নারীগণ কাব্যনাটক

আজকে আমাদের আলোচনার বিষয়ঃ নারীগণ কাব্যনাটক । যা সৈয়দ শামসুল হকের ইতিহাস নির্ভর কাব্যনাটক এর অন্তর্গত।

 

নারীগণ কাব্যনাটক

 

নারীগণ কাব্যনাটক

নারীগণ (২০০৬)’ কাব্যনাটক সৈয়দ শামসুল হক (১৯৩৫-২০১৬) রচনা করেছেন ১৭৫৭ সালের পলাশির ইতিহাসের প্রেক্ষাপটে। পলাশির রাজনৈতিক ইতিহাস কিংবা নবাব শিরাজদ্দৌলার (১৭৩৩-১৭৫৭) ট্রাজিক কাহিনি বাঙালির অস্তিত্বলোকে গভীরভাবে প্রোথিত।

এই ট্রাজিক চরিত্রকে নিয়ে বাংলাদেশে ইতঃপূর্বে বহু চলচ্চিত্র ও নাটক রচিত হয়েছে। কিন্তু সৈয়দ শামসুল হক নারীগণ নাটকে তাঁর চিন্তাশক্তির অভিনবত্ব ও অনন্য মেধার স্বাক্ষর রেখেছেন। তিনি ১৭৫৭ সালের ঘটনা নিয়ে অন্যদের মতো ঐতিহাসিক দেশপ্রেমমূলক নাটক রচনা করেননি; বরং দেখিয়েছেন রাজনৈতিক অভিঘাতের পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া; রাজমহলের নারীদের ওপর একটি যুদ্ধের অভিঘাতে কেমন ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়া সংঘটিত হয় তার স্বরূপ ।

বাংলার স্বাধীনতা সংগ্রামের ইতিহাসে কিংবা বাংলা সাহিত্যে নবাব শিরাজদ্দৌলার শৌর্য-বীর্য, নবাব আলিবর্দী খাঁর ঔদার্য, মীরজাফর জগৎশেঠদের বিশ্বাসঘাতকতার কাহিনি বহুভাবে চর্চিত হলেও তাদের অন্দরমহলের নারীরা বরাবরই থেকে গেছে অনালোচিত। অথচ নবাবের জীবনজুড়ে এসকল নারীর ভূমিকা কম ছিল না। সৈয়দ শামসুল হক আলোচ্য নাটকে ঐতিহাসিক বৃত্তান্তকে নেপথ্যে রেখে রাজমহলের নারীদের অন্তর্দ্বন্দ্ব, তাদের আকাঙ্ক্ষা-অচরিতার্থতা ও অন্তর্বেদনার প্রসঙ্গ প্রকাশ করেছেন।

বস্তুত, পুরুষতান্ত্রিক সমাজে নারীর অবস্থান কিংবা বঞ্চনা নিয়ে সৈয়দ শামসুল হক ছিলেন বরাবরই সোচ্চার। আলোচ্য নাটকটি তাঁর সেই সোচ্চার চেতনারই শিল্পিত প্রয়াস। নারীগণ নাটকের আখ্যানভাগ লক্ষ করলে দেখা যাবে, ‘পুরুষের লোভ যেমন এই নাটকে প্রকাশ পেয়েছে তেমনি নারীতে নারীতে দ্বন্দ্বের জায়গাটিও বুঝিয়ে দেয়া হয়েছে। নবাব সিরাজদ্দৌলার জেনানা মহলের ইতিহাস রচনা করতে গিয়ে নারী জগতের ইতিহাস সৃষ্টি করেছেন সৈয়দ হক।২

পালাকার নাট্যদলের প্রযোজনায় এ নাটকটি প্রথম মঞ্চস্থ হয় ২০১২ সালের অক্টোবর মাসে বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমির এক্সপেরিমেন্টাল থিয়েটার হলে। এই নাট্যদলের প্রচারপত্রে নাটকটি সম্পর্কে যে মূল্যায়ন উপস্থাপিত হয়েছিল তা এরকম :

পলাশী যুদ্ধে ইংরেজদের জয় হয়েছিল ষড়যন্ত্রের শক্তিতে এবং অভ্যন্তরীণ বিশ্বাসঘাতকতায়। নবাব সিরাজদ্দৌলার হত্যার মধ্য দিয়ে ২০০ বছর ব্রিটিশ গোলামির জিঞ্জিরে আবদ্ধ হয় এ উপমহাদেশ । […] যে কোনো যুদ্ধের বাস্তবতা এই – যুদ্ধ করে পুরুষেরা। বিজয়ী বা পরাজিত কোনো পক্ষে নারীযোদ্ধা নেই।

 

নারীগণ কাব্যনাটক

 

যুদ্ধে নারী লুণ্ঠিত হয়, নারী ধর্ষিত হয়, শত্রুপক্ষ যুদ্ধে নারীধর্ষণের তাণ্ডব চালায়। কারণ, নারীরা হয় অধিকার স্থাপনের চূড়ান্ত উপায়। যুদ্ধের প্রান্তরে নয়, জয়-পরাজয় নারীর শরীরে হয় নির্ধারিত। […] নবাব হত্যার পর রাজপ্রাসাদের অন্তঃপুরে নারীমহলে কী ঘটনা ঘটেছিল সেটা ইতিহাসের পাতায় লেখা নেই।

এই সাহসী কাজটাই সম্পন্ন করেছেন বাংলাদেশের সব্যসাচী লেখক-কবি-নাট্যকার সৈয়দ শামসুল হক। […] নারীগণ নবাব সিরাজদ্দৌলাকে হত্যার পর নবাব মহলের অন্তঃপুরে বন্দী নারীদের নানান উপলব্ধি। নবাব সিরাজের বন্দী নানি, মা, পত্নীর জবানে উঠে আসা তাঁদের জীবনে ঘটে যাওয়া ঘটনা, রাজনীতিতে নারীদের অংশগ্রহণ, নারীর মর্যাদা ও ইচ্ছার স্বাধীনতাসহ অনেক বিষয়।

অবমাননার হাত থেকে বাঁচতে এই বন্দী নারীরা আত্মহত্যাও করতে পারে না। কারণ তাঁদের আত্মহননের পথও বন্ধ করে দেওয়া হয়। অঙ্গুরির বিষ কেড়ে নেওয়া হয়, কেড়ে নেওয়া হয় খঞ্জর। প্রহরীর রূঢ় হাত তাদের শরীর স্পর্শ করে। তাঁদের বন্দী করার মধ্য দিয়েই ঘটনার শেষ হয় না। ক্ষমতা পাকাপোক্ত করতে এবং বিদ্রোহের পথ রুদ্ধ করতে ষড়যন্ত্রের মাধ্যমে এইসব নারীকে হত্যা করা হয়।

বস্তুত, ‘পলাশীর যুদ্ধের পিছনে ছিল মুর্শিদাবাদের রাজপুরুষের ষড়যন্ত্র। সে চক্রান্তের সঙ্গে সুবাহ বাংলার জনজীবনের কোনো যোগ ছিল না। এর পিছনে কোনো গভীর নিহিত সামাজিক শক্তি সক্রিয় হয়ে ওঠেনি। ক্ষমতালুব্ধ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির ষড়যন্ত্র, নবাব শিরাজদ্দৌলার আত্মীয়-অনুচরদের গোপন ও প্রকাশ্য ষড়যন্ত্রের ফলে বাংলার শাসনপ্রক্রিয়ায় নেমে আসে সীমাহীন দুর্যোগ।

বাংলার শেষ স্বাধীন নবাব শিরাজদ্দৌলার পতনের পর এ অঞ্চলে সাম্রাজ্যবাদী অপশক্তির শাসন-শোষণ শুরু হয়ে যায়। ইউরোপ থেকে সমুদ্র পাড়ি দিয়ে এদেশে ব্যবসা করতে আসা একটি অর্থনীতিনির্ভর কোম্পানি বাংলার শাসননীতির সঙ্গে জড়িত হওয়া সামান্য ব্যাপার নয়।

তবে বরাবরের মতোই এ রাজনীতি, এ ষড়যন্ত্র, পালাবদল সবকিছু পরিচালিত হয়েছে সমাজের উঁচুতলার মানুষের স্বার্থ ও প্রলোভনকে কেন্দ্র করে। এর সঙ্গে বাংলার সাধারণ মানুষের সম্পর্ক ছিল না বললেই চলে। সৈয়দ শামসুল হক অত্যন্ত নিষ্ঠার সঙ্গে নারীগণ নাটকে ইতিহাসের এই সত্যটি সুস্পষ্ট করতে সক্ষম হয়েছেন। আমিনা চরিত্রটির জবানিতে এ প্রসঙ্গটি সৈয়দ হক উল্লেখ করেছেন এভাবে :

নাকি এই রাজশক্তি আমাদের আসলে থৈরই ?

রাজপক্ষে প্রজা কেন থাকবে, দাঁড়াবে ?

কী আছে প্রজার লাভ – প্রজা মনে ভাবে।

তাই প্রজা সাধারণে এ রাজশক্তির

ভিত্তি তবে কিছুমাত্র ছিলো না কখনো ?

তাই কি মুর্শিদাবাদে যখন ক্লাইভ আসে পলাশীর পরে

মাত্র দু’শ গোৱা সৈন্য নিয়ে –

লক্ষ লোক পথের দু’পাশে দাঁড়িয়ে তামাশা দ্যাখে। (কাব্যনাট্যসমগ্র : ৪০৭)

বাংলা সাহিত্যে একাধিক নাট্যকার ঐতিহাসিক চরিত্র শিরাজদ্দৌলাকে নিয়ে নাটক রচনা করেছেন। এদের মধ্যে গিরিশচন্দ্র ঘোষ (১৮৪৪-১৯১২), শচীন্দ্রনাথ সেনগুপ্ত (১৮৯২-১৯৬১) সাঈদ আহমেদ (১৯৩১-২০১০) ও সিকান্দার আবু জাফরের (১৯১৮-১৯৭৫) নাম বিশেষভাবে উল্লেখ করা যেতে পারে।

 

নারীগণ কাব্যনাটক

 

এঁদের রচিত নাটকে উপনিবেশিত সমাজব্যবস্থায় এদেশের মানুষের পরাধীনতা, দুর্দশাময় জীবনবাস্তবতা, জাতিগত ঐক্য, ঐতিহ্যপ্রীতি ও দেশপ্রেমের প্রকাশই ছিল নাট্যকারের মৌল অন্বিষ্ট। কিন্তু সৈয়দ শামসুল হক আলোচ্য নাটকে অগ্রজ কিংবা সমকালীন নাট্যকারদের নাট্যাদর্শ অনুসরণ করেননি। তিনি নাট্যকাহিনিতে শিরাজদ্দৌলার বিরুদ্ধে প্রাসাদ ষড়যন্ত্রের অনুপুঙ্খ বৃত্তান্ত তুলে না ধরে বরং অন্দরমহলের নারীদের করুণ পরিণতি ও ভয়াবহতাকেই উপজীব্য করেছেন। এজন্য তিনি নাট্যপ্লটে ঐতিহাসিক সত্যের সঙ্গে কল্পনার অসামান্য যোগ ঘটিয়েছেন। ইতিহাসের মৌলসত্যের সঙ্গে কল্পনার মিশেলে নারীগণ হয়ে উঠেছে অনন্য স্বামী।

নবাব শিরাজদ্দৌলার পতনের পর তাঁর অন্দরমহলের নারীদের পরিণতি সম্পর্কে ইতিহাসগ্রন্থ সিয়ারুল মুতাখখেরিনের লেখক গোলাম হোসাইন তাবাতাবাইন এ প্রসঙ্গে লিখেছেন যে, শিরাজকে হত্যার পর মীরজাফর ও মীরন, তাঁর পরিবারের নারীদের কয়েকটি নড়বড়ে নৌকায় চড়িয়ে অত্যন্ত অপমানজনকভাবে জাহাঙ্গীরনগরে গৃহবন্দী হিসেবে পাঠিয়ে দেয়।

এর কিছুদিন পর মীরন জাহাঙ্গীরনগরের সে-সময়ের শাষনকর্তা যশরথ খানকে লিখিত নির্দেশ দেয় যে, তিনি যেন ঘসেটি বেগম ও আমিনা বেগমকে হত্যা করেন। কিন্তু এই সদাশয় শাসনকর্তা মুর্শিদাবাদ রাজপরিবারের নিকট তাঁর উন্নতি ও অন্নের জন্য ঋণী ছিলেন। ফলে তিনি মীরনের ঘৃণ্য নির্দেশ পালন করতে অসম্মতি জানান। পরে ঢাকার জিঞ্জিরা প্রাসাদে শিরাজের মা আমিনা বেগম ও খালা ঘসেটি বেগম দীর্ঘদিন বন্দি থাকার পর তাঁদের বুড়িগঙ্গার ডুবিয়ে হত্যা করা হয়।

তবে ইতিহাসবিদ আবুল কালাম মোহাম্মদ যাকারিয়া তাঁর পলাশির ইতিহাস বিষয়ক গবেষণাগ্রন্থ নবাব শিরাজদ্দৌলাতে বিভিন্ন যুক্তি দিয়ে প্রমাণ করেছেন যে, মীরনের হুকুমে নবাব পরিবারের নারীদের বুড়িগঙ্গায় ডুবিয়ে হত্যা করার প্রসঙ্গটি নিতান্তই ইংরেজ-মদদপুষ্ট লেখকের কল্পনাপ্রসূত।

তিনি বলেন – খুশবাগ কবরস্থানে যেহেতু ঘসেটি বেগম ও আমিনা বেগমের সমাধি রয়েছে, সেহেতু বলা যায়, বুড়িগঙ্গায় মৃত্যু হলে লাশ পাবার কথা নয়, কিংবা সেসময়ের প্রেক্ষাপটে পানিতে ডোবা মরদেহ ঢাকা থেকে তুলে এনে দীর্ঘযাত্রার পর মুর্শিদাবাদে দাফন সম্পন্ন করা প্রায় অসম্ভব।

বরং মীরজাফর পুত্র মীরনের বজ্রপাতে মৃত্যুর খবর নিয়তির বিধান হিসেবে লোকপ্রিয় করে তুলতে তার প্রেক্ষাপট হিসেবে তিনি এই কল্পগল্প সাজিয়েছেন যে, নবাব পরিবারের মৃত্যুপথযাত্রী নারীদের অভিশাপেই মীরনের বজ্রপাতে মৃত্যু হয়েছে; ইংরেজদের ষড়যন্ত্রমূলক হত্যাকাণ্ডে নয়।

আবার, সাংবাদিক-গবেষক রেহান ফজল বিবিসি নিউজের এক প্রচ্ছদ প্রতিবেদনে নবাব মহলের নারীদের পরিণতি বর্ণনা করতে গিয়ে ঐতিহাসিক করম আলির মুজফফরনামা গ্রন্থের উদ্ধৃতি দিয়ে লিখেছেন – প্রায় ৭০ জন নিরপরাধ বেগমকে একটি নৌকায় চাপিয়ে মাঝ-গঙ্গায় নিয়ে যাওয়া হয়, আর সেখানেই নৌকাটি ডুবিয়ে দেয়া হয়। শিরাজদ্দৌলার বংশের বাকি নারীদের বিষ খাইয়ে হত্যা করা হয়।

নৌকাডুবি আর বিষখাইয়ে যাদের হত্যা করা হয়, তাদের সবাইকে একই সঙ্গে নদীর ধারেই খুশবাগ নামের একটি বাগানে দাফন করা হয়। শুধু একজন বাঁচিয়ে রাখা হয়। তিনি হলেন শিরাজদ্দৌলার স্ত্রী লুৎফুন্নিসা। মীরজাফর আর তার ছেলে মীরন – দুজনেই তাকে বিয়ে করতে চেয়েছিলেন। কিন্তু লুৎফুন্নিসা পিতা-পুত্র দুজনের প্রস্তাবই এই বলে – ফিরিয়ে দিয়েছিলেন যে, প্রথমে হাতির পিঠে চড়েছি, এখন গাধার পিঠে চাপা সম্ভব নয়।’ সৈয়দ শামসুল হক আলোচ্য কাব্যনাটকে লুৎফুন্নিসার প্রতি মীরণের আকর্ষণের এ ঘটনা বর্ণনা করেছেন আমিনা বেগমের সংলাপের মাধ্যমে

কেন মীরন !

তার পিতা সিরাজের সিংহাসন পাবে।

পুত্র নেবে সিরাজের বিধবাকে –

চোখ তার বহুদিন থেকে! (কাব্যনাট্যসমধু : ৩৮৬)

মীরজাফর ও মীরনের বিয়ের প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করে যে কিংবদন্তিতুল্য সংলাপ উচ্চারণ করেছিলেন লুৎফুন্নিসা, তা নাট্যকার আলোচ্য নাটকে উপস্থাপন করেছেন। ঘসেটি যখন তাদের মুক্তির উপায় হিসেবে লুৎফাকে নতুন রাজকুমার মীরনের প্রস্তাবে রাজি হবার জন্য আকুল আকুতি জানিয়েছে, তখন লুৎফা অত্যন্ত ঘৃণাভরে সেই প্রস্তাব ফিরিয়ে দিয়ে বলেছে :

আমি রাজহস্তীর রমণী। হস্তীতে অভ্যাস যাৱ

গর্ধভের কাছে যাওয়া অসম্ভব তার। (কাব্যনাট্যসমগ্র : ৪৩০ )

তবে নবাব পরিবারের এই ট্রাজিক পরিণতির একটি ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট রয়েছে; যা বিশ্লেষণের জন্য মুর্শিদাবাদ রাজদরবার প্রতিষ্ঠার ইতিহাস জানা প্রয়োজন। ভারতে মুঘল রাজত্বের ব্যাপ্তি ও স্থিতি বিবেচনায় যদি স্বাধীন বাংলা ভূখণ্ডের কথা বিবেচনা করা হয়, তবে সেখানে দেখা যাবে বাংলা অঞ্চল ছিল মুঘলদের সুবা বা প্রদেশ।

বাংলায় নিয়োজিত সুবাদার বা নবাবরা দিল্লির মুঘল সালতনাতকে নিয়মিত খাজনা দিয়ে এ অঞ্চল শাসনের সুযোগ পেত। সম্রাট আকবর (১৫৪২-১৬০৫) যেমন পাঠিয়েছেন সেনাপতি মানসিংহকে (১৫৫০- ১৬১৪), সম্রাট জাহাঙ্গীর (১৫৬৯-১৬২৭) পাঠিয়েছিলেন ইসলাম খানকে (১৫৭০-১৬১৩), তেমনি সম্রাট আওরঙ্গজেব (১৬১৮-১৭০৭) এ অঞ্চলের সুবাদার করে পাঠিয়েছিলেন তাঁর পৌত্র আজিম উস শানকে (১৬৬৪-১৭১২); যাঁর দেওয়ান ছিলেন মুর্শিদকুলি খাঁ (১৬৬৫-১৭২৭)। এই মুর্শিদকুলি খাঁর হাতেই পত্তন ঘটে নবাব বংশের; এবং তাঁর হাতেই প্রতিষ্ঠিত হয় রাজধানীরূপে প্রতিষ্ঠা পায় মুর্শিদাবাদ ।

 

নারীগণ কাব্যনাটক

 

মুর্শিদকুলি খাঁ যখন এ অঞ্চলে আসেন, তখন বর্তমান ঢাকা বা তৎকালীন জাহাঙ্গীরনগর ছিল বাংলার রাজধানী। এসময়ে ইংরেজসহ অন্য বেনিয়ারা ব্যবসার জন্য হুগলি বন্দর ব্যবহার করতো; তাদের ব্যবসার পসার ছিল ভাগীরথী ও গঙ্গাতীরবর্তী অঞ্চলে। ফলে মুর্শিদকুলি নিজস্ব দপ্তর ঢাকা থেকে তৎকালীন মনসুরাবাদে স্থানান্তর করেন; এবং সম্রাট আওরঙ্গজেবকে নিজস্ব কর্মদক্ষতা দ্বারা বিপুল রাজস্ব পাঠান।

সম্রাট তাঁর বাংলার ভূমিব্যবস্থাপনা ও কর কাঠামো সংস্কারের দক্ষতা দেখে, তাঁকে পদোন্নতি দিয়ে বাংলার শাসনব্যবস্থার প্রধান বা নাজিম করে পাঠান। অর্থাৎ প্রশাসন ও রাজস্ব দুটোই তখন মুর্শিদকুলির হস্তগত হয়। তিনি তখন সর্বক্ষমতার অধিকারী হয়ে নবাব পদ অলঙ্করণ করেন এবং তাঁর নিজের নাম অনুসারে রাজধানীর নাম রাখেন মুর্শিদাবাদ ।

মুর্শিদকুলি খাঁ একজন উত্তম শাসক ছিলেন। তিনি বাংলার অর্থব্যবস্থা ও প্রশাসনিক কাঠামোকে ঢেলে সাজান। তাঁর মৃত্যুর পর বাংলায় তাঁর উত্তরাধিকার নিয়ে দ্বন্দ্ব দেখা দেয়। তিনি ছিলেন অপুত্রক। ফলে তিনি তাঁর প্রিয় পৌত্র সরফরাজ খাঁকে (১৭০০-১৭৪০) বাংলার মসনদের উত্তরাধিকার মনোনীত করে যান। কিন্তু সরফরাজের পিতা উড়িষ্যার সুবেদার সুজা উদ্দিন মুহম্মদ খান (১৬৭০-১৭৩৯) পুত্রকে সরিয়ে বাংলার স্বঘোষিত নবাব হন।

সরফরাজ তখন স্থানীয় শেঠ ও পদস্থদের পরামর্শে পিতার সঙ্গে দ্বন্দ্বে না গিয়ে তার শাসন মেনে নেন। উল্লেখ্য যে, সুজাউদ্দৌলার প্রাক্তন প্রশাসনে উচ্চপদে অধিষ্ঠিত ছিলেন পারস্য বংশদ্ভুত আলিবর্দি খাঁ (১৬৭১-১৭৫৬) ও তাঁর বড় ভাই হাজী আহমেদ।

সুজাউদ্দৌলার নবাবি পদপ্রাপ্তির সাথে সাথে তাঁরাও তখন রাজধানীতে এসে প্রশাসনের উচ্চ পদে অধিষ্ঠিত হন। সুজাউদ্দৌলার মৃত্যুর পর এবার যখন তাঁর ছেলে সরফরাজ সিংহাসনে বসেন, তখন বিহারের সুবাদার পদে কর্মরত আলিবর্দি খা গিরিয়ার যুদ্ধের (১৭৪০) মাধ্যমে তাঁকে পরাজিত ও হত্যা করে মুর্শিদাবাদ ও সিংহাসন দখল করেন। অর্থাৎ মুর্শিদাবাদে রক্তপাতের মাধ্যমে ক্ষমতাদখলের সংস্কৃতি তখন থেকেই শুরু হয়। ভারতচন্দ্র রায়গুণাকর (১৭১২-১৭৬০) তাঁর অন্নদামঙ্গল কাব্যে (১৭৫২)-র গ্রন্থসূচনায় এ বাস্তবিক ইতিহাস তুলে ধরেছেন নিম্নরূপে :

সুজা খাঁ নবাবসুত সরফরাজ খাঁ।

দেওয়ান আলমচন্দ্র রায় রায় রায়াঁ।

ছিল আলীবর্দি খাঁ নবাব পাটনায়।

আসিয়া করিয়া যুদ্ধ বধিলেক তায় ॥

তদবধি আলিবর্দি হইলা নবাব ।

মহাবদজঙ্গ দিল পাসা খেতাব। (অন্নদামঙ্গল, গ্রন্থসূচনা।) ‘

আলিবর্দি খাঁ রক্তাক্ত অভ্যুত্থান ও কূটকৌশলের মাধ্যমে বাংলার মসনদে অধিষ্ঠিত হয়েছিলেন। তাঁর অধীন কর্মচারী মীরজাফর আলী খাঁ (১৬৯১-১৭৬৫) ছিলেন সেই ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শী। ফলে পরবর্তীকালে নবাব শিরাজদ্দৌলাকে ষড়যন্ত্রের মাধ্যমে মসনদচ্যুত করতে তার বিবেকে এতটুকু বাধেনি। এ যেন আলিবর্দি কর্তৃক নিরপরাধ নবাব সরফরাজ হত্যার বিপরীতে প্রকৃতির প্রতিশোধ। ইতিহাসবিদ অক্ষয়কুমার মৈত্রেয় মীরজাফরের উপর আলিবর্দির অবৈধভাবে সিংহাসন দখলের ঘটনার প্রভাব নিয়ে লেখেন :

আলিবন্দীর এই অসাধু ব্যবহারে মীরজাফর যাহা শিক্ষালাভ করিলেন, তাহা আর ইহজীবনে বিস্মৃত হইলেন না। তিনি বুঝিলেন, সিংহাসন লাভের জন্য বিশ্বাসঘাতকতা বা প্রভুহত্যা করা নিন্দনীয় নহে! ষড়যন্ত্র ও বাহুবলে একবার আত্মকার্য্য সাধন করিতে পারিলেই হইল, তাহার পর সে কথা লইয়া লোকে উচ্চবাচ্য করিবার অবসর পায় না।

তবে অবৈধ উপায়ে ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত হলেও নবাব আলিবর্দি খাঁ একজন দক্ষ ও মানবিক প্রশাসক ছিলেন।

ফলে তাঁর আমলে বাংলার অর্থনীতি অপেক্ষাকৃত স্থিতিশীল থাকে। কিন্তু তিনিও নিষ্কণ্টক উপায়ে শাসন
পরিচালনা করতে পারেননি। বার বার তাঁকে মারাঠা দস্যু বা বর্গিদের প্রতিহত করতে হয়েছে, আফগান
সেনাদের বিদ্রোহ দমন করতে হয়েছে। তিনি কখনো সন্ধির মাধ্যমে, কখনো যুদ্ধজয় করে এসকল বিদ্রোহ ও
অরাজকতা দমন করেন। ঐতিহাসিক সুশীল চৌধুরী এ বিষয়ে তাঁর পলাশীর অজানা কাহিনী গ্রন্থে লিখেছেন :

আলিবর্দির রাজত্বের প্রথম দিকে প্রায় দশ বছর ধরে (১৭৪২-৫১) মারাঠারা প্রায় প্রত্যেক বছর বাংলা আক্রমণ ও লুঠ করতে অভিযান চালিয়েছে। তা ছাড়া এ সময় আফগান বিদ্রোহও হয়। আফগানদের দমন করে ও মারাঠাদের সঙ্গে সন্ধি (১৭৫১) করার পর আলিবর্দি দেশের ও প্রজাদের উন্নতিকল্পে বিশেষ যত্নবান হন ও সেদিকে সতর্ক দৃষ্টি দেন।

সৈয়দ শামসুল হক এই ঐতিহাসিক সত্য নারীগণ নাটকে উপস্থাপন করেছেন শরিফা ও আমিনা চরিত্রের পারস্পরিক সংলাপে। আলিবর্দির স্ত্রী শরিফা বেগম এ রাজনৈতিক ক্রান্তিকালে মহলের নারীদের দুঃখ সামলে ওঠার জন্য পরামর্শ দিতে গিয়ে স্মৃতিচারণ করে বলেছে :

বর্গির হামলার কথা মনে নেই ?

মহারাষ্ট্র থেকে বালাজি রগুজি আর

ভাস্কর পণ্ডিত বর্গিদস্যুদল নিয়ে

উড়িষ্যার গিরিনদ বীরভূম বিষ্ণুপুর অতিক্রম করে

কীভাবে বাংলার বুকে নেমে আসে ঘোড়ায় সোয়ার !

[…] দীর্ঘ এ জীবনে

অনেক অনেক যুদ্ধ দেখে দেখে বার্ধ্যক্যে পৌঁছেছি,

বর্গির বিরুদ্ধে যুদ্ধ

পাটনায় আফগান বিদ্রোহ দমনে যুদ্ধ, […]

পরাজয় কখনো মানিনি। (কাব্যনাট্যসমগ্র : ৩৮৪)

অন্যদিকে, মুর্শিদকুলির মতো আলিবর্দি খানও অপুত্রক ছিলেন। তিনি নিজের তিন কন্যাকে বড়ভাই হাজি আহমেদের তিন ছেলের সঙ্গে বিবাহ দেন। তাঁর বড়কন্যা ঘসেটি বেগম বা মেহেরুন্নেসাকে জ্যেষ্ঠভ্রাতার জ্যেষ্ঠপুত্রের সঙ্গে বিয়ে দিয়ে মতিঝিল প্রাসাদে পাঠান; আর কনিষ্ঠ পুত্রের সঙ্গে বিয়ে দেন শিরাজের মাতা আমিনাকে।

 

নারীগণ কাব্যনাটক

 

কিন্তু পাটনার সুবেদার থাকাকালে আলিবর্দির ভাই হাজি আহমেদ ও ভ্রাতুষ্পুত্র জৈনুদ্দিন আহমদ অর্থাৎ আমিনার শ্বশুর এবং স্বামী আফগান বিদ্রোহীদের হামলায় অকালে মারা যান। তখন সপুত্রক আমিনা পুরোপুরিই আলিবর্দির আশ্রিতা হয়ে পড়েন। আমিনা চরিত্রটির সংলাপে এ ঐতিহাসিক সত্যের উল্লেখ করেছেন সৈয়দ শামসুল হক। আমিনা তার হত্যভাগ্য অতীত ইতিহাস স্মরণ করে পুত্রবধূকে উদ্দেশ্য করে সান্ত্বনার সুরে বলেছেন:

পাথরে তো নয়, রক্ত মাংস দিয়ে গড়া,

রূপ যার আকাশের আদম সুরত –

আমি সেই স্বামী, তোর শ্বশুরকে হারিয়েছি

পাটনায় এক রাষ্ট্রবিদ্রোহের কালে।

আফগান ঘাতকের হাতে তার শিরোচ্ছেদ হয়। (কাব্যনাট্যসমগ্র : ৩৯৮)

আবার শরিফা চরিত্রটিও আমিনার সঙ্গে কথাপ্রসঙ্গে এ ঐতিহাসিক ঘটনার কথা উল্লেখ করে বলেছেন :

আমার ভাণ্ডর, হাজী আহমদ খান তোর শ্বশুর, আমিনা,

তারও মৃত্যু হয়েছিলো ঘাতকের হাতে

সেই একই পাটনা বিদ্রোহে। (কাব্যনাট্যসমগ্র : ৩৯৮)

শিরাজের বড়ো খালা ঘসেটি বেগম নিজেও ছিলেন সন্তানহীন। শিরাজের মধ্যম ভ্রাতা ইকরামুদ্দৌলাকে তিনি দত্তক নিয়েছিলেন। অন্যদিকে আমিনার জ্যেষ্ঠপুত্র শিরাজের জন্মের পরপরই আলিবর্দির ব্যাপক উন্নতি ঘটে। তাই অপুত্রক আলিবর্দী খুশির আতিশয্যে নাতিকে দত্তক নেন এবং পুত্রবৎ আদর ও প্রশ্রয় দিয়ে বড় করেন। করম আলী রচিত ইতিহাসবিষয়ক গ্রন্থ মুজাফ্ফরনামার সূত্রদিয়ে ঐতিহাসিক সুশীল রায় এ বিষয়ে লিখেছেন :

আলিবর্দী সিরাজের জন্ম থেকেই তাঁর প্রতি এমন স্নেহান্ধ ছিলেন যে এক মুহূর্তের জন্যও তাঁকে কাছছাড়া করতেন না। তিনি তাঁকে রাষ্ট্রনীতি, শাসনকার্য ও শাসক-অভিজাত জীবনের নানা গুণাবলি শেখাতেন। সিরাজের প্রতি তাঁর স্নেহ এমনই অন্ধ ছিল যে সিরাজের সমস্ত অপকীর্তিকে তিনি যেন দেখেননি বা শোনেননি এমন ভাব করতেন। […] সিরাজের চিন্তা ছাড়া তাঁর একটি মুহূর্তও কাটত না। ‘

মাতামহ আলিবর্দি খার অতিরিক্ত প্রশ্রয় ও সমর্থনে কিশোর সিরাজ প্রথম জীবনে কিছুটা উচ্ছৃংখল জীবন যাপনে অভ্যস্ত হয়ে পড়েন। এসময়ে মন্দস্বভাবের নানান বন্ধু-বান্ধব জুটে যায় তার। এ-অবস্থায়ও আলিবর্দি তাকে ভাবী নবাব কল্পনা করে রাজ্যের গুরুত্বপূর্ণ পদে অভিষিক্ত করেন।

এমনকি আলিবর্দি নিজের সঙ্গে শিরাজকে বিভিন্ন যুদ্ধযাত্রায় নিয়ে যান ভাবী নবাব হিসেবে যুদ্ধ-অভিজ্ঞতা অর্জনের জন্য। কিশোর-বয়সেই তিনি শিরাজকে ঢাকার নৌবাহিনীর প্রধান করেছেন, আবার রাজ্যশাসনের অভিজ্ঞতা সঞ্চয়ের জন্য তাকে গুরুত্বপূর্ণ একটি অঞ্চলের সুবাদার করেও পাঠিয়েছেন।

একদিকে কিশোর শিরাজের স্বেচ্ছাচারী আচরণ এবং অন্যদিকে তার প্রতি নানা আলিবর্দির অকুণ্ঠ সমর্থনে আত্মীয়-স্বজন যারপরনাই অসন্তুষ্ট ছিলেন; যা আরও প্রকট হয়ে পড়ে আলিবর্দি কর্তৃক শিরাজকে নবাবরূপে মনোনীত করার পর। আবার, ঘসেটি বেগম চেয়েছিলেন তাঁর পালকপুত্রকে নবাব পদে অভিষিক্ত করতে।

অন্যদিকে, সিরাজের মেজো খালা মোমেনা বেগমের ছেলে পুর্ণিয়ার নবাব শওকত জং-ও চেয়েছেন নবাব হতে। আলিবর্দি বেঁচে থাকতেই ভেতরে ভেতরে ক্ষমতা দখলের এই  উচ্চাভিলাষ ও ষড়যন্ত্র শুরু হয়ে যায়। ঘসেটির জীবনে এসময়ে দুটো অপ্রত্যাশিত ঘটনা ঘটে। একদিকে তাঁর পালকপুত্র ইকরামুদ্দৌলা বসন্তরোগে মারা যায়, অন্যদিকে স্বামী নওয়াজিশ মুহম্মদ খানকে অকালে হারিয়ে তিনি বৈধব্য বরণ করেন।

ঘসেটির ইচ্ছে ছিল পালকপুত্রকে ক্ষমতায় বসিয়ে রাজমাতা হবেন। কিন্তু ছেলের অকাল মৃত্যুতে সে আশা ব্যর্থতায় পরিণত হয়। তাঁর স্বামীর দুই ঘনিষ্ঠ সহচর ছিলেন হোসেনকুলি খাঁ ও বিক্রমপুরের রাজা রাজবল্লভ। জনশ্রুতি আছে যে, ঘসেটি বেগমের সঙ্গে এদের নীতিবিরুদ্ধ ঘনিষ্ঠতা ছিল, ‘ বিশেষ করে হোসেনকুলি খাঁর বীরত্ব ও ব্যক্তিত্বে ঘসেটি বিশেষ মুগ্ধ ছিলেন।

একথা অবগত হয়ে রাজমহলের সম্মান রক্ষার্থে, নানা আলিবর্দির আদেশে হোসেনকুলি খাঁ-কে শিরাজ প্রকাশ্য দিবালোকে তরবারির আঘাতে হত্যা করে। আলোচ্য কাব্যনাটকে নাট্যকার এ ঐতিহাসিক ঘটনার বিবরণ তুলে ধরেছেন শিরাজের মাতা আমিনার একটি সংলাপের মাধ্যমে

ঘসেটির বিবরণ আরো মনে করাবো কি ?

স্বামী বেঁচে থাকতেই উপপতি!

খুন হয় হোসেনকুলী যে, কেন হয় ?

তার সঙ্গে ঘসেটির অন্তরঙ্গ সম্পর্কের কারণে

এমন কি স্বামী বেঁচে থাকতেই!

আলিবর্দী বংশের মর্যাদা নষ্ট, লোকনিন্দা, বাজারে গুজব

শুনে শুনে দেখে দেখে বিচলিত হয়েছে শিরাজ।

খালাকে সে শাসন করেছে। […]

ঘসেটির বসবাস মতিঝিল থেকে তুলে আনে এই হীরাঝিলে। […]

হোগেনবুলীকে করে খঞ্জরে খতম। (কাব্যনাট্যসমগ্র: ৩৯৭)

এই ঘটনার পর ঘসেটি শিরাজের ওপর ভীষণ ক্ষিপ্ত হন। তিনি উত্তরাধিকারের লড়াইয়ে শওকত জঙ্গকে সমর্থন করতে থাকেন। আবার অন্য একটি সূত্র বলছে – শওকত জঙ্গকে নয়, বরং নিজ পোষ্যপুত্রের রেখে যাওয়া শিশু-সন্তান মুরাদুদ্দৌলাকে নিয়ে তিনি ক্ষমতাহরণের স্বপ্ন দেখেন।

 

নারীগণ কাব্যনাটক

 

‘ সৈয়দ হক অবশ্য দ্বিতীয়সূত্রটি অনুসরণ করে শরিফা চরিত্রের সংলাপে নিম্নোক্ত তথ্য জ্ঞাপন করেছেন :

ভুলি নি ঘসেটি তার পোষ্যপুত্রটিকে একদিন

চেয়েছিলো নবাব বানাতে।

অকালে প্রয়াত হলে স্বামী কোনো সন্তান না রেখেই –

[…] হঠাৎ অকালে মৃত্যু হলে পোষ্যপুত্রটির, তারই শিশুটিকে

কেন কাছে টেনে নেয় আবার ঘসেটি ?

শিরাজের বিরুদ্ধে সে বদ প্রচারণা করে –

শিরাজ মদ্যপ, বেয়াদব, ক্ষমতার সীমাহীন দর্প তার,

অযোগ্য শাসকরূপে শিরাজকে প্রমাণ করতে।

আশা ছিলো শিরাজের পতন ঘটবে,

নাবালক পোষ্যনাতী পাবে সিংহাসন –

নারী লোলুপ শিরাজ। কেন বলে ?

পর্দার আড়ালে থেকে নবাবিটা ঘসেটি করবে। (কাব্যনাট্যসমগ্র : ৩৯৬) পলাশির ট্রাজিক ঘটনার অন্যতম খলনায়ক মীরজাফর আলী খান ছিলেন আরববংশীয় দাস। এদেশে এসে আলিবর্দির শাসনামলে তার প্রতাপ-প্রতিপত্তি ঘটে। কিন্তু আলিবর্দির আমলেও সে নানান প্রতারণামূলক কাজে অংশ নেয়, যার ফলে সেসময়ে তাকে একাধিকবার পদচ্যুতও হতে হয়। কিন্তু নানা উপায়ে সে আবার আলিবর্দির মন ভুলিয়ে ক্ষমতায় টিকে যায়।

শিরাজ ক্ষমতায় বসার পর তার উপর রুষ্ঠ হয়ে তাকে একবার পদচ্যুতও করেন ; কিন্তু সম্ভাব্য সেনাবিদ্রোহের আশঙ্কা করে তরুণ নবাব তাকে পুনরায় নিজ পদ ফিরিয়ে দিতে বাধ্য হন। আবার, নবাবসুলভ অহম ও রাজনৈতিক দূরদর্শিতার অভাবে বন্ধুপ্রতিম ফরাসি কুঠিয়ালদের সহায়তা নিয়ে ইংরেজ কুঠিয়ালদের উদ্ধত আচরণ দমন করতে ব্যর্থ হন শিরাজ।

তবে শিরাজদ্দৌলা এসময়ে দেশি-বিদেশি ষড়যন্ত্রের চালচিত্র অনুধাবনে ব্যর্থ হলেও, কিছুটা আন্দাজ করে নিতে পারেন যে, ইংরেজ বেনিয়াদের পাশাপাশি তাঁর অমাত্য ও ব্যবসায়ীরা তাঁর সঙ্গে যেকোনো মুহূর্তে প্রতারণা করতে পারেন। ফলে পলাশির চূড়ান্ত যুদ্ধের পূর্বে তিনি এদের রাজদরবারে ডেকে এনে যার যার ধর্মগ্রন্থ ছুঁয়ে শপথ করিয়ে নেন।

এসময় প্রধান সেনাপতি মীরজাফর পবিত্র কুরআন শরিফ ছুঁয়ে শপথ করেন যে, তিনি শেষ রক্তবিন্দু উৎসর্গ করে হলেও নবাবের সাথে থাকবেন। অন্যরাও যার যার ধর্মগ্রন্থ স্পর্শ করে শপথ করেন। কিন্তু প্রত্যেকেই উপযুক্ত সময়ে তাদের শপথ ভঙ্গ করে তরুণ নবাবের সঙ্গে বেইমানি করেছেন। সৈয়দ শামসুল হক ইতিহাসের এই ঘৃণ্যতম বিশ্বাসঘাতকতার ঘটনা উল্লেখ করেছেন কুতুবের নিম্নোক্ত সংলাপের মাধ্যমে :

মীরজাফর আলী খান সিপাহ সালার আজম

যুদ্ধ নয় যুদ্ধ পরিচালনার অভিনয় করে, একদিকে

গত রমজান মাসে, ভাও শবে কদরের রাতে,

শিরাজের কাছে তার কোরান শপথ, জানবাজি লড়বে সে, অন্যদিকে ক্লাইভের সঙ্গে তার গুপ্তচুক্তি – নিষ্ক্রিয় থাকার। এভাবে নিশ্চিত করা শিরাজের পরাজয়। চুক্তি আসলে,

মীরজাফরকে দেয়া হবে শিরাজের শূন্য সিংহাসন। ( কাব্যনাট্যসমগ্র : ৩৭৪ )

উল্লেখ্য যে, ২৩ জুন ১৭৫৭ সালে সংঘটিত পলাশির যুদ্ধে নবাব শিরাজের পক্ষে সৈন্যসংখ্যা ছিল পঞ্চাশ হাজারের মতো। অন্যদিকে, ইংরেজ সেনাছাউনিতে মাত্র দুই-তিন হাজার সৈন্য ছিলো। অস্ত্র, কামান গোলাবারুদ সবদিক দিয়েই শিরাজবাহিনী ছিল এগিয়ে। তবু তিনি পরাজিত হয়েছেন দুটি কারণে : প্রথমত, তাঁর সেনাপ্রধান মীরজাফর ও অপর সেনানায়ক রায়দুর্লভসহ অন্যদের আয়ত্তে থাকা প্রায় ৪৫০০০ সৈন্য সেদিন কার্যত কোনো যুদ্ধ করেনি।

তারা পালন করেছিল নিষ্ক্রিয় পর্যবেক্ষকের ভূমিকা। অপরদিকে মোহনলাল, মীরমদান ও শিরাজের বন্ধুপ্রতিম ফরাসি সেনানায়কের অধীনে থাকা প্রায় ৫০০০ সেনা বীর-বিক্রমে লড়াই করে ইংরেজদের প্রায় পরজিত করে ফেলেছিল। কিন্তু এসময়ে অপ্রত্যাশিতভাবে বৃষ্টি হলে শিরাজের গোলাবারুদ ভিজে নিষ্ক্রিয় হয়ে যায়। তবুও শিরাজের অনুগত সৈন্যরা হাতে হাতে লড়াই করে প্রবল পরাক্রমে ঝাঁপিয়ে পড়ে ইংরেজদের উপর।

এমতাবস্থায় ইংরেজদের গোলার আঘাতে মীরমদান ও ফরাসি সেনানায়কের মৃত্যু হলে শিরাজবাহিনী বিক্ষিপ্ত হয়ে পড়ে। শিরাজ এসময়ে নিরুপায় হয়ে মীরজাফরের কাছে সাহায্যের জন্য করুণ আকুতি জানান। কিন্তু নবাবির স্বপ্নে বিভোর মীরজাফর তখনও তার বিশ্বাসঘাতকতা বজায় রেখে তাকে উল্টো পরামর্শ দেন – সেদিনকার মতো যুদ্ধ বন্ধ রাখতে।

মোহনলাল এতে রাজি না হলেও নবাবের ক্রমাগত – অনুরোধে যেই তিনি যুদ্ধক্ষেত্র থেকে সরে আসতে থাকেন – তখনই ইংরেজ সৈন্যরা উপর্যুপরি আক্রমণে তাদের ছিন্নভিন্ন করে ফেলেন। অনন্যোপায় শেরাজ পরাজয় বরণ করেন; জয়ী হন ক্লাইভ-মীরজাফরের যৌথ ৰাহিনী ।

 

নারীগণ কাব্যনাটক

 

প্রকৃতপক্ষে এটিই ছিল ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির এককভাবে এ উপমহাদেশ শাসনের প্রথম ধাপ। ক্ষমতাগ্রহণ করলেও একদিকে স্থানীয় জনবিদ্রোহের আশঙ্কা, অন্যদিকে দিল্লির মুঘলদের অনুমতির প্রয়োজনে তারা ‘ধীরে চলো’ নীতি নিয়ে অগ্রসর হয়েছে। যে কারণে ২৪ জুন ১৭৫৭ সালে লেখা এক চিঠিতে সে মীরজাফরকে নবাব সম্বোধন করে অভিনন্দিত করে লিখেছে :

I congratulate on the victory which is yours, not mine. I should be glad if you would join me with the utmost expendition. We propose marching tomorrow to complete the conquest [ … ] I hope to have the honour of proclaiming you Nabob.

মীরজাফরের পর যাঁরা নবাবপদে অধিষ্ঠিত ছিলেন তারা সবাই ছিলেন ব্রিটিশ কোম্পানির হাতের পুতুলমাত্র। বেশ কয়েকবছর তাঁরা কেবলই সিংহাসনে আসা-যাওয়ার মধ্যে ছিলেন। কেউই ঋজু ব্যক্তিত্ব নিয়ে দাঁড়াতে পারেননি। যেকারণে সৈয়দ শামসুল হক এ-অবস্থাকে আলোচ্য নাটকে ‘বারাঙ্গনা সিংহাসন’ বলে মন্তব্য করেছেন।

নবাব শিরাজদ্দৌলা পরাজয় নিশ্চিত জেনে এসময়ে নিজ ছাউনি থেকে কোনোমতে পালিয়ে রাজধানী রক্ষার উদ্দেশ্যে বেরিয়ে পড়েন। উটের পিঠে চেপে এক রাতের মধ্যেই তিনি ৫০ মাইল পথ পাড়ি দিয়ে রাজধানীতে উপস্থিত হন। কিন্তু সেখানে এসে তিনি তেমন কারো সহযোগিতাই পাননি।

সাধারণ জনগণ বরং শিরাজের পতনের খবর শুনে ভীতসন্ত্রস্ত হয়ে বিজয়ী লুটেরাদের সম্ভাব্য আক্রমণ থেকে বাঁচতে দলে দলে রাজধানী ত্যাগ করতে থাকে। শিরাজের শ্বস্ত্রের ইরেজ খানও এ সময়ে পালিয়ে যান। এ নাটকে ঐতিহাসিক এ ঘটনার বর্ণনা নাট্যকার উল্লেখ করেছেন এভাবে :

বিনা যুদ্ধে পরাজিত বাংলার নবাব ।

নবাব শিরাজদ্দৌলা পলাশীর মাঠ ত্যাগ করে

রাজহস্তির সোয়ার হন, পরদিন শুক্রবার

দিবসের দ্বিতীয় প্রহরে

তিনি রাজধানীতে ফেরেন। […]

তাঁর সময় যে কম! পুনরায় যুদ্ধ চাই নতুন উদ্যমে।

অবিলম্বে রাজকোষ খুলে দেন তিনি।

জুম্মার মিছিলে তিনি পথে পথে ঘোষণা করান –

তরুণ জোয়ান এসো, অগ্রিম মাহিনা নাও, যুদ্ধ সাজ পরো। […]

কিন্তু কেউ এগিয়ে এলো না,

দাঁড়ালো না শিরাজের পাশে।

[…] বিপন্ন সময়ে কেউ আত্ম ছাড়া চেনে না অপৱ! –

শ্বশুর ইরিচ খান মিষ্টবাক্যে তুষ্ট করে সরে পড়লেন –

তবে সরে পড়বার আগে

রাজকোষ তিনিও দু’হাতে লুট করলেন যতটা পারেন ।

নগরে যে বাজে লোকজন আর সিপাহীরা ছিলো

তারাও দুহাতে নিলো সিক্কা টাকা সোনার মোহর।

কিন্তু যুদ্ধসাজে তারা সজ্জিত হলো না। […]

রাজকোষ নিঃশেষিত রাত্রির আগেই। ( কাব্যনাট্যসমগ্র : ৩৭৫)

শিরাজ নতুন করে লড়াইয়ের জন্য তখন ফরাসি কুঠির প্রধান জাঁ ল-এর সাহায্য প্রার্থনায় পাটনায় যাবার জন্য স্ত্রী-সন্তানসহ গোপনে বেরিয়ে পড়েন। কিন্তু লোকশ্রুত আছে যে, দান শাহ – নামক এক ফকির বিশ্বাসঘাতকতা করে শিরাজের অবস্থানের কথা রাজধানীতে বিরুদ্ধপক্ষের নিকট পৌঁছে দেয়। ফলে শিরাজ পত্নীকন্যাসমেত অচিরেই মীরকাসিমের হাতে ধৃত হয়ে বন্দী অবস্থায় মুর্শিদাবাদে নীত হন।

নাট্যকার আলোচ্য নাটকে এসব ঘটনার প্রায় অনুপুঙ্খ বর্ণনা করেছেন। তবে এ অংশে তাঁর পূর্ববর্তী নাট্যকারগণের অনুসরণে তিনিও ইতিহাসের সামান্যসূত্রকে কল্পনার রঙে রঞ্জিত করে আবেগাত্মক ভঙ্গিতে পাঠক-দর্শকের সম্মুখে উপস্থাপন করেছেন :

বজরায় নয়, পানসীতে নয়,

বাংলার নবাব আজ হাটুরের সামান্য নৌকায়। […]

পাঁচদিন একটানা চলবার পর

কালিন্দীর তীরে নবাব শিরাজদ্দৌলা

কাহপুর গ্রামে থামলেন ক্ষুধার আহার্য খোঁজে ।

পিপাসায় মৃতপ্রায় পত্নী লুৎফা, দুধ বিনা কোলের কন্যাটি।

তীরে এক ফকিরের আস্তানায় খাদ্যভিক্ষা করলেন তিনি। […]

দানশা ফকির! পশ্চাৎ ধাবনকারী মীরকাশেমের কাছে

নবাবের সংবাদ পাঠায়। …..

শিরাজেরই অনুগ্রহে জায়গীরভোগী যে কাশেম,

শিরাজকে সে-ই বন্দী করে,

সাধারণ কয়েদীর বেশে তাঁকে পাঠায় মুর্শিদাবাদে।

এরই নাম কৃতজ্ঞতা বটে ! (কাব্যনাট্যসমগ্র : ৩৭৭)

বলাবাহুল্য, এসময়ে ইংরেজদের পরামর্শে মীরজাফর জনগণের মধ্যে নিজ ক্ষমতা প্রদর্শনের নিমিত্তে রাজনিয়মে পশমি রুমালে বন্দী শিরাজকে না বেঁধে লৌহশৃঙ্খলে বন্দী করে মুর্শিদাবাদে আনে। এরপর মীরজাফরের পুত্র ১৭ বছরবয়সী মীরনের নিদের্শে মোহাম্মদী বেগের হাতে বাংলার নবাব নির্মমভাবে শহিদ হন। পলাশি গ্রামের এক নিরক্ষর কবির কবিতায়ও এ নিমর্ম ঘটনার চিত্র ফুটে উঠেছে নিম্নরূপে :

নবাব কান্দে সিপাই কান্দে আর কান্দে হাতী।

কলকাতায় বসে কান্দে মোহনলালের পুতি ॥

দুধে ধোয়া কোম্পানির উড়িল নিশান।

মীরজাফরের দাগাবাজিতে গেল নবাবের প্রাণ।

নাটকের শেষে কুতুব চরিত্রের সংলাপের মাধ্যমে উপস্থাপিত ঘটনাংশ নাট্যকার অত্যন্ত আবেগের সঙ্গে রচনা করেছেন। বস্তুত, ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনের সময় থেকে শিরাজ এবং মুর্শিদাবাদের ট্রাজিক ঘটনা বাঙালির আবেগ-বেদনার সঙ্গে মিশে আছে। ফলে সৈয়দ শামসুল হক নাটকে সেই আবেগটিকে ধরে রাখতে চেয়েছেন নাট্যরস ও নাট্যাবেগ সৃষ্টির প্রয়োজনে। তবে তিনি ইতিহাসের বাস্তবতাকে কখনো অস্বীকার করে যাননি। এ ঘটনার সঙ্গে মিলিয়ে দিয়েছেন ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্টে সংঘটিত ধানমণ্ডির ট্রাজিক ঘটনার সঙ্গে।

 

নারীগণ কাব্যনাটক

 

বঙ্গবন্ধু এবং রক্তাক্ত ও শোকাবহ পঁচাত্তর যে নাট্যকারের অন্তরে গভীরভাবে প্রোথিত এটি তার প্রমাণ । যেমন :

এখনি দেখতে পাই আরো দুটি শতাব্দীর পরে

আরো এক হত্যা হবে এই বাঙ্গালায়।

সেদিনও রাস্তায় লোক দাঁড়িয়ে থাকবে

সেদিনও রাস্তায় লোক নিশ্চেষ্ট নিশ্চল।

সেদিনও অনেকে যাবে ঘাতকের কাছে –

রোষে নয়, প্রতিরোধ প্রতিশোধে নয় –

ক্ষমতার অংশ নিতে রাষ্ট্রক্ষমতার।

হত্যা তো কেবল হত্যা করলেই নয় –

আলিঙ্গন করা হত্যাকারীকে তো এক অর্থে হত্যাই নিশ্চয়। (কাব্যনাট্যসমগ্র : ৪৩১ )

এখানে সহজেই অনুধাবন করা যাচ্ছে যে, ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট বাঙালি জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে সপরিবারে নির্মমভাবে হত্যার মাধ্যমে যে ন্যাক্কারজনক ইতিহাস রচনা করতে চেয়েছিল, নাট্যকার সেই ঘটনাকে বিগত ইতিহাসের সঙ্গে সূত্রবদ্ধ করতে প্রয়াসী হয়েছেন; এবং একজন দেশপ্রেমিক নেতার মৃত্যুতে প্রতিবাদ-প্রতিরোধের পরিবর্তে জনগণের একই নির্লিপ্ত অবস্থানকে নিন্দা করেছেন। তবে সবচেয়ে বেশি আঘাত করেছেন সমাজের সেই শ্রেণিকে যারা ক্ষমতালোভে মত্ত হয়ে ন্যায় অন্যায়বোধ বিসর্জন দিয়ে ঘাতকের সঙ্গে হাত মেলায়। তাঁর মতে, হত্যাকারীকে মদদ দেওয়াও একধরনের হত্যাকাণ্ড।

স্বাধীন বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে দেখা গেছে, পনেরো আগস্টের পর বাংলাদেশের রাষ্ট্রক্ষমতায় যারা বসেছে তারা প্রত্যেকেই বঙ্গবন্ধুর হত্যার বিচারের বদলে তাঁর ঘাতকদের পুরস্কৃত করেছে নানান সরকারি সুযোগ-সুবিধা প্রদান করার মাধ্যমে। অন্যদিকে বঙ্গবন্ধু তনয়ারা থেকে গেছে দেশের বাইরে চরম অবহেলা আর আশংকাময় অবস্থায়। এমনকি শাসকগোষ্ঠী সংবিধান বদলে আইন করে বঙ্গবন্ধু হত্যার বিচার দীর্ঘকাল বন্ধ করে রেখেছে। সৈয়দ শামসুল হক সে প্রসঙ্গটিই এখানে উত্থাপন করেছেন।

কেবল শিরাজকেই নয়, পরবর্তীকালে অত্যাচারী মীরন একে একে তাঁর পরিবারের অন্য সদস্যদেরও নিমর্মভাবে হত্যা করে। মহলের নারীরা দীর্ঘদিন বন্দি থাকে ঢাকার কেরানীগঞ্জস্থ জিঞ্জিরা প্রাসাদে। এরপর ১৭৬৫ সালে ক্লাইভের সহায়তায় লুৎফুন্নিসা তাঁর কন্যাসহ মুর্শিদাবাদ ফিরে যান এবং কোম্পানি-প্রদত্ত সামান্য মাসোহারায় করুণ জীবনযাপন করে ১৭৯০ সালে মৃত্যুবরণ করেন।

অবশ্য শিরাজকে সিংহাসনচ্যুত করে ষড়যন্ত্রের মাধ্যমে যারা ক্ষমতায় বসেছে প্রকৃতির বিচারে তারা কেউই শেষপর্যন্ত টিকে থাকতে পারেননি। বিশ্বাসঘাতক মীরজাফর ইংরেজদের হাতের পুতুল হয়ে কিছুকাল রাজত্ব করলেও অনতিকাল পরেই ইংরেজদের রোষে পড়ে সিংহাসনচ্যুত হন। পরে আবার অল্পসময়ের জন্য সিংহাসন ফিরে পেলেও কুষ্ঠরোগে ভুগে নির্মম মৃত্যু হয় তার। তার পুত্র মীরন বজ্রপাতে মৃত্যুবরণ করে।

তবে জনশ্রুতি আছে যে, ইংরেজরাই তার নির্মমতায় বিস্মিত হয়ে আততায়ীর মাধ্যমে তাকে গোপনে হত্যা করেছে। অন্যদিকে, মীর কাসিম কিছুকাল রাজত্ব পেলেও ইংরেজদের সাথে বনিবনা না হওয়ায় ইংরেজদের সঙ্গে এক যুদ্ধে পরাজিত হয়ে মুর্শিদাবাদ ছেড়ে পালিয়ে যায়।

দিল্লির রাজপথে আমৃত্যু ভিখিরিজীবন যাপনের পর রাজপথেই চরম অবহেলায় তার মৃত্যু ঘটে। স্থানীয় জগৎশেঠ পরিবার ছিল শিরাজকে সিংহাসনচ্যুত করার নেপথ্য শক্তি। মীরকাসিমের হাতে এই শেঠ পরিবারের বড় শেঠ ভাই মহতাব ও স্বরূপচাঁদের সলিল সমাধি ঘটে।

উমিচাদ ইংরেজদের প্রতারণায় পলাশির ষড়যন্ত্রদলিলের শর্তানুযায়ী স্বত্বভোগ থেকে বঞ্চিত হয়ে উন্মাদগ্রস্ত অবস্থায় মৃত্যুবরণ করে। এমনকি যে ক্লাইভ ছিল ষড়যন্ত্রের মূল ক্রীড়নক; সেও ব্রিটিশ পার্লামেন্টে সম্পদ আত্মসাতের অভিযোগে অভিযুক্ত হন। অপমানিত, লজ্জিত, হতাশাগ্রস্ত হয়ে তিনি নিজের গলায় নিজে ছুরি চালিয়ে আত্মহত্যা করেন।

এভাবেই প্রকৃতি তার প্রতিশোধ নিয়েছে এবং অনাগত মানুষের জন্য রেখে গেছে দৃষ্টান্ত। কিন্তু মানুষ ইতিহাস থেকে শিক্ষা গ্রহণ না করে একই ভুল বার বার করে যায়। স্বাধীন বাংলাদেশে আততায়ীর হাতে জাতির জনক বঙ্গবন্ধুর হত্যাকাণ্ড তারই প্রকৃত দৃষ্টান্ত ।

শিরাজের পতনের এ ইতিহাস নিয়ে সমকালে অনেকেই গ্রন্থ লিখেছেন। কিন্তু তাদের প্রত্যেকের রচনার পেছনে একধরণের উদ্দেশ্য ছিল। ইংরেজ কিংবা ফরাসি যে লেখকই এ-বিষয়ে ইতিহাস লিখেছেন, প্রত্যেকেই শিরাজের চরিত্র ইচ্ছাকৃতবাবে বিকৃত করেছেন।

ফলে শিরাজ এক শতাব্দীকালেরও বেশি সময় জনগণের কাছে খলচরিত্র হিসেবেই থেকে গেছেন। এরপর বিংশ শতাব্দীর প্রারম্ভে ইতিহাসবেত্তা ও গবেষক অক্ষয়কুমার মৈত্র শিরাজের জীবনকাহিনি অবলম্বনে নতুন করে গ্রন্থ রচনা করেন, যাতে শিরাজ সম্পর্কে এতদিন ধরে প্রচলিত তথ্যসমূহের অসারতা প্রমাণিত হয়।

এরপর সাহিত্যিক শচীন্দ্রনাথ সেনগুপ্ত রচনা করেন অসামান্য শিল্পসফল নাটক সিরাজুদ্দৌলা (১৯৩৮)। অতঃপর পলাশির ঘটনা ও শিরাজ প্রসঙ্গ নতুন মাত্রা পায়। মানুষের মুখে মুখে রচিত হতে শুরু করে তার বন্দনাগীত। নারীগণ কাব্যনাটকে কুতুব চরিত্রের উচ্চারিত সংলাপে মাধ্যমে শিরাজ চরিত্রের মহিমান্বিত স্বরূপ শিল্পরূপময় হয়ে উঠেছে :

ক্রমে চিড় ধরে যাবে শিরাজের হীরাঝিলে,

ঘসেটির মতিঝিলে, আর মীরজাফরের হাভেলিতে।

একদিন বিরান সুনসান হয়ে যাবে সব,

ইট খসে পড়ে যাবে, সৌধচূড়া মাটিতে গড়াবে,

দেউড়িতে বাসা নেবে শৃগাল বাদুড় ।

পলাশীরও লাক্ষাবাগ আশ্রবন পড়ে যাবে ভাগীরথী বুকে।

কিন্তু শিরাজের নাম ক্রমে বৃদ্ধি পাবে।

বাঙ্গালার বিদ্রোহে বিপ্লবে

তার ভুল ভ্রান্তি ভাগ্য যাই হোক,

তিনি হয়ে উঠবেন মানুষের কাছে এক প্রতীকী মানুষ। (কাব্যনাট্যসমগ্র: ৪৩৩ )

শিরাজের মৃত্যুর পর যারাই নবাবি পদ প্রাপ্ত হয়েছেন, তারা প্রত্যেকেই ছিলেন ইংরেজদের বশংবদ; পুতুল রাজা। নেপথ্য থেকে তাদের পরিচালিত করেছে ইংরেজ। একপর্যায়ে মীরজাফর, মীরকাসিমের সঙ্গে রাজ্য ও রাজত্বের ভাগ-বাটোয়ারা নিয়ে ইংরেজদের বিরোধ সৃষ্টি হয়।

 

নারীগণ কাব্যনাটক

 

অবশেষে মীরজাফরের মৃত্যু ও ইংরেজদের সঙ্গে যুদ্ধে পরাস্ত হয়ে মীর কাসিমের পলায়নের পর ইংরেজরা সরাসরি তৎকালীন দিল্লির সম্রাট দ্বিতীয় শাহকে নজরানা দিয়ে বাংলার পুরো রাজস্ব আদায়ের ভার নিজেরাই নিয়ে নেয়। আর তখনই আক্ষরিক অর্থে বাংলায় শুরু হয় ইস্ট ইণ্ডিয়া কোম্পানির শাসন।

তারা এদেশের বিভিন্ন অঞ্চলে অত্যাচারী নায়েব নিয়োগ করে সাধারণ জনগণকে শোষণ ও অত্যাচারের মাধ্যমে অর্থসংগ্রহ করে বিদেশে পাচার করতে থাকে। রংপুর অঞ্চলের দেবী সিংহ তাদেরই প্রেরিত এমন একজন অত্যাচারী দেওয়ান। সৈয়দ শামসুল হকের অন্য ইতিহাসভিত্তিক কাব্যনাটক নূরলদীনের সারাজীবনে যার অত্যাচারের বর্ণনা রয়েছে। কোম্পানি আর তার সহযোগীদের প্রজাপীড়ন ও নির্বিচার শোষণে বাংলায় অচিরেই শুরু হয় মন্বন্তর (বাংলা ১১৭৬); যা ইতিহাসে ছিয়াত্তরের মন্বন্তর নামে অধিক পরিচিত।

তবে সৈয়দ শাসুল হক নারীগণ নাটকটি রচনা করেছেন ভিন্ন প্রেক্ষাপটে, ভিন্ন উদ্দেশ্যে। তাঁর উদ্দেশ্য দেশপ্রেমের প্রতিষ্ঠা নয়, কিংবা নূরলদীনের মতো ইতিহাসের অনালোচিত বীরকে খুঁজে এনে সমাজে পুনঃপ্রতিষ্ঠা নয়; তাঁর প্রকৃত উদ্দেশ্য অতীত ইতিহাসের জমিনে আধুনিক নারীবাদের প্রতিষ্ঠা।

বলা যায় বিংশ শতকের শেষের দিকে এবং একবিংশ শতকের প্রথম দশকে বিশ্বজুড়ে নব্যনারীবাদের যে জোয়ার চলেছে, একজন আধুনিক-মনস্ক শিল্পী হিসেবে তাতে সমর্থন জানাতেই তিনি এ নাটক রচনা করেছেন। তিনি রাজদরবারে পুরুষের বীরত্ব প্রতিষ্ঠা করতে নয়, বরং রাজমহলের অনালোচিত নারীদের আত্মত্যাগ, সংগ্রাম ও সংক্ষোভের চিত্রাঙ্কনের প্রয়োজনে আলোচ্য নাটক রচনা করেছেন।

ইতিহাসের প্রেক্ষাপটে নারীগণ নাটক রচিত হলেও নাট্যকার এখানে নারীবাদী তত্ত্বে (Feminism Theory) অনুপ্রাণিত হয়ে রাজমহলের নারীদের অপ্রকাশিত ও অনুচ্চ আর্তির কথা বলতে চেয়েছেন। ফলত, এখানে অষ্টাদশ শতাব্দীর বাংলার রাজনৈতিক ইতিহাসের সমান্তরালে প্রকটিত হয়েছে তৎকালীন সামন্ততান্ত্রিক সমাজব্যবস্থা।

রাজমহলের নারীরা যেহেতু মুসলিম অভিজাত পরিবারভুক্ত ছিল, সেহেতু সর্বসাধারণের প্রবেশ সেখানে নিষিদ্ধ ছিল। নবাবরা তাদের এমন ঘেরাটোপে বন্দি করে রাখতেন যেন তারা মানুষ নয়, কোনো রত্নভাণ্ডারের গুপ্ত রত্ন ; যা কেবল নবাবরাই ইচ্ছেমতো ভোগ করতে পারেন। রাজনীতি, রাজদরবার কিংবা সামাজিক আচার-প্রক্রিয়ায় প্রকাশ্যে অংশগ্রহণের পরিবর্তে ঠাটে-ঠমকে নবাবের মনোরঞ্জনই ছিল তাদের উদ্দেশ্য।

তাদেরও যে প্রাণ আছে, উপভোগের তীব্র স্পৃহা আছে তা জানানোর কোনো উপায়ই তাদের ছিল না। কিন্তু এসব নারীদের মধ্যেও যে প্রাণের স্পন্দন আছে, তারাও যে বাইরের আলো-হাওয়ায় বিচরণের অধিকার রাখে, এ-কথাই সৈয়দ শামসুল হক নিজকল্পনার রঙে রাঙিয়ে উপস্থাপন করেছেন আলোচ্য নাটকে।

তবে এখানে উল্লেখযোগ্য বিষয় হচ্ছে, নাট্যকার কেবল মহলের হতভাগ্য নারীদের মর্মগাঁথাই উপস্থাপন করেননি, বরং পুরুষসৃষ্ট এই যুদ্ধে অন্তঃপুরিকারা কীভাবে মানবিক বোধে ও অনুভবে পরস্পরের সঙ্গে নিবিড় অনুভবে সংমিলিত হয়েছেন তাও নাট্যরূপ দিয়েছেন। তিনি যেন বলতে চেয়েছেন – দুঃসময়ে মানুষে মানুষে ভেদ থাকে না। শোষকের চেহারা যেমন এক, তেমনি শোষিতের ছবিও হয়ে যায় এক। তাঁর ভাষায় :

আমির ফকির যদি মৃত্যুপথে এক –

কাল যদি মন্দ, তবে সেও হয় মৃত্যুরই সমান।

বেগম ও বাঁদীগণ আজ এক কাতারে এখন। (কাব্যনাট্যসমগ্র : ৩৭৩)

পুরুষের চোখে নারী কেবল ভোগের সামগ্রী। নারীর মাতৃরূপ বিস্মৃত হয়ে তাদের অঙ্কশায়িনী করতেই বরং তাদের আনন্দ। নাটকের প্রাসঙ্গিক অংশ লক্ষণীয় :

নারীকে ওরা সন্তানের জন্মসূত্র নয়,

মনে করে কামচক্র গুটি।

যেন প্রাচ্য নারীদের স্তন ঘন নয় মাতৃদুধে –

কামনার সুরাপূর্ণ কোমর সোরাহি। (কাব্যনাট্যসমগ্র : ৩৮১)

আঠারো শতকের মাঝামাঝি যখন বঙ্গদেশের নারীদের এই অবস্থা, বহির্বিশ্বের নারী সমাজ তখন থেকেই এই বৈষম্যের বিরুদ্ধে আওয়াজ তুলেছে। পুরুষের তুলনায় নারীকে হেয় করে না দেখে বরং একজন মানুষ হিসেবে নারীকে তারা মূল্যায়নে প্রয়াসী হয়েছে। আর বাঙালি নারীদের সেই আওয়াজ তুলতে সময় লেেেগছে বিংশ শতাব্দীতে রোকেয়া সাখাওয়াত হোসেনের (১৮৮০-১৯৩২) ভূমিকার আগ পর্যন্ত। ”

সৈয়দ শামসুল হক ছিলেন বরাবরই ছিলেন নারীবাদী সাহিত্যচর্চার সোচ্চার সমর্থক। তিনি তাঁর লেখনীতে যেখানেই সুযোগ পেয়েছেন সেখানেই নারীর অধিকার, নারীর মর্যাদাকে প্রতিষ্ঠার প্রয়াস পেয়েছেন। যেমন আলোচ্য নাটকে নবাবের অন্তঃপুরিকাদের বঞ্চনা, মনঃকষ্ট, বন্দিদশার নির্মমতার কথা তিনি উপস্থাপন করেছেন শিরাজের মাতা আমিনা চরিত্রের মাধ্যমে।

অন্যদিকে রাজমহলের দাসি ও পরিচারিকার জীবনযন্ত্রণার চিত্র উপস্থাপিত হয়েছে পায়েলি ও ডালিম চরিত্র দুটির মাধ্যমে। সমকালীন সমাজে প্রচলিত দাসপ্রথার উল্লেখ রয়েছে ডালিম চরিত্রের সংলাপে :

জানি না কোথায় কবে কোন দূর দেশে

কার কোল থেকে কবে ছিন্ন করে আমাদের আনা হয়,

তোলা হয় গোলামের হাটে।

তারপর এসে পড়ি নবাবের জেনানা মহলে।

আর এই জেনানা মহলই হয় একমাত্র জগত বাঁদীর।

মহলেই নাবালিকা থেকে বালিকা –

মহলেই যৌবন বিগত

একদিন মহলেই ইন্তেকাল করা ।

এই জীবন বৃত্তান্তে পিতা মাতা ভাই বোন নাই – (কাব্যনাট্যসমগ্র : ৪১৮) –

সেকালের সমাজে বিদ্যমান দাসপ্রথার নির্মম বলী মহলের বাঁদিচরিত্র ডালিম ও পায়েলি । রাজপরিবারের সেবা- শুশ্রূষা কিংবা মনোরঞ্জনের মাধ্যমেই অতিবাহিত হয় এদের জীবন। কিন্তু মহলের কোনো কিছু ভোগদখলের অধিকার থেকে এরা বঞ্চিত। দাসপ্রথার নির্মম বলী হয়ে কোন দূরদেশ থেকে এদেশে এসেছে তাও তাদের অজ্ঞাত।

রাজপরিবারের সন্তান-সন্ততিরা তাদের পরিচর্যায় লালিত-পালিত হয়, কিন্তু তারা দাসীই থেকে যায় আজীবন। এমনকি যুদ্ধপরবর্তীকালে মহলের উচুতলার নারীরা যখন নিজেদের সম্ভ্রমরক্ষার চিন্তায় অস্থির, তখনও এই দাসীদের কথা তারাও ভাবে না। হাতবদল হওয়া আর সম্ভ্রম হারানোই যেন এসকল নারীদের জীবনভাগ্য। ডালিমের কণ্ঠে তাই উচ্চারিত হয় ক্ষোভমিশ্রিত অভিযোগ :

খোদার পরেই

হাজির নাজির যদি জেনে থাকি আপনাকে

দেখলাম সেই আপনারাই একমাত্র নিজেদের ইজ্জতের কথা ভাবছেন ।

শুধু নিজেদের! শুধু আপনার কন্যা আর পুত্রবধূটির।

কেবল তারাই নারী ? নারীধর্ম কেবল তাদেরই ?

আমাদের নারীধর্ম নাই ? কোনো নারীত্ব নাই ?

বাদীদের নেই – তাই নেই হারাবার ! (কাব্যনাট্যসমগ্র: ৪১৯ )

মহলের নারীদের পাশাপাশি নাটকে আরেক শ্রেণির নারীর উল্লেখ করেছেন নাট্যকার, যারা নবাব মহলের নারীদের মতো অসূর্যম্পশ্যা নয়। তারা রাজপরিবারের পরিচয়ে পরিচিত না হলেও রাজপুরুষদের সম্মানে নৃত্যগীত পরিবেশন করে তাদের জীবনকে করে তুলেছিল উপভোগ্য ও আনন্দময়। বাঈজি নামেই এরা সে- সমাজে পরিচিত ছিল। জীবনযাপনে এরা ছিল অনেকটা স্বাধীন, স্বেচ্ছাচারী।

সমাজপতি কিংবা সামন্তপ্রভুদের সঙ্গেই ছিল এদের সম্পর্ক। ফলে রাজ্য বা রাজত্বের হাতবদল হলেও এদেরর ভাগ্যের তেমন কোনো পরিবর্তন হতো না। যেহেতু রাজপুরুষের ভোগবিলাসে এরা ব্যবহৃত হতো, সেহেতু রাজমহলের নারীরা এদের প্রতি ছিল ঈর্ষাকাতর। মহলের নারীরা যেখানে কেবল নিজেদের স্বার্থ বিবেচনা করছে, সেখানে এরা রাজমহলের সম্মান ও মর্যাদাকে উচ্চাসন দিয়েছে।

অন্যদিকে, নারীগণ নাটকে নাট্যকার সমাজবাস্তবতার আলোকে দেখিয়েছেন যে, পুরুষের নিকট নারীর কোমল- মধুর রূপ অধিক পছন্দনীয়, ফলে তারা নারীর রূপসজ্জা, অঙ্গসজ্জায় যতটা আগ্রহী, নারীর বিদ্যার্জন কিংবা অস্ত্রশিক্ষায় ততটা আগ্রহী নয়। রাজমহলে পুত্রসন্তান শৈশব থেকেই বিভিন্ন অস্ত্রশিক্ষায় শিক্ষিত হয়ে দক্ষযোদ্ধা হবার পাঠ নেয়। কিন্তু কন্যাশিশুর জন্য এ অধিকার নেই । অথচ মেয়ে শিশুকেও উপযুক্ত অস্ত্রচালনায় দক্ষ করে তুললে তারা পুরুষের পাশাপাশি রাজ্যরক্ষায় অংশ নিতে পারত।

 

নারীগণ কাব্যনাটক

 

অন্তত রাজ্যরক্ষা না হোক, শত্রুর কবল থেকে আত্মরক্ষায় তাদের এ দক্ষতা কাজে লাগাতে পারত। অবশ্য মহলের নারীরা সামান্য কিছু অস্ত্র কাছে রাখার অধিকার পেতো সম্ভ্রম রক্ষার্থে আত্মহত্যা করার জন্য। সমাজের এই বাস্তবতা উপস্থাপিত হয়েছে আমিনা চরিত্রের একটি সংলাপে

হায় নারীর খঞ্জর!

যুদ্ধের জন্যে তো নয়,

শত্রুর পঞ্জর বিদ্ধ করতে তো নয়,

পুরুষ যে নারীকে খঞ্জর দেয়, কেন তারা দেয় ?

আত্মহত্যা করবার জন্যেই তো, বেটি।

পুরুষেরা মনে করে, যুদ্ধে পরাজয়

তখনি সর্বাংশে হয়।

যখনি নারীটি তার বিজয়ীর ভোগ্যবস্তু হয়।

তাই পরাজিত হয়েও পুরুষ চায় জয়ী হতে,

আর সেই জয় তাকে দিতে পারে একমাত্র নারী।

যদি নারী আত্মহত্যা করে। (কাব্যনাট্যসমগ্র: ৩৮৬)

অর্থাৎ যে রাষ্ট্রনীতিতে নারীদের অংশগ্রহণ পুরুষতন্ত্র স্বীকার করে নিতে পারে না, সেখানেই নারী জয়- পরাজয়ের হাতিয়াররূপে ব্যবহৃত হয়। আমিনার প্রাসঙ্গিক সংলাপ উল্লেখ্য :

রাজনীতি শতরঞ্জ খেলায়

নারী তো আসলে এক সামান্যই বড়ে –

তাকেও না খেলে বুঝি কিস্তিমাত্ হয় ?

যুদ্ধের প্রান্তরে নয়, জয়-পরাজয়

নারীর শরীরে হয় নির্ধারিত ইতিহাসের রয়েছে প্রমাণ। (কাবনাট্যসমগ্র : ৩৮৫)

সৈয়দ শামসুল হক আলোচ্য নাটকে দেখাতে চেয়েছেন সমাজে নারীরাও রাজনীতি-রাষ্ট্রনীতি সম্পর্কে সচেতন। কিন্তু কোনো পুরুষ হাতে ধরে নারীকে এ শিক্ষা দেয় না। বিরূপ পরিস্থিতির মুখোমুখি হয়ে নারীরা তা শিখে নেয় আপনা থেকেই। রাজনৈতিক ঘাত-সংঘাতের অনিবার্যতায় শিরাজপত্নী লুৎফ্ফার ব্যক্তিত্বের স্ফূরণ প্রসঙ্গে রাজমাতা আমিনার একটি উক্তি উল্লেখ করা যেতে পারে :

রাজনীতি হাত ধরে শেখায় না পুরুষেরা,

শিখি নিজে নিজে, রক্তে বুক ভেসে গেলে।

আম্মা, এভাবেই আমরা নারীরা শিখি –

প্রয়োগের সুযোগ পাই না শুধু নারীজন্ম বলে। (কাব্যনাট্যসমগ্র : ৪২৩)

অন্যদিকে পলাশিপরবর্তী অস্থিতিশীল সামাজিক অবস্থা সুস্পষ্ট হয়েছে শরীফার আরেকটি সংলাপের মাধ্যমে। এর মাধ্যমে সে-সময়কার পলাশির বাস্তব অবস্থা উপস্থাপিত হলেও সবযুগের সর্বকালের রাজনৈতিক পালাবদলের পরবর্তীকালীন বিশৃংখলার চিত্রও পরিস্ফুটিত হয়েছে। এমনকি একবিংশ শতাব্দীর প্রারম্ভিক সময়পরিসরে বাংলাদেশের অস্থির রাজনৈতিক সামাজিক অব্যবস্থাপনাও প্রতীকী হয়ে ধরা দিয়েছে আলোচ্য সংলাপে :

শরিফা। হস্তী পড়ে গেলে চুহা হস্তী হতে চায়! [ … ]

বিধর্মী, কাফের, শেঠ, বানিয়া, গোমস্তা, গোৱা,

দেশবেশ্যা, নীতিবেশ্যা, ধর্মবেশ্যা, চারদিকে ওরাই এখন ।

স্বর্ণলোভী ওরা। বিষ্ঠা থেকে খুঁটে যদি তুলতেও হয়,

তুলতে পিছপা নয়। ক্ষমতার লোভী!

কারণ ক্ষমতা যার স্বর্ণ তারই স্বর্ণের ভাণ্ডার।

অতএব রাষ্ট্রদস্যু সিংহাসন কাড়ে।

সিংহাসন পাওয়া মানে লুণ্ঠনের সুযোগ অপার। (কাব্যনাট্যসমগ্র : ৪২২)

আর এভাবেই নাট্যকার অতীত ইতিহাসের ঘটনাপুঞ্জকে সমকালীন ইতিহাসের সঙ্গে সম্পর্কসূত্রে বেঁধে নারীগণ নাটকটিকে অনন্য উচ্চতায় নিয়ে গেছেন। সামাজিক নাটক রচনা করতে গিয়ে তিনি ইতিহাসের সূত্রকে পাঠক- দর্শকের সম্মুখে অপরূপ নান্দনিকতায় উপস্থাপন করেছেন ।

Leave a Comment