সৈয়দ শামসুল হকের নারীগণের শৈলিবিচার

নারীগণের শৈলিবিচার রচনাটি সৈয়দ শামসুল হকের কাব্যনাটক : ইতিহাস, সমাজ, রাজনীতি ও শিল্প [পিএইচডি অভিসন্দর্ভ] এর অংশ। গবেষনাটির অথোর জান্নাত আরাসোহেলী। এই অভিসন্দর্ভের (পিএইচডি) বিষয় বাংলা নাটক – ইতিহাস ও সমালোচনা। প্রকাশিত হয়েছিল বাংলা বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, শিক্ষাবর্ষ: ২০১৭-২০১৮। গবেষণাকর্মটি সাহিত্যের শিক্ষার্থীদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ হওয়ায় আমরা সাহিত্য গুরুকুলে পুন-প্রকাশ করলাম।

নারীগণের শৈলিবিচার

 

নারীগণের শৈলিবিচার

সৈয়দ শামসুল হক পলাশীর বিয়োগবিধুর ইতিহাসকে আত্তীকৃত করে নারীগণ নাটকের বিষয়বস্তু সাজিয়েছেন। তবে নাটকটি ইতিহাসের উপাদানে রচিত হলেও পুরোপুরি ঐতিহাসিক নাটক না হয়ে হয়ে উঠেছে আধুনিক নারীবাদের প্রতিচ্ছবি। রাজনৈতিক ইতিহাসের বাঁকবদলের বাস্তব উপস্থাপনায়, অবহেলিত নারীসমাজের মনোকথন বর্ণনায়, পরিবেশনরীতির নান্দনিকতায়, ভাষাপ্রয়োগের অনন্যতায় এ-নাটকটি হয়ে উঠেছে অসামান্য ।

নারীগণ নাটকের অধিকাংশ চরিত্রই নারী। প্রহরীগণ ও চার কুতুব হলো দৃশ্যমান পুরুষ চরিত্র। তবে নাটকে প্রহরীদের ভূমিকা একেবারেই গৌণ, চার কুতুব দলীয় চরিত্র হিসেবে কিছুটা গ্রিক নাটকের কোরাসের ভূমিকা পালন করেছে। নাটকের প্রারম্ভে তারা যেমন পলাশীর ইতিহাস বর্ণনা করেছে, তেমনি নাটকের অন্তিমেও নাট্যঘটনার পরবর্তী কাহিনি ইতিহাসের আলোকে দর্শকের সামনে উপস্থাপন করেছে।

নাটকটিতে যেসব নারী চরিত্রের উপস্থিতি রয়েছে তারা হলো : নবাব আলিবর্দী খানের বিধবা স্ত্রী শরিফুন্নেসা, আলিবর্দীর কন্যা ও নবাব শিরাজদ্দৌলার মাতা আমিনা বেগম, শিরাজদ্দৌলার স্ত্রী লুৎফুন্নেসা, শিরাজদ্দৌলার শিশুকন্যা মুন্না, মুন্নার আয়া পায়েলি, লুৎফুন্নেসার একান্ত সেবিকা ডালিম, জনৈক হিন্দু বাঈজি, এবং নেতিবাচক চরিত্র হিসেবে আলিবর্দীর জ্যেষ্ঠকন্যা ঘসেটি বেগম।

এছাড়া বৃন্দনারী চরিত্র হিসেবে রয়েছে – মুর্শিদাবাদের হীরাঝিল প্রাসাদের অন্দরমহলের বাঁদিগণ। যেহেতু নাটকের মূল উদ্দেশ্য রাজনৈতিক পট পরিবর্তনের উদ্ভূত পরিস্থিতিতে রাজমহলের নারীদের বিপর্যস্ত অবস্থার উপস্থাপন, তাই নাট্যকার অত্যন্ত কৌশলে পুরুষ চরিত্রগুলির ভূমিকা এড়িয়ে গেছেন।

নাটকের নারী চরিত্রগুলির মধ্যে সর্বপ্রবীণা আলিবর্দীর স্ত্রী শরিফুন্নেসা। জীবনাভিজ্ঞতায় অভিজ্ঞ এ নারী নবাব- অন্তঃপুরের সর্বময় কর্ত্রী। তিনি ছিলেন নবাব আলিবর্দীর একমাত্র স্ত্রী। আলিবর্দীর শাসনকালে সংঘটিত নানান রাজনৈতিক সংঘাত, যুদ্ধ-বিগ্রহ তিনি যেমন বাস্তবতার নিরিখে অবলোকন করেছেন, তেমনি দৌহিত্র শিরাজের মৃত্যুর পর বিগতদিনের অভিজ্ঞতার আলোকে মহলের অন্য নারীদের পরিচালনা করার চেষ্টা করেছেন।

যে কারণে তিনি কখনো কখনো শোকাহত শিরাজের মাতা ও বধূকে অতীতের গর্বিত ইতিহাস স্মরণ করিয়ে দিয়ে শান্ত রাখার চেষ্টা করেছেন, আবার কখনো মহলের নারীদের কর্তব্য ও ভবিতব্য সম্পর্কে সচেতন করে তুলেছেন। তিনি নবাবমহিষীই কেবল নন, একজন মা-ও। ফলে কন্যা আমিনা ও তার পুত্রবধূ লুৎফুন্নিসাকে আসন্ন বিপদ থেকে রক্ষা করতে একপর্যায়ে অপর কন্যা ঘসেটিকে মিথ্যে প্রলোভন দেখানোর কথাও ভেবেছিলেন।

অন্তঃপুরবাসিনী হয়েও তিনি সমাজ ও রাজনীতি সম্পর্কে অত্যন্ত সচেতন ছিলেন। পরিবর্তিত রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে বিদ্যমান সমাজসম্পর্কিত তাঁর একটি উক্তি নাট্যকার অত্যন্ত চমৎকারভাবে উপস্থাপন করেছেন :

শরিফা। হস্তী পড়ে গেলে চুহা হস্তী হতে চায় ! […]

বিধর্মী, কাফের, শেঠ, বানিয়া, গোমস্তা, গোৱা,

দেশবেশ্যা, নীতিবেশ্যা, ধর্মবেশ্যা, চারিদিকে ওৱাই এখন।

স্বর্ণলোভী ওৱা। বিষ্ঠা থেকে খুঁটে যদি তুলতেও হয়,

তুলতে পিছপা নয় । ক্ষমতার লোভী ! […]

অতএব রাষ্ট্রদস্যু সিংহাসন কাড়ে।

সিংহাসন পাওয়া মানে লুণ্ঠনের সুযোগ অপার। (কাব্যনাট্যসমগ্র : ৪২২)

 

নারীগণের শৈলিবিচার

 

মুর্শিদাবাদ রাজমহলের ইতিহাস পর্যবেক্ষণ করলে দেখা যাবে, বাস্তবেও আলিবর্দী-পত্নী শরিফুন্নেসা এমনই বিচক্ষণ ও রাজনীতি-সচেতন নারী ছিলেন। এমনকি নবাব আলিবর্দী খাঁ যখন বিভিন্ন রাষ্ট্রীয় কাজে রাজধানীর বাইরে থাকতেন, তখন শরিফুন্নেসা প্রয়োজনীয় রাজনৈতিক-প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত প্রদান করতেন। শরিফুন্নেসার এই রাজনৈতিক প্রজ্ঞা প্রসঙ্গে ইতিহাসবিদ শ্রী নিখিলনাথ রায় তাঁর গবেষণাগ্রন্থে নিম্নরূপ মন্তব্য করেছেন :

পুরুষ চিরকাল রাজনীতির সেবক হইয়া থাকেন। রমণী সাধারণতঃ সেই কঠোর তত্ত্বে মনোনিবেশ করিতে চাহেন না। কিন্তু অনেক সম্রাট ও রাজনীতিবিদগণের জীবনে তাঁহাদিগের সহধর্মিণীরও প্রতিভার ছায়া দেখিতে পাওয়া যায়। নবাব আলিবর্দী খাঁর ন্যায় রাজনীতিবিদ পুরুষ বাঙ্গলার সিংহাসনে অতি অল্পই উপবেশন করিয়াছেন বলিয়া মনে হয়। […] সেই কর্মবীর আলিবর্দী খাঁর রাজনৈতিক জীবন তাঁহার প্রিয়তমা মহিষীর সহায়তায় পূর্ণতা লাভ করিয়াছিল বলিয়া কথিত হইয়া থাকে।

আলিবর্দীর উচ্ছৃঙ্খল সংসার যেমন এই মহিয়সী মহিলার তর্জনীতাড়নের অধীন চালিত হইত। জ্ঞান, উদার্য, পরহিতেচ্ছা ও অন্যান্য সদ্‌গুণে তিনি রমণীজাতির মধ্যে অতুলনীয় ছিলেন। রাজ্যের যাবতীয় হিতকর কার্য তাঁহারই পরামর্শের উপর নির্ভর করিত। […] নবাব – – বেগমের এই অসাধারণ প্রতিভার জন্য আলিবর্দী খাঁ রাজধানী হইতে তাঁহার অনুপস্থিতি কালে অনেক সময় বেগমের প্রতি রাজকার্যের ভার প্রদান করিতেন, তজ্জন্য তিনি বাদশাহদরবার হইতে আদেশ লইয়াছিলেন। এই সময় হইতে মুর্শিদাবাদের গদিনসীন – বেগমপদের সৃষ্টি হয়।’

আলোচ্য নাটকে আমিনা ও ঘসেটি চরিত্রদুটি নির্মাণে নাট্যকার বিপ্রতীপ চরিত্রনির্মাণকৌশল ব্যবহার করেছেন। যেকারণে শিরাজ-মাতা আমিনা যতটাই সততা, মর্যাদা, বলিষ্ঠতায় উজ্জ্বল হয়ে প্রকাশিত হয়েছে, ঘসেটি বেগম চরিত্রটি ততটাই অসততা, কপটতা ও লোভীচরিত্র হিসেবে উপস্থাপিত হয়েছে। নাট্যকার একদিকে দেখিয়েছেন – শিরাজমাতা আমিনা তার মৃতস্বামী জয়েনউদ্দিনের প্রতি নিষ্ঠায়, ভালোবাসায়, স্মৃতিচারণায় এখনো আবদ্ধ।

অন্যদিকে ঘসেটি নিজ স্বামী রেখে তার কর্মচারী হোসেন কুলীর প্রতি কামাসক্ত। এমনকি তার রিপুর প্রাবল্য এত বেশি যে, সে ধর্মাধর্ম জ্ঞান, বয়সের বিভাজন ভুলে হিন্দু সভাসদ রাজবল্লভের প্রতিও অনুরক্ত। আবার, উচ্চপদস্থ ইংরেজ বেনিয়াদের আকৃষ্ট করতে উপযুক্ত সাজপোশাকেও নিজেকে প্রকাশ করতেও সে দ্বিধাহীন। ঘসেটি চরিত্রটি ইতিহাসে যেমন খলচরিত্র, নাট্যকারও নারীগণ নাটকে তাকে তেমনি উচ্ছৃংখল, লোভী, স্বার্থপর চরিত্রহিসেবে অঙ্কন করেছেন।

তবে ইতিহাসে ঘসেটি বেগমের রিপুর প্রাবল্যের কথা যেমন উল্লেখিত হয়েছে, ঠিক তেমনি হোসেন কুলীর প্রতি আমিনা বেগমেরও অনুরাগের প্রসঙ্গও বর্ণিত হয়েছে। হোসেন কুলীকে শিরাজদ্দৌলাকর্তৃক প্রকাশ্য দিবালোকে হত্যা করার পেছনেও এটি ছিল অন্যতম প্রধান কারণ। কিন্তু নাট্যকার সৈয়দ শামসুল হক নারীগণ নাটকে ঘসেটিকে পরিপূর্ণ খল চরিত্র হিসেবে উপস্থাপন করতে গিয়ে তার বিপরীতে আমিনা বেগমকে ততটাই ইতিবাচক চরিত্র হিসেবে উপস্থাপন করেছেন।

এমনকি শরিফুন্নেসা যখন রাজবল্লভের বাড়িতে অবাধ যাতায়াতের লোভ দেখিয়ে ঘসেটির কাছে মুক্তিপ্রার্থনার কৌশল এঁটেছে, তখন আমিনা নিজ মাতাকে ধিক্কার দিতেও দ্বিধা করেনি। আমিনা নিজমাতাকে ঘৃণাভরে বলেছে :

জঘন্য প্রস্তাব ! […] নষ্ট যদি ঘসেটি তো আপনিও কিছু কম নন ! […] ঘসেটি নষ্টই ।

কিন্তু কোথায় আপনি তাকে বাঁচাবেন,

আর কিনা আপনিই তাকে আরো নষ্ট করছেন।

[…] অপরকে পাপী করে নিজে পুণ্যে থাকা (কাব্যনাট্যসমগ্র: ৪০৯ )

আমিনা চরিত্রটি প্রচণ্ড যুক্তিবাদীও। শরিফা যখন একের পর এক অবরোধ-মুক্তির কৌশল চিন্তা করেছে, তখন বুদ্ধিমতী আমিনা যুক্তি দিয়ে, বুদ্ধি দিয়ে সেগুলো বিচার বিশ্লেষণ করে তার অসারতা প্রমাণ করেছে। তবে যুক্তি, বুদ্ধি, সততা, আত্মমর্যাদা, সবকিছু ছাপিয়ে আমিনার প্রবল মাতৃত্ববোধই নাটকে সবচেয়ে বেশি প্রকটিত হয়েছে।

নাটকের শেষদৃশ্যে সিরাজকে যখন হস্তিপৃষ্ঠে শহর প্রদক্ষিণ করানো হয়েছে, তখন ভেঙে গেছে আমিনার সংযমের সকল বাঁধ; চ্যুত হয়েছে অভিজাত নারীর মার্জিত আচরণবোধ। সে-মুহূর্তে সন্তানহারা শিরাজমাতার যে আকুতি, তা যেন বীর-পুত্রহারা দেশমাতৃকার প্রতিচ্ছবি। কুতুব চরিত্রের বর্ণনায় নাট্যকার আবেগাত্মক পরিচর্যায় এ দৃশ্যটি নিম্নরূপে বর্ণনা করেছেন :

শিরাজের মাতা ওই ছুটে বেরিয়েছে।

এখনও কি নবাবের মাতা ? আলিবর্দীর কন্যা কি ?

গর্ভধারী নারী এক জননীই আজ

নিহত পুত্রের লাশ পথে শুনে দিগ্বিদিকহারা ।

পর্দা ভেঙে বেরিয়েছে – পর্দা ছিঁড়ে গেছে তার – –

আলুথালু বসন, উন্মত্ত মাতা, লুটাচ্ছে আঁচল।

একবার আয় ওরে পুত্রধন আয়,

সিংহাসন নয়, আয় ফিরে আয় তোর জননীর কোলে। (কাব্যনাট্যসমগ্র : ৪৩১ )

 

নারীগণের শৈলিবিচার

 

অন্যদিকে, নাট্যকার লুৎফুন্নিসা চরিত্রটিকে একদিকে যেমন উদার-কোমল করে গড়ে তুলেছেন, অন্যদিকে তেমনি স্বামীর প্রতি বিশ্বাসে-ভালোবাসায় একনিষ্ঠ করে এঁকেছেন। লুৎফুন্নিসার বাস্তবিক ইতিহাসও ঠিক এমনই। ফলে এ চরিত্রটিতে নাট্যকার নতুনত্ব কিছু প্রয়োগ করেননি।

তবে এখানে লুৎফুন্নিসার বিপ্রতীপ চরিত্র হিসেবে নাটকে বাঈজি চরিত্র সংযোজন করেছেন নাট্যকার। এই বাঈজি চরিত্রটি আত্মমর্যাদাশীল, প্রভুভক্ত, বিশ্বাসী একটি চরিত্র। নিজ পেশার কারণে সে চিরকাল নবাব মহলের নারীদের কাছে লাঞ্ছিত হয়ে এলেও, এই ঘোর বিপদে সে নবাব মহলের নারীদের সম্মান বাঁচাতে ছুটে এসেছে। ‘বেশ্যা’র চেয়েও তার কাছে অধিকতর ঘৃণ্য ‘বিশ্বাসঘাতক’ চরিত্র।

বাঈজি চরিত্রটি দৃঢ়তা, বলিষ্টতা, যুক্তিবাদিতায় নবাবপত্নী লুৎফুন্নিসাকেও ছাপিয়ে গেছে। নাটকে বাঈজি চরিত্রটি নাট্যকারের কল্পিত চরিত্র হলেও নবাবদের হারেমে বাঈজি প্রতিপালন ঐতিহাসিক ঘটনা। বরং কখনো কখনো নবাবদের আমোদ-প্রমোদ, বাঈজি-বিলাস রাজ্যশাসনের চেয়েও অধিক গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতো। স্বয়ং রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর অক্ষয়কুমার মৈত্রেয় রচিত সিরাজদ্দৌলা গ্রন্থের আলোচনা সংক্রান্ত এক লেখায় এ প্রসঙ্গটি উল্লেখ করে লিখেছেন :

প্রমোদের মোহমত্ততায় এই প্রলয়নাট্যের আরম্ভ হইল। ভাগিরথীতটে হীরাঝিলের নিকুঞ্জবনে বিলাসিনীর কলকণ্ঠ এবং নর্তকীর নূপুরধ্বনি মুখরিত হইয়া উঠিল। লালসার লুব্ধহস্ত গৃহস্থের রুদ্ধগৃহের মধ্যেও প্রসারিত হইল। ‘

পলাশীর ইতিহাস সংবলিত নাটকে অনৈতিকহাসিক চরিত্রের সংযোজন এর আগেও করেছেন সিরাজদ্দৌলাকে নিয়ে প্রথম নাট্যপ্রণেতা শচীন্দ্রনাথ সেনগুপ্ত। তিনি তাঁর সিরাজদ্দৌলা (১৯৩৮) নাটকে ঘসেটি বেগম, লুৎফুন্নেসা প্রভৃতি ঐতিহাসিক নারীচরিত্রের সমান্তরালে আলেয়া নামক একটি কল্পিত নারী চরিত্র সংযোজন করেছিলেন। এছাড়া তাঁর নাটকে পুরুষচরিত্রগুলির মধ্যে গোলাম হোসেন নামেও একটি কাল্পনিক চরিত্র ছিল।

নারীগণ নাটকে বাঈজি চরিত্রটি সেরকমই একটি কাল্পনিক চরিত্র; যে আত্মীয়তার সম্পর্কে সম্পর্কিত না হয়েও ভালবাসায় মমতায় আর দশজন সাধারণ গৃহস্থনারীর তুলনায় কম নয়। ডালিম, পায়েলি চরিত্রের মাধ্যমে দাসপ্রথার এক নির্মমরূপ সম্পর্কে নাট্যকার আমাদের অবগত করেছেন। যেমন : ডালিমের একটি সংলাপে দাসপ্রথার ইতিকথা বর্ণিত হয়েছে নিম্নোক্তভাবে

কবে এই মহলে এসেছি মনে নাই – কিছু মনে নাই ।

আমাদের পিতা কে জানি না ।

আমাদের মাতা কে জানি না ।

ভাই বোন ? ভাবলেও ভেবেছি এমন –

যদি ছিলো বোন – জানি না সে কবে কোন

গোলামের হাটে বুঝি বিক্রি হয়েছিলো।

মনে হতো, ভাই যদি থাকে, তবে তাকে

হাজামের কাছে ফেলে খোজা করা হয়েছে নিশ্চয়।

মহলের কোঠায় কোঠায় দরোজায় খোজার পাহারা

নৌকরখানায় খোজা, রসুইখানায় খোজা,

হঠাৎ কখনো কোন জোয়ান খোজাকে দেখে চমকে উঠেছি

নিজের চেহারা যেন আচানক তার মুখে দেখতে পেয়েছি।

তবে কি এ আমারই হারানো ভাই!

হঠাৎ যখন কোন বাঁদীর চিৎকার –

মরদের কোঠা থেকে, শরাবের মাহফিল থেকে

বুক বরফ হয়েছে।

বুঝি সে আমারই মায়ের পেটের বোন –

সদ্য কেনা গোলামের হাটে-

ভাগ্যদোষে এই মহলেই!

ভাগ্যদোষে নাবালিকা আজ বুঝি ছিন্ন হলো ওই। ( কাব্যনাট্যসমগ্র : ৪১৪ )

কিন্তু এই নির্মম নির্যাতনের কোনো প্রতিকার ছিল না। শরিফাকে উদ্দেশ্য করে পায়েলির আরেকটি উক্তি
উল্লেখ্য :

পায়েলি । ফরিয়াদ কিছু নাই। মূল্য দিয়ে খরিদান বাঁদীর জীবনে

ফরিয়াদ থাকলেও তার কোন মূল্য নাই ।

ফরিয়াদ করবে কি বাঁদী ? তার জবান কোথায়?

জবানও খরিদ তার। হাত-পা, তার শরীরও খরিদ

গর্ভে যদি এসেছে সন্তান ।

জন্মের আগেই সেই সন্তানও খরিদ। (কাব্যনাট্যসমগ্র : ৪১৫)

নাট্যকার প্রকৃতপক্ষে এসকল নারী চরিত্রের মাধ্যমে নবাবের হারেমে নারীদের অবস্থা-অবস্থান, মনোবেদনা, দ্বিধা-দ্বন্দ্ব-হতাশার চিত্র অত্যন্ত নিপুনভাবে উপস্থাপন করেছেন এ-নাটকে।

 

নারীগণের শৈলিবিচার

 

নারীগণ নাটকটি ঢাকাকেন্দ্রিক নাট্যদল পালাকার ২০১২ সালে সর্বপ্রথম মঞ্চে উপস্থাপন করে। পালাকার নাট্যদলের পরিচালক ও সহকারী নির্দেশক আমিনুর রহমান মুকুল সৈয়দ হকের এ নাটকটি মঞ্চে আনার কারণ প্রসঙ্গে বলেন :

সিরাজউদ্দৌলার হত্যাকাণ্ড বাংলার ইতিহাসে একটি অবিস্মরণীয় ঘটনা। ইতোমধ্যে সিরাজউদ্দৌলা বাংলার মঞ্চকে বারবার আলোড়িত করেছেন। সেই সুবাদে আমরা ওই ঘটনার সঙ্গে সম্পৃক্ত সমস্ত চরিত্রকে চিনি- জানি। আমরা মীরজাফরকে যেমনভাবে চিনি, তেমনি জানি ঘসেটি বেগমকে, জানি সিরাজের নানি শরিফুন্নেছাকে, মা আমিনাকে ও স্ত্রী লুৎফাকে। কিন্তু সিরাজকে যখন হত্যা করা হয়, তখন সেই নারীদের অবস্থা সম্পর্কে আমরা খুব কম জানি। তারই নতুন দিক উন্মোচন করেছেন নারীগণ নাটকের নাট্যকার।

যেহেতু পালাকার একটি বৈচিত্র্যসন্ধানী নাট্যসংগঠন, তাই এই গল্প বলার সুযোগ আমরা হাতছাড়া করতে চাইনি। সে-কারণে আমাদের নারীগণ মঞ্চায়ন। ‘

তবে পালাকার এ-নাটকের প্রযোজক হলেও নাটকটির নির্দেশনা দিয়েছেন নাগরিক নাট্যসম্প্রদায়ের পরিচালক নাট্যজন আতাউর রহমান। এমনকি এ-নাটকের প্রধান প্রধান চরিত্রে নাগরিক নাট্যদলসহ অন্যান্য নাট্যদলের বেশ কজন অভিনেত্রী অভিনয় করেছেন।

যেমন, নারীগণ নাটকে প্রধান চারটি নারী চরিত্রে অভিনয় করেছেন নাগরিক নাট্যসম্প্রদায়ের ফারহানা মিঠু (শরিফা) ও তানিয়া হোসাইন ( লুৎফুন্নিসা), চট্টগ্রামের নাট্যদল নান্দীমুখের অভিনেত্রী দীপ্তা রক্ষিত (আমিনা) এবং প্রাচ্যনাট্যদলের অভিনেত্রী জয়িতা মহলানবীশ (বাঈজি)। সৈয়দ শামসুল হকের এ নাটকটির মঞ্চায়ন প্রসঙ্গে নাটকের নির্দেশক নাট্য-সারথি আতাউর রহমান এক সাক্ষাৎকারে বলেন :

তাঁর বেশ কয়েকটি নাটককে দেশের অন্য নাট্য নির্দেশকেরা যখন দুরূহ বলে পাশে সরিয়ে রেখেছেন; আমি তখন পরম যত্নে সেই নাটকগুলোকে বুকে তুলে নিয়েছি। […] পালাকার নাট্যদল প্রযোজিত সৈয়দ হক রচিত এবং আমার নির্দেশিত নারীগণ বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য একটি প্রযোজনা বলে আমি মনে করি। সৈয়দ শামসুল হক আমার অগ্রজপ্রতিম বন্ধু। নাট্যভাবনা ও মননে আমরা পরস্পরের পরিপূরক। হক ভাইও তাই মনে করেন।

বলাবাহুল্য প্রথম প্রদর্শনীতেই নাটকটি তুমুল দর্শকপ্রিয়তা অর্জন করতে সক্ষম হয়। এরপর এ নাটকটি দেশ- বিদেশের মঞ্চে অসংখ্যবার সুনামের সঙ্গে অভিনীত হয়েছে। এমনকি ২০১৭ সালে কলকাতার নাট্যপ্রতিষ্ঠান নান্দীরঙ্গ আয়োজিত পাঁচদিনব্যাপী ‘এপার-ওপার পঞ্চম নাট্যোৎসবে আমন্ত্রণ পায় ঢাকার নাট্যদল পালাকার ।

সেখানে নাট্যোৎসবের তৃতীয় দিনে (৩ ফেব্রুয়ারি ২০১৭) কালীঘাটের তপন থিয়েটার মঞ্চে নাটকটির প্রদর্শনী হয়; এবং তুমুল দর্শকপ্রিয়তা অর্জনের পাশাপাশি কলকাতার পত্রিকাতেও নাটকটি নিয়ে ইতিবাচক প্রতিবেদন ছাপা হয়। কলকাতার লেখক, ব্লগার রেজা ঘটক এক লেখনীতে সে অভিজ্ঞতা বর্ণনা করে লেখেন :

নারীগণ নাটকটি কলকাতার দর্শকদের কাছে সেদিন হয়ে উঠেছিল ইতিহাস ফিরে দেখার এক দুর্লভ মুহূর্ত। উপস্থিত দর্শকরা ফিরে গিয়েছিলেন ইতিহাসের দুইশো ষাট বছর আগে সংঘটিত সেই ঐতিহাসিক ঘটনা পরম্পরায়। প্রায় দুই ঘন্টার নাটকে এক ঘোর লাগা নস্টালজিয়ায় ইতিহাস ভ্রমণে মেতেছিলেন তপন থিয়েটার মঞ্চের উপস্থিত দর্শকমণ্ডলী।

নাটক শেষে কলকাতার থিয়েটারের অনেক প্রতিথযশা নাট্যব্যক্তিত্ব মঞ্চে উঠে পালাকার নাট্যদলকে তাঁদের সেই ইতিহাস ভ্রমণের অভিজ্ঞতা শোনান। পাশাপাশি সেই ঐতিহাসিক স্মৃতিময় নস্টালজিক অভিজ্ঞতা শোনানোর ফাঁকে ফাঁকে তাঁরা পালাকারের নারীগণ প্রযোজনার ব্যাপক প্রশংসা করেন।

নারীগণ নাটকটিতে সহনির্দেশকের ভূমিকা পালন করেছেন আমিনুর রহমান মুকুল। এছাড়া শিরাজের খালা ঘসেটি বেগম চরিত্রে অভিনয় করেছেন ফাহমিদা মল্লিক শিশির।

ডালিম চরিত্রে মেরিনা অবনী, পায়েলী চরিত্রে তিথি দাশ সাথী, নবাব শিরাজের চরিত্রে শামীম সুফী, কুতুব-১ চরিত্রে শাহরিয়ার খান রিন্টু, কুতুব-২ চরিত্রে সানসি ফারুক, কুতুব-৩ চরিত্রে শামীম সাগর, কুতুব-৪ চরিত্রে সেলিম হায়দার, আলিবর্দী খাঁ চরিত্রে ফাইজুর মিল্টন, মাঝি চরিত্রে হিমালয় নিমগ্ন অরিত্র, প্রহরী-১ চরিত্রে আমিনুর রহমান মুকুল, প্রহরী-২ চরিত্রে ইমরান হোসেন, প্রহরী চরিত্রে মুরাদ, বাঁদি চরিত্রে নভেম্বর টুইসডে রোদ।

নারীগণ নাটকের মঞ্চ পরিকল্পনা করেছেন অনিকেত পাল বাবু। আলোক পরিকল্পনা : ঠাণ্ডু রায়হান, সংগীত পরিকল্পনা : অজয় দাশ, পোশাক পরিকল্পনা : লুসী তৃপ্তি গোমেজ, নাটকটির পোস্টার পরিকল্পনা করেছেন দিলারা বেগম জলি এবং প্রযোজনা করেছেন আমিনুর রহমান মুকুল। ‘

অন্যদিকে ১৮ জুন ২০১৫ সালে নাট্যসারথী আতাউর রহমানের ৭৪তম জন্মবার্ষিক উপলক্ষ্যে বাংলাদেশের শিল্পকলা একাডেমির এক্সপেরিমেন্টাল থিয়েটার হলে নারীগণ নাটকটির মঞ্চপ্রদর্শন হয়। উল্লেখ্য যে নারীগণ নাটকের এ প্রদর্শনীতে নাট্যকার সৈয়দ শামসুল হক সস্ত্রীক দর্শক সারিতে বসে নাটকটি উপভোগ করেছিলেন।

তিনি নির্দেশক আতাউর রহমানের নির্দেশনায় এতটাই মুগ্ধ হয়েছিলেন যে নাটকের শেষে দর্শক আসন থেকে উঠে দাঁড়িয়ে প্রবল আবেগে নাট্যনির্দেশককে আলিঙ্গন করেছিলেন। এ নাটকটির কুশলী নির্দেশনা প্রসঙ্গে সে সময়ে দৈনিক কালের কণ্ঠের বিনোদন সাংবাদিক যে পর্যবেক্ষণ উপস্থাপন করেছিলেন পত্রিকার পাতায়, প্রসঙ্গত সেটি এখানে উল্লেখ করা যেতে পারে :

চারিদিকে যুদ্ধের দামামা মৃদু থেকে মৃদুতর হয়, হাহাকারের মাত্রা বাড়তে থাকে, স্পষ্ট থেকে আরো গভীর হয় নারীদের আর্তচিৎকারের করুণ রস। শুরু হয় নারীগণ নামক মঞ্চ আখ্যান। প্রযোজনার মূল অংশ শুরু হয় সিরাজের মাতামহ শরিফুন্নেসা চরিত্রের ফারহানা মিঠু, মা আমিনার ভূমিকায় থাকা দীপ্তা লাভলী, স্ত্রী লুৎফার চরিত্রে রূপদানকারী তানিয়া হোসাইন ও বাঈজিবেশে জয়িতা মহলানবিশের কথোপকথন। এই চার নারী অভিনয়শিল্পীর অভিনয়ই মূলত নারীগণ-এর আবেদন দর্শকের মধ্যে দীপ্ত শিখার মতো পৌঁছে দেয় অনায়াসে অবলীলায়।

 

নারীগণের শৈলিবিচার

 

সেই সঙ্গে ভাগীরথী দিয়ে নবাবের পালিয়ে যাওয়ার জন্য ব্যাকস্টেজে নদীর আবহ ফুটিয়ে তোলা, দ্বিতল মঞ্চের যথাযোগ্য ব্যবহার, প্রসেনিয়ামের স্বাদ দিতে যথার্থ চিত্র চিত্রণ, দর্শকের মাথার ওপরের দিকে পাত্র-পাত্রীর অনায়াস যাত্রা, একেবারেই নিরাভরন মঞ্চে সামান্য কিছু সিল্কের কাপড়ের পর্দা দিয়ে নবাবের সিংহাসন, জেনানামহলের চিত্রকে দারুণভাবে ফুটিয়ে তোলাসহ সামগ্রিকভাবে নাট্য-উপস্থাপনের মাধ্যমে আতাউর রহমান বরাবরের মতো তাঁর দক্ষতার স্বাক্ষর রেখেছেন।

নাট্যকার একটি নারীবাদী সুরকে কখনো দর্শককে সরাসরি নারীবাদী হিসেবে ভাবতে না দিয়েই ঠিকই মূল কথাগুলো বলে গেছেন। এটাই হয়তো সব্যসাচী লেখক সৈয়দ শামসুল হকের কৃতিত্ব।

লাইভ মিউজিক, আলোর পরিমিতিবোধ ও দৃশ্যের স্বাদ বুঝে কিছু ঠুমরির ব্যবহার গল্পকে আরো বেশি জীবন্ত করে তোলে। নারীগণ অন্যরকম এক সফল মঞ্চ প্রয়াস।’

নারীগণ নাটকে শরিফা বেগম চরিত্রে অভিনয় করা নাগরিক নাট্যসম্প্রদায়ের নন্দিত অভিনেত্রী ফারহানা মিঠু এক লেখনীতে এই নাটকে অভিনয়ের অভিজ্ঞতা এবং নাট্যকার সৈয়দ হক প্রসঙ্গে স্মৃতিকাতর হয়ে বলেছেন :

এখন ভাবতে বসলে নিজেকে অনেক বেশি সৌভাগ্যবান বলে মনে হয় কারণ আমি তাঁর সে নাটকে অভিনয় করি সেই কাব্যনাটক নারীগণ তিনি একবার নয়, অনেক অনেক বার দেখেছেন। দেশে থাকলে এবং যদি ব্যস্ত না থাকতেন অবশ্যই নারীগণ দেখতে আসতেন। প্রথমে নারীগণ করা হতো প্রসেনিয়াম ভেঙে । তিন দিকে গ্যালারির মতো করে দর্শকদের বসবার জায়গা আর মাঝখানের পুরো অংশ জুড়ে অভিনয়ের মঞ্চ।

আমরা অভিনয় শিল্পীরা অনেক সময়ই অভিনয় করতে করতে দর্শকদের অনেক কাছে চলে যেতাম। অনেক অভিনয় শিল্পী দর্শকদের মধ্য দিয়েই হেঁটে মঞ্চে প্রবেশ করতেন। যেমন নর্তকী আলেয়া। দর্শকদের মধ্য দিয়েই হেঁটে মঞ্চে প্রবেশ করতেন। আবার ক্রন্দনরত অবস্থায় বেরিয়েও যেতেন দর্শকদের মধ্য দিয়ে। এই নর্তকী আলেয়া নারীগণ নাটকের শেষ অংশে যখন বলে ‘নিহত নবাব নন, নিহত বিশ্বাস আর সরলতাই এখন।

তখন মঞ্চে অভিনয়রত আমি বহুবার খুব কাছে দর্শকসারিতে বসে থাকা হক ভাইকে দেখেছি তাঁর অশ্রুসজল চোখ রুমালে মুছতে। আবেগাপ্লুত হক ভাই- নরম কাদামাটির হৃদয়ের হক ভাই। নারীগণ নাটকের সংলাপ একটি নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে তো আবদ্ধ নয়। নারীগণ নাটকের প্রতিটি সংলাপ সত্যভাষণ।

আজও সত্য আগামীতেও সত্য। […] আমি একজন অভিনয়শিল্পী, তাই সৈয়দ শামসুল হকের লেখা মঞ্চনাটক সম্পর্কে বিশেষ করে বলতে চাই যে – সৈয়দ শামসুল হকের লেখা নাটকের সংলাপের মধ্যেই অভিনয়ের ইঙ্গিত নিহিত আছে। একজন অভিনয়শিল্পী তাঁর লেখা সংলাপের মধ্যে থেকেই অভিনয় করার দিক নির্দেশনা পান।

সৈয়দ শামসুল হকের লেখা নাটকের প্রতিটি দাঁড়ি, কমা, সেমিকোলন, শব্দচয়ন – মূলত অভিনয়শিল্পীর জন্য দিক নির্দেশনা হিসেবে কাজ করে। এই সব কিছু বলে দেয় অভিনয়শিল্পী কখন, কোন দিকে, কীভাবে নিয়ে যাবেন তার অভিনয় শৈলীতে। আজ বড় বিষণ্ন মনে রন্ধে রন্ধে অনুভব করি বাংলা সাহিত্যের এই শক্তিশালী নাট্যকারের অনুপস্থিতি।

সৈয়দ শামসুল হকের অন্যান্য কাব্যনাটকের মতো এ-নাটকেও ভাষার নান্দনিক প্রকাশ ঘটেছে। যেহেতু নবাবি আমলের ইতিহাসকে প্রেক্ষাপট করে তিনি এ নাটকটি রচনা করেছেন, সেহেতু নাটকের ভাষায় তাঁর অন্যান্য কাব্যনাটকের ভাষার তুলনায় আরবি-ফার্সি শব্দের আধিক্য অধিক পরিলক্ষিত হয়। তবে তিনি চরিত্র উপযোগী লোকায়ত ভাষা, তৎসম, তদ্ভব শব্দেরও প্রয়োগ করেছেন সংলাপ ও ঘটনার প্রয়োজনানুসারে।

নবাব মহলের নারীদের নিয়েই যেহেতু এ নাটক, সেহেতু উপমা, চিত্রকল্প, অলংকার নির্বাচনে তিনি মুসলিম উচ্চবিত্তের জীবনাচারকে বিবেচনায় রেখেছেন। এমনকি নবাব মহলের রাজদরবারের সংস্কৃতি, ভাষা, আভিজাত্য অক্ষুণ্ণ রেখেছেন অসাধারণ দক্ষতায়। তাঁর নাট্যভাষায় একই সঙ্গে সঞ্চারিত হয়েছে নবাবি আমেজ, লোকজ সংস্কৃতি ও সংস্কৃতবহুল মিলিত ঐশ্বর্য।

এই নাটকে আমিনা চরিত্রটি প্রগতিশীল ও বিপ্লবী। তিনিই নাটকে একমাত্র বাস্তবতার ভিত্তিতে কথা বলে গেছেন; প্রতিবাদ করেছেন পুরুষতান্ত্রিক সমাজের অনিয়মের বিরুদ্ধে; সমাজ কিংবা রাজনীতি সর্বক্ষেত্রে আমিনার দ্রোহ সুস্পষ্ট। নাট্যকার এই প্রতিবাদী নারীর সংলাপ রচনায় তাই সংস্কৃতশব্দবহুল শুদ্ধ, রুচিশীল বা পরিশীলিত বাংলাভাষা প্রয়োগ করেছেন।

শরিফা বেগম যখন আমিনার এই দ্রোহমিশ্রিত ভাষাকে অশিষ্ট আখ্যা দিয়ে তিরস্কার করে বলেন – যার মুখে এতদিন লক্ষ্ণৌ, দিল্লির শীলিত শব্দা ছাড়া অন্য শব্দ ছিল না, সে কেন আজ এমন অশিষ্ট বচন বলছে। তখন আমিনা বলেছেন – কাল যখন দুঃশীল হয়, সুশীল কৃত্রিম ভাষা তখন ঠোঁটে ফোটে না। সমাজে নারীর বৈষম্যপূর্ণ অবস্থান নিয়ে সংস্কৃতশব্দবহুল ভাষায় সে জানিয়েছে :

পুরুষের চোখে

নারী শুধু রূপবতী অথবা সে কুৎসিত কুরূপা –

মেধাবী বা বুদ্ধিমতী নয় ।

শরীর চিক্কণ মেদে, বুদ্ধিতে নিরেট!

যৌবনে নারীর মূল্য শয্যায় সে পরী –

বৃদ্ধকালে দাসীর অধম!

নারীরত্ন বলা হয়, রত্নের মতোই

নারীকে সিন্দুকে বন্দী করে রাখা হয় –

মানে অন্দর মহলে, প্রাচীরের ঘেরা টোপে সুরক্ষিত করে। (কাব্যনাট্যসমগ্র : ৩৯৪)

 

নারীগণের শৈলিবিচার

 

অন্যদিকে অপেক্ষাকৃত রক্ষণশীল চরিত্র শরিফা বেগমের মুখের সংলাপে আরবি-ফার্সিশব্দবহুল সংলাপ যুক্ত
করেছেন নাট্যকার :

ভাষা! ভাষা! ভাষা ঠিক রাখ। পুত্রবধূ সমুখেই –

তমিজ লেহাজ নেই! এই তোর ভাষা! ( কাব্যনাট্যসমগ্র : ৩৯৩)

আবার তিনি চরম উত্তেজনার মুহূর্তে আত্মনিয়ন্ত্রণে ব্যর্থ হয়ে নবাবি সংস্কৃতি ছেড়ে মেয়েকে সম্বোধন করেছেন একবারে বাঙালি ঘরের নিত্যব্যবহার্য শব্দসহযোগে :

নির্লজ্জ! মুখরা! ধর্, ওকে ধর, পোড়ামুখী। ( কাব্যনাট্যসমগ্র : ৩৯৩)

অপরদিকে, নাট্যকার প্রহরীদের মুখের ভাষা তাদের শ্রেণি-পেশা অনুযায়ী প্রয়োগ করেছেন, যেখানে ইতর ও অশ্লীল ইঙ্গিতসমৃদ্ধ শব্দও রয়েছে :

প্রহরী ১।

আই বাপ্, গোরার বজরা! লাল কুর্তি। লাল মুখ

বিলাতি বন্দুক হাতে গিটমিট হুটহাট ভাষা!

[… করা যাবে! গোরার মুখের খানা!

রাজ্য ওরা গিলে খায়! আমাদের গিলতে কতক্ষণ!

প্রহরী ২।

গিলুক ! গিলুক ! গিলে গিলে ওলাওঠা হোক! […]

লাড্ডু কি বলিস ভাই, ডালিম, ডালিম!

আহা, এই পাকা পাকা ডালিম কামড়ে খাবে ?

গোৱালোগ খাবে ! মেরালোগ তাকিয়ে দেখবে! (কাব্যনাট্যসমগ্র : ৪০৫)

কোনো কোনো চরিত্রের সংলাপে নাট্যকার নবাব মহলের রুচি ও সংস্কৃতি অনুসরণে উর্দু, ফার্সি, আরবি শব্দবহুল ভাষার পাশাপশি ফার্সি কবিদের লেখা শের বা কবিতার অংশবিশেষ হুবহু তুলে ধরেছেন । যেমন শিরাজের মাতা আমিনা যখন শিরাজের মাতামহী শরিফা বেগমের সঙ্গে নারীদের অবস্থান নিয়ে কথোপকথন করছে, তখন তাদের পারস্পরিক আলাপে চমৎকারভাবে এই সংস্কৃতি স্পষ্ট হয়েছে :

আমিনা।

[…] আম্মা, বয়েত ঝাড়ুন

ফার্সি কোন কবির – হাফিজ রুমি ভুলে গিয়েছেন ?

আপনারই কাছে সব শেখা। দাস্তা- গোলেস্তা মসনবী।

যদি ইজাজৎ হয় তবে আমিই শোনাই ?

শরিফা।

ইরশাদ

আমিনা।

গাজি কে পায়ে শাহাদাৎ আন্দার ভাগো পোস্ত ।

গাফেল কে শহীদে এস্ক্ ফাজেল্তার আজ দাস্ত ।

ফায়দায় কেয়ামাৎ ই বা আঁ কোন্তায়ে দোত্ ।

ই কোস্তা দুশমানাস্ত্ ওঁয়া কোস্তায়ে দোত্। (কাব্যনাট্যসমগ্র : ৪০০ )

তবে সৈয়দ শামসুল হক নাটকে ফার্সি কবিতার লাইন হুবহু তুলে দিলেও বাঙালি পাঠক ও দর্শকদের জন্য পরক্ষণে শরিফা চরিত্রের সংলাপের মাধ্যমে তার চমৎকার বঙ্গানুবাদ করে দিয়েছেন; যেটি এই কবিতা
প্রয়োগের যথার্থতা প্রমাণ করেছে :

শরিফা।

শুনে চোখ ভিজে আসে, ওরে। মনে পড়ে

তোর আব্বা আলিবর্দী খান একদিন

শিরাজকে লেখা এক পত্রে ওই বয়েৎ লেখেন –

ধর্মের রক্ষায় যারা সম্মুখ সমরে

প্রাণ দিতে এতটুকু ডর নাহি করে

যাদের স্মরণ পথে হয় না উদয়

সংসার সংগ্রামে যাৱা, তারাই নিশ্চয়

গাজীর চেয়েও বড়, কারণ সংসারে

স্বজনের শত্রুতা যে প্রীতির আকারে। ধর্মবীর শত্রুহস্তে হত যদি হন,

সংসার-বীরের মৃত্যু ঘটায় স্বজন। (কাব্যনাট্যসমগ্র : ৪০০ )

 

নারীগণের শৈলিবিচার

 

পলাশির ট্রাজিক পরিণতি যেহেতু এ নাটকের নেপথ্য প্লট, তাই নাটকের ভাষায় নাট্যকার আবেগাত্মক পরিচর্যারও (Emotional Treatment) শরণ নিয়েছেন। নাট্যকার আলোচ্য নাটকে যেখানে দর্শকের মনে আবেগের সঞ্চার করতে চেয়েছেন, সেখানে ছোট ছোট বাক্যে, ঘন ঘন বিরাম চিহ্নের ব্যবহারে ভাষাকে ঝরনার মতো বহমান করে তুলেছেন। যেমন, নিজ দেহরক্ষী মোহাম্মদী বেগের হাতে শিরাজের মর্মান্তিক মৃত্যুর পরবর্তী পর্যায়ে ভাষা-সংলাপে আবেগাত্মক ব্যবহার উল্লেখ্য :

রক্তাক্ত শরীর ছেড়ে আত্মা তাঁর গেলো ঊর্ধ্বলোকে –

যেখানে নবাবী নেই, দরবার নেই, পাত্রমিত্র কেউ নেই

মাথার মুকুট নেই, তোরণে নকিব নেই, খেলাৎ খেতাব নেই,

বানিজ্যের সনদ দস্তক নেই, বিদেশী বণিক নেই,

স্বদেশীয় শেঠ নেই, সৈন্য নেই, সেনাপতি নেই,

শত্রু নেই, যুদ্ধ নেই, সন্ধি নেই, জয় কিম্বা পরাজয় নেই,

ক্ষমতার দ্বন্দ্ব নেই, সিংহাসন নিয়ে কোনো ষড়যন্ত্র নেই,

বিশ্বাসঘাতক নেই, কৃতঘ্ন ঘাতক নেই – (কাব্যনাট্যসমগ্র : ৩৭৮)

এছাড়াও নারীগণ নাটকের ভাষার নান্দনিকতা সৃষ্টিতে সৈয়দ শামসুল হকের উপমা, উৎপ্রেক্ষা, রূপক, প্রতীক প্রভৃতি অলঙ্কার প্রয়োগের কৃতিত্ব দৃষ্টান্ত হিসেবে উপস্থাপন করা হলো :

উপমা :

১. জেনানা বন্টন করে নেবে ওরা দুম্বার মাংসের মতো। (কাব্যনাট্যসমগ্র : ৩৯৩)

২. নারীরত্ন বলা হয়, রত্নের মতোই

নারীকে সিন্দুকে বন্দী করে রাখা হয় – (কাব্যনাট্যসমগ্র : ৩৯৪)

উৎপ্রেক্ষা

১. হৃদয় কম্পিত হলো, যেন অকস্মাৎ

ফাঁদের গহবরে পড়ে বিমূঢ় শার্দুল। (কাব্যনাট্যসমগ্র : ৩৭৭)

২. তবে কেন এমন চেহারা আজ যেন ঈগলের ডানা

ভেঙে গেছে ঝড়ে, বজ্রপাতে নবাবী নিশান

পড়ে গেছে প্রাসাদের শীর্ষ চূড়া থেকে। (কাব্যনাট্যসমগ্র : ৩৯১)

৩. কেন আজ আপনাকে দেখে মনে হচ্ছে

যেন ভাগিরথী তীরে বাজপড়া বৃক্ষ এক

লোকশূন্য গ্রামের কিনারে ? ( কাব্যনাট্যসমগ্র : ৩৯২)

৪. রাজ্যলোভ, অর্থলোভ, একসঙ্গে চলে –

এ দুটি এমন লোভ যেন দুই চাকি যাঁতাকলে!

এর চাপে চূর্ণ হয় নীতি আর সততারও সফেদ পাথর ! (কাব্যনাট্যসমগ্র : ৪০১ )

৫. প্রজার জীবন যেন বৃক্ষ এক শেকড়ে সুস্থির। (কাব্যনাট্যসমগ্র : ৪০৬)

রূপক / প্রতীক

১. সবগুলো দরোজার পাল্লা ভেঙে গেছে, আম্মা,

বিশ্বাসের সমস্ত দরোজা। (কাব্যনাট্যসমগ্র : ৩৮৩)

২. রাজনীতি শতরঞ্জ খেলায়

নারী তো আসলে এক সামান্যই বড়ে –

তাকেও না খেলে বুঝি কিস্তিমাত্ হয় ? ( কাব্যনাট্যসমগ্র : ৩৮৫)

৩. বাজারে দিনের শেষে পড়ে থাকা সবজি সে কুড়োবার নয় –

তার চোখ আস্ত গোটা বাজারের দিকে? (কাব্যনাট্যসমগ্র : ৩৯৫)

৪. কণ্ঠ থেকে ছিড়ে নিয়ে গেছে তোর কণ্ঠহার।

কালের থাবা কি তবে এতই নিমর্ম

শাশুড়ি ও পুত্রবধূ হয় একই ব্যাধের শিকার! (কাব্যনাট্যসমগ্র : ৩৯৮)

চিত্রকল্প

১. যখন দিনের আলো রক্তলাল হয়, সন্ধ্যা নামে,

দিবসের লাশের পঞ্জরে

যখন দাঁড়ায় এসে ঘোর অন্ধকার

তখন আকাশে – ওই ঈশ্বরের অসীম কপোলে

অশ্রুদল ফুটে ওঠে, ঝরে, ঝরে পড়ে,

যত দীর্ঘ হয় রাত, তত অশ্রু ঝরে ইতিহাসে। (কাব্যনাট্যসমগ্র : ৩৭৯)

সমাসোক্তি :

১. কখন হয়েছে রাত্রি, সূর্যঘড়ি বিকল, অথচ

প্রাসাদের বারুকা-ঘড়িতে কাল ঝরেই চলেছে। (কাব্যনাট্যসমগ্র : ৩৮০ )

২. ভাগীরথী, কোরো না ক্রন্দন। (কাব্যনাট্যসমগ্র : ৩৮২)

৩. আজ নারী বিনা আর কেউ কাঁদবার নেই,

তাই মুর্শিদাবাদ কাঁদছে, প্রাসাদের পাথর কাঁদছে –

উদ্যানের তরুবীথি ঝাউবৃক্ষ ফুঁপিয়ে কাঁদছে –

ছলছল কেঁদে যাচ্ছে ভাগীরথী হীরাঝিল ছুঁয়ে।

মানুষ কৃতঘ্ন তাই নদী, পাথরেও কাঁদে। (কাব্যনাট্যসমগ্র : ৩৯৩)

৪. গর্ভপাত ঘটেছে মাটির।

তার চৌচির জরায়ু থেকে

কিমাকার অন্ধকার দলা দলা গড়িয়ে পড়ছে। (কাব্যনাট্যসমগ্র : ৩৯৯)

৫. ভাগ্যে ছিলো, ভাগ্যের পতন । স্বজনের ছুরিতে নিধন।

নিহত নবাব নন, নিহত বিশ্বাস আর সরলতাই এখন। (কাব্যনাট্যসমগ্র : ৪২৪ )

 

নারীগণের শৈলিবিচার

 

বাগধারা / প্রবাদ / প্রবাদপ্রতিম বাক্য :

১. বিপন্ন সময়ে কেউ আত্ম ছাড়া চেনে না অপর ! – (কাব্যনাট্যসমগ্র : ৩৭৫)

২. ইতিহাস একচক্ষু নয়,

কাল একপক্ষ নয় তিনপক্ষ তার –

অতীত, ভবিষ্য আর মধ্যভাগে এই বর্তমান।

খনন যে করে কাল সেই খালে নিজেই সে পড়ে।

বর্তমান ঘটনাই ভবিষ্যৎ গড়ে। (কাব্যনাট্যসমগ্র: ৩৮১)

৩. যুদ্ধের প্রান্তরে নয়, জয়-পরাজয়

নারীর শরীরে হয় নির্ধারিত-ইতিহাসের রয়েছে প্রমাণ। (কাব্যনাট্যসমগ্র : ৩৮৫)

৪. জগতের রীতি এই ।

উপকার ভুলে যায় উপকার করা হয় যার।

সিঁড়ি বেয়ে উঠবার পর

যখন ওপর থেকে দেখা যায় দুনিয়া কী মনোহর,

তখনই তো মনে হয় একমাত্র ক্ষুণ্ণ যা করছে

সে ওই সিঁড়িটা ।

আর তখন সিঁড়িটা লাথি মেরে ফেলে দেয়া হয়। (কাব্যনাট্যসমগ্র : ৩৯৫)

৫. নারী যদি বিষময়ী হয় –

তার কাছে পুরুষেও হার মানে, জানেন নিশ্চয় । (কাব্যনাট্যসমগ্র : ৩৯৬)

৬. বীরের বীরত্ব শুধু তরবারি চালনার দক্ষতায় নয়

তার সঙ্গে থাকা চাই ভাগ্য আর সদয় সময়। (কাব্যনাট্যসমগ্র : ৩৯৮)

অতএব বলা যায়, বিষয়বস্তুর অনন্যতায়, বোধের গভীরতায়, চরিত্র নির্মাণের দক্ষতায়, সর্বোপরি সংলাপের ‘, নান্দনিকতায় সৈয়দ শামসুল হকের নারীগণ কাব্যনাটকটি বাংলাসাহিত্যে একটি উল্লেখযোগ্য সংযোজন ।

Leave a Comment