আজকে আমাদের আলোচনার বিষয়ঃ নারী চরিত্র পর্ব ২। যা মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের পাঁচটি উপন্যাসে জীবন ও সমাজ এর মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের উপন্যাস জীবন এর অন্তর্গত।

নারী চরিত্র পর্ব ২
“পুতুল নাচের ইতিকথা, পদ্মানদীর মাঝি, প্রাগৈতিহাসিক, সরীসৃপ, মহাকালের জটার জট, প্যাক, দিবারাত্রির কাব্য প্রভৃতি গল্প উপন্যাসেই মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় বাংলা সাহিত্যে গতানুগতিকের পথ অতিক্রম কওে নতুনের আশ্বাদন এনে দিয়েছেন। কিন্তু ‘শহরতলী’ উপন্যাসে শ্রমিক জীবন, শ্রমিক-মালিক সম্পর্ক এবং বিশেষ করে সত্যপ্রিয় এবং যশোদার মত অভাবিত চরিত্রসৃষ্টিতে যে অনন্যসাধারণ ক্ষমতার পরিচয় দিয়েছেন তা সত্যই বিস্ময়ের বিষয়। ২১
উপন্যাসের শেষে যশোদা অন্য কোথাও চলে যাওয়ার জন্য প্রস্তুত হচ্ছে। তার মনে হয় আবার উনুন ভাঙতে হবে। যশোদার বাড়ির ওপর দিয়ে শহরের উন্নয়নের জন্য রাস্তা হবে। তবে সে শহর এলাকায় স্বচ্ছন্দবোধ করে না। তাদের শহরতলী শহরে পরিণত হয়েছে। সে আবার শহরতলীর খোঁজে বেরিয়ে পড়বে নিশ্চয়।
সত্যপ্রিয়র বড় মেয়ে যোগমায়া। উচ্চবিত্ত পরিবারে মেয়ে বলে সে আহাদি প্রকৃতির। যোগমায়া সুশ্রী নয়, তবে সত্যপ্রিয় টাকা খরচ করে তার জন্য রূপবান জামাই কিনেছে। যেন সোনার ওজনে সোনার পুতুল। কিন্তু বিয়ের এক বছরের মধ্যে যোগমায়ার মুখের হাসি নিতে স্থায়ী বিষাদ আশ্রয় নিয়েছে আর চোখের দৃষ্টিও হয়েছে উদাস। এই চরিত্রটির দুটি দিক আছে- কন্যা এবং স্ত্রী। সে বাস্তব বুদ্ধিসম্পন্ন নারী নয়। না চাইতেই সব কিছু পেয়েছে। তাই বাস্তব জগৎ সম্পর্কে তার কোনো ধারণাই নেই।
বিয়ের পরও যোগমায়া বাবার বাড়িতে থাকছে, তাই তার নিজের সংসার হয়ে ওঠেনি। একই সঙ্গে সে কন্যার আদর-আহ্লাদ পায়, আবার যামিনীর স্ত্রীর মর্যাদাও পায়। কিন্তু তার চোখেমুখে স্থায়ী একটি বিষাদের কারণে সত্যপ্রিয় চিন্তিত হয়ে ওঠে। তার ধারণা হয়, যামিনী কোনোভাবে তার মেয়েকে যন্ত্রণা দিচ্ছে। তাই তাদের দুজনকে কিছুদিনের জন্য বিচ্ছিন্ন করতে চায়। যোগমায়াকে দেশে পাঠানোর আয়োজন করে। কিন্তু যোগমায়া আপত্তি করে, সে যাবে না। সত্যপ্রিয় বলে
‘কদিন বেড়িয়ে আয়। বিয়ের পর দেশের সবাই তোকে দেখতে চাচ্ছে। (তখ, পৃ.- ২৪৫)
যোগমায়া মনে করে সত্যপ্রিয়র মেয়ে জামাইকে আত্মীয়স্বজনকে দেখানোর ইচ্ছে হয়েছে। সে আর আপত্তি করে না। কিন্তু যখন বুঝতে পারে তাকে একা যেতে হবে তখন সে বেঁকে বসে। স্বামীকে ফেলে সে কোথাও যাবে না। এখানেই বোঝা যায় যোগমায়া বিয়ের পর স্বামীঅন্তপ্রাণ হয়েছে। এরপর সত্যপ্রিয় তার উদ্দেশ্য বাস্তবায়নে অন্যপথ ধরে। সে যামিনীকে দিলী পাঠিয়ে দেয়।
বাবার ওপর প্রচণ্ড রাগ করে যোগমায়া বাড়ির সকলের সঙ্গে কথা বলা বন্ধ করে দেয়। যোগমায়া সন্তানসম্ভবা জেনে যামিনীকে আনতে বাধ্য হয় সত্যপ্রিয়। তখনই যোগমায়ার মুখে হাসি ফোটে। যামিনীর টাকার আবদারে সত্যপ্রিয় জামাই এবং মেয়েকে টাকা না দিলে যোগমায়ার মুখ আরো কালো হয়।
গরিবের ছেলে যামিনী টাকার জন্য যোগমায়াকে যন্ত্রণা দেয়। তারপরও স্বামীর প্রতি ভালোবাসা যোগমায়া চরিত্রটিকে রহস্যাবৃত করেছে। যোগমায়ার সুখ সত্যপ্রিয় সত্যিই কিনতে পারেনি। শ্বশুরবাড়ি থেকেও যামিনী স্ত্রীর সঙ্গে ঝগড়া করে। যোগমায়ার স্বামীভাগ্য ভালো নয়
“ঘুম ভাঙ্গার পর হইতে যামিনীর অপিস যাওয়া পর্যন্ত একবার ধারে কাছেও ঘেঁষিল না দেখিয়া বোঝা গেল, দুজনে ঝগড়া হইয়াছে।” (৩খ, পৃ.-২৪৬)
সত্যপ্রিয় তার মোটা বুদ্ধিতে মনে করে:
“পুরুষ মানুষ যদি অকারণে মেয়ে মানুষকে মারধর গালাগালি না করে, তবে আর মেয়ে মানুষের সুখের জন্য কী দরকার হইতে পারে সে বুঝিতে পারে না।’ (তখ, পৃ.- 289 )
মিষ্টি ভদ্র সম্পর্ক আর স্নেহ মমতার সম্পর্কের ভিন্নতা সত্যপ্রিয় বোঝে না। স্বামীর দিক দিয়ে যোগমায়া সুখী হতে পারে না। যোগমায়ার স্ত্রী সত্তা অপমানিত হয়। যামিনীকে কিছুদিনের জন্য তার বাড়ি পাঠিয়ে দিল, কিন্তু তাতে ফল ভালো হলো না। যামিনী এবার স্ত্রীকে নিয়ে অন্য কোথাও থাকতে চায়।
যামিনীর একগুঁয়েমি যোগমায়াকে সংকটে ফেলে। তবে তার বাবার রাজপ্রাসাদের মতো বাড়ি, দামি আসবাব, দাস-দাসী, লোকজন খাওয়ানোর হইচই, কর্তার মেয়ে হিসেবে সকলের ওপর কর্তৃত্ব- যোগমায়ার একঘেঁয়ে লাগে। জীবনে নতুনত্বের স্বাস পাবার জন্য সে যামিনীর প্রস্তাবে রাজি হয়।
মেয়েরা স্বামীর ঘর করতে যায়, যোগমায়া সে কথা জানে। সে এও জানে যে স্বামীর ঘর করতে যাওয়া মহা গৌরবের এবং সৌভাগ্যের। বাস্ত বজগৎ সম্পর্কে জ্ঞানহীন যোগমায়া ভিন্নস্বাদের জীবন উপভোগ করার জন্য চঞ্চল হয়ে ওঠে। তবে সে বিশ্বাস করে সত্যপ্রিয় তাকে যেতে দেবে না। তাই বলে:
স্বামীর সঙ্গে স্বামীর ঘর করতে যাব, তা লুকিয়ে চুরিয়ে যাব কেন?’ (তখ, পৃ.-২৫৬) যোগমায়ার কন্যাসত্তা পিতার প্রতি বিশ্বাসে অটল। সে বাবার সঙ্গে অভিমান করে স্বামীর সঙ্গে যেতে চায়। বাবার আহ্লাদি মেয়ে সে, বাবাকে বিপাকে ফেলার জন্য তার চেষ্টা।
তাছাড়া স্বামীর সঙ্গে যাওয়াটা তার অভিপ্রায় নয়। তার মন দোটানায় দোলে। সিদ্ধান্তে আসে যে পিতাকে সে একটা শান্তি দেবে। ভালোবাসার, মায়া-মমতার আবদার। কিন্তু সত্যপ্রিয় ভালোবাসা-মায়া- মমতা বোঝে না, সে কঠোর মনের মানুষ। যোগমায়া যামিনীর সঙ্গে চলে যাওয়ার অনুমতি দিলে সে রাজি হয়। এতে যোগমায়ার কোমল মনে আঘাত লাগে:
“যোগমায়ার পৃথিবী অন্ধকার হইয়া যায়। শুধু আশা নয়, যোগমায়ার বিশ্বাস ছিলো সত্যপ্রিয় কখনো তাকে পাঠাইতে রাজি হইবে না, রাগ করিবে, বকুনি দিবে, তাকে বুঝাইবে আর সে তখন কাঁদিয়া কাটিয়া অনর্থ করিবে। কাঁদিতে কাঁদিতে বলিবে যে, তোমার জন্যইতো সব গোলমাল, তুমি কেন ওকে অপমান করলে। তার বদলে একী! এককথায় তাকে অনুমতি দিয়া দিল? এখন তো আর না গিরা উপায় থাকিবে না।” (৩খ,পৃ.-২৫৭)
যোগমায়া বিপাকে পরে। যশোদার বাড়িতে ভাড়াটে হয়ে যাওয়ার ইচ্ছে তার হয় না। আবার বাড়ি ছেড়ে যাওয়ার ইচ্ছাও উবে যায়। সে অন্যপথ ধরে- ছল করে সত্যপ্রিয়কে বলে তোমাকে কষ্ট দিয়ে যাবো না। কিন্তু সত্যপ্রিয় জবাব দেয় তার কোনো কষ্ট নেই। অবশেষে উপায়হীন যোগমায়া আর যামিনী সত্যপ্রিয়কে প্রণাম করে বাড়ি থেকে বের হয়ে যায়। যশোদার ঘর দেখে যোগমায়া আতঙ্কিত হয়ে ওঠে।
“ঘাটপালক, আলমারি, ড্রেসিংটেবিল এসব না থাক, কিন্তু এ কী দেয়াল, এ কী মেঝে, এ কী দরজা জানালা। কতটুকু ঘর।” (৩খ, পৃ. ২৫৮)
যশোদা যোগমায়াকে সাহস দেয়, কিন্তু সে দমে গিয়েছে। বিদ্যুতের আলো নেই। ঘরের দেয়াল যেন সরে সরে আসে, সে যশোদার পিছু পিছু ঘোরে। যামিনীর শখানেক টাকা, যোগমায়ার সাতাত্তর টাকা আর গহনা তাদের সম্বল। এ নিয়ে তারা হাল ফ্যাশনের বাড়িতেও যেতে পারে না। যোগমায়ার অবস্থা দিন দিন খারাপ হয়। সন্তান-সম্ভবা যোগমায়া যশোদার কাছ থেকে ধার করা মনের জোর নিয়ে দিনযাপন করে। লেখক বলেছেন:
“যশোদা না থাকিলে ইতিমধ্যেই হয়তো তার নার্ভাস ব্রেকডাউন ঘটিয়া যাইতো।” (৩খ, পৃ. ২৬০ )
যোগমায়া যামিনীকে অভিযোগ করে
“আমাকে মেরে ফেলে বাবাকে কষ্ট দেবে বলে তুমি আমায় জোর করে এনেছ।” (৩খ, পৃ. ২৬০ )
যোগমায়ার দাদা মহীতোষ এলে যোগমায়া আনন্দে পাগল হয়ে ওঠে। কিন্তু সত্যপ্রিয় এখানে আসতে বারণ করেছে শুনে সে কষ্টে মুহ্যমান হয়। বাড়ির সকলে তার নিন্দা করে জেনে সে স্ত ন্ধ হয়ে যায়। সে চলে এসেছে বলে বাড়ির কোনো পরিবর্তন হয়নি জেনে অভিমানে সে কেঁদে ফেলে।
যোগমায়ার এতোদিন নিজের সংসার ছিলো না। এ কুঁড়েঘর যোগমায়ার নিজের সংসার। নিজের সংসারে সে নিজেই কর্ত্রী। তাই দাদা মহীতোষকে সে অভ্যর্থনা আর আদর যত্নের জন্য ব্যস্ত হয়ে ওঠে। বাজার থেকে একরাশ খাবার এনে খাওয়ায়। বাড়ির কথা খুঁটে খুঁটে জিজ্ঞাসা করে।

মহীতোষের তথ্যে যোগমায়ার মন বীভৎস রকম খারাপ হয়ে যায়। মন ভালো করার জন্য যশোদার উদ্যোগে যোগমায়া সিনেমায় যায় । লেখক নিম্নমধ্যবিত্ত আর উচ্চবিত্তের একটি ছোট সংঘাত দেখিয়েছেন সিনেমায় যাওয়ার বেশভূষার মাধ্যমে। যোগমায়ার জমকালো পোশাক সকলের সাধারণ পোশাকের সঙ্গে খাপ খায় না। শ্রেণী বিভেদটা স্পষ্ট হয় যশোদার কথায়
“যদি ভাবে তো ভাববে যে, আমরা তোমার চাকর-দাসী তুমি কোথাকার রাজরানি- টানি হবে। পাঁচ-সাতজন চাকর-দাসী নিয়ে বায়োস্কোপ দেখতে এসেছ।” (তখ, পৃ.- ২৬৩)
অবশেষে যশোদার নামে বাড়ি বিক্রয় নোটিশ আসলে যোগমায়া স্বামীকে বিয়ে বাড়ি ফিরে যায়। এতো কিছুর পরও যোগমায়ার পিতৃভক্তি যায় না। তাই নোটিশ আসার পর রাজেন সত্যপ্রিয়কে হনুমান বলে গাল দিলে যোগমায়া খেপে যায়, রাগারাগি করে। এরপর সহানুভূতির কোন সম্ভাবনা নেই দেখে ঘরে গিয়ে কান্না শুরু করে।
যোগমায়া চরিত্রের মধ্যদিয়ে মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় নারীমনের বিভিন্ন দিক তুলে ধরেছেন। উচ্চবিত্ত হয়েও সে যে সৌভাগ্যবর্তী হতে পারেনি তা-ও স্পষ্ট হয়েছে। পিতা ইচ্ছে করলেই মেয়ের জীবন হাসি-আনন্দে ভরে দিতে পারে না। নারীর জীবন স্বামীর ওপর নির্ভর করে, সমাজের এই সত্যটিও যোগমায়া চরিত্রে অংকিত হয়েছে।
যোগমায়া বাস্তববুদ্ধিহীনা নারী। আদরে-আহ্লাদে লালিত পালিত হয়ে গরিব স্বামীর সঙ্গে বসবাস করতে গিয়ে পিতার কাছে স্বামীর টাকা জোগাতে হিমশিম খেয়ে ওঠে। তারপর স্বামীর গোঁয়ার্তুমিতে তার জীবন বিপর্যন্ত হয়ে যায়। যোগমায়া দুজন পুরুষের আত্মসম্মানের টানাটানিতে বিধ্বস্ত হয়েছে, দেহ মনে বিপর্যন্ত হয়েছে।
পিতার একগুঁয়েমি, গোঁয়ার্তুমি, স্বামীর বুদ্ধিহীন সিদ্ধান্ত এবং মেরুদণ্ডহীনতা- অপারগতা যোগমায়া চরিত্রকে বিপর্যস্ত করেছে। সমাজে নারী স্বাধীন নয়, সে পিতা বা স্বামীর ওপর নির্ভর করে বেঁচে থাকে। মানিক বন্দোপাধ্যায় যোগমায়া চরিত্রের মধ্য দিয়ে সুক্ষ্মভাবে এই সত্যকে তুলে ধরেছেন।
যোগমায়ার মায়ের চরিত্র উচ্চবিত্ত শ্রেণির অন্দর মহলের কর্ত্রীর চরিত্র প্রকাশ করেছে। এখানে সে কর্ত্রী হয়েও কর্ত্রী নয়, তার কোন অস্তিত্ব নেই। মত প্রকাশের অধিকার নেই। যশোদার বাড়িতে আসা মধ্যবিত্ত বিভিন্ন নারীর চরিত্রও এইরূপ মেরুদণ্ডহীন জীবনযাপন করে। তারা প্রায় সকলেই বিকারগ্রস্ত।
‘শহরতলী’ দ্বিতীয় খণ্ডে সুব্রতা চরিত্রের আবির্ভাব। সুব্রতার বর্ণনায় লেখক বলেছেন: “মুখখানা সুশ্রী, বুদ্ধিতে উজ্জ্বল চপল দুটি চোখ।” (৩খ, পৃ.-২২৮)
সুব্রতা আর তার স্বামী অজিত যশোদার বাড়িতে ঘর ভাড়া নেয়। যশোদা ভদ্রলোকদের পছন্দ করে না, কিন্তু সুব্রতার বুদ্ধিতে যশোদা তাদের ঘর ভাড়া দিতে বাধ্য হয়। ছয় মাস ধরে বিয়ে হয়েছে সুব্রতার। ভাশুর এবং জায়ের অপছন্দের মেয়ে সুব্রতাকে বিয়ে করেছে অর্জিত এবং কারখানায় পঁচিশ টাকায় কুলি-মজুরের একটা কাজ নেওয়ায় অজিতের ভাই-বৌদি খেপেছে। তাই সুব্রতা আর অজিত ঘরভাড়া করে আলাদা সংসার পাতে।
সুব্রতা সুন্দরী, হাসিখুশি, মিশুক প্রকৃতির মেয়ে। সে তার জায়ের চেয়ে সুন্দর বলেই তার জা তাকে পছন্দ করেনি। তার স্বভাবে যশোদা মুগ্ধ হয়। বাড়ি ভাড়া নেয়ার সময় সে যখন কথা বলছিলো, এতটুকু মেয়ের কাছে এতো গোছানো পাকা কথা শুনে যশোদা অবাক হয়। মনে হয় মা মাসি কারো নকল করে সে কথা বলছে।
যশোদার চোখের সামনে একটি সুন্দর ঈর্ষণীয় সংসার সাজায় সুব্রতা। দেওয়ালে ছবি টাঙায়, জানালায় পর্দা দেয়, আলনায় কাপড় সাজিয়ে রাখে, চৌকির পায়ায় রঙিন ঢাকনি দেয় আর আসবাব কেনার জন্য পরিকল্পনা করে। ‘জননী’তেও শ্যামার বাড়ি ভাড়া নিয়ে কনকলতা এমন রিক্ত-পরিচ্ছন্ন সংসার সাজিয়েছে।
তাদের স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে বিরোধ নেই- সুখী দম্পতি। সংসারের প্রয়োজনে চারের দামি সেট কেনার জন্য সুব্রতা গহনা বিক্রির জেদ ধরে, কিন্তু অঙ্গিত বিক্রি করে না। পরে যশোদার মধ্যস্থতায় সমাধান হয়। সুব্রতা সম্পর্কে যশোদা ভাবে
“সুব্রতার গিন্নিপনা আছে, পাকামি নাই, লজ্জাহীনতা আছে, বেহায়াপনা নাই, বুদ্ধি আছে, কুটিলতা নাই …………]।’ (৩খ, পৃ.-২৩১ )
সুব্রতা সন্তান সম্ভবা হলে সে সাবধানী হয়ে গেলো। চায়ের দামি সেট কেনার মত প্রয়োজনগুলো বাতিল করে দিল। অনাগত সন্তানের ভবিষ্যৎ ভাবনায় আসন্ন যা নিজেকে প্রস্তুত করতে শুরু করলো। এমনকি খরচপত্রও কমিয়ে ফেললো। সে সংযমী হয়।
“সুব্রতার মধ্যে ন্যাকামি নাই। তরুণ মনের স্বাভাবিক ভাব প্রবণতা তার মধ্যে যথেষ্টই আছে কিন্তু দমনও যে করিতে জানে।” (৩খ, পৃ. ২৩৪ )
সুব্রতা চরিত্রের সবচেয়ে বড় দিক, সে খুব মিশুক। সে আস্তে আস্তে পাড়ার কাছের এবং দুরের সকলের সঙ্গে ভাব জমিয়ে ফেললো। অদ্রবাড়ির মেয়েরা দুপুরবেলা যশোদার বাড়ি আসতে থাকেঃ
“কয়েক মাসের মধ্যে দেখা গেল যশোদার বাড়িতে দুপুরবেলা রীতিমতো মেয়েদের বৈঠক বসিতে আরম্ভ করিয়াছে। দু-একটি মেয়ে নয়, উকিল, ডাক্তার, মাস্টার, প্রফেসর, কেরানি, জীবনবীমার এজেন্ট প্রভৃতি অনেক রকম ভদ্রলোকের বাড়ির অনেক মেয়ে। সকলের বাড়ি যে খুব কাছে তাও নয়। বড় রাস্তার ধারের কয়েকটি বাড়িতে পর্যন্ত সুব্রতা তার পরিচয়ের অভিযান আগাইয়া নিয়া গিয়াছে।” (তখ, পূ. – ২৩৫)
এরপর সুব্রতা যশোদার পরামর্শে গানের স্কুল খুলে ফেললো। এরপর যশোদার ঘর ভাড়া নিয়ে যোগমায়া এলে সে প্রথমে উদ্ভাসিত হলো, কিন্তু যোগমায়ার রকম দেখে সে পরে দমে গেলো। সুব্রতা বুদ্ধিমতী মেয়ে। তাই সে যশোদাকে ঠিক চিনতে পারে। নিজের অদূরভবিষ্যতের অবস্থা দেখে সে যশোদাকে ছাড়তে চায় না। যশোদার বাড়ি বিক্রির কথায় অজয় কোথাও ঘর খুঁজতে চাইলে সুব্রতা জানায় সে যশোদার সঙ্গেই যাবে। শহরতলীর শহরে পরিণত হওয়ার সঙ্গে তাল রেখে সুব্রতা চরিত্র চিত্রণ লেখকের নিপুণ দক্ষতার পরিচয়।
যশোদার সই কুমুদিনী। স্বামী-পুত্র নিয়ে তার সংসার। যশোদার পাড়াতেই সে বাস করে। যশোদার সমালোচনায় তার সীমা নেই, কিন্তু ভেতরে ভেতরে সে যশোদাকে পছন্দ করে এবং ভালোবাসে। স্বামীর সম্পর্কে কুমুদিনী বেশ সচেতন। স্বামীকে যশোদার কোনো কাজে থাকতে দেয় না। প্রথমখণ্ডে কুমুদিনী চরিত্রটিকে একটা কুট চরিত্র হিসেবেই চিত্রিত হতে দেখা যায়। কুমুদিনী আড়ালে যশোদার দুর্নাম করে, আবার উপকার পাওয়ার সম্ভাবনা থাকলে নির্বিবাদে সেটা আদায় করে। লেখক জানিয়েছেন:
“উপকার পাওয়ার পরেই যশোদার নিন্দায় কুমুদিনী হইয়া উঠে।” (তখ, পৃ. ১৬৭) রাজেন এই নিষ্পাগুলো যশোদাকে শোনায়। যশোদা তখন বলে: “তবে কী জানো সরকারমশায়, আমার জন্য এর সত্যি মায়া আছে।” (তখ, পৃ. ১৬৮)
কুমুদিনীর মায়া সত্যিই আছে। তাই সে বন্ধুত্বসুলভ মনে যশোদাকে সাবধান করতে আসে- ধনঞ্জয়কে নিয়ে পাড়ায় কথা হচ্ছে। ধনঞ্জয়ের প্রতি যশোদার অতিরিক্ত আগ্রহ লোকের চোখে পড়ছে। স্বামী-সন্তানহীন যশোদার গায়ে কলঙ্ক লেপন কুমুদিনী সহ্য করতে পারে না। যশোদা লোকের অহেতুক নিষ্পার প্রতিবাদ করলে কুমুদিনী বলে:
“যা খুশি করগে ভাই তুই, কলঙ্কে আর ডর কি তোর, বোঝার ওপর শাকের আঁটি বই তো নয়। ছেলেবেলা সই পাতিয়েছি, তাই বলা, নয়তো আমার কী এলো গেলো।” (৩খ, পৃ.-২০৩ )
প্রথম খণ্ডে কুমুদিনী চরিত্র এখানে শেষ হয়েছে। দ্বিতীয় খণ্ডে আমরা দেখতে পাই কুমুদিনীর ভেতরে এক প্রকৃত বন্ধুসত্তা, যেখানে কোনো কূট কৌশল নেই। দ্বিতীয় খণ্ডে শহরতলী শহর হয়ে উঠেছে। সকলে মোটা টাকায় বাড়ি বিক্রি করে চলে গেছে, নতুন নতুন পাকা বাড়ি উঠছে। যশোদার বাড়ি পর্যন্ত এসে রূপান্তর থেমে গেছে। সে বাড়ি বিক্রি করে নাই। তার জন্য কুমুদিনী এবং জার পরে আরো কয়েকটি বাড়ি বিক্রি হতে পারে নি।
কুমুদিনীর টাকার শখ প্রবল। সে যশোদাকে অনেক বলেও বাড়ি বিক্রি করাতে পারে না। এরপর যশোদা রাজি হয়ে দু দিনের জন্য হোটেলে গিয়ে উঠলে কুমুদিনী প্রকৃত বন্ধুর মতই জিনিসপত্র বেঁধে রাখে। আবার যশোদা এখনই চলে যাবে বলে সকলে মিলে থাকার জন্য কুমুদিনীও তার সঙ্গে এক বাড়িতেই উঠবে।
আবার যশোদা মত বদলায়- বাড়ি সে বিক্রি করবে না। কুমুদিনী আবার খেপে যায়। বাড়ি বিক্রির জন্য যশোদাকে বোঝায়। এরপর পাড়ার অন্য সকলে বাড়ি বিক্রি করলে কুমুদিনী যশোদার জন্যই টাকার শখ ত্যাগ করে বাড়ি বিক্রি না করে যশোদার সঙ্গে থাকে। যশোদা তাকে কাজ না দিলেও সে নিজে থেকেই যশোদার কাজ করে দেয়। যশোদা শ্রমিকদের মিটিংয়ে গেলে বাড়িতে রান্না হচ্ছে না দেখে কুমুদিনী এসে যশোদার বাড়ি রান্না করে দেয়। তার সম্পর্কে লেখকের মন্তব্য:
“শত্রুর বাড়িতে নিজে রাঁধিয়া দিতে না আসিলে কুমুদিনীর বোধহয় তৃপ্তি হয় না। ” (৩খ, পৃ. ২৫৩ )
যশোদার বাড়িতে যে কোনো ঘটনা ঘটলে কোনো কিছু করার না থাকলেও কুমুদিনী এসে দাঁড়ায়, বোঝার চেষ্টা করে, যশোদার ভাল-মন্দ দেখে। সত্যপ্রিয়র মেয়ে যোগমায়া এবং তার জামাই যামিনী রাগ করে যশোদার বাড়ি ভাড়া নিলে সে যশোদার আসন্ন বিপদের কথা টের পায়।
একপাশে মুখ বুজে বসে থাকে সে। কুমুদিনী চরিত্র চিত্রণে কয়েকটি অসংগত দিক দেখা যায়। ২১৭ পৃষ্ঠায় আছে কুমুদিনী আার রাজেন দুইজনে একা মানুষ, ২২৫ পৃষ্ঠায় আছে ‘কুমুদিনীর ঘরভরা ছেলেমেয়ে’। আবার, ২৫৩ পৃষ্ঠায় আছে- ‘কথা ছিলো কুমুদিনীর ননদ আসিয়া রাঁধিয়া দিবে।’
অপরাজিতা চরিত্রটিকে আমরা দেখি তার বউভাতের দিন থেকে। জোতির্ময়ের তুলনায় তার বয়স অর্ধেকেরও কম। সে নিতান্ত বুকি। সত্যপ্রিয়কে খুশি করার জন্য জ্যোতির্ময় একটি খুকিকে বউ করে এনেছে। অপাজিতা চরিত্রটি পূর্ণাঙ্গতা পায় নি । জোতির্ময়ের চরিত্রের প্রভুভক্তি দেখানোর জন্য অপাজিতার বিভিন্ন সমস্যা উপস্থিত হয়েছে।
সেখানে সে নিজের মতামতের কোনো মূল্য পায় নি। দাম্পত্য জীবনেও সে স্বাধীন নয়। এক্ষেত্রে আবহমান বাঙ্গালি সমাজের চিত্রই লেখক দেখিয়েছেন। সারাদিন অফিসের কাজ শেষে শ্রান্ত জ্যোতির্ময়ের ‘পুতুল নিয়া খেলা করার আমোদ অপরাজিতা:
“অপরিপুষ্ট ও অপরিণত অপরাজিতার বিবর্ণমুখ ও উৎসুক দৃষ্টি শ্রান্তি দূর করিতে সাহায্য করে।” (তখ.পৃ.-১৫০)
জ্যোতির্ময়ের কথায়, আদবে, সোহাগে অপরাজিতা আধমরা হয়ে যায়, কোন দিন মূর্ছা যাওয়ার উপক্রম হয়। সে ভীতসন্ত্রস্ত হয়ে থাকে, তার বুকের মধ্যে ঢিপ ঢিপ করে। তবে মাঝে মাঝে অপরাজিতারও অফুরন্ত জীবনী শক্তি আসে। তার ফর্সা মুখ রক্তবর্ণ হয়ে থাকে, আবেগের আতিশয্যে নিজের চুল ছেঁড়ার উপক্রম করে।
“প্রাণহীন জড়বস্তুর মতো কেবল সোহাগ গ্রহণ করার বদলে সোহাগের বন্যায় স্বামীকে একেবারে ভাসাইয়া দিবার চেষ্টা করে।” (তথ, পৃ. ১৫০ )
এমনি করে আস্তে আস্তে অপরাজিতা অসুস্থ হতে থাকে, কিন্তু জ্যোতির্ময় তা বুঝতে পারে না। বাড়িতে কেউই তার অবস্থা অনুমান করে ডাক্তার দেখায় না:
‘এ বাড়িতে কে অনুমান করিবে অসুখের ঝড়েই একরাত্রে মেয়েটার অবস্থা হইয়াছে দুমড়ানো মোচড়ানো চারার মতো?’ (৩খ, পৃ.-১৫১ )
এভাবে ধীরে ধীরে অপরাজিতা আরো অসুস্থ হয়ে পরে। সুবর্ণ বউদিকে ঠাট্টা করে আর সুধীরা হিংসা করে। কেউই আসল অবস্থা বিচার করে তার রোগমুক্তির ব্যবস্থা করে না। সমাজে বউদের অবস্থাই এই রকম। বউরা একটি দম দেওয়া যন্ত্র, তার নিজের কোনো শক্তি নেই, নিজের চলবার অধিকারও নেই।

নিজেকে প্রকাশ করবার চেষ্টা অপরাজিতা দু-একবার করেছে, মতও দিয়েছে, কিন্তু সিদ্ধান্তের জন্য জোতির্ময়ের উপর নির্ভর করতে হয়েছে। সত্যপ্রিয়র পিতার মাসিক শ্রাদ্ধতে তাদের নিমন্ত্রণ আছে। অপরাজিতার যাওয়ার ইচ্ছা নেই। সে শুধু বলতে পারে: “আমি যাবো?” জ্যেতির্ময় যখন বলে সত্যপ্রিয়র বাড়ি নিমন্ত্রণ যেতেই হবে, তখন-
‘গভীর শ্রান্তিতে অপরাজিতার হাই ওঠে, আবার শুইয়া পড়িতে ইচ্ছা হইতেছে। (৩খ, পৃ. ১৭২)
এরপর সে একটু স্বাধীন মত প্রকাশ করে বলে সত্যপ্রিয়র দেওয়া নেকলেস পরে যাবে না। সে জানায়:
“সোনাটা পিতলের মত দেখাইতেছে, পাথর আর মুক্তাগুলি যেন কাচ আর পুঁতি।” ( তখ, পৃ. ১৭২)
অপরাজিতা কাউকে না দেখিয়ে নেকলেসটি লুকিয়ে রেখেছিল। জোতির্ময়ের সঙ্গে অপরাজিতার কথোপকথনে তাকে অনেক বুদ্ধিমতী মনে হয়। অপরাজিতা বলে- ‘আমাদেরই ভুল হয়েছিলো, জিনিসটা নকল। জ্যোতির্ময় যেন চোখে দেখিয়াও বিশ্বাস করিতে পারে না, তাই কী হয়, উনি আসল জিনিস বলে নকল দেবেন? অপরাজিতা উত্তর দেয়:
“আসল জিনিস বলে তো দেন নি।” (তখ.প্র.-১৭৩)
অপরাজিতা আবার বলে না যাওয়ার কথা। কিন্তু জ্যোতির্ময় তাকে ভুল বোঝে। সে ভাবে নেকলেস কালো হয়েছে বলেই অপরাজিতা যেতে চাচ্ছে না। জ্যোতির্ময়ের কড়া কথা শুনে অপরাজিতা মুখ ফুটে আর নিজের শরীরের অসুস্থতার কথা বলতে পারে না। সে নিজেকে বাঁচাবার জন্য যশোদার শরণাপন্ন হয়। নিজের শরীর ও মনের কথা যশোদাকে খুলে বলে। যশোদা ভাবে
“বউটাও বা এমন হাবা কেন, স্বামীকে অসুখের কথা বলিতে লজ্জা পায়।” (তখ, পৃ. ১৮১)
যশোদা জ্যোতির্ময়কে অপরাজিতার কথা বুঝিয়ে বলে এবং তাকে কিছুদিন বাপের বাড়ি পাঠাতে বলে। যশোদার কথায় সে অন্যমনস্ক হয়ে যায় এবং সত্যপ্রিয়র মেয়ের বিয়ের পর অপরাজিতাকে বাপের বাড়ি পাঠাবে বলে জানায়। তারপরও অপরাজিতা বিয়েতে যেতে অস্বীকৃতি জানালে, জ্যোতির্ময় পীড়াপীড়ি করে তাকে নিয়ে যায়। বিয়েবাড়িতে গিয়ে তার অবস্থা এতো খারাপ হয় যে, হাসপাতালে নিতে হয়। শেষ পর্যন্ত অপরাজিতার মৃত্যু হয়। জ্যোতির্ময়ের অতিরিক্ত চাকরিভক্তি এবং প্রভুভক্তি তাকে সংসার সম্পর্কে উদাসীন করে এবং এইটেই অপারিজতার মৃত্যুর কারণ।
সমাজবাস্তবতাও এর জন্য কম দায়ী নয়। জ্যোতির্ময়ের পরিবারের লোকেরা যদি সচেতন হতো তবু অকালে তাকে মৃত্যুবরণ করতে হতো না। কিন্তু কেউ তাকে সাহায্য করলো না। যশোদার তৎপরতাও জ্যোতির্ময়ের কারণে ব্যর্থ হলো।
জ্যোতির্ময়ের অবিবাহিত বোন সুবর্ণ। সে সকলের আদরে আহ্লাদিত। তার চরিত্রে কয়েকটি দিক স্পষ্ট- প্রেমিক, বোন এবং ননদ। জ্যোতির্ময়ের বউভাতে সুবর্ণ চরিত্রের প্রথম প্রকাশ । বিয়ের কনের মতো সে সাজগোজ করেছে:
“আজিকার উৎসবটি যেন তারই বিবাহের ভূমিকা- সাজগোজেই যেখানে যত বড় আছে, সকলকে আজ সে আয়ত্ত করিয়া রাখিবে।” ( ৩খ, পৃ.-১২৭ )
আনন্দে উত্তেজনায় আহাদে আর ন্যাকামিতে সেই মধ্যমণি হয়ে রইল। যশোদার ভাই নন্দ সত্যি সত্যিই সুবর্ণকে দেখে হা হয়ে গেলো। জ্যোতির্ময়ের আহ্লাদি বোন সুবর্ণ, অপরাজিতার আদরের ননদ। ননদসুলভ আচরণ সে করে। বৌদির দোষত্রুটি ধরা নয়, বউদিকে টিপ্পনি কাটতেই সে পটু। বেলা করে ঘুম থেকে ওঠার জন্য অপরাজিতাকে দেখে বড় বোন সুধীরা মুখ বাঁকালেও সুবর্ণ মুচকি মুচকি হাসে আর পাকামো করে
“আড়ালে ডাকিয়া নিয়া গত রজনীর ইতিহাস সব না হোক কিছু শুনিবার জন্য কেবলই খোঁচায়, তোষামোদ করে, আর কেবলই ভয় দেখায়, না যদি বলো বউদি, সুবর্ণ অপরাজিতাকে সত্যিই ভালোবেসে ফেলে। অপরাজিতা অসুস্থ হয়ে হাসপাতালে যাওয়ার সময় সুবর্ণ অস্ফুট শব্দ করে কান্না করে।
অসুস্থ অপরাজিতা হাসপাতালে মৃত্যুর সঙ্গে লড়ছে এ অবস্থায় জ্যোতির্ময় অফিসে যাচ্ছে শুনে সুবর্ণ আপত্তি করে। তারপরও অফিসে যাবে জেনে স্নেহময়ী সুবর্ণ নিজেকে সংযত রাখতে পারে না:
“রাত্রিটাও অপিসে থেকো- সুবর্ণের মুখ বিবর্ণ, চোখ ফুলিয়া গিয়াছে। বলিতে বলিতে আবেগে বিবর্ণ মুখে রক্তের সঞ্চার হয়, মাথা ঝাঁকি দিয়া সে আবার বলে, বউদি যেন মরে মরে, মরে, মরে। মরে যেন তোমার হাত থেকে রেহাই পায়।” (৩খ, পৃ.-২০০ )
সত্যিই অপরাজিতা মরে যায়। সুবর্ণের তখন অন্য অনুতাপ, তার আশঙ্কা সে মরতে বলেছে বলেই হয়তো অপরাজিতা মরে গেছে। অনুতপ্ত অসহায় সুবর্ণ জ্যোতির্যয়ের গায়ের ওপর ঝাঁপিয়ে পরে কান্না শুরু করে। এই সুবর্ণ অনেক কোমল, স্নেহময়ী। দায়িত্বভার তাকে কেউ দেয় নি, কিন্তু ভালোবাসার দায়িত্ব সে কাঁধে তুলে নিয়েছে।
সুবর্ণ অভিমানী, স্নেহ প্রত্যাশী। সুবর্ণের অসংযত কথায় জ্যোতির্ময় তার গালে চড় দিলে সে অভিমান করে থাকে। কিন্তু কেউ কোন স্বান্ত্বনার বাক্য বলে না? সুধীরাকে বলে সে বাড়ি থেকে চলে যাবে। সেখানে সুধীরা তাকে চুপ করতে বলে, কোনো মায়া মমতা দেখায় না। এরপর সে যায় যশোদার কাছে, সেও কোনো সহানুভূতি জানায় না।
অবশেষে সে সত্যিই কোথাও চলে যাওয়ার জন্য পা বাড়ায়, তখন দেখা হয় নন্দ’র সাথে। নন্দর সহানুভূতি পেয়ে সে নন্দকে নিয়ে পালিয়ে যেতে চায়। কিন্তু অপরাজিতার মৃত্যু তাকে থামিয়ে দেয়। এখানে সুবর্ণ বাস্তব বৃদ্ধিহীন, খেয়ালি প্রকৃতির।
সুবর্ণ সবচেয়ে সক্রিয় তার প্রেমিকসত্তায়। সত্যপ্রিয়র পিতার মাসিক শ্রাদ্ধের দিন নন্দ’র কীর্তন শুনে সে নন্দকে পছন্দ করে। কীর্তন শুনে সে দিগ্বিদিক জ্ঞানশূন্য হয়ে যায় :
“মুখখানা লম্বাটে হইয়া গিয়াছে সুবর্ণের, ছোট একটু হা করিয়া আছে, দু-চোখ বড়ো বড়ো করিয়া খোলা, কী একটা রোগের যন্ত্রণায় মেয়েটা যেন মুখ ভেংচি দিয়াছে।” (৩খ, পৃ. ১৭৩-১৭৪)
যশোদা অন্দরে গেলে সুবর্ণ তার কাছে নন্দর উচ্ছাসিত প্রশংসা করে। সকলে কীর্তনের প্রশংসা করছে, সে কথাও বলে। পরদিন দুপুর বেলা কীর্তনের অবসাদে নন্দ যখন ঝিমুচ্ছে, তখন সুবর্ণ এসে উপস্থিত হয়। সে নন্দর কীর্তন পুনর্বার শুনতে চায়। কিন্তু আয়োজন ছাড়াতো নন্দ কীর্তন গাইতে পারে না। সুবর্ণ উত্তেজনা চেপে রাখতে পারে না। আবেগ তার উথলিয়ে ওঠে। সে বলে
“কীর্তন যে এমন হয়, আমি সত্যি জানিতাম না। কাল শুনতে শুনতে আমার যে কী রকম হচ্ছিল-” (তখ, পৃ. ১৭৯)
উত্তেজনায় সুবর্ণ ঘুমাতে পারে নি, তার জ্বরও এসেছে, চোখ পাগলের মত হয়েছে। প্রেমের প্রথম সোপানে সুবর্ণ উদ্ভ্রান্ত হয়েছে। তার বউদি যশোদাকে ডাকতে বলার সঙ্গে সঙ্গে তাই সে ছুটে এসেছে। এসে উত্তেজনায় সে যশোদাকে দেখতেই পায় নি, নন্দর কাছে কীর্তন শোনার আবদার জানিয়েছে আর যশোদাকে বলেছে আসল কথা। যশোদা তাকে তার বাড়ি এনে বরফ পানি দিয়ে মাথা ধুয়ে শরবত খাওয়ালে সে কিছুটা সুস্থ হয়।
যশোদার মিষ্টি কথা শোনা মাত্র সে ফুঁপিয়ে কেঁদে ওঠে। এমনি করে প্রেমের প্রথম ধাক্কা সে কাটিয়ে ওঠে। এরপর আর থামতে পারে না সুবর্ণ। সে এবার নিজের অস্তিত্ব সম্পর্কে সচেতন হয়ে ওঠে। জ্যোতির্ময়ের চড় খেয়ে সে নন্দের ওপর নির্ভর করে। অনেক দূরের অজানা শহরে নদীর ধারে তারা ঘর করবে।
নন্দর কাছে সারা দিন কীর্তন শুনে সে ঘরক্সার কাজ করবে। কিন্তু অপরাজিতার মৃত্যু তাদের নিরুদ্দেশ হতে দিল না। এবার সুবর্ণ নন্দর চাকরি নিয়ে চিন্তিত হয়, কেমন করে নন্দকে তাদের পর্যায়ে তুলবে, কিংবা তারা যদি নন্দদের মতো মধ্যবিত্ত হয়ে যায় তাও হয়।
নন্দকে সে সত্যপ্রিয়র কাছে চাকরির জন্য পাঠায়। সত্যপ্রিয়র কৌশলে নন্দ চাকরিও পায়। যশোদা সে চাকরি ছাড়তে বললে সুবর্ণর পরামর্শে নদ চাকরি ছাড়ে না। সুবর্ণ চিন্তা করে নন্দর একশ টাকা বেতন হতো। সুবর্ণ অপরাজিতার কথা বলে জ্যোতির্ময়কে চাকরি ছেড়ে দিতে বলে যেন তারা নন্দদের স্তরে নেমে যায়। অতঃপর কোনো উপায় না দেখে সুবর্ণ আর নন্দ নিরুদ্দেশ হয়।
‘শহরতলী’ দ্বিতীয় খণ্ডে দেখা যায়, তারা কোথায় গেছে যশোদা বা জ্যোতির্ময় কেউই জানে না। তারপর একসময় যশোদা জানতে পারে নন্দ সিনেমায় অভিনয় করছে। হলে গিয়ে তারা সুবর্ণকেও সিনেমায় অভিনয় করতে দেখে। রাজেন খবর নিয়ে আসে নদ আর সুবর্ণ অনেক বড়লোক হয়েছে। সুবর্ণের মাধ্যমে উচ্চমধ্যবিত্ত পরিবারের একটি মেয়ের প্রথা ভাঙা দেখিয়েছেন লেখক।
‘অহিংসা’ উপন্যাসে মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় মানব মনের সূক্ষ্ম বিশেষণ করেছেন। মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের এই উপন্যাসেই মনোবিশেষণ সবচেয়ে জটিল এবং সমৃদ্ধ। আশ্রমকে কেন্দ্র করে উপন্যাসের কাহিনী আবর্তিত হয়েছে। এই আশ্রমটি মহীগড়ের রাজা সাহেবের দান। রাজপুত্র নারায়ণ কয়েক দিন লুকিয়ে রাখার জন্য পালকিতে করে একটি মেয়েকে আশ্রমে নিয়ে আসে। এই মেয়েটির নাম মাধবীলতা।
মাধবীলতা প্রথম দিন আশ্রমে এসেই আশ্রম এবং সদানন্দের স্বাভাবিক জীবনে অস্বাভাবিক ক্রিয়া করেছে সিমেন্ট করা উঠানে হিলতোলা জুতা ঠুকে সে সদানন্দের কাছে এসে খপ করে সদানন্দের হাত ধরে ফেলে। তার কোনো সংযম নেই:
“মুখে তীব্র মদের গন্ধ, যে গন্ধে সদানন্দের চিরকাল বমি আসে। [… …….. দুহাতে সদানন্দের গলা জড়াইয়া গদগদ হইয়া বলিল, শোনো, আমি কেউ নয় বললাম না এক্ষনি তোমাকে, তা সত্যি নয় । আমি মাধবী মাধবীলতা- লতাটা কেটে বাদ দিয়েছি একদম।” (৩খ, পৃ. ২৮২)
মাধবী তার মামা-মামির কাছে বড় হয়েছে শুধু এ কথা জানা যায়- এ ছাড়া তার অতীতের আর কোনো কথা জানা যায় না। আশ্রমেই নতুন করে তার জীবনের শুরু। প্রথম দিন সে ঘুম সদানন্দের পিঠের কাছে কুণ্ডলী পাকিয়ে ঘুমিয়ে থাকে। সকালবেলা সদানন্দ উঠে ঘুমান্ত মাধবীকে দেখতে পায়।
প্রৌঢ় বয়সী সদানন্দের কাছে মাধবী কুমারীত্ব হারায়, ফ্রয়েডীয় যৌন তত্ত্বকে অবলম্বন করে মাধবী চরিত্রটি অংকন করা হয়েছে। সদানন্দ বিপিন মহেশ চৌধুরি বিভূতি এদের চিন্তা-চেতনা একগুঁয়েমি, পরশ্রীকাতরতা ইত্যাদি মাধবীর জীবনের গতিকে নিয়ন্ত্রণ করেছে, তবে মাধবীর নিজস্ব চেতনায় তার মনের গতি নিয়ন্ত্রিত হয়েছে। মাধবীর জীবনের বিভিন্ন পর্যায় উপন্যাসের কাহিনীকে এগিয়ে নিয়ে গেছে।
নারায়ণ মাধবীকে নিয়ে আসে আশ্রমে। কয়েক দিনের জন্য সে মাধবীকে রেখে যায়। সব ব্যবস্থা করে তারপর মাধবীকে নিয়ে যাবে। এরই মধ্যে সদানন্দ মাধবীর মনে ভয় এনে দেয়। সে মাধবীকে বলে নারায়ণ দুদিন পর তাকে ছেড়ে পালাবে, তখন সে কী করবে? এমন ভুল, এমন ছেলেমানুষি কেউ করে? একথা শুনে মাধবী খাবারের পেট, চায়ের কাপ সদানন্দের দিকে ছুঁড়ে মারে, তারপর বাঘিনীর মতো আঁচড়িয়ে সদানন্দের মুখে রক্ত বের করে দেয় এবং সদানন্দের কোলে মুখ গুঁজে কাঁদতে আরম্ভ করে।
মাধবীর অসহায়তা এখানে প্রবলভাবে ধরা পরে। সে ঘর থেকে পালিয়ে এসেছে নারায়ণের হাত ধরে, আবার নারায়ণকে বিশ্বাস করতে পারছে না, এখানে এসে সদানন্দের হাতে সে ধর্ষিত হয়েছে। সেই সদানন্দই আবার তাকে পরিস্থিতি বোঝানোর চেষ্টা করছে। মাধবী কাউকে বিশ্বাস করতে পারছেন না, তার সামনে কোনো পথ খোলা নেই। অল্প বয়সী একা একটা মেয়ের পক্ষে বুদ্ধিদীপ্ত কোনো সিদ্ধান্ত নেওয়া সম্ভব হচ্ছে না।
সে কোনো উপায় না দেখে সদানন্দকে আক্রমণ করে, আবার তারই কোলে মুখ গুঁজে কাঁপতে আরম্ভ করে। সে যেন নিজেকে সাধু সদানন্দের কাছে সমর্পণ করে দেয়- এবার সদানন্দ তাকে নিয়ে যা খুশি করুক। এ হলো অনেক ঝঞ্ঝাট বয়ে যাওয়া একটি মেয়ের নিস্তেজ হয়ে যাওয়া। কয়েকদিনের উত্তেজনা, ভয়, না খাওয়া- সবকিছুর প্রভার পরে তার ওপর
“একই মনের মধ্যে হিংসা-অহিংসা আছে বলেই মাধবীর হিংস্র হয়ে ওঠা সম্ভব হয়েছে। আবার যুগ যুগ ধরে গোষ্ঠী মনস্তত্ত্বে সাধু-গুরু ইত্যাদির প্রতি মানুষের যে অবলম্বনবোধ, সেই বোধেই যে সদানন্দ তার কৌমার্য বিলাসী, নারীত্বের এই বিপর্যয় বোধের মুহূর্তেও মাধবী সেই বিপর্যয়কারীকেই অবলম্বন হিসাবে আঁকড়ে ধরেছে। ২২
সদনান্দ মাধবীকে আশ্রমের অন্যান্য মেয়েদের কাছে দিয়ে আসতে চায়, মাধবী তৎক্ষণাৎ রাজি হয়। উপন্যাসে তার উচ্ছ্বাস চোখে পড়ে
“মাধবীলতা যেন বেশ উৎসাহের সঙ্গে জোরে জোরে পা ফেলিয়া চলিতে থাকে, তপোবনের শোভা দেখিয়া সে যেন খুশি হইয়াছে, ভিজা মাটিতে পা ফেলিয়া হাঁটিতে যেন আরাম পাইতেছে।” (৩খ, পৃ.- ২৮৭)
এরপর মাধবী নারায়ণের সঙ্গে ফিরে যায় না, সে আশ্রমেই থাকে উমা আর রত্নাবলীর কাছে। এখানেই মাধবীর মনের একটি জটিল দিক স্পষ্ট হয়ে ওঠে। আবার সদানন্দের চিন্তায়ও মাধবীর স্বাভাবিক আচরণ সম্পর্কে সম্ভাব্যতা প্রকাশিত হয়:
“যদি সে তুলনা করে এই বিরাট দেহ শ্রীহীন দরিদ্র, প্রৌঢ়ের সঙ্গে রূপবান ধনবান সঙ্গী যুবকটির, আর তুলনা করিয়া যদি তার মনে খটকা বাধে যে কী হইবে ধার্মিকের মুখোশ পরা নরপিশাচটার আশ্রমে বাস করিয়া, তার চেয়ে রাজপুত্রের হাত ধরিয়া উধাও হইয়া যাওয়া ঢের ভালো, যা হোক তা হোক ফলাফল?” (৩খ, পৃ. ২৯০)

মাধবীর মনে এই চিন্তা আসা স্বাভাবিক ছিল। কিন্তু কোন চিন্তা থেকে মাধবী রাজপুত্রেকে ত্যাগ করে আশ্রমে থেকে যায় তার সন্ধান পাওয়া কঠিন। কুমারীত্ব হরণকারী সদানন্দের কথায় মাধবী সম্মোহিত হবে কেন তাও বোঝা দুষ্কর। তবে পঞ্চাশের কাছাকাছি বয়সের উমাকে ধুলায় গড়া ভঙ্গুর পুতুলের মতো সদানন্দের পায়ে লুটিয়ে পড়তে দেখে এবং উমার দেহ থরথর করে কাঁপতে দেখে মাধবীর বুক ঢিপ ঢিপ করতে থাকে। সদানন্দ এ সময় উমাকে উপদেশ দেয় দার্শনিকের মতো:
“মন হল ঘরের মতো, ধুলোবালি এসে জমা হয়, ঝাঁট দিয়ে সেসব সর্বদা সাফ করে নিতে হয়, নইলে ঘর যেমন আবর্জনার স্তরে ওঠে, মনও তেমনি কুচিন্তায় আচ্ছন্ন হয়ে যায়।” (৩খ, পৃ.-২৮৯)
সদানন্দের এরূপ কথায় বাস্তব বুদ্ধিহীন, ঘর পালানো অল্পবয়সী মাধবীর সম্মোহিত হওয়া অস্বাভাবিক নয়। কারণ কথা শুনত শুনতে মাধবী আর দাঁড়িয়ে থাকতে পারে না, সে মেঝেতেই বসে পড়ে। মাধবীর আশ্রমে থাকা নিয়ে বিপিন প্রশ্ন তোলে। সদানন্দের হাব-ভাব দেখে ভীত হয়ে সে মাধবী সম্পর্কে সদানন্দকে বলে তোর পাতানো মেয়ে, কিন্তু সদানন্দ মাধবীকে মেয়ে বলে স্বীকার করে না।
মাধবীর আশ্রমে ভালোলাগা না । মাঝে মাঝে মন খারাপ হয়ে যায়। আকাশে মেঘ করে, মাধবীর ঘরের ভেতরও সে রকম মেঘলা হয়ে যায়। যেন
“এ ভরা বাদর
মাহ ভাদর
শূন্য মন্দির মোর। ২
মাধবী রাতে ঘুমাতে পারে না। সদানন্দ বিপিনকে এ কথা জানালে বিপিন মাধবীর ভার নেয়। সেদিন থেকে বিপিন আর মাধবীর আত্মীয়তা গড়ে ওঠে। মাধবী আশ্রমে কাজকর্ম করে- সকাল-বিকাল গোয়ালঘরে দুধ দোহানোর সময় সে উপস্থিত থাকে, রান্নার সময় তরকারি কুটে দেয়, কেউ অসুস্থ থাকলে তার জন্য পথ্য তৈরি করে। আস্তে আস্তে আশ্রমের জীবন মাধবীর ভালোলাগতে থাকে। আগে সে সদানন্দের অন্দর মহলে উপদেশ শুনতে যেতো কিন্তু কিছুই বুঝতে পারত না, কিন্তু বিপিনের কথায় সে তাও বুঝতে পারে। সদানন্দের প্রশ্নের উত্তরে মাধবী আশ্রমের উদ্দেশ্য সম্পর্কে বলে
“কীভাবে সুখে শান্তিতে বেঁচে থাকা যায় মানুষকে তাই বুঝিয়ে দেওয়া, ধর্মের মধ্যে যে বিকার এসেছে সংশোধন করা, সমাজ গঠনে-” (৩খ, পৃ.-২৯৬)
সদানন্দ এখানেই তাকে থামিয়ে দেয়। মাধবী সদানন্দের সামনে এখন আর প্রাণোচ্ছল নয়, সে শুধু শ্রদ্ধা-ভক্তি করে, হাসি-আনন্দের মুখে ছিপি আটকে দেয়, বিপিন মাধবীকে এমনি করে গড়ে তুলে। বিপিন মাধবীকে পুরোপুরি অধিকার করে, অনেক কাজের ঝামেলায় থাকা সত্ত্বেও সে মাধবীর সঙ্গে গল্প করে, তপোবনে বেড়াতে বের হয় আবার মাধবী যাতে ছোটখাটো কাজ করে সময় কাটাতে পারে সে ব্যবস্থাও করে দেয়।
বিপিন আর সদানন্দের প্রশ্রয়ে মাধবী আশ্রমের অনেক ব্যাপারে সাহসী হয়ে উঠে। মহেশ চৌধুরী এসে সদানন্দের দর্শন লাভের জন্য ধরনা দিলে শতাধিক লোকসমাগম হয়, আশ্রমের কাজে ব্যাঘাত ঘটে। মাধবী মহেশ চৌধুরিকে বকুনি দিতে আরম্ভ করে
“মাথা খারাপ হয়ে থাকে অন্য কোথাও গিয়ে পাগলামি করুন না ?” (তখ, পৃ.-৩০৬) তারপর মাধবী নিজের চেষ্টায় মহেশ চৌধুরীকে সদানন্দের চরণ দর্শন করায়। সে নিজের দায়িত্বে মহেশকে সদানন্দের কাছে নিয়ে যায়। ক্ষুব্ধ সদানন্দকে চোখের জলে বশ করে “কত ভাবিয়া কত হিসাব করিয়া নিজের দায়িত্বে বড় একটা কাজ করিতে গিয়া বুকটা ভয়ে ও উত্তেজনায় টিপটিপ করিতেছিল, সদানন্দ দেবতা না দানব মাধবীর জানা নাই কিন্তু এমন ভয় সে করে সদানন্দকে যে কাছে আসিলেই তার দেহমন কেমন একসঙ্গে আড়ষ্ট হইয়া যায়, সদানন্দ তাকে বুকে তুলিয়া নইলেও সে জন্য সে নতুন কিছুই আর অনুভব করিতে পারে না, …………।” (৩খ,পৃ.-৩০৯)
শেষ পর্যন্ত মাধবীর চোখের জলে সদানন্দ নরম হয়ে মহেশকে প্রণাম করতে দিল। বিপিন মাধবীর কাছে সদানন্দকে মহাপুরুষ করে তুলেছিল। মহেশকে সদানন্দ মিথ্যা কথা বললে সে বিশ্বাসে ফাটল ধরে। আশ্রমে মহেশের ধরনা দেওয়ার ব্যাখ্যা আর নিজের কৈফিয়ত দিতে গিয়ে সে সদানন্দকে জানিয়ে এলো তার বিশ্বাসভঞ্জের কথা। মাধবীর আচরণ এখানে একটু অসংলগ্ন মনে হয়
“আকুল হইয়া সে কাঁদিতে আরম্ভ করিয়া দিল আর বলিতে লাগিল, কেন আপনি মিছে কথা বললেন। কেন বললেন!” (৩খ, পৃ. ৩১১ )
এখানে মাধবী প্রথম দিনই একজন ভণ্ড নরপিশাচ সাধুর দেখা পেয়েছিল। সেই সাধু সম্পর্কে সে হঠাৎ দিব্যজ্ঞান কেন করল তা বোঝা যায় না, তার তো সদানন্দ সম্পর্কে কোনো সৎ বিশ্বাস থাকারই কথা নয়, সেক্ষেত্রে বিশ্বাস ভঙ্গ হয়ে সে কাঁদতে থাকে কেন এটাও বিস্ময়ের ব্যাপার। আশ্রমের বহমান একটি ধারায় প্রবাহিত মাধবীর জীবন হঠাৎ করেই আবার জটিল হয়ে ওঠে।
এ জটিলতা যেমন বাইরে থেকে তার ওপর প্রভাব বিস্তার করে, তেমনি তার মনে জটিল চিন্তা এবং ভাবময়তার উদয় হয়। সদানন্দ মাধবীর ব্যাপারে সিদ্ধান্ত নেওয়ার জন্য, নিজের মনকে বশে আনার জন্য সাতদিন ঘরের কোনে লুকিয়ে থাকে। কিন্তু তার মন স্থির হওয়ার পরিবর্তে আরো অস্থির হয়। সে মাধবীকে অভিসারের নিমন্ত্রণ করে:
“না, একটু রাত করে এসো। এই এগারোটা সাড়ে এগারোটার সময়। অনুরোধ নয়, আদেশ। এতক্ষণে মাধবীলতা বুঝিতে পারিয়েছিল, আহ্বানটা খাঁটি অভিসারের, ধর্ষণের ফলে প্রেমের জন্ম হওয়ায় এতদিন যে পূর্ব রাগের পালা চলিতেছিল আজ তার সমাধি।” (৩খ,পৃ.-৩১২)
এ হলো বাইরের দিক থেকে মাধবীর ওপর চাপ। কিন্তু মাধবী নিজেও এ আহ্বান উপেক্ষা করতে পারে না। তাই অভিসার বাতিল না করে শুধু বলে:
“আজ নয়, পরশু যাব।” (৩খ, পৃ.-৩১২)
মাধবীকে সদানন্দ ত্রয়োদশীর জ্যোৎস্নার লোভ দেখায়। মাধবী তখন কেলেঙ্কারির ভয় দেখায়, কিন্তু সদানন্দ বলে সে নিজেই সব ব্যবস্থা করবে। মাধবী আবার দুপুরে সদানন্দের ঘরে যায়, অভিসারের সময়টা একটু পিছানোর জন্য, সেখানে যে বিপিনকে দেখে বিব্রত হয়। তখন সদানন্দ বাইরে এসে শোনে মাধবীর কথা।
মাধবীকে তার পাকা ঝানু-বাজারের বেশ্যার মতো মনে হয়। মাধবীর মনের ভেতরে জন্ম নিয়েছে দ্বন্দ্ব। একদিকে তার আত্মসম্মান, ব্যক্তিত্ব লোকলজ্জা, অন্যদিকে সদানন্দের পাশবিক অনাচারের প্রতি এক দুর্নিবার আকর্ষণ। মাধবীর আত্মদ্বন্দ্বের পর্যায়ে রাতে বিপিন তাকে ডাকতে যায়।
শশধর এসেছিল মহেশের অসুখের সংবাদ নিয়ে। মহেশ চৌধুরী মাধবীকে একবার দেখতে চায়। বিপিন একা রাত করে মাধবীকে মহেশ চৌধুরীর বাড়ি পৌঁছে দিতে যাবে। মাধবী মনে করে সদানন্দ বিপিনকে দিয়ে মাধবীকে ডেকে পাঠিয়েছে। সে ক্ষোভে ফেটে পরে। চিন্তা করে:
“সে এত সপ্তা, মানুষের কাছে তার মর্যাদা এত কম যে, প্রকাশ্যভাবে বিপিনকে দিয়া সদানন্দ তাকে অভিসারে যাওয়ার হুকুম পাঠাইয়া দিতে পারে এমন অনায়াসে।”(৩,পৃ.-320)
সদানন্দ বিপিনকে ডেকে পাঠিয়েছে বলেই তার এতো রাগ-ক্ষোভ, নইলে কী মাধবীর অভিসারে যেতে আপত্তি নেই। মানব মনের এই সূক্ষ্ম জটিল দিক মাধবীর মাধ্যমে লেখক তুলে ধরেছেন। মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় দেখিয়েছেন ধর্ষণেও প্রেমের জন্ম হয়। মাধবী তাই লোকচক্ষুর অন্তরালে সদানন্দের কুটিরে যেতে মানসিকভাবে প্রস্তুত ছিল। তবে তার ভেতরের সৎ চিন্তা যে একেবারে মুছে গেছে তা নয়। তাই সে বিপিনের উপর ক্ষিপ্ত হয়:
“ও! আপনি বুঝি পাওনা মিটিয়ে নেবেন আগে ? শিগগির নিন, একটু তো ঘুমাতে হবে রাত্রে ?” (তখ,পৃ. 230 )
এ সময় মাধবীর মনে হয় রাজকুমারের মিসট্রেস হওয়াই ভালো ছিল। ফাঁকা মাঠে মাধবীলতার হাত ধরে দাঁড়িয়ে থাকতে থাকতে বিপিনের মনে হয় আঙুলগুলো তার পাখির পালকের মতো কোমল হয়ে উঠুক সে মাধবীর সর্বাঙ্গে হাত বুলিয়ে দেবে মাধবীর মাথা বিপিন নিজের বুকে চেপে ধরে। মাধবীকে সে বাড়ি কিনে দিতে চায় তার নামে ব্যাংকে টাকা জমা রাখতে চায়। সে জিজ্ঞাসা করে মাধবীর ওপর কে অত্যাচার করেছে, তাকে বিপিন আশ্রম থেকে বের করে দেবে। প্রকাশিত হয় বিপিনের পাশবিকতা:
“কী উগ্র উদারতা বিপিনের। এদিকে চাপিয়া ধরিয়াছে মাধবীর মাথাটা নিজের বুকে, মুখে তাকে জিজ্ঞাসা করিতেছে কে অত্যাচার করিয়াছে তার উপর, কে কষ্ট দিয়াছে তার মনে। ” (৩খ,পৃ.-৩২১)
মাধবীলতার মনে হয়:
“বিপিন সত্যই মানুষ নয়, ” ( ৩, পৃ.-৩২১)
মাধবীর জীবন এমন করে জটিল হয়ে ওঠে। এরপর বিপিন তাকে মহেশ চৌধুরির বাড়ি পৌঁছে দিতে তাকে নিয়ে নৌকায় ওঠে। ভিতরে বাইরে চরম জটিলতার মাঝে মহেশ চৌধুরীর বাড়ি গিয়ে মাধবী স্বস্তি পায়। তবে বিপিন এখানেও তাকে তাড়া করে। বিপিন প্রতিদিনই আসে । তারপর আস্তে আস্ত বিপিন আসা কমিয়ে দেয়। মহেশ সুস্থ হয়ে উঠলে মাধবীরও কাজ কমে যায়। সবকিছু তার একঘেয়ে লাগে। গ্রামের মেয়েরা তার কাছে ঘেঁষার ভরসা পায় না। তাদের কাছে মাধবী একটি রহস্য:
“আশ্রমবাসিনী কুমারী সন্ন্যাসিনী (বয়স কত হইয়াছে ভগবান জানেন) সাধারণ বেশে আশ্রম ছাড়িয়া আসিয়া মহেশ চৌধুরীর বাড়িতে বাস করিতেছে, গাঁয়ের মেয়েদের কাছে সে কতকটা স্বর্গচ্যুত অপ্সরি কিন্নরীর মতো রহস্যময়ী জীব।” (৩খ, পৃ.-৩২২)
মহেশ চৌধুরীর বাড়ি মাধবীলতার আদরযত্নের অভাব নেই, বিভূতির মা তাকে মেয়ের মতো আপন করেছে, কিন্তু মাধবীর এখানে ভালে লাগে না। আশ্রমের জীবনের পর এ জীবন নীরস মনে হয়, আশ্রমে অনেক নরনারীর নির্জনতা, গাছপালায় ঘেরা কুটিরগুলা কোনো কিছু ঘটার অপেক্ষায় থাকে, এখানে কিছু ঘটার নেই। বিপিনকে মাধবীলতা সদানন্দের কথা জিজ্ঞাসা করে। মাধবী সদানন্দ সম্পর্কে বলে।
“উনি বেশ লোক।” (তখ, পু.-৩২৩)
মানুষের জীবন যে জটিল আরেকবার প্রমাণিত হয়। যে সদানন্দের অত্যাচারে মাধবী অতিষ্ঠ হয়ে উঠেছিল, তার প্রতি-ই সে বারবার আকৃষ্ট হয়। বিপিন বিস্মিত হয়
“মাধবীলতার মুখে এ কথা শুনিয়া বিপিন প্রায় চমকাইয়া যায়। নৌকায় উঠিবার আগে রাগের মাথায় সদানন্দের কুটিরের দিকে পা বাড়াইয়া, স্টেজে সরলা কোমলা বনবালার অভিনয় করিয়া হয়রান হইয়া গরম মেজাজে সাজঘরে ফিরিয়া আসা বেশ্যার মতো ফুঁসিতে ফুঁসিতে মাধবীলতা যে সব কথা বলিয়াছিল, বিপিন তার একটি শব্দও ভোলে নাই।” (৩খ, পৃ.-৩২৩)
বিপিনের সঙ্গে গল্প করাটাও মাধবীলতার জন্য বিস্ময়ের ব্যাপার। কারণ, ইতোপূর্বে বিপিনের লিবিডো তাড়নার পরিচয়ও মাধবীলতা পেয়েছে। তাই মহেশ চৌধুরি বিপিনের প্রশংসা করলে সে হাসবে কি কাঁদবে ভেবে পায় না। এই বিপিনকে সে রাগে ক্ষেভে বলেছিল, তার মিসট্রেস হয়ে থাকতে হবে কি না। সেই বিপিনের সঙ্গে সে গল্প করে, সদানন্দের সম্পর্কে ভালো মন্তব্য করছে।
মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় উপন্যাসে ফ্রয়েডীয় মনোবিকারের এমন জীবন্ত চরিত্র আর নেই। বিপিন মাধবীলতাকে মহেশ চৌধুরী লোক কেমন জিজ্ঞাসা করলে যে বলে, ভালো নয়। সে আশ্রমে ফিরেও যেতে চায়। তবে আশ্রমে গিয়ে সে কি করবে তা বলতে পারে না। মহেশ চৌধুরির কাছে মাধবী বিপিনকে দুর্নাম করে, বলে উনি অপদার্থ ভীরু কাপুরুষ- ” (পৃ.-৩২৬)
মাধবীলতার মন একেক সময় একেকজনের প্রতি বিরূপ হতে থাকে আর সে নিজে অদ্ভুত আচরণ করে।
“মহেশ চৌধুরির উপর বিরক্তিটা তার এত বেশি বাড়িয়া গিয়াছে, লোকটাকে দেখিলেই গায়ে যেন আজকাল তার জ্বর আসে। কিছুদিন আগে মাধবীলতা বিপিনকে বলিয়াছিল, মহেশ চৌধুরি লোক ভালো নয়। তখন বিপিনের সাহচার্য সে সহ্য করিতে পারিত না। আজকাল মহেশ চৌধুরির একসুরে বাঁধা মনোবীণার একঘেয়ে ঝংকারগুলি একেবারে অতিষ্ঠ করিয়া তোলায় বিপিনের মধ্যেও হঠাৎ সে কিছু কিছু বৈচিত্র্য আবিষ্কার করিয়া ফেলিয়াছে। বিপিনের কাছে আর তাই মহেশ চৌধুরির সম্বন্ধে কোনো রকম মন্তব্য করে না, মহেশ চৌধুরির কাছে বিপিনকে বিশেষণের পর বিশেষণে অভিনন্দিত করিয়া চলে চালবাজ, মিথ্যুক, লোভী, অসংযত প্রভৃতি কত সংজ্ঞাই যে বিপিনকে সে দেয়।” (৩খ, পৃ. ৩২৭ )

মহেশ চৌধুরির ছেলে জেল থেকে বাড়ি আসলে মহেশ চৌধুরি সকলকে নিয়ে আশ্রমে যেতে চায়। আশ্রমে যাওয়ার কথা শুনে মাধবীলতা আনন্দিত হয়ে ওঠে। আশ্রমে গিয়ে তারা গাছের গুঁড়িতে বসে রত্নাবলীর সঙ্গে গল্প করতে থাকে। সদানন্দ এলে বিভূতি তাকে পায়ে হাত দিয়ে প্রণাম করতে চায় না। ঠিক এই সময় বিপিন এসে মাধবীর আশ্রমে আসার কৈফিয়ৎ চায়। মাধবী বিপিনের বিরুদ্ধে বিদ্রোহী হয়ে ওঠে। সে ঔদ্ধত্যভাবে বলে:
“বারণ করেছেন মানে? উনি বারণ করবার কে? বেশ করেছি আমি আশ্রমে এসেছি।” ( তখ, পৃ. ৩৩১ )
সকলের সামনে সদানন্দ মাধবীকে বলে
“আমার ওখানে একবার আসবে মা মাধু?” (তখ, পৃ. ৩৩২ )
এই দিন সন্ধ্যায় বিপিনের সঙ্গে ঝগড়া করে সদানন্দ মহেশের বাড়ি এসে আশ্রয় নেয়। মাধবীলতা সকালের মতো তেজোদীপ্ত থাকতে পারে না। সে সদানন্দকে প্রশ্ন করে বসে বিপিন কেন তাকে তাড়িয়ে দিল। সে সদানন্দের ঘরে একা এসে বলে:
“আপনাদের দিয়ে কোনো ভালো কাজ হতে পারে না। খালি নিজেদের মধ্যেই মারামারি করবেন তো কাজ হবে কী? ছি ছি নিজের নিজের স্বার্থচিন্তাই যদি করবেন। দিনরাত, এসব কাজে কেন আসেন আপনারা ?” (৩খ, পৃ. ৩৪১ )
বিপিন আর সদানন্দের পরিচয় মাধবীর অজানা নয়। তবু তারা ভালো কাজ করবে মাধবীর পক্ষে এ চিন্তা করা একেবারেই অমুলক, তথাপি মাধবী তার মনের নির্দিষ্ট গতিতেই চিন্তা করে রেখেছে এরা দুজন ভালো কাজ করতে নেমেছে।
যে সদানন্দকে একদিন সে আঁচড়ে কামড়ে একাকার করে দিতে চেয়েছিল, বিপিনের কাছে যার বিরুদ্ধে ক্ষোভে ফেটে পড়েছিল, যার জন্য তার জীবন অতিষ্ঠ হয়েছিল মহেশ চৌধুরির বাড়ি তার আগমনে মাধবীর নিষ্ক্রিয়ভাবে দূরে থাকাই ছিল স্বাভাবিক কর্ম কিন্তু সে তা থাকতে পারে না। সদানন্দের সঙ্গে ব্যঙ্গবিদ্রূপের সুরে কথা বলে সে যেন আরো ঘনিষ্ঠ হয়ে পরে
“বিপিনবাবু কেন মহাপুরুষ হবেন, মহাপুরুষ তো আপনি।” (৩খ, পৃ.-৩৪১) মাধবী ঘনিষ্ঠ হলেও সদানন্দ ভোলেনি নিজের আচরণের কথা। সে তাই মাধবীর প্রতি কামাসক্ত হয়ে তাকে বলে মহাপুরুষ না ভেবে তার কোনো উপায় নেই, নইলে যে তাকে দ্বিচারিণী হতে হবে। বিভূতির সঙ্গে মাধবীর বিয়ের কথায় সদানন্দ মাধবীকে ডেকে পাঠায়। মাধবী এলে সদানন্দ দরজা-জানালা বন্ধ করে দেয়, চোখ দেখে মাধবী ভীত হয়ে ওঠে।
“ভয়ংকর একটা আঘাতে দেহে মনে তাকে চিরদিনের জন্য পঙ্গু করিয়া দিবার সাধটাই সদানন্দের মনে মাথাচাড়া দিয়া উঠিয়াছে।” (৩খ, পৃ.-৩৫১)
মাধবীলতা অজ্ঞান হয়ে যায়। জ্ঞান ফিরে বাইরে এসে সে বিভূতির বুকে মুখ গুঁজে কাঁদে, বিভূতিকে এর প্রতিকার করতে বলে। এর জের ধরে মহেশ চৌধুরির বাড়ি এক বিরাট কাণ্ড ঘটে যায়। বিভূতি সদানন্দের নাকে ঘুষি দিয়ে নাক ফাটিয়ে দেয়। বিভূতির এই আচরণে মহেশ চৌধুরি বিভূতির ওপর ক্ষিপ্ত হয়ে হাতুড়ি দিয়ে নিজের নাকে আঘাত করে নিজে সদানন্দের চেয়ে বেশি আঘাতপ্রাপ্ত হয়।
মাধবীর বিয়ের পর সদানন্দকে বিপিন আশ্রমে ফিরিয়ে নিয়ে যায়, মাধবীকে সদানন্দের কাছে ফিরিয়ে দেবে এই প্রতিশ্রুতি দিয়ে। বিয়ের পর সদানন্দ ডেকে মাধবীর কাছে কোনো সাড়া পায়নি, এমনকি মাধবী তাকে এড়িয়ে চলেছে। এক দিনের জন্য হলেও মাধবীর এই অহংকার ভাঙতে সদানন্দ বদ্ধপরিকর।
এক রাতের জন্য হলেও যে মাধবীকে চায়। এমনি অবস্থায় বিপিন মাধবীকে সাবধান করে দিয়ে আসে রত্নাবলী বা উমা কেউ ডাকতে গেলেও যেন মাধবী আশ্রমে না আসে। মাধবীও এ ব্যাপারে সচেতন থাকে। সে এখন স্বামী সোহাগী। বিস্তৃতি তাকে স্ত্রীর উপযুক্ত মর্যাদা দিয়েছে। সংসার পেয়ে মাধবী উৎফুল হয়ে উঠেছে:
“বিভূতির ঘুম আসিলেও তাকে সে ঘুমাইতে দেয় না, প্রাণের চেয়ে যে প্রিয়তর তাকে পর্যন্ত ভালোবাসিতে ভালোবাসিতে শ্রান্ত হইয়া বিস্তৃতি ঝিমাইয়া পড়িলে মাধবীলতা অক্লান্ত চেষ্টায় যেভাবে আবার তাকে বাঁচাইয়া তোলে, মানুষের বাস্তব জীবনে যে সে ধরনের অপরূপ কাব্যের স্থান আছে বিস্তৃতি কোনোদিন কল্পনাও করিতে পারে নাই।” (৩খ, পৃ. ৩৭২)
মাধবীর এই সুখের জীবনে পুলিশ এসে বাড়িতে হানা দেয়। তলাশি চালায়। সদানন্দ বিস্তৃতির পিছনে পুলিশ লেলিয়ে দিয়েছে। বিভূতির কাছে মাধবী জানতে পারে সদানন্দ পুলিশ লেলিয়ে দিয়েছে। মাধবী ক্ষোভে-দুঃখে দিশেহারা হয়ে ওঠে ঘুরে ফিরে বারবার এই আলোচনা করতে থাকে।
বিভূতি মাধবীর এই বিচলিত ভাব দেখে মুগ্ধ হয়, কৃতজ্ঞ হয়। “বিভূতির এই কৃতজ্ঞতাই মাধবীলতাকে সবচেয়ে বেশি মুগ্ধ করিয়াছিল। বড়ো সহজে বিস্তৃতির মন ভুলানো যায়। একটু আদরযত্ন করা, রূপের সামান্য একটু বিশেষ ভঙ্গি দেখানো, বিভূতির কাছে এ সমস্ত যে কত দামি বুঝিতে পারিয়া মাধবীলতা নিজেই অবাক হইয়া যায়। [… ….] বিভূতির কপালে হাতের তালু ঘষিয়া দিতে দিতে সে ব্যগ্রকন্ঠে বলে, না না, তুমি ভেবো না, ও তোমার কিচ্ছু করতে পারবে না।” (৩খ, পৃ. ৩৭৩)
মাধবী বিভূতিকে বলে তার কিছু হলে মাধবী মরে যাবে। আবেগে মাধবীর চোখে জল আসে। পরদিন সে আশ্রমে যায় সদানন্দের কাছে কৈফিয়ৎ চাইতে। শশধরের বউকে সে বলে যে সদানন্দের মুক্তপাত করতে যাচ্ছে, বাড়িতে পুলিশ লেলিয়ে দেয়, এতো বড় স্পর্ধা। শশধরের বউ আর মনোহর দত্তর মা’কে রত্নাবলীর কুটিরে বসিয়ে রেখে মাধবী একা যায় সদানন্দের সঙ্গে বোঝাপরা করতে। সদানন্দের মহলে ঢুকতে গিয়ে তার দেখা হয় বিপিনের সঙ্গে। বিপিন তাকে যেতে নিষেধ করে। কিন্তু মাধবী বদ্ধ পরিকর:
“মাধবীলতার নিজেরও বুকের মধ্যে অকথ্যরকমের টিপটিপ করেছিল, তবু সে মুখে সাহস দেখাইয়া বলিল, আপনার ভয় নেই, উনি আমার কিছু করতে পারবেন না। ” (৩খ, পৃ.-৩৭৫)
মাধবী ঘরে ঢোকামাত্র সদানন্দ দরোজা বন্ধ করে দেয়, বেলা পরে আসে কিন্তু মাধবী বের হয় না। বিপিন বাইরে বসে থাকে। অনেক সাহস সঞ্চায় করেও মাধবীর শেষ রক্ষা হয় না। রত্নাবলী গিয়ে পড়ন্ত বেলায় মাধবীকে নিয়ে আসে। রাত্রে বিভূতি মাধবীকে জেরা করা শুরু করে। মাধবী শুধু বলে পুলিশ লেলিয়ে দিল কেন। মাধবী ছলনার আশ্রয় নেয়।
“মাধবীলতার সর্বাঙ্গ অবসন্ন হইয়া আসিতেছিল, জাগিয়া আছে তবু ঘুমেই দু- চোখ বুজিয়া গিয়াছে। মনের মধ্যে একটা ধিক্কার ভরা আর্তনাদ গুনগুনানো গানের মতো মৃদু চাপা সুরে গুমরাইতেছে। কী হইয়াছে? কেন হইয়াছে? কোথায় হইয়াছে? কবে হইয়াছে? কিছুই যেন মনে নাই। অবসাদের যন্ত্রণা যে এমন বৈচিত্র্যময় সকলেই তা জানে, তবু সকলের পক্ষেই ‘এটা কে তা জানিত’র পর্যায়ের।” (৩খ,পৃ.-৩৭৯)
পরদিন জেরা করেও বিভূতি কিছুই বুঝতে পারল না। শুধু বোঝা গেল সদানন্দের হাতে-পায়ে ধরে বলে এসেছে বিস্তৃতির পিছনে যেন পুলিশ না লাগায়। এমনি করে বারবার মাধবী জটিল জীবনে পদার্পণ করে। মহেশের কাছে ধরা পরে সদানন্দ সম্পর্কে তার দুর্বল দিক, বিভূতির কাছে সে অবিশ্বাসী হয়ে ওঠে। বিভূতি চিন্তা করে মাধবী তো কচি খুকি নয়।
মাধবীর সংসারে সন্দেহের-অবিশ্বাসের বীজ বপন হয়। এর কয়েক দিন পর মহেশ চৌধুরি তাকে নিয়ে আবার আশ্রমে গেলো। মাধবীকে ডাকতে পাঠালো সদানন্দকে। মহেশ আর রত্নাবলী দাঁড়িয়ে রইল, প্রায় একঘণ্টা পর মাধবী খবর আনল সদানন্দ বলে পাঠিয়েছে সরকার থাকলে মহেশ যেন সন্ধ্যার পর দেখা করে, মহেশ চৌধুরি মাধবীকে নিয়ে বাড়ি ফিরে এলো, বিভূতি মারা যাওয়ার পর মাধবীর শোকটা তত জোরালো হলো না, তবে তাকে খুব রুক্ষ দেখায়, যেন ভিতর থেকে রস শুকিয়ে গেছে।
বিভূতির মৃত্যুর পিছনে যে সদানন্দ দায়ী সে কথা বলে মহেশ চৌধুরিকে মাধবী খুব খোঁচানো শুরু করে। মহেন তখন মাধবীকেও দায়ী করে। মাধবী স্তম্ভিত হয়ে যায়। তারপর কোর্টে ছেলেকে দোষী বলে মহেশ চৌধুরি। মাধবী তখন কান্নায় ভেঙে পড়ে, কিন্তু মহেশ চৌধুরী মাধবীকে সদানন্দের সঙ্গেই পাঠিয়ে দেয়। মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় সংসারের অন্যতম সত্য উচ্চারণ করেন:
“মাঝরাত্রে আশ্রমের পিছনের ঘাটে বাঁধা নৌকায় উঠিয়া সদানন্দ আর মাধবীলতা চালিয়া গেল।” (তখ, পৃ. ৪০৩ )
মাধবীলতার জীবন এভাবে অঙ্কিত হয়েছে। নারায়ণের হাত ধরে ঘর ছেড়ে সে আশ্রমে আশ্রয় নিয়েছে, কিন্তু নারায়ণের সঙ্গে জীবনযাপন করেনি। সদানন্দের হাতে সে ঝুমারীত্ব হারিয়েছে, বিভূতিকে বিয়ে করে সংসার পেতেছে আবার সদানন্দের কৌশলে বিভূতি মারা গেলে বিধবা মাধবী স্বামীর নিহত হওয়ার জন্য বিচার চেয়েছে, সদানন্দের বিরুদ্ধাচরণ করেছে কিন্তু শেষ পর্যন্ত সদানন্দের সঙ্গেই সে আশ্রম ত্যাগ করে চলে গেছে।
একটি মনে কত বিচিত্র চেতনা ভর করতে পারে মাধবীর মাধ্যমে মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় দেখিয়াছেন। মাধবী নিজে বারবার অস্তিত্ববান হওয়ার চেষ্টা করেছে। মাঝে মাঝে সে বুদ্ধিদীপ্ত সিদ্ধান্তও নিয়েছে, কিন্তু সব সময় নিজে নিজের মনকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারে নি। মাধবী বিভূতিকে অধিকার করেছিল প্রথম থেকেই।
বিয়ের আগে আশ্রমে বেড়াতে গিয়ে সদানন্দকে প্রথম না করা মহেশ যখন সদানন্দের পা ধরে ক্ষমা চায়, তখন কোনো উপায় না দেখে মাধবী বিভূতিকে বলেছিল
“প্রণাম করে নিন। তারপর এঁকে নিয়ে বাড়ি যাই চলুন।” (তখ, পৃ-৩৩৩ ) বিভুতি তখন প্রণাম করেছিল, আবার বিয়ের পর বিভূতির ভুলের কারণে যখন মহেশ অন্য গ্রামের লোকের হাতে মার খেয়ে আসে তখন বিস্তৃতি মাধবীর পরামর্শ চায়, মাধবীকে বলে: “ওদের মেরে ফেলা উচিত, খুন করে ফেলা উচিত।” (৩খ, পৃ.-৩৯২)
বিস্তৃতি ওদের মেরে ফেলতে গিয়ে সদানন্দের কৌশলে নিজেই মারা গেলো। মাধবীর চারপাশের সকলকে সে অধিকার করেছে। সদানন্দ বিপিন বিভূতি প্রয়েডীয় মনস্তত্ত্বমূলক আকর্ষণে জর্জরিত হয়েছে। অন্যদিকে মহেন বাস্তব বুদ্ধিসম্পন্ন একজন মানুষ, সে ব্যভিচার এড়িয়ে সুস্থ জীবনযাপনে আগ্রহী। কিন্তু অসুখের সময় সে কেন মাধবীকে দেখতে চায় এটা বোধগম্য হয় না।
আবার বিপিন সদানন্দের সঙ্গে মাধবীকে জড়িয়ে কুৎসা রটাচ্ছে দেখে সে নিজের ছেলের সঙ্গে মাধবীকে বিয়ে দেয়। পরিচয়হীন কুড়ানো মেয়ে মাধবীর সঙ্গে নিজের একমাত্র পুত্রের বিয়ে দেওয়ার মধ্যেও মহেশ চৌধুরির কোনো দার্শনিক যুক্তি নেই। মাধবী সম্পর্কে মানিক বন্দ্যেপাধ্যায় একটি অসংগতি রেখেছেন, তার উপন্যাসে- উপন্যাসের শেষে তিনি বলেছেন ‘মাধবীলতা প্রথম দিন রাত্রে আশ্রমে আসিবার সময় নৌকা হইতে এই ‘ঘাটেই নামিয়াছিল।’ (৪০৩) কিন্তু মাধবীর আসার সময় উপন্যাসের প্রথম দিকে আছে
“আট বেয়ারার পালকি চাপিয়া মহীগড়ের রাজা আজ আসে নাই। আসিয়াছে রাজপুত্র। মাধবীলতাকেও সঙ্গে আনিয়াছে সেই, আনিয়াছে পালকির মধ্যে এককোণে লুকাইয়া। একেবারে অন্দরে ঢুকিয়া পালকি থামিয়াছে, রাজা সাহেব স্বয়ং রানি সাহেবকে সঙ্গে করিয়া আশ্রমে আসিলে যেখানে থামে।” ( ৩খ, পৃ.-২৮২)
শেষ পর্যন্ত এ কথা বলা যায়- ‘অহিংসা’ উপন্যাস নিয়ন্ত্রণ করেছে।
‘অহিংসা’ উপন্যাসে অপ্রধান নারী চরিত্রগুলোর মধ্যে বিস্তৃতির মা, রত্নাবলী, উমা এবং শশধরের বউ। বিভূতির মা একটি সক্রিয় চরিত্র। মহেশ চৌধুরি সদানন্দের দর্শনের জন্য রোদ-বৃষ্টি উপেক্ষা করে বসে থাকলে বিভূতির মা তাকে ফিরিয়ে আনতে যায়। সে বৃষ্টির সময় দাওয়ায় উঠেও বসে না, স্বামীর সঙ্গে ভিজতে থাকে।
তখন মহেশ চৌধুরি তাকে নিয়ে বাড়ি ফিরে যেতে চাইলে সে যায় না। সে মহেশকে নিয়ে ভয় পায়। এতো কাণ্ডের পর মহেশ বাড়ি ফিরে যেতে চাইলে সে যায় না। সে মহেশকে নিয়ে ভয় পায়। এতো কাণ্ডের পর মহেশ বাড়ি ফিরে গেলে সে হয়তো আর তার সঙ্গে সংসারই করতে চাইবে না। কিন্তু তার সাধু সদানন্দের প্রতি অত ভক্তি নেই। মহেশ যখন প্রণাম করতে চললো তখন সে বলে:
“আমি এখান থেকেই মনে মনে প্রণাম জানাচ্ছি, তুমি যাও প্রণাম করে এসো।”(তখ, 1. -৩০৮)
এরপর বিভূতি বাড়ি ফেরার পর সকলে যখন আশ্রমে যায়, তখনও সে যায় না। বাড়িতে সদানন্দ এলেও তার ভিতরে কোনো পরিবর্তন ঘটে না। স্বামীর সিদ্ধান্তগুলো কেবল মেনে নেয়। তবে ছেলের ব্যাপারে সে উদাসীন নয়। মাধবীর সঙ্গে বিস্তৃতির বিয়ের কথায় সে আপত্তি তোলে, আবার মহেশের বিড়াল মারার পর মহেশ যখন খাবে না বলে একগুঁয়েমি শুরু করে তখন প্রথম সে গর্জে ওঠে। অসহ্য হয়ে দুধের বাটি ঘর থেকে বাইরে ছুড়ে ফেলে আগাগোড়া একটা বিছানার চাদর মুড়ি দিয়ে দেওয়ালের দিকে মুখ করে শুয়ে থাকে।
বিভূতির মায়ের ভিতর সন্তান বাৎসল্য প্রবল। মাধবী তাদের বাড়িতে এলে সে মাধবীকে মেয়ের মতো বুকে তুলে নেয়, আদর যত্ন করে। বিভূতি বাড়ি ফিরে এলে বিস্তৃতির চেহারা দেখে সে কেঁদে বুক ভাসায়। এটা সেটা রান্না করে ছেলের জন্য, ছেলের খাওয়ার ব্যাকুলতা দেখে তার চোখে জল আসে। ছেলের মৃত্যুর পর মহেশ আদালতে বিস্তৃতির দোষ প্রমাণ করে এলে সে ক্ষোভে ফেটে পরে:
“আদালতে দশজনের কাছে তুমি আমার ছেলের নিন্দে করে এলে! এবার আমি গলায় দড়ি দেব। আমি অনেক সয়েছি, আর সইব না।” ( ৩খ, পৃ.-৪০২)
শশধরের বউ একটি নীরব নারী চরিত্র। সে সকলের থেকে দূরে থাকে। কিন্তু সকলের প্রয়োজনের সময় গিয়ে হাজির হয়। স্বামীর সঙ্গে তার সম্পর্ক কেমন তা বোঝা যায় না। কেবল সে যে প্রয়োজনের সময় প্রয়োজনীয় কাজটি করতে প্রতিজ্ঞাবদ্ধ তা দেখা যায়। সদানন্দর নাকে ঘুষি দিয়ে তাকে আহত করলে সে সেবা শুরু করে দেয়, আবার মহেশ হাতুড়ি দিয়ে নাকে আঘাত করে অজ্ঞান হয়ে পড়লে তাকেও সেবা করে। তাকে মাধবীর সঙ্গে তিনবার কথা বলতে দেখা যায়। বিভূতির সঙ্গে যখন মাধবীর বিয়ের কথা হয় তখন সে ফোকলা দাঁতে বলে:
“ঠাকুরপোর সঙ্গে তোমার বিয়ে হবে দিদি?” ( ৩খ, পৃ. ৩৪৮)
মহেশকে শশধরের বউ খেতে দিলে মাধবী যখন রেগে যায় তখন মাধবীকে সে স্মরণ করিয়ে দেয় তার আজ কিন্তু ছুঁতে নেই। আর একবার তাকে সঙ্গে নিয়ে মাধবী যখন আশ্রমে যেতে চায় তখন সে বলে সাধু বাবাকে যে মাধবী এতো ভক্তি করে তা সে জানতো না। যখন মাধবী জানায় সদানন্দর মুণ্ডুপাত করতে যাচ্ছে, তখন সে ভয় পেয়ে বলে:
“বাড়িতে এঁরা জানতে পারলে কিন্তু বড্ড রাগ করবেন।” (৩খ, পৃ.-৩৭৪)
যদিও এ চরিত্রটির পরিসর খুব কম তবু তার প্রকৃতি বুঝতে পাঠকের অসুবিধা হয় না।
রত্নাবলী আশ্রমের একজন আশ্রিতা। সে বিভিন্ন বিষয়ে সন্দেহপ্রবণ এবং সাহসী। বিপিন মাধবীকে নিয়ে একা মহেশের বাড়ি যেতে চাইলে সে বিপিনকে বাধা দেয়। সেও তাদের সঙ্গে যেতে চায়। তারপর বিপিন যখন তাকে একবারে আশ্রম থেকে চলে যাওয়ার কথা বলে তখন সে ভীত হয়ে ওঠে এবং নিজের জায়গা থেকে বিচ্যুত হয়।
আবার মাধবী কার সঙ্গে কী করেছে তা শুনতেও আগ্রহী হয়। সে ছেলেদের বিশ্বাস করে না। বিপিন তার গা ঘেষে বসলে সে ভীত হয়ে ওঠে। সে এও জানে তার পক্ষে কিছু করা সম্ভব হবে না। সকলে সত্য বুঝলেও কেউ তার পক্ষ নিয়ে কথা বলার সাহস পাবে না, সকলে বিপিনকে ভালোবাসে।
বিপিন যখন সদানন্দ আর মাধবীকে নিয়ে কুৎসা রটাচ্ছে তখনও সে সাহসী হয়ে একা মহেশের বাড়ি আসল খবরের জন্য ছুটে যায়। বিভূতির সঙ্গে মাধবীর বিয়ের কথা শুনে সে তাজ্জব হয়ে যায়। মাধবীকে অনুযোগ দিয়ে বলে:
“তুই কী মাধু? আমার জানাসনি কিছু?” ( ৩থ, পৃ. ৩৪৭ )

সদানন্দর ঘরে মাধবী কী করছে তা দেখতে বিপিনকে উপেক্ষা করে সে দেখতে যায়। এ সব দিক দিয়ে রত্নাবলী একটি সাহসী চরিত্র। রত্নাবলী নিজে শশধরের প্রতি অনুরক্ত। শশধর তাকে আশ্রমে রাখতে যাবে জেনেই সে রাত করে মহেশের বাড়ি আসে।
উমা চরিত্রটির পরিসর আরো কম। সন্তানদের উপেক্ষায় টিকতে না পেরে সে আশ্রমে এসে আশ্রয় নিয়েছে। রত্নাবলী তার ভাইঝি। নারীর প্রতি তার বিশেষ টান আছে। মাধবীর সম্পর্কে তার মনোভাবে তা বোঝা যায়। সদানন্দ মাধবীকে নিয়ে উষা আর রত্নাবলীর কাছে রাখতে গেলে সে সন্দিহান হয়ে ওঠে। সে সাধু-সন্ন্যাসীর প্রতি অন্ধ ভক্ত। তাই যখন বিপিন বলে সদানন্দ সন্ন্যাস ছেড়ে দিয়েছে, তখন সে খেপে যায়।
‘চতুষ্কোণ’ উপন্যাসটি একটি নিরীক্ষাধর্মী উপন্যাস। বিভিন্ন নারীর মধ্য দিয়ে সমাজের বিভিন্ন স্ত রের নারীর দৃষ্টিভঙ্গি দেখানো হয়েছে। এই নারীরা প্রত্যেকেই রাজকুমারকে ঘিরে রয়েছে।
এদের মধ্যে সবচেয়ে ব্যক্তিত্বসম্পন্ন, বিবেকবান, বন্ধুত্বপূর্ণ, তীক্ষ্ণবুদ্ধিসম্পন্ন সরসী। উপন্যাসের শেষে সরসীর শেষ কথার মধ্য দিয়ে জীবনবোধ সম্পর্কে দার্শনিকতা স্পষ্ট হয়:
“ জীবন তো খেলার জিনিস নয় মানুষের।” (৪খ, পৃ.-৮৬) সরসী সামাজিক কাজ করতে পছন্দ করে। ঘরে তার মন বসে না, সারাদিন সভা-সমিতির ব্যাপার নিয়ে ঘুরে বেড়ায়। কিন্তু সে ধীরস্থির প্রকৃতির। সে কখনো ব্যস্ত হয় না
“একদিনে পঞ্চাশটি জায়গায় কাজে যাইতে পারে অনায়াসে, কিন্তু চলে সে ধীরে ধীরে পা ফেলিয়া, আস্তে আস্তে উচ্চারণ করে কথা, শান্ত দৃষ্টিতে তাকায়, কখনও উত্তেজিত হয় না।” (৪খ, পৃ.-২৪)
সরসী সবচেয়ে কঠিন কাজটিও সহজে করে ফেলতে পারে। তার আয়োজিত মিটিং- এ নির্ধারিত সভাপতি কয়েক ঘন্টার নোটিশে একেবারে শহরের বাইরে গেলে সে অনায়াসে স্যার কে এলকে সভাপতি হতে রাজি করায়, অথচ অন্য কারো কথায় এতটুকু সভায়, আরেকজনের বদলি সভাপতি হতে স্যার কে এল কখনোই রাজি হতো না। সমাজে চারদিক বজায় রাখা কম কঠিন নয়।
রিণি মালতীর মধ্যে সর্বক্ষণ রেষারেষি লেগেই রয়েছে, আবার কালোর মত মেয়েও অন্য মেয়েদের ঈর্ষা করে, কিন্তু সকলের কাছে সরসীর গ্রহণযোগ্যতা আছে। মনের সবচেয়ে গোপন কথাটি তারা সরসীকে বলে।
বাস্তববুদ্ধিসম্পন্ন সরসীর রাজকুমার সম্পর্কে ভুল হয়। রাজকুমার যখন মানুষের দেহে থিওরি খুঁজে ব্যস্ত তখন সে রাজকুমারকে বখাটে ভাবতে পারে না, ভাবতে পারে না আর দশটা লোলুপ পুরুষের মতো রাজকুমার তার দেহের দিকে তাকাচ্ছে, কারণ রাজকুমার সম্পর্কে তার বিশেষ দুর্বলতা আছে। সে মনে করে এতো দিনে রাজকুমার তার সুন্দর মনের সন্ধান পেয়েছে।
এতকাল রাজকুমার তার দেহের সৌন্দর্যে মুগ্ধ ছিল, তাই তার দিকে সংকোচে তাকাতে পারতো না। এখন সে বুঝতে পেরেছে তার ভেতরের সৌন্দর্যকে তাই তাকে রাজকুমার ভালোবেসে ফেলেছে। ভালোবাসে বলেই তার দিকে তাকাতে আর কোনো সংকোচ নেই। সে আরো ভাবে “পুরুষের মন ভুলানো মেয়েলি হাবভাবের সপ্তা অভিনয় সে যে কখনও করে না, লজ্জাবতী লতা সাজিয়া থাকে না, নাঁকি সুরে কথা বলে না, ভাবপ্রবণতা পছন্দ করে না, বাজে খেয়ালে হালকা খেয়ালে সময় নষ্ট করে না, এ সব বোধহয় রাজকুমারের খেয়াল হইয়াছে।” (৪খ, পৃ. 81 )
এই বোধের মধ্য দিয়ে বোঝা যায় সরসী প্রেমময়ী। প্রেম তার সকল চেতনায় সকল কিছুকে সুন্দর করে ভাবায়। আবার রুক্মিণীর বাড়িতে রাজকুমারের যাওয়ার কথা ছিল, কিন্তু সে যায়ও নি, চিঠি লিখে ক্ষমাও চায় নি এ অভিযোগে রাজকুমারকে বাঁচানোর জন্য সে রুক্মিণীকে মিথ্যে করে চিঠির কথা বলে, তারপর পোস্ট অফিসের ঘাড়ে সকল দোষ চাপিয়ে রাজকুমারকে উদ্ধারেরর চেষ্টা করে।
রাজকুমারের পাশে সে কখনো বন্ধুর মতো এসেছে, কখনো প্রেমিকের মতো। রাজকুমার রিণির দেহ দেখতে চেয়ে অপমানিত হওয়ার পর মুসড়ে পরে, তার উন্মাদনা দেখে সরসী রাজকুমারকে সাহায্য করতে এগিয়ে আসে।
একদিন রাতে বিয়েবাড়ি থেকে রাজকুমারকে ডেকে সকলকে রেখে একা সে জনহীন বাড়িতে আসে। তারপর তার নিরাবরণ শরীর দেখায়। এতে রাজকুমারের সুস্থ জীবনে উত্তরণ ঘটে। কিন্তু রিণির অসুস্থতা রাজকুমারকে আবার বিচলিত করে দেয়। সে মনে করে রিপি তার জন্যই পাগল হয়েছে। রাজকুমার নিজেকে খাপছাড়া উদ্ভট ভাবে। রাজকুমারের মানসিক বিপর্যস্ততা কাটানোর জন্য সে তাকে বলে:
“খাপছাড়া হওয়াটা সব সময় নিন্দনীয় হয় না রাজু। সাধারণ মানুষের সঙ্গে চিন্তাশীল প্রতিভাবান মানুষের খাপ না খাওয়াটাই বেশি স্বাভাবিক। সুস্থ অবস্থায় রিপি হয়তো তোমার নাগাল পেত না, তোমার ব্যক্তিত্ব ওকে পীড়ন করত, তাই ও তোমায় সহ্য করতে পারত না। পাগল হয়ে এখন আর ও সব অনুভূতি নেই, তোমায় তাই ওর ভালো লাগে, বিনা বাধায় তোমায় শ্রদ্ধা করতে পারে।” (৪খ, পৃ.-৮৩)
মালতীর সঙ্গে রাজকুমারের সম্পর্ক জটিল পর্যায়ে চলে গেছে। মালতীর জীবনকে সে কষ্টকর। মানসিক বিপর্যয়ে পৌঁছে দিয়েছে। এ ব্যাপারে সে আবার সরসীর দ্বারস্থ হয়। রাজকুমারের মানসিক যন্ত্রণা লাঘবের জন্য সে মালতীর সঙ্গে কথা বলার ভার নিয়ে রাজকুমারকে নিশ্চিন্ত করে। আবার রিপিকে বিয়ে করার ব্যাপারে সে স্যার কে এল-এর মতো সেও রাজকুমারকে বিয়ে করা থেকে বিরত থাকতে বলে।
রিপির সঙ্গে ঘনিষ্ঠতাতে কোনো দোষ নেই, সে রিণিকে সারিয়ে তোলার জন্যই এ ব্যবস্থা করছে। এতে সংকোচেরও কিছু নেই। কিন্তু জীবনের মূল্য এতো কম নয় যে তাকে অনিশ্চয়তার দিকে নিয়ে যাবে। সরসীর সিদ্ধান্ত বুদ্ধিদীপ্ত। সে বুঝতে পারে হঠাৎ নেওয়া আবেগের কোনো ভুল সিদ্ধান্ত রাজকুমারের জীবন নষ্ট করে দিতে পারে।
তাই রাজকুমারকে বিয়ে থেকে নিবৃত করে। সরসীর জীবন একমুখী। তার কোনো উত্থান পতন নেই। জীবনের বিভিন্ন ঘাত-প্রতিঘাতও নেই। তার জীবন চলার পথে কোনো অভ্যান্তরীণ বা বাহ্যিক বাধা নেই, নিজে সে স্বাধীন। তবে স্বাধীনভাবে সে ঠিক কী কী কাজ করে সে বিষয়ে স্পষ্ট ধারণা নেই। শুধুমাত্র রাজকুমারকে ঘিরে তার কিছু জীবনমুখী সিদ্ধান্ত আছে, যা রাজকুমারকে সুস্থ জীবনে উত্তোরণে সহায়তা করে।
“সরসী রাজকুমারের নিউরোসিসের অবস্থাটা বুঝতে পারে। সরসী তার রুদ্ধ অবচেতনকে মুক্ত করে দিতে সহায়তা করে। ২৪
মালতী চরিত্রটি বিশেষণের দাবি রাখে। সে কল্পনা আর বাস্তব জীবনের মধ্যে বিধ্বস্ত হয়েছে, আবার নিজের মনের দ্বিমুখী টানে হয়েছে ধরাশায়ী। ‘চতুষ্কোণ’ উপন্যাসে নারী চরিত্রের মধ্যে তার জীবনই মনের সুক্ষ্মাতিসূক্ষ্ম অনুভূতির কারণে বিপর্যস্ত হয়েছে। জীবনের সিদ্ধান্তহীনতা এবং হঠাৎ নেওয়া কোনো সিদ্ধান্তের কারণে সর্বনাশের আশংকা মালতীর জীবনের বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন অবস্থার সৃষ্টি করেছে। মালতী বিভ্রান্ত হয়ে পড়েছে:
“মধ্যবিত্ত সমাজে প্রেমকে কেন্দ্র করে আত্মঘাতী এক বিকার অবস্থা বৰ্তমান। ২
তাই মালতী কখনো বা স্ববিরোধী আচরণ করেছে, আত্মদ্বন্দ্বে ভুগেছে। মানুষের জীবন অনেক সময়ই নিজের নিয়ন্ত্রণাধীন নয়। মানব মনের জটিল ভাবনাগুলো বিভিন্ন অপ্রীতিকর পরিস্থিতির সৃষ্টি করে, যা সে নিজেও চায় না। মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় এ বিষয়ের দিকে সচেতন ছিলেন এবং বাস্তব জীবন তার মূলসমেত আনার জন্যই তার লেখনী। সেই দিক দিয়ে মালতী চরিত্রটি সার্থক।
রাজকুমার মালতীর প্রাইভেট টিউটর, কিন্তু তাদের সম্পর্কটা ঠিক ছাত্র-শিক্ষকের মতো নয়, অনেকটা বন্ধুর মতো। রাজকুমার সম্পর্কে তার তীব্র আকর্ষণ আছে। উপন্যাসে তার আগমন ঘটে একটি অসংগত আচরণের মধ্য দিয়ে, যে আচরণ স্বাভাবিক মানুষ করবে না। শুধু মনকে যে প্রাধান্য দেয়, মন যা চায় তা করতে যে পারে সে এ রকম ঘটনা ঘটাতে পারে। এ উপন্যাসে।
“গোটা মানুষ ও তাহার মানসসমগ্রতাকে বাদ দিয়া তাহার সাধারণতঃ অবদমিত অংশবিশেষকে তাহার যৌন আকাঙ্ক্ষার অসংখ্য অণু-পরমাণুকে অগণিত বুদবুদরাশির ন্যার দ্রুত উত্থান-বিলয়শীল, যৌন কল্পনার ছায়াছবিগুলিকে একটা অবিচ্ছিন্ন ঐক্য, একটা অখণ্ড জীবনের প্রতিরূপ দেওয়া হইয়াছে।
কলেজ থেকে ফেরার সময় মালতী দেখতে পায় রাজকুমার রিপিদের বাড়ি ঢুকছে। কৌতূহলবশত সেও ঢোকে। সে বলে
“কলেজ থেকে ফিরছি, দেখি আপনি এ বাড়িতে ঢুকে পড়লেন। ব্যাপারটা ভালো করে না জেনে আর কী তখন বাড়ি ফিরতে পারি, আপনিই বলুন?” (৪খ, পৃ.-২২) রাজকুমারের ওপর নিজের অধিকার রিপির সামনে প্রতিষ্ঠা করার জন্য সে রিশির সামনে রাজকুমারকে নিজের সঙ্গে বাইরের দিকে যেতে বলে।
রিণি আসার আগেই সে রাজকুমারকে জানিয়েছে রিপি তাকে দেখতে পারে না, তাই সে রিপিদের বাড়ি আসে না। রিপির সঙ্গে তার রেষারেষি রাজকুমারকে কেন্দ্র করেই। মালতী কোমল, ভাবপ্রবণ, ভালোবাসার বাস্তবতা সম্পর্কে অনভিজ্ঞ। সে রাজকুমারকে ভালোবাসে। রাজকুমারও একমাত্র মালতীর সঙ্গেই ভালোবাসার মতো সম্পর্কে জড়িয়ে যায়। মালতী রাজকুমারের ব্যাপারে খুব সচেতন। সে সকল সময় নিজেকে আকর্ষণীয় করে উপস্থাপন করার জন্য প্রস্তুত হয়ে থাকে।
এক অবিরাম বর্ষণের দিন রাজকুমার তাকে পড়াতে আসবে কি না ঠিক নেই, কিন্তু তার মনে হয় যদি আসে, তাই দুপুরের গুমোটের খেদে আত্মগানিময় শরীরটিকে সযত্ন প্রসাধনে চাঙা করে তোলে। এই দিনই রাজকুমার আর মালতীর এক অদৃশ্য বন্ধন রচিত হয়। রাজকুমার মালতীর চেয়ারের পেছনে দাঁড়িয়ে তার খাতা দেখতে যায়, মালতীর মাথা তখন রাজকুমারের বুকে লাগে, মালতী এরপর আর নিজেকে সামলাতে পারে না সে রাজকুমারের হাতের আংটিতে মুখ রেখে পিপাসার্তের মতো পান করতে থাকে।
এ সময় আসে মালতীর প্রেমে পাগল প্রায় শ্যামল। শ্যামল বৃষ্টিতে ভিজে গেছে, সে মালতীর কাছে শুকনো কাপড় চায়, কিন্তু মালতী শ্যামলকে বাড়িতে রাখতে রাজি নয়, অন্তত এই সময়। সে শ্যামলের সঙ্গে নিষ্ঠুরের মতো আচরণ করে। সে অবজ্ঞা করে নিষ্ঠুরভাবে বলে “শুকনো কাপড় দিয়ে কী করবে, রাস্তায় নামলেই তো কাপড় আবার ভিজে যাবে।
একেবারে বাড়ি গিয়ে কাপড় ছাড়ো।” (৪খ, পৃ.-৩৩)
শ্যামলের প্রতি মালতীর ভালোবাসা নেই, তবে মমতা আছে, প্রশ্রয় আছে, কিন্তু রাজকুমারের প্রতি তার ভালোবাসার টান। ভালোবাসার প্রথম অভিসারে সে তৃতীয় কাউকে রাখতে রাজি নয়।
সে রাজকুমারকে বলে শ্যামল ছেলেমানুষ, শ্যামলের এ সব নীরব পূজার ন্যাকামি তার ভালো লাগে না। এই একদিনে মালতী বড় হয়ে যায়, আর মালতীর সাথে যারা পড়ে-শ্যামল ছেলেমানুষ। তার আর রাজকুমার সম্পর্কে কোনো সংশয় নেই, এই ঘটনার মধ্য দিয়ে যেন রাজকুমারকে তার পাওয়া হয়ে গেছে। সে তাই রাজকুমারকে সরাসরি বলে:
আজ কাপড় দিলে বসে থেকে আমাদের জ্বালাতন করত। “(৪খ, পৃ.-৩৩)
মালতী বুদ্ধিসম্পন্ন মেয়ে। রাজকুমারকে ভালোবাসলেও সে অন্ধ প্রেমিক নয়। ভালো-মন্দ জ্ঞান তার আছে। সে মানুষের দৃষ্টি দেখে ভালো মন্দ বুঝতে পারে। যেখানে রাজকুমারের লোলুপ- সৃষ্টি সম্পর্কে রিপি ভুল করেছে, এমনকি বাস্তববুদ্ধিসম্পন্ন সরসী ভুল করেছে, সেখানে মালতীর ভুল হয় না। মালতী বুঝতে পারে এ দৃষ্টিতে ভালোবাসা নেই। ভালোবাসার দৃষ্টিতে তাকে এভাবে দেখলে সে বরং খুশি হতো:
“কিন্তু চোখে তার ভালোবাসা নাই। মনে মনে কী যেন সে হিসাব করিতেছে যার যাচাই করার দৃষ্টিতে তার সর্বাঙ্গে চোখ বুলাইতেছে!” (৪খ, পৃ. ৪১)
রাজকুমার আর মালতীকে পড়ায় না। কারণ সে বুঝতে পারে তার কাছে পড়লে মালতীর পাশে আর ভরসা নেই। মালতী ভাবে রাজকুমার তাকে হয়তো আবেগ আর উত্তেজনা থেকে দূরে রাখতে চাইছে। রাজকুমারের প্রকৃতি সে বুঝতে পারে না। তার নিজের যুক্তি দিয়ে সে বিচার করে। সকলে মিলে বিয়েতে যাচ্ছে মালতীরা।
গাড়িতে সকলের জায়গা হবে না জেনে মালতী রাজকুমারকে অধিকার করে সরসীকে টেক্কা দিয়ে রাজকুমারকে নিয়ে ট্রামে যাবে বলে বেরিয়ে যায়, যাওয়ার আগে সে শ্যামলকেও অপমান করে যায়। কিছুক্ষণ আগে শ্যামল বলেছে রাজকুমারের মনুষ্যত্ব নেই, নে রাঙ্কেল। সেই রাগে এতোক্ষণে মালতীর চোখে জল আসে।
রাজকুমারের অপমান যে তারও অপমান সে তা রাজকুমারকে বলে। মধ্যবিত্তবাঙালি একটি নারী এ ধরনের অভিপ্রায় ব্যক্ত করবে এটাই স্বাভাবিক। মালতী এখন শুধু বিয়ের অপেক্ষায়। ‘জীবনের জটিলতায় প্রমীলাও নগেন সম্পর্কে এরূপ ভুল করেছিল। তবে এ ভুল মালতী বা প্রমীলার নয়। এ ভুল রাজকুমার আর নগেনের প্রতারণার।
তারা শুধু বুঝতে পারে নি যে তারা প্রতারকের ফাঁদে পা দিয়েছে। তবে প্রমীলা নগেনের বিরুদ্ধে কোনো কিছু করে নি শুধু স্টেশনে ছুটে গিয়েছে। তারপর আর তারা মুখোমুখি হয় নি। কিন্তু মালতী সাহসী। সে রাজকুমারকে দিয়ে হোটেলের রুম ভাড়া নেওয়ায়। সে যে কোনো উপায়ে রাজকুমারকে বাঁধতে চায়। আসবার আগে শ্যামলের সঙ্গে ঝগড়া করে। তাকে অপমান করে, তাকে বাড়িতে আসতে বারণ করে। কিন্তু মালতী শেষ পর্যন্ত শ্যামলকেও ছাড়তে পারে না, সে শ্যামলকে আবার আসতে বলে
“শোনা, তোমাকে কয়েকটা কথা বুঝিয়ে বলা দরকার। আজ আমার সময় নেই, ক্ষমতাও নেই। কাল সন্ধ্যার পর একবার এসো।” (৪খ, পৃ.-৬৮)

এমনি করে মালতী শ্যামল এবং রাজকুমার দুজনের দিকেই ঝুঁকে থাকে, সিদ্ধান্ত নিতে পারে না। আবার হোটেলের রুমে সে রাজকুমারকে চূড়ান্তভাবে বাঁধার যে কৌশল কল্পনা করেছে। তাও ঠিক রাখতে পারে না। বাঙালী নারীর এ এক চিরন্তন দিক:
“রাজকুমারকে না হারাইবার ব্যাকুল, একনিষ্ঠ সাধনায় সে শ্যামলের প্রতি নিষ্ঠুরতম ব্যবহার করিয়াছে। কিন্তু আত্মসমর্পণের মুহূর্তে সে কোন দুর্বোধ্য প্রেরণার বশে পিছাইয়া আসিয়াছে । ২৭
মধ্যবিত্তের সংস্কার এসে তাকে ক্ষতবিক্ষত করে:
“নিজেদের অতৃপ্ত কামনার সঙ্গে এদের মজ্জাগত সংস্কারের একটা দ্বন্দ্ব সব সময় বিদ্যমান। মালতীর যে রাজকুমারের সঙ্গে যৌন মিলনের পূর্বেই গা বমি বমি করে, বস্তুত তা আর কিছুই নয় মালতীর ভেতরকার সংস্কারজনিত বন্ধের প্রতিক্রিয়ার ফল ছাড়া। ২৮
রাজকুমার তাকে রেখে রিণির বাবার সঙ্গে দেখা করতে গেলেই সে মনে মনে ভেঙে পড়ে। যৌন মিলনের দ্বারা রাজকুমারকে বাধতে তার মন সায় দেয় না। সে আবার রাজকুমারকে বলে দূরে কোথাও অন্তত দুমাস তারা দুজন একসঙ্গে এক বাড়িতে থাকবে। আত্মদানের উদ্দেশ্যে এসেও সে নিজেকে দান করতে পারে না।
চিরন্তণ সংস্কারের ভয় তাকে জাপটে ধরে। সে নিজেকে বাঁচানোর জন্য দুমাসের কথা বলে, কিন্তু এই ব্যবস্থাও সে গ্রহণ করতে পারবে না। মধ্যবিত্ত সংস্কার তার পথ রুদ্ধ করবে। তাই রাজকুমারও মালতীর ব্যাপারে নিশ্চিত হয়। এরপর সরসী মালতীতে স্বাভাবিক করার ভার নেয়। তখন রিণি অসুস্থ হয়েছে। মালতী রিণির প্রতি সহানুভূতিশীল হয়।
রিশি চরিত্রটি আধুনিক এবং ভাবপ্রবণ চরিত্র। সে উচ্চবিত্ত শ্রেণির নারী। তার চলাফেরা অতি আধুনিক। সে গান গায়, হাফপ্যান্ট পরে টেনিস খেলে। রাজকুমারকে ভালোবাসে। ‘চতুষ্কোণ’ উপন্যাসের প্রতিটি নারী-ই রাজকুমারকে নিয়ে আপন আপন ভুবন তৈরি করে। রিপিও এর ব্যতিক্রম নয়। রাজকুমারকে নিয়ে তার ন্যাকামিও আছে। উপন্যাসে তার প্রথম আবির্ভাব – সে গান গাইছে।
রাজকুমার এসে দাঁড়ালে সে বুঝেও না বোঝার ভান করে গেয়ে চলে এবং গান শেষ হওয়ার পর অতিরিক্ত আবেগে চুম্বন প্রত্যাশায় নিজের মুখ রাজকুমারের দিকে বাড়িয়ে দেয়। রাজকুমারের প্রত্যাখ্যানে সে পাথরের মূর্তি হয়ে যায়। রাজকুমার গল্প করতে চাইলে রিলি বসে, কিন্তু গল্প জমে না। অবশেষে রাজকুমার বিদায় নেয়। রাজকুমার সম্পর্কে রিপি চোখেমুখে অবজ্ঞা ফুটে ওঠে।
রাজকুমার ঘরের বাইরে আসার সঙ্গে সঙ্গে সে আবার গানের প্র্যাকটিস আরম্ভ করে। অর্থাৎ রিণি লজ্জা পায় নি, অপমানিত হয় নি, বরং রাজকুমারকে অভদ্র ভেবেছে। তবে কিছুক্ষণ পর নিচে হলঘরে এসে মালতীকে রাজকুমারের সঙ্গে কথা বলতে দেখে নিজের অস্তিত্ব সম্পর্কে সচেতন হয়ে ওঠে। মালতী তখন রাজকুমারকে বাইরে আহ্বান করছে। রিণি রাজকুমারকে ভেতরে আসতে বলে।
মালতীর কাছে সে কিছুতেই হার মানবে না। সে দিন রাজকুমার দুজনকে একসঙ্গে বাড়িতে রেখে চলে এসেছিল। রিপির ভেতরে রাজকুমার সংক্রান্ত বোধ আরো বাড়তে থাকে। না পাওয়াকে পেতে তার মন সদা চঞ্চল হয়ে থাকে। তাই রাজকুমার যখন তার শরীর খুঁটে খুঁটে দেখে সে তখন ভুল বোঝে। সে মনে করে:
“রাজকুমারের মন কবিত্বময়, বাস্তব জগতের অনেক উঁচুতে নিজের মানস-কল্পনার জগতে সে বাস করে; বড়ো ভাবপ্রবণ প্রকৃতি রাজকুমারের। তার মনের ঐশ্বর্য রাজকুমারকে মুগ্ধ করিয়াছে, তার হাসি কথা গান ভাবালোকের অপার্থিব আনন্দ দিয়াছে রাজকুমারকে, তার সান্নিধ্য অনুভব করিয়াই রাজকুমারের মন এমনভাবে অভিভূত হইয়া গিয়াছে যে একটি চুম্বনের প্রয়োজনও সে বোধ করে নাই। রাজকুমার তাই চমকাইয়া গিয়াছিল, কী করিবে ভাবিয়া পায় নাই।” (৪খ, পৃ. 81 )
তবে রিপির এই বোধেরও পরিবর্তন অচিরেই ঘটে। সে টেনিস খেলে বাড়ি এসে স্নান করবে। কিন্তু রাজকুমার তার আগেই তাকে একটি কথা বলতে চায়। রিণি মনে করে সে তাকে প্রেমের প্রস্তাব দেবে। কিন্তু রাজকুমার বলে অন্য কথা। সে বাথরুমে দাঁড়িয়ে রিপির স্নান করা দেখবে।
সে নারী দেহের নগ্নরূপ দেখে থিওরি আবিষ্কার করবে। এতে রিণি প্রচণ্ড রেগে যায়। রাজকুমার সম্পর্কে তার ধারণা পুরোপুরি বদলে যায়। এতে ভালোবাসা থাকলে হয়তো সে এতো কষ্ট পেতো না। সে বলে:
“একটা উপদেশ নিয়ে যাও। আর একটি মেয়েকে যখন কথাটা বলবে, মালতীকেই বলবে বোধহয়, কিছু বুঝিয়ে বলতে যেয়ো না। শুধু বোলো যে তোমার এ সাধটা না মেটালে তুমি পাগল হয়ে যাবে, সায়ানাইড খাবে। হয়তো রাজি হতে পারে। ” (৪খ, 1. -৫১)
নারীত্বের সাধারণ বোধ সকল নারীর ক্ষেত্রেই সমান। রিপির এ কথা রাজকুমারকে বুঝিয়ে দেয়। এর পর রিপি পাগল হয়ে যায়।
“রিণির তীব্র আকাঙ্ক্ষা, রাজকুমারের মন্থর বিধান্ত গতিতে অসহিষ্ণু হইয়া, তাহার দুর্বোধ্য, আত্মবিরোধী আচরণে পীড়িত হইয়া, অবশেষে পাগলামিতে ফাটিয়া পড়িয়াছে।’
দেহ সম্বন্ধে সচেতন রিপি বাউজের বোতাম লাগায় না কাপড় তার লুটিয়ে থাকে। রাজকুমারকে দেখলে সে শান্ত থাকে, অন্যরা তাকে ধরে রাখতে পারে না। পাগল রিণির রাজকুমারের প্রতি কোনো রাগ নেই, অভিমান নেই। রিপি অবচেতন একটি মানুষ
“রিণির অহং-এর আবরণ ভেঙে যেতে, সে এখন রাজকুমারের সামনে নিজের নারীত্ব সম্পর্কেও আর সচেতন নয়।
উপন্যাসে একটি দৃশ্যে গিরীন্দ্রনন্দিনী এবং তার মা-কে পাওয়া যায়। তবে একটি দৃশ্যে তাদের উপস্থিতি হলেও পরোক্ষভাবে রাজকুমারের জীবনের বিকৃতির কারণ তারাই। যদিও একেক সময় একেক জিনিস নিয়ে মেতে থাকতে রাজকুমার পছন্দ করে তবু নারী দেহ স্পর্শ করার আগ্রহ তাদের কারণেই প্রবল হয়েছে।
একটি দৃশ্যেই স্পষ্ট হয় গিরি রাজুমারের ওপর অধিকার আদায় করতে চায়, কিন্তু বাঙালি হাজার হাজার পরিবারের মতো শারীরিক সংস্কার তার মধ্যে বিদ্যমান। রাতে রাজকুমারের গিরিদের বাড়ির নিমন্ত্রণ আছে, কিন্তু রাজকুমারের মাথা ধরার কারণে সে নিমন্ত্রণ রক্ষা করতে পারবে না। এই কথা বলতে রাজকুমার গিরিদের বাড়ি আসে। গিরি তখন শেমিজ ছাড়া শুধু ডুরে শাড়ি পরে আছে। তাই সে সংকুচিত। কিন্তু রাজকুমারকে খাওয়ার ব্যাপারে খোঁচা দিয়ে বলে:
“তা খাবেন কেন গরিবের বাড়িতে?” (৪খ, পৃ.-১৪)
তাছাড়া সে আরো বলে, না খেলে শরীরের রক্ত কমে যায় তাই মাথাধরা আরো বাড়বে। এবার রাজকুমার গিরির হার্ট দেখতে গিয়ে ডুরে শাড়ির নিচে হাত রাখে, এতে গিরির মুখ কালো হয়ে যায়। সে বলে:
“ছি ছি! এসব কী।” (৪খ, পৃ. ১৫)
সে উপরে গিয়ে তার মাকে বলে। গিরির মাও রেগে অগ্নিমূর্তি ধারণ করে । রাজকুমার উপরে গেলে সে বলে:
“বেরো হারামজাদা, বেরো আমার বাড়ি থেকে।” (৪খ, পৃ.-১৫)
শরীর নিয়ে এমন বিড়ম্বনায় রাজকুমারকে আর কখনো পড়তে হয় নি। এ সময় থেকে তার ক্ষু এই অপমানের কথা মনে হতে থাকে এবং তার মাথায় বিভিন্ন উদ্ভট চিন্তা উদয় হতে থাকে । রাজকুমারের আরেকটি উদ্ভট চিন্তা শরীর দেখে মেয়েদের মানসিক দিক নির্ণয়। এই চিন্তাটি আসে কালীকে দেখে।
কালী মনোরমার দুর সম্পর্কের বোন। মনোরমা কালীকে তার কাছে এনে রেখেছে রাজকুমারের সঙ্গে বিয়ে দিতে। কালী সাধারণ মেয়ে, তাকে দেখে রাজকুমারের মনে হয় তার গড়নটি পর্যন্ত ঘরোয়া ছাঁচে। রাজকুমার কালীর হার্ট পরীক্ষা করে একটু প্রেমিকের ভঙ্গিতে তাকে একহাত দিয়ে বেষ্টন করে। কিন্তু কালীর আচরণ গিরির মতো নয়:
“কালী যেন নীরব আত্মনিবেদনের জন্য প্রস্তুত হয়েই আছে। ১ প্রতিটি নারীর থেকে প্রতিটি নারী আলাদা। খাওয়ার পর তাই এই দিনই কালী তাকে মশলা দিতে আসলো। তবে কালীর অভিযোগ অন্য জায়গায়। রাজকুমারের অনেক মেয়েবন্ধু তার পছন্দ নয়। সমাজে বন্ধুত্বের একটি সাধারণ বোধ আছে, কালী সেই মত পোষণ করে।
“আপনার শুধু মেয়ে বন্ধু, গণ্ডা গণ্ডা মেয়ে বন্ধু। বেটাছেলের অত মেয়ে বন্ধু থাকতে নেই।” (৪, পৃ.-৫২)
কালী রাজকুমারকে কাছে টানতে পারে না বলে মনোরমা তাকে তিরস্কার করে। তখন থেকে সে নিজেকে আকর্ষণীয় করতে চেষ্টা করে। সহজ-সরল মেয়েটার মনে জটিলতার আগমন ঘটে “মনোরমা যতটুকু সাজাইয়া দেয় তার উপর সে নিজে আরেকটু বেশি করিয়া সাজ করে। গায়ে একটু বেশি সাবান ঘষে, মুখে একটু বেশি ক্রিম মাখে, একটু বেশি দামের কাপড় পরে।” (8, পৃ. 99 )
মেয়েটার মন ভেঙে যায়। সে রাজকুমারকে অধিকার করবার জন্য বিদ্রোহী হয়ে ওঠে। সরসী রাজকুমারের কাছে এলে সে খেপে যায়। রাজকুমারকে অভিযোগ করে ঘরের বউয়ের মতো, তার চোখে জল আসে। এতটুকু মেয়ের মধ্যে ভাবাবেগের উদয় হয়। নিতান্ত বালিকা থেকে সে নারীতে পরিণত হয়।
রাজকুমার এই মেয়েটার জীবনকে জটিল করে তোলে। তবে কালীর জীবন জটিল করার পেছনে মনোরমার অবদান সবচেয়ে বেশি। সেই কালীকে এনেছে। এবং বিভিন্ন সময় বিভিন্ন সাজ সাজিয়েছে, রাজকুমারকে স্বপ্ন দেখতে সাহায্য করেছে। মনোরমা নিজেও একটি জটিল চরিত্র। সে স্বামীকে নিয়ে রাজকুমারের বাড়িতে ভাড়াটে হয়ে আসে এবং আসার দ্বিতীয় মাস থেকেই রাজকুমারের দিদি হয়ে তাকে ভাড়ার বদলে চারবেলা খাওয়ায় এবং কিছু কাজ করে দেয়।
এতেই সে সন্তুষ্ট থাকে না, নিজের মনের সুপ্ত কাম জাগ্রত হয়। সে সেই কাম চেতনা চরিতার্থ করার জন্য কালীকে নিয়ে আসে। বাঙালি কূলবধূর কূল রক্ষা করে নিজের বাসনা অন্যের মধ্যে দেখতে সে উদ্যোগী হয়। তবে নিজেও সে রাজকুমারের কাছে উপযাজক হয়ে ধরা দেয়, তার রাগ-অভিমানেরও আতিশয্য দেখা যায়। সে দিনের মধ্যে অন্তত আট- দশবার রাজকুমারকে ডাকে, কিন্তু প্রতিবারই মনে হয়, এই তার প্রথম ও শেষ আহ্বান।
গিরিদের বাড়ি থেকে আসার পর মনোরমা রাজকুমারকে ডাকে। তখন সে দেড় বছরের ছেলেকে ঘুম পাড়াচ্ছে। ছেলেটি তার পরিপুষ্ট স্তন ধরে আছে। এ বিষয়ে তার রাজকুমারের সঙ্গে আলোচনা চলে না। কিন্তু তার ভেতরের যৌন চেতনা তাকে রাজকুমারের দিকে পরিচালিত করে। সে অবলীলাক্রমে বললো:
“এমন দুষ্ট হয়েছে ছেলেটা। খায় না কিন্তু ঘুমানোর আগে ধরা চাই।” (৪খ, পৃ.-১৬)
অতঃপর এ বিষয়ে আলোচনা হলো এবং মনোরমা রাজকুমারকে আহ্বান জানালো খোকার হাত ছাড়িয়ে দিতে। রাজকুমারের আপত্তি মনোরমার বুদ্ধির কাছে টিকলো না। অবশেষে রাজকুমার খোকার হাতে হাত দেয়।
“খোকার কচি হাত আর মনোরমার কোমল স্তনের স্পর্শ যেন অবিস্মরণীয় সুগন্ধি। অনুভূতিতে ভরা তেজস্কর রসায়নের মতো তার মধ্যে নবজীবনের সঞ্চার করিতে লাগিল।” (৪খ, পৃ.-১৬)
স্বামী থাকতেও মনোরমার এই আচরণ তার মনোবিকারেরই লক্ষণ। মনোরমা চরিত্রে ফ্রয়েডীয় মনোবিকার প্রবলভাবে লক্ষণীয়। তার মধ্যে আত্মসম্মানবোধও প্রবল। রাজকুমার খোকাকে ছোঁড়া বললে সে খেপে যায়। রাজকুমার আদর করে বলেছি বললেও সে তুষ্ট হয় না। সে বলে “আমার ছেলেকে যদি আদর করে ছোঁড়া বলতে পারো, আমাকেও তো তবে তুমি
আদর করে বেশ্যা বলতে পারো অনায়াশে।” (৪খ, পৃ. ১৭)
এখানে এ সত্য স্পষ্ট হয় যে মনোরমা সচেতনভাবে রাজকুমারের সঙ্গে অসংগত আচরণ করে। তার স্বামীর সঙ্গে তার সম্পর্ক কেমন তা জানা যায় না। তবে, কালীর ব্যাপারে রাজকুমারেরর স্পষ্ট উত্তর শোনার পর তার কথাতেই তার স্বামী বাড়ি বদল করে, এতে মনে হয় স্বামীর প্রতি তার আধিপত্য রয়েছে। মনোরমার অতৃপ্ত যৌন কামনার কারণেই কালীকে সে এনে রেখেছে। নিজের কাছে।
রাজকুমারকে সে জিজ্ঞাসা করে কালীকে তার কেমন লাগে, কালীকে সে মিউজিয়াম দেখাতে নিয়ে যেতে চেয়েছে তা-ও মনে করিয়ে দেয়। কালীর বিয়ের জন্য ভাবনা নেই, বিলেত ফেরত পাত্রের মা সাধাসাধি করছে। এসব বলে আর রাজকুমারের মনোযোগ দেখে। কালী সম্পর্কে তার অনুভূতি দেখে
কালীকে মনোরমা কখনও বেশি সাজায় না, তার ঘরোয়া সাধারণ সাজেই বৈচিত্র্য সৃষ্টির চেষ্টা করে। কালীর একরাশি কালো চুল আছে, কোনোদিন মনোরমা লম্বা বিনুনি ঝুলাইয়া দেয়, কোনোদিন রচনা করে কুলানো ফাঁপানো খোঁপা। সকালে ঘরের কাজ করার সময় কালীর গায়ে সাদাসিধে ভাবে জড়ানো থাকে নিমন্ত্রণে যাওয়ার জমকালো দামি শাড়ি, বিকালে সযত্ন প্রসাধনের পর তাকে পরিতে হয় সাধারণ মিলের কাপড়।” (৪খ, পৃ.-৩৯)

মনোরমা যেন কালীর মধ্য দিয়ে নিজের অপূর্ণ বাসনা দেখতে পায়। আবার কালী রাজকুমারের ঘরে বেশি সময় থাকলে তার বুকের ভেতর টিপটিপ করে, কালীকে বাঁচানোর জন্য সে ছটফট করে। আবার ভাবে-
“শুধু আজের জন্য বাঁচাইতে গিয়া সে যদি কালীর চিরদিনের মরার ব্যবস্থা করিয়া বসে?” (৪খ, পৃ.-৫৩)
কালীর মধ্য দিয়ে মনোরমার জীবন জটিল হয়ে ওঠে। রাজকুমার যখন একেবারে শান্ত হয়ে যায়, তখন সে আরো চিন্তিত হয়ে পড়ে, আশা করবে না হতাশ হবে কিছু বুঝে উঠতে পারে না। এরপর রাজকুমার কালীকে তার মায়ের কাছে পাঠিয়ে দিতে বলে। মনোরমা বিষাদ আর হতাশার যন্ত্রণায় কুঁকড়ে যায়। মনে হয় কালীকে নয়, মনোরমাকেই প্রত্যাখ্যান করেছে রাজকুমার।
মনোরমা চরিত্রটি মানসিক বিকারমূলক চরিত্র। বিয়ের আগে কোনো এক পুরুষের স্পর্শে তার মধ্যে যে চাঞ্চল্য দেখা দিয়েছিল, সেই বোধ তার মধ্যে সুপ্ত রয়েছে, তারই প্রতিক্রিয়ায় সে রাজকুমারের সঙ্গে জটিল সম্পর্কে লিপ্ত হয়। নিজে আড়ালে থেকে সে কালীকে দিয়ে রাজকুমার এবং কালীর মনের বিভিন্ন জটিল মুহূর্ত অবলোকন করে। এতেই সে তৃপ্তি পায়।
কিন্তু রাজকুমার কালীকে প্রত্যাখ্যান করলে তাই সে নিজে কালীর চেয়ে বেশি ভেঙে পরে, তার অপমানবোধ বেশি হয়। অবশেষে সে রাজকুমারের বাড়ি ছেড়ে চলে যায়। এ উপন্যাসে প্রতিটি নারী তাদের নিজস্ব মনোবাসনা নিয়ে রাজকুমারের দিকে ঝুঁকেছে বলে তারা তাদের মতো করে রাজকুমারকে চেয়েছে, কিন্তু রাজকুমার স্বরূপে বিদ্যমান। তাই প্রায় প্রতিটি নারী-ই মানসিক কষ্টের শিকার হয়েছে।
মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় শোষিত মানুষের রূপকার। এ শোষণ রাষ্ট্রীয়, সামাজিক এবং পারিবারিক। তিনি নিরাসক্ত শিল্পীর মতো বাইরে থেকে সমাজকে পর্যবেক্ষণ করেছেন এবং উপন্যাসের কন্টেন্ট হিসেবে তা উপস্থাপন করেছেন। সমাজে শোষক ও শোষিত এই দুই শ্রেণি। কিন্তু শোষিত শ্রেণির মধ্যেও নারীরা পুরুষের দ্বারা অধিকতর শোষিত।
দৃষ্টিভঙ্গির নৈর্বক্তিকতায় মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় তাঁর উপন্যাসে সারীদের শ্রেণির মধ্যে শ্রেণিগত অবস্থানটি স্পষ্ট করে তুলে ধরেছেন। মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় তাঁর উপন্যাসে নারীর বিভিন্ন রূপ অঙ্কন করেছেন। নারী মানব সম্প্রদায়ের অর্ধেক। তবে তার সে মর্যাদা সমাজ দেয় না, কিন্তু পরিস্থিতির কারণে সে পুরুষের চেয়েও বেশি সক্রিয় হতে পারে, মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় অধিকাংশ উপন্যাসে তা দেখিয়েছেন।
নারী যেমন বাহ্যিক পরিবেশে সক্রিয়, তেমনি নিজের মনকেও নিয়ন্ত্রণ করেছে। লেখক সামাজিক বিভিন্ন জটিলতা প্রকাশের মাধ্যম হিসেবে মানুষের মনকে অবলম্বন করেছেন। তাঁর উপন্যাস গুলিতে নারীদের মনের জটিলতার পরিচয় পাওয়া যায়।
মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের উপন্যাসের নারীরা সংগ্রামশীল এবং পরিস্থিতির মোকাবেলায় সক্ষম। যশোদা, সরসী, প্রমীলারা আপন অবস্থানে সক্রিয়। তারা বৈরী পরিবেশের মধ্যে থেকেই সংগ্রাম করে টিকে থেকেছে। মানব মনের চাওয়া-পাওয়ার দ্বন্দ্ব, কষ্টকে গোপন করে সুখী হওয়ার চেষ্টা, স্বপ্নবিসর্জন দিয়ে ক্ষত-বিক্ষত হওয়া, পুরুষের স্বেচ্ছাচারিতায় সৃষ্ট বিশৃঙ্খল পরিস্থিতিতে খাপখাওয়ানোর প্রচেষ্টা-সকল কিছু নারী চরিত্রগুলির মধ্যে দেখা যায়।
প্রতিটি নারীই তাদের লক্ষ্যে পৌছানোর জন্য অবিচল। ঘাত-প্রতিঘাত সংঘাতের মধ্য দিয়ে তাদের পদযাত্রা। নারী চরিত্রগুলি পর্যালোচনা করে আমরা দেখতে পাই তারা অস্তিত্বশীল হওয়ার প্রচেষ্টায় সদা তৎপর। বাস্তবের সঙ্গে সংঘাতে মানুষ সত্যের মুখোমুখি হয়।
সংগ্রামের স্তরে স্তরে মানুষ আরো জটিলতর পরিস্থিতির সম্মুখীন হয়। মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের নারী চরিত্রগুলি এমনি জটিলতায় বসবাস করে, মুক্তির পথ খোঁজে এবং শেষ পর্যন্ত অস্তিত্বশীল হয়।