আজকে আমরা আলোচনা করবো নাগিনী কন্যার কাহিনী উপন্যাসে বিষবেদে জীবনের রূপায়ণ। যা তারাশঙ্করের তিনটি উপন্যাস : কৌমজীবনের রূপায়ণ এর তারাশঙ্করের উপন্যাসে কৌমজীবনের রূপায়ণ এর অন্তর্ভুক্ত।

নাগিনী কন্যার কাহিনী উপন্যাসে বিষবেদে জীবনের রূপায়ণ
সমাজের প্রান্তবাসী অন্ত্যজ মানুষের সুখ-দুঃখ, হাসি-কান্না, সংস্কার ও বিশেষ বিশ্বাস এবং তার বিবর্তনের শিল্পরূপায়ণই ছিল তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়ের সাহিত্যসাধনার অভীষ্ট। রাঢ় অঞ্চলে বিচিত্র আদিবাসী অন্ত্যজ কৌমগোষ্ঠীর মধ্যে বেদে সম্প্রদায়ের প্রতি বিশেষ দুর্বলতা ছিল তাঁর। বেদে সম্প্রদায়ের প্রতি তারাশঙ্করের ব্যক্তিগত আগ্রহ ও বিশেষ দুর্বলতাই তাঁকে এই গোষ্ঠীর জীবনমান, ঐতিহ্য ও সংস্কৃতির শিল্প রূপায়ণে প্রাণিত করেছে।
প্রাচীন বেদে কৌমের একটি শাখা সম্প্রদায়ের নাম বিষবেদে। এদের আদি নিবাস সাঁওতাল পরগণা বা সাঁতালীর সমতল ভূমি। এই সাঁতালীর বিষবেদেদের মিথ আশ্রিত জীবনালেখ্যই আলোচ্য নাগিনী কন্যার কাহিনী (১৯৫১) উপন্যাসের কথাবস্তুর ভিত্তি।
একদিকে প্রবহমান স্রোতোস্বিনী গঙ্গা, অন্যদিকে সাঁতালী পাহাড়, আর তার মধ্যবর্তী স্থানে হিজল বিলের অবস্থান। সেই বিলের ধারেই বিষবেদে জনগোষ্ঠীর বসবাস। উপন্যাসের শুরুতে লেখক হিজল বিলের অপূর্ব এক পারিবেশিক চিত্র নির্মাণ করেছেন। হিজল বিলের জলে অসংখ্য সাপের চলাচল। বিল ঘেঁষা ডাঙ্গায় আনাগোনা রয়েছে হিংস্র বাঘের, গাছে গাছে বিষপিল সাপের অস্তিত্ব আর আকাশে গগন ভেরী পাখির ডাক, এই নিয়ে হিজল বিলের ভয়ংকর সুন্দর পরিবেশ।
ঔপন্যাসিক বিলের যে ভয়ানক চিত্র বর্ণনা করেছেন তার সাথে উপন্যাসের এই বিষবেদে সম্প্রদায়ের জীবন-বাস্তবতা যথার্থই সাযুজ্যপূর্ণ। বিপদসঙ্কুল যাযাবর জীবনে অভ্যস্ত বিষবেদে-দেরই যেন এমন ভয়ংকর সুন্দর পরিবেশে মানায়।
তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়ের নাগিনী কন্যার কাহিনী উপন্যাসে হিজল বিলের বিষবেদে সম্প্রদায়ের উপকথা-নিয়ন্ত্রিত জীবনকথা রূপায়িত হয়েছে। এই বিষবেদে গোষ্ঠীর গোটা জীবনটাই উপকথার ইন্দ্রজালে আবদ্ধ। লেখক মিথের ব্যবহারে আশ্চর্য দক্ষতার পরিচয় দিয়েছেন। মূল উপকথার অনুষঙ্গে যথার্থ ভাবেই উপন্যাসে এসেছে চম্পকনগর-কেন্দ্রিক বাংলার চিরায়ত লোককথাটিও।
হিজল বিলের বিষবেদে সম্প্রদায় একালের মানুষ হয়েও প্রাগৈতিহাসিক যুগের অচ্ছেদ্য নিয়ন্ত্রণে বাঁধা। তাদের জীবনাচার, মূল্যবোধ, অনুভূতি, বুদ্ধি ইত্যাদি পরিচালিত হয় দৈব ও অলৌকিক বিশ্বাসের অনুশাসনে, যুক্তিহীন সংস্কারাচ্ছন্নতার মধ্যে।
এসব সংস্কার আর বিশ্বাসের জগৎটা তাদের কাছে এমনই অবশ্যম্ভাবী যে, ওই মানুষগুলোকে অনুধাবন করতে হলে – তারা যে মিথ বা উপকথার আদিম বিশ্বাসের জগতের অধিবাসী সেই উপকথার জগৎটাকে সর্বাগ্রে আয়ত্ত করা জরুরি। নাগিনী কন্যার কাহিনী উপন্যাসটি শিব-মনসা এবং মনসা-চাঁদসওদাগর-বেহুলা-লক্ষ্মীন্দর কেন্দ্রিক প্রচলিত মিথকে আশ্রয় ও মান্য করেই রচিত।
হিজল বিলের বিষবেদে সম্প্রদায়ের জীবনাচারে-ধর্মে এবং বিশ্বাসে সংস্কারে সংলিপ্ত হয়ে আছে ওই মিথনির্ভর গাথা ও কাহিনী। মূল মিথে ছিল- শিব কুলীন দেবতা, তিনি মর্ত্যলোকে ইতর-ভদ্র নির্বিশেষে সকলের পূজা পান। কিন্তু শিবের মানসকন্যা মনসা নিচু কুলের দেবী। তিনি অভিজাত বণিক-ধনিক শ্রেণির পূজা লাভে আগ্রহী হলেন। এই আকাঙ্ক্ষা সূত্রেই চাঁদ সওদাগরের প্রতি তাঁর দৃষ্টি আকৃষ্ট হল ।
মনসা ভাবলেন চাঁদ সওদাগরের পূজা পেলে তিনি অভিজাতের দেবী বলে পরিগণিত হবেন। চাঁদ একগুঁয়ে চরিত্রের অধিকারী; সে যে হাতে শিবের পূজা করে সেই হাতে ওই ‘কানী’ মনসার পূজা সম্পাদনে নারাজ। একদিকে চাঁদ তাঁর প্রতিজ্ঞায় অটল অন্যদিকে মনসাও তাকে রেহাই দিতে অপ্রস্তুত। ফলে মানব ও দেবতার এই দ্বন্দ্ব চরমে ওঠে। মনসা ও চাঁদের মধ্যে এই অমীমাংসিত দ্বন্দ্ব তৈরি করে প্রতিহিংসা-পরায়ণ সম্পর্কের। শুরু হয় স্বর্গ-মর্তের লড়াই। এই দ্বন্দ্বে অংশত জড়িয়ে পড়েন দেবাদিদেব মহাদেবও।

সর্পদেবী মনসা চাঁদ সওদাগরের বশ্যতা লাভের জন্য সর্প দংশনে কেড়ে নিলেন তার ছয় পুত্র, চাঁদের সপ্তডিঙ্গা মধুকর ডুবিয়ে নিয়ে রাখলেন হিজল বিলে, যেখানে তাঁর আসন ও অধিষ্ঠান। তবুও চাঁদ দেবী মনসার বশ্যতা স্বীকার করল না। চাঁদ সওদাগরকে রিক্ত, নিঃস্ব করে দিয়েও পিছু ছাড়লেন না মনসা। চাঁদের দাম্ভিকতাকে চূর্ণ করতে তবু ব্যর্থ হলেন তিনি। চাঁদ সওদাগরের গৃহে এলো চাঁদের ন্যায় ফুটফুটে ছেলে লক্ষ্মীন্দর, গণকরা গণনা করে বলল বাসরঘরে সর্পাঘাতে মৃত্যু হবে লক্ষ্মীন্দরের।
বেদেদের আদি গুরু ‘ধন্বন্তরী’ বিশ্বন্তর ছিল চাঁদ সওদাগরের মিতা; মনসার বিবাদী সেও মহাজ্ঞানের অধিকারী ধন্বন্তরীর মন্ত্রপ্রাপ্ত বিষবেদে সম্প্রদায়ের সর্দার শিরবেদেকে চম্পাইনগর সুরক্ষার দায়িত্ব দিল চাঁদ সওদাগর। বিষবেদে সম্প্রদায়ের আদি-শিরবেদে মন্ত্রোচ্চারণ করে সীমানা চিহ্নিত করে দিল। ‘সাঁতালী’ গাঁয়ের। চাঁদ লক্ষ্মীন্দরকে বিয়ে দিল এক বেনে কন্যার সঙ্গে। লোহার ছিদ্রহীন বাসরঘর তৈরি করা হল নবদম্পতির জন্য। যাতে মনসার অধীন নাগিনীরা দংশন করতে না পারে লক্ষ্মীন্দরকে।
বেহুলা- লক্ষীন্দরের বাসর-রাতে শিরবেদে রইল অতন্দ্র প্রহরী হয়ে। বহির্শত্রুর আক্রমণ থেকে রক্ষা পাওয়ার জন্য মন্ত্রপূত করা হল সুনির্দিষ্ট ভূমিখণ্ড। ‘নেউলে-মউরেরা’ সতর্ক রইল। তবু নিয়তির ইচ্ছায় মনসার পাঠানো কালনাগিনী ছলনার আশ্রয় নিয়ে এগিয়ে গেল যন্ত্র পড়া সীমানার ধারে কিন্তু কিছুতেই সীমানা ভেদ করতে পারল না ছদ্মরূপা ওই কালনাগিনী। নেউলে-মউরেরা সতর্ক করে দিল। মন্ত্রপূত মাটির ঝাঁঝালো গন্ধে এলিয়ে পড়ল ছোট মেয়ের ছদ্মবেশিনী সেই নাগিনী।
কিন্তু নিয়তির ষড়যন্ত্রে ঘটল ভিন্ন ঘটনা। এবার শিরবেদের মৃত কচি মেয়ের অবিকল রূপ ধরে নাগিনীটি ডাকল- বাবা-বাবা বলে। শিরবেদে ভুলল এ ছলনায়। মউর-নেউলেরাও সম্মোহিত হল। কারণ শিরবেদের যে মেয়ে সাপ-নেউলে-মউরের সঙ্গে নাচত এ তো সেই মেয়েরই অবিকল রূপ। শিরবেদে বিশ্বস্তুরের বুভুক্ষ পিতৃহৃদয় কন্যাকে বুকে নেওয়ার জন্য ব্যাকুল হয়ে উঠল।
মায়াবিনী নাগিনী কন্যা এবার শিরবেদেকে বলল- আমি তোমার কন্যা- পরজনমে নাগলোকে জন্মেছি। তোমার কোলে স্থান নেব বলে এসেছিলাম, তুমি নিলে না। শিরবেদে পাগলের মতো ছুটে গিয়ে মূর্তিমতি নাগিনী কন্যাকে বুকে তুলে নিয়ে বলল, আর আমাকে ছেড়ে যাবি না তো মা? কন্যা তিন সত্যি করল কখনো সে পিতৃবক্ষ পরিত্যাগ করে যাবে না। শিরবেদে বিষমন্ত্র সহ্য করার ঔষধ দিল মূর্তিরূপিণী কন্যাকে।
তুমড়ি বাঁশির তালে তালে নাচল শিরবেদে কন্যা। এইবার নাগিনী ধরল আসল রূপ, নাচের তালে তালে নাগিনীর বিষ- নিঃশ্বাসে গভীর ঘুমে অচেতন করে দিল সে শিরবেদেকে। গভীর নেশায় অচেতন হল শিরবেদে। নাগিনীর জিব-চেরা বিষাক্ত নিঃশ্বাসে লক্ষ্মীন্দরের বাসর ঘরের যে ছিদ্র কয়লা দ্বারা রুদ্ধ ছিল তা খসে গেল। এবার নাগিনী কন্যা আনল চরম আঘাত। বাসর ঘরে প্রবেশ করে দংশন করল লক্ষ্মীন্দরকে।
বেহুলা বিলাপ করে উঠল। অবশ্য বেহুলা জাঁতি দিয়ে নাগিনীর লেজ কেটে রেখে দিয়েছিল। চারদিকে হায় হায় রব উঠল সদ্য বিধবা বেহুলার কান্নায়। উন্মাদের মতো চাঁদ সওদাগর ছুটে এলো চম্পাইনরে প্রহরার দায়িত্বে নিয়োজিত শিরবেদের কাছে । ঢুলু ঢুলু চোখ নিয়ে তাকিয়ে নেশার ঘোরে সব শুনল শিরবেদে বিশ্বম্ভর। বুঝতে পারল সব ছলনা। নির্বাক রইল শিরবেদে অপমানে লজ্জায়। চাঁদ সওদাগর দিলে কঠিন শাস্তি সমস্ত বেদেকুলকে।
ভোর হওয়ার পূর্বেই চম্পাইনগর ছেড়ে চলে যাওয়ার নির্দেশ দিল চাঁদ সওদাগর। সেদিন থেকেই বিষবেদে সম্প্রদায় হল মানহারা, যাযাবর, অস্পৃশ্য। শিরবেদে হাহাকার করে উঠল। তার বিদ্যা-ধর্ম-সম্মান-মন্ত্রগুণ গেল, হারাল সে কন্যাকেও। ঝাঁপির ভিতর নাগিনী শিস্ দিয়ে জানাল তিন সত্যি-করা কন্যা রয়েছে তার জিম্মায়। নাগিনীটি বলল আমি থাকব তোমার ঘরেই। নাগিনী কন্যা হয়ে জন্মাব পুনরায়, আর বেদেকুলের মান রক্ষা করব সর্বদা। চলো মা বিষহরির আসনে। আমিই পথ দেখিয়ে নিয়ে যাব তোমাদের।
সেই থেকে বেদে সম্প্রদায় সব হারিয়ে যাযাবরের জীবন বেছে নিল। সাঁতালীর হিজল বিলের ধারে যেখানে চাঁদ সওদাগরের সপ্তডিঙ্গা মধুকর নিমজ্জিত ছিল, নাগিনী কন্যা নৌকার গলুই-এ বসে পথ দেখিয়ে নিয়ে এল সেখানে। পথে অনির্দিষ্ট যাত্রার ভয়ে অনেকে সঙ্গ ছাড়ল শিরবেদেদের। যারা সঙ্গ ত্যাগ করল না তারাই আসল বিষবেদে সম্প্রদায়ের অর্ন্তভুক্ত রইল। বাকিরা বেদেদের অন্যান্য শাখা- গোষ্ঠী রূপে গণ্য হল। বেদেদের উদ্ভব ও বিকাশের এই উপকথা সকল বেদের মুখস্ত।
চাঁদ সওদাগরের অভিশাপ নিয়ে শুরু হল বিষবেদের অনিশ্চিত নতুন জীবন। তবে মা বিষহরি রইলেন তাদের সর্বসহায় রূপে। আর নাগিনী কন্যা রইল বিষবেদের ঘরের শোভা বর্ধনের কাজে ; বংশের ঐতিহ্য, ধর্ম ও মান রাখতে। মনসার বরে বিষবেদেরা পেল সর্প-বিষহরণের ক্ষমতা ও নাগিনী কন্যা’।
উপর্যুক্ত উপকথাকে কেন্দ্র করেই বিষবেদেদের জীবন আবর্তিত। একটি উপকথা থেকে সৃষ্টি হয়েছে আরও নানা শাখা-উপকথার। এসব উপকথাই তাদের জীবনের নিয়ন্ত্রক ও পরিচালক। উপকথার উপর্যুক্ত স্তর বা পর্যায় থেকেই বেদেরা হল নতুন সমাজ-ধর্ম-বর্ণ ও জীবিকার মানুষ। শিবের উপাসক চাঁদের অভিশাপ মাথায় নিয়ে তারা হল মনসার কৃপাপ্রার্থী।
বেদে সমাজে এ কথা প্রচলিত আছে যে, যে-নাগিনী লক্ষ্মীন্দরকে দংশন করার জন্য শিরবেদের হারানো কচি মেয়ে সেজে এসেছিল, যার জন্য বেদেকুল সর্বরিক্ত হয়েছিল, সে কন্যা ফিরে আসবে যুগে যুগে। তাকে চিনে নিতে হবে, সমাদরে রক্ষা করতে হবে। বেদেকুলে জন্ম নেওয়া এই কন্যা স্বামীর সর্পদংশন-জনিত মৃত্যুর কারণে পাঁচ বছর বয়সেই বিধবা হবে। এরপর তার আর বিয়ে হবে না, ষোল বছর বয়সে এই মেয়ের মধ্যে পরিস্ফুট হবে নাগিনী লক্ষণ ।
কপালে ফুটে উঠবে ‘চক্ৰচিহ্ন’। সেই কন্যা নেবে কুলদেবী বিষহরির পূজার ভার। বেদে কুলের কল্যাণ প্রতিষ্ঠা করবে এই নারী। বিষহরির ইচ্ছার কথা নাগিনী কন্যা জানাবে বেদেদের। বেদেরা বংশ পরম্পরায় এ সত্য অবগত যে, স্বামীকে হত্যার কারণে বেহুলার অভিশাপে ওই নাগিনীর বংশের ধারাক্রম রহিত হয়েছে। অর্থাৎ সতী বেহুলার অভিশাপে কালনাগ হয়েছে নির্বংশ। আর তাই কালনাগিনীর দেহ লক্ষণযুক্ত হয়ে মর্তবাসিনী নাগিনীকন্যাও নিঃসঙ্গ, স্বামী ও সন্তানহীনা। অন্যের সান্নিধ্যে সন্তান লাভ করলেও সে হবে সন্তানঘাতিনী।

উপকথা-আশ্রিত বেদেজীবনের পরতে পরতে ছড়িয়ে আছে অসংখ্য উপকথা আর লোকপুরাণের কাহিনী। তারা জানে কালীয়নাগকে কৃষ্ণ দমন করেছিলেন কৌশলে। কালীয়নাগের কন্যাকে বিয়ে করার প্রতিশ্রুতি দিয়েও কৃষ্ণ আর ফিরে আসেননি।
সেই নাগকন্যা কৃষ্ণের অপেক্ষায় প্রতিদিন সন্ধ্যাবেলায় চাঁপাফুলে সজ্জিত হয়ে যমুনার তীরে ঘুরে বেড়াত আকুল হয়ে। আর তা নিয়ে নাগমেয়েরা কটাক্ষ করত কালীয়কন্যাকে। সেই কৃষ্ণাভিসারিনী নাগ কন্যা তাদের অভিশাপ দিয়ে বলেছিল- বিশেষ সময়ে যখন কোন নাগকন্যার হৃদয়ে যৌনবাসনা জাগ্রত হবে, তখন তার সর্বাঙ্গ থেকে উৎসারিত হবে চাঁপাফুলের গন্ধ । যা তাদের লজ্জার ও অপমানের কারণ হয়ে দাঁড়াবে।
এইসব পৌরাণিক কথা ও কাহিনী বেদেদের কণ্ঠস্থ। তাদের জীবনাচারের সবটাই নিয়ন্ত্রিত হয় এই কথা ও কাহিনীর আশ্রয়ে। বিষবেদে জীবন-সত্যও ছিল এসব উপকথা-কেন্দ্রিক। তাদের পুরাণকথায় আছে- নাগসেবা করে এক বণিক-বধূ নাগলোকে গিয়েছিল এবং সহস্র নাগের সেবায় ব্রতী হয়েছিল। তবে তার জন্য নিষিদ্ধ ছিল দক্ষিণ দিকে তাকানো। সেখানে মা মনসার ‘বারি’। একদিন গরম দুধে নাগদের মুখ-জিহ্বা পুড়ে গেলে রুষ্ট হল নাগেরা। বিষহরি বলেছিলেন- “নরে- নাগে বাস হয় না।”
তাই বণিকবধূকে আবার ফিরে আসাতে হল মর্তলোকে। যাবার আগে দক্ষিণ দিকপানে কী আছে তা দেখতে গিয়েই দেখল সে মা বিষহরির বিষবিভোর’ রূপ। দেবী বিষহরি বিষময়ীরূপ পরিবর্তন করে অমৃতময়ীরূপ ধরে এসে তখন বণিকবধূকে জিজ্ঞেস করলেন- ‘ও বেনে বেটী কি দেখলে বল? ‘বেনেবেটী’ বললে— ‘না মা কিছু দেখি নাই’। মা তুষ্ট হয়ে বলেছিলেন- ‘তুই আমার গোপন কথা ঢাকলি স্বর্গে, আমি তোর গোপন কথা ঢাকব মর্ত্যে।’
বেদে কৌমে প্রচলিত আছে শিব ও মনসার কামভাব জাগৃতির আর এক লোক-পুরাণ। ভোলা মহেশ্বরের কন্যা বিষহরি। বিষহরির রূপমাধুর্যে শিবের কামভাব জাগ্রত হলে বিষহরি বিষদৃষ্টিতে তাকালেন পিতা শিবের দিকে। বিষণ্নভাবে সঙ্গে সঙ্গে শিব ঢলে পড়লেন মাটিতে।
বাস্তব জীবনে অসংখ্য ঘটনাকে উপকথার অনুষঙ্গে সাজিয়ে বিষবেদেরা তাদের রহস্যময় জীবন যাপন করে। তাদের বিশ্বাস গগনভেরী পাখিরা গরুড়ের বংশধর। বৈমাত্রেয় জ্ঞাতি-সূত্রের কারণেই সাপেদের সাথে তাদের শত্রুতা। তাই দেবতাদের মীমাংসায় শীতকাল গরুড় পাখিদের এড়াং গ্রীষ্মকাল সাপেদের বিচরণের জন্য বরাদ্দ হয়।
পৌরাণিক কাহিনী-নির্ভর জীবনবৃত্তের অধিবাসী বিষবেদে সম্প্রদায়ের প্রধান আরাধ্য সৰ্পবেদী মনসা। চাঁদ সওদাগরের অভিশাপে বিষবেদেরা জাত, মান, কুল, মহাজ্ঞান ইত্যাদি সব হারিয়ে যখন নিঃস্ব, তখন মনসার কৃপাতেই তারা নতুন সামাজিক আশ্রয় ও বিষবিদ্যায় পারদর্শিতা ফিরে পেয়েছিল। সাপ ও সাপের বিষ নিয়ে কারবারি এই গোষ্ঠীর কাছে বিষহরি বা মা মনসাই সর্বশক্তির আধার।
নাগিনী কন্যার কাহিনী-তে হিজল বিলের বিষবেদেদের বিশ্বাস মনসার ইচ্ছাতেই তাদের ভাল-মন্দ, ভাগ্য-জীবিকা ইত্যাদি নিয়ন্ত্রিত হয়। তারা বিশ্বাস করে সাঁতালী গ্রামের মাঝখানে বিষহরির ‘থান’। এই বিষহরির কৃপাতেই বেদেরা সর্প-বিষয়ক সকল মন্ত্রজ্ঞানে সিদ্ধ। তাই প্রাত্যহিক সকল কাজেই বিষহরিকে তাদের ভীষণ সম্ভ্রম ও ভয়। তাদের বিশ্বাস বিষহরির কন্যাই ‘নাগিনী কন্যা’।
নাগিনী কন্যা তাদের কাছে বিষহরির কন্যা এবং তাদের পথ-প্রদর্শক। তাই নাগলোকের অধিষ্ঠাত্রী এই দেবীকে বিষবেদেরা জননী- রূপে কল্পনা করে। বিষহরির দেওয়া মন্ত্রগুণেই তারা নাগ-নাগিনীদের বশীভূত করতে সমর্থ। এই সামর্থ্যের গুণে তারা সমাজে সম্মান আকর্ষণ করে এবং জীবিকা নিশ্চিত করে। যে কোন ধরনের সংকটে তারা মনসার আশ্রয় ও সাহায্য প্রার্থনা করে।
হিজল বিলের বিষবেদেরা বলে- বেদেকুলের মা বলতে বিষহরি, বেদেদের অন্য মা নাই। কালী না, দুর্গা না- কেউ না। বেদেদের বাপ বলতে শিব। শিবের মানস হতে মা-বিষহরির জনম গ। পদ্মবনের মধ্যে শিবের মনের থেকে জন্ম নিয়া পদ্মপাতের মধ্যে ধীরে ধীরে মা বড় হয়্যা উঠলেন। মায়ের আমার পদ্মবনে বাস- অঙ্গের বরণ পদ্মফুলের মতো।
শিবঠাকুরের মধুপান করা নেশা হয় না, তাই শিবের কন্যে পদ্মবনে পদ্মমধু পান করলেন, সেই কন্যের কণ্ঠে- অমৃতের থেক্যা মধু হইল তখন সেই মধু খাইলেন শিব। সেই মধুতে তাঁর কণ্ঠ হ’ল নীল বরণ, মধুর পিপাষা মিট্যা গেল চিরদিনের তরে; চক্ষু দুটি আনন্দে হলো ঢুলু ঢুলু। শিবের কন্যে পদ্মাবতী- পদ্মের মত দেহের বরণ, তেমনি তাঁর অঙ্গের সৌরভ, মা হলেন চিরযুবতী। চাঁদ মনসার সংঘাতের পর থেকেই মনসা জননী, দেবী, রক্ষক ও মঙ্গলকারিণী-রূপে হিজল বিলের বিষবেদে সমাজে প্রতিষ্ঠিত।
পদ্মবনে জন্ম বলেই মনসার নাম পদ্মাবর্তী। চাঁদ সওদাগরের সাত ডিঙ্গা মধুকর সমুদ্রের ঝড়ে ডুবেছিল এই হিজল বিলে। বৃন্দাবনের কালীদহের কালীনাগ কালোঠাকুরের দত্ত মাথায় নিয়ে এই হিজল বিলেই এসে বাসা বেঁধেছিলেন দেবী মনসা। সেই থেকে হিজল বিলই তাদের কাছে মনসার আসন হিসাবে পূজিত হয়।
নাগলোকে মনসা নানা জাত ও বর্ণের সাপের অলঙ্কার ধারণ করে আছেন। নাগকন্যারা নিঃশ্বাসের বিষাক্ত বাতাস দিয়ে ঘুম পাড়ায় মনসাকে। মনসা বিষমুক্ত থেকে বিষপান করেন আর উগড়ে দেন। মনসার এই ভয়ংকর মূর্তি বিষবেদেদের মধ্যে সম্ভ্রম আর ভয়ের উদ্রেক না করে পারে না।
দেবী মনসার ওপর বিষবেদেরা যাঁকে স্থান দেয় তিনি মনসার পিতা শিব। শিব হলেন বিষবেদেদের জন্ম-মৃত্যুর অধিকর্তা। তাই শিবের আজ্ঞা তাদের কাছে মহা-আজ্ঞা। তবু মনসা তাদের কাছে অধিক জীবন্ত ও কার্যকরী দেবী। বিচিত্র এই কৌমের ধর্মাচারেও রয়েছে যথেষ্ট বৈচিত্র্য। অন্যান্য বেদে গোষ্ঠীর ন্যায় এরাও হিন্দু দেব-দেবীদের সম্মান করে, তথাপি মনসা আর শিবই তাদের মনোলোক ও জীবন ধারায় অধিক জাগ্রত ও অধিষ্ঠিত।
দুই
পৃথিবীর সব কৌমগোষ্ঠীর ন্যায় বিষবেদে কৌমেরও রয়েছে একটি নির্দিষ্ট সমাজ সংগঠন। বিষবেদে সমাজ পুরুষতান্ত্রিক। এদের রয়েছে একজন শক্তিমান গোত্রপতি। সমাজে এই গোত্রপতিই শিরবেদে নামে পরিচিত। শারীরিক শক্তি, বুদ্ধিমত্তা, বিষবিদ্যার পারদর্শিতা ও বংশানুক্রমিক ঐতিহ্য অনুসরণ করে কৌমের শিরবেদে নির্বাচন করা হয়।এক্ষেত্রে অবশ্য পুরাতন শিরবেদের উত্তরাধিকারকেই অগ্রাধিকার দেওয়া হয়।
বেদে সমাজের সর্বময় ক্ষমতার অধিকারী এবং তাদের আর্থ-সামাজিক নীতি নির্ধারণের ক্ষমতা এই শিরবেদের। হিজল বিলের বিষবেদেরা শিরবেদেকে যথেষ্ট মান্য করে এবং ভয় পায়। কৌমের সকল প্রকার প্রশাসনিক ক্ষমতা ন্যস্ত থাকে শিরবেদের হাতে। গোত্রে কেউ অনাচার ব্যভিচার বা নিয়ম ভঙ্গ করলে শাস্তির ব্যবস্থা করে শিরবেদে।
বেদে সম্প্রদায়ের নারী-পুরুষ সকলেই তাকে সমীহ করে এবং তার আদেশ নির্দেশ মানতে বাধ্য থাকে। শিরবেদের পরেই বিষবেদে সম্প্রদায়ে নাগিনী কন্যার স্থান। নাগিনী কন্যা যেহেতু আধ্যাত্মিক শক্তির অধিকারী এবং বিষবেদে সম্প্রদায়ের রক্ষা ও তাদের সম্মান রক্ষার জন্য বিষহরির কৃপায় প্রেরিত, সেহেতু নাগিনী কন্যার গুরুত্ব ও ভূমিকা বিষবেদে সমাজে স্বীকৃত ও প্রতিষ্ঠিত। তবে নাগিনী কন্যার গোত্রগত প্রশাসনিক কোনো ক্ষমতা থাকে না।
বেদেদের প্রতি নাগলোকের ঋণ শোধ করতেই যুগ যুগ ধরে নাগিনী কন্যার আগমন ঘটে বিষবেদে সমাজে। এই নাগিনী কন্যারা বিষবিদ্যা ও দিব্যজ্ঞান সম্পর্কে থাকে পারদর্শী এবং দেবী মনসার সরাসরি আশীর্বাদপুষ্ট। ফলে সমাজ সংগঠনের নানা স্তরে নাগিনী কন্যা ও শিরবেদের মধ্যে ক্ষমতার দ্বন্দ্ব অনিবার্য হয়ে ওঠে।
তথাপি শিরবেদের কর্তৃত্বকে মেনে নিতে হয় নাগিনী কন্যাকেও। গোত্রের অন্য সকলেই নাগিনী কন্যাকে বিষহরির কন্যা হিসেবে বিশেষ সম্ভ্রমের দৃষ্টিতেই দেখে। কারণনাগিনী কন্যা বিষহরিরই মর্ত-প্রতিনিধি। নাগিনী কন্যাকে শুদ্ধাচারী ও তপস্বিনী হতে হয়। প্রেম ও যৌন-সম্পর্ক স্থাপন তাদের জন্য গর্হিত অপরাধ ।

ভারতীয় প্রাচীন নিম্নবর্গের মানুষের মধ্যে সামাজিক ও অর্থনৈতিক দিক থেকে বিষবেদে সমাজ অত্যন্ত নিম্নস্তরের। নাগিনী কন্যার কাহিনী উপন্যাসে বিধৃত এই বিষবেদেরা বৃহত্তর হিন্দু সমাজের অন্তর্ভুক্ত হলেও তাদের রয়েছে নিজস্ব পুরাণ-কথা সমাজে প্রচলিত নিজস্ব উপকথা, কুসংস্কার, মিশ্র ধর্ম-সংস্কৃতি, অলৌকিক বিশ্বাস আর মন্ত্রে পরিপূর্ণ লোক-পুরাণের জগৎ।
অস্পৃশ্য বলে বৃহত্তর ভদ্র সমাজে এদের যাতায়ত খুবই সীমিত। সাপের বিষ বিক্রি, জড়ি-বুটি বিক্রি, গৃহস্থের ঘরে সাপ ধরতে যাওয়া, খেলা দেখানো ও হাতে তৈরি সামগ্রী বিক্রি করতে যাওয়ার মধ্যেই সীমাবদ্ধ ওই সংযোগ। ফলে বৃহত্তর সমাজ থেকে তারা থেকেছে প্রায়-বিচ্ছিন্ন।
বিষবেদে সমাজ রহস্যাবৃত এক সমাজ। যুগ যুগ ধরে আরণ্যক প্রকৃতিকে ধারণ করে আছে বলে তারা ভূতকালের মানুষই থেকে গেছে শেষ পর্যন্ত। অসভ্য বন্য বর্বর জীবন-যাপনের কারণে অন্য বেদেদের থেকেও বিষবেদেরা অধিকমাত্রায় আরণ্যক। বিষবেদে সমাজের প্রতি ভদ্র সমাজের রয়েছে ভয় ও উপেক্ষা। তাদের সামাজিক রীতি-পদ্ধতিও বিচিত্র এবং রহস্যময়।
বেদে সমাজের মধ্যেও রয়েছে প্রকারভেদ। যেমন- মাল বেদে, মাঝি বা ইসলামী বেদে, মেটেল বেদে, বিষবেদে নামে তাদের বিভিন্ন সমাজের অস্তিত্ব সম্পর্কে জানা যায়। এর মধ্যে বিষবেদেরা নিজেদেরকে অধিকতর কুলীন ও মন্ত্রসিদ্ধ কৌম বলে মনে করে। সাপ বিষয়ে এরা সর্বাধিক পারদর্শী। প্রকৃত কালনাগিনীর বিষ সংগ্রহে এরা সিদ্ধহস্ত। বিষবেদেরা সভ্যতার আলোকছটাকে যথাসাধ্য পাশ কাটিয়ে নিজেদের সমাজ ব্যবস্থাকে দীর্ঘকাল টিকিয়ে রাখতে সচেষ্ট থেকেছে। নাগিনী কন্যার কাহিনী উপন্যাসে বিষবেদে কৌমের উপর্যুক্ত সামাজিক সাংস্কৃতিক ও ঐতিহ্যিক পরিচয় বিধৃত হয়েছে।
সাপ গ্রীষ্মমণ্ডলীয় এলাকার প্রধান সরীসৃপ। অবিভক্ত বাংলার পূর্ব ও পশ্চিম উভয় অঞ্চলের পারিবেশিক কারণেই এখানে সাপের অস্তিত্ব অধিক। আর এ কারণেই অরিদেবী মনসার পূজার প্রচলনও ওই দুই অঞ্চলেই বেশি। নদীমেখলা পূর্ব বাংলার জীবনে ও সমাজে মনসার অবস্থান অত্যন্ত সুদৃঢ়। মধ্যযুগের বাংলা সাহিত্যে মনসামঙ্গল কাব্যের একটি শক্তিশালী ধারা ও আদর্শ ছিল সুপ্রতিষ্ঠিত। তবে অবিভক্ত বাংলার রাঢ় অঞ্চলও ছিল সর্পসংকুল। তাই সাপকে জীবিকা হিসাবে অবলম্বনকারী বেদে গোষ্ঠীর আধিক্য রয়েছে এ অঞ্চলে।
নাগিনী কন্যার কাহিনী উপন্যাসের বিষবেদে সম্প্রদায় ওই অঞ্চলেরই অধিবাসী। পৃথিবীর অনেক জাতির মধ্যেই রয়েছে সাপ সম্পর্কে নানা প্রচলিত লৌকিক-অতিলৌকিক সংস্কার । পৃথিবীর অনেক আদিম উপজাতির মতো হিজল বিলের এই বিষবেদেদেরও আছে সাপকে নিয়ে নানা বিশ্বাস, সংস্কার আর উপকথা।
হিজল বিলের বিষবেদে কৌমের মধ্যেও বিচিত্র বিশ্বাস, সংস্কার ও উপকথা বিদ্যমান। সাপকে তারা দেবীর প্রতিস্থানীয় রূপে কল্পনা করে। হিজল বিল ও সাঁওতাল পাহাড় অঞ্চল বিষবেদেদের কাছে বিশ্বাসের এক বিশেষ প্রতীকী রূপ লাভ করেছে। সর্পসংকুল এ অঞ্চলে দেবীর আসন প্রতিষ্ঠিত বলেই এ স্থানের প্রতি তাদের ভিন্নমাত্রিক আকর্ষণ।
প্রকৃতির রহস্যলোকে ঘেরা এই সমাজে রয়েছে নানা রকম বিধি-নিষেধের বেড়াজাল। টোটেম তাদের জীবনের গতিধারাকে বহুলাংশে নিয়ন্ত্রণ করে। হিজল বিলের বিষবেদে গোষ্ঠীর রয়েছে অসংখ্য টোটেমে বিশ্বাস। এসব টোটেম-সংস্কার তাদের জীবনের সংবিধান স্বরূপ। যেমন- শিয়াল ডাকিলি পরে, বেদেরা না দিবে ঘরে। ১১ অর্থাৎ জীবিকার প্রয়োজনে বেদে নারীরা সারা দিন আমান্তরে ঘুরে বেড়ায়। কিন্তু সূর্যাস্তের পূর্বে শিয়াল ডাকার আগে বেদে নারীদের তাদের আস্তানায় ফিরে আসতে হয় ।
অন্যথা সমাজের অনুশাসন মতে তাদের দুর্ভোগ পোহাতে হয়। আবার এমন বিশ্বাস প্রচলিত আছে— ‘যমরাজার দক্ষিণ দুয়ার হিজলেরই বিল। ” অর্থাৎ এখানে হিজল বিলের দক্ষিণ দিকে যাওয়ার ব্যাপারে বেদেদের নিষেধ আছে। স্বর্গলোকে যেমন বণিক-বধূর দক্ষিণ দিকে তাকানো নিষেধ ছিল দেবী মনসার আসন থাকায়, তেমনি মর্ত্যলোকেও এর অনুসরণে বেদেরা মনসার প্রকৃত রূপধারী অবস্থা যাতে দৃষ্টিগোচর না হয় তার জন্যই এই নিষেধাজ্ঞা বহাল রেখেছে। বেদেরা হিজলের দক্ষিণ দিকে যাওয়ার এই নিষেধ কঠোরভাবেই তাই মেনে চলে।
গোত্রের নাগিনী কন্যার দিকেও বেদে পুরুষদের তাকানো নিষেধ। নাগিনী কন্যা দেবী মনসা- প্রেরিত কন্যা : মনসার সর্বাগ্রে পূজার অধিকার তারই, তাকে থাকতে হয় স্বচ্ছ-পবিত্র। তাই কোন বেদে পুরুষের কামনার বস্তু হতে পারে না এই নাগিনী কন্যা।
বেদেদের জীবন জীবিকার স্তরে স্তরে সঞ্চিত রয়েছে নানা রহস্য ও গোপন কথা, যা সমাজের গৌরবময় সম্পদ বলেই তারা মনে করে। কিন্তু এহেন কুলের লক্ষ্মী- গোপন সম্পদ কেউ যদি অন্যের কাছে প্রকাশ করে তার জন্য রয়েছে কাঠোর শাস্তির বিধান। কারণ এতে তাদের পেশাগত ক্ষতির সম্ভাবনা থাকে। তাই বেদেদের গোপন কথা প্রকাশ করা সমাজের প্রতিটি সদস্যের জন্য গর্হিত অপরাধ।

তিন
তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায় তাঁর নাগিনী কন্যার কাহিনী উপন্যাসে বেদে কৌমের সংস্কৃতিকে রাঢ়ের এক সমৃদ্ধ অধ্যায়রূপে সংযোজন করেছেন। রাঢ়ের আদিবাসী কৌম গোষ্ঠীর মধ্যে বিষবেদেদের সংস্কৃতি-জীবন বৈচিত্র্যমণ্ডিত। সমাজে প্রচলিত সংস্কারগুলোকে তারা ধর্ম বিধানরূপে জ্ঞান করে।
বেদে সমাজে প্রচলিত উপকথাগুলোই তাদের জীবন-সংস্কৃতির ভিত্তি। তাদের পূজা-পার্বণ, নৃত্য-গীত, বিনোদনসহ জীবনাচরণের সর্বত্রই জড়িয়ে আছে উপকথা-আশ্রিত বিশ্বাস। মনসা-চাঁদসওদাগর-শিব সংক্রান্ত উপকথা তাদের জীবন সত্যের নিয়ামক রূপে সক্রিয়। হিজল বিলের বেদেদের দৃষ্টিসীমা কখনোই এ উপকথার জগৎকে অতিক্রম করতে পারেনি।
বিষবেদেরা মনসাকে জননীরূপে কল্পনা করে। আদি শিরবেদে বিশ্বস্তরের পতনের সেই কালোরাত থেকে মনসাই তাদের একমাত্র আশ্রয়দাত্রী দেবী। নিম্ন শ্রেণির হিন্দুদের অন্যান্য পুজো-পার্বণে বিষবেদেরা অংশগ্রহণ করলেও মনসা-কেন্দ্রিক পুজো-পার্বণই বেদেকৌমের প্রধান কৃত্য ও উৎসব।
অন্যদিকে মনসার পিতা দেবাদিদেব শিবকে তারা পিতারূপে মান্য করে। ভাদ্রের শেষে নাগপঞ্চমীর রাতে ধূপ-ধুনা আর তুমড়ী-বাঁশির সুরে হিজল বিলের বিষবেদেরা দেবী মনসার পুজো করে সমারোহে। দিনান্তে মায়ের ‘থানে পুজো শেষে গোটা সম্প্রদায় মেতে ওঠে নাচে-গানে এ-সব অনুষ্ঠানে প্রধান গায়িকার দায়িত্ব পালন করে নাগিনী কন্যা। আর দোহারের মতো ‘ধুয়া’ ধরে অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণকারী সকলে।
গানে-গানে নাগিনী কন্যা তুষ্ট করে দেবী মনসাকে। গানের মাধ্যমে বিষবেদেরা স্মরণ করে নিজেদের জাতিগত ইতিহাস। মনসা-প্রেরিত নাগিনী কন্যা আদি শিরবেদেকে প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল চিরদিন তাদের সাথে থাকার। নাগিনী কন্যার গানে গানে সে কথারই প্রতিধ্বনি। –
ও আমার সাত জন্মের বাপ গ তোরে দিচ্ছি বাক্ গ!
অ-গ!
তোরে ছেড়া যাইলে আমার মুণ্ডে পড়বে বাজ গ
অ-গ!
এ ঘোর সঙ্কটে তুমি রাখলে আমার মান্যে গা
অ-গ!
জন্ম জন্ম তোমার ঘরে হইব আমি কন্যে গ
অ-গ!
তোমার বাঁশির তালে তালে নাচব হেল্যা-দুল্যা গ
অ-গ!
আমার গরল হইবে সুধা তুমি বাবা ছুলো গ!
অ-গ!
নাগপঞ্চমীর পুজো শেষ করে হিজল বিলের বিষবেদেরা বিষহরির আশীর্বাদ নিয়ে বেরিয়ে পড়ে তাদের আদি কুল-ব্যবসায়। দেশ-বিদেশে নেচে-গেয়ে, খেলা দেখিয়ে এবং কাল নাগিনীর বিষ বিক্রি করে ভরা শীতে আবার ফিরে আসে তারা হিজল বিলে। এর সবই পরিচালিত হয় তাদের ঐতিহ্য ও প্রথা অনুসারে।
চাঁদ সওদাগরের বন্ধু আদি শিরবেদে বিশ্বশুরকে ছলনা করে বিষহরি-প্রেরিত নাগিনীটি দেবীর অভিলাষ চরিতার্থ করেছিল লক্ষ্মীন্দরকে দংশন করে। সেই থেকে বিষবেদেরা অদ্ভুত বা ব্রাত্য হয়েও লাভ করেছিল মনসার কৃপা। উপন্যাসে বিধৃত উপকথার গানে প্রকাশিত হয়েছে বেদেদের জীবনের সেই নিগূঢ় কাহিনী-
জয় বিষহরি গ! জয় বিষহরি!
চাদো বেনে দণ্ড দিল
তোমার কৃপায় তরি গ!
অ-গ!
চম্পাই নগরের ধারে
সাঁতালী পাহাড় গ!
অ-গ!
ধন্বন্তরি ‘মন্তে’ বাঁধা
সীমেনা তাহার গ!
অ-গ!
“বিরিখ্যে’ ময়ূর বৈসে
‘গণ্ডে গত্তে’ নেউল গ
অ-গ!
বিষবৈদ্য বৈসে সেথায়
‘বাণ্ডুলা বাউল গ!
অ-গ!
আদি নাগিনীর ওই ছলনার ধারা প্রভাবিত ও সংক্রমিত হয়েছে হিজল বিলের নাগিনী কন্যা অবধি। নাগিনী কন্যা তার লাস্যময়তা, চাতুর্যপূর্ণ তীক্ষ্ম দৃষ্টি, হিল্লোলিত দেহ ও সুরেলা কণ্ঠে গান গেয়ে গৃহস্থ নারী-পুরুষের মন ভুলিয়ে উপঢৌকন আদায় করে। তখনও তাদের গানের কথায় থাকে সেই আদি কাহিনী। কখনো ‘ভাসান’ গান গেয়ে গৃহস্থ বৌ-ঝিদের হৃদয় আর্দ্র করে তোলে তারা। বেহুলা যে গান গেয়ে দেবতাদের মনোরঞ্জন করে দংশিত স্বামীর প্রাণ ফিরিয়ে এনেছিল, হিজলের বিষবেদে নারীদের কণ্ঠে গীত হয় সেই বেহুলা-পালাও।-
উর্- হায় হায়, লাজে মরি,
আমার মরণ ক্যানে হয় না হরি!
আমার পতির মরণ সাপের বিষে
আমার মরণ কিসে গ!
মদন-পোড়া চিতের ছাইয়ের
কে দেবে হায় দিশে গা
অঙ্গে মেখে সেই পোড়া ছাই
ধৈরয মুই ধরি গ ধৈরয মুই ধরি, উর, হায় গ !
বাবুদের কাছ থেকে অধিক অর্থপ্রাপ্তির প্রত্যাশায় বেদে নারীদের ছলা-কলার অন্ত থাকে না। বাঁদরের বা সাপের নাচের পর হিল্লোলিত দেহ গানে গানে মেলে ধরে নাগিনী কন্যা, বাবুদের কাছে পেশ করে তাদের দাবি-
যেমন বাবুর চাঁদো মুখো
তেমনি বিদায় পাব গ
বেনারসীর শাড়ি পরা
লেচে লেচে যাব গ!
প্রভু রাঙা হাত ঝাড়িলে
আমার পাহাড় হয় গ….
নাগিনী কন্যা দেবী মনসার পূজার অন্যতম অধিকারিণী বলে তাকে সর্বদা থাকতে হয় পূত-পবিত্র। পুজোর সময়ে নাগিনী কন্যার ওপর ভর করেন দেবী মনসা। তখন তার সঙ্গে সরাসরি সংযোগ ঘটে বিষহরির। ফলত নাগিনী কন্যা তখন হয়ে ওঠে অতিলৌকিক জগতের অধিবাসী। দিব্য দৃষ্টিতে তখন সে বেদেকুলের বর্তমান ও ভবিষ্যৎ প্রত্যক্ষ করতে সমর্থ হয়।
পুজোর অন্তে বাহ্য জ্ঞান ফিরলে বেদেরা ধূপ- ধুনা আর তুমড়ি বাঁশি বাজিয়ে ঘিরে ধরে নাগিনী কন্যাকে বিষহরির দেওয়া আদেশ শোনার জন্য । নাগিনী কন্যার বয়স বাড়লে, চিত্তে জৈব কামানার সঞ্চার হলে কিংবা কোনো ব্যাভিচার তাকে স্পর্শ করলে লুপ্ত হয় তার নাগ মাহাত্ম্য। শিরবেদে বেদে সম্প্রদায়ের পতনের কালোরাত্রিকে স্মরণ করে কৃষ্ণপঞ্চমীর ঘোর অন্ধকার রাতে বসে বিষহরির পুজোয়।
ওই দিন ধূপ-ধুনার অন্ধকারে নিজের দেহের রক্ত দান করে সে প্রার্থনা জানায় নতুন নাগিনী কন্যার জন্যে। নাগ-জননী পুজোয় তুষ্ট হলেই পুনরায় পাঠাবেন নতুন নাগিনী কন্যা বেদেকুলে।

চার
বিষবেদেরা বাউন্ডুলে ও বাউল স্বভাবী। বিষ-চিকিৎসায় তাদের দক্ষতা অসামান্য। সাপে কাটা রোগীর বিষ ছাড়াতে ‘ধন্বন্তরি’র মন্ত্র তারা স্মরণ করে গানে-গানে।-
তুরা খাস গো সুধার মধু মোরা খাইব বিষ গ!
অ-গ!
তুদের ঘরের কালসপ্য মোদের গলায় দিস গ
অ গা
আর দিস গো ছেঁড়া বস্তর মুষ্টি মেপ্যা চাউল গ
অ-গ!
গুরুর আজ্ঞায় বিষবৈদ্য বাগুলা বাউল গ!
অ-গ!
জীবিকার সন্ধানে পর্যটনরত বিষবেদেরা মনসা-চাঁদসওদাগরের বিবাদের কাহিনীও পরিবেশন করে। গানে গানে তারা হাহাকার জাগায় গৃহস্থ ঘরের বউ-ঝিদের বুকে। যেমন—
মরুক মরুক চাঁদো বেনে মুক্তে পড়ুক বাজ গ!
অ-গা
এত দেবতা থাকতে হৈল মনসার সঙ্গে বাদ গ!
অ-গা
আবার তাদের পরিবেশিত বেহুলার ভাসান গান করুণার্দ্র ও সম্মোহিত করে ভদ্রপল্লির নর-নারীদের। ভাসান গানের মাধ্যমে তারা স্মরণ করে তাদের পূর্ব ইতিহাস –
জলে ভেসে যায় রে সোনার কমলা।
হায় গ! হায় গ!
কঠিন নাগিনী তোর দয়া হ’ল না!
হায় গ! হায় গ!
ফাল্গুনে ঘাসে আগুন দিয়ে নাগ-নাগিনীর শীতের গভীর ঘুম ভাঙ্গানোর দায়িত্ব বিষবেদের। এ দায়িত্বও তারা পালন করে মহা-উৎসবের সাথে। এ সময় যদি ধরা পড়ে নতুন কোন নাগিনী, তাহলে তা কৌমের জন্য শুভ লক্ষণ । বন পোড়ানোর পর পরই নাগিনী কন্যা বসবে দেবী মনসার ধ্যানে। শিরবেদের ডাকে ধ্যানমগ্না নাগিনী কন্যার সম্বিত ফিরে পাওয়াকে তারা উপলব্ধি করে মনসার জাগরণ হিসেবে। এ সময় তারা হাঁস, বনপায়রা ও নানা রকম পাখি মনসার উদ্দেশে বলি দেয়। পরে, ভোজনান্তে মেতে ওঠে নাচ-গান ও আনন্দ উৎসবে।
পাঁচ
তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায় তাঁর নাগিনী কন্যার কাহিনী উপন্যাসে দুই ধরনের ভাষা ব্যবহার করেছেন। একটি লেখক ভাষ্য অন্যটি চরিত্রের বাচনিক ভাষা। লেখক বা ঔপন্যাসিক ভাষ্যে ভাষা-ব্যবহারের ক্ষেত্রে তিনি মান্য চলিত ভাষাই ব্যবহার করেছেন।তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায় তাঁর প্রথম দিককার উপন্যাস সাধু ভাষারীতিতেই লিখেছেন । চলিত ভাষারীতিতে লিখিত প্রথম উপন্যাস মন্বন্তর (১৯৪৪)। মন্বন্তর-পরবর্তী সকল উপন্যাসই চলিত ভাষায় রচিত। ২৩
নাগিনী কন্যার কাহিনী উপন্যাসের ঘটনা এবং বিষয়-পরিচিতির বর্ণনায় তিনি চলিত ভাষা প্রয়োগ করেছেন। কখনো আবার ‘ধন্বন্তরী’ ও শিবরামকে দিয়েও মান্য চলিত ভাষায় কথা বলিয়েছেন। বস্তুত হিজল বিলের বিষবেদেদের শিব-মনসার নব্য মিথ বর্ণনায় তিনি ব্যবহার করেছেন এই মান্য চলিত ভাষা। চরিত্র রূপায়ণের ক্ষেত্রে লেখক চরিত্র-উপযোগী ভাষা নির্মাণ করেছেন। কৌমের চরিত্রসমূহের সংলাপে তিনি ব্যবহার করেছেন রাঢ়ী উপভাষা।
এ উপন্যাসের নানা স্থানে উচ্চ ও নিম্নবর্ণের মানুষের চরিত্র-উপযোগী ভাষা স্থাপন করা হয়েছে। বেদেরা নিম্নবর্গের বলেই তাদের মুখে দেওয়া হয়েছে কথ্য আঞ্চলিক ভাষা। বিষবেদেদের ভাষায় মিথনির্ভর আঞ্চলিক লোকপুরাণের ব্যবহার লক্ষণীয়। তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায় বর্তমান উপন্যাসে হিজল বিলের বিষবেদে কৌম-গোষ্ঠীর মুখে দিয়েছেন লোক- প্রকরণ ও লোকবিশ্বাস-নির্ভর ছড়া, প্রবাদ, প্রবচন ও গান। তাদের ব্যবহৃত ভাষা আমাদের সাহায্য করে বেদেদের লোকবিশ্বাস সমৃদ্ধ জীবনধারা অনুধাবনে।
পুরুষ ও নারীর ভাষায় তেমন পার্থক্য সূচিত না হলেও বৃত্তিগত কারণেই নারী যখন সাধারণ মানুষের সঙ্গে বাক্য বিনিময় করে, তখন তাতে একটু প্রলম্বিত সুর ধরা পড়ে। যেমন- ‘দ্যাখেন গ মা বাড়ির গিন্নী, রাজার রানী, স্বামী সোহাগী, সোনা-কপালী চাঁদের মা। কালনাগিনীর দোলন নাচন হীরেমনের খেল। আবার বিষবেদেদের মুখে যে ভাষা প্রয়োগ করেছেন ঔপন্যাসিক, তা বৃহত্তর সমাজ থেকে বিছিন্ন ক্ষুদ্র এই নৃ-গোষ্ঠীকে পাঠকের একান্তে এনে দাঁড় করিয়ে দেয়। তাদের ব্যবহৃত ভাষাই পাঠককে সাহায্য করে লোকবিশ্বাস নির্ভর স্বতন্ত্র এ গোষ্ঠীর জীবন ধারাকে বুঝতে।
হিজল বিলের বেদে গোষ্ঠীর ভাষায় প্রকাশ ঘটেছে তাদের সৃজনশীলতার। তাদের কথায় ধরা পড়েছে ওই গোষ্ঠীর জীবন ধারার সাঙ্গীতিক আবহ। কথায় কথায় তারা মিথনির্ভর বিশ্বাস প্রকাশ করেছে স্বকীয় ভঙ্গিতে। দৃষ্টান্ত লক্ষণীয় : লাচো
লাচো আমার কাল নাগিনী কন্যে গ!
অ-গ!
দুস্কু আমার সোনা হইল তু মানিকের জন্যে গ!
অ-গ!
এই জনগোষ্ঠীর জীবন ও জীবিকায় গান ও ছড়ার রয়েছে ব্যাপক ব্যবহার। তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়-সৃষ্ট সকল অন্ত্যজ শ্রেণির মানুষের মধ্যে বিষবেদেরা লোক-বিশ্বাসজাত ছড়া, গান ও প্রবাদ রচনায় স্বতন্ত্র :
শিয়াল ডাকিলি পরে, বেদেরা না লিবে ঘরে,
অভাগিনীর যাবে জাতিকুল। ২৭
ছড়ার আঙ্গিকে স্বসমাজে সৃষ্ট রূপকথাকেও তারা প্রকাশ করে- ‘মোর ঢাকলি স্বর্গে, তোর ঢাকবে মর্ত্যো’২৮
কিংবা ‘যমরাজার দখিণ-দুয়ার হিজলেরই বিল’। বিষবেদেরা লোকবিশ্বাস-নির্ভর প্রচুর প্রবাদ-প্রবচন ব্যবহারে অভ্যস্ত। এসব তাদের সৃজনশীলতা ও স্বাতন্ত্র্যের স্মারক। যেমন: “শিরে হৈলে সর্পাঘাত তাগা বাঁধিবি কোথা?’, ‘নরে নাগে বাস হয় না’, ‘খেলে ডোমনা, ডাক বামনা’, সাপের হাঁচি বেদেয় চিনে’। তাদের কথিত এইসব প্রবচনে প্রতিফলন ঘটেছে লোকায়ত দর্শনেরও, যেমন: ‘রাজার পাপে রাজ্য নাশ, কত্তার পাপে গেরস্তের দুগ্গতি, বাপের পাপে ছাওয়াল করে দণ্ড ভোগ’, *একজনার অমৃতি অন্যজনের বিষ।’ ৩৫
তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায় এ উপন্যাসে হিজল বিলের দৃশ্যময় ও শব্দময় চিত্র মান্য চলিত ভাষায় উত্তমপুরুষের জবানিতে উপস্থাপন করেছেন এভাবে- ‘ধন্যায় কাদা হয়। ঘাস পচে, ভ্যাপসা গন্ধ হয়, মশায় মাছিতে ভনভন করে চারিদিক, ঘাসবনের মধ্যে বাঘ গর্জায়, হিজল বিলের অসংখ্য নালায় কুমীর ঘুরে বেড়ায়, হাঙর আসে, কামঠ আসে, তারই মধ্যে ওরা বাস ক’রে চলেছে। এখান ছেড়ে বিষবেদেরা স্বর্গেও যেতে চায় না।
বাপ রে বাপ, এখানকার বাস কি ছাড়া যায়। মা বিষহরির সনদ দেওয়া জমি এ জমির খাজনা নাই।’ ঔপন্যাসিকের শিল্পিত ভাষার পাশাপাশি নিম্নবর্গের অচ্যুত এই তৃণমূল মানুষের মুখের ভাষায় অবহেলিত খড়-কুটোর রূপ-রস-গন্ধ নিয়ে তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায় সৃজন করেছেন এক অপূর্ব ভাষিক জগৎ, এক অতিলৌকিক সৌন্দর্যলোক। আঞ্চলিক শব্দের যথাযথ প্রয়োগ, উপমা, ক্রিয়ারূপ, বাকভঙ্গি, লোকোক্তি, ছড়া ও প্রবাদ প্রবচনের অসামান্য ব্যবহার নাগিনী কন্যার কাহিনী উপন্যাসের ঐশ্বর্য।
নাগিনী কন্যার কাহিনী উপন্যাসের কুশীলবরা তাদের সংলাপে যে আঞ্চলিক গদ্যের ব্যবহার করেছে তাতে ফুটে উঠেছে ভিন্ন এক জগৎ। সেই জগতের নিগূঢ় পূঞ্জীভূত ক্ষোভ ও বেদনা সংকেতিত হয়েছে নাগিনী কন্যা শবলার লোকায়ত ভাষায়: বাবা গো, লাগিনী যখন শিশু থাকে, তখন কিলবিল করা ঘুরে বেড়ায়।
ঘাসের বনে বাতাস বইলে পর, তা শুনেও হিস করা ফণা তুলে দাঁড়ায়। বয়স বাড়ে বাবা, পিথিয়ীর সব বুঝতে পারে, সাবধান হয়। মানুষ দেখলি, জন্তু দেখলি সি তখন ফোঁস করা মাথা তুলে না বাবা, চুপিসারে পলায়ে যেতে চায়। নেহাত পায়ে পড়লি পর তবে ফণা তুলে বাবা। তখন আক্কেল হয় যি, মানুষ সামান্যি লয়।

ছয়
নাগিনী কন্যার কাহিনী উপন্যাসে ঔপন্যাসিক হিজল বিলের বিষবেদে সম্প্রদায়ের পৌরাণিক বিশ্বাস- নির্ভর জীবন-ধারা অঙ্কনে প্রয়াসী। আঞ্চলিক উপন্যাস শ্রেষ্ঠত্ব অর্জন করে সামূহিক জীবনের বাস্তবিক কথকতায়। এখানেও ব্যক্তি কিংবা একক কোন পরিবারের নয়, গোটা সম্প্রদায়ের চিত্র রূপায়ণই ছিল অভীষ্ট। রাঢ়ের বিভিন্ন অনার্য কৌমগোষ্ঠীর মধ্যে বেদে সম্প্রদায়ের প্রতি তারাশঙ্করের আগ্রহ ছিল সর্বাধিক। তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়-অঙ্কিত অন্যান্য কৌমগোষ্ঠীর মতো বিষবেদেদের জীবনও লোককথা ও পৌরাণিক বিশ্বাস আর সংস্কারের বলয়ে আবর্তিত।
বিচিত্র এই অনার্য গোষ্ঠীর পারিবারিক জীবনও খুবই বিচিত্র। বেদের মেয়ের বিয়ের কাল শুরু হয় অনুপ্রাশনের পর থেকেই। ছয় মাস থেকে তিন বছর বয়সের মধ্যেই বেদে কন্যার বিয়ে সম্পন্ন হয়ে যায়। বেদেদের সমাজে বিধবা-বিবাহ প্রচলিত; বিবাহ-বিচ্ছেদও সিদ্ধ। তবে যারা পাঁচ বছর বয়সে স দংশনে বিধবা হয়, ষোল বছর বয়সের পূর্বে তাদের বিয়ে হয় না।
ধীরে ধীরে তাদের মধ্যেই নাগিনী কন্যার লক্ষণ ফুটে ওঠে। বেদে পরিবারে পুরুষের অবস্থান কিছুটা সংহত। নারী-পুরুষ উভয়ে সমান পরিশ্রমী। পারিবারিক অনুশাসনের চেয়ে গোষ্ঠীর অনুশাসন এখানে প্রধান্য পায়। গোষ্ঠীপ্রধান শিরবেদেদের সিদ্ধান্তই সমাজ পরিচালনার ক্ষেত্রে চূড়ান্ত। নারীর অবস্থান নগণ্য হলেও নাগিনী কন্যার আধ্যাত্মিক ক্ষমতার জন্য সমাজে তার অবস্থান স্বতন্ত্র।
এই কৌমগোষ্ঠীর পারিবারিক জীবনে কঠোর অনুশাসন, বাধা-নিষেধ ও শান্তি থাকা সত্ত্বেও নারী-পুরুষ লিপ্ত হয় নানা পাপাচার ও ব্যভিচারে। পারস্পরিক বিশ্বাস এখানে সম্পূর্ণ অনুপস্থিত। জীবন-ধর্মের শাশ্বত প্রয়োজন স্বাভাবিক ধারায় বাধা প্রাপ্ত হয় বলেই গোষ্ঠীর ব্যক্তি মানুষ কখনো পা বাড়ায় কদর্য পথে। পাপাচারের শাসন হিসাবে শাস্তির ব্যবস্থা থাকলেও ভ্রান্তি বা স্খলন বেদে সমাজে স্বাভাবিক ঘটনা।
তাদের প্রতিটি ঘরের কোনো কথাই সমাজে গোপন থাকে না। পূর্বেই বলা হয়েছে যে, বেদে সম্প্রদায়ের যৌনজীবন কিছুটা শিথিল। অসীম শক্তির অধিকারী এই অদিম নর-নারীর প্রাণ-প্রাচুর্য প্রকাশ পায় তাদের উদ্দাম যৌন জীবনে। বেদেদের বউ ঝি’রা পর-পুরুষের সঙ্গে অন্যত্র রাত্রি যাপন করলে তাকে প্রহার করা হয়। কিন্তু তাকে পরিত্যাগ কিংবা সমাজচ্যুত করা হয় না।
জরিমানা পরিশোধ করলেই ওইসব নারীর সকল পাপ স্খালন হয়ে যায়। আর কোন বেদে- নারী সৎ গৃহস্থের আশ্রয়ে ছিল এইরূপ সাক্ষী পেলে তাও মাফ করা হয়। কিন্তু ন্যাগিনী কন্যার ক্ষেত্রে এ নিয়ম প্রযোজ্য নয়। নাগিনী কন্যাকে আজীবন থাকতে হয় পূত-পবিত্র। সূর্যাস্তের পর কোনো বেদেনারীর ঘরের বাইরে অবস্থান করার বিধান নেই। এই নিয়ম অমান্য করলে অপরাধীকে শাস্তি ভোগ করতে হয়। নারী-পুরুষের গোপন অভিসার এখানে স্বাভাবিক ব্যাপার। তাই কেউ কারো প্রতি আস্থাশীল নয়।
বেদের মেয়েরা যাযাবর জীবনে প্রতি রাতে পাহারা দেয় যাতে কেউ এক নৌকা থেকে অন্ধকারের মধ্যে অন্য নৌকায় যেতে না পারে। বন্য আদিম এই নর-নারীর ক্লেদাক্ত জীবনে চলে অবাধ, উদ্দাম জীবন-লীলা। কখনো-কখনো নারী হয় পারিবারিক ভোগের নির্মম শিকার। পাপাচারের ফলে বেদে নারী সন্তানসম্ভবা হলে সে নারী হয় আত্মঘাতিনী অথবা সন্তানঘাতিনী। বিষবেদে সমাজের সকল পাপ মোচন হয় নাগিনী কন্যার পুণ্য ও তপস্যায়। বিষবেদে সম্প্রদায়ের দৃঢ়মূল প্রত্যাশা নাগিনী কন্যা থাকবে কামহীন-প্রেমহীন।
নাগিনী কন্যা ও শিরবেদের মধ্যে বিরাজমান চিরকালীন দ্বন্দ্বকে বিষবেদে সমাজ উপকথার শিব- মনসার দ্বন্দ্বের অমোঘ ফল হিসাবেই মেনে নেয়। এরই ধারাবাহিকতায় বর্তমান উপন্যাসে আমরা প্রথম শিরবেদে মহাদেবের সঙ্গে নাগিনী কন্যা শবলার ও দ্বিতীয় শিরবেদে গঙ্গারামের সঙ্গে নাগিনী কন্যা পিঙলার সংঘাত লক্ষ করি। এ সংঘাত ভাল ও মন্দের সংঘাত।
আবার মানব সভ্যতায় সম্পত্তি ও ক্ষমতার ধারণা সৃষ্টির পর থেকে যে কারণে মানুষে-মানুষে সংঘাত অনিবার্য হয়ে উঠেছিল শিরবেদে ও নাগিনী কন্যার মধ্যেও তার প্রতিফলন ঘটেছে। বিষবেদেরা এই বিরোধকে দেবতার নির্ধারিত নিয়তি বলেই মনে করে। কারণ শিব নিজে ধর্মভ্রষ্ট হয়ে আপন কন্যা মনসার প্রতি কামাসক্ত হয়েছিলেন। সেই ধারাবাহিকতাই মহাদেব-শবলা, গঙ্গারাম-পিঙলার মধ্যেও প্রবাহিত। শিরবেদে বেদে সমাজের রক্ষক ও শাসক।
অন্যদিকে নাগিনী কন্যা দেবীর আশীর্বাদপুষ্ট শক্তি দিয়ে বেদে সমাজের কল্যাণে ও পাপ মোচনে নিয়োজিত । দেবী প্রদত্ত শুভ শক্তির চর্চা করাই তার কাজ। আর তাই এ শক্তির অধিকারী হয়েই নাগিনী কন্যার কাহিনীতে উল্লেখিত কন্যাদ্বয় শিরবেদের অন্যায়, পাপাচার অনাচারের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়েছে। নাগিনী কন্যাদের প্রতি সমাজের লোকদের ধর্মীয় বিশ্বাস ও শ্রদ্ধা বনাম সর্দারদের প্রবল শাসন ক্ষমতার সংঘাতে নাগিনী কন্যাদ্বয় বার বার বিপর্যস্ত হয়েছে।
বিষবেদেরা নিশ্চিন্তে অনাচার, মিথ্যাচার ও উচ্ছৃঙ্খলতা চালিয়ে যায়। কারণ তারা জানে কন্যার পুণ্যে তারা মুক্তি লাভ করবে। তাই কন্যার প্রতি তাদের সম্ভ্রম ও শ্রদ্ধা যথেষ্ট। কিন্তু এ বরাভয় ততদিন থাকবে যতদিন কন্যার মধ্যে কোন কামভাব জাগবে না। কন্যা কামাসক্ত হলে তার আধ্যাত্মিক ক্ষমতা লুপ্ত হয়। তাই তারা এ বিষয়ে সজাগ দৃষ্টি রাখে। উপন্যাসে উভয় শিরবেদের মধ্যেই কৌমসমাজের তুলনায় আধুনিক সামন্ততান্ত্রিক মানসতা লক্ষণীয়।
ঔপন্যাসিক সমকালীন দেশকালের বৈশিষ্ট্য দ্বারা প্রভাবিত হয়েই সম্ভবত কৌমসমাজের জীবনায়নে সামন্ততন্ত্রের প্রভাবকে এনেছেন। সমাজে অনিবার্য ভাঙনের সূত্রও এতে সংকেতিত করার উদ্দেশ্য সম্ভবত লালন করেছিলেন ঔপন্যাসিক তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়। শিরবেদেরা নেতৃত্বের সুবাদে গোত্রের লোকদের শোষণ করে। ঋণ দিয়ে অর্থের জালে আবদ্ধ করে তাদের পদানত করে রাখে তারা। মিথ্যা, ভাড়ামো, প্রবঞ্চনা তাদের নিত্য সঙ্গী।
পক্ষান্তরে নাগিনী কন্যা ন্যায় ও সততার প্রতীক। তাই নাগিনী কন্যারা স্বভাবগতভাবে অনাচারের প্রতিবাদ করলে সংঘাত তীব্রতর হয়। তখন শিরবেদেরা সুচতুর কৌশলের আশ্রয় নেয় ধর্মের ছদ্মাবরণে এ সত্য উপন্যাসে মহাদেব গঙ্গারাম উভয়ের মধ্যেই প্রত্যক্ষ করা যায়। কূটকৌশলী শিরবেদে মহাদেব সর্পদংশনে মারতে চেয়েছিল শবলাকে। কারণ সাধারণ বেদেদের বিষ বিক্রির ন্যায্য প্রাপ্য শবলা আদায় করতে চেয়েছিল। শবলার ভালবাসার যুবককেও সর্পদংশনে হত্যা করেছিল মহাদেব। কারণ মহাদেব নিজেই আসক্ত ছিল শবলার প্রতি।
এ-কথা সর্বজ্ঞ ঔপন্যাসিক জানিয়েছেন এভাবে : ‘মহাদের শিরবেদের মধ্যেও সেই উদ্দাম ভ্রষ্ট জীবনের নিরুদ্ধ কামনা শবলা আবিষ্কার করেছিল। সে বলে- শিরবেদেদের উপরে শিবই চাপিয়ে গিয়েছেন তাঁর সেই স্রষ্ট জীবনের কামনার অতৃপ্তি। সব সব- সকল শিরবেদের মধ্যেই তা প্রকাশ পায়। বেদেরা তা ধরতে পারে না, দেখতে পায় না; দু-একজন পেলেও, তারা চোখ ফিরিয়ে থাকে।
মহাদেবের দৃষ্টিও নাকি পড়েছিল শবলার উপর। চোখে দেখা যেত না, শবলা তা অন্তরে অন্তরে অনুভব করেছিল। এটিকে দৈব নির্ধারিত নিয়তি বলে মেনে নিতেও শবলার কষ্ট হয়নি। প্রথম দিকে নাগিনী কন্যার ধারণাটি শরণার মধ্যে বদ্ধমূল ছিল। কিন্তু মহাদেবের নিষ্ঠুর নৃশংশতার শিকার হয়ে তার প্রেমিকের অপঘাত মৃত্যু তাকে কিছুটা বিদ্রোহী করে তোলে।
তাই সে পিঙলাকে বলে- ‘নাগিনী কন্যা মিছা কথা, কন্যে আবার নাগিনী হয়! কই, বোঝলম না তো কিছু। পাঁচ বছর বয়স হওয়ার আগেই বৈধব্যপ্রাপ্ত শবলার মধ্যে ষোল বছর বয়সে আদিম নারীর কামনা জেগেছিল। নিজ সমাজের চারদিকে উদ্দাম যৌনাচারের প্রভাবে স্বাভাবিক ভাবেই তার চৈতন্যে ও জীবনে জেগে উঠেছিল ভোগ বাসনা। আর তাই সে পাতানো ভাই শিবরামের নিকট ভ্রুণনিরোধক ভেষজ চেয়েছিল।
স্বেচ্ছাচারের কামনা বেদে সমাজে অহরহ আত্মপ্রকাশ করে। কিন্তু শবলার অতৃপ্ত মন মহাদেবের প্রতি তাকে ক্ষুব্ধ করেছিল বলেই অন্ধকার রাতে অসহ্য জীবন ও জৈবিক যন্ত্রণায় মহাদেবকে ধর্মভ্রষ্ট ও হত্যা করে অবরুদ্ধ কামনার মুক্তি দিয়ে নদীবক্ষে আত্মবিসর্জনের আকাঙ্ক্ষায় জীবনমুক্তির আস্বাদ পেতে চেয়েছিল। কিন্তু আত্মবিসর্জনের প্রয়াস ব্যর্থ হয়ে যাওয়ায় বস্তুতপক্ষে শবলার মুক্তি ঘটেনি।
পিঙলা ও গঙ্গারামের বিরোধ আরো স্পষ্ট, করুণতর। গঙ্গারাম মহাদেবের চেয়ে অনেক বেশি হিংস্র ও কুটিল। নাগিনী কন্যা বিষয়ক ধারণায় অগাধ বিশ্বাস ছিল পিঙলার। কৌমের প্রতি সততায় সে ছিল স্বনিষ্ঠ। জমিদার বাড়িতে সাপ ধরতে গিয়ে বেদেদের দেহতল্লাশীর অপমান থেকে বেদে সম্প্রদায়কে রক্ষা করতে নিজেই উলঙ্গ হয়ে, অদ্ভুত আদিম প্রক্রিয়ায় বেদে-কুলের সম্ভ্রম রক্ষা করে সে।
সাপ ধরার দক্ষতার কারণে গোষ্ঠীর লোকের কাছে পিঙলার সম্মান ও গ্রহণযোগ্যতা বৃদ্ধি পায়। তার সাহস ও সাপ ধরার কৌশল দেখে রাঢ় দেশের ওঝাকুলের পুরোহিত নাও ঠাকুর পর্যন্ত প্রশংসায় পঞ্চমুখ। নাগু ঠাকুর বিয়ে করতে চায় পিলাকে। তাই কন্যার ঋণ শোধের ছাড়পত্র আনতে যায় দেবতার কাছ থেকে। এসব ঘটনা গঙ্গারামকে প্রতিহিংসা পরায়ণ করে তোলে। শুরু থেকেই পিঙলার প্রতি গঙ্গারামের ছিল লোভাতুর দৃষ্টি।
গঙ্গারাম ছিল মাতাল, শঠ, কুটিল ও পাপাচারী। নেশা করে সে বেদে পাড়ায় অনাচার করে বেড়াত। ডাকিনী বিদ্যা জানা থাকায় সবাই তাকে ভয় করে। একমাত্র পিঙলাই ছিল গঙ্গারামের এসব আচরণের প্রতিবাদকারিণী। পালিয়ে গিয়ে পিঙলাকে ঘর বাঁধার প্রস্তাব করে গঙ্গারাম। কোন ক্রমেই পিঙলাকে আয়ত্ত বা বশীভূত করতে না পেরে গঙ্গারাম পিঙলার ঘরে চাঁপা ফুলের এসেন্স ছড়িয়ে এই প্রতুবিশ্বাস জন্মানোর চেষ্টা করেছিল যে, পিঙলার মধ্যে যৌনবাসনা জেগেছে, তার গায়ে চাঁপার গন্ধ উঠেছে।
অতএব তার নাগিনী কন্যার মহিমা লুপ্ত হয়েছে, সে ভ্রষ্টা, পাপী। অন্যদিকে নাগু ঠাকুরকে পিঙলার ভাল লেগেছিল কিন্তু নাগিনী-ধর্ম বিসর্জন দিয়ে সে তাকে পেতে চায় না। এ-রকম সংকটে তার মধ্যে মানসিক বিকার দেখা দেয়, আক্রান্ত হয় সে মূর্ছা রোগে। চাঁপা ফুলের গন্ধ নিজের শরীর থেকে উত্থিত না হলেও পিঙলার অন্তরে প্রজ্বলিত হয়েছিল জৈবকামনার বহ্নি।
পিঙলার কথায় তারই অকপট স্বীকারোক্তি : ‘নারীমানুষের লাজের কথা। রাতে আমার ঘুম হয় না। বেদে পাড়ায় ঘুম নেম্যা আসে- আর আমার অঙ্গ থেক্যা চাঁপাফুলের বাস বাহির হয়। সি বাসে মুই নিজে পাগল হয়্যা যাই গ। মনে হয়, দরজা খুল্যা ছুট্যা বাহির হয়্যা যাই চরের ঘাসবনে, নয়তো ঝাঁপিয়ে পড়ি হিজলের জলে। আর পরান দিয়ে ডাকি কালো কানাইয়ে।’ ৪. পিগুলার মধ্যে বাসনা জাগলেও সে দেবীর আজ্ঞা ছাড়া নাও ঠাকুরের সঙ্গে যেতে রাজি হয় না।
গঙ্গারামের কুটিলতার কাছে পরাজয় মেনে সে সকলের সামনে স্বীকার করে যে তার গা থেকে চাঁপা ফুলের গন্ধ উঠছে। ফলে সম্প্রদায়ের মধ্যে প্রতিষ্ঠিত তার মহিমা লুপ্ত হয়ে যায়। ফলত সে মুক্তি প্রার্থনা করে বিষহরির কাছে। কারণ তার বিশ্বাস বিষবেদে সম্প্রদায়ের জন্য অর্পিত দায়িত্ব সে পালন করেছে। দেবী এবার তাকে নিশ্চয়ই মুক্তি দেবেন।
এক পর্যায়ে উন্মাদিনী পিঙলা নাও ঠাকুরের আনা সাপের মুখে আত্মসমর্পণ করে স্বেচ্ছায় দংশিত হয়ে এক অভিনব পদ্ধতিতে জীবন বিসর্জন দেয়। বেদে সম্প্রদায়ের বিচিত্র সংস্কার ও দ্বন্দ্বের নির্মম শিকার নাগিনী কন্যা শবলা ও পিঙলা, জীবন ধর্মের বাসনা ও স্বসম্প্রদায়ের প্রতি দায়িত্বশীলতার সংকটে জর্জরিত হয়েছে এই দুই বঞ্চিত নারী। তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায় একে অভিহিত করেছেন সংস্কার-নির্ভর নিয়তি বলে।
নারীর অচরিতার্থ জীবনাকাঙ্ক্ষাই প্রকাশ পেয়েছে বেদেদের পারিবারিক-সামাজিক ও সাংস্কৃতিক জীবনধারায়। সৈয়দ আজিজুল হক-ও এ-প্রসঙ্গে বলেছেন- ‘চব্বিশ/পঁচিশ বছর বয়সের দুই নারী, কুসংস্কারমূলক বিশ্বাসের বশবর্তী হয়ে জীবনোপভোগ থেকে যাদের বঞ্চিত থাকতে বাধ্য করা হয়েছে, জীবনোপভোগের বাসনায় তারা উদ্দীপ্ত হবে— এটাই স্বাভাবিক। ”
উপন্যাসটিতে জীবনের দ্বন্দ্ব-সংঘাত, পাপাচার, অনাচার, বঞ্চনা ও শঠতার মধ্যেও একটি কৌমের বাঁচার এবং টিকে থাকার যে সংগ্রাম চিত্রিত হয়েছে তা বাংলা সাহিত্যে দুলর্ভ। বিজিতকুমার দত্ত নাগিনী কন্যার কাহিনী-কে তাই তারাশঙ্করের অন্যতম শ্রেষ্ঠ রচনা বলে অভিহিত করেছেন।

সাত
বাংলা সাহিত্যে তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়ই প্রথম অবহেলিত, বঞ্চিত, নিষ্পেষিত, হতদরিদ্র এবং ভদ্রসমাজ বর্হিভূত কৌনজীবনের সার্থক রূপায়ণ ঘটিয়েছেন। বহুকালের বঞ্চনা, অশিক্ষা, কুসংস্কার ও প্রবল দারিদ্র্যের মাঝে যারা বাঁচার সংগ্রামে রত, সেই বঞ্চিত সম্প্রদায়কে তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায় গভীর অভিনিবেশে প্রত্যক্ষ করেছেন। তাদের জীবনধারার নিখুঁত চিত্র এঁকেছেন সার্থতার সাথে। হিজল বিলের বিষবেদে সম্প্রদায়ের পারিদ্র্য- ক্লিষ্ট সংস্কারাচ্ছন্ন বিচিত্র জীবনের চিত্র ও চিত্রকল্প তৈরিতেও তার ব্যত্যয় ঘটেনি।
নাগিনী কন্যার কাহিনী উপন্যাসে তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায় এই গোষ্ঠীর জীবনধারা, ঘর-বাড়ি, পোষাক-পরিচ্ছদ, খাদ্য ইত্যাদির বর্ণনা উপস্থাপন করেছেন যথার্থ সমাজবিজ্ঞানী ও নৃবিজ্ঞানীর দৃষ্টিকোণ থেকে। বিষবেদেরা অমার্জিত, অবজ্ঞাত ও নিম্ন শ্রেনির হলেও তারা স্বাভাবিক নিয়মেই আত্মজীবন ধারাকে আকড়ে থেকেছে শত প্রতিকূলতার মধ্যেও।
নানা ধরনের সামাজিক, প্রাকৃতিক বিপর্যয়েও তারা নিজস্ব জীবনধারা ও ঐতিহ্যকে বিসর্জন দেয়নি। তাই অন্যান্য আদি কৌমগোষ্ঠীর ন্যায় বিষবেদেদেরও আছে স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্যমণ্ডিত বিচিত্র আঞ্চলিক জীবনবৈশিষ্ট্য।
হিজল বিলের বিষবেদেরা অন্যান্য আদিম নরগোষ্ঠীর চেয়ে ভিন্ন প্রকৃতির। তারা নানা রকম তন্ত্রে- মন্ত্রে বিশ্বাসী। অঙ্গে জড়িয়ে রাখে তারা বিভিন্ন রকম বিষঘ্নি লতা-পাতা। তেল মাখে না বলে তাদের গায়ে তীব্র কটুগন্ধ থাকে। মালবেদে, মাঝিবেদে ও মেটেল বেদেদের থেকেও বিষবেদেদের জীবনধারা ভিন্ন। বিষবেদেরা মনে করে তারাই মা মনসার আসল উপাসক, ভক্ত। অন্য বেদেরা বিষবেদেদের সেই ভয়াল রাতে ত্যাগ করেছিল বলে তাদের কেউ মাঝি হয়ে সারাজীবন নদীতে এবং কেউ মাটিতে বসবাস করে।
বেদে সম্প্রদায়ের বিভাজনের সূত্রপাতও এখানেই। ওই সময় থেকেই বিষবেদেরা আসল বা প্রকৃত যাযাবর শ্রেণির বেদেজীবন প্রাপ্ত হয়। তারা হিজল বিলের ধারে একটা নির্দিষ্ট সময়ে এসে ঘর বাঁধে। তারা বিশ্বাস করে এখানে রয়েছে মনসার আসন। বর্ষাকালে তারা নৌকায় করে ঘুরে বেড়ায়। তখন নৌকাই তাদের ঘর-বাড়ি। শীতের শেষে যখন সাপেদের ঘুম ভাঙে তখন তারা হিজল বিলের পাশে ঘর-বাড়ি তৈরি করে।
গ্রামের মাঝখানে মনসার আসনটিকে ঘিরে চারপাশে তৈরি করে বিচিত্র বসতি। এই দেবস্থানের চারদিকে দেবদারু গাছের ডাল কেটে তৈরি করে খুঁটি। খুঁটির ওপর মাচা তৈরি করে তার ওপর বাঁধে ঘর। মাচার চার পাশে ঝাউডালের বেড়া তৈরি করে তার ওপর মাটির পাতলা প্রলেপ দিয়ে নির্মাণ করা হয় দেয়াল।
ঘরের চালা নির্মাণের জন্য তারা হিজল বিলের ঘাস ও বনের ঘাস কেটে শুকিয়ে ব্যবহার করে। কিন্তু প্রতি বছরই ঘরের চালা উড়ে যায় তাদের, বন্যায় ভেসে যায় ঘরের ভিত। শক্ত মাচাগুলো কোন রকমে টিকে থাকে। বন্যার পানি সরে গেলে নৌকা থেকে, ভেলা থেকে নেমে আসে বেদেরা। তখন নতুন করে তৈরি করে তারা ঘর। কাদার প্রলেপ দেয় তারা বেড়ায়; পরিষ্কার করে মেঝে।
তখন বেদেপাড়ার জীবন-প্রবাহে চাঞ্চল্য দেখা দেয় পুনরায়। ছোট ছেলে-মেয়েরা কাদা ঘেঁটে কাঁকড়া ধরে, মাছ ধরে। বড়োরা গাছের শুকনো ডাল ভেঙে আনে। ফাঁদ পেতে, গুলতি ছুঁড়ে মেরে আনে হাঁসসহ নানা রকম পাখি। ঘরে ঘরে রান্নার ধোঁয়া ওঠে তখন। পুরোদমে শুরু হয় ঘরকন্না। বন্যার জলে ভেসে আসা সাপ ধরার ধুম পড়ে তখন। নাগপঞ্চমীর শেষে সারি সারি নৌকা সাজিয়ে বেদেরা বেরিয়ে পড়ে নদীপথে।
নৌকাগুলিই তখন তাদের ঘর-বাড়ি, তাদের সংসারের যাবতীয় সামগ্রী তখন নৌকায়ই থাকে। সাপের ঝাঁপি, রান্নার হাঁড়ি, বাঁদর, ছাগল, মানুষ সবার তখন একত্র নৌকায় বসবাস। নাগিনী কন্যা ও শিরবেদেসহ সবার আলাদা নৌকা থাকে। গঙ্গার বুকে ভাসতে ভাসতে বিষবেদেরা কখনো সুবিধাজনক স্থানে নৌকা ভিড়িয়ে অস্থায়ীভাবে বসবাস করে।
অরণ্য-প্রকৃতির আদিম সন্তানদের দৈহিক-অবয়ব ও পোষাক-পরিচ্ছদ থেকেই বোঝা যায় ওরা ভূতকালের মানুষ। বিষধর সাপ নিয়ে বেদেদের খেলা। সাপের বিষগালা, গভীর অরণ্যে সাপ ধরা এবং ওষধি লতা-পাতা ও শিকড় সংগ্রহ করেই তাদের জীবন কাটে। তাই আরণ্যক বৈশিষ্ট্য অনেকটা ওদের সহজাত।
পুরুষরা দেখতে কালো পাথর কেটে গড়া বন্য বর্বর মূর্তির মতো। তাদের গায়ের রঙ মসৃণ। কালো, কোকড়া চুল, কোমরে একফালি গামছা জড়ানো, রুক্ষ ধূলি-ধূসরিত চেহারা। গলায় হাতে অসংখ্য মালা তাগা তাবিজ-জড়ি-বুটি কালো সূতায় জড়ানো। শেষের দিকে অনেক বেদে অবশ্য গিরিমাটিতে ছুপিয়ে গেরুয়া রঙের কাপড় পরায় অভ্যস্ত হয়ে পড়ে। এটি তাদের আধুনিকতাকে স্পর্শ করার প্রথম সংকেত। মেয়েরাও ক্রমশ তাঁতে বোনা ছাপানো খাটো ও মোটা শাড়িতে আগ্রহী হয়ে ওঠে।
বন্য আদিম মানুষের খাদ্যতালিকা বিচিত্র রকমের হয়। বেদেকৌমের মানুষেরা পোড়া মাংস খায়। বিষবেদেরা কাঁকড়া, মাছ ও শিকার করা পশুপাখির মাংস পছন্দ করে। হিজল বিলে মাংস সহজলভ্য। বাটুল মেরে বা তীর ছুড়ে এবং ফাঁদ পেতে তারা পশু-পাখি শিকার করে। সরালি হাঁস, জলমুরগি, কাঁদাখোঁচা, হাঁড়িচাঁচা, শামকল ইত্যাদি পাখির মাংস হিজল বিলের বেদেদের সহজলভ্য আহার। বন থেকে ধরে আনা খরগোশ, সজারু, শিয়াল ইত্যাদি প্রাণীও তাদের আহার্য তালিকাভুক্ত।
ফাল্গুন-চৈত্র মাসে শীতের শেষে সাপের যখন ঘুম ভাঙে, তখন বেদেরা বিষহরির পুজো দেয়। পুজোয় তারা শিকার করা প্রাণির মাংস, পেঁয়াজ-রসুন-লঙ্কা দিয়ে পরিপাটি করে রান্না করে। বেদেরা মদ ও সাপের বিষ দ্বারা নেশা করে। ফসলের মৌসুমে তারা গৃহস্থের জমি থেকে কুড়িয়ে অথবা চুরি করে শস্য সংগ্রহ করে। শহরে এসে কখনো-কখনো নগদ পয়সা হাতে পেয়ে অখাদ্য কুখাদ্য খেয়ে তারা মৃত্যুমুখী রোগেও আক্রান্ত হয়।
আট
সাঁতালী গাঁয়ের বিষবেদেদের আর্থনীতিক জীবনও উপকথা-নিয়ন্ত্রিত। তাদের সর্প-কেন্দ্রিক আর্থনীতিক জীবন দৈব-নির্ধারিত বলেই তাদের বিশ্বাস। তাদের আর্থনীতিক জীবন প্রধানত সর্প-নির্ভর। দারিদ্র্য তাদের নিত্য সঙ্গী। কিন্তু অমিত প্রাণ-শক্তির কারণেই তাদের অস্তিত্ব যুগ যুগ ধরে টিকে রয়েছে। বন্য এবং আদিম জীবন যাপনের ফলে তারা খাদ্যাভাবে নিশ্চিহ্ন হয়ে যায়নি কখনো। ছল চাতুরী, লোক- ঠকানো, প্রতারণা তাদের পেশারই একটা অপরিহার্য অংশ।
কৃষির সাথে বিষবেদেরা সম্পৃক্ত ছিল না বলে ভূমির সাথে তাদের সম্পর্ক কখনো নিবিড় হয়ে ওঠেনি। সাপ ধরা, সাপের বিষ সংগ্রহ করে বিক্রি করা, সাপের খেলা দেখিয়ে পয়সা আদায় করা বিষবেদে গোষ্ঠীর প্রধান পেশা। এছাড়া সর্পকেন্দ্রিক চাতুর্যপূর্ণ নানা কাজের সঙ্গেও তারা সংযুক্ত। বিভিন্ন স্থানে ঘুরে তারা সাপ সংগ্রহ করে এবং বাঁধা কবিরাজের কাছে সেই সাপের বিষ বিক্রি করে।
মেয়েরা গ্রামে গৃহস্থের ঘরে ঘরে সাপের নাচ, ছাগল-বাঁদরের খেলা দেখিয়ে ভেল্কিবাজি করে পয়সা উপার্জন করে। বেদে- মেয়েরা কৌতুক-রসিকতা ও যাদু মন্ত্রের দ্বারা গৃহস্থের মনোরঞ্জন করে বকশিস পায়। গ্রামের বউ-ঝিরা হাতের সমস্ত কাজ ফেলে বেদে মেয়ের নাচ-গান ও খেলা দেখে এবং তাদের পয়সা দেয়। কিন্তু ওই পয়সার সবটাই বেদে পুরুষের অধিকারের চলে যায়।
বেদেদের পেশার সঙ্গে সততার সম্পৃক্ততা নেই। লোক ঠকিয়ে নানা রকম লতা, জড়িবুটি, তাবিজ ও সর্প দংশনের ঔষধ বিক্রি করে অর্থ উপার্জন করে তারা। ভদ্র পল্লির মেয়েদের কাছে বেদে-মেয়েরা শুধু বাক্যের মোহ বিস্তার করে। কিন্তু পুরুষদের কাছে বাক্চাতুর্যের সঙ্গে চপল দৃষ্টি ও হিল্লোলিত দেহ মেলে ধরে মোহ বিস্তারেও তারা পারঙ্গম। নেচে গেয়ে জমিদার গৃহস্থদেরকে তুষ্ট করে অধিক অর্থ উপার্জনে তাদের জুড়ি নেই। গ্রামের মহিলাদের কাছে তারা স্বামী বশীকরণ তাবিজ বিক্রি করে।
জাদুবিদ্যার দ্বারাও বেদেরা উপার্জন করে। বেদেদের রয়েছে নিজস্ব চিকিৎসা-ব্যবস্থা। সাঁতালীর গাছ-গাছড়া, লতা-পাতা দিয়ে চলে ওই চিকিৎসা। সাপে কাটা রোগীর চিকিৎসা করা বেদেদের জন্য বাধ্যতামূলক। দেবীর আদেশে এ কাজ সম্পন্ন করে বলে এর জন্য পারিশ্রমিক তারা নেয় না। তবে খুশি হয়ে কিছু দিলে তা তারা ফিরিয়েও দেয় না। সাপের ভয় দেখিয়ে সাপে কাটা থেকে রক্ষা পাওয়ার তাবিজ বিক্রি করে তারা। মোটকথা, তাদের পেশার সাথে বিচিত্র সব ছল-চাতুরি ও লোক-ঠকানো ব্যাপার জড়িত।
নাগপঞ্চমীর পূর্ব পর্যন্ত তারা বনে জঙ্গলে সাপ ও সাপের বিষ সংগ্রহ করে। শিকার করা প্রাণীর তেল, হাঁড় জমা করে। নাগপঞ্চমীর পরে নৌকা সাজিয়ে তারা বেরিয়ে পড়ে গ্রাম-গঞ্জে ও শহরের উদ্দেশ্যে। শুশুকের তেল, বাঘের চর্বি-পাজার, নখ, কুমিরের দাঁত, শজারুর কাঁটা এবং সাপের বিষ বিক্রির জন্য তারা পশরা সাজায়। এসব বিক্রি করে তারা শহর থেকে ঔষধের মসলা, চুড়ি, ফিতা, তাবিজের খোল, পুঁতির মালা, ভূঁই-সূতা, ছুরি, বড়শি ইত্যাদি জীবনযাপনের প্রয়োজনীয় উপকরণ নিয়ে আসে।
বেদের মেয়েরা এসব গ্রামে গ্রামে গিয়ে বিক্রি করে। ওদের পেশার মধ্যে সাপ আর সাপের বিষটুকুই বোধ হয় সত্য আর বাকি সবই ছলচাতুরি। তথাপি তারা পরম বিশ্বাস ও ভক্তিসহকারে গর্বিতভাবেই নিয়োজিত থাকে এ পেশায়। নদীর কূলে নৌকা বেঁধে সাপ- বাঁদর ছাগল নিয়ে ডুগডুগি বাজিয়ে গ্রামের দুয়ারে দুয়ারে হাজির হয়। গ্রামের সবাই ছুটে আসে, বলে- বেদেনী এসেছে। তখন সুরেলা কণ্ঠে বেদের মেয়েরা বলে- ‘হ্যাঁ গ মা-লক্ষ্মী, বেদেনী আছে ।… মা, পোড়ারমুখী আছে, তুমাদের দুয়ারের কাঙালিনী আছে, সব্বনাশী-মায়াবিনী আছে, খেল দেখাতে, ভিখ মাঙতে, দুয়ারে এস্যা হাত পেতে দাঁড়াছে।
কখনো কখনো বেদেরা নানা রকম অন্যায় কাজও করে। অভাবের সময় গৃহস্থের ফসল চুরির মত কাজেও তারা জড়িয়ে পড়ে। বেদে কন্যারা তরুণ গৃহস্বামীর সাথে কটাক্ষপূর্ণ রসিকতা করে ও নাচ দেখিয়ে মোটা অংকের টাকা আদায় করে থাকে। যেমন বিচিত্র জাতি এ বিষবেদে গোষ্ঠী, তেমন বিচিত্র তাদের পেশাগত জীবন।

নয়
তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায় রাঢ়ের অন্ত্যজ শ্রেণির জীবনকে প্রত্যক্ষ করেছেন অত্যন্ত নিবিড়ভাবে। তাই রাঢ়ের বিভিন্ন ব্রাত্যশ্রেণির জীবন-ধারা সম্পর্কে বাস্তব চিত্র উপস্থাপন করেছেন তিনি। বৈষ্ণব’ ও ‘বিষবেদে’ সম্প্রদায় ছাড়া আর সব কৌম গোষ্ঠীই কম বেশি ভূমি সংলগ্ন। এর মধ্যে বৈষ্ণবদের ইতিহাস ভিন্ন।
বৈষ্ণবেরা বাউল ও সংসার বিবাগী হয়ে ঘুরে বেড়ায়। এরা শ্রীচৈতন্যদেব-প্রচারিত বৈষ্ণব নয়। এই বৈষ্ণবদের মতোই সংস্কার ও বৃত্তিগত কারণে বিষবেদেরাও জাত- যাযাবর। বিষবেদেরা সপজীবী, সাপের বিষ বিক্রি করা, সাপের খেলা দেখানো, সাপ ধরা ইত্যাদি কাজের জন্য তাদের বিভিন্ন স্থানে পরিভ্রমণে যেতে হয়। নাগিনী কন্যার কাহিনী উপন্যাসে আমরা লক্ষ করি সাপের বিষ বিক্রির জন্য তারা শহরের বাঁধা করিরাজের কাছে যাতায়ত করে।
এছাড়া একটি স্থানে বহু দিন তাদের পেশা চলে না, লোকজনের আগ্রহ কমে আসে। ফলে তারা স্থান পরিবর্তনে বাধ্য হয়। নানা রকম লোকালয়ে মিশে বিচিত্র অভিজ্ঞতা অর্জন করে বেদেরা। কৃষির সাথে অসম্পৃক্ততা ও নির্দিষ্ট আবাসভূমিতে বসবাস না করার কারণেও তাদের গ্রাম থেকে শহরের সর্বত্র ঘুরে বেড়াতে হয়।
বিষবেদেদের সহজাত প্রবণতা হচ্ছে ভবঘুরে মানসতা। জাতিগত স্বভাবেই তারা যাযাবর। বছরের একটা নির্দিষ্ট সময়ের জন্য তারা সাঁতালী পল্লিতে এসে থাকলেও, নৌকা করে বিভিন্ন স্থানে ঘুরে বেড়ায় বেশির ভাগ সময়। জীবিকার ধরনই তাদের যাযাবর হতে বাধ্য করেছে। তাদের ধর্মীয় সংস্কার ও বিশ্বাস- যাযাবর জীবনই তাদের জন্য নির্ধারিত।
চাঁদ সওদাগরের অভিশাপে তাদের পূর্ব-পুরুষরা স্বভূমি থেকে উৎখাত হওয়ার পর থেকেই যাযাবর জীবনের নিয়তি তাদের ওপর ভর করেছে। বিষবেদেদের বিশ্বাস এটি তাদের আদিপুরুষ-কৃত পাপের এক বিরামহীন প্রায়শ্চিত্ত। ভাদ্রের শেষে নাগপঞ্চমীতে বিষবেদেরা নৌপথে বেরিয়ে পড়ে দেশ থেকে দেশান্তরে, বিষবেদেরা চলে নৌকায় জলে জলে, গঙ্গা থেকে ঢোকে অন্য নদীতে, চ’লে আসে কলকাতা শহর পর্যন্ত, সেখানে সাহেবান লোকের নতুন শহর গ’ড়ে উঠেছে, বড় বড় আমীর বাস করে, অনেক কবিরাজও আছেন। সেখানেও বিষ বিক্রি করে, তারপর শীত বেশ গাঢ় হয়ে পড়তেই ফেরে।’
উপন্যাসে তারাশঙ্করের এই বর্ণনা থেকেই আমরা এই সম্প্রদায়ের যাযাবর জীবন-ধারা সম্পর্কে ধারণা পাই। এই ভবঘুরে মানসতার জন্যই বেদেরা কখনো কৃষির সাথে সম্পৃক্ত হতে পারেনি। আমরা লক্ষ করেছি আদিবাসী এই জনগোষ্ঠী যখনই সভ্য জগতের সন্নিকটবর্তী হয়েছে, তখনই তাদের জীবনধারায় পরিবর্তনের সূচনা হয়েছে। আর বিষবেদেরা যাযাবর হওয়ার জন্যই সভ্য জগতের ভিন্নমাত্রিক মানুষের সংস্পর্শে আসে সব সময়।
ফলে তারা বিভিন্ন জীবন ধারা, বিষয় ও পেশার মোহে আকৃষ্ট হয় স্বভাবতই। ফলত এই সৰ্পজীবী জনগোষ্ঠী অন্যান্য পার্শ্বজীবিকার সাথে সংশ্লিষ্ট হয়ে পড়ে অনিবার্যত। এভাবেই তাদের জীবনে অনুপ্রবেশ করেছে নানা মাত্রিক জটিলতা। আলোচ্য উপন্যাসে গঙ্গারামই এর যোগ্য উদাহরণ। শহরে-বন্দরে ঘুরে ঘুরে সে জটিল ও ভয়ানক মানুষে পরিণত হয়।
নানা স্থান থেকে নানা রকম বিদ্যা আয়ত্ত করার সঙ্গে সঙ্গে সে আয়ত্ত করে আধুনিক মানুষের জটিলতাও। এবং এরই প্রভাবে বেদেদের কৌম জীবনে ক্রমান্বয়ে সূচিত হয় পরিবর্তনের ধারা। বিষবৈদ্য নামে বহুল পরিচিত বিষবেদেদের বিষ-চিকিৎসার জন্য প্রয়োজন নানাবিধ ভেষজ উপকরণ।
সর্প সংক্রান্ত ও আন্যানা রোগের কবিরাজি চিকিৎসায়ও বিষবৈদ্যরা অভ্যস্ত। পেশাগত প্রয়োজনেই এদেরকে শহর বা লোকালয় থেকে ভেষজ উপকরণ সংগ্রহ করতে হয়। আবার গভীর অরণ্য থেকে তারা সংগ্রহ করতে হয় বিষয়ি ও ঔষধি লতা-পাতা। এসব কারণে সভ্য জগৎ ও অরণ্যে তাদের চলাচল করতে হয়। নগর জীবনের সংস্পর্শে আসার কারণে স্বভাবতই তাদের জীবন-মানে এর প্রভাব পড়ে।
আবার বনভূমি উজার হওয়ার কারণেও তাদের ভেষজ উপাদানের স্বল্পতা দেখা দেয়। অন্যদিকে বিজ্ঞানের প্রসারের সঙ্গে সঙ্গে গ্রামীণ ও নাগরিক মানুষের দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন ঘটে চলেছে নিয়ত। ভেষজ চিকিৎসায় ক্রমশ মানুষের আগ্রহ কমে আসছে। ফলে এই কৌমগোষ্ঠীর স্বকীয়তায় পড়েছে টান।
সভ্য জগতের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট হওয়ার অভিজ্ঞতা বেদেদের কাছে সব সময় সুখকর হয় না। শহরে বা লোকালয়ে এসে জড়িয়ে পড়ে তারা নানা সমস্যায়। এই বিচিত্র জনগোষ্ঠী সম্পর্কে মানুষের আগ্রহ থাকলেও তাদের প্রতি মানুষ সব সময় সহানুভূতি প্রদর্শন করে না। ধূর্জটি কবিরাজের কাছ থেকে পাওয়া সমাদর তাদের জন্য অবিস্মরণীয় অভিজ্ঞতা। বৃত্তিগত বা অন্য যে কোন কারণেই আরণ্যক এই যাযাবর শ্রেণি প্রায়শই প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ শোষণের শিকার হয়েছে।
তাদের সে অভিজ্ঞতার প্রমাণ মেলে পুলিশ সম্পর্কে মহাদেবের ভীতি থেকে। এ জন্য মহাদেব পুলিশের হাঙ্গামা থেকে রক্ষা পাওয়ার আশায় শরণাপন্ন হয় ধূর্জটি কবিরাজের। আত্মরক্ষার জন্য জমিদারের কুকুর মেরে ফেলার পর রাতের অন্ধকারেই জমিদারের ভয়ে ওই এলাকা ত্যাগ করে বেদেরা। কারণ জমিদার জানতে পারলে তাদের ওপর যে অত্যাচার নেমে আসবে সে সম্পর্কে তাদের ধারণা ছিল স্পষ্ট।
নিজ সমাজেও বিষবেদেরা বঞ্চনা ও শোষণের শিকার হয়েছে। সংগৃহীত বিষ বিক্রির টাকা সমভাবে সবার মধ্যে বণ্টন করায় অনীহা ছিল শিরবেদের। গঙ্গারাম গোষ্ঠীর দারিদ্র্যের সুযোগ নিয়ে অর্থ ঋণ দিয়ে স্বজাতির মধ্যে শোষণ ও শাসন প্রক্রিয়া অব্যাহত রেখেছে। বেদেরা একদিকে নিজ সম্প্রদায়ের অভ্যন্তরে, অন্যদিকে সভ্য সমাজ কর্তৃক শোষণের শিকার হয়েছে।
আমরা লক্ষ করেছি যে, বিচ্ছিন্ন আদিবাসী জনগোষ্ঠী যখনই সভ্য জগৎ-সংলগ্ন হয়েছে, তখনই তাদের জীবন ধারায় পরিবর্তন সূচিত হয়েছে। ফলে তাদের বিশেষ বৃত্তি-নির্ভর জীবনে আর্থনীতিক শৈথিল্য দেখা দেয়। এছাড়া বেদেরা ধর্মের ব্যাপারে আশ্চর্য রকম সহজিয়া স্বভাবী। তাদের গোষ্ঠীগত ধর্মীয় বন্ধনও তাই শিথিল হয়েছে সহজে। এ-কারণেই শেষ পর্যন্ত শবলা ইসলামি বেদের সঙ্গে ঘর বেঁধেছে। তবে এ ব্যাপারে সে নির্দ্বন্দ্ব ছিল তা বলা যাবে না।
বেদেদের আর্থনীতিক ও সামাজিক জীবনের কর্মধারা পরিচালিত হয় হিজলবিল-কেন্দ্রিক বিশ্বাসকে অবলম্বন করে। হিজল বিলের প্রস্ফুটিত পদ্ম তাদের শুভ-অশুভের নির্দেশক। এমনকী নারী-পুরুষের প্রেম ও যৌনজীবনও হিজলবিল-কেন্দ্রিক সর্প-সংস্কৃতির দ্বারা নিয়ন্ত্রিত। মোট কথা তাদের সমগ্র জীবনদর্শনের মর্মমূলে রয়েছে এই নৈসর্গিক পরিবেশ ও সংস্কৃতি। তাই এই আশ্রয় থেকে যাযাবর স্বভাবী বেদেরা যখন বিচ্যুত হয় তখন তাদের সামূহিক বিপর্যয় অনিবার্য হয়ে পড়ে।
বহির্জগতের প্রভাব গঙ্গারামের মাধ্যমে বেদে জীবনে কীভাবে পড়েছে তার বিস্তৃত বিবরণ তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায় বর্তমান উপন্যাসে দিয়েছেন। সর্বজ্ঞ ঔপন্যাসিক লিখেছেন যে, ‘বেদেদের চিকিৎসা-বিদ্যা আছে, সে বিদ্যা জানে ভাদু নটবর নবীন। সাঁতালীর আশপাশের গাছ-গাছড়া নিয়ে সে চিকিৎসা। জন্তু-জানোয়ারের তেল-হাড় নিয়ে সে চিকিৎসা। নাগিনী কন্যার কাছে আছে জড়ি আর বিষহরির প্রসাদী নির্মাল্য, তাই দিয়ে কবচ মাদুলি নিয়ে সে চিকিৎসা। গঙ্গারামের চিকিৎসা অন্য রকম।
ওষুধের মসলা সংগ্রহ ক’রে আনে সে শহর-বাজারের দোকান থেকে। ধন্বন্তরি ভাইদের কবিরাজী ওষুধের মত পাঁচন বড়ি দেয়। বিশেষ ক’রে জ্বর-জ্বালায় গঙ্গারামের ওষুধ খুব খাটে। সেই মসলা আনতে সে মধ্যে-মাঝে শহরে যায়। নিয়ে যায় শুশুঁকের তেল, বাঘের চর্বি, বাঘের পাঁজর নখ, কুমীরের দাঁত, শজারুর কাঁটা আর নিয়ে যায় মা মনসার অব্যর্থ ঘায়ের প্রলেপ মলম। নিয়ে আসে ওষুধের মসলা আর সঙ্গে চুড়ি, ফিতে, মাদুলীর খোল, পুঁতির মালা, সূচ- সুতো, বড়শি, ছুরি, কাটারি, কাঁকুই হরেক রকম জিনিস। গঙ্গারাম শিরবেদে সাঁতালী গাঁয়ে নতুন নিয়ম প্রবর্তন করেছে— শিরবেদে হয়ে বেনেতী বৃত্তি নিয়েছে।’ ৪৭

দশ
তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়ের সাহিত্যিক মনন গড়ে উঠেছিল বিশেষ কালচেতনা ও রাঢ়ের চারপাশের সামগ্রিক প্রতিবেশকে কেন্দ্র করে। ক্ষয়িষ্ণু সামন্ত সমাজের পাশাপাশি তিনি গভীরভাবে প্রত্যক্ষ করেছেন অন্ত্যজ কৌম গোষ্ঠীকে। রাঢ়ে এদের আধিক্য ছিল বলেই শৈশব থেকে তাদের ঘনিষ্ঠ সান্নিধ্যে এসেছিলেন তিনি। রাঢ় অঞ্চলে কাহার, বেদে, সাঁওতাল, ডোম, বাউরি ইত্যাদি অনার্য কৌম মানুষের আদি নিবাস। তথাকথিত সভ্য সমাজধারা থেকে পৃথক এসব কৌম গোষ্ঠীর একটি হল সাঁতালীর বিষবেদে সম্প্রদায়। এদের বিচিত্র সংস্কারাচ্ছন্ন জীবন কাহিনী নিয়ে রচিত উপন্যাস নাগিনী কন্যার কাহিনী। বেদেজীবন সম্পর্কে তারাশঙ্করের বাস্তব অভিজ্ঞতার যথেষ্ট প্রমাণ মিলে তাঁর আত্মজীবনীমূলক রচনা আমার কালের কথা-য় (১৩৫৮)।
এসব বাস্তব অভিজ্ঞতাকে কেন্দ্র করেই তাঁর কল্পনার বিস্তার ঘটেছে নাগিনী কন্যার কাহিনী উপন্যাসে। তিনি নিজেই বলেছেন- ‘মোট কথা, ‘নাগিনী কন্যা’ আমার বারো আনার বেশি কল্পনা। হয়ত দু’আনা তথ্যের সত্য এর মধ্যে আছে।’ এই দুই আনা সত্যের ওপর প্রতিষ্ঠিত কল্পনাকে তিনি অধিকতর বাস্ত ব করে তুলেছেন।
সাহিত্য ক্ষেত্রে সত্যিকারের আত্মপ্রকাশের কাল থেকেই তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায় তাঁর পরিচিত এসব অন্ত্যজ মানুষের প্রবৃত্তি-তাড়িত জীবন-রহস্যের সন্ধান করেছেন। অস্তিত্ব রক্ষা, যৌনকামনা, স্বার্থ- দ্বন্দ্ব, বিশ্বাস, সংস্কার প্রভৃতি মানবীয় বৃত্তি ও আকাঙ্ক্ষা তাদের স্বভাবকে বিশেষ বৈশিষ্ট্যে সংগঠিত করেছিল। তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায় ওইসব মানবীয় আকাঙ্ক্ষার বিচিত্র গতি-প্রকৃতি লক্ষ করে মানবজীবনের অপার রহস্য উদ্ঘাটনে প্রয়াসী ছিলেন।
মানুষের সহজাত প্রবণতা হচ্ছে অস্তিত্ব রক্ষার সাধনা। অনার্য সমাজে অস্তিত্ব রক্ষার পরপরই প্রাধান্য পেয়েছে অপ্রতিরোধ্য যৌনকামনা। তারাশঙ্করের গল্প-উপন্যাসে মানুষের প্রবৃত্তি-লীলার প্রকাশ মূলত ওই দুটি সূক্ষ্ম ধারায় প্রবাহিত। একটি জীবন রক্ষার তাগিদ, অপরটি যৌন- চাহিদা। প্রাণের স্বতঃস্ফূর্ত আবেগী প্রকাশ আদিম সমাজে লক্ষণীয়। মানুষ যত এগিয়েছে ততই সীমাবদ্ধতাকে স্বীকার করে নিতে হয়েছে। তাই তাদের প্রাণপ্রাচুর্য স্বতঃস্ফূর্ত হলেও সামাজিক অনুশাসনহীন নয়।
সামাজিক গঠন ও অস্তিত্ব রক্ষার খাতিরেই কৌমের অনুশাসন মেনে নিতে হয়েছে তাদের কঠিন সাধনায় বর্হিজগতের আঘাত থেকে তারা যথাসাধ্য দূরে রেখেছে নিজেদের। কিন্তু মানুষের স্বভাবগত স্বার্থপরতার জন্য অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্বের শিকার হতে হয়েছে তাদের।
নাগিনী কন্যার কাহিনী উপন্যাসে ভদ্রসমাজ-বিচ্ছিন্ন বেদে সম্প্রদায়ের জীবনধারা সম্পর্কিত ঔপন্যাসিকের একটি স্বতন্ত্র দৃষ্টিভঙ্গি কাজ করেছে। বিষবেদেদের জীবন সম্পর্কে উপস্থাপিত তারাশঙ্করের ধ্যান-ধারণা উপন্যাসে মূলত ধূর্জটি কবিরাজের দৃষ্টিকোণ থেকে উপস্থাপিত হয়েছে।
ধূর্জটির প্রেক্ষণবিন্দু থেকে ঔপন্যাসিক লিখেছেন- ‘ওরা হলো ভূত কালের মানুষ। পৃথিবীতে সৃষ্টিকাল থেকে কত মন্বন্তর হ’লো, এক-একটা আপৎকাল এল, পৃথিবীতে ধর্ম বিপন্ন হ’লো, মাৎস্যন্যায়ে ভ’রে গেল, আপদ্ধর্মে বিপ্লব হয়ে গেল, এক মনুর কাল গেল, নতুন মনু এলেন- নতুন নতুন বিধান ধর্ম বর্তিকা হাতে নিয়ে। জ্ঞানে-বিজ্ঞানে, আচারে-ব্যবহারে, রীতিতে-নীতিতে, পানে-ভোজনে, বাক্যে-ভঙ্গিতে, পরিচ্ছদে প্রসাধনে কত পরিবর্তন হয়ে গেল। কিন্তু যারা নাকি আরণ্যক, তারা প্রতিবার প্রতিটি বিপ্লবের সময়েই গভীরতর অরণ্যের মধ্যে গিয়ে তাদের আরণ্যক প্রকৃতিকে বাঁচিয়ে রাখলে। সেই কারণেই তারা সেই ভূত কালের মানুষই থেকে গিয়েছে।
মনু বলেন, শাস্ত্রপুরাণ এদের জন্মগত অর্থাৎ ধাতু এবং রক্তের প্রকৃতিই স্বতন্ত্র এবং সেইটেই এর কারণ। এই ধাতু এবং রক্তে গঠিত দেহের মধ্যে যে আত্মা বাস করেন, তিনি মানবাত্মা হ’লেও ওই পতিত দূষিত আবাসে বাস করার জন্যেই তিনিও পতিত এবং বিকৃত হয়ে এই ধর্মে আত্মপ্রকাশ করেন। এই বিকৃতিই ওদের ধর্ম।… মহাভারতে পারে ধর্ম ব্যাধ নিজের আচরণ বলে পরমতত্ত্বকে জ্ঞাত হয়েছিলেন। এক জিজ্ঞাসু ব্রাহ্মণকুমার তাঁর কাছে সেই তত্ত্ব জানতে গিয়ে তাকে দেখে বিস্মিত হয়েছিলেন।
সেই আরণ্যক মানুষের বর্বর জীবন, অন্ধকার ঘর, চারিদিকে মৃত পশু, মাংস-মেদ-মজ্জার গন্ধ, শুষ্ক চর্মের আসন শয্যা, কৃষ্ণবর্ণ গাঢ় মুখমণ্ডল, রক্তবর্ণ গোলাকৃতি চোখ, মুখে মদ্যগন্ধ দেখে তার মনে প্রশ্ন জেগেছিল, এ কেমন করে মুক্তি পেতে পারে? ব্যাধ বুঝেছিলেন ব্রাহ্মণকুমারের মনোভাব।
তিনি তাকে সম্ভাষণ আহবান ক’রে বলেছিলেন- এই আমার স্বধর্ম। … এই আচরণের মধ্যেই আমাদের জীবনের স্ফূর্তি। এর মধ্যেই আমাদের মুক্তি।… বহু পরীক্ষায় বহু বিচার ক’রে এই সিদ্ধান্তেই পৌঁছেছি যে ধাতু বা শোণিত যদি রোগ দূষিত না হয়, তবে এক জীবন ধর্ম থেকে আর এক জীবন ধর্মে আসতে কোনো বাধা বিশেষ নাই।
যে টুকু বাধা, সে নগন্য, অতি নগন্য।’ তবে যে কারণেই হোক ওরা বৃহত্তর সমাজধারার সঙ্গে একীভূত হতে চায়নি। ভদ্র সমাজের জটিল জীবনাচরণ, সংস্কার, হিংস্রতা, স্বার্থপরতার ভয়েই হয়ত তাদের এই বন্ধমূল অনীহা। তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায় জানতেন এরা আধুনিক জ্ঞান পায়নি, পেয়েছে অধিক স্বাস্থ্য এবং দীর্ঘ আয়ু। অন্ত্যজ শ্রেণির এই সামাজিক মানুষ সম্পর্কে তারাশঙ্করের মনস্তাত্ত্বিক, ঐতিহাসিক মতবাদ হয়ত সর্বদা নির্বিচারে গ্রহণ করা যাবে না। কিন্তু তাঁর পর্যবেক্ষণ ও বিশ্লেষণকে অবৈজ্ঞানিক বলাও যাবে না। বিভিন্ন যুগে নতুনতর সমাজ প্রতিষ্ঠা পেয়েছে।
তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায় এ সত্য জেনেও নাগিনী কন্যার কাহিনী-তে নতুন সমাজলক্ষণকে স্পষ্টতা দেননি। হাঁসুলী বাঁশের উপকথা-য় কৌমের বিশ্বাসের বিরুদ্ধে করালীর বিপ্লবাত্মক আচরণ কাহার পল্লিতে আলোড়ন তৈরি করেছিল। রীতি ভঙ্গ করে নতুন জীবিকা নিয়ে স্বাধীন জীবনযাপনের আহ্বান- আসন্ন যুগান্তরের অমোঘ সংকেত। লেখক এই সংকেতের অতিরিক্ত কোন বৈপ্লবিক রূপান্তরের বিবরণ স্থাপন করেননি সেখানে। নাগিনী কন্যার কাহিনী-তে ওই পরিচয় আরো সংবৃত। শবলা-পিঙলা প্রবল আধ্যাত্মিক শক্তির অধিকারী হলেও গোটা সমাজের সাথে তাদের সম্পর্ক নিবিড় নয়, বরঞ্চ শিথিল ।
হাদেব-শবলা ও গঙ্গারাম পিওলার দ্বন্দ্ব প্রকট আকার ধারণ করতে পারত যদি ওই দ্বন্দ্ব গোটা সমাজে আলোড়ন তুলতে পারত। শবলার ‘নাগিনী কন্যা’ বিষয়ক ধারণা ও বিশ্বাসহীনতাকে লেখক সুপ্রতিষ্ঠিত করতে পারতেন। কন্যাদ্বয়ের মানবীয় আকাঙ্ক্ষার চরিতার্থ রূপ অঙ্কনের সুযোগ ছিল ঔপন্যাসিকের। কিন্তু তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায় কৌমের বিপর্যয়কে সমকালীন দেশকালের সঙ্গে সংযুক্ত করতে সক্ষম হননি এ- উপন্যাসে। নতুন স্বাধীনতা প্রাপ্ত ভারতের দেশকালগত প্রেক্ষাপট হয়ত তাঁকে ওই সিদ্ধান্ত গ্রহণে প্রভাবিত করেছে।
নাগিনী কন্যার কাহিনী ভাগীরথী-তীরবর্তী হিজল বিল, অরণ্য-প্রকৃতি, জল-স্থল-আকাশ, কৃষি-মৎস – সর্পজীবিতার আধার। তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায় এ উপন্যাসে শুধু অন্ত্যজ আদিবাসী জনগোষ্ঠীর সংস্কার ও জীনব-ধারার চিত্রই এঁকেছেন। সমাজ বিচ্ছিন্ন এ জনগোষ্ঠীকে বৃহত্তর সমাজের সঙ্গে সম্পৃক্ত করতে পারেননি। কালের পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে তাঁর নিজেরও অনেক পরিবর্তন হয়েছিল।
তাই একালের উপন্যাসে বার বার ফিরে আসে পাপ-পুণ্যের প্রসঙ্গ, ধর্ম-অধর্ম, ব্যাধি ও প্রতিকার, বিজ্ঞান ও সংস্কারের দ্বন্দ্ব এবং উপকথা আশ্রিত সংস্কারাচ্ছন্ন জীবন। সামাজিক সমস্যার প্রতিটির মর্মমূলেই তিনি আঘাত করেছেন সত্য। কিন্তু কোনটিরই মুক্তির পথ-নির্দেশ নেই। এক্ষেত্রে তিনি অনেকটা শরৎচন্দ্রেরই অনুগামী।
ভারত-বিভাগোত্তরকালে তারাশঙ্করের সাহিত্যে নির্লিপ্ত-নিরাসক্ত জীবনদর্শন কাজ করেছিল। সমকালীন দেশকালের প্রভাবেই এরকমটি ঘটেছে। নাগিনী কন্যার কাহিনী-তে তিনি বিষবেদেদের সংস্কারপূর্ণ জীবন, তাদের সংগ্রাম, নাগিনী কন্যাদ্বয়ের জীবনতৃষ্ণা, দ্বন্দ্ব-সংঘাতের চিত্র এঁকেছেন পরম মমতায়। হাঁসুলী বাঁকের উপকথা-য় করালী সংস্কার ভেঙে বাবার বাহন সাপকে মেরে ফেলার সাহস দেখিয়েছিল। কিন্তু নাগিনী কন্যায় সংস্কার ভাঙার সুযোগ তৈরি করেও লেখক তা থেকে সরে গেলেন।
এক্ষেত্রে মনে রাখতে হবে নাগিনী কন্যার কাহিনী-র রচনাকাল ছিল ভারতের স্বাধীনতা-উত্তর কাল। ইতিহাসের দ্বান্দ্বিক পরিবর্তনে তখন নতুন ধরনের এলিট ও কমনারের’ উদ্ভব ঘটেছে। অপরিহার্য রূপে প্রাকৃতজনের আত্ম- প্রতিষ্ঠার আগ্রহও প্রবলতর হয়েছে তখন নাগিনী কন্যার কাহিনী-তে ওই আকাঙ্ক্ষার চিত্র আছে কিন্তু তা তৎকালীন বাস্তবতার সঙ্গে শেষ পর্যন্ত সামঞ্জস্য রক্ষায় সমর্থ হয়নি।
সাহিত্য সর্বদাই জীবনের প্রগতিকে ধারণ করে এবং রুদ্ধ জীবন-প্রবাহকে মুক্তি দেয়। চর্যাপদের শবর ডোমদের টেনে আনা হয়েছিল উচ্চবর্ণের প্রতিদ্বন্দ্বীরূপে। পরবর্তীতে পৌরাণিক দেবতাদের বিরুদ্ধে দাঁড় করানো হল মনসা, চণ্ডীকে। এ উচ্চ বর্ণের আধিপত্যের বিরুদ্ধে অনার্যের সর্বাত্মক প্রতিবাদ।
তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায় মনসার লোকপুরাণ নিয়ে উপন্যাস রচনা করলেও বৃহত্তর সমাজের কাছে অবহেলা, অবজ্ঞা ও উপেক্ষার পাত্র এই বিষবেদে কৌমগোষ্ঠীকে বৃহৎ সমাজবাস্তবতা থেকে সরিয়ে রেখেছেন। তাদের আসন্ন বিচ্ছিন্নতার সংকেত দিয়েছেন, কিন্তু তাদের পরিণতি কিংবা ভবিষ্যতের ছবিটিকে মূর্ত করে তুলতে সক্ষম হননি।