্শকে তার নিজের জন্য গ্রহণ করার। তথ্য ও ভাব ধারণা গ্রহণের ক্ষেত্রে ও কোন সীমাবদ্ধতা নেই। যে কোন অঞ্চলের যে কোন আদর্শকে নিজের জীবনের আদর্শ হিসেবে গ্রহণ করা যায়।৩৮
স্বাস্থ্য, অর্থ, বিত্ত, সম্মান, প্রজ্ঞা, ইত্যাদি যা কিছুই মানুষ আশা করে না কেন তা অন্য যে কোন একটি উপায় হেতু বা বিনিময়ে। যেমন স্বাস্থ্য, সৌন্দর্য, বুদ্ধি, প্রজ্ঞা, আর্থিক স্বাচ্ছন্দ্য ছাড়া জ্ঞানের বিকাশ হয় না। মানুষ মানুষের সান্নিধ্যে না আসলে ভাল আচরণ, সুখদায়ক অনুভূতি প্রাপ্তির সৌভাগ্যলাভ কখনই হবে না। এভাবেই আসবে মানুষের চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য।
চারিত্রিক আচরণ হচ্ছে মানুষের অভ্যাসসিদ্ধ মানসিক প্রবণতা। এবং তাতে যৌক্তিক সঙ্গতি পূর্ণ বাস্তবতা রক্ষা পাবে। আচরণ ও চরিত্রের নৈতিক মূল্য হল মানুষের সুখদায়ক ও দুঃখদায়ক অনুভূতিপূর্ণ অভিজ্ঞতা। চারিত্রিক সততা ও কর্তব্য, মানসিক ইচ্ছা শক্তির কাজ করে। এই চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য থাকে এক ব্যক্তি থেকে আর এক ব্যক্তির মধ্যে স্বাতন্ত্র বোধে স্বতন্ত্র।
সুতরাং নৈতিক বিধি অনুযায়ী মানুষ যা করবে তা হবে কর্তব্য। অন্যায়, অনুচিত, মন্দ, অকল্যাণ, অমঙ্গল -এ জাতীয় শব্দগুলি অনেক সময়ই মানুষকে বিভ্রান্তিতে ফেলে। কারণ আবেগধর্মিতা ব্যক্তিনিষ্ঠ মনোভাবের পরিচায়ক, কখনও নীতিধর্মের নয়। ম্যাকেঞ্জির মতে: সততা হল চরিত্রের সৎ অভ্যাস এবং তা কর্তব্য থেকে পৃথক।
তিনি বলেন:
The complete good is perfectly beautiful; the morally good is the choice of it and the effort to achieve it, which may be necessary elements in its achievement.
নৈতিকতার দ্বন্দ্ব দূর না হওয়া পর্যন্ত নৈতিকতা বা নীতিবিদ্যা মানুষের জন্য তার নীতির সংজ্ঞা প্রয়োগ করবে। নীতির বিভিন্ন যুক্তিতে নৈতিক কর্তব্যে দ্বন্দ্ব একবার না একবার দূর হতে সক্ষম। সমস্ত মানুষ মেনে নিতে পারেনি বলে, তা মানুষের কাছে অস্পষ্ট অবিশ্লেষণযোগ্য ও অসচ্ছ। মানুষ ইচ্ছানুযায়ী কামনা করে বা পেয়ে থাকে নিজের হিতার্থে। এসবই এখন অন্যের উপকারে চাওয়া হবে তা পরমার্থের চেয়েও বেশী।
মানুষ নৈতিক জ্ঞানে যা চায় তা পরম কল্যাণ। মঙ্গলের জন্যই মঙ্গল সাধনা। এই কমনায় যখন আর ও দায়িত্ব বেড়ে যাবে তখন তা হবে আপেক্ষিক কল্যাণ বা সার্বজনীন কল্যাণ। পরম কল্যাণের ইচ্ছার স্বাধীনতায় আপেক্ষিক কল্যাণ আসে এবং মানুষের মধ্যে কর্তব্য পালনে নৈতিক বাধ্যবাধকতা (obligation) সরাসরি দেখা দেয়।
অতএব মানুষ নিঃশর্ত সাপেক্ষে, নৈতিকতাবোধে মনুষ্যত্ব প্রকাশে কর্তব্য করে সদগুণের অধিকারী হবে, এটাই আমাদের কাম্য। তাতে মানুষ হয়ে উঠবে সত্য, সুন্দর, কল্যাণকামী। সদাচার সুশিক্ষার সাথে স্বশিক্ষার ঘটবে সমন্বয়।